উপন্যাস অদ্ভুত পানীয় ও একটি গুপ্ত কাল্ট বৈশাখী ঠাকুর শরৎ ২০১৯

বৈশাখী ঠাকুরের আগের লেখাপত্রঃ পানি-পথ, বিবর্তনব্যাং বাহিনীর স্কুলভ্রমণ

বৈশাখী ঠাকুর

         তিথির যখন চেতনা হল তখন সে একটা বনের মধ্যে নিজেকে খুঁজে পেল। এই তো দিব্যি শ্বাসপ্রশ্বাস চলছে। হাত-পাও অক্ষত রয়েছে। তাহলে সে সত্যি সত্যিই বেঁচে আছে! ভাবতেই কেমন অবাক লাগছিল। যদি দিম্মা সময়মতো না বলত পালাতে, তাহলে হয়তো তাকেও দিম্মার মতো ডাইনি সন্দেহে পুড়িয়ে মারা হত। আরও আগে যদি দিম্মা তাকে ডেকে পাঠাত তাহলে হয়তো সবটাই তার জানা হয়ে যেত। দিম্মা যখন প্রথম বলেছিল তখন ভাবতেই কেমন গর্ব হয়েছিল পৃথিবীর সেই মুষ্টিমেয় ব্যক্তির মধ্যে সে একজন যে এই গুপ্ত রহস্যটা জানে। যতটা তাকে দিম্মা জানিয়েছে সেটার ওপর ভিত্তি করেই তাকে আরও পড়াশোনা করতে হবে। কিন্তু দিম্মা! ভাবলেই বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠছে। কী একটা যেন দলা পাকিয়ে আসছে গলায়। দিম্মার এই পরিণতির কথা যেন সে চিন্তাই করতে পারছে না। কুসংস্কারের অন্ধকার আর অশিক্ষার জন্যই কি এই দশা হল, নাকি অন্য কারুর প্ররোচনা ছিল! কিন্তু তার এখন শোক করার সময় নয়। না চাইতেই একটা বিরাট দায়িত্ব তার কাঁধে চেপে গেছে। তাকে আরও অনেক জ্ঞান অর্জন করতে হবে। আরও অনেক চর্চা করতে হবে। নিজেকে উপযুক্ত তৈরি করতে হবে। কিন্তু তারও আগে নিজেকে বাঁচাতে হবে। তবেই এইসব কিছু বাস্তবে রূপান্তরিত হবে।

হকচকিয়ে সব আলসেমি ঝেড়ে উঠে বসে তিথি। দিম্মা যে কীসব জিনিস দিল তাকে! সে তার জামার ভেতর গুপ্ত পকেটে হাত বোলাল। একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। যাক, জিনিসগুলো নিরাপদে আছে। এখন তার কাজ হচ্ছে কোনওক্রমে কলকাতা শহরে পৌঁছনো। একটা চিরকুটের ভেতর একটা নামঠিকানা দেওয়া আছে। যিনি তাকে এইখানে পৌঁছে দিয়ে গেছিলেন, ওঁর নামঠিকানা। তাকে কাকামণি বলতেই শিখিয়েছিল দিম্মা। সেখানে যেতে পারলে, ব্যস! তার নিজের লোকেদের মাঝে সে চলে যেতে পারবে।

তিথি ভালো করে চারপাশ তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করল কোনদিক দিয়ে গেলে কোনও জনপদ পেতে পারে। হঠাৎ কানে এল কিছু দেহাতি ভাষার কথোপকথন। সে চকিতে একটু সরে একটা গাছের আড়ালে লুকোল। কাঠ কেটে মাথায় করে জনা চার গ্রামের মহিলা কথা বলতে বলতে এগিয়ে যাচ্ছিল। তাদের দ্রুত এগিয়ে চলার সাথে সাথে তাদের কলকল করে কথাগুলো যেন এক অদ্ভুত ছন্দ তুলছিল ঐ বাতাবরণে। খানিক দূরত্ব রেখে তিথিও এগিয়ে গেল তাদের সাথে। কোনও এক গ্রাম বা জনপদে নিশ্চয়ই সে পৌঁছবে।

আধা ঘণ্টা মতো চলার পর দেখতে পেল বেশ কিছু আলো দেখা যাচ্ছে। দিনের আলো প্রায় মরে এসেছে তখন। কুসুমের মতো হলদে আর কমলা আলোয় মাখামাখি সারা আকাশ। তারপরেই লাল হয়ে ধীরে ধীরে সুয্যিমামা পাটে গেল। মুখ তুলে তাকালে দেখা যায় ক্লান্ত শ্রান্ত পাখিরা বাড়ি ফিরছে। খানিক এগিয়ে হঠাৎ নজর করতে পারল কিছু শহুরে নিয়ন বাতির। তবে কি! তবে কি! সে যা ভাবছে তাই। আরও একটু দ্রুত চলার চেষ্টা করল। গ্রামের মহিলারা একটা বাঁকে বেঁকে যেতেই সে প্রায় ছুটতে লাগল। হ্যাঁ! অবশেষে তার অনুমানই ঠিক। একই জায়গায় পাশাপাশি বেশ কিছু টুরিস্ট বাংলো আর হোটেল মতো রয়েছে। প্রথমবার যখন এসেছিল তখন দিম্মা তাকে ঐ লাল পলাশ নামে টুরিস্ট বাংলো, ওখান থেকেই তো তাকে নিয়ে গেছিল নিজের আস্তানায়।

কিছু টাকাপয়সা আছে তার কাছে। তাই দিয়ে যদি কোনওমতে কলকাতায় পৌঁছতে পারে, তাহলে ফোন করলে ওকে ঠিক এসে নিয়ে যাবে। নাকি আগে সে, ঐ তো দূরে দেখা যাচ্ছে এসটিডি বুথটা থেকে ফোন করে নেবে? কারণ, দিম্মার শেষকালের ঐ কথাগুলো এখনও তার কানে বাজছে।

সে যখন খবর পেল তখন দিম্মার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন জ্বেলে দিয়েছে ঐ কুরুচিকর, নৃশংস  মানুষগুলো। সে প্রায় এক নিঃশ্বাসে দৌড়ে সেই স্থানে পৌঁছে গেছিল। সেই দৃশ্য মনে করলেও গাটা কেমন শিউরে ওঠে! তবুও উপস্থিত বুদ্ধির জেরে সে ত্বরিতে একটা কম্বল হাতে নিয়ে প্রায় ছুটতে ছুটতে এসেছিল। কোনওমতে জড়িয়ে টানতে টানতে নিয়ে যাবার চেষ্টা করেছিল পুকুরপাড়ে। কিছু সহৃদয় মানুষ তাকে সেই মুহূর্তে সাহায্য না করলে শেষ ক’টা কথাও দিম্মার বোধহয় শোনা হত না তিথির। তার আগেই প্রাণের পাখি বেরিয়ে যেত। কোনওমতে নিজের সব শক্তি জড়ো করে তাকে কাছে ডেকে অতিকষ্টে জড়িয়ে জড়িয়ে বলতে পেরেছিল, “ভয়! ভয়!”

শুধু কি গ্রামবাসীদের থেকে ভয়! তা কিন্তু মনে হয়নি তিথির। এর পেছনে অন্য কোনও রহস্য আছে। তবে কি দিম্মাকে কেউ ভয় দেখাত! নাকি তিথির প্রাণসংশয়! সেই ভয়? কিন্তু তার মন বলে, এই শেষ কথাটার অন্য কোনও তাৎপর্য আছে। দিম্মা কি নিজেও কিছু বুঝতে পেরেছিল? নাহলে হঠাৎ আগের দিন রাত্রেই কেন তাকে তার কাকামণির নামঠিকানা সব গুছিয়ে লিখে দিল? টাকাপয়সা গুছিয়ে দিয়ে গুপ্ত পকেটটা পর্যন্ত জামাতে নিজে হাতে বানিয়ে দিয়েছিল আর বারবার বলেছিল, “আমার কিছু হলে তুই কিন্তু পালিয়ে যাবি। এক মুহূর্ত এখানে থাকবি না। তোকে ওরা মেরে ফেলবে। আর আমি যা শেখালাম তার চর্চা করবি। তোকে বাঁচতেই হবে। নাহলে অনেক কিছু হারিয়ে যাবে। জানবি তোর ওপর এখন অনেক দায়িত্ব।”

তবে কি তিথির যদি কিছু হয় সেটাই ভয় পাচ্ছিল বলে বলেছিল, ভয়! ভয়!? কী জানি! তিথির মনের ভেতরটা খচখচ করতেই থাকে।

এক

‘ফোর্থ ডাইমেনশন’-এর ফলকটাতে হাত বোলালাম। আমিই শখ করে ফলকটা অর্ডার দিয়ে বানিয়েছি।  কেমন জমজমিয়ে রমরমিয়ে প্রথম কেসটা উতরে গেল পূবালী দাশগুপ্তের। কিন্তু যা ছিটেল আর কাঠখোট্টা মেয়ে! ওকে আর কে জিজ্ঞেস করবে কেস নিয়ে? অগত্যা আমিই যা পাড়াপড়শির ভরসা। অনেকেই সেলুলার মেমারি ব্যাপারটাই জানত না। তবে এখন সবাই ওয়াকিবহাল। এখন ইনফরমেশনের যুগ। তা একটু ইনফোর ফান্ডা না থাকলে চলবে কেন! আজকাল মাঝেমধ্যে কান পাতলে শুনতে পাই, ‘ঐ যে, ঐ যে ওইটা পূবালী দাশগুপ্তর বাড়ি।’ শুনে আমি আহ্লাদে যাকে বলে আটখানা নয় একেবারে ষোলখানা হয়ে যাই। অনুরূপ অবস্থা আমার জেঠিমারও। মুখচোখ একেবারে জ্বলজ্বল করে ইদানীং। মেয়ে তার অফবিট প্রফেশনে সাফল্য পেয়েছে। বললে হবে! কিন্তু জেঠুর মতিগতি বোঝা ভার। ভাবছিলাম, একদিন সময় করে জেঠুকে বাজিয়ে দেখব নাকি। মনে মনে চিন্তা করছিলাম কী দিয়ে প্রথমে শুরু করে প্রসঙ্গটা টেনে আনব। মনে মনে প্ল্যান আঁটছি, ঠিক সেই সময় ঝঙ্কার দিয়ে মোবাইলটা বেজে উঠল। সেই লিফলেটে যে নাম্বারটা দেওয়া হয়েছিল সেই মোবাইলটা এখন অফিসেই রাখা থাকে। ওটাই ফোর্থ ডাইমেনশনের ফোন নাম্বার। তা অভিনন্দনবার্তা আজকাল ফোনে প্রায়ই আসে। এক্ষেত্রে আমি ফোনটা তুলতেই শুনতে পেলাম এক দ্বিধান্বিত, চিন্তান্বিত কণ্ঠস্বর, “এটা কি ফোর্থ ডাইমেনশন?”

“হ্যাঁ, আপনি সঠিক জায়গায় ফোন করেছেন।”

“আমি একটু ম্যাডাম মানে, পূবালী দাশগুপ্তর সাথে কথা বলতে পারি? ইন ফ্যাক্ট দেখাই করতে চাই। সামনাসামনি কথা বললে উনি আরও ভালো করে আমার সমস্যাটা বুঝতে পারবেন।”

বুকের ভেতর আমার তখন দামামা বাজছে। আরেকটা কেস! আরেকটা কেস! মেঘ না চাইতেই জল যাকে বলে। “ঠিক আছে, আপনি এক মিনিট ধরুন, আমি দিদিভাইকে ডেকে দিচ্ছি।”

আমি জানি দিদিভাই এইসময় শরীরচর্চা করে। মোবাইলটা ওর কাছে নিয়ে গেলাম। ভ্রূ কুঞ্চিত করে মিনিট পাঁচেক ও-প্রান্ত থেকে ভেসে আসা কথা শোনার পর পূবালী দাশগুপ্তর মুখ থেকে কেবল সাতটা শব্দ  শুনতে পেলাম। “ঠিক আছে। চলে আসুন সন্ধে সাতটা নাগাদ।”

তোয়ালে দিয়ে ঘাম মুছে কিছু অঙ্কুরিত ছোলা খেয়ে দিদিভাই খবরের কাগজ টেনে বসল। আমিও একটু দুনিয়ার হালহকিকত জানব বলে ভেতর থেকে একটা পেপার টেনে নিলাম। রোববারের বাজার! ক্রোড়পত্রে ভর্তি আর বিস্তর বিজ্ঞাপন। আসল খবরে চটজলদি চোখ বুলিয়ে আমি বিজ্ঞাপনের রঙচঙে দুনিয়ায় ঢুকলাম। অজস্র পাত্র চাই, পাত্রী চাই-এর বিজ্ঞাপনেই ভর্তি। একেকটা বেশ মজাদার থাকে। আমার পড়তে কিন্তু বেশ লাগে। আবার অনেক অন্য বিজ্ঞাপনেও চোখ রাখি। সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং মনে হয় জ্যোতিষীদের বিজ্ঞাপনের বক্তব্যগুলো। কেউ হাত দেখে, কেউ কপাল দেখে, কেউ চোখ দেখে নাকি সব বলে দিতে পারে। ত্রিকালদর্শী, বশীকরণে সিদ্ধহস্ত, হরেকরকম কবচ। তবে সবচেয়ে বেশি আমায় আকর্ষণ করল মহানীল সরস্বতী কবচ। এটা নাকি নিলে বিদ্যায় মনযোগী হয়ে স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি পেয়ে পরীক্ষায় একশো শতাংশ কৃতকার্য হয়ে ভালো রেজাল্ট একবারে অবশ্যম্ভাবী। উফ! জাস্ট ভাবা যাচ্ছে না। দেখি, উচ্চমাধ্যমিকের আগে এরকম একটা সংগ্রহ করতে হবে। আবার অনেকে কাজ না হলে পয়সা ফেরতের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। সবাই যে যার মতো বিজ্ঞাপনে চমক দেবার চেষ্টা করেছে। হঠাৎ একটা বেশ অন্যরকম বিজ্ঞাপন আমার নজর কাড়ল। ‘প্ল্যানচেটে সামিল হতে চাইলে আসুন। প্ল্যানচেটের মাধ্যমে পৌঁছে যান এক অজানা অচেনা জগতে। কথা বলুন ওপারের আত্মার সাথে আর ফল পান হাতেনাতে। সত্বর যোগাযোগ করুন। সীমিত সিটের জন্য আগ্রিম বুকিং আবশ্যক।’ তারপর একটা মোবাইল নম্বর দেওয়া। আমি কেমন চমকে উঠলাম বিজ্ঞাপনটা পড়ে! গায়ের রোম খাড়া হয়ে উঠল। কী কাণ্ড! কলকাতার বুকে আজকাল এইসব হচ্ছে! কী দিনকালই না পড়ল। দিদিভাইয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হবে। আমার উত্তেজনা দেখেই মনে হয় দিদিভাই টের পেয়েছে।

“হুম। আমিও দেখলাম রে। তবে এত আশ্চর্য হবার কিছু নেই। কয়দিন আগে কিছু সাহসী মহিলা চাই বলে একটা বিজ্ঞাপন দেখা গেছিল।”

“কেন, পাহারা দেবার জন্য?”

“না, ছাদে জামাকাপড় মেলার জন্য। মাসমাইনে তিনশো টাকা।”

এত অবাক বোধহয় আমি জীবনে হইনি।

“কী বলছ!”

“আমার অনেক বন্ধুই শেয়ার করেছে ফেসবুকে। আমাকেও ট্যাগ করেছে। চাইলে দেখে নিতে পারিস। যাই হোক, আজ সন্ধে সাতটা নাগাদ ভদ্রলোক আসবেন। খেয়াল রাখিস কিন্তু।”

“হ্যাঁ, সে আর বলতে! তো কী বললেন উনি?”

“এলে উনি সবিস্তারে সব বলবেন। তখনই মন দিয়ে সব শুনিস। আমি বারোটার দিকে একটু  বেরবো। আমার এক পুরনো বন্ধুর সাথে দেখা করতে যাব। তা সাতটার আগে ঢুকে যাব নিশ্চয়ই। না এলে তুই ওঁকে বসিয়ে কেস ডিটেলগুলো নিতে শুরু করবি।”

এরপর দিদিভাইয়ের সাথে খানিক দাবা খেলে ওপরে গেলাম জেঠুর পেছনে লাগব বলে। একটু জোরে জোরেই কথাগুলো বললাম, “আবার আরেকটা কেস আসছে গো জেঠিমা।”

জেঠিমা ময়দা মাখা হাতে একেবারে ‘ববি’ সিনেমার স্টাইলে কপাল থেকে অবাধ্য চুলের গুছি সরিয়ে বলল, “সত্যি!”

“তা নয়তো কি মিথ্যে! এই তো ফোন এল। সন্ধেবেলা আসবেন আলাপ-আলোচনা করতে।”

আমি জানি আর দু-তিনটে ইনিয়ে বিনিয়ে তথ্য দিলেই জেঠিমার হাতের লুচি আর সাদা সাদা আলু-চচ্চড়ির মতো মহার্ঘ খাবার দিয়ে আমার প্রাতরাশটা নিশ্চিত হয়ে যাবে। জেঠু বাজার গেছিল বলে জেঠুর লেগ পুলিংয়ের অভিপ্রায়টা পূরণ হল না। কিন্তু জেঠিমা বড়ো একটা থালায় জামাই আদরের মতো করে গরম গরম ফুলকো লুচি, সাদা সাদা আলু-চচ্চড়ি ও পান্তুয়া সহযোগে পরিবেশন করল। চেটেপুটে জলখাবারটা খেয়ে আমি নিচে নেমে একটু পাজল খেলতে বসলাম। সবিস্তারে পরে সব তথ্য দেব, কথা দিয়ে এসেছি জেঠিমাকে।

সন্ধে সাতটা বাজার আধা ঘন্টা আগে কেমন উলোঝুলো চুলে কেমন ঘোর লাগা চোখে হন্তদন্ত হয়ে দিদিভাই ঢুকল। তার আধা ঘণ্টা বাদেই বেলটা বাজল। আমি দরজা খুলে দিলাম। ঋজু চেহারার এক দীর্ঘাঙ্গী ভদ্রলোক। চোখে রিমলেস চশমা। ফ্রেঞ্চ-কাট দাড়ি। কালো রঙের জিনসের ওপর কালো কটকি একটা পাঞ্জাবী। টিপিক্যাল বাঙালি আঁতেলদের চেহারা। আমি তো বেশ ইমপ্রেসড। কিন্তু শুধু চেহারা নয়, ওঁর কণ্ঠস্বর শোনার পর বুঝতে পারলাম দিদিভাইও মুগ্ধ। সত্যি বলতে কী, এমন কণ্ঠস্বর খুবই কমই শোনা যায়। পুরুষদের যেমন হওয়া উচিত—ভারিক্কী, ওজনদার গলাই শুধু নয়, তার সাথে আছে এক অদ্ভুত সম্মোহনী ক্ষমতা। মুগ্ধতার রেশ অতি দ্রুত কাটিয়ে করজোড়ে নমস্কার করে দিদিভাই ওঁকে বসার জায়গা করে দিল।

“হ্যাঁ হ্যাঁ, বসছি। তার আগে নিজের পরিচয়টা দিয়ে নিই। আমি এ.কে. গাঙ্গুলি। এ ফর অসিত আর কী। আমি একটা অদ্ভুত সমস্যায় পড়েছি, জানেন? এর ভূমিকা পর্ব অনেক আছে। আপনার তদন্তের খাতিরে যেমন যেমন প্রয়োজন হবে আমি বলতে থাকব। তবে টু কাট অ্যা লং স্টরি শর্ট আমার এক পিসিমাকে ডাইনি সন্দেহে পুরুলিয়ার এক গ্রামে পুড়িয়ে মারা হয়েছে।”

“কী বলছেন আপনি? খবরটা পেপারে দেখলাম কি! দু’দিন আগের ঘটনা? ওঁর সাথে ওঁর নাতনি থাকতেন মনে হয়।”

“এগজ্যাক্টলি সো! হ্যাঁ, ওঁর নাতনি থাকতেন ওখানে ওঁর সাথে, মানে আমাদের তিথি। তা মারা যেতে যেতে উনি নাতনিকে ওঁর অন্তিম শয্যায় ‘ভয় ভয়’ বলে কিছু বলে গেছেন। তা তিথির, মানে ওঁর নাতনির ধারনা সেটা নিছক ভয় অর্থে ফিয়ার নয়। অন্য কোনও গূঢ় রহস্য এর পেছনে রয়েছে। ভীষণ ডিস্টার্বড সেই কারণে। একে দিম্মাই ওর জগত ছিলেন।”

“সবার আগে আমায় বলুন যে পুরুলিয়ার ঐ প্রত্যন্ত গ্রামে আপনার পিসিমা ছিলেন কেন? বিবাহসূত্রে, নাকি অন্য কোনও কারণে?”

“না না, সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায়। বহু জায়গা… মানে জঙ্গলে বনে বিশেষত গ্রামগঞ্জ বন-পাহাড়ে ঘুরে ঘুরে বেড়াতেন উনি। বায়োলজির স্টুডেন্ট ছিলেন। তাছাড়াও ওঁর গাছগাছড়া নিয়ে পড়াশোনা এবং গবেষণার বিরাট পরিধি ছিল। আমার বিশ্বাস, মানে খানিকটা তিথির থেকে শুনেও আমার যা আন্দাজ যে ওইখানে মানে পুরুলিয়াতে ঐ বিশেষ জায়গায় কোনও দুষ্প্রাপ্য উদ্ভিদের বা অর্কিডের বেড়ে ওঠার পক্ষে নিশ্চয়ই কোনও অনুকূল বাতাবরণ পেয়েছিলেন।”

“পুরুলিয়ার কোন অঞ্চলটা আপনি কি স্পেসিফাই করতে পারবেন?”

“বড়ন্তি বলে একটা ট্যুরিস্ট স্পট আছে জানেন? ওটার কাছেই। পিসিমা নির্দিষ্ট যে জায়গায় বাস করতেন সেখানে আমি কখনও যাইনি। তবে তিথিকে একবার পৌঁছে দিতে এসে বড়ন্তির একটা গেস্ট হাউসে এসে একরাত কাটিয়ে গেছিলাম। পিসিমা ‘লাল পলাশ’ বলে গেস্ট হাউসটা থেকেই ওকে নিয়ে গেছিলেন।”

দিদিভাই ভুরু কুঁচকে কী যেন ভাবছিল। “তা তিথির সাথে কি দেখা করা সম্ভব? ওর সাথে কথা বলতে পারলে ভালো হত।”

“নিশ্চয়ই। সেইজন্যই তো আপনার কাছে আসা। শুধু ভয় শব্দটার রহস্যভেদ নয়, তার সাথে পিসিমাকে কেন কেউ বা কারা ডাইনি সন্দেহে মারল, কোনও ষড়যন্ত্র কি এর পেছনে আছে, থাকলে কে বা কারা এর পেছনে রয়েছে এবং তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া প্রয়োজন। আমি সবকিছুরই সরেজমিনে তদন্ত চাইছি।”

“আপনার পিসিমা ঐ জায়গাকে যে বেছে নিলেন তার বিশেষ কোনও কারণ নিশ্চয়ই আছে। সে বিষয়ে কিছু আলোকপাত করতে পারবেন?”

“আমি খুব বেশি জানি না, জানেন তো। কোনও উদ্ভিদ-সংক্রান্ত ব্যাপারই হবে। ওঁর কিছু গুপ্তবিদ্যা জানা ছিল। সেগুলো উনি অনুশীলন করতেন ঠিকই, কিন্তু সেগুলো ব্ল্যাক ম্যাজিক বলে আমার আদৌ মনে হয় না। তবে তিথি যেহেতু পিসিমার সাথেই থাকত, ও আরও কিছু সঠিক তথ্য আপনাকে সরবরাহ করতে পারবে বলে আশা করি। আপনি দেরি না করে কাল সকালেই চলে আসুন। অবশ্য আপনার যদি কিছু অসুবিধে না থাকে। কারণ, আপনি হয়তো কলকাতায় বসে পুরো তদন্তটা চালাতে পারবেন না। প্রয়োজনে পুরুলিয়াতে যেতে হতে পারে। ঐ লাল পলাশেই উঠবেন। আমি সব ব্যবস্থা করে দেব। খরচখরচা নিয়ে আপনি চিন্তা করবেন না। আপনি বললে এখনই ট্রেনে টিকিট বুক করে গেস্ট হাউস বুক করে দিতাম। এত তাড়াহুড়ো করছি কেন জানেন তো? হাতে গরম থাকতে থাকতে ঘটনাটার তদন্ত করতে আপনারই অনেক সুবিধে হবে। সময়ের সাথে সাথে অনেক প্রমাণই লোপাট হয়ে যায়। মানুষের স্স্মৃতিও ফিকে হতে থাকে। জানা দেখা ঘটনাও অনেক পল্লবিত হয়ে আপনার আমার সামনে উপস্থাপিত হবে। তার থেকে তখন সত্য উদঘাটনে আমাদেরই মুশকিলে পড়তে হবে। আর সত্যি কথা বলতে কী, তিথির নিরাপত্তা নিয়েও আমি খানিক চিন্তিত। যত তাড়াতাড়ি ব্যাপারটার নিষ্পত্তি হয় ততই মঙ্গল।”

“না, সেটা আপনি ঠিকই বলেছেন। যত তাড়াতাড়ি ঘটনাটার স্পটে গিয়ে পৌঁছতে পারব ততই সুবিধে  হবে তদন্ত করতে। ওঁর ঘরেও নিশ্চয়ই জিনিসপত্র আছে, তা থেকেও অনেক কিছু জানা সম্ভব।”

কেসটা যে বেশ জটিল এবং তার সাথে ইন্টারেস্টিংও তা আমি ভদ্রলোকের বাতচিত এবং  দিদিভাইয়ের মুখ দেখেই আন্দাজ করতে পারছিলাম। কথা বলতে বলতেই ওর মাথায় অজস্র সম্ভাবনার রেখা যে উঁকি দিয়ে যায় তা আমার থেকে ভালো আর কেউ জানে না। ওর মুখে সেই অভিব্যক্তির ঝলকানি বারবার দেখা যাচ্ছিল।

“আচ্ছা, আপনার পিসিমার কাছে কি অমূল্য কিছু রক্ষিত ছিল? মানে সেটা যে সোনাদানা গয়না বা হিরে মোহরই হতে হবে এমন নয়। কোনও দুষ্প্রাপ্য পুঁথি বা কোনও ভেষজ ওষুধের সন্ধান?”

