অভিযান- অন্নপূর্ণা মরিস হারজগ অনুবাদ তাপস মৌলিক বর্ষা ২০২০

আগের পর্বগুলো একত্রে এই লিংকে

একটা তীক্ষ্ণ যন্ত্রণা অনুভব করে আমি চিৎকার করে উঠলাম। সকালবেলার প্রথম ইঞ্জেকশনটা আইজ্যাক ফুটিয়েছে আমার কোমরে। দেখলাম সে বেশ উত্তেজিত। অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ে চলেছে, যেন চোখের জলে পাহাড় বিদায় জানাচ্ছে আমাদের। অডট যাত্রা শুরু করার আদেশ দিতে ইতস্তত করছিল, কিন্তু আজ জুন মাসের উনিশ তারিখ হয়ে গেল, আর দেরি না করে আমাদের নেমে যাওয়াই মঙ্গল। আমার আর ল্যাচেনালের জন্য জি বি রানা দুটো স্ট্রেচার বানিয়েছে। স্ট্রেচারে শোওয়ানোর আগে শেষবারের মতো চারদিকের বৃষ্টিস্নাত সবুজ বনানীর অপরূপ মায়াময় দৃশ্য দু’চোখ ভরে দেখে নিলাম একবার।

শুরু হল যাত্রা। রেবুফত একটা ঘোড়া জোগাড় করেছে, ঘোড়ায় চেপে টগবগ করতে করতে চলেছে আমাদের পাশে পাশে। ধৌলাগিরি থেকে নেমে আসা একটা স্রোতস্বিনী ধারা পেরোতে হল আমাদের। স্রোতের মোকাবিলা করার জন্য কুলিরা ছোটো ছোটো দলে ভাগ হয়ে কাঁধে কাঁধ রেখে পেরোল সেই ধারা। আইজ্যাক আর অডট দেখি ঝটপট জামাকাপড় খুলে ফেলেছে, তারপর শুধু আন্ডারপ্যান্ট পরে বীরদর্পে পেরিয়ে চলে এল এপারে। গত কয়েক সপ্তাহের ধকলে দু’জনেরই ওজন অনেক কমে গেছে, ছিপছিপে হয়ে গেছে শরীর। কলেজ পড়ুয়া যুবার মতো দেখাচ্ছিল দু’জনকে।

দানা গ্রামে পৌঁছে মনে হল হিমালয়ের উচ্চ পার্বত্য অঞ্চল ছেড়ে সত্যিই নেমে এসেছি আমরা। রাস্তার দু’পাশে পাহাড়ের ঢালে এখন চাষের খেত, কলাবাগান। আবহাওয়াও যথেষ্ট উষ্ণ। এত বিপর্যয়ের পরেও পাহাড় ছেড়ে নেমে যেতে সত্যি মনখারাপ লাগছিল!

এদিকে কুলিরা একের পর এক আমাদের ছেড়ে চলে যেতে শুরু করেছে। ওদের বোঝানোর সমস্ত প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হল আমাদের। এমনকি কুলিদের দলনেতা পান্ডি পর্যন্ত বলল, এরপর সে আর যাবে না। নিচের উপত্যকার গরম আবহাওয়া নাকি ওর সহ্য হয় না! বাস্তবিকই, ওর সারা শরীর বেয়ে দরদর করে ঘাম গড়িয়ে পড়ছিল। আরেকটা কারণও অবশ্য আছে। ওর মতে এই ক’দিনে ও যা রোজগার করে ফেলেছে তা যথেষ্ট। এর চেয়ে বেশি টাকা দিয়ে করবেটা কী তাই ও জানে না।

পরদিন কুড়ি তারিখ দিনটা ভালো ছিল। বৃষ্টি ছিল না। রাস্তাও সহজ। বহুদিন পর দুপুরবেলা কয়েক মিনিটের জন্য সূর্যের মুখ দেখা গেল। কতগুলো বিশাল বিশাল বটগাছে ঘেরা ছায়াসুনিবিড় এক জায়গায় লাঞ্চের জন্য থামলাম আমরা। খাওয়া মানেই তো আমার কাছে যন্ত্রণাবিশেষ! খাবারের কথা মাথায় এলেই দেহমন বিদ্রোহ করে উঠছে। কিন্তু অডট ডাক্তারবাবু সহজে ছাড়ার পাত্র নন। আমার নিয়মিত পুষ্টিবিধানের ওপর তাঁর কড়া নজর, আর তাঁর নির্দেশানুসারে দলের বাকিরাও আমায় খাওয়ানোর জন্য সদা তৎপর। আইজ্যাক আর টেরে সমস্তরকম চেষ্টা করল, যুক্তি দিয়ে বোঝাল কখনও, কখনও অনুনয়-বিনয় করল, সবশেষে রেগে গিয়ে শাসানি দিল, “এরকমভাবে চললে দিন কয়েকের বেশি টিকবে না তুমি আর।”

ওরা যদি জানত এই কথাটা কীভাবে ভয়ে অবশ করে দিচ্ছিল আমায়! বিস্তর সাধ্যসাধনা করে ওরা দু’জন রণে ভঙ্গ দিলে রঙ্গমঞ্চে আবির্ভূত হলেন খোদ ডাক্তারসাহিব। ওসব কায়দাকানুনের মধ্যে না গিয়ে কমান্ডারের ঢঙে আমায় হুকুম করল অডট, “মেটেগুলো এক্ষুনি খেয়ে নেবে, খানিক পরে এসে আমি দেখছি খেয়েছ কিনা। আশা করি জোর করে তোমার মুখে ঠুসে দিতে হবে না ওগুলো।”

