আমার শহর ফেলে আসা কলকাতা সুজয় রায় বর্ষা ২০১৬

ফেলে আসা কলকাতা–আগের পর্বগুলো

মাইকেল মধুসূদন দত্ত

feleasakolkata01 (Medium)

বাংলার আরেক অসামান্য কবি প্রতিভা। জন্মেছিলেন ১৮২৪ সালে। কল্পনা করা যাক, তিনি কথা বলছেন—

“শর্মিষ্ঠা, হু নক্‌স্‌ অ্যাট দ্য ডোর? আমার প্রিয় বন্ধু গৌরদাস বসাক এসেছে। এই ঘরে নয়, পাশের ঘরে বসে কথা বল প্লিজ। কারণ অবশ্যই একটা আছে। মাঝখানে দুটি ঘরে দরজা খোলা। হেনরিয়েটা, এ ঘরে এসে দেখে যাও কে এসেছে।ছিলাম লণ্ডন স্ট্রিটে সাহেব পাড়ায়। সেখান থেকে ছেড়ে উত্তরপাড়া।দয়া করে জয়কেষ্ট মুখার্জি সেখানে লাইব্রেরিতে থাকতে দিয়েছিল। সেখানেও থাকা হল না। শেষপর্যন্ত বেনেপুকুরে এই বাসাবাড়ি। একচিলতে মাথা গোঁজবার ঠাঁই। জানালা দিয়ে হাত বাড়ালে একমুঠো আকাশ। ঝুরঝুর করে ঝরে পড়ছে এই বাসাখানা।

“সেই যখন গোলদিঘিতে বসে বন্ধুরা গল্প করতাম! হিন্দু কলেজের দিনগুলি মনে পড়লে—মাই হার্ট এক্‌স্‌! রাজনারায়ণ আমাকে বলেছিলেন, মধু, বিখারিকে পয়সা দিচ্ছ দাও, কিন্তু একটু গুণে গুণে দাও। কিন্তু আমি রাজনারায়ণ দত্তর ছেলে। টাকা গুণতে শিখিনি। আমার জন্য কলেজে পালকি আসত। স্যুট আসত প্যারিস থেকে কেচে। আমার জন্য টিফিন আসত অজস্র, যা দশজন ছাত্র খেয়ে শেষ করতে পারত না।

“গৌর, দরজার ফাঁক দিয়ে দেখতে পাচ্ছ? মেঝেতে পড়ে আছে ভাঙা থালা। তাতে কয়েকটা উচ্ছিষ্ট ভাত। ওই ভাত আমার ছেলেমেয়েরা খেয়েছে। লবণ আর ভাত কীরকম হাঁ হাঁ করে খাওয়া যায় বিশ্বাস করতে পারবে না। তুমি জান, ওইটুকু ভাতও আমি আর হেনরিয়েটা গত দু’দিন খাইনি? ক্যান ইউ ইমাজিন? বাংলার অগ্রগণ্য কবি এম দত্ত বন্ধুর কাছে অন্নাভাবের কথা বলছে!

“হাসি পায় না? আমাকে ঘৃণা করছ না তো? আচ্ছা বোসো। তোমাকে এখন দান্তে শোনাব। ডিভাইন কমেডি। শুনবে না? তাহলে মিলটনের প্যারাডাইস লস্ট থেকে বলব—নো নো—অ্যালবার্ট, ডোন্ট ক্রাই। হেনরিয়েটা, ও এত কাঁদছে কেন? ওকে একটু চুপ করতে বল। গৌর আমি জানি ও কাঁদছে কেন। ওর শেষ সম্বল ভালো জামাটা ছিঁড়ে গেছে। হেনরিয়েটা চারবার রিফু করে দিয়েছে।

“আমি এখন সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নির্বাসিত নেপোলিয়ন। প্রতিদিন বিক্রি করছি জানালার পর্দা, প্যান্ট, শার্ট, বই, আসবাব। আমার শরীরটা যদি এখন কেউ নীলাম ডেকে কিনে নিতে রাজি হত, আমি এখুনি রাজি হতাম। কেউ নেবে না এটা, না? আমি যে একজন নিভন্ত প্রদীপ! আউট—আউট ব্রিফ ক্যান্ডেল। লাইফ ইজ বাট আ ওয়াকিং শ্যাডো। আ পুওর প্লেয়ার দ্যাট স্ট্রাটস অ্যান্ড ফ্রেটস্‌ হিজ আওয়ার আপন দা স্টেজ, অ্যান্ড দেন ইজ হার্ড নো মোর। ইট ইজ আ   টেল টোল্ড বাই অ্যান ইডিয়ট, ফুল অব সাউন্ড অ্যান্ড ফিউরি, সিগনিফাইং নাথিং।”

feleasakolkata2 (Medium)“মধু—মধু—টেক দিস মেডিসিন-”

