উপন্যাস-নূর এ হিন্দুস্তান-রাজীবকুমার সাহা শরৎ ২০২০

রাজীবকুমার সাহার অন্যান্য গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ 

নূর-এ-হিন্দুস্তান

রাজীবকুমার সাহা

ভোরের আলো ফুটে গেছে ততক্ষণে যে সৈনিক মুত্থুর বুকে চেপে বসে তার গলা টিপে ধরেছিল সে এক ঝটকায় মাটি থেকে উঠে এসে অর্ধোত্থিত মুত্থুর সামনে এসে দাঁড়াল মুহূর্তে খোলা তলোয়ার বিদ্যুৎবেগে ঝলসে উঠল তার অজ্ঞাত এক গহিন অরণ্যে এক অজ্ঞাতকুলশীল শ্রমিকের রক্তে ইতিহাসের এক বর্ণময় অভিশপ্ত অধ্যায়ের সূচনা হয়ে গেল

 প্রথম অধ্যায়

।। এক ।।

 তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেলে লক্ষ না করলে জলপানরত মূর্তিটিকে প্রথম দৃষ্টিতে কৃষ্ণকায় এক পাথরখণ্ড বলেই ভুল হয়। গভীর বনে আচ্ছাদিত কৃষ্ণার তীরে উবু হয়ে বসে অঞ্জলি ভরে নিজের তৃষ্ণা মেটাচ্ছে সে। পরনের জীর্ণ কটিবস্ত্রখানাও মাটিরই রং ধরেছে। কিন্তু একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলে দেখা যাবে তৃষ্ণা মিটিয়ে নিয়ে খানিক সরে এসে এক গাছের গুঁড়িতে পিঠটা ছেড়ে দিয়ে নাগালের মধ্যে থাকা পুঁটুলিটা টেনে নিয়েছে সে। তারপর ভেতরে হাত চালিয়ে সন্তর্পণে একটুকরো কাপড় গিঁট দেওয়া আরেকটা অপেক্ষাতর ছোটো পুঁটুলি বের করে এনেছে। বাড়ি থেকে পালাবার সময় এই পুঁটুলিতে কিঞ্চিৎ আহার্য বেঁধে এনেছে সে। গিঁট খুলে আহার্য সামগ্রীর ওপর গভীর শ্বাস টানতেই ভ্রূ যুগল সামান্য কুঁচকে উঠল তার। চালের গুঁড়োয় অন্যান্য আনুষঙ্গিক সামগ্রী মিশিয়ে পুলিহরা নামক এই আহার্য প্রস্তুত করা হয়েছিল গতরাতে। বর্তমানে সূর্য আকাশের চূড়া থেকে ঢলতে শুরু করলে পুলিহরারও স্বাভাবিক অম্লত্ব বৃদ্ধি পেয়ে তা প্রায় বিষাক্ত হয়ে উঠেছে।

পুঁটুলিটা কৃষ্ণার জলে বিসর্জন দিয়ে উঠে দাঁড়াল মূর্তিটা। তার কষ্টিপাথর সদৃশ পেশীবহুল ঋজু দেহ ঈষৎ ক্লান্ত। গাছের কাণ্ডে ঠেস দিয়ে রাখা পাকা লাঠিটার একপ্রান্তে গাঁঠরিখানা ঝুলিয়ে নিয়ে চতুর্দিকে সন্ত্রস্ত দৃষ্টি ফেলে জঙ্গলাকীর্ণ একচিলতে পায়ে হাঁটা পথ ধরল সে। আন্দাজে তাকে পথিক বলেই মনে হয়। কিন্তু চতুর্দিকে সহস্র সাবধানী নজর রেখেও একজোড়া অনুসন্ধানী দৃষ্টি যে শুরু থেকেই তার পিছু নিয়েছে তা পথিকের আর নজরে এল না।

সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হয়েছে। গভীর বনের মধ্যে অদূরবর্তী একখানা আলোকবিন্দুর প্রতি সহসা দৃষ্টি আকর্ষিত হতেই চোখদুটো পুলকিত হয়ে উঠল শঙ্কিত পথিকের। আলোটা অনুসরণ করে নিকটবর্তী হতেই সচকিতে এক শতাব্দী-প্রাচীন অশ্বত্থের নীচে ধ্যানমগ্ন এক সন্ন্যাসীর অবয়ব আবিষ্কার করল সে। সর্বাঙ্গে বিভূতি মাখা জটাজুটধারী উলঙ্গ সে সন্ন্যাসী ধুনি জ্বালিয়ে মুদিত চোখে নিমগ্ন চিত্তে ইষ্টের আরাধনারত—বয়সের গাছপাথর নেই। মাথা থেকে নেমে এসে বুক বেয়ে বটের ঝুরির মতো কতকগুলো পিঙ্গল বর্ণের সর্পিল জটা মাটিতে নেমে এসেছে। মুহূর্তে চোখদুটো চকচক করে উঠল পথিকের। যে উদ্দেশ্যে সে আজ এই বনে উপস্থিত হয়েছে তা সফল হয় যদি কোনোক্রমে সন্ন্যাসীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে ভোল পালটে নেওয়া যায়। তার বিন্দুবিসর্গের হদিশও তাহলে কেউ কোনোদিন পাবে না আর।

এই অভিসন্ধি নিয়ে পথিক শ্রান্তদেহে হাঁটু গেড়ে মাটিতে মাথা ছোঁয়াবার উপক্রম করতেই আচমকা চোখ খুললেন সন্ন্যাসী। আরক্ত চোখদুটো যেন ভাঁটার মতো জ্বলছে। কমণ্ডলু থেকে হাত তুলে তর্জনী উঁচিয়ে হুঙ্কার ছাড়লেন, “সাবধান রে পাপিষ্ঠ! ওই অভিশপ্ত জিনিস নিয়ে আমার ত্রিসীমানায় ঘেঁষবি না।”

পথিক থতমত খেয়ে চতুষ্পদ জন্তুর মতো দুই করতল আর দুই হাঁটু মাটিতে ঠেকিয়ে রেখেই মাথা তুলে তাকিয়ে রইল অপলক। অবশ্য অবিলম্বেই সন্ন্যাসীর মুখমণ্ডলে ভাবান্তর পরিলক্ষিত হল। দৃষ্টি স্বাভাবিক হবার পর মুখে খানিকটা স্মিতহাস্য টেনে জিজ্ঞেস করলেন, “পালিয়েছিস, না রে?”

পথিকের উত্তরের অপেক্ষা না করেই আবার বললেন, “তবে যে ভয়ংকর বস্তু তুই সঙ্গে নিয়ে এসেছিস তা সাংঘাতিক অভিশপ্ত। এক ঈশ্বর আর কোনও স্ত্রীলোক ছাড়া যে-ই এ-জিনিস কাছে রাখবে তার সর্বনাশ অবধারিত। যা যা, শিগগির যা, ছুড়ে ফেলে দিয়ে আয় ওই আপদ কৃষ্ণার জলে। দেরি করিস না এক মুহূর্তও।”

পথিক তখন বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচল আর অতিমাত্রায় আশ্চর্যের ধাক্কা কাটিয়ে ধীরে ধীরে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ছিল। তার ঝুলির ভেতরে যে এক অমূল্য সম্পদ গোপনে রাখা আছে তা সন্ন্যাসী টের পেলেন কী উপায়ে! আর জিনিসটা নিয়ে প্রভাতের আলো ফোটবার আগেই সে যে বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে তাই বা সন্ন্যাসী জানলেন কেমনে! এ কোন অন্তর্যামীর পাল্লায় পড়ল সে!

“কী রে ব্যাটা, অবাক হয়ে গেলি যে বড়ো? নাম কী তোর? এলি কোত্থেকে?”

“আজ্ঞে, না-নাম মুত্থু মঙ্গলম, বাবা। থাকি গোলকুণ্ডায়।”

“এবার খুলে বল দেখি বৃত্তান্তটা। জল খাবি? নে।” বলে সন্ন্যাসী কমণ্ডলুর হংসগ্রীবা অল্প ঝুঁকিয়ে ধরলে মুত্থু গণ্ডূষ ভরে জলপান করে স্বস্তি পেল খানিকটা। হাতের পিঠ দিয়ে ঠোঁট মুছে নিবেদন করল, “আপনি তো সাক্ষাৎ অন্তর্যামী, বাবা। কিছুই তো অগোচর নেই আপনার।”

সন্ন্যাসী উচ্চৈঃস্বরে হেসে ওঠে বলেন, “তবুও তুইই বল তোর কথা। পালালি কেন?”

“কাজ করতাম এক হিরে-খনিতে বাবা। কল্লুর রায়ালাসীমা খনিতে। ছোটোবড়ো প্রচুর হিরে-জহরত তুলেছি এই দুই হাতে। কাজে মনোযোগ আর দক্ষতার পরিচয় পেয়ে মালিক গত কার্তিকে খনি-সর্দার করে দিলেন। দ্বিগুণ উৎসাহে কাজ করতে লাগলাম। দিন চারেক আগে হঠাৎ এক আশ্চর্য জিনিসের সন্ধান পাই আমি। খনির ভেতরের সবচেয়ে বিপজ্জনক বাঁকটাতে কাজ করছিলাম আমি আর আমার ভাগনে কুট্টি। দুপুরের খাওয়া হয়নি তখনও। খুঁড়তে খুঁড়তে জিনিসটার ছোট্ট একটুকু অংশ চোখে পড়তেই মাথাটা ঘুরে গেল বাবা! তখনও প্রায় সবটাই ভেতরে। যেটুকু মুখ বের করেছে তা থেকেই চোখ ফেরানো যাচ্ছিল না। জিনিসটা মোটেও এলেবেলে নয় ভেবে আমি খুব সন্তর্পণে পাথরটা কাটছিলাম। ভাগনেকে ততক্ষণে অন্য কাজের অছিলায় সরিয়ে দিয়েছি।”

মুত্থুর কথা শুনতে শুনতে সন্ন্যাসী মাথা দুলিয়ে মৃদু হাসতে লাগলেন। কথার ফাঁকেই জিজ্ঞেস করলেন, “তা বের করে আনলি কী উপায়ে? ধরা পড়িসনি?”

মুত্থু লজ্জিত কণ্ঠে জবাব দিল, “এতদিনে মালিকের এতটুকু বিশ্বাসভাজন কি আর হইনি বাবা? নইলে কি আর এমনি এমনি আমাকে খনি-সর্দার করেন? বের করে এনেছিলাম খাবারের বাটির ভেতরে না খাওয়া খাবারের নীচে লুকিয়ে।”

“কী মনে করেছিলি, বেচে রাজা হবি? শোন রে মূর্খ, ওই জিনিসের প্রতি খাঁজে খাঁজে অভিশাপ লুকিয়ে আছে। এই মণি আজকের নয়, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অবধি এর অভিশাপ থেকে রক্ষা পাননি।”

“ভগবান শ্রীকৃষ্ণ! তা-তাঁর সঙ্গে এই মণির সম্পর্ক কোথায় বাবা?” মুত্থুর স্বর থেকে একরাশ আশ্চর্য ঝরে পড়ে।

সন্ন্যাসী ব্যাখ্যা করলেন, “তবে শোন। একবার রাজা সত্রাজিৎ দ্বারিকায় শ্রীকৃষ্ণের সাক্ষাতে যান। তাঁর গলায় ঝুলছিল স্যমন্তক নামের এক অত্যাশ্চর্য মণি যা তিনি বরদান হিসেবে পেয়েছিলেন সূর্যদেবের কাছ থেকে। এই মণির দ্যুতি এতই প্রকট ছিল যে দ্বারপাল শ্রীকৃষ্ণকে খবর দেয় যে স্বয়ং সূর্যদেব তাঁর সাক্ষাৎপ্রার্থী হয়েছেন। শ্রীকৃষ্ণ মণিটি জগতের কল্যাণে যাদব কুলপতি রাজা অগ্রসেনকে দান করার আবেদন জানালে সত্রাজিৎ সম্মত না হয়ে ভেবে নেন যে শ্রীকৃষ্ণ বোধহয় লোভের বশবর্তী হয়ে অন্যের নাম করে কৌশলে মণিটি হস্তগত করতে চাইছেন। অবশ্য এর পেছনেও এক কারণ রয়েছে, বুঝলি?”

“কী কারণ বাবা?” মুত্থু উৎসাহিত হয়ে খানিক নড়ে বসে।

“একবার শ্রীকৃষ্ণ দুধ দুইবার সময় গোমূত্রে ভরা গোষ্পদে ভাদ্রমাসের শুক্ল চতুর্থীতে অসাবধানতা বশত চন্দ্রদেবের প্রতিবিম্ব প্রত্যক্ষ করে ফেলেছিলেন। তাতে চন্দ্রদেব রুষ্ট হয়ে শাপ দিয়েছিলেন যে এক মণি দ্বারা একদিন শ্রীকৃষ্ণের চরিত্র কলঙ্কিত হবে। শ্রীকৃষ্ণ অবশ্য সত্রাজিতের গলায় মণিটি দেখেই চিনতে পেরেছিলেন। ভবিষ্যৎ কী হবে তাও বুঝতে পেরেছিলেন। কিন্তু শাপ তো আর খণ্ডাবার নয়!”

“তারপর, বাবা?”

