আমার শহর

ফেলে আসা কলকাতা-> সুজয় রায়

kol01আমরা কলকাতার বনেদি পরিবারের কথা বলেছিলাম। তেমনই এক দৃষ্টান্ত গোকুল মিত্রের বাড়ি। সামান্য লবণ যা গরিব লোকেরা খায়, অন্য শ্রেণীর মানুষও খায় তাই নিয়ে ব্যাবসা করে লাখপতি হওয়া সম্ভব হয়েছিল বাংলায় অষ্টাদশ শতাব্দীতে। চিৎপুরের কুলচন্দ্র মিত্র তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। বিষ্ণুপুরের রাজা চৈতন্য সিং পর্যন্ত তাঁর কাছ থেকে টাকা ধার নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। তার পরিবর্তে বন্ধক রাখলেন রাজবাড়ির মদনমোহন বিগ্রহ। সেই কারণে বাগবাজার-চিৎপুর এলাকাতে এক জায়গার নাম হচ্ছে মদনমোহনতলা। সেই পাড়াতেই গোকুল চন্দ্র মিত্রের বাড়ি।

আড়াইশো বৎসর আগে লোকমুখে বাগবাজারের নাম ছিল বারুদখানা। স্কট নামক সাহেব এই জায়গায় কেল্লা ও বারুদ কারখানা বানিয়েছিল। সিরাজদৌল্লা সেই খবর জানতে পেরে তৎক্ষণাৎ তা ধ্বংস করে দেবার আদেশ দেন। ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি সেই আদেশ অমান্য করায় সিরাজ প্রচুর সৈন্য এনে কাশীপুরে তাঁবু ফেলেন। বাগবাজারে প্রিন্স গার্ডেনে যুদ্ধ হয়। তখন কুমারটুলির গোবিন্দরাম মিত্র,বনমালী সরকার, গোকুলচন্দ্র মিত্র ও রাজা নবকৃষ্ণ নিজেদের ধনদৌলত রক্ষা করতে বড়ো বড়ো গাছ কেটে চিৎপুর রোডে পথ অবরোধ করেন। সিরাজের সৈন্য রা তাই চিৎপুর দিয়ে কলকাতায় প্রবেশ করতে পারেনি।

নীলচাষীদের শোচনীয় অবস্থার ইতিহাস লিখেছেন দীনবন্ধু মিত্র। কিন্তু লবণ যারা উৎপাদন করত সেই মালুঙ্গিদের দুর্দশা কেউ লিখে রাখেনি। ২৪ পরগণা, মেদিনীপুর ও চট্টগ্রামের  উপকূল লবণ উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র। মালুঙ্গিরা ঠিকাদার ও ব্যবসাদারের কাছ থেকে দাদন নিত। এর দরুন ঠিকাদাররা যে দাম বেঁধে দিত সেই দামেই তারা লবণ দিতে বাধ্য থাকত। ব্যবসায়ীরা সেই লবণ বিক্রি করে আঙুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছিল।

লবণ ঘিরে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি, ব্যাবসাদার, ঠিকাদার সকলে মিলে কূটকৌশল করেছিল। মুনাফা কোম্পানির কর্মচারী ও বেনিয়ারা পকেটস্থ করে নিত। ১৭৭২ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস হলেন গভর্নর। তিনি লবণের কাজ-কারবার কোম্পানির একচেটিয়া করে দিলেন। তারপরে তারা বাঁধা দামে  লবণ দিত কোম্পানিকে।

এর পরের বৎসর থেকেই করমণ্ডল উপকূল থেকে লবণ আমদানি শুরু হল। কারণ বাংলার লবণ থেকে নানা কৌশলে সাহেব কর্মচারী ও বেনিয়াদের পকেটে যে প্রচুর মুনাফার টাকা জমা পরত, করমণ্ডল থেকে লবণে তার বেশি হেরফের হবেনা, এই ছিল উদ্দেশ্য।

