অভিযান- অন্নপূর্ণা মরিস হারজগ অনুবাদ তাপস মৌলিক শরৎ ২০২০

আগের পর্বগুলো একত্রে এই লিংকে

নেপালের বর্ষণসিক্ত সতেজ সবুজ মনোরম উচ্চ পার্বত্য অঞ্চল ছেড়ে ধীরে ধীরে প্রায় সমতলে পৌঁছে গেছি আমরা। পুরো এক সপ্তাহ কালী বা কৃষ্ণা গণ্ডকী নদীর তীর ধরে হেঁটে কুসমা গ্রামে পৌঁছে যে রাস্তা ধরে যাবার সময় গেছিলাম সে রাস্তা আমাদের ছাড়তে হল। বর্ষার জলে কালী গণ্ডকী এমনই ফুলেফেঁপে উঠেছে এখন যে তার তীর বরাবর হাঁটা খুবই বিপজ্জনক, সময় সময় তো প্রায় অসম্ভব। তাই কুসমায় কালী গণ্ডকী ছেড়ে বেশ উঁচু একটা গিরিশিরা টপকে আঁধি খোলা নামে এক নদীর ধারে নেমে এলাম আমরা। এ নদীটা কালী গণ্ডকীর সমান্তরালে সমতলে নেমে গেছে, তার তীর ধরে চলাটা দেখা গেল অতটা বিপজ্জনক নয়। আঁধি খোলা ধরে তানসিং পৌঁছে ফের পুরোনো চেনা রাস্তায় ফিরে গেছিলাম আমরা।

অভিযানের অবস্থা এখন একটা রক্তশূন্য খোঁড়া নির্জীব রুগির মতো, ব্যাজার মুখে টেনেহিঁচড়ে কোনোরকমে নিজের শরীরটাকে বয়ে নিয়ে চলেছে। কারও মনে কোনও উৎসাহ নেই, আনন্দ নেই। ধানখেতের আল ধরে ধরে কেবল হেঁটে চলো! কোনও ব্যাপারেই কেউ তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছে না। সবারই এক এবং একমাত্র উদ্দেশ্য, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ভারত সীমান্তে পৌঁছোনো। অবিশ্রাম বৃষ্টি আর ভ্যাপসা গরমের মধ্যে নেপালের পাহাড়ি উপত্যকা ধরে অন্তহীন এই অবতরণ আমাদের মানসিক ও শারীরিক দুইভাবেই একেবারে পর্যুদস্ত করে ফেলেছিল।

কোজি আর টেরে সবার পেছনে অভিযানের মালপত্র গুটোতে গুটোতে আসছিল। সীমান্তের কাছাকাছি পৌঁছে নোয়েল আগেভাগে গোরখপুর রওনা হয়ে গেল, ভারতীয় রেলে আমাদের ফেরার বন্দোবস্ত করতে। আগেপিছে অনেকটা রাস্তা জুড়ে ছড়ানো আমাদের দলের মাঝামাঝি ছিলাম অডট, আইজ্যাক, ল্যাচেনাল, রেবুফত, শ্যাজ আর আমি। ল্যাচেনাল দিন দিন প্রচণ্ড অধৈর্য হয়ে পড়ছিল। সামান্য দেরিও সহ্য হচ্ছিল না তার, হামেশাই কুলিদের অকথ্য গালিগালাজ করছিল। পথ চলতে চলতে বিশ্রামের সময় মাঝে মাঝেই ওর আর আমার স্ট্রেচার দুটো পাশাপাশি রাখা হচ্ছিল, ফলে টুকটাক কথাবার্তাও চলছিল আমাদের মধ্যে। অভিযানের সঙ্গে আনা একমাত্র রোমাঞ্চকর থ্রিলারটা পড়তে পড়তে চলছিল ল্যাচেনাল। এক-দু’পাতা করে তারিয়ে তারিয়ে পড়ছিল, যাতে শিগগির শেষ না হয়। যতদূর মনে পড়ছে বইটা মুন্ডুহীন একটা লোকের কাহিনি, অনেকবার পড়তে শুরু করেও ওর বেশি আর কোনোদিন এগোতে পারিনি আমি।

“এত সময় নষ্ট করছে এরা! দূর দূর! কোনও মানে হয়?” বলল ল্যাচেনাল।

“ধৈর্য ধরো ল্যাচেনাল। সবসময় সব কিছু একেবারে ঠিকঠাক চলে না। দেখছ তো কুলি পেতে কত সমস্যা হচ্ছে।”

“ওই জি বি রানা লোকটা কী করছে? ওর কি আরেকটু বেশি দায়িত্ব নেওয়া উচিত নয়?”

“এই ভ্যাপসা গরম আর পথশ্রমে সবাই ঝিমিয়ে পড়েছে।”

“দুত্তোর!” ক্ষোভে ফেটে পড়ে ল্যাচেনাল, “দিনরাত চারপাশে এই অসভ্য গেঁয়ো ভূতগুলোকে আর সহ্য করতে পারছি না আমি। সারাক্ষণ কী যে বকর বকর করে চলেছে, এক বর্ণও বোঝা যায় না! কাছে ডাকলে পিঠের বোঝা নামিয়ে রাখে! জল খেতে চাইলে এক কাঁদি কলা নিয়ে আসে! উফ, কবে যে শ্যাময়ে আমার বাড়ি ফিরব… বউ-বাচ্চারা কেমন আছে কে জানে…”

