উপন্যাস পান্নালাল শিবশঙ্কর ভট্টাচার্য শরৎ ২০১৮

 শিবশংকর ভট্টাচার্য -র সমস্ত লেখা একত্রে      

সূর্য পশ্চিমের আকাশ থেকে গঙ্গার জলে ডুবে যাবার পর আলো কমতে কমতে ঠিক তারা ফুটে ওঠার আগের সময়টা অন্যরকম। চারপাশ কেমন শান্ত হয়ে যায়। গঙ্গার দিক থেকে জোলো গন্ধমাখা বাতাস বইতে থাকে সারাক্ষণ। তাও থেমে যায়। পাখির দল যে যার বাসায় ফিরে অনেক ডানা ঝটপটানি আর ডাকাডাকির পর চুপ করে যায়। আকাশের নীল, গাছেদের সবুজ, নৌকোর পালের লাল রং মুছে একরঙা ছবির মতো হয়ে যায়। সবজেটে নীল একটা অদ্ভুত আলো সবকিছুর ওপর স্থির হয়ে থাকে। এই ঝিমিয়ে থাকা সময়টাকে আমি ভালোবাসি।

এই আলোকে বলে গোধূলি। কাকিমা বলেন টোয়াইলাইট। নীলমণিদাদু একে বলেন ব্রাহ্মমূহুর্ত! যে যাই বলুক, আমি খুব ভালোবাসি সময়টাকে। রোজ এই সময়টায় আমি বাড়ির পেছনের বাগানটিতে এসে বসে থাকি। একা একা। কেউ জানতেও পারে না। পারবে কী করে? এদিকে তো কেউ আসেও না! অত উঁচু দেয়াল ঘেরা সামনের চমৎকার সাজানো বাগান, ফোয়ারা, পাথরের গুলি ছড়ানো রাস্তা। রাজবাড়ির মতো বাড়ি আর বিশাল দেউড়ি দেখেই খুশি থাকে সবাই। কত রঙের ফুল ফুটে আছে বাগানে! সারি দেওয়া পামগাছ, বাহারি লতানো আমগাছ এসব ছেড়ে পেছনটার দিকে নজর পড়ে কারও? ভাগ্যিস কেউ যায় না ওদিকে! গিয়ে ওখানেও বাগান সাজালে একটুও ভালো লাগত না আমার। সাজানো বাগান বিচ্ছিরি।

গঙ্গার ধারের এই লম্বা জঙ্গল ঘেরা পুরনো দিনের ভেঙে পড়া দালানের পাথুরে স্তূপ-টুপ নিয়ে জায়গাটা আপনিই তৈরি হয়েছে। সবার চোখের আড়ালে বলেই এত সুন্দর। এদিকে ভালো গাছ নেই একটাও। একটা বটগাছের মতো বড়ো তেঁতুলগাছ। আর ভেঙে পড়া শিবমন্দিরটার ওপর চীনে বটগাছটা এদিকে আসার পথ আটকে রেখেছে। এখানে মাটির ওপর ছোটো ছোটো দূর্বা-সাজানো লনটা ঢালু হতে হতে গঙ্গায় গিয়ে মিশেছে। এই নামটাও তৈরি হয়েছে নিজে থেকেই। কেউ মোয়ার চালিয়ে ছাটেনি। ভারি মোলায়েম ঘাসগুলো। শুয়েও থাকি।

সেখানকার চওড়া ঘাটটাও ভাঙা, তার পাশে পাশে বেত আর বাঁশগাছের জঙ্গল। দু’পাশের ঝোপগুলোর পরেই অবশ্য দুটো পুকুর আর গলফ খেলার মাঠ শুরু হয়ে যাচ্ছে। ওখানে যারা যায়, তারা অতবড়ো ঢেউ খেলানো ঘাস-ছাঁটা মাঠে ছাতার তলায় বসে শরবত খায়। এদিকটায় ফিরেও দেখে না।

এই লুকোনো জঙ্গুলে জায়গাটার কথা আমি কাউকে বলিনি। বলতে নিষেধ আছে। লোকটা আমায় পই পই করে বলেছে, আমি ছাড়া আর কেউ যেন না জানতে পারে। জানলেই কেউ না কেউ চলে আসবে। তাহলে ও আর আসতে পারবে না। আর ও না এলে বিকেলটাকে বিকেল বলে মনেই হবে না আমার।

আমরা দু’জনে এখানে বসে কত্ত গল্প করি! আর কেউ দেখতেও পায় না! বললাম তো, কেউ জানে বলে মনেই হয় না। এ-বাড়িতে, বাবা-মা-কাকা-কাকিমাকে বাদ দিয়ে যারা থাকে তাদের সারাদিন কাজের অন্ত নেই। গোবর্ধনদাদু আর তার দুই ছেলে সুদামকাকা আর বংশীকাকা বাগানে ব্যস্ত। খুব কাজের লোক তিনজনেই। আমাকে একটা গাছের চারা দেবে বলেছে। কতদিন আগে চেয়েছিলাম পারিজাত ফুলের গাছ। গল্পের বইতে পেয়েছি পারিজাতের নামটা। গোবর্ধনদাদু ফোকলা হেসে বলে, “হেঁ হেঁ খোকাবাবু, এনাকে যে স্বর্গ থেকে আনতে হবে গো।”

আমি তো জানি না স্বর্গ কোথায়। জিজ্ঞেস করতে বলল, “সে ম্যালা দূর। যেতি-আসতি সময় লেগে যাবে! সবুর করো।”

আমাকে ছোটো পেয়ে যে যা খুশি বুঝিয়ে দেয়। বাসন্তীপিসি আর দুর্গানাদকাকা আছে রান্নাঘরে। আমায় দুধ খাওয়ার জন্য খুব জ্বালাতন করে সকালবেলায়। আমাদের কালী-গরুর দুধ, বাছুরকে খেতে না দিয়ে দুয়ে আনে বলে খেতে ইচ্ছেই করে না আমার। আরও সাত-আটজন আছে বাড়িতে। সনাতনবাবু, ম্যানেজার আর ইচুদাদু ছাড়া কারও সঙ্গে আমি চেনাশোনা হয়নি বলে কথা বলাও হয় না।

সনাতনবাবুকে কেন যে আমার পছন্দ হয় না বলা মুশকিল। ওর বাবা-ঠাকুরদারা নাকি চার পুরুষ ধরে আমাদের বাড়ির ম্যানেজার। আগে নায়েব না কী যেন বলে ডাকা হত। গোল চশমার পেছনে গোল গোল চোখদুটো সবসময় এদিক ওদিক ঘুরছে। কী যেন খুঁজে বেড়াচ্ছে সারাক্ষণ! আমায় দেখলেই ভুরু উঁচিয়ে এমনভাবে তাকায়, আমার পেটের ভেতর প্রজাপতিরা ফরফর করতে থাকে। দু’চক্ষে দেখতে পারি না! আর সারাক্ষণ বাড়ির কাজের লোকেদের পেছনে লাগা! বাবা-কাকার কাছে এর ওর সম্বন্ধে গুজগুজ করে নালিশ তো আছেই। বাবা-কাকারা অবশ্য ওর কথায় কানও দেন না। বেশ হয়েছে। অত নালশে লোক মোটেও ভালো লাগে না আমার। মনে মনে ভাবি, কী করে ওকে জব্দ করা যায়।

ইচুদাদুকে ভালো লাগে ওর মস্ত দাড়ি আর বড়ো চাবি ঝোলানো রিংটা সঙ্গে থাকে বলে। বাড়ির ঘড়িগুলোর চাবি দেয়া আর ঝাড়পোঁছ করার সময়, দরজার তালা খোলা-বন্ধ করার কাজ ওর। চলার সময় চাবিগুলো ঝুম ঝুম করে বাজে, খুব মজা লাগে দেখতে।

মাঝে মাঝে আমাকে গল্পও শোনায় ইচুদাদু। সে গল্পের না আছে মাথা, না আছে মুণ্ডু! তবুও শুনি মন দিয়ে। খুব নিচু গলায় থেমে থেমে বলা গল্পগুলোয় একরকম পাখির কথা আছে। তারা নাকি হাতি গিলে খেতে পারে! তাদের ডিমের খোলা দিয়ে নৌকো তৈরি হয়। পালক দিয়ে পাল। আলাদিন বলে একটা ছেলের গল্প শুনে অবাক লাগত। তার হাতে একটা প্রদীপ। সেটা ঘষলেই হাজির হবে দৈত্য! যা চাওয়া যাবে তাই নাকি সে এনে দেবে। বিশ্বাস হতে না চাইলেও শুনতে ভালো লাগে খুব। কোথায় নাকি গুহার মধ্যে অনেক ধনরত্ন। সব ডাকাতি করে জড়ো করা। গুহার বন্ধ দরজা খুলে যায় ‘সিম সিম ফাঁক’ বলেলেই। খুলুক গে, আমার কী? ডাকাতি করা ধনরত্নে লোভ করতে নেই ভালো মানুষদের।

অবশ্য ইচুদাদুও সে-কথাই বলল। লোভ করতে গিয়ে একটা লোককে তো ডাকাতরা মেরেই ফেলল! ডাকাতরা বড়ো খারাপ হয়। আরও কত যে গল্প শুনেছি ওর কাছে! সবগুলো মনেও নেই ভালো করে। ইচুদাদু আমায় ছোটো ছেলে মনে করে কথা বলেই না। ও যেন আমার বন্ধু। অন্যদের মতো গাল টিপে দেওয়া নেই, চুমো খাওয়া নেই, ন্যাকা ন্যাকা কথা বলে আদর করা নেই। আট বছর হয়ে যাবে আমার! ছোটো আছি নাকি?

তবে আমার আরও ভালো লাগে আস্তাবল আর তার পাশের চমৎকার কাচ-ঘরটায় যেতে। কাচ-ঘরটা দেখতে ভারি চমৎকার। মাথার ওপর ছোটো ছোটো বিদেশি টালি। তলায় সবুজ রঙের কাঠের মেঝে, কারুকার্য করা কাচের ঘন সবুজ দেয়াল। দেয়ালে নাক ঠেকালে ভেতরটা দেখা যায়। একপাশে একটা দোকানমতো আছে, তার তাকে কত যে বোতল! ওতে শরবত আছে। বাবা-কাকার বন্ধুরা টেবিলে বসে খায়। আমার নাকি ওটা খাওয়া বারণ। তাহলে ওরা খায় কেন? কাকিমাও খায়। মা খায় না কখনও। যাক গে। কাচ-ঘরের যে জিনিসটা দেখতে সবচাইতে ভালোবাসি সেটা হল টালির উঁচু ছাদের ওপর ঘুরতে থাকা মুরগিটা। ও নাকি হাওয়া মাপে। এটা একটা মাপার জিনিস হল? তবে সাদা ফুল ফোটানো লতাটা ছাদ বেয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ওর দিকে। কিছুদিন বাদে ওর ঘোরাঘুরি জারিজুরি শেষ! তখন সব জড়িয়ে-মড়িয়ে বাবুইপাখির বাসা হতে হবে বাছাধনকে। হিঃ হিঃ! ব্যাটা ওর ঐ উঁচোনো পেট, ঝুপসি লেজ আর উঁচোনো বাহারি ঝুঁটি নিয়ে পালিয়ে এলেই পারে। আমার সাথে গঙ্গার ঘাটে গেলেই হয়। ঘুরবে ফিরবে, হাওয়া খাবে। ঐখানে ওর আটকে থাকাটাই খারাপ লাগে।

“তোর ঐরকম খারাপ লাগা বাই কেন রে? কোনটা ভালো লাগে তার কথাই বল না!” আস্তাবলের পাশের ঘরটায় গেলেই আমাকে বলে নীলমণিদাদু, “কী কী ভালো লাগে?”

ওকে বলি, “কেয়ারি না করা ঝোপঝাড়, মাটিতে খুদে খুদে সবুজ ফুলের মতো আমরুলগাছের দালান। ছোট্ট গাছে পাতা সেলাই করা টুনটুনিদের বাসা। তাতে ডিম ফুটে ছানা হলে তাদের হাঁ করে থাকা। বুনো ফুলের কাউকে কেয়ার না করে একা একা ফুটে থাকা। দেয়ালের শ্যাওলার ভেলভেট রং, এসব ভালো লাগে।” নীলমণিদাদু হেসে বলেন, “তুই ছোটো কিনা, তাই যত ছোটোখাটো মাটি-ঘেঁষা জিনিস ভালো লাগে। বড়ো বড়ো ব্যাপারগুলো কি কম ভালো? দেখতে শেখ, দেখবি আরও কত কী আছে ভালো লাগার মতো।”

উঁচু পাহাড়, গভীর জঙ্গল, ঢেউয়ের মাথায় সাদা ফেনার মুকুট পরা আকাশপাতালজোড়া সমুদ্দুর, তারাভরা রাতের আকাশ দেখলে নাকি মনটা দৌড়ে বেড়াবার সুযোগ পায়। ঘরে চুপচাপ বসে থাকলে তা হবার জো নেই! কুয়োর ব্যাঙ হয়ে যেতে হয়।

কুয়োর কথায় মনে পড়ল, আস্তাবলের পেছনে জল দিয়ে ঢাকনা দেয়া একটা মস্ত কুয়ো আছে। ওখানে গিয়ে শব্দ করলে কতক্ষণ ধরে সে শব্দ বাজতে থাকে তো বাজতেই থাকে। জলটল সেখানে নেই বলে কেউ যায় না ওদিকে। আমারও যাওয়া বারণ, তবুও যাই। কুয়োটা এত গভীর যে তল দেখা যায় না! দুপুরে উঁকি মেরে দেখেছি অনেক তলায় ছোট্ট গোল টিপের মত কালো জলে আকাশের ছায়া টলটল করছে। একপাশ দিয়ে লোহার সিঁড়ি করা আছে। ইচ্ছে হয় জালের ঢাকনা সরিয়ে নেমে যাই, দেখে আসি কী আছে তলায়। বারণ বলেই বেশি করে ইচ্ছে করে। কিন্তু ভয়ও করে খুব! যাবই একদিন।

দাদুর মাথায় ছিট আছে। ফোয়ারার বাইরের গোলটাতে বারোটা সাদা পাথরের পরি আছে। ডানা কারও ছড়ানো, কারও অর্ধেক গোটানো। সবাই হাত ধরাধরি করে ফোয়ারা ঘিরে নাচ করছে। দাদু বলে, আকাশে চাঁদ থাকলে ওরা জ্যান্ত হয়ে মাঝরাতে আকাশে উড়ে যায়। সবাই ঘুমিয়ে থাকে, তাই জানতেও পারে না। সত্যি বুঝি তাই! কী জানি বাপু, ছোটো বলে অত বুঝি-টুঝি না! হতেও পারে। দাদু কি মিথ্যে বলবে! দাদু কত কী কাজ করতে পারে! এ-বাড়ির ছ’টা ঘোড়াকে কেমন পোষ মানিয়েছে! ঘোড়ার পিঠে চড়ে যখন, ওকে বুড়ো বলে মনেই হয় না! মনে হয়, বীর যোদ্ধা। মাঝে মাঝে দুষ্টুমি করে মাথায় ওড়না পেঁচিয়ে আমায় নাচ দেখায়, অবশ্য লুকিয়ে। তখন আর যোদ্ধা বলে মনেই হবে না। হেসে গড়াতে হবে। ও বলে, আমি নাকি ওর ক্যাপ্টেন, ও আমার মেট। অবশ্য উলটোটাও হতে পারে।

আমার কিনা শরীর খারাপ, তাই স্কুলে যেতে পারি না। আট বছর প্রায় বয়েস হয়ে গেল তবুও পারি না। কাকিমার ঘরে পড়তে যেতে হয় রোজ সকালে। কাকিমা আমায় পড়ায়। খুব ভালোবাসে। কিন্তু আমার মন বসে না। ওর আলমারির পুতুলগুলো যেন চেয়ে থাকে আমার দিকে। যেন কথা বলতে চায় আমার সঙ্গে। আমায় পড়ায় নীলমণিদাদু। দুপুরে লুকিয়ে লুকিয়ে। পরে কাকিমা পড়া ধরলে সব যখন বলতে পারি কাকিমা অবাক হয়ে চেয়ে দেখে আমাকে।

নীলমণিদাদু তো ঘোড়াদের দেখাশোনা করেন, তাই নিজের বিদ্যে লুকিয়ে রাখেন। আমিও বাবা বলতে যাই না কাউকে। আস্তাবলের ঘোড়াগুলোর সঙ্গে নীলমণিদাদু আমার আলাপ করিয়ে দেবার পর একা একাও ঢুকতে পারি এখন। ওরা আমার দিকে বড়ো বড়ো চোখে চেয়ে নাক দিয়ে ফরর ফরর শব্দ করে জানান দেয় যেন চিনেছে আমায়। আমিও কাছে গিয়ে কপালে হাত বুলিয়ে দিই, কথা বলার চেষ্টা করি। মনে হল ওরা বোঝে আমার কথা। লেজ নাড়ায়, খাড়া খাড়া কানদুটো নাড়ে, ঘাড় বাঁকিয়ে মাথা উঁচুনিচু করে। খুব খুশি হলে গায়ের চামড়া কাঁপায়। দেখে নীলমণিদাদুও অবাক। এত তাড়াতাড়ি নাকি ঘোড়াদের কাছে যাওয়া যায় না। লেজের দিকে যেতে বারণ থাকলেও যাই। কিছু বলে না ওরা।

নিম আর আমলকিগাছে ঘেরা আস্তাবলটা যে কী সুন্দর! মনে হয় সারাদিন এখানেই বসে থাকি। বিদেশের বইতে এমন আস্তাবলের ছবি দেখেছি কত। পাথুরে দেয়াল, মাথায় অনেক উঁচু প্যাগোডার মতো বাহারি চাল। মেঝেটা কিন্তু মোটা রবার পাতা। তার তলাতেও পাথর আছে। ঘোড়াদের নাল পরানো পায়ে লাগবে বলে রবার দিয়ে ঢাকা। চারপাশের দেয়ালের ওপরের অনেকটাই খোলা, আলো-বাতাস খেলে। এই আস্তাবলটাকে চমৎকার লাগে আমার। নয়নদাদা আর রাধুদাদা একদম পরিষ্কার করে রাখে সবসময়। নীলমণিদাদু এমনিতে হাসিখুশি হলেও এসব ব্যাপারে ভয়ানক কড়া। জানালা দিয়ে নজর রাখে সবসময়।

নীলমণিদাদুর আগে সর্দার ছিল হুকুম সিং। বয়েস হয়ে যাবার পর তার সর্দারি চলে গিয়ে শুধু বিকেলে বাবাদের বেড়াতে যাবার দু’ঘোড়ার ল্যান্ডোগাড়িটা চালায়। কী যে ভালো দেখতে তাকে! সাজগোজ করে মাথায় পাগড়ি বেঁধে গাড়িতে সোজা হয়ে বসলে বুড়ো রাজার মতো লাগে। ফিরে এসে অবশ্য বড্ড হাঁফায়। কষ্ট পাই তখন ওকে দেখলে। হুকুমটুকু চলে গিয়ে ওর শুধু শিংটুকু আছে। তবে আমাকে দেখলেই পাকা গোঁফের ফাঁকে হেসে ছড়া শোনায় মাথা নেড়ে নেড়ে,

ইয়ারার দেগি বনমুগো দেখি
চককর পেঁদি চকচকর ঘোরি
পেঁ পেঁ পেঁ পেঁ।

এর মানে কী জানে শুধু ওই। না বুঝলেও মজা লাগে শুনতে। চককর মানে কি চাকা? কে জানে?

