উপন্যাস সাইলেনটিয়াম (শেষার্ধ) সুদীপ চ্যাটার্জি বসন্ত ২০১৯

সাইলেন্টিয়াম প্রথম পর্ব–>

 সুদীপ চ্যাটার্জি 

দ্বিতীয় পর্ব

আলোর বিচ্ছুরণের মধ্যে কালো রঙের একটা লম্বা শরীর ঘুরপাক খেতে শুরু করেছে সাবমেরিনটাকে ঘুরে। এই কি সেই প্রাণী?  উত্তেজনায় অয়নদের দমবন্ধ হয়ে গেছে। প্রাণীটার মুখ চোখ কিছুই বোঝা যাচ্ছে না, কিন্তু তার শরীরের নানান জায়গা থেকে বিভিন্ন রঙের আলোর বিচ্ছুরণ হচ্ছে।

এমন সময় ইচিকা আবার চেঁচিয়ে বলল,  “আমি সাবমেরিনটাকে কন্ট্রোল করতে পারছি না,  কিছুতেই পারছি না।”

সাবমেরিনের চারধারে ঝড়ের বেগে ঘুরপাক খেতে খেতে একসময় প্রাণীটা অদৃশ্য হয়ে গেল। অয়নদের চার জোড়া হতভম্ব চোখের সামনের স্ক্রিন জুড়ে পড়ে রইল অন্ধকার।

 ৫।  ২০৩০, নেপচুন থেকে পাঁচ হাজার কিলোমিটার দুরে

আজ আট মাস হল অয়নরা এগিয়ে চলেছে সৌরজগতের শেষ বিন্দুর দিকে। টাইটানের অভিজ্ঞতার জের তাদের এখনো কাটেনি। টাইটানের বুকে কি তারা সত্যি কোন প্রাণীর সাক্ষাত পেয়েছিল?  লেকের গভীরে কোন অজানা কারণে তাদের অত্যাধুনিক সাবমেরিন ভোজবাজির মত লোপাট হয়ে গেল সেটা তারা আজও বুঝে উঠতে পারেনি।

সাবমেরিনের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর কোন কন্ট্রোলই আর কাজ করেনি। পৃথিবীর বাইরে প্রাণের সন্ধান অদ্ভুতভাবে তাদের মনে কোনো আনন্দের সঞ্চার করতে পারেনি। হয়ত অয়ন, ইচিকা, অলিভাররা মনে মনে বিশ্বাস করবে যে সত্যি কোন প্রাণী থাকে টাইটানের লেকের তলায় কিন্তু পৃথিবীর মানুষকে বিশ্বাস করানোর মত প্রমাণ তাদের কাছে নেই। প্র

ফেসর মিগুয়েল আর প্রফেসের ওয়াং এর সঙ্গে এই নিয়ে বহুবার আলোচনা হয়েছে তাদের। তাদের মতে লেকের তলায় সুড়ঙ্গের মধ্যে খুব কম পরিমাণে অক্সিজেন রয়েছে। সেই অক্সিজেনের জোরেই  সুক্ষ্ম কোন জৈবিক প্রক্রিয়ায় প্রাণের সঞ্চার হয়েছে সেখানে। সেই জন্যেই সুড়ঙ্গের মুখে আগুন দেওয়ার ফলে সেখানে আগে থেকে থাকা অক্সিজেন লেকের মিথেন আর অক্সিজেন ফ্লেয়ারের সংস্পর্শে এসে বিস্ফোরণ শুরু করে। এই সুড়ঙ্গগুলোই টাইটানের প্রাণীদের থাকার জায়গা, যদিও বিবর্তন চক্রে তারা অনেক পিছিয়ে আছে।

সময় থেমে থাকে না। একসময় আবার যাত্রা শুরু করেছিল তারা। যত তারা এগিয়েছে, গতিপথের হিসেব করা হয়ে উঠেছে আরো কঠিন। ইউরেনাস আর নেপচুন সূর্যের পরিক্রমা করছে তাদের নিজস্ব কক্ষপথে। সোজা রকেট নিয়ে এগোলে কোন গ্রহ –উপগ্রহই তাদের রাস্তায় পড়বে না। এই আট মাসে তারা সবসুদ্ধ তিনটে জায়গায় অনুসন্ধান চালিয়েছে প্রোব নামিয়ে। তার মধ্যে ইউরেনস এর উপগ্রহ টিটানিয়া আর মিরান্ডা এবং নেপচুনের উপগ্রহ ট্রাইটিয়ম আছে। কোন গ্রহেই প্রাণের কোন চিহ্ণ পাওয়া যায়নি। সূর্য থেকে অনেক দুরে থাকার ফলে হয় এই সব গ্রহ আর উপগ্রহ হয় প্রচন্ড ঠান্ডা, অথবা এখানে সারাক্ষণ হাজার হাজার জীবন্ত আগ্নেয়গিরি থেকে অগ্ন্যুত্পাত হয়ে চলেছে।

গত কয়েকদিন আগে সৌরজগতের শেষ অভিযানের পর এখন শুধু অপেক্ষার পালা। আর কিছুদিন পরেই তারা প্লুটো ছাড়িয়ে সৌরজগতের বাইরে উড়ে চলবে কয়েক বছর ধরে। সেই অভিজ্ঞতার জন্যে সকলে উদগ্রীব হয়ে থাকলেও, ভয়ের একটা অনুভূতি মনকে আনচান করছে। ডক্টর জসের কাজ হয়ে উঠেছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন শরীর ঠিক রাখার জন্যে নানা ধরনের ওষুধ খেতে হয়। অয়ন সকালে বাড়ির মতনই চা খেয়ে খবরের কাগজ নিয়ে বসে। সবই অবশ্য পুরোনো কাগজ, অনেকগুলো রবিবাসরীয় সংখ্যা নিয়ে এসেছে সে। পৃথিবীতে থাকার সময়ও কাজের চাপে সে বাংলা প্রায় ভুলতে বসেছিল। এখন অবশ্য তার হাতে অঢেল সময়, সময় পেলেই সে কোন না কোন বই মুখে দিয়ে বসে পড়ছে।

সব সময় অবশ্য বই পড়া হয় না। রান্নার কাজে হাত লাগাতে হয় ইচিকা আর অলিভারের সঙ্গে। অলিভার ক্যাপসুল কম্মুনিকেটর এর দায়িত্বের সঙ্গে তাদের রাঁধুনি হওয়ার কাজটাও ঘাড়ে নিয়েছে। ইচ্ছে করেই তাদের রকেটে টিনের খাবারের সঙ্গে সঙ্গে কত ছোট রান্নাঘর তৈরি করা হয়েছে যাতে রান্না করার অছিলায় রোজ তাদের কিছু কাজ করতে হয়। তাতে মন ভালো থাকে। বাইরে থেকে থেকে রান্নার অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল অয়নের। কিছুদিন অনুশীলনের ফলে সে আজকাল ভালই রান্না করছে। ইচিকা একদিন তার সঙ্গে অলিভারের রান্নার কম্পিটিশন করবে বলে সবাইকে জানিয়ে দিয়েছে।

বিকেলে রান্নার পাশাপাশি চলে গান। সারাক্ষণ নানা ধরনের গান চলছে। কখনো জ্যাজ, কখনো ক্লাসিকাল, কখনো আবার কান্ট্রি সং। অয়ন একদিন রবীন্দ্রসঙ্গীতও চালিয়েছিল। তার সঙ্গে কোনদিন দাবা, কোনদিন মেমরি গেম, কোনদিন ক্যারম খেলা হয়। এর মধ্যে বাইরে কোন কিছু দেখতে পাওয়া গেলে সকলে সব কাজ ছেড়ে ছুটে আসে মনিটরের সামনে। অয়নের মনে আছে, প্রথম বার নেপচুনের ঘন নীল রং দেখে তার যেরকম অনুভূতি হয়েছিল, ঠিক সেইরকম অনুভূতি হয়েছিল ছোটবেলায় মায়ের হাত ধরে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার সময়। এমন সুন্দর সেই দৃশ্য যে চোখ বন্ধ করা যায় না, নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে।

আজকের দিনটা অবশ্য অন্যরকম। আজ অয়নের জন্মদিন। এই মহাকাশের চলমান স্পেসশিপের মধ্যেও আয়োজনের ত্রুটি রাখেনি ইচিকারা। অলিভার যে এখানে কেক কী করে বানাল সেটা অনেক মাথা ঘামিয়েও অয়ন বুঝে উঠতে পারল না। প্রায় এক দশক পর মোমবাতিতে ফুঁ দিয়ে কেক কাটল অয়ন। কেকের টুকরো সকলের মুখে তুলে দিতে দিতে তার খেয়াল হল, পরের বছর সে পৃথিবী থেকে অনেক অনেক দুরে চলে যাবে। ফিরে আসতে যে পারবেই,  সেই নিশ্চয়তাও নেই।

ডিনার করার পর ডক্টর জস সকলকে বললেন,  “আর দুমাসের মধ্যেই আমরা ইন্টারস্টেলার স্পেসে গিয়ে পড়ব। প্রক্সিমা সেন্টরি পৌঁছতে মোটামুটি আট বছর লাগবে। এই যাত্রাপথের কোন ধারনাই আমাদের নেই। কোন গ্রহ, নক্ষত্র, উপগ্রহ নেই এর মাঝে। তাই যদি হয়,  আমার মনে হয় প্রফেসর মিগুয়েলের সিমুলেশন হেলমেট ব্যবহার করার সময় এসে গেছে।”

অয়ন বলল,  “আমার একটা প্রশ্ন মনে উঁকি দিচ্ছে। ক্রায়জেনিক অবস্থায় থাকার সময়ে আমাদের মস্তিস্ক হয়ত সজাগ থাকবে, রকেটের যন্ত্রপাতি, গতিপথ বা অন্য কোন যান্ত্রিক গোলমাল রোবটদের কমান্ড দিয়ে হয়ত ঠিক করে ফেলা যাবে। কিন্তু যারা ক্রায়জেনিক অবস্থায় থাকবে না, তাদের যদি কোন রকম সাহায্যের দরকার হয়? আমাদের শরীর নিস্ক্রিয় থাকলে আমরা কোনভাবেই তাকে সাহায্য করতে পারব না।”

ডক্টর জস মাথা নেড়ে বললেন,  “তুমি ঠিক বলেছ অয়ন। সেই জন্যেই আমরা সকলে একসঙ্গে এই হেলমেট পরব না। আমার প্রস্তাব, চার বছর করে দুজন এই হেলমেট ব্যবহার করুক। যারা প্রথমে ক্রায়েজেনিক অবস্থায় যাবে, জেগে উঠে তারা এই চার বছরের অভিজ্ঞতা তাদের মাথার চিপে ট্রান্সফার করতে পারবে।”

সকলেই এই কথায় সায় দিল। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। অয়ন তার নিজের জায়গায় গিয়ে চুপ করে বসে রইল কিছুক্ষণ, তারপর তার চকেলেট কেকে একটা কামড় দিয়ে একটা বাংলা বই খুলে বসল।

 ৬। ২০৩৪, প্রক্সিমা সেন্টরির পথে, ট্রেলব্লেজার মহাকাশযান, ইন্টারস্টেলার স্পেস 

মাথার মধ্যে একটা চিনচিনে যন্ত্রণা হচ্ছে। অয়নের ইচ্ছে করছে আরো খানিকটা ঘুমিয়ে নেয়। কিন্তু কে যেন তার কাঁধ ধরে ঠেলা দিচ্ছে ক্রমাগত। অনেক কষ্টে চোখ খুলল অয়ন। কিন্তু মাথায় এখনো যন্ত্রণা হচ্ছে। অয়ন আবার চোখ বন্ধ করল।

“অয়ন, অয়ন।”কে যেন তার নাম ধরে ডাকছে। কষ্ট করে আবার চোখ খোলার চেষ্টা করল অয়ন। সামনে একজন দাঁড়িয়ে আছে। কিছু বোঝার আগেই কে যেন ইনজেকশনের একটা সিরিঞ্জ তার হাতে ফুটিয়ে দিল। একটা চিনচিনে ব্যথা, তারপর কয়েক মুহূর্ত পর সে সামনের ব্যক্তিকে চিনতে পেরে বলে উঠল,  “ডক্টর জস।”

ডক্টর জস স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। অয়নের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন,  “আর ইউ অল রাইট মাই সন? কেমন লাগছে তোমার? ”

“মাথায় একটু ব্যথা।”অয়ন সত্যি কথাটাই বলল। প্রায় মিনিট পনেরো লাগল অয়নের সহজ হতে। ধীরে ধীরে তার মনে পড়ল সব কথা। ২০৩০ সালে সৌরজগত পেরোনোর পর অয়ন আর ইচিকা হেলমেট পরে ক্রায়জেনিক ঘুমে চলে গিয়েছিল চার বছরের জন্যে। তারা জেগে উঠলে ডক্টর জস আর অলিভার হেলমেট পরবে।

সব কথা মনে পড়তেই অয়ন ধড়মড় করে উঠে বসল। চার বছর এত তাড়াতাড়ি কেটে গেল! তার মনে হচ্ছে গতরাতেই সে ঘুমাতে গেছে। সে উদিগ্ন হয়ে ডক্টর জস কে প্রশ্ন করল,  “ডক্টর জস? আমরা এখন কোথায়? সব কি হিসেব মত চলছে? ইচিকার ঘুম ভাঙেনি? অলিভার কই? ”ডক্টর জস গম্ভীর মুখে অয়নকে এক গেলাস জল খেতে দিলেন। তার স্বাভাবিক হাসি না দেখতে পেয়ে অয়নের মনে কু ডাকতে লাগল। সব ঠিক আছে তো?