সরকি ওর নোংরা চটচটে হাতে মেটেগুলো ছুরি দিয়ে কেটে একটা টুকরো ছুরির ডগায় গেঁথে ঢুকিয়ে দিল আমার মুখে। বাচ্চা ছেলের মতো আমি কেবল চিবিয়েই চললাম, গিলতে আর পারি না! ওদিকে অডট ফের ওই এল বলে! ও যেরকম কড়া ধাতের লোক… ওই আসছে! কোঁত করে গিলে ফেললাম টুকরোটা। মনে হল গলা পুরো বন্ধ হয়ে গেল, এক্ষুনি না উলটি হয়ে যায়! উফফ! আরও অতগুলো মেটের টুকরো গিলতে হবে? অডট ফিরে এল। হেডমাস্টারের মতো বজ্রকঠিন মুখে  বলল, “তোমার কোনও চেষ্টাই নেই, মরিস!” তারপর সরকির দিকে ফিরে বলল, “চালিয়ে যাও।” লাঞ্চ, ডিনার কিংবা ব্রেকফাস্ট, তিনবেলাই মোটামুটি এইভাবে চলছিল।

বটগাছগুলোর ছায়ায় হাওয়া বেশ ঠান্ডা। কতগুলি হৃষ্টপুষ্ট মুরগি নিঃশঙ্কচিত্তে এদিকওদিক ছুটে বেড়াচ্ছিল। ইশ, এদের একটাকে যদি খাওয়া যেত ধরে, তাহলে কিঞ্চিৎ স্বাদবদল হত! সবসময় শক্ত মাটন খেতে খেতে এমন একঘেয়ে হয়ে গেছে, মাটনের গন্ধ পেলেই এখন বমি আসে। এক চাষি রাজি হল একটা মুরগি বেচতে, মুচকি হেসে বলল, “রাজি, তবে তোমরা নিজেরা যদি একটাকে ধরে নিতে পারো তবেই।” তার মুখের কথা শেষ হয়েছে কি হয়নি, জি বি রানা নিজের বন্দুকটা তুলে গুড়ুম করে গুলি করে দিল একটা মুরগিকে। কাটা হল মুরগিটা, রান্নাও হল তারপর। আংথারকে প্রচণ্ড উৎসাহে আমাকে দিতে এল খাওয়ার জন্য। বড়া সাহিব নিজমুখে কিছু খাওয়ার ইচ্ছাপ্রকাশ করেছেন – এটা তাদের কাছে এক বিরল ঘটনা।

দানা থেকে যে ক’জন কুলিকে বিশেষভাবে আমার ও ল্যাচেনালের জন্য নিযুক্ত করা হয়েছিল তারা প্রত্যেকেই অসম্ভব দক্ষ। আমার চারজন তো স্ট্রেচারশুদ্ধু আমায় অনায়াসে বয়ে নিয়ে চলেছিল, যেন পালকের মতো হালকা আমি। এদের মধ্যে বছর পঞ্চাশ বয়সের এক কুলি ছিল আমার প্রতি বিশেষ সহানুভুতিশীল, তার এক চোখ ছিল কানা। চলতে চলতে বিশ্রামের জন্য দাঁড়ালেই প্রতিবার কাছে এসে বলছিল সে – রাস্তা আর বাকি নেই বেশি, এ পথ ওদের চেনা। ওদের সামর্থ্য আর দক্ষতা দেখে বুকে বল পাচ্ছিলাম। এদের মধ্যে একজনও কখনও পা হড়কালে আমি বা ল্যাচেনাল কয়েকশো ফিট গড়িয়ে পড়তে পারতাম। কখনও কখনও চড়াই-উৎরাইয়ের জন্য স্ট্রেচারটা ঢালু হয়ে পড়ছিল আর শরীরটা ওপরে বা নিচে পিছলে যেতে চাইছিল। প্রাণপণে হাঁটু আর কনুইয়ের সাহায্যে ঠেকানোর চেষ্টা করছিলাম আমি। যখন পারছিলাম না, চিৎকার করে উঠছিলাম আতঙ্কে, কোনও শেরপা এসে তখন ধরে রাখছিল আমায়। বার বার এরকম আতঙ্কিত হয়ে পড়ায় স্নায়ুর ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ছিল, তাই বললাম, একজন শেরপা যেন সর্বদা আমার পাশে পাশে থাকে। দায়িত্বটা বর্তাল সরকির ওপর। এরপর থেকে সবসময় আমার সঙ্গে সঙ্গে ছিল সরকি, মাঝে মাঝেই আমায় খাবার জল দিচ্ছিল, কলা খেতে দিচ্ছিল, খাওয়ার সময় সাহায্য করছিল, আবার কোথাও বিশ্রামের জন্য থামলে একটা এয়ার ম্যাট্রেস ফুলিয়ে তার ওপর শুইয়ে দিচ্ছিল। এতই রোগা আর হাড্ডিসার হয়ে পড়েছিলাম আমি যে এয়ার ম্যাট্রেস ছাড়া স্ট্রেচারটা মাটিতে নামালে রাস্তার ছোটো ছোটো নুড়িপাথরগুলি তীক্ষ্ণ সুচের মতো বিঁধছিল গায়ে।

এক রাত্রে, বান্দুক নামের এক গ্রামের কাছে, বিশাল এক জলপ্রপাতের পাশে তাঁবু পড়ল আমাদের। তাঁবুর ছাদে অঝোরধারায় বৃষ্টি পড়ে চলেছিল। ঘুমোনোর চেষ্টা করছিলাম, বৃষ্টির শব্দ কানে তেমন পৌঁছোচ্ছিল না আমার। দুঃস্বপ্নের মতো পাহাড় থেকে আমাদের এই অবতরণের কথা ভাবছিলাম শুয়ে শুয়ে। এত দীর্ঘ দিন ধরে এই কষ্ট শরীর আর বইতে পারছিল না। আমার ব্যান্ডেজ করা ক্ষতগুলি থেকে রীতিমতো দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল, কিন্তু দলের কারও মুখে এ নিয়ে কোনও অভিযোগ শুনিনি কখনও। ইদানীং মাঝে মাঝেই প্রায় অচৈতন্যের মতো হয়ে পড়ছিলাম আমি।

