আমার শহর-ফেলে আসা কলকাতা-সুজয় রায়

পূর্বপ্রকাশিত  র পর

ঘড়িওয়ালা বাড়ি

২৭৯ রবীন্দ্র সরণীতে বহু ঘড়ি আজও যেন কথা বলে। পুরাতন ঐতিহ্য ধরে রাখে সেইসব সংগৃহীত ঘড়ি।মতিলাল মল্লিক এদের সংগ্রহ করেছিলেন।

বাড়ির ছাদে  রাস্তা ধারে বসানো  কুক অ্যান্ড কেলভি-র পুরোনো আমলের গোল ঘড়িটা দেখতে পাওয়া যায়। এর আগে এই বাড়ি ছিল মধুসূদন স্যান্যালের। জোড়াসাঁকোর এই বাড়ি পেশাদারী নাট্যশালার এক ঐতিহাসিক আবাস। এই বাড়িতে নীল দর্পন, সধবার একাদশী ইতাদির অভিনয় হয়েছিল। এ বাড়ির চেহারা পরে পরিবর্তন করা হয় ম্যাকিনটশ বার্ন কোম্পানির সহায়তায়। ১৮৭৩ এ বাড়িতে শেষ অভিনয়ের আসর বসেছিল। অভিনীত হয়েছিল বুড়ো শালিকের ঘারে রোঁ।

মতিলাল মল্লিকের বংশধর গোবিন্দলাল মল্লিক বের করেছিলেন ম্যালেরিয়ার ওষুধ, গোবিন্দসুধা নামে। মল্লিকদের খুলনা সাতক্ষিরা অঞ্চলে প্রচুর জমিজমা ছিল। কলকাতার ধনী সুবর্ণবণিক পরিবারগুলির মধ্যে তারা অন্যতম। কলকাতায় তাঁদের ছিল প্রচুর ভাড়াবাড়ি ও বস্তি।

মতিলাল শীলের বাড়ি, কলুটোলা

feleasakolkata5501 (Medium)

নানা ব্যাবসা ছিল এঁর। শিশিবোতলের ব্যাবসা করে প্রথমে প্রতিষ্ঠালাভ করেন। এদেশ থেকে নীল, রেশম, চিনি ও চাল রফতানি করতেন। কিনেছিলেন ১২টি জাহাজ, এবং কোলাঘাট, মহিষাদল, যশোর ইত্যাদি এলাকায় বড়ো বড়ো জমিদারি। মেডিকেল কলেজ স্থাপনের জন্য বারো হাজার টাকা দান করেন। মেডিকেল কলেজের মূল বাড়ির জন্য মতিলাল শীল জায়গা দিয়েছিলেন। মেডিকেল কলেজের কাছে ৬০ নম্বর কলুটোলা স্ট্রিটে ওঁর বাড়ি। সেখানে আছে সাবেক কালের ঠাকুরদালান। এই ঠাকুর দালানে দেড়শো বছরের পুরাতন দুর্গোৎসব হয়।

জাহাজ, জমিদারি ও ব্যাবসা থেকে তিনি এত টাকা আমদানি করেছিলেন যে শেষ বয়সে তাঁর টাকার প্রতি আর কোন মোহ ছিল না। ১৮৪১ সালে তিনি বেলঘরিয়াতে ঠাকুরবাড়ি ও অতিথিশালা গড়ে তুলেছিলেন। সেই অতিথিশালায় বহু মানুষ নিখরচায় অন্নলাভ করত। এখনকার ১২৭ চিত্তরঞ্জন অ্যাভেন্যুতে বিনাখরচে পড়াশোনা করবার জন্য মতিলাল শীল কলেজে ৪০০ ছাত্রের পড়বার ব্যবস্থা করেছিলেন। বাংলায় যিনি প্রথম বিধবাবিবাহ করেছিলেন তাঁকে কুড়ি হাজার টাকা দেন। বহু অনাথ ও বিধবা তাঁর দেয়া বৃতির টাকায় প্রতিপালিত হয়েছিলেন। দানশীল মতিলালকে কলকাতা ভোলেনি। ওঁর নামে আছে রাস্তা, গঙ্গার ঘাট, মেডিকেল কলেজের ওয়ার্ড আর কাশীপুর মতিলাল ঝিল।

feleasakolkata5502 (Medium)

