ইয়ামা দিক্ষিতের শামুক-ইন্দ্রশেখর

১৮ জুলাই’২০১৫

indus04সে বছর বৃষ্টি হল না। জিমুক তাতে ঘাবড়ায় নি। সিন্ধুনদীতে অনেক জল আছে। কিন্তু তারপর, বছরের পর বছর যখন আকাশে মেঘের ছিটেফোঁটা দেখা গেল না, ফুটিফাটা জমিতে এককণা যবও ফলল না, শুকিয়ে গেল অত বড়ো স্নানাগার, শস্যাগার ফাঁকা হয়ে গেল, তখন জিমুকের কপালে ভাঁজ পড়ল।

শহরগুলো একের পর এক খালি হয়ে যাচ্ছে দ্রুত। চারদিকে হাহাকার। আকাশে শকুনের আনাগোণা। সিন্ধু নদীর ধারে  ধারে জলের অভাবে মরে যাওয়া মানুষ আর পশুদের ভিড়–সে মৃত্যুর স্রোত চলবে আগামি দুই শতাব্দি ধরে। সুবিপুল এই সভ্যতার শেষ চিহ্নটুকু পৃথিবীর বুক থেকে মুছে দেবেন রুষ্টা প্রকৃতি।

“আচ্ছা, বহুকাল পরে, কোনদিন কোন জ্ঞানী মানুষ কি খুঁজে পাবেন  আমাদের কংকাল? দিব্যচক্ষে দেখতে পাবেন কেন আমরা মরে গিয়েছিলাম?” –দুর্বল জিমুক রৌদ্রঝরা আকাশের দিকে চোখ খুলে রেখে মাটিতে লুটিয়ে পড়বার আগে শেষবারের মতন ভেবেছিল। তার চার সহস্রাব্দি বাদে তার শেষ ইচ্ছেটা পূর্ণ হয়েছিল। করেছিলেন বিজ্ঞানি-“ইয়ামা দিক্ষিত”

__________________________________________________________

বড়োরা ভারী ক্ষ্যাপা। এ বছরে বৃষ্টি আসবে না আসবে না বলে কী ক্ষ্যাপামিটাই না করল! মেট অফিস ঘন ঘন বার্তা দিচ্ছে বৃষ্টি কম হবে। টিভিতে খবরের বন্যা। চাষীরা ভয় পেয়ে গেছে। বৃষ্টি না হলে বেশির ভাগ জমিতেই ফসল হবে না। মানুষ খাবে কী?

ভাবো একবার! বর্ষাকালে বৃষ্টি হবে না তা কখনো হয়? এইটুকুও বোঝেনা কেউ। তারপর দেখা গেল মেঘ ঠাকুর মোটেই রাগ করেন নি। সব বিজ্ঞানি আর তাদের যন্ত্রপাতিকে বোকা বানিয়ে হুড়মুড়িয়ে বৃষ্টি চলছে তো চলছেই।

কিন্তু একবার বড়োদের সেই দুশ্চিন্তাটা বড়ো ভয়ংকরভাবে ফলে গিয়েছিল। এতটাই ভয়ংকরভাবে যে তার ফলে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল একটা সুমহান সভ্যতা। সেই গল্প শোনো।

আমাদের ভারতবর্ষের উত্তরপশ্চিমে যে বহুদিনের পুরোনো ১৩০০রও বেশি শহর নিয়ে তৈরি সিন্ধু সভ্যতা (যাকে ইশকুলে পড়ায় ইন্দাস ভ্যালি সিভিলাইজেশান এই নামে)ছিল, তার বয়েস মোটামুটি হাজার পাঁচেক বছর। কেউ জানে না কেমন করে দুম করে সে মানুষেরা অত আগে আধুনিক শহর গড়ে ফেলেছিল অত্তগুলো। জাহাজ নিয়ে মেসোপটিমিয়ায় বাণিজ্য করতে যেত তারা, দক্ষিণ ভারতে সোনার খনি, আফগানিস্তানে রত্নখনি চালাত। বানিয়েছিল ড্রাইডকওয়ালা লোথালের মতন বন্দর।

