উপন্যাস হার্বার্ট ওয়েস্ট এইচ পি লাভক্র্যাফট। অনুবাদ দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য শরৎ ২০১৮

লাভক্র্যাফটের আগের উপন্যাসঃ বর্ণদূত  

।।১।।
অন্ধকারের দেশ থেকে

হার্বার্ট ওয়েস্ট আমার সেই কলেজবেলার বন্ধু। সে বন্ধুত্ব আমাদের কলেজ ছেড়ে বের হবার পরেও অটুট ছিল। অথচ তার কথা বলতে গেলে এখন আমার নিঃসীম আতঙ্ক ছাড়া আর কোনও অনুভূতিই হয় না। সে-ভয় শুধু কিছুদিন আগে তার ভয়াবহভাবে অদৃশ্য হয়ে যাবার ঘটনাটার জন্যে নয়। এর সূচনা তার অনেক আগে।

তখন আমরা আরখামের মিসকাটনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিক্যাল স্কুলে তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। আমাদের একত্রে থাকা শুরু হবার পর থেকেই তার উদ্ভট, পৈশাচিক পরীক্ষানিরীক্ষাগুলো আমাকে কেমন যেন সম্মোহিত করে রাখত। কিছুতেই তার সঙ্গ ছাড়তে পারতাম না আমি। এখন, সে চলে যাবার পর সেই ঘোরটাও কেটে গেছে আমার। আর সেই সঙ্গে সঙ্গেই ব্যাপারটা নিয়ে একটা গভীর ভয় এসে ঘিরে ধরেছে আমাকে। বাস্তব বর্তমানের চাইতে স্মৃতি আর সম্ভাবনাদের ভয় দেখাবার শক্তি অনেক বেশি।

মনে আছে, আমাদের প্রথম মোলাকাতের ঘটনাটাই আমাকে সবচেয়ে বড়ো ঝাঁকুনিটা দিয়েছিল। শুরুতেই বলেছি, তখন আমরা দু’জনেই মেডিক্যাল স্কুলের ছাত্র। ওয়েস্ট তদ্দিনে মৃত্যুর স্বরূপ আর কৃত্রিমভাবে মৃতকে বাঁচিয়ে তোলা নিয়ে তার হাড়হিম করা সব তত্ত্বের কল্যাণে বেশ কুখ্যাত হয়ে উঠেছে। তার বক্তব্য, আমাদের বেঁচে থাকাটা একটা যান্ত্রিক প্রক্রিয়া বৈ আর কিছু নয়। ঠিকঠাক রাসায়নিক হিসেব করে ব্যবহার করলে যেকোনও মরা মানুষের শরীরকে জ্যান্ত মানুষের মতোই চালু করে তোলা সম্ভব। এই নিয়ে স্কুলের মাস্টার, ছাত্র সবার কাছেই বেশ একটা হাসির খোরাক হয়ে উঠেছিল ওয়েস্ট।

কিন্তু তাতে সে দমবার পাত্রই নয়। নিজের তৈরি নানান জাতের রাসায়নিক নিয়ে তার ক্রমাগত পরীক্ষার শেষ ছিল না। কত যে নিরীহ খরগোশ, গিনিপিগ, বেড়াল, কুকুর, এমনকি বাঁদরকে প্রাণ দিতে হয়েছে তার সেইসব পরীক্ষার শিকার হয়ে তার ইয়ত্তা নেই। গোটা কলেজে তার সেইসব নারকীয় পরীক্ষার উৎপাতে লোকজন উদ্ব্যস্ত হয়ে উঠেছিল। মাঝেমধ্যে সে এসে জানাত, ওষুধে নাকি কাজ হয়েছে। সদ্য মারা কোন কোন প্রাণীর মধ্যে নাকি রাসায়নিকগুলো ব্যবহার করে খানিক খানিক প্রাণের সাড়া পেয়েছে সে। মাঝেমাঝে সে-সাড়া বেশ বিপজ্জনকও হয়ে উঠতে দেখেছে সে নাকি।

তবে সেসব কথা ঘুঘু বিজ্ঞানীদের বোঝানো তত সহজ কাজ ছিল না। আস্তে আস্তে ওয়েস্ট বুঝতে পারছিল, দুয়েকদিনের ছেলেখেলায় এ-কাজ পুরো করা সম্ভব হবে না। এর জন্য সারাটা জীবন ধরে যুদ্ধ করে যেতে হবে তাকে।

যে দুয়েকটা ক্ষেত্রে সামান্য সাফল্য এসেছে বলে তার দাবি ছিল, সে ক্ষেত্রগুলো থেকে আরও একটা বিষয়ে স্থির সিদ্ধান্তে এসেছিল হার্বার্ট। বলত, সে দেখেছে এক প্রাণীর ওপর যে রাসায়নিক কাজ করে, তা অন্য প্রাণীর ওপর কাজ করবে না। তার অর্থ একটাই। মানুষের প্রাণ ফিরিয়ে দেবার জন্য তাকে মানুষের শরীর নিয়েই কাজ করতে হবে।

আর এইখানেই তার লড়াই বাধল কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে। মানুষের মৃতদেহ নিয়ে এমন ছিনিমিনি তাকে খেলতে দিতে রাজি নয় কেউ। ওদিকে হার্বার্টও নাছোড়। শেষমেশ কলেজের ডিন ডঃ অ্যালান হেসলেকে মাঠে নামতে হল। তিনি হার্বার্টকে ডেকে জানিয়ে দিলেন ওসব অলক্ষুণে কাজকর্ম মেডিক্যাল স্কুলে করা একেবারেই চলবে না।

আমি অবশ্য ওয়েস্টের কাজকর্ম নিয়ে অতটা তুচ্ছতাচ্ছিল্য কখনই করতাম না। তার তত্ত্ব আর তার হাজারো প্রয়োগ নিয়ে মাঝেমধ্যেই গুরুগম্ভীর আলোচনা হত আমাদের। ওয়েস্ট হেকেলের তত্ত্বে বিশ্বাসী ছিল। তার বক্তব্য – আত্মা, প্রাণ ওসব ফালতু সংস্কার। আমাদের শরীরটা আসলে কিছু ভৌত আর রাসায়নিক প্রক্রিয়ার খেলা। সে খেলা থেমে গেলে যন্ত্রটা অকেজো হয়ে পড়ে, এই যা। যেমন সুইচ বন্ধ করলে কলের গান থেমে যায়। কিন্তু যদি কোনও মরা শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, পেশিটেশিতে পচন ধরে না থাকে তাহলে ঠিকঠাক জৈব যন্ত্রপাতি ভরা মৃতদেহটা, সঠিক সুইচটাকে টিপে দিতে পারলেই ফের গড়গড়িয়ে চলতে ফিরতে শুরু করবে।

তবে হ্যাঁ, এটা সে মানত যে, খানিকক্ষণ অকেজো থাকলেও মস্তিষ্কের সংবেদনশীল স্নায়ুকোষগুলো যে চোটটা পাবে তাতে শরীরটাকে ফের বাঁচিয়ে তোলবার পর তার খানিক মানসিক আর বৌদ্ধিক শক্তি কমবে। আর সেজন্যই শুরুতে তার ফন্দিটা ছিল, এমন কোনও একটা ওষুধ তৈরি করা যা কাজে লাগালে প্রাণীটা পুরোপুরি মরবার আগেই তার জীবনীশক্তিকে ফের পুরোদস্তুর ফিরে আসবে। তবে বারবার তার কুকুর-বেড়ালদের নিয়ে সে-পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়ে সে-আশা তাকে ছাড়তে হল।

এইবার পরীক্ষার রাস্তা খানিক বদলাল ওয়েস্ট। একেবারে সদ্য মারা নমুনা নিয়ে কাজ শুরু করল সে। মারবার সঙ্গে সঙ্গে এক মুহূর্ত দেরি না করে তার শিকারদের শরীরে সে তার নানান রাসায়নিক ইঞ্জেক্ট করে দেয়। আর তাতেই দুয়েকবার সাফল্যের ইশারা আসতে শুরু করল।

কলেজের প্রফেসররা অবশ্য তাতে মোটেই বশ হলেন না। তাঁদের বক্তব্য পরিষ্কার, একেবারে সদ্য মারা নমুনা নিয়ে কাজ করছে হার্বার্ট। এমনটা হতেই পারে যে প্রাণীগুলো হয়তো ভালো করে মরেইনি। কাজেই ইঞ্জেকশনের পর তাদের যে নড়াচড়া হার্বার্ট দেখাচ্ছে সেসব ভাঁওতাবাজি। ও হয়তো তারা এমনিতেই নড়ত। তাঁদের একজনও পরীক্ষাগুলোকে একটু ধৈর্য ধরে, যুক্তি দিয়ে, খুঁটিয়ে দেখবার চেষ্টা করেননি।

অ্যালান হেসলের ফতোয়া জারি হবার পর হার্বার্ট যেন ক্ষেপে গেল একেবারে। একদিন আমায় ডেকে বলে, যে করেই হোক মরা মানুষের শরীর সে জোগাড় করবেই। প্রকাশ্যে পরীক্ষা না চালানো গেলে লুকিয়ে লুকিয়েই চালিয়ে যাবে তার কাজ।

কলেজে পড়াশোনার জন্য মরা মানুষ জোগাড়ের কাজটা আমাদের নিজেদের করতে হত না। সে বিশ্রী কাজটা সারত দুটো কালো ছোকরা। কোত্থেকে, কীভাবে তারা সেসব মড়া জুটিয়ে আনছে সে নিয়ে কেউ কোনও উচ্চবাচ্যও করত না। কাজেই মড়া আনবার যা কায়দা-কৌশল ওয়েস্ট আলোচনা করত তাতে ব্যাপারটা বেশ ভয়াবহই ঠেকত আমার। ওয়েস্ট ছেলেটা বেশ রোগাভোগা। তার চোখে চশমা, সরু সরু হাত-পা, হলদেটে পাতলা চুল, ফ্যাকাশে নীল চোখ। ওই চেহারা নিয়ে নরম গলায় সে যখন ক্রাইস্টচার্চের গোরস্থান বা পটার্স ফিল্ডের কবর খুঁড়ে মড়া তোলবার সুবিধে অসুবিধে নিয়ে আলোচনা করত তখন ব্যাপারটা বেশ ভূতুড়েই ঠেকত।

শেষমেশ অনেক আলোচনা করে আমরা পটার্স ফিল্ডেই হানা দেয়া সাব্যস্ত করলাম। আসলে ক্রাইস্টচার্চে মানুষকে গোর দেবার আগে তার গায়ে নানান গন্ধটন্ধ মাখানো হয়। সেসব মাখালে নাকি ওয়েস্টের ওষুধ আর কোনও কাজ করবে না সেই শরীরের ওপর।

ততদিনে সব অস্বস্তি সত্ত্বেও আমি ওয়েস্টের একনিষ্ঠ চ্যালা হয়ে উঠেছি। কীভাবে কী কাজকর্ম হবে তার সবতাতেই তাকে পরামর্শও দিই। পরীক্ষানিরীক্ষাটার জন্য ঠিকঠাক জায়গাটাও শেষমেশ আমিই খুঁজে বের করলাম।

মিডো হিল ছাড়িয়ে চ্যাপম্যানদের একটা খামারবাড়ি ছিল। বাড়িটা তখন ফাঁকা পড়ে আছে। জায়গাটা দেখেই আমার পছন্দ হয়ে গেল। ওখানে কাজটা সারলে কাকপক্ষীতেও টের পাবে না। অতএব খামারবাড়ির একতলার দুটো ঘরে অপারেশন রুম আর ল্যাবরেটরি তৈরি হল আমাদের।

জায়গাটা রাস্তা থেকে বেশ খানিক ভেতরে। আশপাশে অন্য কোনও বাড়িঘরও নেই। তবুও, সাবধানের মার নেই। রাতের বেলা হঠাৎ করে পথ ভুলে কেউ যদি সেদিকটা এসে পড়ে, তাহলে পোড়োবাড়ির ভেতর থেকে আলো-টালো বেরোতে দেখলে সে নিয়ে হইচই একটা বাধতেই পারে। অতএব, ঘরগুলোর দরজা-জানালা কালো কাপড় দিয়ে মুড়ে দিলাম আমরা, যাতে রাতের বেলা বাইরে কেউ এসে পড়লেও ভেতরের আলো তার চোখে না যায়।

এরপর টুকটুক করে জিনিসপত্তর জোগাড় করবার পালা। বোস্টন থেকে কিছু কেনাকাটা, কলেজের ল্যাব থেকে চুপচাপ কিছু জিনিসপত্র সরিয়ে আনা, এইভাবে আমাদের ল্যাব সেজে উঠছিল আস্তে আস্তে।

কাজটায় বড়ো একটা সমস্যা ছিল। পরীক্ষা তো আর প্রথমেই সফল হবে না! ফেল করা পরীক্ষার পর মড়াগুলোকে নিয়ে করব কী আমরা? কয়েকদিনের বাসি হলেই বেজায় দুর্গন্ধ ছাড়ে সেগুলো। কলেজে অ্যানাটমির ক্লাশে ব্যবহার করা মড়াগুলোকে চুল্লিতে পুড়িয়ে ফেলা হয়। কিন্তু সে-চুল্লি তো আর এখানে এনে বসানো যাবে না!

অনেক ভেবেচিন্তে শেষমেশ আমরা সে-বাড়ির সেলারটাকেই বেছে নিলাম। বেশ কিছু শাবল, কোদাল, বেলচা এনে জড়ো করে রাখা হল। পরীক্ষানিরীক্ষার পর ব্যবহার করা মড়াগুলোকে ওই সেলারে নিয়ে পুঁতে ফেললেই হবে। কেউ টেরও পাবে না।

এরপর অপেক্ষার পালা। এলাকায় কোথায় কে মারা গেল তার খোঁজখবর রাখা শুরু করে দিলাম আমরা। যেকোনও মড়ায় কাজ হবে না। চাই এমন শরীর যা মৃত্যুর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে এনে গোর দেয়া হয়েছে কোনও রাসায়নিকের ব্যবহার ছাড়া। সেই সঙ্গে শরীরটা নিখুঁত, তরতাজা হওয়া প্রয়োজন। প্রত্যেকটা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থাকতে হবে। বিকলাঙ্গ হলে কাজ হবে না। সব মিলিয়ে আচমকা মারা যাওয়া কমবয়সী মানুষের শরীর হলেই সবদিক থেকে সুবিধে।

এরপর বেশ কয়েক সপ্তাহ কাটল এলাকার যত হাসপাতাল আর মর্গে যাতায়াত করে জুতোর শুকতলি খসিয়ে। কারও যাতে সন্দেহ না হয় সেজন্য কলেজের দরকারের দোহাই দিয়ে মড়ার তল্লাশ করি, সদ্য মৃত শরীরগুলো ঘেঁটেঘুঁটে দেখি, কিন্তু কাজের কাজ আর হয় না।

দরকার মতন ঠিকঠাক মড়া মেলবার ব্যাপারে প্রায় আশা ছাড়তে বসেছি, এমন সময় কপাল খুলল একরকম হঠাৎ করেই। খবর এল, পটার্স ফিল্ডের সুমনের-এর পুকুরে এক ঠিকে কাজের ছোকরা ডুবে মরেছে। তাকে তৎক্ষণাৎ মিউনিসিপ্যালিটি থেকে নিয়ে গিয়ে সটান গোর দিয়ে কর্তব্য পালন করে ফেলা হয়েছে। খবর পেয়ে বিকেলবেলা চুপচাপ গিয়ে কবরটা দেখে এলাম আমরা। ঠিক হল, মাঝরাত্তিরে তাকে কবর থেকে তোলা হবে।

