উপন্যাস মেজাম্বা পুষ্পেন মণ্ডল শরৎ ২০২০

পুষ্পেন মণ্ডলের আরো লেখাঃ বাউটম্যানের বাংলো, কুয়াশার ডাকঅরেলস্টাইন ক্যাসেলসমুদ্রগুপ্তের তরবারিগৌরীভিটিলের অদ্ভুত গন্ধ,  জলদস্যুর রক্তচক্ষু 

মেজাম্বা

পুষ্পেন মণ্ডল

বাজাউদের উপকথা

দক্ষিণ আমেরিকার মেক্সিকোয় কয়েক হাজার বছর আগের দুই দল মানুষের মধ্যে শুরু হয়েছিল প্রবল গণ্ডগোলমায়া আর অ্যাজটেক। তাদের মধ্যে লড়াই লেগেছিল একটি প্রাচীন মূর্তির দখল নিয়ে। তবে মূর্তিটা সাধারণ নয় দুই গোষ্ঠীর মানুষই মনে করত সমুদ্রের ধারে একটি জঙ্গলে মোড়া পাহাড়ের গায়ে প্রাকৃতিক গুহার ভিতরে বিরাজমান সেই দেবতা ‘তালোক’-এর মূর্তিটিতে রয়েছে অসীম দৈব ক্ষমতা। অ্যাজটেকদের ধর্মগুরু ফুরান্তাগু দীর্ঘ তপস্যার মাধ্যমে তুষ্ট করলেন দেবতাকেফলে ফুরান্তাগুর কাছে খুলে গেল অলৌকিক শক্তির দরজা। আকাশ-বাতাস, ঝড়-বৃষ্টি, সামুদ্রিক তুফান তখন সব তাঁর বশে। বাণিজ্যতরী নিয়ে দূরদূরান্তে গিয়ে উপনিবেশ স্থাপন থেকে ব্যাবসা করায় অ্যাজটেকদের আর কোনও বাধা রইল না। মায়াদের অত্যাচার থেকে মুক্তির পথটাও খুলে গেল সেই সঙ্গে। কিন্তু মায়া রাজ্যের অধিপতির কপালে তৈরি হল চিন্তার ভ্রূকুটি। তিনি সভাসদদের নিয়ে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলেনকীভাবে অ্যাজটেকদের আটকানো যায়? মায়াদের কালা জাদুর অধীশ্বর গুরাকুড়াকে ডেকে একটা উপায় বের করতে বললেন রাজা। মৃত্যুর দূত গুরাকুড়া তন্ত্রযজ্ঞের মাধ্যমে সমুদ্র দানব সুংরসুকে আদেশ দিলেন অ্যাজটেকদের সমুদ্র বিজয় বন্ধ করার জন্য।

এদিকে এক সুন্দর সকালে বন্দর শহর তিলিডা থেকে অ্যাজটেকদের তিনটি বাণিজ্যতরী ছাড়ল মহাসমুদ্র পেরিয়ে পশ্চিমের উদ্দেশ্যে। ভিনদেশে বিক্রির জন্য বেছে বেছে জাহাজে ভর্তি করা হয়েছে রকমারি জিনিস। সেই নৌকার কর্মাধ্যক্ষ ছিলেন সেলুন্তাগু। তিনি ছিলেন ধর্মগুরু ফুরান্তাগুর বড়ো ছেলে দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার জন্য প্রস্তুত হয়ে পাল তোলা জাহাজগুলি বন্দর ছাড়িয়ে ক্রমশ গিয়ে পৌঁছে গেল মাঝ-সমুদ্রে। মায়াদের রাজা এই খবর পেয়ে তাঁর নৌবাহিনীর সেনাধ্যক্ষকে আদেশ দিলেন, যেভাবেই হোক অ্যাজটেকদের এই তিনটি জাহাজকে ডুবিয়ে দিতে হবে মহাসমুদ্রে। যদি অ্যাজটেকদের বাণিজ্যতরী সমুদ্র পেরিয়ে পৌঁছে যায় অন্য দেশে, তবে মায়াদের নাক কাটা যাবে। সেটা রাজা কিছুতেই মেনে নিতে পারবেন না।

সমুদ্রের মাঝে চারটি মায়া রণতরী আক্রমণ করল অ্যাজটেকদের। শুরু হল ভয়ংকর যুদ্ধ, মুহুর্মুহু তির বৃষ্টি। মায়া সৈন্য তৈরি হয়েই এসেছিল অ্যাজটেকদের বাণিজ্যতরীগুলিকে নাস্তানাবুদ করার জন্য। অ্যাজটেকদের কাছে যুদ্ধাস্ত্র ছিল বটে, কিন্তু তা মায়া রণতরীর তুলনায় সামান্যই। তবুও দেবতা তালোক-এর আশীর্বাদে সেলুন্তাগুকে সামনাসামনি যুদ্ধে হারানো সম্ভব হল না মায়াদের পক্ষে। দৈব বলে একটি তিরের আঁচড়ও লাগল না তাঁর শরীরে। প্রচণ্ড বিক্রমে একে একে সমস্ত মায়া সৈন্যকে তিনি একাই ছুড়ে ফেললেন সমুদ্রে তাঁর মন্ত্রপূত তলোয়ারের সামনে দাঁড়ানোর ক্ষমতা মায়াদের ছিল না দেবতা তালোক-এর রক্ষাকবচ তাঁর প্রাণ বাঁচাল। তবুও অ্যাজটেকদের ক্ষয়ক্ষতি আর প্রাণহানি কম হয়নি সেদিন। তাদের দুটি বাণিজ্যতরী ডুবে গেল সমুদ্রের জলে যুদ্ধ জয়ের পর মায়াদের সবক’টি জাহাজেই আগুন ধরিয়ে দিল তারা

বাকি দুটি জাহাজ নিয়ে সেলুন্তাগু এগিয়ে চললেন পশ্চিমদিকে। সঙ্গে ছিল তাঁর প্রচণ্ড জেদ আর অসীম ধৈর্য বেশ ক’টি রাত কাটল নির্বিঘ্নেতারপর হঠাৎ উত্তাল হয়ে উঠল শান্ত মহাসমুদ্রের জল। ধেয়ে এল প্রলয়ঙ্কর ঝড়। শয়তান সুংরসুর লেজের ঝাপটায় সমুদ্রের মধ্যে শোঁ শোঁ করে হাওয়ার বেগ ঘূর্ণিঝড়ের আকারে ঘুরতে ঘুরতে জলের মধ্যে একটা সুড়ঙ্গ তৈরি করল। তারপর চোখের পলকে নৌকাটি ডুবে গেল সেই সুড়ঙ্গে। সেলুন্তাগু দেখলেন এই বিপর্যয় থেকে আর নিস্তার নেই, দুটি নৌকারই সলিলসমাধি হবে। পিতার দেওয়া মহামন্ত্র উচ্চারণ করে তিনি অনুরোধ করলেন সমুদ্রকে শান্ত হওয়ার। সমুদ্র শান্ত হল ঠিকই, কিন্তু সেই সুড়ঙ্গ থেকে নৌকা সমেত সেলুন্তাগু বেরিয়ে আসতে পারলেন না বুদবুদের মতো হাওয়ার গোলক তাঁদের বয়ে নিয়ে চলল মহাসমুদ্রের গভীরে। সমুদ্রের দেবতা তাঁদের জলের প্রাণী করে দিলেন। তাঁদের নাম হল মেজাম্বা। শরীরে ফুসফুসের বদলে মাছের মতো ফুলকা গজাল গায়ে নীলচে আঁশ, হাত দুটি হয়ে গেল পাখনা আর পা দুটি জুড়ে গিয়ে তৈরি হল লেজ। তারপর থেকে তাঁরা বাস করতে লাগলেন গভীর সমুদ্রের নীচেঅন্ধকার জগত থেকে তাঁরা দৈবাৎ কখনও উঠে আসেন জলের ওপরেসভ্য মানুষ ভুলে গেছে তাঁদের। শুধু বাজাউ উপজাতিরা নিজেদের মুখ-চলতি উপকথায় ধরে রেখেছে মেজাম্বাদের। বাজাউরা জলের পোকা। সমুদ্রের পাড়ে গাছের গুঁড়ি পুঁতে বাসা বানায়। অনেকে সারাজীবন কাটিয়ে দেয় নৌকায়। পা রাখে না মাটিতে। জলের নীচের অনেক গভীর গোপন কথা জানে ওরা। মেজাম্বারা ওদের কাছে ঈশ্বরের সন্তান।

***

“ঘটনাটা শুরু হয়েছিল প্রশান্ত মহাসাগরের নীচে।”

অরুণদাদুর এই একটা কথাতেই সবার চোখগুলি দপ করে উঠল এক ঝলকে। তারপর হাঁ হয়ে গেল মুখগুলি। সেটা লক্ষ করে দাদু গোঁফের নীচে মুচকি হাসলেন। এই খুদেদের অবাক করা চোখের থেকে প্রিয় তাঁর কাছে আর কিছুই নেই। তাই গল্প শুনতে ওরা যতটা ভালোবাসে, তিনি বলতে গিয়ে তার থেকে কম রোমাঞ্চ অনুভব করেন না। সারা পৃথিবী ঘুরে হাজারো প্লট তিনি জমিয়েছেন মাথার মধ্যে। সময়-সুযোগ পেলে বাছাই করা দুয়েকটা ঘটনা এই বিস্ময়কর চোখের মালিকদের শুনিয়ে বড়ো তৃপ্তি পান অরুণদাদু।

আসলে হঠাৎ কালবৈশাখীর জন্য সেদিন সন্ধ্যায় শাসমলবাবু পড়াতে আসেননি। ফলে গোল বেধেছে চারজনের মধ্যে। পাড়ার লাইব্রেরি থেকে মৌ একটা বই নিয়ে এসেছিল ক’দিন আগে। হান্স ক্রিশ্চান অ্যান্ডারসনের লেখা ‘দ্য লিটল মারমেড’। তর্কটা সেটা নিয়েই। ভোম্বল আর কৌস্তভের মতে মৎস্যকন্যা বলে আদপে কিছু হয় না। এদিকে মৌ কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না ওদের কথা। মাথা নেড়ে বলল, “ইউটিউব খুলে দেখ। এক সপ্তাহ আগে ফিলিপিন্স সমুদ্রে একটি মাছধরা ট্রলারের জালে মারমেড ধরা পড়েছে, যার ওপরের দিকটা মানুষের আকৃতি আর নীচের অংশ মাছের মতো।”

অরুণদাদু বললেন, “কই, দেখি ছবিটা।”

সঙ্গে সঙ্গে ফোনে সার্চ করে ভিডিওটা বের করে দিল মৌ। অরুণদাদু ভালো করে খুঁটিয়ে লক্ষ করে মন্তব্য করলেন, “আরে, এ তো পেড্রো মনে হচ্ছে! অনেক কাল আগে দেখেছিলাম তো! বয়েস হয়েছে।”

“মানে! আপনি চেনেন একে?” ভোম্বল, মৌ, কৌস্তভ আর ঋক তিনজনেই ঝটকা খেল একটা।

তিনি গলা ঝেড়ে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বললেন, “হ্যাঁ, চিনি বৈকি! এর বাবা-কাকাদেরকেও চিনি। নিউজিল্যান্ডে মস্ত বাড়ি আছে। তবে পেড্রো মেজাম্বা হয়ে গিয়েছিল পরে। সে অনেক লম্বা গল্প।”

ঘোষ-বাড়ির বৈঠকখানা তখন নতুন গল্পের গন্ধে ম ম করছে। চারজনেই এগিয়ে এসে গা ঘেঁষে বসল অরুণদাদুর কাছে।

“এ-গল্প তো আগে শুনিনি দাদু! আজকে বলতেই হবে। মেজাম্বা কারা? এরা কি মারমেড?”

মুচকি হেসে দাদু মুখ খুললেন, “বছর চল্লিশ আগের কথা। আমি তখন মাঝারি মাপের একটি অস্ট্রেলিয়ান সেলুলার কন্টেইনার কার্গো জাহাজে কাজ করতাম। জাহাজটি অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড আর পাপুয়া নিউগিনির বন্দরগুলি থেকে মেক্সিকো, পেরু, চিলি, আর্জেন্টিনা সহ উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম পারের বন্দরগুলিতে বিভিন্ন জিনিসপত্র দেওয়া নেওয়া করত। প্রায় দশ-বারো হাজার কিলোমিটারের এই জলপথগুলি সরাসরি প্রশান্ত মহাসাগরের পেট চিরে চলে গেছে। এর মাঝে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ ছাড়া ম্যাপে অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে খুঁজে পাওয়ার মতো যে ক’টা ছোটো ছোটো দ্বীপ মাথা তুলে আছে, তাতে কোনও মানুষের বসতি তেমনভাবে ছিল না সেই সময়ে। কয়েকটাতে ছিল শুধুই নারকেল আর সামুদ্রিক গুল্ম-গাছ। আর যে দ্বীপগুলি সমুদ্রের জোয়ারভাটার কারণে অনেক সময়ে ডুবে যায় জলের নীচে, তাতে শুধুই রাশি রাশি সাদা বালি। সূর্য যখন মাঝ আকাশে থাকে তখন এই বালির ওপর আলো পড়ে ঝিকমিক করে হিরের মতো। দূর দিয়ে যাতায়াত করা জাহাজের নাবিক আর ক্রুদের মনে তৈরি হয় কোনও রহস্যময় জগত। মাসের পর মাস উত্তাল জলের উপর দিয়ে ভেসে চলা মানুষগুলি তখন হয়তো হ্যালুসিনেশনের শিকার হয়ে সেইসব দ্বীপে ঘুরে বেড়াতে দেখে কোনও অশরীরী কিংবা মৎসকন্যা অথবা অচেনা কোনও প্রাণীদের।”

চা দিয়ে গেছে বংশীকাকা; পেয়ালায় চুমুক দিলেন আস্তে করে। “আমি যে জাহাজে কাজ করতাম কাকতালীয়ভাবে তার নাম ছিল ‘ওডা নোবুনাগা’। যাঁর নামাঙ্কিত জাহাজ, তিনি ছিলেন পনেরশো শতকের এক বিখ্যাত জাপানিজ সামুরাই মানে সম্রাট। এঁর কথায় আমি পরে আসছি। তখন জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে জাহাজটি পাপুয়া নিউগিনির পোর্ট মোরেসবে থেকে মাল ভর্তি করে ছাড়ল মেক্সিকোর বন্দর শহর ভালার্তার উদ্দেশ্যে।

“যাত্রাপথের বর্ণনা দেওয়ার মতো তেমন কিছু নেই। প্রশান্ত মহাসাগরের শান্ত আর ঘন নীল জলে গান গাওয়া সুবৃহৎ তিমি থেকে হিংস্র মানুষখেকো হাঙর সবই রয়েছে। উড়ুক্কু মাছ সহ আরও কত লক্ষ অদ্ভুত জলজ প্রাণী যে এর গভীর তলদেশে ঘাপটি মেরে আছে তার সম্পূর্ণ তালিকা প্রাণীবিজ্ঞানীরা তৈরি করে উঠতে পারেননি এখনও। তিমি আর ডলফিন কিন্তু জলজ প্রাণীদের মধ্যে বেশ বুদ্ধিমান। মাঝে-মাঝেই শোনা যায় নতুন ধরনের কোনও প্রাণী মারা গিয়ে ভেসে উঠেছে মহাসমুদ্রের কাছে বালির তটে। মারিয়ানা ট্রেঞ্চের কথা তোরা শুনেছিস নিশ্চয়ই? পঁয়ত্রিশ হাজার ফিট গভীর সমুদ্রখাত। যার শেষ তলদেশ পর্যন্ত এখনও কোনও মানুষ পৌঁছাতে পারেনি। অতএব রহস্য যা আছে তার অনেকটাই তখনও মানুষের অধরা। সমুদ্রের মাঝখানে ছিল বেশ কয়েকটা আগ্নেয়গিরি। তার মধ্যে বেশিরভাগই এখন মৃত। সেগুলির ওপরের অংশ জল থেকে ওপরে উঠে তৈরি করেছে একেকটি দ্বীপ বা দ্বীপপুঞ্জ।