“তারপর? তারপর অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ভাই প্রসেনজিৎ যখন স্যমন্তক মণি গলায় পরে শিকার করতে গিয়ে গভীর জঙ্গলে সিংহের উদরস্থ হলেন, ঘরে ফিরলেন না, তখন সত্রাজিৎ নিশ্চিত হয়ে যান যে শ্রীকৃষ্ণই মায়াবলে মণিটি আত্মসাৎ করেছেন। প্রসেনজিতের এই পরিণাম কর্ণগোচর হলে শ্রীকৃষ্ণ শেষে মণিটি সেই জঙ্গলের এক অজ্ঞাত গুহা থেকে উদ্ধার করে এনে সত্রাজিতের হাতে সমর্পণ করেন। সত্রাজিৎ নিজের ভুল বুঝতে পেরে রূপে গুণে স্বভাবে অত্যন্ত সুলক্ষণা নিজকন্যা সত্যভামা আর স্যমন্তক মণি শ্রীকৃষ্ণের হাতে অর্পণ করেন। শাস্ত্রীয় বিধিমতে সত্যভামাকে শ্রীকৃষ্ণ নিজপত্নীরূপে গ্রহণ করলেও মণিটি গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন এবং তা সত্রাজিৎকে ফিরিয়ে দেন। এই মণির লোভে বশবর্তী অক্রূরের প্ররোচনায় শতধন্ব দ্বারিকাপুরীতে শ্রীকৃষ্ণের অনুপস্থিতির সুযোগে সত্রাজিৎকে হত্যা করেন।”

মুত্থু হাঁ করে এই বৃত্তান্ত শুনছিল। সহসা এই ত্রিকালজ্ঞ সন্ন্যাসীর চোখদুটো জ্বলে উঠল ফের। বললেন, “এই স্যমন্তক মণিই তুই বয়ে বেড়াচ্ছিস, হতভাগা! সে এক জ্যান্ত আপদ। ভগবান শ্রীকৃষ্ণও এই মণির শাপ থেকে রেহাই পাননি, আর তুই তো সামান্য এক মানব মাত্র। ফেলে দে, ফেলে দে শিগগির! এই রাত্রিকালই হচ্ছে একাজের উত্তম সময়। একদৌড়ে গিয়ে কৃষ্ণার জলে ছুড়ে ফেলে স্নান করে শুদ্ধ হয়ে আয় আমার কাছে। যা বলছি!”

মুত্থু মঙ্গলম কৃষ্ণা নদীর পাড়ে উপস্থিত হয়ে নিঝুম অন্ধকারে বসে ঝুলি থেকে হিরেখানা হাতের তালুতে নিয়ে তন্ময় হয়ে রইল। এত গোপনীয়তা, এত বিপদ মাথায় করে কষ্টার্জিত হিরেখানা হস্তচ্যুত করতে তার অন্তঃকরণ ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। বামাল ধরা পড়লে তার যা শাস্তি হত, বর্তমানে হিরে বিনে দেশে ফিরে গেলে শাস্তি হবে তার দ্বিগুণ। কারণ, কথাটা আজ না হোক কাল পাঁচকান হবেই। কৃতকর্ম আর সত্য অদ্যাবধি কেউই লুকিয়ে রাখতে পারেনি। পরাক্রমী কাকাতিয়া রাজবংশ তাকে জ্যান্ত পুঁতে ফেলবে।

কিছুক্ষণ ঝিম মেরে বসে থেকে আচমকা সবেগে উঠে দাঁড়াল মুত্থু। তারপর কী মনে করে একতাল গোময় আর নদীকূলের পলি মিশিয়ে ডিম্বাকৃতির হিরেখানা সুনিপুণ প্রলেপে আচ্ছাদিত করে নিল।

***

তখনও পূর্বাকাশে রূপোলি আভার লেশমাত্র জাগেনি। মুত্থু অন্ধকার বন্যপথ থেকে সরে এসে জঙ্গলের এক অপেক্ষাকৃত নিভৃত স্থানে গাছের তলায় বসে হাঁফাচ্ছিল। তৃষ্ণায় তার গলা কাঠ হয়ে গেছে কোন কালেই। এবার ফেটে পড়বার উপক্রম হল। রাত্রিব্যাপী গভীর উৎকণ্ঠা নিয়ে ক্ষমতার অধিক মাত্রায় ছুটতে ছুটতে পায়ের রশি যেন ছিঁড়ে আসতে চাইছে। আলো না ফুটলে জলের সন্ধান করাও সম্ভব নয়। ঝোলার ভেতরে হাত ঢুকিয়ে কাদা প্রলেপিত ঢেলাটির গায়ে স্পর্শ করতেই তার সমস্ত দেহে এক শিহরন খেলে গেল। তারপর বস্তুটির গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে কখন যে তার চোখ জুড়ে এসেছে তা সে নিজেও টের পায়নি। প্রায় অষ্টপ্রহর ক্ষুধা-তৃষ্ণা উপেক্ষা করে মৃত্যুভয়ের তাড়নায় ছুটে পালাতে গিয়ে তার দৈহিক শক্তি নিঃশেষিত হয়ে এসেছিল।

গভীর ঘুমের মধ্যে মুত্থু দেখতে পেল, সে এক অপূর্বগম্য দেশে গিয়ে উপস্থিত হয়েছে। তার কাছে এক আশ্চর্য মণি রয়েছে এই সংবাদ প্রকাশ পেতেই অবিলম্বে সে দেশের রাজা তাকে সসম্মানে রাজসভায় আমন্ত্রণ জানিয়ে তার সঙ্গে সখ্যতা স্থাপন করলেন। আর সেই মণির বিনিময়ে রাজা তাঁর অর্ধেক রাজ্য মুত্থুকে প্রতিদানস্বরূপ ছেড়ে দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেন। সম্পূর্ণ এক নতুন রাজ্য গঠন করে মুত্থু এক শুভদিনে শুভক্ষণে রাজসিংহাসনে অভিষিক্ত হওয়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে কোথা থেকে এক ভীষণদর্শী দানব উপস্থিত হয়ে মুহূর্তেই তাকে সিংহাসন সমেত উলটে ফেলে বুকে চেপে বসল। দমবন্ধ হওয়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে মুত্থু তার সমস্ত শক্তি একত্রিত করে এক ঝটকায় দানবটিকে দূরে ঠেলে দিতে গিয়ে চোখ মেলে দেখল, এক কৃষ্ণকায় তাগড়া জোয়ানকে সত্যি-সত্যিই সে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছে। গলায় অত্যন্ত বেদনা অনুভূত হচ্ছে। খোলা তলোয়ার হাতে আট-দশজন অশ্বারোহী তাকে ঘিরে ধরেছে। পোশাক-পরিচ্ছদ কাকাতিয়া রাজসৈনিকের। তাদের মধ্যে একজনের হাতে মুত্থুর ঝোলাটা দোল খাচ্ছে। ভোরের আলো ফুটে গেছে ততক্ষণে। যে সৈনিক মুত্থুর বুকে চেপে বসে তার গলা টিপে ধরেছিল সে এক ঝটকায় মাটি থেকে উঠে অর্ধোত্থিত মুত্থুর সামনে দাঁড়াল এসে। মুহূর্তেই খোলা তলোয়ার বিদ্যুৎবেগে ঝলসে উঠল তার। অজ্ঞাত এক গহিন অরণ্যে এক অজ্ঞাতকুলশীল শ্রমিকের রক্তে ইতিহাসের এক বর্ণময় অভিশপ্ত অধ্যায়ের সূচনা হয়ে গেল।

।। দুই ।।

রাত দুই প্রহর অতিক্রান্ত হলে দুই আগন্তুক নিঃশব্দে রাজপ্রাসাদের এক বিশেষ কক্ষে এসে প্রবেশ করলেন। পরিচারকবেশী এক প্রবীণ আর অপেক্ষাকৃত এক নবীন আগন্তুকদ্বয়কে প্রহরীরা কেউই বাধা দিল না। এদের প্রতি তেমনই রাজাদেশ রয়েছে। মহারাজ দ্বিতীয় প্রতাপরুদ্র পূর্বেই সে কক্ষে উপস্থিত রয়েছেন। আগন্তুকদ্বয় কক্ষে প্রবেশ করে ব্যস্ত হাতে দ্বার বন্ধ করতেই মহারাজ আহ্বান করলেন, “আসুন, মহামন্ত্রী। হঠাৎ জরুরি বার্তা পাঠাবার কারণ? আর এই ব্যক্তিই বা কে?”

দ্বিতীয় আগন্তুক যথাবিহিত অভিবাদন সেরে সরে দাঁড়াল। মহামন্ত্রী কক্ষের চতুর্দিকে অনুসন্ধানী দৃষ্টি ফেলে নিশ্চিন্ত হয়ে বললেন, “মহারাজের জয় হোক। একটা বিশেষ সংবাদ আছে মহারাজ, অত্যন্ত গোপনীয় বলেই মনে করি।”

মহারাজ দ্বিতীয় আগন্তুকের মুখে সন্দিগ্ধ দৃষ্টি ফেলতেই মহামন্ত্রী পরিচয় দিলেন, “এই ব্যক্তি সীমা সুরক্ষা দলের অধিনায়ক, মহারাজ। আজ ভোরবেলা…” বলে মহারাজের মালিকানাধীন হিরের খনি থেকে এক হিরে চুরি করে খনি-সর্দারের পলায়ন, তারপর এক বিশিষ্ট সূত্র দ্বারা সর্দারের অবস্থানের সংবাদ সংগ্রহ এবং তাকে হত্যা করে সেই হিরে উদ্ধার—সমস্ত একের পর এক বর্ণনা করে গেলেন মহামন্ত্রী। মহারাজ স্থিরদৃষ্টিতে সব শুনে জানতে চাইলেন, “সে হিরে তবে এখন কোথায়, মহামন্ত্রী?”

“এই যে, মহারাজ।” বলে মহামন্ত্রী কটিদেশের এক গোপন থলি থেকে বের করে তা তুলে দিলেন মহারাজের হাতে। মহারাজের ইশারায় সীমা সুরক্ষা দলের দলপতি বিদায় নিল। মহারাজ বিস্ফারিত চোখে সেই আশ্চর্য হীরকের পানে তাকিয়ে রইলেন। মহামন্ত্রী বললেন, “এ ধরনের হিরে আমি আর কখনও দেখিনি মহারাজ। আপনার কী অভিমত?”

“নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই! এ জিনিস অমূল্য। কোন খনির মহামন্ত্রী?”

“আজ্ঞে, কল্লুর খনির মহারাজ। এখন আপনি আদেশ করলে তা রাজকোষে…”

“উঁহু উঁহু, একদম নয় মহামন্ত্রী। এ-জিনিস রাজকোষে জমা পড়লে রাত পোয়াতেই ষড়যন্ত্র শুরু হয়ে যাবে রাজবংশে। এ আমি নিজের কাছেই রাখলাম। ঘুণাক্ষরেও যেন এর কথা আমাদের তিনজনের বাইরে কেউ জানতে না পারে সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখবেন। আপনার ওই সৈন্যসর্দার মুখ খুললে তার গর্দান নেব আমি।”

“না, মহারাজ। মুখ তার খুলবে না। সে সমুচিত ব্যবস্থা আমি করব।”

মহারাজের শেষদিকের কথাবার্তা আর তাঁর মুখমণ্ডলের লোভাতুর অভিব্যক্তি মহামন্ত্রীকে ভেতরে ভেতরে রুষ্ট করে তুলল। কিন্তু রাজহুকুম শিরোধার্য।

***

রাজধানী ওরুগল্লু আজ আনন্দোৎসবে মেতেছে। কাকাতিয়া দেশবাসী যে যেমন পারছে নববস্ত্রে সুসজ্জিত হয়ে রাজধানীর দিকে ধাবমান। ক্ষমতানুসারে কেউ দুই মুষ্টি চাল, কেউ বা চামেলির মালা আবার কেউ বা নারিকেল-হরিদ্রা-কুমকুম-চন্দনের নৈবেদ্য সাজিয়ে রাজমন্দিরের সোপানশ্রেণী অতিক্রম করছে। ঘটম, কঞ্জিরা, মৃদঙ্গম, তাভিল আর নাড়াস্বরমের যুক্ত-সঙ্গীতে আকাশ-বাতাস মুখরিত। আজ শুভলগ্নে রাজকুলদেবীর নবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করতে চলেছেন মহারাজ দ্বিতীয় প্রতাপরুদ্র। রাজমন্দিরের দক্ষিণী কারুকাজ সমন্বিত সহস্র স্তম্ভের প্রতিটি পুষ্প-পত্র-মাল্য দ্বারা সুসজ্জিত। সহসা গিয়ে উপস্থিত হলে মন্দিরের গর্ভগৃহ চাক্ষুষ হয় না। দক্ষ শিল্পীর শিল্পনৈপুণ্যে ভরপুর চতুর্দিকের স্তম্ভগুলোই দৃষ্টিগোচর হয় কেবল। কমপক্ষে ত্রিস্তর নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেদ করে তবেই মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রবেশ করা যায়, দেবীর দর্শন মেলে।

মহারাজ মাস চারেক পূর্বে স্বপ্নাদিষ্ট হয়েছিলেন যে প্রাচীন কুলদেবীর দ্বিনয়না মূর্তি সরিয়ে বর্তমানে ত্রিনয়না মূর্তি স্থলাভিষিক্ত করতে হবে। নচেৎ কাকাতিয়া রাজবংশ ঘোরতর অমঙ্গলের সম্মুখীন হবে। এই চারমাস ধরে অজ্ঞাত এক ধাতুশিল্পী দ্বারা দেবীর এক অষ্টধাতুর মূর্তি নির্মিত হয়েছে রাজমন্দিরের গুপ্ত কক্ষে। অক্ষিকোটরে এক অমূল্য মণি স্থাপন করে শিল্পী সুদক্ষ হাতে দেবীর কপালে তাঁর তৃতীয় চক্ষুর উন্মেষ ঘটিয়েছে। এই চারমাস এক মহারাজ স্বয়ং, মহামন্ত্রী আর কুলপুরোহিত ব্যতীত কাকপক্ষীরও মন্দিরে প্রবেশাধিকার ছিল না, আজও নেই। নগরবাসী গর্ভগৃহের বহির্প্রাঙ্গণেই সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে দেবীর উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা নিবেদন করে ফিরে যাচ্ছে। কেবল এক মূক ও বধির যুবা রক্ষীদের বারংবার নিষেধ উপেক্ষা করে উৎসুক দৃষ্টি ফেলে কেবলই মূল মন্দিরের আশেপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

শুভক্ষণে রাজমন্দিরে মহারাজ দ্বিতীয় প্রতাপরুদ্রের হাতে কুলদেবীর নবকলেবর প্রতিষ্ঠা হয়ে গেল।

সপ্তাহান্ত অতিক্রান্ত হতেই রাজপুরোহিত গ্রাম্য এক যুবককে সঙ্গে করে রাজসন্নিধানে উপস্থিত হলেন এক আর্জি নিয়ে। বললেন, “মহারাজ, এই বোবা-কালা অনাথ ছেলেটি আমার আশ্রয়প্রার্থী হয়েছে। রাজমন্দিরে সেবাইত রূপে থাকতে চায়। আপনার অনুমতি হলে…”

“সে কি, কুলগুরু! আপনি বিলক্ষণ জানেন যে রাজমন্দিরে এক আপনি ভিন্ন অন্য কাউকে প্রবেশাধিকার দেওয়া রাজবংশের রীতি নয়।” মহারাজ প্রতাপরুদ্র খানিক আশ্চর্য হয়ে পড়লেন।

প্রশান্ত হেসে রাজপুরোহিত ব্যক্ত করলেন, “সে আমি অবগত আছি মহারাজ। তবে এটাও ভেবে দেখুন যে আমার বয়স হয়েছে। একজন সাহায্যকারীর বিশেষ প্রয়োজন। আর সেবাইত রূপে এই বোবা-কালা ছেলেটি ছাড়া উত্তম আর কেই বা হতে পারে বলুন?”