রোজ বিকেলে ল্যান্ডো নিয়ে গঙ্গার ধারের রাস্তায় যাওয়া চাই বাবা, কাকা আর কাকিমার। না হলে নাকি রাতের খিদে হয় না। আরও তো দুটো বড়ো বড়ো মোটরগাড়ি আছে, ড্রাইভার গণেশকাকুও আছে। তবুও ল্যান্ডো কেন? আমার মনে হয়, ওতে চড়লে সবাই চেয়ে দ্যাখে। রাজা মনে হয় নিজেদের, তাই। আমার খুব খারাপ লাগে হুকুম সিংয়ের কথা ভেবে। ঘোড়াগুলোও হাঁফায়। ঘাম ঝরে ওদের গায়ে।

নিজেকে রাজারানি ভাবার দরকারটা কী! ভারি বোকা। রাজা মানেই তো ঢাল-তরোয়াল নিয়ে যুদ্ধ আর মরে যাওয়া। আমার মায়েরও বোধ হয় খারাপ লাগে। কখনও মাকে ওদের সঙ্গে নিয়ে যেতে দেখি না। মা বড়ো ভালো। কাকিমাও ভালো। তবে ও মেমসাহেব বলে ঠিক বুঝতে পারি না।

পান্নালালকে বলে যাবে না কাউকে আমার খারাপ লাগে। ও বলে, “সে তো তুই রাগ করে থাকিস বলে। রাগ করে দেখিস বলে খারাপ মনে হয়। মুখটা হাসি হাসি করে থাক তো ক’দিন, দেখবি মনটাও হাসিখুশি হয়ে যাবে। তখন দেখবি সব ভালো, সবাই ভালো। মাথায় একটু চোট লেগেছে বলে তোর এমন হঠাৎ হঠাৎ মনখারাপ আর রাগ।”

ভেবে দেখতে হবে। চোট লাগার পর থেকেই তো আমার অসুখ। ও জানল কী করে!

আরে! মাও তো তাই বলেন। মনখারাপ হলে দোতলার কাচ-ঘরে মার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেই মা হাতে ধরা তুলির রংটা টক করে আমার নাকে বা গালে একটু ছুঁইয়ে দিয়ে একগাল হেসে কাছে টেনে নিয়ে আদর করে দেন। আমিও আমার নাকের রংটা মায়ের নাকে লাগিয়ে দিই।

মা ছবি আঁকেন। দেখতেও মাকে ছবির মতো সুন্দর। শুধু চোখদুটো মাঝে মাঝে দুঃখ দুঃখ হয়ে যায়। আমার সামনে দিব্যি হাসি হাসি, আড়াল থেকে লুকিয়ে দেখেছি মুখে হাসি নেই। কেন? ডাক্তারদিদিকে বলেওছি সেকথা। মার দুঃখ কীসের কে জানে!

ডাক্তারদিদির লাল গাড়িটা ঢুকল। ও একদিন বাদে একদিন আমাকে দেখতে আসে। কী যে অসুখ আমার বুঝি না ছাই! শুইয়ে বসিয়ে নানারকম যন্ত্রপাতি লাগিয়ে দেখে আমি ঠিকঠাক আছি কি না। কই, অন্যদের তো দেখে না! হুকুম সিংয়ের তো হাঁপানির কষ্ট। তাকে দেখলেই পারে! যত কাণ্ড আমাকে নিয়ে। কাচ-ঘরের ঐ দোকানটার শরবত খেলে কাকিমারও তো রোজ রাত্তিরে অসুখ করে। মুখটা কেমন হয়ে যায়, হাঁটতে পারে না ঠিকমতো। ডাক্তারদিদি আমার কাছে শুনে গম্ভীর হয়ে বলেছে, ও কিছু নয়।

দেখলেই পারে। বুঝি না বাপু বড়োদের। আমার তো কিছুই হয়নি, তবুও আমাকে নিয়েই ব্যস্ত সবাই! তবে ডাক্তারদিদি লোক ভালো বলে কিছু বলতে পারি না। পরিদের মতো কী সুন্দর দেখতে ওকে! কত কথা বলে আমার সঙ্গে। ঠেলাগাড়িতে আমাকে বসিয়ে গলফের মাঠে ঘুরতে ঘুরতে আমার কাছে গল্প শুনতে চায়। মাঝে মাঝে খাতায় কীসব লিখে-টিখে নেয় আবার। ও-ও গল্প বলে, আমিও বলি। তবে সব বলি না। পান্নালাল বলেছে, বড়োদের সব কথা বলে দিতে নেই। বিশ্বাস করতে চায় না ওরা।

একতলায় একটা বড়ো হলঘর। খুব উঁচু ছাদে অনেকগুলো আলো ঝোলানো আছে। জানলাগুলো রঙিন কাচ দেয়া আছে বলে ঘরটা রঙিন আলোয় ভরে থাকে। সেখানে অনেক জীবজন্তুর মরা শরীর তুলো ভরে রাখা। অনেক বছর ধরে শিকার করে করে জমিয়ে রেখেছে। দেখলে মনে হয় জ্যান্ত! তোমাদের চুপিচুপি বলি, আসলে তো ওরা মরেনি। ঘরে কেউ না থাকলে আমি যখন কাছে গিয়ে দাঁড়াই ওরা জ্যান্ত হয়ে ওঠে। ঘর ঝাড়ু দেবার সময় একেকদিন ঢুকে পড়ি ও-ঘরে। একজোড়া ম্যাকাও পাখির পাশে একঝাঁক টিয়া সেখানে বসে আছে। ওখানে গেলে আমি মস্ত নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা ভেসে যেতে দেখি। মনে হয়, আমিও যেন ওদের সাথে উড়ছি! মস্ত বড়ো শিংওয়ালা বুনো মোষটার গায়ে ঘাসবন, কাদা-জলের গন্ধ! কত আর বলব? সুন্দরবনের মানুষখেকো বাঘটার পাশে দাঁড়াতে একটুও ভয় পাই না। ওকে ছুঁলে আমার চারপাশে কত বড়ো বড়ো গাছ গজিয়ে পুরো সুন্দরবনের জঙ্গল গজিয়ে ওঠে। আমি শুলোর খোঁচা বাঁচিয়ে কাদামাটিতে ওর পাশে পাশে হেঁটে বেড়াই।

ও আমায় মারবে না। আমি দেখেছি, ওর কাচ বসানো চোখের কোণে জল। পান্নালাল বলেছে, ওগুলো ছোটোদের মনের লুকোনো খাতার গল্প। শুধু ছোটোরা দেখতে পায়, পড়তে পায়। বড়ো হয়ে গেলেই মনের খাতা বন্ধ। তাই পান্নালাল বড়োদের কাছে আসেই না।

তোমরাই বলো, এসব শুনলে বড়োরা কী বলবে! তবুও আমার তো সত্যিই হয় ওরকম।

যাদুঘরে নিয়ে গেল যেদিন, সেদিন আমার যা হয়েছিল! ডাক্তারদিদি, আমি আর মা। দোতলার মমির ঘরে কাচের ওপর দিয়ে ওর দিকে তাকাতেই ঝড় উঠল। বালির ঝড়। অবাক হয়ে দেখলাম, ছায়া ছায়া কত লোক মস্ত কাঠের বাক্স করে তেকোনামতো একটা পাথুরে মস্ত ঘরের মধ্যে ঢুকল। ভেতরে দমবন্ধ অন্ধকার। মশালের আলোয় শুয়ে থাকা একটা লোককে ঘিরে ক’জন খুব ব্যস্ত! তেলমাখা কাপড় পেঁচিয়ে লোকটাকে ঢেকে ফেলছে। ভয় পেয়ে চেঁচিয়ে উঠতেই মা আমায় কোলে তুলে বাইরে নিয়ে এল। কী হয়েছিল ওদের বলতেই খুব অবাক হয়ে দু’জনে দু’জনার মুখের দিকে চেয়ে রইল। ডাক্তারদিদি ফিসফিস করে বললেন, “হাইপার সেনসিটিভ! ড্রিমার। মোস্ট আনইউজুয়াল! হি ইজ টু মাচ রোমান্টিক ইন ট্রু সেন্স।”

আমার কান বাঁচিয়ে মাকে বললেও শুনতে পেলাম। অত ইংরিজি কি ঠিকঠাক বোঝা যায়! তবে মনে হল, আমার অসুখ নিয়ে বলছে। পরে সব শুনে-টুনে পান্নালাল গম্ভীর হয়ে বলল, “বড়োদের বলতে কে বলেছিল? এখন এটাকে অসুখ ভেবে তেতো তেতো ওষুধ খাওয়াবে ক’দিন। কিচ্ছু বলতে নেই বড়োদের। মাথায় ঢুকবে না।”

পান্নালালের মানে জিজ্ঞেস করতে নীলমণিদাদু বলেছে, “পান্নালাল বলে বটে! তবে ওটা ভুল। পান্না তো সবুজরঙা পাথর। এই লাল মানে বোধহয় বাচ্চার কথা বলছে। কোথায় পেলি নামটা?”

আমি চুপচাপ পালিয়ে এলাম। দরকার নেই বাপু! কী বলতে কী বলে ফেলব! আমার আবার পেটে কথা থাকতে চায় না। প্রজাপতির মতো ফরফর করে।

তার মানে পান্নালাল মানে সবুজ বাচ্চা! ঠাকুরঘরে ঠাম্মার গোপাল ঠাকুরের গায়ের রং সবুজ। গোপাল বড়ো হয়েই তো কৃষ্ণ! বাব্বা, ওর নামের মধ্যে এত! পান্নালালের মতো কৃষ্ণঠাকুরও তো ম্যাজিক জানত!

এবার বলি কী করে পান্নালালের সাথে আমার প্রথম দেখা হল।

আমাদের মস্ত বড়ো বাড়িটার কেবল দশ-বারোটা ঘরে আমরা থাকি। মানে বাবা, মা, কাকা, কাকিমা আর আমি। ওপরে নিচে আরও কত ঘর! মাঝের মস্ত চাতালটাকে ঘিরে আর পেছনদিকে আরও কত্ত! সব পুরনো দিনের জিনিসপত্তরে ঠাসা। বেশিরভাগ ঘরের দরজায় বড়ো বড়ো সাহেবি আমলের তালা ঝুলছে। কখনও কাউকে ঢুকতে দেখি না।

চাবি থাকে ইচুদাদুর কোমরে বাঁধা রিংটার মধ্যে। চললে যেগুলো ঝুম ঝুম করে বাজে। প্রত্যেকটা চাবির সঙ্গে যেন একেকটা আলাদা গল্প আছে। ঝুম ঝুম শব্দ করে তারা সেগুলো বলতে চায়। মাঝে মাঝে ইচুদাদুর পিছু পিছু ঘরগুলোর দরজায় ঘুরে বেড়াই, যদি খুলে দেয় তালা।

সব দরজা তো খোলে না। সেগুলোর দিকেই আমার বেশি টান। দরজার খড়খড়ি কোনওমতে ফাঁক করে ভেতরে উঁকি মেরে দেখি। স্কাই-লাইটের আলোয় দেখা যায় কোনওটাতে বড়ো বড়ো ঝাড়লন্ঠন, কার্পেট, কাচের আলমারিভর্তি কত রঙবেরঙের কাচ আর চীনেমাটির বাসনপত্র, পুতুল। খড়খড়ির শব্দে চমকে উঠে চামচিকেরা ঘরময় উড়ে বেড়াচ্ছে। কোনও ঘরে দেয়ালজোড়া বড়ো বড়ো ছবি টাঙানো। সেগুলোর গায়ে মাকড়শারা চমৎকার জাল বুনে রেখেছে। আধখোলা স্কাই-লাইটের ফাঁক দিয়ে সবজে পায়রার দল ঢুকে বাসা বেঁধে নিশিন্তে ডিম পেড়েছে। দরজায় সাড়া পেয়ে তারা ডানা ঝটপটিয়ে উড়ছে আর ডানার বাতাস লেগে ঝাড়লন্ঠনের থেকে টুকরো কাচের শব্দ পাচ্ছি টুং টাং টুং টাং।

নিচের হলঘরটার মতো ওপরেও একটা বড়ো হলঘরে সাজনো একগাদা বর্শা, তলোয়ার, ঢাল আর বন্দুক। খুব নজর করলে ধারালো শিং বাগানো মস্ত হরিণ, বাইসন আর দেয়ালে টাঙানো দুটো মস্তবড়ো কুমীর দেখা যায়। ঘরের ঠিক মাঝখানে একটা সিংহ দাঁড়িয়ে। তার দরজার দিকেই নজর। একটুকরো রোদ্দুর তার জ্বলজ্বলে চোখের ওপর পড়ছে। যেন দরজা খুলে ঢুকলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে।

এ-ঘরটার পরেই লম্বা একটা অন্ধকার ঢাকা বারান্দা পেরিয়ে কতগুলো ছোটো ছোটো ঘরে থাকে বাড়ির কাজের মানুষেরা। সবাইকে চিনিও না আমি। তারা আমাকে ওখানে যেতে বারণ করে।

কাকিমার কাজের লোক মতিপিসিকে চিনি। হঠাৎ তার সাথে দেখা হল একদিন অন্ধকার বারান্দায়। পিসি বাঙাল দেশের মানুষ, ছুটে এসে আমায় ধরে ফেলল। খুব অবাক।

“তুমি এখানে একা একা কী কর? এইখানে একলা যাইতে নাই। পথ হারাইলে বিপদ! চলো আমার ঘরে।” বলে ওর ঘরে নিয়ে বসিয়ে তিলের নাড়ু আর নারকেলের তক্তি খেতে দিয়ে চানে যাবার আগে বলল, “আমি এখনই আইতাছি। আমার লগে যাইবা।” তারপর কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে ফিস ফিস করে বলল, “রাইতে বারান্দায় ভূত আসে, ছায়ারা হাঁটাহাটি করে। এখানে কি তোমার একা আসতে আছে!” বলে চানের ঘরে যেতেই আমিও একছুটে বারান্দা পার হয়ে একটা খোলা চাতালে পৌঁছে গেলাম। যার একধার দিয়ে নিচে যাবার একটা লোহার জং ধরা স্পাইরাল সিঁড়ি। সিঁড়ি বেয়ে সোজা গঙ্গার ধারে এই লুকোনো জায়গাটায়!

একেবারে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। প্রথমেই মনে হল এ কোথায় এলাম রে বাবা! বাড়ির পেছনের এই জায়গাটায় কেউ আসে বলে মনেই হল না। একতলার মেঝে প্রায় দু’মানুষ উঁচু বলে জানালা আরও উঁচুতে। পথ বলতে ঐ লোহার সিঁড়ি। দুটো মস্ত বড়ো গাছ দু’পাশে দাঁড়িয়ে মাঝের ঢেউ খেলানো মাঠটাকে পাহারা দিচ্ছে। এছাড়া আরও কত যে গাছ মাথা তুলেছে তার ঠিক নেই। ভিতের পরে উঁচু জমি থেকে পাঁচ-ছ’ফুট নিচের জমিতে নেবে যাবার পাথরের সিঁড়ি হয়তো আগে ছিল, এখন নেই। ক’টা পাথর ছড়িয়ে আছে। নিচের মাঠ থেকে ঢাল বেয়ে নেমে গেলে গঙ্গা।

জঙ্গল আর পাথরের স্তূপ-টুপ নিয়ে তৈরি চমৎকার জায়গাটাতে যে অনেক বছর কোনও মানুষের হাত পড়েনি বোঝাই যাচ্ছে। এদিকের চীনে বটের অজস্র বাড়ি ভাঙা একটা মন্দিরকে ঘিরে রয়েছে। ডানে বিশাল তেঁতুলগাছটাও প্রায় মাটি-ছোঁয়া। সেটা ডালপালা ছড়ানো মস্ত একটা ছাত যেন। পুরো ঢালু জমি ছোটো ছোটো ঘাস, আমরুল আর থানকুনিতে ঠাসা।

পাঁচ-ছ’ফুট কী করে নামা যায় ভাবছি। এমন সময় কে যেন বলল, “লাফ দে না একটা!”

লাফ দেব? কিন্তু লাগে যদি? কে যেন বলল কথাটা! এদিক ওদিক অবাক হয়ে চাইছি, তেঁতুলগাছের ঝুপসি তলাটা থেকে বেরিতে এল লোকটা। হাসি হাসি মুখে বলছে, “ভয় কী রে! মার এক লাফ। কিছু হবে না।”

লাফিয়ে নেমে গড়াগড়ি খেয়ে উঠতেই ও বলল, “বসবি তো চল গঙ্গার ধারে। লুকোনো জায়গা আছে। কেউ দেখতে পাবে না।”

ওর নাম পান্নালাল। আমি ডাকি পান্নালাল দাদা। ভারি চমৎকার দেখতে ওকে! আমার থেকে বয়েস বোধ হয় খানিকটা বেশি। কিন্তু থুতনিতে একটুখানি ফুরফুরে দাড়ি থাকায় বেশ লোক লোক দেখতে। মাথার চুল থেকে গা, জামাকাপড় সব হালকা সবুজ। মায় পায়ের জুতো, চোখের মণি সব সবুজ! মুখটা হাসি হাসি বলে ওর দিকে চাইলেই মন ভালো হয়ে যায়। ওর প্যাংলামতো শরীরে কী গায়ের জোর! আর মাথাটাও বুদ্ধিতে ঠাসা।

প্রথমদিন ওর সঙ্গে গপ্পো করতে করতে দিনের আলো কমে এক্কেবারে অন্ধকার হয়ে গেল। এবার বাড়ি যাব কী করে? ভূতের কথা ওকে বলতে আমার কপালে আঙুল ছুঁইয়ে দিয়ে বলল, “যা, আর ভয় নেই। এবার থেকে ভূতেরা তোর সাথে কথা বলবে, তুই ওদের দেখতে পাবি। ভূত বলে কি মানুষ নয় রে? খুব ভালো ওরা।”

বলতে না বলতে লম্বা সিড়িঙ্গেপানা একজন একগাল হেসে পাশে দাঁড়িয়েছে। ওর কাঁধে আবার চমৎকার দেখতে একটা বাঁদর। কালো-সাদায় কী যে সুন্দর তাকে দেখতে! লোকটা হাত ধরল আমার। বলল, “চলো, ঘরে রেখে আসি গা তোমায়।”

আমিও গুটি গুটি ওর হাত ধরে মায়ের ঘরে চলে এলাম। আশ্চর্য, একটুও ভয় করল না আমার!

