অভিযান এভারেস্ট এরিক শিপটন অনুঃ বাসব চট্টোপাধ্যায় বর্ষা২০১৭

আগের পর্বগুলো

অবশেষে !!

সুইস অভিযাত্রীরা ঘোষণা করলেন শরৎকালের আগে তাঁদের শৃঙ্গ আরোহণের কোন পরিকল্পনা নেই। এই সংবাদে বৃটিশ অভিযাত্রীদের ১৯৫৩ সালের এভারেস্ট অভিযানের প্রস্তুতি চলতে থাকল ধীরগতিতে। ব্রিটিশ অভিযাত্রীরা সুইস অভিযাত্রীদের অগ্রগতি এবং সাফল্যের দিকে নজর রাখলেন। সুইস অভিযানের পরিণামের ওপর নির্ভর করছিল ব্রিটিশ পর্বতারোহীদের পৃথিবীর উচ্চতম শৃঙ্গ অভিযানের অগ্রগতি।

    সুইস অভিযানের ব্যর্থতার সংবাদ ইংল্যান্ডে পৌঁছনোমাত্রই অত্যন্ত দ্রুততার সাথে শুরু হল ব্রিটিশ অভিযানের প্রস্তুতি। অনেক আলাপ-আলোচনার পর স্থির হল অভিযানে ন্যুনতম দশজন আরোহী অংশগ্রহণ করবেন। সঙ্গে থাকবেন ফিজিওলজিস্ট Dr. Plugh এবং চিত্রগ্রাহক Tom Stobart। এছাড়া সঙ্গে থাকবেন কর্নেল H.C.J. Hunt এর মতো পর্বতারোহী, যিনি আল্পস এবং হিমালয়ের বিভিন্ন শৃঙ্গ অভিযানের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন। দীর্ঘদিন সেনাবাহিনীতে থাকার সুবাদে নেতৃত্ব দেবার যোগ্যতা থেকে শুরু করে উচ্চমানের পরিকল্পনা সফলতার সাথে বাস্তবায়িত করতে হান্ট এর জুড়ি ছিল না। অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে শক্তিশালী একটি অভিযাত্রীদল নির্বাচিত হল। নিউজিল্যান্ড থেকে হিলারি এবং Lowe ভারতে এসে ব্রিটিশ দলে যোগ দিলেন। ছিলেন Burdilon এবং Ward, যাঁরা ১৯৫১ সালের এভারেস্ট reconnaissance অভিযানের প্রাক্তন সদস্য। R.C.Ivans, A.Gregory -এর মতো পর্বতারোহী চো ওয়ু অভিযানের অভিজ্ঞতার ঝুলি সঙ্গে নিয়ে যোগ দিলেন। আল্পস অভিযানের বিপুল অভিজ্ঞতা সম্পন্ন অভিযাত্রী W.Noyce এবং গোরখা রেজিমেন্টের প্রধান Major Walie –এর মতো দক্ষ পর্বতারোহী অভিযাত্রীদলকে সমৃদ্ধ করেছিল।

দলের নতুন দুজন পর্বতারোহী G.C.Band এবং M. Westmacott –এর কথা না বললেই নয়। তাঁদের এই অভিযাত্রীদলে সদস্য হবার যোগ্যতা ছিল দুঃসাহসিক আরোহণ অভিজ্ঞতার রেকর্ড। অভিযানের সাজসরঞ্জামেও ছিল বিশেষত্ব। নির্দিষ্ট এই অভিযানের জন্যই শ্রেষ্ঠ গুণমানের এবং বিশেষ ভাবে নির্মিত হয়েছিল আরোহণ সামগ্রী। বিশেষত ক্লাইম্বিং বুট, ঠান্ডা প্রতিরোধক পোশাক এবং অক্সিজেন সিলিন্ডার ব্রিটেনের শেষ্ঠ পর্বতারোহণের যন্ত্রপাতি নির্মাণকারী সংস্থাগুলি থেকে নানাবিধ পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নির্বাচন করা হয়েছিল।

অভিযানের জন্য দুধরণের ক্লাইম্বিং বুট ক্রয় করা হয়েছিল। একধরণের জুতো ২৩০০০ ফুট উচ্চতা পর্যন্ত ব্যবহার করা যায় অন্যদিকে অতি উচ্চতায় ব্যবহার করবার জন্য দুটি চামড়ার স্তর বিশিষ্ট জুতো সরবরাহ করা হয়। চামড়ার স্তরদুটির মধ্যের ফাঁকা অংশ ফারের আস্তরণে পূর্ণ। বিশেষত উচ্চ হিমালয়ের তুষার সাম্রাজ্যে ব্যবহারযোগ্য জুতো কঠিন রাবার নির্মিত এবং অপরিবাহী। বায়ুনিরোধক পোশাকগুলি এবং তাঁবুর গুণমান পরীক্ষার জন্য যাওয়া হয়েছিল “ফার্নবোরো রিসার্চ হেড কোয়ার্টার”-এ। বিশেষ কুকার সঙ্গে নেওয়া হয়েছিল উচ্চ হিমালয়ের তুষার রাজ্যে বরফ গলিয়ে রান্না করার জন্য, যাতে আরোহীদের উষ্ণ খাবার সরবরাহ করা যায়। এছাড়া বিশেষভাবে তৈরি স্লিপিং ব্যাগ, এয়ার ম্যাট্রেস এবং খাদ্যসামগ্রী ১৯৫৩ সালের অনেক আগেই ভারতে প্রেরিত হয়েছিল।