মহারাজ কিছুক্ষণ গভীর চিন্তা করে, রাজসভার পার্শ্ববর্তী মন্ত্রণা কক্ষে মহামন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ শেষে অনুমতি দিলেন। এই প্রথম কাকাতিয়া রাজবংশের রীতি ভেঙে রাজপুরোহিত ভিন্ন অপর কোনও ব্যক্তি মন্দিরের সেবাইত রূপে নিযুক্ত হল। তবে শর্ত রইল যে, যুবকের রাজমন্দিরের চত্বরের বাইরে যাবার অনুমতি থাকবে না।

রাজপুরোহিত স্মিত হেসে যুবককে নিয়ে প্রস্থান করলেন। যুবকটি আর কেউ নয়, খনি-সর্দার মুত্থুর ভাগনে কুট্টি। সে মুত্থুর মণি চুরির ব্যাপারে সমস্তই অবগত ছিল এবং মাতুলের গতিবিধির উপর প্রতিমুহূর্তে শ্যেনদৃষ্টি রেখে সীমা সুরক্ষা সৈন্যের হাতে মাতুলকে ধরিয়ে দিয়েছিল।

***

মাস ছয়েকও অতিক্রান্ত হয়নি। তেলেঙ্গানা রাজ্যের উত্তর সীমান্ত থেকে অশ্বারোহী মারফত সংবাদ এসে পৌঁছল যে দিল্লির সুলতান আলাউদ্দিনের অতি বিশ্বস্ত সেনাপতি মালিক কাফুর বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে রাজ্যের দিকে ধাবমান। সেই দুর্ধর্ষ খিলজিবাহিনীর গতিরোধে কাল বিলম্ব হলে সর্বনাশ ঘটে যাবে।

মহারাজ প্রতাপ অবিলম্বে গোপন মন্ত্রণা কক্ষে সভা বসালেন। এই সভায় মহামন্ত্রী, প্রধান সেনাপতি সাগি নাগাদেবা, রাজকোষ প্রধান হরিহর আর বুক্কা এবং অতি বিশ্বস্ত দুই-চারজন অমাত্য ব্যতীত আর কারও প্রবেশাধিকার রইল না।

মহামন্ত্রী বললেন, “মহারাজ, দিল্লির সুলতান জুনা মুহম্মদ খাঁ ওরফে আলাউদ্দিন খিলজির নাম আমি শুনেছি। তাঁর যুদ্ধনীতি সম্পর্কে কমবেশি ধারণাও আমার আছে। তাঁর সেনাপতি কোনও নির্দিষ্ট দিক ধরে আক্রমণ করে না। অবস্থা বিশেষে আক্রমণরীতিও খুব অল্প সময়ের ব্যবধানেই পালটে ফেলে।”

মহারাজ উদ্বিগ্ন হয়ে জানতে চাইলেন, “আপনাদের কার কী মতামত? আমাদের রণকৌশল কী হওয়া উচিত?”

প্রধান সেনাপতি বললেন, “এখানে কূটনীতির আর কোনও উপায় দেখছি না মহারাজ। সম্মুখ সমর ছাড়া আর কোনও পথ খোলা নেই।”

একে একে প্রত্যেকেই সহমত পোষণ করলেন। শুধু মহামন্ত্রী খানিক ইতস্তত করে শেষে বললেন, “দু-চারদিন ঠেকিয়ে রাখতে পারলে অবশ্য একটা উপায় বের করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে রক্তক্ষয় অনেকাংশেই কম হয়।”

মহারাজ চিন্তাক্লিষ্ট দৃষ্টি মহামন্ত্রীর চোখে ফেলতেই চমকে উঠলেন সহসা। উপায়টি কী তা জিজ্ঞেস করতে গিয়েও উপস্থিত অপরাপর ব্যক্তিবর্গের মুখে দৃষ্টি ফেলে নিজেকে আটকালেন। মহামন্ত্রীর মুখে তাকিয়েই তাঁর অভিসন্ধি টের পেয়ে গেলেন যে তিনি কুলদেবীর কপালে অবস্থিত সেই মহামূল্যবান মণির লোভ দেখিয়ে হয়তো এবারের মতো শত্রুর আক্রমণ ঠেকিয়ে রাখতে চান। আর তা বুঝতে পেরেই মুহূর্তে গর্জে উঠলেন প্রতাপরুদ্র, “মহামন্ত্রী! আপনি হয়তো বিস্মৃত হয়েছেন যে এই সিংহাসনে একসময় বীরাঙ্গনা রুদ্রামাদেবী রাজত্ব করে গেছেন। খিলজি সৈন্যের তুলনায় আমাদের শক্তি হয়তো কিছুটা কম, কিন্তু প্রতাপরুদ্র সরাসরি লড়বে। কোনও সন্ধি কখনও হয়নি, আজও হবে না।”

মহামন্ত্রী খেদোক্তি করলেন, “মহারাজ, আপনার পূর্বপুরুষদের এই পুণ্যভূমিতে এর আগে কখনও যবনদের অশুচি পা পড়েনি। আজ এই দেবভূমি অশুদ্ধ হয়ে গেল।”

“এর সমুচিত শিক্ষা ওরা পাবে মহামন্ত্রী!” দাঁতে দাঁত পিষে রাজা প্রতাপ পুনরায় গর্জন করে উঠলেন। দৃঢ় সংকল্পের আভাস রেখে তাঁর ইস্পাত-কঠিন দৃষ্টি অলিন্দের বাইরে নির্গত হল।

না, প্রতাপরুদ্র মিথ্যাই বাগাড়ম্বর করেছিলেন। সামান্য এক ক্রীতদাস থেকে সুলতানের প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠে, শেষে প্রধান সেনাপতি পদে উন্নীত মালিক কাফুরকে শেষপর্যন্ত কোনও উপায়েই আটকে রাখা গেল না। দু-চারদিন সীমান্তে অবরোধ করে রাখা গেলেও শেষে সমস্ত প্রতিরোধ ভেঙে একদিন কাফুর কাকাতিয়া রাজপ্রাসাদের তোরণদ্বারে উপস্থিত হলেন এসে। চাঁদরাম নাম্নী প্রথম জীবনে হিন্দু কাফুর রাজমন্দিরের রুদ্ধ দ্বারের সামনে উপস্থিত হয়ে মন্দিরের সর্বোচ্চ সোপানে ভক্তিভরে মাথা ঠেকালেন। প্রতাপরুদ্র ততক্ষণে অন্দরমহলের গুপ্ত কক্ষে আশ্রয় নিয়েছেন।

ইতিপূর্বে অবশ্য মালিক কাফুর কাকাতিয়া সাম্রাজ্যের সীমান্ত থেকে সুলতান আলাউদ্দিনের ফরমান পাঠিয়েছিলেন প্রতাপকে। এক ছত্র ও খিলৎ সহযোগে দূত পাঠিয়ে প্রতাপরুদ্রের মতামত যাচ্ঞা করেছিলেন। সুলতানি রীতি অনুযায়ী বেশ কিছু বহুমূল্য উপঢৌকন খিলৎ হিসাবে আর ছত্রে লিখিত রূপে সুলতান প্রতাপের বশ্যতা আর সমস্ত মণিমুক্তো ও হস্তীকুল দাবি করেছেন। প্রতাপ সে খিলৎ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি পরিষ্কার বুঝলেন যে তিনি যতই গোপন রাখতে চান না কেন সেই অমূল্য মণির সংবাদ আলাউদ্দিনের কানে ঠিক পৌঁছেছে। মালিক আসলে দেবগিরির খণ্ড খণ্ড ছিন্নবিচ্ছিন্ন সাম্রাজ্যগুলোকে দিল্লির বশ্যতা স্বীকার করিয়ে বাৎসরিক কর আদায় নিশ্চিত করতেই সৈন্যাভিযান চালিয়েছিলেন। দেবগিরি উপস্থিত হয়েই রাজা প্রতাপরুদ্রের কাছে এক মহামূল্য মণি রয়েছে বলে তিনি সংবাদ পেয়েছিলেন কোনও বিশ্বস্ত সূত্রে।

পূর্বপুরুষ গণপতিদেবা দ্বারা খননকৃত পাখাল হ্রদের কিনারে এক অসম যুদ্ধ সংঘটিত হল। কাকাতিয়া রাজবংশের তখন বার্ধক্য দশা চলছে। পরাক্রমী আলাউদ্দিনের বাহিনীকে পর্যদুস্ত করবার শক্তি বা সুযোগ কিছুই তার ছিল না। মালিক কাফুর যখন সসৈন্যে রাজধানী ওরুগল্লুতে পৌঁছে রাজপ্রাসাদের নিকটবর্তী হলেন, তৎক্ষণাৎ প্রতাপরুদ্র আত্মসমর্পণ করলেন। তদুপরি সুলতানি সেনা রাজধানী আর রাজপ্রাসাদে যথেচ্ছ লুটপাট ও অত্যাচার চালাল। কিন্তু সমস্ত কোষাগার তন্নতন্ন করেও সেই মণির সন্ধান তারা পেল না। অচিরেই সকল আক্রোশ গিয়ে পড়ল প্রতাপরুদ্রের ওপর। মালিক কাফুর তাঁকে বন্দী করে দিল্লির উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন।

***

কাফুর প্রতাপরুদ্রকে একজন মাত্র পরিচারক সঙ্গে রাখবার অনুমতি দিয়েছিলেন। দিল্লি যাবার পথে সন্ধ্যাকালে নর্মদাতীরে উপস্থিত হয়ে কাফুর তাঁবু খাটাবার আদেশ দিলেন। প্রতাপরুদ্রের পরিচারক এসে সেলাম ঠুকে নিবেদন করল, “মহারাজের তরফে এক আর্জি আছে, হুজুর।”

পথশ্রমে ক্লান্ত কাফুর। অধৈর্য কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন, “আবার আর্জি কীসের?”

“মহারাজ নর্মদার জলে স্নান করবার ইচ্ছা রাখেন। আপনার অনুমতি প্রার্থনা করেছেন।”

“কেন? কাউকে বললেই তো জল তুলে দেয়। এই আবছা অন্ধকারে নদীতে নামবার দরকারটা কী?”

“মহারাজ রোজ এই সময়ে স্নান সেরে নিজ ইষ্টের আরাধনা করেন। অপরাধ নেবেন না হুজুর, এখানে অন্য কারও ছোঁয়া জলে…” এই পর্যন্ত নিবেদন করে পরিচারক মাথা নামিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

হিন্দুর সন্তান মালিক হাত তুলে অনুমতি দিলেন। জনাপাঁচেক সশস্ত্র প্রহরী প্রতাপরুদ্রের সঙ্গে পাঠিয়ে দিলেন।

এই স্থানে নর্মদা অত্যন্ত খরস্রোতা। প্রতাপরুদ্র অতি সাবধানে নেমে গেলেন জলে। দিনভর পথ ভেঙে প্রহরীর দল খানিক ফুরসত পেয়েছে। স্নানরত প্রতাপরুদ্রের দিকে অলস দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে নিজেদের মধ্যে সুখদুঃখের কথা কইছিল তারা। পরিচারকটি মস্ত একখানা পাথরের ওপর মহারাজের প্রসাধন সামগ্রী আর স্নানান্তে পরিধেয় বস্ত্র আগলে বসে ছিল। মুহূর্তে কোথাকার কী এক ইশারায় যেন ভেলকিবাজি ঘটে গেল। হতভম্ব প্রহরীর দল চমক ভাঙতে দেখতে পেল ভৃত্যটি কোন ফাঁকে সেই পাথরখণ্ড জলে গড়িয়ে দিয়েছে আর প্রতাপরুদ্র তা আলিঙ্গন করে নর্মদার তীব্র স্রোতে কোথায় তলিয়ে গিয়েছেন। এই দৃশ্য ছেড়ে মুহূর্তে পেছন ফিরতেই দেখা গেল সেই পরিচারক ততক্ষণে নিজের বুকে সুতীক্ষ্ণ এক ছোরা আমূল গেঁথে দিয়েছে।

১৩০৫ সালে দাক্ষিণাত্যের দেবগিরিতে কাকাতিয়া রাজবংশের অবসান ঘটল।

অপরদিকে কাফুরের প্রতাপরুদ্রের রাজপ্রাসাদে প্রবেশের দু’দিন পূর্বে এক নিকষ আঁধার রাত্রির তৃতীয় প্রহরে এক গো-শকট রাজমন্দিরের নিকটবর্তী জঙ্গল ভেদ করে নিরুদ্দেশের পথ ধরেছিল।