সেই থেকে এ-বাড়ির আনাচে-কানাচে যত ভূত আছে সবাই আমার বন্ধু। লম্বা ভূতটার নাম মৃত্যুঞ্জয়। বাঁদরটার নাম হুপ। পান্নালাল নামটা একটু বুড়ো বুড়ো বলে ও বলেছিল, “তুই আমাকে পানুদা বলে ডাকবি। আমি তোর…” একটু থেমে বলেছিল, “বন্ধু।”

সেই থেকে ও রোজ আসে ঐ আশ্চর্য সময়টাতে। আমিও আসি, একা। ওর কথা বলিও না কাউকে।

খুব কাণ্ড হয়েছিল সেই প্রথমদিনে। ফিরতে ফিরতে সন্ধে। সবাই মিলে খোঁজাখুঁজি, কান্নাকাটি রব। আমায় না পেয়ে সবাই যখন হতাশ, তখন হঠাৎ মায়ের নজরে পড়ে গেলাম। মার বসবার ঘরের গ্র্যাণ্ড পিয়ানোটার ডালার ওপর দিব্যি ঘুমিয়ে আছি। জেগে উঠে মনেই পড়ল না কখন ওখানে গেলাম। তাই বলে কি ভাবছ ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছি? মোটেই নয়। এই তো আর একটু বাদেই ওখানে আসবে পানুদা। হুপ এসেছে আমায় ডাকতে। রোজ রোজ কি আর একই স্বপ্ন দেখা যায়? বিকেলের রং পালটাতে শুরু করেছে। এবার আসি।

মায়ের ঘরের পাশেই আমার ঘর সাজানো হল। কাকিমা ওর পুতুলের আলমারিটা এ ঘরে পাঠিয়ে দিয়েছে। কাকিমা তো মেমসাহেব, তাই ওর পুতুলরাও প্রায় সব বিদেশের থেকে নিয়ে আসা। এ-দেশি পুতুল বলতে কৃষ্ণনগর থেকে দাদুর কেনা তিরিশটা মানুষ-পুতুল। কী যে সুন্দর, কী বলব! পুরুতঠাকুর, মেছুনি, জাল ঘাড়ে জেলে, বাউল, বর-বৌ, কাঠুরে, চাষী, চাষী-বৌ, দাঁড় হাতে নৌকার মাঝি, বুড়োবুড়ি, মুচি, দর্জি তো আছেই। আর আছে সৈনিকের দল, একদল পুলিশ, আরও কত কী! আমি অবাক হয়ে চেয়ে দেখি, একটুও মনে হয় না ওরা পুতুল। ঠিক যেন এক বিঘত মাপের কতগুলো সত্যিকারের মানুষ। আমি যখন ওদের দেখি, ওরাও যেন আমার দিকে চেয়ে থাকে।

সাহেব-মেম পুতুলেরা আছে আলাদা তাকে। ওরাও সবাই একই মাপের। ওদের সাজপোশাক আবার কাপড় কেটে তৈরি। মাথার টুপি, পায়ের জুতো সবই আসলের মতো। পড়ার টেবিলের পাশে মস্ত বড়ো একটা গ্লোব রাখা আছে। সেটা দেখে দেখে দেশ চিনতে শেখালেন বাবা। প্রথমেই চিনে ফেললাম নিজের দেশটাকে। ম্যাপগুলোর পাহাড়ের জায়গা একটু উচু। সমুদ্রের তলাতেও উঁচুনিচু করে তৈরি জমি। কোন জায়গা কতটা গভীর, দেখলেই বোঝা যায়। গ্লোবটা রেখেছি জানালার কাছে। পাশেই ছোট্ট টেবিল-চেয়ারে আমার পড়ার জায়গা।

সেদিন ভোরে ঘুম ভাঙতেই দেখি, সেই চেয়ারে বসে বাবা গালে হাত দিয়ে গ্লোবটার দিকে চেয়ে আছেন। মনটা যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। আমি যে জেগে উঠেছি তা জানতেই পারলেন না! ছোটোবেলায় এটাই ছিল বাবার ঘর, ইচুদাদুর কাছে শুনেছি। বাবার কি ছোটোবেলার কথা মনে পড়ছে? বড়ো হয়ে গেছেন বলে মনখারাপ? বাবার জন্য কষ্ট হল আমার। বড়ো হয়ে গেলে বোধহয় দূরে চলে যাওয়া ছোটোবেলাটার কথা মনে পড়ে মনখারাপ হয় সকলেরই।

ইচুদাদু আজকাল মাঝে মাঝে আমার ঘরে এসে বসে থাকে। আমাকে গল্প-টল্প বলে। চাবির রিংটা কাঁপিয়ে হালকা ঝুম ঝুম শব্দ করে মাঝে মাঝে অন্যমনে। আমি কথাটা ওকে জিজ্ঞেস করতেই ও ঘোলাটে ছানিপড়া নজরে আমার দিকে চেয়ে রইল। দেখলাম ওর চোখের কোণে জল। তার মানে কথাটা সত্যি! ও কিছু না বললেও বুঝতে পারলাম। সব বড়োদেরই তো ছোটোবেলা আছে। ছোটোবেলা যখন দূরে চলে যায়, কষ্ট পায় সবাই।

পানুদা শুনে বলে, “ছেলেবেলা হারিয়ে যাবে কেন! বড়োরা মনের মধ্যে খানিকটা ছেলেবেলা পুষে রাখলেই পারে। বুড়োটে মেরে যাওয়া খুব বাজে ব্যাপার।”

ওর কোন বন্ধু নাকি বলেছে, বয়েস খানিকটা এগোলেই আবার একটু একটু করে পিছোতে হয়। তা হলেই ল্যাটা চুকে যায়। কথাটা খুব মনে ধরেছে আমার। ঐ বন্ধুর সাথে দেখা হলে বেশ হত!

আজকাল আমার কী যে হয়েছে! পান্নালালদাদা সেদিন কপালে ম্যাজিক করে দেওয়া বা আমার অসুখ যে জন্যই হোক অনেক দেখতেও পাচ্ছি, শুনতেও পাচ্ছি! সেদিন দুটো টিকটিকি দেওয়ালে কাছাকাছি বসে টিক টিক করছিল। আমি কান পেতে শুনি ওদের কথা হচ্ছে।

“তুই এদিকের দেওয়ালে এলি যে? তোর জায়গা তো কড়িকাঠের ওদিকে।”

“বেশ করেছি। তুই ওদিকে যাস না বুঝি?”

“সে তো আরশোলার বাচ্চাটা ওদিকে উড়ে গেল বলে।”

“আমার তাড়া খেয়ে মাকড়শার ছানাটা তোর দেয়ালে গেল কেন? তাই তো আসতে হল।”

“ঠিক আছে। খোকাবাবুকে বল দেয়ালে দাগ টেনে দিতে। ঐদিকটা আমার। এদিকটা তোর। তোর জায়গা তুই পাহারা দিবি, আমার জায়গাটা আমি দেখব!”

শুনেটুনে আমি দেয়ালে লাল পেনসিল দিয়ে দাগ দিয়ে দিতেই ঝামেলা বাধল। কে দেয়াল নোংরা করল? কে দাগ কাটল? আমি পালিয়ে বাঁচি না। বড়োরা বুঝবে কী করে, দাগটা দিয়েছি বলে একটা যুদ্ধ হতে পারল না।

পানুদাকে ব্যাপারটা বলার পর তো হেসেই গড়াগড়ি। বলল, “তোর গ্লোবে দেখবি অনেক দাগাদাগি রয়েছে। দেশগুলোর গায়ে গায়ে ওরকম দাগ টেনে মানুষরাও তো আলাদা থাকতে চায় রে। এটা যে বোকামি সেটা তাদের বোঝাবে কে? ছোটোরা বুঝলেও বড়োরা বুঝতে চায় না। যে যার দাগের মধ্যে বসে ফোঁস ফোঁস করে। বোকা, বোকা! আকাশ, মাটি, জল এগুলো কি ওরা বানিয়েছে? তা হলে এত আমার তোমার করে কেন? পাখিরা অনেক বুদ্ধি ধরে, ওসব দাগটাগ মানে না। মাছেরাও না।”

মৃত্যুঞ্জয় পাশেই ছিল দাঁড়িয়ে। সেও নাকি সুরে বলল, “আমরাও মানি না গো, পান্নালালদাদা। এই তো ভেনিজুয়েলা থেকে ঘুরে এলাম একটা জরুরি কাজে, পাশফোট-ভিসা কিছুই লাগেনিকো।”

ওর ঘাড় থেকে কিচমিচ করে হুপও সায় দিল। ওরও লাগেনি।

নীলমণিদাদু দুপুরবেলা বই পড়েন। আমিও না ঘুমিয়ে পালিয়ে গিয়ে জুটি ওর ঘরে। কাকিমার কাছে সকালে যা পড়েছি, বলি ওকে। ও বলে, “এবার আমাকে তোর ছাত্র মনে করে বুঝিয়ে দে।”

শোনো কথা! আমি ওর মাস্টার, ও ছাত্র! তাই করতে হয়। খুব দুষ্টু ছাত্র নীলমণিদাদু। এটা কী, ওটা কেন বলে বলে মাথা খারাপ করে দেয়। বলতেই হয় আমাকে। বলতে না পারলে অবশ্য দাদুই বলে দেয়। এই করে দুপুরবেলা কখন কেটে যায়। এ যেন নতুন একটা খেলা, পড়াশোনা বলতে যা বুঝি তার মতো নয়। পরীক্ষা বলে কিছু নেই। পাশ-টাশ নেই। দাদু বলে, “পরীক্ষা তো নিজেই নেবে নিজের!”

একদিন ইচুদাদুকে ধরে বসলাম। পড়তে হবে। আমি পড়াব। খানিক বাদে বোঝা গেল, ঘড়িতে দম দিতে দিতে ও নিজের দম ফুরিয়ে ফেলেছে।

সন্ধের পর আমার ঘরে এসে বসে থাকে ভূতের দল। আমি রং-টং নিয়ে ওদের ছবি আঁকতে বসি। মৃত্যুঞ্জয়ের কাঁধে হুপ বসে আছে আঁকার পর হুপের লাফালাফি দেখে কে! মৃত্যুঞ্জয় বেজায় লাজুক। ছবি দেখে খুব খুশি। তবে গায়ের রং কালো দেখে বলল, “একটু ফর্সা করে আঁকলেই পারতে।”

আরও কত ভূতপেত্নী যে এল লাইন দিয়ে! ছবির পর ছবি এঁকে আমার হাত ব্যথা হয়ে গেল।

একদিন আশ্চর্য কাণ্ড হল একটা। পান্নালালদাদা বলল, “তোদের বাড়ির বড়োরা নিজেদের বাড়িটাকেই ভালো করে চেনে না।”

বললাম, “চিনবে না কেন? চেনে বৈকি!”

ও আমার হাত ধরে ভাঙা মন্দিরের তলার দিকে চীনেবটের ঝুড়ি দিয়ে ঢাকা একটা ছোট্ট খোপ দেখিয়ে বলল, “এটা চেনে? তুই চিনিস?”

আমি অবাক হয়ে খোপটার দিকে চেয়ে রইলাম। মোটা মোটা বটের ঝুড়ি আর মাকড়শার জালের মতো শেকড়বাকড়ের আড়ালে অন্ধকার একটা চৌকো গর্ত। বোধহয় পাথর দিয়ে বন্ধ করা ছিল এতদিন, পান্নাদার ম্যাজিকে খুলে গেছে। পাশেই দেখছি পাথরটাকে। হামাগুড়ি দিয়ে আমরা ওর মধ্যে ঢুকতেই দেখি ওটা নিচে নেমে যাওয়া সুড়ঙ্গের মুখ!

কিছুটা নেমে যেতেই একটা গোল ঘরে পৌঁছে গেলাম। দেয়ালের একটা খোপ থেকে পাথর বার করে ঠুকে পানুদা একটা তেলের বাতি জ্বেলে দিতেই আলোয় দেখা গেল সবকিছু। ঘরটার চার দেয়ালে চারটে সুড়ঙ্গের সিঁড়ি ওপর দিকে উঠে গেছে। এ যেন গপ্পে শোনা সেই আলিবাবার দেখা ডাকাতদের গুহা। যেখানে ‘চিচিং ফাঁক’ বললে বন্ধ দরজা খোলে।

অবাক হয়ে পানুদার দিকে চাইতে ও বলল, “দেখছিস কী! চার-পাঁচশো বছরেরও আগে সাহেব ডাকাতরা এ গুহা বানিয়েছিল। ঝড় আর ভূমিকম্পে বাইরে যাওয়ার সবক’টা পথ বন্ধ হয়ে কেউ আর পালিয়ে যেতে পারেনি। তিনশো বছর আগে তোর বংশের পুরনো লোকেরাও পরের জমি কিনে বাড়ি বানায়। ওরা কেউ জানতেই পারেনি মাটির তলায় ডাকাতদের এরকম সুড়ঙ্গ কাটা আছে। এখনও জানে না তোর বাবা-কাকারা। তবে জানতে পেরেছিল একজন, বলেনি কাউকে। সুড়ঙ্গের মধ্যে ঘরও আছে কতগুলো!”

শুনতে শুনতে একটা খটকা লাগল আমার। যে-কথা কেউ জানে না, তা পানুদা জানতে পারল কী করে? ওকে সেকথা বলতেই ও মুচকি হেসে বলল, “ম্যাজিক! আমার আরও কত কী জানা আছে। সবকথা তোকে বলতে নেই। বড়ো হলে তুইও জানতে পারবি। তোকে সবক’টা সুড়ঙ্গ দেখিয়ে আনব!”

আমি ব্যস্ত হয়ে বললাম, “আমাদের বাড়ির একজন গুহার কথা জানে বললে, তার নামও বলবে না?”

মুচকি হেসে পানুদা বলল, “জানতে পারবি শিগগিরি। আমায় আর বলতে হবে না। দরকার আছে, তাই সুড়ঙ্গের খোঁজটা তোকে দিয়ে রাখলাম। কাজে লাগবে।”

একটু চুপ করে থেকে সিঁড়িটার দিকে হাঁটতে হাঁটতে আবার মুখ খুলল পানুদা, “সুড়ঙ্গে ঢুকে তুই ভয় না পেলে বুঝব কলজের জোর আছে! ভেতরের ঘরগুলোয় ঢুকলে তোর পিলে চমকে যাবে। আজ আর নয়, গঙ্গায় জোয়ার এলে এই গোলঘর চলে যাবে জলের তলায়।”

দেখলাম মেঝেতে ভেজা ভেজা ভাব। ফিরে আসতে হল। এর কথাও কাউকে বলা যাবে না।

খোপটার মুখ পাথর চেপে বন্ধ করে পানুদা বলল, “তোর পূর্বপুরুষরাও ডাকাত ছিল। তা জানিস তো?”

আমি শুনে একটু রাগ করতেই বলল, “আহা সব জমিদাররাই তো এককালে ডাকাত ছিল। তবে এরা ডাকাতি করত সাহেবদের জাহাজে। দেশ থেকে ওদের তাড়াতে চাইত।”

আমি মায়ের কাছে সাহেবদের অনেক গল্প শুনেছি। মোটেও তারা বিশেষ ভালো ছিল না। পানুদার কাছে শুনে-টুনে বললাম, “বেশ করত, ডাকাতি করত। নীলকর সাহেবরা বেঁচে থাকলে আমিও এদের কুঠিতে ডাকাতি করতে যেতাম। ধানচাষ বন্ধ করে চাষীরা নীল চাষ করতে রাজি না হলে সাহেবরা তাদের কুঁড়েঘরে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারত! শেকলে বেঁধে চাবুক মারত! চাষীদের কামানো মাথায় ভেজা কাদায় নীল গাছ পুঁতে দিত। গাছ মরে গেলেই মেরে ফেলত।”

পানুদা বলল, “খারাপ লোকেরা তাদের নিজেদের দেশেও করত অনেক খারাপ কাজ। তবে সবাই তো আর ওরকম খারাপ ছিল না। বেশ কিছু ভালো লোকও ছিল। তারা আসত ধর্ম প্রচার করতে, গরিবদের সেবা করতে আর লেখাপড়া শেখাতে। তাদের ওপর রাগ করিস না। আমাদের দেশের লোকরাই বা কী এমন ভালো? ভালো হলে, সাহসী হলে বিদেশি সাহেবরা আসতেই তো পারত না।”

মার ঘরে গিয়ে বসে বসে ছবি আঁকা দেখি। মস্ত বড়ো ক্যানভাসে আঁকতে আঁকতে মাঝে মাঝে গা ব্যাথা করে মার। বলে, “পিঠটায় কিলিয়ে দে তো বাবা।”

মৃত্যুঞ্জয়কে আমি এখন মিত্যুনদা বলে ডাকি। হুপকে কাঁধে নিয়ে ও-ও বসে বসে দেখে। মা তো ওদের দেখতে পায় না, তাই আমারও চিন্তা নেই। আমি মায়ের পিঠের কাছে বসে কিল মারতে থাকি। আমার দেখাদেখি হুপটাও ওর ছোট্ট ছোট্ট মুঠি দিয়ে কিলোতে থাকে। সে এক মজা!

মা সারাদিন ছবি আঁকতেই থাকে। আমার আঁকা ছবিগুলো দেখাব ভাবি, ভয় হয় যদি কাদের দেখে এঁকেছি বলে বসে! খুব বাজে ব্যাপার হবে তা হলে। ভূতেরাই তো বন্ধু আমার। কেন যে বেচারাদের দেখে সবাই ভয় পায় কে জানে।

মার ছবিটা আস্তে আস্তে আঁকা শেষ হচ্ছে। নীল সমুদ্রের ধারে আশ্চর্য সুন্দর একটা দ্বীপের ছবি। দূরে দূরে কতগুলো পাথর জলের ওপর মাথা তুলেছে। বড়ো বড়ো ঢেউ ভেঙে পড়ছে তার গায়ে, যেন ফেনার সাদা কেশর বাতাসে ওড়ানো পাগলা ঘোড়ার দল। সোনালি বালির চরে গড়ানো ঢেউয়ের গায়ে ফেনার জালের আঁকিবুকি। চাঁদের আলোয় পুরো ছবিটা স্বপ্নের মতো। কী যে ভালো লাগল!

গালে তুলির পেছনটা ঠেকিয়ে মা কী যেন ভাবছে। আমার এ-ছবিটা খুব চেনা লাগল। পান্নালালদাদার কাছে তো শুনছি এই দ্বীপের গল্প! মার কানে ফিসফিস করে বললাম, “আকাশে ওড়া কাকাতুয়ার দল কই? পাথরের ওপর জলপরি নেই কেন! মাস্তুল-ভাঙা নৌকো যার মকরের মতো মুখ, বালিতে কাত হয়ে নেই তো! আর বনের মধ্যে পথটাও তো আঁকনি। রঙিন ঝিনুক আর মাছের রঙিন আঁশ বিছানো সেই পথে আলো পড়লে ঝলমল করে হাজার রং। কই সেগুলো?”

মা অবাক হয়ে চেয়ে রইলেন আমার দিকে অনেকক্ষণ। তারপর এক চোখে জল আর এক চোখে হাসি নিয়ে জড়িয়ে ধরলেন আমাকে। একসাথে এত চুমো বোধ হয় কোনওদিন খাননি আমায়।

গরমের দিন কেটে গিয়ে বৃষ্টি এল। আকাশে মেঘের দৌড় দেখি জানালার ধারে চুপচাপ বসে। দেয়ালে মার আঁকা ছবিটা টাঙানো হয়েছে। মা বলেছে, “ছবিটা আমার হতে পারে, স্বপ্নটা তোর। আমার কাছে এসে তোর স্বপ্নের কথা বলবি; তুই আর আমি দু’জনে মিলে এঁকে ফেলব ঠিক।”

মনে মনে আমি শক্ত হয়ে যাই। আসল কথাগুলো ফাঁস হয়ে গেলে চলবে না। মৃত্যুঞ্জয়দাদা ঠোঁটে আঙুল দিয়ে আমায় চুপ করিয়ে রাখে। হুপটা যা দেখে তাই নকল করতে যায়। ওরও দেখি ঠোঁটে আঙুল! একদিন ওর সামনে অঙ্ক করতে বসব। দেখি ওটা কী করে! পারে বটে ব্যাটা। আমার খাতার চারটে কাঠি আর একটা আলু এঁকে আমার দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে কী নাচ! ওটা নাকি আমি। ওর আপন দেশ নাকি মাদাগাস্কার। আফ্রিকার পাশে। ঠিক মায়ের পাশে বাচ্চার মতো শুয়ে আছে।

পান্নালালদাদা আমাকে সব গল্প করে বলে জানতে পারি। খুব বাদলার দিনেও চলে আসে এ-বাড়ির চিলেকোঠায়। ওখানে আমার লুকোনো ঘর হয়েছে একটা। ভাঙা সিঁড়ি দিয়ে আমি ছাড়া যায় না কেউ, খবরও রাখে না। তাই বিকেল ফুরিয়ে এলেই চলে আসে পানুদা। ঘরটার সবুজ পায়রারা বাসা বেঁধেছে। একটু নোংরা করে বটে, কিন্তু বাসায় বসে বসে কত ডিম পাড়ে। সেই ডিম ফুটে ছানা হয়। এককোণে মস্ত মৌচাক ঝুলে আছে কতদিন ধরে। মস্ত বড়ো চিলের ঘরে তাই সবসময় মৌমাছিদের গুনগুন শব্দ শোনা যায়। ভারি ভালো লাগে আমার। ঠিক যেন কেউ তানপুরার তারে সুর ভাঁজছে। পানুদা যখন আসে তখন কিন্তু ওরাও চুপ করে যায়।

গ্লোবটা এ-ঘরে এনে রেখেছি। খোলা জানালা দু’পাশে। তাই দিনরাতের আলো পড়ে গ্লোবের গায়ে। যেন আসল পৃথিবীর বাচ্চা মনে হয় ওকে। জ্যান্ত! হুপকে বলা আছে ওকে আস্তে ঘোরাতে। মেরুদুটোয় হাত দিলে ঠান্ডা লাগে। কেমন গা ছমছম করে! দেখতে দেখতে কেমন ঘোর লেগে যায়। গ্লোবে নাক ঠেকিয়ে আতসকাচ দিয়ে মনে হয় কারা নড়ছে। সমুদ্দুরের জলে ঢেউ দিচ্ছে। জাহাজ ভেসে চলেছে। সাহারায় গাল ঠেকিয়ে গরম গরম মনে হয়েছে কতবার!