“ডক্টর জস? কথা বলছেন না কেন? সব ঠিক আছে তো? ” অয়ন আবার প্রশ্ন করল।

ডক্টর জস মাথা নেড়ে বললেন,  “অয়ন, আমরা সকলেই এখনো বেঁচে আছি। প্রফেসর মিগুয়েলের প্রযুক্তি ঠিক মতই কাজ করেছে। ছোটখাটো ত্রুটি আর রকেট পরিচালনা করতে রোবটদের কোন অসুবিধে হয়নি, তোমার আর ইচিকার ব্রেন ফাংশান প্রোগ্রাম ঠিক ভাবেই চলেছে এই চার বছরে।”

“তবে? আপনি এত গম্ভীর হয়ে আছেন কেন? আপনি কী এড়িয়ে যাচ্ছেন ডক্টর জস? ” অয়নের এবার ভয় করতে শুরু করেছে।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ডক্টর জস উত্তর দিলেন,  “তোমাকে তো সব বলতেই হবে অয়ন। আমি আর পারছি না। তোমাকে সব বলে আমি বিশ্রাম নেব। তোমাদের ক্রায়জেনিক ঘুমে পাঠানোর এক বছর পর অব্দি কোনো ঝামেলাই হয়নি। শুধু মহাশূন্যের মধ্যে দিয়ে ছুটে চলা। সব কিছুই হিসেব মত চলছিল। অলিভার রান্না করছিল, পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছিল, আমি রকেটের গতিপথের মডেল ডায়াগ্রাম বানিয়ে ট্রাজেকটারি ঠিক করছিলাম। রেডার টেলিস্কোপে প্রচুর ছবি তুলেছি আমরা দুজনেই নানা  ধুমকেতু, উল্কাপিন্ড আর নক্ষত্রঘন আকাশের। কিন্তু তারপর ধীরে ধীরে সেই অভাবনীয় ব্যাপার শুরু হয়, যা আমাদের কল্পনাতেও ছিল না।”

“কী হয়েছে ডক্টর? স্পেস রেডিয়েশন?  কোনো দুরারোগ্য অসুখ? কী হয়েছিল ডক্টর? বলুন আমাকে…” অয়ন অধৈর্য হয়ে উঠেছে।

“এসব কিছুই নয়, অয়ন,” ডক্টর জস আস্তে আস্তে বললেন,  “একাকিত্ব। একাকিত্ব অয়ন। এর চেয়ে বড় ব্যাধি আর কিছু নেই। বছরের পর বছর ধরে মহাশূন্যে কাটাতে গিয়ে এই ব্যাধিই আক্রমণ করল আমাদের। ধীরে ধীরে নিঃসঙ্গতায় আমাদের শরীর আর মন খারাপ হতে শুরু করল। সে যে কী ভয়ানক অবস্থা আমি তোমাকে বলে বোঝাতে পারব না। অলিভার ঘুমানো একদম বন্ধ করে দিল, খাওয়া কমিয়ে দিল। আমার মনে হতে লাগল আমার মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। অলিভারকে দেখলে আমি মুখ ঘুরিয়ে নিতাম, সে আমার দিকে ফিরেও তাকাত না। “দিনের পর দিন ধরে একরকম ভাবে আমরা চলেছি অজানার খোঁজে, কেন? আমাদের কী দায়? পৃথিবীতে গবেষণা করেই কি আমরা সুখে ছিলাম না? ব্রহ্মান্ডে সৃষ্ট প্রতিটা বিন্দুর মৃত্য নিশ্চিত, সে ক্ষুদ্র কোন জীব হোক, মানুষ হোক, অথবা গ্রহ, নক্ষত্র, গ্যালাক্সি হোক না কেন? কিন্তু এরকম জীবিত অবস্থায় তিলে তিলে মরার আমাদের কী দরকার ছিল?

“রকেটের ভিতরের জীবনযাপন আমাদের কাছে অসহনীয় হয়ে উঠল। অলিভার এক সময়ে পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ করা বন্ধ করে দিল। আমার মনে হতে লাগল আত্মহত্যাই একমাত্র রাস্তা। আমার পরিচিতদের আত্মাদের আমি চোখের সামনে ঘুরে বেড়াতে দেখেছি। মাথা ঠিক রাখার জন্যে এত ওষুধ খেয়েছি যে সেই ওষুধ কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। আমরা পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম অয়ন।

“তারপর একদিন সেই ঘটনা ঘটে গেল। অলিভার চুপ করে বসে ছিল কন্ট্রোল রুমে। হঠাৎ সে হা হা করে হেসে উঠে চিত্কার করে বলে উঠল,  ‘এইখান থেকে বেরোনোর পথ পেয়েছি।’ তার তখন অর্ধ উন্মাদ দশা।

“আমি প্রশ্ন করলাম,  ‘কী উপায়?’

“অলিভার লাল চোখে আমার দিকে তাকাল, তারপর ছুটল ইঞ্জিন রুমের কন্ট্রোল প্যানেলের দিকে। আমিও তার পিছনে ছুটলাম। অলিভার একটানে রকেটের গতির হ্যান্ডেল চেপে খটখট করে কমান্ড দিতে লাগল। আমি চিত্কার করে বললাম,  ‘কী করছ?’ অলিভার আমার দিকে না তাকিয়ে বলল, ‘গতি বাড়িয়ে দিচ্ছি রকেটের। মুহুর্তের মধ্যে অভিযান শেষ করে আমরা বাড়ি ফিরব। আমার বাড়ির সামনের বাগানে বিকেলে বসে কফি খাব..’

“তারপর সে আবার হেসে উঠল। ততক্ষণে আমার জ্ঞান হয়েছে। অলিভারকে এক ধমক দিয়ে বললাম,  ‘তুমি পাগল হয়ে গেছ, গতি কমাও!’

“কিন্তু সে আমার কথা শুনতেই পেল না। আমি এগোতে যেতেই সে এক ধাক্কায় আমাকে মাটিতে ফেলে দিয়ে আমার গলা টিপে ধরল। তারপর শুরু হল ধ্বস্তাধস্তি। একসময় আমি হাতের কাছে একটা টুলবক্স নিয়ে আঘাত করলাম অলিভারকে। সে উল্টে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেল। কোন রকমে গতি কমিয়ে ফিরে এলাম। অলিভারকে ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে ওর মাথায় হেলমেট পরিয়ে চার বছরের জন্যে হেলমেটটাকে এক্টিভেট করে দিলাম। কিন্তু ততক্ষণে যা সর্বনাশ হওয়ার হয়ে গেছে।”

অয়ন ততক্ষণে থরথর করে কাঁপতে শুরু করেছে। আলোর গতির কাছাকাছি চলে গেলে পৃথিবীর সময় তাদের তুলনায় অনেক তাড়াতাড়ি কেটে যাবে। সেই অবস্থাতেই সে চিত্কার করে প্রশ্ন করল,  “কতটা সময় পেরিয়ে গেছে পৃথিবীতে ডক্টর জস?”

ডক্টর জস মাথা নিচু করে বললেন,  “খুব কম সময়ের জন্যে অলিভার রকেটের গতি বাড়িয়ে ছিল। কিন্তু ঐটুকুর মধ্যেই পৃথিবীতে কেটে গেছে একশ চল্লিশ বছর।”

অয়ন মাথা ধরে বসে পড়ল। তার মাথার ভিতরে খালি খালি মনে হচ্ছে। চিন্তা করার মত অবস্থা তার নেই। অনেক কষ্টে সে প্রশ্ন করতে পারল,  “আমরা কোথায়? ”

“আগামী ছয়মাসের মধ্যেই আমরা প্রক্সিমা সেন্টারিতে পৌছে যাব। কিন্তু তারপর কী হবে ভাবতে পারছি না। আমার আর কিছু বলার নেই অয়ন। আমি ছয় মাসের জন্যে হেলমেট পরে ক্রায়জেনিক স্লিপে যাচ্ছি। ইচিকার ওঠার সময় হয়ে গেছে। তুমি ওকে জাগিয়ে দিও। গত চার বছরের সমস্ত অভিজ্ঞতা ইচিকার আর তোমার মাথায় লাগানো এই দুটো যন্ত্রে ট্রান্সফার করে দিয়েছি। এটা পরে নাও। দশ মিনিটের মধ্যেই তুমি সব জানতে পেরে যাবে। বিদায়।”

ডক্টর জস অয়নের সামনে থেকে চলে গেলেন। অয়ন মাথা নীচু করে মুহ্যমান অবস্থায় বসে রইল মাটিতে। অনেকক্ষণ সে একইভাবে বসে রইল সেখানে। তার চোখ থেকে অবিরাম জল ঝরছে। একসময় মনের সমস্ত জোর একত্র করে সে উঠে দাঁড়াল। নিজের মনেই বলল, কাউকে দোষ দিয়ে কোন লাভ নেই। তারা তো আগে থেকে জানতই যে কোনো সমস্যার মুখোমুখি হতে পারে যাত্রাপথে, যা তারা আগে থেকে ভেবে রাখেনি।

ডক্টর ওয়াং এর দেওয়া যন্ত্র কানের পিছনের স্লটে লাগিয়ে সে বোতাম টিপল। এক মুহুর্তের মধ্যে অনেক রকম দৃশ্য, ছবি, আর শব্দ এসে তার মাথায় ভিড় করতে লাগল। স্বপ্নের মধ্যে ছবি দেখার মত করে প্রত্যেকটা ফ্রেম সরে যাচ্ছে একের পর এক। অয়ন পরিষ্কার মনে করতে পারল তার অবর্তমানের সব ঘটনা। অলিভারের গুম হয়ে বসে থাকা, রোবটের সাহায্যে ইঞ্জিনের সার্কিট ঠিক করা, পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যাওয়া সব ঘটনা যেন সে নিজে অনুভব করেছে। মিনিট কুড়ি পর যখন সে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল, গত চার বছরের সব ঘটনা পুঙ্খাণুপুঙ্খভাবে তার জানা।

 ৭। পৃথিবীর নিয়মে ২১৮৮ সাল, প্রক্সিমা সেন্টরির পথে

“প্রফেসর ওয়াং? প্রফেসর মিগুয়েল? আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিল যে সেই কমিটি..? ” ইচিকা ব্যাকুল হয়ে প্রশ্ন করল। ইচিকাকে ক্রায়জেনিক ঘুম থেকে তুলে অয়ন প্রথমে কিছুই জানায়নি। হঠাৎ করে এরকম শক পেলে ইচিকা কীভাবে ব্যাপারটা নেবে সেই নিয়ে ভয় ছিল অয়নের। মেয়েটার মাত্র চব্বিশ বছর বয়স। ট্রেনিং সেন্টারে পৌঁছতে এসেছিলেন তার বাবা, মা। ছোট একটা বোন ছিল তার। তারা আজ কেউই বেঁচে নেই পৃথিবীতে।

পৃথিবীর কথা মনে পড়তেই অয়নের বুকের মধ্যে টনটন করে উঠল। তার নিজের আত্মীয়রাও আর কেউ নেই। মায়ের কথা অনেকদিন পর মনে পড়ল তার। তার ছোট ভাই কলকাতায় মায়ের কাছে থাকত বলেই সে মার্কিন মুলুকে গিয়ে গবেষণা করতে পেরেছিল নির্ভাবনায়। তাদের একলা ছেড়ে এই অভিযানে আসতে দুবার ভাবেনি অয়ন। নিজেকে তার প্রচন্ড দোষী মনে হতে লাগল। ইচিকাকে সব কথা খুলে বলতে চার পাঁচ দিন সময় নিয়েছিল সে। প্রথমদিকে মানসিক ভাবে প্রচন্ড শক পেয়ে ভেঙে পড়লেও মেয়েটা এই কদিনে ধীরে ধীরে সামলে উঠেছে। মনে মনে তার ইচ্ছাশক্তির তারিফ না করে পারেনি অয়ন। ইচিকার সঙ্গে বসে আজ অয়ন তাদের অভিযানের ভবিষ্যত নিয়ে আলোচনা করছিল। পৃথিবীর সঙ্গে এই মুহুর্তে তাদের সবরকম যোগাযোগ কেটে গেছে। কথার মাঝখানেই ইচিকা তার প্রশ্নটা করেছিল অয়নকে।  

উত্তরটা ইচিকার নিজেরও জানা ছিল। অয়ন তার চোখের দিকে চেয়ে বলল,  “একশ পঞ্চাশ বছর ধরে পৃথিবীতে কেউ বেঁচে থাকতে পারে না ইচিকা। কোনো ভাবেই সেটা সম্ভব নয়।”

ইচিকা বলল,  “পৃথিবী থেকে নিশ্চয়ই আগে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়েছে। তুমি কি এর মধ্যে ডাউনলিংক কম্যুনিকেশন কমান্ড মডিউল রিবুট করার চেষ্টা করেছ? ”