পরের কেসগুলোতে কবরখানায় যেসব বিশ্রী অভিজ্ঞতাগুলো আমাদের হয়েছিল প্রথমবারে সেগুলো ঝুলিতে না থাকায় ব্যাপারটা যে কতটা বীভৎস হতে পারে তার কোনও আন্দাজ আমাদের ছিল না। সে-সময় ইলেকট্রিক টর্চ বাজারে এসেছে, কিন্তু তখনও তা এখনকার টর্চগুলোর মতো ভালো কাজ দেয় না। অতএব কোদালের সঙ্গে দুটো কালো কাগজে ঢাকা লন্ঠন সঙ্গে নিয়েছিলাম আমরা। মৃত মানুষের বোজানো কবর খোঁড়া বেশ শ্রমসাধ্য কাজ। ওর মধ্যে একটা গা হিম করা কাব্যিক ব্যাপারও হয়তো আছে। বিজ্ঞানী না হয়ে আর্টিস্ট হলে হয়তো আমরা সে শিল্পটার রসে খানিক হলে মজতেও পারতাম।

কিন্তু বাস্তবে মাটি খুঁড়ে কোদালের ডগায় কফিনের কাঠ ঠেকতে বেশ একটু স্বস্তিই হয়েছিল আমাদের। এরপর ঝপাঝপ কোদাল চালিয়ে পাইনকাঠের কফিনটাকে বের করে এনে ওয়েস্ট গর্তে লাফ দিয়ে নেমে তার ঢাকনাটা খুলে মড়াটাকে টানাহ্যাঁচড়া করে তুলে ধরল। আমি ওপর থেকে ঝুঁকে তার হাত থেকে সেটাকে জড়িয়ে ধরে তুলে আনলাম।

তারপর ফের দু’জনে মিলে ফাঁকা কফিন মাটিচাপা দিয়ে কবর বোজাবার পালা। কাজটা করতে করতে মৃতদেহটার নিশ্চল, জীবনের চিহ্নহীন শরীরটার দিকে চোখ পড়ে গেলে কেমন গা শিরশির করে উঠছিল আমাদের। অবশেষে কবর নিখুঁত করে বুজিয়ে আমাদের কীর্তিকলাপের সব চিহ্ন মুছে ফেলে, একটা বস্তায় শরীরটা ভরে নিয়ে চ্যাপম্যানের খামারবাড়ির দিকে রওনা হলাম যখন, রাত তখন তিন প্রহর হয়েছে।

কবরখানার আলো-আঁধারিতে জিনিসটাকে যতটা ভূতুড়ে মনে হচ্ছিল, ডিসেকশন টেবিলে অ্যাসিটিলিন আর্কের চড়া আলোর নিচে তাকে আর তত ভয়ংকর ঠেকছিল না। ছোকরার শক্তপোক্ত খেটে খাওয়া চেহারা। ধূসর চোখ। বাদামী চুল। দেখেই বোঝা যায়, সহজ-সরল লোক। সুক্ষ্মতার লেশমাত্র ছিল না এর মধ্যে। কেবল শক্তপোক্ত নীরোগ একটা শরীর তার সম্বল। চোখ বন্ধ করে থাকা মুখটার দিকে তাকালে মনে হবে, মৃত নয়, যেন ঘুমিয়ে আছে সে।

বেশ একটা খুশি খুশি ভাবই হচ্ছিল আমাদের সেটার দিকে দেখে। অবশেষে! ওয়েস্টের এত সাধনায় তৈরি ওষুধগুলো পরীক্ষা করে দেখবার জন্য একটা ঠিকঠাক মৃতদেহের বন্দোবস্ত করা গেল তাহলে!

অবশ্য খানিক দুশ্চিন্তাও হচ্ছিল না যে তা নয়। আমরা খুব ভালো করেই জানতাম যে প্রথম চেষ্টায় পুরোপুরি সাফল্য আসবে না। আংশিক সফল হলে আবার তাতে কী কী ঘটতে পারে সে নিয়েও নানা উদ্ভট আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দিতে পারছিলাম না। ভয়টা বিশেষ করে আধা জীবন্ত জীবটার মন আর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াগুলো নিয়ে। মরার পরের সময়টায় মস্তিষ্কের কিছু কিছু নিউরোন তো নিঃসন্দেহে মারা গেছে।

আমি আবার মানুষের চেতনাকে নিছক একটা যন্ত্রের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া বলে মেনে নিতে ঠিক তৈরি ছিলাম না। আত্মা বলে কিছু একটা আছে বলে বিশ্বাস করতাম। কাজেই টেবিলে শুয়ে থাকা মৃতদেহটার দিকে তাকিয়ে একটা অন্যরকম চাপা উত্তেজনাও কাজ করছিল আমার ভেতর। মৃতের দেশ থেকে ফিরে আসা একটা লোক সে-বিষয়ে কী কী আমাদের বলতে পারে সেই ভেবে। জীবিত মানুষের অগম্য সেই আত্মাদের দেশে গিয়ে এ-ছোকরা কী কী দেখেছে কে জানে। সেখান থেকে ফিরিয়ে আনতে পারলে তার কতটা সে আমাদের জানাতে পারবে তাই বা কে বলতে পারে!

তবে ওয়েস্টের ভেতর সেসব উত্তেজনার ছিটেফোঁটাও ছিল না। একেবারে শান্তভাবে শরীরটার হাতের চামড়া খানিকটা চিরে ফেলেছে সে ততক্ষণে। তারপর তার শিরায় বেশ খানিকটা ওষুধ ঢুকিয়ে দিয়ে চটপট ক্ষতস্থানটাকে বেঁধে দিয়েছে ফের।

এবার দীর্ঘ অপেক্ষার পালা। ওয়েস্টের অবশ্য কোনও ছটফটানি নেই। খানিক বাদে বাদে মৃতদেহের বুকে স্টেথো লাগিয়ে সে শোনে কোনও স্পন্দন ফিরে এল কি না।

প্রায় পৌনে ঘন্টা মতন এইভাবে অপেক্ষা করবার পর অবশেষে সে গম্ভীর মুখে জানাল, প্রথম পরীক্ষা ব্যর্থ। ওষুধ কাজ করেনি। তবে সম্পূর্ণ হাল সে ছাড়েনি। সাধের মৃতদেহটিকে ফেলে দেবার আগে আরেকটা পরীক্ষা সে করে নিতে চায়। ওষুধের রাসায়নিক মিশ্রণে কয়েকটা বদল এনে ফের একবার দেখে নিতে চায় ফলটা কী হয়।

এদিকে সময় তখন কমে আসছে। রাতের আর বেশি বাকি নেই। দিনের আলোয় ধরা পড়বার সামান্যতম সম্ভাবনাও ছেড়ে যেতে চাই না আমরা। বাড়ির সেলারে তাই আগে থেকেই শরীরটা লুকোবার জন্য একটা গর্ত খুঁড়ে তৈরিও রাখা হয়েছে। এ-অবস্থায় শরীরটাকে আরেক রাত পরীক্ষা করবার জন্য তাই ওভাবে খোলা টেবিলে শুইয়ে রেখে চলে যাওয়া সম্ভব ছিল না। তাছাড়া, ধরা না পড়লেও, আরও একদিন রাখলে শরীরটা পচে যাবারও সম্ভাবনা আছে। তখন কোনও ওষুধেই আর কাজ হবে না।

কাজেই আমরা পাশের ল্যাব রুমে অ্যাসিটিলিনের বাতিটা নিয়ে গিয়ে ওষুধটা নিয়ে কাজ শুরু করে দিলাম। এ-ঘরে অন্ধকারে মৃত শরীরটা শুয়ে রইল একা।

ল্যাবে এসে খানিকক্ষণের মধ্যেই ওয়েস্ট তার নতুন ওষুধের নানান জিনিসপত্র মেপেজুপে মেলানোর কাজে একেবারে ডুবে গেল। আমিও তার হাতে হাতে এটা ওটা এগিয়ে দিতে তখন ব্যস্ত। সময় ফুরিয়ে আসছে। যেকোনও মুহূর্তে ভোরের আলো ফুটে যাবে এবারে!

উদ্ভট ব্যাপারটা একেবারে হঠাৎ করেই ঘটে গেল এই সময়। আমি তখন একটা টেস্ট টিউব থেকে অন্য একটা টেস্ট টিউবে কিছু একটা ঢালছিলাম, আর ওয়েস্ট ব্যস্ত আছে একটা অ্যালকোহল বার্নার নিয়ে। হঠাৎ পাশের অন্ধকার ঘরটার ভেতর থেকে একটা রক্ত জমানো চিৎকারের একটানা শব্দ উঠল। কোনও পার্থিব জীবের গলা থেকে তেমন নারকীয়, জান্তব শব্দ উঠতে পারে না।

শব্দটা যেন একটা হাতুড়ির মতো এসে আমাদের নার্ভে ঘা মেরেছিল। একই সঙ্গে আমরা দু’জন চিৎকার করে উঠে হাতের জিনিসগুলো ছুড়ে ফেলে দিয়ে ছুটে গেলাম ল্যাবের খোলা জানালাটার দিকে। তারপর বার্নার, টেস্ট টিউব, রাসায়নিকের জার সমস্ত উলটে ফেলে দিয়ে জানালা দিয়ে ছিটকে তারাভরা আকাশের নিচে এসে পড়লাম দু’জন মিলে। পাগলের মতো চিৎকার করতে করতে নির্জন পথ দিয়ে ছুট দিয়েছিলাম আমরা।

তবে লম্বা রাস্তা পাড়ি দিয়ে শহরের কাছাকাছি যখন এসে পৌঁছেছি, ততক্ষণে ভয়ের প্রাথমিক ধাক্কাটা কেটেছে আমাদের। প্রায় টলতে টলতে শহরের দিকে ফিরতে থাকা দুই বন্ধুকে দেখে তখন সারারাত আমোদ-হুল্লোড় করে শহরের দিকে ফিরতে থাকা দুই ফুর্তিবাজ বলেই মনে হবে।

শহরে ফিরে কোনওমতে ওয়েস্টের ঘরে এসে ঢুকে বাকি রাতটা গ্যাসের আলো বাড়িয়ে দিয়ে বিষয়টা নিয়ে অনেক আলোচনা করেছিলাম আমরা। শেষমেশ ব্যাপারটার একটা কাজ চলা গোছের মনগড়া ব্যাখ্যা খাড়া করে, আর তাই নিয়ে খোঁজখবর করবার মোটামুটি একটা ছক বানিয়ে রেখে দু’জনে ঘুমোতে গেলাম। সেদিন আর ক্লাশ-টাশে যাওয়া হল না।

তবে পরদিন রাতেও নিশ্চিন্ত ঘুম আমাদের ভাগ্যে ছিল না। সন্ধেবেলা জেগে উঠে সেদিনের সান্ধ্য কাগজে চোখ বুলোতে গিয়ে দুটো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ফের একবার আমাদের চমকে দিল। প্রথমটা হল চ্যাপম্যানের খামারবাড়িটা কোনও আকস্মিক অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে ছাই হয়ে যাবার খবর। সেটা নাহয় পালাবার সময় অ্যালকোহল ল্যাম্প উলটে যাওয়া দিয়ে ব্যাখ্যা করা যেতেও পারে। কিন্তু অন্য খবরটা বেশ গা শিউরে ওঠবার মতো। পটার্স ফিল্ডে একটা সদ্য তৈরি কবরকে কে বা কারা খোঁড়বার চেষ্টা করেছে। নাকি কোনও কোদাল-টোদাল নয়, খালি হাতে মাটি আঁচড়ে খোঁড়বার চেষ্টা। খবরটা পড়ে একে অন্যের দিকে তাকাচ্ছিলাম আমরা। চলে আসবার আগে কবর তো আমরা খুব ভালো করেই—

এরপর দীর্ঘ সতেরো বছর ধরে ওয়েস্ট বারংবার বলে গেছে, পেছনে কার পায়ের শব্দ শুনতে পায় সে। আর এখন, সে একেবারে নিখোঁজ!

।।২।।
মহামারী রাক্ষস

ষোলো বছর আগের সে গ্রীষ্মকালটা আমি কখনও ভুলতে পারব না। সে-বছর সাক্ষাৎ ইবলিশের চ্যালার মতোই যেন নরক থেকে উঠে এসে গোটা আরখাম শহর জুড়ে দাপিয়ে বেড়িয়েছিল কালান্তক টাইফয়েড। ক্রাইস্টচার্চের কবরখানায় গোর দেয়া কফিনের সারের কথা মনে করে অনেকেই এখনও সে-বছরটাকে শয়তানের অভিশাপের বছর বলেই মানে।

কিন্তু আমাদের দু’জনের কাছে সে-বছরের আসল আতঙ্কটা অন্য ছিল। ওয়েস্ট হারিয়ে গিয়ে এখন সে-আতঙ্কের বোঝা কেবল আমাকে একলাই বয়ে বেড়াতে হচ্ছে।

আমরা দু’জন তখন মিসকাটনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিক্যাল স্কুলে গ্র্যাজুয়েশনের পড়াশোনার কাজে ব্যস্ত। আগের বছরের চ্যাপম্যানের খামারের ঘটনাটা প্রথম প্রথম ওয়েস্টের মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। প্রতিমুহূর্তেই সে কেবল বলত, কেউ তার পিছু নিয়েছে। তাকে দেখা যায় না। কিন্তু তার উপস্থিতি কেবল ওয়েস্টই টের পায়।

চ্যাপম্যানের খামারের সে-রাতটার ভয়কে তখন পেছন ফিরে আমরা অন্য আলোয় দেখা শুরু করেছি। তাতে কিছুটা আত্মধিক্কারও মেশানো ছিল। ভাবতে শুরু করেছিলাম, সম্ভবত অতিরিক্ত নার্ভাসনেস সে-আতঙ্কের জন্য বেশি দায়ী ছিল।

এ-নিয়ে মাঝেমাঝেই নিজেকে দোষ দিত ওয়েস্ট। পরীক্ষাটা করবার জন্য তার একেবারে তাজা মৃতদেহ পাবার জন্য অপেক্ষা করা উচিত ছিল বলে তার বিশ্বাস। নাকি কয়েক ঘন্টার বাসি মৃতদেহটায় ওষুধ প্রয়োগে ফল বিপরীত হয়েছে। তাছাড়া অমন ভয় পেয়ে পালিয়ে না এসে শরীরটাকে ধরে তখন আমাদের খুঁড়ে রাখা কবরে চালান করে আসাটা উচিত ছিল। সেটা মাটির নিচে আছে জানা থাকলে নাকি এতটা অস্বস্তি তার কখনওই হত না।

এইসব ভাবনাচিন্তার ফলে ঘটনাটার পর কিছুদিন ওয়েস্টের এ-হেন পরীক্ষানিরীক্ষা বন্ধ ছিল। তবে সে মাত্রই কিছুদিনের ব্যাপার। শিগগিরই ফের তার বৈজ্ঞানিক আবেগ নতুন শক্তি নিয়ে ফিরে এল। ফের একবার কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে তাজা মৃতদেহ নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করবার আবদার নিয়ে গণ্ডগোল শুরু করে দিল সে।

ডঃ হেসলে ফের একবার বেশ কড়াভাবেই তাকে মানা করে দিলেন। কলেজের অন্যান্য মাস্টারদেরও তাতে সায় ছিল। ছোকরা ছাত্রের মড়াকে জ্যান্ত করবার হাস্যকর থিওরিতে তাঁদের কারও বিশ্বাস নেই।

এতে তাঁদের কোনও দোষ ছিল না। একে তো তত্ত্বটা প্রায় অবিশ্বাস্য। তার ওপর ওয়েস্টের বাচ্চাদের মতো মুখ, তার পাতলা চেহারা, চশমাঢাকা নিরীহ নীল চোখ আর নরম গলা তার মাথায় লুকিয়ে থাকা শীতল মস্তিষ্কটার অবিশ্বাস্য শয়তানি শক্তির কোনও আন্দাজই দিত না যে! তার পরের এতগুলো বছরেও ওয়েস্টের মুখে বয়সের ছাপ পড়েনি কোনও। শুধু একটু একটু করে পাথরের মতো শক্ত হয়ে উঠেছিল তার চোখদুটো। এমনকি কিছুদিন আগে তার কোনও চিহ্ন না রেখে উবে যাওয়া অবধি প্রায় একইরকম দেখতে রয়ে গেল সে।

কোর্সের ফাইনাল টার্মের শেষের দিকে ওয়েস্টের সঙ্গে হেসলের ঝগড়াটা একেবারে চরমে উঠল। তার ধারণা, কর্তৃপক্ষ নিতান্ত বুদ্ধুর মতো তার অকল্পনীয় একটা বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বাধা দিয়ে চলেছে। কাজটা সে হয়তো পরে স্বাধীনভাবেও করতে পারে। কিন্তু ইউনিভার্সিটিতে থাকাকালিন সেখানকার আধুনিক গবেষণাগারের সুবিধে কেন তাকে দেয়া হবে না? ছোটোখাটো প্রাণীদের ক্ষেত্রে মৃত শরীরে প্রাণসঞ্চারের কিছু প্রমাণ সে দিয়েছে ততদিনে। কিন্তু সেগুলোকে অকর্মণ্য বুড়ো মাস্টাররা বাতিল করে দেয় কোন অধিকারে?