মোতিলালের নামে গঙ্গার ঘাট

তাঁর বড়োপুত্র ছিলেন হীরালাল। ১৮৬৪ সালে আকালের সময় অন্নসত্র খুলে প্রতিদিন হাজার লোকের অন্নের জোগান দিতেন।

কলকাতা হাইকোর্ট প্রথমে মাইকেল মধুসূদন দত্তকে কোর্টে ব্যারিস্টারি করতে দেয়নি। বঙ্গসমাজের নানা বিশিষ্ট পরিবার থেকে তাঁর চরিত্র সম্বন্ধে ভালো সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন। তার মধ্যে একজন ছিলেন হীরালাল শীল। এছাড়াও ছিলেন রাজা কালীকৃষ্ণ বাহাদুর, রমানাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্যারিচাঁদ মিত্র, টিপু সুলতানের ছেলে গোলাম মুহম্মদ। কলকাতার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অভিজ্ঞানপত্রের দরুন মাইকেল ১৮৬৭ সালে আইনব্যাবসার ছাড়পত্র পেয়ে গেলেন।

আজ দুর্মূল্যের বাজারে জাতিধর্মনির্বিশেষে সকলে যাতে সুলভে চিকিৎসা পেতে পারে সেজন্য কালিদাস মল্লিকের চ্যারিটেবল ট্রাস্ট থেকে মাসিক দান দেয়া হয়ে থাকে মেডিকেল কলেজ, স্কুল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিন, চিত্তরঞ্জন ন্যাশনাল ক্যান্সার রিসার্চ ইনস্টিটিউট, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদিকে।

মার্বেল প্যালেসঃ চোরবাগান

feleasakolkata5503 (Medium)

চোরবাগানের পথে যেসব পুণ্যার্থী ও বণিকেরা স্নানে বা বাণিজ্যে যেতেন তাঁদেরকে অনেক সময় ডাকাতের হাতে লুন্ঠিত হতে বা প্রাণ দিতে হত। এই কারএ সে পথের নামই হয়ে যায় চোরবাগান। রাজেন্দ্র মল্লিক ১৮৩৫ সালে এখানে তাঁর বাড়ি তৈরি শুরু করেন। সে সময় মাটির নীচে মানুষের অনেক কংকাল পাওয়া গিয়েছিল। রাজেন্দ্র সোনা কেনাবেচার ব্যাবসা করতেন। ক্রমে দানধ্যান, শিক্ষাতে ওঁর সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। বৃটিশ সরকার এঁকে রায়বাহাদুর ও রাজাবাহাদুর উপাধি দিয়েছিলেন।

মার্বেল প্যালেস তৈরি হয়েছিল পাঁচ হাজার ইউরোপীয় স্থাপত্যশিল্পী ও কারিগর দিয়ে, তাঁর মা ও তাঁর নিজের রুচিবোধ অনুযায়ী। ইতালির স্থপতিরা মার্বেলের ফ্লোরিং করেছিলেন। ফরাসিরা করেছিলেন বাড়ির লে আউট, ভেস্টিব্যুল, পোর্টিকো এবংবাড়ির সামনের অংশ। ইংরেজ কারিগররা বানিয়েছিলেন আসবাবপত্র ও অন্যান্য ফিটিংস্‌। রাজেন্দ্র মল্লিক তাঁর বাবার নামে রেখেছিলেন বাড়ির বাগানের নাম- নীলমণি নিকেতন। বাগানে ফোয়ারা, গ্রিনহাউস, দুর্লভ অর্কিড, সবুজ ঘাসের লন, পাম গাছ আছে। আছে প্রচুর অর্থে কেনা ম্যাকাও পাখি। আর আছে দূরদেশের গাছ ও লতা। মার্বেল প্যালেসের ঠাকুরদালান ফরাসি স্থাপত্যে তৈরি করেছিলেন। বিশিষ্ট স্থাপত্যের এই দালান ঢালাই লোহার লতা-ফুল-পাতার নকশাতে সুসজ্জিত। পুজোর ঘর দুর্লভ পিয়েত্রা ওরো দিয়ে বানানো। স্বর্ণাভ শিরাবহুল এই শেতপাথর আজ ইটালিতেও দুর্লভ।

ক্রমশ

এই লেখার সব পর্ব একত্রে