অয়ন মাথা নাড়ল। নিশ্চয়ই অনেক বার্তা জমে আছে। ঘন্টাখানেকের মধ্যে কমান্ড মডিউল আপডেট করতেই তারা একের পর এক বার্তা পেতে শুরু করল। কয়েক শ মেসেজ জমে আছে ড্রাইভে। তাদের হাতে এখন কোন কাজ নেই। একটা একটা করে বার্তাগুলো পড়তে শুরু করল তারা। প্রথম কয়েক বছর ধরে উত্তেজিত হয়ে তাদের খবর নেওয়ার সব রকম চেষ্টা করেছে প্রক্সিমা কমিটি। কিন্তু কোন উত্তর না পেয়ে তারা ধরে নিয়েছিল যে কোনো দুর্ঘটনার ফলে তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা বানচাল হয়ে গেছে। একটার পর একটা বার্তা দেখতে দেখতে একসময় থমকে গেল অয়ন। প্রফেসর ওয়াং-এর মৃত্যু সংবাদ! ২০৫১ সালে মারা গেছেন তিনি। অয়নদের দলের নামে একটা ছোট্ট চিঠি তিনি পাঠিয়েছেন তার আগে। ইচিকাকে সে কথা জানিয়ে চিঠিটা পড়ল অয়নঃ

“গত আঠারো বছর ধরে ট্রেলব্লেজারের সঙ্গে পৃথিবীর যোগাযোগ হয়নি। সকলেরই ধারণা তোমরা আর বেঁচে নেই, অথবা বেঁচে থাকলেও এই অভিযান অনেক আগেই তোমাদের জন্যে শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু আমার বিশ্বাস, তোমরা বেঁচে আছ। তোমাদের যাত্রা শেষ হয়নি। এই বিশ্বাসের কী কারণ, সেটা আমিও জানি না। আমার দুর্ভাগ্য, জীবন আমাকে আর সময় দিল না। হয়ত আমাদের কারো সঙ্গেই তোমাদের আর দেখা হবে না। কিন্তু কোনদিন যদি এই চিঠি তোমরা পাও, জেনো আমরা তোমাদের সঙ্গেই আছি। জীবনের প্রতি বিশ্বাস রেখো, এই বিশ্বাস নিয়ে অমল একা মহাশূণ্যে নির্বাসন নিয়েছিল। তোমরা তো একা নও। অয়ন, ইচিকা, ডক্টর জস, অলিভার, হয়ত আমি দেখে যেতে পারব না, কিন্তু আমার আজও বিশ্বাস, তোমরা পারবে।”

চিঠিটা পড়ে স্তব্ধ হয়ে বসে রইল অয়ন আর ইচিকা। প্রফেসর ওয়াং এর চিঠির কথাগুলো কানে বাজছে তাদের। কোন কারণে এক মৃত্যুপথযাত্রী বৃদ্ধের তাদের ওপর এই অক্ষয় বিশ্বাস? তারা কি সত্যিই এই অভিযান শেষ করতে পারবে? ইচিকা অয়নকে বলল,  “হিসেব করে দেখলে আমরা দুজন মাত্র একবছর জেগে কাটিয়েছি মহাকাশে। আমার মনে হচ্ছে এই সেদিন আমরা পৃথিবী ছেড়ে বেরিয়েছি।”

অয়ন বলল,  “ইচিকা, তুমি পৃথিবীর সঙ্গে আবার যোগাযোগ করার চেষ্টা কর। অনেকটা সময় নষ্ট হয়ে গেছে। যা হয়ে গেছে সেটা আমরা বদলাতে পারব না, কিন্তু ভবিষ্যৎ এখনো আমাদের হাতে। প্রক্সিমা সেন্টরি পৌঁছতে আমাদের মাত্র ছয় মাস সময় লাগবে। এই অভিযানের শেষ না দেখে আমি ছাড়ছি না।”

ইচিকা সোজা হয়ে বসে আবেগঘন স্বরে বলল,  “আমিও না। পৃথিবীতে একশ পঞ্চাশ বছর কেটে গেছে ঠিকই, কিন্তু আমরা কাটিয়েছি মাত্র পাঁচ বছর। এটা যদি আমাদের চিন্তার কারণ হয়, তাহলে এর ভালো দিকও আছে। পৃথিবীতে এতদিনে নিশ্চয়ই অনেক উন্নততর প্রযুক্তি এসে গেছে। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারলে আমরা অনেক কিছুই জানতে পারব। আমাদের আগের মতন স্বাভাবিক থাকা প্রয়োজন।”

পরের দিন থেকে আবার একটু একটু করে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা শুরু হল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা দুজনেই বুঝতে পেরেছে যে অতীতের জন্যে মন খারাপ করে আর কোন লাভ নেই। শরীর ঠিক রাখতে হবে, তাদের অভিযান এখনো শেষ হয়নি। হ্যাবিটেট ক্যাপসুলের প্রতিটা অংশ ভালো করে গুছিয়ে রাখা হল। জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিল চারদিকে। ট্রাজেকটারি ঠিক করে নিল রকেটের গতিপথের। প্রায় সারাদিন ধরে সব যন্ত্রপাতি মন দিয়ে পর্যবেক্ষণ করল অয়ন আর ইচিকা। সব কিছুই ঠিক আছে। রান্নাঘরে গিয়ে অয়ন নিজে রান্না করল তার আর ইচিকার জন্যে। অবসর সময়ে অয়ন আবার বই পড়তে শুরু করেছে। ইচিকার আঁকার হাত ভালো, সে আজকাল তার ছোটবেলার বাড়ির ছবি আঁকছে।  

একটা একটা করে দিন কাটতে লাগল অয়ন আর ইচিকার। সেইদিন কন্ট্রোল সেন্টারে বসে টেলিস্কোপের মাধ্যমে নানা নেবুলা দেখার চেষ্টা করছিল অয়ন। কয়েকটা নেবুলা দেখতে এতটাই অদ্ভুত সুন্দর হয় যে মনে হয় ম্যাজিক। ক্র্যাব নেবুলা, গ্যারেন নেবুলা আর ইগল নেবুলার বিখ্যাত আকৃতি “পিলার অফ ক্রিয়েশন” দেখে পৃথিবীতে শিল্পীরা নানান ছবি এঁকেছে তাদের নিয়ে।

অয়ন খেয়াল করেছে, কোন রকম গ্রহ নক্ষত্র না থাকলেও সৌরজগতের বাইরের মহাকাশ নিকশ কালো নয়, সব সময়ই নানান আলোর বিচ্ছুরণ দেখতে পাওয়া যায়। ঘন গ্যাসের আস্তরণ এর ফলে ছড়িয়ে থাকা “ক্লাউড ডাস্ট” এর আলো আর শত শত ধুমকেতুর লেজ থেকে বিচ্ছুরিত হওয়া আলোর ঝিলিক তো আছেই, তা ছাড়াও দুরে আলেয়ার মত অজানা আলোর নকশা চোখে পড়ে মাঝে মাঝে। এই আলোর নকশার কথাই কি প্রফেসর ওয়াং তাকে বলেছিলেন? মাধ্যাকর্ষনিক তরঙ্গ!

এই আলোর জ্যামিতির মধ্যে চেয়ে থাকলে একটা ঘোর লেগে যায়। টেলিস্কোপে চোখ লাগিয়ে মহাকাশীয় নকশা দেখতে দেখতে তন্ময় হয়ে গিয়েছিল অয়ন। হঠাৎ চমকে উঠে সে টেলিস্কোপ থেকে চোখ সরিয়ে নিল। কিছুক্ষণ সময় নিয়ে নক্ষত্রের ম্যাপ দেখে সে একুয়ারিয়স নক্ষত্রমন্ডলের একটা বিশেষ বিন্দুতে টেলিস্কোপের লেন্স ফোকাস করল। টেলিস্কোপে আবার চোখ রেখে সে চমকে উঠল আবার। এটা কী করে সম্ভব? টেলিস্কোপের লেন্সের সাহায্যে ঝটপট কয়েকটা ছবি তুলে নিল সে, তারপর কমপিউটারে বিশেষ এক প্রোগ্রাম খুলে সেখানে মনোনিবেশ করল।

কিছুক্ষণ পরেই সে উত্তেজিত হয়ে ইচিকাকে ডাকতে শুরু করল। “ইচিকা, ইচিকা, এক্ষুণি একবার এখানে এস।” তার কপালে ঘাম জমে উঠেছে। ইচিকা “কী হয়েছে অয়ন? ” বলে ঘরে ঢুকতেই অয়ন তাকে টেনে এনে টেলিস্কোপের সামনে বসিয়ে দিয়ে বলল,  “দেখো তো চিনতে পার কিনা? ”

ইচিকা এক মুহূর্ত দেখেই বলল,  “এটা তো হেলিক্স নেবুলা। সাতশো আলোকবর্ষ দূরে। এই দৃশ্য কি ভোলার অয়ন? মহাশূন্যের সবচেয়ে সুন্দর কয়েকটা দৃশ্যের মধ্যে অন্যতম। একদম চোখের মতন, যেন ঈশ্বর নিজে দেখে চলেছেন এই সৃষ্টিকে।”

অয়ন তাকে বলল,  “হেলিক্স নেবুলা তো তুমি আগেও দেখেছ, তার মাঝে ব্যাঙাচির মত গোল হয়ে ঘুরতে থাকা এই  বিন্দুগুলো সম্পর্কেও তুমি নিশ্চয়ই জানো? ”

“সেগুলো তো কমেটেরি নটস। তাদের সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা না গেলেও মনে হয় বিশেষ কোনো মাধ্যাকর্ষণের ফলে তারা সুপারনোভার পর থেকে নেবুলার ক্লাউড ডাস্টে চক্কর খেয়ে চলেছে।”

“ঠিক বলেছ ইচিকা। ” অয়ন টেলিস্কোপের অন্য একটা বিন্দুতে ফোকাস করে বলল,  “এইবার এইটা দেখো।”

ইচিকা আবার টেলিস্কোপে চোখ লাগল। তারপর অয়নকে প্রশ্ন করল,  “এটা তো মনে হচ্ছে একটা সুপারনোভা, কোন গ্যালাক্সি এটা অয়ন? এটা তো আগে দেখিনি। এরকম দুর্লভ দৃশ্য দেখতে পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।”

অয়ন বলল,  “ইচিকা, ভুলে যেও না আমরা পৃথিবী থেকে প্রায় চার আলোকবর্ষ দুরে আছি, অনেক দৃশ্যই এখান থেকে দেখতে পাওয়া সম্ভব যা হয়ত পৃথিবীতে আমরা জানতে পারিনি। আমাদের সবচেয়ে কাছের গ্যালাক্সি এন্ড্রমিডার একটা তারার সুপারনোভা বিস্ফোরণ এটা, পৃথিবী থেকে যার দূরত্ব প্রায় আড়াই মিলিয়ন আলোকবর্ষ দুরে। এবার তুমি লক্ষ করে দেখো তো এখানে কোন কমেটেরি নটস দেখতে পাও কিনা? ”

ইচিকা আবার টেলিস্কোপে চোখ রাখল। কিছুক্ষণ লক্ষ করে চমকে উঠে সে বলল,  “ঠিক বলেছ অয়ন। এইখানেও কমেটেরি নট্স দেখতে পাওয়া যাচ্ছে হেলিক্স নেবুলার মত, যদিও আকারে খানিকটা পার্থক্য আছে।”

অয়ন উত্তেজিত হয়ে বলল,  “আমি এই সুপারনোভার ছবি নিয়ে তার একটা ত্রিমাত্রিক মডেল তৈরি করেছি। এইবার ইন্টারস্টেলার এসট্রনমি এলগরি্দম প্রোগ্রামের সাহায্যে আমি সময় এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি কয়েক হাজার বছর। মানে আমি দেখতে চাইছি হাজার বছর পরে আমি যদি এই সুপারনোভা থেকে সৃষ্ট নেবুলা দেখতে পাই, তাহলে কেমন দেখতে হবে তাকে? দেখ ইচিকা, কেমন হবে এন্ড্রমিডার গ্যালাক্সির এই নেবুলা? ”

ইচিকা এক ঝলক দেখে নিয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল,  “কী বলছ তুমি অয়ন, এইটা তো হেলিক্স নেবুলার ছবি।”

অয়ন উত্তর দিল,  “না ইচিকা, এই ছবি হেলিক্স নেবুলার নয়, তুমি এন্ড্রমিডার গ্যালাক্সির যে সুপারনোভা দেখছ, সেই ছবিরই ভবিষ্যৎ সংস্করণ..”