“হতেই পারে। তবে এগুলোর ক্ষেত্রে উনি ভীষণ গোপনীয়তা রক্ষা করতেন। সবাইকে বলতেন না। উনি কীভাবে যে তিথিকে এই ব্যাপারে নির্বাচন করেছিলেন কে জানে!”

“আপনি একটা কাজ করুন, আপনি টিকিট কেটে আর গেস্ট হাউসটা বুক করে রেখে দিন। ঐ দুটো কনফার্মড হয়ে গেলেই আমরা বেরিয়ে পড়ব। তার আগে আগামীকাল সকালে আপনার বাড়িতে গিয়ে তিথির সাথে দেখা করাটা সবার আগে প্রয়োজন।”

“অবশ্যই। কাল সকালে আমি গাড়ি পাঠিয়ে দেব। আমাদের অনেক কালের পুরনো ড্রাইভার চন্দন আপনাদেরকে এসে নিয়ে যাবে। আমরা থাকি জি.এল.টি রোডের ওপরেই।”

“মানে গোপাল লাল ঠাকুর রোড। আমাদের এই পাইকপাড়া থেকে তো খুব বেশি দূরে নয়।”

“এগজ্যাক্টলি সো! মিনিট কুড়ি-পঁচিশের বেশি লাগার কথা নয়। অনেকদিনের পুরনো বাসিন্দা আমরা। এলাকায় প্রায় সকলেই আমাদের চেনে। গাঙ্গুলি ম্যানশনের এখনও একটা আলাদা ঐতিহ্য আছে। সকাল ন’টায় আমি গাড়ি পাঠিয়ে দেব। কথা বলতে বলতে আমাদের ওখানেই প্রাতরাশটা সেরে নেবেন।”

আরও এধার ওধার দু’কথা হয়ে ভদ্রলোক বিদায় নিলেন। আমি জানি এইবার দিদিভাই যাবতীয় সম্ভাবনা ভালো করে খতিয়ে দেখবে। নিখুঁতভাবে ওর হোমওয়ার্ক করে রাখার চেষ্টা করবে। বলা যায় না, পুরুলিয়া যাবার আগেই হয়তো অর্ধেক রহস্যের সমাধান হয়ে গেল!

আমার মনের ভাবনাটা বোধহয় দিদিভাই পড়তে পারল।

“না রে, না। অতও সহজ নয়। গুপ্তবিদ্যা, গোপনভাবে চর্চা, কেসটা বেশ ভোগাবে মনে হচ্ছে।”

“ভোগাবে!”

“ব্রেন-স্টর্মিংয়ের প্রয়োজন আছে রে। মাথায় শান দে, মাথায় শান দে। রিস্কও নেহাত কম নেই কেসটাতে। বুঝলি!”

তা বুঝতে আমার ভারি বয়েই গেছে। দিদিভাই থাকতে আমার আবার চিন্তা কী?

দুই

বলতে গেলে ন’টা বাজার দশ মিনিট আগেই চন্দনদা গাঙ্গুলিবাড়ির গাড়ি একটা দুধ সাদা আরটিগা নিয়ে হাজির। দিদিভাইও খেয়াল করেছে ব্যাপারটা।

“হাই টাইম, বাঙালিদের সময়জ্ঞান নিয়ে বদনামটা ঘোচা দরকার।”

না না, এই মন্তব্যটা দিদিভাইয়ের নয়। স্বয়ং জেঠু উবাচ! ওপরের বারান্দা থেকে দেখে কথাগুলো বললেন। আমি আর দিদিভাই চোখ চাওয়াচাওয়ি করলাম। জেঠিমা তো ছুটে এসে বারান্দায় মেপে নিচ্ছিল কী গাড়ি, কোন মডেল, কী রং তার। গাড়ি দেখে মক্কেলের অর্থনৈতিক অবস্থা সম্বন্ধে কতটা আন্দাজ করা যায় সে নিয়ে অন্দরমহলে মায়ের সাথে একপ্রস্থ জোর আলোচনা হয়ে যাবে, এ আমি নিশ্চিত।

আমরা আর দেরি করলাম না। চন্দনদা বেশ ভালো ড্রাইভার দেখা গেল। অলিগলির ভেতরে এত সুন্দর গাড়ি ঘোরাচ্ছিল যে তার হাতের তারিফ না করে পারা যায় না। দিদিভাই মোবাইল দেখল। মিনিট পঁচিশের মাথায় আমরা গাঙ্গুলি ম্যানশনের সামনে এসে হাজির হলাম। তা অট্টালিকাই বটে। ঢোকার মুখে শান বাঁধানো রাস্তার দু’পাশে সুন্দর বাগান। হরেক ফুলের বাহার। বাগানের মাঝে গোলাকার একটা বসার জায়গাও রয়েছে যেটা আমার ভীষণ পছন্দ হয়েছে। দিদিভাই টের পেয়ে বলল, “বাগানের পেছনের বাঁদিকের কোণে খেয়াল কর। একটা দোলনাও আছে।”

তাই তো! তাতে একটা মেয়েও বসে আছে। আমি গলা নিচু করে বললাম, “তিথি?”

মাথা হালকা করে নেড়ে পূবালী দাশগুপ্ত তার সহকারী অহনা দাশগুপ্তকে (অর্থাৎ কিনা আমাকে) নিয়ে ঘরে ঢুকল। বেশ বড়ো একটা হলঘরে আমাদের বসানো হল। কার্পেটে মোড়া মেঝে। দু’দিকে বিলাসবহুল সোফা-সেট আর একদিকে বড়ো ডিভান। মেরুন রঙের ভেলভেটে মোড়া চারটে তেপায়া টুল। দেয়ালে দেয়ালে সুদৃশ্য অয়েল পেন্টিং। একটা অয়েল পেন্টিং মাইকেল এঞ্জেলোর বলে আমি চিনতে পারলাম। একটু অবাকই হলাম। কোনও বাঙালির বাড়িতে এর আগে আমি কখনও মাইকেল এঞ্জেলো দেয়ালে শোভা পেতে দেখিনি। আমরা ঘরে ঢুকতেই অসিতবাবু সাদরে আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন। “আসুন, আসুন। বসুন। যা গরম পড়েছে! মুকুন্দ, দু’গ্লাস শরবত নিয়ে এসো তো!”

“বাগানে কি তিথিকে দেখলাম?”

“হ্যাঁ। ও আপনাদের জন্যই অপেক্ষা করছিল। দাঁড়ান, ডেকে দিচ্ছি।”

উনি বেরোলে আমি আবার ঘরটাকে ভালো করে দেখে নিলাম। ঢুকেই ঘরটার বাঁহাতে এককোণে একটা বিশাল মাটির কারুকার্য করা কলসি। তাতে বালি-পাথর দিয়ে ভর্তি করে একগোছা ময়ূরের পালক রাখা। তবে সেটা কথা নয়। আমার যেটা দৃষ্টি আকর্ষণ করল, কলসিটাতে মিশরীয় সব দেবদেবীর ছবি আঁকা। যেমন আনুবিস, রা, আইসিস, অসিরিস, হরাস ইত্যাদি। আবার নন্দলাল বসুর আঁকা ছবিও দেয়ালে শোভা বর্ধন করছে। আমি লক্ষ করলাম, দিদিভাইয়ের একটা বিশেষ পোর্ট্রেটের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ। সাবেক আমলের কোনও এক বিদেশি ভদ্রলোকের ছবি। আমি ঠিক চিনতে পারলাম না।

এইসবের মাঝেই অসিতবাবু তিথিকে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। তিথি মিষ্টি করে হাসল। তিথিকে দেখে আমার  কেমন একটা লাগল। তারপর বুঝতে পারলাম, সে বাংলায় কথা বললেও, সালওয়ার কামিজ পরে থাকলেও তার চেহারায় এক অদ্ভুত বিদেশি ছোঁয়া। কথাতেও হালকা টান আছে। আমি এটার জন্যও একদমই প্রস্তুত ছিলাম না। দিদিভাই দেখলাম হঠাৎ বলে উঠল, “আপনার পিসিমা কি…”

“হ্যাঁ, আমার পিসিমা বিদেশে গবেষণা করতে গিয়ে ওঁর প্রোফেসর হেনরি অ্যালবটকে বিয়ে করেন। ওঁর  মেয়ে বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেন, আর ওঁর জামাই বহুকাল নিরুদ্দেশ। তবে ওঁর জামাইও ভারতীয় বংশোদ্ভূত। তাই তিথি ওর দিদার কাছেই মানুষ। শেষকালে শিকড়ের টানে নাকি অন্য কোনও কারণে জানি না আমার পিসিমা তিথিকে নিয়ে কলকাতা চলে আসেন। বছর দুয়েক অনেক জায়গা ঘুরে ঠিক করেন যে শেষমেশ পুরুলিয়াতেই আস্তানা করে থাকবেন। তার আগে অবশ্য তিথিকে দার্জিলিংয়ের এক কনভেন্টে ভর্তি করে দেন। আবার কী মনে করে বছর দুয়েক আগে ওকে পুরুলিয়াতে নিজের কাছে নিয়ে এসে রাখেন।”

“তা এই ছবিটা কি তিথির দাদুর?”

“হ্যাঁ, একদম ঠিক ধরেছেন।”

“তিথির কীরকম বয়স হবে?”

“এই আঠারো-কুড়ি হবে। ক্লাস টেন অবধি পড়িয়ে তো পুরুলিয়াতে নিয়ে চলে গেলেন।”

“কিন্তু আমি ওখানেও একটা স্কুলে পড়তাম। আমাকে সব দিদিমণিরা অনেক সাহায্যও করত।” পরিষ্কার বাংলায় বলে উঠল তিথি।

“তাই নাকি, তিথি? তুমি ওখানে লেখাপড়া ছাড়া আর কী করতে?” দিদিভাই কেস নিজের হাতে নিয়ে নিল।

“বল, বল। সবকিছু পরিষ্কার করে বল ওঁকে।”

“আমাকে দিম্মা অনেক কিছু পড়াত। অনেক গাছগাছড়া চেনাত। আর হপ্তায় একদিন আইওয়াস্কা সেশন হত।”

দিদিভাই দেখি একহাত আরও সোফায় এগিয়ে বসে জিজ্ঞেস করল ভুরু কুঁচকে, “মানে তুমি কি শামামদের সেই পানীয়র কথা বলতে চাইছ যা খেলে নানারকম ভিশন আসে? অনেকে মনে করেন আধ্যাত্মিক দরজা খুলে যায়।”

“এগজ্যাক্টলি সো। আমাকেও তাই বলেছে। স্পিরিচুয়াল অ্যাওকেনিং হয়।”

“বানানটা  হচ্ছে, এ ওয়াই এ এইচ ইউ এ এস সি এ (Ayahuasca)।”

সপ্রশংস দৃষ্টিতে চাইলেন দিদিভাইয়ের দিকে অসিতবাবু। বিগলিত হাসি হেসে বললেন, “এই জন্যই আপনার কাছে যাওয়া। আপনি তো আবার প্যারানর্মাল ব্যাপার-স্যাপারে বেশি পারদর্শী।”

“কিন্তু তিথি আমাকে বলো, পুরুলিয়াতে এই গাছ হত?”

“হ্যাঁ, দিম্মা সারা ভারত ঘুরে দেখে যে পুরুলিয়ার মাটিতে আর একরকম মাটি মিশিয়ে দিলে এই গাছ হওয়া সম্ভব। আর পুরুলিয়াতে তো ছোটো ছোটো পাহাড় অনেক আছে। একটা পাহাড়ের গায়ে আমরা থাকতাম, আর সেখানেই দিম্মা সব গবেষণা চালাত। এছাড়াও আরেকরকমের একটা রেয়ার উদ্ভিদের সন্ধান পেয়েছিল ওখানে দিম্মা।”

আমি কীরকম দ্রব হয়ে শুনছিলাম। যেন অন্য কোনও জগতে এসে পড়েছি।

“তো সেখানে কি গ্রামের লোকেরাও অংশ নিত এই সেশনে?”

“প্রথমে দু-চারজন। পরে বেড়েছিলও। তাতেই গণ্ডগোলটা পাকাল।”

“কীরকম সময় হত?”

“এই দুপুর দুপুর নাগাদ শুরু হত।”

দিদিভাইয়ের ভুরুটা কি ভীষণ কুঁচকে গেল?

“ওই পানীয় সেবন করার পর গ্রামবাসীরা কীরকম রিয়াক্ট করত?”

“ওই কেউ হাঁটাচলা করত। কেউ বা শুয়ে পড়ত। আবার কেউ বমি করতে শুরু করত।”

“আর তোমার দিম্মা?”

“দিম্মার তো মেন কাজটা তখন শেষ। এবার ওরা যা ভিশন দেখবে, আর যদি কেউ অসুস্থ বোধ করত তাদের একটু দেখাশনার ব্যাপার থাকত।”

মৃদু স্বরে উনি গান গাইতেন বা মন্ত্র উচ্চারণ করতেন কি?”

একটু দ্বিধান্বিত হয়ে তিথি উত্তর দিল, “কই, না তো!”

“তা ওটা খাওয়ার পর অদ্ভুত অভিজ্ঞতার ফলে সবাই ডাইনি সন্দেহ করতে লাগল?”

“ঠিক তাই। আসলে প্রথমে যারা গ্রুপে ছিল তারা দিম্মাকে ভীষণ ভালোবাসত। ভক্তিশ্রদ্ধা করত। মান্যি করত। ফলে দিম্মা যেমন বলত, অক্ষরে অক্ষরে তা পালন করত। প্রথমে যা হয়, আমারও বমি হত। তারপর ডাইরিয়ামতো হয়ে গেছিল। মানসিক অবসাদ। ক্লান্তি। তবে এই সবই স্বাভাবিক। কিছুদিন বাদে একটু ধাতস্থ হলে এই পানীয়টার বেনেফিট পুরোপুরি নেওয়া যায়। আর আমি যেমন দিম্মাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করি, ভরসা করি, কিছু এমন অনুগত মানুষ আছে যারাও নিজের থেকেও দিম্মাকে বেশি ভালোবাসত। কিন্তু পরে আরও কয়েকজন কাকুতি মিনতি করে ঢুকল। তবে তারা সবকথা শুনত না। কানেই নিত না। অদ্ভুত সব দৃশ্য দেখবে বলে বেশি করে খাবার ফলে ঐ যে অজ্ঞান হয়ে পড়ল, আর জ্ঞান ফিরল না।”

“তারপরই গ্রামের লোক খেপে গেল, আর দিম্মাকে আক্রমণ করল?”

“হ্যাঁ,” বলে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল তিথি। তারপর ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলেছিল, “আমার দিম্মা কত কষ্ট করে ঐ গাছ করেছিল জানো না। প্রতিদিন আমরা দু’জনে মিলে কত যত্ন করতাম। মংলুকে দিয়ে শহর থেকে দিম্মা কতরকমের সার আনাত। জল দিত। মাটি কোপাত। সারাদিন ঐ নিয়ে পরে থাকত।”

“কিন্তু আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি, পুরুলিয়ার মাটিতে বানিস্তেরিওপ্সিস কাপি ভাইন!”

“বাবার মুখে শুনেছি, ছোটোবেলা থেকে পিসির অমন স্বভাব।”

দিদিভাইয়ের মুখায়ব বলে দিচ্ছে ও অসিতবাবুর কথা অত গুরুত্ব দিয়ে শুনছে না। ওর মাথায় তখন অন্য চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। চিন্তান্বিত মুখে ও ফের তিথির দিকে ফিরে বলল, “কিন্তু তিথি, আমি যতদূর জানি আজাওয়াস্কা পানীয় প্রস্তুতের জন্যও সঙ্গে আরেকরকম উদ্ভিদের পাতা মেশানো হয়। যেমন চাক্রুনা বা  চ্যাগ্রপঙ্কা, মানে ডিএমটি আছে এমন উদ্ভিদশ্রেণী।”

“হ্যাঁ, না হলে এর এফেক্টটা  পাওয়া যায় না।”

অঢেল গোয়েন্দা বই পড়ার জন্যও আমারও একটু জ্ঞান আছে। “তাহলে কি এটাও হ্যালুসিনোজেন ড্রাগ?”

“বলতে পারিস। মূল উপাদান হল, ব্যানিস্তেরিওপ্সিস কাপি ভাইন, আর সাইকিত্রিয়া ভারদিস পাতা। প্রথমটা মনো অ্যামাইনো অক্সিডেজ ইনহিবিটার। অন্যটা ডাইমিথাইল ট্রিপ্টামাইন। আর বেশি জ্ঞানের কচকচি করলে ভালো লাগবে না।”

শুনে আসলে এত উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলাম! আমরা মূল সমস্যায় ফিরে আসি।

“আমাকে সব খুলে বলো, তিথি। এই আইজাওয়াস্কা সেশনে তোমাদের কী হত? তুমি কি কিছু দেখতে পেতে?”

“খেলে সবাই কিছু না কিছু দেখতে পায়।”

হঠাৎ একটা পেন্টিংয়ের দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে দিদিভাই বলল, “ঐটা মনে হচ্ছে পেরুর বিখ্যাত শামাম, পাবলো আমারিঙ্গোর আঁকা ছবি।”

উজ্জ্বল হয়ে উঠল তিথির মুখটা। “ঠিক ধরেছ।”

আমার কৌতূহল তখন তুঙ্গে। দিদিভাই মাথা নেড়ে আমাকে ইঙ্গিত করল আমি যেন কাছে গিয়ে আঁকাটাকে ভালো করে দেখি। আমি এগিয়ে গিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম।

অদ্ভুত রঙিন এক ছবি। তাতে নানাধরনের পশুপাখি চিত্রার্পিত। একদম ওপরে গাছের ডালে একপাল রঙিন ম্যাকাও পাখি। তার তলায় এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত একসারি বাঁদরের যাতায়াত। মধ্যে মধ্যে গাছগুলোর ফাঁক দিয়ে চেয়ে আছে কালো কালো প্যান্থার। চোখজোড়া তাদের গাঢ় হলুদ। একদম তলায় রয়েছে সরীসৃপ জাতীয় প্রাণী। সেগুলো এমন আলপনার আঙ্গিকে আঁকা যে ধরা মুশকিল। বাঁদিকের ওপরে আবার একটা ক্যাসেল নজরে পড়ল যার দিকে একটা উড়ন্ত ভ্যাম্পায়ার জাতীয় প্রাণী ধাবমান। তার তলা দিয়ে বহতা নদী যার ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে এক ডানাওয়ালা নারী। মাথায় তার মুকুট। একদম ডানদিকের তলায় দেখলাম অজস্র লতাপাতার আড়ালে একটা জলাশয়। তাতে একটা পানকৌড়ির মতো পাখি। কিছুদূরেই একগাদা ছোটো ছোটো মাছ আর কিছু ছোটো কচ্ছপমত মনে হল।

এরকম অভিনব স্টাইলে আঁকা এর আগে আমি কখনও দেখিনি। আর্টিস্টের সিগনেচার স্টাইলকে কুর্নিশ জানাতেই হয়। আমি হতবাক হয়ে তিথির দিকে চেয়ে বলি, “তোমরা বুঝি এইসব দেখ আইওয়াস্কা সেশনে?”

“আরও অনেক কিছু দেখি। ওঁর এরকম আরও অনেক আঁকা আছে। তবে প্রথম সেশনেই সবাই এরকম দেখতে পায় না। ধৈর্যও লাগে। ভালো শামাম লাগে। বা যে ঠিক জানে কোন অনুপাতে কোনটা কতটা দিতে হবে। নাহলে অনেকরকম সাইড এফেক্টও হয়ে যায়!”

আমার মতো পূবালী দাশগুপ্তও প্রচণ্ড মন দিয়ে শুনছে। “তা ওখানে কি তোমার দিম্মা সব অ্যারেঞ্জ করতেন?”

“হ্যাঁ। তার আগে অনেক কিছু মাথায় রাখতে হত।”

“কীরকম? আমি যতদূর জানি যারা শামাম হিসেবে নিযুক্ত হন তাদের উদ্ভিদ, ভেষজ জ্ঞান অপরিসীম হয়। বাইরে থেকে দেখে হয়তো বোঝা যায় না, কিন্তু কোন গাছের কী উপকারিতা এবং তার কী প্রয়োগ তারা এ ব্যপারে সিদ্ধহস্ত। তারা এতটাই এই সেশন করে করে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে যে তারা সেশনের মধ্যে দিয়ে গেলেই তাদের গাইড করার জন্য কোনও পাখি বা পশুকে পেয়ে যায় স্পিরিচুয়াল গাইড হিসেবে যারা তাকে ঐ স্বপ্নবৎ পথে সাহায্য করে। তাদের মনস্কামনা পূর্ণ করে। যেকোনও কৌতূহল মেটায়।”

“কেউ কেউ আবার এই আধ্যাত্ম-জগতে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠার জন্য কোনও ক্ষমতাশালী বস্তু বা পাওয়ার অবজেক্টের সাহায্য নেয়। যেমন কোনও ক্রিসটালের বল, চুম্বক, গুচ্ছ পালক বা হাড়ের মূর্তি। সেগুলো দিম্মা একটা গুপ্ত পকেটে আমায় দিয়ে দিয়েছিল।”

“তুমিও তো অংশ নিতে, তাই না!”

“হ্যাঁ। আমার তো কিছুটা পারিবারিক সূত্রে পাওয়া। আর দিম্মা আমায় রোজ মেডিটেশন,  যোগ ব্যায়াম, রেওয়াজ সব করাত যাতে আমার মাথার সেলগুলো আস্তে আস্তে সব খুলে যায়।”

আমার ব্যাপারটা খুব একটা বোধগম্য হল না। দিদিভাইয়েরও দেখলাম ভুরুটা খুব কুঁচকে গেল।

“এই বিশেষ কাজটার জন্যই কি তোমার দিম্মা তোমাকে দার্জিলিং থেকে নিয়ে চলে এসেছিলেন?”

“হ্যাঁ। আমার অনেক কাজ এই পৃথিবীতে। আমায় অনেকটা পথ যেতে হবে। কিন্তু মারা যাবার আগে দিম্মা ‘ভয় ভয়’ কেন বলল? কী বলতে চাইল? আমার না জানা অবধি কোনও শান্তি নেই।”

“আমরা প্রাণপণ চেষ্টা করব, তিথি। কাল আমরা পুরুলিয়ার ঐ জায়গায় যাব। সরেজমিনে গিয়ে দেখে আসব ব্যাপারটা কী। নিশ্চয়ই কোনও না কোনও ক্লু ওইখানে লুকিয়ে আছে। তুমি আমাদের সাথে যাবে নাকি?”

হঠাৎ অসিতবাবু ছটফট করে উঠলেন। “না না, ওকে দরকার নেই। নিন, আপনারা শরবতটা খেয়ে নিন। গরম হয়ে যাবে যে! যা গরম পড়েছে তাতে আর কোনও কিছুতে যেন স্বস্তি নেই। নে তিথি, তুইও নে।”

শরবতের কাচের গ্লাসটা সাবধানে তুলতে তুলতে তিথি বলল, “দিম্মা যাবার আগে আমাকে কতগুলো জিনিস দিয়ে গেছে। নিজের হাতে সিক্রেট একটা পকেট করে দিয়েছিল। সেগুলো খুব যত্ন করে রাখতে বলেছিল দিম্মা। সেগুলো দেখলে কি তুমি কিছু বলতে পারবে?”

“হ্যাঁ, নিশ্চয়ই পারবে তিথি। আমরা ওপরে যাব। ঘুরে ঘুরে পুরো বাড়িটা দেখাব। সবার সাথে আলাপ করে তোমার ঘরে যখন যাব তখন তুমি দেখিও। আসলে এগুলো আসার পরেই করা উচিত ছিল। কিন্তু ও এত টেনসড হয়ে আছে যে প্রথমে আপনার সাথে কথা না বলে স্বস্তি পাচ্ছে না।”

আমিও লক্ষ করছিলাম, তিথির ভেতর একটা চূড়ান্ত অস্থিরতা। আমি বুঝতে পারছিলাম যে ওর ওপর একটা গূঢ় দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাই ও ছটফট করছে দিম্মার ঐ শেষ কথাগুলোর অন্তর্নিহিত বক্তব্যটা জানার জন্যও।

কথাটা আমিই তুললাম। “আচ্ছা তিথি, তুমি ভয় অর্থে ফিয়ার বা প্রাণের ভয়-সংশয় এগুলো ভাবছ না কেন?”