“আর তো বেশি দূর নয়। তানসিং থেকে ভারত সীমান্ত মোটে দু’দিনের হাঁটা। দিনের হিসেবও নয় আর, কয়েক ঘন্টার ব্যাপার। আমার শুধু দরকার একটা ভালো নার্সিং হোম, আধুনিক অপারেশন থিয়েটার থাকবে তাতে একটা, ওষুধপত্রের অভাব নেই, প্রচুর তুলো আর ব্যান্ডেজ, বার বার ড্রেসিং বদলানো যাবে…”

ঘটনা হল ক’দিন যাবৎ আমাদের তুলো-ব্যান্ডেজের ভাঁড়ারে টান পড়েছে, পুনর্ব্যবহারযোগ্য সমস্ত তুলো অডট জমিয়ে রাখা সত্ত্বেও। সার্জিকাল স্পিরিটের ভান্ডার শেষ, ইনজেকশনের সুচগুলো আমার অডিকোলন দিয়ে জীবাণুমুক্ত করতে হচ্ছে।

“ঈশ্বরের আশীর্বাদে এরকম একজন ডাক্তার পেয়েছি আমরা,” অডটের তারিফ করতে করতে বলল ল্যাচেনাল, “ও না থাকলে যে কী করতাম, ভাবাই যায় না! একটা ব্যাপার নিশ্চিত, তুমি অন্তত এখন অবধি বেঁচে থাকতে না আর। কিন্তু, তোমার কি মনে হয় না আরেকটু সাবধানে ছুরি-কাঁচি চালানো উচিত ওর? ব্যাটা ডাকাত! প্রাণে একটু মায়াদয়া নেই! ব্যাপার কী জানো, এই সার্জনরা কাটাছেঁড়া করার সময় রোগীকে অ্যানাস্থেসিয়া দিয়ে অবশ করা হয়েছে কিনা সেটা ধর্তব্যের মধ্যেই আনে না। রোগীর যন্ত্রণা হচ্ছে কিনা পাত্তাই দেয় না, ধরো আর প্যাট করে সুচ ফুটিয়ে দাও, ঘচ ঘচ করে কেটে ফেল! কী আর করা, ওর দয়াতেই বেঁচে আছি, সহ্য করে যাওয়া বিনা উপায় নেই!”

আমিও ল্যাচেনালের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অডটের মুন্ডপাত শুরু করলাম। প্রাণভরে সমালোচনা আর নালিশ করায় যে এত সুখ আগে জানতাম না! আমার পরম সৌভাগ্য যে নালিশ জানানোর জন্য বেঁচে আছি এখনও!

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা এই যাযাবর জীবনের সঙ্গে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে গেছি আমরা। মাঝে মাঝে রাস্তা গেছে ধানখেতের মাঝবরাবর পিছল সরু আলপথ ধরে, কিন্তু স্ট্রেচার কাঁধে দু’জন পাশাপাশি ওই সরু আলের ওপর দিয়ে যাওয়া মুশকিল, তাই ল্যাচেনাল আর আমায় নিয়ে আমাদের বাহকরা সোজা একেবারে ধানখেতে নেমে পড়তে বাধ্য হচ্ছে। কষ্ট হচ্ছে দেখে, যেন মত্ত হস্তীর দল নিজেদের প্রমোদের জন্য সুজলা সুফলা শস্যক্ষেত্র তছনছ করতে করতে এগিয়ে চলেছে। কখনও আবার ভরভরন্ত মকাইখেতের মাঝখান দিয়ে চলা, প্রায়ান্ধকার সুঁড়িপথ ধরে লাইন দিয়ে একজনের পেছনে আরেকজন চলেছে, দু’পাশে লম্বা লম্বা মকাই গাছ আমাদের মাথা ছাড়িয়ে বেশ কয়েক হাত উঁচু হয়ে আছে।

চলার পথে বিশ্রামের সময় কুলিরা আমাদের ঘিরে পা ছড়িয়ে বসত। একটাই সিগারেট পালা করে হাতে হাতে ঘুরত ওদের মধ্যে, একটা টান দিয়ে একজন পাশের জনকে চালান করে দিত সেটা। ধর্মীয় মতে তামাক ওদের কাছে অশুচি আমোদের উৎস, ঠোঁটে তামাক ছোঁয়ানো বারণ। তাই বেশ বুদ্ধি করে সমস্যাটার সমাধান করতে হয়েছে ওদের। তর্জনী আর তার পাশের আঙুলের গোড়ার ফাঁকে সিগারেটটা চেপে ধরে মুঠোটা গোল করে পাকিয়ে তার ওপর মুখ ঠেকিয়ে ধোঁয়া টানে এরা, ঠোঁটের সঙ্গে সিগারেটের যাতে সরাসরি সংস্পর্শ না হয়। সাপও মরল, লাঠিও ভাঙল না!

তানসিং-এর কাছাকাছি পৌঁছে আবহাওয়ার উন্নতি হল। বৃষ্টি থামল, কিন্তু তারপর সূর্যের প্রখর তাপ আমাদের যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়াল। পুঁজ-রক্তে মাখামাখি ব্যান্ডেজ বাঁধা আমার ক্ষতস্থানগুলির ওপর ভনভন করে মাছি উড়ে বেড়াতে লাগল। কিছুই করার নেই। হঠাৎ কোথা থেকে এক স্থানীয় ব্রাহ্মণ উদয় হল। আমার স্ট্রেচারের পাশে পাশে হাঁটতে শুরু করল সে, দীর্ঘ সময় ধরে আমার জন্য প্রার্থনা করল। তার কথাবার্তা কিছুই বোধগম্য হচ্ছিল না আমার, তবু ভদ্রতার খাতিরে মাঝে মাঝে স্থানীয় ভাষায় ‘আচ্ছা, আচ্ছা’ বলে গেলাম। যত দূর বুঝতে পারলাম, ব্রাহ্মণটি সূর্যের উপাসক। ব্যাপারটা জেনে মোটেই আনন্দ হল না। গনগনে সূর্যের তাতে কিনা জ্বলেপুড়ে যাচ্ছি, আর ব্যাটা তার ওপর সূর্যের উপাসনা করতে লেগেছে! চুলোয় যাক সূর্য আর তার উপাসক।

পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে ক্রমাগত হাত-পা নেড়ে ব্রাহ্মণটি কী সব বলে যাচ্ছিল। বিরক্ত লাগছিল। চোখ ঘুরিয়ে মাথার ওপর বৃষ্টিধোয়া সুনীল আকাশ দেখছিলাম আমি। হঠাৎ একটা জিনিস আমার নজরে পড়ল – আরে! লোকটার বগলে একটা ছাতা না? সঙ্গে সঙ্গে খুব মনোযোগ সহকারে ব্রাহ্মণ কী বলছে শুনতে শুরু করলাম আমি। কিছুক্ষণ নানা অঙ্গভঙ্গি করে তাকে বোঝাতে সক্ষম হলাম যে তার ওই ছাতাটি এই মুহূর্তে আমার বড়োই উপকারে আসতে পারে। ব্রাহ্মণ তার বড়ো কালো ছাতাটি আমাদের ওপর মেলে ধরে স্ট্রেচারের পাশে পাশে হাঁটতে থাকল। সেই ছাতার স্নিগ্ধ ছায়ায় যে যার ভাষায় কথাবার্তা চালিয়ে যেতে থাকলাম দু’জনে, যদিও একে অন্যের ভাষা কিছুই বুঝি না!

দু’ঘন্টা পর সেদিনের হাঁটাপথের গন্তব্যে পৌঁছলাম আমরা। স্ট্রেচারে শুয়ে শুয়ে সরকির হাতে একের পর এক কলা খাচ্ছিলাম, এমন সময় হঠাৎ একটা প্রবল চ্যাঁচামেচি আর সঙ্গে কারও আর্ত চিৎকার শুনলাম। দেখি শেরপা সর্দার আংথারকে বেচারা ব্রাহ্মণটির পেছনে লাথি মারতে মারতে এক্ষুনি তাকে এ জায়গা ছেড়ে চলে যেতে বলছে। সর্দারকে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম, “ব্যাপারটা কী?”

“বড়া সাহিব, এ ব্যাটা ঠগ, জোচ্চোর। মোটেই আমাদের কুলি নয়। বলে কিনা ওকে আজকের দৈনিক মজুরি চার টাকা দিতে হবে, কুলিদের মতো। তা আমি জিজ্ঞেস করলাম, তুমি যে কুলিদের মতো মজুরি চাইছ, তোমার বোঝাটা কোথায় দেখি? কোন বোঝটা বয়ে নিয়ে এসেছ তুমি? আপনিই বলুন বড়া সাহিব, ওর বোঝা কোথায়?”

আমি ওর ব্যাপারে খোঁজখবর নিচ্ছি দেখে ব্রাহ্মণটি হাত জোড় করে কাঁপতে কাঁপতে পাশে এসে দাঁড়াল। আংথারকে বলে চলল, “বড়া সাহিব, ব্যাটা বলছে আমাদের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে নাকি ও কাজ করেছে! পরিশ্রমে একেবারে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে! তাই পারিশ্রমিক হিসেবে ওরও মজুরি চাই।”

“দু’টাকা দিয়ে দাও,” বললাম আমি।

আংথারকে মোটেই খুশি হল না আমার সিদ্ধান্ত শুনে।

পরদিনের গন্তব্য তানসিং। এখন আর দল ছেড়ে কুলিদের পালিয়ে যাওয়ার ভয় নেই, তাদের প্রত্যেকেই ‘বড়ো শহর’-এ যাওয়ার জন্য উন্মুখ। লম্বা লম্বা পা ফেলে তাই এগিয়ে চলেছে সবাই।

“ওই যে পানসি ফিরে এসেছে!” উত্তেজিত হয়ে বলল একজন।

“দূর! হতেই পারে না। অবিশ্বাস্য!” বললাম আমি।

পানসিকে দিল্লি পাঠানো হয়েছিল। অনেকদিন আগেই সে দল ছেড়ে এগিয়ে গেছিল। এতদিন তার কোনও খবরাখবর না পাওয়ায় বেশ চিন্তিতই হয়ে পড়েছিলাম আমরা। দেখি উলটোদিক থেকে নির্বিকারভাবে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে সে, মুখে বরাবরের মতোই অমলিন হাসি, যেন মাত্র কিছুক্ষণের জন্য কাছাকাছি কোথাও গেছিল। সবাই তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেল দুর্ধর্ষ এই শেরপাকে অভিবাদন জানাতে। দিন-রাত চলে উনিশ দিনের মধ্যে দিল্লি ঘুরে ফিরে এসেছে পানসি। একমাত্র দিল্লিতেই সে রাত্রিবাস করেছে, আটচল্লিশ ঘন্টা বিশ্রাম পেয়েছে, বাকি সময়টা পথে পথেই কেটেছে।

“এই যে আপনাদের ডাক।”

“চিঠি!!”

অবিশ্বাস্য! এই প্রথম ফ্রান্সের খবর পেতে চলেছি আমরা। অভিযানের সদস্যদের মধ্যে চিঠি বিলি হল। যে যার নিজের চিঠি মুখের সামনে ধরে ডুবে গেল তার মধ্যে।

“আমার স্ত্রীর শরীরটা ভালো নেই,” আইজ্যাক বলল আমায়, “শেষ চিঠিটা বেশ কিছুদিন আগে লেখা। এখন কেমন আছে কে জানে!”