একটু বড়ো হয়েছি আমি। ডাক্তারদিদি সেদিন আমায় দেখে খুশি। মাও পাশে ছিল। বলল, “ওষুধ কি খেতে হবে আরও?”

নতুন করা মাথার সিটি-স্ক্যানটা মন দিয়ে দেখতে দেখতে দিদি বলল, “আর মাসদুয়েক খাবার পর ওষুধ বন্ধ।”

ভালোই হল। এখন আমার বয়েস সাত বছর দশ মাস তিনদিন। আট বছর বয়স পুরো হয়ে যাবে। বড়ো হয়ে যাব আমি। নীলমণিদাদু বলেছে, আট পুরো হলে আমায় ঘোড়ার পিঠে চাপিয়ে দেবে। বাবাকে বলে দেখেছি, বাবাও রাজি। শুধু কাকিমা বলেছে, “হি ইজ টু ইয়ং অ্যান্ড থিন!”

বড়ো হলে আর বলতে পারবে না। ছ’মাস আগে ঘোড়ার ছানা হয়েছে একটা, ধপধপে সাদা রং। বড়ো বড়ো কেশর। চোখের পল্লবগুলো অ্যাত্ত লম্বা লম্বা। চোখদুটো যে কী সুন্দর!। আমার সাথে খুব ভাব। ও বড়ো হলে ওর পিঠেই চড়ব বলেছি ওকে। বলতেই খুশি হয়ে একছুটে গলফের মাঠটায় দু’চক্কর দিয়ে আমার পিঠে নাক ঘষতে লাগল। ভাবখানা হল, এখুনি চড়ো না।

মাঝে মাঝে ভাবি, ছ’মাস আগে যখন শহর ছেড়ে গঙ্গার ধারের এই বাড়িটায় থাকতে এলাম তখন আমি ছিলাম একা। অসুখের জন্য খিটখিটে মেজাজের একটা বাচ্চা ছেলে। স্কুল থেকে যার নামে কত নালিশ করা হত! এখানে এখন আমার কত বন্ধু! আমি ভালো হয়ে উঠছি বলে বড়োরাও খুশি।

তবে সবচেয়ে বড়ো বন্ধু পান্নালালদাদা। ও একজন যাদুকর! কত কী করতে পারে, মনের কথা বুঝতে পারে। চমৎকার বাঁশিও বাজাতে পারে। আমাকে শিখিয়ে দেবে বলেছে। আমি যে এখন পাখি, ঘোড়া, টিকটিকি, পিঁপড়ে থেকে বাঘ, বেড়াল, কুকুর, সক্কলের কথা বুঝতে পারি তা তো পান্নালালদাদার জন্যই। মাকে ওর কথা বলতে পারি না এটাই আমার দুঃখ। মাঝে মাঝে মনে হয় বড়োদেরও তো ছোটোবেলা ছিল আমার মতোই, ওদের সাথে পান্নালালদাদার দেখা হয়নি কখনও? হয়তো বলা বারণ বলে ওরাও চুপ করে থাকে।

পানুদা বলে, ভালোবেসে কথা বললে ছবিরাও জীবন পায়, কথার উত্তর দেয়। কান পেতে শুনলে ইট-কাঠ-পাথরও কত গল্প বলে। বন্ধু হয়ে যায়! ভালোবেসে পড়লে বইতে লেখা গল্প চোখে দেখা যায়। অবাক হয়ে শুনি!

সেদিন রাত্তিরে ঘুম ভেঙে গেল। তখন অনেক রাত। দু’দিন ধরে বৃষ্টি হয়েই চলেছে। আলমারির দিক থেকে কাদের যেন কথা শোনা যাচ্ছে। প্রথমে মনে হচ্ছিল মৌমাছির গুনগুন বুঝি, তারপর লাঠি দিয়ে কাচের ওপর ঠুকবার চিনচিন আওয়াজ। লাফিয়ে উঠে আলমারির পাল্লা খুলতেই পুতুলের দল লাফিয়ে নেমে এল আমার বিছনায়। পৈতে গলায় পুরুতঠাকুরটি রাগী রাগী গলায় বলল, “কবে থেকে ডাকছি শুনতে পাও না?”

সাহেব-পুতুলগুলোও নিজের নিজের ভাষায় কিচিরমিচির করতে লাগল। আমি অবাক হয়ে ওদের কাছে মুখটা নিয়ে যেতেই ফের বকুনি। “একটু ধুলো-টুলো পরিষ্কার করতে পার না! আলমারিতে বন্ধ করে রাখলেই হল?”

আমি বললাম, “ভুল হয়ে গেছে খুব। কালকেই ঝাড়ু দেয়া হবে।”

গিন্নিবান্নি ঘাড় নাড়া মোটাসোটা পুতুল বলল, “ও ছেলেমানুষ, ও পারে? আমি করে দিচ্ছি।”

তারপর ছোট্ট ঝাঁটা আর মেমসাহবদের লাঠি লাগানো ব্রুম দিয়ে সে কী ঝাড় দেবার ধুম! ছেলেগুলো দেখলাম নিষ্কর্মা। সব পালিয়েছে একদিকে। ঝাড়ুদারও পালায় দেখে পুরুতের সে কী তম্বি! “অ্যাই, তুই যাস কোথা! তোরই তো কাজ এটা। মাইনে পাস না? ফাঁকিবাজ কোথাকার!”

সেও রুখে দাঁড়িয়েছে। “কে দিচ্ছে মাইনে শুনি? দুশো বচ্ছর ধরে সব মাইনে বাকি!”
“কেন? মিউনিসিপ্যালিটির ক্যাশিয়ার কোথায় গেল? মাইনে দেয়া তো ওর কাজ।”
“আরে, তাকে তো চালাকি করে তৈরিই করেনি কারিগর! পাছে মাইনে দিতে হয়।”
“তাই বলে নিজের কাজটা অন্যকে দিয়ে করাবি?”
“তুমিও তো দুশো বচ্ছর পুজো-আচ্চা করছ না! নিজের চরকায় তেল দাও তো।”
“যজমানদের বানায়নি যে। পুজো করব কার জন্য? দক্ষিণার পয়সা, চাল-কলা দেবে কে?”
“তবে আমিই করব পুজো।”
“তুই ব্যাটা ডোম, তুই পুজো করবি! জাতধর্ম গেল তো! আর বামুন ছাড়া পুজোর হক নেই কারও।”
“অ্যাঁ! বড়ো জাতের বড়াই যে। বামুন হয়ে মাথা কিনে ফেলেছ নাকি? দেব এক ঝ্যাঁটার বাড়িতে তোমার বামনাই ঘুচিয়ে! বলি, তোমার ভেতরে যে মাটি আমারও তো তাই!”

পুতুলরা ক্ষেপে গিয়ে দু’দলে ভাগ হয়ে তড়পাতে লেগেছে দেখে ওপরের তাক থেকে এক চার্চের ফাদার, “আমেন, আমেন, করেন কী স্যার!” বলতে বলতে তাদের মাঝে এসে দু’হাত তুলে দাঁড়াল। তার দলের জনাচারেক ব্রাদার, মানে ফাদারের পোঁ ধরা লোক, ভাগাভাগি হয়ে ঢুকে দুটো দলকেই কীসব বোঝাতে লাগল।

পেছন থেকে গম্ভীর গলায় আজান দিতে দিতে মৌলবি এসে দাঁড়াল। সাহেব পাদ্রী দেখে তার মেজাজ খারাপ। চিড়বিড়িয়ে উঠল সে, “তুমি আবার এদের মাঝে এসে দাঁড়ালে কেন? লড়াই বাধিয়ে মাঝ থেকে আখের গোছানো বার করছি! সব্বাইকে খেষ্টান করবার মতলব।”

কোথায় ছিল এক তিলক কাটা টিকিধারী গেরুয়া পরা পাণ্ডা। এসে লম্ফঝম্প শুরু করে দিল। “আমরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান। তিন নম্বর ফুলের দরকার নেই, বৃন্তে জায়গা কম। তোমরা বিদেশের লোক বিদেশে যাও। আমরাই বলে করেকম্মে খেতে পাচ্ছি না শঙ্করা এসে জুটেছে! পালাও বলছি কালাপানির ও-পাড়ে।”

গোলমাল কমার চেয়ে বেড়েই উঠছে দেখে আমি তো আমি, পাশে দাঁড়ানো ভূতের দলও দেখছি ভয় পেয়ে গেছে! বড্ড ঝগড়াটে তো এরা! একসাথে থাকতে পারেই না।

মেছুনি-জেলেতেও লেগেছে গোলমাল। জেলে কেন মাছ ধরেনি, মেছুনি কেন দাঁড়িপাল্লা আনেনি এই নিয়ে নতুন গোলমাল। মাথা নাড়া বুড়োবুড়ি বসে আছে বলে পালাতেও পারছে না, ঝগড়াও করতে পারছে না। বেজায় মোটা বলে এমনিতেই মাথা ছাড়া আর কিছু নড়ে না তাদের। তাই বসে বসেই তারা বিড়বিড় করছে। মাথা দুলছে, তাল মিলিয়ে ছড়া বলছে।

বিপদতারণ মধুসূদন
বন্ধ করো নাচন কোঁদন,
স্বস্তিমতো থাকতে চাই
ঝগড়া করে শান্তি নাই।
চেঁচালে গলা ভাঙবে তোর
পড়বি নাকি গায়ের ওপর!

দেখতে দেখতে খট খট শব্দ করে পুলিশ, বরকন্দাজ আর সৈনিকের দল নেমে এসে ঘিরে ফেলেছে। তাদের আবার অসুবিধে হল। পুতুলের কারিগর দারোগা বা সেনাপতি তৈরি করেনি। কাজেই হুলুস্থুলু বাড়ল বৈ কমল না।

মৃত্যঞ্জয় ফিস ফিস করে আমার কানে কানে বলল, “সেই কবে পুতুলনাচ দেখেছিলাম ছেলেবেলায়। বুড়ো হয়ে মরে ভূত হয়ে এই আবার দেখলাম বিনিপয়সায়!”

আকাশে আলো ফুটেছে দেখে গোলমাল থামিয়ে পুতুলরা সব যে যার জায়গায় ফিরে গেল। ভূতেরাও গেল। ঘরে আবার আমি একা। বাইরে বৃষ্টি পড়েই যাচ্ছে যেমনকে তেমন। কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লাম।

সকালবেলা মা শুধু বলল, “তোর ঘরে বড়ো ইঁদুরের উৎপাত! সারারাত কিচিরমিচির, খুটখাট। বেড়াল পুষতে হবে।”

শুনে বললাম, “ইঁদুর মারা চলবে না কিন্তু, তাকে বলে দিও।”

আমি দেয়ালে নোটিস লিখে টাঙিয়ে দিলাম – মশা, মাছি, ইঁদুর, বাঁদর কিছুই মারা চলবে না। মারলে ফাইন দিতে হবে, অথবা জেল।

মাকে বললাম, “ওগুলো আমার পোষা ইঁদুর। রাতে আসে আমার কাছে, সকাল হলে চলে যায়।”

শুনে মা অবাক চোখে ভুরু উঁচিয়ে আমার দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে হেসে বলল, “যত পাগলামি! পাগল ছেলে কোথাকার।”

মার কাছে আর কতদিন সত্যি কথাগুলো না বলে থাকতে পারব কে জানে?

বৃষ্টির দিন বলে নীলমণিদাদুর খুব আনন্দ। টালির চালের কোণগুলো দিয়ে জল পড়ে বৃষ্টির সময়। নল-বসিয়ে আট কোণের সমস্ত জল একটা নল দিয়ে বয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছে। নালা দিয়ে সেই জল যায় মাটির তলাকার মস্ত ট্যাঙ্কে। সারাবছরের জল জমা থাকে সেখানে। এটা তো সবাই জানে, দেখে। যা জানে না তা হল, ও একটা ছোট্ট যন্তর বানিয়েছে। বলল, নাম হল জলবিদ্যুৎ যন্ত্র। জলের তোড়ে কী একটা চাকা ঘোরে, তা থেকে ব্যাটারি চার্জ হয়। তাই দিয়ে আলো জ্বলে, পাখা চলে, ওর কারখানার মেশিনও চলে। কতরকম অদ্ভুত যন্ত্র যে তৈরি করে দাদু, বলবার নয়। ঘোড়াদের গা চুলকোবার যন্ত্র, চুল কাটার যন্ত্র, ছোটো ছোটো ট্র্যাক্টর। বলেছে, একটা রেলগাড়ির ইঞ্জিনও বানাবে। আমি নাকি ওর সাগরেদ। সাগরেদ মানে অ্যাসিস্ট্যান্ট। কী যে মজা, কী বলো! কেউ জানেই না আমাদের এই কারখানার কথা।

ইঞ্জিনের কথায় আমি লাফিয়ে উঠলাম। বললাম, “আমরা চড়তে পারব তো?”

একগাল হেসে দাদু বলে, তা হলে নাকি সবাই জানতে পেরে যাবে। বড়ো করে বানাতে হবে তো চড়তে হলে। তৈরি হবে ছোট্ট ইঞ্জিন। পুতুলরা চড়বে, আমরা দেখব। তাই সই। পুতুলদের ভাগ্য দেখে হিংসে হল একটু। লাইন পাতা হবে কোথায়? স্টেশনের নাম কী হবে? কতদূরে যাবে ট্রেন? স্টেশন-মাস্টার কে হবে? আমার মুখে এসব শুনে নীলমণিদাদু বলল, “তার চাইতে বড়ো কথা হল, অত লোহা পাব কোথায়। লোহা গলানোর ফার্নেস তৈরি করতে হবে। অ্যালুমিনিয়াম আর টিনও চাই।”

খোঁজ শুরু হয়ে গেল আমাদের। আস্তাবলের থেকে একটু দূরে ভাঙা লোহালক্কড় রাখার ঘর। নয়নদা আর রাধুদার কাছে খবর পাওয়া গেল। জানাই ছিল না বড়ো বড়ো শিরীষ আর নিমগাছের আড়ালে আবার এরকম ঘর আছে একটা। ফার্নেসটা দাদু ওখানেই বানিয়ে ফেলল। সূর্য থেকে বিদ্যুৎ নেয়ার জন্য তার ছাদে বড়ো বড়ো সোলার প্যানেল বসিয়ে মাটির তলায় বেশ ভালো ফার্নেস হল। লোহা পিটিয়ে আর গলিয়ে একশো চাকা যেদিন তৈরি হল, নীলমণিদাদু, আমি আর দুই দাদার নাচ দেখে কে! সন্ধেবেলা পানুদা, মৃত্যুনদারাও এসে দেখে গেল চুপিচুপি। যত রাজ্যের ফেলে দেওয়া কৌটো আর ফয়েল থেকে পাওয়া গেল অ্যালুমিনিয়ামের চাদর।

আটটা কামরা, গার্ডের কামরা, কয়লা বওয়া ছাদ খোলা কামরার শেষে তৈরি হল ইঞ্জিন। সেই আগেকার দিনের কয়লায় চলা ইঞ্জিন! চিমনি দিয়ে যার ধোঁয়া বার হয়। কী চমৎকার যে হল, কী বলব! ছাঁচ বসিয়ে গলানো লোহা ঢেলে লাইন তৈরি চলতে চলতে আমরা দেয়ালের গায়ে গায়ে রাস্তাও পেয়ে গেলাম। ঘন ঝোপঝাড়ের মধ্যে দিয়ে সে-পথ কারও নজরে পড়ার উপায় নেই। পড়লও না। হুপকে দেয়া হল ড্রাইভারের চাকরি, গার্ড হল নকুল বলে সবচেয়ে কচি ভূতটা।

পাইনকাঠের স্লিপারের ওপর লাইন পেতে গাড়ি সাজিয়ে একদল ছুঁচো ইঁদুরদের প্যাসেঞ্জার সাজিয়ে রেলগাড়ি ছাড়ল একদিন। বড়ো বড়ো গাছের গুঁড়ির পাশ কাটিয়ে দুটো টানেলের ভেতর দিয়ে ব্রিজের ওপর দিয়ে গঙ্গার নালা পেরিয়ে সে কী চমৎকার চলল যে!

একটা মাঝারি ঢিবিকে পাহাড় বানিয়ে তাতে পাক খেয়ে ফিরে এল গাড়ি। প্রথম চলন একটু বাঁদুরে মতে হাওয়ায় একটু আধটু ঝাঁকুনি লাগলেও সবাই খুব খুশি।

নাম দেয়ার ব্যাপারে মতামত নিয়ে দেখলাম, কাজটা বেশ শক্ত। দাদুর অনেক বিদ্যে, ওর ওপরেই ছাড়লাম। ছুঁচো-ইদুঁরদেরও দেশ দেখা হল, শিক্ষাও হল আশা করি। ভ্রমণ শিক্ষার অঙ্গ, নীলমণিদাদুই বলেছে।

মুশকিল হল স্নো হোয়াইটকে নিয়ে। ঘোড়ার ছানাটার ঐ নাম পড়েছে ইদানিং। রেল ছুটলেই সেও ছুটবে পাশে পাশে। ইঞ্জনের বদলে চিঁ-হি-হি-হি করে ওই হুইশেল দিচ্ছে। কী আপদ রে বাবা! অ্যাক্সিডেন্ট করবে নাকি? দাদু বলেছে, “সামনে হর্স ক্যাচার বসিয়ে দিচ্ছি, ভয় নেই। তাছাড়া অ্যাক্সিডেন্ট হলে ওর কিছু হবে না, ক্ষতি হবে গাড়ির।”

গাড়ির নাম হল কু-ঝিকঝিক। প্রথম স্টেশন নাম পেল চিঁহিহি, আস্তাবলের কাছে বলে। শেষ স্টেশন হল ঘুড়লটিলা। টানেল দুটোর নাম হল একানল আর ব্যাঁকানল। নালার নাম গঙ্গুনালা আর ব্রিজ হল কার্তবির্জার্জুন। বানান-টানান ঠিক করে লিখে আনলাম আমি। ছোট্ট স্টেশনদুটো দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়! প্রত্যেক সপ্তাহে একদিন করে চলতে লাগল কু-ঝিকঝিক।

*****

ভয়ংকর বিপদ! বাড়ির পুরনো ম্যানেজার সনাতনবাবু হঠাৎ ভ্যানিশ! অনেক খোঁজাখুঁজি করেও কোথাও পাওয়া গেল না তাঁকে। এমনিতে মাঝে মাঝে শহরে কাজে যাওয়া ছাড়া বাইরে বিশেষ যেতে দেখা যেত না তাঁকে। থাকতেন একতলার পুরনো কাছারিঘরের পাশেই একটা ছোটো ঘরে। বাবা শহরে গিয়ে খোঁজখবর করে পুলিশে খবর দিয়ে এলেন। তারা এসে সারা বাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখার পর না পেয়ে ছবি দিয়ে ইস্তেহার ছাপাল। বাড়ির সবাই গম্ভীর। যত দরকারি কাগজপত্তর নাকি ওঁর কাছেই থাকত। ওগুলো না পেলে খুব বিপদ। বিপদের ওপর বিপদ, সনাতনবাবুর সাথে সাথে নাকি সেগুলোও হাওয়া! দিনরাতের পাহারাদাররা বলল, কেউ তাঁকে যেতে দেখেনি!