“কী হয়েছে হেনরিয়েটা? ওষুধ?” ও বিশ্বাস করে ওই ওষুধ খেয়ে আমি ভালো হয়ে যাব।  আমি জানি ওই ওষুধ খেয়ে আমি ভালো হব না। তবু, ওর বিশ্বাসকে আমি আঘাত করতে চাই না। চুপিচুপি তোমাকে একটা কথা বলি, আমার চেয়ে আগে আমার স্ত্রী পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবে।  হেনরিয়েটার দৃঢ়বিশ্বাস ওই ওষুধ খেয়ে আমি সুস্থ হয়ে যাব। আবার কোর্টে যাব, শামলা পরব, হাকিমের সামনে দাঁড়িয়ে বলব, মাই লর্ড—

“মিলটন, অ্যালবার্ট নতুন পোশাক পরে স্কুলে যাবে। আমার বন্ধুরা আসবে আমার বাসায়। গৌরদাস বসাক, মনমোহন ঘোষ, রাজনারায়ণ বসু, ভুদেব মুখার্জি, আরো কত জন! আমি লিখব, ‘তুমি এবার এস দেবি, তুমি মধুকরি কল্পনা, চিত্তফুলবনে মধুলোভে রচ মধুচক্র—’(কাশি ও রক্ত)- বসরাই গোলাপের মত আমার রক্ত গলা থেকে বেরিয়ে আসছে। এবার জীবনের যবনিকা পতন।

করে স্নান সসিন্ধুতীরে রক্ষদল ফেরে

হেরিলা লংকার পানে অশ্রুনীরে

বিসর্জি প্রইতিমা যেন দশমী দিবসে।

সব শেষ। ঘরে ফেরা হবে না।

“এইসময় আমার দুখিনী মায়ের মুখ মনে পড়ে যায়। কতবার আমাকে ফেরাতে চেয়েছিলেন। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ থেকে, বিশপ কলেজের গোপন আস্তানা থেকে। কিন্তু আমি ফিরিনি। মাতৃভূমি যশোহরের গ্রামের গোবরনিকানো উঠানে শীতলপাটির সুখ আমার জোটেনি। আমি পৈত্রিক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হয়েছি।

আশার ছলনে ভুলি কী ফল লভিনু হায়

তাই ভাবি মনে

জীবনপ্রবাহ বহি কালসিন্ধুপানে ধায়

ফিরাব কেমনে

“পশ্চিমের জানালা দিয়ে দেখি অস্তমিত সূর্য। বন্ধু গৌরদাস, এই পৃথিবী আমি ছেড়ে যেতে চাই না। এর ধুলামাটি আমার কাছে পারিজাতের চেয়ে পবিত্র। এ যে আতরের চাইতে সুগন্ধী। হেনরিয়েটা, তোমার হাতে ওটা কী? পাওনাদারের চিঠি? বাড়িওলার নোটিস? সর্বনাশ! কোথায় পেলে? ডাস্টবিনে? ওটা আমার এপিটাফ। কিছুদিন আগে লিখেছিলাম। মনমোহন ঘোষ কথা দিয়েছে আমার অনুপস্থিতিতে আমার ছেলেমেয়েরা অন্নাভাবে পড়বে না। সে নিজের সন্তানদের মতন আমার সন্তানদের যত্ন করবে। তাই কয়েকদিন আগে পরম শান্তিতে লিখেছিলাম আমার এই শেষ কবিতা। পারো যদ্দি, এক বিপন্ন কবির সমাধিতে এই শব্দক’টি সাজিয়ে দিও-

দাঁড়াও পথিকবর জন্ম যদি তব

বঙ্গে ! তিষ্ঠ ক্ষণকাল এ সমাধিস্থলে

(জননীর কোলে শিশু লভয়ে যেমতি

বিরাম) মহীর পদে মহানিদ্রাবৃত

দত্ত কুলোদ্ভব কবি শ্রী মধুসূদন !