“খবর পড়েছ? আরেকটা হিমালয় অভিযানের পরিকল্পনা করছে আমাদের ক্লাব!”

এটা সত্যিই একটা বিস্ময়কর খবর।

“হুম, ওদের আত্মবিশ্বাস এখন তুঙ্গে! ভাবছে একটা যখন সফল হয়েছে তখন আর কী! এবার পর পর চালিয়ে গেলেই হয়! আমাদের ফেরা অবধিও তর সইছে না।”

“ক’জন যাচ্ছে?” “কোথায় হচ্ছে অভিযান? কোন শৃঙ্গে?” “এবার কি এভারেস্ট?” প্রচুর প্রশ্ন, উত্তর, জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়ে গেল আমাদের মধ্যে।

চিঠিতে সবাই যে কেবল ভালো খবর পেয়েছে এমন নয়। কেউ কেউ আরও অস্থির হয়ে পড়ল, কেউ বা উদ্বিগ্ন মুখে উঠে ফের হাঁটা শুরু করল।

চলতে চলতে দূরে একটা সবুজ পাহাড়ের দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে সরকি বলল, “তানসিং! বড়া সাহিব, ওই যে তানসিং!” যাক! অবশেষে কী তবে এই দীর্ঘ পথচলার অবসান হতে চলেছে?

পরদিন সকালে ঝমঝম করে খানিক বৃষ্টি হয়ে গেল। উৎরাই রাস্তাটা কাদায় মাখামাখি, খানা-খন্দে ভরা, কিন্তু আজ আর সে সব সমস্যা কুলিদের দমাতে পারল না। তারা যেন উড়ে উড়ে চলেছে আজ। তানসিং আর মাত্র কয়েকশো গজ দূরে, ইতিমধ্যেই শহরের প্রান্তে পৌঁছে গেছি আমরা। ওই তো পথের ধারে ছোটো ছোটো দোকানগুলো, রঙবেরঙের পোশাক পরা কৌতূহলী মানুষের জটলা। শহরের ভিড়ভাট্টা পেরিয়ে একটা প্রশস্ত সমতল জায়গায় তাঁবু ফেললাম আমরা। সপ্তমে গলা চড়িয়ে গান গাইতে গাইতে টেরে মালপত্র গুছিয়ে রাখতে শুরু করল। টেরের গলায় গান মানে লক্ষণ ভালো, মেজাজ খুশ আছে তার। অবশ্য একটা গানই সে জানে কেবল, প্রেরণা এলে সেটাই গায় বার বার – ‘ধিন কেটে ধিনতা, নেই কোনও চিন্তা, গাও গান পালোয়ান, কেটে ধিন ধিনতা…’

শুধু টেরে নয়, সবার মনই ভালো আজ। যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচা গেল! এর মধ্যে হঠাৎ অডটের মনে হল অনেকদিন যাবৎ অপারেশন ইত্যাদি করা হচ্ছে না, হাত খারাপ হয়ে যেতে পারে। সুতরাং বিকেলবেলাই তার নিয়মমাফিক কাটা-ছেঁড়া ফের শুরু করে দিল সে। সেদিনের অস্ত্রোপচারে আমি আমার আরেকটা পায়ের বুড়ো আঙুল এবং তার সঙ্গে ডান হাতের বুড়ো আঙুলটিও হারালাম। বৃষ্টি শুরু হল। আমায় একটা তাঁবুর ভেতর এনে শুইয়ে দেওয়া হল। শুয়ে শুয়ে এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ল্যাচেনালের আর্ত চিৎকার শুনলাম, আজ বেচারার প্রথম অঙ্গহানি হচ্ছে। “না, না” বলে তার যন্ত্রণাকাতর তীক্ষ্ণ গোঙানি শুনে সত্যিই কষ্ট হচ্ছিল, বুঝতে পারছিলাম বেচারা নিজের হাত-পায়ের আঙুলগুলোকে কতটা ভালোবাসত।

পরদিন আমাদের শিবির পরিদর্শনে এল সরকারি কর্মকর্তাদের একটি দল। তাঁদের যথাসাধ্য অভ্যর্থনা জানালাম আমরা। গভর্নরকে দেখে আমার খুবই প্রভাবশালী মনে হল। আমাদের প্রতি তিনি যথেষ্ট সদয়, কুলি নিয়োগের সমস্যার কথা শুনে তক্ষুনি যথাসাধ্য সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিলেন। চৌঠা জুলাইয়ের সকাল আজ, আর কয়েক ঘন্টার মধ্যেই আমাদের প্রয়োজনমতো কুলিরা চলে আসবে, জেনে বড়ো আশ্বস্ত লাগছিল। সরকারি নির্দেশ অনুযায়ী জি বি রানার চুক্তির মেয়াদ আর দু’দিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে, বাটওয়াল পৌঁছোনো অবধিই তার দায়িত্ব, কিন্তু আমার ইচ্ছা আমাদের সঙ্গে সে কাঠমান্ডু অবধি চলুক। কোনও সন্দেহ নেই কাঠমান্ডুতে ও সঙ্গে থাকলে আমাদের খুবই উপকার হবে, কিন্তু আমার মূল উদ্দেশ্য ছিল ওকে বেশ ভালোভাবে পুরস্কৃত করা, যা কিনা ওর প্রাপ্য। জি বি রাজি হল, প্রতিশ্রুতি দিল অনুমতি চেয়ে মহারাজার কাছে সে দরখাস্ত পাঠাবে। কয়েক ঘন্টা পরেই সে ঝড়ের মতো আমার তাঁবুতে ছুটে এল, ঠোঁটে চওড়া হাসি, মুখচোখ আনন্দে ঝলমল করছে। ঘোষণা করল মহারাজা তাকে রাজধানী অবধি যাবার অনুমতি দিয়েছেন।