।। তিন ।।

আর দেরি নেই, দিন পাঁচেক পরেই দীপাবলি উৎসব। চতুর্দিকে সাজ সাজ রব আর নাগরিকদের উদ্যম কর্মব্যস্ততা এই হারে বেড়ে গেছে যে উজ্জ্বয়িনী নগরী টগবগ করে ফুটছে। নানান দেশের বণিকেরা অহরহ গো-শকটভর্তি আপন আপন সামগ্রী নিয়ে নগরে প্রবেশ করছে, বের হয়ে যাচ্ছে। নগরী যেন দিবারাত্রি নবকিশোরীর মতো চঞ্চলা হয়ে পড়েছে। এই হট্টগোলের মধ্যে এক ভিনদেশি শ্রমিক কবে এসে নগরের একপ্রান্তে ডেরা বেঁধেছে তা কেউ লক্ষ করেনি। মাথায় অপটু হাতে বাঁধা পাগড়ি আর কষ্টিপাথরের মতো দেহ লক্ষ করে তাকে দক্ষিণদেশীয় বলেই মনে হয়। যুবা মানুষটি বোবা ও কালা। সুতরাং, তাকে কোনও প্রশ্ন করলেও উত্তর পাবার আশা নেই। যখন যা কর্ম জোটে তাতেই তার জীবিকা নির্বাহ হয়। তার কোনও শত্রুও নেই, মিত্রও নেই। অথচ এক রাত্রে কর্মস্থল থেকে নিজ আস্তানায় ফেরবার মুখে সর্পাঘাতে যখন তার মৃত্যু হল তখন পল্লীবাসীরা দলে দলে তাকে দেখতে এসেছিল, নগরপালকে সংবাদ পাঠিয়েছিল। নগরপাল ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে আগন্তুকের পরিচয় সংগ্রহের বিস্তর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলে মৃতদেহ স্থানীয় কোতয়ালের হাতে সঁপে দিয়ে তার অস্থাবর সম্পত্তি সোজা রাজদরবারে পাঠিয়ে দিলেন। মালবদেশে তখন এটাই রীতি ছিল যে কোনও অজ্ঞাতপরিচয় অথবা উত্তরাধিকারীহীন ব্যক্তির মৃত্যু ঘটলে মৃতব্যক্তির সম্পত্তি রাজ-সম্পত্তি রূপে পরিগণিত হবে। মুত্থু মঙ্গলমের ভাগনে কুট্টি জানতেও পারল না যে সে মরে গিয়ে কী এক অন্ধকারাচ্ছন্ন অভিশপ্ত ইতিহাসের অপর এক দ্বার খুলে গেল।

***

মালবরাজ রায় মাহ্লক দেও নির্দিষ্ট সময়ের খানিক বিলম্বেই রাজসভায় পৌঁছেছেন আজ। সভার প্রাথমিক রীতিনীতি সম্পন্ন হতেই মহামাত্য হরনন্দ উঠে এলেন নিজ আসন ছেড়ে। মহারাজের সামনে উপস্থিত হয়ে এক অর্থপূর্ণ ইঙ্গিত করলেন। মহারাজের ইশারায় দুই পাশের দুই চামরবাহী দাসী সসম্মানে পিছু হটে দাঁড়াল। মহামাত্য মহারাজের কর্ণমূলের অত্যন্ত কাছে মুখ বাড়িয়ে কোনও গূঢ় কথা পেশ করলে মহারাজ কিছুক্ষণের জন্যে সভা মুলতুবি ঘোষণা করে গোপন কক্ষে প্রবেশ করলেন। হরনন্দ তাঁর পশ্চাৎবর্তী হলেন।

মহারাজ গোপন কক্ষে উপবিষ্ট হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কই মহামাত্য, দেখান জিনিসটা।” উত্তেজনায় কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠল তাঁর।

হরনন্দ অতি সন্তর্পণে নিজ পরিচ্ছদের এক গুপ্ত স্থান থেকে উজ্জ্বল একখানা মণি বের করে মহারাজের হাতে তুলে দিলেন। মালবরাজ কিছুক্ষণের জন্যে তন্ময় হয়ে পড়লেন। তাঁর রাজকোষে হাজার হাজার মণিমুক্তোর সম্ভার রয়েছে, কিন্তু এমন রত্ন একখানাও নেই। সম্বিৎ ফিরে পেতেই চোখ তুলে জানতে চাইলেন, “কোথায় পাওয়া গেল এটা?”

“আজ্ঞে মহারাজ, রাজধানীর এক অখ্যাত পল্লীতে। এক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির মৃত্যু ঘটলে নগরপাল তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে উদ্ধার করলেন।”

“সে কি! এমন এক জিনিস যার কাছে ছিল তার সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি? কোথাকার লোক, কী পরিচয়—কিছুই নয়?”

“না, মহারাজ। উপস্থিত নয়। তবে গুপ্তচর বিভাগের প্রধানকে আদেশ দেওয়া হয়েছে।”

“আচ্ছা ঠিক আছে, ওটা যত্নের সঙ্গে রাজকোষে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করুন। তবে সাবধান থাকবেন, এ-জিনিস সারা পৃথিবীতে খুব বেশি নেই বলেই আমার ধারণা।”

***

দিল্লির দরবার। বৃদ্ধ আলাউদ্দিন সিংহাসনে উপবিষ্ট। স্নেহান্ধ পিতৃব্য জালালউদ্দিনকে হত্যা করে ১২৯৬ সালে দিল্লির সিংহাসন নিজ করায়ত্ত করেছেন। গুজরাটের খম্বাত থেকে এক হাজার দিনারের বিনিময়ে ক্রীতদাস রূপে ক্রয় করে আনা এক হিন্দু যুবককে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করে নিজেও স্নেহান্ধ হয়ে প্রধান সেনাপতির পদে নিযুক্ত করেছেন। যুবকটি মালিক কাফুর। বর্তমানে সুলতান এই সেনাপতির হাতের ক্রীড়নকে পরিণত হয়েছেন। যার রণকৌশলে মুগ্ধ হয়ে আলাউদ্দিন ওরুগল্লু আক্রমণ করে রাজা প্রতাপরুদ্রের কাছ থেকে অমূল্য মণি ছিনিয়ে আনতে পাঠিয়েছিলেন, সে উদ্দেশ্য সফল হয়নি। দাক্ষিণাত্য জয় করে মালিক কাফুর খালি হাতে প্রত্যাবর্তন করেননি বটে; অপ্রত্যাশিত পঞ্চাশ হাজার মন পরিমাণ সুবর্ণ-রৌপ্য, রাশিকৃত রেশমবস্ত্র, কুড়ি হাজার অশ্ব, তিনশত বারো হস্তী আর যথেষ্ট পরিমাণ মণিমুক্তো লুঠ করে আনলেও সেই বিশেষ মণি বা রাজা প্রতাপরুদ্র কাউকেই দিল্লি উপস্থিত করতে সক্ষম হননি। তবে আশার কথা এই যে, কাঙ্ক্ষিত মণিখানা বর্তমানে মালবরাজ মাহ্লক দেওয়ের নিকট রয়েছে বলে গুপ্তচর নিশ্চিত সংবাদ এনেছে। মালব আক্রমণ বিষয়েই আজ এই গুপ্ত বৈঠকের আয়োজন।

মালিক কাফুর বললেন, “আমায় মাফ করুন সুলতান। সুবিশাল দেবগিরি আয়ত্ত করতে অন্তত একবছর অতিক্রান্ত হয়েছে। আমি কিছুদিন নতুন কোনও যুদ্ধবিগ্রহ থেকে বিশ্রাম চাই।”

আলাউদ্দিন বঙ্কিম দৃষ্টিতে তাকিয়ে উত্তর দিলেন, “তোমার মতো যুদ্ধবাজ বিশ্রাম চাইছে মালিক? বিশ্বাস হচ্ছে না যে!”

“আমার আর্জি যথার্থ সুলতান। আপনার সঙ্গে মশকরা করার ইচ্ছে বা ধৈর্য কোনোটাই আমার নেই।”

মুখের ওপরে সেনাপতির এমন দুর্বিনীত উক্তি শুনে সুলতানের মুখমণ্ডল নিমেষে আরক্ত হয়ে উঠল। কিন্তু মানুষটি মালিক কাফুর। বর্তমানে দিল্লি সাম্রাজ্যে সুলতান অপেক্ষা তাঁর হুকুমই বেশি চলে। সুলতানও তাঁকে ঘাঁটালেন না। খানিক অধৈর্য হয়ে শুধু বললেন, “সে তুমি বিশ্রাম নাও। কিন্তু মণিটি আমার চাই। আর তা যত তাড়াতাড়ি হয় ততই মঙ্গল। আক্রমণ কি স্থগিত রাখতে চাও তবে?”

“না হুজুর। আক্রমণ হবে। আর এই আক্রমণের নেতৃত্ব দেবেন আইন-উল-মুলক মুলতানি—আপনার বিদ্বান সেনাপতি।” মালিক তাঁর বক্তব্য শেষে একখানা যে শ্লেষের অভিব্যক্তি প্রকাশ করলেন, উদ্দিষ্ট ব্যক্তির তা নজর এড়াল না।

কাফুরের অধস্তন সেনাপতি মুলতানি লেখাপড়া জানা মানুষ। তিনি অসির চাইতে মসীর ভক্ত বেশি। ইতিমধ্যে ‘আইনুল মুলকি’ ও ‘মুনসত-ই-মাহরু’ নামে দু’খানা গ্রন্থও লিপিবদ্ধ করেছেন। নিরক্ষর দাস কাফুরের শ্লেষখানা অম্লানবদনে হজম করে মুলতানি উত্তর দিলেন, “বেশ। আমার কোনও আপত্তি নেই সুলতান। তবে যেহেতু আমাদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সেই হীরা, তাই অহেতুক রক্তক্ষয় যাতে না হয় সেদিকে নজর রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ, যুদ্ধে দিল্লির জয় হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হবে দিল্লিও। সেনা আমাদেরও ক্ষয় হবে।”

“কী বলতে চাইছ হে তুমি, মুলতানি? আমি অহেতুক রক্তক্ষয় করি? দিল্লির তাতে ক্ষতি হয়?” কাফুরের চোখ রক্তবর্ণ হয়ে উঠল।

সুলতান মাঝখানে পড়ে বললেন, “আহা, সেকথা হচ্ছে না মালিক। মুলতানি নিজের অভিমত ব্যক্ত করেছে মাত্র। তা তুমি কবে যাত্রা করতে চাও, মুলতানি?”

মুলতানি মাথা ঝুঁকিয়ে উত্তর দিলেন, “আপনি যখন আদেশ করবেন সুলতান।”

মুহূর্তেই মালিকের ওষ্ঠে একখানা কুটিল হাসি খেলে গেল। তিনি কিছুতেই এই সময়ে দিল্লি ছেড়ে নড়বেন না—এই তাঁর সঙ্কল্প। তাঁর আজন্ম লালিত অভিপ্রায়, দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করতে হলে তাঁকে বর্তমানে দিল্লি উপস্থিত থাকতেই হবে।

***

দীপাবলি অতিক্রান্ত হয়েছে। তবে তার রেশ এখনও কাটেনি। মালববাসীর দিন-কর্মে গতি আসেনি। মন্থর গতিতে চলেছে রাজ্যপাটও। রাজা মাহ্লক দেও সহ অনেক অমাত্যই এখনও অবসরযাপনে রয়েছেন। এরই মধ্যে আচমকা মালবরাজের সিংহাসন টলে উঠল। দিল্লির যবনেরা মালব আক্রমণ করেছে। কুখ্যাত নির্মম মালিক কাফুর নন বটে, তবে দিল্লির সেনাবাহিনীর যিনি অধিনায়ক হয়ে এসেছেন এ-যাত্রা, তিনিও প্রচুর যুদ্ধবিগ্রহে জয়লাভ করেছেন। কুশলী সেনাধিপতি হিসেবে তাঁরও সুখ্যাতি কিছু কম নয়। উজ্জ্বয়িনীর বহির্প্রান্তে ছাউনি পড়ল দিল্লি-সেনার।

রাজা মাহ্লক দেও মহামাত্য আর সেনাপতি গোগাকে নিয়ে মুহুর্মুহু গুপ্ত বৈঠকে ব্যস্ত রইলেন। এমতাবস্থায় দিন তিনেক পরে দিল্লি সুলতানের এক ছত্র হাতে রাজসভায় দূত উপস্থিত হল এসে। মহামাত্য আলাউদ্দিনের ছত্র পাঠ করে শোনালেন।

‘সুহৃদ মালবরাজ,

আদাব গ্রহণ করবেন। আমি এবং আমার অন্যতম সেনাপতি আইন-উল-মুলক মুলতানি উপস্থিত আপনার রাজ্যসীমার অভ্যন্তরে বিশ্রামে প্রবৃত্ত রয়েছি। আমরা দাক্ষিণাত্য অভিযানে নির্গত হয়েছি এবং আমার এক ইচ্ছাপূরণ হেতু খানিক ঘুরপথ হলেও উজ্জ্বয়িনী নগরে এসে উপস্থিত হয়েছি। আমীর-ওমরাহ মারফত উজ্জ্বয়িনী নগরীর প্রভূত প্রশংসা অতীতে কর্ণগোচর হওয়া সত্ত্বেও এ যাবত কখনও সশরীরে উপস্থিত হতে সক্ষম হইনি। আপনার রাজত্বের বিন্দুমাত্র ক্ষতিসাধন করা আমার অভিপ্রায় নয়।

লোকমুখে প্রচারিত হবার ফলে জ্ঞাত হয়েছি যে আপনার নিকট এমন এক অতি মূল্যবান হীরা রয়েছে যা পৃথিবীতে অদ্বিতীয়। আমি পীড়িত হয়ে শয্যাশায়ী না হলে অবশ্যই আপনার আতিথ্য গ্রহণপূর্বক তা চাক্ষুষ করে ধন্য হতাম। পরন্তু বর্তমানে সে অবকাশ নেই। তাই, আপনি স্বয়ং যদি হৃষ্টচিত্তে সেই মণিখানি নিয়ে আমার শিবিরে দয়াপূর্বক আথিতেয়তা গ্রহণ করেন তবে অতীব প্রীত হই।

আপনি হৃদয়বান রাজা। আশা করি আমার ইচ্ছাপূরণে সহায়ক হবেন।

শুভেচ্ছাসহ,
সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি

মালবরাজ আর মহামাত্য উভয়ের অর্থপূর্ণ দৃষ্টি পরস্পর আলিঙ্গন করল। সুলতানি দূত যথাবিহিত সম্মান প্রদর্শনপূর্বক নিবেদন করল, “মহারাজ, সেনাপতি মুলতানির এক আর্জি আছে। সুলতান গত তিন-চারদিন যাবত গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। শিবিরেই বিশ্রাম করছেন। আপনি যদি দয়া করে খুব বেশি লোকজন সঙ্গে না করে শিবিরে উপস্থিত হন তবে সেনাপতি তো বটেই, সুলতানেরও উদ্বেগ অনেকটা লাঘব হয়।”