উদাস দুটো চোখ তখন ডানা মেলল। “দিম্মাকে নিয়ে কম্বল মুড়ি দিয়ে টানতে টানতে যখন পুকুরপাড়ে এলাম, দিম্মা তখন অল্প অল্প কথা বলতে পারছে। মংলু আমাদের খুব বিশ্বস্ত। ও পুকুর থেকে বালতি করে জল নিয়ে ক্রমাগত ঢালছে। আমি মুখে চোখে জল দিয়ে একটু জল খাওয়ালাম। দিম্মা কেবল আমাকে তখন বলার চেষ্টা করছে, পালা—পালা। আসলে ওরা যে আমাকে তখন খুঁজতে বেরিয়েছিল। মংলু ওদের হাবভাব দেখে সন্দেহ করাতে আমাকে ইস্কুলে খবর পাঠিয়েছিল। আমি তাড়াতাড়ি বেরিয়ে লুকিয়ে চুরিয়ে অন্য পথ দিয়ে এসেছি। কিন্তু ইস্কুলে গিয়ে না পেলে শেষে আমাদের ডেরায় এসেই ভিড়বে। তাই দিম্মা কেবল বলছিল, পালা, যা যা পালা, পালা। শিগগিরি পালা।

“ক্রমে উত্তেজিত লোকজনের আওয়াজ কাছে আসছিল। হাতে যে অস্ত্রশস্ত্র থাকবে তাতে আর আশ্চর্য কী! দিম্মার তখন শেষ অবস্থা। কেবল হেঁচকি তুলছে। আমি থেকে থেকেই জল খাওয়াচ্ছি। বুকটা আমার ফেটে যাচ্ছিল। দিম্মা ছাড়া আমার আর তেমন আপনার কেউ নেই।”

গলাটা ধরে এল তিথির। একটু গলাটা ঝেড়ে নিয়ে ফের বলল, “আর সময় নেই দেখে মংলু ছুটে একটা ব্যাগ এনে দিল আর ঠিক বিদায় নেবার সময় হাত নেড়ে ডেকে তখন দিম্মা অনেক কষ্ট করে বলল, ভয়-ভয়। তারপরেই ভীষণ হেঁচকি উঠতে লাগল, আর পরমুহূর্তেই সব শেষ।”

একটা পিন পড়লেও মনে হয় তখন ঘরে আওয়াজ হত। আমরা সবাই অত্যন্ত মনোনিবেশ করে তিথির কথা শুনছিলাম।

অসিতবাবুই মৌনতা ভঙ্গ করলেন। “চলুন, ওপরেই আমাদের ডাইনিং স্পেস। ওখানে একটু জলখাবারের ব্যবস্থা করেছি। ওপরের ঘরগুলোও ঘুরে ঘুরে দেখবেন। আমার বাবা আপনার সাথে সাক্ষাৎ করার জন্যও খুব উদগ্রীব। বছর দুয়েক প্যারালেটিক হয়ে আছেন। নাহলে নিজেই নিচে এসে পরিচয় করতেন। বাবা বসে থাকলে কী হবে! প্রচুর পড়াশোনা করেন। পেপার-ম্যাগাজিন-জার্নাল। উনিই আমাকে আপনার কথা বললেন।”

কাচের গ্লাসটা টেবিলে রেখে দিদিভাই প্রশ্ন করল, “বাই দ্য ওয়ে, আপনাদের কি ওষুধ নিয়ে কোনও কারবার আছে? আমি এসে থেকে দেখছি অনেক মেডিক্যাল জার্নাল আর পেটি পেটি ওষুধ এককোণে পাইল করে রাখা আছে।”

“হ্যাঁ, আমাদের তিন পুরুষের ওষুধের ব্যাবসা। শুনে থাকবেন হয়তো, নীরোগ মেডিকেলস।”

“মানে আপনারা বেসিক্যালি ওষুধ প্রস্তুতকারক।”

“একগাল হেসে অসিতবাবু বললেন, “এগজ্যাক্টলি সো। আমাদের ডানকুনির দিকে নিজস্ব কারখানা আছে।”

“আচ্ছা, আচ্ছা। আপনি নিশ্চয়ই একা এই বিরাট কর্মকাণ্ডটাকে সামলাতে পারেন না?”

“না, না। আমার একার দ্বারা তো একেবারেই হয় না। যতদিন বাবা কর্মক্ষম ছিলেন, চিন্তা ছিল না। কিন্তু তারপরই মুশকিল হয়ে গেল। আমার কাকার ছেলে মৃদুল আমার ডানহাত। ভীষণ বিশ্বাসী আর ছোটো থেকে আমাদের বাড়িতেই মানুষ। এছাড়া আমাদের কারখানার ম্যানেজার বিমলবাবুও এই বাড়িতে থাকেন। উনিও আমার বাবার আমল থেকে আছেন। কোম্পানির যাবতীয় দায়িত্ব একাই প্রায় কাঁধে করে বয়ে বেড়াচ্ছেন বলতে পারেন। এছাড়া কারখানার বিভিন্ন কর্মীরা তো আছেনই।”

“এই প্রকাণ্ড বাড়িতে আর কে কে থাকেন?”

“আমাদের বহুদিনের পুরনো পরিচারক মুকুন্দদা, বাহাদুরচাচা আর ওদের পরিবার। আমার জন্মের আগে থেকে আছেন বাহাদুরচাচা। আগে ওঁর বাবা নিজে দায়িত্ব নিয়ে সব করতেন। এখন উনি সব করেন নিষ্ঠা সহকারে।”

“ওঁরা কি বাড়ির একতলার পেছনদিককার ঘরগুলোয় থাকেন?”

“একজ্যাক্টলি সো! এছাড়া বাগানের মালি, ড্রাইভার চন্দনদা থাকেন ওঁর স্ত্রী ও এক মেয়ে নিয়ে। চলুন, বাবার কাছে নিয়ে যাই। উনি অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছেন।”

ওঁর ঘরের দিকে এগোতে এগোতে একটা চাপা শোরগোলের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম। একটা কথা কাটাকাটির আওয়াজ। এক বৃদ্ধের গলার স্বর শুনতে পাচ্ছিলাম। “তাই বলে তুমি যা খুশি তাই করে বেড়াবে?”

“আমি তো কারুর ক্ষতি করছি না।”

“সব বাড়ির একটা রীতিনীতি আছে।”

“যদি বলি এইটাই  আমার হবি বা শখ।”

“এই বাড়িতে থেকে এইসব চলবে না।”

শেষের কথাগুলো অত্যন্ত উচ্চৈঃস্বরে বলা হল। অসিতবাবু একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। আমাদের ইশারায় দাঁড়াতে বলে অসিতবাবু এগিয়ে গিয়ে পর্দা ঠেলে ওঁর বাবার ঘরে ঢুকলেন। মিনিট খানেকের মাথায় বেরিয়ে এসে বললেন, “চলুন, আমরা খাবার টেবিলে যাই। বাবা ওখানেই আসছেন। আর সবাইকেও বলে দিচ্ছি। জলখাবার খাওয়ার সাথে সাথে আলাপটাও সেরে নেওয়া যাবে।”

বাঁদিকে একটা বাঁক নিয়েই আমরা একটা প্রকাণ্ড হলঘরের মতো জায়গায় এলাম। সবাই মিলে খেতে বসার রেওয়াজ আছে দেখলাম। মুকুন্দদা প্রায় রেডি হয়েই ছিলেন। ওঁর সাথে মনে হল ওঁর স্ত্রী আছেন সাহায্য করার জন্যও। কথায় কথায় জানলাম মুকুন্দদার স্ত্রী আর বাহাদুরচাচার স্ত্রী আর চন্দন্দার স্ত্রী মিলেই গোটা বাড়ির রান্নাবান্না আর ঘর-গৃহস্থালির কাজ সামলান।

টেবিলে বসেই গরম গরম আলুর পরোটার সুগন্ধে খিদেটা যেন দ্বিগুণ হয়ে গেল। তার সাথে বেগুন-ভর্তা আর আচার আর কাঁচা পেয়াজ। আমি একটু খেতে ভালোবাসি, তাই টেনশনে পড়ে গেলাম যে খাবার টেবিলে এর আলাপপর্বে আমি কতটা মনোযোগ দিতে পারব। কিন্তু কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা যে হতে চলেছে তা বলাই বাহুল্য।

আমরা অপেক্ষা করছিলাম। অসিতবাবুর বাবা অর্থাৎ অখিলবাবু হুইলচেয়ারে করে এলেন। উনি নিজেই চালিয়ে এলেন। ব্যাপারটা সত্যি আমার মনে দাগ কেটে গেল। বাড়িতে এত লোকলশকর থাকতেও উনি স্বাবলম্বী হওয়া পছন্দ করেন। নিজের কাজ নিজে করেন। আসতেই পূবালী দাশগুপ্ত করজোড়ে নমস্কার জানাল। উনি প্রতিনমস্কার করে আমাদের বসতে বললেন। তারপর একে একে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। বাঁদিকে একজন মাঝবয়সী ভদ্রলোক আসন গ্রহণ করলেন। তাকে অখিলবাবু পরিচয় করিয়ে দিলেন কোম্পানির ম্যানেজার বিমলবাবু হিসেবে। একটা খদ্দরের পাঞ্জাবী আর পাজামা পরে ছিলেন। মাথায় ঈষৎ টাক। কিন্তু চুল দিয়ে এমনভাবে ঢাকা যে ‘ওরা থাকে ওধারে’ কথাটা মনে পড়ে যাচ্ছিল। অমায়িক এক হাসি হেসে আমাদের নমস্কার জানালেন। ওঁর পাশে এসে বসলেন বছর পঁয়ত্রিশের এক ভদ্রলোক। বুঝতে পারলাম, ইনিই অসিতবাবুর কাকার ছেলে মৃদুলবাবু। অসিতবাবুর সাথে চেহারার আদলে মিল আছে। খানিক বাদে এক ভদ্রমহিলা এগিয়ে এলেন তিথি আর এক ছোটো ছেলেকে নিয়ে। অখিলবাবু পরিচয় করিয়ে দিলেন, “আমার বউমা অর্থাৎ অসিতের স্ত্রী, জাগরী। আমার নাতি অভিরূপ আর তিথির সাথে তো আপনাদের আলাপ হয়েই গেছে।”

জাগরীদেবী খাওয়ার দিকটা পুরো সামলালেন। ওঁকে আরও দু’জন ভদ্রমহিলা সাহায্যও করলেন। একজনের মুখের ধাঁচ দেখে বোঝা যাচ্ছিল যে তিনি নেপালি। বলা বাহুল্য, উনি বাহাদুরচাচারই স্ত্রী হবেন।

গরম গরম আলুর পরোটার সাথে সুস্বাদু বেগুন-ভর্তা খেয়ে সত্যি মনটা ভালো হয়ে গেল। সঙ্গে গ্লাসে করে ঘোলও ছিল দোকানে যেটাকে বাটার মিল্ক বলে দেয় মহা আড়ম্বরে।

হালকা আলাপ আলোচনা চলছিল। বর্তমান হালচাল, বাজারের দাম-দর, পার্টি-পলিটিক্স, আইপিএল নিয়ে আলোচনা গড়াচ্ছিল। আমি কান পেতে শুনছিলাম আর খেয়াল করছিলাম যদি অখিলবাবুর সাথে তর্করত ব্যক্তির সন্ধান করতে পারতাম গলার স্বর শুনে! কিন্তু এখানে সবাই এত ভদ্রভাবে মোলায়েম স্বরে কথা বলছিলেন যে আমি ঠিক ঠাওর করে উঠতে পারলাম না।

তারপরই একটা আশাপ্রদ খবর শোনালেন অসিতবাবু। “হোটেলের ঘর কনফার্ম হয়ে গেছে। ঐ লাল পলাশ-এই পেয়ে গেছি। তোমরা চাইলে কালকেই আমাদের গাড়ি করে রওনা হয়ে যেতে পার। ট্রেনে করে যাবার দরকার নেই। ডাইরেক্ট একেবারে আমাদের গাড়ি নিয়ে চলে যেও।”

দিদিভাইয়ের ইচ্ছে ছিল তিথিকে নিয়েই যায়। কিন্তু অখিলবাবু রাজী হলেন না। “আর রিস্ক নিতে চাই না, বুঝলে পূবালী ম্যাডাম। কোনও অঘটন ঘটে গেলে নিজেকে একদম ক্ষমা করতে পারব না।”

দেখলাম তিথিও ভয় পাচ্ছে ঐ জায়গায় পা দিতে। তবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিল। “আমার মোবাইল নম্বরটা তুমি রাখো, পূবালীদি। কোনও অসুবিধে হলে বা কিছু জানতে হলে আমায় ফোন করবে। আমার দ্বারা যতটা হবে আমি সাহায্য করব।”

এতক্ষণ কথাবার্তায় বাড়ির সবার সাথেই আমরা মোটামুটি স্বছন্দ হয়ে গেছি। সবাই আমাদের তুমি তুমি সম্বোধনেই নেমে এসেছে।

“তোমাদের সঙ্গে না হয় অসিত যাবে।”

“না, বাবা। আমার কালকে একটা জরুরি মিটিং অ্যাটেন্ড করতে হবে বেঙ্গল চেম্বার অফ কমার্সে। মৃদুল না হয় যাক।”

মৃদুলবাবুও যেন আপত্তি জানালেন। “কিন্তু আমারও যে একটু কাজ ছিল।”

একটু হুকুমের সুরেই এবার অখিলবাবু বললেন, “সে-কাজ না হয় পরে হবে, মৃদুল। তুমি কাল ওদের সঙ্গেই যাবে। সক্কাল সক্কাল বেরিয়ে পড়ো। আমাদের ড্রাইভাররের হাত খুব ভালো। ঘণ্টা চার সাড়ে চারের মধ্যে ঢুকিয়ে দেবে তোমাদের বড়ন্তিতে। একটু রেস্ট নিয়ে চান-খাওয়া করে একটু বেড়িয়ে ঘুরে আসতে পারবে। স্পটটা দেখে একটা আন্দাজ নিয়ে চলে এসো। যা করার পরদিন দিনের আলো থাকতে থাকতে  করো। রাতবিরেতে কিছু হলে সামলানো যাবে না। সারাদিনে যদি না হয়, পরদিন সকালে কাজ করে দুপুরে খেয়ে রওনা হয়ে যেতে পারবে। আমাদের গাড়ি সঙ্গে থাকলে তোমাদের সুবিধে হবে। যখন যেখানে যেমন যেমন চাও নিয়ে যাবে চন্দন তোমাকে। আর মৃদুল তো রইলই। ও ওখানে বেশ কয়েকবার গেছে।”

সেই মুহূর্তে তিথি বলে উঠল, “ওখানে আমাদের বাগানটা, গাছগুলো কেমন আছে জানাবে? ওগুলোই যে আসল। বারবার দিম্মা বলে দিয়েছে। মংলুকেও বারবার বলে দিয়েছিল গাছগুলোর যত্ন নেওয়ার কথা।”

“নিশ্চয়ই তিথি, আমি আমার মোবাইলে ছবি তুলে এনে তোমাকে দেখাব।” আমি আশ্বস্ত করতে চাই ওকে। ঘাড় কাত করে মিষ্টি করে হাসল তিথি।

তিন

সকাল ছ’টা নাগাদ আমরা বেরিয়ে পড়েছিলাম। চন্দনদার সময়ানুবর্তীতায় আমরা এমনিই আগে থেকে  মুগ্ধ। হাতও বড্ড ভালো। আরও একবার তার মসৃণ গতিতে চালানোর প্রশংসা না করে পারা গেল না। দিল্লি রোডের ওপর দিয়ে যখন গাড়ি চলছিল মৃদুমন্দ হাওয়ায় শরীরটার সাথে সাথে মনটাও যেন জুড়িয়ে গেল।

মৃদুলবাবু গুনগুন করে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইছিলেন। আমি আর দিদিভাই উৎসাহ দিতে গলা ছেড়ে উদাত্ত স্বরে গেয়ে উঠলেন। সুর-জ্ঞান তাল-জ্ঞানের সাথে গলাটাও উল্লেখযোগ্য রকমের ভালো। পূবালী দাশগুপ্ত বলে উঠল, “আপনাদের প্রত্যেকের গলার ভলিউম এবং মড্যুলেশনে একটা অন্যরকম মাত্রা আছে। জিনঘটিত খুব সম্ভবত।”

“তা বলতে পারেন। গান আমাদের রক্তে। গলাও কমবেশি সবারই ভালো। গান গেয়ে বৃষ্টি নামানোর উৎকৃষ্ট উদাহরণ আছে আমাদের এই পরিবারে, বুঝলেন ম্যাডাম?”

আমি তো শুনে তাজ্জব বনে গেছি। দিদিভাইও চমৎকৃত। “বলেন কী! এ তো যে-সে ঘটনা নয়!”

“তবে আর বলছি কী, ম্যাডাম? একসময় নিয়মিত রাগ-প্রধান সঙ্গীতের তালিম নিতাম।”

“তা ছেড়ে দিলেন কেন?”

“ছেড়ে পুরো দিইনি। মিউজিক থেরাপির ওপর কিছু কাজকর্ম করি।”

কথা বলতে বলতে শক্তিগড় চলে এল। আমরা প্রথম থামলাম শক্তিগড়ে। সেখানে ব্রেকফাস্টটা সারা হল। গরম গরম কচুরি, তরকারি আর অপরিহার্য ল্যাংচা সহকারে। শক্তিগরের ল্যাংচার মহিমার কথা আর কেই বা না জানে! প্রতিবার গিয়ে খাওয়াটাও যেমন রেওয়াজ হয়ে গেছে তেমনি ‘ধুর! এদের মান খারাপ হয়ে গেছে। এর আগে আগে খেয়েছিলাম, যা স্বাদ ছিল না! এখনও জিভে লেগে আছে—এই বলাটাও একটা অলিখিত নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে আমাদের মধ্যে কেউ আর ঐ রাস্তায় হাঁটলাম না। খিদের মুখে জমিয়ে খেয়ে গাড়িতে চেপে বসলাম।

আমার বা দিদিভাইয়ের চায়ের নেশা নেই। কিন্তু মৃদুলবাবু আর চন্দনদা চা পান করলেন ছোটো ছোটো ভাঁড় থেকে। এই ফাঁকে দিদিভাই নেমে দুটো বিসলেরির জলের বোতল আর খান চারেক বিস্কুটের প্যাকেট কিনে নিল। ফের দ্রুতগতিতে আমরা গাড়ি চালিয়ে লাল পলাশে যখন পৌঁছলাম তখন ঘড়িতে কাঁটায় কাঁটায় বাজে এগারোটা পঁয়তাল্লিশ।

পলাশগাছে তখন আর তেমন গুলঞ্চ চোখে পড়ল না। তবে কটেজগুলো বেশ মনোরম। আমার আর দিদিভাইয়ের একটা। আর মৃদুলবাবুর পাশেরটা। সুন্দর সুসজ্জিত একটুকরো বাগানের মাঝে একেকটা কটেজ। নরম গদির বিছানার পাশে লাগোয়া ছোট্ট ক্যাবিনেট। ড্রেসিং টেবিল কাম আলমারির পাশে পোর্টেবল একটা টিভিও মজুত। বাথরুমেও শাওয়ার, গিজার, সাবান, তোয়ালে সব উপকরণই যখন রয়েছে আমি কাল বিলম্ব না করে আগেভাগে স্নানটা সেরে নিলাম। দিদিভাইয়ের অফুরন্ত সুগন্ধীর ভাণ্ডার থেকে বেছে দুটো নিয়ে এসেছিল। তাই থেকে একটা নিয়ে নিজেকে সুরভিত করতে করতে আয়না দিয়ে আড়চোখে খেয়াল করলাম, দিদিভাই মোবাইলে নেট থেকে কী একটা ডাউনলোড করে নিয়ে এসেছে, মন দিয়ে সেটাই পড়ছে। আয়নার প্রতিচ্ছবিতে যা বুঝলাম, একগাদা আজগুবি মার্কা উদ্ভিদের ছবি এবং সেগুলো কোনও পটু হাতের আঁকাও নয়। তার পাশে কিম্ভূতকিমাকার ভাষায় কীসব লেখা। কী লিপি ওটা কে জানে!

আমি প্রমাদ গুনলাম। আবার বুঝি মাথার পোকাটা কিলবিল করে উঠেছে। উদ্ভিদ নিয়ে পড়াশোনা যে এই কেসের জন্যও জরুরি তা তো বোঝাই যাচ্ছে। তাই বলে যেটা বোধগম্য নয় তা পড়ে কী জ্ঞানের ভাণ্ডার বাড়বে তা তো বুঝলাম না। বেশি ঘাটিয়ে তবে লাভ নেই। ওর মুখচোখ দেখেই বুঝতে পারছি, ও তন্ময় হয়ে ঐসব আজগুবি জিনিস দেখে চলেছে। আমি একটা ফ্রেশ জামার সেট বার করে পরে বের হব স্থির করলাম। কটেজটার চারপাশটা একটু ঘুরে দেখব।

ছিটগ্রস্ত হলে কী হবে মেয়ে আমার হাবেভাবে ঠিক টের পেয়েছে। “এখন সময় নষ্ট করলে চলবে না। এত তাড়াতাড়ি নিশ্চয়ই তোর কচুরি-তরকারি-ল্যাংচা হজম হয়ে যায়নি। চট করে একটু ঘুরে আসাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে বলে আমার মনে হয়। আমি যা সন্দেহ করছি তাই যদি হয় তাহলে কম করে একটা আধটা নমুনা তো পাবই। সেইজন্য ভালো করে গাছপালাগুলো দেখে নিলাম।”

ঐ আজগুবি লিপির মতোই সবই দুর্বোধ্য ঠেকল আমার কাছে। কিন্তু জানি সময় হলে দিদিভাইই পরামর্শ দেবে কোনটা পড়তে হবে আর কী নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে। এসব নিয়ে আমার আপাতত মাথা ঘামিয়ে লাভ  নেই। কেস সলভ করতে এসে যে টুক করে একটা ছোটো আউটিং হয়ে গেল, আমি এই আনন্দেই বেশ মশগুল। কিন্তু দিদিভাইয়ের পায়ে তো জিন লাগানো। এক্ষুনি ছুটতে হবে।

দিদিভাই হোটেলের ম্যানেজারের সাথে কথা বলে একটু ডিরেকশন নেওয়ার চেষ্টায় ছিল। মৃদুলবাবু যদিও এর আগে একবার জায়গাটায় গেছেন, তবুও দিদিভাই তিথির ইস্কুল, পোস্ট অফিস, হাসপাতাল এইসবের খোঁজখবর করছিল।

বেরিয়ে লোকজনকে জিজ্ঞেস করতে দেখলাম ব্যাপারটা নিয়ে কেউ মুখ খুলতে রাজি নয়। কেমন এর ওর মুখ চাওয়াচাওয়ি করে ঘটনাটা এড়িয়ে যেতে চাইছে।

মৃদুলবাবুর ডিরেকশনে আর তিথির কথা অনুযায়ী আমরা নির্দিষ্ট একটা জায়গায় এসে পৌঁছলাম। সেখানে একটা বাঁশের দরমা দেওয়া একটা বাগান দেখে দিদিভাইয়ের চোখদুটো দেখলাম চকচক করে উঠল। সে দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে পটাপট বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে বেশ কয়েকটা ছবি তুলে নিল। তারপর মোবাইল খুলে  কীসব দেখে দেখে মিলিয়ে নিল। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “ভয় ভয় মানে ভয়নিচ ম্যানুস্ক্রিপ্ট, বুঝলি মিঠি? বাড়ি গিয়ে গুগল সার্চ মেরে ভালো করে পড়াশোনা করবি।”

আমি তো পূবালী দাশগুপ্তের হাবভাব দেখে যাকে বলে চমকে চ, ঘেঁটে ঘ। ততক্ষণে অবশ্য মংলু এসে হাজির হয়েছে। বেঁটেখাটো মানুষটার মুখে সারল্যের কোনও অভাব নেই। কথা শুনে বুঝলাম তিথির দিম্মার প্রতি আনুগত্যেরও শেষ নেই। বহু মানুষকে উনি ওঁর ভেষজ ওষুধের দ্বারা রোগমুক্ত করে তুলেছেন।

দিদিভাই ঠিক করল গ্রাম পঞ্চায়েতের সাথে কথা বলবে। চন্দনদা আর মৃদুলদা মংলুকে সঙ্গে করে গোটা গ্রামটা ঘুরে বেশ কিছু মানুষকে জড়ো করেছে যারা কোনও না কোনও সময়ে দিম্মার কাছে উপকৃত। সংখ্যাটা নেহাত কম নয়। সেই দলে মংলুর মাও ছিল। দিদিভাই তাকে একটু আলাদা ডেকে এনে জিজ্ঞেস করল, “আপনি তিথির দিম্মাকে চিনতেন?”

“হ্যাঁ, আমি প্রথম থেকেই ওঁর দেখাশনা করতাম। ঘরদোর সাফ করা, রান্না করা, জামাকাপড় কাচা। আমাদের দিদিমণি তো লেখাপড়া গাছ-লতা-পাতা-শেকড়-বাকড় নিয়েই ব্যস্ত থাকত। এটার সাথে ওটা মেশাচ্ছে। এটা  পোড়াচ্ছে, তো অন্যটা কাঠের জ্বালে তাতাচ্ছে।”

“আবার কখনও কখন দুটো তিনটে মিশিয়েও তো করতেন!”