বাটওয়ালের দিকে রওনা হওয়ার আগে মনে হল একটু ভদ্রসভ্য হওয়া প্রয়োজন। একজন নাপিত ডেকে আনতে বললাম আমি, কারণ আমার দাড়িগুলো বেড়ে আদিম মুনিঋষিদের মতো লম্বা হয়ে উঠেছিল। জি বি তার এক আর্দালিকে পাঠাল সে কাজে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই আর্দালি এক গোর্খাকে ধরে নিয়ে এল। লোকটা অসম্ভব নোংরা। আমার পাশে এসে বসল সে। বেশ অস্বস্তি হচ্ছিল, সন্দেহ জাগছিল কী জানি কী করবে লোকটা, কিন্তু ফরসা মসৃণ গালের স্বপ্নে বিভোর হয়ে আমি তখন মরিয়া। জল আনা হল। সেই গোর্খা আমার দাড়িতে সাবান ঘষতে শুরু করল। কী জানি কোন আদিম জিনিস ব্যবহার করছিল সে, সাবানের মতো ফেনাও হল না, দাড়িও বিন্দুমাত্র নরম হল না। ওই দিয়েই মুখটা ভীষণভাবে রগড়াতে শুরু করল নাপিত। দু’হাতের তালু আর দশ-দশটা আঙুল দিয়ে এমন তেড়েফুঁড়ে মালিশ করতে লাগল যে রীতিমতো যন্ত্রণা হচ্ছিল।

“আরে আস্তে, আস্তে!” বললাম আমি, “ধীরে ধীরে মালিশ করো।” কিন্তু সেই গোর্খাকে নিরস্ত করে কার সাধ্যি! মালিশ করে দাড়ি নরম করার পর সে তার বাক্স ঘেঁটে অদ্ভুতদর্শন একটা ক্ষুর বার করল। দেখি বাঁশ ছুলে বানানো দুটো কাঠির মাঝে ছোট্ট একফালি ব্লেড গোঁজা রয়েছে। এবার সে তার নোংরা দুর্গন্ধ বাঁ হাতে আমার মুখটা চেপে ধরে ডান হাতের ক্ষুর দিয়ে দাড়ি কামাতে শুরু করল। ক্ষুরের ব্লেড দাড়ির ওপর দিয়ে পিছলে বেরিয়ে যায় আর তারপর সেই নাপিত আঙুল দিয়ে টেনে টেনে একটা একটা করে দাড়ি ওপড়াতে থাকে, এই হল তার দাড়ি কামানো। যন্ত্রণায় পরিত্রাহি চিৎকার শুরু করলাম আমি, তাতে সেই গোর্খা আমায় কড়া এক ধমক লাগাল, আমার তীব্র প্রতিবাদ ধর্তব্যের মধ্যেই আনল না।

ব্যাপার কী দেখতে অডট তাঁবুর ভেতর মাথা গলিয়েছিল। চিৎকার করে বললাম তাকে, “এই অসভ্য বর্বর লোকটার হাত থেকে বাঁচাও আমায় অডট। এর চেয়ে তুমি আমার হাত-পায়ের বাকি আঙুলগুলো কেটে বাদ দিয়ে দাও, সেটা অনেক কম যন্ত্রণাদায়ক।” শুনে অডট এমন খুশি হল যে কী আর বলি!

ঘন্টাখানেক কসরতের পর আমার গাল-গলা মোটামুটি ভদ্রস্থ একটা চেহারায় পৌঁছল। এবার গোঁফ ছাঁটার পালা। গোঁফের আকৃতির ব্যাপারে আমি বরাবরই খুব খুঁতখুঁতে। লোকটা তার এক এবং একমাত্র অস্ত্র সেই ক্ষুরটা দিয়েই গোঁফ ছাঁটতে শুরু করল। এবারে ব্লেডটা ঠোঁটের ওপরের চামড়ায় রীতিমতো কেটে বসে যাচ্ছিল, বেশ বুঝতে পারছিলাম। প্রাণপণে ঠোঁট দুটো চেপে বন্ধ করে রইলাম। অবশেষে ক্ষৌরকর্ম সমাপ্ত করে গোর্খাটি তার যন্ত্রপাতি বাক্সে ঢুকিয়ে রাখল। বিপুল অঙ্কের এক পারিশ্রমিক দাবি করে বসল সে। আইজ্যাক ওর হাতে তিন টাকা ধরিয়ে দিয়ে সরকিকে বলল, “একে এক্ষুনি এখান থেকে দূর করে দাও।”

দলটা দু’ভাগ করে প্রথম দলে রেবুফতের তত্ত্বাবধানে ল্যাচেনালকে বাটওয়াল পাঠিয়ে দেওয়া হল। আমি দ্বিতীয় দলের সঙ্গে রওনা দিলাম। চারিদিকে সব এত ঘন সবুজ এখন যে তিন মাস আগে যে রাস্তা ধরে গিয়েছি তা চিনতেই পারছিলাম না। সন্ধের ঠিক আগে একটা পাহাড়ের মাথায় উপস্থিত হলাম আমরা। আইজ্যাক আমার পাশে পাশে হাঁটছিল। বলল, “মরিস, চেয়ে দেখ একবার।”