আইজ্যাক আমার পাশে শুয়েছিল। অনেকক্ষণ পর অবশেষে চোখে ঘুম নেমে এল। মাঝরাতে আচমকা ভেঙে গেল ঘুমটা। চারদিকে ঘুরঘুট্টি অন্ধকার। তাড়াতাড়ি বিছানায় উঠে বসলাম আমি, ভয়ে আতঙ্কে সারা শরীর থরথর করে কাঁপছিল। মনে হচ্ছিল আমার শেষ সময় আগত, সাক্ষাৎ মৃত্যু দাঁড়িয়ে আছে শিয়রে। কোথা থেকে যেন অবিরাম গির্জার ঘন্টাধ্বনি ভেসে আসছে, কানে তালা ধরে যাচ্ছে সে আওয়াজে। এ আমি কোথায় এখন? ভয়ে চিৎকার করে উঠলাম প্রাণপণে। তাঁবুর ভেতর আলো জ্বলে উঠল। হাঁপ ছেড়ে দেখি, নাঃ, টেন্টের ভেতরেই আছি। ধীরে ধীরে মনে পড়ল এক অভিযানের সদস্য হিসেবে হিমালয়ে এসেছি আমি।

আইজ্যাক বিস্মিত হয়ে বলল, “হলটা কী তোমার?” ব্যাপারটা ওকে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করলাম। “নিশ্চয়ই দুঃস্বপ্ন দেখছিলে কোনও,” বলল সে। যাই হোক, তাঁবুর ভেতরের আলোটা জ্বালিয়েই রাখল আইজ্যাক, তারপর ধীরে ধীরে নানা কথার ছলে শান্ত করার চেষ্টা করল আমায়।

সকাল হতেই অডটকে বললাম ঘটনাটা। সে বলল মরফিন ইঞ্জেকশনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে এরকম দেয়ালা হতে পারে কখনও কখনও। সেদিন থেকে ঠিক করলাম, যতই যন্ত্রণা হোক সহ্য করতে রাজি, কিন্তু আর কোনোদিন মরফিন নেব না।

বেণি গ্রামের কাছাকাছি এসে খবর পেলাম সেখানে কলেরার মড়ক লেগেছে। গ্রামটা এড়ানোর জন্য একটা সেতু পেরিয়ে কালী গণ্ডকী নদীর অন্য পারে যেতে হল আমাদের। সেতুটা প্রায় দুশো ফিট লম্বা, নদীর জলতল থেকে প্রায় পঞ্চাশ ফিট ওপরে ঝুলছে, নিচ দিয়ে ভয়ঙ্কর গর্জনে পাক খেতে খেতে বয়ে চলেছে স্রোতস্বিনী গণ্ডকীর বিপুল কালো জলরাশি। নদীর দু’পারে দুটো খাম্বার মাঝে দুটো শেকল ঝোলানো সমান্তরালভাবে, শেকল দুটো থেকে নিচে ঝুলছে কিছু জং ধরা বাঁকানো লোহার রড, আর সেই রডগুলোর ওপর পাতা কিছু পোকায় খাওয়া পচা কাঠের তক্তা – এই হল সেই ঝুলন্ত ব্রিজ। তার ওপর যথেষ্ট লম্বা হওয়ায় কেউ পেরোতে গেলেই ভয়ঙ্করভাবে দুলছে ব্রিজটা। এখানে স্ট্রেচারে করে আমায় আর ল্যাচেনালকে পার করানো যাবে না, তাই টেরের নকশা করা বেতের চেয়ার দুটোয় বসানো হল আমাদের। প্রথমে ল্যাচেনালকে পিঠে নিয়ে রওনা দিল আজীবা, কয়েক গজ যেতে না যেতেই ল্যাচেনাল আতঙ্কে চিৎকার শুরু করল। কয়েকজন শেরপা আজীবাকে সাহায্য করছিল যাতে ব্রিজের দু’পাশের লোহার রডগুলোর ঘষায় ল্যাচেনালের পায়ে চোট না লাগে। এরপর আমার পালা। প্রাণপণে মনে সাহস আনার চেষ্টা করলাম। আজীবা খুব সাবধানে রওনা হল, অন্য শেরপারাও সাহায্যের জন্য প্রস্তুত, কিন্তু ব্রিজের মাঝামাঝি পৌঁছোতেই সেটা এমন ভয়ানক দুলতে শুরু করল যে আতঙ্কে নীল হয়ে গেলাম আমি। অবশেষে অন্য পারে ল্যাচেনালের কাছে পৌঁছোলাম, তারপর ডাক ছেড়ে কোরাসে এমন কান্না জুড়লাম দু’জনে যে কুলিরা রীতিমতো অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল।

আমরা তো সবাই পেরিয়ে গেলাম, এবার জি বি রানার ঘোড়াটা এপারে আসে কীভাবে? রানা বলল, ওটা সাঁতরেই পেরোবে। বেশ কিছু নাইলনের দড়ি ঘোড়াটার শরীরে বেঁধে এপার থেকে টানতে শুরু করল লোকজন। ঘোড়াটা খুশি হল না মোটেই, বিপদ আঁচ করে এক পাও এগোল না নদীর দিকে। তখন কয়েকজন পেছন থেকে ধাক্কা মেরে তাকে ফেলে দিল জলে। মুহূর্তের মধ্যে নদীর ঘূর্ণিজলে তলিয়ে গেল ঘোড়াটা। এপার থেকে দড়ি ধরে সবাই হেঁইয়ো হেঁইয়ো করে টানতে শুরু করল। মাঝে মাঝে ঘোড়াটার একটা কান কি একটা ঠ্যাং হঠাৎ হঠাৎ জলের ওপর উঁকি মারে, ফের তা তলিয়ে যায় নদীতে। ভাবলাম এপারে টেনে তুললেও ঘোড়াটা ততক্ষণে আর জ্যান্ত থাকবে না। কিছুক্ষণ পর পাড়ের কয়েক গজ দূরে তার মাথাটা জেগে উঠল জলের ওপর, তারপর হাঁচরপাঁচর করে প্রাণীটা উঠে এল শক্ত মাটিতে এবং নির্লিপ্ত ভঙ্গীতে ধীরে ধীরে হেঁটে যোগ দিল আমাদের সঙ্গে।