সকলের নামে নালিশ করত বলে লোকটাকে আমার ভালো না লাগলেও ওঁর জন্য আমারও মনখারাপ হল খুব। আমিও খুঁজে দেখলাম এখানে ওখানে। লোকটার আপন বলে তো কেউ ছিল না। পুলিশের লোক এসে বাড়ির কাজের লোকেদের ডেকে ধমক-ধামক দেবার পর পুলিশের ওপর রাগও হল খুব। ওরা ইচুদাদু আর নীলমণিদাদুকেও ছাড়েনি। অত বুড়ো হুকুম সিংকেও না! মোটা দারোগাটা আমাকে দেখে যেই একগাল হেসে ভুরু নাচিয়ে বলেছে, “খোকা, তোমার নাম কী?”

আমি দুম করে বলে দিলাম, “বলব না।”

তখন মস্ত ভুঁড়ি দুলিয়ে কী তার হাসি! কোনও কম্মের নয়, খালি বড়ো বড়ো কথা। যাই হোক, কোথাও পাওয়া গেল না সনাতনবাবুকে। নীলমণিদাদুও কেমন যেন হয়ে গেছে আজকাল। আগেকার সেই হাসিখুশি ভাবটা নেই। আমার কেমন মনে হয়, ও-ই খুঁজে বার করতে পারে সনাতনবাবুকে। এই বাড়ির মধ্যে ওর মতো বুদ্ধি তো কারও নেই! দেখলেই টের পাওয়া যাচ্ছে, দাদু খুব চিন্তায় আছে।

বৃষ্টির দিন শেষ হয়ে এল। গোবর্ধনদাদু, সুদামকাকা আর বংশীকাকার এখন অনেক কাজ। গলফের মাঠে মোয়ার চালানো, আগাছা পরিষ্কার করা, নতুন নতুন গাছ লাগানো, এরকম কত কাজ। গাছ লাগাতে ভালো লাগে বলে আমিও সঙ্গে থাকি, হাত লাগাই। আগাছাগুলো ফেলে না দিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে ওগুলো রেল-লাইনের ধারে ধারে আর গঙ্গার ঘাটের পাশে পুঁতে দিই। কোনও গাছ কি ফেলতে আছে!

সনাতনবাবুর কথা কেউ আর মুখেও আনে না। লোকটার কথা বোধ হয় বাড়ির সবাই ভুলেই গেল! বাবা আর কাকা খুব ব্যস্ত হয়ে সকাল সকাল বেরিয়ে যায় রোজ। মা বলে, “ওরা শহরে যায়। হারানো কাগজপত্তর খুঁজে পাওয়া না গেলে নাকি খুব বিপদ! তাই ওরা খুব ব্যস্ত।”

কী আর করি, আমি একা একা নিজের মনে থাকি। রোজ রোজ বৃষ্টি, ভালো লাগে না ছাই।

পানুদাকে বলে দেখেছি সনাতনবাবুর কথা। ও বলে, সময় হলে নাকি সব জানা যাবে। ও ওর ম্যাজিক করে খুঁজে আনলেই তো পারে! বুঝি না বাপু!

বৃষ্টির দিন গিয়ে শরৎকাল এল। পুজো হয় বাড়ির ভেতরকার উঠোনে শামিয়ানা টাঙিয়ে। পাশেই ঠাকুরদালানে কাঠামোর ওপর খড় বাঁধা হচ্ছে। পুজোর সময় কত লোকজন আসবে ভেবেই আনন্দ হচ্ছে! লক্ষ্মীপুজোর দিন আমার বয়স হবে পুরো আট! বড়ো হয়ে যাব!

সক্কালবেলা থেকে ঠাকুরদালানে ঘুরঘুর করি। রথের দিন কাঠামো পুজোর পর খড় বাঁধা। এরপর যেটা হয় তাকে বলে একমেটে। গঙ্গার ধারের এঁটেল মাটি তুলে এনে পাটের কুঁচি, খড়ের কুঁচি, গোবর আর গুড় মিশিয়ে দুই পালোয়ান তার ওপর নাচানাচি করে মাটি তৈরি করে।

মা আর কাকিমা মাঝেমাঝেই এসে দেখে যায়। মেমসাহেব কাকিমা সেই প্রথম থেকে পুরো ব্যপারটা মুভি ক্যামেরায় তুলে রাখছে। শুধু রাত্তিরে বন্ধ থাকে ক্যামেরা। রং দেয়া শেষ হওয়া অবধি এটা চলবে।

মায়ের ঘরে ঠাকুরের পেছনে থাকা ময়ূরের পেখমের মতো চালিটা খাড়া করে রাখা। এটা মা নিজের মনের মতো করে আঁকে। আমি বসে বসে দেখি। নীল চালির মাথায় আঁকা মহাদেব নন্দী-ভৃঙ্গীকে পাশে নিয়ে বসে আছে। নরম তুলিতে তার টানা টানা চোখ, হাসি হাসি মুখ। জটা থেকে গঙ্গা নেমে নিচ পর্যন্ত এঁকে বেঁকে বয়ে যাচ্ছে। তার দু’পাশে ঘরবাড়ি, গাছপালা, আকাশে সাদা মেঘ। উড়ন্ত পাখি আর কাশফুল আঁকতেও ভোলেনি। আঁকবার সময় মায়ের মুখটাই দুগ্‌গাঠাকুরের মতো লাগে!

নীলমণিদাদু হঠাৎ একদিন বলল, “কারখানায় বিশ্বকর্মা ঠাকুরের পুজো করি আয়। সমস্ত যন্ত্রপাতির দেবতা হলেন বিশ্বকর্মা।”

কিন্তু ঠাকুর তৈরি করবেন কে? কারিগরের কাছ থেকে তৈরি মাটি চেয়ে আনা যায়। কারিগর দুর্গাঠাকুর বানাতে ব্যস্ত, তিনি কি বিশ্বকর্মার মূর্তিতে হাত লাগবেন?” নীলমণিদাদু কী যেন ভাবতে ভাবতে বলল, “ইচু মিঞাকে ডেকে আন। ওর ছোটোবেলায় পুতুল বানানোর শখ ছিল! ও বুড়ো হলেও ঠিক পারবে।”

ইচুদাদুর ঠিক দু’দিন লাগল। মাটি নয়, মূর্তি তৈরি হল লোহালক্কড় আর যন্ত্রপাতি জুড়ে। দেখতে অনেকটা রোবটের মতো। হাতিটাও যন্ত্রে তৈরি। পুজো করবেও ইচুদাদু! বুড়ো মানুষ, চাবির মস্ত রিং পিঠে ঝুলিয়ে ঝুমঝুমিয়ে ঘুরে বেড়ায়। ঘড়িতে চাবি দেয়া আর বন্ধ দরজার তালা খুলে দেয়া, বন্ধ করার কাজ করে। ওকে পড়াতে গিয়ে ভেবেছিলাম দম ফুরোনো পুতুল। তার পেটে পেটে এই বিদ্যে! বিশ্বকর্মা পুজো হয়ে গেল।

বৃষ্টি কমে যাওয়ার পর আবার পান্নালালদাদার সঙ্গে রোজ দেখা হচ্ছে। ইচুদাদুর কথায় ও বলল, “গরিব বলে এদের পড়াশুনো হয়নি। হলে কত বড়ো বিদ্বান হতে পারত ভেবে দ্যাখ। বড়ো হয়ে গরিব ছেলেমেয়েদের জন্যে পড়ার ব্যবস্থা করে দিস। নীলমণিদাদু নাকি আসলে মস্ত বড়ো ইঞ্জিনিয়ার। তোদের এখানে পরিচয় লুকিয়ে আস্তাবল দেখাশুনো করছে। পরে জানতে পারবি সব, এখন বলিস না কাউকে। জানবার সময় হলে বলব। অনেক বড়ো রহস্য লুকিয়ে আছে ওর পেছনে। তোর নীলমণিদাদুকেও বলবি না কিছু।”

হঠাৎ মনে হল, এর কথা ও জানল কী করে? আমার মুখ দেখেই বোধ হয় মনটা পড়ে নিয়ে হাসি হাসি মুখে বলল, “আমি যে যাদুকর! যাদুকরদের কত কিছু জানতে হয়!” তারপর একটু গম্ভীর হয়ে বলল, “সাবধানে থাকিস, বিপদ আসছে।”

কাকিমার কাছে যেদিন অঙ্কে পুরো একশোতে একশো পেলাম, ইংরাজিতে আটানব্বই, কাকিমা জড়িয়ে ধরে খুব আদর করে পুজোয় কী চাই জিজ্ঞেস করলেন। আমি বললাম, “ভালো একটা মুভি ক্যামেরা।”

“আর কী চাই?”

বললাম, “পরে বলব।”

সেদিন ডাক্তারদিদিকে আমার খাতা দেখিয়ে ফিস ফিস করে বলল, “প্রডিজি! ক্লাশ এইট-নাইনের অঙ্ক করতে দিয়েছিলাম ভুল করে।‌ সব কারেক্ট!”

আড়াল থেকে শুনতে পেলাম আমি! আসলে আমি তো পাইনি। একশোতে একশো পেয়েছে নীলমণিদাদু! দাদু তো লুকিয়ে লুকিয়ে পড়ায়, বই খোলে না। খাতাকলম ধরতেও বলে না, পরীক্ষার নম্বর এসবের গপ্পো নেই। তবুও কেমন হয়েই যায় পড়া। কী করে বোঝাই বড়োদের বন্ধ ঘরের অন্ধকারে মোটা মোটা বই, ভয় দেখানো মার্কশিট, ভীষণ বাজে রাগী আন্টিদের ক্লাশে আমার পড়া হবেই না। পড়ায় আবার ইংরেজিতে! বাংলা বলতেও দিত না ওখানে। মাথায় স্কেলের বাড়ি খেয়েই তো আমার মাথায় চোট করে দিল! কাউকে বলিনি অবশ্য। ভালো হয়ে গেলে বোধ হয় ইস্কুলে পাঠানো হবে আমায়!

ডাক্তারদিদি এসে আমার ঘরে ঢুকতেই পর্দার আড়ালে লুকোলাম। তলা দিয়ে যে পা দেখা যাচ্ছে খেয়ালই করিনি। ধরে ফেলল এক মিনিটেই। জানালার ধারে বসিয়ে কানে নল লাগিয়ে দেখে-টেখে একগাল হেসে বলল, “আর ওষুধ খেতে হবে না।”

আমি খুব খুশি হলাম শুনে, কিন্তু একটু চিন্তাও হল। “ভালো হয়ে গেছি আমি?”
“এক্কেবারে!”
“এবার বুঝি এ-বাড়ি ছেড়ে কলকাতায় যেতে হবে?”
“হ্যাঁ। স্কুলে যেতে হবে তো। সবাই নতুন ক্লাসে উঠবে পাশ করে! তুই বুঝি ক্লাস টুতেই থাকবি? বড়ো হবি না? সাতমাস স্কুলে যাসনি তুই!”
“বড়ো হওয়া বুঝি ভালো?”
“ভালো না?”

আমি এদিকে ওদিক মাথা নাড়ালাম। বড়ো হলেই মুশকিল। পান্নালালদাদা আর আসবে না। নীলমণিদাদুও আর পড়াবে না। আর আমায় ছেড়ে কোথাও গিয়ে ঘোড়ার ডাক্তার হয়ে লুকিয়ে থাকবে। ইচুদাদু শুধু দম দেয়া পুতুলের মতো ঝুম ঝুম করে চাবির গোছা নিয়ে ঘুরবে। আমাকে আর গল্পটল্প বলবে না। বড়দের সাথে ও কথাই বলতে চায় না। ওর সাথে কথা বলতে না পারলে আমিও কিচ্ছু জানতে পারব না। বড় হওয়া মোটেও ভাল নয়। আমি বড় হতে চাই না।

কান্না পেয়ে গেল আমার। সামলে নিতে হল। কাঁদতে দেখলে পানুদা বকবে।

কিন্তু মনটা খারাপ হয়েই রইল। আলমারির পুতুলেরা আমার বন্ধু হয়েছে আজকাল। পুরুত আর ডোম একসাথে বসেই গপ্পো করে। মেছুনি, জেলে, মাঝি সবাই আছে মহা আনন্দে। একতলা, দোতলা, তিনতলা সুতো বাঁধা বাক্সের লিফট বসিয়ে দিয়েছি। সাহেব-মেমসাহেবরাও ওঠানামা করে গপ্পো করে। ভূতেরাও আসে দিনে রাতে, যখন তখন। একা একাও এ-ঘর ও-ঘর ঘুরে বেড়াই। মনখারাপটা কীসের বুঝতে পারি না।

বাবা আর মা কী কাজে কলকাতা গেছেন। বোধ হয় পুজোর বাজার করতে। পায়ে পায়ে বাবার বড়ো আলমারির পাশে দাঁড়িয়ে গোড়ালি উঁচু করে উঁকি দিলাম ভেতরে। ওখানে সারি সারি তাসের প্যাকেট। পানুদা বলেছিল ওগুলোর ওপর নজর রাখতে। সাহেব-বিবি-গোলাম, হরতন, চিড়িতন, রুইতন, ইসকাপন, ছরি-তিরি-টেক্কা! নানা জাতের তাসেরা থাকে ওখানে। বন্ধ থাকলে শান্তি, বার হতে পারলে কেউ কারো চেয়ে কম যায় না। তাই আমার এখানে আসা। দাবার ছক আর গুটির আড়ালে বলে তাসের প্যাকেট নজরে আসছিল না। পাল্লা খুলে হাত বাড়াতেই ঠক করে একটা তাসের বাক্স নিচে পড়ল। সে এক পুরনো আমলের নকশা আঁকা কাঠের বাক্সে! নিচে কার্পেটের ওপর পড়েই তার ঢাকনা খুলে তাসগুলো এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এ ওর ঘাড়ে। আর যাবে কোথায়! বুঝলাম, এদেরও প্রাণ আছে। চারটে সাহেব খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে তলোয়ার বাগিয়ে সে কী হম্বিতম্বি! আমি চট করে টেবিলের আড়ালে লুকিয়ে রকম-সকম দেখতে লাগলাম। পানুদা আগেই বলে দিয়েছিল তাসের সাহেবদের যেন একটু সমঝে চলি। কালো ইসকাপনের সাহেবটা বোধহয় এদের সম্রাট। আরও একটা কালো রাজাকে দেখলাম অত তেজি নয়, একটু ফুলবাবু গোছের ভাব। আর দুটো লাল সাহেব একটু সুখী সুখী ভাবের হলেও কম যায় না তারাও। তেরো জন তেরো জন আলাদা চারটে দল হয়ে কার্পেটের চার কোণে জড়ো হয়ে নিজেদের মধ্যে কী ফুস ফুস, গুজ গুজ করে আবার বিশ্রাম করার চেষ্টায় আছে দেখে নিশ্চিন্ত হতে যাব, এমন সময় ঘটল একটা কাণ্ড!

ঘড়িটার কথা আগে বলতে হয়। বাবার ঘরে আলমারিটার কাছেই সে দাঁড়িয়ে থাকে অনেককাল হল। আমাদের বাড়িতে যে বড়ো ঘড়িগুলো আছে তাদের থেকে আলাদা তার চেহারা। মাস কতক কলকাতায় থাকার পর কালকেই তাকে সারিয়ে ফেরত আনা হয়েছে। সময় ঠিক ঠিক দিলেও ঘন্টার শব্দ খারাপ হয়েছিল তার। ধরো বারোটা বাজল। অমনি ঘড়িটার ছোট্ট দরজা খুলে একজন ক্ষুদে বামন পুতুল বার হয়ে এল। চারদিক ঘুরে সেলাম করে হাতে ধরা একটা বাঁশি ঠিক বারোবার বাজিয়ে সে আবার চলে যাবে দরজা বন্ধ করে।

শুধু কি তাই? ঠিক বারোটা বাজার সময় বারোজন ডানাওয়ালা পরি গোল হয়ে নাচবে তাকে ঘিরে। অন্যসময় বামন। এখন হয়েছে কী, তাসেরা সবে চার ভাগে বাক্সে ঢুকে বোধ হয় আবার ঘুমোবার মতলবে ছিল। জানালার নীল সবুজ কাচের আলো পড়ে ঘরটার এমনিতেই একটু ঘুম ঘুম ভাব। আমিও বড়ো টেবিলটাতে শুয়ে ছাদের দিকে চেয়ে আছি। তিনটে বাজল। ব্যস, একসঙ্গে বাড়ির সবক’টা ঘড়ি একসঙ্গে নানান সুরে বাজতে শুরু করেছে। কতরকম যে আওয়াজ। সবচাইতে চমকে দিল নতুন সেরে আসা বড়ো ঘড়িটা। বামন দরজা খুলে বাঁশি বাজানো শুরু করতেই কে যেন কোত্থেকে ভারী গলায় বলল, “কে হে ছোঁড়া? এই ভরদুপুরে বারবার ইয়ার্কি হচ্ছে!”

কে যে বলল কথাটা প্রথমে বোঝাই গেল না। আমি অবাক হয়ে এদিক ওদিক দেখছি। বামুন পুতুল বললে, “মাপ করবেন, হুজুর। গলতি হয়ে গেছে।”

মোটা গলা আবার বললে, “ভরদুপুরে আমার ঘুম ভাঙিয়ে আবার মাপ করতে বলা! আমি কি আমিন?”

বামুনের আর ঘরে ঢোকা হল না। একটু কিন্তু কিন্তু গলায় বললে, “আজ্ঞে, আপনি কোথা থেকে বলছেন জানতে পারলে তবিয়ত খুশ হত বান্দার।”

আমার নজরটা এদিক ওদিক ঘুরছিল। আলমারির মধ্যে থেকে আওয়াজ এল, “এই খোকা, মধ্যের তাকে হাতটা আরেকবার বাড়ালে পাবি আমাদের, বার করে টেবিলে বিছিয়ে দে।”

আমি থতমত খেয়ে বললাম, “আপনি কে?”