আমার স্ট্রেচারটা শেরপাদের এমনভাবে রাখতে বলল আইজ্যাক যাতে পেছনদিকটা অর্থাৎ যে পার্বত্য প্রদেশ আমরা ছেড়ে যেতে চলেছি তা পরিষ্কার দেখতে পাই। দেখলাম। বিষণ্ণ এক সন্ধ্যার জলছবি যেন। ধাপে ধাপে উঠে যাওয়া সবুজ পর্বতশ্রেণিগুলির খাঁজ থেকে ধোঁয়ার মতো কুয়াশা উঠে আসছে। নিচের গভীর উপত্যকাগুলিতে অন্ধকার নেমে এসেছে। দিনের কলকোলাহল ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসছে। মনটা এক অদ্ভুত অবসাদে ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল। সে কি এই অসাধারণ দৃশ্য জীবনে আর দেখতে পাব না বলে? নাকি ওই দুর্গম সুউচ্চ শৃঙ্গরাজির অন্দরমহলে আমাদের অবর্ণনীয় দুঃখকষ্টের স্মৃতিতে? না এই বিশাল হিমালয়ের সামনে নিজেদের ক্ষুদ্রতার উপলব্ধিতে? আইজ্যাক আর আমি নীরবে চেয়েই রইলাম।

আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ফের আধুনিক সভ্যতার দুরন্ত ঘূর্ণির মধ্যে গিয়ে পড়ব। এই হিমালয়, আমাদের অভিযান সবই নিছক অতীতের স্মৃতি হয়ে যাবে। কুলিরা আমার স্ট্রেচারটা ফের কাঁধে তুলে নেবার তোড়জোড় করছে। ফিরে যে যেতেই হবে! ডান হাতটা কপালে ঠেকিয়ে একটা শেষ নমস্কার করলাম হিমালয়কে। দুঃখ নেই কোনও। হিমালয়, তুমি আমাদের হৃদয় কানায় কানায় পূর্ণ করে দিয়েছ। একটা ঝাঁকুনি দিয়ে চলতে শুরু করল আমার বাহকরা। সবাই চুপচাপ, কারও মুখে কোনও কথা নেই। রাত্রের আস্তানার খোঁজে নীরবে এগিয়ে চললাম আমরা।

পরদিন সকালে বাটওয়ালের উদ্দেশে রওনা হবার পর নোয়েলের সঙ্গে দেখা। ট্রেনে আমাদের ফেরার ব্যবস্থা করতে সে গোরখপুর গেছিল। রাস্তায় দূর থেকে আমাদের দেখতে পেয়েই সে হাঁক পাড়ল, “হ্যালো, কেমন আছ সবাই?”

“তোমার খবর কী? ভারতে কি খুব গরম পড়েছে এখন?”

“গরম বলে গরম! বাপ রে বাপ! হাঁড়িভর্তি জল টগবগ করে ফুটছে যেন!”

নোয়েল বলল, জুলাইয়ের ছ’তারিখ, অর্থাৎ আগামীকাল ভারতের নৌতনওয়া স্টেশন থেকে আমাদের ট্রেন ছাড়বে। আর সময় নেই। বিকেলে প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টির মধ্যে বাটওয়ালে আমাদের পুরোনো আস্তানায় উপস্থিত হলাম। ল্যাচেনাল সেখানে গত রাত্রেই পৌঁছেছে। এরপর সন্ধেবেলাটা গেল ডাক্তার সাহিব অডটের নিত্যনৈমিত্তিক চিকিৎসা এবং কাটা-ছেঁড়ার কাজে।

অভিযানের মালপত্র সমস্ত বাটওয়ালে পৌঁছে গেছে। এখন প্রশ্ন হল কাল ভোরে সব কিছু নিয়ে স্টেশন অবধি যাওয়ার জন্য ট্রাক পাওয়া যাবে তো? বেলা দশটার মধ্যে আমাদের স্টেশনে পৌঁছোতে হবে। আমি জি বি-কে অনুরোধ করলাম এ ব্যাপারে যথাসম্ভব সাহায্য করার জন্য। সঙ্গে সঙ্গে সেই রাতের অন্ধকারে বৃষ্টিবাদলা উপেক্ষা করে গভীর জঙ্গলাকীর্ণ রাস্তা ধরে সে বেথারি-র দিকে রওনা দিল। ছ’তারিখ ভোরবেলা লরি হাজির। জি বি পুরো ভেলকি দেখিয়ে দিয়েছে! ওকে অনেক ধন্যবাদ জানালাম। কুলিদের পাওনাগণ্ডা মিটিয়ে দিয়ে নৌতনওয়া-র দিকে রওনা হলাম আমরা। জঙ্গলের মধ্য দিয়ে রাস্তা, গাছে গাছে বাঁদর ভর্তি, আমাদের তারা বিন্দুমাত্র পাত্তা দিল না। পথে একটা লরির টায়ার গেল ফেটে, আর আমি যেটায় ছিলাম সেটার ইঞ্জিন গেল বিগড়ে। তখন বিগড়োনো গাড়িটার চাকা খুলে লাগানো হল টায়ার-ফাটা লরিটায়। দুটো খোঁড়ায় মিলে একটা চালু গাড়ি, মাইনাসে মাইনাসে প্লাস যাকে বলে!