যশোরে সাগরদাঁড়ী কপোতাক্ষ তীরে

জন্মভূমি ; জন্মদাতা দত্ত মহামতি

রাজনারায়ণ নামে, জননী জাহ্নবী

 

কাশীপ্রসাদ ঘোষ

১৮৩৪ সালে কাশীপ্রসাদ ঘোষ কবিতা লিখেছিলেন,  ‘বোটম্যান্‌স্‌ সং টু গঙ্গা।’ মাইকেল মুধুসূদন দত্ত লিখেছিলেন ‘ক্যাপটিভ লেডি’ (১৮৪৯)। মাতৃভাষা বর্জন করে তৎকালে বিদেশী ভাষাতে এই দুই কবি সুনাম অর্জন করেননি। কাশীপ্রসাদের বাড়ি কলকাতায় হেদুয়াতে। ছিলেন হিন্দু কলেজের ছাত্র। মাত্র ১৭ বছর বয়সে জেমস মিল-এর হিস্টরি অব ব্রিটিশ ইন্ডিয়া গ্রন্থের প্রথম চারটি অধ্যায়ের সমালোচনা লিখে বিশেষ প্রশংসিত হয়েছিলেন। জেমস মিল ছিলেন, রাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি, ইতিহাস ইত্যাদি বিষয়ে  বিংশ শতকের বিশিষ্ট লেখক জন স্টুয়ার্ট মিল-এর বাবা। কাশীপ্রসাদের কবিতার বই ‘দ্য শের অব মিনস্ট্রেল অ্যান্ড আদার পোয়েমস’ আজও জাতীয় গ্রন্থাগারে পাওয়া যাবে।

তাঁর আরেকটি কাব্যগ্রন্থ ইংরাজি ভাষায় ‘দ্য হিন্দু ফেস্টিভ্যাল্‌স্‌। এখানে ঝুলন, জন্মাষ্টমী, কোজাগরি পূর্ণিমা, চড়ক, শ্রীপঞ্চমী, অক্ষয় তৃতীয়া, দোল, রাসযাত্রা, দুর্গাপূজা, শ্যামাপূজা ইত্যাদি হিন্দুদের বিভিন্ন উৎসব ও পূজাপার্বণ বর্ণনা করে আলাদাভাবে একএকটি কবিতা লিখেছিলেন। তাঁর মেমোরি অব ইন্ডিয়ান ডাইনাস্টিজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই গ্রন্থে তিনি গোয়ালিয়রের সিন্ধিয়া, লখনউয়ের রাজা, ইন্দোরের হোলকার, হায়দরাবাদের নবাব, বরোদার গাইকোয়াড়, নাগপুরের ভোঁসলে ও ভোপালের নবা বংশের ইতিহাস লিখেছিলেন। বাংলাভাষার কবি ও লেখকদের সমালোচনা লিখেছিলেন ‘বেঙ্গলি পোয়েট্রি’ ও ‘বেঙ্গলি ওয়ার্কস অ্যান্ড রাইটার্স’ এই দুটি গ্রন্থে।

তিনি অবৈতনিক ম্যাজিস্ট্রেট, সুপ্রিম কোর্টের গ্র্যান্ড জুরি ও মিউনিসিপ্যালিটির জাস্টিস অব পিস হয়েছিলেন। এছাড়া তাঁর ছিল তিনটি বাণিজ্যজাহাজ। সেই জলযানগুলী নষ্ট হয়ে যাওয়াতে তাঁর প্রচুর ক্ষতি হয়েছিল। 

কাশীপ্রসাদের হেদুয়ার বাড়িতে দেবেন্দ্রনাথ, ঈশ্বরচন্দ্র, গিরীশ ঘোষ প্রমুখ বাংলার অন্যতম গুণীজনেরা যেতেন। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর সেখানে গানবাজনা করতেন। বৃটিশ সমাজের দিকপাল প্রায় সকলেই সেখানে উপস্থিত হতেন। রবীন্দ্রনাথও ছেলেবেলায় যেতেন সেখানে।

তাঁর দুঃখ ছিল মাতৃভাষায় সাহিত্যকীর্তি করতে না পারা। সেই এক আক্ষেপ মহাকবি মাইকেলও এক সময় করেছিলেন,

“হে বঙ্গ ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন

তা সবে অবোধ আমি অবহেলা করি

পরধনলোভে মত্ত হইয়া বিভোর

পরদেশে ভিক্ষাবৃত্তি কুক্ষণে আচরি

১৮৭৩ সনে কালীপ্রসাদ মারা যান।

ক্রমশ