আস্তে আস্তে সে চারপাশে বলে বেড়ানো শুরু করল, “এইসব গোঁড়া প্রফেসর-ডাক্তার টাইপগুলো একেকটা জড়বুদ্ধি। লোক এরা ভালো সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। শরীরে দয়ামায়া আছে। অথচ কী সংকীর্ণ দৃষ্টি দেখ দেখি একেকজনের! দূরদৃষ্টির ছিটেফোঁটাও নেই। এদের মতো ভিতু লোকজনই টোলেমি আর ক্যালভিনের তত্ত্বের পক্ষে ভোট দেয়, ডারউইনকে নিয়ে হাসে, আর এই করে করে একদিন এরা ইতিহাসের কাছে হাসির খোরাক হবে, দেখে নিও।”

তবে যতই সে রেগেমেগে যা খুশি বলে বেড়াক, তাতে হেসলে বা অন্য মাস্টারদের কোনও হেলদোল ছিল না। ফলে ওয়েস্ট আস্তে আস্তে একেবারে ক্ষেপে উঠছিল। তার ধ্যান-জ্ঞান-স্বপ্ন তখন একটাই, মাথামোটাগুলোকে একটা চমকদার পরীক্ষা দিয়ে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হবে তার তত্ত্বটা কতটা ঠিক। আর দশটা ছোকরার মতোই প্রতিশোধের আকাশকুসুমটা বেশ বিস্তারিতভাবেই কল্পনা করত সে দিনরাত। একটা চমকদার এক্সপেরিমেন্ট, সব বুড়ো পণ্ডিতগুলোর মুখ তাতে চুন হয়ে যাবে, আর তারপর ওয়েস্ট অসামান্য মহত্ত্ব দেখিয়ে তাদের সবাইকে ক্ষমা করে দেবে। আহা!

আর, তারপর এল সেই গ্রীষ্মের মহামারী। সে-সময়টা আমি আর ওয়েস্ট সবে স্নাতক হয়েছি। তবে কিছু অতিরিক্ত কাজকর্মের জন্য তখনও মেডিক্যাল কলেজের সামার স্কুলে রয়ে গিয়েছিলাম আমরা। ফলে শহরে যখন রোগটার প্রাদুর্ভাব শুরু হল আমরা তখন আরখামেই রয়েছি।

তখনও ডাক্তারির লাইসেন্স আমাদের হাতে আসেনি। তবে তখন কে আর অত আইনকানুন নিয়ে মাথা ঘামায়? মহামারীর শিকারের সংখ্যা বাড়তে শুরু করবার সঙ্গে সঙ্গেই পাশ করা ছাত্র হিসেবে আমাদের কাজে জুতে দেয়া হল কলেজের তরফ থেকে। অবস্থা তখন প্রায় হাতের বাইরে চলে গেছে। এত মানুষ মারা যাচ্ছে যে স্থানীয় কবরখানাগুলো তার চাপে দিশেহারা। মৃতদেহগুলোকে কোনও সুগন্ধী-টুগন্ধী মাখাবার অবসর কারও নেই। আসবার সঙ্গে সঙ্গে কাপড়ে মুড়ে কফিনে ভরে সরাসরি গোর দিয়ে দেয়া হচ্ছে সার সার।

মাঝেমাঝেই সেই দেখে ওয়েস্ট হাত মোচড়াত। এত তাজা মৃতদেহ! অথচ তার রিসার্চটা চালিয়ে যাবার কোনও উপায় নেই। কাজের চাপে আমাদের তখন নাওয়াখাওয়াও মাথায় উঠেছে। গবেষণা-টনা করবার ফুরসত পাবার জো নেই। মাঝেমাঝেই তাই দেখতাম, বেচারা একা একা মুখটা আষাঢ়ের মেঘের মতো করে বিড়বিড় করে দুঃখ করছে সেই নিয়ে।

ওয়েস্টের শত্রুদলেরও তখন নাওয়াখাওয়া ঘুচে গেছে মহামারীর মোকাবিলা করতে গিয়ে। বিশেষ করে প্রফেসর হেসলে তো জান লড়িয়ে দিচ্ছেন মানুষের প্রাণ বাঁচানোর কাজে। যে কেসগুলোতে সবাই আশা ছেড়ে দেয়, সেখানেও তিনি পাহাড়ের মতো অটল হয়ে দাঁড়িয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা কষে যান রোগীকে ফিরিয়ে আনবার জন্য।

মহামারীর বয়স যখন মাস খানেক গড়িয়েছে তদ্দিনে দেখা যাচ্ছিল, ডঃ হেসলেকে ওই জন্য প্রায় দেবতার আসনে তুলে দিয়েছে গোটা শহর। অন্যের জীবন বাঁচাবার জন্য অমানুষিক পরিশ্রম করে ক্লান্তির শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়েও তাঁর কাজের বিরতি নেই। এমনকি ওয়েস্ট নিজেও মাঝেমাঝে মুগ্ধ হয়ে যেত মানুষটার আত্মত্যাগ আর কাজের নিষ্ঠা দেখে। আর তারপরেই ফের মাথায় পোকাটা চাগিয়ে উঠত তার। একে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হবে ওয়েস্টকে চিনতে কত বড়ো ভুল এ করেছে।

সম্ভবত সেই ম্যানিয়াটা থেকেই একদিন রাতে ওয়েস্ট একটা সদ্য মরা শরীর এনে কলেজের শবব্যবচ্ছেদের ঘরে নিয়ে তুলল। সে-সময়টা কলেজ বা মিউনিসিপ্যালিটি কেউই এসব ছোটোখাটো বিষয়ে নজর দেবার অবস্থায় নেই। কাজটা তাই তার পক্ষে সহজ হয়ে গিয়েছিল।

আমাকে সাক্ষী রেখে তার ওষুধের একটা নতুন ফর্মুলা শরীরটায় ইনজেক্ট করে ঢোকাবার পর সেটা চোখ খুলেছিল। কিন্তু তাতে আত্মা-জমানো একটা আতঙ্কের দৃষ্টি মাখিয়ে কয়েক মুহূর্তের জন্য ঘরের ছাদটার দিকে দেখেই সেই যে সে চোখ বুজল, আর কোনওমতেই তাকে দ্বিতীয়বার জাগানো গেল না। ওয়েস্ট মাথা নেড়ে বলল, গরমকালে মৃতদেহ খুব তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে যায়। এ শরীরটা যথেষ্ট তাজা ছিল না হয়তো। তাই এমন ফলাফল হয়েছে।

শরীরটাকে পুড়িয়ে ফেলবার সময় সেবার আমরা প্রায় ধরা পড়তে পড়তে বেঁচে যাওয়ায়, ওয়েস্ট ঠিক করল, কলেজ চত্বরে এমন চেষ্টা আর নয়।

সে-বছর আগস্ট নাগাদ মহামারীর আক্রমণ চরমে উঠেছিল। ওয়েস্ট আর আমার তখন খেটে খেটে অর্ধমৃতের দশা। এমন সময় আগস্টের ১৪ তারিখে প্রফেসর হেসলে নিজেই মারা গেলেন। ১৫ তারিখ মহাসমারোহে তাঁর অন্ত্যেষ্টি করা হল। সারা শহর চোখের জলে আর ফুলের মালায় বিদায় দিল তাদের দেবতার সমান ডাক্তারবাবুকে।

প্রফেসর হেসলেকে কবর দেবার পর কলেজের ছাত্ররা মিলে কমার্শিয়াল হাউসের বার-এ গিয়ে বসা হয়েছিল কিছুটা সময় কাটাবার জন্য। দুঃখে কেউ বিশেষ কথাবার্তা বলছিল না, একমাত্র ওয়েস্ট ছাড়া। সে সেখানে সুযোগ পেলেই যাকে তাকে ধরে তার মড়া জাগানোর তত্ত্ব আলোচনা করবার সুযোগ পেলে ছাড়ছিল না মোটে।

তারপর দিন কেটে সন্ধে নামলে যখন বেশিরভাগ ছাত্র যার যার কাজে ফিরে গেল, তখন ওয়েস্ট এসে আমায় ধরে বসল। রাতে তার সঙ্গে যেতে হবে। কাজ আছে।

সেদিন রাত প্রায় দুটো নাগাদ ওয়েস্টের বাড়িউলি আমাদের ফিরে আসতে দেখেছিল। একটা জ্ঞানহীন মানুষকে দু’জনের মধ্যে ধরে নিয়ে আমরা আস্তে আস্তে ঘরের ভেতর ঢুকছিলাম। ঢুকতে ঢুকতেই শুনি দোতলার বারান্দায় বাড়িউলি তার বরকে বলছে, “ফুর্তিটা আজ একটু বেশিই হয়ে গেছে ছোঁড়াগুলোর। যে বন্ধুটিকে বয়ে এনেছে তার ঘুম তো শেষরাত্তিরের আগে ভাঙবে বলে মনে হয় না।”

আপাতদৃষ্টিতে ভদ্রমহিলা ঠিকই বলেছিলেন বলেই ভাববে সবাই। কারণ, সেদিন রাত তিনটে নাগাদ ওয়েস্টের ঘরের ভেতর থেকে রক্ত জমানো কিছু চিৎকারের শব্দ ওঠে। বাড়িউলি লোকজন নিয়ে এসে দরজা ভেঙে দেখে, আমরা দু’জন রক্তে মাখামাখি কার্পেটের ওপর অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছি। সারা গায়ে আঁচড়-কামড়ের দাগ। চারপাশে ওয়েস্টের শিশিবোতল আর যন্ত্রপাতির ভাঙা টুকরোটাকরা ছড়িয়ে আছে।

আমাদের সঙ্গে আসা বন্ধুর ব্যাপারে অবশ্য কোনও খোঁজখবর নেবার দরকার ছিল না। খাটের মাথায় খোলা  জানালাটার ভাঙা পাল্লা বলে দিচ্ছিল, অতিথিটি ওই পথে বিদায় হয়েছেন। তবে দোতলার ওপরের জানালা থেকে অতটা নিচে ঝাঁপ দেবার পর তিনি যে কেমন করে পায়ে হেঁটে উধাও হলেন সে-নিয়ে দুয়েকটা ভুরু একটু কুঁচকেছিল। ঘরে কিছু বিচিত্র কাপড়ের টুকরোটাকরা ছড়িয়েছিল। কিন্তু জ্ঞান ফিরে আসবার পর ওয়েস্ট জানায়, সেগুলো তার অতিথির পোশাক নয়। মৃতদের আচ্ছাদনের টুকরো সেগুলো। রোগীর মৃত্যুর পরে এ-রোগের জীবাণু কীভাবে, কতদিন টিকে থাকতে পারে সেইটে বিশ্লেষণ করে বোঝবার জন্য সে জোগাড় করে এনেছে। এ-হেন ব্যাখ্যা দেবার পর যখন সে সেগুলোকে ফায়ার প্লেসে ফেলে তড়িঘড়ি পুড়িয়ে দেয়, তখন তাতে লোকজন স্বাভাবিকভাবেই কোনও বাধা দেয়নি।

পুলিশকে আমরা দু’জনেই জানিয়েছিলাম, লোকটাকে আমরা চিনি না। ওয়েস্ট বেশ গলাটলা কাঁপিয়ে দাবি করে, রাত্তিরে শহরের একটা বার-এ লোকটার সঙ্গে তাদের আলাপ হয়েছিল। নামটাম আর জানা হয়নি। নেশা করে একেবারে বেহেড হয়ে যাওয়ায় রাস্তায় পড়ে বেঘোরে মরবে ভেবে তাকে তুলে এনেছিলাম আমরা।

সেদিন রাত্রেই আরখামের দ্বিতীয় আতঙ্কের সূচনা হয়। আমার কাছে মহামারীর আতঙ্ককেও ছাপিয়ে গিয়েছিল তার প্রতিক্রিয়া। ক্রাইস্টচার্চ গোরস্থানের এক রাতপাহারাদার খুন হয়ে যায় সে-রাত্রে। যে অকল্পনীয় নিষ্ঠুরতায় নখের আঁচড় মেরে মেরে তাকে খুন করা হয়েছিল তা কোনও মানুষের সাধ্য বলে বিশ্বাস করা কঠিন। মাঝরাত্রের কিছু পরেও মানুষটাকে জীবন্ত দেখা গিয়েছিল। কিন্তু সকালবেলায় গোরস্থানে তার ছিন্নবিচ্ছিন্ন শরীরটাকে পড়ে থাকতে দেখা যায়। মৃতদেহটাকে যারা খুঁজে পেয়েছিল তাদের চোখে পড়েছিল, মৃতদেহের কাছ থেকে একটা রক্তের ধারা একটা কবরের দিকে এগিয়ে গিয়েছে। সেখানে খানিকটা রক্ত জমে রয়েছে, আর তারপর সেখান থেকে আর একটা ক্ষীণ রক্তের ছাপ এগিয়ে গিয়েছে কবরখানার পাশের জঙ্গলের দিকে।

কাছাকাছি একটা সার্কাসের তাঁবু পড়েছিল। অতএব প্রথম সন্দেহটা গিয়ে তাদের ওপরেই পড়ে। কিন্তু সার্কাসের ম্যানেজার জানালেন, তাঁর খাঁচা থেকে কোনও হিংস্র প্রাণী মোটেই পালায়নি। আর, তারপর গুনেগেঁথে দেখা গেল মিথ্যে বলেননি তিনি।

এর পরের রাতে আরখাম শহরে শয়তান স্বয়ং আবির্ভূত হয়েছিলেন যেন। সে-রাত্রে শহরের বুক দিয়ে কোনও এক অদৃশ্য মৃত্যুদূত হেঁটে বেরিয়েছিল। কেউ তাকে দেখেনি। শুধু শহরের বিভিন্ন এলাকার আটটা বাড়িতে সে তার পদচিহ্ন এঁকে দিয়ে গিয়েছিল নিঃশব্দে। সব মিলিয়ে সতেরটা ছিন্নবিচ্ছিন্ন মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল আক্রান্ত বাড়িগুলোতে। প্রত্যেককেই কবরখানার পাহারাদারের মতই অকল্পনীয় নিষ্ঠুরতায় নখ দিয়ে আঁচড়ে ক্ষতবিক্ষত করে খুন করা হয়েছে। যেন মহামারীর আত্মা স্বয়ং জীবন্ত হয়ে নেমে এসেছিল সে-রাত্রে আরখাম শহরের বুকে।

কয়েকজন মানুষ দাবি করে তারা হত্যাকারীকে দেখেছে। আধো অন্ধকারে সাদা পোশাকে ঢাকা একটা শরীর। অনেকটা বাঁদর, কিংবা বিকৃত গড়নের কোনও মানুষের মতো। তার শিকারদের শরীরগুলো সবক্ষেত্রে যে আস্ত ছিল তাও নয়। বোঝা যাচ্ছিল, জন্তুটা ক্ষুধার্তও ছিল।