“সেবারে পাপুয়া নিউগিনির সমুদ্র পরিধি ছাড়িয়ে সলোমন দ্বীপপুঞ্জ পেরিয়ে সর্বোচ্চ গতিবেগে আমাদের জাহাজ এগিয়ে যাচ্ছিল নীল মহাসমুদ্রের বুক চিরে। তখন বিশ বছর বয়েস হয়েছে ঐ জাহাজটির। সমুদ্রের মাঝে একবারও বেগড়বাই করেনি। কিন্তু সেই ট্রিপে আমাদের কপাল নেহাতই খারাপ ছিল। কোনও যান্ত্রিক গোলযোগে জাহাজটির দুটি প্রপেলারই বন্ধ হয়ে গেল আচমকা। মাঝ মহাসমুদ্রে দাঁড়িয়ে পড়ল। আমরা অনেক চেষ্টা করেও কোনোভাবেই জাহাজ চালু করতে পারলাম না। বন্ধ হয়ে গেল ইঞ্জিন। সাহায্যের জন্য বার্তা পাঠানো হল কাছাকাছি সমস্ত জাহাজে। কিন্তু তাদের মধ্যে বেশিরভাগ জাহাজই জানাল যে ওই পার্টস তাদের কাছে নেই। ইতিমধ্যে খবর পৌঁছেছে অস্ট্রেলিয়ায় কোম্পানির সদর দপ্তর ব্রিসবেনে। তারা উপযুক্ত যন্ত্রপাতি আর ইঞ্জিনিয়ার সহ একটি স্পিড বোটকে রওনা করিয়ে দিয়েছে যেটি আমাদের কাছে এসে পৌঁছাতে আরও এক সপ্তাহ লাগবে।

“আমাদের জাহাজটি তখন প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝামাঝি একটি ছোট্ট দ্বীপ ‘কিরিবাটি’ থেকে প্রায় একশো মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে ভাসছে। জাহাজটিকে নোঙর করার জন্য কাছি ফেলে দেখা গেল সমুদ্রতল এতই নীচে যে নোঙর সেখানে পৌঁছাল না। ফলে ঢেউয়ের স্রোতে জাহাজটি হেলেদুলে ভাসতে লাগল উদ্দেশ্যহীনভাবে।

“কিন্তু এর থেকেও ভয়ংকর পরিস্থিতি আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল সামনে। পূর্বদিকে একখণ্ড কালো মেঘ দেখে জাহাজের ক্যাপ্টেন প্রথমে অতটা গুরুত্ব দেননি। পরে সেটাই ভীষণ একটা ঝড়ের আকার ধারণ করে ধেয়ে এল সমুদ্র-রাক্ষসের চেহারা নিয়ে। প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝখানে বিকল জাহাজে সওয়ারি হয়ে ওইরকম উত্তাল ঢেউয়ের মুখোমুখি হওয়া আর মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা একই কথা। দিগন্তে সূর্য ডুবে যাবার পর তীব্র হাওয়ার তাণ্ডব শুরু হল। সেই বিশাল বিশাল ঢেউয়ের কাছে আমাদের জাহাজ খড়কুটোর মতো ভেসে চলল। মুহুর্মুহু বজ্রপাতে কেঁপে উঠছিল পুরো জাহাজ। বিদ্যুতের রেখা আকাশ থেকে নেমে ঢুকে যাচ্ছিল জলের মধ্যে। আর আমরা লাইফ জ্যাকেটগুলি শরীরের সঙ্গে বেঁধে তৈরি হচ্ছিলাম মহাসমুদ্রের সঙ্গে শেষ মরণপণ যুদ্ধে নামব বলে।

“শেষে ঢেউয়ের সঙ্গে বড়ো বড়ো জলোচ্ছ্বাসের জন্য কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আমাদের বিকল জাহাজটির সলিলসমাধি হল। আর আমরা পিঁপড়ের মতো বেশ কয়েকটা ছোট্ট ‘পিরোগু’ নৌকায় লাইফ জ্যাকেট পরে ভেসে রইলাম জলের ওপর। কিন্তু কিছুক্ষণেই উত্তাল ঢেউ আমাদের বিচ্ছিন্ন করে দিল অন্ধকারে। বাকিরা কে কোথায় ছিটকে গেল বুঝতেই পারলাম না। সাকুল্যে জনা তিরিশ লোক ছিল জাহাজটিতে। আমার সঙ্গে ছিল ডুহাম। ওর বয়েস কম আর মৃত্যুকে এই প্রথম দেখছে চোখের সামনে। চিৎকার করে শুধু কাঁদছে আর ভগবানের নাম জপছে। আসলে এই পরিস্থিতিতে ঈশ্বরও হয়তো বড়ো অসহায়। ওকে শুধু বললাম চোখ বন্ধ করে মনকে শান্ত করতে। ঢেউ এই ছোট্ট পিরোগুকে উলটে দিতে পারবে না যদি না আমরা ভয় পেয়ে বেশি লাফালাফি করি। তবে ওর মৃত্যু ভয়টা কেটে গেল কিছুক্ষণের মধ্যে, যখন বুঝল সমুদ্র শান্ত হচ্ছে ধীরে ধীরে।

“কিন্তু কোনদিকে ভেসে চললাম তার কোনও ধারণা নেই। ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করে শরীর বড়ো ক্লান্ত হয়ে গেছে। বৃষ্টিটা থেমে যেতে দু’জনেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম ভোররাতে। সূর্যের আলো ওঠার আগেই ঝড়টা থেমে গেল পুরোপুরি। যখন চোখ মেলে তাকালাম, যেন কিছুই হয়নি এমন সেই শান্ত নীল জল। শুধু অত বড়ো জাহাজটা বেমালুম হাওয়া হয়ে গেছে। আর অন্য মানুষগুলিরও কোনও হদিশ নেই। চোখ বন্ধ করে ভাবলাম, আমরা ভাসছি পৃথিবীর সবথেকে বড়ো মহাসমুদ্রে। সঙ্গে না আছে কোনও খাবার বা পানীয় জল, নেই যোগাযোগের কোনও মাধ্যম বা দিক নির্ণয়ের যন্ত্র। এমনকি একটা ছুরি ছাড়া কোনও অস্ত্রও নেই সঙ্গে। চারদিকে কয়েক হাজার কিলোমিটার শুধু গভীর জল। এরকম অবস্থা থেকে বেঁচে ফেরা একটা অলীক কল্পনা আর কিছু নয়। অতএব নিশ্চিন্তে মৃত্যুর অপেক্ষায় বসে থাকা। শুধু সে কোনদিক দিয়ে আসবে সেটাই জানা নেই।

“চোখে আলো পড়তে কিছুক্ষণ পর ধড়মড় করে উঠে বসল ডুহাম। ‘আমরা কোথায়?’ এটাই ছিল তার প্রথম জিজ্ঞাস্য। এরপর ঝড়ের বেগে এত প্রশ্ন সে করে চলল, যে আমার পক্ষে তার উত্তর দেওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল। হ্যাঁ, হুঁ, না করে মাথা নাড়তে থাকলাম শুধু। সূর্য যখন মাথার উপরে উঠে এল, সারা শরীরের চামড়া গরমে পুড়তে লাগল। তার সঙ্গে তেষ্টায় ফেটে যেতে লাগল গলা। জিভ শুকিয়ে চটচটে হয়ে সে এক অসহ্য যন্ত্রণা। খিদেতে পেটের নাড়িগুলিই সেদ্ধ হয়ে গেল বোধহয়। সমুদ্রের নীল জলে পার্চ মাছের মতো লালচে সূর্য ডুবল। কিন্তু অমন সুন্দর দৃশ্য সেদিন এতটুকু ভালো লাগল না আমাদের।

“ডুহাম কাঁদতে কাঁদতে থেমে গিয়ে এখন উদাস দৃষ্টিতে শুধু চেয়ে আছে আর বিড়বিড় করে বাড়ির কথা বলছে। বলল, তার মায়ের কথা, গ্রামের কথা বড্ড মনে পড়ছে। অন্ধকার নামার সঙ্গে সঙ্গে ঠাণ্ডা পড়ল ভয়ংকর। কোটি কোটি নক্ষত্রেরা আকাশ থেকে ফুলঝুরির উজ্জ্বল আলোর বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ছে। এর মধ্যেই শরীরটা অবশ হয়ে তন্দ্রা লেগেছে চোখে। ঘোরের মধ্যে কি না জানি না, মনে হল কারা যেন ঘুরে বেড়াচ্ছে পিরোগুর চারপাশে। অন্ধকারের মধ্যে ঠিক বুঝতে পারলাম না। তবে জলের মধ্যে আলোড়ন দেখে আন্দাজ হল কোনও বড়ো সামুদ্রিক প্রাণীর উপস্থিতি। তাদের উজ্জ্বল নীলচে গায়ের রং জলের মধ্যে থেকে ফুঁড়ে বেরচ্ছিল। চক্রাকারে ঘুরছিল তারা। ডুহাম আচমকা ধড়ফড় করে উঠে চিৎকার করে উঠল, ‘শার্ক! শার্ক!’ তারপরেই ওরা মিলিয়ে গেল জলের গভীরে।”

অরুণদাদুকে থামিয়ে কৌস্তভ বলে উঠল, “নীল তিমির কথা আমি পড়েছি বইয়ে।”

তিনি মাথা নেড়ে বললেন, “তোরা বইয়ে পড়েছিস আর আমি নিজের চোখে তাদের দেখেছি সমুদ্রের মাঝে। ওরা নীল তিমি ছিল না। তারা সমুদ্রে মিলিয়ে যাওয়ার পরেই বিশাল ঢেউ উঠল। নৌকা দুলতে শুরু করল। তবে কিছুতেই ওলটাতে পারল না আমাদের ডিঙিকে। কিছুক্ষণ পরে আবার আগের মতো ভাসতে থাকলাম আমরা।

“পরপর তিনদিন কাটল সেই নৌকায়। কোনও খাবার না খেয়ে সাধারণ মানুষ মাস খানেকের মতো বেঁচে থাকতে পারে। কিন্তু জল পান না করে দুটো দিন কাটানো অসম্ভব। অনন্ত জলরাশির ওপর থেকেও তেষ্টায় গলা শুকিয়ে বুক ফেটে যাচ্ছিল। সামুদ্রিক নোনা জল মুখে দেওয়ার অযোগ্য। তবুও থাকতে না পেরে সেটাই মুখে দিচ্ছিলাম আমরা মাঝে মাঝে। শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা বাড়ছে। চামড়া ফাটছে। মাঝে মাঝে বিকারগ্রস্তের মতো আচরণ করছে ডুহাম। মাংসাশী হাঙরের ঝাঁক খবর পেয়ে এসে গেছে আমাদের কাছে। কালো তিনকোনা নাক উঁচু করে তারা ঘুরছে চারপাশে। বাঁচার কোনও আশা তখন আর নেই। তবুও কোনোভাবে যেন বেঁচে গেলাম আমরা।”

“কীভাবে?” অরুণদাদু চুপ করতেই চারজনে চেঁচিয়ে উঠল একসঙ্গে।

“হঠাৎ দেখি সমুদ্রের মধ্যে সাদা বালির একটা রেখা এঁকেবেঁকে চলে গেছে নীল জলের ওপর দিয়ে। হাল টেনে কাছে পৌঁছলাম। প্রায় কুড়ি-পঁচিশ ফুটের মতো চওড়া একটা চড়া জেগে আছে সমুদ্রের মাঝখানে। পূর্ব থেকে পশ্চিমে বিস্তৃত হয়ে এঁকেবেঁকে ইউ আকৃতিতে ঘুরে গেছে। সমুদ্রতল থেকে ওপরে আছে সামান্য অংশ। ঢেউ আছড়ে পড়ছে তার চকচকে সাদা বালির উপর। নৌকা থেকে নেমে সাবধানে পা রাখলাম বালির তটে। ভিজে বালিতে গেঁথে যেতে থাকল পা। ডুহাম তখন বালিতে দাঁড়িয়েই আনন্দে চিৎকার করতে শুরু করেছে। আমি নৌকাটির নোঙর তটের উপর আটকে দিয়ে খালি পায়ে হাঁটতে হাঁটতে বালির রেখা ধরে এগোতে থাকলাম। মাথার উপরে সূর্যের তেজ প্রচণ্ড। অবসন্ন শরীর। সাদা ঢেউয়ের ফেনা এগিয়ে এসে ভিজিয়ে দিচ্ছিল পায়ের পাতা। খেয়াল করলাম, এই উঁচুনিচু পথটা কোথাও জলের উপর ভেসে আছে, কোথাও বা ডুবে আছে নীচে। কিন্তু পথটা এঁকেবেঁকে অনেকটা দূর দিয়ে ঘুরে আবার এসে মিশেছে একই জায়গায়। বিশাল একটা অংশ ঘিরে রেখেছে সমুদ্রের মাঝে। আরও লক্ষ করলাম, ভিতরের জলের রঙ ফিকে সবজে, আর বাইরের জলের রঙ সম্পূর্ণ আলাদা, ঘন নীল। সমুদ্রের মাঝে যেন কেউ প্রাচীর দিয়ে ঘিরে রেখেছে আর একটুকরো সমুদ্র। তবে প্রাচীরটা প্রবাল আর পাথর দিয়ে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি।

“হঠাৎ ডুহামের দিকে চোখ গেল। নৌকার একটা হাল মাথার উপরে তুলে বালির উপর দিয়ে পা টিপে টিপে এগিয়ে চলেছে। আমি ওর আচরণ দেখে প্রথমে একটু অবাক হলাম। তবে মুহূর্তের মধ্যেই বুঝলাম, বালির মধ্যে একটা নিচু জায়গায় জমা জলে কয়েকটি সামুদ্রিক মাছের সন্ধান পেয়েছে ও। হালের পিছন দিয়ে থেঁতলে কয়েকটা মাছ শিকার করে ওর যা আনন্দ দেখেছিলাম সেদিন তা ভোলার নয়। খিদের জ্বালায় দু’জনে মিলে ছোটো ছোটো কাঁচা মাছই অমৃতের মতো খেলাম। যা হোক, চারদিন পরে পেটে কিছু পড়ল।

“সেই গর্তের মধ্যেই খুঁজে পেলাম একটা সোনালি কয়েন। সমুদ্রের জলে দীর্ঘদিন থেকে মলিন হয়ে গেছে সেটা। অচেনা ভাষায় অস্পষ্টভাবে কিছু লেখা আছে কয়েনের গায়ে। জিনিসটা সোনার হলেও আশ্চর্য হব না। ডুহাম মন্তব্য করল, ‘হয়তো এই জায়গাটা জলদস্যুদের কোনও গোপন ঘাঁটি ছিল। তারাই লুকিয়ে গেছে সোনার কয়েনগুলি। চলো, আমরা আরও খুঁজে দেখি। ভাগ্যে থাকলে আমরা হয়তো বড়োলোক হয়ে যাব।’

“তারপর বালির মধ্যে আঁতিপাতি করে শুরু হল খোঁজা। ডুহাম একদিকে খুঁজছে, আমি আরেকদিকে খুঁজছি। সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে গেল। আর একটাও সোনার কয়েন পেলাম না আমরা। হঠাৎ খেয়াল হল, ঘেরা জলের বেশ গভীরে যেন বড়ো তিমির মতো কয়েকটি নীলচে প্রাণী নড়ছে। তারপর আর বেশিক্ষণ সেই বালুরেখা ভেসে রইল না। জলের স্তর বাড়তে বাড়তে ক্রমশ সাদা বালিকে ডুবিয়ে দিল সমুদ্রের নীচে। আমরা আবার ভেসে পড়লাম পিরোগুতে।