“এটা কী করে সম্ভব? হেলিক্স নেবুলা প্রায় সাতশো আলোকবর্ষ দুরে, অন্তত কয়েক হাজার বছর আগে কোন মহাবিস্ফোরণের সময় সৃষ্ট হয়েছে, এদিকে এন্ড্রমিডার গ্যালাক্সির দূরত্ব আড়াই মিলিয়ন আলোকবর্ষ, আমরা যে সুপারনোভা দেখছি সেখানে, হয়ত কয়েক লক্ষ বছর আগে সেই ঘটনা ঘটেছে। সেখান থেকে আলো এসে পৌছতেই এতটা সময় লেগেছে। দুটো ঘটনার অবস্থান এবং সময়ে আকাশ পাতাল তফাৎ। তুমি কী বলতে চাইছ অয়ন আমি বুঝতে পারছি না।”

অয়ন গম্ভীর গলায় বলল,  “আমি বলতে চাইছি যে মহাকাশে সময় আর অবস্থানের হিসেব আমরা যেভাবে দেখি, সেইভাবে বাস্তবে হচ্ছে না। আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে আমাদের না জানা কোন মাধ্যমে দেশকালের নানান বিন্দু একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করে চলেছে। একই মুহুর্তে আমরা লক্ষ লক্ষ বছরের তফাতে থাকা অনেকগুলো ঘটনা দেখতে পাচ্ছি।”

ইচিকা হতভম্ব হয়ে বলল,  “তুমি কী বলছ অয়ন? ”

“ভেবে দেখো ইচিকা, প্রায় চল্লিশ বছর ধরে হাবল টেলিস্কোপে মহাকাশে চিরুনি তল্লাশি চালিয়েছে। যতদুর পর্যন্ত আলোর নিয়মে আমাদের দেখতে পাই, সব কিছুর ছবি তোলা হয়ে গেছে প্রায়। কিন্তু হেলিক্স নেবুলা ছাড়া কোথাও কি আমরা ব্যাঙাচির আকৃতির কমেটেরি নট্স দেখতে পেয়েছি? ”

“মানে তুমি বলছ এন্ড্রমিডা গ্যালাক্সির এই সুপারনোভার ফলেই হেলিক্স নেবুলার জন্ম, যা অজানা কোনো উপায় আড়াই মিলিয়ান আলোকবর্ষ থেকে সাতশো মিলিয়ান আলোকবর্ষে চলে এসেছে? আর ইউ স্পিকিং এবাউট দি ওয়ার্মহোল প্রফেসর ওয়াং ওয়াস টেলিং আস? ”

অয়ন ইচিকার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,  “জানি না ইচিকা। হয়ত ওয়ার্মহোল, হয়ত বা অন্য কিছু। কিন্তু দূরত্ব আর সময় অতিক্রম করার একটা বিকল্প থাকতে বাধ্য।”

৮। পৃথিবীর নিয়মে ২১৮৯ সাল, প্রক্সিমা সেন্টরি স্টার সিস্টেম

“ফিল্ড অফ ভিশন কারেক্টেড, ইঞ্জিন প্যাচ কনফার্মড, এভিওনিক্স সিস্টেম ইউজুয়াল, একটিভ রেসপন্স গ্রেভিটি অফলোড ইন লাইন…”

ইঞ্জিন রুমে বসে কাজ করতে করতে অয়নের মনে অদ্ভুত একটা ভাবের উদয় হচ্ছিল। পৃথিবীর হিসেবে অনেকটা সময় কেটে গেলেও অয়ন আসলে বাবার সম্পর্কে জানতে পেরেছিল আট বছর আগে। এই প্রক্সিমা সেন্টরিতে আসার জন্যেই পৃথিবীর সঙ্গে সব সম্পর্ক ত্যাগ করে মানুষটা একা পাড়ি দিয়েছিল ‘সর্সারার’ নিয়ে। প্রফেসর ওয়াং এর সঙ্গে দেখা না হলে অয়ন কোনদিন জানতেও পারত না তার বাবার আসল পরিচয়। অসম্ভব মেধাসম্পন্ন বৈজ্ঞানিক অমল বিশ্বাস যে কতটা সাহসী আর একরোখা সেই পরিচয় অজানাই রয়ে যেত তার কাছে।

প্রক্সিমা সেন্টরির সীমানায় পৌঁছেছে তারা চার দিন আগে। এ এক অদ্ভূত জায়গা। তিনটে সুর্য জ্বল জ্বল করছে আকাশে কিন্তু কোন গ্রহ নেই এই ত্রয়ী অথবা ট্রিনিটি ষ্টার সিস্টেমে। প্রক্সিমা সেন্টরি সি সূর্যটাকে দেখে মনে হয় জ্বলন্ত লাল একটা ফলের মত। বৈজ্ঞানিকেরা এর নাম দিয়েছে দ্য ডোয়ার্ফ। এই সূর্য তিনটে মহাকর্ষের বিশেষ একটা নিয়ম মেনে একে অপরের পরিক্রমা করে চলে। অয়নদের লক্ষ হল এই নক্ষত্র জগতের মাঝের তারা আলফা সেন্টরি বি। কয়েকদিন আগে অলিভার আর ডক্টর জস জেগে উঠেছে। তাদের সাহায্য ছাড়া এগিয়ে যেতে হলে অয়ন আর ইচিকা মুশকিলে পড়ে যেত। অলিভার এখন পুরোপুরি সুস্থ। সব ঘটনা জানতে পেরে সে বাচ্চা ছেলের মত কেঁদে উঠেছিল, তারপর সে নিজেকে অপরাধী মনে করে বার বার ক্ষমা চেয়েছে সকলের কাছে। যে কোন ব্যক্তির কাছেই এই অভাবনীয় অভিঘাত সহ্য করা কষ্টকর। অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে তাকে শান্ত করেছে অয়ন আর ইচিকা। ডক্টর জস তাকে বুকে টেনে নিয়েছিলেন।  

প্রক্সিমা সেন্টরিতে প্রবেশ করার আগে থেকেই নানা রেডার আর রেডিও সিগনাল পাঠাতে শুরু করেছিল তারা, যদি ‘সর্সারার’-এর সন্ধান পাওয়া যায় তাহলে তাদের অভিযান সফল হলেও হতে পারে। সকলের মনেই একটা দ্বিধার ভাব। অমল কি সত্যি আজও বেঁচে আছে? তাকে কি সত্যি ওরা খুঁজে পাবে? অয়ন বাইরে কোন ভাব প্রকাশ না করলেও তার মনে একটা ঝড় বইছে সবসময়। এই অভিযানে সব কিছু হারিয়েছে সে, পৃথিবীতে কেউ আর অপেক্ষা করে নেই তার জন্য। কার জন্যেই আর ফিরবে সে? কিন্তু বাবা? বাবাকে কি সে সত্যি ফিরে পাবে?  

“বিপ বিপ বিপ বিপ বিপ…….”

অয়ন চমকে উঠে দেখল কন্ট্রোল প্যানেলের মধ্যে একটা লাল আলো জ্বলতে শুরু করেছে। ততক্ষণে সকলেই আওয়াজটা পেয়ে ছুটে এসেছে কন্ট্রোল রুমে। অলিভার উত্তেজিত হয়ে চেঁচিয়ে বলল,  “উই আর গেটিং সিগনাল্‌স্‌। ইট মাস্ট বি দ্য শিপ।”

ততক্ষণে ইচিকা উত্তর পাঠাতে শুরু করেছে দক্ষ হাতে। অয়নের বুকের মধ্যে ঢিপ ঢিপ করে শব্দ হচ্ছে। এখনও বিপ বিপ শব্দ হয়ে চলেছে। ইচিকা বলল,  “উই নিড টু মুভ এট ফোর ও ক্লক ডিরেকশন। সিগনাল ঐদিক থেকেই আসছে।”

অয়ন কন্ট্রোল প্যানেল থেকে উঠে পড়ল, তারপর দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। কয়েকবার মাথা ঝাঁকিয়ে সে যেন সব চিন্তা উড়িয়ে দিতে চাইল। তারপর এক গেলাস জল নিয়ে তার জায়গায় চলে গেল। একটা বই খুলে নিয়ে সে শুয়ে পড়ল বিছানায়। ইচিকারা ততক্ষণে নির্দিষ্ট দিকে চালনা করছে ট্রেলব্লেজারকে।

এক সময় তারা দেখতে পেল আকাশে কুচকুচে কালোর মধ্যে একটা সাদা বিন্দু, একটু একটু করে সেটা বড় হতে শুরু করল। ডক্টর জস অস্ফূটে বললেন,  “সর্সারার!”

ইচিকা আর অলিভারের তখনও বিশ্বাস হচ্ছে না। ইচিকা অলিভারকে বলল,  “স্টেবল দ্য শিপ। অলিভার, গেট দ্য রোভার আর-সেভেন মুভিং। আমি আর ডক্টর জস গিয়ে দেখছি।”

অলিভার প্রশ্ন করল,  “অয়ন? ”

ডক্টর জস বললেন,  “ওকে এখন না ডাকাই ভালো। লেট আস গো দেয়ার ফার্স্ট।”

অলিভার মাথা নেড়ে বলল সে বুঝেছে। আর সেভেন রোভারে বসে স্পেস সুট পরে ইচিকা আর ডক্টর জস এগিয়ে যেতে লাগল সর্সারার-এর দিকে। কাছাকাছি পৌছে ইচিকা একটা বিস্ময়ের শব্দ করে বলল,  “২০০০ সালে এই যান ডক্টর অমল কী করে তৈরি করেছিলেন? ”

ডক্টর জস বললেন,  “সেটা তুমি ওকেই প্রশ্ন করে নিও।”

সর্সারার-এর প্লাটফর্মে এয়ারলক করে রোভার দাঁড় করানো হল। ইচিকা আর ডক্টর জস এগিয়ে গেলেন ভিতরের দিকে।  

***

অমলের কাঁধ ধরে কেউ ঝাঁকুনি দিচ্ছিল। চোখ খুলে দেখল ইচিকা এক গাল হাসি নিয়ে তার চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। ডক্টর জস তার পিছনে দাঁড়িয়ে। ততক্ষণে অলিভার এসে একটানে তাকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে তার আপাদমস্তক দেখতে লাগল। তারপর মুচকি হেসে ইচিকাকে বলল,  “ওয়েল, হি ইজ সারটেইনলি লুকিং ওলডার দ্যান হিস ফাদার।” তারপর তারা একসঙ্গে হাসতে লাগল।

“অয়ন! সত্যি তুই এসেছিস? ”

অনেক, অনেক বছর পর অয়ন বাংলা শুনল। এক ঝটকায় ঘুরে দাঁড়িয়ে সে দেখল দাঁড়িয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে অমল।

“বাবা। ”

অয়নের পঁয়ত্রিশ বছরের স্মৃতি এক মুহুর্তে তার চোখের সামনে দিয়ে বইতে লাগল। ছোট্ট বেলায় দেখা বাবার আবছা মুখ, মায়ের হাসি, বাংলা গান, ভাই, স্কুল, কলকাতা, তার বন্ধুরা, সুখ আর দুঃখের শত শত স্মৃতি ভিড় করে এসেছে এক লহমায়। অয়ন আর থাকতে পারল না, অমলকে জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল।  

পর্ব ৩

১। পৃথিবীর নিয়মে ২১৮৯ সাল, সর্সারার মহাকাশযান, প্রক্সিমা সেন্টরি স্টার সিস্টেম 

“আমি এখনো বুঝতে পারছি না প্রফেসর।”

ইচিকা মাথা ঝাঁকাল। গত দু’দিন ধরে ক্রমাগত আলোচনা হয়ে চলেছে। কোন কোন উদ্বেগঘন মুহুর্তে ধৈর্য হারিয়েছে অয়ন, অলিভার, ইচিকারা। কিন্তু অমলের কোন ভাবান্তর হয়নি। এতটা সময় একা কাটানোর ফলে এত লোকের উত্তেজিত আলোচনা তার কাছে একটু বেমানান লাগছিল। মাঝে মাঝেই সে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছিল। মহাশূন্যের সফর তার জন্যে বড় সোজা ছিল না। মানুষের প্রথম প্রতিনিধি হিসেবে সৌরজগতের সীমানা পেরিয়ে আসায় যতটা না গর্ব, তার চেয়ে অনেক বেশি দায়িত্ববোধ ছিল। তার ওপর নাসার অভিযান বানচাল করে সে নিজের মত করে এগিয়ে গেছে  মহাকাশের অনেক গভীরে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রফেসর ওয়াং এর সঙ্গে মাসের পর মাস আলোচনা চালিয়েছে সে। প্রক্সিমা সেন্টরিতে পৌছে গেলেও রেডিও সিগনালের মাধ্যমে কী করে সেই ডার্ক এনার্জির রহস্য ভেদ করবে সেটা আগে থেকে পরিকল্পনা করা সম্ভব ছিল না কোনক্রমেই। হয়ত অনিশ্চয়তার পথেই তারা পা বাড়িয়েছিল। কিন্তু আজ এত বছর পরে অমল বুঝতে পেরেছে, তাদের সিদ্ধান্তে ভুল ছিল না। মানুষের পরের প্রজন্ম তার অভিজ্ঞতাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর। আর অয়ন, তার নিজের ছেলে…যতবার তার দিকে চোখ গেছে তার, এক অদ্ভুত ভালো লাগার আবেশ অনুভব করতে পারছে অমল। ইচিকা আর ডক্টর জস যখন অমলকে ক্রায়জেনিক অবস্থা থেকে জাগিয়ে তোলে, তখন সে সম্পূর্ণ স্বাভাবিকভাবে তাদের অভিবাদন করেছিল। যেন সে জানতই, কেউ না কেউ কোনদিন তার কাছে আসবেই! কিন্তু ডক্টর জসের কাছে অয়নের ব্যাপারে জানতে পেরে তার নিরাসক্ত ভাব মিলিয়ে গিয়েছিল। হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছিল সে।

এই কয়েকদিনে অবশ্য অনেকটাই সহজ হয়ে গেছে সে অয়নের সঙ্গে, ইচিকাদের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াতেও কোন অসুবিধে হয়নি। সে বয়সে এদের চেয়ে বড় হতেই পারে, কিন্তু এখানে তাদের একমাত্র পরিচয়, তারা অভিযাত্রী।