তৃতীয় রাত্রে পুলিশ আর শহরের লোকজনের একটা মিলিত দল জন্তুটাকে মিসকাটনিক ক্যাম্পাসের কাছাকাছি ক্রেন স্ট্রিটের একটা বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে। খুব যত্ন করে জাল বিছানো হয়েছিল সে-রাত্রে। শহরের সমস্ত টেলিফোনওয়ালা বাড়িকে অনুসন্ধানের সঙ্গে জুড়ে নেয়া হয়েছিল। সতর্ক ছিল পুলিশবাহিনী আর খোঁজারুর দল।

ক্রেন স্ট্রিট এলাকা থেকে মাঝরাতে প্রথম ফোন-কলটা আসে। যিনি ফোন করছিলেন, তিনি জানান, জানালার গায়ে একটা আঁচড়ানোর শব্দ পাচ্ছেন তিনি। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সক্রিয় হয়ে ওঠে খোঁজারুর দল।

সাহায্য পৌঁছোবার আগে আর মাত্রই দুটো প্রাণ নিতে পেরেছিল জীবটা। একটা বুলেটের ঘায়ে জন্তুটাকে আহত করে, উন্মত্ত জনতার আক্রমণের হাত থেকে বাঁচিয়ে তাকে নিয়ে আসা হয় স্থানীয় হাসপাতালে।

পরীক্ষায় দেখা যায়, জন্তুটা একসময় মানুষ ছিল। তার বন্য দৃষ্টি, ভাষাহীন অপমানবিক আচরণ আর পিশাচসুলভ হিংস্রতা সত্ত্বেও সেটা টের পেতে কোনও অসুবিধে হয়নি ডাক্তারদের। তাঁরা জীবটার ক্ষতস্থানগুলোতে ব্যান্ডেজ বেঁধে তাকে সেফটনের উন্মাদাগারে পাঠিয়ে দিলেন। তারপর থেকে দীর্ঘ ষোলো বছর ধরে জীবটা অ্যাসাইলামের একটা প্যাডেড সেলের ভেতরে ক্রমাগত মাথা ঠুকে আর দুর্বোধ্য রক্ত জল করা আর্তনাদ করে কাটিয়েছে। আর অবশেষে, কিছুদিন আগে একটা বর্ণনাতীত নৃশংসতার প্রমাণ রেখে সে সেই বন্দিদশা থেকে ছাড়া পেয়ে পালায়। সে-ঘটনার বিবরণ লেখবার সাধ্য আমার নেই।

জন্তু হয়ে ওঠা মানুষটার মুখটাকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করবার পর আরখামের খোঁজারুদের যে বিষয়টা দেখে সবচেয়ে ধাক্কা লেগেছিল সেটা হল, সে-মুখ তাদের চেনা। দেবোপম সেই মানুষটা, এ শহরের মানুষকে বাঁচাবার জন্য প্রাণপাত করেছিলেন। মাত্রই তিনদিন আগে তারা তাঁকে চোখের জলে বিদায় দিয়ে মহাসমারোহে কবর দিয়েছিল ক্রাইস্টচার্চের কবরখানায়। তিনি ডক্টর অ্যালান হেসলে, মিসকাটনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মহামান্য ডিন।

।।৩।।
মধ্যরাত্রের ছ’টি গুলি

যেখানে একটা গুলিতেই কাজ হয় তেমন ক্ষেত্রে রিভলভারের ছ-ছ’টা গুলিকে একবারে চালিয়ে দেয়াটা কিছুটা অস্বাভাবিক। তবে হার্বার্ট ওয়েস্টের জীবনে এমন সব অস্বাভাবিক ব্যাপার-স্যাপারের ঘটাটাই স্বাভাবিক নিয়ম ছিল।

যেমন ধরুন, তার আস্তানা পছন্দ করবার ব্যাপারটা। সদ্য পাশ করা কোনও ডাক্তার যখন তার বাড়ি আর ডিসপেনসারির জায়গা খোঁজে তখন সে আস্তানার যা সুযোগ সুবিধে সে চাইছে সেইটে কাউকে খুলে না বলাটা মোটেই স্বাভাবিক নয়। অথচ হার্বার্ট ঠিক সেইটাই করেছিল। মিসকাটনিক থেকে ডাক্তারি পাশ করে বেরোবার পর ঠিক হল, একটা ডিসপেনসারি বানিয়ে দু’জনে একসঙ্গেই প্র্যাকটিশ শুরু করব। ততদিনে আমরা দু’জন প্রায় অচ্ছেদ্য জুড়ি হয়ে উঠেছি।

আমরা জায়গা খুঁজছিলাম পটার্স ফিল্ডের কবরখানার একেবারে লাগোয়া কোথাও। আর সেই সঙ্গে জায়গাটাকে বেশ নির্জনও হতে হবে। কিন্তু এমন আস্তানাই যে আমরা খুঁজছি সেটা হার্বার্ট সযত্নে গোপন করে গিয়েছিল। তার কারণটা অবশ্য খুবই স্বাভাবিক। আমাদের আসল উদ্দেশ্যটা তো খুব একটা ভদ্রগোছের বা ফ্যাশানেবল কিছু নয়! ডাক্তারি তো কেবল একটা ছদ্মবেশ। রোজগারের উপায়। কিন্তু ওর আড়ালে যে কাজটাকে আমরা তখন আমাদের সারাজীবনের সাধনা হিসেবে নিয়েছি তার জন্য দরকার নিত্যনতুন মানুষের শব। দরকার সকলের চোখের আড়ালে নির্জন সাধনা।

তবে সেটা শুরু করতে গেলে সবার আগে দরকার দু’জনের একসঙ্গে একটা কাজ। কাছাকাছি এলাকায়। সেই মতন কাজ পেতে শুরুতে একটু মুশকিল হয়েছিল। কাজ দু’জনেরই জুটছে, তবে দূরে দূরে। আলাদা আলাদা জায়গায়।

শেষমেশ ইউনিভার্সিটির কল্যাণে সে সমস্যা খানিক হলেও মিটল। আরখামে কিছু না জুটলেও পাশেই বোল্টনের শিল্পশহরে তেমন একটা কাজের ব্যবস্থা আমাদের করে দিল ইউনিভার্সিটি। বোল্টনের সুতোর কল ও-এলাকায় সবচেয়ে বড়ো। দেশিবিদেশি হাজারো মানুষ কাজ করে। হল্লাবাজ গুণ্ডা টাইপ লোকজন সব।

সুতোকলের ডাক্তার হবার জন্য লোক মিলছিল না এদের উৎপাতে। কাজেই একসঙ্গে দু-দুটো ডাক্তার পেয়ে মিল-কর্তৃপক্ষ বেশ খুশিই হল। একটা গেলে আরেকটা অন্তত টিকে থাকবে, এই আশায় বোধ হয়।

মিলের ডাক্তার। অতএব ডিসপেনসারি-কাম-আস্তানাও আমাদের এমনভাবে নিতে হবে যাতে তা মিল থেকে বেশি দূরে না হয়। অনেক খুঁজেপেতে শেষে তেমন আস্তানা একটা জুটেও গেল আমাদের। বোল্টনের পণ্ড স্ট্রিটে।

জায়গাটা আরখামের একেবারে গা ঘেঁষে। বোল্টনের কারখানা ওখান থেকে বেশি দূরে নয়। আবার উলটোদিকে একটা বড়োসড়ো মাঠ পেরোলেই পটার্স ফিল্ডের কবরখানা। পথ অনেকটাই পড়ে, কিন্তু মাঠঘাটের ওপর দিয়ে বলে বেশ নির্জন। আর সবচেয়ে বড়ো কথা, কটেজটার সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশীর বাসা আধমাইলটাক দূরে।

কয়েকদিনের মধ্যেই আমাদের প্র্যাকটিশ বেশ জমে উঠল। জ্বর-পেটখারাপের কেস তো ভুরি ভুরি। তার ওপর মিলের লোকজন বেশ দাঙ্গাবাজ প্রকৃতির। মারপিট, খুনজখম লেগেই আছে। দিন নেই রাত নেই রুগি আসছে তো আসছেই।

সদ্য পাশ করা যেকোনও ডাক্তারের ওতে খুশিই হবার কথা। কিন্তু আমাদের ওতে কাজের সমস্যাই হচ্ছিল খানিক। সকাল থেকে রাত অবধি রুগি দেখেই চলেছি। নিজেদের কাজটা তাহলে করব কখন? তার ওপর আবার যখন তখন অসময়ের উটকো রুগির উৎপাতও লেগে থাকে।

বাড়িটার সেলারে ততদিনে আমাদের গোপন ল্যাব চালু হয়ে গিয়েছে। সেখানে গভীর রাতে কবর খুঁড়ে তুলে আনা মৃতদেহদের শোয়ানো থাকে। বাইরে যখন ভোর হয়ে আসতে থাকে, দুই নিশাচর বিজ্ঞানী তখন নিঃস্পন্দ শরীরগুলোর শিরা ফুঁড়ে নানান সলিউশান ঢুকিয়ে চলে তাদের ভেতরে। কাজটা মাথা গুলিয়ে দেবার মতো জটিল। প্রতিটি মৃতদেহের গঠন আলাদা। তার মাপজোক নিয়ে প্রত্যেকের জন্য সলিউশন আলাদা করে বানাতে হয় নতুন নতুন অনুপাতে জিনিসপত্র মিশিয়ে।

এ-যাত্রা একটা ব্যাপারে অবশ্য হার্বার্ট একেবারে দৃঢ় ছিল। মৃতদেহকে একদম তাজা হতে হবে। সে ব্যাপারে আর কোনও আপোস সে করতে নারাজ। আসলে আংশিক পচে যাওয়া মস্তিষ্কের ওপর পুনর্জীবনের প্রতিক্রিয়া কতটা ভয়াবহ হয় তার অভিজ্ঞতা ততদিনে আমাদের দু-দু’বার হয়ে গেছে। চ্যাপম্যানদের খামারবাড়ির প্রথম ব্যর্থ পরীক্ষাটার পর থেকেই হার্বার্ট তো ক্রমাগত বলে চলেছে, কেউ তার পিছু নিচ্ছে। নিঃশব্দে। চোখের আড়ালে।

আসলে বাইরে যতই শান্ত, নীলচক্ষু, স্বর্ণকেশ ডাক্তার ডাক্তার ভাব করুক, ভেতরে ভেতরে তার আত্মাটা কুঁকড়ে থাকত ভয়ে – তার একটা সৃষ্টি তখনও বেঁচে। সেফটনের প্যাডেড সেলে আটকানো এক ভয়ানক নরখাদক। তাহলে তার অন্য সৃষ্টিটা? তাকে তো খুঁজে পাওয়া যায়নি কোথাও! কী যে হয়েছে তার সেকথা কেউ জানে না।

বোল্টনে এসে ইস্তক আমাদের মড়া-ভাগ্য অবশ্য বেশ ভালোই যাচ্ছিল। থিতু হবার সপ্তাহ খানেকের ভেতর সদ্য গোর দেয়া একটা অ্যাক্সিডেন্টের মড়া হাতে এল। শরীরে সলিউশান ঢোকাবার পর সে চোখ খুলে বেশ খানিকক্ষণ সচেতনভাবে এদিক ওদিক দেখলও। তবে তা বেশিক্ষণের জন্য নয়। আসলে দুর্ঘটনায় তার একখানা হাত কাটা পড়েছিল। অক্ষত শরীর হলে হয়তো আরও ভালো ফল হতে পারত।

ওর পর থেকে জানুয়ারি অবধি আরও তিনটে মৃতদেহ হাতে এসেছিল। তিনটেয় তিনরকম ফল হল। একটা সম্পূর্ণ ব্যর্থ। একটা বেশ খানিক হাত-পা নাড়াচাড়া করল, আর তিন নম্বরটা একটু ভয় ধরিয়ে দিয়েছিল আমাদের। ওষুধ শরীরে ঢোকবার পর সেটা হঠাৎ নিজে নিজেই খাড়া হয়ে উঠে একটা হাঁক ছেড়েছিল। কপাল ভালো যে তারপর ফের সে শুয়ে পড়ে। আর ওঠেনি। এরপর মাস দুয়েক বাজার বেজায় মন্দা গেল। যা মৃত্যুর খবর আসছে সব বুড়োবুড়ি কিংবা রুগ্ন মানুষজন।

মার্চ মাসে একদিন ফের কপাল খুলল আমাদের। এবারে আর পটার্স ফিল্ডের গোরস্থান নয়। খোদ বোল্টন থেকেই। বোল্টন শহরের লোকজন খানিক পুরনোপন্থী। বক্সিং ও-শহরে নিষিদ্ধ। তবে বক্সিং তাতে সেখানে মোটেই বন্ধ হয়নি। মিলের গুণ্ডা টাইপ লোকজন দিব্যি তার টুর্নামেন্ট চালায়। শুধু একটু লুকিয়ে চুরিয়ে এই যা।

মার্চের এক রাতে দুই পোলিশ জোয়ান আমাদের বাড়িতে এসে হাজির। ভয়ে মুখটুখ শুকিয়ে গেছে তাদের। হাতজোড় করে বলে, “বক্সিং ম্যাচে বিচ্ছিরি কাণ্ড হয়ে গেছে, ডাক্তারবাবু। আমাদের বাঁচান।”

তাদের সঙ্গে গিয়ে একটা পরিত্যক্ত খামারবাড়ির উঠোনে দেখা গেল, গাদাখানেক লোক মাটিতে পড়ে থাকা একটা কালো চামড়ার শরীরের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে আর নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কিছু বলাবলি করছে।

লড়াইটা হয়েছিল কিড ওব্রায়েন নামে এক ছোকরার সঙ্গে বাক রবিনসন উর্ফ হার্লেম স্মোক নামে এক নিগ্রোর। গিয়ে দেখি কিড ওব্রায়েন ছোকরা একপাশে বসে থরথর করে কাঁপছে। নাকি তারই ঘুসিতে হার্লেম স্মোক নক আউট হয়েছে খানিক আগে।

শরীরটা পরীক্ষা করে বোঝা গেল, সেই নক আউট বেশ পাকাপোক্ত। এ লোক আর জমি ছেড়ে উঠবে না। লোকটার চেহারা দেখলে গা ছমছম করে। মানুষের চেহারায় একটা বড়োসড়ো গোরিলা যেন কঙ্গোর অরণ্য থেকে উঠে এসেছে।

শরীরটাকে ঘিরে থাকা লোকজনের তখন একটাই প্রার্থনা, কেসটাকে গুম করে দিতে হবে। নইলে পুলিশ এসে যে তাদের নিয়ে ঠিক কী করবে সে নিয়ে নানা মুনির নানা মত।

ওয়েস্ট খানিক চুপ করে তাদের কথাবার্তা শুনল। তারপর মাথা নেড়ে বলল, “চিন্তা কোরো না। ব্যবস্থা হচ্ছে।”

কথাটা কানে যেতে ফের একবার শরীরটা আর তার অতিকায় হাতদুটোর দিকে তাকিয়ে আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। এর ব্যবস্থা যে ওয়েস্ট কী করবে তা আমার থেকে ভালো আর কে জানে!