সন্ধে হয়ে আসছিল। নদীর ধারেই তাঁবু ফেললাম আমরা, কিন্তু শোনা গেল নদীর এপারেও নাকি কলেরা ছড়িয়ে পড়ছে, তাই পরদিন ভোর হতে না হতে সেই অস্বাস্থ্যকর জায়গা ছেড়ে রওনা দিলাম তাড়াতাড়ি। বিকেলে কুসমা নামে ছড়ানো-ছেটানো এক বড়ো জনপদে হাজির হলাম সকলে। প্রতিদিন রাত্রেই নিয়ম করে বৃষ্টি হচ্ছে, তাঁবুর ছাদে একঘেয়ে বৃষ্টির শব্দ শুনে শুনে কান পচে গেছে। তাই কুসমায় একটা বড়ো পাকা বাড়ি খুঁজছিলাম আমরা, যাতে দলের সবাই একসঙ্গে থাকা যায় আর জিনিসপত্র গোছগাছের জন্যও বেশ খানিক জায়গা মেলে, কিন্তু সেরকম কোনও বাড়ি পাওয়া গেল না জায়গাটায়। যাঁদের কাছে চাহিদাটা জানানো হয়েছিল, গ্রামের সেই মাতব্বররা আমাদের নিয়ে গিয়ে ওঠাল গ্রামের এক বৌদ্ধ গুম্ফায়। মনে হল গুম্ফাটা পরিত্যক্ত। প্রথমে নিজেদের মতো ছড়িয়েছিটিয়ে আয়েশ করে বসল সবাই, কিন্তু একটু থিতু হওয়ার পরই সেই নিস্তব্ধ পবিত্র গুম্ফা আমাদের ইয়ার্কি ফাজলামি আর কলকোলাহলে মুখরিত হয়ে উঠল।

কিছু কুলি এখান থেকে দানা ফিরে যাবে, দলের কয়েকজন তাদের পাওনাগন্ডা মিটিয়ে দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। অন্য কয়েকজন লেগে পড়ল এখান থেকে তানসিং যাবার জন্য নতুন কুলি নিয়োগের কাজে। বিদায়ী কুলিদের কাছ থেকে শ্যাজ মালপত্র এবং সাজসরঞ্জাম সমস্ত বুঝে নিল। কোজিকে সর্বসম্মতিক্রমে রাঁধুনি হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে, সে খাবারের টিনগুলো খুলে কী কী বেঁচে আছে দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কোনোকিছুরই নিশ্চয়তা নেই। পরদিন যাত্রা শুরুর জন্য যথেষ্টসংখ্যক কুলি পাওয়া যাবে কিনা কে জানে! শুনলাম তানসিং এখান থেকে পাঁচ দিনের পথ, বাস্তবে দশ দিনেরও বেশি লেগেছিল আমাদের সেখানে পৌঁছোতে।

তানসিং যাত্রাকালে এক সকাল – শিবিরের বাইরে অন্তত পঞ্চাশজন রুগি অপেক্ষা করছে ডক্টর সাহিব অডটের জন্য। তাদের একেক জনের একেক রকম সমস্যা, তবে বেশিরভাগেরই অজানা জ্বর, হাত-পা ফোলা কিংবা ব্যথা-বেদনা। এত রুগি দেখতে অডটের প্রচুর সময় লেগে যাবে, ওষুধপত্রও লাগবে অনেক, ধৈর্যের কথা নয় ছেড়েই দিলাম। ব্যাপারটা তাড়াতাড়ি সারার জন্য অডট তাই পাঁচটা বাঁধা প্রশ্ন ঠিক করল – ১। বয়স কত? ২। রাতে ভালো ঘুম হয়? ৩। খিদে হয়? ৪। ব্যথা কোথায়? ৫। কাশি আছে?

প্রশ্নগুলো নোয়েল ইংরিজি আর হিন্দি মিশিয়ে জি বি রানাকে বুঝিয়ে বলল, রানা গুরখালি ভাষায় জিজ্ঞেস করছিল রুগিকে। রুগির উত্তরও উলটো পথে গুরখালি-হিন্দি-ইংরিজি হয়ে ফরাসি ভাষায় অডটের কাছে ফিরে আসছিল, আর এতবার ভাষান্তরিত হওয়ায় তাদের বিচিত্র সব রূপান্তর ঘটে যাচ্ছিল। শেরপারা তো হাসতে হাসতে কুটিপাটি, তাও তো ওদের কাছে কেবল হিন্দি-গুরখালি-হিন্দি এই রূপান্তরটুকুই বোধগম্য হচ্ছিল। তাতেই ওদের এই অবস্থা!

চিকিৎসার এত প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও সাধারণ গ্রামবাসীদের কাছ থেকে অডট বিপুল ভক্তিশ্রদ্ধা আদায় করে নিতে সক্ষম হয়েছিল। প্রায় দেবতার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিল সে। দূর দূর গ্রাম থেকে রুগিরা আসত তাকে দেখাতে। এদের সারল্য সত্যিই হৃদয়স্পর্শী। অগাধ বিশ্বাসে নিজেদের স্বাস্থ্য, কখনও কখনও নিজেদের জীবনও এক সম্পূর্ণ অজানা-অচেনা লোকের হাতে নির্দ্বিধায় সঁপে দিচ্ছিল তারা। এই প্রথম সত্যিকারের কোনও পাশ করা ডাক্তার ওদের চিকিৎসা করছে। জ্বরজ্বালায় ওদের ভরসা বলতে গ্রামের হাতুড়ে ডাক্তার, নয়তো শরণাপন্ন হতে হয় কোনও ওঝার। আর প্রায় সবরকম রোগেই ওঝাদের দাওয়াই এক ও অভিন্ন – মন্ত্রপূত গোবরের প্রলেপ!