অমল একটু সময় নিয়ে ইচিকার দিকে তাকিয়ে বলল,  “দেখো, তোমরা সকলেই বৈজ্ঞানিক। বিজ্ঞানের ধারণা বা নিয়ম নিয়ে তোমাদের যথেষ্ট ধারণা আছে বলেই আমার বিশ্বাস। তাই ভৌতবিজ্ঞানের প্রচলিত নিয়মে কী হতে পারে, কী পারে না তা নিয়ে গভীর আলোচনায় যাওয়ার কোন দরকার নেই। আমি শুধু সেটাই বলব, যেটা আমি নিজে অনুভব করেছি। তারপর তো আমার যাবতীয় অভিজ্ঞতার কথা তোমরা ব্রেন সিমুলেশন হেলমেটের মাধ্যমে জানতেই পারবে।”  

ডক্টর জস অমলের দিকে তাকিয়ে বললেন,  “ঠিক আছে প্রফেসর। আপনি শুধু সেই টুকুই বলুন যেটুকু আপনার বলা দরকারি মনে হয়।”

অমল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,  “তোমরা হয়ত জান, আমাদের ধারণা ছিল গ্র্যাভিটেশনল ওয়েভ্‌স্‌ নকশার সাহায্যে ভিন্নগ্রহীরা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে। ডার্ক এনার্জির পক্ষেই আলোকে আকর্ষিত করে এরকম জ্যামিতিক নকশা তৈরি করা সম্ভব, তাই আমাদের ধারণা হয়েছিল, যদি সত্যি ভিন্নগ্রহী বা এলিয়েন বলে কিছু থেকে থাকে, তারা ডার্ক ম্যাটার দিয়ে তৈরি প্রাণী। ডার্ক ম্যাটার কোন আলো বা অন্য শক্তি বিকীরণ  করে না, তাই আমাদের চোখে তারা কোনদিনই ধরা পড়বে না। পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে এখানে পৌঁছে যখন আমি কাজ শুরু করি, অনেক দিন ধরে আশার কোন আলো দেখতে পাইনি। রেডিও সিগনাল পাঠালে কোন উত্তর আসে না। রেডারে কোন ছবি দেখতে পাই না, শুধু টেলিস্কোপে আকাশের নানা জায়গায় রংবেরঙের আলোর ছটা আর জ্যামিতিক নকশা দেখতে পাওয়া যায়। এমন করে অনেক দিন কেটে গেল। একাকিত্বে, অবসাদে আমার শরীর খারাপ হতে শুরু করল। সেই দিনটার কথা আমার পরিষ্কার মনে আছে। আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙে গেল। চমকে উঠে বসলাম। সারা ঘরে আলোর রোশনাই, শূন্যে হিজিবিজি কেটে নানা রঙের আলোর রেখা এখানে সেখানে ছুটে বেড়াচ্ছে। আমি রীতিমত ঘাবড়ে গেলাম। একি ভুতুড়ে কান্ড রে বাবা? এত আলো শাটলের ভিতরে এল কী করে? প্রায় তিন ঘন্টা ধরে সেই আলোর ছোটাছুটির মধ্যে সিঁটিয়ে রইলাম। তারপর একসময় সব আলো মিলিয়ে গেল কোথায়। সহসা আমার মাথা ঝনঝন করে উঠল। এত সোজা কথাটা আমি বুঝতে পারিনি! আলোর মাধ্যমে যে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চায়, তার সঙ্গে কথা বলতে গেলে তার ভাষাতেই কথা বলতে হবে। কন্ট্রোল রুমের আলোকছটার ভিডিও রেকর্ডিং নিয়ে বসলাম। তারপর অন্য অন্য রঙের আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য আর কম্পাঙ্কের রেঞ্জে রেডিও সিগনাল পাঠাতে শুরু করলাম। চেষ্টা করলাম যাতে আলোর নাচানাচির সময়ে যেই রঙের ধারাবাহিকতা ছিল, তার সঙ্গে একটা সামঞ্জস্য থাকে। কিন্তু কাজটা শুনতে যতটা সোজা মনে হয়, বাস্তবে ততটাই কঠিন। বছরের পর বছর লেগে গেছে আমার। কিন্তু একদিন সাফল্য এসেছে, সিগনালের উত্তর পেয়েছি তাদের কাছ থেকে।”

অয়ন এতক্ষণ কোন কথা বলেনি। এবার সে অধীর হয়ে প্রশ্ন করল,  “কারা? কেন যোগাযোগ করার চেষ্টা করছিল আমাদের সঙ্গে? ”

অমল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,  “অনেক কিছুই আমি জেনেছি অয়ন, কিন্তু সব কিছু যে জেনে গেছি সেটা বলতে পারছি না। আলোর মাধ্যম ব্যবহার করে আমি এতদিন ধরে ক্রমাগত কথা চালিয়ে গেছি, কিন্তু এই ভাষা ইংরেজি বা বাংলা তো নয়, সিগনালের মাধ্যমে কি বলার চেষ্টা করা হচ্ছে সেটা ডিকোড করতে অনেক সময় লাগে।”

অলিভার কৌতুহলী হয়ে প্রশ্ন করল,  “কিরকম? ”

“এই ধর লাল রঙের তরঙ্গদৈর্ঘ্য হল সবচেয়ে বেশি, সবচেয়ে বেশি এনার্জিও ধরে রাখতে পারে লাল রং। নিজেকে বোঝানোর জন্যে তারা সবসময় লাল রং ব্যবহার করে সিগনাল পাঠায়, সেরকমই বেগুনি রঙের এনার্জি সবচেয়ে কম, আমাদের সম্পর্কে বা মানুষের সম্পর্কে কথা বলার জন্যে বেগুনি রঙের ব্যবহার করে তারা। হয়ত তারা বলতে চাইছে,  “আমি তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাই,” সেই সময় লাল আর বেগুনি রঙের দুটো আলোকরশ্মি মধ্যে একটা জ্যামিতিক নকশা তৈরি হবে, অনেকটা অঙ্কের মত।”

“কিন্তু ভিন্নগ্রহীরা অঙ্ক জানবে কী করে? যদি সেরকম কিছু থাকেও তাদের অক্ষর, নম্বর, চিহ্ন অন্য রকম হবে না? ”

“এই প্রশ্নটা আমার মাথাতেও এসেছিল। আমি প্রশ্নও করেছিলাম, কিন্তু কোন উত্তর আমি পাইনি। কিন্তু আমার বিশ্বাস অঙ্কের ব্যবহার ওরা জানে।”

ইচিকা প্রশ্ন করল,  “আপনি ঠিক কী কী জানতে পেরেছেন প্রফেসর? ”

অমল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর অনেকটা নিজের মনেই বলল,  “আমার মনে হয় আমাদের প্রশ্নের উত্তর ওরা দিতে চায় না। ওরা খালি কয়েকটা কথা আমাদের বলার চেষ্টা করছে। যতদুর আমি বুঝেছি, আমাদের তারা মহাকাশের বিশেষ একটা অংশের কথা জানাতে চাইছে। প্রক্সিমা সেন্টরির একটা বিশেষ জায়গায় বার বার তাদের আলোকসংকেত দেখতে পেয়েছি আমি। সেখানেই ওরা আমায় নিয়ে যেতে চাইছে…”

চমকে উঠে সকলে একে অপরের দিকে তাকাল। ডক্টর জস নিচু গলায় অমলকে প্রশ্ন করলেন,  “আপনি নিশ্চিত? হয়ত সেখানেই থাকে ওরা। ”

অমল সে কথার উত্তর না দিয়ে বলল,  “আমি অনেক বার সিগনালের মাধ্যমে অনেকরকম প্রশ্ন করেছি, তারা কি কোন ভিন্ন গ্রহের প্রাণী? কোথায় থাকে তারা? আমাদের কথা তারা জানতে পারল কী করে? কী তাদের উদ্দেশ্য? কী করে আমরা ডার্ক এনার্জির রহস্য বুঝতে পারব? কিন্তু প্রত্যেকটা প্রশ্নের উত্তরে শুধু একটা কথাই বলে গেছে তারা। শুধু একটা শব্দ!”

“কী শব্দ? ”

“সাইলেনটিয়াম। ”

“সাইলেনটিয়াম? সেটা কী?” ইচিকা বলে উঠল। অয়ন অলিভার আর ডক্টর জসের দিকে তাকাল। সকলের মুখেই প্রশ্নচিহ্ন!

অমল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,  “আক্ষরিক অর্থে সাইলেনটিয়াম মানে শান্তি বুদ্বুদ কিংবা দ্য বাবল অফ পিস। কিন্তু এর আরেকটা মানে আছে। ব্ল্যাকহোলের কেন্দ্রবিন্দু অথবা সিঙ্গুলেরিটি পয়েন্টকে বলা হয় সাইলেনটিয়াম।”

ঘরের মধ্যে একটা নিস্তব্ধতা নেমে এল। সিঙ্গুলেরিটি সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান খুবই সীমিত। মহাকাশের সবচেয়ে বড় রহস্য সম্পর্কে তাদের কি জানাতে চায় ভিন্নগ্রহীরা? একসময় অয়ন উত্তেজিত হয়ে বলল,  “সিঙ্গুলেরিটি? কী বলছ বাবা? ব্ল্যাকহোলের কেন্দ্রে কোন কিছুই তো থাকা সম্ভব নয়,  প্রচণ্ড ঘনত্বের কারণে মহাকর্ষ বলের টান সেখানে এতোটাই বেশি যে এই গহ্বরের ইভেন্ট হরাইজন থেকে আলোও ফিরে আসতে পারে না, গহ্বরের অতল তলে হারিয়ে যায়।  সেখানে জীবিত কোন প্রাণী থাকবে কি করে? ”

অলিভার বলে উঠল,  “আর বিজ্ঞানের নিয়ম বলছে ব্ল্যাকহোলের কেন্দ্রে যে কোন বস্তু ওজন এতটাই বেড়ে যাবে যে, কোন এনার্জিই সেখান থেকে তাকে স্থানান্তরিত করতে পারবে না…”

অমল অলিভারকে থামিয়ে দিয়ে বলল,  “অলিভার, হয়ত সেটাই ডার্ক এনার্জি! তুমি ভুলে যাচ্ছ, আমি বলেছিলাম যে বিজ্ঞানের নিয়ম নিয়ে আমরা আলোচনা করছি না। আমাদের জানা নিয়মে কী হতে পারে সেটা সবাই জানে, কিন্তু হয়ত সিঙ্গুলেরিটি পয়েন্টে এমন কিছু আছে যা মানুষের অজানা। আজ পর্যন্ত কি কোন মানুষ ব্ল্যাকহোলে ঢুকেছে? ”

অমলের কথা শুনে সবাই চুপ করে গেল। এই কথার উত্তর সবাই জানে। একসময় নীরবতা ভেদ করে ডক্টর জস বললেন,  “কিন্তু যদি আপনার কথা ঠিকও হয়, আমরা কোন ব্ল্যাকহোলে ঢুকে দেখব কী করে? প্রত্যেকটা গ্যালাক্সির কেন্দ্রে যে সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল থাকে সেখানে যাওয়া অসম্ভব ব্যাপার। সবচেয়ে কাছের গ্যালাক্সি এন্ড্রমিডা আড়াই মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে, এমনকি সুপারনোভার ফলে যে স্টেলার ব্ল্যাকহোল তৈরি হয়, সেই মনোসেরোটিস ভি61৬ এর দূরত্ব তিন হাজার আলোকবর্ষ।”

অমলের মুখে একটা হালকা হাসি দেখতে পাওয়া গেল। তার চোখ চকচক করছে। ডক্টর জসের দিকে তাকিয়ে সে বলল,  “সে কথা কি আমি ভাবিনি জস? মানুষের সমস্যা কী জানো, যেইটুকু সে জানতে পেরেছে সেটাকেই সে অন্তিম সত্য বলে ধরে নেয়। এত বছর ধরে পৃথিবী ছেড়ে এসে শুধু এইটুকু সত্যি আমি আবিষ্কার করতে পেরেছি। প্রক্সিমা সেন্টরির কেন্দ্রেই একটা ব্ল্যাকহোল আছে, যা সম্পর্কে আমাদের কোন ধারনাই ছিল না। গ্র্যাভিটেশনল ওয়েভস নিয়ে কাজ করতে করতে আমি জানতে পারি এর কথা।”

“কিন্তু সেটা কি সম্ভব? ” অয়ন জানতে চাইল।

“ব্ল্যাকহোল এর মত প্রচন্ড শক্তিশালী অভিকর্ষের সংস্পর্শে এলে কি আলফা সেন্টরি থেকে নির্গত আলো দিক পরিবর্তন করত না, গ্রেভিটি আলোকে বেন্ড করলে পৃথিবী থেকে গ্র্যাভিটেশনল লেন্স এফেক্ট পরিষ্কার বুঝতে পারা যায়।”

“যায় অয়ন, ব্ল্যাকহোলের চারিপাশে মহাকাশীয় উল্কা, গ্রহ, উপগ্রহের টুকরো ঘুরতে থাকে, আলোর রশ্মি বেঁকে গিয়ে গ্র্যাভিটেশনল লেন্স এফেক্ট তৈরি হয়, পৃথিবী থেকে রেডিয়েশন এর তীব্রতা অবধি যাচাই করা যায়, কিন্তু, যদি ব্ল্যাকহোল নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থাকে? তাহলে? যদি এরকম হয় যে, বিশেষ কোন কোন সময়ে ব্ল্যাকহোল সক্রিয় হয়ে ওঠে? তাহলে? ”