শরীরটাকে জামাকাপড়ে মোড়া হল প্রথমে। তারপর দু’জনের মাঝখানে তাকে প্রায় ঝুলিয়ে ধরে, নির্জন রাস্তা আর মাঠঘাট পেরিয়ে আস্তানায় এনে তোলা গেল। সেই আরখামের প্রথম কেসের রাতটার মতোই বাড়ির খিড়কি দিয়ে তাকে ঢুকিয়ে সেলারে নিয়ে গিয়ে টেবিলে তোলা হল।

সে রাত্রের পরীক্ষাটা একেবারে মাঠে মারা গিয়েছিল আমাদের। যতরকম অনুপাতের সলিউশান আছে তার সবগুলোই একে একে তার গায়ে ঢোকানো হল। কিন্তু মড়া তাতে নট নড়নচড়ন। শেষমেশ সকাল হয়ে আসছে দেখে হার্বার্ট বলে, সবগুলো ওষুধই সাদা চামড়ার মানুষের জন্য বানিয়েছি তো এ-যাবত। ওসব বোধ হয় এর শরীরে কাজ করবে না।

অতএব ভোররাত্রের দিকে ফের একবার মড়া নিয়ে বের হতে হল। শরীরটাকে টানতে টানতে মাঠ পেরিয়ে পটার্স ফিল্ডের ধারের জঙ্গলের মধ্যে নিয়ে আসা হল। তারপর প্রত্যেকবারের মতোই যেমন তেমন একটা আধহাত গভীর গর্ত খুঁড়ে তাকে চাপা দিয়ে দিলাম। আসবার আগে কবরটার ওপরে কিছু শুকনো ঘাসপাতাও ছড়িয়ে এসেছিলাম, যাতে কবর বলে সেটাকে চেনা না যায়। তবে তার দরকার বিশেষ ছিল না। পুলিশের অত বুদ্ধি নেই যে ওই গহিন জঙ্গলে কবর খুঁজতে আসবে।

পরের দিনটা বেশ খারাপ কাটল আমাদের। সকালে ডিসপেনসারিতে আসা রোগীরা বলাবলি করছিল, বাজারে জোর গুজব যে, আগের দিন রাতে বোল্টনের কোথাও বক্সিংয়ের আসর বসেছিল। তাতে কেউ খুনও হয়েছে। শুনে আমার বুক দুরদুর শুরু হয়ে গেল। যদি পুলিশ ব্যাপারটা নিয়ে খোঁচাখুঁচি শুরু করে?

বিকেলের দিকে ওয়েস্টের নতুন এক ফ্যাসাদ হল। শ্রমিকদের বস্তিতে একটা কল ছিল তার। এক ইটালিয়ান মহিলা খানিক হিস্টেরিক হয়েছেন। গিয়ে সে দেখে, মহিলার পাঁচ বছরের ছেলেটাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। নাকি সকালবেলা বাড়ি থেকে বের হয়েছিল, তখনও ফেরেনি।

ব্যাপারটা হয়তো কিছুই নয়। কিন্তু ভদ্রমহিলাকে সেকথা কে বোঝায়? ইটালিয়ানরা সব কুসংস্কারের ডিপো একেকজন। নানা লক্ষণ-টক্ষণ মিলিয়ে নাকি সে মহিলার ধারণা হয়েছে ছেলে তার আর নেই। ওয়েস্ট তাকে ওষুধ দিয়ে শান্ত করবার চেষ্টা করছিল বৈকি, কিন্তু ওরই মধ্যে সন্ধে সাতটা নাগাদ হঠাৎ একটা হার্ট অ্যাটাক হয়ে মহিলা চোখ বুজে ফেললেন। তাতে খেপে গিয়ে তাঁর স্বামী ছেলের কথা ভুলে গিয়ে একটা স্টিলেটো বাগিয়ে ওয়েস্টকে মারতে এসেছিল। নাকি ওয়েস্টই তার বউকে মেরে ফেলেছে। লোকজন তাকে চেপে ধরে না রাখলে কিছু একটা হয়েও যেতে পারত ওয়েস্টের।

ওখানেই একবার কথা উঠেছিল, নাকি ছেলেটার জন্য জঙ্গল খুঁজে দেখতে যাবে সবাই দল বেঁধে। তবে মহিলা মারা যাওয়ায় তালেগোলে সেসব আর হয়ে ওঠেনি। ওয়েস্ট যখন ফিরে আসছে তখনও মহিলার স্বামী তার নামে অভিশাপ আর শাসানি দিয়ে চলেছে। সারাদিনের এইসব তাণ্ডব মিটিয়ে এগারোটা নাগাদ শুতে গেলাম আমরা।

আমার সেদিন ঘুম আসছিল না। বোল্টন ছোটো শহর হলে কী হয়, সেখানকার পুলিশ ডিপার্টমেন্ট বেশ বড়োসড়ো। কাজেরও সুনাম আছে। আগের রাতের ব্যাপারটা নিয়ে যদি তদন্ত হয় তাহলে যে কী কাণ্ড একটা বাধবে সেই নিয়ে বেশ ভয় ভয়ই লাগছিল আমার। এলাকা তো ছাড়তে হবেই, কপাল তেমন খারাপ হলে জেলেও যেতে হতে পারে আমাদের।

ওই ভাবতে ভাবতেই কখন যেন চোখদুটো একটু জুড়ে এসেছিল আমার। রাত তিনটে নাগাদ জানালা দিয়ে চোখে চাঁদের আলো এসে পড়তে ঘুমটা ভেঙে গেল। উঠে পর্দাটা টেনে দিতে যাব, ঠিক তখনই শব্দটা পেলাম। খিড়কির দরজা ধরে কেউ ঝাঁকাচ্ছে। ঘাবড়ে গিয়ে চুপচাপ শুয়ে আছি, তখন দরজায় ওয়েস্ট এসে ডাকল। গায়ে একটা ড্রেসিং গাউন চাপিয়েছে সে। পায়ে চপ্পল। হাতে রিভলভার আর একটা টর্চবাতি। রিভলভার দেখে বুঝলাম, তার মাথায় পুলিশের চেয়ে ক্ষ্যাপা ইটালিয়ানের ভয়টাই কাজ করছে বেশি।

“জবাব তো দিতেই হবে হে। পেশেন্ট হতে পারে। দরজা না খুললে চলবে না। চলো, দু’জন মিলে যাই। লোকটার যা মেজাজ দেখে এসেছি সন্ধেবেলা সেটা সুবিধের নয়।”

দু’জনে মিলে পা টিপে টিপে সিঁড়ি বেয়ে নামলাম। একটু ভয় ভয় যে লাগছিল না তা নয়। দরজায় ধাক্কা তখন বেড়েই চলেছে। নিচে পৌঁছে সাবধানে হুড়কো খুলে দরজাটা আমি হাট করে খুলে ধরলাম।

সেখানে চাঁদের আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা অন্ধকার মূর্তিটার দিকে চোখ যেতেই ওয়েস্ট একটা অদ্ভুত কাজ করে বসল। লোক জানাজানি, পুলিশ এই সবকিছুর ভয়কে কাটিয়ে হাতের রিভলভারটার ছ’টা গুলিই সে চালিয়ে দিল নৈশ অতিথির গায়ে।

তার কারণটা বুঝতে আমার কয়েক সেকেন্ড সময় লেগেছিল। আগন্তুক ইটালিয়ান বা পুলিশ দুয়ের একজনও ছিল না। চাঁদের আলোয় দরজার দু’পাশ ধরে পাহাড়ের মতো ঝুঁকে থাকা কালো শরীরটার মতো কোনও জীবকে শুধু দুঃস্বপ্নেই দেখা যায়। চার হাত-পায়ে উবু হয়ে থাকা জীবটার দৃষ্টি একেবারে ফাঁকা। তার গায়ে জমাট বাঁধা রক্ত, মাটি, শুকনো ডালপালার টুকরো লেগে আছে। তার ঝকঝকে ধারালো দাঁতের ফাঁকে একটা শিশুর ছিঁড়ে আনা হাত ধরা।

।।৪।।
মৃতের আর্তনাদ

মৃত মানুষের আর্তনাদ শুনেছেন কখনও? শুনলে বুঝবেন সেটা কতটা ভয়ের হতে পারে। ওয়েস্টের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে মাঝেমধ্যেই আমার সে শব্দ শোনবার অভিজ্ঞতা হয়েছে বৈকি। কিন্তু তবুও, অভ্যাস হয়ে গেলেও প্রতিবারই একটা ভয়ের কাঁপুনি আমি টের পেয়েছি। ওয়েস্টের অবশ্য ব্যাপারটাই আলাদা ছিল। ভয়ের চাইতেও বৈজ্ঞানিক কৌতূহলটাই তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল সবসময়। এমনকি সেই কবর থেকে উঠে আসা নিগ্রোকে গুলি করবার সময়েও তার চিৎকার তার হাতকে এতটুকু কাঁপায়নি। সে যাই হোক, তার পরের ইতিহাসটা বলি।

১৯১০-এর জুলাই মাস নাগাদ আমাদের মড়া-ভাগ্য ফের চোখ খুলে চাইল। সে সময় আমি একটা লম্বা ছুটি নিয়ে ইলিয়নিসে মা-বাবার কাছে গিয়েছিলাম। ফিরে এসে দেখি ওয়েস্ট বেজায় ফুর্তিতে আছে। বলে, তাজা মড়া পাবার সমস্যাটাকে সে একেবারে অন্য একটা রাস্তায় সমাধান করে ফেলেছে। সেটা হল একটা নতুন ওষুধ দিয়ে মৃতদেহ সংরক্ষণ।

বিষয়টা নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই কাজ করছিল ওয়েস্ট। সাফল্য যে কিছু আসবে সে বিষয়ে আমি নিশ্চিতই ছিলাম একরকম। কিন্তু প্রশ্ন হল, আমরা যখন মৃতদেহটা হাতে পাই ততক্ষণেই তো অনেকটা দেরি হয়ে গেছে। তাহলে তার পর ওষুধ দিয়ে সংরক্ষণ করে লাভটা হবে কী করে? তা ওয়েস্ট বলল, সে ঠিক কথাই। মড়া একবার বাসি হয়ে গেলে আর কিছু করবার থাকে না। তবে এ-ওষুধের কাজ আলাদা। বোল্টনের সেই বক্সিং বীরের শরীরটা যেমন একেবারে তাজা পাওয়া গিয়েছিল, তেমন কোনও শরীর পেলে তাইতে তার ওষুধটা মাখিয়ে ফেললে তারপর ধীরেসুস্থে যদ্দিন খুশি কাজ করা যাবে সেটা নিয়ে। পচে ওঠবার ভয়ে পরীক্ষার ফল ভালো করে দেখেশুনে না নিয়েই মড়া পাচার করবার দায় থাকবে না।

তারপর সেলারে নিয়ে গিয়ে সে দেখাল, ভাগ্যক্রমে তেমন একটা একেবারে তরতাজা মড়া পেয়ে গিয়ে সে সেটাকে তার ওষুধ মাখিয়ে কেমন তরতাজা করে জমিয়ে রেখেছে ক’দিন ধরে। আমার আসবার অপেক্ষায়। পরীক্ষা করে দেখলাম, ওয়েস্টের কথাই ঠিক। পচনের কোনও চিহ্ন নেই শরীরটায়। এর প্রাণ ফিরিয়ে দিলে কি তাহলে অবশেষে বোধবুদ্ধিসহ একটা সুস্থ মানুষ ফেরত পাওয়া যাবে? ওয়েস্ট অবশ্য তক্ষুনি সে বিষয়ে কোনও ভবিষ্যৎবাণী করতে রাজি নয়। শুধু বলল, “দেখা যাক কী হয়। তুমি এসে গেছ। এইবার একসঙ্গে কাজটা করা যাবে।”

কী করে জিনিসটা সে পেল সে গল্পটাও ওয়েস্ট বলেছিল আমায়। লোকটা ব্যাবসাদার। বেশ মোটাসোটা, ভারী চেহারা। ব্যাবসার কাজেই বোল্টন ওরস্টেড মিল-এ আসছিল। স্টেশনে নেমে মিলের দিকে যেতে গিয়ে রাস্তা গুলিয়ে আমাদের বাড়ির কাছে এসে পড়ে। রাস্তা জিজ্ঞেস করতে যখন সে বাড়ির ভেতর এসে ঢুকল, ততক্ষণে অতটা রাস্তা হেঁটে তার হাঁফ ধরে গেছে। ওয়েস্ট তাকে দেখেই বুঝেছিল, এর হার্টের অবস্থা ভালো নয়। তাকে বে-জান হয়ে হাঁফাতে দেখে একটা ওষুধও খাওয়াতে চেয়েছিল। কিন্তু লোকটা সে ওষুধ খেতে রাজি হয়নি, আর তারপরেই একেবারে হঠাৎ বুক খামচে ধরে শুয়ে পড়েই সব শেষ।

ওয়েস্টের মনে হয়েছিল নাকি স্বয়ং ভগবানই শরীরটা এভাবে তাকে পাইয়ে দিলেন। মরবার আগে যেটুকু কথাবার্তা সে বলেছিল তাতেই মালুম, লোকটার পরিবার বলতে কেউ নেই। এ-অঞ্চলে তার কোনও চেনাপরিচিতিও নেই।

মৃত্যুর পর তার কোট-প্যান্ট পরীক্ষা করে জানা গেছে তার নাম রবার্ট লেভিট। সেন্ট লুই-এর মানুষ। অতএব পরীক্ষা ব্যর্থ হলেও একে নিয়ে কোনও খানাতল্লাশের ভয় থাকবে না আমাদের। মাঠ পেরিয়ে জঙ্গলের গভীরে গিয়ে পুঁতে ফেললেই ল্যাঠা চুকবে। আর পরীক্ষা সফল হলে আমাদের আর পায় কে? অতএব ওয়েস্ট আর দেরি করেনি। লোকটার কবজিতে তার নতুন পচন আটকাবার ওষুধ ইনজেক্ট করে আমার অপেক্ষায় থেকেছে ক’দিন ধরে।

একটা চিন্তা হচ্ছিল আমার। লোকটার হার্টের দোষ ছিল। বাঁচিয়ে তোলবার পর সেটা সাফল্যের পথে বাধা হয়ে উঠতেও পারে। কিন্তু ওয়েস্ট দেখলাম সে চিন্তাটাকে ধর্তব্যের মধ্যেই আনছে না। সাফল্যের স্বপ্নে সে তখন একেবারে বুঁদ হয়ে আছে।

জুলাইয়ের ১৮ তারিখ রাত্রে পরীক্ষার দিন স্থির করা হয়েছিল। সেলার-এর ল্যাবের টেবিলে শোয়ানো, আর্ক-ল্যাম্পের আলোয় ফটফটে সাদা শরীরটার দিকে দু’জনেই লোভী চোখে তাকিয়েছিলাম আমরা। তাকে দেখলে মনে হয়, দু’সপ্তাহের পুরনো মৃতদেহ নয়, ঘুমিয়ে থাকা একজন তাজা মানুষ।

“লোকটা সত্যি সত্যি মরেছিল তো?”