ভাষা ছাড়া অন্যান্য অনেক কারণেও অডটের পক্ষে চিকিৎসা করা বেশ কঠিন ছিল। ধর্মীয় কারণে অডটের স্পর্শ রুগিরা পছন্দ করত না। সবচেয়ে শক্ত ছিল মহিলাদের পরীক্ষা করা। তারা প্রচণ্ড লাজুক, কিছুতেই ডাক্তারবাবুকে নিজেদের শরীর স্পর্শ করতে দিতে রাজি নয়, পরীক্ষার প্রয়োজনে জামাকাপড় খোলা তো দূরের কথা। একবার বহু কষ্টে একটি নেপালি বালিকাকে অডট রাজি করিয়েছিল। সবে সে তার গয়নাগাটি খুলতে শুরু করেছে, অডটের সহকারী সরকি সসম্ভ্রমে তাঁবু ছেড়ে বেরিয়ে গেল। মেয়েটি আর কোনোভাবেই এরপর এগোতে রাজি হল না!

যাই হোক না কেন, ওষুধ সমস্ত রুগিকে দিতেই হবে। যতটা সম্ভব, অভিযানের ভাঁড়ার থেকে অডট লাগসই ওষুধ দেবার চেষ্টা করত, না পারলে নিরীহ কোনও ভিটামিন জাতীয় ওষুধ দিয়ে দিত যাতে রুগি অন্তত মানসিক শান্তি পায়। কিন্তু ওষুধগুলি নিয়ে যে ওরা কী করবে তা ভগবানই জানেন! হয়তো নির্দ্বিধায় টিউব থেকে চুষে অ্যান্টি-সানবার্ন ক্রিম খেয়ে ফেলল, কিংবা একটা গোটা প্লাস্টারই চিবিয়ে খেয়ে নিল! জ্বরের রোগী আর পেটব্যথার রোগী নিশ্চিন্তে নিজেদের মধ্যে ওষুধ বদলাবদলি করে নিত। ওষুধ তো ওষুধই, জ্বরের না পেটব্যথার তাতে কী আসে যায়! তবে এই গ্রাম্য নেপালি লোকগুলির মারাত্মক সাহস আর সহ্যশক্তি দেখতাম কোনও অপারেশনের দরকার পড়লে।

একদিন এক হতভাগ্য নেপালি তরুণ কবজিতে ডবল কম্পাউন্ড ফ্র্যাকচার নিয়ে দেখাতে এল অডটের কাছে। কবজির একটা হাড় চামড়া ভেদ করে খোঁচের মতো বেরিয়ে আছে, ক্ষতস্থানটা পুঁজ-রক্তে মাখামাখি, বীভৎসভাবে ফুলে আছে হাতের পাতা, পুরো হাতটাই ফুলে এমন হয়ে আছে যে কল্পনা করা যায় না। সন্দেহ নেই তার অবস্থা গুরুতর। জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা গেল দুর্ঘটনাটা ঘটেছে সপ্তাহ দুয়েক আগে। অডট ছেলেটির বাবা-মাকে জানাল, হাতটা এক্ষুনি কবজি থেকে কেটে বাদ দিতে হবে, নইলে তাঁদের ছেলে বাঁচবে না। বাবা-মা মোটেই রাজি হলেন না, জানালেন যে তাঁরা এসেছেন যদি ডাক্তারবাবু শুধু একটু ব্যান্ডেজ করে দেন, তাহলেই যথেষ্ট। কিছু করার নেই অডটের। সে ছেলেটিকে মরফিন ইঞ্জেকশন দিয়ে কবজিটা টেনেটুনে হাড়টা জায়গামতো বসিয়ে দেবার চেষ্টা করল, সফলও হল অনেক কসরতের পর। তারপর হাতটা সে প্লাস্টার করে দিল।

“এরপর কী হবে?” ওরা চলে গেলে অডটকে উদ্বিগ্নভাবে জিজ্ঞেস করলাম আমি। ছেলেটা তো ব্যান্ডেজ বদল করার জন্য কাউকে পাবে না, আর ক্ষতটা ভেতরে পেকে উঠে কয়েকদিনের মধ্যেই বিষাক্ত হয়ে পড়বে! ক্রমে তার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়বে সেই বিষ।

“কী আর করি বলো! খুব বেশি হলে দু’সপ্তাহের ভেতরেই ছেলেটি মারা যাবে,” নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল অডট। ওর কথা শুনে আমার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা হিমেল স্রোত নেমে গেল। ঠিকই করেছে অডট। এই অশিক্ষিত গ্রাম্য অধিবাসীদের যুক্তি দিয়ে বোঝানো আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়, এখনও অন্ধকার যুগে পড়ে রয়েছে এরা। শুয়ে শুয়ে এ দেশের অভাগা মানুষগুলির কথা ভাবছিলাম। অসুখ-বিসুখ মহামারীর সঙ্গে লড়ার মতো কোনও অস্ত্রই নেই এদের কাছে, না আছে ডাক্তার, না টিকার ব্যবস্থা। এ সব জায়গায় মৃত্যু আপন মর্জিমাফিক দাপিয়ে বেড়ায়, যে কোনও মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে শিকারের ঘাড়ে। দীর্ঘ ফেরার পথে প্রায়ই শবযাত্রা দেখেছি আমরা। আমার কিংবা ল্যাচেনালের কাছে দৃশ্যগুলি খুব একটা উৎসাহবর্ধক ছিল না। অদ্ভুত রঙের একরকম কাপড়ে জড়িয়ে মৃতদেহ বয়ে নিয়ে যায় এরা, সামনে শিঙা ফুঁকতে ফুঁকতে চলে একদল লোক, সে শিঙার আওয়াজ চারদিকের পাহাড়ে বার বার প্রতিধ্বনিত হয়ে ফেরে। মৃতের আত্মীয়বন্ধুরা চুপচাপ পেছন পেছন অনুসরণ করে, কান্নাকাটি বা দুঃখপ্রকাশের কোনোরকম বাড়াবাড়ি দেখিনি তাদের মধ্যে। মৃত্যু এদের কাছে আত্মার এক দশা থেকে অন্য দশায় রূপান্তরমাত্র, দুঃখজনক কোনও ঘটনা নয়। জন্মান্তরে বিশ্বাসী এরা, বিশ্বাস করে মৃত ব্যক্তির আত্মা আরও উন্নত এবং যথাযথ রূপে অন্য কোনও প্রাণীদেহে পুনর্জন্ম লাভ করবে। কৃষ্ণা গণ্ডকী নদীর পাড় বরাবর মৃতদেহগুলি কবর দেওয়া হয়, বর্ষার স্ফীত জলরাশির তোড় সেগুলি ভাসিয়ে নিয়ে যায় পবিত্র গঙ্গায়।