আবার কেউ জানে না, কেমন করে দুম করে তা ধ্বংস হয়ে মিলিয়ে গেল মাটির নীচে। অতগুলো শহর। কম কথা নয়।

two-indus-sealsওদের ভাষা যদি পড়া যেত তাহলেও নয় সেখানে পাওয়া সিলমোহরটোহরগুলো পড়ে কিছু একটা কারণ পাওয়া যেত। কিন্তু সে গুড়েও বালি। এখন অবধি এত যন্ত্রপাতি সুপারকমপিউটার রোবটটোবট লাগিয়েও মানুষ সে বিটকেল ভাষাকে কবজা করতে পারেনি।

বিজ্ঞানিরা তাই নানান কায়দায় পথ খুঁজছেন , কেন ধ্বংস হয়ে গেল অতবড়ো সভ্যতাটা। এই খোঁজারুদের মধ্যে একদল আছেন যাঁদের নাম প্রত্ন-আবহাওয়াবিদ, বা প্যালিওক্লাইমেটোলজিস্ট। এঁরা করেন কি, মাটির নীচে থাকা নানান সূত্র থেকে গোয়েন্দাগিরি করে পুরোনোদিনের আবহাওয়ার খবর জোগাড় করেন।

ইয়ামা দিক্ষিত নামে নামের এমনই এক প্রত্ন-আবহাওয়াবিদ এই নিয়ে একটা সাংঘাতিক আবিষ্কার করেছেন। আবিষ্কার করা বস্তুটা অবশ্য দেখতে ছোট্ট। একটা পুঁচকে শামুক প্রজাতির দেহাবশেষ। আর তাইতেই খবর মিলেছে প্রকৃতির এক ভয়ংকর অভিশাপের,  চার হাজার বছর আগে যা একটা গোটা সভ্যতাকে ধ্বংস করে দিয়েছিল অবহেলায়।

ইয়ামা তাঁর দলবল নিয়ে হরিয়ানায় একটা খননকার্য চালাচ্ছিলেন। জায়গাটা সিন্ধু উপত্যকার উত্তরপূর্ব কোণায় একটা প্রাচীন হ্রদের বেসিন। এখনো তাতে মাঝেমাঝে বর্ষায় জল জমে। বর্ষার জল ছাড়া ওতে জল হবার আর কোন রাস্তা নেই।আর একবার জল হলে একমাত্র সূর্যের তাপে উবে যাওয়া ছাড়া আর কোন পথ নেই তার হ্রদ থেকে বেরোবার।

shamukমিষ্টিজলের হ্রদে একধরনের লম্বাটে শামুক থাকে তা তো দেখেছ। যারা দেখনি তাদের জন্য ছবি দিলাম। এই শামুকগুলোর বৈশিষ্ট্য হল, বৃষ্টি যত কম হয় তত তাদের খোলাগুলো একটু একটু করে হালকা হয়ে যায়। ইয়ামা আর তাঁর দলবল সেই শুকনো হ্রদের বুক খুঁড়ে তাতে সেইসব শামুক খুঁজতে গেছিলেন। মানে, শুকনো হ্রদে আর জ্যান্ত শামুক পাবেন কোথা? খুঁজতে গেছিলেন তাদের মরা খোলগুলোকেই।

হ্রদের তলায় যে স্তরে স্তরে পলি জমে থাকে সে তো এখন জমে জমে শক্ত হয়ে উঠেছে। বিজ্ঞানিরা যন্ত্র দিয়ে মেপে বলতে পারেন, তার মধ্যে কোন স্তরটার কত বয়েস।তা, ইয়ামা এমনই নানান বয়েসের পলিস্তর থেকে শামুকের খোল জোগাড় করে তার ওজন মাপতে বসলেন। দেখা গেল সবসময়েই তাদের ওজন একেবারে ঠিকঠাক, শুধু আজ থেকে ৪২০০ থেকে ৪০০০ বছর আগেকার দুই শতাব্দি সময়ের পলিস্তরে তাদের খোলের ওজন বেশ কম।

ব্যাপারখানা কী? খোঁজখবর শুরু হল। তখন দেখা গেল, আরো একজন বিজ্ঞানী, তাঁর নাম সুষমা প্রসাদ, তিনি মধ্যভারতের লোনার হ্রদের তলাকার শামুকদের নিয়েও অমন একটা কাজ করছেন। তাতেও দেখা যাচ্ছে  ৪৬০০ সাল থেকে খুব ধীরে হালকা হতে শুরু করে ৪২০০ বছর আগে থেকেই সবচেয়ে হালকা হয়ে উঠেছে শামুকদের খোলা।