“ঐ যেদিনকে সেশন থাকত। সেদিন সকাল থেকে খুবই ব্যস্ততা। প্রথম প্রথম দূরে দূরে গিয়ে কোথা থেকে নিয়ে আসত। তারপর অনেক চেষ্টাচরিত্র করে এখানে গাছ ফলাল।”

“দূরে দূরে বলতে কথায় যেতেন?”

“সে কি আর আমায় বলে যেত? চার-পাঁচদিনের জন্যও গিয়ে সব গাছপাতা সংগ্রহ করে আনত। ধীরে ধীরে মংলু, আমি, ইস্কুলের এক মাস্টারমশাই, এক দিদিমণি—সব যোগ দিলাম।”

“তাই নাকি! ঐ পানীয়টা কে তৈরি করত?”

“ঐ দিদিমণিই করত। শেষ দু’বার ট্রেনিং দেবার পর তিথি-মাও বানিয়েছে।”

“বলেন কী!”

“তা নয়তো কী! কিন্তু আমরা যা দেখি, ওরা কিন্তু আরও অন্যকিছু দেখে। দিদিমণি বলে দিত, একমনে চিন্তা কর, ঠিক বুঝতে পারবি। ঠিক বুঝতে পারবি। তারপরই ওকে এক-দু’দিনের মধ্যে যা দেখত লিখে ফেলতে হত। দিদিমণিও লিখত কীসব ডায়রিতে।”

“তা আপনারা কী দেখতেন?”

“প্রথম প্রথম তেমন কিছু দেখতে পেতাম না। পরে আস্তে আস্তে দেখতাম কেমন সব গাছপাতা। ঘন বন। কেমন আজব আজব প্রাণী। গিরগিটির মতো। সাপের মতো। সরসরিয়ে গাছপালার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। তবে প্রথমে একটুখানি দেখার পরই বমি হত। পানীয়ের অনুপাতটাই সাংঘাতিক ব্যাপার। এধার ওধার হলেই হল।”

“ওই জন্যেই তো!” দিদিভাই কথাটা কেড়ে নিল। “আর কী দেখতেন?”

“শেষেরটায় কেমন একটা আজব মানুষকে দেখেছিলাম। ছোটো। বেঁটেপারা। এটুকখানি। এত বড়ো মাথায় শুধু এত্ত বড়ো বড়ো চোখদুটা দেখা যায়। আবার অনেকে নিজেদের মৃত আত্মীয়স্বজনদেরও দেখতে পায়।”

কেমন আশ্চর্য হয়ে ভুরু কুঁচকে দিদিভাই বলল, “তা কতদিন ধরে তুমি এই আইওয়াস্কা সেশন করছ?”

“হ্যাঁ, হ্যাঁ। দিদিমণি ঐ কথাই বলত বটে! আইওয়াস্কা সেশান। তা দিদিমণি যবে থেকে এসেছে। বছর তিন-চার হবে।”

“এইখানে এইসব গাছপালা ফলল কী করে—এ এক তাজ্জব ব্যাপার।”

“ঐ দিদিমণি বলে পেরেছে। অন্য কেউ পারবে না। সার, মাটি, জল সব দেওয়া ছাড়াও আরও একটা বিদ্যা দিদিমণি জানত। ভগবান জানে কী করে পারত। এখানে যখন রুখা-সুখা জমি হয়ে যেত তখন ভোর রাত্তির থেকে গান করে তানপুরায় বৃষ্টি নামাত।”

আমার একে বিস্ময়ের সীমা ছিল না। তারপর এটা শুনে আমি একেবারে তাজ্জব বনে গেলাম। আমি একমাত্র এই ঘটনা তানসেনের জীবনীতে পড়েছিলাম। কিছু দুর্বৃত্ত ঈর্ষান্বিত হয়ে সম্রাট আকবরের কানে তুলেছিলেন যে তানসেন দীপক রাগ গেয়ে সম্রাটের দরবারের সব প্রদীপ জ্বেলে আলোকিত করে তোলার ক্ষমতা রাখেন। তাদের অভিসন্ধি ছিল যদি তানসেন না পারেন তাহলে তিনি অত্যন্ত সাধারণ মানের এক গায়ক বলে সবাইকে মেনে নিতে হবে। আর যদি চেষ্টাও করতে যান দীপক রাগ গাইবার, তাহলে তানসেনের শরীরে এত তাপ সঞ্চারিত হবে যে উনি নিজেই পুড়ে মারা যাবেন। সম্রাট আকবর স্বয়ং যখন এই আহ্বান জানান, তানসেন উপেক্ষা করতে পারেন না। কিন্তু তিনি জানতেন এই রাগ গাইলে অবশ্যই উনি পুড়ে মারা যাবেন। এটা রোধ করার একমাত্র উপায় রাগ মেঘমল্লার গেয়ে যা অবিলম্বে বৃষ্টি নামাবে। তানসেন নিজের কন্যাকে এ রাগের তামিল দিয়েছিলেন। তাই তার ওপরই ভার পড়ল নির্দিষ্ট দিনে এই রাগ গাইবার। দরবারের সমস্ত শ্রোতা শুনল এবং দেখল কীভাবে দীপক রাগ গাইবার সাথে সাথে তাপমাত্রা বাড়তে লাগল। অচিরে তেলের প্রদীপ জ্বলে উঠল। তুমুল তাপমাত্রায় আর দাবদাহে যখন চারপাশ জ্বলছে তখন তানসেনের কন্যার মেঘমল্লার রাগের দরুন আকাশ কালো করে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল। ভারতীয় সঙ্গীতের কী ঐতিহ্য, কী মহিমা যা কিনা প্রকৃতিকেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে! সেই মেঘমল্লার রাগ! আমার যেন গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল।

“আমার দুর্ভাগ্য এমন মহীয়সীর সাথে সাক্ষাত হল না। অকালে কিছু মূর্খ লোকের জন্য প্রাণ দিতে হল। কী অপূরণীয় ক্ষতি তা কল্পনাও করা যায় না।” দিদিভাই দুঃখ প্রকাশ করল। “তা উনি কি রোজ নিয়মিত রেওয়াজ করতেন?”

“হ্যাঁ। কোনদিনও ভুল হত না। কী সুরেলা কণ্ঠ ছিল! দেবী সরস্বতী যেন গলায় বসে আছেন। নাতনিকেও তালিম দিতেন।”

মৃদুলবাবু ততক্ষণে গ্রাম পঞ্চায়েতের সাথে কথা বলার অনুমতি নিয়ে এসেছেন। দিম্মার ঘরের চাবি যদিও মংলুর কাছেই গচ্ছিত, তবুও দিদিভাই কোনও রিস্ক নিল না। ওঁর খাস লোককে সঙ্গে নিয়েই আমরা দিম্মার ঘর খুললাম। খুলেই আমি হতবাক। এমন মাটির লেপা দেওয়ালের ভেতর যে এক স্বারস্বত সাধনার এমন ছবি দেখতে পাব সত্যিই তা আমি আশা করিনি। উদ্ভিদবিজ্ঞানের বই তো ছেড়েই দাও, রসায়ন বিজ্ঞানের বইও কিছু কম নেই। কত ছোটো ছোটো পাত্রে কত না গাছের চাড়া। আবার অগণিত বীজ সামলে পরিষ্কার করে রাখা আছে। প্রভূত বই এবং বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম একটা কাঠের র‍্যাকে শোভা পাচ্ছে। গাদা করা কাগজপত্র, কিছু ডায়েরিও আমার নজর এড়াল না। একটা বাঁশের দরমা দিয়ে ভাগ করা যার একদিকটা রান্নাঘর আর অন্যদিকটা শোয়ার স্থান। শোয়ার ঘরের এককোণে হ্যাজাক, লন্ঠন, ভারী টর্চ মজুত। যদিও ইলেক্ট্রিসিটি আছে, কিন্তু প্রায়শই লোডশেডিং হয়ে যায়। বাথরুম ঘরের সংলগ্ন নয়। একটু দূরে। অদ্ভুত একটা গন্ধ নাকে কেবল ঝাপটা মারছিল। কোনও কেমিক্যাল বিক্রিয়ার যেমন হয় অনেকটা সেই গোছের।

দিদিভাইয়ের ইশারায় আমি ডায়েরিটা আমার জিম্মায় রাখলাম। অনেক ফাইল-কাগজপত্রও রয়েছে যেগুলো দিদিভাই দেখার লোভ সামলাতে পারছে না জানি। তাই ও মৃদুলবাবুর অনুমতি নিয়ে দেখেশুনে কতগুলো ফাইল তুলে নিল। দেখতে দেখতে খেয়াল করলাম একটা জায়গায় কেমন থমকে গেল। মুখে বিড়বিড় করল, “চারশো আট।”

এটার যে কী তাৎপর্য সেই মুহূর্তে আমি বুঝতে পারলাম না। তবে নজর করলাম, ঘরের এক কোনায় তানপুরাটাও যেন বিষণ্ণভাবে দাঁড়িয়ে আছে। সেও যেন আকস্মিক এই ঘটনায় শোকাহত, মর্মাহত। অত্যন্ত গুণী এবং বিদুষী মহিলা ছিলেন এবং বিদগ্ধ পড়াশোনায় যে ডুবে থাকতেন—এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

তিথির দিম্মা সম্বন্ধে আমার ভারি কৌতূহল হচ্ছিল। কেমন দেখতে ছিলেন কে জানে।

ঠিক সেই সময় মংলু কোত্থেকে একটা ছবি এনে দেখাল। “এই যে আমার বড়ো দিদিমণি আর ছোটো দিদিমণি।”

দিদিভাই মনে হল ছবিটা অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে দেখল। মোবাইলে স্ক্যান করে একটা ছবিও তুলে নিল। আমিও হাতে নিয়ে দেখলাম। এত যে কী দেখার আছে তা বুঝলাম না। আগের ছবি মনে হয়। তিথি তখন বেশ রোগা ছিল। এমনিতে ছবি দেখে অনেককেই সামনাসামনি মেলানো যায় না। আর তিথির সাথে  তো প্রথম সাক্ষাৎ, আর কয়েক ঝলকের দেখা।

ছবি নিয়ে গবেষণা করতে-করতেই দিদিভাইয়ের মোবাইল বেজে উঠল। আমি দিদিভাইয়ের দিকে এগিয়ে গেলাম। ব্যাগ থেকে মোবাইলটা বের করতে না করতেই খেয়াল করলাম যে এটা একটা আননোন নাম্বার। সোয়াইপ করে কানে ফোনটা ধরতেই এক লহমায় দিদিভাইয়ের মুখের চেহারা পুরো বদলে গেল। রাগে শুধু কান নয়, ওর চোখমুখও লাল হয়ে উঠেছে। প্রচণ্ড রেগে গেছে কোনও কারণে। ফোনটা কেটে যেতেই আমায় মুঠোফোনটা দিল নম্বরটা নোট করার জন্য। পরে খোঁজ নিতে হবে কোথা থেকে ফোনটা এল। আর কেই বা করল। কী বলল সেটা ঠিক সবার সামনে জিজ্ঞেস করা সমীচীন হবে কি না বুঝতে পারলাম না। তবে ফোনটা দিদিভাইয়ের মনে আলোড়ন তুলেছে, এটুকু বুঝতে পারছিলাম। খুব নিচু গলায় আমায় বলল, “শিগগিরি বাগানের কতগুলো ছবি তোল তো! কী কী গাছ আছে না আছে তা জানা দরকার। আর বাড়িটার চারদিকেরও যা পারিস ছবি তুলিস। কাম অন, হারি! খুব বেশি সময় নেই আমাদের হাতে।”

এই ‘সময় নেই’ কথাটা যে কেন বলল তা ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। তবে এরকম সময় আমি ওর আদেশ পালন করি, কোনও প্রশ্ন করি না। ওর থেকে আমার মধ্যেও একটা উত্তেজনা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে যাচ্ছে। আমি বুঝতে পারছি, দিদিভাই কিছু একটা ঘটনা ঘটার অপেক্ষায় আছে। তবে সময় নষ্ট না করে আমি বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে ছবি তুলতে লাগলাম। ততক্ষণে পূবালী দাশগুপ্ত ঘরের ভেতর সবকিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল। তারপর ও বেরিয়ে এসে মংলুকে জিজ্ঞেস করল, “তিথি যে ইশকুলটায় পড়ত সেটা কতদূর? আমি ইস্কুলটা একবার দেখতে চাই।”

“মৃদুলবাবু  মনে হয় ধারেকাছেই ছিলেন। “চলুন, লজে গিয়ে খাওাদাওয়াটা সেরে নিই। তারপর না হয় যাওয়া যাবে।”

দিদিভাইয়ের প্রস্তাবটা যে খুব একটা পছন্দ হয়নি তা আমি ওর মুখচোখ দেখেই আন্দাজ করতে পারছিলাম। মৃদুলবাবুও একটু ধরতে পারলেন মনে হয়। “আসলে রাস্তাটা তো ভালো নয়। তাই ওরা একটু আগে ঘুরে দেখে আসুক।” বলেই চন্দনদার দিকে ইশারা করলেন।

“আজ্ঞে, আমি দেখে আসছি। আগে আপনাদের লজে পৌঁছে দিই।”

দিদিভাইয়ের প্রস্তাবটা মোটেই মনঃপূত হয়নি তা আমি পরিষ্কার বুঝতে পারছিলাম।

লজে ফিরে এসে দিদিভাই টকাটক করে ল্যাপটপে কাজ করতে শুরু করে দিল। মৃদুলবাবু একটু বাদেই এসে জানতে চাইলেন খাবারের কী অর্ডার হবে। আমি দিদিভাইয়ের দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাতেই দিদিভাই বলল, “যেটা সবচেয়ে তাড়াতাড়ি হবে সেটাই।”

আমিই বা পিছিয়ে থাকি কেন! আমিও আমার অ্যানড্রয়েডে ভয়নিচ ম্যানুস্ক্রিপ্ট সার্চ করতে বসলাম।

এমন একটা অদ্ভুতুড়ে বই যে আছে তার কথা তো আমি ঘুণাক্ষরেও জানতাম না। আর কী আজব তার হরফগুলো! এগুলো দেখে আমি তো কিছুই বুঝব না। তাবড় তাবড় রথীমহারথীরা মানে উদ্ধার করতে পারল না তো আমি কোন ছাড়! আমি এর ইতিহাসের দিকেই মন দিলাম।

এই অদ্ভুত হাতে লেখা পাণ্ডুলিপিটা কার্বন ডেটিংয়ের সাহায্যে মনে করা হয় ১৪০৪ থেকে ১৪৩৮-এর মধ্যে ইতালীয় রেনেসাঁস যুগে লেখা। ১৯১২ সালে উইলফ্রেড ভয়নিচ নামে পোল্যান্ডের এক বই ব্যবসায়ী এই বইটি ক্রয় করেন। সেই ভদ্রলোকের নামেই এই পাণ্ডুলিপির নামকরণ যার এখনও দুশো চল্লিশটা পাতা অক্ষত। আমরা যেমন বাঁদিক থেকে লেখা শুরু করি, তেমনি এই বইটির লেখাও বাঁদিক থেকে ডানদিকে গেছে। অজস্র ছবি হচ্ছে এই বইয়ের বাড়তি আকর্ষণ। অগুনতি কোড ব্রেকার, ক্রিপ্টোগ্রাফার—হাজার চেষ্টা করেও এর অর্থ বা লিপি উদ্ধার করতে পারেনি। তাই একে ঘিরে আরও বেশি রহস্য এবং উন্মাদনার সৃষ্টি হয়েছে। শুধু উদ্ভিদের ছবি নয়, নভোমণ্ডল-রাশিচক্রের বিচিত্রসব চিত্র রয়েছে। অনেকেই মনে করেছেন যে হয়তো ছোট্ট মাইকেলাঞ্জেলোর লেখা, কেউ মনে করেন এডওয়ার্ড কেলি। কিন্তু সেরকম প্রমাণ কারুর হাতেই নেই। আর এই অদ্ভুত লিপিও উদ্ধার হয়নি। স্বল্প পরিসরে যা পড়লাম তা জেনে আমি বেশ চমৎকৃত হলাম। তারপরেই আমাদের খাবার ডাক পড়ল।

ভাত, পাতলা মুসুর ডাল, বেগুনি আর দেশি মুরগির ঝোল খেয়ে আমরা দ্রুতগতিতে গাড়ি  করে স্কুলের দিকে রওনা হলাম। মিনিট পাঁচেকও হয়নি যখন আবার একটা ফোন আমাদের আন্দোলিত করে তুলল। প্রথমে মৃদুলবাবুর  কাছে এল। মৃদুলবাবু প্রায় আর্তনাদ করে উঠলেন, “কী বলছ, দাদা! সে কি! কখন? কীভাবে? এ যে ভাবতেই পারছি না। এবার কী হবে?”

তারপরই মনে হয় দিদিভাইকে চাইলেন। দিদিভাই হাতে ফোনটা নিয়ে সরাসরি জিজ্ঞেস করল, “তিথি কি আপনাদের বাড়ি থেকেই কিডন্যাপ হয়েছে?”

আমি অবাক হয়ে গেলাম। মৃদুলবাবু কিন্তু কথার ফাঁকে একবারও দাঁতের ফাঁক দিয়ে উচ্চারণ করেননি যে তিথিকে কিডন্যাপ করা হয়েছে। আমি পূবালী দাশগুপ্তের এ হেন দূরদর্শিতায় সত্যিই মুগ্ধ। আবার স্তম্ভিতও!

গাড়িটা ঘোরাতে বলেছেন ততক্ষণে মৃদুলবাবু। সোজা লজে গিয়ে জিনিসপত্র তুলে ফিরে যাব। ওঁকে দেখে সত্যিই খুব উদ্বিগ্ন মনে হল।

দিদিভাই কিন্তু তৎক্ষণাৎ বাধা দিল। আমিও আশ্চর্য হয়ে গেলাম।

“কিডন্যাপ তো হয়েই গেছে। আমি একবার ইস্কুলটা ঘুরে দেখে যেতে চাই।”

মৃদুলবাবুর চোখেমুখে বিরক্তির ছাপ সুস্পষ্ট। আমিও দিদিভাইয়ের হাবেভাবে বেশ অবাক। ও তো এরকম অমানবিক কাজকর্ম কখনও করে না! কী, হলটা কী ওর?

কিন্তু খানিক দূর গাড়িটা ফের ইস্কুল-পানে যেতেই আরেক বিপত্তি। বিশাল একটা গাছ পড়ে পথ অবরুদ্ধ। দিদিভাইয়ের ইস্কুল-দর্শনের এখানেই ইতি। কেন যে গাছ পড়ে তার কিন্তু কোনও সদুত্তর খুঁজে পাওয়া গেল না। তুমুল ঝড়ে গাছ উপড়ে পড়েছে সে সম্ভাবনা নেই। আর শুধুমুধু গাছ কাটা তো বেআইনি!

অগত্যা গাড়ি লজের দিকে ঘুরে দুরন্ত গতিতে ছুটছে। মিছিমিছি কিছুটা মুল্যবান সময় নষ্ট। তবে আমি লক্ষ করলাম দিদিভাইয়ের ভুরু বেশ খানিকক্ষণ ধরে কুঁচকেই আছে। ও গভীরভাবে কিছু চিন্তা করে যাচ্ছে। ইস্কুলে কি সত্যিই কোনও প্রাকৃতিক কারণে যেতে পারল না? নাকি যেতে দেওয়া হল না? তা নিয়ে আমারই মনটা কেমন খচখচ করতে লাগল।

ফেরার সময় বলতে গেলে দিদিভাই একটা কথাও বলল না। খানিক বাদে দেখলাম অন্যমনস্ক হয়ে জানালা দিয়ে তাকাল। তারপর মোবাইলে ইন্টারনেট খুলে কীসের সব তত্ত্বতালাশে মেতে উঠল। ফিরতি পথে যখন আবার গাড়িটা শক্তিগড়ে থামল, খেয়াল করলাম দিদিভাই সবার থেকে একটু তফাতে গিয়ে বেশ কয়েকটা ফোন করল এবং কথা বলল অত্যন্ত মৃদুস্বরে। ঠিক সেই সময় কে যেন তাক করে দিদিভাইয়ের ফোনটায়  ঢিল ছুড়ল। আমি রীতিমতো শূন্যে লাফিয়ে শুয়ে পড়ে মাটিতে হাত পেতে ফোনটাকে রক্ষা করলাম। এত আচমকা ঘটনাটা ঘটল যে দিদিভাইও হতচকিত। পরক্ষণেই আমার দিকে তাকিয়ে একটা উজ্জ্বল চাউনি দিল, সেটা কতকটা ভালোবাসার, কতকটা কৃতজ্ঞতার। কিন্তু এইখানে কে দিদিভাইয়ের ক্ষতি করতে চাইবে সেটাই আমি ভেবে ভেবে আকুল। সে যে বা যারাই হোক তারা আমাদের গতিবিধির ওপর শ্যেনদৃষ্টি রাখছে, এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

মৃদুলবাবু এবং চন্দনদাও ছুটে ছুটে এসেছেন। তবে শেষপর্যন্ত যে দিদিভাইয়ের মোবাইলটা অক্ষত আছে, সেটা দেখে সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। আমিও ফাঁকতালে কিছু বাহবা কুড়িয়ে নিলাম। কিন্তু প্রশংসার শেষ বাক্যটা দিদিভাইই বলল, “সাধে কি আর অলিম্পিকসে শুধু মেয়েরাই মেডেল আনছে! তোর এই অসাধারণ ক্যাচ দেখলে মহিলা ইন্ডিয়ান ক্রিকেট টিমের কোচও তোকে লুফে নিত।”

এত বড়ো একটা সার্টিফিকেট পেয়ে দিদিভাইয়ের কাছ থেকে আমার বেশ লজ্জা-লজ্জাই করছিল। কিন্তু দিদিভাইয়ের মোবাইলে কী এমন আছে যে কেউ সেটা হাতিয়ে নিতে চাইছে? অথবা ক্ষতি করার এত আগ্রহ! মোবাইল আক্রমণ নিয়ে দিদিভাই যতটা চিন্তিত ততটা কিন্তু তিথির কিডন্যাপ নিয়ে নয়। বাইরের লোক বুঝতে না পারলেও এইটা আমি ঠিক টের পেয়েছি। যেন ও জানতই তিথি অপহৃত হবে।

আর কোথাও না দাঁড়িয়ে আমরা সোজা গাঙ্গুলি ম্যানসনে এলাম। ম্যানসনের পরিবেশ স্বাভাবতই থমথমে। অসিতবাবু যা মুষড়ে পড়েছেন দেখলাম, তবে ওঁর বাবাকে দেখে সত্যি বোঝা যাচ্ছিল যে উনি যথার্থই ব্যথিত। ওঁর ঘরে ঢুকে ওঁর অবস্থা দেখে পূবালী দাশগুপ্ত আর কোনও প্রশ্ন করল না। চুপ করে মাথা নিচু করে বসে ছিলেন। দুয়েকবার মৃদু নাক টানার আওয়াজও যেন পেলাম। ওঁর কষ্টের অনুভূতিটা আমাদের মধ্যেও সংক্রমিত হচ্ছিল। অখিলবাবুকে দেখে বেশ অসহায় লাগল।

আমার কী মনে হতে তিথির ফোন নাম্বারে একটা ফোন করলাম। ক্ষীণভাবে দূর থেকে আওয়াজটা পাচ্ছিলাম। তার মানে মোবাইলটা বাড়িতেই আছে। আমরা ধীর পদক্ষেপে ওঁর ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দিদিভাই অসিতবাবুকে জিজ্ঞেস করলেন, “কখন ঠিক ঘটল ঘটনাটা?”

“আরে আপনারা তো জানেনই যে ও গাছপালা কীরকম ভালোবাসে। আর গাছপালাকে ভালোবাসতে, যত্ন করতে নিষ্ঠা সহকারে তো ওকে ওর দিম্মাই শিখিয়েছে। তাই ও ঘুরেফিরে হয় ছাদে, নয় বারান্দায় সময় কাটায়।”

“আপনাদের ছাদেও বুঝি অনেক টব আছে?” আমি কৌতূহল দমন করতে না পেরে জিজ্ঞেস করে ফেললাম।

“তা নেই নেই করে পঁচিশ-তিরিশটা তো হবেই।”

প্রসঙ্গান্তরে চলে যাচ্ছি দেখে দিদিভাইয়ের ব্যাপারটা ভালো লাগল না। “হ্যাঁ, তারপর কী হল?”