প্রতিদিন নিয়ম করে অডট দলের আহতদের সেবাশুশ্রূষা করে চলেছে। মুশকিল হয়েছে তার ওষুধপত্তর নিয়ে। কুলিদের পিঠে হয় সেটা এগিয়ে যায়, তাড়াতাড়ি হেঁটে তার নাগাল পেতে হয় আমাদের, নয়তো অনেক পেছনে পড়ে থাকে, অপেক্ষা করতে হয় নিরুপায় হয়ে। তবে তাতে আমার কিংবা ল্যাচেনালের কোনও তাপ-উত্তাপ নেই, অডটকে যত ঠেকিয়ে রাখা যায় ততই যেন নিশ্চিন্ত। ধীরে ধীরে পেনিসিলিনের কড়া ডোজের অগুন্তি ইঞ্জেকশন তাদের কাজ শুরু করল। জ্বর কমল আমার, শরীরে সেপ্টিসেমিয়া ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও কাটল। স্বাভাবিকভাবে কথাবার্তা শুরু করলাম আমি, চারপাশে ঘটে চলা ঘটনাবলী সম্পর্কে আগ্রহও ফিরে এল আবার।

একদিন পুতলিকেট নামক এক গ্রামের সবুজ ঘাসে ঢাকা উপত্যকায় স্থাপিত আমাদের শিবিরে অডট আমার রুটিনমাফিক চিকিৎসা শুরু করল। “বেশি চেঁচাবে না,” বলল সে আমায়।

“একটু ধীরেসুস্থে কাঁচি চালিও প্লিজ!” কাতর অনুরোধ জানালাম আমি।

“যতটা সম্ভব সাবধানেই করছি। এই দেখ, লাগছে?” কাঁচি দিয়ে ক্ষতস্থানের মরা চামড়াগুলি ছেঁটে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করল অডট।

দাঁতে দাঁত চেপে ব্যথা সহ্য করতে করতে বললাম, “নাহ, ঠিক আছে। বুঝতে পারিনি কিছু।”

“বেশ!” বলল অডট, তারপর তার কাঁচি দিয়ে মোক্ষম এক কোপ দিল।

“উফফ!” বিদ্যুতের মতো একটা তীক্ষ্ণ যন্ত্রণায় সারা শরীর থরথর করে কেঁপে উঠল আমার।

“প্রথম অঙ্গহানি, পায়ের একটা কড়ে আঙুল গেল তোমার,” ঘোষণা করল অডট।

ব্যাপারটা মানসিকভাবে বেশ ধাক্কা দিল আমায়। পায়ের কড়ে আঙুল তেমন কোনও কাজে লাগে না অবশ্য, তাও আজন্মের সঙ্গী বলে কথা! চোখে জল এসে গেছিল প্রায়! অডট তার দু’আঙুলে জিনিসটা তুলে ধরে আমায় দেখিয়ে বলল, “স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে রেখে দেবে নাকি? কিচ্ছু হবে না এটার, একদম ঠিকঠাক থাকবে। তোমার তেমন আগ্রহ নেই মনে হচ্ছে? চাই না আঙুলটা?”

“মোটেই চাই না। এরকম পচা কালো একটা কড়ে আঙুল রেখে কী করব আমি?”

“ভালো, তোমার আবেগ-টাবেগ কম!” নির্বিকারভাবে ‘স্মৃতিচিহ্ন’-টা ময়লা ফেলার বাক্সে ছুড়ে ফেলে বলল অডট।

ক্ষতস্থানগুলিতে মৃত কোষ আর জীবিত অংশের মধ্যে ফারাকটা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে এখন। অডট নিয়মিত তার শল্যচিকিৎসা করে চলল আর প্রতিদিনই আমার হাত-পায়ের আঙুলগুলির একটা কি দুটো করে গাঁট কাটা পড়তে লাগল। সমস্ত অপারেশনই চলল কোনোরকম অ্যানাস্থেসিয়া ছাড়া, যখন যেখানে সুবিধে। একদিন কোনও গ্রামে হয়তো কোনও পাকা বাড়ি পাওয়া গেল, কোনোদিন আবার রাস্তার ধারে ধুলোবালির মধ্যেই করতে হল অপারেশন। কখনও জোঁক গিজগিজ স্যাঁতসেঁতে কোনও ধানখেতের ভেতর, কখনও বৃষ্টির মধ্যে জি বি রানার কম্পমান হাতে ধরা ছাতার তলায় – কোনও পরিস্থিতিতেই নিস্তার নেই অডটের হাত থেকে।