মহারাজ উত্তর করলেন, “একজন রাজা আরেকজন রাজার সঙ্গে রাজোচিতভাবেই সাক্ষাৎ করতে যাবে। আমার সঙ্গে দু’জন দেহরক্ষী ছাড়া আর কেউ থাকবে না। সুলতান যেন নিশ্চিন্ত থাকেন।”

এরপর মহামাত্য হরনন্দ আর দু-চারজন প্রাচীন উপদেষ্টার সঙ্গে মন্ত্রণা করে স্থির হল যে আলাউদ্দিনের শিবিরে সেই বিশেষ হীরা ব্যতীত রাজকোষের সর্বোৎকৃষ্ট মণিখানাই পরদিন নিয়ে যাওয়া হবে।

সূর্যদেব তখনও তপ্ত কিরণ ছড়াতে শুরু করেননি। সুবিশাল প্রান্তরের একপ্রান্তে সহসা সুসজ্জিত তিন অশ্বের খুরধ্বনি প্রকট হয়ে উঠল। মালবরাজ্যের ধ্বজাধারী দু’জন দেহরক্ষী দুই পাশে নিয়ে এক রাজপুরুষ আলাউদ্দিনের শিবিরের সামনে উপস্থিত হলেন। মুলতানি প্রস্তুত হয়েই ছিলেন। শিবির থেকে বের হয়ে প্রথমেই মালবরাজকে বন্দী করবার হুকুম দিলেন। রাজপুরুষ স্মিত হেসে একখানা পত্র মুলতানির হাতে দিয়ে বললেন, “দূত অবধ্য, এটা নিশ্চয়ই সুলতানি সেনাপতিকে স্মরণ করিয়ে দিতে হবে না।”

রাজপুরুষের রাজবেশের প্রতি প্রথমেই মুলতানি সন্দিগ্ধ ছিলেন। এবার পত্রখানা পাঠক দ্বারা পাঠ শেষ হতেই চক্ষুদ্বয় রক্তবর্ণ হয়ে উঠল তাঁর। মালবরাজ শারীরিক অসুস্থতাবশত স্বয়ং উপস্থিত হতে না পেরে এক উচ্চপদস্থ অমাত্যের হাতে হিরেখানা পাঠিয়ে দিয়েছেন। দিল্লির সুলতান যেন তা মার্জনা করেন বলে পত্রও লিখে পাঠালেন। মুলতানির সমস্ত পরিকল্পনা জলাঞ্জলি গেল।

মুলতানি হিরেখানা করতলে তুলে ধরে এ যে সেই বিশেষ রত্ন নয় তা একপলক দৃষ্টিপাত করেই বুঝে গেলেন। এই শ্রেণীর হিরে-জহরত দিল্লির রাজকোষে যথেষ্ট পরিমাণে মজুত রয়েছে। তিনি এই নগণ্য হিরের জন্যে এতটা পথ পাড়ি দিয়ে উজ্জ্বয়িনী উপস্থিত হননি।

সুতরাং যুদ্ধ অবধারিত হয়ে পড়ল। মাহ্লক দেও-ও সেরকম প্রস্তুতিই শুরু করে দিয়েছিলেন।

মুলতানি মালব আক্রমণ করলেন। মালব সেনাপতি গোগা কুড়ি হাজার অশ্বারোহী আর নব্বই হাজার পদাতিক সৈন্য নিয়ে প্রবল বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। কিন্তু এক লক্ষ ষাট হাজার দুর্ধর্ষ যবনসেনাকে বেশিদিন ঠেকিয়ে রাখা গেল না। গোগা ক্রমশ পিছু হটতে লাগলেন। অন্যদিকে প্রায় হাজার কুড়ি উদ্বৃত্ত দিল্লি-সেনা গুটিকতক উপদলে বিভক্ত হয়ে চতুর্দিক ঘিরে সোজা রাজদুর্গ আক্রমণ করে বসল। নগণ্য সংখ্যক মালবসেনা দ্বারা সুবিশাল দুর্গ অবরোধ করে রাখা সম্ভবপর হচ্ছিল না। কিন্তু অল্পসংখ্যক মালবসেনারই অমিতবিক্রমে দুর্গের উচ্চতম অলিন্দের ফোঁকর গলে বিষাক্ত তিরবর্ষণে কুড়ি হাজার সুলতানি সেনা কোনও উপায়েই দুর্গের প্রাকার লঙ্ঘন করতে সক্ষম হচ্ছিল না। তারা দুর্গ অবরোধ করে প্রবেশের নতুন উপায় খুঁজছিল।

২৪ নভেম্বর, ১৩০৬ সাল। মধ্যরাত্রি। আপাদমস্তক কম্বল মুড়ি দিয়ে সবার অলক্ষ্যে এক দাস মালব রাজদুর্গ থেকে বেরিয়ে সুলতানি সৈন্যসর্দারের তাঁবুতে প্রবেশ করল। পরদিন ভোরের আলো ফুটবার পূর্বেই সুলতানি সেনা এক গুপ্ত পথে দুর্গের অন্দরে ঢুকে পড়ল। সুরক্ষিত গুপ্ত কক্ষে বসে উপায়ান্তর না দেখে মাহ্লক দেও মুলতানির কাছে সন্ধিবার্তা প্রেরণ করলেন। মুলতানি যদি সত্যই সেই অদ্বিতীয় মণির সন্ধান চান তবে যেন দুর্গ থেকে সুলতানি সৈন্য সরিয়ে নিয়ে যান। আর রাজপরিবারের কারও দেহে যেন এতখানি আঁচড়ও না পড়ে। দুর্গের পথে মুলতানির পদতলে অন্যান্য মণিমুক্তা বৃষ্টির মতো ছড়িয়ে দেওয়া হবে। মহারাজ মাহ্লক দেও বিনা শর্তে আলাউদ্দিনের বশ্যতা স্বীকার করবেন। নচেৎ মুলতানির মালবদেশে পদার্পণের আসল উদ্দেশ্য অধরাই থেকে যাবে। হিরে হাতে দিল্লি প্রত্যাবর্তন করতে সক্ষম হবেন না।

কিন্তু মুলতানি চাল চেলে মাহ্লক দেওকে বন্দী করতে ব্যর্থ হওয়ায় প্রথম থেকেই চণ্ডমূর্তি ধারণ করে ছিলেন। অপমানের বিষ তার চোখের প্রতিটি দৃষ্টি থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছিল। তিনি পত্রপাঠ সন্ধিপ্রস্তাব নাকচ করে দিলেন। পরাজিত গোগার মুণ্ডচ্ছেদ করে তা দিল্লি সুলতানের কাছে ভেট পাঠানো হল। মুলতানি যথাসময়ে রাজদুর্গে উপস্থিত হয়ে নির্বিচারে হত্যালীলা আর লুণ্ঠন চালালেন। মালবরাজ মাহ্লক দেও মৃত্যুমুখে পতিত হলেন। মালবের পরমার রাজবংশের অবসান ঘটল। শুধু তাই নয়, কাঙ্ক্ষিত হিরে হস্তগত হবার পর আইন-উল-মুলক মুলতানি এতটাই আগ্রাসী হয়ে উঠলেন যে মালবের পার্শ্ববর্তী মান্ডু, চান্দেরী আর ধার রাজ্যও জয় করে ১৩০৮ সালে সদর্পে দিল্লি ফিরে গেলেন।

।। চার ।।

১৩১৬ সালের জানুয়ারি মাস। বৃদ্ধ আলাউদ্দিন মৃত্যুশয্যায়। পূর্বরাত্রে কেউ তাঁকে বিষ খাইয়েছে। শাহী হাকিমের তাই অভিমত। আলাউদ্দিন ধূসর স্মৃতিতে দুর্বল আলোড়ন তুলে আবছা মনে করলেন যে প্রধান বাবুর্চি এসে সুলতানের খানার প্রতিটি পদ আস্বাদন করে যাবার পর স্বয়ং মালিক কাফুর পাত্রে সুরা ঢেলে দিয়েছিল। ভোর হবার অল্পক্ষণের মধ্যেই ছেষট্টি বর্ষীয় আলাউদ্দিন বেহেশতের পথ ধরলেন। সুলতানের জীবনের শেষ পর্যায়টুকু অতি দুর্বিষহ করে তুলেছিলেন মালিক কাফুর। ধারণা করা হয়, আর্সেনিক বিষ প্রয়োগের ফলে আলাউদ্দিন ইডিমায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। দিল্লির মেহরউলিতে এই অতি পরাক্রান্ত তুর্কি সুলতানকে কবরস্থ করা হল।

আলাউদ্দিনের মৃত্যুর পর মালিক কাফুর মুহূর্তও কালক্ষেপ করলেন না। আগে থাকতেই তাঁর সমস্ত ব্যবস্থা ঠিক করে রাখা ছিল। দরবার বসিয়ে আলাউদ্দিনের এক ইচ্ছাপত্র প্রকাশ করে দিল্লির সিংহাসনের অভিভাবক হয়ে বসলেন। আলাউদ্দিনের পঞ্চম বর্ষীয় তৃতীয় পুত্র শিহাবুদ্দিন উমরকে দিল্লির সিংহাসনে কাষ্ঠ-পুত্তুলিকা বানিয়ে বসিয়ে দেওয়া হল। অভীষ্ট সিদ্ধ হতেই কাফুর সর্বাগ্রে সেই মণি কুক্ষিগত করলেন। কিন্তু শত্রুর শেষ রাখতে নেই। গুপ্ত ঘাতক দ্বারা কাফুর আলাউদ্দিনের পুত্রদের মধ্যে খিজর খাঁ ও শাদি খাঁর চোখ উপড়ে ফেলে অন্ধকূপে নিক্ষেপ করলেন তাদের। তৃতীয় পুত্র শাহজাদা কুতবউদ্দিন মুবারক শাহ পালিয়ে যেতে সমর্থ হল। যার সাহায্যে আনাজপাতি সরবরাহকারী এক গো-শকটে লুকিয়ে মুবারক শাহ পালাল তিনি আর কেউই নন, সেনাপতি আইন-উল-মুলক মুলতানি।

তারপর পঁয়ত্রিশ দিন ধরে মালিক কাফুর দিল্লিতে রাজত্বের ছলে এক অরাজকতা চালালেন। দিল্লিবাসীর কাছে তা পঁয়ত্রিশ বৎসরের মতো দীর্ঘ বলে মনে হল। হিরেখানা কাফুর সর্বদা নিজের কাছে রাখতেন। শেষে মালিকের রাজত্বের ছত্রিশতম দিনের প্রভাত অতিক্রান্ত হবার পর হারেমের এক দাসী গুপ্ত ঘাতক দ্বারা সংঘটিত নিজ শয্যায় তাঁর শিরচ্ছিন্ন দেহ আবিষ্কার করল।

***

কচি সবুজের চাদরে ঢাকা ঢেউ খেলানো বিস্তীর্ণ এক চারণভূমি। গণ্ডা পাঁচেক মেষের দলটাকে খামার থেকে তাড়িয়ে এনে সেখানে ছেড়ে দিয়েছে এক নব্য যুবক। নিজে বসেছে এক গাছের ছায়ায় গিয়ে। সে জানে না সুদূর দিল্লি থেকে বেগবান এক অশ্বারোহী ছুটে আসছে তার কাছে।

কখনও ঊষর ভূমি, কখনও দুর্গম গিরি ডিঙিয়ে উল্কাবেগে ছুটে চলেছে সে অশ্বারোহী। ঘোড়ার সমস্ত রোমকূপ ঘর্মাক্ত হয়ে উঠেছে। মুখনিঃসৃত উষ্ণ লালা ছিটকে এসে আরোহীর জানুদেশ স্পর্শ করছে। অবিরাম তিনদিন ছুটতে ছুটতে অশ্বারোহীরও দেহ ক্রমশ ভেঙে আসছে। তথাপিও এতটুকু বিশ্রামের অবকাশ নেই। অশ্বারোহী ছুটে চলছে এমন এক স্থানে যেখানে দিল্লির সিংহাসনের ভবিষ্যৎ তথা যোগ্য দাবীদার অজ্ঞাতবাসে রয়েছেন। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাঁকে দিল্লি ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে। নচেৎ নতুন কোনও বিপত্তির সূচনার আশঙ্কা প্রবল। অশ্বারোহী সেনাপতি মুলতানির অত্যন্ত বিশ্বাসভাজন নায়েব কামালউদ্দিন।

***

দুপুর গড়িয়ে বিকেল। কামালউদ্দিনের সঙ্গে এক শ্রীহীন মেষপালক দরবার মহলে পদার্পণ করতেই সমস্ত দিল্লি যেন আলোড়িত হয়ে উঠল। আলাউদ্দিনের যোগ্য উত্তরাধিকারী ফিরেছেন। অষ্টাদশ বর্ষীয় কুতুবউদ্দিন মুবারক শাহ নাবালক শিহাবুদ্দিনের স্থলাভিষিক্ত হলেন। আইন-উল-মুলক মুলতানি প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত হলেন।

মালিক কাফুরের হত্যা সংঘটিত হবার পর সেই অভিশপ্ত হিরে সরাসরি শিহাবুদ্দিনের হস্তগত হয়েছিল। হিরের উজ্জ্বলতা তাকে এতটাই মুগ্ধ করে রেখেছিল যে নাবালক শিহাবুদ্দিন নিদ্রাকালেও তা আঁকড়ে ধরে নিদ্রা যেত। সে হিরেখানা অহর্নিশ নিজের কাছে রাখবার বায়না ধরলে মুলতানি তাতে সম্মতি দিয়েছিলেন। কিন্তু আলাউদ্দিনের আমলের আরেক সেনাপতি খুসরু খাঁর এই হিরের প্রতি লোভ ছিল বহুদিনের। তিনি আপত্তি তুলে বলেছিলেন, “প্রধান সেনাপতির অনুমতি পেলে অধস্তনের একটা আর্জি ছিল।”

মুলতানি জানতে চাইলেন, “বলো কী বলতে চাও, খাঁ?”