গোকুল মিত্রের বাড়ি চিনতে পারা যায় ১৬১ আপার সারকেলে মদনমোহন ঠাকুরবাড়ি অনুসরণ করে। এখন সেখানে কবওয়েব অফ হিসট্রি, মাকড়সার স্থান।

feleasakolkata01 (Small)গোকুল মিত্রের ভাগ্য অতি সুপ্রসন্ন। ১৭৮৪ সালে কলকাতায় লটারি কমিটি তৈরি হয় রাস্তা বানানো,পুকুর তৈরি ইত্যাদি উন্নয়ন কাজের জন্য। চাঁদনী চক উঠেছিল গোকুল মিত্রের ভাগ্যে। একটি ছড়া আছে- “মদনমোহন দয়ায় পেলেন বাজার চাঁদনী।”

কিন্তু জাতীয়তাবোধের অভাব ও ব্যক্তিগত অর্থচিন্তা এতই প্রবল ছিল যে আমাদের অর্থনীতির যারা শিরদাঁড়া সেই কৃষক, শ্রমিক ও অন্যান্য উৎপাদনকারীদের দিকে ফিরেও তাকায়নি। সেই অবহেলা ও প্রবঞ্চনার করুণ পরিণতি আমাদের বাংলায় প্রকটভাবে দেখতে পাচ্ছি। বাংলার শিল্পের বিশেষ কোন ধারাবাহিক ইতিহাস নেই।

 ১৮২৪ সালে কলকাতার মেসার্স বিচক্যাম্প অ্যান্ড কোম্পানিতে এক বাঙালি যুবক মাসিক ১২ টাকা মাইনেতে যোগ দিলেন। কিছুদিনের মধ্যেই যুবকের অসাধারণ কর্মকুশলতা ও দূরদৃষ্টি সকলের নজর কেড়ে নিয়েছিল।পাঁচ বছর পরে রাধানাথ বসু ওই বিদেশী কোম্পানির একমাত্র ভারতীয় পরিচালক ও অংশীদার হলেন। এর পরবর্তী সময়ে গঙ্গার তীরে  জমি কিনে হুগলী ডকইয়ার্ড তিনি পত্তন করেছিলেন।

“স্যার উইলিয়াম ওয়ালেস” নামে ২০০ টনের জাহাজ কিনে বসলেন। সে সময়ে জাহাজের দাম পড়েছিল ১০ হাজার টাকা। সেই কারণে তিনি বাংলার শিল্পায়নের পথীকৃত। রাধানাথ চেয়েছিলেন  ইংরেজ বণিকদের মতন সম্পূর্ণ নিজের পরিচালনায় একটি বাণিজ্যিক সংস্থা গড়ে তুলবেন। তাঁর সঞ্চিত অর্থে ১৮৩৮ সালে বিচক্যাম্প ও থমাস্‌ উইলিয়াম তিনগাটের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে তৈরি করেন ডকইয়ার্ড।

সেকালে কলকাতা বন্দরে বহু জাহাজ আসত কিন্তু মেরামতের জন্য কোন জাহাজঘাট ছিল না। তাঁর বন্ধু ও প্রাক্তন সহকর্মী স্যামুয়েল রিডের সঙ্গে যুগ্ম উদ্যোগে হুগলী ডকইয়ার্ডের জন্ম দেন তিনি।

রাধানাথ বসু মল্লিকের বাড়ি

feleasakolkata02radhanath (Small)