ওয়েস্ট মাথা নেড়ে হাসল। “নইলে এমন চুপচাপ শুয়ে থাকে? নাকের নিচে হাত নিয়ে দেখো না! তাছাড়া পচন আটকাবার যে রাসায়নিকটা ওর শরীরে রয়েছে, সেটা রক্তে মিশলে কোনও প্রাণী জীবন্ত থাকতে পারে না।”

খানিক বাদে ওয়েস্ট তার কাজ শুরু করে দিল। আজকে সে আমাকে শরীরটা ছুঁতে দিচ্ছে না একেবারে। গোটা কাজটা সে নিজে করবে। প্রথমে শরীরটার হাতের যেখানে সে আগের ইঞ্জেকশনটা দিয়েছিল তার ঠিক পাশে অন্য একটা ওষুধ ঢুকিয়ে দিল সে সিরিঞ্জে ভরে। ওতে পচন-নিরোধক রাসায়নিকটা নিষ্ক্রিয় হয়ে গিয়ে ঠিক মরবার মুহূর্তের অবস্থায় ফিরে যাবে শরীরটা।

কয়েক মুহূর্ত বাদে স্থির, ফ্যাকাশে শরীরটার কঠিন ভাবটা কেটে গিয়ে ফের একটু কোমলতার আভাস জেগে উঠল তার গায়ে। পেশিগুলো খুব হালকাভাবে কাঁপছিল তার। ওয়েস্ট সঙ্গে সঙ্গে একটা বালিশ তুলে নিয়ে তার মুখটায় চেপে ধরে রইল কয়েক মিনিট। তারপর শরীরটার কাঁপুনি-টাপুনি একেবারে থেমে যেতে বালিশটা সরিয়ে নিয়ে পরীক্ষার পরের ধাপের প্রস্তুতি শুরু করল।

দুয়েকটা ছোটোখাটো পরীক্ষা করে নিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে এইবার সে মৃতদেহের ডানহাতের মণিবন্ধে তার প্রাণ ফেরাবার দাওয়াইয়ের একটা নিখুঁত মাপের ডোজ ঢুকিয়ে দিল। ওষুধটা সেদিন বিকেলেই আমরা অনেক হিসেবনিকেশ করে তৈরি করেছি।

ওষুধটা ঢুকিয়ে দেবার পর এবার উত্তেজিত অপেক্ষার পালা। ওয়েস্ট আত্মায় বিশ্বাস করে না। মানুষ তার কাছে একটা যন্ত্র বৈ আর কিছু নয়। অপেক্ষায় তার উত্তেজনাটা তাই ছিল কেবলমাত্র বৈজ্ঞানিক কৌতূহল আর সাফল্যের আশার উত্তেজনা। কিন্তু আমার ব্যাপারটা একটু আলাদা। যুক্তি দিয়ে না মানলেও, সব যুক্তির ওপারে একটা বিশ্বাস আমার ছিল। কিছু একটা আছে মানুষের। কয়েকটা যন্ত্রের কার্যকলাপের বাইরে। বিজ্ঞান তাকে ব্যাখ্যা করতে পারে না। এ-ওষুধ কি পারবে চেতনা নামের সেই অজানা ধর্মকে ফিরিয়ে দিতে? যদি পারে, তাহলে জীবিতের দুনিয়ায় ফিরে এসে কী খবর দেবে ও? কী দেখেছে ও সেই অজানা অন্ধকার দেশে?

কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমি খেয়াল করলাম, পরীক্ষাটা আর যাই হোক সম্পূর্ণ ব্যর্থ হবে না। শরীরটার চকের মতো সাদা গালে হালকা লালের আভাস ফিরে আসছিল। আস্তে আস্তে সেটা তার হলদেটে দাড়ির তলায় তলায় ছড়িয়ে যাচ্ছিল।

ওয়েস্ট লোকটার নাড়ি ধরে ধ্যানস্থ হয়ে বসে ছিল। হঠাৎ সে মাথা নাড়িয়ে একটা ছোটো আয়না এনে ধরল লোকটার মুখের ওপর। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আয়নার গায়ে হালকা একটা বাষ্পের আস্তর পড়ল।

আস্তে আস্তে লোকটার শরীরের পেশিগুলো নড়াচড়া শুরু করছিল। খানিক বাদে দেখা গেল, তার বুকটার সামান্য ওঠাপড়া শুরু হয়েছে। জেগে উঠছে নিঃশ্বাসের শব্দও। তার চোখের দিকে নজর করে দেখি, পাতাগুলো কাঁপছে।

আর তারপর, চোখদুটো খুলে গেল তার। ধূসর, শান্ত, জীবন্ত। শুধু তখনও তাতে বুদ্ধিমত্তা বা কৌতূহলের কোনও ছাপ নেই। হঠাৎ কী যে হয়ে গেল আমার, জানি না। আমি তার লাল হয়ে উঠতে থাকা কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে উঠলাম, “কোথায় ছিলে তুমি?”

জবাবে কোনও উত্তর ভেসে এল না আমার কানে। শুধু ঠোঁটদুটো তার নড়ে উঠে নিঃশব্দে কিছু শব্দ তৈরি করল, “আমি এখন—”

কথাটার অর্থ কী তা আমি বুঝিনি। বোঝবার চেষ্টাও করছিলাম না। তীব্র একটা উত্তেজনা তখন ছেয়ে ফেলছে আমাকে। এই প্রথম! এই প্রথমবার কোনও প্রাণ ফেরানো মৃতদেহ একটা প্রশ্ন শুনে একটা যুক্তি নির্ধারিত জবাব দেবার চেষ্টা করেছে। সেটুকুই আমার কাছে যথেষ্ট ছিল সেই মুহূর্তে।

কিন্তু তার পরমুহূর্তেই সেই জয়ের আনন্দটাকে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে গেল মানুষটার নতুন আচরণ। সদ্য প্রাণ পাওয়া শরীরটা থরথর করে কাঁপছিল টেবিলে শুয়ে। যেন একেবারে মৃত্যুর মুহূর্তটাতেই ফের জেগে উঠেছে সে। আর কাঁপতে কাঁপতেই তার হাতদুটো দিয়ে বাতাস খামচাবার জীবনমরণ চেষ্টা করল সে একবার। আর তারপর চোখদুটো বড়ো বড়ো করে ওয়েস্টের দিকে ফিরে তাকিয়ে বুকচেরা একটা শেষ চিৎকার করে উঠল সে, “বাঁচাও। তফাত যা নীলচোখো শয়তান। তোর সিরিঞ্জ আমার হাতে আমি কিছুতেই ফোটাতে…”

।।৫।।
ছায়াপৃথিবীর আতঙ্ক

যুদ্ধক্ষেত্রে অনেক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হয় মানুষের। সেসব অভিজ্ঞতার কথা ছাপার অক্ষরে প্রকাশ পায় না। মানুষের মুখে মুখেই থেকে যায়। এমন অনেক কাহিনি শুনে অনেক সময় আমার মাথা ঘুরে উঠেছে। কখনও বমি পেয়েছে। কখনও রাতের অন্ধকারে ভয়ও পেয়েছি সেসব গল্প শুনে। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্র নিয়ে আমি যে গল্প বলতে পারি সেই ছায়াপৃথিবীর আতঙ্কদের চাইতে নারকীয় বোধ হয় আর কিছুই হয় না।

১৯১৫ সাল। আমি তখন ফ্ল্যান্ডার্সে ফার্স্ট লেফটেন্যান্ট ডাক্তার হিসেবে ফ্রন্টে গেছি। নিজের ইচ্ছেয় অবশ্য যাইনি। গেছি ডক্টর হার্বার্ট ওয়েস্টের চাপে পড়ে। সে তখন বস্টনের একজন সুবিখ্যাত শল্যচিকিৎসা-বিশেষজ্ঞ। দেশজোড়া তার নামডাক। আসলে অনেকদিন ধরেই হার্বার্ট ডাক্তার হিসেবে একটা বড়োসড়ো যুদ্ধে যাবার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছিল। সেই সুযোগটা যখন এল, তখন সে যে আমায় ছেড়ে একলা যাবে না তা বলাই বাহুল্য।

যদি সে একা যুদ্ধে যেত, আমরা আলাদা হয়ে যেতাম, তাতে আমার খুশি হবার অনেক কারণ ছিল। হার্বার্টের সঙ্গে একত্রে ডাক্তারি করাটা আমার কাছে ততদিনে প্রায় অসহনীয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু তবুও, যুদ্ধের সম্ভাবনা দেখা দিতে সে যখন ওটাওয়া গিয়ে সামরিক বিভাগের এক বন্ধুকে ধরে সেনাবিভাগে একটা মেজরের পদ জুটিয়ে নিল, তখন তার প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তির কাছে মাথা আমাকে নোয়াতেই হল। অতএব বিখ্যাত সার্জন ডক্টর হার্বার্ট ওয়েস্টের অনুরোধে, তাঁর সহকারী হিসেবে আমাকেও সৈন্যদলে ভর্তি করে নিলেন সদাশয় সরকার।

হার্বার্টের যুদ্ধে যাবার ইচ্ছেটা বলা বাহুল্য রক্তপিপাসা বা দেশপ্রেম জাতীয় কোনও কারণে নয়। আবেগ-টাবেগের বালাই তার কোনওদিনই ছিল না। ছোটোখাটো চেহারার, চশমা আঁটা নীল চোখের বৌদ্ধিক যন্ত্র একজন। ফ্ল্যান্ডার্সের রণক্ষেত্রে যাবার অন্য উদ্দেশ্য ছিল তার। সে উদ্দেশ্য সাধনের জন্যই মিলিটারির খোলসটা গায়ে তুলতে এতটা ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল সে। সেটা আর কিছুই নয়, অজস্র তরতাজা মৃতদেহের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ।

বস্টনে এসে প্র্যাকটিশ শুরু করবার পর সেখানকার ফ্যাশানেবল নাগরিক মহলে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে উঠতে বেশি সময় লাগেনি হার্বার্টের। কিন্তু তার জীবনের আসল লক্ষ্যটার বিষয়ে একেবারেই ওয়াকিফহাল ছিল না তার স্তাবক ভক্তের দল। সেটা জানতাম কেবল আমি একা।

আরখাম আর বোল্টনের দিনগুলোতে আমি ওয়েস্টের গুণমুগ্ধ ভক্তই ছিলাম। সে সময় তার সঙ্গে নৈশ অভিযানে কবর থেকে মড়া খুঁড়ে তোলা কিংবা অন্য নানান কায়দায় মৃতদেহ জোগাড় করে পরীক্ষানিরীক্ষায় বেশ একটা উত্তেজক খেলার মজা পেতাম আমি।

কিন্তু বয়েস কিছুটা বাড়তে তার কাজের কায়দাকানুন যত দুঃসাহসী হয়ে উঠছিল, ততই ভেতরে ভেতরে একটা ভয়ের আঁচড়ানি টের পেতে শুরু করেছিলাম আমি। ব্যাপারটা চরমে ওঠে ১৯১০-এর সেই রাতে, যখন রবার্ট লেভিট বেঁচে উঠে ফের মারা যাবার আগে জানিয়ে যায়, মৃত্যুর আগেই তার শরীরে রাসায়নিক ভরা ছুঁচ বিঁধিয়ে তাকে শেষ করে দেয় হার্বার্ট। আর, সম্ভবত সেইজন্যই, সেই প্রথমবার কোনও মৃতের শরীর জীবন্ত হয়ে ওঠবার সঙ্গে সঙ্গে তার চেতনাও ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিল তার পুনর্জীবনের ওষুধ।

এর পরের পাঁচ বছর ধরে তার পরীক্ষানিরীক্ষার ব্যাপারে কিছু বলতে চাই না আমি। তার দানবিক ইচ্ছাশক্তির দাস হয়েই একরকম সে সময়টা আমি তার সঙ্গে কাজ করেছি। আর, যেসব মুহূর্তের সাক্ষী হয়েছি সেই কাজ করতে গিয়ে, তা কোনও মানুষের জিভ উচ্চারণ করতে পারবে না।

এই চলতে চলতে ধীরে ধীরে আমি টের পাচ্ছিলাম, তার পরীক্ষার ফলাফলগুলোর চেয়ে হার্বার্ট নিজে অনেক বেশি ভয়াল হয়ে উঠছে। টের পাচ্ছিলাম, স্বাভাবিক বৈজ্ঞানিক কৌতূহল আর তাকে চালিয়ে নিচ্ছে না। মৃতের জীবন ফিরিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে নয়, এখন সে তার পরীক্ষাগুলো চালায় শুধুমাত্র তার ফলাফলগুলোকে উপভোগ করবার পৈশাচিক আনন্দের খোঁজে।

মৃতদেহে রাসায়নিক ঢুকিয়ে তৈরি পিশাচদের বিকৃতি, তাদের অমানুষিক আচরণ এই সবই সে ভারি শান্তভাবে উপভোগ করতে শুরু করেছিল। সেগুলো দেখতে দেখতে এক বিকৃত সৃষ্টির আনন্দে জ্বলজ্বল করে উঠত তার নীল চোখদুটো। বিপদে ভয় পেত না সে। অপরাধ করত চোখের পাতাটুকু না কাঁপিয়ে। লেভিটের কেসে যখন সে প্রমাণ করে দিল যে সচেতন প্রাণও ফিরিয়ে দেয়ার কৌশল সে শিখেছে, সেদিনই তার গবেষণার প্রথম অধ্যায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। এরপর সে নজর দিয়েছিল শরীরের কাটা অঙ্গপ্রত্যঙ্গে প্রাণসঞ্চারের গবেষণায়।

দেহকোষের কিংবা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন নার্ভ-কোষের স্বাধীন সত্ত্বার বিষয়ে তার কিছু ক্ষ্যাপাটে তত্ত্ব ছিল। তার প্রমাণও সে দিয়েছিল একজাতের ক্রান্তীয় সরীসৃপের প্রায় ফোটার মুখে পৌঁছোন ডিম থেকে নেয়া কিছু টিসুকে স্থায়ীভাবে বাঁচিয়ে রেখে। সে পরীক্ষার পর দুটো নতুন প্রশ্নের জবাব খুঁজতে শুরু করে সে। তার প্রথমটা হল, মস্তিষ্ককে বাদ দিয়ে শুধুমাত্র সুষুম্নাকান্ড আর অন্যান্য নার্ভ-কোষকে দিয়ে চেতনার গড়ে তোলা যায় কি না।

আর দ্বিতীয় প্রশ্নটা ছিল, একই শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে জীবন্ত করে তুললে তাদের মধ্যে কোনও অদৃশ্য যোগাযোগ থেকে যায় কি না। এই প্রশ্নদুটোর উত্তর পেলেই তার বহুদিনের লালিত তত্ত্বটা প্রমাণিত হবে। প্রমাণিত হবে মানুষ শুধুই একটা যন্ত্র। তার চেতনা মস্তিষ্ককেন্দ্রিক নয়। তার প্রতিটি নার্ভকেন্দ্র বা অঙ্গপ্রত্যঙ্গই স্বাধীনভাবে ভাবতে সক্ষম।

তবে এর উত্তর পাবার জন্য তার অনেক নরমাংসের প্রয়োজন ছিল। আর সেইজন্যই হার্বার্ট ওয়েস্ট সেনাবিভাগে যোগ দেবার পরিকল্পনা করে।

১৯১৫-এর মার্চের শেষদিকের এক রাতে ফ্রন্ট থেকে খানিক দূরের সেন্ট ইলয়-এর একটা ফিল্ড হাসপাতালে একটা উদ্ভট ঘটনা ঘটে যায়। হাসপাতালের অস্থায়ী অফিসের পুবদিকে ওয়েস্টের একটা নিজস্ব গবেষণাগার ছিল। যুদ্ধক্ষেত্রে অঙ্গহানির সমস্যার একটা নতুন পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করবার অজুহাতে সে সেটা তৈরি করায়। সেই ল্যাবের ভেতর হার্বার্টের কাজকর্মের সঙ্গে বিজ্ঞানীর বদলে কসাইয়ের বেশি মিল পেতাম আমি। রক্তাক্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে, তাদের সাজিয়ে রাখতে গিয়ে যে পৈশাচিক আনন্দ ফুটে উঠত তার মুখে তা দেখলে তখন তাকে আর মানুষ বলে মনে হত না।

একেক সময় অবশ্য কোনও আহত সৈনিককে অসামান্য শল্যচিকিৎসায় সাক্ষাৎ মৃত্যুর মুখ থেকেও ফিরিয়ে আনত সে। তবে সেসব জনহিতকর কাজে তার বিশেষ তৃপ্তি হত না। তার আসল তৃপ্তি ছিল নিজের ল্যাবের কাজে। সেখান থেকে ভেসে আসা কিছু কিছু ব্যাখ্যাহীন শব্দ মাঝেমধ্যে লোকজনের নজরও টানত। যেমন, মাঝেমাঝেই সেখান থেকে রিভলভারের গুলির আওয়াজ উঠত অনেক রাতে। যুদ্ধক্ষেত্রে গুলির শব্দ নতুন কিছু নয়। কিন্তু হাসপাতালের চত্বরে গভীর রাতে গুলির শব্দ লোকের খানিক অদ্ভুত ঠেকবেই।