“বলছিলাম যে, এই মূল্যবান হিরে কি এভাবে অরক্ষিত অবস্থায় রাখা উচিত? রাজকোষ রয়েছে, আমার রক্ষীরা রয়েছে। অমন একটা নাবালকের হাতে…”

মুলতানি খানিকক্ষণ অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে সহসা গর্জন করে উঠলেন, “সম্মান দিয়ে কথা বলো খাঁ! ভুলে যেও না নাবালক হলেও তিনিই বর্তমানে দিল্লির সুলতান। তোমার এই বেয়াদবির শাস্তি কী হতে পারে তুমি জানো?”

“গুস্তাখি মাফ, হুজুর। তবে হিরেটা…”

“ও নিয়ে তোমায় ভাবতে হবে না। উপস্থিত ওটা নতুন সুলতানের হাতেই সুরক্ষিত থাকবে। ভবিষ্যতে অন্য ব্যবস্থা করা যাবে।”

মুলতানি স্যাকরা ডেকে একখানা বাজুবন্ধে হিরেটা গেঁথে তা শিহাবুদ্দিনের হাতে পরিয়ে দিয়েছিলেন তখন।

কিন্তু মুবারক শাহ সুলতান হবার পর স্বভাবতই হিরেখানা তাঁর ব্যক্তিগত সম্পত্তি রূপে গণ্য করা হলেও শিহাবুদ্দিন কিছুতেই হিরে ত্যাগ করতে সম্মত হল না। মুবারক শত চেষ্টা করেও ভাইয়ের হাত থেকে হিরেখানা ছিনিয়ে নিতে সক্ষম হলেন না।

পিতার পরাক্রমের সিকিভাগও মুবারকের ব্যক্তিত্বে ছিল না। স্বভাবে কুটিল আর সন্দেহপ্রবণ মুবারক দুই মাস অতিক্রান্ত না হতেই ভাই শিহাবুদ্দিনের চোখ উপড়ে কারাগারে নিক্ষেপ করতে আদেশ দিলেন। কার্যসিদ্ধি হলে হিরেখানা মুষ্টিবদ্ধ করে অট্টহাস্য করে উঠলেন মুবারক।

***

১৩২০ সাল। দিল্লির মসনদে মুবারক শাহের রাজত্বকাল চার বৎসর অতিক্রান্ত হয়েছে। দীর্ঘ তিনমাস রোগ ভোগের পর দিন দশেক পূর্বে অভিভাবক, গুরু, মুবারকের প্রাণ রক্ষাকারী আইন-উল-মুলক মুলতানিরও ইন্তকাল ঘটেছে। সুলতানের হৃদয় তদাবধি ভারাক্রান্ত হয়ে আছে। নবনিযুক্ত প্রধান সেনাপতি খুসরু খাঁ সুলতানের মনোরঞ্জন হেতু এক শিকার অভিযানের আয়োজন করলেন। অনেক পীড়াপীড়ি করে সুলতানকে সম্মতও করালেন।

রাজস্থানের ঊষর ভূমিতে শিবির পড়ল। বড়জোর সপ্তাহ খানেকের ব্যাপার। বিশ্বস্ত জনাকুড়ি ব্যতীত দিল্লি থেকে সৈন্যসামন্ত বিশেষ কাউকে সঙ্গে নেবার প্রয়োজন বোধ করলেন না সেনাপতি। সেই অঞ্চলের সুবেদারের উপর সুলতানের সুরক্ষার ভার ন্যস্ত রয়েছে। প্রমোদস্থলে পৌঁছে শিকার অপেক্ষা সুরায় অধিক মেতে উঠলেন সুলতান।

চৈত্রের শেষ। সেদিন রাত্রি চতুর্থ প্রহরের পূর্বেই সুলতানের শিবিরকক্ষে খুসরু খাঁ প্রবেশ করলেন। সুলতানকে জাগিয়ে তুলে বললেন, “জাঁহাপনা, যদি সত্যি-সত্যিই হরিণ চান তবে এই মুহূর্তেই আমার সঙ্গে চলুন।”

পানাসক্ত মুবারক অস্বছ দৃষ্টি মেলে কোনোমতে জিজ্ঞেস করলেন, “এখন কেন? এখনও তো রাত বাকি। আমায় আরেকটু সুরা দিতে পার, সেনাপতি?”

“এখন আর নয় সুলতান। শিকারের জায়গায় সব ব্যবস্থা করে রেখেছে নাসিরুদ্দিন। গিয়ে পান করবেন। চলুন শিগগির। হরিণেরা ভোররাতে জল খেতে আসে। দেরি হয়ে গেলে নাগাল পাবেন না আর।”

মুবারক চাবুক খাওয়া ঘোড়ার মতো উঠে দাঁড়াতে গিয়ে টলে গেলেন। জড়িত কণ্ঠে বললেন, “আমার ঘোড়া কই? আমায় ঘোড়ার পিঠে বসিয়ে দাও।”

“এখন নয় জাঁহাপনা। ঘোড়া আধক্রোশ দূরে অপেক্ষা করছে। এখানে হৈ-হল্লা করলে সৈন্যসামন্ত পিছু নেবে। আর ওখানে হ্রদের ধারে বেশি লোকজন দেখলে হরিণও পালিয়ে যাবে। চলুন। আমার কাঁধে হাত রাখুন।”

খুসরু খাঁর অতি বিশ্বস্ত খিদমতগার নাসিরুদ্দিন কাজ শেষ করে এনেছে প্রায়। দুই মানুষ সমান গভীর এক গর্ত খুঁড়ে এইমাত্র উঠে এসেছে সে। এরই মধ্যে সুলতানকে সঙ্গে নিয়ে খুসরু খাঁ যেন অন্ধকার ফুঁড়ে আবির্ভূত হলেন। মুহূর্তের মধ্যেই মুবারককে এক মোক্ষম ধাক্কায় মাটিতে ফেলে দিয়ে যমদূতের মতো বুকের ওপর চেপে বসে তাঁর কণ্ঠ চেপে ধরলেন খাঁ। মুবারক বাধা দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেও অচিরেই নিস্তেজ হয়ে পড়তেই নাসিরুদ্দিন তাঁর বাজুবন্ধ খুলে নিয়ে খুসরুর হাতে দিল। খুসরুর চোখ লোভে চকচক করে উঠল। শেষে বিষাক্ত এক ছোরার উপর্যুপরি আঘাতে কাবু করে ফেলল সুলতানকে। খিলজি বংশের শেষ বংশধরকে গর্তে নিক্ষেপ করে দুই ঘোড়সওয়ার দিল্লির পথে রওনা হয়ে গেল। ১৫ এপ্রিল ১৩২০ সালে খিলজি বংশের দীপ নির্বাপিত হল।

।। পাঁচ ।।

খুসরু খাঁ দিল্লি পৌঁছেই নিজেকে সুলতান বলে ঘোষণা করে শাসনভার নিজ হাতে তুলে নিলেন। আলাউদ্দিনের আমল থেকে প্রচুর যুদ্ধবিগ্রহে জয়ী খুসরু তলে তলে দরবারের অধিকাংশ আমীর-ওমরাহদেরই নিজ করায়ত্ত করে রেখেছিলেন। এক বাধা ছিলেন আইন-উল-মুলক মুলতানি আর সুলতান মুবারক শাহ। বর্তমানে শেষ কাঁটাটাও উৎপাটিত হয়েছে। সিংহাসনে আরোহণ করে খুসরু আমোদ-আহ্লাদে মেতে উঠলেন। সেই অভিশপ্ত হিরেখানা নিজের আলখাল্লায় প্রধানতম মণি রূপে স্থান দিলেন।

অন্যদিকে মালিক কাফুরের মৃত্যুর পর থেকেই আলাউদ্দিনের আমলে নিযুক্ত দীপালপুরের আফগানি তুর্কি মনসবদার গাজী মালিক ধীরে ধীরে নিজের শক্তি বৃদ্ধি করছিলেন। দিল্লির পারস্যদেশীয় এবং আফগান ওমরাহগণের প্রায় কেউই খুসরু খাঁর অনুকূলে ছিলেন না। শেষে সেই সব ওমরাহদের আহ্বানে আর দিল্লি মসনদের উপস্থিত টালমাটাল অবস্থার সুযোগে গাজী একদিন আচমকা দিল্লি আক্রমণ করে বসলেন। রাজত্বকালের চার-সাড়ে চারমাস অতিক্রান্ত হতে না হতেই খুসরু খাঁর সিংহাসন টলে উঠল।

৫ সেপ্টেম্বর, ১৩২০ সালে গাজী মালিক দিল্লি আক্রমণ করলেন। তুলনায় কম সংখ্যক গাজীবাহিনীর আক্রমণও প্রতিহত করতে সক্ষম হল না দিল্লি। গাজী গিজ, তুর্কি, মোঙ্গল, রুমি, তাজিক, খোরাসানি, মেবাতি আর দোয়াবের রাজপুত সেনার এক সমন্বয় ঘটিয়ে মিশ্র অথচ দুর্ধর্ষ এক সেনাবাহিনীর উত্থান ঘটিয়েছিলেন।

দিল্লি আক্রমণের তিনদিনের মাথায় সন্ধ্যার প্রাককালে যুদ্ধবাজ উলুগ খাঁ খুসরু খাঁকে বন্দী করে গাজীর পদতলে এনে ফেললেন। গাজীর তরফে খুসরু খাঁর মৃত্যুদণ্ডের আদেশ হল।

পরদিন গাজী মালিক ‘গিয়াসউদ্দিন তুঘলক’ নামে দিল্লির মসনদে আসীন হয়ে তুঘলকবংশের সূচনা করলেন। রাজকোষের সমস্ত ধনরাজির সঙ্গে সেই হিরেখানাও নতুন সুলতানের হস্তগত হল।

নাতিদীর্ঘ পাঁচ বৎসর রাজত্ব করবার পর সুলতান গিয়াসউদ্দিন বাংলা অভিযানে বের হলেন। ততদিনে সুলতান নিজের বংশের নামে তুঘলকাবাদ নামক এক নগরীর পত্তন করেছেন। বাংলার সফল অভিযান শেষে ফেরবার পথে বর্তমান বিহারের উত্তরাংশে অবস্থিত তিরহুট (প্রাচীন মিথিলা) রাজ্যও জয় করে নিলেন।

দিল্লি আর বেশি দূর নয়। সমস্ত কিছু ঠিকঠাক থাকলে আর দিনকতকের মধ্যেই রাজধানীতে পৌঁছে যাবার কথা। তুঘলকাবাদের প্রায় দুই ক্রোশ দূরবর্তী স্থান আফগানপুরে রাত কাটাবার ছাউনি পড়েছে। আর দিল্লি থেকে তুঘলকাবাদের দূরত্ব মাত্র দেড় ক্রোশ। রাত গভীর হলে সেনাপতি উলুগ খাঁ সুলতানের শিবিরে প্রবেশ করে অভিবাদন সেরে দাঁড়ালেন।

“কী সংবাদ, সেনাপতি? এই অসময়ে?” সুলতান সবিস্ময়ে সেনাপতির দিকে তাকালেন।

“গুস্তাখি মাফ হুজুর। আপনার বিশ্রামে বিঘ্ন ঘটালাম। তামাম সৈন্যবাহিনীর তরফে এক আর্জি নিয়ে উপস্থিত হয়েছি জাঁহাপনা।”

সুলতানের মুখমণ্ডল থেকে দুশ্চিন্তার রেখা অন্তর্হিত হল। স্মিত হেসে জানতে চাইলেন, “আর্জি? তা সেটা কী?”

“সেনাদল এখানেই দুই-চারদিন বিশ্রাম নিতে চায় জাঁহাপনা। আপনি অনুমতি দিলে…”

সুলতান অত্যন্ত আশ্চর্য বোধ করলেন। বললেন, “সে কি! মাত্র দুই ক্রোশ দূরেই তো তুঘলকাবাদ। সেখানে পৌঁছে যাওয়া মানে তো দিল্লিই পৌঁছে যাওয়া একরকম। এত কাছে এসেও তোমরা এখানেই বিশ্রাম নিতে চাইছ!”