একদিকে যখন আহতদের এরকম আদিম সব অস্ত্রোপচার চলছে, প্রতিদিনই তাঁবুর ভেতর দুর্গন্ধ পুঁজ-রক্তের ছড়াছড়ি, ব্যান্ডেজ করা ক্ষতস্থানগুলি থেকে পুঁজ গড়িয়ে পড়ছে, শয়ে শয়ে মাছি উড়ে বেড়াচ্ছে সেগুলির চারপাশে, অন্যদিকে শুয়ে শুয়ে মজাদার সব ঘটনা দেখছিলাম শিবিরে। বর্ষার প্রথম বৃষ্টির পর এখন খেতে ধান রোপণের সময়। গ্রামের সক্ষম ছেলেবুড়ো সবাই চাষের খেতে ব্যস্ত, অভিযানের সবচেয়ে বড়ো মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়াল দলের জন্য কুলি জোগাড় করা। সবাই খুব উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল, যে করে হোক পাহাড় ছেড়ে সমতলে নেমে যেতে হবে আমাদের এবং যত শীঘ্র সম্ভব। অডট জি বি রানাকে অনুরোধ করল তার ক্ষমতা এবং পদমর্যাদার সদ্ব্যবহার করে কুলি নিয়োগ করার জন্য। সে রানাকে স্মরণ করিয়ে দিল, আমরা নেপালের মহারাজার অতিথি। মহারাজা যদি জানতে পারেন, অভিযানের একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে এভাবে তাঁর দেশে আটকে পড়েছি আমরা, কখনোই সেটা বরদাস্ত করবেন না। জি বি যথাসম্ভব চেষ্টা করল, কিন্তু তেমন কোনও লাভ হল না তাতে।

ক্রমশ আমরা মরিয়া হয়ে উঠছিলাম। এমনিতেই ন্যূনতম পারিশ্রমিকের থেকে কুলিদের আমরা বেশি পয়সা দিচ্ছিলাম। কিন্তু দেখা গেল, যতই নিচের দিকের উপত্যকায় নামছি, চাষ-আবাদও ততই বেড়ে চলেছে চারপাশে আর প্রচুর পারিশ্রমিক দিতে চাইলেও কুলি নিয়োগ ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে। বোঝা গেল অচিরেই কুলি জোগাড় করা সম্পূর্ণ অসম্ভব হয়ে পড়বে এবং সেরকম হলে আর এক পাও এগোতে পারব না আমরা। তখন দলের সদস্যরা এক নতুন ফন্দি বার করল। শুরু হল অভিযানের জন্য ‘স্বেচ্ছাসেবক’ নিয়োগ। পদ্ধতিটা খুব সহজ সরল – গ্রামের কোনও সক্ষম স্বাস্থ্যবান লোককে বিনা কাজে ঘুরে বেড়াতে দেখলেই হল, সোজা তার কোমরের কাছি ধরে টেনে আনো আর আলগোছে স্ট্রেচারের নিচে জুতে দাও কিংবা ঘাড়ে একটা রুকস্যাক চাপিয়ে দাও। প্রথমে লোকটি প্রবল আপত্তি জানাবে, কিন্তু একটু পরেই একগাল হেসে ফেলবে। দিনের শেষে যখন সে মোটা পারিশ্রমিক পাবে তখন গোড়ায় বিদ্রোহ করার জন্য বরং অনুশোচনা হবে তার, সমস্ত মনোমালিন্যও দূর হয়ে যাবে। বিশেষ করে অভিযানের শেরপারা খুবই দক্ষ ও সফলভাবে এই নতুন পদ্ধতির প্রয়োগ করে চলেছিল। দেখে মনে হল, এ পদ্ধতি তাদের কাছে নতুন নয়, এমন নয় যে আমরাই প্রথম হিমালয় অভিযান যারা এভাবে কুলি নিয়োগ করছি। ভালোমানুষের মতো মুখ করে নির্লিপ্তভাবে শেরপারা গ্রামের রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়াত, চিতাবাঘের মতো বাতাস শুঁকতে শুঁকতে। যেই মাল বওয়ার মতো উপযুক্ত কোনও গ্রামবাসী চোখে পড়ল অমনি ‘খপাৎ’!

এরকমই এক সকাল, গরমবোরি নামের এক ছোট্ট গ্রামের ঠিক কেন্দ্রস্থলে এক বাড়ির সামনে স্ট্রেচারে শুয়ে আছি; অডটের দৈনিক কাটাছেঁড়ার পর ক্লান্ত, বিধ্বস্ত। আজ অনেকগুলি আঙুলের গাঁট হারিয়েছি আমি। সামনেই গ্রামের পাথরে বাঁধানো সদাব্যস্ত প্রধান রাস্তা, সেদিকে শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি। শেরপারা সব কুলি ‘শিকারে’ গেছে। স্বয়ং তুকুচার গ্রামপ্রধানের তরফে নিযুক্ত এক বিশেষ কুলির কাছ থেকে গতকাল একটি কারুকার্যখচিত দুর্দান্ত রুপোর তলোয়ার পেয়েছি। সে লোকটাও শেরপাদের সঙ্গে গেছে কুলি ধরে আনতে। এ কাজে তার খুব উৎসাহ। লোকটার গলার আওয়াজ বেশ বাজখাঁই, দাঁতগুলো আদিম মানুষের মতো এবড়োখেবড়ো আর লম্বা লম্বা, দেখলে ভয় হয় এই বুঝি এক কামড়ে শরীর থেকে এক খাবলা মাংস তুলে নিল! হঠাৎ দেখি সরকি, আংথারকে আর আজীবা কাছেই গ্রামের এক গলির ভেতর থেকে বেরিয়ে এল, সামনে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে এল হতচকিত চার গ্রামবাসীকে। বেচারারা ধানখেতে ধান রুইছিল। মুহূর্তের মধ্যে তাদের হাতের কাস্তে ইত্যাদি কেড়ে নেওয়া হল, তারপর সামান্য ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ আলোচনার শেষে পিঠে চাপিয়ে দেওয়া হল অভিযানের একেকটা বোঝা। এইভাবে গ্রাম থেকে একের পর এক ‘স্বেচ্ছাসেবক’ এসে জড়ো হল জায়গাটায়, অভিযানের লগ বুকে তাদের নাম-ধাম নথিভুক্ত করা চলল।