“আরও দু’দিন কাটল। খিদেটা আবার অসহ্য হয়ে উঠেছে। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে নিজের হাত-পা কামড়ে খেয়ে ফেলি। সেদিন মাঝরাতে মনে হল আবার এসেছে তারা। আমাদের ডিঙি নৌকাকে যেন টেনে নিয়ে চলেছে। অচৈতন্য অবস্থায় আমরা চিত হয়ে শুয়ে আছি আকাশভরা টিমটিমে নক্ষত্রের নীচে। মাঝে মাঝে চোখ খুলে দেখছি উলটানো কালো কড়াইয়ের গায়ে যেন কেউ অজস্র ফুটো করে দিয়েছে। আর আমরা মহাশূন্যে ভাসতে ভাসতে চলেছি অজানা দেশে। আধো তন্দ্রার মধ্যে মনে হল একটা আলোর রেখা আকাশ থেকে নেমে ডুবে গেল সমুদ্রের মধ্যে।

“পরেরদিন ভোরে একটা হৈ-হট্টগোল কানে আসতে তন্দ্রার মধ্যে মনে হল নিশ্চয়ই কোনও স্বপ্ন দেখছি। নইলে মাঝ সমুদ্রে মানুষের হৈ-চৈ কানে আসবে কোথা থেকে! অনেক কষ্টে চোখ খুলে দেখি আমাদের নৌকাটি একটা মাঝারি মাপের লঞ্চের গায়ে আটকে আছে। আনন্দের চোটে ক’দিনের অভুক্ত শরীরে উত্তেজনার আওয়াজ গলা দিয়ে যেন বের হতে চাইছে না। মহাসাগরের মাঝে দু’জন জীবিত মানুষ একচিলতে নৌকাতে করে ভাসছে দেখে ওরাও অবাক হয়েছে খুব। আমাদের তুলে নিল জাহাজে। শরীরে তখন এককণাও শক্তি অবশিষ্ট নেই। মালিক মিঃ গুয়ার্দাদো অতি সজ্জন ব্যক্তি। প্রথমেই আমাদের আপ্যায়ন করে গরম মাছের স্যুপ খেতে দিলেন। অস্ট্রেলিয়ান রেসিপিতে খিদে মিটিয়ে পরিষ্কার জলে স্নান করে গরম তেল মালিশ করলাম সারা গায়ে। একটা নরম বিছানা পেলাম ঘুমানোর জন্য। ঘুমের মধ্যেও সেই এক সপ্তাহের দুঃস্বপ্ন পিছু ছাড়ছে না কিছুতেই। শুধু মনে হচ্ছে সমুদ্রের মাঝে দুলছি ডিঙি নৌকায় শুয়ে। আর অন্ধকার কালো সমুদ্রে নীলচে বড়ো জলজ প্রাণীগুলি ঘিরে ধরে যেন কিছু বলতে চাইছে আমাদের।

“মিঃ গুয়ার্দাদোর সঙ্গে পরিচয় হল আরও একদিন পর। ওঁর বছর দশেকের ছেলেটির নাম ছিল পেড্রো। ভারি মিষ্টি দেখতে। আর তেমনি মিশুকে। সে পরেরদিন সকালে সুপ্রভাত জানিয়ে বলল, ‘আমার ট্রিঞ্জি মাছের স্যুপ খুব প্রিয়। তোমরা খেয়ে দেখছ নাকি!’

“আমি মাথা নাড়তে সে আবার বলল, ‘তুমি কি ভারতীয়? আমি বড়ো হয়ে যাব তোমাদের দেশে। মাউন্ট এভারেস্টে চড়ব। আমার অনেকদিনের ইচ্ছা।’

“ওকে জানালাম, ‘এভারেস্ট নেপালে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ।’

“পরে জানলাম, মিঃ গুয়ার্দাদো একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। পারিবারিক ট্রান্সপোর্টের ব্যাবসা। পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়েস। বাসস্থান নিউজিল্যান্ডের সমুদ্র শহর ক্রাইস্টচার্চে। তিনি বললেন, ‘আমার স্ত্রী গত হওয়ার পর থেকে পেড্রো আমার সঙ্গেই ঘুরে বেড়ায় সমুদ্রে। ও নাকি বড়ো হয়ে এক্সপ্লোরার হবে। আসলে এটা ওর জিনে আছে।’

“বললাম, ‘কীরকম?’

“তিনি জানালেন, ‘আমিও গত কয়েক দশক ধরে চক্কর দিচ্ছি প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝে একটা ফাঁপা ডুবো পাহাড়ের খোঁজে।’

“অবাক হলাম। ‘ডুবন্ত পাহাড়!’

“বললেন, ‘হ্যাঁ, আগে হয়তো কোনও সময়ে ওটা একটা আগ্নেয়গিরি ছিল। কিন্তু এখন মৃত। ডুবে আছে জলের নীচে। ভিতরটা ফাঁপা। মাঝেমধ্যে মহাসমুদ্রের জলের স্তর যখন নেমে যায়, ভেসে ওঠে তার ধারগুলি। অনেক নাবিক দেখেছে, সাদা বালির লম্বা গোলাকৃতি রেখা।’

“জানালাম, ‘আমিও কয়েকদিন আগেই সেই সাদা বালির রেখা দেখেছি সমুদ্রের মধ্যে। সেখানে নেমেও ছিলাম আমরা। একটা সোনালি কয়েন পেয়েছি সেখান থেকে।’

“কয়েন! কই, দেখি।’

“পকেট থেকে জিনিসটা বের করে হাতে দিতে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে চোখ দুটো চকচক করে উঠল ওঁর। হঠাৎ উনি কপাল চাপড়াতে শুরু করলেন। ‘হায় ভগবান! আমি এত বছর ধরে খুঁজছি ওই জায়গাটা অথচ বালির রেখাটা আমার দৃষ্টিতে পড়েনি একবারও! তুমি কি বুঝতে পারছ এটি একটি খাঁটি সোনার তৈরি কয়েন? জিনিসটা চারশো বছরের পুরনো।’

“জিজ্ঞেস করলাম, ‘এটা ওখানে এল কীভাবে?’

“১৫৭৮ সালে জাপানের সম্রাট ওডা নোবুনাগার বড়ো বড়ো পাঁচটি রণতরী প্রচুর সোনাদানা সমেত মেক্সিকো থেকে যুদ্ধজয় করে ফিরছিল সমুদ্রপথে। কিন্তু সেই নৌবহর জাপানে পৌঁছাতে পারেনি। কোথায় কীভাবে হারিয়ে গেল তাও জানে না কেউ। পনেরশো শতকের প্রথমদিকে মেক্সিকোর অ্যাজটেক সম্রাটের তৈরি এইরকম কয়েক লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা সমেত প্রচুর ধনরত্ন হারিয়ে গিয়েছিল সমুদ্রের মাঝে। এখনকার দিনে সেই সম্পদের পরিমাণ দশটা দেশের সমান।’

আমার মুখ তখন হাঁ হয়ে গেছে। মিঃ গুয়ার্দাদো গম্ভীর হয়ে কিছু ভাবতে শুরু করেছেন তখন। পূর্বদিকে সূর্য তখন টুকরো টুকরো লালচে মেঘের আড়ালে ডুবতে বসেছে সমুদ্রের ওপারে। কমলা রঙের আলো এসে পড়েছে আমাদের গায়ে। ডেকের উপর একটা চক্কর দিয়ে এসে শান্ত গলায় বললেন, ‘আমরা সাতপুরুষ ধরে প্রশান্ত মহাসাগর চষে ফেলেছি ঐ ডুবন্ত আগ্নেয়গিরির খোঁজে। যেভাবেই হোক আমাকে পৌঁছাতে হবে ওখানে। কোনদিকে তোমরা দেখেছিলে ঐ আগ্নেয়গিরির মুখটা?’

“আমি হিসেব করে বললাম, ‘আমাদের কাছে কোনও কম্পাস ছিল না। তাই সঠিক দিকনির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। তবে সূর্যের গতিপথ আর নক্ষত্রদের অবস্থান অনুযায়ী আমার ধারণা জায়গাটা সামান্য উত্তর-পশ্চিমে হবে।’

“সেদিন অনেক রাত পর্যন্ত বসে রইলাম ডেকের ওপর। ঢেউয়ের তালে দুলছিল জাহাজ। রাতে নক্ষত্রদের মায়াবী আলোয় মনের মধ্যে অদ্ভুত তোলপাড় চলছিল। ঠাণ্ডা হাওয়ায় বসে তাকিয়ে ছিলাম আকাশের দিকে। অন্ধকারে গুটি গুটি পায়ে মিঃ গুয়ার্দাদো আবার এসে বসলেন আমার পাশের চেয়ারে। একটা চুরুট ধরিয়ে বললেন, ‘পেড্রো ঘুমিয়ে পড়েছে। ওকে নিয়ে আমার খুব চিন্তা।’

“জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন?’

“বললেন, ‘সমুদ্রের নেশা ওকে এমন পেয়ে বসেছে যে বাড়িতে থাকতে চায় না কিছুতেই। যখনই আমি সমুদ্রযাত্রায় বের হব, আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটি শুরু করবে। অনেক সময়ে ভোররাতে জেগে উঠে দাঁড়িয়ে থাকবে ডেকে মেজাম্বাদের দেখার জন্য।’

“সেই প্রথম শুনলাম ওদের কথা। জানতে চাইলাম, ‘মেজাম্বা কারা?’

“সে কি! তুমি জানো না? মেজাম্বারা মহাসমুদ্রের নীচে থাকে। ওদের একটা আলাদা সভ্যতা আছে। শহর আছে। বাজাউরা ছাড়া খুব কম মানুষই চেনে ওদের। ঐ মৃত আগ্নেয়গিরির মধ্যে দিয়ে নাকি রাস্তা আছে মেজাম্বাদের দেশে যাওয়ার।’

“আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে প্রশ্ন করলাম, ‘মেজাম্বা মানে কি মারমেড?’

“উনি বললেন, ‘না। মারমেড বা জলপরি তো কাল্পনিক জীব। কিন্তু এরা সত্যিই গভীর সমুদ্রের মধ্যে বাস করে। ভীষণ বুদ্ধিমান প্রাণী এরা। ফিশিং ট্রলারের জালে কখনও ধরা পড়েনি। তাই মানুষও বেশি কিছু জানে না এদের সম্পর্কে।’ আরও বললেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষও দেখেছে মেজাম্বাদের। ওরা মাঝে মাঝে ঝাঁক বেঁধে উঠে আসে। এই অঞ্চলে অনেক জাহাজকে ডুবিয়ে দিয়েছে জলের তলায়। মানুষদের ধরে নিয়ে গিয়ে বন্দী করে রাখে।’

“আমি ভাবলাম নির্ঘাত ভদ্রলোকের মাথায় গণ্ডগোল আছে। হয়তো হ্যালুসিনেশনের শিকার। মানুষকে জলের নীচে নিয়ে গেলে তো এমনিই মরে যাবে। বন্দী করে রাখবে কীভাবে?

“মিঃ গুয়ার্দাদো শোনালেন আরেক অদ্ভুত কাহিনি। ‘প্রায় দেড়শো বছর আগের ঘটনা। আমার ষষ্ঠ পূর্বপুরুষ ছিলেন তৎকালীন নিউজিল্যান্ডের পলিনেশিয়ান গোষ্ঠীর রাজা মৌরির বাণিজ্যতরীর অ্যাডমিরাল। একবার তিনটি জাহাজ নিয়ে বাণিজ্য করতে বেরিয়েছিলেন উত্তর আমেরিকার উদ্দেশ্যে। ফেরার পথে সমুদ্রের মাঝে একদল জলদস্যু ঘিরে ধরে ওদের। তুমুল লড়াই হয়। একে একে তিনটি জাহাজই ডুবিয়ে দেয় জলদস্যুরা। আমাদের সেই পূর্বপুরুষ একটা ভেলা নিয়ে ভাসতে ভাসতে সেই আগ্নেয়গিরির মুখে গিয়ে পৌঁছান। সেখানেই তিনি প্রথম দেখেছিলেন মেজাম্বাদের। জলের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছিল তারা। মাথার দিকটা মানুষের মতো হলেও ওপরের হাত দুটো পাখনার আকার নিয়েছে, আর পায়ের দিকটা জুড়ে গিয়ে হয়ে গেছে ডলফিনের লেজের মতো। এর এক সপ্তাহ পরে অস্ট্রেলিয়ার একটি জাহাজ ভাসমান ভেলার মধ্যে তাঁকে উদ্ধার করেছিল অচৈতন্য অবস্থায়। আজ যেমন তোমাদের উদ্ধার করলাম। তাঁর মুখ থেকে শোনা গল্পই চলে আসছে আমাদের বংশে।’

“এরপর আরও এক সপ্তাহ কেটে গেল ওই একই জায়গায় ভেসে। পেড্রোর সঙ্গে ততদিনে বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গেছে আমাদের। ‘রুরুটি’ নামে লুডোর মতো একধরনের খেলা ওর খুব প্রিয়। সামুদ্রিক রঙিন ঝিনুক দিয়ে তৈরি সেটার ঘুঁটি। অজানা সব নিয়ম-কানুন। সেই খেলা শুরু করলে সময় যে কীভাবে চলে যেত তা বুঝতেই পারতাম না। তবে অলীক সেই মেজাম্বা নামক জলের প্রাণীদের প্রতি ওর খুব আগ্রহ। একদিন খুব ভোরে কেবিনের মধ্যে একটা আওয়াজ কানে আসতে ধড়মড়িয়ে উঠে দেখি পেড্রো ঘুমের মধ্যে বিড়বিড় করছে। ওর বাবাও হকচকিয়ে গেছে। ধাক্কা দিতে চোখ খুলে বলল, ‘আমাকে ডাকছে… ওরা ডাকছে আমাকে…’ কথাটা বলেই দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে গেল বাইরে। আমরাও ছুটলাম ওর পিছনে। ডেকের কিনারে দাঁড়িয়ে আঙুল তুলে আমাদের দেখাচ্ছে কিছু। লক্ষ করলাম, ভোরের হালকা আলোয় কালচে নীল সমুদ্রে ঢেউয়ের মাঝে সাদা ফসফরাসের মতো দেখা যাচ্ছে বালির রেখাটি। দূরবীন দিয়ে জায়গাটা দেখে আনন্দে নাচতে নাচতে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন মিঃ গুয়ার্দাদো। চিৎকার করে নাবিককে নির্দেশ দিলেন ওইদিকে জাহাজের মুখ ঘোরাতে। কাছাকাছি আসতে আমিও নিশ্চিত হলাম এটাই সেই সাদা বালির লাইন যেখানে কয়েকদিন আগে আমি আর ডুহাম নেমেছিলাম। কিন্তু ভোররাতে ঘুমের মধ্যে পেড্রো বুঝতে পারল কী করে? ব্যাপারটা রহস্যই থেকে গেল।

“পাড়ে নোঙর ফেলে মিঃ গুয়ার্দাদো নেমে পড়লেন সবার আগে। তোড়জোড় শুরু করলেন ডুবুরির পোশাক পরে জলে নামার জন্য। অনুরোধ করতে আমাকেও সঙ্গে নিলেন তিনি। কিন্তু পেড্রোর হাজার কাকুতি মিনতিতে উনি মাথা নাড়লেন না। উলটে হুকুম দিলেন তাকে কেবিনে বন্দী করে রাখার। তার চিৎকার আর করুণ কান্না অনেকদূর থেকে শোনা যাচ্ছিল। কোথায় একটা কু ডাক শুনতে পাচ্ছিলাম।

“আমরা অক্সিজেন সিলিন্ডার পিঠে বেঁধে নেমে গেলাম জলে। মৃত আগ্নেয়গিরির গা বেয়ে নামতে নামতে চোখে পড়ল পাথরের আর প্রবালের দেয়ালে জলজ উদ্ভিদের মোটা স্তর। প্রায় খাড়াই নেমে গেছে দেয়ালটা। ভিতরে জলের উষ্ণতা বাইরের সমুদ্রের তুলনায় অনেকটা কম। বেশ ঠাণ্ডা লাগছিল আমার। প্রায় তিনশো ফুটের মতো নামার পরেই অন্ধকার হয়ে এল চারপাশটা। হেলমেটের গায়ে মাথায় বাঁধা সার্চ লাইটের আলোতেই জলের নীচের থমথমে চেহারা মনের মধ্যে ভয় ঢুকিয়ে দিচ্ছিল।”

এই পর্যন্ত বলে একটু থামলেন অরুণদাদু। কৌস্তভ বলে উঠল, “থামলে চলবে না দাদু। তুমি বলতে থাকো। সেই মৃত আগ্নেয়গিরির ভিতরে ঢুকে কী দেখলে তোমরা? আমার তো হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে।”

মৌ উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে জিজ্ঞেস করল, “মেজাম্বাদের খুঁজে পেলে?”