উত্তর এল, “দাবার ঘুঁটির কৌটোটা নামালে পাবি আমায়। ছকটা আগে বিছিয়ে ফেল টেবিলে।”

ছক বিছিয়ে কৌটো খুলতেই হুশশ করে দম ফেলে দু’জোড়া রাজা-মন্ত্রী ছকে বসে হাত-পা ছড়িয়ে ব্যায়াম-ট্যায়াম করে দাঁড়াল। সাদা রাজাটা বামনকে বলল, “নে, দেখে নে ভালো করে। আগে তো তোর বাঁশি এত জোরে বাজত না! এখন ঘুম ভাঙানোর তেজ এল কোত্থেকে তোর বাঁশিতে? এবার থেকে সামলে বাজাস।”

বামন হতাশ গলায় বলল, “কারিগরটার দোষ, হুজুর! এমন তেল ঢেলেছে, হালকা বাজালেও জোরে শোনাচ্ছে। ধুলো না পড়লে ও ঠিক হবে না।”

“ঠিক আছে, ঠিক আছে।” বলে এবার আমার দিকে ফিরল রাজা। ভুরু কোঁচকানো তার। “ছকের ওপরে ঘুঁটিগুলো সাজাবে কে রে ছোঁড়া? যত্তসব আজে বাজে কাজের লোক নিয়ে হয়েছে কারবার!”

নিজের জায়গায় গ্যাঁট হয়ে বসে পায়ের ওপর পা তুলে নাচাতে লাগল সাদা রাজা। কালো রাজাও বসে পড়ল জায়গামতো। দেখাদেখি মন্ত্রী, হাতি, ঘোড়া, বোড়ে, আর সাদাকালো নৌকোরা বসল। ছকটা দেখতে মনে হল যুদ্ধ একটা লাগলেই হয়!

বামনাটা পালাল নিজের ঘরে। খুব রাগ হল আমার। লোকটা তো ভারি ইয়ে! নিজেদের তো নড়ে বসার মুরোদ নেই, কৌটোবন্দী হয়ে থাকে। মেজাজ কত! কথা বলবার ধরনটা দেখ! হোক না রাজা। প্রথমে বলল খোকা! আমি মোটেই খোকা নই, ক’দিন বাদেই আট হব। তারপর বলছে ছোকরা, কাজের লোক! কাজের তো বটেই। তোমাদের মতো অকাজের নই আমি। পানুদা নেহাত রাগটাগ করতে বারণ করেছে, তাই চুপ করে থাকলাম।

টেবিল থেকে নেমে দরজার দিকে যেতে গিয়ে থমকে তাকালাম। তাসের বাক্সটা তুলে রেখে যাওয়া উচিত। ওদিকে নজর পড়তে দেখি বাক্স খুলে চারজন গোলাম বেজায় ব্যস্ত। মেঝের কার্পেটের ওপর কোত্থেকে আর একটা লাল রুমাল পেতে চার-চার আটখানা ক্ষুদে চেয়ার পেতে পাখা হাতে চেয়ারের পেছনে দাঁড়িয়েছে। লাল রুমালটা বাবার চশমা মোছা রুমাল বলে চিনতে পারলেও, অতগুলো ঐ মাপের চেয়ার কোথায় পেল বুঝতে পারলাম না। হঠাৎ বামন আবার বাঁশি বাজাতেই চমকে গেলাম। সাড়ে তিনটে!

প্যাকেট থেকে এবারে বার হলেন কালো সাহেব। একে বলে ইসকাপনের সাহেব। বাবা রং মিলান্তি খেলার সময় চিনিয়ে দিয়েছিল। অন্যগুলোকেও চিনি। সাহেব বার হয়েই লাট্টুর মতো তিনপাক খেয়ে হাঁক মারল, “কই, কে বাজাচ্ছিলি বাঁশি? মুখখানা দেখি!”

বামন পুতুলটা নাচার। ঘন্টায় ঘন্টায় তাকে বাজাতেই হবে। সেটাই তো তা চাকরি। সে আপাতত লুকোবার মতলবে ছিল। সাহেবের হাঁক শুনে ফিরে দাঁড়িয়ে নিচু হয়ে সেলাম করল। “বান্দা হাজির হুজুরের ছিচরণে, ফরমাশ করুন।”

সাহেব তার কাছে গিয়ে ভালো করে শুঁকে-টুকে দেখে খুশি হয়ে বললে, “না, তোমার কেতা-টেতা তো ভালোই জানা আছে দেখছি, বুদ্ধিশুদ্ধিও সন্দেহ নেই। আমার গোলামি করতে রাজি আছ?”

কালো পান মানে ইসকাপনের গোলাম এতক্ষণ বুক ফুলিয়ে পাখা হাতে দাঁড়য়ে ছিল। বামনকে চাকরির কথা বলতে তার হাত থেকে পাখা পড়ে গেছে। মুখ শুকিয়ে আমসি। পিঁ পিঁ করে নাকে কান্না শুরু করল সে। “আমার কী হবে হুজুর!”

সাহেব ফোঁস করে উঠল, “চোপরাও! কাঁদা হচ্ছে আবার! আমার তহবিল তছরূপ করে আবার নাকে কান্না হচ্ছে!”

বামন বেচারা কিছুই না বুঝতে পেরে নাক খুঁটতে লাগল। কালো গোলাম ভারি অবাক হল। “তহবিলের কথা কী বলছিলেন হুজুর?”

ঝট করে তার নাকের কাছে আঙুল তুলে সাহেব আবার চেঁচাতে শুরু করল, “তাছাড়া একটু পরিষ্কার থাকার নাম নেই। গায়ে ঘোড়ার মতো গন্ধ, নাকি হবে আমার গোলাম!”

বামন নাক থেকে আঙুল বার করে জামায় মুছে নিয়ে মিনমিন করে বলবার চেষ্টা করল। “কিন্তু হুজুর, ঐ তহবিল তছরূপ ব্যাপারটা যদি একটু বুঝিয়ে বলেন খোদাবন্দ!”

সাহেব আবার ফোঁস করল, “কাল অবধি সব হিসেব ছিল ঠিকঠাক। আজ সকালে হঠাৎ দেখি ইসকাপনের দুরিটা নেই। লোকবল ছাড়া আমার তহবিলে আছেটা কী! এদিকে হরতনের রাজাটা ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলছে, লোক কমে গেলে রাজাগিরি চলে যাবে না!”

কালো গোলাম বলতে গেছে, “ও আর যাবে কোথায়, খুঁজে দেব ঠিক।” রাজা রাগের চোটে বললে, “তা বলে একেবারে হাওয়া! কীরকম পাহারা দিস শুনি? কাজে-কম্মে মন নেই, বাঁশি বাজাতেও তো পারিস না এর মতো।” বলতে বলতে বাক্সের কাছে গিয়ে মোলায়েম গলা করে বলল, “ওগো বিবি, শুনতে পাচ্ছ?”

পিনপিনে গলায় উত্তর এল, “কী বলছ?”

“তোমার গোলাম পালটে ফেললাম। একবার দেখে পছন্দ ঠিক আছে কি না বলে যাও।”

বিবির বাইরে আসা কি চাট্টিখানি কথা! প্রথমে সার বেঁধে এল চার রঙের টেক্ক-দুরি-তিরি করে দশ পর্যন্ত কচিকাঁচার দল। গোলামরা তো বাইরে আছে আগে থেকেই। তারপর বিবিরা একে একে কার্পেটে নেমে এল। কেউ এল পাউডার মাখতে মাখতে। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে হাই উঠছে কারও। কারও হাতে জাপানি পাখা। কালোপান বিবি এল সবার শেষে ভুরু কুঁচকে মাথার মুকুট পরতে পরতে। তার পেছনে সার্কাসের মতো ডিগবাজি খেতে খেতে এল একজন জোকার! তার মাথার ওপর ছুঁচলো টুপি, চকরাবকরা পোশাক, নাকের ওপর লাল বল। হিল তোলা জুতো গটগটিয়ে মাঝখানটিতে দাঁড়াতেই বামন মাথা ঝুঁকিয়ে সেলাম করে হাঁটু গেড়ে বসল। তাকে চোখের কোনা দিয়ে একপলক দেখে বিবি বললেন, “চলতে পারে, তবে কাজের হবে কি?”

সাহেব হেঁকে উঠলেন, “অন্তত সময়জ্ঞানটা তো আছে! কাজগুলো সময়মতো পাওয়া যাবে। না হে, তুমি বহাল। যাও, উর্দি-টুর্দি পরে নাও।”

হঠাৎ অনেকগুলো মেয়ে গলার চিৎকার শোনা গেল, “কী! আমাদের দলের লোককে ভাঙিয়ে নেওয়া হচ্ছে!”

চমকে চেয়ে দেখি, ঘড়ির ভেতর থেকে বার হয়ে বারোটা পরি এসে দাঁড়িয়েছে। তাদের সবার নজর ইসকাপনের সাহেবের দিকে। চাউনি তাদের মোটেই নরম নয়! সাহেব ভীষণ রেগে হাত-পা ছুড়তে ছুড়তে বলল, “ঠিক করেছি, বেশ করেছি। ঘড়ির জন্য বাঁশি বাজানো একটা কাজ হল!”

পরিরা কোরাসে বলল, “ঘড়িতে বাঁশি বাজানো কাজ নয়? সব্বাই কেমন সময় জানতে পারছে! কাজ নয়?”
“না না না! আমার কাছে ও কত কাজ করতে পারবে। সময় জেনে হবেটা কী!”
“কেমন কাজ তো দেখতেই পাচ্ছি। বাক্সের মধ্যে ঢোকা আর বেরোনো।”
“কত মাইনে দেব, জানো!”
“তোমার নিজের মাইনে কত শুনি? তুমি আবার নাকি মাইনে দেবে!”
“খবরদার, পালাও বলছি সব, নইলে…” বলে তলোয়ারে হাত দিতেই পরিদের দেখা গেল না। গোলমালের মাঝে বামনটাও পালিয়েছে নতুন পাওয়া চাকরির মায়া ছেড়ে। ইসকাপনের বিবিও বোধ হয় বাক্সে গেছে। বাকি তিন বিবিও সেদিকেই চলে গেল।

এবার এগিয়ে এল হরতন, রুইতন, চিরিতনের তিন সাহেব। একসাথে গলা মিলিয়ে তারা বলল, “সব তো হল। আপনার হারিয়ে যাওয়া ছরির কী হবে?”

ইসকাপনের সাহেব ভারি মনমরা হয়ে চেয়ারে বসে বলল, “কী হবে মানে! দুরি যাবে কোথায়? তোমরা সবাই মিলে তাকে খুঁজে বার করবে। আমার গোলামটা গেল কোথায়?”

“গোলাম!” মুচকি হেসে হরতনের সাহেব বলল, “তাকেও তো আপনি বরখাস্ত করলেন! আপনি এখন এগারো, তেরো নন। না না, তার আবার চাকরি যাবে কোন দুঃখে। ভাই গোলাম, আমি আছি তুমি আছ তাই। খোঁজো দুরিকে।”

চাকরি ফিরে পেয়ে গোলাম লম্বা সেলাম করে বাকিদের নিয়ে এখানে ওখানে খোঁজে দুরিকে। চাকরি ফিরে পেয়ে গোলাম লম্বা সেলাম করে বাকিদের নিয়ে এখানে ওখানে খুঁজে বেড়াতে লাগল দুরিকে। শুধু তিনটে সাহেব আরও ঘিরে ধরল কালোপান সাহেবকে। গলায় তাদের দুষ্টুমির সুর।

“আর কী হবে খুঁজে?”
“হারিয়ে গেলে পাওয়া কি যায়?”
“বরং এসো হিসেব করি, তোমার রাজাগিরি থাকে কি না!”
কালোপান বললে, “মানে! কীসের হিসেব? মানে কী?”

হরতন সাহেব এবার গম্ভীর। “মানে খুব সোজা। কার দল কত ওজনের, সে হিসেব। দুরি হারিয়ে তোমার ওজন কমেছে। এখন আমি রাজা, তুমি মন্ত্রী, বাকি দু’জন সেনাপতি।”

যেই না বলা লেগে গেল বিষম ঝটপটি সবক’টার মধ্যে। সকলেই বলছে, আমি রাজা হব, আমি রাজা হব। এ-দলের দুরি নেই, ও-দলের তিরির কান কাটা, কেউ জোকারকে দলে নিয়ে ওজন বাড়াতে চায়, ওর নওলার গায়ে তেলের দাগ। সব মিলিয়ে হুলুস্থুলু!

হঠাৎ আমার মনে হল বাবার নষ্ট কাগজের ঝুড়িতে খুঁজে দেখলে হয়! যেমন ভাবনা তেমনি কাজ। ওমা, দেখি দুরি বেচারা কাগজপত্তর চাপা পড়ে শুয়ে আছে সেখানে। বেচারা ছেলেমানুষ, ভয়ে তার মুখ শুকিয়ে গেছে। চট করে তাকে তুলে নিয়ে রাজামশাইয়ের সামনে রাখতেই চেঁচামেচি থেমে গেল। দুরিটা কাঁদছিল খুব। এতক্ষণ ওর চিৎকার শুনিনি। এখন দলের সবাইকে কাছে পেয়ে কি তার হাঁ করে কান্না! কাঁদছে আর হাত-পা ছুঁড়ছে। সবাই আবার চারপাশে জড়ো হয়ে ওকে দেখতে লাগল। দুরির দম একটু কমতে কান্নার জোরও কমে গেল। রাজামশাই দুরিকে কোলে তুলে চুমো-টুমো খেয়ে খুব আদর-টাদর করে রানির কোলে তুলে দিয়ে ঘুরে দাঁড়ালেন। তার মুখে একগাল হাসি। গম্ভীর গলার আওয়াজ। “বন্ধুরা, আর কোনও কথা নেই, আবার আমি রাজা। দুরি এসে পড়ায় তহবিল ঠিকঠাক। আমরা সবাই মিলেমিশে থাকব। কাজকর্ম করব। ছোটোদের স্বভাব দুষ্টুমি করা। কোথায় যায়, কী করে! ভালো কথা, দুরিকে খুঁজে পেল কে?”

সদ্য গোলামি ফিরে পেয়ে গোলামের এখন খুব উৎসাহ। আমার দিকে আঙুল তুলে বলল, “ইনি ওকে দিয়ে গেলেন, হুজুর।”

রাজার বোধ হয় চোখের ব্যারাম! তালপাতার সেপাইয়ের মতো তিন-চার পাক খেয়ে তবে সে আমায় দেখতে পেয়েছে। তারপর পায়ে পায়ে টেবিলে উঠে সবুজ ভেলভেটের মাঠ পেরিয়ে আমার কাছে এসে দাঁড়াল। “আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। বড্ড উপকার করলেন আমার। দুরি হারিয়ে গেলে গোটা ইসকাপনের দল কমজোরি হয়ে কী কেলেঙ্কারিই যে হত! শেষকালে রাজার মুকুট খুইয়ে ঐ হরতন-রুইতন-চিরতনদের মুদ্দোফরাসগিরি করতে হত। চলো সবাই, এঁকে সেলাম থ্যাঙ্ক ইউ বলে বাক্সে ফিরে চলো।”

দাবার ছকটার দিকে তাকাবার কথা ভুলে গিয়ে দরজার কাছে যেতেই চারটে বেজেছে, আর নতুন করে সবাই হল্লা শুরু করেছে দেখে পালিয়ে এলাম আমি। বড্ড ঝগড়াটে এরা।

আস্তাবলে এসে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল! আস্তাবলে নীলমমণিদাদু নেই। ওর ঘরে নেই, বাগানে নেই। আমাদের রেল-স্টেশনেও পেলাম না ওকে। বেশ রহস্যময় ব্যাপার মনে হল। মা ডেকে পাঠালেন বলে বেশিক্ষণ বসে থাকতেও পারলাম না।

মা আজ ছবি আঁকছে না। কলকাতা থেকে কিছুক্ষণ হল একাই ফিরেছে ডাক্তারদিদির সাথে। দু’জনে মুখ গোমড়া করে বসে আছে দেখে আমার কেমন ভয় ভয় করল। কী হল রে বাবা! বাবাও তো গেল একসঙ্গে কেনাকাটা করতে, বাবা কেন ফিরল না এখনও? এমন ভাবতে ভাবতে পাশে গিয়ে বসতেই মা আমার মাথার চুলগুলো ঘেঁটে দিয়ে একটু হাসলেন। “কোথায় থাকিস সারাদিন?”

“আস্তাবলে বসেছিলাম।”
“ওখানে কী করছিলি? ম্যানেজারবাবু বলছিলেন, রোজই নাকি যাস?”
“সনাতনবাবু দেখেছেন বুঝি? উনি তো ভ্যানিশ হয়ে গেছেন কতদিন হল!”
“হ্যাঁ, বলেছিলেন ক’দিন আগেই। রাগ করছিস কেন? কার কাছে যাস রে? রোজ কেন যাস?”
“নীলমণিদাদুর কাছে। ওর কাছে পড়তে যাই আমি।”
“নীলমণিবাবু তো ঘোড়াদের দেখাশোনা করেন! উনি তোকে পড়ান? কে বলল তোকে উনি পড়াতে পারেন?”
“ওর মতো আর কেউ পড়াতে পারে না। কে বলবে আবার, আমি জানি।” বলে আমি ছুটলাম পানুদার কাছে। বিকেলের আলো কমে আসছে।

মনে মনে সনাতনবাবুর ওপর রাগ হচ্ছে খুব! আবার আমার ওপর টিকটিকিগিরি করা হচ্ছিল! আমি কোথায় যাই না যাই তাতে ওঁর কী? আবার মায়ের কাছে লাগানো হয়েছে আমার নামে! তার মানে নীলমণিদাদুর ওপরেও নজর রাখছিলেন উনি? বলতে হবে দাদুকে। কিন্তু উনি তো কাছারিঘর ছেড়ে যেতেন না কোথাও, কী করে জানতে পারছিলেন কে কোথায় যায়? কী জানি, ইনিও ম্যাজিক জানেন কি না পানুদার মতো! হারিয়ে যাওয়া লোকটার ওপর রাগে গা জ্বলতে লাগল আমার।

আজ পানুদাকে একটু ছটফটে লাগছে। কী যেন ভাবছে মনে মনে। একটু চুপ করে থেকে ফিস ফিস করে বলল, “বিপদ আসবে বলেছিলাম, বিপদ কিন্তু এসে গেছে! লড়াই করতে হবে বুদ্ধি দিয়ে। দুর্গাপুজোর আগেই পাতালপুরী হানা দেব আমরা। সব ব্যবস্থা করে ফেলেছি। সময়মতো বলব।”

ঠাকুরদালানে ঠাকুর তৈরি হয়ে গেছে। শুধু রঙ দেয়া আর পোশাক-গয়না পরানো বাকি। আর কাকিমা ওখানেই বসে আছে সারাদিন। আমি বেজায় ব্যস্ত।

ঠাকুরের রং করা শেষ। গয়না পরানো হবে চতুর্থীর দিন। এখন সামিয়ানা ঘিরে ঢাকা আছে ঠাকুর। শুধু মা-কাকিমা আছে ভেতরে। কাকিমার ক্যামেরা ধরে রেখেছে সব। ইচুদাদু আজকাল চাবির গোছা নিয়ে আমার ঘরেই বসে থাকে। কোনও ঘরের দরজার তালা বললেই খুলে দেয়। মাঝেমাঝে আমার মুখের দিকে চেয়ে থাকে তো চেয়েই থাকে! কী দেখে কে জানে? হয়তো ওর ছোটোবেলায় দেখা কারও মুখের সঙ্গে আমার মুখ মেলে। পানুদার তাই মত। ও বলে, চোখের ভাষা, মনের ভাষা থেকে মুখের ভাষা, সব ভালো করে দেখলেই জানা যায়, বোঝাও যায়। মুখের বলা কথা তো শোনাই যায়।

আজকাল কারও ছবি দেখলেই মনে হয় কথা বলতে চায় আমার সঙ্গে। আমারও খুব ইচ্ছে করে তাদের সঙ্গে কথা বলতে। কতকালের মানুষ সব! ভালো ভালো পোশাক-গয়না আর মাথায় পাগড়ি পরা একজনকে নীলমমণিদাদুর মতো দেখতে! তবে তার দাড়ি নেই আর জোড়া ভুরু বলে প্রথমটায় চিনতে পারিনি। হাতে আবার খাপ খোলা তরোয়াল, রংচংয়ে খাপটা কোমরে বাঁধা। ভালো করে দেখতে হবে বলে ইচুদাদুর থেকে চাবিটা নিয়ে দুপুরবেলা ঢুকে পড়লাম ঘরটার মধ্যে।

ঘরময় নীলচে আলোয় ভালো করে চোখ চলতে চায় না। শুধু ছবিগুলোর ওপর হালকা হলদেটে আলো। ভেতর থেকে বন্ধ করে দেবার পর থমথমে অন্ধকারে দেয়াল জুড়ে ছবির মানুষগুলো দাঁড়িয়ে আছে। পাশে তাদের বড়োরা ঠিক রানির মতো পোশাক পরে বসে আছে সিংহাসনে। এরা সবাই আমার পূর্বপুরুষ! ডানদিকের শেষ পাঁচটা ছবির পোশাক আগেরগুলোর থেকে আলাদা। পুরনো ছবিগুলোর যেমন রাজারানির মতো পোশাক ঐ পাঁচটার পরনে কোট-প্যান্ট-টুপি! হাতের অস্ত্র তলোয়ার থেকে পালটে বন্দুক হয়ে গেছে। শেষ তিনজনের হাতে বই, পকেটে কলম। বউদের ছবি পালটে গেছে অনেক। বাবার ঠাকুমার ছবিতে চোখে চশমা, পাশে গ্রামোফোন। অন্যপাশে ছোট্ট একটা ছেলে, ঠিক যেন আমি!