“যা বলছিলাম। ওর অমন স্বভাব আছে। মঝেমাঝেই ও বাগানে কিংবা ছাদে চলে যায়। দুপুরে খাবার পর কীসব সার দেয়। একটা স্প্রেয়ার দিয়ে পাতাগুলো ধোয়। কখনও পাতা ছাঁটে। খুরপি দিয়ে টবের একটু মাটি কোপায়, আরও কী কী সব কাজ আছে করে। নিজের মনে বাগান নিয়ে থাকে। আমরা কখনও বাধা দিই না। আপন মনে ও যা করছে করুক। তা খাওয়াদাওয়ার পর আজও নিশ্চয়ই তাই করতেই বাগানে গেছিল। তারপর অনেকক্ষণ সাড়াশব্দ নেই। এই দুপুর সাড়ে তিনটে থেকে চারটের মধ্যে আমাদের বাড়িতে একটা ফল খাওয়ার রেওয়াজ আছে। সেই ছোটোবেলা থেকে আমারা দেখে আসছি। তা সেই সময় বাহাদুরচাচা ওকে ছাদে খুঁজে না পেয়ে বাগানে গিয়ে দেখে খুরপি পড়ে আছে কিন্তু তিথি নেই। প্রথমেই কিন্তু ও আমাদের ডাকেনি। আগে নিজে ভালো করে সারা বাগান খুঁজে দেখেছে। তারপর ছাদে গিয়ে সারা বাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখেছে। ও নাম ধরে যখন বারবার ডাকছে তখনই আমার কেমন সন্দেহ হয়। আমি এসে জিজ্ঞেস করাতে বাহাদুরচাচা হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলে। বিশ্বাস করুন, এরকম বিপদে আমারা কখনও পড়িনি এর আগে। সারা বাড়ি সবাই মিলে তন্নতন্ন করে অনুসন্ধান চালালাম…”

“আপনি বলতে চাইছেন বাগান থেকেই তিথিকে অপহরণকারীরা নিয়ে গেছে?”

“এছাড়া আর কী হতে পারে, বলুন তো!”

“সে সময় বাইরে আপনাদের কোনও পাহারাদার থাকে না?”

“বাড়ির সবার খাওয়াদাওয়া হয়ে গেলে তবেই ওরা খেতে আসে। ওদের বেশ বেলাই হয়। তারপর দেখুন একটু হয়তো দিবানিদ্রাও দেয়। গড়িমসি করে ফের চারটে নাগাদ আবার মোতায়েন হয়। দুপুরের সময় এমনিতেও রাস্তাঘাট খা খা করে। তেমন তো আর্জেন্সি কিছু থাকে না। এমনটাই ওরা করে আসছে বছরের পর বছর। এর আগে সেরকম কোনও দুর্ঘটনাও ঘটেনি। অতএব ওদের কাজকর্মের মধ্যে ঢিলেমি ভাব চলে এসেছে।”

মন দিয়ে কথাগুলো শুনল পূবালী দাশগুপ্ত। তারপর ঘুরে ঘুরে নিজে পুরো বাড়িটা দেখল। প্রতিটা ঘর, বাথরুম, মায় রান্নাঘর পর্যন্ত বাদ দিল না। তারপর আবার গেট থেকে বেরিয়ে খানিক খোঁজাখুঁজি করল। আচমকা দেখলাম, মাথা নিচু করে অদ্ভুত দেখতে ছোট্ট একটা কী কুড়িয়ে নিল। আমি কাছে গিয়ে বুঝলাম, সেটা কোনও সিগারেটের পোড়া টুকরো। তবে বাজারচলতি সিগারেটের মতন নয়। গাঢ় বাদামি বা চকোলেট কালার বলা বেশি ভালো। আমার মনে হল এটা কোনও বিদেশি সিগারেটের টুকরো। দিদিভাই দেখলাম কপাল কুঁচকে আপন মনেই বলে উঠল, “বিদেশি সিগারেট, কেলী… অ্যালবট—এই মিসিং লিঙ্কটাই আমি মিস করছিলাম।”

যা হয় আর কী, আমি হাঁ করে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম।

“চল মিঠি, বাড়ি চল।”

এখন আমাদের অনেক কাজ আছে। আমরা সবার কাছে বিদায় নিয়ে ফিরে এলাম।

এসে থেকে দেখছি দিদিভাই কেমন যেন গভীর চিন্তায় মগ্ন। মাঝে মাঝে পায়চারি করছে। আবার কখনও বা ফোন করছে। আবার কখনও আন্তর্জালে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। আমি ভাবছি আচমকা ‘কেলী-অ্যালবট’ কথাটা দিদিভাই পেল কোথা থেকে।

“দিদিভাই, কেলী…”

“ঘটে ঢুকল না? ভালো করে আপাদমস্তক ভয়নিচ ম্যানুস্ক্রিপ্ট-এর ওপর লেখাগুলো পড়। দেখ কিছু আন্দাজ পাওয়া যায় নাকি।”

তারপরেই দিদিভাই জামাকাপড় পড়ে কোথায় একটা বেরোবার তোড়জোড় করতে লাগল। আমাকে একবার সাধলও না। ভারি রাগ হল মনে মনে। কিন্তু কী আর করা যাবে? পূবালী দাশগুপ্ত এইসব রাগ-অভিমানের ধার ধারে না। অগতির গতি ঐ ভয়নিচেই মনোনিবেশ করলাম। একটু একটু মনে পড়ছিল বটে। এডওয়ার্ড কেলী। কী যেন সেদিন পড়েছিলাম বটে! ধুর ছাই! এ কি পরীক্ষার পড়া নাকি যে সব মনে রেখে একেবারে মুখস্থ করতে হবে?

“তার চেয়ে তুই একটা পাজল সলভ কর।” ঠিক টের পেয়েছেন অন্তর্যামী। “যে মানুষেরা মানুষ খায়…”

“মানে ক্যানিব্যাল?”

“হ্যাঁ। তো সেই মানুষখেকোদের জঙ্গলে গিয়ে তিন সৈন্য পড়েছে। তিন সৈন্য স্বাভাবিকভাবেই প্রাণ ভিক্ষা চেয়েছে। তো তাদের একটা শর্তে ছেড়ে দেওয়া হবে ঠিক করা হয়েছে।”

“কী শর্ত?”

“পাঁচটা টুপি আছে। দুটো সাদা। তিনটে কালো। তিনজনকেই পিছমোড়া করে এমনভাবে দাঁড় করানো হয়েছে যে শেষের জন প্রথম দু’জনকে দেখতে পাবে। মধ্যের সৈন্য নিজের সামনের জনকে দেখতে পাবে আর প্রথম জন কাউকেই দেখতে পাবে না। প্রত্যেককে একটা করে টুপি পরানো হয়েছে। একজনও যদি সঠিক উত্তর দিতে পারে তাহলে তিনজনকেই মুক্তি দেওয়া হবে।”

“ওরা নিজেদের টুপি দেখতে পাচ্ছে না?”

“ওদের চোখ বন্ধ করে পরানো হয়েছে। তারপর খুলে দিলেও দেখার অনুমতি নেই। এবার শেষের জনকে জিজ্ঞেস করা হল সে কী টুপি পরেছে। সে বলল, জানি না। দ্বিতীয় জন বলল, জানি না। কিন্তু প্রথমে যে দাঁড়িয়ে ছিল এবং কারুর টুপি দেখতেই পাচ্ছিল না সে বলল, আমি জানি। এবার প্রশ্ন, কী করে জানল এবং  তাঁর টুপির  রঙ কী ছিল?”

আমি তো শুনেই ঢোঁক গিলতে শুরু করেছি। উফ! কী খটমট! এর চেয়ে ভয়নিচের পাণ্ডুলিপি পড়লে হত। সৈনিকরা কী টুপি পরবে, আমিই টুপি পড়ে বসে আছি।

“ওরে বাবা রে! একটু ক্লু দাও, দিদিভাই।” আমি কাকুতিমিনতি করলাম।

দিদিভাইয়ের একটু বুঝি মন গলল। “টুপির রঙ দিয়ে চিন্তা করতে শুরু কর।”

আমি খানিক চিন্তা করলাম। তিনটে কালো টুপি আর দুটো সাদা টুপি। আর সৈনিক তিনটে। বেশ, তা না হয় হল। কিন্তু তারপর?

“ভাব, ভাব। কম টুপির সংখ্যা দিয়ে ভাব।” দিদিভাইয়ের ইঙ্গিত সাদা টুপির দিকে।

“হ্যাঁ, এইবার পেয়েছি। যদি সামনের দু’জন সাদা টুপি পরে থাকত তাহলে শেষের জন বলতে পারত যে সে কালো টুপি পরে আছে। তাঁর মানে সামনের দু’জন সাদা টুপি পরে নেই এটা বোঝা যাচ্ছে।”

“গুড। কিন্তু দু’জনেই পরে নেই। মানে, একজন পরে থাকতেই পারে।”

“হুম, সেখানেই তো গণ্ডগোল।”

“এবার ধর, যদি মধ্যিখানের লোকটা সামনে সাদা টুপি পরা দেখত তাহলে সে একটা চেষ্টা নিশ্চয়ই করত বলার যে সে কালো পরে আছে কারণ, শেষের জন সাদা পরতেই পারে, তবে সে তো নিজেরটা দেখতে পাচ্ছে না।”

“তার মানে, এই হিসাবটা কষে প্রথম জন বলল যে সে কালো টুপি পরে আছে?”

“একদমই তাই। এই তো ঠিক ধরতে পেরেছিস। খুব ভালো। তুই আরও মাথায় শান দে, আমি একটু ঘুরে আসি।”

“কোথায় যাবে তুমি এখন?”

“একটু লোকাল থানায় যাব। কিছু সাহায্যর আমার দরকার হতে পারে।”

এমন একটা জায়গায় যাবার কথা বলল যে আমি আর বায়না করতে পারলাম না। একটু মনঃক্ষুণ্ণ যে হলাম না তা নয়। কিন্তু কিছু করার নেই। যাবার আগে অবশ্য একটা কাজ দিয়ে গেল আমাকে। “তুই কিন্তু মিঠি এর মধ্যে ফোনে ট্রু কলারটা ডাউনলোড করে আমার কাছে আসা ফোন নম্বরটা ট্র্যাক কর। সেখান থেকে ফেসবুকে গিয়ে যদি কোনও তথ্য পাস, যতটা যা খবর জোগাড় করতে পারিস, বুঝলি তো!”

আমি ঘাড় নাড়লাম।

প্রথমেই আমি ট্রু কলার অ্যাপটা ডাউনলোড করলাম। তারপর নম্বরটা দিতে সে দেখি ঘুরেই যায়, ঘুরেই যায়। এ আচ্ছা বিপদ তো! একটা সামান্য কাজ দিল দিদিভাই, সেটাও পারলাম না। মনটা একটু খারাপই  হয়ে গেল। হয়তো একদম নতুন সিম। তাই কোনও তথ্য দিতে পারল না। ঠিক তখনই আমাদের ফোর্থ ডাইমেনশনের মোবাইলটা বেজে উঠল। আমি দ্রুত গিয়ে রিসিভ করতে না করতেই দেখি কেটে গেল। তারপরেই টিং টিং শব্দে একটা মেসেজ ঢুকল। আমি উত্তেজনায় তখন ফুটছি কারণ, মেসেজটা ঐ নির্দিষ্ট মোবাইল নম্বর থেকেই। দ্রুত ইনবক্স খুলে দেখলাম—‘মাইন্ড ইয়োর ওন বিজনেস।’ তারপর এক অদ্ভুত শৈলীতে একটি সাপের চিহ্ন আঁকা। সেটা খানিকটা হলেও আমার যেন মনে হল সেই পেরুর শামাম পাবলো  আমারিঙ্গো ধাঁচের আঁকা যেটা অসিতবাবুদের বসার ঘরে দেখেছিলাম। অজান্তেই গায়ে কীরকম কাঁটা দিয়ে উঠল। মুখ থেকে অস্ফুটে বেরিয়ে এল, “তবে কি গুপ্ত কাল্ট!”

এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার মনে হল। তাই আমি অপেক্ষা না করে দ্রুত দিদিভাইকে ফোন করলাম। সব শুনে দিদিভাই প্রশংসাই করল। “ভালো করেছিস মিঠি যে আমাকে সব জানিয়ে দিলি এক্ষুনি। না হলে আমাকে আবার বেরোতে হত।”

চার

বেশ দু-তিন ঘণ্টা পর দিদিভাই বাড়ি রল। প্রচণ্ড ঝড় বয়ে গেলে যেমন হয় ওকে দেখে ঠিক তাই মনে হচ্ছিল। এসেই বোমাটা ফাটাল। “মিঠি, আমি একটু দার্জিলিং যাব কাল। কালকে গিয়ে পরশুদিনই ফিরে আসব।”

“আমি যাব না!” আমি কাঁদোকাঁদো হয়ে জিজ্ঞেস করলাম। হঠাৎ যে দার্জিলিং যাবার কী হল তাও বুঝে উঠতে পারলাম না।

“তোকে নেওয়াটা রিস্ক হয়ে যাবে। তুই বরঞ্চ গাঙ্গুলি ম্যানসনে গিয়ে আমার দুটো কাজ করে দিস। তুই গিয়ে বলবি যে আমিই তোকে পাঠিয়েছি। তুই গিয়ে তিথির ঘরটা ভীষণ ভালো করে দেখবি। প্রয়োজনে ফটো তুলবি। আর আনাচকানাচ সব দেখে কিছু সন্দেহজনক পেলে আমায় জানাবি।”

ব্যাপারটা মনঃপুত না হলেও না করতে পারলাম না। দিদিভাই পরদিনই বেরোবে বলে দ্রুত প্যাকিং করতে শুরু করে দিল। সেই সময় আমার মনে হল আবার যেন একটা মেসেজ ঢুকল আমাদের ফোর্থ ডাইমেনশনের অফিসিয়াল মোবাইলে। আমি ত্বরিতে খুলে যা দেখলাম তাতে আমার মাথা ঘুরে যাবার জোগাড়! লেখা—‘বি অ্যালার্ট! শার্প ৫:৩০ এ.এম।’ আর এই সর্পচিহ্ন।

আমার গলা কেমন শুকিয়ে গেল। হাত-পা ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল। ওরে বাবা রে! এ কী সব হচ্ছে রে! দিদিভাইয়ের এরা ভালো করতে চায়, না ক্ষতি করতে চায়? সাবধান করছে, না হুমকি দিচ্ছে? সব যেন কীরকম জট পাকিয়ে যাচ্ছে। কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। যাই হোক, আমার কর্তব্য ওকে জানানো। দেখানো। নীরবে গিয়ে ওর সামনে মোবাইলটা ধরলাম। ওর নজর করে আলগোছে আমার দিকে তাকাল। “অনেক বিপদ আছে রে। ওই জন্যই তোকে নিচ্ছি না। আর আমার যাওয়াটা কিন্তু খুব গোপনীয় ব্যাপার। কাকপক্ষী যেন টের না পায়। এমনকি বাড়ির কাউকেও আমি বলছি না এই যাওয়ার ব্যাপারে। এটা শুধু তোর আর আমার মধ্যেই সীমিত থাক। তদন্তের খাতিরে অনেক কিছুই করতে হয়, বুঝলি তো! খুব প্রয়োজন না হলে আমাকে ফোন করার দরকার নেই। আর কাল সকালের দিকে গাঙ্গুলি ম্যানসনে গিয়ে কৌশলে তুই আমার না যাওয়াটা ম্যানেজ করবি।”

আমার বুকের ভেতর তখনও দামামা বাজছে। পরদিন দিদিভাই খুব ভোর ভোর বেরিয়ে গেল।

পাঁচ

সারারাত ভালো করে ঘুমোতে পারলাম না। কী জানি কী এক আশঙ্কায় কেবলই ঘুমের চটকাটা ভেঙে ভেঙে যাচ্ছিল। বিদঘুটে সব স্বপ্ন দেখছিলাম। দিদিভাইয়ের জন্যও ভীষণ চিন্তা হচ্ছিল। প্রথম থেকে ঘটনাগুলো সাজাবার চেষ্টা করছিলাম। ভয় তো ভয়নিচ ম্যানুস্ক্রিপ্ট বোঝা গেল। আর খুনটাও হয়েছে ঐ আজাওয়াস্কা পানীয়র এফেক্টের জন্যে ডাইনি সন্দেহে পুড়িয়ে মেরেছে। কিন্তু আচমকা তিথি অপহৃত হল কেন? আর হবে যে সে বিষয়ে দিদিভাই যেন নিশ্চিত ছিল। এমনটাই বা কেন? আর বাইরে ঐ বিদেশি সিগারেট দেখে কী এমন ক্লুয়ের সন্ধান পেল পূবালী দাশগুপ্ত? তারপর ঐ ফোনে হুমকি। তারপর ঐ মেসেজ? তবে কি তাদের সাথেই হাত মেলাল দিদিভাই? নাকি সন্তর্পণে সুকৌশলে তারা দিদিভাইকেও নিয়ে গিয়ে শেষকালে… ছিঃ! ছিঃ! আমারই ভুল। শেষে কিনা দিদিভাইয়ের বুদ্ধিমত্তা আর সাহসের ওপর আমি আস্থা হারাচ্ছি! নিজেরই নিজের ওপর ধিক্কার জন্মাল। আসলে দিদিভাইয়ের জন্যও বড্ড চিন্তা হচ্ছিল। আমি ছাড়া যে আর কেউ জানে না ওর এই গোপন অভিযানের কথা। কিছু হলে শেষে আমাকে না সবাই দোষারোপ করে! এইসব নানাবিধ চিন্তা মাথার মধ্যে ক্রমাগত ঘুরপাক খাচ্ছিল।

সকাল হলে মুখহাত ধুয়ে একটু লেখাপড়ার চেষ্টা করলাম। কিন্তু কোথায় কী! একটুও মন বসাতে পারলাম না। কোনওমতে ব্রেকফাস্টটা সেরে বেড়িয়ে পড়লাম গাঙ্গুলি ম্যানসনের উদ্দেশ্যে।

আগের বারের মতো এবার আর কোনও উষ্ণ অভ্যর্থনা আমার জন্যও অপেক্ষা করছিল না। বাড়ির আবহাওয়া বেশ গুরুগম্ভীর। সবার চোখমুখই থমথমে। কিছু তির্যক বাক্যবাণও আমায় শুনতে হল। অখিলবাবুই যেমন বললেন, “কী, নাটের গুরু হাওয়া! এখন কুচো নৈবিদ্যিকে পাঠিয়েছে?”

শুনেই আমার মাথাটা গরম হয়ে গেছিল। দিদিভাইয়ের এমন অপমান! আর আমি কিনা কুচো নৈবেদ্য! কিন্তু পুরো রাগটা হজম করে নিয়েছিলাম। প্রথমত সেই মুহূর্তে আমি একা। সাংঘাতিকভাবে রিয়াক্ট করাটা ঠিক হবে না। তাছাড়া রহস্যের প্রথম জটটা ছাড়িয়ে দিলেও সেটা সবাইকে আনুষ্ঠানিকভাবে খোলসা করে বলা হয়নি। আর দিদিভাই দুটো রহস্যের সমাধান একসাথে করে যে অচিরেই সবার সামনে আসল ঘটনা তুলে ধরবে এ তো জানা কথাই।

আমি কথা আর না বাড়িয়ে তিথির ঘরের দিকে যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করলাম। কেউ দেখলাম গা করল না। কেউ আমায় যেতে মানাও করল না। আবার যাবার জন্যও আহ্বানও জানাল না। আমি যে একেবারেই অনাহূত এক অতিথি তা তাদের হাবেভাবে স্পষ্ট। যেন আমাদের জন্যই তিথি কিডন্যাপ হয়েছে। যাই হোক, এসব গায়ে মাখলে চলবে না। যখন রহস্যের সমাধান হয়ে যাবে, এরাই আমাদের মাথায় নিয়ে নাচবে। কথাতেই আছে, আল্টিমেটলি এন্ড রেজাল্ট ম্যাটারস।

আমি তিথির ঘরে ঢুকতে গিয়ে প্রথমেই যেটা আমার নজর কাড়ল সেটা দরজার মুখোমুখি দেয়ালে টাঙানো এক অদ্ভুত ছবি। না, এটা বিখ্যাত পেরুর শামাম পাবলো আমারিঙ্গোর আঁকা ছবি নয়। যতদূর মনে হচ্ছিল আমার এটা হয়তো তিথির নিজের আজাওয়াস্কা সেশনের ভিশনের উপস্থাপনা। একলা ঘরে এমন একটা ছবি দেখে গাটা কেমন ছমছম করে উঠল। না জানি কোথা থেকে কখন কোন রোমহর্ষক জিনিস উঠে আসবে! এটা যত না তিথির ঘর ছিল, তার চেয়ে বেশি দিম্মার ঘর কারণ, তিথি আর থাকত কোথায়?

আমি আলমারিটা খোলার চেষ্টা করলাম। সাবেক আমলের কাঠের আলমারি। অঢেল আওয়াজ করল, কিন্তু আমার সাথে একটুও সহযোগিতা করে নিজেকে মেলে ধরল না। অগত্যা আলনা, ড্রেসিং টেবিলই লক্ষ্য করে খুঁজতে শুরু করলাম। প্রতিদিন যে নিয়ম করে পরিষ্কার করা হয় তা নিশ্চিত টের পাচ্ছিলাম। কোথাও কোনও ধুলোময়লার আস্তরণ নেই। সবকিছু বেশ পরিপাটি করে গুছিয়েই রাখা আছে। সেক্ষেত্রে বেশি লণ্ডভণ্ড করে জিনিসগুলো উলটেপালটে দেখতেও লজ্জা করছিল। আমি চেষ্টা করছিলাম দেখে নিয়ে মোটামুটি ভদ্রস্থ করে রাখার। অন্তত যেন বিসদৃশ না হয়। তেমন কিছু তো নজরে পড়ল না। আচ্ছা একটু বিছানার তোষকের তলাটা দেখলেও তো হয়। কাচ, কাগজ কি কোনও গুরুত্বপূর্ণ স্লিপ সে তো হামেশাই তোষকের তলায় রেখে বেমালুম ভুলে যাই আমি। কী মনে হতে আমি সত্যি-সত্যিই তোষক তুলে দেখতে উদ্যত হলাম। আর ওখানে সত্যি সত্যি দেখতে পেলাম বেশ কিছু মোটা হ্যান্ড মেড পেপারে আঁকা ছবি। সেই কিম্ভূত মার্কা উদ্ভিদের সব  ছবি। তবে বাছাই করা দশ-বারোটা। খুব তাড়াতাড়ি মোবাইল নিয়ে ছবি তুলতে হবে। ছবি তুলতে বেশ কষ্টই হল কারণ, তোষকের তলায় থাকার জন্য কেমন ভাঁজে ভাঁজে পাতাগুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে গেছে। দ্রুত ছবি তুলে নিয়ে ঘরটার বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে ফের ছবি তুললাম।

তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে এসে এবং কেমন নিজের কৌতূহল মেটাতেই ছাদে উঠলাম তিথির টবের গাছগুলো দেখব বলে। সন্তর্পণে মোবাইল খুলে ছবিগুলোর সাথে মেলাতে মেলাতে দুটো অনুরূপ গাছ নজরে এল। তার চেয়েও লক্ষণীয় হল তোষকের তলায় রাখা ছবিগুলোর মধ্যে একটা ছবির কোনায় সেই ভুজঙ্গের ছবি। তখন অতটা খেয়াল করিনি। একটা পায়ের শব্দের আওয়াজ পেয়ে দ্রুত সরে এসে অন্য গাছের সামনে দাঁড়ালাম আমি। কেন যে এটা করলাম আমিও জানি না। চুপিচুপি চোরের মতো করছিলাম বলে কি কোনও অপরাধবোধ কাজ করছিল? নাকি ঐ চিহ্নটাই আমার মাথা ঘুরিয়ে দিল? হতে পারে। কিন্তু কী আশ্চর্য, পায়ের আওয়াজটা আর পাচ্ছি না যে! কেউ কি ছাদে না এসে দরজার আড়াল থেকে আমায় লক্ষ রাখছে! আমার বেশ ভয় ভয় করতে লাগল। এ আবার কী রহস্য! আমি তো কাউকে লুকিয়ে চুরিয়ে ঢুকিনি! দিনের আলোয় প্রকাশ্যে এসেছি। আর কেই বা হতে পারে, এমন আড়াল থেকে নজর রাখছে? আর আমি ছাদে কী আর এমন গোপন কাজ করতে পারি, সেটাও তো একটা ব্যাপার! দেখি তো। মনে সাহস করে এগিয়ে গেলাম। কিন্তু কোথায় কী? ভোঁ ভা! কেউ কোথায় নেই। মনের ভুল! নাকি কানের ভুল? কী জ্বালাতন! মনটা কেমন খচখচ করতেই থাকল। এতটা আমি ভুল করব বলে মনে হয় না। দিদিভাইও সামনে নেই যে আলাপ আলোচনা করব। মহা ঝামেলা হল আমার। কী যে করি! দিদিভাই তো গোপনীয়তা রক্ষা করার জন্যও ফোন করতেও বারণ করেছে। সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় চটি পরে উঠেছে আর নামার সময় নিঃশব্দে খালি পায়ে নেমে গেছে, এমন হতে পারে কি! ধুর! ধোপে টিকছে না এ যুক্তি। নিজেই টের পাচ্ছি। নিজের বাড়িতে আচমকা এমন কেউ করতে যাবে কেন? মন থেকে সরাতে চাইলেও ঘটনাটা কেমন গলায় কাঁটার মতন কেবল অস্বস্তি দিচ্ছে।

বাড়িতে ফিরে এসেও আমার যেন শান্তি নেই। কেবলই মাথায় ঘটনাটা ঘুরপাক খাচ্ছে। একটু অন্যমনস্ক হবার জন্যই আমার ফেসবুক অ্যাকাউন্টটা খুললাম। খুলতেই দেখি দিদিভাই মেসেজ করল, ‘অনলাইন আছিস?’

‘হ্যাঁ গো। কেমন আছ?’