উলুগ খাঁ নতমস্তকে বললেন, “হ্যাঁ জাঁহাপনা, সৈনিকরা এই আফগানপুরেই বাংলা আর বিহার জয়ের বিজয় উৎসব করতে উৎসাহী। দিল্লি ফিরে হাঙ্গামা করতে চায় না।”

গিয়াসউদ্দিন তুঘলক তাঁর সৈন্যবাহিনীর প্রত্যেকের সঙ্গে পিতৃবৎ আচরণ করতেন। উলুগ খাঁর এই আর্জির পর আর আপত্তি করলেন না। ভেবে দেখলেন, ‘সত্যিই তো, সেনাবাহিনী শুধু বাংলা অভিযানে সামিল হয়েছিল। পরিকল্পনায় বিহারের তিরহুটের উল্লেখ ছিল না। অতিরিক্ত যুদ্ধবিগ্রহে সৈন্যদল নিশ্চয়ই শারীরিক-মানসিক উভয়ত ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তিন-চারদিন দেরিতে দিল্লি ফিরলে ক্ষতিবৃদ্ধি কী আর হবে। দিল্লির দায়িত্বে জুনা যখন রয়েছে, সমস্যা হবে না।’

সুলতান সৈন্যদলের ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে আফগানপুরে মোট তিনদিন বিশ্রাম করবার অনুমতি দিলেন। ছাউনিতে আনন্দের হিল্লোল বয়ে গেল।

সুলতানের অবর্তমানে দিল্লির দায়িত্বপ্রাপ্ত শাহজাদা জুনা খাঁর কাছে বার্তা পাঠানো হল। জুনা খাঁ পিতার এই অসাধারণ সাফল্য উদযাপনের উদ্দেশ্যে আফগানপুরে এক বিশাল মঞ্চ নির্মাণ করিয়ে সুলতানকে সম্বর্ধনা প্রদান করতে মনস্থ করলেন। সম্পূর্ণ কাষ্ঠনির্মিত দ্বিতল মঞ্চখানা প্রস্তুত করবার দায়িত্ব নিজের বিশ্বস্ত সহচর আহমদ আয়াজের উপর ন্যস্ত করলেন।

কুয়াশামাখা আবছা শীতের সকাল। প্রভাত উত্তীর্ণ হতেই দলে দলে লোকজন মঞ্চের সম্মুখবর্তী হতে শুরু করল। সৈন্যসামন্ত, আমীর-ওমরাহগণের পাশাপাশি সাধারণ জনগণ মঞ্চের সামনে কেউ বসে, কেউ দাঁড়িয়ে থেকে সুলতান গিয়াসউদ্দিন তুঘলকের প্রতীক্ষা করতে লাগল। মঞ্চ সুচারু রূপে পুষ্পপত্রদ্বারা সুসজ্জিত করা হয়েছে। আহমদ আয়াজ আর সেনাপ্রধান উলুগ খাঁ সমস্ত তদারকি করছেন। অল্প সময়ের মধ্যেই সুলতান এসে মঞ্চে আরোহণ করবেন। শাহজাদা জুনা খাঁর যথাসময়ে আফগানপুরে উপস্থিত হবার কথা ছিল। কিন্তু আচমকা দিল্লিতে এক জরুরি কর্ম সম্পাদন হেতু উপস্থিত হতে অক্ষম বলে সুলতানের কনিষ্ঠ পুত্র মাহমুদ খাঁ বার্তা নিয়ে হাজির হলেন।

বাংলা-বিহার থেকে লুঠ করে আনা একপাল হাতি মঞ্চের একপাশে মাহুত দ্বারা পরিবেশিত কীসব অজ্ঞাত লতাপাতা চিবুচ্ছিল। ঠিক বিপরীত দিকে রয়েছে সুবিশাল সুলতানি হাতিশাল। তাদেরও অনুরূপ খাদ্য সরবরাহ করা হয়েছে। অস্থায়ী মঞ্চের নিম্নদেশ দুই-চারটি খুঁটি দ্বারা দ্বিতলকে কোনোরূপ ধরে রেখেছে। সুলতান মঞ্চের দ্বিতলে আরোহণ করে আসনে উপবিষ্ট হয়েছেন। ডানপাশে শুধু কনিষ্ঠ শাহজাদা মাহমুদ আর পেছনে দুই-চারজন সুলতানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ আমীর-ওমরাহ।

সৈন্যসামন্ত সকলে হর্ষোল্লাস তুলল। চতুর্দিকে হৈ-হল্লা আর চিৎকারে কান পাতা দায়। ইত্যবসরে দুই হাতিশালের মধ্যে যে তোলপাড় আরম্ভ হয়ে গেছে তা কেউ নজর করেনি। আহমদ আয়াজের ইশারা পাওয়ামাত্র হিমশিম খেতে থাকা মাহুতেরা হাতিশালের মজবুত আগল খুলে দিয়ে কোনোমতে পালিয়ে গেল। দুই পক্ষের উন্মত্ত হাতির দল মঞ্চের দুইদিক থেকে পঙ্গপালের মতো একে অপরের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। কোনও কিছু বুঝে উঠবার আগেই মড়মড় শব্দে মঞ্চখানা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হল। ঘড়ি দুই হাতি-দলের বিপক্ষে যুদ্ধ করে কোনোমতে বাগে এনে সুলতান সহ শাহজাদা মাহমুদ আর কয়েকজন আমীরের হাতি-দলের পদদলিত নিষ্প্রাণ দেহ উদ্ধার করা হল। আহমদ ক্ষিপ্রহস্তে মৃত সুলতানের শিরস্ত্রাণে সন্ধান চালিয়ে তা থেকে হিরেখানা খুলে নিয়ে সকলের অলক্ষ্যে দিল্লির উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেল।

দ্বিতীয় অধ্যায়

।। এক।।

২১ নভেম্বর, ১৫১৭।

সিকন্দর শাহ লোদির মৃত্যুতে দিল্লির সিংহাসনে অভিষিক্ত হলেন তাঁর সুযোগ্য পুত্র ইব্রাহিম লোদি। সিংহাসনে বসেই তাঁর প্রথম দৃষ্টি গেল গোয়ালিয়রের রাজপুতদের দিকে। গোয়ালিয়র সিংহাসনে তখন রাণা বিক্রমজিৎ সিং। বিক্রমজিৎ নতুন সুলতানের সিংহাসন আরোহণের সংবাদ পেয়ে উপঢৌকন সহযোগে নিজের শুভেচ্ছা বার্তা পাঠালেন এক বিশ্বস্ত অনুচর চন্দ্রভানের হাতে। চন্দ্রভান রাণা বিক্রমজিৎ সিংয়ের ভ্রাতৃস্থানীয় এক নিকটাত্মীয়ও বটে। একাজে তাঁর চাইতে সুযোগ্য ব্যক্তি আর কেউ হয় না।

ইব্রাহিম লোদি দরবার শেষে নিজ কক্ষে বিশ্রামরত। দ্বারবান উপস্থিত হয়ে নিবেদন করল, “গোয়ালিয়র-রাজের এক দূত আপনার সাক্ষাৎ প্রার্থী, সুলতান।”

ভ্রূ যুগল ঈষৎ কুঞ্চিত হয়ে উঠল সুলতানের। জানালেন, “মেহমানখানায় পাঠিয়ে দাও। আগামীকাল দরবার বসলে হাজির করবে।”

দ্বারবান ইতস্তত কণ্ঠে জানাল, “কিন্তু দূত আপনার সঙ্গে একান্ত সাক্ষাতে ইচ্ছুক সুলতান।”

সামান্য চিন্তিত হলেন ইব্রাহিম। শেষে আদেশ দিলেন, “বেশ। পাঠিয়ে দাও তবে।”

চন্দ্রভান হাসিমুখে সুলতানের কক্ষে প্রবেশ করলেন। তারপর কেটে গেল দীর্ঘক্ষণ। প্রায় এক প্রহর অতিক্রম করে হৃষ্টচিত্তে সুলতানের কক্ষ থেকে নির্গত হয়ে অবিলম্বে গোয়ালিয়রের পথ ধরলেন তিনি।

পরবর্তী কয়েকমাসে একাধিকবার গোপনে গোয়ালিয়র আর দিল্লির পথে আসাযাওয়া করলেন চন্দ্রভান।

***

একদিন আচমকাই রাণা বিক্রমজিৎ সিংয়ের কক্ষে হাজির হলেন চন্দ্রভান। চোখেমুখে আষাঢ়ে মেঘের কালিমা। রাণা কী এক পত্র লিখতে ব্যস্ত, লেখা ছেড়ে মুখ তুললেন। “কী সংবাদ, চন্দ্রভান? চোখেমুখে এত দুশ্চিন্তার ছাপ কেন?”

আতঙ্কে থরথর করে কেঁপে উঠলেন চন্দ্রভান। কোনোমতে উচ্চারণ করলেন, “সর্বনাশ হয়েছে মহারাজ! দিল্লির সুলতানের লোলুপ দৃষ্টি গোয়ালিয়র সিংহাসনের ওপর পড়েছে। এইমাত্র গুপ্তচর মারফত সংবাদ পেলাম।”

কাগজকলম ঠেলে সরিয়ে রাখলেন বিক্রমজিৎ। চোয়াল অত্যন্ত কঠিন, চোখ ঠিকরে যেন আগুন বেরোচ্ছে। জলদগম্ভীর কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন, “সত্যতা যাচাই করেছ? কী উদ্দেশ্য তাঁর?”

“সে এখনও যাচাই করা সম্ভব হয়নি মহারাজ। দু’দিন সময় চাই।”

“বেশ। যাওয়ার পথে মহামন্ত্রী আর প্রধান সেনাপতিকে এত্তেলা পাঠিয়ে যেও, অবিলম্বে যেন সাক্ষাৎ করেন এসে।”

সংবাদ সর্বাংশে সত্য। মাস খানেকের মধ্যেই সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো ধেয়ে এসে গোয়ালিয়র রাজদুর্গ ঘিরে ছাউনি ফেলল দিল্লির সেনা। দিল্লি সেনার নেতৃত্বে সুলতানের বিশ্বস্ত সেনাপতি আজম হুমায়ূন শেরওয়ানি। রাণা বিক্রমজিৎ সিং, মহামন্ত্রী ও প্রধান সেনাপতি তখন মন্ত্রণা কক্ষে।

পরদিন গোয়ালিয়র রাজদরবারে সুলতানি দূত উপস্থিত হয়ে এক সন্দেশপত্র তুলে দিল রাণার হাতে। বার্তা অতি স্পষ্ট। সুলতান অযথা রক্তক্ষয় চান না। গোয়ালিয়র-রাজ দিল্লির বশ্যতা স্বীকার করে নিয়ে বাৎসরিক ধার্য খাজনা যথাসময়ে দিল্লি পৌঁছে দেওয়ার অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করে দিলেই ফিরে যাবে দিল্লি সেনা। গোয়ালিয়রের এতটুকু ক্ষতিও করবে না তারা।

চন্দ্রভানের মুখ কালো হয়ে উঠল এ পত্র পাঠে। সর্বাঙ্গ কাঁপছে তিরতির করে। সুলতান বিশ্বাসভঙ্গ করেছেন তাঁর সঙ্গে। গোয়ালিয়রের সিংহাসন প্রার্থনা করেছিলেন তিনি গোপনে দিল্লি সুলতানের কাছে। বশ্যতা স্বীকারের পরিকল্পনা হয়নি কখনোই।

এবারে চন্দ্রভানকেও সঙ্গে করে মন্ত্রণা কক্ষে প্রবেশ করলেন রাণা বিক্রমজিৎ সিং। সঙ্গে মহামন্ত্রী ও প্রধান সেনাপতি।

প্রথম মুখ খুললেন চন্দ্রভানই। বললেন, “এ সিদ্ধান্ত যত বিলম্বে পৌঁছবে ওদের কাছে, ততই বিপদ বেশি হবে গোয়ালিয়রের মহারাজ।”

রাণা চোখ তুলে প্রশ্ন করলেন, “তবে? তোমার মতে সিদ্ধান্ত কী হওয়া উচিত চন্দ্রভান?”

“পত্রপাঠ সুলতানের প্রস্তাবে সম্মতি প্রদান মহারাজ। উনি প্রতিজ্ঞা করেছেন, আপনি তাঁর এই সামান্য প্রস্তাবে সম্মত হলে একবিন্দু রক্তও ক্ষয় করবেন না।”

“প্রতিজ্ঞা? যবনের প্রতিজ্ঞা! তা এই প্রতিজ্ঞার সংবাদ কী উপায়ে পেলে তুমি, চন্দ্রভান? প্রস্তাব পত্রে তো এর উল্লেখ নেই কোনও!” মহামন্ত্রী প্রশ্ন করে বসলেন।

সহসা জোর একটা ধাক্কা লাগলেও সঙ্গে-সঙ্গেই নিজেকে সামলে নিলেন চন্দ্রভান। ঠোঁট চেটে নিয়ে উত্তর দিলেন, “ওই, ওই যে আমার ব্যক্তিগত গুপ্তচর মারফত। তাছাড়া গোয়ালিয়র আক্রমণ করে ছারখার করে দেওয়ার উদ্দেশ্য থাকলে কি আর দিল্লি সুলতান এই প্রস্তাব পাঠাতেন?”

মহারাজ আর মহামন্ত্রীর অর্থবহ দৃষ্টি পরস্পর আলিঙ্গন করল। মন্ত্রণা সেদিনকার মতো স্থগিত রইল। দু’দিনের সময় চেয়ে নিয়ে সুলতানি দূতকে বিদায় দেওয়া হল।

রাত প্রায় তৃতীয় প্রহর। সুলতানি সেনাপতি আজম হুমায়ূনের তাঁবুর দ্বাররক্ষীর কাছে পরিচয় প্রকাশ করে সন্তর্পণে পর্দা সরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল এক আগন্তুক।

সেনাপতির ঘোর নিদ্রাকর্ষণ থেকে জাগিয়ে তুলল তাঁকে। আজম হুমায়ূন ধড়মড় করে উঠে বসে প্রশ্ন করলেন, “চন্দ্রভান, তুমি? এত রাতে?”