বসু পরিবারের সপ্তদশ পুরুষ রঘুনাথ ছিলেন বাংলা নবাবের দেওয়ান। তাঁর কাজে দক্ষতার জন্য তাঁকে মল্লিক উপাধি দেওয়া হয়েছিল। রঘুনাথের বংশধর রাধানাথ ছিলেন সাদাসিধে মানুষ। প্রথম দিকে সামান্য অর্থাগম সত্ত্বেও তিনি ছিলেন সঞ্চয়ী। এইভাবে বাংলার ১২৩৩ সালে কলকাতার আরপুলি গ্রামে সামান্য জমি কিনে বসত বাড়ি হল। ক্রমে আরো জমি কিনে অট্টালিকা বানান। ১৮৩০ সালে রাধানাথ গৃহপ্রবেশ করেছিলেন। এই পরিবারের লোকজন ছিল গুণী, উন্নতমনা ও দূরদর্শিতাসম্পন্ন। শ্রী গোপাল তাঁর ছোটোছেলে। দর্শনশাস্ত্র ও শিক্ষাপ্রচারের জন্য নিজের সম্পত্তি থেকে আলাদা করে ট্রাস্টিদের দিয়ে দেন।

হুগলি ডক হওয়ার পরে রাধানাথ মিত্র দুটি বৎসর বেঁচেছিলেন। মাত্র ৪৫ বৎসর বয়সে তিনি মারা যান। সেই পরিবার ছিল দেশের উন্নতিকামী। লবণ চাষ করে মালুঙ্গিদের  অত্যাচার করে অথবা নীল চাষিদের দুর্দশার ভাগীদার হয়নি তারা। প্রকৃষ্ট উদাহরণ এই বংশের রাজা সুবোধ মল্লিক, তিনি নিজের সম্পূর্ণ সম্পত্তি দেশের উদ্দেশ্যে ছেড়ে স্ত্রী, পুত্রকে নিয়ে রাজবাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। বাড়ির সংলগ্ন  উইলিংটন স্কোয়ারে এই মানুষটির স্মারক ও দক্ষিণ কলকাতার এক রাস্তা তাঁর নামে চিহ্নিত করা হয়েছে। সাবেক কলকাতার গরিমা এইখানে।

বেলগাছিয়া ভিলা

feleasakolkata03belgachiavilla (Small)

বেলগাছিয়া রোডে “প্রিন্স” দ্বারকানাথ ঠাকুর দুই লাখ টাকা মূল্যে তাঁর বিখ্যাত বাগানবাড়ি তৈরি করেছিলেন। লবণ মহলের দেওয়ানি ও নানা ব্যাবসা-বাণিজ্যের সূত্রে তিনি বিত্তশালী ও প্রতাপান্বিত। এই বাগানবাড়িতে তিনি সেকালের দেশি-বিদেশি উচ্চপদস্থ লোকেদের আমন্ত্রণ করে বিলাসবহুল পার্টি দিতেন। সেই সময় সংবাদপত্রে তার বিস্তারিত বর্ণনা থাকত।

সেই বাগানবাড়িতে মোতিঝিল নামে একটি সুন্দর খাল ছিল। সেখানে নীল ও লাল রঙের পদ্ম ফুল ফুটে থাকত। বাগানে ছিল ফুলের মেলা। সেকালের ইউরোপীয় আসবাব, ছবি ও ভাস্কর্য সাজানো বৈঠকখানা ছিল। বৈঠকখানার পিছনে মার্বেলের ফোয়ারা। ঝিলের মাঝখানে দ্বীপ।সেখানে ছিল “সামার হাউস”; কাঠ ও লোহার সেতু দিয়ে সামার হাউসে যাতায়াত করা যেত।

১৮৫৬ সালে সেই বাগানবাড়ি বিক্রি হয়ে গেল। কিনলেন রাজা প্রতাপচন্দ্র বাহাদুর ও রাজা ঈশ্বরচন্দ্র সিংহ বাহাদুর। একজন বিদেশি ৫৩হাজার টাকা দিতে রাজি ছিল। কিন্তু ৫৪ হাজার টাকায় বাগানবাড়ি কিনে নিলেন সিংহরা। মুর্শিদাবাদ জেলার কান্দি ও কলকাতা পাইকপাড়ার বনেদি পরিবার এই সিংহরা। এই বংশের পুত্রবধূ রীতা সিংহ দেশের প্রথম সারির রাইফেল সুটার।এই বংশের গঙ্গাগোবিন্দ ছিলেন ওয়ারেন হেস্টিংসের দেওয়ান। ভেনেশিয়ান কাটগ্লাসের ঝাড়বাতি,টেবিল, পোর্সেলিনের ফুলদানি, হাতির দাঁতের শিল্পসামগ্রী আছে। দেওয়ালে তিসিয়ান,রুবেন্স, রাফায়েলের ছবির প্রতিলিপি আছে। চারটে আলসেশিয়ান নিঃশব্দে ঘুরে বেড়াত সারা বাড়িতে।