অমলের কথা শুনে অয়ন মাথা নাড়ল। সে বুঝতে পেরেছে অমল কী বলতে চাইছে। ইচিকা বলল, “এরকম কি সম্ভব? ”

এইবার অমলের আগে অয়ন নিজেই উত্তর দিল ইচিকাকে,  “বার্সেলোনা অটোনোমা ইউনিভার্সিটিতেই প্রফেসর ওয়াং এর বৈজ্ঞানিকরা ল্যাবে ম্যাগনেটিক ফিল্ডের ওয়ার্মহোল তৈরি করতে পেরেছেন। বিদ্যুত সংযোগ বন্ধ করলে সেই ওয়ার্মহোল নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। যদি সত্যি কোনো অজানা শক্তি বা ডার্ক এনার্জি নিয়ন্ত্রিত করে ব্ল্যাকহোলকে, এরকম হওয়া অসম্ভব নয়।”

সকলে চুপ করে গেল। বিশ্বাসে ধাক্কা লাগলে সামলে নিতে সময় লাগে। ইচিকা দাঁত দিয়ে আঙুল কামড়াচ্ছে। অলিভার খুব মনোযোগ দিয়ে দুটো হাত জড়ো করে সেদিকে তাকিয়ে আছে। ডক্টর জস একসময় বললেন,  “এবার তাহলে আমাদের করণীয় কী? ”

অমল সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,  “আমি সেই ব্ল্যাকহোলের ভিতরে যাব। এটাই একমাত্র পথ। আমাকে যেতেই হবে।”

২। পৃথিবীর নিয়মে ২১৯০ সাল, ট্রেলব্লেজার, প্রক্সিমা সেন্টরি স্টার সিস্টেম

সময় যত এগিয়ে আসছে, সকলের উত্তেজনা তত বাড়ছে। গত চার মাসে অনেকটা পথ এগিয়েছে তারা প্রক্সিমা সেন্টারের ব্ল্যাকহোলের দিকে। কিন্তু পরিকল্পনা করা এক ব্যাপার আর সত্যি সত্যি সেই পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করা অন্য ব্যাপার। এখানে অজানা বিপদের সঙ্গে মোকাবিলা করার মত কিছুই নেই, আছে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে স্বেচ্ছায় অজানার বুকে নিজেকে সমর্পণ করা। চার মাস আগে অমলের কাছ থেকে শোনার পর প্রথমে সকলে একমত হতে পারেনি। ব্ল্যাকহোলের ভিতরে যাওয়া মনে সাক্ষাত মৃত্যুর দরজায় গিয়ে কড়া নাড়া। কিন্তু সিমুলেশন হেলমেট পরে নিয়ে অমলের অভিজ্ঞতার অংশীদার হতে পরে সকলের মধ্যেই অভাবনীয় পরিবর্তন এসেছিল। সেই অভিজ্ঞতা লিখে বোঝানো যায় না। অয়নের মনে হয়েছে সে নিজে বছরের পর বছর ধরে সন্দেশ পাঠিয়ে ভিন্নগ্রহীদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা চালিয়ে গেছে। প্রতিটা সিগনাল পাঠানোর পিছনের অগাধ পরিশ্রম, সিগনালের উত্তর পেয়ে সেটা বুঝতে না পারার ছটফটানি, সাফল্য আর একাকিত্বের প্রতিটা মুহুর্ত যেন সে নিজে অনুভব করেছে। ইচিকা, অলিভার, আর ডক্টর জসও একই ভাবে এই ব্যাখ্যাতীত অভিজ্ঞতার ভাগীদার হয়ে মুহ্যমান হয়ে গিয়েছিল।

কেন অমল এই প্রচন্ড ঝুঁকি নিতে চাইছে, কারো বুঝতে অসুবিধে হয়নি। অমলের গ্র্যাভিটেশনল ওয়েভস সিগনালের মাধ্যমে পাওয়া সেলেস্টিয়াল বা মহাকাশীয় কো-অর্ডিনেট লক্ষ করে ট্রেলব্লেজার পাড়ি দিয়েছিল প্রক্সিমা সেন্টরির ব্ল্যাকহোলের উদ্দেশ্যে, যার নাম তারা দিয়েছে ‘কিউরিওসিটি। ’ অয়নের মধ্যে আশ্চর্য এক ভাব এসেছিল এর পর থেকে। সে বুঝতে পেরেছে ব্রেন সিমুলেশন হেলমেট শুধু মানুষের কাজের পারদর্শিতা আর অভিজ্ঞতা বহন করে না, আসলে সিমুলেশন হেলমেট পরে অন্যের অভিজ্ঞতা গ্রহণ করার সময় তার ব্যক্তিত্বের অনেকটাই অন্য মানুষের মধ্যে চলে আসে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অয়ন বুঝতে পেরেছে, সে আর ইচিকা একসঙ্গে তিনজন মানুষের পরিচয় বহন করছে। মানসিক ভাবে অয়নের নিজস্ব মস্তিস্কই তাকে পরিচালনা করছে, কিন্তু সময়ে সময়ে অমল আর ডক্টর জসের ব্যক্তিত্ব তাদের উপস্থিতির প্রমাণ দিচ্ছে।

এক এক বার অয়নের মনে হয়েছে কেন এতদিন পরে সে বাবাকে পেয়েও হারাবে? কেন তাকে সে এই ঝুঁকি নিতে দেবে? কিন্তু পর মুহুর্তেই অমলের ব্যক্তিত্ব তাকে বলেছে যে মানুষের কর্তব্য হল অজানাকে জানিয়ে যাওয়ার জন্যে ঝুঁকি নেওয়া। এই কয়েক মাসে বাবাকে নতুন করে চিনতে পেরেছে সে। বাবার চেয়ে বেশি অমলকে সে বন্ধুভাবেই পেয়েছে। মহাকাশীয় বিজ্ঞানে তো বটেই, অন্যান্য ব্যাপারেও অমলের মেধা তাদের সকলকেই অবাক করেছে। অয়নের সবচেয়ে মুগ্ধ করেছিল যেই ব্যাপারটা সেটা হল সব ক্ষেত্রেই অমল মন খোলা রাখে। কোন গান, সাহিত্য, ঘটনা শুনেই বাতিল করে দেওয়া তার স্বভাবে নেই।

অনেকদিন পর ট্রেলব্লেজারের বৈঠকখানা সরগরম হয়ে উঠেছিল মানুষজনের কন্ঠস্বরে। শেষ অভিযানের আগে তারা কিছুদিনের জন্যে স্বাভাবিক ভাবে বেঁচে নিতে চায়। ‘কিওরিওসিটি’ নির্দিষ্ট কো-অর্ডিনেটে কাল এসে পৌঁছেছে তারা, কিন্তু সেখানে কিছুই নেই। বোঝাই যাচ্ছে ব্ল্যাকহোল থাকলেও এখন তা সক্রিয় অবস্থায় নেই।

অমল তুড়ি মেরে বলল,  “বন্ধুরা, আপাতত কিছু করার নেই। আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।”

সেইদিন রাত্রে অয়ন একলা বসেছিল বাবার সঙ্গে। তার মনের মধ্যে তোলপাড় চলছে। অবশষে মনের সব জোর একত্র করে সে বলল,  “বাবা, আমিও তোমার সঙ্গে যাব।”

অমল ছেলের দিকে তাকাল। পৃথিবীর সময় হিসেবে আজ সে বৃদ্ধই বলা চলে, সাঁইতিরিশ বছর বয়সে সে পৃথিবী ছেড়েছে। কিন্তু তাকে দেখে পঁয়তাল্লিশ বলে মনে হয়। সেই হিসেবে অয়ন তার চেয়ে বছর আটেকের ছোট মাত্র।

সে হেসে বলল,  “না রে, সে হয় না, আমার বয়স হয়েছে, সারাজীবন অনেকটা স্বার্থপরের মতনই ঘর সংসারের কথা ভুলে মহাকাশের রহস্যের পিছনে ছুটেছি। তার জন্যে দামও দিতে হয়েছে আমায়। লক্ষ কোটি আলোকবর্ষ দূরের গ্রহেও প্রাণের সম্ভাবনা আছে, আমরা তো শুধু সবচেয়ে কাছের নক্ষত্রে এসেছি, একজন মানুষের জীবনে এই রহস্য সমাধান করা সম্ভব নয়। কিন্তু তোর হাতে এখনো সময় আছে, তুই ফিরে গিয়ে আজও স্বাভাবিকভাবে তোর জীবন কাটাতে পারবি হয়ত। অনেক কিছু হয়ত বদলে যাবে, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব ঠিক হয়ে যাবে।”

অয়ন তাকে বাধা দিয়ে বলল,  “কী ঠিক হবে বাবা? আমাদের পৃথিবী ছেড়ে বেরিয়ে আসার পর প্রায় দেড়শ বছর কেটে গেছে। কী আছে আমার জন্যে সেখানে? মা নেই, ভাই নেই, আত্মীয়স্বজন কেউ নেই। অনেক চেষ্টা করেও আমরা পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি আর। কার জন্যে ফিরে যাব আমি? ”

অমল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর এগিয়ে এসে অয়নের কাঁধে হাত রেখে বলল,  “তোর কাছে আমি একটা সত্যি কথা বলতে চাই অয়ন, যা হয়ত আমি অন্য কাউকেই বলতে পারব না। এত বছর মহাকাশে কাটিয়ে আমি আজ যখন পিছন ফিরে তাকাই, আমারও ফিরে যেতে ইচ্ছে করে। আমি জানি কেউ অপেক্ষা করে নেই আমার জন্যে। কিন্তু তাও আমি ফিরতে চাই। জানিস কেন? ”

অয়ন দুদিকে মাথা নাড়ল। অমল ধরা গলায় বলল, “পৃথিবী থেকে সূর্য ওঠা দেখব বলে অয়ন। সূর্যাস্ত দেখব বলে, বৃষ্টিতে ভিজব বলে, ছবি আঁকব বলে। বিজ্ঞান ছাড়াও মানুষের অনেক কাজ আছে অয়ন। তুই কোনদিন মিলেনিয়াম পার্ক থেকে গঙ্গার ওপরে সূর্যাস্ত দেখেছিস? কী অপূর্ব লাগে তখন আকাশটাকে? তোকে এই সবের জন্যেই ফিরতে হবে অয়ন, তোকে ফিরতেই হবে।”

৩। ২১৯০ সাল, ’কিউরিওসিটি’ ব্ল্যাকহোল, প্রক্সিমা সেন্টরি

“গেট আপ অয়ন। ইটস হেয়ার।”

ইচিকার উত্তেজিত কন্ঠ শুনে ধড়মড় করে উঠে বসল অয়ন। দৌড়ে কন্ট্রোল রুমে গিয়ে স্ক্রিনের সামনে দাঁড়াতেই তার চোখ ধাঁধিয়ে গেল আলোয়। আলোর ঝিকমিকি জ্যামিতিক নকশার মাঝে আকাশে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে বিশালাকায় একটা কালো বলয়, যাকে ঘিরে অসংখ্য আলোককণা পাক খেতে খেতে মিলিয়ে যাচ্ছে কুচকুচে কালো সেই গহ্বরে।  অয়ন অস্ফূটে বলে উঠল,  “ব্ল্যাকহোল? সত্যি তাহলে এরকম হয়? ”

ডক্টর জস সকলকে উদ্দেশ্য করে বললেন,  “আমরা ক্রমাগত সিগনাল পাচ্ছি কিউরিওসিটির সেলেস্টিয়াল কো-অরডিনেট থেকে। গ্র্যাভিটেশনল ওয়েভস এর নকশা আগের মতনই আছে। আমাদের কাছে বেশি সময় নেই। ইচিকা, গেট রোভার আর সেভেন রেডি ফর দ্য ডিপারচর। প্রফেসর অমল, আমরাও যাব আপনার সঙ্গে।”  

অমল ততক্ষণে স্পেসস্যুট পরে নিয়েছে। সে বলল,  “তোমরা যেতে পারবে না জস, কেন না তোমাদের দায়িত্ব অনেক বেশি। আমি দুটো সিমুলেশন হেলমেটের যন্ত্রপাতিতে খানিকটা বদল করেছি, যাতে ইন্স্যান্টলি থট ট্রান্সফার করা সম্ভব, অনেকটা ট্রান্সমিটারের মতনই। যতক্ষণ আমি ব্ল্যাকহোলে থাকব আমি যা দেখব বা অনুভব করব, তোমাদের মধ্যে কোন একজন সেই একই মুহুর্তে একই জিনিস দেখতে বা অনুভব করতে পারবে, এই হেলমেট পরে থাকলে। আমি ফিরে আসি অথবা না আসি, সেই ইনফরমেশনকে পৃথিবীর মানুষদের কাছে পৌছে দেওয়ার দায়িত্ব তোমাদের। হয়ত মানুষ এই জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে সত্যি কোনদিন মহাকাশের রহস্য ভেদ করতে পারবে। পারবে তো? ”

ডক্টর জস কোন কথা বলতে পারলেন না। শুধু ঘাড় নেড়ে সম্মতি দিলেন। অমল সকলের দিকে তাকিয়ে বলল,  “ইচিকা, অলিভার, তোমাদের ওপর আমার অনেক ভরসা। যা কিছুই হোক না কেন, কোনদিন নিজের ওপর থেকে বিশ্বাস হারাবে না। তোমরা ঠিক কর কার সঙ্গে আমার মানসিক যোগাযোগ থাকবে ব্ল্যাকহোলের ভিতরে?”