অরুণদাদু একটু গলা ভিজিয়ে নিয়ে বললেন, “জলের গভীরে যেতে প্রথমে একটা শব্দ কানে এল। ঠিক যেন শিস দিচ্ছে কেউ। মহাসমুদ্রের তিমিরা অনেকরকম সুরেলা শব্দ তৈরি করে সে তো নিশ্চয়ই জানিস। প্রথমে সেরকমই মনে হল। শব্দটা ক্ষীণ থেকে ক্রমশ জোরালো হয়ে উঠছে, আবার আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আমি আর মিঃ গুয়ার্দাদো হাত-পা নাড়তে নাড়তে ক্রমশ নীচে নেমে চলেছি। ওঁর আচরণে কোনও ভয়ের লক্ষণ দেখলাম না। কিছুক্ষণ পরে আমার একটা অস্বস্তি শুরু হল। মনে হচ্ছে জলের নীচে আমাদের চোখের বাইরে যেন কিছু প্রাণী ওত পেতে আছে। দেখতে পাচ্ছি না, কিন্তু তারা আছে। ঘুরে বেড়াচ্ছে আমাদেরই চারপাশে। সুযোগ পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে আমাদের উপর!

“আরও অনেকটা নামতে ঘোলাটে জলে চোখে পড়ল একটা জাহাজের ভাঙা মাস্তুল। উঁচুনিচু পাথরের দেয়ালের সঙ্গে কোনাকুনি লেগে আছে শ্যাওলায় মোড়া ভাঙাচোরা একটা মাস্তুলের কাঠ। কিছুটা নীচে পাথরের দেয়ালের খাঁজে আটকে ছিল পুরনো ভগ্নপ্রায় জাহাজটা। মিঃ গুয়ার্দাদো এগিয়ে চললেন সেদিকে। আমিও এগোলাম ওঁর পিছনে। কাঠের তৈরি জাহাজটিকে দেখেই মনে হল সেটা কয়েকশো বছরের পুরনো। শ্যাওলায় মুড়ে রয়েছে। সমুদ্রের নীচে এত বছর পড়ে থাকতে থাকতে জরাজীর্ণ অবস্থা। ওটা ছিল ওডা নোবুনাগার হারিয়ে যাওয়া রণতরীগুলির একটি। জাহাজের খোলের ভিতরে ঢুকে কিছু একটা খুঁজছিলেন মিঃ গুয়ার্দাদো। একটা অস্বস্তিকর অনুভূতি। সেটা যে কেন হচ্ছে বুঝতে পারছি না। আমি ইশারায় জিজ্ঞেস করতে মিঃ গুয়ার্দাদো কোনও উত্তর দিলেন না। আর একটু এগোতে দেখি একটা বড়সড় অক্টোপাস তার শুঁড় ছড়িয়ে বসে আছে ভিতরে। আমরা সেখানে হাজির হতে সে বেশ বিরক্ত হয়েছে বোঝা গেল তার শুঁড় নাড়া দেখে। মিঃ গুয়ার্দাদো আমাকে ইশারায় দেখালেন অক্টোপাসের নীচে ভাঙা কাঠের পাটার মধ্যে চাপা পড়ে আছে কয়েকটা বাক্স। কিন্তু জলের এই দানবটাকে সরাতে না পারলে বাক্সগুলির কাছে পৌঁছানো যাবে না। আমি এদিক সেদিক দেখে একটা লম্বা ভাঙা কাঠের পাটা জোগাড় করে আনলাম। সেটা দিয়ে খোঁচা দিতে জন্তুটি আরও বিরক্ত হল। শুঁড়গুলি দিয়ে আমাদের আটকানোর চেষ্টা করল। মিঃ গুয়ার্দাদো তাকে বিশেষ পাত্তা না দিয়ে এগিয়ে গেলেন বাক্সগুলির দিকে। তখনই গুয়ার্দাদোকে শুঁড় দিয়ে পেঁচিয়ে ধরল অক্টোপাসটি। আমি অনেক চেষ্টা করেও কিছুতেই শুঁড়ের প্যাঁচ থেকে ছাড়াতে পারলাম না। ওঁর দম বন্ধ হয়ে চোখগুলি ঠেলে বেরিয়ে এসেছে তখন। আমি কোমরের কাছে গোঁজা ছুরিটা বের করে একটি শুঁড়ে আঘাত করলাম প্রচণ্ড জোরে। কিন্তু স্প্রিংয়ের মতো ছিটকে এল ছুরিটা। অক্টোপাসটি অন্য একটি শুঁড় দিয়ে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিল আমাকে। তারপরেই একটা গুলির শব্দ হল। শুঁড়গুলি আলগা হয়ে গেল চোখের সামনে। দেখলাম মিঃ গুয়ার্দাদোর ডানহাতে একটি পিস্তল। অক্টোপাসটি ওঁকে ছেড়ে দিয়ে ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল জলের গভীরে। ভদ্রলোক হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন।

“জাহাজের খোলের মধ্যে পড়ে থাকা বাক্সগুলি দেখেই বেশ উত্তেজিত হয়ে উঠেছেন মিঃ গুয়ার্দাদো। বুঝলাম, এ জিনিসের সন্ধানেই তিনি বহুবছর ঘুরে বেড়িয়েছেন সমুদ্রের বুকে। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও আমরা দু’জনে বাক্সের ঢাকনাগুলি খুলতে পারলাম না। সেরকম কোনও যন্ত্রপাতিই ছিল না আমাদের কাছে। আশেপাশে পড়ে থাকা লোহার ডাণ্ডা বা কাঠের টুকরো দিয়ে অনেক চেষ্টা করার পরেও লাভ হল না কিছু।

“হঠাৎ কানের কাছে একটা তীক্ষ্ণ শিসের মতো চিৎকারে চমকে উঠলাম। মাথার সঙ্গে লাগানো টর্চের আলোটা ততক্ষণে কমে এসেছে। অক্সিজেনের পরিমাণও ঠেকেছে তলানিতে। চারপাশের কালো অন্ধকার যেন দম বন্ধ করে দিচ্ছে। সেই বিশালকায় অক্টোপাসটা তখন চলে গেছে দূরে। কিন্তু অন্য কোনও প্রাণীর অদৃশ্য উপস্থিতি রীতিমতো টের পাচ্ছি। সারা শরীর শিরশির করছে কোন অজানা আতঙ্কে। মিঃ গুয়ার্দাদোকে ইশারায় বললাম ওপরে ফেরার কথা। কিন্তু ওই জাহাজের ভাঙা খোলের মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসতে তিনি কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না। মনে হচ্ছিল কারা যেন ওঁকে টেনে ধরছিল জলের নীচে। ঠাণ্ডা জলের মধ্যে কষ্ট হচ্ছিল আমার। প্রাণ বাঁচানোর জন্যই বাধ্য হয়ে জাহাজের খোলের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এলাম ওপরে। চোখের আড়াল হতেই একটা হুলুস্থুলু শুরু হল সেখানে। মুহূর্তের মধ্যে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল সেই ভঙ্গুর জাহাজের খোল। মিঃ গুয়ার্দাদো বেরতে পারলেন না। পাথরের খাঁজ থেকে খুলে জলের গভীরে তলিয়ে গেল পুরো জাহাজটি। থরথর করে কাঁপছে হাত-পা। ওপরে ওঠার জন্য প্রাণপণে সাঁতার কাটতে থাকলাম। মনে হচ্ছিল কারা যেন তাড়া করে আসছে নিচ থেকে। কোনোক্রমে ওপরে উঠে শ্বাস নিলাম খোলা হাওয়ায়।

“জাহাজে এসে দেখি আরেক সমস্যা। যে কেবিনে পেড্রোকে বন্দী করে গিয়েছিলেন মিঃ গুয়ার্দাদো, তার জানালা গলে পেড্রো জলে ঝাঁপ দিয়েছে। ঘণ্টা দুয়েক হল তার কোনও হদিস নেই। এদিকে ডুহাম বড়ো অস্থির হয়ে উঠেছে বাড়ি ফেরার জন্য। মাঝে-মাঝেই চিৎকার করে পাগলের মতো হাত-পা ছুড়ছে। গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে তার। বালির রেখাটি ডুবে গেছে জলের নীচে। চারদিকে তখন শুধুই ঘন নীল শান্ত জল। পেড্রো যে কেন ঝাঁপ দিল জলে, আর তারপর কোথায় গেল, সেটা বোঝার মতো যুক্তি হারিয়ে গেছে আমার। মনে হল চারপাশে এমন অনেক ঘটনা ঘটছে যা বুদ্ধি আর যুক্তির বাইরে। সেটা যেন এক অন্য জগত। আমাদের সভ্যতার কোনও হিসাব সেখানে খাটে না।

“আরও প্রায় একদিন অপেক্ষা করে ক্যাপ্টেন জ্যাক জাহাজকে ফিরিয়ে নিয়ে চললেন। মানচিত্রে অক্ষাংশ দ্রাঘিমাংশ হিসেব করে একটা গোল করে দাগ দিয়ে রাখা হল জায়গাটার। যাতে পরবর্তীকালে আবার খুঁজে পেতে সুবিধা হয়। মিঃ গুয়ার্দাদোর মতো ভালো মনের মানুষ আর তাঁর তরতাজা একটি ছেলে হারিয়ে গেল চোখের সামনে! মেনে নিতে পারছিলাম না কিছুতেই।”

অরুণদাদু চুপ করে গেলেন। অনেকক্ষণ আরামকেদারায় বসে থাকার পর ভোম্বল উসুখুসু করে জিজ্ঞেস করল, “তারপর?”

চোখ বন্ধ করে তিনি বললেন, “ছ’মাস পর জাহাজের কাজ ছেড়ে তখন আমি অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমে হোসকিবুরি নদীর ধারে এক কাঠ চেরাইয়ের কারখানাতে চাকরি করি। মিঃ গুয়ার্দাদোর দুর্ঘটনাটির জন্য নিউজিল্যান্ডের পুলিশ আমাকে অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। আমার সঙ্গে যা যা ঘটেছিল সবই জানিয়েছিলাম ওদের। ওদের সন্দেহ, হয়তো আমিই কোনও কারণে খুন করেছিলাম গুয়ার্দাদোকে জলের নীচে। কিন্তু কোনও প্রত্যক্ষ সাক্ষী, প্রমাণ এবং উদ্দেশ্য খুঁজে না পেয়ে ছেড়ে দিয়েছিল। হঠাৎ একদিন হাতে পেলাম একটা চিঠি। আমার পুরনো কোম্পানির ঠিকানায় ঘুরে তারপর এসে পৌঁছেছে।

‘প্রিয় মিঃ ঘোষ,

আশা করি কুশলে আছ। তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝে সেই ডুবন্ত আগ্নেয়গিরির কথা, যেখানে বালির ওপরে পেয়েছিলে অ্যাজটেকদের স্বর্ণমুদ্রা। আমার বড়ো ভাই কার্লোস গুয়ার্দাদো তোমার সঙ্গে নেমেছিল ডুবন্ত আগ্নেয়গিরির নীচে। তারপর মৃত্যু হয় তার। আর আমার ভাইপো পেড্রোও হারিয়ে গিয়েছিল। মাঝে কেটে গেছে অনেকটা সময়। সমুদ্রের নীচে অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সংগ্রহ করতে কিছুটা সময় লেগে গেল। একটি উপযুক্ত সাবমেরিন জোগাড় করেছি আমরা। ওখানে যেহেতু তুমি নেমেছিলে, তাই তোমাকে সঙ্গে নিতে চাই। তোমার আগের অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই কাজে লাগবে আমাদের। আর অবশ্যই উপযুক্ত পারিশ্রমিক পাবে। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে জানাও।

ইতি – গ্যাব্রিয়েল গুয়ার্দাদো’

“আমি সম্মতির কথা জানিয়ে চিঠি পাঠাতে দেরি করিনি। এর দু’সপ্তাহ পর হাজির হলাম নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ শহরে। মিঃ গাব্রিয়েল গুয়ার্দাদোর প্রাসাদোপম বাড়ি অভিজাত আপার রিকারটন এলাকায়। সাদর অভ্যর্থনা করে তিনি বললেন, ‘অভিযানের চূড়ান্ত প্রস্তুতি শেষ। শুধু তোমার সঙ্গে কয়েকটা কথা বলে নেব।’

“খেয়াল করে দেখলাম, এঁকে দেখতে এঁর দাদারই মতো, শুধু চেহারায় ছিপছিপে, মাথার ঘন সোনালি চুল। বয়েস হয়তো আমার কাছাকাছি। সংশয় জড়ানো গলায় বললেন, ‘আমাদের বংশের মানুষকে এক ভয়ানক অভিশাপ বয়ে বেড়াতে হচ্ছে কয়েকশো বছর ধরে। যেভাবেই হোক এই সংকট থেকে মুক্তি চাই।’

“বিস্তারিত জিজ্ঞেস করতে গ্যাব্রিয়েল জানালেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষের বাস ছিল মেক্সিকোয়। প্রায় চারশো বছর আগে সম্রাট নোবুনাগার সৈন্যরা আমাদের বংশের প্রায় সমস্ত পুরুষকে জীবন্ত পুড়িয়ে মেরেছিল। বিপুল ধনসম্পত্তি লুট করেছিল অ্যাজটেকদের কাছ থেকে। তার সঙ্গে ছিল আমাদের পারিবারিক দেবতা ‘তালোক’-এর একটা প্রাচীন মূর্তি। কিন্তু সেই ধনসম্পদ তিনি জাপানে নিয়ে যেতে পারেননি। ঝড়ের মধ্যে পড়ে সমস্ত ডুবে গিয়েছিল মহাসমুদ্রের মাঝখানে। অনেকে বিশ্বাস করেন, সেই মৃত আগ্নেয়গিরির নীচে হারিয়ে গিয়েছিল অ্যাজটেকদের দেবতা।’ একটু নিঃশ্বাস ছেড়ে গ্যাব্রিয়েল আরও বললেন, ‘আমরা বংশপরম্পরায় ব্যাবসা-বাণিজ্য করে আবার মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছি ঠিকই, কিন্তু যতদিন না আমরা সেই দেবতাকে জলের নিচ থেকে উদ্ধার করতে পারব, ততদিন আমাদের বংশের শাপ মুক্তি হবে না। আমাদের বংশের প্রত্যেকটি পুরুষ অপঘাতে মারা গেছেন সমুদ্রের জলে। কতজনের কোনও হদিশ পাওয়া যায়নি। ঐ মৃত আগ্নেয়গিরির নীচে কী রহস্য লুকিয়ে আছে তা আমাকে জানতেই হবে।’

“কিছুটা থেমে তিনি আবার বললেন, ‘আমার ঠাকুরদা ছিলেন অ্যাজটেক ধর্মে সিদ্ধ পুরুষ। তাঁরও নিজের মৃত্যু হয়েছিল জাহাজ-ডুবিতে। তিনিই বলে গিয়েছিলেন এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে গেলে আমাদের উদ্ধার করতে হবে সেই প্রাচীন তালোক দেবতার মূর্তিটি। তারপর উপযুক্ত ধর্মীয় আচারের মাধ্যমে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে তাঁকে। তিনি নিত্য পূজিত হলে তবেই এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পাব আমরা।’

“আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে গ্যাব্রিয়েলকে প্রশ্ন করলাম, ‘আপনার দাদা বলেছিলেন মেজাম্বাদের কথা। ঘুমের মধ্যে নাকি পেড্রোকে ডাকত ওরা।’

“কথাটা শুনে গ্যাব্রিয়েল পাইপে ধরিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, ‘বাজাউ আদিবাসীদের উপকথায় আছে এই মহাসমুদ্রের প্রাণীটির কথা। অনেকে বলে তারা জলের নীচে থাকে। তবে আমি এখনও কোনও প্রমাণ পাইনি।’

“ওকে জানালাম, ‘আমি যখন আপনার দাদার সঙ্গে নেমেছিলাম ওই আগ্নেয়গিরির ভিতর, একটা অন্যরকম অনুভূতি হয়েছিল। মনে হচ্ছিল চোখের আড়ালে বেশ কিছু অচেনা প্রাণী ঘিরে রয়েছে আমাদের। যদিও অন্ধকার জলের মধ্যে স্পষ্ট করে কিছু বুঝতে পারছিলাম না। কিন্তু টের পাচ্ছিলাম।’

“কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে গ্যাব্রিয়েল হাঁটতে হাঁটতে প্রশ্ন করলেন, ‘সেই জন্যই তোমাকে নিয়ে যেতে চাইছি সঙ্গে। তুমি বলেছিলে একটা ভাঙা জাহাজ দেখেছিলে সেখানে?’