তিনধরণের অক্সিজেন ইক্যুইপমেন্ট নেওয়া হয়েছিল আরোহণের সময় ব্যবহারের জন্য । একটি অভিযাত্রীর স্লিপিং ব্যাগের অভ্যন্তরে রাখা থাকত। বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত অক্সিজেন সিলিন্ডারের তুলনায় ওজনও ছিল কম। যেকোন পর্বত অভিযানে আরোহণ সরঞ্জামের ওজন এবং পরিমাণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। তা সত্ত্বেও এভারেস্ট অভিযানের সঙ্গে ছিল ১৬০টি সিলিন্ডার, ৩০ সেটের অক্সিজেন যন্ত্রপাতি এবং ৮০ টি ক্যানেস্তারার বাক্স।

    অভিযানে মালবাহক ব্যবহারের প্রশ্নে হান্ট গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার মুখমুখি হলেন। দক্ষিণ অথবা উত্তর দিক যেকোন প্রান্ত থেকেই এভারেস্ট অভিযানে ছোট দলে শৃঙ্গারোহণের প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। আরোহীদলে থাকবে দুজন সদস্য। অনূকুল আবহাওয়ার পূর্বাভাস পেলেই যাতে তাঁরা পূর্ণ শক্তি নিয়ে শৃঙ্গের চূড়ায় এগোনোর অনুমতি পেতে পারেন।

সাফল্যের কথা চিন্তা করে হান্ট উপলব্ধি করলেন পর্বত অভিযানের প্রত্যেক অভিযাত্রীর অগ্রগতি এবং মালবহনের পরিমাণ স্থির করা উচিত আগাম পরিকল্পনা মাফিক। শুধু তাই নয় ব্রিটেন ছাড়বার পূর্বে অভিযানকে তিনটি নির্দিষ্ট পর্বে ভাগ করে নিলেন। প্রথম পর্বে বিপুল খাদ্যসামগ্রী কুম্বু হিমবাহ অতিক্রম করে বেসক্যাম্প থেকে ওয়েস্ট CWM এর শীর্ষে অ্যাডভান্স বেসক্যাম্পে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা। এক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই আইস ফল অঞ্চলে সহজতম পথ অন্বেষণই সবচেয়ে বড় সমস্যা। হালকা ওজনের ধাতুর তৈরি মই ব্যবহারই সেক্ষেত্রে অন্যতম সমাধান, যেটি ২৫ ফুট পর্যন্ত চওড়া দুটি বরফের দেওয়ালের ফাঁকা অংশে সেতু নির্মাণের উপযোগী।

    দ্বিতীয় পর্বের লক্ষ্য সাউথ কলে একটি অস্থায়ী শিবির স্থাপন করে প্রচুর মালবাহককে লোৎসে গাত্র অতিক্রম করে অধিকতর উচ্চতায় পাঠানো। অভিযানে লোৎসে গাত্রে পৌঁছনোর পূর্বেই দুটি অন্তবর্তী শিবির স্থাপন অবশ্যম্ভাবী।

    সাউথ কলে শিবির স্থাপনের উদ্দেশ্য পূর্বপরিকল্পিত। চারদলের সদস্যের মধ্যে ছিলেন দুজন পর্বতারোহী এবং দুজন শেরপা। পরিকল্পনা অনুযায়ী একেকটি দল অ্যাডভান্স বেসক্যাম্প থেকে যাত্রা শুরু করে সাউথ কলে রাত্রি যাপন করবে। এবং প্রয়োজন হলে লোৎসে গাত্রের অন্তর্বতী শিবিরেও রাত্রিবাস করতে হতে পারে। আরোহীর শারীরিক অবস্থা এবং আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করবে সাউথ কল থেকে অধিক উচ্চতায় আরোহণের সম্ভাবনা। শিবির ত্যাগের মুহুর্তে দলটি হবে স্বয়ংসম্পূর্ণ যদি প্রয়োজন হয় দক্ষ দলকে দক্ষিণ পূর্ব রিজ ধরে অধিকতর উচ্চ হিমালয়েও প্রেরণ করা হতে পারে। এই বিক্ষিপ্ত তিনটি পদক্ষেপের মাধ্যমে হান্ট শৃঙ্গের চূড়ায় পৌঁছনোর পরিকল্পনা করলেন।

    পরিস্থিতির চাপে উক্ত পরিকল্পনাগুলির হয়তো পরিবর্তন হতে পারে। কিন্তু প্রধান উদ্দেশ্য হল পরিকল্পনাগুলিকে পূঙ্খানুপুঙ্খ অনুসরণ করা। অভিযানের সাফল্য নির্ভর করবে পূর্ব পরিকল্পনাটি কতটা সতর্কতার সাথে এবং সুচারু রূপে সম্পন্ন হয়েছে।  

ক্রমশ

জয়ঢাকের খেলা ও অভিযান লাইব্রেরি 

 

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s