এই বাড়িতে বাংলা মাস হিসাবে কাজ করে সেরেস্তা। খাতালেখা, হিসেব, দলিল দস্তাবেজ সব বাংলা ভাষায় চর্চা করা হয়।

পাথুরিয়াঘাটার মল্লিক বাড়ি

ঘোড়ায় টানা জুড়িগাড়ির কথা সবাই জানেন। কিন্তু কলকাতার রাস্তার দিনে দুপুরে  জেব্রায় টানা গাড়ি আমরা জানি কি? পাথুরিয়াঘাটার যদু মল্লিকের ছোট ছেলের ট্রটিং গাড়ি টানতো জেব্রা।

feleasakolkata04 (Small)১৯৩৫ সালের ঘটনা। ঘোড়া যে তার ছিল না তা নয়। জাতকুল বিচারে কুলীন নয়। জোড়া ঘোড়া তার আস্তাবলে বাঁধা থাকত। এছাড়া আলিপুরে চিড়িয়াখানা থেকে ছয় হাজার টাকায় দুটি জেব্রা কিনে গাড়ি টানার ট্রেনিং দিয়েছিলেন। দেখতে লোকের ভিড় কেমন হয়েছিল? কলকাতায় “স্টেটসম্যান” পত্রিকায় সেদিন সংবাদ বেরিয়েছিল।

অর্থপ্রাচুর্যের চূড়ান্ত নিদর্শন হিসাবে রোলস্‌ রয়েস কিনেছিলেন। তিনি মল্লিকা নামে এক বজরা ও মন্মথ নামে মোটরলঞ্চ চড়ে গঙ্গা বিহার করতেন। বড়োছেলে রাসবিহারীর বিবাহতে ফোর্ট উইলিয়াম থেকে কেল্লার বাজনা নিয়ে শোভাযাত্রা করেছিলেন। এই শোভাযাত্রায় খোলা তলোয়ারধারী ঘোড়সওয়ার, ৩৬টি পুলিশ ঘোড়সওয়ার, চারটি ঘোড়ায় টানা দুটি গাড়ির কনসার্ট পার্টি ও ১৬টি ঘোড়ায় টানা গাড়ি ছিল। সেদিন আমাদের শহরে এটি একটি সাড়া জাগানো ঘটনা।

যদু মল্লিকের বড় ছেলে রায় বাহাদুর অনাথনাথ মল্লিকের  এক মাত্র ছেলে প্রদ্যুম্নকুমার কিনে নিয়েছিলেন প্রসন্নকুমার ঠাকুরের নাপতেহাটার বাড়ি,শ্যাম মল্লিকের ৮৪ আপার চিৎপুর রোডের বাড়ি ও আপার চিৎপুর রোডের হরেন্দ্রকৃষ্ণ শীলের বাড়ি। তাঁর ৩৫টি মোটরগাড়ি, ১০টি রোলস্‌ রয়েস ছিল। এর মধ্যে দুটি গাড়ির বডি ছিল অ্যালমুনিয়াম ও পিতলের। এমনটা সচরাচর হয় না।

অত্যধিক খরচের ফলে তাঁকে ব্যাঙ্ক ও বিমা কোম্পানি থেকে ধার নিতে হয়েছিল।এবং ঋণের দায়ে কলকাতা ছেড়ে মধুপুরের প্রাসাদোপম “মার্বল হল”-এ আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত বিত্তহীন হয়ে স্ত্রীকে গুলি করে নিজে আত্মহত্যা করেন।