যাই হোক, অবশেষে নৌতনওয়া পৌঁছে আমাদের জন্য সংরক্ষিত দুটো প্রশস্ত বগিতে গুছিয়ে বসলাম সবাই। দুপুরের মধ্যে সমস্ত মালপত্র ট্রেনে তোলা হয়ে গেল, ট্রেন ছেড়ে দিল গোরখপুরের উদ্দেশে। সবাই বাড়ি ফেরার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত। প্রত্যেকেই যত শীঘ্র সম্ভব ফ্রান্সে ফিরতে চায়। অভিযান চলাকালীন তিন মাস যাবৎ যারা অসীম সাহস এবং ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে তারা এখন চব্বিশ ঘন্টা বাঁচাতে মরিয়া। কিন্তু প্রত্যেকের স্বতন্ত্র ব্যক্তিগত ইচ্ছানুসারে তো পরিকল্পনা করা সম্ভব নয়! আমার কথা বলতে গেলে বলতে হয়, কথা দিয়েছিলাম অভিযান শেষে কাঠমান্ডু গিয়ে নেপালের মহারাজার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করব, অভিযানের শুরুতে করা সেই অঙ্গীকার রক্ষায় আমি সমস্তরকম চেষ্টা করতে প্রস্তুত। অডট আমার সঙ্গে থাকবে, আইজ্যাক আর নোয়েলও আসবে। বাকিরা দিল্লি চলে যাবে, সেখানে তাদের কয়েকদিন অপেক্ষা করতে হবে। ল্যাচেনালকে দিল্লির তীব্র গরম থেকে রেহাই দিতে ক’দিনের জন্য মুসৌরির মতো কোনও পাহাড়ি শহরে নিয়ে যাওয়া হবে।

সবাই যখন এই সমস্ত পরিকল্পনা নিয়ে তর্ক-বিতর্কে মগ্ন, অডট কিন্তু হাতে কাঁচি বাগিয়ে ঠিক তার নিজের কাজে ব্যস্ত। প্রচণ্ড গরম, ছায়ার নিচে তাপমান দেখাচ্ছে ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। চারপাশে মশা বিনবিন করছে। তার মধ্যেই অডট ল্যাচেনালের ক্ষতগুলির শুশ্রূষা করে চলেছে। গোরখপুরের কাছাকাছি এসে পড়েছি আমরা। আর দু’ঘন্টার মধ্যে দুটো আলাদা দলে ভাগ হয়ে যাবে অভিযান। আগামী প্রায় এক সপ্তাহ ল্যাচেনাল আমাদের ডাক্তার সাহেবের সেবাযত্ন থেকে বঞ্চিত থাকবে। তাই অডটের এত তাড়াহুড়ো।

ট্রেনের কামরাগুলো প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিতে দিতে চলেছে, যেন একটা টিনের কৌটোয় আমাদের পুরে লুডোর ছক্কার মতো ক্রমাগত ঝাঁকিয়ে চলেছে কেউ। এর মধ্যে অডটের পক্ষে অপারেশন করা অসম্ভব, তাই আঙুল-টাঙুল কেটে বাদ দিতে সে স্টেশনে স্টেশনে ট্রেন দাঁড়াবার সুযোগ নিচ্ছিল। এক স্টেশন থেকে ছেড়ে পরের স্টেশনে গাড়ি থামার মাঝে যাবতীয় প্রস্তুতি সেরে ফেলা হচ্ছিল – পুরোনো ব্যান্ডেজ খোলা, ক্ষতস্থান পরিষ্কার করা, যন্ত্রপাতি সাজিয়ে রাখা ইত্যাদি – কাঁচি হাতে অডট তৈরি – যে মুহূর্তে ট্রেন থামবে অমনি অপারেশন শুরু।

“ল্যাচেনাল, চলে এসো, এবার তোমার পালা,” আমায় ছেড়ে ল্যাচেনালের দিকে ফিরে ব্যাগ্র সুরে বলল অডট, “সরকি, বড়া সাহেবের বিছানাটা পরিষ্কার করে ফেল ততক্ষণ…”

ল্যাচেনাল নিজেই ব্যান্ডেজ খুলে পা বাড়িয়ে বলিদানের জন্য প্রস্তুত। গোরখপুরের আগের স্টেশনে তার ডান পায়ের দুটো আঙুল কাটা পড়ল। গোরখপুর পৌঁছে আরও তিনটে বাদ দিতে হবে।

“আস্তে, অডট, প্লিজ একটু সাবধানে!”

“যথাসম্ভব সাবধানেই করছি আমি ল্যাচেনাল, এর বেশি সম্ভব নয়। কথা বোলো না।”

প্রাণপণে দু’হাতে একটা পা চেপে ধরে আছে ল্যাচেনাল, তার দৃষ্টিতে অডটের প্রতি অনুনয় ঝরে পড়ছে।

“গোরখপুরে গাড়ি ঢুকছে,” বলল শ্যাজ।

ট্রেনের গতি শ্লথ হয়ে এল। কোজি, রেবুফত, শ্যাজ আর কয়েকজন শেরপা গাড়ি থামার সঙ্গে সঙ্গে স্টেশনে লাফিয়ে নামার জন্য প্রস্তুত। অভিযানের সমস্ত সাজসরঞ্জাম এই ট্রেন থেকে ঝটপট নামিয়ে লখনউগামী ট্রেনের সংরক্ষিত কামরায় ওঠাতে হবে। সে গাড়ি এক ঘন্টার মধ্যে ছাড়বে।

অডট এদিকে ঘেমেনেয়ে একসা। গভীর একাগ্রতার সঙ্গে সে তার কাটাকাটি করেই চলেছে, বেচারি ল্যাচেনালের যন্ত্রণাকাতর আর্তনাদে কর্ণপাতই করছে না। আর মাত্র আধঘন্টা সময় আছে হাতে, আরও একটা আঙুল বাদ দিতে হবে। আজ বোধহয় একদিনে সর্বোচ্চসংখ্যক আঙুল কাটার রেকর্ড করল অডট! কাঁচি হাতে শেষ আঙুলটা কাটার জন্য তৈরি হল সে। ঠিক এই সময় হঠাৎ এক প্রবল ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল ট্রেনটা, বোধহয় নতুন ইঞ্জিন জোড়া হল। অডটের বাগিয়ে ধরা কাঁচি সেই ঝাঁকুনির চোটে পড়ে গেল হাত থেকে। পড়বি তো পড়, সে কাঁচি জানালার পাশের ফাঁক গলে ঢুকে গেল কামরার দেয়ালের ভেতর, কত নিচে কে জানে!