তবে কার তাতে অদ্ভুত ঠেকল না ঠেকল তাতে হার্বার্টের কিছু যেত আসত না। যে অঙ্গপ্রত্যঙ্গদের প্রাণ সে তখন ফিরিয়ে দিচ্ছে তাদের বেশিদিন জিইয়ে রাখার বা লোকচক্ষুর সামনে আনার কোনও ইচ্ছা তার ছিল না। মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বা টিসুর পাশাপাশি ওয়েস্ট সেই সরীসৃপের টিসু নিয়েও প্রচুর পরীক্ষানিরীক্ষা করছিল এই সময়টা। মনুষ্যেতর জীবের টিসু হওয়ায় মস্তিষ্কহীনভাবে এদের বাঁচিয়ে রাখাটা তুলনায় সহজও ছিল। ল্যাবের একটা অন্ধকার কোনায় একটা বড়ো, ঢাকনাওয়ালা পাত্রে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় রাখা থাকত তার সরীসৃপের টিসুর নমুনা। সেখানে তারা উপযুক্ত পুষ্টি পেয়ে ফুলে ফেঁপে উঠত ক্রমাগত।

যে রাতটার কথা বলছি, সে রাত্রে আমরা একটা অসামান্য নমুনা হাতে পেয়েছিলাম। ওয়েস্টের যে সামরিক বন্ধু তাকে যুদ্ধক্ষেত্রে যেতে সাহায্য করেছিলেন, শরীরটা তাঁর।

ভদ্রলোকের নাম মেজর এরিক মোরল্যান্ড ক্ল্যাপহ্যাম লি, ডি.এস.ও। নামকরা ডাক্তার ছিলেন কানাডা সরকারের সেনাবিভাগে। ওয়েস্টের পুনর্জীবনের তত্ত্ব নিয়ে তার কাছে গোপনে বেশ কিছুকাল ট্রেনিংও নিয়েছিলেন ভদ্রলোক।

আমাদের এলাকায় ভারী যুদ্ধের খবর হেড কোয়ার্টারে পৌঁছোতে সেখান থেকে তড়িঘড়ি মেজর এরিককে আকাশপথে এই এলাকায় পাঠানো হয়। সেন্ট এলয়-এর হাসপাতালে আমাদের সঙ্গে কাজ করবার জন্য আসছিলেন তিনি। এখানকার এয়ার-স্ট্রিপের ওপরে পৌঁছেও গিয়েছিল তাঁদের বিমান। কিন্তু নামবার মুহূর্তে শত্রু ফ্রন্ট থেকে উড়ে আসা একটা গোলা সরাসরি আঘাত করে বিমানে।

আগুন ধরা বিমানটার আছড়ে পড়বার দৃশ্য বেশ অসাধারণ ছিল। বিমানের চালক লেফটেন্যান্ট রোনাল্ড হিলের বিকৃত শরীরটা সনাক্ত করবার অযোগ্য হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মেজর এরিকের শরীরটা আশ্চর্যভাবে বেঁচে যায়। মাথাটা তাঁর প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল ধড় থেকে। কিন্তু সেইটি বাদে বাকি শরীরে কোনও আঘাতের চিহ্নও ছিল না।

শরীরটাকে হার্বার্ট লোভীর মতো দুর্ঘটনাক্ষেত্র থেকে তুলে নিয়ে এল তার ল্যাবে। তারপর প্রায় বিচ্ছিন্ন মাথাটাকে নিখুঁতভাবে কেটে সেটাকে তার সরীসৃপের টিস্যুর পাত্রে রেখে দিয়ে শরীরটাকে অপারেটিং টেবিলে নিয়ে গিয়ে তুলল।

শরীরে নতুন রক্ত ঢুকিয়ে কাটা গলাটার ওপরে কয়েকটা নার্ভকে নিখুঁতভাবে জুড়ে দিল সে। তারপর কাটা জায়গাটাকে অন্য একটা মৃতদেহ থেকে জোগাড় করে রাখা খানিকটা চামড়া দিয়ে ঢেকে দিল। কী দেখতে চাইছিল হার্বার্ট তা আমি জানি। সে বুঝতে চাইছিল, মাথাহীন ধড়টায় প্রাণ ফিরিয়ে দিলে মস্তিষ্ক ছাড়া সেটা মেজর এরিকের চেতনার কোনও চিহ্ন দেখাতে পারে কি না। একটা অশুভ রসিকতার মতো লাগছিল ব্যাপারটা আমার কাছে। একদিন যে হার্বার্টের পুনর্জীবনদানের বিদ্যার শিক্ষার্থী ছিল আজ তার মুণ্ডহীন ধড়টাকেই সে তত্ত্বের পরীক্ষায় বসানো হচ্ছে।

সে মুহূর্তটা আমি এখনও চোখ বুজলে দেখতে পাই। ছোট্ট একটা ল্যাব। তার মেঝেতে রক্ত আর মানুষের নাড়িভুঁড়ির গোড়ালি ডোবা পাঁক, তার দেয়ালে অজস্র অঙ্গপ্রত্যঙ্গ লেবেল করে টাঙানো। ঘরের এককোণে একটা বিরাট পাত্রে একটা মানুষের মুণ্ডু রাখা। সেটাকে ঘিরে ফুলেফেঁপে ওঠা কোনও সরীসৃপের টিসুর পিণ্ড কেঁপে কেঁপে উঠছে তার তলায় জ্বলতে থাকা নীলচে একটা শিখার উত্তাপের স্পর্শ পেয়ে। আর সেই সবকিছুর মাঝখানে একটা টেবিলের ওপর আর্ক-ল্যাম্পের তীব্র আলোয় হার্বার্ট একটা মুণ্ডহীন শরীরে তার জীবন ফেরাবার রাসায়নিকের ইঞ্জেকশন ফুঁড়ে দিচ্ছে।

শরীরটার নার্ভতন্ত্রের গড়ন দুর্দান্ত। দেখে বেশ আশা জাগছিল আমাদের। ইঞ্জেকশনটা দেবার কয়েক মিনিটের মধ্যে তার পেশিতে প্রাণের সাড়া জাগতে শুরু করল। সেদিকে নজর ধরে রেখে ওয়েস্টের চোখেমুখে একটা অসুস্থ উত্তেজনা ফুটে উঠছিল। এইবার হয়তো সে প্রমাণ করে দেবে ‘জীবনের রহস্য’ বলে কিছু হয় না। প্রমাণিত হবে, চেতনার জন্য মস্তিষ্ক গুরুত্বপূর্ণ নয়।

শরীরটার পেশির খিঁচুনি ক্রমশ বেড়ে উঠছিল। একে একে তার হাত-পাগুলো নড়তে শুরু করল। আর অবশেষে মুণ্ডহীন ধড়টা হঠাৎ তার হাতদুটো দু’পাশে ছড়িয়ে দিয়ে প্রাণপণে হাওয়ায় ধাক্কা দিতে শুরু করল। যেন মৃত্যুর মুহূর্তে জ্বলন্ত বিমান থেকে বের হয়ে যাবার পথ খুঁজছে।

বাঁচবার একটা তীব্র, বেপরোয়া আকুতি ছিল তার ছটফটানিতে। ওয়েস্টের মুখে হাসি ফুটে উঠছিল সেইদিকে তাকিয়ে। আর সন্দেহ নেই। মুণ্ডহীন শরীরটা তার দুর্ঘটনার ইতিহাসের ব্যাপারে সচেতন। মাথা ছাড়াই বাঁচবার তীব্র আকুতির প্রমাণ রাখছে সে তার প্রাণপণ সেই ছটফটানিতে।

এরপর যা ঘটেছিল সেটা কতটা হ্যালুসিনেশন আর কতটা বাস্তব তা আমি জানি না। কারণ, প্রায় সেই মুহূর্তেই শত্রু ফ্রন্ট থেকে উড়ে আসা একটা দূরপাল্লার গোলা এসে ল্যাব-ঘরটার দেয়ালে ধাক্কা মারে। ঘরটা দাউদাউ করে জ্বলে গিয়েছিল তাতে। আমি আর ওয়েস্ট কেমনভাবে তার থেকে বেঁচে গিয়েছিলাম তা আমরা নিজেরাই জানি না।

তবুও পরে ঘটনাটার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ওয়েস্ট বারবার দাবি করেছে, মুণ্ডহীন শরীরটা ওই মুহূর্তে উঠে দাঁড়িয়েছিল, তারপর সামনে হাত বাড়িয়ে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করেছিল এককোণে রাখা টিসুর পাত্রটার দিকে। আর একই সময়ে গোলার বিস্ফোরণের শব্দের মধ্যেই পাত্রের মধ্যে রাখা মাথাটা বলে উঠেছিল, “লাফাও রোনাল্ড! ঈশ্বরের দিব্যি, লাফিয়ে পড়ো…”

আমি সেকথাটা মানতে না পারলেও পুরোপুরি অস্বীকারও করতে পারিনি, কারণ সেই অগ্নিকাণ্ডের মুহূর্তে আমার বিবশ চেতনাতেও খুব হালকাভাবে তেমনই একটা স্মৃতি ধরা পড়েছিল।

।।৬।।
কবরখানার সৈন্যদল

গতবছর ডক্টর হার্বার্ট ওয়েস্ট নিখোঁজ হয়ে যাবার পর বোস্টন পুলিশ আমাকে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ করে। তাদের সন্দেহ ছিল আমি সম্ভবত কোনও গোপন খবর-টবর জানি। হয়তো আরও খারাপ কোনও সন্দেহও তাদের ছিল, তবে সে আমি সঠিকভাবে বলতে পারি না। তবে শত জিজ্ঞাসাবাদেও তাদের আসল সত্যিগুলো আমি বলতে পারিনি। বললে তারা বিশ্বাসও করত না।

হ্যাঁ, এটা ঠিক যে ওয়েস্টের উদ্ভট পরীক্ষানিরীক্ষার বিষয়ে তাদের কিছু কিছু আন্দাজ ছিল। দীর্ঘকাল ধরে একটা এ-হেন বিজাতীয় গবেষণাকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে রাখা যায় না। তবে ওয়েস্টের শেষ দুর্ঘটনাটা এতটাই মর্মান্তিক আর ভয়াবহ যে, সেটা তাদের বললেও তারা বিশ্বাস করত না। মাঝেমাঝে আমার নিজেরই মনে হয়, হয়তো একটা দুঃস্বপ্নই দেখেছিলাম সে রাত্রে। পৃথিবীর বুকে অমন সাক্ষাৎ নরকের দৃশ্য কখনও বাস্তব হতে পারে না।

আগেই বলেছি, ওয়েস্ট ধীরে ধীরে কেমন যেন হয়ে যাচ্ছিল। নিজের বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের প্রমাণ খোঁজার চেষ্টায় নিজের মনুষ্যত্বকে সম্পূর্ণ বিসর্জন দেবার পথে চলেছিল সে। একটা সময় এসেছিল যখন যেকোনও সুস্থ, চনমনে মানুষ দেখলেই তার দৃষ্টি বদলে যেত। একটা লোভী ক্ষুধার্ত দৃষ্টি জেগে উঠত সেখানে।

একেবারে শেষের দিকে আমি নিজেই ওয়েস্টের ব্যাপারে গভীর ভয় পেতে শুরু করেছিলাম। তার কারণ, আমি খেয়াল করছিলাম মাঝেমাঝে আমার দিকেও তেমন দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে সে। লোকজন ওয়েস্টের দৃষ্টিটা খেয়াল করত না। কিন্তু তার কাছাকাছি এলে আমার অস্বস্তিটা অনেকেরই নজরে পড়েছিল। ওয়েস্ট নিখোঁজ হবার পর তাই সেটাকে কাজে লাগিয়ে তারা কিছু অবাস্তব সন্দেহ করেছিল আমার বিষয়ে।

তবে আসল ঘটনাটা হল, ওয়েস্ট নিজে আমার চেয়েও বেশি ভয়ে ভয়ে থাকত সে সময়টা। যে জীবনযাত্রাকে সে বেছে নিয়েছিল, তাতে প্রতিমুহূর্তে ধরা পড়বার বা নারকীয় কোনও দুর্ঘটনা ঘটবার ভয়। এর খানিকটা ছিল অবশ্যই পুলিশে ভয়। তবে মাঝেমধ্যেই দেখতাম, শুধু পুলিশ নয়, অন্য কোনও অজানা শত্রুর ভয়েও সে কাঁপছে।

সাধারণত ওয়েস্ট তার পরীক্ষাগুলোর সমাপ্তি ঘটাত রিভলভারের গুলিতে। কিন্তু দীর্ঘ বছরগুলোর পরীক্ষানিরীক্ষায় অন্তত দু’বার তার হাতে বেঁচে ওঠা নরপিশাচদের সে মারতে পারেনি। তাদের একজন তখনও সেফটনের অ্যাসাইলামের আটকানো রয়েছে। অন্যজনের কোনও সন্ধান সে কখনও পায়নি। আর তাছাড়া পরবর্তীকালে  মানুষের নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে জীবন্ত করে তোলবার যে পরীক্ষানিরীক্ষা সে অজস্র বার চালিয়েছিল, অথবা মানুষ আর অন্য জীবের টিসু মিলিয়ে তাতেও প্রাণসঞ্চার করে দেখেছিল, তাদের মধ্যেও অনেকগুলোকেই গুলি করে নিকেশ করবার অবসর মেলেনি তার।

সে পরীক্ষানিরীক্ষাগুলো তার ক্রমেই আরও বীভৎস হয়ে উঠছিল। তাদের কথা বিস্তারিত লেখার সাধ্য নেই আমার। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তার চরিত্রের এই দিকটাকে আরও ধারালো, আরও হিংস্র করে তুলেছিল। আবার একই সঙ্গে সে তার এ-হেন সৃষ্টিদের নিজেই বড়ো ভয়ও পেত। ভয় পেত সেফটনের উন্মাদাগারে আটকানো সেই পিশাচকে। ভয় পেত হারিয়ে যাওয়া তার প্রথম সৃষ্টিকে।

তবে সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক ছিল তার মেজর এরিককে নিয়ে। মাঝরাতে জেগে উঠে কতবারই তো সে বলেছে, গোলার হানা থেকে আমরা কীভাবে বেঁচে ফিরলাম? ধ্বংসস্তূপের ভেতর আর সবকিছু পাওয়া গেল, কিন্তু এরিকের শরীরটা পাওয়া যায়নি কেন? তাকে আমি মৃতদেহে প্রাণসঞ্চারের কৌশল শিখিয়েছিলাম। সেই বিদ্যা নিয়ে যদি সে…”

*****

ওয়েস্টের শেষ আস্তানাটা ভারি সুন্দর ছিল। বস্টনের একটা পরিত্যক্ত কবরখানার মুখোমুখি। কবরখানাটা তার গবেষণার কাজে আসবার প্রশ্ন ছিল না। বহুকাল সেখানে নতুন শরীর কবর দেয়া বন্ধ। তবুও জায়গাটা ওয়েস্ট বেছেছিল সেন্টিমেন্টাল কারণে। কবরখানার দৃশ্য তার প্রিয় ছিল। বাড়ির সেলারে বেশ আধুনিক একটা ল্যাবরেটরি বানিয়েছিল সে। বাইরে থেকে মজুর আনিয়ে কাজটা করা হয়। স্থানীয় লোকজন তার খবর রাখত না। সেখানে একটা বড়োসড়ো বৈদ্যুতিক চুল্লির বন্দোবস্ত রাখা হয়েছিল। সেটা মূলত তার পরীক্ষানিরীক্ষা আর প্রাণ ফিরিয়ে দেয়া খেলনাদের নিয়ে কিঞ্চিৎ মজা-টজার পর প্রমাণ লোপের কাজে ব্যবহার করা হত।

সেলারটা খোঁড়বার সময় মজুররা বহু প্রাচীন কিছু গাঁথুনির সন্ধান পেয়েছিল মাটির নিচে। সম্ভবত সেগুলো পাশের পুরনো কবরখানার সঙ্গে মাটির তলা দিয়ে যুক্ত। তবে গাঁথুনিগুলো মাটির এত গভীরে যে সেগুলো কোনও কবর হতে পারে না। ব্যাপারটা নিয়ে বেশ কিছু হিসেবনিকেশ আর পড়াশোনা সেরে ওয়েস্ট বলল, ওগুলো নিঃসন্দেহে পুরনো কালের আভেরিল পরিবারের কবরগুলোর তলাকার কোনও গোপন কক্ষের অংশ হবে। সে পরিবারের শেষ কবরটা হয়েছিল ১৭৬৮ সনে।