বৃষ্টির মধ্যে একজনের পেছনে আরেকজন লাইন দিয়ে যাত্রা শুরু করলাম আমরা। দিন যখন প্রায় শেষ হয়ে আসছে, ধোঁয়াশায় আবছা শান্ত সবুজ পাহাড়ি গ্রামাঞ্চল জুড়ে সন্ধে নামছে, সেই সময় হঠাৎ এক জেলেকে দেখতে পেল শেরপারা। লোকটি জালভর্তি মাছ নিয়ে আমাদের সামনে সামনে দুলকি চালে হাঁটতে হাঁটতে ঘরে ফিরছিল। আজীবা নিঃশব্দে ফুথারকে ও সরকিকে কনুই দিয়ে দুই ঠোনা মারল, তারপর তিনজনে লম্বা লম্বা পায়ে এগিয়ে গেল জেলেটির নাগাল পেতে। হঠাৎ একটা ছোট্ট ধ্বস্তাধস্তি, জেলেটির ছিপ, মাছভর্তি জাল, সঙ্গের পোঁটলাপুঁটলি নিমেষে চলে এল আজীবাদের হাতে, কয়েক মুহূর্ত পরে দেখি সে আমারই স্ট্রেচারের সামনে, অন্য তিনজনের সঙ্গে কাঁধে স্ট্রেচার বয়ে তালে তালে পা ফেলে দিব্যি এগিয়ে চলেছে! বেচারি জেলে! এবারে শেরপারা নরমভাবে তাকে বুঝিয়ে বলল, স্রেফ তানসিং অবধি যেতে হবে তাকে, বিনিময়ে যথেষ্ট পয়সা পাবে সে। জেলেটি তো কান্নাকাটি জুড়ে দিল, অনেক অনুনয়-বিনয় করল, কাঁধে স্ট্রেচারটা না থাকলে নির্ঘাত সে আজীবাদের পায়ে হত্যে দিয়ে পড়ত। শেরপারা যখন মুচকি হেসে তাকে জানাল যে এতে তাদের কিছুই করার নেই, তখন বাধ্য হয়ে সেও হেসে ফেলল। “ভালোই ব্যবস্থা যা হোক!” হাসতে হাসতে বলল সে।

তানসিং যাত্রাপথে প্রায় প্রতিদিনই এরকম কোনও না কোনও নাটক অভিনীত হত, কারণ প্রতি রাত্রেই কিছু কুলি টাকার মায়া ত্যাগ করে পাওনা পারিশ্রমিক না নিয়েই শিবির ছেড়ে পালিয়ে যেত। পরিস্থিতি খুবই সঙ্গিন হয়ে দাঁড়াল। কুলির অভাবে অভিযানের মালপত্র আগেপিছে প্রচুর গ্রামে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রইল। কোনও কোনও সময় দেখা গেল একদম সামনের দলের চেয়ে সবচেয়ে পেছনের কুলিরা পুরো দু’দিন পিছিয়ে। কয়েকটা দল মালপত্র নিয়ে জনমানবহীন জায়গায় ফেঁসে গেল যেখানে কোনও কুলির হদিস পাওয়াই দুষ্কর।

উনত্রিশে জুন সকালবেলা দারজিং নামে এক জায়গায় দেখা গেল পঁচিশ জন কুলি দল থেকে হাওয়া। আবহাওয়াও ক্রমশ খারাপ হচ্ছে আরও। বেশ কিছুদিন যাবৎ প্রায়ই আমাদের দলের আশেপাশে মাথায় চমৎকার একটি টুপি পরা এক প্রাক্তন গোর্খা সৈনিককে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যাচ্ছিল। ঠিক বোঝা যাচ্ছিল না লোকটার উদ্দেশ্য কী, তবে সে ছিল ঝামেলা পাকাতে ওস্তাদ। প্রায়ই সে বিরক্ত করত দলের কুলিদের, নানারকমভাবে প্ররোচিত করার চেষ্টা করত, লম্বা লম্বা ভাষণ দিত তাদের উদ্দেশে। আইজ্যাক এসে অডট আর আমায় বলল, “কুলিদের ওপর লোকটার যখন এতই নেতিবাচক প্রভাব, মনে হয় এ অঞ্চলের একজন কেউকেটা সে।”

“হুঁ, কিন্তু তার ক্ষমতা যদি সে এভাবে কুলি খ্যাপাতে ব্যবহার করে তাহলে আর আমাদের নেপাল ছেড়ে বেরোতে হচ্ছে না,” বলল অডট।

“ঠিক, বরং ওর প্রভাবকে আমরা কায়দা করে ব্যবহার করতে পারি,” আইজ্যাক প্রস্তাব করল, “লোকটাকে প্রধান কুলি নিয়োগকর্তা হিসেবে আমাদের দলে চাকরি দিলে হয় না? গালভরা একটা নাম দেওয়া যায় পদটার – প্রিন্সিপাল রিক্রুটিং সার্জেন্ট!”

প্রস্তাবটা মনে ধরল সকলের, সুতরাং দৈনিক দশ টাকা মাইনেয় লোকটাকে নিয়োগ করলাম আমরা। খুব একটা সুবিধের লোক ছিল না সে। স্থানীয় গ্রামপ্রধানদের চাপ দিয়ে কুলি নিয়োগ করতে সে পারছিল ঠিকই, কিন্তু দেশি মদ ছাং এবং সুন্দরী নেপালি মেয়েদের প্রতি তার মাত্রাতিরিক্ত আসক্তি ছিল। প্রতি সন্ধ্যায় কুলিদের আসর বসত, বেলাগাম নাচ-গান আর হইহল্লায় কুলিরা ভাসিয়ে দিত নিজেদের, গভীর রাত অবধি চলত সে মজলিস। পরদিন সকালে ক্লান্ত বিধ্বস্ত অবস্থায় কোনোরকমে চোখ কচলাতে কচলাতে আমাদের ‘রিক্রুটিং সার্জেন্ট’ ডিউটিতে জয়েন করত, তবে খানিক পরেই সে সামলে নিত নিজেকে এবং গ্রাম থেকে ‘স্বেচ্ছাসেবক’ নিয়োগ করার কাজে লেগে পড়ত চটপট।

(এরপর আগামী সংখ্যায়)

(এরপর আগামী সংখ্যায়)

খেলার পাতার সমস্ত লেখার লিংক একত্রে এইখানে