ইচিকা আর অলিভার দুজনেই অয়নের দিকে তাকাল। অয়ন অমলের হাত থেকে হেলমেটটা নিয়ে মাথায় পরে নিল।  যাওয়ার আগে অয়নের দিকে তাকিয়ে অমল হেসে বলল,  “চলি রে। দেখা হবে।”তারপর কাউকে কিছু না বলার সুযোগ দিয়ে সে উঠে বসলো রোভারে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আর-সেভেন রোভার ট্রেলব্লেজার থেকে বেরিয়ে আলোর ঝিকমিকানির মধ্যে দিয়ে ছুটে গেল কিওরিওসিটির উদ্দেশ্যে। অয়ন বিহ্বল দৃষ্টিতে চেয়ে থাকলো সেইদিকে। সিমুলেশন হেলমেট পরে অমলের ভাবনা স্পষ্ট বুঝতে পারছে সে। অয়ন বুঝল, অমল আর কোনদিনই ফিরবে না।  

৪। কিউরিওসিটি ব্ল্যাকহোল, প্রক্সিমা সেন্টরি স্টার সিস্টেম

ব্ল্যাকহোলের গহ্বরের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে অমল বুঝতে পারল, মাধ্যাকর্ষণ বেড়ে গেছে বহু গুণ। রোভারের আশপাশ থেকে আলোর ফুলকি অবিরাম ভাবে ছুটে চলে ঝাঁপিয়ে পড়ছে কুচকুচে কালো অন্ধকারে। রোভারের ইঞ্জিনের কন্ট্রোল প্যানেলে বিপ বিপ শব্দ হতে শুরু করেছে। আর হাতে সময় নেই। অমল মাইকে চেঁচিয়ে বলল,  “অয়ন, তুই কি অনুভব করতে পারছিস মাধ্যকর্ষণ? ”

অয়নের গলার স্বর শোনা গেল,  “হ্যাঁ। আমি সব দেখতে পাচ্ছি, অনুভব করতে পারছি।”

অমল আশ্বস্ত হল। তার প্রচেষ্টা তাহলে বৃথা যায়নি। ব্রেন সিমুলেশন প্রোগ্রামে খুব সুক্ষ্ম কয়েকটা বদল করে তার ব্রেনের নিউরন থেকে তৈরি হওয়া বিদ্যুত তরঙ্গ গিয়ে জড়ো হচ্ছে অয়নের হেলমেটের স্টোরেজ প্রোগ্রামে। সে ফিরে না এলেও অয়নের মস্তিস্কে তার অভিজ্ঞতা ধরা থাকবে। তার ছেলে হয়ত কোনদিন এগিয়ে নিয়ে যাবে তার গবেষণা। আর তাহলে দেরি নয়। অমল অটোপাইলট সরিয়ে নিজে রোভারের কন্ট্রোল নিয়ে গতি বাড়িয়ে দিল। তারপর শেষ বারের মত মাইকে বলল,  “ভালো থাকিস অয়ন। ”

মুহুর্তের মধ্যে আর-সেভেন প্রচন্ড গতিতে ব্ল্যাকহোলের ভিতরে প্রবেশ করল। অমল অনুভব করল, মাধ্যাকর্ষণের জোরে তার শরীরের ওপরে প্রচন্ড চাপ পড়তে শুরু করেছে। রোভারের বাইরের আস্তরণ খসে পড়তে শুরু করছে শব্দ করে।  ভাঙা টুকরোগুলো অতলে ছুটে গিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে। কন্ট্রোল প্যানেলে এলার্ম বাজতে শুরু করেছে, কোন যন্ত্রপাতি কাজ করছে না। অমল প্রাণপণ শক্তিতে দাঁতে দাঁত চেপে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সামনের দিকে। যতক্ষণ তার জ্ঞান থাকে, সে দেখবে, বোঝার চেষ্টা করবে।

ক্রমে মাধ্যাকর্ষণের চাপ বাড়তে বাড়তে অসহনীয় হয়ে এল। মনে হচ্ছে স্পেসস্যুট সহ তার শরীর কুঁকড়ে ছোট হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু কোনরকম ব্যথা অনুভব করতে পারছে না অমল। কোথায় তার রোভার? কোথায় হেলমেট? একসময় অমলের মনে হল সে অনন্তকাল ধরে আলোর গতিতে এগিয়ে চলেছে গহ্বরের ভিতর, তার শরীর বলতে কিছু নেই, কিন্তু কোন অজানা কারণে সে এখনো সব দেখতে পাচ্ছে, সব বুঝতে পারছে।

বড় অদ্ভুত এই অনুভূতি। সমস্ত কিছু যেন ভেঙে ছড়িয়ে পড়ছে। কোথায় ব্ল্যাকহোল? কোথায় মাধ্যাকর্ষণ? সে তো কতকাল ধরে এখানেই আছে!

কোথায় এই জায়গা? অমল অনুভব করল কোটি কোটি আলোর জ্যামিতিক নকশার মাঝে সে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু এই আলোর নকশা হারিয়ে যাচ্ছে না, বিদ্যুতের তারের মত, মাকড়সার জলের মত সুক্ষ্ম বুননে অজানা কোন শক্তি বয়ে চলেছে এই আলোরসুতোর মধ্যে দিয়ে। প্রতি মুহুর্তে রং বদলে যাচ্ছে এই আলোর। কোথায় সে?  অমল রঙিন আলোর জলের মধ্যে ঘুরপাক খেতে লাগল। সে কি জাগতিক জগত ছাড়িয়ে এসেছে? সে কি আদৌ বেঁচে আছে?  এই কি তবে সাইলেনটিয়াম?

সহসা দপ করে সব আলো নিভে গেল। অমল টের পেল সে তার পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। নিজের শরীরটাকে আবার অনুভব করতে পারছে সে। কোথায় দাঁড়িয়ে আছে সেটা বোঝার কোন উপায় নেই। হঠাৎ তার চোখের সামনে ফুটে উঠল জ্যামিতিক একটা নকশা। এই নকশা অমলের চেনা।

কিছু বোঝার আগেই কয়েকটা আলোর ঝিলিক অমলকে বিদ্যুতের মত ছুঁয়ে গেল। পর মুহুর্তেই সে তার মাথার ভিতরে পরিষ্কার শুনতে পেল, “সাইলেনটিয়ামে আপনাকে স্বাগত জানাই, অমল।”

বিস্মিত হলেও অমল ঘাবড়ে গেল না। হয় সে স্বপ্ন দেখছে, সে ক্ষেত্রে ভয় পেয়ে কোন লাভ নেই। কিন্তু যদি সে সত্যি জেগে থাকে, তাহলে এই অপার্থিব কান্ডকারখানা তাকে মনে রাখতে হবে। মানুষের জানার বাইরেও অনেক কিছু আছে, এই প্রতিষ্ঠিত সত্যের ওপরে বিশ্বাস করে বলেই সে বহু কষ্টে মনকে নিয়ন্ত্রিত করতে পারল। তারপর প্রশ্ন করল,  “আপনি কে? ”

মুহুর্তের মধ্যে অমল উত্তর পেল তার মস্তিষ্কের অন্তরে। কিন্তু এই উত্তর আসলে প্রশ্ন!

“আপনি আমাকে চিনতে পারছেন না? ”

অমল প্রশ্ন করল,  “আপনি কি সেই প্রাণী যারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন গ্র্যাভিটেশনল ওয়েভস এর মাধ্যমে? যার সঙ্গে সন্দেশ বিনিময় করে এসেছি আমি এত বছর ধরে? ”

“আমিই সেই যার সঙ্গে আপনি কথা বলেছেন। আমিই সেই ডার্ক এনার্জি ফর্ম। কিন্তু আমি কোন প্রাণী নই।”

“তাহলে? ভিন্নগ্রহীরা কি নিজেদের প্রাণী বলে না? কোন গ্রহে থাকেন আপনারা? ”

কিছুক্ষণ পর উত্তর এল, “অমল, আপনি ধৈর্য ধরুন। আপনি যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন, সেটা সাইলেনটিয়াম। ব্ল্যাকহোল এর কেন্দ্রবিন্দু। একটা বিশেষ সময়ের পর এখানে কেউ থাকতে পারে না। আমি যতটা সম্ভব, আপনাকে বুঝিয়ে বলছি।”

অমল সাহস করে বলল,  “আপনি বলছেন এখান থেকে ফেরা সম্ভব! আমরা মনে করতাম ব্ল্যাকহোলের ইভেন্ট হরাইজন থেকে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়।”

“হয়ত আপনি খানিকটা সত্যি বলেছেন। ফেরা সম্ভব নয়, কিন্তু এগিয়ে তো যাওয়া যায়। আপনারাই তো বলেছেন কোয়ান্টাম ইনফরমেশন কোনদিন হারিয়ে যায় না, তাহলে ব্ল্যাকহোলের কেন্দ্রে গিয়েও কিছুই হারিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। আপনি তো এই নিয়েই গবেষণা শুরু করেছিলেন? ”

“এটা তো পৃথিবীর ইনফরমেশন প্যারাডক্সের তথ্য, আপনি এসব জানলেন কী করে? এক মিনিট..আমার গবেষণা, এটা কি তবে ওয়ার্মহোলের একটা পথ? ” অমল অবাক হয়ে বলল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই সে শুনতে পেল তার প্রশ্নের উত্তর। “আমি জানি, কেন না আপনারাই আমাকে তৈরি করেছেন। সত্যি বলতে আপনিই আমার জন্মদাতা।”

অমল হতভম্ব হয়ে বলল,  “আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।”

“অমল, সাইলেনটিয়াম আর কিছুই নয়, আপনার তৈরি করা একটা কমপিউটার সিমুলেশন প্রোগ্রাম। আপনিই আমার জন্মদাতা। পৃথিবীর মানুষ কোনদিনই লক্ষ লক্ষ আলোকবর্ষ পেরিয়ে মহাকাশে অনুসন্ধান চালাতে পারত না। মানুষের আয়ু খুব সীমিত। এই সত্যিটা অনুভব করতে পেরেই আপনি এমন একটা সিমুলেশন প্রোগ্রাম তৈরি করার কথা ভেবেছিলেন, যার পক্ষে মহাকাশের অসংখ্য সিমুলেশন বা প্রতিলিপি তৈরি করা সম্ভব। মানুষ হয়ত এন্ড্রমিডা গ্যালাক্সিতে যেতে পারবে না, কিন্তু যদি এন্ড্রমিডা গ্যালাক্সির একটা প্রতিলিপি তৈরি করা যায়, সেখানে যাওয়া সম্ভব হতে পারে।”

অমলের ব্যাপারটা বোধগম্য হচ্ছিল না। সে কবে এই প্রোগ্রাম তৈরি করল? কম্পিউটারে তৈরি করা কোন প্রোগ্রাম জড়জগতে কি কোন ভূমিকা পালন করতে পারে। তার মনে আসা প্রশ্নের উত্তর পেতে সময় লাগল না অমলের।

“আপনার মনে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক অমল। আপনার মস্তিষ্ক যেই জগৎ থেকে এসেছে, সেখানে প্রোগ্রাম বলতে শুধুই যন্ত্রের মাথায় পুরে দেওয়া কয়েকটা এলগরিদম। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তি উন্নত হয়। আপনার সময়ে কৃত্রিম বাস্তব বা ভারচুয়াল রিয়ালিটি নিয়ে গবেষণা চলছিল। আজকাল প্রোগ্রাম মানে শুধুই যন্ত্রমগজের কার্যবিধি নয়, মানুষের তৈরি প্রোগ্রাম তৈরি করতে পারে আরেকটা বাস্তব জগতের প্রতিকৃতি। বাস্তব আর প্রতিকৃতিতে সংযোগ ঘটাতে পারে এই সিমুলেশন প্রোগ্রাম। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আপনার গবেষণা অনেক উন্নত হয়েছে অমল। ভবিষ্যত প্রজন্ম নানা ভাবে আমাকে উন্নত থেকে উন্নততর করে চলেছে। আমি আপনার তৈরি করা প্রোগ্রামের ৫৬১তম ভার্শন। আমিই সাইলেনটিয়াম। অতীত আর ভবিষ্যত আমার কাছে কার্যকারণ বা হেতু আর ফলাফলের দুটো চেহারা মাত্র। আপনি আমার সঙ্গে আগেও কথা বলেছেন, হয়ত অন্য কোন সময়, অন্য কোন সমান্তরাল পৃথিবী থেকে মহাকাশ অভিযানে এসে।”