“দুত্তোর!” বিরক্তির চরম সীমায় পৌঁছে বলে উঠল অডট, “আর সময় নেই, এক্ষুনি কাঁচিটা বার করো ওখান থেকে।”

“অসম্ভব! ওটা বার করতে হলে কবজা-টবজা ঢিলে করে জানালাটা খুলে ফেলতে হবে।”

জবাবটা মোটেই পছন্দ হল না অডটের। কোনও কথা না বলে সে অন্য একটা বিরাট কাঁচি হাতে তুলে নিল। অবশিষ্ট বুড়ো আঙুলটা যে কেটে বাদ দিতেই হবে!

“ওরে বাবা গো!” ককিয়ে উঠল ল্যাচেনাল, “পায়ে পড়ি অডট, আর না, ছেড়ে দাও এবার…”

কামরার দরজার সামনে স্থানীয় কিছু মানুষজন ভিড় করে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছিল। হঠাৎ অডটের চোখ পড়ল তাদের ওপর।

“এখানে কী দরকার? দূর হও! ভাগো হিঁয়াসে!” হুঙ্কার দিয়ে উঠল সে।

মানুষগুলো অডটের ভাষা কিছুই বুঝল না, কিন্তু সুড়সুড় করে ঠিক সরে পড়ল সব।

ল্যাচেনালের দিকে এগিয়ে এল অডট।

“না না, অডট, প্লিজ, আর নয়,” ল্যাচেনালের কাতর প্রার্থনা শুরু হল ফের।

হঠাৎ থমকে গেল অডট। শান্ত স্থির চোখে ল্যাচেনালের দিকে তাকিয়ে কঠিন গলায় বলল, “সত্যি, বড্ড বাড়াবাড়ি করছ তুমি। যা করছি তোমার ভালোর জন্যই করছি আমি। আমার প্রতি বরং তোমার কৃতজ্ঞ থাকা উচিত, বদলে তুমি কিনা অসহযোগিতা করছ! এই তোমার প্রতিদান?”

এই কথায় ল্যাচেনাল একেবারে নির্বাক হয়ে গেল। যদি প্রতিদানেরই ব্যাপার হয় তাহলে সে তার দুই হাত দুই পা সমস্ত অডটের জন্য কেটে ফেলতে প্রস্তুত।

লখনউ-এর ট্রেন ছাড়তে আর কয়েক সেকেন্ড মাত্র বাকি। প্ল্যাটফর্মে প্রচুর লোকজনের ব্যস্ত আনাগোনা। যে মুহূর্তে অডট ল্যাচেনালের পায়ের পাতা দুটো ব্যান্ডেজ করা শেষ করল টেরে এক ঝটকায় ল্যাচেনালকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে এই ট্রেন থেকে নেমে অন্য ট্রেনের দিকে ছুট দিল। কোনোরকমে তাকে বলতে পারলাম, “বিদায় ল্যাচেনাল! ভালো থেকো। দিল্লিতে দেখা হচ্ছে ফের।”

আমাদের কামরাটা এবারে পরিষ্কার করতে হবে। ছড়িয়ে থাকা পুরোনো তুলো-ব্যান্ডেজ আর পুঁজ-রক্তের গন্ধে মনে হয় ভূতও পালাবে। সরকি আর ফুথারকে কাজে লেগে পড়ল। দরজাটা হাট করে খুলে সমস্ত নোংরা ঝেঁটিয়ে মেঝেতে জড়ো করল তারা। আবর্জনার স্তূপ থেকে ইতস্তত উঁকি দিতে থাকল নানা আকার ও আকৃতির অনেকগুলি কাটা আঙুল। তারপর ভিড় করে কামরার বাইরে দাঁড়ানো হতভম্ব স্থানীয় মানুষজনের চোখের সামনে সবকিছু ঝেঁটিয়ে নিচের প্ল্যাটফর্মে ফেলা হল। ট্রেনের বাঁশি বেজে উঠল, স্টেশনের অগুন্তি লোকজনের চিৎকার চ্যাঁচামেচি ও দৌড়োদৌড়ির মধ্যে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে চলতে শুরু করল গাড়ি। ভিড়ের মধ্যে কেবল টেরেকে দেখতে পেলাম, দু’হাতে দুটো গামবুট তুলে ধরে নাড়াতে নাড়াতে আমাদের বিদায় সম্ভাষণ জানাচ্ছে।

ট্রেনের চাকার ছন্দবদ্ধ গানের তালে আমার কল্পনা ভেসে চলল প্রাচীন এক রাজধানী শহরের উদ্দেশে, সহস্র এক আরব্য রজনীর গল্পের মতোই যে শহরের অসংখ্য কাহিনি শুনেছি এতদিন।

(পরবর্তী সংখ্যায় সমাপ্য)

খেলার পাতার সমস্ত লেখার লিংক একত্রে এইখানে

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s