“হ্যাঁ, জাহাজটা পাথরের দেয়ালে আটকে ছিল। ওটার খোলের মধ্যে ছিল বড়ো বাক্স। মনে হয় সেই বাক্স সরাতে যেতেই ভারসাম্য নষ্ট হয়ে জাহাজটা তলিয়ে গিয়েছিল খাদের ভিতরে। সেখান থেকে আপনার দাদা আর বেরোতে পারেননি।’

“পুরো খাদটা কত গভীর, তুমি আন্দাজ করতে পারো?’

“জানালাম, ‘না। ঘন অন্ধকার জলের ভিতর সেটা বোঝার কোনও উপায় ছিল না। আর আমি বেশ ভয় পেয়েছিলাম তখন। অক্সিজেন কমে আসছিল, টর্চের আলোতেও আর জোর ছিল না।’

“তিনি কথাগুলি মন দিয়ে শুনে বললেন, ‘আগামীকাল সকালেই বেরোতে হবে আমাদের। এবারে আর ওই সমস্যাগুলি যাতে না হয়, তার ব্যবস্থা করেছি। ভোরে উঠে তৈরি হয়ে নেবে।’ কথাটা শেষ করেই হনহন করে চলে গেলেন গ্যাব্রিয়েল।

“পরেরদিন খুব ভোরেই ঘুম ভেঙে গেল আমার। রাজকীয় ব্রেকফাস্ট ঘরেই দিয়ে গেছে। তৈরি হয়ে আমি একাই ঘুরে দেখতে লাগলাম প্রাসাদের মতো বাড়িটা। পিছনের দিকে খুব সুন্দর করে সাজানো মস্ত বড়ো বাগান। হরেকরকমের রংবাহারি গাছ। বাঁধানো একটি বড়ো পুকুরে দুটি মাঝারি সাইজের ডলফিন ঘুরে বেড়াচ্ছিল। পাড়ে গিয়ে দাঁড়াতে তারা মুখ তুলে এগিয়ে এল কাছে। ডানা ঝাপটে ডিগবাজি খেতে লাগল বারবার। সেখানে এক অল্প বয়সী কর্মচারীর দেখা পেলাম। বাগানের দেখাশোনা করে সে। কথা প্রসঙ্গে জানাল, ‘কার্লোস আর গ্যাব্রিয়েল ছাড়াও আরেক ভাই ছিল এঁদের। নাম নিকোলাস। তিনি ছিলেন এক সমুদ্র বিজ্ঞানী। ডলফিন নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে কয়েক বছর আগে হারিয়ে গেছেন সমুদ্রে। এদের নিকোলাস এনেছিলেন সমুদ্র থেকে। পুকুর থেকে একটি সুড়ঙ্গ দিয়ে যোগ আছে সমুদ্রের। নিকোলাস নেই, তাও ওই ডলফিন দুটি ওঁকে খুঁজতে আসে মাঝেমাঝে।’

“জলের ধারে বসে ডলফিনগুলিকে আদর করতে করতে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এদের নিয়ে কী ধরনের গবেষণা করতেন তিনি?’

“সে জানাল, ‘ওদের ভাষা বোঝার জন্য একটি যন্ত্র…’ কথাটি শেষ না করেই আচমকা মুখ ঘুরিয়ে পিছন দিকে হাঁটতে শুরু করল ছেলেটি। উলটোদিকে দেখি দাঁড়িয়ে আছেন গ্যাব্রিয়েল। হাসি মুখে বললেন, ‘ছোটো থেকেই নিকোলাস ছিল সমুদ্রের পোকা। বাড়ি থেকে পালিয়ে বাজাউদের সঙ্গে থাকত সমুদ্রের মধ্যে। বলত, জলের প্রাণীরা নাকি ওর সঙ্গে কথা বলে। শেষপর্যন্ত জলেই হারিয়ে গেল সে। অভিশাপটা ওকেও রেহাই দেয়নি। তুমি তৈরি তো? চলো, এবার বেরিয়ে পড়ি।”

অরুণদাদুকে থামিয়ে মৌ জানতে চাইল, ‘বাজাউ কারা?’

“তিনি জানালেন, ‘এরা প্রশান্ত মহাসাগরের চারপাশে ছোটো ছোটো দ্বীপের গায়ে সমুদ্রের ওপর বাসা বানিয়ে থাকে। মাছ ধরাই এদের প্রধান পেশা। আর জলের নীচে সাঁতার কাটার জন্য এরা খুবই দক্ষ। অনেকক্ষণ ডুবে থাকতে পারে এরা জলের নীচে। এদের নিয়ে অনেক গল্প আছে। ইন্টারনেটে সার্চ করে পড়ে নিস কোনও সময়ে।

“সেবার লিটিলটন বন্দর থেকে আমরা মাঝারি মাপের একটি আধুনিক জাহাজে ভেসে পড়লাম সমুদ্রে। ডুবোজাহাজটি সঙ্গে চলেছে। সেটি ক্যাপসুল আকৃতির একটি ছোট্ট মিনি বাসের মতো দেখতে। সামনে পিছনে মোটা কাচের বড়ো বড়ো জানালা। গায়ে ও মাথার ওপরেও গোল গোল জানালা রয়েছে কয়েকটি। ভিতরে জনা চার-পাঁচেক লোকের থাকার মতো ব্যবস্থা। গ্যাব্রিয়েল জানালেন, ‘এর নাম বিটল। এক নামী জাহাজ কোম্পানিকে অর্ডার দিয়ে তৈরি করেছি। গভীর সমুদ্রে পরীক্ষা করা হয়েছে অনেকবার। ভয়ের কিছু নেই।’

“আমরা দু’দিনের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম ম্যাপ ধরে সেই জায়গায়, অর্থাৎ ৫ ডিগ্রি ৩৮ মিনিট ২৯ সেকেন্ড দক্ষিণ, ১৫৫ ডিগ্রি ৫৩ মিনিট ২৪ সেকেন্ড পশ্চিমে। বিটলকে ক্রেনে করে নামানো হল জলে। ধীরে ধীরে ডুবে গেল সে। গ্যাব্রিয়েল আর আমি ছাড়াও সঙ্গে ছিল আরও দু’জন সহকারী। তার মধ্যে একজন হলেন আমার পুরনো পরিচিত ক্যাপ্টেন জ্যাক। জলের নীচে দিয়ে দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম সেই ডুবন্ত আগ্নেয়গিরির কাছে। একটা জিনিস বেশ অবাক করল আমাকে, সেই পাহাড়ের কাছাকাছি আসতেই একটা চরম নিস্তব্ধতা। সেখানে জলের নীচে কোনও মাছ, হাঙর, তিমি, ডলফিন বা অন্য কোনোরকম প্রাণীর দেখা নেই। আগ্নেয়গিরির মাথাটা ডুবে আছে সমুদ্রতল থেকে প্রায় দশ ফুট নীচে। একটা নিচু খাঁজের মধ্যে দিয়ে আমরা ভিতরে প্রবেশ করলাম। দ্বিতীয়বারের জন্য ডুব দিলাম সেই মৃত আগ্নেয়গিরির পেটে। ভাবছি, এবারে কপালে কী আছে কে জানে। বিশাল গর্তটা সোজা নেমে গেছে গভীরে। চোখের সামনে ভেসে উঠল আগেরবারের স্মৃতি। উপরের নীলচে আলো কমে আসতে ফ্লাড লাইটের আলোগুলি জ্বলে উঠল চারপাশে। বিটলের ভিতরটা নাতিশীতোষ্ণ। কিন্তু আমার কপালে তখন বিন্দু বিন্দু ঘাম। সবাই উত্তেজনায় চোখ বড়ো বড়ো করে চেয়ে আছি বাইরের দিকে। গ্যাব্রিয়েল জানালেন, ‘প্রশান্ত মহাসাগরের গড় গভীরতা ১৪ হাজার ফুটের কাছাকাছি। তবে এ-ডুবোজাহাজের পাঁচ হাজার ফিটের নীচে নামার ক্ষমতা নেই। জলের চাপ সহ্য করতে পারবে না।’

“চারদিকে আলো জ্বেলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখানেও কোনও প্রাণীর দেখা পাওয়া যাচ্ছে না। খেয়াল হল, আগেরবারেও সেই বড়ো অক্টোপাসটা ছাড়া কোনও প্রাণী দেখতে পাইনি ভিতরে। ডেটা অ্যানালিসিস স্ক্রিনে ধরা পড়ছে জলের নীচের গভীরতা, তাপমাত্রা, ঘনত্ব ইত্যাদি। বিভিন্ন শব্দ মাপার জন্য রয়েছে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি। আলট্রা সাউন্ড পদ্ধতিতে পুরো গর্তটির একটা ছবি তৈরি হচ্ছিল মেশিনের স্ক্রিনে। কিছুক্ষণের মধ্যে আমি পাথরের সেই খাঁজটি দেখতে পেয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘এইখানেই আটকে ছিল সেই ডুবে যাওয়া জাহাজটি!’

“গ্যাব্রিয়েল সেদিকেই এগিয়ে নিয়ে যেতে বললেন বিটলকে। মনে হল গতবারে অনেকটা সময় লেগেছিল এখানে পৌঁছাতে, এবারে সেই কষ্টটা মালুম হল না। দুয়েকটা শ্যাওলা ধরা কাঠের পাটাতন আর মাস্তুলের টুকরো পড়ে ছিল তখনও। গ্যাব্রিয়েল চুক চুক করে শব্দ করে বললেন, ‘সেই বাক্সগুলি তো একটাও নেই এখানে!’

“আমি বললাম, ‘সেগুলি সবই তলিয়ে গেছে খাদে।’

“জ্যাক, আর কতটা নীচে নামা যাবে?’

“এখনও পর্যন্ত তিনশো ফুটের একটু নেমেছি। এই গর্তের গভীরতা প্রায় দেড় হাজার ফুট দেখাচ্ছে। পুরোটাই নামা যাবে।’

“চলো, তাহলে যাওয়া যাক!’

“কাচের বাইরে আলো পড়তে দেখা যাচ্ছে পাথরের এবড়ো-খেবড়ো দেয়ালে শ্যাওলা শেষ হয়ে গেল ক্রমশ। সূর্যের আলো যেখানে পৌঁছায় না সেখানে শ্যাওলাও জন্মায় না। এরপর শুরু হল মসৃণ পাথরের দেয়াল। আরও প্রায় মিনিট তিরিশ পর আমরা পৌঁছলাম তলদেশে। সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে ছিল বেশ কয়েকটি জাহাজের খোল আর মাস্তুল। সাবমেরিন মাটি ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে জায়গাটার গভীরতা ষোলোশো ফুটের কাছাকাছি।

“গ্যাব্রিয়েল বললেন, ‘ডুবুরির পোশাক পরে তৈরি হয়ে নাও সবাই।’

“আন্ডারওয়াটার স্কুটি, অক্সিজেন সিলিন্ডার, ইনফ্রারেড ক্যামেরা আর আগ্নেয়াস্ত্র সহ কিছুক্ষণের মধ্যেই সমুদ্রের নীচে যুদ্ধ করার জন্য পুরোপুরি তৈরি হয়ে আমরা ঢুকে গেলাম অ্যান্টি-চেম্বারে। প্রত্যেকের হাতে একটা করে আন্ডারওয়াটার অ্যাসাল্ট রাইফেল যা জলের মধ্যে পঁচিশ মিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুল আঘাত হানতে পারে। এছাড়াও গ্যাব্রিয়েলের কাছে শক্তিশালী ডিটোনেটর ছিল কয়েকটা। ডুবুরির পোশাকে আমি আগেও নেমেছি। তবে এতটা গভীরে নয়। জলের চাপ এখানে আরও বেশি। তবে এই পোশাকটি অতিরিক্ত জলের চাপ সহ্য করার জন্য বিশেষভাবে তৈরি যাতে শ্বাস নিতে কোনও অসুবিধা না হয়। মাথার হেলমেটের সঙ্গে আটকানো জোরালো সার্চ লাইট আর ক্যামেরা। গ্যাব্রিয়েলের হাতে বিশেষ একধরনের রেডার, যাতে ধরা পড়বে যেকোনও ধরনের প্রাণীর গতিবিধি। প্রথমে এগোলেন জ্যাক আর মার্তোস। ওঁরা দু’জনেই দক্ষ ডুবুরি। তারপর গ্যাব্রিয়েল আর শেষে আমি।

“কানের মধ্যে লাগানো ছোটো স্পিকারে ভেসে এল গ্যাব্রিয়েলের গলা, ‘রেডিও সিস্টেমের সঙ্গে সবাই যুক্ত থাকবে বিটলের সঙ্গে। আশা করি কথাবার্তা আদান প্রদান করার কোনও সমস্যা হবে না।’

“ওয়াটার-স্কুটির সুইচ চালু করতেই তার পাখনাগুলি ঘুরতে শুরু হল। আমরা তার টানে এগিয়ে চললাম সামনে দিকে। ডাইনে বাঁয়ে বা উপরনীচে যেকোনও দিকে হেলিয়ে স্পিড বাড়িয়ে বা কমিয়ে যানটিকে নিয়ন্ত্রণ করার সহজ পদ্ধতি শিখিয়ে দিলেন গ্যাব্রিয়েল। ধীরে ধীরে জাহাজের খোলগুলির দিকে এগিয়ে গেলাম আমরা। মোট তিনটি ভাঙা জাহাজ ছিল সেখানে। তার মধ্যে দুটি কয়েকশো বছর এখানে পড়ে থাকায় সেগুলির ওপরে জমেছে মোটা পলির স্তর। আরেকটি জাহাজের ভাঙা অংশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে চারদিকে। এটি মনে হয় আটকে ছিল ওপরের দেয়ালে। নীচের এবড়ো-খেবড়ো জমিতে, ভাঙা জাহাজের খোলের মধ্যে সামুদ্রিক প্রাণীদের ছোটোবড়ো হাড়গোড়। জ্যাক আর মার্তোস কাঠের টুকরোগুলি সরানোর জন্য হাত লাগালেন। কিছুক্ষণের চেষ্টাতেই খুঁজে বের করা হল ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বড়ো কাঠের বাক্সটি। এত বছর জলের নীচে পড়ে থাকার সত্ত্বেও বেশ শক্তপোক্ত আছে। যদিও ড্রিল মেশিনের সাহায্যে বাক্সের ঢাকনা খুলতে মাত্র কয়েক মিনিট সময় লাগল। ভিতর থেকে পাওয়া গেল প্রচুর সোনার মোহর, অ্যাজটেকদের ব্যবহৃত গহনা, রঙিন পাথর ও বিভিন্ন ধাতুর তৈরি ছোটোবড়ো মূর্তি। আমাদের সঙ্গে আনা একটি ধাতব বাক্সে ভরে জিনিসগুলিকে নিয়ে যাওয়া হল বিটলের মধ্যে। গ্যাব্রিয়েল আরও কিছু খুঁজছিলেন। জিজ্ঞাসা করতে জানালেন, ‘দাদার মৃতদেহের কোনও চিহ্ন নেই কিন্তু!’