‘শোন। তোকে একটা কথা বলি।’

‘আমারও তোমাকে একটা কথা বলার ছিল।’

‘আচ্ছা দাঁড়া, তাহলে আমি তোকে ফোন করছি। মোবাইলটা খোলা রাখ। তোরটা নয়। মায়েরটাতে করছি। আর দশ মিনিটের মধ্যে। বুঝলি?’

‘হ্যাঁ। ঠিক আছে।’

আমি বুঝলাম, দিদিভাই কোনও ফাঁক রাখতে চাইছে না। কেউ যদি আমাদের মোবাইল ট্যাপ করে বা অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে! তবে এই মুহূর্তে আমার প্রধান কাজ হল জেঠিমার ঘরে গিয়ে জেঠিমাকে পটিয়ে পাটিয়ে ফোনটা করায়ত্ত করা।

ওপরে গিয়ে দেখি জেঠিমা সিরিয়াল নিয়ে ব্যস্ত। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য। খুনি ঘরের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে। একটা অল্পবয়সী মেয়ে আয়নার সামনে গান গাইতে গাইতে সাজছে। মনে তার প্রচুর আনন্দ। এদিকে তার মৃত্যু ঘনিয়ে এসেছে। একটু একটু করে খুনি এগোচ্ছে। পর্দার আড়াল দিয়ে ছায়া ছায়া কালো মুখোশ পরা অবয়ব। এই কাছে এল বলে! জেঠিমা যথারীতি প্রবল উত্তেজিত। মুখে, ‘এই এই’ আওয়াজ পর্যন্ত করে ফেলেছে। ঠিক সেই সময় ঝঙ্কার দিয়ে মোবাইলটা বেজে উঠল। আমি ঝাঁপিয়ে বিছানার ওপর রাখা মোবাইলটা নিতে গেলাম। কিন্তু এ কী! তার চেয়েও দ্রুততার সাথে জেঠিমা ছোঁ মেরে শিকার তুলে নিয়ে বলল, “দাঁড়া, আমাকে করেছে। আমি আগে কথা বলব তোর গুরুর সাথে।”

যাহ্‌! এটা যে দিদিভাইয়ের ফোন সেটাও বুঝে ফেলল! ব্যাপারটা কিন্তু আমায় বেশ ভাবিয়ে তুলল। জেঠিমার এই দিকটার কথা আমার জানা ছিল না তো! তত্ক্ষণে আমার তলব পড়েছে।

“এতটাও আন্ডার-এস্টিমেট করিস না।”

যাহ্‌! এই মা-মেয়ে কী শুরু করেছে! সব দেখছি থট রিডার।

“নে, আগে তুই বল কী বলতে চাইছিলি।”

আমি আজকের ঘটনা সব বললাম। দিদিভাই খানিক চিন্তা করে বলল, “ভালো খবর দিলি। এবার কিছু কিছু মেলাতে পারছি।”

নাও এবার! জিনিস আরও জটিল হচ্ছে। আর ইনি কিনা মেলাতে পারছেন!

“যাই হোক, এবার আমার কথাটা শোন। তুই বো ব্যারাকস-এ একটু যেতে পারবি?”

“মানে কলকাতার ঐ অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান কমিউনিটিরা যেখানে থাকে?”

“হ্যাঁ। আমি একটা ঠিকানা দিচ্ছি। তুই একটু খোঁজ করিস তো ওখানে এমিলি জেফারসন নামে কেউ থাকে কি না। এই তোদের থেকে দু-চার বছরের যা বড়ো হবে।”

আমি জেঠিমার দিকে একটা কাগজ-কলমের ইশারা করলাম। জেঠিমা এগিয়ে দিল। আমি টকাটক ঠিকানাটা টুকে মিলিয়ে নিলাম একচোট।

কী যে হচ্ছে এসব যেন আমার ধরাছোঁয়ার বাইরে। কাগজে চোখটা বুলিয়ে ঠিকানাটা বোঝার চেষ্টা করছিলাম। তারপর মুখ তুলতেই দেখি জেঠিমা আমার দিকে চেয়ে মিটিমিটি হাসছে। “কী রে মিঠি, অবাক হয়ে গেলি তো কী করে জানলাম ওটা তোর দিদিভাইয়ের ফোন!”

“হ্যাঁ গো! তোমরা মা-মেয়ে যা খেল দেখাচ্ছ না!”

“ওরে, তোর দিদিভাইই সেট করে দিয়ে গেছে। রিংটোনটা খেয়াল আছে, কী বেজেছিল?”

“হ্যাঁ, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের সেই বিখ্যাত গান—ওরে আমার মেয়ে। আমার সোনা মেয়ে!”

আরে, তাই তো! অন্য সময় তো আমজাদ আলি খাঁ সাহেবের সরোদের ঝংকার বেজে ওঠে। আমার খেয়াল করা উচিত ছিল। আসলে উপর্যুপরি এইসব ঘটনার জন্যও আমি যেন কেমন ঘেঁটে গেছি। যাই হোক, একটু গুগুল ম্যাপ সার্চ করে দেখব ঠিক কোথায় এই জায়গার অবস্থান।

সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসেছি কি আসিনি, আমার কানে আসছিল আমাদের ফোর্থ ডাইমেনশনের রিংটোন। এসে হাতে নিয়ে রিসিভ করতেই একজন উত্তেজিত মহিলার উত্তাল গালাগালের সামনে পড়লাম। একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না এর জন্যও। প্রথম দফায় মনে হল ওঁর কি কোথাও ভুল হচ্ছে! তারপরই হুঁশ হল, পূবালী দাশগুপ্ত নামটা যেন শুনলাম। একটু বয়স্ক ভদ্রমহিলার গলা বলেই মনে হচ্ছিল। উনি ওঁর পুরো বক্তব্যটাই ইংরাজিতে বলেছেন এবং এত দ্রুততার সাথে যে আমি ঠিকঠাকভাবে ওঁর কথা কিছু বুঝতেই পারছিলাম না। আর সত্যি কথা বলতে ওঁর অ্যাক্সেন্টও আমার ধরতে বেশ অসুবিধে হচ্ছে। এতগুলো কথা একসাথে বলে উনি একটু দম নিতেই আমি ওঁকে বললাম, “ইফ ইউ কুড বি অ্যা লিটল স্লো দেন মে বি আই ক্যান ফলো ইউ।”

“অ্যাম আই টকিং টু পূবালী ডাসগুপ্টা?”

“ওয়েল, শি ইস নট আরাউন্ড। ইউ মে লিভ অ্যা মেসেজ। আই শ্যাল কনভে ইট টু হার।”

“ওয়েল, দ্যাট ইস সো ন্যাচারাল। সি হ্যাস ডান সাচ অ্যা ন্যাস্টি থিং। শি উইল সারটেনলি এসকেপ। দ্যাট বিচ মাস্ট হ্যাভ লেফট দ্য স্টেশন।”

আমার কথাটা শুনেই মাথাটা গরম হয়ে গেল। ভেবেছে কী এরা! যা বলবে তাই মেনে নিতে হবে! আর ধৈর্য রাখতে পারলাম না। আমি যথাসম্ভব না চিৎকার করে দাঁতে দাঁত চেপে বললাম,

“মাইন্ড ইয়োর ল্যাঙ্গুয়েজ, ম্যাম। প্লিজ বি ক্লিয়ার। ওয়াট এক্সাক্টলি ইউ ওয়ান্ট টু সে? ওয়াট আর ইয়োর অ্যালেগেশনস এগেন্সট পূবালী দাশগুপ্ত?”

“শি ইস বিহাইন্ড অল দিস কন্সপির‍্যাসি। মাই নিস এমিলি জেফারসন হ্যাস নট রিটার্নড টু হার হোম সিন্স টু ডেস। আই হ্যাভ ফাউন্ড হার ডায়েরি হোয়ের শি হ্যাস মেনশনড অ্যাবাউট পূবালী ডাসগুপ্তা।”

“সো ওয়াট! দ্যাট ডাস নট প্রুভ মাই সিস্টার ইস রেসপন্সিবল!”

“ওকে, আই শ্যাল কোট এমিলি, মে বি অ্যাই নিড টু গো ফর অ্যা হাইডিং জাস্ট বিকস অফ দিস পূবালী ডাসগুপ্তা।”

আমি তো হাঁ! কী, হচ্ছে কী এসব? দিদিভাই কীসের সাথে জড়িয়ে পড়ছে! দিদিভাইকে শিখণ্ডী রেখে এগুলো সেই ভুজঙ্গ মার্কা ঐ গ্রুপটার কাজ নয়তো! আমার বুকের ভেতরটা তোলপাড় হয়ে যাচ্ছিল। তবুও ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করে ওঁকে বললাম, “ইট উড বি বেস্ট ম্যাম ইফ ইউ কুড কাম অ্যাট আওয়ার প্লেস টুমরো ইভিং। দেন আই মে সেট অ্যান অ্যাপয়েন্টমেন্ট উইথ পূবালী দাশগুপ্ত।”

ভদ্রমহিলা দেখলাম রাজী হয়ে গেলেন। আমি বিস্তারিতভাবে আমাদের ভদ্রাসনের নির্দেশ দিলাম। তিনি জানালেন যে তিনি বো ব্যারাকস থেকে আসবেন। চকিতে মনে পড়ে গেল, দিদিভাই বো ব্যারাকসের কোন এক এমিলির খোঁজ নিতে বলেছিল আমাকে। তাহলে কি এই দু’জন একই ব্যাক্তি? তাই হবে হয়তো।

যেহেতু উনি সন্ধেবেলা আসবেন হাতে কিছুটা সময় পাওয়া গেল। এর মধ্যে দিদিভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করে নেব। ওর মতামতের ভীষণ প্রয়োজন। তাছাড়া দিদিভাইও এমিলি নামের কারুর খোঁজ করছিল। কিন্তু সে যে ডায়েরিতে দিদিভাইয়ের নাম নিয়ে তাকে ফাঁসিয়ে গেছে সে তো আর দিদিভাই জানে না। সে কেন দিদিভাইয়ের নাম নিয়েছে আমি তাও বুঝতে পারলাম না। কোথকার জল যে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে কে জানে! সমস্যা ক্রমে জটিল হয়ে পড়ছে। আমি একা সামাল দেব কী করে কে জানে! দিদিভাই অবশ্য বলেছিল যে ও কাল সন্ধেতে বাড়ি ঢুকে যাবে। আমার প্রতীক্ষা করা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই। তবে একটা কাজ করা যেতে পারে। ফোর্থ ডাইমেনশনের ফোন থেকে না ফোন করে জেঠিমার ফোন থেকে আরেকবার ফোন করলে কেমন হয়? এই খবরটা দেওয়া ওকে অত্যন্ত জরুরি।

আমি ত্বরিতে ওপরে গিয়ে ফের জেঠিমার ফোনটা বাজেয়াপ্ত করলাম। জেঠিমা তখনও সিরিয়াল নিয়ে ব্যস্ত। আমি সন্তর্পণে ফোনটা বাইরে নিয়ে এলাম। আলগোছে আমায় নজর করল বটে জেঠিমা, কিন্তু মুখে কিছু বলল না। আমি বাইরে ব্যালকনির এককোণে এসে নিচু স্বরে দিদিভাইকে পুরো ব্যাপারটা গুছিয়ে বললাম। দিদিভাই আমায় আশ্বাস দিল যে আগামীকাল দুপুর নাগাদ সে যথাসময়ে ঢুকে যাবে। চিন্তার কিছু নেই। ভদ্রমহিলার সাথে সাক্ষাতের সময় ও থাকবে জেনে আমি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।

ছয়

পরদিন দুপুরে যে কখন ও ঢুকেছে, আমি জানতেই পারিনি। এমন কুম্ভকর্ণের ঘুম ঘুমিয়েছি। আসলে রাত্তিরে একদম ভালো ঘুম হয়নি। এত আজেবাজে স্বপ্ন আর দুশ্চিন্তা মাথায় কাজ করছিল যে ঘুম আসতে  আসতে প্রায় ভোর রাত্তির হয়ে গেছিল। তারপর টিউশন ক্লাস ছিল বলে আর ঘণ্টা দুয়েক বাদেই মা তুলে দিয়েছে, যার ফলে দুপুরে অকাতরে ঘুমিয়েছি। কোনও কিছু টের পায়নি। জানি আওয়াজ খাব। দিদিভাই তো রেডিই আছে।

হাই তুলতে তুলতে ফোর্থ ডাইমেনশনের অফিসে ঢুকলাম। দেখি পুরনো একগাদা কাগজপত্র নিয়ে দিদিভাই বসে আছে। কাগজপত্র বলতে খবরের কাগজ। আবার আসতে না আসতেই কীসের সন্ধানে উঠে পড়ে লেগেছে কে জানে! আমায় আড়চোখে খেয়াল করে বলল, “এক্ষুনি বেরোতে হবে তোকে।”

“আমাকে? কেন?”

“আর কাকে পাঠাব এখন? একটু রিস্ক আছে বটে, তবুও নিতেই হবে।”

“কোথায় সেটা তো বলবে!”

বো ব্যারাক হলে আমি ইতিমধ্যে খোঁজখবর নিয়ে রেখেছি। কিন্তু দিদিভাই দেখি খবরে কাগজ থেকে একটুকরো কাগজ কেটে আমায় দিল। কগজের টুকরোটা পড়ে তো আমার চক্ষু ছানাবড়া। এ যে দেখছি সেই প্ল্যানচেটের বিজ্ঞাপনের টুকরো এবং তার টিকিটের প্রাপ্তিস্থানে আমায় যেতে নির্দেশ দিচ্ছে পূবালী দাশগুপ্ত। আমি যাকে বলে একেবারে কিংকর্তব্যবিমুঢ়। আরও চমকের বাকি ছিল যখন দিদিভাই আমায় বলল, “সবক’টা সিটই আমাদের চাই। ফুল বুকিং।”

এই বলে বেশ কিছু পাঁচশো টাকার নোট আমার হাতে গুঁজে দিল। “দেরি করিস না। আমি একটা লোক ফিট করে রেখেছি তোর ওপর নজর রাখার জন্য। তোকে দূর থেকে খেয়াল রাখবে। যা, বেরিয়ে পর।”

আমি খুব তাড়াতাড়ি জামাকাপড় পরে রেডি হয়ে নিলাম। দমদম থেকে মেট্রো ধরে পার্ক স্ট্রিটে পৌঁছলাম। সেখানে নির্দেশ অনুযায়ী একটা গলিতে গিয়ে একটা প্রায় অন্ধকার প্রাচীন ইমারতের ভেতর প্রবেশ করতেই বুকটা কীরকম ছ্যাঁত করে উঠল। এইখানে যে এরকম ঘরবাড়িও আছে কে জানত! কলকাতা সত্যি এক আজব নগরী। এই শহরের কোন বাঁকে যে কী অপেক্ষা করে আছে কেউ জানে না।

ঢুকতেই বুঝতে পারলাম কেমন ভ্যাপসা আবহাওয়া। ড্যাম্প। এইরকম আলো–হাওয়া বিহীন প্রাচীন ঘরবাড়িগুলো দেখলেই কেমন রহস্যে মোড়া মনে হয়। তারপর আবার আত্মা নামানোর জন্যও টিকিট কাটা! বুকের ভেতরটায় এত জোরে হাতুড়ি পিটছিল যে কী বলব! আমি একটা স্পাইরাল সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠলাম। ওপরটা অবশ্য ততটা খারাপ নয়। প্রশস্ত একটা ঘর। মধ্যিখানে বড়ো একটা টেবিল। তলায় ইস্কুল বেঞ্চের মতো লম্বা লম্বা বেঞ্চ। পুরনো দিনের বাড়ির মতো অনেক উঁচু সিলিং। ওপরে একটা আদ্যিকালের পাখা ঘটাং ঘটাং আওয়াজে ঘুরছে, কিন্তু ঘরে কোনও জনমানব নেই। আমি দু’পা ঘরে গিয়ে, “কেউ আছে?” বলে খোঁজ নিলাম। কোনও সাড়াশব্দ পেলাম না। এবার গলার আওয়াজ একটু উঁচু করে জিজ্ঞাসা করলাম, “কেউ আছে কি এখানে? এনিওয়ান দেয়ার? আমি টিকিট কিনতে এসেছিলাম।”

হঠাৎ কোথা থেকে একটা হেঁড়ে গলায় আওয়াজ শুনলাম, “কে? কে ওখানে?”

“আমি-ই-ই।” একটু সুর করে উত্তর দিলাম কারণ, আওয়াজটা যাতে আমার পৌঁছয় ওঁর কাছে। কেন জানি না আমার মনে হল, অনুসন্ধানকারী খানিক দুরত্বে রয়েছেন। পায়ের আওয়াজ কাছে আসতে লাগল। লাল চোখ, কেমন নেশার ঘোরে একটা লোক এল। “ক’টা চাই?”

“সব চাই।”

“স-অ-ব চাই! আবার বাবু বলছিল, এবার নাকি বিক্রি হবে না।” বলে সে খিক খিক করে বিশ্রীভাবে হাসতে লাগল।

আমি টিকিটের টাকা দিয়ে সব টিকিট হাতে করে নিয়ে এলাম। এখান থেকে বেরোতে পারলে বাঁচি। দ্রুত পা চালিয়ে মেট্রো স্টেশনে আসছি, আমার মোবাইলটা বেজে উঠল। দেখি দিদিভাই।

“হ্যাঁ, বলো।”

“শোন, তুই তাড়াতাড়ি বাড়িতে যা। আমি একটু বো ব্যারাকসে যাচ্ছি। আমার মনে হয় ভদ্রমহিলা বিপদে পড়তে পারেন। রাস্তায় কোথাও দাঁড়াবি না। টিকিটগুলো সযত্নে রেখে দিবি। ভীষণ ভাইটাল ওগুলো।”

আমি নিজে ভয়ে ভয়ে দ্রুত ফিরে আসছি, আর এখন শুনি কিনা দিদিভাই আরেক আডভেঞ্চারে বেরোচ্ছে। কী যে হচ্ছে সব কে জানে। আমি কোনওদিকে না তাকিয়ে সটানে মেট্রো ধরে দমদম এসে রিক্সা করে আমাদের পাইকপাড়ার বাড়িতে ঢুকে গেলাম। এত জটিল সব কাজকারবার হচ্ছে, সত্যি আমার মাথায় একেবারেই ঢুকছে না। পরিবারের কারুর সামনে প্রকাশ করতে পারছি না, কিন্তু আমার ভেতর প্রবল উত্তেজনা কাজ করছে। এত ঘটনার ঘনঘটা! তার ওপর আগামীকাল সম্পূর্ণ একটা অন্য স্বাদের অভিজ্ঞতা হতে চলেছে। মিশন প্লানচেট!

দিদিভাই যখন ফিরল, ও ঢুকলই বাড়িতে ভুরু কুঁচকে। তবুও আমি সাহস করে জিজ্ঞেস করলাম, “গেছিলে?”

“হ্যাঁ রে। পরিস্থিতি খুব ঘোরালো। ওই ভদ্রমহিলাকে একটা হোটেলে রেখে এলাম।”

“কোথায় রেখে এলে?”

“চিন্তা নেই, আমার কিছু চেনা পরিচিতদের সাথেই আছেন।”

“কী, হচ্ছে কী বলো তো ব্যাপারটা?”

“কালকে ঐ প্ল্যানচেট সেশনে সব জানতে পারবি।”

সাত

পরদিনের সকালটাই একটা তুমুল উত্তেজনা নিয়ে শুরু হল। না জানি কী হয়, কী হয়! সকালে দিদিভাই লোকাল থানা, পার্ক স্ট্রিট থানা, এই দুটো জায়গায় যাবে বলেছিল। আমি নিশ্চিত, হোটেলে আর ও যাবে না। কিছু একটা গূঢ় রহস্য ঐ ভদ্রমহিলার সাথে জড়িয়ে আছে। আরও ব্যাপারটা জটিল হয়ে উঠল যখন দিদিভাই আমায় একটা বেশভূষা এনে দিয়ে বলল, “ছদ্মবেশে যেতে হবে কিন্তু!”

আমি বুঝতে পারছি দিদিভাই কেসটায় ভীষণরকম রিস্ক নিয়ে ফেলছে।

এর মধ্যেই একটা ফোন এল গাঙ্গুলি ম্যানসন থেকে। আমিই ফোনটা রিসিভ করলাম। আমার পরিচয়  শুনে জলদগম্ভীর এক কণ্ঠস্বর জানালেন, “পূবালী দাশগুপ্তকে বলবেন ওঁর এই কেসটা নিয়ে আর চিন্তাভাবনা করার দরকার নেই। আমরা ওঁর থেকে এই কেসটা তুলে নিচ্ছি।”

কে ছিল জিজ্ঞেস করার আগেই ফোনটা রেখে দিল। আমি পূবালী দাশগুপ্তকে বিলক্ষণ চিনি। তাই আমি তৎক্ষণাৎ জানিয়ে দিলাম, “না, আর তো সেটা হয় না। পূবালী দাশগুপ্ত একবার যে কেস হাতে নেয় তা আর উইথড্র করে না। তা সে আপনি বললেও আর পেছু হটবে না। আর চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে কেস সলভ হয়ে যাবে। তা সে আপনি চাইলেও হবে। না চাইলেও হবে।”

বলেই ফোনটা আমি রেখে দিলাম। ঠিক করলাম কি না কে জানে। দিদিভাই তখনও বেরোয়নি। কথোপকথনের খানিকটা হয়তো কানে গিয়ে থাকবে।

“কী বলছে, কেসটা তুলে নিতে চায়?”

“হ্যাঁ।”

একটা বাঁকা হাসি হেসে দিদিভাই বিন্দাস নিজের কাজে চলে গেল।

আট

যথাসময়ে আমরা আমাদের বেশ ধরলাম। দিদিভাই এসব মামলায় বেশ পটু। একটা উইগের সাহায্যে আমার এখন ব্লান্ট কাট চুল। কন্ট্যাক্ট লেন্সের দরুন চোখের মণির রং ধূসর। বেড়াল-অক্ষি যাকে বলে। নিজেই বুঝতে পারছি নিজের চেহারার আমূল পরিবর্তন। একটা ঢোলা সালওয়ার-কামিজ পরিয়েছে দিদিভাই আমাকে। বেশ আড়ষ্ট লাগছিল। কিন্তু বুঝতে পারছিলাম, এই বেশে আমায় সত্যিই চট করে চিনতে পারবে না। দিদিভাই একজন বর্ষীয়ান মহিলার বেশে একটা লাঠি নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ঢুকল। আরও খানিক বাদে সব সিট ভর্তি হয়ে গেল। সব টিকিট আমার কাটা হলেও কাউকে আমি চিনতে পারলাম না। দিদিভাই কাদের এনেছে কে জানে! আর চিনলেও তারাও হয়তো আমার মতো ছদ্মবেশে। তাই চিনতে পারছি না।

এসে বসার খানিক বাদে একটা মৃদু ঘণ্টা ধ্বনির মতো আওয়াজ হল। দেখলাম এক ভদ্রলোক ঢুকলেন। ফটোক্রমাটিক গ্লাস চোখে। ফ্রেঞ্চ কাট দাড়ি। সঙ্গে একটি মেয়ে। অদ্ভুত সাজে সাজানো হয়েছে তাকে। বোঝা যাচ্ছে এ তার আসল চেহারা নয়। মেয়েটির পা ফেলা দেখে মনে হচ্ছে সে কিঞ্চিৎ অসংলগ্ন। তাকে প্রায় ধরে ধরে এনে তার জন্যও রাখা একটি বিশেষ চেয়ারে বসিয়ে দেওয়া হল।

এরপর একদম অন্ধকার করে দেওয়া হল ঘরটা। মধ্যিখানে একটা মোমবাতি জ্বলছে। হালকা একটা কোনও গন্ধ রয়েছে এই ঘরের বাতাসে। কোনও অ্যারোমা অয়েলের এসেন্সের মনে হচ্ছে। সবাইকে মনঃসংযোগ করে মোমবাতির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে হবে। তারপর এল প্রত্যেকের জন্য এক গ্লাস করে পানীয়। এরপর সেই ভদ্রলোক দরাজ গলায় বলে উঠলেন, “আমরা প্রথমে ক্লারা জেফারসনের সমস্যায় যাব। ওঁর ভাইজিকে উনি খুঁজে পাচ্ছেন না। ওঁর সমস্যার পর অন্যদের কথা শুনব। তার আগে আমার মিডিয়াকে দেখেই বুঝতে পারছেন যে আত্মাকে আমরা আগেই নামিয়ে এনেছি যাতে এতে সময় নষ্ট না হয়।”

“কিন্তু আমরা কি আমাদের পছন্দের আত্মাকে নামাতে পারি না?” ঘরের এক কোনা থেকে এক ভদ্রলোকের বলিষ্ঠ গলা বলে উঠল।

“দেখুন, আমাদের উদ্দেশ্য প্ল্যানচেটের প্রক্রিয়া দেখানো নয়। সমস্যার সমাধান। আত্মা নামানো যথেষ্ট সময়সাপেক্ষ কাজ। এত সহজে বা কম সময়ে নাও হতে পারে। এক সিটিংয়ে সবার সমস্যার কথা শুনে সমাধানের চেষ্টা হবে। না হলে আপনারাই বলবেন, ঠকিয়ে পয়সা নিয়ে নিল। কোনও লাভ হল না। ক্লারা জেফারসন, আপনি সামনে এসে আমাদের মিডিয়ার একদম উলটোদিকে বসুন।”

এক টুপি পরা বৃদ্ধা উঠে এসে বসলেন একদম সেই মিডিয়ার বিপরীতে। চলাফেরা, ভাবভঙ্গী দেখে বুঝলাম ভালোই বয়স হয়েছে ভদ্রমহিলার। এঁর সঙ্গেই আমার উত্তেজিত বাকবিতণ্ডা হয়েছিল। এরপর একটা সাদা পাতা আর কলম দেওয়া হল সেই মিডিয়ার হাতে।

“আপনি বলুন আপনার ভাইজির কথা।”

“ওর নাম এমিলি জেফারসন। ও একটা ওষুধ-কোম্পানিতে কাজ করত। আচমকা ও একদিন ফোন করল যে কোনও কারণে ও আজ বাড়ি ফিরতে পারবে না। তারপর দিন বলল, বড্ড কাজের চাপ। অফিসের কাছেই বন্ধুর বাড়িতে থেকে কাজ করে নেবে। অনেক রাত হয়ে যাচ্ছে। বাড়ি ফেরা মুশকিল। আমিও ভাবলাম সত্যি একা মেয়ে অতও রাতে ফিরবে, তার চেয়ে কাছেপিঠে থেকে যাওয়াই ভালো। তারপর একঘণ্টার জন্য একদিন বাড়ি ফিরেছিল। নিজের ঘরে গিয়ে কীসব করল। তারপর থেকে আর ওর সাথে আমার যোগাযোগ নেই। আমি দু’দিন অপেক্ষা করলাম। চেনাজানা বন্ধুবান্ধব আত্মীয়পরিজন, সব জায়গায় খোঁজ করেছি কিন্তু কোথাও এমিলি যায়নি। সেই যে ও গেল, তারপর থেকে আর ওর কোন খবর নেই। কোনও ফোন নেই। এমিলির কোনও খোঁজও নেই। ফোন করলে বলে সুইচড অফ।”

মেয়েটা কেমন ঘোরলাগা চোখে একবার দেখল। তারপর কীসব আঁকতে বসল। আমি একটু নজর করে দেখার চেষ্টা করলাম। দেখে তো আমার রক্ত হিম হয়ে গেল। এ যে অদ্ভুত সব সরীসৃপ আঁকছে! কেমন উড়ন্ত মানুষ, মাছ, নদী, পরি। আমি যদি কিছু ভুল না বুঝে থাকি তো এই আঁকার ধরন দেখেই ধরতে পারছি যে মিডিয়াকে অবশ্যম্ভাবী আজাওয়াস্কা পানীয় পান করানো হয়েছে। তাহলে দিদিভাই নিশ্চয়ই আগে থেকেই তা টের পাচ্ছে। এই আঁকার মাথামুণ্ডু কেউই বুঝতে পারছে না, তাই কৌতূহলী চোখে সবাই তাকিয়ে আছে। আচমকা মিডিয়া দেখি দমকে বমি করে উঠল। হন্তদন্ত হয়ে উঠে পড়লেন সেই ভদ্রলোক। “চিন্তা করবেন। চিন্তা করবেন না। এমনটা হয়ে থাকে। আসলে এ বড়ো দুরূহ সাধনা। এই আঁকার মধ্যেই লুকিয়ে আছে তথ্য। আমি আপনাদের ব্যাখ্যা করে দেব।”

কিন্তু বমির দমক কমল না। আবারও বমি করল সে। এবার আর থাকতে পারল না দিদিভাই। “ওভারডোজ হয়ে গেছে। শীগগিরি ব্যবস্থা নিতে হবে। ডাক্তারবাবু, আসুন।”

এখানে আবার ডাক্তারবাবু কোত্থেকে এলেন?