মোটা সোনালি ফ্রেমের গায়ে সকলের নাম লেখা আছে। বড্ড উঁচুতে বলে ঠিক পড়তে পারা গেল না। বাঁদিকের প্রথম ছবিটা খুব পুরনো। ছবির রং কালচে হয়ে গেলেও মানুষটির চোখদুটো যেন জ্বলজ্বল করছে। বাঁকানো মোটা গোঁফ আর ছুঁচলো দাড়ি দেখে পানুদার সেই কথাটা মনে পড়ে গেল, “তোর পূর্বপুরুষরাও তো ডাকাত ছিল।” তবে তারা বিদেশি ডাকাতদের নৌকো লুঠ করত। তার মানে তারা দেশকে ভালোবাসত। আমারও মনে হল, বেশ করত! ভালো করে ছবিগুলো দেখার পর দরজার তালা লাগিয়ে পানুদার কাছে ছুটলাম।

নীলমণিদাদু আমাকে বেশ কয়েকটা যন্ত্র বানিয়ে দিয়েছে। সবক’টা যে সবসময় কাজে লাগে এমন নয়। কিছু কিছু তো বেশ কাজের! কাঠ আর স্প্রিং দিয়ে চমৎকার একটা অস্ত্র, তাকে নাকি বলে, ‘বাঁটুল’। ছোট্ট মাপের হলেও দারুণ কাজের। ছোট্ট ব্যাগাডেল-এর গুলি ছোড়া যায়। দু-তিনশো গজ অবধি দূরে নিখুঁত নিশানায় গুলি লাগানো যায়! আমি তো যুদ্ধেও যাব না, পাখিও মারব না। তবুও রেখে দিয়েছি কাছে। রাতের অন্ধকারে দেখা যায়, আবার ফটোও তোলা যায় এমন একটা চশমা, দিনের আলোতেও ছবি ওঠে! ওটা পকেটেই থাকে আমার। মাইক্রোস্কোপ ক্যামেরা আর দূরবীন দিয়েছিল কাকিমা, দাদু বানিয়ে দিয়েছে টেলিস্কোপ! চাঁদের গর্তগুলোকে অ্যাত্ত বড়ো দেখায়। মাপে একটু বড়ো বলে চিলেকোঠার ঘরে রেখেছি। পুজোর সময় বাজি ফোটানোর জন্য চাবি কামান। খুব জোর শব্দ হয়! বারুদ পুরে ছুঁড়ে দিলেই দুম! পুজোর সময় খুব কাজে লাগবে। ছোট্ট একটা চার্জ দেয়া টর্চ, আর একটা খুব শক্তিশালী ছোট্ট চুম্বক। চুম্বকটা বেল্টে ঝুলিয়ে রেখেছি। সেদিন পুজোর প্যাণ্ডেল বাঁধার লোক কাজ করছিল, আমি তেমন কাছাকাছিও ছিলাম না, ওর হাত থেকে পেরেক ছুটে এসে ঠক করে সেঁটে গেল আমার বেল্টে! তারপর থেকে সাবধানে থাকি। আর দিয়েছে একটা ক্ষুদে যন্ত্রর, যার শব্দ মৌমাছিদের টেনে আনে। রেড ইণ্ডিয়ানদের ছোট্ট ব্লো গানের কথাটা তো ভুলেই গিয়েছি বলতে। সেটাও বানিয়ে দিয়েছে ক’দিন আগে! ওর মাথায় কত কী বুদ্ধি যে খেলা করে সবসময়! ওকে খুঁজে না পেলে কী যে করব!

তিনতলার চিলেকোঠার ঘরে মৌচাকটা ছাদের বরগা থেকে প্রায় মেঝে ছুঁই ছুঁই হয়ে গেছে। তলায় একটা ট্রে রাখা আছে, তাতে ফোঁটা ফোঁটা করে মধু জমতে জমতে ট্রে টইটম্বুর। একটা বড়ো বয়ামে ঢেলে আবার ট্রে জায়গামতো রেখে উঠে দাঁড়াতেই দেখি ইচুদাদু দরজায় এসে দাঁড়িয়ে আছে। ওর হাতে যেন কী একটা পোকা। আমি কাছে যেতেই সেটা ওর হাত থেকে আমার চুম্বকে এসে লেগে গেল! তার মানে পোকার মতো দেখতে এটা লোহার তৈরি একটা কিছু। ওজনও বেশ ভারী! খালি চোখে ঐটুকু জিনিসটা একটা বড়ো মাছি বলেই মনে হচ্ছে।

আতসকাচের তলায় ধরতেই যন্ত্রটাকে বোঝা গেল। আকাশে ওড়া এই যন্ত্র দিয়ে ছবি তোলা যায়। জোরালো অস্ত্র হিসেবেও কাজ করানো যায় রিমোট কন্ট্রোল ডিভাইস দিয়ে। কে আছে এর পেছনে? এরকম আরও যন্ত্র নজর রাখছে কি আমাদের ওপর? দাদু থাকলে এটাকে খুলে-টুলে বুঝতে পারত সবকিছু। আমি একটা ভারী কাচের বাটি উলটে চাপা দিয়ে রাখলাম যন্ত্রটাকে। কারখানায় অনেক বেশি শক্তিশালী বড়ো একটা চুম্বক তৈরি করতে পারলে কাজের কাজ হয়। এসব উড়ো আপদেরা জব্দ হয়। হঠাৎ মনে হল, ইচুদাদু পারবে না বড়ো চুম্বক বানাতে?

কারখানার লোহার তাল থেকে চারটে বড়ো চুম্বক বানাতে লেগেছে একদিন। কাউকে জানতে না দিয়ে লুকোনো জায়গায় বসানো হয়েছে সেগুলো। আমার বেল্টে যেটা লাগানো আছে সেটার শক্তিও কিছু কম নয়। নতুন চুম্বকগুলো আরও অনেক বেশি তেজি। পনেরো-কুড়ি হাত দূরের লোহাও টেনে নিতে পারে। এগুলো চালাবার রিমোট সুইচ আমার কাছে রেখে দিয়েছি।

দুর্গাঠাকুর, কার্তিক, গণেশ, অসুরের অস্ত্র লাগানো, কাপড় পরানো হয়ে গেছে। আজ তৃতীয়া। বাড়িতে আত্মীয়স্বজনরা চলে আসবে পঞ্চমীর মধ্যে। ভীষণ মজা হচ্ছে আমার। আবার একটু ভয় ভয়ও করছে। পুজোর সময় যদি কোনও গণ্ডোগোল হয়! লোহার যন্ত্রটা দেখে বোঝা যাচ্ছে, কেউ নজর রাখছে আমাদের ওপর। আমার কাছে তো কোনও অস্ত্রও নেই! তাছাড়া এইটুকু ছেলে আমি, কেউ যদি আক্রমণ করতে আসে তাকে আটকানো যাবে কী করে? হঠাৎ মনে পড়ে গেল ব্লো পাইপটার কথা।

যে হলঘরে বাঘ, ভাল্লুক, বাইসনগুলো রাখা আছে, সেই ঘরের দেয়ালে টাঙানো নানা দেশ থেকে সংগ্রহ করা জীবজন্তুর তুলোভরা শরীরগুলো এমনভাবে সাজিয়ে রাখা, যেন এরা জীবন্ত! আমি তো বলেইছি, ওদের আসলে প্রাণ আছে। আমি একা থাকলে ওদের সঙ্গে আমি কথা বলি। ওরাও চেনে আমাকে। দেয়ালে ওদের পাশেই বহু অস্ত্রশস্ত্রও টাঙানো আছে। দুপুরবেলা ইচুদাদুর কাছ থেকে চাবি নিয়ে চুপি চুপি ঢুকলাম ওখানে।

অস্ত্র থাকলেই তো হল না, দরকারে সেগুলো চালানোর মতো গায়ের জোরও থাকা চাই। আমার হাতে প্রায় কোনওটাই মানানসই নয়। ছোটো ছোটো অস্ত্রগুলো মাপে ছোটো হলেও কাজের। ছুরি-ছোরা দিয়ে কাজ হবে না। দূর থেকে ছুড়বার অস্ত্র বলতে রেড ইণ্ডিয়ানদের দেশ থেকে আনা অস্ত্রগুলোর পাশে এক কোনায় রাখা ছিল ওটা, ব্লো পাইপটা। আমাজনের জংলি মানুষদের কাছ থেকে কিনে এনেছিলেন আমার দাদু। বড়ো ব্লো পাইপটা দেখে  নীলমণিদাদু ছোট্ট মাপের ব্লো পাইপ বানিয়ে দিয়েছিলেন আমার জন্য। তিরগুলোও ছোট্ট ছোট্ট আর ছুঁচলো। পাখি-টাখি শিকারের কথা তো আমি ভাবতেই পারি না, তাই ক’দিন ওটা দিয়ে বেলুন ফাটিয়ে তুলে রেখেছিলাম বাক্সে। মনে পড়তেই সেটা বার করে ফেললাম। পকেটে রেখে মনে বেশ সাহস পেলাম। অবশ্য এইটুকু অস্ত্র দিয়ে কতটুকু কী করা যাবে কে জানে। তিরগুলোর মাথায় আঠা দিয়ে লঙ্কার গুঁড়ো লাগিয়ে রেখেছি। বড়ো কিছু না হোক, বাছাধনের একটুখানি জ্বালা তো করবে! ডাকাতদের বাড়ির লোক হই আর যা হই, মোটেই চাই না আমার অস্ত্রে কেউ খুব বেশি ব্যথা পাক বা মরে যাক।

কাল থেকে বাড়ি ভরে যাবে আত্মীয়স্বজনে। বিকেল হয়ে এল। আমার কাঁধের ব্যাগে অনেককিছু জোগাড় করেছি। পানুদা বলেছিল দড়ি, টর্চ আর একটা ছুরি আনতে। তা ছাড়াও বুদ্ধি করে আরও কত কী যে ভরে নিয়েছি! ছোট্ট একটা ক্যামেরা, নানারঙের চক, একটা শাবল, এক পোঁটলা খাবার, মোমবাতি, দেশালাই আর একশিশি কেরোসিন তেল। বেশ ভারী হয়ে গেছে ব্যাগ। এছাড়া পকেটে ব্লো গান আর মার মোবাইল ফোন আর বেল্টের ম্যাগনেট। ব্যাগ নিয়ে এদিক ওদিক নজর রাখতে রাখতে যখন লোহার সিঁড়িটা দিয়ে নেমে গেছি তার একটু বাদেই সূর্য ডুবে গেল। চোখে অন্ধকারে দেখার চশমাটা পরে ফেললাম।

তেঁতুলতলার ঝুপসি অন্ধকার থেকে পানুদা বেরিয়ে এসে মন্দিরের লুকোনো দরজার পাথরটা খুলে ফেলল। মুখে আঙুল দিয়ে কথা বলতে বারণ করে প্রথমে নিজে দু’ধাপ নিচে নেমে আমায় হাতছানি দিয়ে ডাকল।

নিচের ঘরটা আগেরদিন যতটা নোংরা ছিল আজ অতটা লাগল না। বোধ হয় গঙ্গার জলে ধুয়ে গেছে অথবা আর কেউ ঢুকে পড়েছিল। সর্বনাশ! আমাদের বাড়ির সুড়ঙ্গে বাইরের কারও হাত পড়েনি তো? আজ সুড়ঙ্গগুলো কতদূর অবধি গেছে দেখব আমরা। টর্চ হাতে পানুদা চলল ডানদিকের প্রথম সুড়ঙ্গটার মধ্যে, আমি পিছু পিছু দেয়ালে চকের দাগ দিতে দিতে।

বেশ খানিকটা উঠে যাওয়ার পর সুড়ঙ্গ দু’ভাগ হয়ে একটা নেমে গেছে নিচে। কানে যেন জলের শব্দ পাচ্ছি! তার মানে এটার মুখ গঙ্গার ধারের কোনও লুকোনো জায়গায় গিয়ে শেষ হয়েছে। এগিয়ে লাভ হল না। বড়ো বড়ো পাথর পড়ে পথ বন্ধ।

ফিরে চললাম দু’নম্বর সুড়ঙ্গটা ধরে। এটা কয়েক ধাপ উঠে সোজা গিয়ে পৌঁছল একটা ঘরে। টর্চের আলোয় ঘরে দেয়ালে একটা কুলুঙ্গি দেখা গেল। সেখানে তালাবন্ধ একটা আদ্যিকালের লোহার বাক্স। পানুদা বলল, “খোলার দরকার নেই। আমরা তো গুপ্তধন খুঁজতে আসিনি, পরে দেখা যাবে। সময় কম, জোয়ার আসার আগেই ফিরতে হবে।”

আবার গোলঘরে এসে দু’নম্বর পথে বেশ কিছু যন্ত্রপাতি দেখে পানুদা বলল, “এগুলো নৌকো সারাই করতে কাজে লাগে। অন্তত তিনশো বছর কারও হাত পড়েনি বেশ বোঝা যাচ্ছে।”

আর একটু এগোতেই অনেকগুলো মোটা মোটা থামের ওপর কড়িবরগার ছাদওয়ালা বেশ বড়ো একটা ঘরের খোঁজ পাওয়া গেল। দেয়ালের হুক থেকে ঝোলানো আট-দশটা হ্যামক কতকালের কে জানে, হাত দিতেই ছিঁড়ে পড়লো। এছাড়া আরও নানান জিনিস ঘরময় ছড়িয়ে রয়েছে। একটা পুরনো ডায়েরি পেয়ে ঝোলায় পুরে বেরিয়ে আসতে হল।

জোয়ার এসে গোলঘরের মেঝেতে হাঁটুর ওপর জল ঢুকে গেছে। আরও অন্তত দু’দিন লাগবে সবগুলো সুড়ঙ্গ খুঁজে দেখতে। ডায়েরিটা কার কে জানে। ভালো করে পড়ে দেখতে হবে।

ওপরে উঠে পানুদা বলল, “বোঝাই যাচ্ছে গোলঘরের সাথে গঙ্গার যোগ রয়েছে। কিন্তু কোথায়?”

ডায়েরিটা অদ্ভুত দেখতে। পুরনো, ঝুরঝুর করছে। ময়ূরের পালক দিয়ে হালকা করে ধুলো ঝাড়ার পর পড়তে চেষ্টা করলাম। চামড়া বাঁধানো মলাটের কোথাও কোথাও পোকায় খেয়ে গেছে। ওপরের লেখা ষোলোশো আটাত্তর। আঙুলে কড় গুনে চমকে উঠলাম, তিনশো চল্লিশ বছর আগেকার ডায়েরি! কে লিখেছিল বোঝার ক্ষমতা নেই আমার। কিচ্ছু বোঝা গেল না ভেতরের পাতাগুলো থেকেও! কী ভাষায় লেখা কে জানে। শুধু পাতার পর পাতা ইকড়িমিকড়ি লেখা আর নানারকম নকশা আঁকা। মলাটের পেছনে এককোণে বোধহয় একটা পাখি আঁকা। অবশ্য ওটা কারও নাম হতে পারে। ভেতরের অক্ষরগুলোর মতো লেখাগুলো এমনভাবে সাজানো যে পাখি মনে হল আমার, ডানা মেলা পাখি!

ডায়েরির ভেতরের পাতাগুলো বোধ হয় এককালে হলদেটে ছিল, এখন পুরনো হয়ে প্রায় মরচে রঙ ধরেছে। তার ওপরকার লেখাগুলো কালো বলেই পড়া বা দেখা যাচ্ছে, যদিও খুব অস্পষ্ট। নকশাগুলো দেখে অঙ্ক মনে হচ্ছে। চোখে আতসকাচ লাগিয়েও খুব সুবিধে হল না। এটা পড়তে পারে বোধ হয় নীলমণিদাদু অথবা পানুদা।

হঠাৎ ঝুপ করে একটা পাতলা ভাঁজ করা চামড়া খসে পড়ল ডায়েরি থেকে। ভাঁজ খুলে দেখি সেটা একটা ম্যাপ! অনেকক্ষণ ধরে আতসকাচের তলায় দেখে তবে তাকে ম্যাপ বলে চেনা গেল। গঙ্গার দু’দিকে দুটো বাঁক আর তার মাঝে আমাদের বাড়ির নকশা দেখে বোঝা গেল ম্যাপটা এখানকার। খাঁড়ি অথবা গঙ্গার একটা সরু খাল বাড়ির চৌহদ্দির পাশ দিয়ে চলে গেছে এখানকার আস্তাবলের দিকে। আশ্চর্য, ওখানে তো খাল নেই এখন! তার মানে পরে ওটা ঢাকা দেওয়া হয়েছে? খালের শেষ মাথায় একটা গোল দাগ আঁকা। এর মানে বুঝতে পারলাম না। বাড়ির নকশার তলায় মাকড়শার জালের মতো দাগগুলো কীসের? অনেক নজর করে জালের শেষে গোল দাগ দেখে মনে হল এগুলো মাটির তলায় সুড়ঙ্গের নকশা হতে পারে! কিন্তু গঙ্গার কোন কোন জায়গায় সুড়ঙ্গ শেষ হয়েছে সেখানটা চামড়ার ভাঁজে নষ্ট হয়ে গেছে। গঙ্গার জল ঢোকার পথটা কোথায়? খালটাই বা ঢাকা হল কেন? খালের শেষের গোল দাগটা কী বোঝাতে চাইছে? মনের মধ্যে এগুলোর কোনও জবাব পাওয়া গেল না। পাতায় পাতায় আঁকা নকশাগুলোই বা কী? নীলমণিদাদু বা পানুদা হয়তো বলতে পারে।

উত্তর পাওয়া গেল একদিন পর। দোল খেলার বাদুড়ে রং আর বেগুনি রঙের গুঁড়ো গোলঘরের মেঝেতে জমা জলে ফেলে রেখেছিল পানুদা। ভাটার সময় জমা জল বেরিয়ে যাওয়ার পর বাঁদিকে গঙ্গার জল রঙিন হয়ে যেতেই ভাঙা সিঁড়ির তলায় পাওয়া গেল আরেকটা সুড়ঙ্গের ধ্বসে যাওয়া মুখ। বিকেলে পানুদা দেখাল জায়গাটা। ইট-পাথরে মুখটা বন্ধ হলেও ফাঁকফোকড় দিয়ে  জল ঢোকার জায়গা আছে। গোলঘরের মেঝে আর দেয়ালের জোড়ের কাছে রাঙের দাগ যেদিকে গেছে, সেখানে দেয়ালের ফাটলে শাবলের চাড় দিতেই সুড়ঙ্গের চৌকো মুখটা পাওয়া গেল। পানুদা বলল, এই সুড়ঙ্গ দেখতে যাওয়ার কাজ একদম শেষে। সঙ্গের জিনিসপত্র মন্দিরের কুলুঙ্গিতে রেখে বাইরে এসে পানুদা বলল, “রাত্তিবেলা দেখতে হবে সুড়ঙ্গে কেউ আসে কি না। আজ রাতেই আসতে হবে।”

আমি বললাম, “আমি আসব না?”