অমলের মাথা ঘুরতে শুরু করেছে ততক্ষণে। কন্ঠস্বর বলে চলেছে, “অমল, আপনি কর্মজীবনের প্রথমে ওয়ার্মহোল নিয়ে গবেষণা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই গবেষণা শেষ হয়নি। আপনার গবেষণায় ভুল ছিল না, একসময় মানুষ জানতে পারবে ওয়ার্মহোল আসলে বাস্তব, যেখান থেকে দুটো দেশকালের মাঝে একটা সেতু তৈরি হয়। এই সেতু তৈরি করার একমাত্র উপায় হলো ব্ল্যাকহোল। ব্ল্যাকহোলের অপর প্রান্ত দিয়ে দেশকাল অতিক্রম করা সময়ের সঙ্গে সহজ গয়ে গিয়েছে। এখন সাইলেনটিয়াম প্রোগ্রামের মাধ্যমে এই ওয়ার্মহোলের সিমুলেশন করাও সম্ভব। কয়েক হাজার সময়ের সেতু ছড়িয়ে আছে মহাকাশে, যার ফলে অতীত আর ভবিষ্যতের দূরত্ব মিটে গেছে। তৈরি হয়েছে হাজার হাজার সমান্তরাল পৃথিবী। কোন পৃথিবীতে আপনি হয়ত গবেষণা করছিলেন রকেট ফিউয়েল প্রোপলশন নিয়ে, কোন পৃথিবীতে হয়ত ওয়ার্মহোল অথবা সাইলেনটিয়াম প্রোগ্রামের এলগরিদম নিয়ে কাজ করছেন। কিন্তু একই মুহুর্তে দেশকালের অন্য কোথাও অন্য কোন অমল হয়ত কাজ করে চলেছে সম্পূর্ণ অন্য কোন বিষয় নিয়ে।

“আপনি যেই ব্ল্যাকহোলের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন, সেটা একটা প্রতিকৃতি মাত্র। কিন্তু প্রতিকৃতি হলেও বিজ্ঞানের নিয়ম এখানেও একই। সেটা পাল্টানো অসম্ভব। এই মুহুর্তে সিমুলেশন আর বাস্তবে কোন তফাৎ নেই। আমার দায়িত্ব শুধু মানুষের ভবিষ্যতের কথা ভেবে কয়েকটা সমান্তরাল পৃথিবীর মধ্যে একটা যোগাযোগ তৈরি করা। মনে করুন একজন বৈজ্ঞানিক যিনি ক্যান্সারের ওষুধ আবিষ্কার করবেন, হয়ত হাজারটা সমান্তরাল পৃথিবীতে একজন মাত্র ওষুধ নিয়ে গবেষণা করছে। বাকিরা কেউ চাকরি করছে, কেউ সাহিত্যিক, কেউ দোকান চালাচ্ছে। কিন্তু অন্তত একজন সিমুলেশন তার জন্যে নির্দিষ্ট কাজটা করুক, সেই যোগাযোগ করিয়ে দেওয়াটাই আমার কাজ। অনেক সময় তার কোন দরকারই পড়ে না। মানুষেরা নিজের নির্দিষ্ট পথ নিজেই ঠিক করে নেয়। আপনার কথাই ঠিক, না জানা অনেক কিছুই সবসময় থেকে যায়। আমরা অনেক কিছুই জেনেছি কিন্তু সব কিছু জানতে পারিনি।”

অমল চুপচাপ শুনছিল। অনেকক্ষণ সময় নিয়ে সে বলল,  “আমার সঙ্গে যোগাযোগের কারণ কি? ”

“সেটা বলা কঠিন। এলগরি্দম অনুযায়ী একশন নেওয়ার পিছনে অনেক কারণই হতে পারে। হয়ত কোন না কোন ভাবে আপনার এই অভিজ্ঞতা কোন এক সমান্তরাল পৃথিবীতে কয়েকটা মানুষের জীবন আরো সুন্দর করে তুলবে। সেটাই তো বিজ্ঞানের উদ্দেশ্য। কিন্তু আপনার হাতে আর সময় নেই। এবার আপনাকে যেতে হবে অমল। ভালো থাকবেন। বিদায়।”

সহসা একটা ঝাঁকুনি দিয়ে অমলের সামনের দৃশ্য এলমেলো হয়ে গেল। চমকে উঠে অমল দেখল সে আবার সুরঙ্গের ভিতর দিয়ে ছুটে চলেছে। সেই সাদা কালো হলুদ সবুজ জ্যামিতিক নকশাকে কাটিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে সে। আলোর ঝিকিমিকির মধ্যে একসময় অমল আবিষ্কার করল সে রোভারের মধ্যেই বসে আছে। অমলের মনে হতে লাগল তারা আলোর চেয়েও বেশি গতিতে এগিয়ে চলেছে।  সঙ্গে সঙ্গে ছুটে চলেছে নানা উল্কার টুকরো।

প্রচন্ড বেগে একসময় কম্পন শুরু হলো। অমলের শরীর কাঁপতে শুরু করেছে, তারপর সে শুনতে পেল প্রচন্ড একটা শব্দ। তারপর আর তার কিছু মনে নেই।  

শেষ পর্ব

চোখ খুলতেই অমল দেখল সে শুয়ে আছে সাদা রঙের একটা বিছানায়। দেখে মনে হচ্ছে কোন একটা হসপিটালের কামরা। আস্তে আস্তে উঠে বসল সে। কোথায় আছে সে? ধীরে ধীরে খাট থেকে নেমে দরজা খুলে দাঁড়ায় সে। মনে হচ্ছে কোন হসপিটালের করিডোর। এখানে কি করে এল সে। হঠাৎ একজন মহিলা নার্সকে দেখতে পেয়ে অমল প্রশ্ন করে,  “শুনছেন? এক্সকিউজ মি!”

মহিলা অমলের দিকে চেয়ে খুব সহজ ভাবে হেসে তার কাছে এগিয়ে এসে বলেন,  “আপনি উঠে পড়েছেন প্রফেসর? এখন কেমন লাগছে? ”

অমল তখনও ধন্ধে আছে। সে বলল,  “আমি কোথায়? কী হয়েছিল? ”

“আপনি হিউস্টনে। এটা নাসার একটা হসপিটাল। আপনার স্পেস স্যুটের কমুনিকেশন সিস্টেম খারাপ হয়ে গিয়েছিল। ভাগ্যিস স্পেস স্টেশন থেকে খুব দূরে যাননি! সেই সব কথা থাক, আপনি এখন বিশ্রাম নিন। বাকি ঘটনা প্রফেসর ওয়াং এর মুখেই শুনবেন।”

অমল চমকে উঠে বলল,  “প্রফেসর ওয়াং? তিনি বেঁচে আছেন? ”

মহিলা হেসে বললেন,  “বেঁচে থাকবেন না কেন? আপনি প্রচন্ড শক পেয়েছেন, কিছুদিন বিশ্রাম নিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।”

অমলকে ঘরে নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দিলেন মহিলা। অমল ঘুমিয়ে পড়ল। তার খুব ঘুম পাচ্ছে। বিকেলে চোখ খুলে অমল দেখল তার বিছানার পাশে হাসিমুখে বসে আছেন প্রফেসর ওয়াং। বিস্মিত হয়ে অমল বলে উঠল,  “আপনি? ”

প্রফেসর ওয়াং এসে অমলের মাথায় হাত দিয়ে বললেন,  “চলে এলাম। ছাড়তে কি চায়? নিউক্লিয়ার প্র্পলসান নিয়ে গবেষণা চলছে বলে ম্যানেজমেন্ট একেবারে মাথা খারাপ করে দিচ্ছে। একের পর এক মিটিং। তুমি কেমন আছ? ”

অমল ফ্যালফ্যাল করে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল প্রফেসর ওয়াং এর দিকে। তারপর শুধু বলল,  “ভালো।”

প্রফেসর ওয়াং আরো খানিকক্ষণ বসে উঠে পড়লেন। যাওয়ার আগে বলে গেলেন,  “তুমি ব্যাপারটা যেভাবে হ্যান্ডল করেছ অমল, আই এম প্রাউড অফ ইউ। সর্সারার প্রজেক্ট সফল হলে তোমাকেই আমি এই দায়িত্ব দেব।”

অমল কিছুই বুঝতে না পেরে ঘাড় নাড়ল। পুরো এক সপ্তাহ অমল হসপিটালে শুয়ে বসে কাটিয়ে দিল। ততদিনে সে অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। জানতে পেরেছে যে প্রফেসর ওয়াং নাসাতে গবেষণা চালাচ্ছেন। সে তার সঙ্গেই কাজ করছে। কয়েকদিন আগেই মহাকাশে অবস্থিত হাবল টেলিস্কোপের কয়েকটা যন্ত্রপাতি আপগ্রেড করতে অমল আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে গিয়ে কয়েকদিন ছিল। হঠাৎ একদিন স্পেসওয়াক করার সময় হঠাৎ ছুটে আসা স্পেস ডেবরির ভাঙা একটা স্যাটেলাইটের টুকরোর আঘাতে সে জ্ঞান হারায়। স্পেস স্টেশনে তার সঙ্গে থাকা প্রফেসর মিগুয়েল এসে তাকে উদ্ধার করেন।

এখন পৃথিবীতে ১৯৯৮ সাল। গত দু’বছর আগেই অমল ইসরো ছেড়ে নাসাতে জয়েন করেছে। প্রফেসর ওয়াং নাসা ছাড়েননি, এখান থেকেই মহাকাশের রহস্য ভেদ করার চেষ্টা করছেন। প্রফেসর মিগুয়েল বায়োকেমিস্ট্রি নিয়ে চর্চা করলেও প্রধানত ডেটা সিমুলেশন নিয়ে কাজ করেন। নাসা থেকে দুমাসের ছুটি নিয়ে বাড়ি যাচ্ছে অমল। তার ছেলে অয়নের বয়স এখন এক। ব্ল্যাকহোলের ব্যাপারটা নিয়ে অনেক ভেবেছে অমল। তার ধারণা সাইলেনটিয়াম ব্ল্যাকহোলের কেন্দ্রের উল্টো দিকে একটা হোয়াইট হোলের প্রতিকৃতি তৈরি করেছে। ব্ল্যাকহোল যত কিছু আকর্ষণ করে টেনে নেয় মাধ্যাকর্ষণ এর কারণে, হোয়াইট হোল সব কিছুই দেশকালের অন্য এক বিন্দুতে নিক্ষেপ করে। অনেক অনেক বছর আগে এই ধারনা নিয়েই ইসরোতে গবেষণা করতে চেয়েছিল সে। সাইলেনটিয়ামের কথা কাউকে বলেনি অমল। বললেও কেউ তাকে বিশ্বাস করবে না। অনেক প্রশ্নের উত্তর সে নিজেও এখনো পায়নি, কিন্তু সে নিয়ে চিন্তা করতে তার আর ইচ্ছা করে না।

অমল লক্ষ করেছে, মহাকাশ অভিযান, তার নিজের অভিজ্ঞতা, অলিভার, ইচিকা, ডক্টর জস, তার আগের জীবনের সব কথা ধীরে ধীরে আবছা হতে শুরু করেছে তার স্মৃতি থেকে। হয়ত এরকমই হয়, একটা পৃথিবীতে সমান্তরাল পৃথিবীর স্মৃতি আবছা হয়ে একসময় মুছে যায়। কিন্তু অয়নের কথা পরিষ্কার মনে আছে তার। সে হয়ত তার পৃথিবীতে ফিরে গিয়ে গবেষণা করবে অমলের ব্রেন সিমুলেশন অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। না করলেও কিছু যায় আসে না।

মিলেনিয়াম পার্কের একটা বেঞ্চে অয়নের হাত ধরে বসে ছিল অমল। সূর্য ডুবে যাচ্ছে গঙ্গার জলে। সন্ধ্যে নামার আগে একটা কমলা আভা ছড়িয়ে গেছে চারদিকে। গাছের ওপর থেকে পাখিদের কলকল শব্দ শুনতে পাচ্ছে সে। বিকেলের শেষ পাখিরা ঘরে ফিরছে। একটা সুখের আভাস তার মন ভালো করে দিচ্ছে। অয়ন এখনো ভালো করে কথা বলতে শেখেনি। অমলের জামা ধরে সে আধো আধো গলায় বলল,  “বাবা! তুমি আবার চলে যাবে না তো? ”

সহসা অমলের মনে অনেক না বোঝা, না জানা স্মৃতি ভিড় করে এল। বুঝতে না পারা কিছু সুখ আর দুঃখ একাকার হয়ে তার চোখদুটো ভিজিয়ে দিল। জামার হাতায় চোখ মুছে হাসতে হাসতে অমল ছেলেকে কোলে তুলে নিল। তারপর তাকে জড়িয়ে ধরে বলল,  “না সোনা, কোনদিন যাব না। কোনদিন না।”                     

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প উপন্যাসের লাইব্রেরি 

Advertisements

8 Responses to উপন্যাস সাইলেনটিয়াম (শেষার্ধ) সুদীপ চ্যাটার্জি বসন্ত ২০১৯

  1. Rumela das says:

    বিশ্বাস করো অসাধারণ লাগল। একটাই কথা বলব, দু-মলাটে আসুক

    Like

  2. Debanjon says:

    darun..pratham porber suspense ektuo hariye jayni ..emon lekha print eo sochorachor paoa jay na..oporer comment er songe ekmat..dumolate asle aro anek beshi pathok porbe

    Like

  3. Tina Banerjee says:

    অসাধারণ। অন্য রকমের লেখা। এক নিশ্বাসে পড়ে ফেললাম। কতো পড়াশুনা করে লেখা সেটা বোঝা যায়। অনেক ধন্যবাদ লেখককে।

    Like

  4. কিশোর ঘোষাল says:

    দুর্দান্ত লাগল। অত্যন্ত টেনসানে ছিলাম সাইলেনটিয়ামে ঢোকার সময়। কিন্তু সেখান থেকে বেরিয়ে সমান্তরাল জগতে চলে আসতেই নিশ্চিন্ত! অপূর্ব।

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s