ততক্ষণে ছদ্মবেশের বাইরে আরোপিত গলার স্বর, কথা বলার ভঙ্গি, বেশভূষা সব বিসর্জন দিয়ে মেয়েটার সাহায্যে এগিয়ে গেছে পূবালী দাশগুপ্ত। দিদিভাইয়ের আসল রূপ দেখেই পালানোর ধান্দা করছিলেন তিনি  যিনি এই সেশনটা সঞ্চালনা করছিলেন।

“আর এক পা নড়বেন না, মিঃ অসিত গাঙ্গুলি।”

আমি চমকে উঠে পেছন ফিরে দেখলাম, রিভলবার হাতে একজন পুলিশ অফিসার। সম্ভবত পার্ক স্ট্রিট থানার। আমার চেনা বলে মনে হল না। দিদিভাই তাহলে পাকাপোক্ত ব্যবস্থা করেই এসেছে। ডাক্তার, পুলিশ কিচ্ছু বাকি নেই। এবার নজর করলাম সেই মিডিয়ার দিকে। থমকে গেলাম। দিদিভাই তার বেশভূষা সব খুলে ফেলেছে। কৃত্রিম চুল, ভুরু, তিল। তাতে এবার স্পষ্ট, এ যে তিথি! মানে, যার সাথে আমাদের সাক্ষাৎ হয়েছিল গাঙ্গুলি ম্যানসনে। তাহলে সে কিডন্যাপড হয়নি!

অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান ভদ্রমহিলা অর্থাৎ ক্লারা জেফারসন ছুটে এগিয়ে গেলেন। “এমিলি, মাই চাইল্ড! ও মাই গড! ওয়াট হ্যাস হ্যাপেন্ড টু ইউ?”

আমি কেমন ভ্যাবলা বনে গেলাম। এ যদি এমিলি হয় তবে তিথি কই?

“ডোজ না জেনে দিলে জানেন মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে?”

একটা বিজাতীয় টোনে বাংলা শুনে আমি দেখলাম এক ভদ্রলোক অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে উঠে পড়েছেন। ভদ্রলোক ভারতীয় বংশোদ্ভূত হলেও দীর্ঘদিন মনে হয় বিদেশে থাকার দরুন বাংলা ভাষায় একটা টান আছে। ওঁর পাশে বোরখা পরা একটা মেয়েও উঠে দাঁড়িয়ে তার হিজাব খুলে বলে উঠল, “বাট দিস ইস টোটালি অ্যা ক্রিমিনাল অফেন্স।”

“উই শ্যাল সারটেনলি সি টু ইট। কিন্তু আমি জানি এগজাক্টলি কোত্থেকে কী হল? এর জন্যও আমরা সবাই আগে গাঙ্গুলি ম্যানসনে যাব। পুলিশের গাড়িতে অসিতবাবু  যাবেন। ডাক্তারবাবু, এমিলিকে নিয়ে হাসপাতালে চলে যান।”

“আই ওয়ান্ট টু গো উইথ মাই চাইল্ড!” আকুতি জানালেন ক্লারা জেফারসন।

“তবে তাই হোক। আপনার যাওয়া দরকার এমিলির সাথে।”

“তিথি, মিঃ চ্যাটার্জি, বাহাদুর, মিঠি সবাই আমার সাথে অন্য গাড়িতে আয়। ওখানে শেষ অঙ্কের হিসেবটা  বাকি।”

তিথি নামটা শুনেই চমকে গেলাম। তার মানে এটাই আসল তিথি! তবে হ্যাঁ, এমিলির সাথে এর চেহারার দারুন মিল—এটা অস্বীকার করার সত্যিই জায়গা নেই।

আমরা সবাই এসে আবার গাঙ্গুলি ম্যানসনে জড়ো হলাম। পুলিশ অসিতবাবুকেও হাজির করেছে। সবার সামনে কেসটা তুলে ধরতে ওঁর উপস্থিতিও একান্ত কাম্য। এখানে আসার বিশেষ কারণ অসিতবাবুর বাবা, অখিলবাবু। উনি চলতে ফিরতে পারেন না। অথচ ওঁর পুরো ঘটনাটা জানা ভীষণ প্রয়োজন। উনিই মূলত দিদিভাইকে নিযুক্ত করেছিলেন।

সেই হল ঘরটায় সবাই জমায়েত হলে দিদিভাই দু’মিনিট চুপ থেকে বলতে শুরু করল, “আমি প্রথম যখন এখানে আসি আমাকে প্রথমে অবাক করে দেয় আপনাদের বাইরের ঘরে টাঙানো পাবলো আমারিংগোর ওই ছবি। বিখ্যাত শামাম পাবলো আমারিংগোর ছবি কোনও বাঙালির ড্রয়িং রুমে থাকতে পারে, এ যেন আমার স্বপ্নেরও অতীত। তারপর তিথির সাথে কথা বলে এবং অসিতবাবুও বলেন যে ওঁর পিসিমার উদ্ভিদের ওপর গবেষণার কথা এবং ওই আইজাওয়াস্কা সেশনের কথা, তখন আমার মনে প্রশ্ন জাগল এটা কি এতই সহজ  কোনও কাজ যে, যে কেউ যেখানে খুশি বসে করতে পারবে? এই প্রশ্নের অনুসন্ধানটাই আমার তখন মুখ্য ছিল। কারণ, ওই পানীয়র স্বাদ এত কুচ্ছিত, এত বাজে যে বলার নয়। কেউ শুধুমাত্র মজা করার জন্য বা ফুর্তি করার জন্য ওই পানীয় খেতে চাইবে না। কেউ কেউ খাওয়ার সাথে সাথে বমি করে ফেলে। পেট অবধি যায়ই না। তাছাড়া প্রথমদিন আমাকে তিথি একটা কথা বলেছিল। আমি যখন ওকে জিজ্ঞেস করি যে এই আইজাওয়াস্কা সেশনটা তোমাদের কখন হত? ও উত্তর দিয়েছিল দুপুর নাগাদ। এটাই শুনেই আমার কেমন খটকা লাগে যে আইজাওয়াস্কা সেশন দুপুরে, সে আবার কী কথা! আমার বই পড়ে যতদূর জ্ঞান তাতে আমি জানি ব্রেজিলে বা অ্যামাজনের রেন ফরেস্টে বা মেক্সিকোতে যেসব প্রাজ্ঞ শামামরা এই প্রথা অনুশীলন করে থাকেন তারা প্রত্যেকেই রাতের দিকে করেন। কেউ আটটা সাড়ে আটটা, কেউ বা মধ্যরাত। এছাড়া আমি ওকে উল্লেখ করে জিজ্ঞেস করেছিলাম ওর দিম্মা কোনও মৃদু স্বরে গান গান বা মন্ত্র উচ্চারণ করেন কি না। তাতে ও একটু ঘাবড়েই গেছিল মনে হয় এবং উত্তর দিয়েছিল ‘না’ এবং সেটা একেবারেই অস্বাভাবিক। তখন থেকেই আমার মনের মধ্যে সন্দেহ দানা বাঁধতে শুরু করে। এ আসল তিথি তো! সেটা সম্পূর্ণ সন্দেহমুক্ত হই  যখন আমি পুরুলিয়ার ওই গ্রামে গিয়ে অসিতবাবুর পিসিমা এবং ওঁর নাতনির ছবি দেখি। ছবিটা হাতে আসার পর নিশ্চয়ই সেই খবরটা আসল তিথির অপহরণকারীর কাছে পৌঁছেছে।”

“মানে তুমি বলতে চাইছ, আমরা আসল তিথিকে কখনও চোখে দেখিইনি? ও আগে থেকেই অপহৃত ছিল?” আমার যেন বিস্ময়ের শেষ ছিল না। তাই মুখ ফসকে কথাগুলো বলেই ফেললাম।

“একদমই তাই। আমাদের আসল তিথির সাথে সাক্ষাতই হয়নি। তবে আমরা যেদিন এসেছিলাম তার আগেরদিনই আসল তিথি অপহৃত হয়েছিল বলে আমার বিশ্বাস। তাকে অন্য কাজে লাগানোর অভিপ্রায় ছিল অসিতবাবুর। কী অসিতবাবু, ঠিক বলেছি না?”

অসিতবাবু দেখলাম মুখ নিচু করে বসে আছেন।

“কিন্তু আপনি কি এই কেলী বা অ্যালবট পরিবারের ইতিহাস জানেন? নাহলে কিন্তু এখানে আমাদের সবারই এই জায়গাটা বুঝতে বেজায় অসুবিধে হবে। আমি একটু খোলসা করেই বলি।

“আমি যখন অসিতবাবুর মুখে এত উদ্ভিদের কথা শুনি এবং ওঁর পিসিমার মৃত্যুর আগে ওই শেষ কথা, ‘ভয়, ভয়’ শুনি তখনই আমার কেমন খটকা লাগে যে এটার সাথে ভয়নিচ ম্যানুস্ক্রিপ্টের কোনও সম্পর্ক নেই তো! ওখানে গিয়ে যখন বাগানে এমন কিছু উদ্ভিদ দেখি যা দেখে আমার মনে হয় আমি কখনও ভয়নিচ ম্যানুস্ক্রিপ্টেও এগুলো কখনও না কখনও দেখেছি। আমি আর মিঠি পিসিমার বাগানের বেশ কিছু ছবি তুলে নিয়ে আসি। তাছাড়া পিসিমার ঘরে একটা ডায়রিতে আমি দেখেছিলাম লেখা আছে, এম এস ৪০৮। এইটা দেখে আমি মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গেছিলাম কারণ, বর্তমানে ভয়নিচ ম্যানুস্ক্রিপ্ট যেখানে সংরক্ষিত অর্থাৎ ইয়েল ইউনিভার্সিটির ক্যাটালগে ভয়নিচ ম্যানুস্ক্রিপ্টের কল নম্বর ৪০৮। গেস্ট হাউসে ফিরে এসে আমি নেট খুলে মেলাতে গিয়ে দেখি সেখানে নেট কানেকশন অত্যন্ত খারাপ। কিন্তু এই আশঙ্কায় আগেরদিন রাতেই আমি বেশ কিছু ভিডিও অফলাইন সেভ করে রেখেছিলাম আমার মোবাইলে। সেটা দারুণভাবে তখন কাজে লেগে গেল এবং আমি দেখলাম যে আমি নির্ভুল। অতএব এই ‘ভয় ভয়’ হচ্ছে আসলে ভয়নিচ ম্যানুস্ক্রিপ্ট।

“কিন্তু এবার কথা হচ্ছে, তার সাথে পিসিমার বা তিথির কী এমন নিবিড় সম্পর্ক? আমাদের নকল তিথি কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ কথা কিন্তু বলেছিল যে দিম্মা বলেছে, আমার এখন পৃথিবীতে অনেক কাজ। আমাকে পড়াশোনা করে এগিয়ে যেতে হবে। নিজেকে যোগ্য প্রমাণ করতে হবে। হয়তো আসল তিথির থেকে শোনা কথাই ওর মুখে বসানো হয়েছে। ভালোভাবে শিখিয়ে পড়িয়ে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এই কথাগুলো আমাকে বেশ ভাবিয়েছে। উল্লেখ্য, এখানে পিসিমার স্বামীর নাম হেনরি অ্যালবট। এইটা আমার কাছে একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ছিল।

“এইবার একটু অন্য কথায় আসি। ভয়নিচ ম্যানুস্ক্রিপ্ট সম্বন্ধে যদি আপনাদের কিছু জানা থাকে তাহলে নিশ্চয়ই জানেন যে উইলফ্রিড ভয়নিচ ছিলেন এক পুরনো বই ব্যবসায়ী। ১৯১২ সালে এই বইটার তিরিশটা পাণ্ডুলিপি তিনি ক্রয় করেন। এরপর সাতবছর উনি অনেক পণ্ডিত ব্যক্তিকে দিয়ে এই লিপি পাঠোদ্ধারের চেষ্টা করেন, কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। এর রচয়িতা কে এই নিয়েও অনেক বিতর্ক আছে। তার মধ্যে এডওয়ার্ড কেলী একটি উজ্জ্বল নাম। এই রহস্যের কিনারা করতে এসে এবং এক গুপ্ত কাল্টের সংস্পর্শে এসে আমি প্রায় নিশ্চিত, এর রচয়িতা না হোক অন্তত পড়তে সক্ষম ছিলেন এডওয়ার্ড কেলীই। সেক্ষেত্রে এডওয়ার্ড কেলী সম্বন্ধে আমাদের একটু জানা দরকার। তাহলে ব্যাপারটা বুঝতে অনেকটা সুবিধে হবে। এডওয়ার্ড কেলী অত্যন্ত রহস্যময় একটি চরিত্র। ওঁর সম্বন্ধে যে অনেক কিছু জানা যায় তা নয়। ওঁর অতীত বেশ কুয়াশাবৃত।

“শোনা যায়, ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যভাগে তিনি এবং এক ইংরেজ উকিল যিনি কিনা ওয়েলসে যাচ্ছিলেন একটা রাতের জন্য এক সরাইখানায় আশ্রয় নেন। তিনি একটি অদ্ভুত টুপি পরেছিলেন যা ওঁর পুরো মাথা থেকে নেমে চিবুক অবধি ঢেকে রেখেছিল। সেই টুপি কিন্তু কখনওই কেলীর মাথা থেকে সরত না। ওঁর সম্বন্ধে কোনও বিবরণ দিতে হলেও এই টুপিটার কথা বারংবার উল্লেখ হত। ওই অদ্ভুত টুপির গঠনটাই এমন ছিল যে ওঁর কানদুটো কক্ষনও দেখা যেত না। ওঁর কানদুটো খুব সম্ভবত কোনও শাস্তি স্বরূপ কেটে নেওয়া হয়। ওই সরাইখানার মালিক কেলীকে এক পণ্ডিত ব্যক্তি বলে চিনতে পেরেছিলেন। একদিন রাত্রে সরাইখানার মালিক একটি পুরনো শতছিন্ন বই ওঁর সামনে মেলে ধরলেন। সরাইখানার মালিকের একটা অভ্যাস ছিল, ওঁর সরাইখানায় যত অতিথি আসতেন ওঁদের সবাইকেই এই বহু পুরনো জীর্ণ পাণ্ডুলিপিটা উনি দেখাতেন। কেলীকে দেখালে উনি এটার মাধ্যমে এক অপার সম্ভাবনার হদিশ পান। উনি জানতে চান, এটা ওই সরাইখানার মালিকের হাতে কী করে এল।

“সরাইখানার মালিকের কথা শুনে কেলী বুঝতে পারলেন যে কোনও ধর্মীয় যুদ্ধের সময় কিছু প্রটেস্ট্যান্ট সৈন্য কোনও ক্যাথলিক পাদ্রীর কফিন খনন করেছিল। তিনি একসময় যথেষ্ট ধনী ব্যক্তি ছিলেন। হয়তো ধনসম্পত্তির আশায় এমনটা করেছিল সেই সৈন্যদল। কিন্তু পাদ্রীর কফিন থেকে তারা এই পুরনো পাণ্ডুলিপি আর দুটো বল আবিষ্কার করে, লাল এবং সাদা। লাল বলটা ভেঙে তারা দেখার চেষ্টা করেছিল কী আছে ভেতরে। কিছু গুঁড়ো ছাড়া আর কিছু না পেয়ে তারা সেই বলটা ফেলে দেয়।

“কিন্তু কেলীর জহুরির চোখ অন্য কিছু দেখেছিল। তিনি ওই পাণ্ডুলিপি আর বল এক গিনি দিয়ে ক্রয় করে নেন। কেলীর অত্যন্ত পরিচিত এক ব্যাক্তি ডাঃ জন ডী যার কিনা প্রভূত জ্ঞান এবং আগ্রহ এইধরনের জিনিসে, তিনি সেই পণ্ডিত ব্যক্তিকে দেখালেন এই বল এবং পান্ডুলিপি। ডীর প্রথম ঝলকে দেখে মনে হয়েছিল যে এই পাণ্ডুলিপিতে ফিলোজফারস স্টোন সম্বন্ধে বলা আছে, কিন্তু সাংকেতিক ভাষাতে। তিনিও সাদা বলটাকে খুলে দেখলেন। তার ভেতর গুঁড়ো গুঁড়ো পাউডারের মতো জিনিস পান যা দেখে ওঁর মনে হয়েছিল, এই সেই পাউডার যা দিয়ে অ্যালকেমিস্টরা সোনা বানিয়ে থাকে। কিন্তু এইখানে মনে রাখতে হবে, এর সাথে আরও দুটো পাতা ছিল যা কেলী সরিয়ে রেখেছিলেন যেখানে এই পাণ্ডুলিপি পড়ার আসল রহস্যটা লুকিয়ে ছিল। এছাড়া এমন ঘটনা সম্ভব নয়।

“সোনা বানানোর নেশা মানুষের এমনই তীব্র যে কেলী আর ডী তাতে মেতে ওঠেন। কিন্তু এইখানে দুটো সমস্যা দেখা দিল। প্রথমত, কেলীর ইংল্যান্ডে এত বদনাম হয়ে যায় যে সেখানে টেকা বেশ দুরূহ হয়ে গেছিল।  তাছাড়া সোনা বানানো বেশ খরচ সাপেক্ষ ব্যাপার। কোনও পৃষ্ঠপোষক না থাকলে এটা সম্ভব নয়। তাই তারা দু’জনে যাত্রা করতে শুরু করলেন। বোহেমিয়া, জার্মানিতে গিয়ে পৌঁছলেন। যেখানেই যেতেন কেলী নিজেকে সোনা বানানোর গুপ্ত রহস্য জানেন বলে নিজের পরিচয় দিতেন। ফলস্বরূপ সব জায়গায় তাকে নিয়ে হুলস্থুল পড়ে যেত। বোহেমিয়ার সম্রাট তাকে মার্শাল অফ বোহেমিয়ার পদে নিযুক্ত করে দেন। তবে ওঁর লক্ষ্য ছিল সোনা তৈরির গোপন রহস্য উদ্ঘাটন করা। তিনি কেলীকে নজরবন্দী করলেন। শুধু নজরবন্দী নয়, পরে ওঁকে বন্দীও বানালেন যাতে সোনা বানানোর পদ্ধতি চিরতরে হারিয়ে না যায়।

“জন ডী ততদিনে নিজের অজ্ঞতা সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অবহিত হয়ে গেছেন। তাই তিনি চুপচাপ গা ঢাকা দিয়ে ইংল্যান্ডে পালিয়ে গেলেন। রানি  এলিজাবেথের শরনাপন্ন হলেন। সেই অদ্ভুত পাণ্ডুলিপির কোনও কিনারা হল না। কিন্তু তথ্য বলছে, টমাস অ্যালবট যিনি কিনা জন ডীর বাড়িতে পরে আতিথেয়তা গ্রহণ করেছিলেন, তিনি এডওয়ার্ড কেলীর নিজের ভাই। ওঁর কাছে তার বড়ো ভাই অর্থাৎ এডওয়ার্ড অ্যালবট ওরফে এডওয়ার্ড কেলী (পরে উনি নিজের নাম পরিবর্তন করেন) দুটো পাতা দিয়েছিলে যা তিনি সরিয়ে রেখেছিলেন এবং ওঁকে নির্দেশ দিয়েছিলেন সেই বিদ্যা চর্চা করার।

“টমাস দেখলেন, তাতে লতাপাতা দিয়ে বানানো এক পানীয় প্রস্তুতের কথা বলা হয়েছে যা পান করলে মস্তিষ্কের অনেক রুদ্ধ দ্বার খুলে যায় এবং আমাদের অগণিত যে সমান্তরাল দুনিয়া আছে সেইসব দুনিয়ার সাথে যোগাযোগ সম্ভব হয়। কিন্তু এ-বিদ্যা অনুপযুক্ত মানুষের হাতে পড়লে সর্বনাশ হতে পারে। তাই উপযুক্ত ব্যক্তিরাই এর উত্তরসূরি হবার যোগ্য। টমাস অ্যালবটই এই গুপ্ত কাল্টের প্রবক্তা। ওঁর সম্বন্ধে খুব কম তথ্যই জানা যায় বহির্জগতে। কিন্তু এই কাল্টের সদস্যরা সর্বপ্রথম ওঁর সম্বন্ধেই তথ্য আহরণ করে থাকেন। অ্যালবট পরিবার বংশানুক্রমে এইধরনের পানীয় প্রস্তুত করে আসছেন যা কিনা ব্রাজিলের শামামরাও করেন। কিন্তু ওই নির্দিষ্ট গাছ ছাড়াও আরও কিছু গাছপালা আছে যা দিয়ে এমন ডি.এম.টি প্রস্তুত করা সম্ভব। সেসবই এই কাল্টের সদস্যদের শেখান হয় এবং তারা নিয়মিত অনুশীলন করেন। অন্য জগতের সাথে যোগাযোগের ফলে তারা যা দেখে তাই যেমন পাবলো আমারিঙ্গো আঁকেন। তেমনই সেই অগ্রসর প্রজাতির থেকে নির্দেশেই ওই সব ভয়নিচের আঁকা এবং তার তাৎপর্য একমাত্র এই কাল্টের সদস্যরাই উদ্ধার করতে পারেন। কিন্তু এটা এত গোপনীয় একটা ব্যাপার যে হাতে গোনা কিছু মুষ্টিমেয় মানুষ এই কথাটা জানে।

“এই অদ্ভুত পানীয়র অনুপাতটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। ভুলভাল অনুপাত মানুষকে পাগল বানিয়ে দিতে পারে। শুধু ভারসাম্যহীন নয়, মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। এই গোপন কাল্টের এক সদস্যর সাথেই বিয়ে হয় অসিতবাবুর পিসিমার। তাকে উপযুক্ত মনে করাতে পুরোদস্তুর তাকে গড়ে পিটে নেওয়া হয়েছে। পিসিমার নিজের ঐকান্তিক ইচ্ছে এবং আন্তরিকতাও প্রবল ছিল। কিন্তু নিজেদের এই চর্চা বজায় রাখতে এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে এইধরনের উদ্ভিদ যাতে হারিয়ে না যায় তাই নিয়ে পড়াশোনা ও গবেষণার জন্য ওঁর স্বামী হেনরি অ্যালবট বিশ্বব্যাপী ঘুরে বেড়াতেন। বিশ্বব্যাপী এই ডি.এম.টি শ্রেণীর উদ্ভিদের ওপর ওঁর উল্লেখযোগ্য কাজ আছে। আসলে উনি যে বোটানিরই প্রোফেসর ছিলেন। ওঁর গবেষণালব্ধ কাজের জনই পিসিমা এই পুরুলিয়ার মাটিতে এইধরনের রেয়ার শ্রেণীর উদ্ভিদ বপন করেও সফল হয়েছেন।

“কিন্তু ওঁদের যে কন্যাসন্তান অর্থাৎ, তিথির মায়ের এইদিকে বিশেষ কোনও ঝোঁক ছিল না। যোগ্য উত্তরসূরির জন্য ওঁকে বিয়ে দেওয়া হয় এক ভারতীয় বংশোদ্ভূত কিন্তু জার্মানির এক বৈজ্ঞানিকের সাথে। তিনি আজ আমাদের মধ্যে উপস্থিত। আসুন, মিঃ সুকল্প চ্যাটার্জি। আপনি ভারতীয় বংশোদ্ভূত বলেই কি ভারতের মাটিতে কাজ করার কথা চিন্তা করেছিলেন?”