মাটির তলা থেকে বের হয়ে আসা ভেজা, সোঁদা গন্ধমাখা দেয়ালগুলো যখন মজুরদের গাঁইতি, কোদালের ঘায়ে বের হয়ে আসছে, আমি তখন হার্বার্টের সঙ্গেই ছিলাম। হার্বার্টের অনুমিতিটা শুনে ইচ্ছে হচ্ছিল, রহস্যটার শেষ দেখব। পাতালপথে পাশের কবরখানার ভেতর কোনদিকে কতটা ছড়িয়ে আছে গুপ্তকক্ষটা সেটা জানবার জন্য বেশ একটা কৌতূহলই হচ্ছিল।

কিন্তু সেবারই প্রথম খেয়াল করলাম, ওয়েস্টের ভিতু স্বভাবটা কতটা শেকড় ছড়িয়েছে তার মনে। সাধারণত এ’সব ক্ষেত্রে তার কৌতূহলটা আমার চাইতে অনেক বেশি উগ্র হয়। অথচ সেদিন সে আমায় বাধা দিল। হুকুম দিল, সেটাকে বন্ধ করে প্লাস্টার দিয়ে ঢেকে ওর গায়ে সেলার গেঁথে তুলতে।

সেইভাবেই অতএব রয়ে গেল জায়গাটা। ওয়েস্টের সেলারের একটা দেয়াল হয়ে। সবার অজান্তে। শেষের সেই রাতটা আসার আগে পর্যন্ত।

তবে ওয়েস্ট ভেতরে ভেতরে ভিতু হয়ে উঠলেও বাইরে কিন্তু তার কোনও ছাপ ছিল না। সেখানে সে সেই একইরকম ছিল। ছোট্টখাট্টো, শান্ত, গভীর নীল চোখ, হলদে চুল। যত বয়সই হোক, চেহারায় তার কোনও ছাপ ফেলত না তা। এমনকি রাতবিরেতে কখনও আতঙ্কিত হয়ে পিছু ফিরে দেখবার সময়েও সেই শান্ত, গভীর দৃষ্টিটা বদলাত না তার।

হার্বার্ট ওয়েস্টের শেষ সন্ধেটা শুরু হয়েছিল আমাদের স্টাডি রুমে। সেদিন সন্ধেবেলা দু’জনেই বসে ছিলাম সেখানে। ওয়েস্টের হাতে একটা পুরনো খবরের কাগজ ছিল। কাগজ পড়তে পড়তে মাঝেমাঝেই সে আমার দিকে চোখ তুলে দেখছিল।

পুরনো কাগজটা নিয়ে ওয়েস্ট পড়তে বসেছিল, তার কারণ ওতে ছাপা একটা বিচিত্র হেডলাইন। লাইনটার মধ্যে দিয়ে যেন একটা অতিকায় নখ ষোলো বছরের অতীতকে চিরে নেমে এসেছে তার সামনেঃ

সেফটন উন্মাদাগারে ভয়াবহ ঘটনা!

খবরটা এইরকম। বস্টন শহর থেকে মাইল পঞ্চাশেক দূরে সেফটন উন্মাদাগারে এমন একটা ঘটনা ঘটেছে যাতে স্থানীয় লোকজন আর পুলিশ বিভাগ সকলেই স্তম্ভিত। ঘটনার দিন ভোররাত্রে কিছু মানুষের একটা দল নিঃশব্দে প্রতিষ্ঠানটির কমপাউণ্ডে ঢুকে আসে। তাদের নেতা উন্মাদাগারের পাহারাদারদের জাগায়। মানুষটাকে দেখলে মনে হয় সে সেনাবিভাগের লোক। বিরাট চেহারা। কথা বলবার সময় তার ঠোঁট বা মুখের কোনও পেশি নড়ছিল না। ভেন্ট্রিলোকুইজমের কোনও কৌশলের কারণে তার কথার আওয়াজগুলো বের হয়ে আসছিল মানুষটার হাতে ধরা একটা কালো বাক্সের ভেতর থেকে।

লোকটার মুখটা ভারি সুদর্শন। তবে খানিক বাদে তাতে আলো পড়তে পাহারাদাররা ঘাবড়ে গিয়ে লক্ষ করে সেটা মোমের তৈরি, আর তার গায়ে দুটো কাচের চোখ বসানো। এতে তারা অনুমান করে লোকটার মুখ নিশ্চয়ই কোনও দুর্ঘটনায় বিকৃত হয়ে গেছে। তাই মুখোশের বন্দোবস্ত।

বড়োসড়ো চেহারার অন্য একজন মানুষ এই মোমের মুখোশ পরা মানুষটির হাত ধরে পথ দেখাচ্ছিল। এই দ্বিতীয় মানুষটার শরীরের গড়ন কুৎসিত। তার নীলচে মুখের অর্ধেকটা কোন অজানা রোগের আক্রমণে ক্ষয়ে গেছে বলে মনে হয়। মোমের মুখোশ এরপর উন্মাদাগারে ষোলো বছর ধরে বন্দি থাকা আরখামের এক উন্মাদ নররাক্ষসের নাম বলে তাকে তাদের হাতে তুলে দিতে আদেশ দেয় পাহারাদারদের।

এতে পাহারাদাররা অসম্মতি জানালে লোকটার ইশারায় তার সাঙ্গোপাঙ্গেরা সেখানে দক্ষযজ্ঞ বাধিয়ে দেয়। তাদের আক্রমণের সামনে দিশাহারা হয়ে যারা পালাতে পেরেছিল তারা প্রাণে বেঁচে গেলেও অন্তত চারজন পাহারাদার প্রাণ হারিয়েছে এই আক্রমণে।

পাহারাদারদের পর্যুদস্ত করে আক্রমণকারীরা বন্দি নররাক্ষসকে উদ্ধার করে। পরবর্তী সময়ে পাহারাদারদের বয়ান একত্র করে দেখা গেছে আক্রমণকারী গোটা দলটাই কিছু যন্ত্রমানবের মতো ব্যবহার করছিল। তাদের নেতা সেই মোমের মুখওয়ালা মানুষটার হুকুম মেনে চলছিল তারা যন্ত্রের মতন। পলাতক পাহারাদাররা পুলিশে খবর দেয়। কিন্তু পুলিশবাহিনী এসে হানাদারের দল বা আরখামের নররাক্ষস কারও কোনও চিহ্ন খুঁজে পায়নি সেখানে।

খবরটা পড়বার পর থেকে সেদিন একেবারে মাঝরাত পর্যন্ত ওয়েস্ট যেন প্রায় পঙ্গু হয়ে চুপচাপ বসে ছিল। তারপর সেদিন ঠিক মাঝরাতে হঠাৎ তার বাড়ির ডোর-বেল বেজে ওঠে। আওয়াজটা একেবারে হকচকিয়ে দিয়েছিল ওয়েস্টকে। নিজে উঠে গিয়ে দরজা খুলতে সে নারাজ।

বাড়ির কাজের লোকজন তখন ছাদের চিলেকোঠায় ঘুমোচ্ছে। অতএব আমি নিজেই গিয়ে দরজা খুলে দিই। পুলিশকে আমি যা বয়ান দিয়েছি সে অনুযায়ী সেই মুহূর্তে রাস্তায় কোনও গাড়িঘোড়া আমি দেখিনি। দরজা খুলে দিতে একদল বিচিত্রদর্শন মানুষ একটা বড়োসড়ো চৌকো বাক্স বয়ে ভেতরে ঢুকে এসেছিল। বসবার ঘরের মেঝেতে সেটা নামিয়ে দিয়ে তাদের একজন বেশ অস্বাভাবিক গলায় চিৎকার করে বলে ওঠে, “এক্সপ্রেস। প্রিপেড।” এই বলে তারা ফের সার বেঁধে ঘর থেকে রাস্তায় বের হয়ে যায়। তাদের চলার ঢঙয়ে একটা ঝাঁকুনি দেয়া ভাব ছিল।

দরজা দিয়ে উঁকি মেরে আমি খেয়াল করেছিলাম, তারা রাস্তায় নেমে বাড়ির পেছনে ছড়িয়ে থাকা পুরনো গোরস্থানটার দিকে এগিয়ে চলেছে। খানিক বাদে ভেতরে ঢুকে সদর দরজা বন্ধ করবার পর ওয়েস্ট নেমে এসে বাক্সটাকে দেখে। দু’ফুট বাই দু’ফুট একটা বাক্স। তার গায়ে ওয়েস্টের নাম আর এখনকার ঠিকানা গোটা গোটা হস্তাক্ষরে লেখা। আর তার নিচে অপেক্ষাকৃত ছোটো হরফে লেখা আছে,

‘প্রেরক,
এরিক মোরল্যান্ড ক্ল্যাপহ্যাম লি, সেন্ট এলয়, ফ্ল্যান্ডার্স’

ওয়েস্টের চোখেমুখে আর কোনও উত্তেজনারও চিহ্ন ছিল না। সম্ভবত সেসব অনুভূতির সীমাকেও সে পার করে গেছে ততক্ষণে। খানিক বাদে কোনওমতে বলল, “এটা—এটাকে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। চলো।”

বাক্সটাকে আমরা দু’জন মিলে বয়ে এনেছিলাম ওয়েস্টের সেলারের ল্যাবরেটরিতে। কান খাড়া করে রেখেছিলাম আমরা — যদি কোনও শব্দ ওঠে বাক্সটা থেকে সেই আশায়। কিন্তু না। শেষমুহূর্ত অবধি কোনও শব্দ ওঠেনি তার ভেতর থেকে।

তারপর ল্যাবরেটরির ইলেকট্রিক চুল্লি চালু করে তার মধ্যে দু’জন মিলে বাক্সটাকে ঢুকিয়ে দিলাম আমরা। (আজ্ঞে হ্যাঁ। পুলিশ যে সন্দেহই করুক না কেন সব মিথ্যে। ঢুকিয়েছিলাম আমি ওই বাক্সটাকেই। যে যাই বলুক, ওর বদলে হার্বার্ট ওয়েস্টকে চুল্লিতে ঢুকিয়ে বোতাম আমি মোটেই টিপে দিইনি।)

বাক্সটা যখন নিঃশব্দে পুড়ছে, ঠিক তখনই ওয়েস্ট প্রথম খেয়াল করে, সেলারের একদিকের দেয়ালের প্লাস্টার আস্তে আস্তে খসে পড়ছে। আমি জানতাম, দেয়ালটার ওপাশে রয়েছে গোরস্থান অবধি ছড়ানো সেই গুপ্তকক্ষটা।

ছুটে পালাতে গিয়েছিলাম আমি। কিন্তু হার্বার্ট আমার হাত ধরে টেনে থামাল। তারপর সেইখানে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই আমাদের চোখের সামনে সেই দেয়ালের গায়ে একটা ছোট্টো কালো গর্ত গজিয়ে উঠল। সেই পথে ধেয়ে এল পূতিগন্ধময় নরকের বাতাস।

কোনও শব্দ ওঠেনি। শুধু সেই মুহূর্তে হঠাৎ করেই নিভে গিয়েছিল বিজলিবাতির আলোগুলো। অন্ধকারের মধ্যে সেই গর্তের অন্য ধারে মৃদু একটা আলোর আভাস জেগেছিল। সে আলোয় দেখেছিলাম গর্তের মুখে ভিড় করে আসা একদল পৈশাচিক শরীরের শিলুয়ে। অক্লান্ত পরিশ্রমে দেয়ালের গর্তটাকে ক্রমশ বড়ো করে তুলছে তারা।

তাদের মধ্যে মানুষের চেহারা ছিল। ছিল আধা মানুষের চেহারা। তাদের কাউকে কাউকে কষ্ট করে মানুষ বলে ভেবে নিতে হয়। আবার কেউ কেউ একেবারেই বিজাতীর অ-মানুষী শরীরের মালিক। প্রাচীনকালের সেই দেয়ালের শরীর থেকে একটা একটা করে পাথরকে তারা টেনে হিঁচড়ে সরিয়ে দিচ্ছিল নিঃশব্দে।

আর তারপর, সুশৃঙ্খল একটা সার বেঁধে তারা নিঃশব্দে ঢুকে এল হার্বার্টের ল্যাবরেটরিতে। তাদের সবার সামনের মানুষটার মাথার জায়গায় মোমের তৈরি একটা অপূর্ব সুন্দর মুখোশ।

হঠাৎ তার পেছন থেকে ছোটোখাটো, পৈশাচিক চেহারার একটা জীব বের হয়ে লাফ দিয়ে পড়ল ওয়েস্টের ওপর। ওয়েস্ট কোনও বাধা দিল না। নিজেকে বাঁচাবার কোনও চেষ্টাই করল না সে। একটা শব্দও বের হয়ে এল না তার মুখ থেকে। তারপর গোটা দলটা নিঃশব্দে লাফিয়ে এল ওয়েস্টের শরীরের ওপর। আমার চোখের সামনে শরীরটাকে জীবন্ত অবস্থাতেই ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে তারা বয়ে নিয়ে ফিরে গেল ফের দেয়ালের গর্তটা বেয়ে।

ওয়েস্টের মাথাটা বয়ে নিয়ে গিয়েছিল মোমের মুখোশ পরা মানুষটা। তার শরীরে কানাডিয়ান সেনাবাহিনীর ইউনিফর্ম ছিল।

*****

পরদিন সকালে বাড়ির চাকরবাকররা আমাকে অজ্ঞান অবস্থায় উদ্ধার করে। ওয়েস্টের কোনও চিহ্ন ছিল না কোথাও। চুল্লির ভেতরে ছিল কিছু পরিচয়হীন ছাই।

ডিটেকটিভরা এই নিয়ে আমায় অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করে। কিন্তু কী বলব আমি তাদের? ওয়েস্টের ঘটনাটার সঙ্গে সেফটন ট্র্যাজেডির কোনও যোগসূত্র তারা খুঁজে পাবে না। গভীর রাত্রে একটা বাক্স বয়ে আনা লোকজনের দলটার কথাও তারা মেনে নেয়নি। তাদের স্বীকার করতেই রাজি নয় তারা। তাদের বলেছিলাম, দেয়ালটার পেছনে একটা গোপন ঘর আছে। জবাবে তারা অক্ষত দেয়ালটার প্লাস্টারের দিকে দেখিয়ে হেসেছিল শুধু।

তাই আমি তাদের আর কিচ্ছু বলিনি। তাদের ধারণা, আমি একজন উন্মাদ খুনে। কিন্তু কবরখানার ওই সৈন্যদল যদি সে রাত্রে একটাও কথা বলত, একবারও বলত তারা কে, তাহলে… তাহলে হয়তো আমি উন্মাদ হয়ে যেতাম না। আমি…

অলঙ্করণঃ অর্ক পৈতণ্ডী

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

 

Advertisements

5 Responses to উপন্যাস হার্বার্ট ওয়েস্ট এইচ পি লাভক্র্যাফট। অনুবাদ দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য শরৎ ২০১৮

  1. প্রদীপ্ত says:

    চমৎকার শুরুয়াদ পুজোর। দারুন লেগেছে অনুবাদ।

    Like

  2. নীলাভ says:

    দুর্দান্ত!!

    Like

  3. Sudeep says:

    বাপরে.. লাস্ট এ একেবারে কাঁটা দেওয়া উঠল.. দুর্ধর্ষ অনুবাদ

    Like

  4. prosenjit says:

    darun darun,chobir moto dekhte pelam ghatona gulo..dhanyobaad

    Like

  5. অনুবাদের অনবদ্য ভাষার যাদুতে জীবন্ত হয়ে উঠেছে

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s