প্রথমে রাজি না হলেও শেষে বলল, “রাত ঠিক দশটায় মৃত্যুঞ্জয় নিয়ে আসবে তোকে।”

এত রাতে কখনও বাড়ির বাইরে যাওয়া হয়নি। ভয় যে করছিল না বলব না। ঠিক দশটায় মৃত্যুনদা আর হুপের সঙ্গে মন্দিরের পাশে এসে পানুদাকে দেখে ভয় চলে গেল। ভূতেদের দলের আরও ক’জন গঙ্গার দিকটায় পাহারা দিতে চলে গেল। তেঁতুলগাছের মগডালে ব্রহ্মদৈত্য নিত্যানন্দদাদু নজর রাখছে মন্দির আর বাড়ির দিকে। গোলঘরে ঢুকে তিন নম্বর সুড়ঙ্গে ঢোকার আগে মিত্যুনদাকে ওখানেই দাঁড় করিয়ে আমরা সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগলাম। কিছুটা উঠে বাঁক নিয়ে আবার নেমে গেছে অনেকটা। শেষ মাথায় যাবার রাস্তা বন্ধ। ধসে পড়া পাথরের ওপাশে জলের শব্দ শুনে মনে হল গঙ্গা থেকে এখানে ঢোকার আর আরেকটা পথ ছিল এখানেই। কোনও লোক ঢোকার হদিস পাওয়া গেল না এখানেও।

চার নম্বর সুড়ঙ্গটা শুধু বাকি। আমার হাতের ঘড়ি সময় বলছে রাত সাড়ে বারোটা। এই সুড়ঙ্গের সিঁড়িটা একটা ছোট্ট ঘরে গিয়ে পড়েছে। কোনও লোকজনের সাড়া নেই, তেলের বাতি জ্বলতেই চমকে গেলাম।

ঘরের এককোণে একটা চেয়ার-টেবিল রাখা আছে। টেবিলের ওপর লাল কাপড় মোড়া অনেকগুলো মোটা মোটা খাতা আর বেশ কয়েকটা পাকানো কাগজ বাণ্ডিল বাঁধা। দুটো ড্রয়ারের একটাতে কাগজ-কলম আর কিছু অদ্ভুত দেখতে যন্ত্রপাতি। আরেকটাতে একগাদা ছুরি-ছোরা আর একটা পুরনো দিনের পিস্তল। একটা চামড়ার থলি প্রথমে দেখতেই পাইনি। পান্নাদা খুঁজে পেল কুলুঙ্গিতেতে। ভেতরে গোটা আষ্টেক লোহার মাছি আর একটা ছোট্ট রিমোট কন্ট্রোলের যন্ত্র। তাতে আবার ছোটো পর্দা লাগানো। তার মানে দরকারমতো ছবি দেখা যায় এতে!

ঘরটার অনেক উঁচু ছাদ থেকে একটা দড়ির মই ঝুলছে। আমার নাগালের বাইরে বলে পানুদা একাই উঠে গেল ওপরে। কম আলোয় অত উঁচু ছাদের কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।

বেশ কিছুক্ষণ পরে পানুদা নেমে এল। হাতে মোটা একটা খাতা। ওর মুখটা গম্ভীর। আমাকে খাতাটা দিয়ে বলল, “ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখ, কাল সকালে তোর বাবার হাতে দিবি। মনে রাখিস, খুব দরকারি খাতা এটা। এখন চল, ফেরা যাক।”

ঘুম চোখে ঘরে ফিরে কখন ঘুমোলাম মনেই নেই।

আজ পঞ্চমী। বাড়িভর্তি লোকজন। আমেরিকা থেকে কাকিমার দুই দাদা এসেছেন পুজো দেখতে। ওদের ইংরিজি বুঝতে পারি না বলে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি। মাসি-মেসো ছেলেমেয়ে নিয়ে এসেছেন। ঋক আর তুলি। দু’জনেই বড্ড ছোটো।

মামাতো দাদা ওর বন্ধু নিয়ে এসেছে। আরও আত্মীয়রা এসেছেন। আমার বন্ধুরা লোকজনের মধ্যে আসতে চায় না বলে আড়ালে থাকে। আমাকেই যেতে হয় ওদের কাছে ফাঁক বুঝে। আজ দুপুরে তেঁতুলতলায় যেতেই ব্রহ্মদৈত্য নিত্যানন্দদাদু কোটরের অন্ধকার থেকে হাতছানি দিয়ে কাছে ডাকল। ওর চোখদুটো এমনিতেই বড়ো বড়ো, এখন আরও গোল। খুব অবাক হয়েছে!

“গঙ্গার দিকে চেয়ে দেখ দেখি কী ওটা!”

চেয়ে দেখি ছোট্ট একটা সি-প্লেন জলের ওপর দিয়ে সাঁ করে উড়ে গেল। এত অবাক আমি জীবনেও হইনি! হুপ বসে ছিল মাথার ওপরকার ডালের ওপর। ও-ও চেয়েছিল গঙ্গার দিকেই। প্লেনটা চলে যেতেই লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে আমার কাঁধের ওপর উঠে এল। কিচিরমিচির করে কী যেন বলার চেষ্টা করছে আমাকে। শেষটায় ওর আঙুল দেখানো পথে ফিরে এলাম আমার চিলেকোঠার ঘরে। এখান থেকে নিচে উঁকি মেরে পুজোর জায়গটা দেখতে পাচ্ছি। সেখানে তখন আলপনা দিচ্ছে মা। কাকিমা ক্যামেরায় তুলে রাখছে। হঠাৎ বাবা আর কাকা কোত্থেকে এসে ব্যস্তভাবে কী যেন বলতে লাগলেন। ওদের ঘিরে ভিড় জমে গেল আত্মীয়স্বজনদের। এখান থেকে কথা কিছুই বুঝতে পারছি না, শুধু ‘গয়না’ আর ‘পুলিশ’ এই দুটো কথা কানে এল। আজ তো মা দুর্গাকে গয়না পরানোর কথা! সেই ব্যাপারে কোনও গোলমাল হল? ছুটলাম নিচে।

বাড়িসুদ্ধু মহা হইচই। কাকা ছুটলেন পুলিশে খবর দিতে। বাবা লোকজন নিয়ে পুরো বাড়ি তন্নতন্ন করে খোঁজায় লেগে গেলেন। মা-কাকিমাদের মুখ শুকিয়ে গেছে। বাকি আত্মীয়স্বজনেরাও মুখ গম্ভীর করে বসে আছেন প্রতিমার পাশে। ভয়ংকর ব্যাপার! একতলার ঠাকুরঘরের সিন্দুক থেকে মা দুর্গাকে আর বাকিদের পরানোর গয়না পাওয়া যাচ্ছে না! সিন্দুকের চাবি থাকে বাবার ঘরে। সিন্দুকটা খুলল কে? বাবা ছুটে এলেন। যেখানকার চাবি সেখানেই ছিল। তবে?

প্রথমে জরুরি কাগজপত্র নিয়ে ম্যানেজার সনাতনবাবু ভ্যানিশ, তারপর নীলমণিদাদু কোথায় গেলেন কেউ জানে না, শেষে ঠাকুরঘরের সিন্দুক থেকে সমস্ত গয়না লোপাট! একটার পর একটা। সন্ধে হয়ে এল। আজ আর পানুদার সাথে দেখা হল না বলে মনখারাপ। পানুদার বলা কথাটা সত্যি হয়ে গেল। আরও কী আছে কপালে কে জানে। কী যে হয়েছে আমার, বাড়িতে এত লোকজন, আমার ইচ্ছে করছে একা থাকতে। অবশ্য ঠাকুরের গয়না এভাবে চুরি যাওয়াটা নাকি খুব অমঙ্গলের ব্যাপার। পুরুতমশাইও পুজোর তোড়জোড় না করে চুপ করে বসে আছেন। কী হবে কে জানে! চললাম আমার তেতলার চিলেকোঠার ঘরে।

ঘরে ঢোকার আগেই পা থেমে গেল। ঘরে মধ্যে কাদের কথা শোনা যাচ্ছে না? কান পেতে আমার হৃৎপিণ্ড লাফিয়ে উঠল। ঘরে আছে দু’জন মানুষ। কথা ফিস ফিস করে বলা হলেও চিনতে পারলাম, সনাতনাবাবু আর নীলমণিদাদু! ওরা কী করছে এখানে? ভাঙা খড়খড়িতে চোখ রেখে দাঁড়াতে অন্ধকারে সয়ে যাওয়া চোখে আবছা দেখতেও পাচ্ছি এবার। সনাতনবাবুর হাতে বোধ হয় পিস্তল। গলার আওয়াজ সাপের মতো হিসহিসে!

“আমার ওপর গোয়েন্দাগিরির ফল পাবে, সোনাকর্তা! তোমার ফর্মুলার খাতাটা ভালোয় ভালোয় বার করে দাও দেখি! নইলে…”

সোনাকর্তা বলে ডাকল নীলমণিদাদুকে! সোনাকর্তা তো আমার বাবার ছোটোকাকাকে ডাকা হত! নীলমণিদাদু আমার ছোটোদাদু? কম বয়সে বাবার অমতে যিনি বাড়ি ছেড়ে বিলেত চলে যান? শেষে চিঠি লিখেছিলেন আমার দাদু মারা যাওয়ার পর আজ থেকে তিরিশ বছর আগে! তারপর থেকে তার হদিস পাওয়া যায়নি। দাদুর কথা শুনতে পাচ্ছি এবার। গলায় আওয়াজ গম্ভীর।

“ফর্মুলার খাতা তোমার মতো নেমকহারামদের জন্য নয়। ভালো কথায় ঠাকুরের গয়না আর হিসেবপত্তরের কাগজ বার করে দাও।”

“দেব না। তুমি জানলে কী করে ওসব আমার কাজ! প্রমাণ কী?”

“প্রমাণ দেব পুলিশের কাছে।”

সনাতনবাবুর গলা এবার একটু হিংস্র শোনাল। আর সময় নষ্ট করতে চান না মনে মনে হচ্ছে উনি। অনেক উত্তেজিত!

“পুলিশ তোমার খোঁজ পেলে তো! তুমি আসলে কে এ-বাড়ির, কেউ জানে না। মেরে গঙ্গায় ফেলে দিলে কেউ জানতেও পারবে না। তিন গুনব আমি। খাতা দেবে তো দাও। নইলে এখানেই তুমি শেষ। এক… দুই…”

তিন বলার আগেই আমার চুম্বকের সুইচ টেপা আর ব্লো-গান একসঙ্গে চলল। রিভলভার চলে এল আমার কাছে আর পিঠে বেঁধা তিরের ধাক্কায় উপুড় হয়ে পড়ল ম্যানেজার। দাদু ভেতর থেকে বলল, “সাবাস, ক্যাপ্টেন!”

আমাদের কাছে শুনে জানতে কারও বাকি ছিল না কাজগুলো কার। পুলিশের জেরায় জানা গেল সন্ধান। গয়নাগুলো পাওয়া গেল গঙ্গার ঘাটের একটা গর্ত থেকে। সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে নিয়ে পালাবার সুযোগ পায়নি। বোধ হয় আমাকে নিত্যানন্দদাদুর কাছে যেতে দেখেই পালাতে হয়েছিল ওকে। কোনওমতে গর্তে রেখে পাথরচাপা দিয়ে পালিয়েছিল।

সকালবেলা আমি সুড়ঙ্গে ঢুকে বাঁদিকের ঘরের টেবিল থেকে লাল শালুর কাপড় জড়ানো দলিলপত্র নিয়ে আসি। কিছুই খোয়া যায়নি। না দেখা বাক্সের মধ্যে পেয়েছি একগাদা সোনার মোহর। এত পুরনো যে কালো হয়ে গেছে!

পুলিশ এসে সনাতনবাবুকে নিয়ে যাওয়ার পর বাড়িতে আনন্দের বান ডেকে গেল। নীলমণিদাদু যে আসলে বিলেতের নামকরা বৈজ্ঞানিক, এটা জানা গেল কাকিমার দুই ভাইয়ের হইচই থেকে। দু’জনেই নীলমণিদাদু, থুড়ি, আমার সোনাদাদুর ছাত্র ছিল। আসলে এ-বাড়িতে সোনাদাদুর বড়োবেলার কোনোও ছবি না থাকায় চিনতে পারেনি কেউ। জানা গেল, আস্তাবলের ম্যানেজার আসলে এ-বাড়ির বুড়ো মালিক!

বাবা যখন জিজ্ঞেস করলেন এখানে এসে পরিচয় না দিয়ে লুকিয়ে থাকার কারণ কী, দাদু একগাল হেসে বলল, “লুকোচুরি খেলার মজা পাবার জন্য। তাছাড়া কতগুলো নতুন আবিষ্কারের নকশা লেখা খাতার ওপর সারা পৃথিবীর লোকের নজর পড়ে যাওয়ায় পালাতে হল আর কী। আর অবসর নিলে তো লোকে নিজের বাড়িতেই আসে! তবে ম্যানেজারের কাজটা না পেলে পরিচয়টা আগেই দিতে হত। তা হলে আর লুকোচুরি চলত না, ক্যাপ্টেনের সাথে বন্ধুত্বটাও কম হত, চোরও সাবধান হয়ে যেত। যাক, আমার ফর্মুলা লেখা খাতাটা খোয়া গেছে। তিরিশ বছরের পরিশ্রম গঙ্গার জলে।”

পানুদার দেয়া খাতাটা এক ছুট্টে এনে দিতেই সোনাদাদু জড়িয়ে ধরল। “এই তো খাতা! ক্যাপ্টেন থাকতে চিন্তা কী? ঠিক পাওয়া গেল, গঙ্গায় যায়নি।” তারপর আমার কপালে একটা চুমো খেয়ে বলল, “কোথায় পেলি?”

আমি বললাম, “সুড়ঙ্গ থেকে পান্নালালদা এনে দিল তো।” বলেই জিভ কাটলাম।

সোনাদাদু অবাক হয়ে চেয়ে রইলেন। তারপর চাপা গলায় বললেন, “সুড়ঙ্গ তুই জানতে পেরেছিস? আর পানুদা মানে পান্নালালদা, তোরও? ও তো কোন ছোটোবেলায় আমারও বন্ধু ছিল রে! বড়ো হয়ে আর দেখতে পাইনি।”

দাদু মনে মনে ছোটোবেলায় পৌঁছে গেছে। ওর চোখে জল!

আরও তিনটে কথা জানার ছিল আমার। “যন্ত্রমাছিগুলো আর রিমোট যন্ত্রটা কার?”

দাদু হেসে বলল, “তোর মেট ছাড়া আর কার মাথায় আসবে ওসব?”

বললাম, “এটা আমিও বুঝেছিলাম, বলিনি কাউকে। ওরাই বুঝি নজর রাখত তোমার হয়ে?”

দাদু বলল, “শুধু নজর রাখা নয়, ফটোও তুলত। তাই আমি জানতে পারতাম।”

দু’নম্বর কথা, চামড়া বাঁধানো ডায়েরিটার কথা বা মোহরের কথা দাদু জানে কি না? গম্ভীর গলায় দাদু জবাব দিল, “ওটাই তো আমার বিলেত যাবার মনটা তৈরি করে দিয়েছিল। পুরোটা নকল করে বিদেশের পণ্ডিতদের দিয়ে পড়িয়েছি। ইনি ডাকাত সর্দার হলেও মস্ত বড়ো বৈজ্ঞানিক ছিলেন। চিহ্ন দেখে পরিচয় জেনেছি, সঠিক নাম জানা যায়নি। এ-বাড়ির তলার সুড়ঙ্গঘরে তাঁর লুকোনো কারখানা ছিল। যাতায়াত করতেন কুয়োর তলার গোপন পথ ধরে। আমিও ঐ ঘরেই ছিলাম। খাবার এনে দিত তোর ইচুদাদু। ও আমার ছোটোবেলার বন্ধু ছিল যে। কাউকে কিছু বলেনি।”

এবার আমার শেষ প্রশ্ন, “সি-প্লেনটা কার? কে এসেছে ওতে?”

দাদু একটু চুপ করে  থেকে বলল, “প্লেনটা আমার। ফোন করেছি, একটু পরেই আমার ছেলে আসবে ওতে চড়ে। এরপর আমার কাজ হবে সমুদ্রের তলায়। ভাবছি আমার ক্যাপ্টেনকে সঙ্গে নেব কি না এবার।” বলেই জড়িয়ে ধরে মাথায় চুমো খেলেন সোনাদাদু।

আমি কিন্তু নীলমণিদাদু নামটা ভুলিনি এখনও। দুর্গাপুজোর হইহই চলছে। খুব ধুমধাম এবার। বন্ধুদের মিনি-রেল আর কারখানা দেখিয়ে দিয়েছি। আমার মন পড়ে আছে গঙ্গার ধারে আমার প্রিয় জায়গায়। ওখানে পান্নালালদার কাছে।

ষষ্ঠীর বিকেলে ঠাকুর বোধন হচ্ছে, সবাই গেছে ওখানে। আমি চুপি চুপি গেলাম আমাদের জায়গায়। আকাশে সেই অদ্ভুত আলো। ঢাকের শব্দ শোনা যাচ্ছে না। কোথাও কেউ নেই। পাখিরা বাসায় ফিরে এসেছে। তেঁতুলগাছের তলায় অন্ধকারে পানুদা দাঁড়িয়ে আছে, মুখে একগাল হাসি। হাত নাড়ছে। নাড়তে নাড়তে মিলিয়ে গেল অন্ধকারে।

সোনাদাদু কখন এসে দাঁড়িয়েছে পিছনে। আমার কাঁধে হাত রাখল। ফিরে চললাম বাড়ির দিকে দু’জনে। বুঝলাম, ছোটোবেলায় আমার মতো ছেলেদের পানুদা থাকে, বড়ো হলে আর দেখা হয় না। আমি বড়ো হয়ে গেছি।

অলঙ্করণঃ শিবশঙ্কর ভট্টাচার্য্য

জয়ঢাকের গল্প ও উপন্যাস

Advertisements

5 Responses to উপন্যাস পান্নালাল শিবশঙ্কর ভট্টাচার্য শরৎ ২০১৮

  1. sudeep says:

    মায়া ছড়ান এমন লেখা কতদিন পড়িনি। আমার কিছু বলার নেই।লেখক কে নীরবে ধন্যবাদ জানাই

    Like

  2. prosenjit says:

    opurbo,porar samay mone holo harie gechi chotobelay,dhanyobaad jananor bhasa nei
    prosenjit

    Like

  3. প্রদীপ্ত says:

    কিই বলব!! অসম্ভব সুন্দর , মন কেমন করে জগত। বড় ভালো লাগলো। অনেক অনেক ধন্যবা।

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s