“বললাম, ‘হয়তো মাংসাশী সামুদ্রিক প্রাণীরা খেয়ে ফেলেছে।’

“কিন্তু পোশাকের টুকরো, হাড়গোড় বা কোনও অলঙ্কার—কিছুই তো নেই। আর সেই দেবতার মূর্তিটিও খুঁজে পেলাম না।’

“জ্যাক আর মার্তোস জলের মধ্যেই আনন্দে নাচতে শুরু করেছেন। কিন্তু লক্ষ করলাম, গ্যাব্রিয়েলের চোখে সেই আনন্দটা নেই। বিটলের মধ্যে ফিরে তিনি বললেন, ‘অ্যাজটেকদের প্রাচীন দেবতা তালোক-এর মূর্তিটি পাওয়া না গেলে আমাদের এই অভিযান সম্পূর্ণ ব্যর্থ। এই বিপুল ধনরত্ন আমাদের পরিবারে কোনও কাজে আসবে না।’

“তাহলে!’

“কিছুক্ষণ চুপ করে গ্যাব্রিয়েল গম্ভীর গলায় জানালেন, ‘তোমাদের হিন্দু ধর্মে যেমন মহাদেব শিব খুব রাগী দেবতা, তেমনি অ্যাজটেকদের তালোক। ইনি ঝড়, বৃষ্টি, সামুদ্রিক তুফানের অধীশ্বর। কয়েকশো বছর ধরে সেই দেবতার আদিশক্তি মূর্তি পড়ে আছে মহাসমুদ্রের নীচে। পৃথিবীর মানুষ ভুলতে বসেছে তাঁকে। তাঁর ক্রোধ শান্ত করতে গেলে যেকোনও উপায়ে মূর্তিটিকে উদ্ধার করে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। আমার প্রপিতামহ সেরকমই বলে গেছেন। মূর্তিটির একটা অস্পষ্ট ছবি এঁকেছিলেন তিনি। কথাটা কুসংস্কার বলে কেউ উড়িয়ে দিতে পারে, কিন্তু আমাদের পরিবারের প্রত্যেকটি পুরুষ যেভাবে সমুদ্রের জলে তলিয়ে গেছে তাতে এই অভিশাপের তত্ত্ব একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।’

“তাহলে উপায়?’

“কিছুটা দূরে ভাঙাচোরা জাহাজের টুকরোগুলো ফেলে এগিয়ে গেলে ডানদিকে একটি সুড়ঙ্গ ঢুকে গেছে ভিতরে। দেখেছ তোমরা? ভাবছি ওই গুহার ভিতরে গিয়ে খুঁজে আসব একবার যদি ওখানে কিছু থাকে।’

“স্ক্যানারের মনিটরে আঙুল দেখিয়ে জ্যাক মাথা নেড়ে বললেন, ‘বিটলকে ওখানে নিয়ে যাওয়া বিপদজনক হবে। সুড়ঙ্গটা বেশ সরু হয়ে গেছে ওদিকে। চারদিকের দেয়ালে সূচালো পাথর। বিটলের গায়ে আঘাত লাগলে বড়ো ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। তখন আমাদের সকলেরই সলিলসমাধি হবে।’

“গ্যাব্রিয়েল মন্তব্য করলেন, ‘তাহলে আমি আর মার্তোস ভিতরে গিয়ে দেখে আসি, তোমরা এখানে অপেক্ষা করো।’

“আমি বললাম, ‘আমরা সবাই মিলেই তো যেতে পারি! ভিতরে যদি কোনও বিপদ হয়?’

“তিনি জানালেন, ‘বিপদের পরোয়া আমি করি না। এই রেডারে এখনও পর্যন্ত আমাদের চারপাশে কোনও বড়ো প্রাণীর অস্তিত্ব ধরা পড়ছে না। আধঘণ্টার মধ্যেই ফিরে আসব। তাছাড়া ওয়াকিটকিতে যোগাযোগ তো থাকছে।’

“কথাটা শেষ করে অ্যান্টি-চেম্বার দিয়ে বিটলের বাইরে বেরিয়ে ওয়াটার-স্কুটি চালিয়ে পা নাড়তে নাড়তে চলে গেলেন গ্যাব্রিয়েল আর মার্তোস। আমরা কাচের ভিতর থেকে তাকিয়ে রইলাম। মাথায় বাঁধা টর্চগুলির আলো দেখা গেল অনেকক্ষণ। তারপর মিলিয়ে গেল গভীর জলের মধ্যে গুহার অন্ধকার বাঁকে। আমার মনের মধ্যে তখন তোলপাড় চলছে। গ্যাব্রিয়েল কি সত্যিই শুধুমাত্র দেবতার মূর্তি খোঁজার জন্য এতটা ঝুঁকি নিলেন? নাকি এর পিছনে আছে অন্য কোনও উদ্দেশ্য? আগেরবারে যখন নেমেছিলাম এই মৃত আগ্নেয়গিরির ভিতর, তখন যেমন অদ্ভুত একটা অনুভূতি হয়েছিল, সেইরকম শিরশিরানি অনুভূতিটা শুরু হল আবার। যেন মনে হল বিটলের বাইরেই ঝাঁক বেঁধে এসে দাঁড়িয়েছে অচেনা কোন প্রাণীর দল। সার্চ লাইটের আলোয় তাদের দেখা যাচ্ছে না বটে, কিন্তু তারা আছে। ঘোলাটে জলের মধ্যে নড়েচড়ে বেড়াচ্ছে। অথচ গ্যাব্রিয়েল বললেন তাঁর যন্ত্রে কোনও বড়ো প্রাণীর অস্তিত্ব ধরা পড়ছে না। তার মানে কি আমার নিজের মনের ভুল? নাকি বিশেষ কোনও কারণে ওই প্রাণীদের উপস্থিতি ধরা পড়ছে না এই যন্ত্রে!

“জ্যাক গরম কফির কাপ আমার হাতে ধরিয়ে হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমাকে কত পার্সেন্ট দেবে বলেছে?’

“বুঝলাম না।’

“এই যে আজকে এত সোনাদানা পাওয়া গেল, এর মধ্যে তোমার ভাগ কী?’

“জানালাম, ‘পার্সেন্টের কথা তো হয়নি ওঁর সঙ্গে। বলেছেন, আমাকে উপযুক্ত পারিশ্রমিক দেবে। সেটা কত, তা আমি জানি না।’

“জ্যাকের চোখেমুখে ছড়িয়ে গেল একটা ক্রুর হাসি। ‘আগেরবারেই তোমাকে দেখে বুঝেছিলাম তোমার মধ্যে সাহস থাকলেও দূরদর্শিতা তেমন নেই। গ্যাব্রিয়েলের কোনও কথায় বিশ্বাস নেই আমার। বিটল নিয়ে এখন যদি আমরা ফিরে যাই, তাহলে এই সমস্ত কিছু আধাআধি করে নিতে পারব। ভেবে দেখো, বিশ্বের সবথেকে ধনী ব্যক্তি হয়ে যাবে রাতারাতি। তোমার পরের সাত পুরুষ এই সম্পদ খরচ করে শেষ করতে পারবে না।’

“মানে!’

“ভেরি সিম্পল। ওপরে গিয়ে বলব তারা গুহায় ঢুকেছিল, কিন্তু আর ফিরে আসেনি।’

“কিন্তু ওঁরা তো কিছুক্ষণ পরেই ফিরে আসবেন!’

“হ্যাঁ, সে হয়তো আসবে। কিন্তু সাবমেরিন ছাড়া এত গভীর সমুদ্রের মধ্যে থেকে ওপরে উঠতে পারবে কি? আর উঠলেও আমরা তখন এখানে থাকছি কোথায়? সামুদ্রিক প্রাণীরা ওদের হাড়গোড় সমেত খেয়ে ফেলবে।’

“আমি কিছুক্ষণ গুম খেয়ে থেকে উত্তর দিলাম, ‘বিশ্বাসঘাতকতা আমার রক্তে নেই।’

“হা হা হা… তুমি কী ভাবছ, গ্যাব্রিয়েল ধোয়া তুলসিপাতা? ও নিজের ছোটো ভাই নিকোলাসকে খুন করেছে এই সম্পত্তির জন্য। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের সবথেকে বড়ো বে-আইনি ড্রাগ ডিলার আর আন্ডারওয়ার্ল্ড মাফিয়া ডনের নাম গ্যাব্রিয়েল গুয়ার্দাদো। একটু খোঁজ নিলেই সব জানতে পারবে। আজ পর্যন্ত কত মানুষকে সমুদ্রে মাংসাশী হাঙরের মুখে ফেলে হত্যা করেছে ও, সেটা জানো?’

“নিজের ভাইকে খুন করেছেন গ্যাব্রিয়েল!’

“ডলফিনের ভাষা রপ্ত করেছিল নিকোলাস। সে নিজের তৈরি যন্ত্রের মাধ্যমে তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারত। এই ডুবন্ত আগ্নেয়গিরির নীচে লুকিয়ে থাকা গুপ্তধনের খোঁজ নিকোলাস আগেই পেয়েছিল তার পোষা ডলফিনের মাধ্যমে। সেই নিয়েই দুই ভাইয়ের ঝামেলা শুরু হয়। তাছাড়া বাজাউদের দিয়ে গ্যাব্রিয়েল অনেক বে-আইনি জিনিস আনা-নেওয়া করত। নিকোলাস বাধা দিচ্ছিল সেইসব কাজে। তারপর হঠাৎ একদিন নিরুদ্দেশ হয়ে গেল নিকোলাস। এখনও তার হদিস কেউ জানে না। সে বেঁচে থাকলে হয়তো অ্যাজটেকদের হারিয়ে যাওয়া এই গুপ্তধন অনেক আগেই উদ্ধার করা যেত।’ কিছুটা দম নিয়ে সে আবার বলল, ‘আমরা এখন যেখানে আছি সেটা মেজাম্বাদের গড়। গ্যাব্রিয়েলের অভিশপ্ত ভাগ্যই ওকে নিয়ে গেছে ওই সুড়ঙ্গের ভিতরে। যেখান থেকে ফেরা অসম্ভব। পৃথিবীতে অ্যাজটেকরা আসার বহু আগে থেকে ছিল মায়া সভ্যতা। ওরা এসে মায়াদের সর্বস্ব কেড়ে নিয়েছিল। তারপর যখন ওদের দেবতা তালোক-এর আদি মূর্তি তলিয়ে গেল মহাসমুদ্রে, হেরে গেল অ্যাজটেকরা। কিন্তু এখনও কয়েক হাজার বছরের শত্রুতা বয়ে বেড়াচ্ছে এরা। তালোক-এর মূর্তিটি উদ্ধার করতে পারলে আবার আমাদের ওপর আক্রমণ হবে। এটা আমি কিছুতেই হতে দেব না।’

“তখন ধীরে ধীরে বুঝতে পারছি ওর মনের কথা। জিজ্ঞেস করলাম, ‘তার মানে, তুমি মায়াদের বংশধর?’

“জ্যাক মাথা নেড়ে বলল, ‘আমার পূর্বপুরুষ দক্ষিণ আমেরিকার অধীশ্বর ছিল একসময়ে। ভাগ্যের ফেরে আজ আমি এদের চাকর। তবে এর প্রতিশোধ আমি নেবই। তার জন্য কারোর প্রাণ নিতে হলেও পিছপা হব না।’

“কী বলছ তুমি!’

‘মেজাম্বারা হল সমুদ্রের শয়তান। কত শত জাহাজকে ডুবিয়ে দিয়েছে। জলের নীচে সুরেলা স্বরে এক অদ্ভুত ভাষায় কথা বলে ওরা। নিকোলাস সেই ভাষা বোঝার জন্য একরকম যন্ত্র তৈরি করেছিল। সেই যন্ত্রটি সঙ্গে নিয়ে গুহায় ঢুকেছে গ্যাব্রিয়েল। কিন্তু সেখান থেকে ও আর কোনোদিনই ফিরবে না। ওর বংশের সবার মতো, ওর কপালেও লেখা আছে সলিলসমাধি।’

“আমি ওদের মৃত্যুর মুখে ছেড়ে দিয়ে চলে যেতে পারব না।’

“তার মানে তুমি আমার কথা বিশ্বাস করছ না?’