সব দেখেশুনে ইয়ামা আর তাঁর দলবল যে সিদ্ধান্তে পৌঁছোলেন সেইটে খুব ভয়ংকর। ৪২০০ বছর আগে, যখব সিন্ধু সভ্যতা তার খ্যাতি আর প্রতিপত্তির তুঙ্গে, তখন হঠাৎ করে থেমে গিয়েছিল মৌসুমী হাওয়ায় বয়ে আসা বর্ষাকাল।

নদী আর মাটির তলার জলকে অবলম্বন করে বিরাট লড়াই করেছিল এই উন্নত সভ্যতার মানুষেরা। কিন্তু প্রকৃতি  বোধ হয় হেসেছিলেন তাদের সেই চেষ্টাকে দেখে। দীর্ঘ দু শতাব্দির জন্য বন্ধ করে দিয়েছিলেন বিস্তীর্ণ এলাকায় মৌসুমী বাতাসের বৃষ্টিবাহী যাতায়াত। একেবারে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন অতবড়ো সভ্যতাটাকে। শুদ্ধুমাত্র একটা ব্যাখ্যাহীন খেয়ালের বশে তিলতিল করে মেরে ফেলেছিলেন তেরোশোর ওপর শহরকে। ভারতবর্ষ ফের ডুবে গিয়েছিল আদিম যুগে। যার থেকে তার বুকে ফের নগরসভ্যতা গড়ে তুলতে আর্যদের কেটে গিয়েছিল প্রায় দেড় সহস্রাব্দি।

indus02তাহলে ভাবো দেখি, বৃষ্টি কম হবে শুনে বড়োরা ভয় পাবে না কেন? তাও তো মাত্র এক বছর বৃষ্টি কম হবে শুনেই হৃৎকম্প উঠে গেছে। আমাদের হাতে এতসব যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তিটযুক্তি থাকা সত্ত্বেও।

 ফের যদি একবার আমাদের দেশটার বুকে প্রকৃতি সেই ভয়ানক খেলাটা শুরু করে? ফের যদি একবার শতাব্দিজোড়া খরার আক্রমণ শুরু হয়ে যায়? হতেই তো পারে। কোথায় যাবে তখন এ দেশের ১২৭ কোটি মানুষ? কে তাকে খাবার দেবে? ফের যদি একবার এই দেশটা মরুভূমি হয়ে যায়? তারপর আবার কি হাজার হাজার বছর পরে কোন বিজ্ঞানি এইভাবেই খুঁজে পাবে আমাদের হাজারো শহর-গ্রামের ধ্বংসস্তূপ?

India_Harappan_02ওহো এই প্রসঙ্গে খবর দিই,  হরিয়ানার রাখিগ্রাহীতে সিন্ধু সভ্যতার ধ্বংসাবশেষের মধ্যে থেকে একটা কবরখানায় পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো এক সিন্ধুবাসী পরিবারের দুজন পুরুষ একজন মহিলা এর একজন বাচ্চার সম্পূর্ণ কংকাল উদ্ধার করেছেন ডেকান কলেজ, হরিয়ানা প্রত্ন দফতর আর সিওল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানিরা মিলে।  ওর থেকে সিন্ধুবাসীদের ডি এন এ বিশ্লেষণ সম্ভব হবে এবারে। ফের খুলে যাবে সে সভ্যতার রহস্যের আরো একটা পর্দা।

Advertisements

4 Responses to ইয়ামা দিক্ষিতের শামুক-ইন্দ্রশেখর

  1. রাজীব কুমার ঘোষ says:

    অত্যন্ত মনোগ্রাহী একটি রচনা। জয়ঢাককে ধন্যবাদ।

    Like

  2. বা: সাবলীল বর্ণনায় গুরুত্বপূর্ণ খবর!

    Like

  3. dipanwita roy says:

    সুন্দর লেখা

    Like

  4. kausikbhaduri says:

    সিন্ধুবাসীদের ডিএনএর সঙ্কেত জানার অপেক্ষায় আছি।

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s