“সেটা তো আছেই। তাছাড়া ভারতীয় জঙ্গলেও ডি.এম.টি-র উদ্ভিদের অনেক উপাদান আছে।”

কী করে যেন আমার মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল, “তবে যে শুনেছিলাম, তিথির মা আত্মহত্যা করেছিলেন!”

“আসলে তিনি যে যোগ্য উত্তরসূরি হতে পারেননি তাই নিয়ে ওঁর মনে ক্ষোভ ছিল। শুধু ক্ষোভ নয়, হীনমন্যতাতেও ভুগতেন। কিছুটা জেদের বশেই নিজে আইজাওয়াস্কা পানীয় তৈরি করে খেতে গিয়ে ভুলভাল অনুপানের জন্য বেঘোরে প্রাণ হারান।”

“সেই জন্যই বোধহয় তিথির দিম্মা ওকে অনেক ছোটবেলা থেকে তালিম দিতে শুরু করেছেন?”

“একদমই তাই। উনি ঐ শকটা নিতে পারেননি। বেশিরভাগ লোকই ওটাকে সুইসাইড হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন। সেটা যে নয় তা বলতে গেলে এত বেশি ব্যাখ্যা দুনিয়াকে দিতে হত যে আমরা আতঙ্কিত ছিলাম যে কোনও গুপ্ত তথ্য ফাঁস না হয়ে যায়। তারপর তিথির দাদুও দেহ রাখলেন। তখনই তিথির দিম্মা ওকে নিয়ে ভারতে আসবেন বলে ঠিক করলেন। তখন ভারতে আমিও আছি।”

“আপনি কি দার্জিলিংয়ে থাকতেন?” আমি জিজ্ঞেস করে উঠলাম।

“হ্যাঁ।”

“তাহলে ঐ কারণেই তিথি দার্জিলিংয়ের কনভেন্টে পড়ত?”

“ঠিকই। কিন্তু ওর আসল জিনিসে তালিম হচ্ছে না বলে তিথির দিম্মার অর্থাৎ তুহিনা অ্যালবটের ভীষণ চিন্তা হচ্ছিল। উনি ঘুরে ঘুরে পুরুলিয়ার ও-গ্রামে একটু অনুকূল পরিস্থিতি পেয়ে থিতু হয়ে বসেছিলেন।”

“সেখানে তো আপনাদের গবেষণার সোনার ফসল ফলেছিল। অ্যামাজন রেন ফরেস্টে যে গাছ হয় তাই আপনারা পুরুলিয়ার মাটিতে ফলিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন।”

নিজের স্তুতি শুনে একটু বোধহয় লজ্জা পেলেন তিথির বাবা। “না না, পুরো কৃতিত্ব আমার নয়। আমার শ্বশুরমশাইয়েরও আছে। ওঁর এই নিয়ে বিশ্বব্যাপী যা কাজ আছে তা পৃথিবীর মানুষের সামনে এলে ওঁকে নোবেল দিতে কেউ কুণ্ঠা বোধ করতেন না। আর তুহিনা আলবটের সঙ্গীত প্রতিভা।”

“কিন্তু সেসবের আন্দাজ অসিতবাবু পেলেন কী করে?” আমি যেন আর কৌতূহল চেপে রাখতে পারছিলাম না।

“ঐ যে, তিথিকে নিয়ে আসার ভারটা অসিতবাবুকে দেওয়া হয়। তাছাড়া তিথির দিম্মা তো এই বাড়ির মেয়ে। তাই ওঁর সম্বন্ধে কিছু খোঁজখবর তো ওঁরা রাখতেনই।”

“আপনারা অত্যন্ত স্বার্থপর। দুনিয়ার সামনে যদি আসে এমনসব দুষ্প্রাপ্য শেকড়বাকড়, সেটা তো আদতে মানবজাতিরই কাজে লাগবে।”

হঠাৎ দেখলাম পূবালী দাশগুপ্তর গলাটা বদলে গেল। “কিন্তু সেক্ষেত্রে কি পেটেন্টটা আপনি তুহিনা অ্যালবটকে দিতেন? তাহলে তো এই দিনই দেখতে হত না, অসিতবাবু!”

হঠাৎ সরোষে গর্জে উঠলেন অসিতবাবু, “কী, বলতে চাইছেন কী?”

গম্ভীর স্বরে দিদিভাই বলল, “তাহলে পরিষ্কার করেই বলি। আপনি যেদিন বুঝতে পারলেন এই আইজাওয়াস্কার প্রবল সম্ভাবনার কথা এবং এই অন্য জগতের সঙ্গেই সম্পর্ক রচনা করে অ্যালবট পরিবার ভয়নিচের মতো রহস্যে মোড়া বইয়ের সব উদ্ভিদের উপকারিতা সম্বন্ধে অবহিত হয়েছেন সেদিন থেকেই নিজের ধান্দায় ছক কষতে শুরু করে দিয়েছেন। মৃদুলবাবু দলে ছিলেন না বলে ওঁর দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাকেও দলে টানলেন। উনি পরলোকগত আত্মার চর্চা করতেন। ওঁর মগজ ধোলাই করলেন যে এ পানীয় পরলোকগত আত্মা নামাতেও সক্ষম।”

“কী, বলছ কী পূবালী? পরিষ্কার করে বলো তো!” এবার অখিলবাবু বলে উঠলেন।

“হ্যাঁ, এবার সবকিছু পরিষ্কার করে বলবার সময় এসেছে বৈকি! আইজাওয়াস্কার দরুন ট্রান্স মত সিচুয়েশনে যারা অভ্যস্ত তারা অনেক অদ্ভুত এবং অভিনব জিনিস দেখতে পায়। যেমন ধরুন, শুনতে অবাক লাগলেও সত্যি যে ফ্রান্সিস ক্রিক, যিনি কিনা ডি.এন.এ-র গঠন আবিষ্কার করে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন, তিনি তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মহলে কবুল করেছিলেন যে তিনি এল.এস.ডি নিতেন নিয়মিত। তখনই তিনি ঐ ঘোরের মধ্যে ঐ বিখ্যাত ডি.এন.এ-র ডবল হেলিক্স-এর গঠনটা দেখেছিলেন। আমাদের মস্তিষ্কের গোপন কোষে এমন অনেক অফুরন্ত জ্ঞানের ভাণ্ডার আছে। সেটাকে উদ্দীপিত করতেই আইজাওয়াস্কা বা ঐ জাতীয় হ্যালুসিনেশনের এর প্রয়োজন হয়। কিন্তু সবার মন বা শরীরর এটার জন্য প্রস্তুত নয়। এটা একটা সংরক্ষিত বিদ্যা যা একসময় খুব মুষ্টিমেয় মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এই গুপ্ত সমিতি বা কাল্ট-এর সদস্যদের চিহ্ন হচ্ছে এই ফণা তোলা সাপ। অনেকের মতে এই পানীয়র দরুন বহির্জগতের উন্নত প্রাণীদের সাক্ষাত মেলে। তারাই এইসব নানাবিধ জ্ঞান প্রদান করে মানবজাতির উন্নতির জন্য।

“তা, এবার অসিতবাবু এই পানীয়র প্রবল সম্ভাবনার কথা শুনে লোভে পড়ে যান। একটা সঞ্জীবনী ওষুধের সন্ধান পেলেই কেল্লা ফতে। উনি ওঁর পিসিমাকে বলে খুব একটা সুবিধে করতে পারেননি। কিন্তু অভাবনীয়ভাবে সুযোগটা চলে এল। পিসিমাকে ডাইনি সন্দেহে পুড়িয়ে মারতেই তিথি আপনার সাথে যোগাযোগ করে। আপনি ওর সাথে কথা বলেই বুঝতে পারেন যে সেও কিছু কম পারদর্শী নয়। তাকে ভালো করে গড়ে পিটে নিয়েছেন তার দিম্মা। যতই হোক তার জিনেই আছে এইসব রসদ। অতএব সে অতিদ্রুত তার দিম্মার থেকে সব শিখে নিয়েছিল। তাকে যোগ্য উত্তরসূরি বানাবেন বলে তার দিম্মার আন্তরিক প্রচেষ্টা ছিল সবসময়। সে কারণেই উনি দার্জিলিং থেকে তিথিকে নিয়ে এসেছিলেন নিজের কাছে। তাকে দিয়ে একদিন আইজাওয়াস্কা সেশন করাতে পারলে ব্যাপারটা জমে যাবে। প্রথমত উনি কোনও শেকড়বাকড়ের সন্ধান পেয়ে তার পেটেন্ট নিয়ে যদি কোনও যুগান্তকারী ঔষধ তৈরি করতে পারেন তাহলে ওঁর মুনাফা লোটা আটকায় কে।

“আর এদিকে মৃদুলবাবুর ছিল প্রবল প্রেতচর্চার আগ্রহ। উনি মনে করলেন, যদি পরলোকগত আত্মাকে আনা যায়, সেই সুবাদে কোনও প্ল্যানচেট সেশন করা যেতে পারে। প্রথম যে বিজ্ঞাপনটা খবরের কাগজে গেছিল তাতে আমি যোগ দিয়েছিলাম। সেখানেই আমি আসল তিথিকে দেখি। মৃদুলবাবু এবং অসিতবাবুও ছদ্মবেশে উপস্থিত ছিলেন। নেহাতই কৌতূহলের বশে গিয়েছিলাম। বেশিরভাগ লোকই সেই পানীয় খেতে পারেননি। এত জঘন্য তার স্বাদ। আমি কিঞ্চিৎ খেয়ে খানিক ঐ ট্রান্স মানে ঐ ঘোরমতো অবস্থায় গেছিলাম। তাতে সরীসৃপ জাতীয় কিছু প্রাণী দেখেছিলাম। এর বেশি কিছু নয়।”

আমি বিপুলভাবে চমকে উঠে বললাম, “তাই নাকি!”

“হ্যাঁ। তবে সেবার কোনও মিসহ্যাপ হয়নি কারণ, স্বয়ং তিথি ঐ পানীয় বানিয়েছিল। অনেকেই বলেছিল যে পরলোকগত দিদা-ঠাকুমার সাক্ষাৎ পেয়েছিল। আমার বিশ্বাস, তিথির খোঁজে তার বাবা তখন কলকাতায় এসে পৌঁছে ঐ বিজ্ঞাপন দেখেন এবং তিনিও সেখানে হাজির হয়েছিলেন।”

“একদম ঠিক। আমাদের নিয়ম হচ্ছে, সক্রিয় কর্মী ছাড়া আমরা কারুর সাথে মোবাইলে যোগাযোগ রাখতে পারি না। তিথির দিম্মার দুর্ঘটনার কথা পেপারে পড়তেই আমি এখানে এসে দেখি সে নেই। আমার দলের এক কর্মীকে ওখানে রাখতেই হয়েছিল কারণ, ওখানে তুহিনা অ্যালবটের গবেষণার কাগজপত্র, তার আঁকা আইজাওয়াস্কা সেশনের অভিজ্ঞতা এবং সর্বোপরি ঐ মাটিতে ফলানো অত্যাশ্চর্য সব গাছ সংরক্ষিত আছে। একেকটা গাছের যে কী বিপুল গুণাবলী—দেখলে শুনলে তাক লেগে যাবে। আমি আমার লোক ওখানে মোতায়েন করে চলে আসি এবং অতি সন্তর্পণে বাহাদুরের সাহায্যে তিথিকে ওদের কবল থেকে আমার কাছে নিয়ে রাখি। কিন্তু ততক্ষণে ওঁরা আপনাকে নিযুক্ত করেছেন দিম্মার রহস্যের কিনারার জন্য। আর কিছুটা রহস্য উদ্ঘাটনের আশাতেও ছিলেন যদি আপনি অনুসন্ধান করতে গিয়ে কিছু তথ্য আলাদা করে গাছপালা সম্বন্ধে দিতে পারেন। তা এইবার তিথির চেহারার সাথে ওঁদের ওষুধের দোকানের একটা অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান মেয়ের চেহারার বেশ মিল ছিল। সেই এমিলি জেফারসন। তাকে পয়সার লোভ দেখিয়ে পটিয়ে পাটিয়ে তিথি সাজানো হয়। এদিকে তো দ্বিতীয় দফায় প্ল্যানচেটের বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়ে গেছে, অতএব কাউকে একটা তিথি সাজাতেই হত।”

“মানে আমাদের আসল তিথির সাথে দেখা করতে দেওয়া হয়নি?” আমার মুখ ফসকে কথাটা বেরিয়ে গেল।

“একদমই তাই, মিঠি। প্রথম থেকেই ওর কথায় নানা গরমিল লাগছিল। ওকে শিখিয়ে পড়িয়ে রাখা হয়েছিল। কিন্তু তারপরেও অনেক ভুলত্রুটি থেকেই যায়। আমার প্রথমদিনই নানা কারণে সন্দেহ হয়েছিল যেগুলো আমি বললাম আগে। আরও নিঃসন্দেহ হলাম যখন বরন্তিতে গিয়ে দিম্মার সাথে একটা ছবি দেখলাম। এটা যে আমি দেখে ফেলেছি তা মৃদুলবাবু খেয়াল করে থাকবেন। খবর পৌঁছে যায় অসিতবাবুর কাছে। তখনই ওঁরা তিথি অপহৃত হয়েছে এটা বলবেন বলে ঠিক করেন। আর এই সূত্র ধরে যদি আসল তিথি উদ্ধার হয় তাই বা মন্দ কী! আর এই ব্যাপারে অখিলবাবুর অগ্রণী ভূমিকা ছিল। উনি ওঁর বোনের মৃত্যুর কিনারা করতে চেয়েছিলেন।”

“ঐ জন্যেই কি ওঁরা আমাদের যেতে দেননি তিথির ইস্কুলে?”

“একদমই তাই। সেখানে নিশ্চয়ই তিথির একদম সাম্প্রতিক কোনও স্কুল ফটোগ্রাফ ছিল এবং তাতে দুই চেহারার গরমিলটা আরও সহজে ধরা পড়ত। তাই আমাকে আটকে দেওয়া হল।”

“হ্যাঁ, ইস্কুলে আমার একটা বড়ো ছবি টাঙানো আছে তো!” তিথি বলে উঠল।

“ঐ কারণেই তুমি ধরতে পেরে গেছিলে যে তিথিকে কিডন্যাপ করা হবে! নকল-আসলের ধোঁয়াশাটা কাটানোর জন্য!”

“হ্যাঁ, ব্যাপারটা দুয়ে দুয়ে চার করে মিলে গেছিল।”

“কিন্তু তাহলে ঐ হুমকি আর ছবি?”

“আমার লোক ছিল ওখানে আমি বলছিলাম না? সে বুঝতে পেরেছিল যে পূবালী দাশগুপ্ত যথেষ্ট এনলাইটেন্ড। সেখানে উনি সব মন দিয়ে দেখেছেন। শুধু দেখেছেন নয়, ফটোও তুলেছেন। তাতে আমাদের অনেক ক্ষতি হতে পারে যদি ভুল কোনও লোকের হাতে পরে। কিন্তু যে মুহূর্তে আমার মনে হয়েছে যে উনি তিথির কোনও ক্ষতি করবেন না, উলটে হয়তো সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে পারেন, তখনই আমি ওঁর অফিসের নম্বর অর্থাৎ ফোর্থ ডাইমেনশানের নম্বরে যোগাযোগ করি। কিন্তু আমায় বলুন, আপনি কী করে বুঝলেন যে তিথিকে আমিই সরিয়েছি?”

“গাঙ্গুলি ম্যানসনের বাইরে একটা বিদেশি সিগারেটের টুকরো এই সূত্রটা আমায় ধরিয়ে দিয়েছিল। বাড়ির ভেতর নিশ্চয়ই বাহাদুরচাচা আপনাকে সাহায্য করেছিল।”

বত্রিশ পাটি বের করে হাসলেন সুকল্প চ্যাটার্জি। “হ্যাঁ, দার্জিলিং নিবাসী বলে তিথির দিম্মাই গোপনে বাহাদুরচাচার সাথে আমার যোগাযোগ করিয়ে দেন। আমি বুথ থেকে ফোন করে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতাম বাহাদুরচাচার সাথে।”

“এটা আমি আন্দাজ করতে পারছিলাম, কিন্তু এই বাড়িতে কোথায় লুকিয়ে থাকতে পারে তাই নিয়ে কেমন একটা সন্দেহ ছিল। কিন্তু যেদিন মিঠি বলল ও একা ছাদে উঠে যখন ছাদের টবগুলো দেখছিল তখন ও একটা পায়ের আওয়াজ ওপরে আসতে শুনল কিন্তু নিচে নামতেও শোনেনি, আবার কাউকে ছাদে আসতেও দেখেনি তখনই আমি নিঃসন্দেহ হলাম যে ছাদের সিঁড়ির কাছে নিশ্চিতরূপে কোনও গুপ্তঘর আছে। আমার ধারণা, এমিলি জেফারসনকে সেখানেই রাখা হয়েছিল। আসলকে ঢাকতে গিয়ে নকলকে এনে আরেক বিপদে পড়লেন অসিতবাবু। আমার চোখকে ধুলো দিতে নকলকেও লুকোতে হল। তাই এমিলি তার ডায়েরিতে লিখেছিল যে পূবালী দাশগুপ্তর জন্য বাড়ি ফেরা হচ্ছে না।”

“কিন্তু তুমি দার্জিলিং গেলে কেন, দিদিভাই?”

“দার্জিলিং তো আমি যাইনি। কলকাতার বুকেই ছিলাম। তিথি, সুকল্পবাবুর সাথে ওঁদের ডেরায়। সে এক অনন্য অভিজ্ঞতা। পরে কোনও সময় বলা যাবে। তবে আমি চাইছিলাম যে ক্লারা জেফারসন আমার ডেরায় আসুন যাতে আমি ওঁকে সুরক্ষা দিতে পারি। এই অজ্ঞাতবাস ওঁর এবং আমার পক্ষে জরুরি ছিল। একা মহিলা থাকেন। বড্ড উদ্বিগ্ন ছিলেন ভাইজিকে নিয়ে। বাড়ির বাইরে না থাকলে কাজগুলো করা সম্ভব হত না কারণ, ততক্ষণে গাঙ্গুলি পরিবার বুঝতে পেরে গেছে যে আমি বিপজ্জনক হয়ে উঠছি। শেষে কেঁচো খুঁড়তে না কেউটে বেরিয়ে পড়ে! তাই আমার মনে হয়েছিল যে ওঁরা আমার ওপর নজরদারি করতে পারেন, তাই সরে গিয়েছিলাম। একটু আড়ালে থাকলে তদন্ত চালাতে সুবিধে হয়। ক্লারা জেফারসন ডায়েরিতে আমার নাম দেখে ছুটে এলেন আমার খোঁজ করে। তাতে আমাদেরই লাভ হল। কিন্তু এ-খবর গাঙ্গুলি ম্যানসনে পৌঁছলে সমূহ বিপদ ছিল। তাই আমি ওঁকে তিথি এবং সুকল্পবাবুর সাথে অন্য ডেরাতেই রাখা সাব্যস্ত করলাম। এদিকে আগের হপ্তা থেকে এই প্ল্যানচেট সেশন শুরু হয়েছে। তাতে এত লাভ দেখে এবার যে হবে আমি নিশ্চিত ছিলাম এবং তখন নকল তিথিকে না এনে উপায় নেই। কারণ, আগের সেশনে থেকেই আমি দেখেছিলাম তিথিকে অসিতবাবু এবং মৃদুলবাবু দর্শকদের সামনে বিপুল গুরুত্ব দিচ্ছিলেন এবং এমন অভাবনীয় সব তথ্য তিথি দিচ্ছিলেন যে অনেকেই জানতে চেয়েছিলেন যে পরের সেশনে তিথিই আসবে কি না, নতুবা তারা টিকিট বুক করবে না। অতএব আমি একদম শিওর ছিলাম যে এখানেই আমি নকল তিথি ওরফে এমিলির দেখা পাব। তবে এমিলিকে ধন্যবাদ দিতেই হবে যে তার ডায়েরি লেখার অভ্যাস ছিল এবং সে প্রতিদিনের খুঁটিনাটি যদি-বা কিছু বাদ দিয়েও থাকে, তাকে যখন গা ঢাকা দিতে হবে সে সময় অন্তত আমার নামটা উল্লেখ করেছিল। না হলে ক্লারা জেফারসান আমাদের খোঁজ করতেন না আর এমিলির আরও বড়ো কোনও বিপদ হতে পারত।”

সবাই এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো শুনছিল মন দিয়ে। অসিতবাবুর বাবাই মুখ খুললেন। “ওটা তো একটা কুলাঙ্গার, কিন্তু তুমি মৃদুল, তোমার পরলোকগত চর্চার জন্য তুমি এতদূর যেতে পার! আমি তোমাকে সাবধান করেছিলাম, এ নেশা সাংঘাতিক নেশা।”

“আপনার তো প্রথম থেকেই এতে আপত্তি। কী আর এমন হয়েছে!”

“থাক, মৃদুলবাবু। আপনিও আমাদের সাথে থানায় আসবেন।”

যেরকম ঝাঁঝিয়ে উঠে কথাগুলো বললেন মৃদুলবাবু তাতে এই কণ্ঠস্বরটা আমার চেনা মনে হল। প্রথমদিন গাঙ্গুলি ম্যানসনে এসে যে বাকবিতণ্ডাটা শুনেছিলাম সেটা আদতে মৃদুলবাবুর গলা ছিল।

“কিন্তু আমি একটা কথা বুঝতে পারছি না, একালের শিক্ষিত মেয়ে হয়ে শুধু টাকার লোভে এমিলি এমন করতে রাজী হয়ে গেল!” অখিলবাবু একটু আশ্চর্য হয়ে বললেন।

“আমার মনে হয় এক্ষেত্রে মৃদুলবাবু নিজের সম্মোহনী বিদ্যাকে পুরোমাত্রায় কাজে লাগিয়েছিলেন। ওঁর সম্মোহনী কণ্ঠস্বরও বড়ো সহায়ক ওঁর এই বিদ্যাচর্চার ক্ষেত্রে। কী, ঠিক বললাম তো, মৃদুলবাবু?”

“যান যান, এদের সব আমার চোখের সামনে থেকে নিয়ে যান।” অখিলবাবু ঘৃণার সাথে কথাগুলো বললেন। “আর শোন, তোদের যা ইনকাম হয়েছে ঐ প্ল্যানচেট মিশন থেকে তার পুরোটাই আমি দেব পূবালীকে ওর কৃতিত্বের জন্য।”

এমন চমকে মৃদুলবাবু আর অসিতবাবু তাকালেন যে ওঁদের মুখের এক্সপ্রেশন দেখে আমার বেদম হাসি পাচ্ছিল। ওহ্‌! দিদিভাইয়ের ভালো করে ঘাড় ভাঙতে হবে। যা মজা হচ্ছিল না শুনে!

আচমকাই তারপর দৃশ্যপট বদলে গেল। প্রবল ঘৃণা থেকে যাকে বলে প্রগাঢ় ভালোবাসা।

“কোথায় তুই? আয় দেখি দিদিভাই, আয় দেখি। আমার কাছে আয়। তোকে ভালো করে দেখি। সেদিন এক রাত্তির থাকলি কি না থাকলি, তুহিনা নিয়ে চলে গেল। কত আদরের তুই আমাদের তা তুই জানিস!”

তিথি গুটিগুটি পায়ে উঠে এল তার দাদুর কাছে। দাদু-নাতনির এক স্বর্গীয় মিলনের সাক্ষী তখন আমরা।

অলঙ্করণঃ শিমুল

 জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

3 Responses to উপন্যাস অদ্ভুত পানীয় ও একটি গুপ্ত কাল্ট বৈশাখী ঠাকুর শরৎ ২০১৯

  1. সুদীপ says:

    বাহ্..ফাটাফাটি উপন্যাস..বেশ ভাল লাগল

    Like

  2. রুমেলা says:

    অপূর্ব লাগল। টানটান উত্তেজনা

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s