“দৃঢ়ভাবে বললাম, ‘না। করছি না।’

কথা বলতে-বলতেই জ্যাকের চোখেমুখে ফুটে উঠছিল ভয়ংকর প্রতিহিংসার ছায়া। বুঝতে পারছিলাম, বংশানুক্রমিক শত্রুতা ডালপালা ছড়িয়ে হয়ে উঠছে মহীরুহ। এত সোনাদানা দেখে ও নিজের মাথাটা ঠিক রাখতে পারছে না। মুহূর্তের মধ্যে একটা ছোরা নিয়ে আক্রমণ করে বসল আমাকে। এই আক্রমণটার জন্য আমি তৈরি ছিলাম। চোখের পলকে আমি দু’পা পিছিয়ে এসে ওকে জুজুৎসুর প্যাঁচে চেপে ধরলাম। জ্যাকের হাত থেকে খসে পড়ল ছোরা। ধীরে ধীরে শুয়ে পড়ল মেঝেতে। কিন্তু জ্যাকও মরণ কামড় দেওয়ার চেষ্টা করছে। আমাকে ধাক্কা দিয়ে শুইয়ে দিল মেঝেতে। ওর শরীরে তখন অসুরের শক্তি। এদিকে আমাদের ধাক্কাধাক্কির ফলে বিটলের কন্ট্রোল প্যানেলের কি-বোর্ডে আঘাত লাগতেই নড়ে উঠল যানটি। ফলে বন্ধ হয়ে গেল সবক’টা মনিটর। জ্যাক তখনও হাল ছাড়েনি। চেষ্টা করে চলেছে আমাকে কব্জা করার। মেঝের মধ্যে ধস্তাধস্তি চলছে। একবার আমার বুকের উপর ও চেপে বসছে, তো আরেকবার জ্যাকের পিঠের উপর আমি। এর মধ্যেই গ্যাস সিলিন্ডারে মাথা ঠুকে চিৎকার করে নিস্তেজ হয়ে গেল সে। দেখলাম, জ্ঞান হারিয়েছে জ্যাক।

“এদিকে আধঘণ্টার ওপর হয়ে গেছে তখনও গ্যাব্রিয়েল আর মার্তোসের দেখা নেই। লড়াই করতে গিয়ে আমিও হাঁফিয়ে উঠেছি। গলায় জল ঢেলে একটু শান্ত হলাম। তারপর রেডিও সিগন্যাল পাঠানোর চেষ্টা করলাম বারবার। কিন্তু কোনও উত্তর এল না। শেষে ঠিক করলাম আরও আধঘণ্টা অপেক্ষা করে বের হব এই বিটলের মধ্যে থেকে। ওদের যেভাবেই হোক খুঁজে বের করতে হবে। এমনিতেও এই যান চালানো আমার একার পক্ষে সম্ভব নয়।”

“তারপর?” অরুণদাদুর কথা থামতেই চার মূর্তি একসঙ্গে প্রশ্ন করে উঠল।

তাঁর কপালে তখন বিন্দু বিন্দু ঘাম। বোঝা যাচ্ছিল এত বছর পরেও কথাগুলি মনে করতে গিয়ে রীতিমতো উত্তেজিত হয়ে উঠেছেন তিনি। গলাটা ভিজিয়ে নিয়ে তিনি আবার শুরু করলেন, “আরও আধঘণ্টা অপেক্ষা করে আমি পোশাক পরে বাইরে এলাম। ঠাণ্ডা কালো জল। আগেরবারের সেই স্মৃতি ভেসে উঠছিল চোখের সামনে। কিছুটা এগোতেই মনে হল নিকষ কালো জলের মধ্যে কারা যেন ওত পেতে আছে আমাকে ধরবে বলে। হতে পারে মনের ভুল, কিন্তু সেই শুনশান গভীর জলে সাঁতার কাটতে কাটতে ভাবছিলাম আর হয়তো ওপরের পৃথিবীতে ফিরতে পারব না কোনোদিন।

“জাহাজের ভাঙা টুকরোগুলি পেরিয়ে দুশো মিটারের মতো গিয়ে শুরু হল সেই গুহার মুখ। সুড়ঙ্গটির গড় ব্যাস মোটামুটি দশ-পনেরো ফুট হবে। এদিক ওদিক এঁকেবেঁকে এগিয়েছে। ওয়াটার-স্কুটি চালিয়ে আমি এগিয়ে চললাম ভিতরের দিকে। ক্রমশ চারপাশের পরিবেশটা পালটাতে শুরু করল। সূচালো পাথরের অঞ্চলটা শেষ হয়ে শুরু হল গোলাকৃতি চকচকে পাথর। অদ্ভুত ব্যাপার, পাথরগুলির রং সব সাদা! সেই রাশি রাশি সাদা পাথরের এলাকা পেরিয়ে এক অজানা জগতে প্রবেশ করলাম আমি।

“মনের মধ্যে তোলপাড় চলছে। কারা এই মেজাম্বা? কোথা থেকে এসেছে? কেউ ভাবে এরা ঈশ্বরের পুত্র, কেউ ভাবে এরা মহাসমুদ্রের দানব। আসলে কি এরা কোনও সময়ে মানুষ ছিল? কিংবা মানুষের পূর্বপুরুষ! বিজ্ঞানীদের মতে পৃথিবীতে প্রথম প্রাণের সৃষ্টি হয়েছিল সাড়ে চারশো থেকে সাড়ে তিনশো কোটি বছর আগে। সেটা ছিল জলের মধ্যে তৈরি এককোষী অ্যামিবা। বানর প্রজাতির প্রাণী থেকে আদিম মানুষ তৈরি হয় আনুমানিক এগারো লক্ষ বছর আগে। সেই এককোষী অ্যামিবা থেকে ক্রমবিবর্তনের মাধ্যমে এই মানুষ হওয়ার আগে পর্যন্ত তো অনেক প্রাণী তৈরি হয়েছিল। তাদের মধ্যে আবার অনেকে আবার চিরতরে মুছেও গেছে পৃথিবী থেকে। কিন্তু সমুদ্রের গভীরে যদি সেরকম কোনও আদিম প্রাণী লুকিয়ে থাকে আমাদের চোখের আড়ালে! ব্যাপারটা একেবারে অসম্ভব তো নয়! এইসব ভাবতে-ভাবতেই এগিয়ে যাচ্ছিলাম সেই গুহার ভিতরে।

“তবে কিছুটা এগোতেই আমার পথ আটকাল এক বিশালাকৃতি অক্টোপাস। ভালো করে লক্ষ করে মনে হল, এই অক্টোপাসটাই আগেরবারে জাহাজের খোলের ভিতর বাধা দিয়েছিল আমাদের। তার হাবভাব দেখে মনে হল যেন সে হল এই গুহার প্রহরী। তাকে পাশ কাটিয়ে গিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলাম বটে, কিন্তু চোখের পলকে লম্বা শুঁড়ে জড়িয়ে চেপে ধরল আমায়। তারপর শুঁড়ের চাপ বাড়তে লাগল। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে আমার। দেখলাম শরীরের সমস্ত শক্তিকে একজোট করেও ওই দানবের সঙ্গে লড়াই করা সম্ভব নয়। অক্টোপাসের আলিঙ্গন ধীরে ধীরে রক্ত চলাচল বন্ধ করে দিচ্ছিল। হাত-পা নাড়ার আর ক্ষমতা নেই এক চুল। বুঝলাম মৃত্যু আসন্ন। পরক্ষণেই জলের মধ্যে একটা তীব্র আলোর ঝলকানি আর বিস্ফোরণের শব্দ কানে এল। অক্টোপাসের শুঁড়গুলি আলগা হয়ে যেতে প্রাণ ফিরে পেলাম। জন্তুটা নেতিয়ে পড়ল আস্তে আস্তে। মনে হল কেউ জলের মধ্যে গুলি চালিয়েছে। পিছন ঘুরে দেখি জ্যাক পোশাক পরে হ্যান্ড-স্কুটি নিয়ে আমার দিকেই তেড়ে আসছে। গুলিটা সম্ভবত ও-ই চালিয়েছিল আমাকে লক্ষ্য করে। শেষমুহূর্তে মাথাটা সরিয়ে নেওয়ার জন্য অক্টোপাসটিকে আঘাত করেছে। শুঁড়গুলিকে ছাড়িয়ে নিয়ে আমিও হ্যান্ড-স্কুটি চালিয়ে দিলাম জোরে। গুহার বাঁকটা ঘুরে যাওয়ার আগে আরও দুটো ফায়ার করল সে। কপাল ভালো ছিল, তাই সেগুলিও লক্ষ্যভ্রষ্ট হল।

“ওয়াকিটকিতে গলা শুনতে পেলাম জ্যাকের, ‘পালানোর রাস্তা নেই ঘোষ। ফিরে এলে প্রাণে বাঁচবে। নইলে এই গুহায় সলিলসমাধি।’

“গুহাটার সঙ্গে আমিও এঁকেবেঁকে ক্রমশ নামছিলাম নীচের দিকে। পিছনে তাড়া করে আসছে জ্যাক। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা আর্তনাদ কানে এল রেডিওতে। জ্যাকের চিৎকার। আমি থমকে গেলাম। প্রথমে ভাবলাম, হয়তো এটা ওর একটা ফাঁদ। মনের ভিতরে অজানা আতঙ্কে তোলপাড় শুরু হয়েছে তখন। কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ সাড়াশব্দ না পেয়ে ধীরে পিছিয়ে এলাম। আমার মাথায় লাগানো টর্চের আলোয় চোখে পড়ল জলের মধ্যে ভাসছে শুধু একটা কাটা পা। লাল রক্ত বেরিয়ে কালো জলে মিশছিল। আর কেউ কোথাও নেই। বুকের ভেতরটা মুহূর্তের মধ্যে ফাঁকা হয়ে গেল।

“এখানে এসে থেকে একটাও হাঙরের দেখা পাইনি। ওই অক্টোপাসটা ছাড়া আর কোনও প্রাণীই ছিল না এখানে। তাহলে এটা কার কাজ! শুকিয়ে আসছিল সমস্ত সাহস। কী করব, সামনে এগোব, না পিছনে ফিরে যাব? এই দোলাচলে স্থির হয়ে রইলাম অনেকক্ষণ। শেষে কীসের আকর্ষণ যে আমাকে ফিরে যেতে দিল না সেটা আজও বুঝে উঠতে পারিনি। বুঝতে পারছিলাম সামনে আর পিছনে দু’দিকেই ওত পেতে আছে মৃত্যু। সুযোগ পেলেই জাপটে ধরবে আমাকে। শরীরটা টানটান হয়ে গেল হঠাৎ। একটা অনমনীয় জেদ চেপে বসল মাথার মধ্যে। আবার এগিয়ে চললাম সুড়ঙ্গের ভিতর। মাঝে ওয়াকিটকিতে একটা অস্পষ্ট শব্দ পেয়েছি। তবে কি গ্যাব্রিয়েল আর মার্তোস কাছাকাছিই আছে?

“বড়ো সুড়ঙ্গ থেকে অনেকগুলি অলিগলি বেরিয়েছে। প্রতিটাতেই টর্চের আলো ফেলে দেখে নিচ্ছি ভিতরে যদি আটকে থাকে কেউ। শুধু মনে হচ্ছিল আর একটু পরেই হয়তো অপেক্ষা করে আছেন ওঁরা; আর একটা বাঁক ঘুরলেই নিশ্চয়ই দেখা পাব গ্যাব্রিয়েল আর মার্তোসের। একটা আলোর আভা আসছে ভিতর থেকে। তবে কি ওঁদের কারও টর্চের আলো! আরও কিছুটা এগিয়ে গেলাম। আলোর দ্যুতিটা বাড়তে লাগল। বুঝতে পারলাম, এটা কোনও টর্চের আলো নয়। এই সাদা আলোর উৎস নিশ্চয়ই অন্যকিছু। হ্যান্ড-স্কুটিটা বন্ধ করে ধীরে ধীরে সাঁতার কাটতে লাগলাম। গুহাটা শেষ করে আমি পৌঁছে গেলাম একটা বিশাল খোলা প্রান্তরে যার মাঝখানে ছিল উজ্জ্বল একটা সাদা আলোর স্ফটিক। তার থেকে বিচ্ছুরিত আলো পুরো জায়গাটাকে দিনের মতো করে রেখেছে। সমুদ্রের এত গভীরে কীসের আলো? ওই সাদা স্ফটিকটা অদৃশ্য আকর্ষণে আমাকে টেনে নিয়ে চলেছে ওর দিকে। দেখলাম, ওটার চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে সুন্দর সুন্দর রঙিন প্রাণীর দল। কিন্তু আমি তাদের কাউকেই চিনি না। ঠিক যেন একটা সুন্দর সাজানো অ্যাকোয়ারিয়াম! অবাক হয়ে দেখছিলাম তাদের। আমার গা ঘেঁষে চলে গেল একেকটা ঝাঁক। জলের মধ্যে যেন রামধনু রঙের অজস্র রেখা। তবে অবাক ব্যাপার, আমার প্রতি তাদের কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই। আবার নীলচে সবুজ রঙের একধরনের তরঙ্গ কেঁপে কেঁপে ঘুরে বেড়াচ্ছিল চারদিকে। আচমকা আমার শরীরে সেই তরঙ্গটা এসে আঘাত করল। মনে হল মাথার মধ্যে চিনচিন করে উঠল। অবশ হয়ে গেল হাত-পা। সমস্ত চেতনা লোপ পেল আস্তে আস্তে।

“এর কতক্ষণ পর চোখ খুলে তাকিয়েছি জানি না। প্রচণ্ড উজ্জ্বল আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছিল আমার। স্বপ্ন দেখছি না সত্যি, বোঝার ক্ষমতা ছিল না। আমার হাত ধরে কেউ যেন টেনে নিয়ে চলেছে জলের মধ্যে। ভালো করে তাকিয়ে দেখি একটা সাদা অক্টোপাস তার শুঁড় দিয়ে টানতে টানতে নিয়ে চলেছে আমাকে। তার শুঁড় থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার ক্ষমতা ছিল না আমার। আরও কিছুক্ষণ পর খেয়াল করলাম, আমাকে একটা বড়ো বুদবুদের মতো বড়ো বাতাসভরা বেলুনে ঢুকিয়ে দিল সে।

“ভিতরটা বেশ গরম। জলের চাপ নেই একদম। অক্সিজেন সিলিন্ডার ছাড়াই নিঃশ্বাস নিতে পারছি। বেলুনটি আমাকে বয়ে নিয়ে ভেসে চলল অন্যদিকে। অবাক চোখে তাকিয়ে ছিলাম সেই অচেনা জগতের দিকে। কত অদ্ভুত বিচিত্র প্রাণীরা বাস করে এখানে যাদের আমি জীবনে কোনোদিন ছবিতেও দেখিনি। বড়ো বড়ো রঙিন শ্যাওলা জলের স্রোতে ঢেউয়ের মতো মাথা নাড়ছে। সেই বেলুনের মধ্যে বন্দী হয়ে কোনদিকে চলেছি আমি জানি না। আমার গতিপথে নিজের আর কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। এগিয়ে চলেছি ভাসতে ভাসতে। নেশার ঘোরের মতো তন্দ্রাচ্ছন্ন চোখে যা কিছু দেখছি সবই মনে হচ্ছে যেন স্বর্গীয় দৃশ্য। কিছুটা ছাড়া ছাড়া আরও কত রঙিন বেলুন ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাতেও আটকে আছে মানুষ। ভালো করে লক্ষ করে দেখলাম, ওরা তো কেউ মানুষ নয়। কারো পা দুটো জুড়ে লেজের আকার নিয়েছে, কারোর হাত দুটো ডানায় বদলে গেছে। তারা সবাই বেলুনের মধ্যে নড়াচড়া করছে আস্তে আস্তে। কারা এরা?

“চোখে পড়ল বিশালাকৃতি একটা গাছ। একশোটা মানুষ হাত ধরাধরি করেও গাছটির বেড় পাবে না এমনই তার আয়তন। পাতা আর ডালপালার বদলে গাছটির গায়ে অক্টোপাসের মতো সরু মোটা, ছোটোবড়ো অসংখ্য শুঁড়। জলের মধ্যে শুঁড়গুলি হেলেদুলে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বেলুনের মধ্যে ভাসতে ভাসতে গিয়ে হাজির হলাম গাছটির কাছে। দেখি অন্য বুদবুদগুলির মধ্যে আটকে থাকা মানুষগুলি ঘোলাটে চোখে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। তারা যেন অচেনা কোনও প্রাণীকে দেখছে। আশ্চর্যের বিষয় তাদের মধ্যে দু’জনকে আমি চিনতে পারলাম। আমাদের ডুবে যাওয়া জাহাজ ‘ওডা নোবুনাগার ক্যাপ্টেন আর এক খালাসি! কিন্তু ওরা এখানে এল কীভাবে? তারা আমাকে চিনতে পারছে না। অদ্ভুত তাদের চোখের দৃষ্টি। তাদের শরীরের মধ্যেও পরিবর্তনগুলি স্পষ্ট।

“আচমকা একটা বিস্ফোরণের শব্দ…

“চোখ ঝলসানো আলো। চমকে উঠলাম। কানে এল একটা তীব্র শিস দেওয়ার মতো শব্দ। সারা শরীর ঝিমঝিম করতে শুরু করল সেই আওয়াজে। দেখলাম বড়ো বড়ো ফার্ন ঘাসের মতো শ্যাওলার জঙ্গল থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে বেরিয়ে আসছে অদ্ভুত এক প্রাণী। তাদের মাথাটা অনেকটা মানুষের মতো হলেও বেশ সূচালো। লোমহীন শরীর। গোলাকৃতি চোখ দুটি মাথার দু’পাশে বাসানো। কান দুটি মাছের কানকোর মতো। দুটো হাত পাখনার আকৃতি নিয়েছে, আর পা দুটো জুড়ে গিয়ে হয়ে গেছে বড়ো লেজের মতো। দাঁতগুলি মাংসাশী প্রাণীর মতো হিংস্র। এই তাহলে মেজাম্বা! সারা শরীর থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছে এক নীলচে আলো। কিন্তু তাদের শরীরগুলি জলের রঙের সঙ্গে মিশে আছে যেন।

“কিন্তু ওরা ঝাঁক বেঁধে প্রাণের ভয়ে পালাচ্ছে কেন? হঠাৎ একটা হারপুন ছুটে এসে ফাঁসিয়ে দিল আমার বেলুন। দেখি গ্যাব্রিয়েল হ্যান্ড-স্কুটি নিয়ে তিরবেগে ছুটে আসছে এদিকে। তার পিছনে মার্তোস, আর একটি ছোটো মেজাম্বা। কানে লাগানো যন্ত্রে রেডিও সিগন্যাল পেলাম। ওরা বলছে, ‘পালাও! পালাও! মৃত আগ্নেয়গিরি জেগে উঠেছে।’

“কথাটা শুনে খেয়াল হল লাল আগুনের গোলা ধেয়ে আসছে ভিতর থেকে। জলটা গরম হয়ে উঠছে হু হু করে। আমার হুঁশ ফিরল। স্কুটিতে স্টার্ট দিয়ে তিরবেগে পিছু নিলাম ওদের। একবার পিছন ফিরে দেখলাম বিশাল গাছটা কাঁপতে কাঁপতে পুড়ে গেল লাভার স্রোতের মধ্যে। পিছনে অন্য প্রাণীরাও সাঁতার কেটে আসছে প্রাণ বাঁচানোর জন্য। মেজাম্বারা একে একে লাল লাভায় পড়ে ছটফট করছিল। অন্য প্রাণীগুলিও পুড়ছে। কিন্তু আমি ভাবছি, এই বাচ্চা মেজাম্বাটিকে কোথায় পেলেন গ্যাব্রিয়েল?

“বাচ্চাটির হাত ধরে ওয়াটার-স্কুটি চলিয়ে তিরবেগে সুড়ঙ্গের মধ্যে ঢুকে যেতেই গুহার মুখের দিকে একটা ডিনামাইট ছুড়ে দিলেন গ্যাব্রিয়েল। আবার বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল জায়গাটা। জলের ধাক্কায় আমরা আছাড় খেলাম পাথরের গায়ে। পাথর ভেঙে গুহার মুখটা বন্ধ হয়ে গেল। গলন্ত লাভার স্রোতকে কিছুক্ষণের জন্য হলেও আটকে দেওয়া গেছে। আমরা প্রচণ্ড বেগে এগোতে থাকলাম সুড়ঙ্গের মধ্যে দিয়ে।

“বিটলে পৌঁছে মেশিন স্টার্ট করা হল। তারপর সমুদ্রের ওপরে উঠে আসতে সময় লাগল আরও কয়েক মিনিট। কিন্তু তার মধ্যেই যা সর্বনাশ হওয়ার তা হয়ে গেছে আমাদের।”

মৌ উত্তেজিত হয়ে প্রশ্ন করল, “আবার কী হল?”

“আগ্নেয়গিরির পেটের ভিতরে তখন শুরু হয়েছে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ। গলিত লাভা প্রবল বেগে বেরিয়ে আসছে ভিতর থেকে। থরথর করে কাঁপছে বিটল। লাভা ছিটকে এসে জড়িয়ে ধরল ডুবোজাহাজের নীচে। ফলে কিছুক্ষণের মধ্যেই ধাতব পাত পুড়ে গিয়ে হু হু করে জল ঢুকতে শুরু করল ভিতরে। আমরা তড়িঘড়ি অক্সিজেন সিলিন্ডার পিঠে বেঁধে বেরিয়ে এলাম বাইরে। জল তখন প্রায় ফুটতে শুরু করেছে। তার মধ্যেই হ্যাঁচোড়প্যাঁচোড় করে উঠে এলাম ওপরে অপেক্ষারত জাহাজে। কিন্তু বিটলকে আর বাঁচানো গেল না। তলিয়ে গেল সে। তখন ধোঁয়ায় ভরে যাচ্ছে চারপাশ। বাতাসে তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ। জাহাজটিকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দূরে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হল। যখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম সূর্য ডুবে গেল পশ্চিম আকাশে। অন্ধকার নেমে আসছে। সমুদ্রের মাঝখানে কালীপুজোর হাজারো তুবড়ির মতো লাল আগুন ছেটাতে থাকল সদ্য জেগে ওঠা আগ্নেয়গিরি।

“যে ছোটো মেজাম্বাটিকে গ্যাব্রিয়েল আর মার্তোস সঙ্গে করে এনেছিল তাকে টর্চের আলোয় খুঁটিয়ে দেখে অবাক হয়ে গেলাম। তার আকৃতি অনেকটা মানুষেরই মতো। মাথার দিকটা চ্যাপটা হয়ে এসেছে। চোখ দুটো গোল আর হলুদ। সারা গায়ে কোনও লোম নেই। তার বদলে ছোটো ছোটো আঁশ গজিয়েছে। হাত দু’খানা অনেকটা ডলফিনের ডানার মতো। পা দুটো জুড়ে চ্যাপটা হয়ে মাছের লেজের আকৃতি নিয়েছে। জল থেকে ওপরে তুলতেই সে ছটফট করতে শুরু করেছিল। একটা চৌবাচ্চায় ছেড়ে দিতে শান্ত হল সে। তার গায়ের রং জলের বাইরে বেশি নীলচে লাগছিল। জলে ছেড়ে দিতে আবার মিশে গেল জলের রঙের সঙ্গে। আমি ভাবছিলাম একে যেন কোথায় দেখেছি। হঠাৎ মাথায় এল, এই কি পেড্রো? কথাটা গ্যাব্রিয়েলের কাছে জানতে চাইতে তিনি বললেন, ‘ঠিক ধরেছ। একে বাঁচিয়ে রাখা আমার কাছে একটা চ্যালেঞ্জ। তবে এ মানুষের চেহারায় হয়তো আর ফিরতে পারবে না কোনোদিন।’

“ধপাস করে বসে পড়লাম ডেকে। ঢোঁক গিলে বললাম, ‘আমার সব গুলিয়ে যাচ্ছে! ব্যাপারটা একটু খুলে বলুন।’

“আগে একটু পানীয় খেয়ে ধাতস্থ হয়ে নাও। গুছিয়ে বলছি সবকিছু।’

অরুণদাদুও আরেক প্রস্থ চা পানের বিরতি নিলেন। বাইরে ঝড়ের দাপট আরও বেড়েছে। খুদেদের চোখের বিস্ময় তখনও কাটেনি।

“নিন দাদু, শেষটা বলে ফেলুন ঝটপট। মা আজকে খিচুড়ি বসিয়েছে। উনুন থেকে হাঁড়ি নামানোর আগে গল্পটা শেষ করতে হবে।”

মৌয়ের গলা শুনে অরুণদাদু আবার নড়েচড়ে বসে শুরু করলেন, “অন্ধকার আকাশের গায়ে কোটি কোটি নক্ষত্রের আলো মিটমিট করছিল তখন। জাহাজের ডেকে বসে গ্যাব্রিয়েল বললেন, ‘পৃথিবীর উপরিভাগের তিন ভাগের এক ভাগ জায়গা জুড়ে রয়েছে প্রশান্ত মহাসাগর। জনপ্রাণীহীন তেষট্টি কোটি আশি লক্ষ বর্গ মাইল অঞ্চল শুধু জল। এখানে এমন অনেক রহস্যময় জিনিস আছে যা মানুষের কাছে অধরা।’

‘যেমন এই মেজাম্বা?’

‘ওর থেকেও সাংঘাতিক কিছু। শুনলে অবাক হবে, ভিনগ্রহী প্রাণীদের লঞ্চপ্যাড আছে এখানে। অন্তরীক্ষের প্রাণীরা এখান থেকেই যাতায়াত করে বাইরের দুনিয়ায়। অনেকেই দেখেছে, আকাশ থেকে নেমে উল্কার মতো সোজা জলের গভীরে চলে যায় মহাকাশের যান।’

“প্রশ্ন করলাম, ‘তার মানে মেজাম্বারা অন্য গ্রহের প্রাণী?’

“গ্যাব্রিয়েল জানালেন, ‘না। ভিনগ্রহী প্রাণীরা মানুষকে বিশেষ পদ্ধতিতে মেজাম্বা তৈরি করে। সমুদ্রের নীচে অসংখ্য শুঁড়ওলা বিশাল গাছের মতো দেখতে যে প্রাণীটাকে দেখেছিলে, মনে আছে? সেটাই ছিল সম্ভবত অন্য গ্রহ থেকে আসা প্রাণী। কতদিন আগে, কতদূর থেকে এসে ও ঘাঁটি গেড়েছিল মহাসমুদ্রের নীচে তা আমরা জানি না। হয়তো ওর মতো আরও আছে। গত কয়েক শতাব্দীতে যত মানুষ ডুবেছে এই মহাসমুদ্রে, তাদের মধ্যে বেশ কিছু লোক এখন মেজাম্বা হয়ে গেছে। তাদের ওরা ক্রীতদাসের মতো কাজে লাগায়।’

“মানে?’

“তিনি একটু থেমে আবার বললেন, ‘আমরা যেখানে ঢুকেছিলাম, সেটা ছিল ওই গুহার প্রথম ভাগ। ওর পিছনেও অনেকগুলি আস্তানা আছে ওদের।’

“কী চায় ওরা?’

“একটু থেমে গ্যাব্রিয়েল বললেন, ‘খুব সহজভাবে বলতে গেলে ওরা পৃথিবীর দখল নিতে চায়। মানুষের থেকে উন্নততর কোনও মাংসাশী ভিনগ্রহীর যদি প্রাণীজ প্রোটিনের ঘাটতি হয়, তবে সেই চাহিদা মেটানোর জন্য পৃথিবীর জীবগুলিকে টার্গেট করতে পারে। এত বিচিত্র রকমের প্রাণী অন্য কোনও গ্রহে আছে বলে তো মনে হয় না। আর পৃথিবীকে দখল করতে গেলে মানুষের সঙ্গে লড়াই করতে হবে। তার জন্য প্রয়োজন বিশাল বুদ্ধিমান সৈন্যবাহিনীর। সেই কাজই করছিল এই এরা। সমুদ্রে ডুবে যাওয়া মানুষদের ধরে, তাদের বিশেষ ধরনের বেলুনের মধ্যে পুরে জিনগত পরিবর্তনের মাধ্যমে মেজাম্বা তৈরি করছিল। তবে বাজাউদের ওরা কোনও ক্ষতি করেনি। বরং বন্ধু সেজে অনেকবার প্রাণ বাঁচিয়েছে। পরিবর্তে অ্যাজটেক আর মায়াদের কাল্পনিক যুদ্ধের গল্প বানিয়ে বাজাউরা মেজাম্বাদের করে দিয়েছে ঈশ্বরের পুত্র।’

“আমি জানতে চাইলাম, ‘বেশ। কিন্তু আপনি এতকিছু জানলেন কী করে?’

“গ্যাব্রিয়েল জানালেন, ‘এর কৃতিত্ব আমার ভাই নিকোলাসের। ও প্রশান্ত মহাসাগরে যে ভিনগ্রহী প্রাণীদের যান ওঠানামা করে, তা নিয়ে গবেষণা করছিল বহুদিন ধরে। অনেক বিজ্ঞানীরা মনে করেন যে অক্টোপাসরা পৃথিবীর প্রাণী নয়। পৃথিবীর জলজ প্রাণী ডলফিন বা তিমিরা হল সবথেকে বুদ্ধিমান প্রাণী। ওদের নিজেদের আলাদা ভাষা আছে। নিকোলাস সেই শব্দ তরঙ্গগুলি থেকে অর্থ বের করেছিল। সেখানে দেখা যায় ডলফিন, তিমি, হাঙর বা অন্য জলের প্রাণীগুলি বিশেষ একটা অঞ্চল এড়িয়ে চলছে। তারপর কারণটা খুঁজতে গিয়ে ও মেজাম্বাদের হাতেই ধরা পড়ে।’

“তাহলে দেবতা তালোকের মূর্তি আনতে যাওয়াটা আপনার আসল উদ্দেশ্য ছিল না। তাই তো?’

“আমার একটাই লক্ষ্য ছিল যেভাবেই হোক এদের গোপন ঘাঁটিটা গুঁড়িয়ে দেওয়া। সেজন্য সঙ্গে অনেকগুলি শক্তিশালী ডিনামাইট নিয়ে গিয়েছিলাম আমি। কিন্তু ডিনামাইট চার্জ করতেই মৃত আগ্নেয়গিরি জেগে উঠল। মহাসাগরের নীচের প্লেট ফুটো হয়ে যাওয়ায় পৃথিবীর পেটের ভেতর থেকে উঠে আসতে লাগল কয়েক লক্ষ বছরের জমা হওয়া লাভা। আপাতত ওদের পৃথিবী দখলের চক্রান্ত ব্যর্থ হয়েছে।’

“জিজ্ঞেস করলাম, ‘ওই অক্টোপাসটি তো পাহারা দিচ্ছিল গুহাপথটা, তাহলে আপনারা ঢুকলেন কী করে?’

“গ্যাব্রিয়েল মাথা নিচু করে বললেন, ‘নিকোলাস সাহায্য করেছিল আমাদের। ও নিজেও এখন মেজাম্বা। তবে ওর পুরনো স্মৃতি একেবারে মুছে যায়নি। নিকোলাস পোষা ডলফিনদের দিয়ে খবর পাঠাচ্ছিল বারবার। আমাদেরই আসতে দেরি হয়ে গেল একটু। সে নিজেই কিছুক্ষণের জন্য অক্টোপাসটিকে সরিয়ে দিয়েছিল গুহার মুখ থেকে। তারপর ওর মাধ্যমেই আমরা পেড্রোকে খুঁজে পেয়েছি। কিন্তু ডিনামাইট চার্জ করার সময় সে মারা গেল।’

“হঠাৎ একটা চিৎকারে চমকে উঠলাম আমরা। দৌড়ে গিয়ে দেখি ডেকের উপর যে চৌবাচ্চার মধ্যে পেড্রোকে রাখা হয়েছিল সেটা খালি। একজন সহকারী জানাল, ‘জন্তুটি নিজেই লাফ দিয়ে সমুদ্রের জলে পড়েছে।’ দৌড়ে জাহাজের পিছনে গিয়ে লক্ষ পড়ল, অন্ধকারে কালো জলের মধ্যে সাদা ফেনার উপর দুরন্ত গতিতে সাঁতার কাটছে সেই মেজাম্বা… মানে পেড্রো! তখন বিশাল মহাসমুদ্রের রাজা সে।”

কিছুক্ষণ ঘরের মধ্যে সবাই চুপ।

“গরম গরম খিচুড়ি আর বেগুনি রেডি। চলে এসো সবাই।” খাবার ঘর থেকে ডাক এল।

অরুণদাদু উঠে পড়লেন চেয়ার ছেড়ে। বললেন, “পেড্রো যখন মানুষ ছিল, খিচুড়ি খেতে খুব ভালোবাসত, বুঝলি!”

আমাদেরও খেয়াল হল, খিদেটা বেশ চাগাড় দিয়ে উঠেছে।

ছবি: শিমূল সরকার

জয়ঢাকের গল্প ও উপন্যাস

1 Response to উপন্যাস মেজাম্বা পুষ্পেন মণ্ডল শরৎ ২০২০

  1. সুদীপ says:

    আগে এইধরনের অনেক লেখা চোখে পড়ত। এখন আর কেউ তেমন লেখে না। মাঝে মাঝে পুষ্পেন্ দার লেখা পড়ে বেশ ছোটবেলায় ফিরে যাওয়া যায়। খুব ভাল লাগল।

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s