চন্দ্রভান ধপ করে এক আসনে বসে পড়ে জানালেন, “আমাকে ওরা সন্দেহ করছে নির্ঘাত। ধরা পড়বার আগে…”

চন্দ্রভানকে বক্তব্য শেষ করতে দিলেন না সেনাপতি। তার আগেই হাত তুলে থামার নির্দেশ দিলেন।

সবার অলক্ষ্যে একটা ছায়ামূর্তি তখন সুলতানি সেনা ছাউনি ছেড়ে দ্রুত পায়ে এগিয়ে চলল রাণার দুর্গের পথে।

পরদিন পরামর্শ হল, এ-যাত্রা দিল্লির নিকট বশ্যতা স্বীকার করা ছাড়া আর গত্যন্তর নেই কোনও। মহামন্ত্রী বললেন, “ওরা এখন আর সম্মুখ যুদ্ধে দুর্গ দখল করতে চাইবে না মহারাজ। সন্ধি প্রস্তাব নাকচ করা মাত্র পিলপিল করে গুপ্ত পথে দুর্গে প্রবেশ করবে একরকম বিনা প্রতিরোধে। আর ওই দিল্লি সেনাপতিকে পথ দেখিয়ে আনবে কে বিলক্ষণ বুঝতেই পারছেন তা। আপনার ভাই চন্দ্রভান।”

প্রধান সেনাপতি আক্ষেপ করলেন, “ওই বিশ্বাসঘাতকটা না থাকলে সম্মুখ যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী ছিল।”

মহামন্ত্রী দু’দিকে মাথা নেড়ে উত্তর দিলেন, “না সেনাপতি। সে অসম যুদ্ধেও আমাদের পরাজয় নিশ্চিত ছিল। সুলতানি সেনা সংখ্যায় এবং অস্ত্রশস্ত্রে আমাদের তিন গুণ।”

গোয়ালিয়র-রাজ দিল্লির বশ্যতা স্বীকার করলেন। রাজপুতদের কাছে রক্তের চেয়ে আব্রুর মূল্য অনেক বেশি। সুলতানি সেনা ফিরে গেল।

***

খিলজি বংশধরেরা সুরক্ষিত আশ্রয়ের নামে একরকম বন্দী তখন আগ্রার দুর্গে। সুলতান ইব্রাহিম আগ্রার দুর্গেই বিলাসবহুল এক মহলের ব্যবস্থা করে দিলেন চন্দ্রভানকেও। মাঝেমধ্যে সুলতান স্বয়ং এসে সাক্ষাৎ করে যান তাঁর সঙ্গে।

এমনই এক সাক্ষাতের দিনে ইব্রাহিম সুবিশাল এক পেটিকার রক্ষণাবেক্ষণের ভার অর্পণ করলেন চন্দ্রভানের হাতে। পেটিকা সুলতানের ব্যক্তিগত ধনরত্নে পরিপূর্ণ। রাশি রাশি ধনরত্নের মধ্যে রাজার রাজা এক অপূর্বদৃষ্ট হীরকখণ্ড। যার সমতুল এ পৃথিবীতে আর নেই।

দিল্লির সিংহাসনে লোদি বংশের প্রতিষ্ঠাতা পিতামহ বহলোল লোদির সময়কাল থেকেই আফগান সর্দারেরা আপন আপন জায়গীরে রাজত্ব করে আসছে। ইদানীং ইব্রাহিম লোদির তাদের ওপর অহেতুক খবরদারি তারা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। প্রতিহিংসার আগুনের তাপ দিল্লির সিংহাসনের দিকে ধেয়ে আসছে ক্রমশ।

অসন্তুষ্ট সর্দারেরা একজোট হল। নেতৃত্বে এগিয়ে এলেন ইব্রাহিমের পিতৃব্য আলম খাঁ এবং পাঞ্জাবের শাসক দৌলত খাঁ লোদি। কাবুলের তৈমুর বংশীয় এক ভাগ্যান্বেষীকে ভারত আক্রমণের আমন্ত্রণ পাঠালেন। সে দুর্ধর্ষ যোদ্ধাও বহুদিন অপেক্ষা করে রয়েছেন একটা সুযোগের। কালক্ষেপ না করে যথাশীঘ্র দিল্লি আক্রমণ করে বসলেন।

১৫২৬ সালের ২১ এপ্রিল পানিপথের প্রথম যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদি নিহত হলেন। দিল্লির সিংহাসনে লোদি বংশও লোপ পেল।

।। দুই ।।

বসন্তকাল, ১৫২৬ সাল। উজবেকিস্তানের ফরগনা অঞ্চলের এক তুর্কি-মোঙ্গল যুবক বাছাইকরা কিছু দুর্ধর্ষ যোদ্ধা একত্র করে খাইবার গিরিপথ ধরে দ্রুত ভারতের দিকে এগিয়ে চলেছেন। তিনি জহির-উদ-দিন মহম্মদ বাবর। সীমান্তে তাঁদের স্বাগত জানালেন আলম খাঁ এবং দৌলত খাঁ লোদি ও তাঁদের দলবল। দুর্বার গতিতে আছড়ে পড়া এই ঝড় আর এদের অত্যাধুনিক কামান-গোলার তীব্র আঘাত প্রতিরোধ করতে সক্ষম হল না দিল্লি। পানিপথের প্রান্তরে তুমুল যুদ্ধে প্রাণ হারালেন দিল্লির অন্তিম লোদি বংশীয় সুলতান ইব্রাহিম লোদি। পরিবারপরিজনেরা বন্দী হল আগ্রার দুর্গে।

দিল্লি সিংহাসনে মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা হল।

বাবর নির্দিষ্ট কোনও ধনরত্নের লোভে এদেশ আক্রমণ করেননি। করেছেন সুবর্ণসুযোগের সদ্ব্যবহার করে দিল্লি মসনদে আসীন হওয়ার অভিপ্রায়ে। সে অভিপ্রায় সফল হতেই পুত্র হুমায়ূনকে পাঠালেন উদ্ধত রাজপুতদের শায়েস্তা করতে।

হুমায়ূনের প্রথমেই নজর গেল আগ্রা দুর্গে নজরবন্দী খিলজি বংশধর ও জনাকতক রাজপুত বন্দীদের প্রতি। এদের সরিয়ে দিয়ে আগ্রা দখলমুক্ত করতে হবে যত শীঘ্র সম্ভব। কারণ, শাহেনশাহ বাবর আগ্রায় নিজের রাজধানী স্থানান্তরণের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।

চন্দ্রভান অত্যন্ত ধূর্ত ব্যক্তি, চতুর্দিকের সংবাদ পুঙ্খানুপুঙ্খ রাখেন। হুমায়ূন আগ্রা দুর্গে পৌঁছলে চন্দ্রভান গোপনে উপস্থিত হয়ে জানালেন, “আপনার জন্যে আমার তরফে অমূল্য এক উপহার রয়েছে শাহজাদা।”

চন্দ্রভান নিশ্চিত জানেন ইব্রাহিমের গচ্ছিত ধনরত্নের মধ্যে একমাত্র সে হিরেই তাঁর প্রাণ যেমন রক্ষা করতে পারে, তেমনই কেড়েও নিতে পারে মুহূর্তে। সে হীরকখণ্ড চন্দ্রভান নিজের কাছে লুকিয়ে রেখে প্রাণ বিপন্ন করতে চাইলেন না।

অপূর্ব সুন্দর এই হীরকখণ্ডের বিনিময়ে চন্দ্রভান প্রাণে বেঁচে গেলেন। পুত্রের বার্তা পেয়ে বাবর অনতিবিলম্বে আগ্রায় উপস্থিত হলে হুমায়ূনও তা তুলে দিলেন পিতার হাতে।

অজ্ঞাত নাম্নী এই হীরকখণ্ড প্রথমবারের মতো নিজের নাম পেল, বাবরের হিরে। পরবর্তী প্রায় দুশো বছর হীরকখণ্ডটি এই নামেই ইতিহাসের পাতায় পরিচিত ছিল।

***

১৫৩০ সাল।

শাহজাদা হুমায়ূন দীর্ঘ ছয়মাস ব্যাপী পিতার আদেশে মধ্যপ্রদেশের সম্ভাল দুর্গে নিযুক্ত রয়েছেন। কোনোক্রমে আগ্রায় ফিরে এলেন অজ্ঞাত এক জ্বরে ধরাশায়ী হয়ে। শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটজনক। শাহেনশাহও স্বয়ং অসুস্থ একরকম, ভারতের অধিকাংশ অঞ্চল অবিজিত থাকলেও গত একবছরে কোনও যুদ্ধবিগ্রহে উৎসাহ দেখাননি তিনি। নিজের আত্মজীবনী ‘বাবরনামা’ও লিপিবদ্ধ করা বন্ধ করে দিয়েছেন বছর খানেক আগেই।

তাবড় তাবড় হাকিম-বৈদ্যেরা হুমায়ূনের এই অজ্ঞাত রোগ চিহ্নিত করতে সক্ষম হলেন না। শারীরিক ও মানসিক উভয়তই অত্যধিক শক্তিশালী বাবর শাহজাদার এই মৃত্যুযাত্রায় অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়লেন। প্রাণাধিক পুত্রের প্রাণ বুঝি আর রক্ষা হয় না।

ক’দিন পরে কোথা থেকে এক সন্ন্যাসী এসে হাজির হলেন সহসা দরবারে। সর্বাঙ্গে তাঁর বিভূতি মাখা, চোখে জ্বলন্ত অঙ্গার। তর্জনী উঁচিয়ে নির্দেশ দিলেন, “অন্ধকার! ঘোর অন্ধকার! শীগগিরই নিজের সবচাইতে প্রিয় ধন যমুনায় জলাঞ্জলি দিয়ে প্রার্থনা শুরু করুন শাহেনশাহ। পুত্রের প্রাণ ভিক্ষা চেয়ে নিন ঈশ্বরের কাছে।”

সন্ন্যাসী দাঁড়ালেন না। বিচলিত বাবরও কোনও প্রশ্ন করবার সুযোগ পেলেন না। শাহী হাকিম এগিয়ে এসে পরামর্শ দিলেন, “তাই করুন শাহেনশাহ, ধনরত্ন নিজের কলিজার টুকরোর চেয়ে মূল্যবান কিছু নয়।”

সিংহাসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন বাবর। দৃপ্তকণ্ঠে জানালেন, “আমি এই সিংহাসনের উত্তরাধিকারীর প্রাণ রক্ষার বিনিময়ে নিজের প্রাণ উৎসর্গ করতে রাজি আছি। হে হজরত, হে পরবর দিগার, আমার জানের বিনিময়ে হুমায়ূনের জান ভিক্ষা দাও!”

দরবার ছেড়ে বাবর সোজা গিয়ে হাজির হলেন রুগ্ন হুমায়ূনের পালঙ্কের পাশে। পালঙ্কের চতুর্দিক প্রদক্ষিণ করে একই মিনতি করতে লাগলেন পরমেশ্বরের নিকট।

***

নিজের মহলে অলিন্দের একদিকে দোলনায় অলস বসে দোল খাচ্ছেন এক বৃদ্ধা, বাইদা বেগম। একহাতে গড়গড়ার নলের মুখ। সুগন্ধি তামাকের আবছা ধোঁয়া মন্থর ভেসে চলেছে চতুর্দিকে। পূর্ববর্তী সুলতান ইব্রাহিমের জন্মদাত্রী তিনি। আচমকা এক দাসী উপস্থিত হয়ে সংবাদ দিল, “শাহজাদার অবস্থা আজ অত্যন্ত সংকটজনক বেগম সাহেবা। দিনটা পেরোলে হয়।”

মুহূর্তে চোখের দৃষ্টি অস্থির হয়ে উঠল বাইদা বেগমের। শত্রুর দুর্গের নির্ধারিত মহলে নজরবন্দী হয়ে কাটালেও এ বিপর্যয় আর সহ্য হল না তাঁর। সংকোচ, বিদ্বেষ ঝেড়ে ফেলে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এগিয়ে এলেন হুমায়ূনের শুশ্রূষায়। এই দুঃসময়ে শাহেনশাহের পাশে গিয়ে না দাঁড়ালে গুনাহ হয়। মাতৃস্নেহে হুমায়ূনের সেবায় উৎসর্গ করলেন নিজেকে।

দিন কতক বাদে সত্যি-সত্যিই চোখ মেলে তাকালেন হুমায়ূন। নিশ্চিত মৃত্যুমুখ থেকে ফিরে উঠে বসলেন শয্যায়। দিনরাত এক করে শাহজাদাকে সুস্থ করে তুললেন বাইদা বেগম।

শাহেনশাহর চোখেমুখে ক্লান্ত তৃপ্তি, বাইদা বেগমের প্রতি আকুল কৃতজ্ঞতা। এবারে বিশ্রাম নেবেন তিনি। কতদিন যে নিদ্রা যাননি। ভালোমন্দ দুটো মুখে দেননি।

শাহী পাকশালায় স্বয়ং বাইদা বেগম প্রবেশ করেছেন আজ। শাহী খানসামাকে ডেকে নির্দেশ দিলেন, “আজ শাহেনশাহর প্রিয় খরগোশের গোস্ত, গাজর মসালা আর তন্দুরি রুটি করো খানসামা। আজ তাঁর জীবনে এক বিশেষ দিন।”

শাহেনশাহর চশনিগিরকে (খাদ্য পরীক্ষক) গোপনে ক্ষুদ্র দুই শিশি তরল হাতে দিয়ে এলেন বাইদা বেগম। একটা মন্দগতির বিষ, অপরটা তার কাটান। চশনিগির গোপনে শাহেনশাহর নিত্যদিনের খাদ্যে প্রথম শিশির তরল মিশিয়ে যাবে, তারপর পরীক্ষার পর নিজে নিয়মিত সেবন করে যাবে দ্বিতীয় শিশির তরল।

মাস চারেক অতিক্রান্ত হয়েছে তারপর। হুমায়ূন পুনরায় হৃত স্বাস্থ্য ফিরে পেয়েছেন। তবে শাহেনশাহর শারীরিক অবস্থা ধীরে ধীরে মন্দের দিকে চলেছে। ইদানীং তো অত্যন্ত সংকটজনক।

শেষে মাত্র আটচল্লিশ বছর বয়সে ২৬ ডিসেম্বর, ১৫৩০ সালে মৃত্যুমুখে পতিত হলেন মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবর।

অত্যন্ত সুচতুর উপায়ে পুত্রের মৃত্যুর চরম প্রতিশোধ নিলেন এক মা। বাবর নিজ পুত্রের মৃত্যুযোগ নিজের মাথায় নিয়ে যে অলৌকিক প্রাণত্যাগের গরিমা ইতিহাসে লিখে গেলেন, বাইদা বেগমের প্রতিশোধ স্পৃহা তাতে চাপা পড়ে গেল।

।। তিন ।।

৩০ ডিসেম্বর, ১৫৩০।

তেইশ বর্ষীয় যুবক হুমায়ূন দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করলেন। তবে এই যুবকের প্রতি ভাগ্যদেবী সুপ্রসন্ন নন মোটেই।

দুই বছর অতিক্রান্ত হতে না হতেই হুমায়ূনের রাজসিংহাসনে নেমে এল চরম বিপর্যয়। দুর্ধর্ষ আফগান বংশোদ্ভূত সর্দার শের শাহ সুরি হুমায়ূনকে বিতাড়িত করলেন দিল্লির মসনদ থেকে। সেই থেকে একযুগ ধরে হুমায়ূন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন গিরিকন্দরে, মিশ্র জনপদে।

শেষে একদিন মনস্থির করলেন হুমায়ূন। গোপনে পারস্য সম্রাটের সাক্ষাতে রওনা হলেন একান্ত বিশ্বস্ত কিছু অনুচরকে সঙ্গে করে।

নীল রঙের ফুলের নকশা কাটা মূল্যবান মণিমুক্তোর এক বটুয়া ভিন্ন হুমায়ূনের হাতে তখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। আগ্রা থেকে রওনা হয়ে পারস্যের পথ ধরেছেন তিনি। মধ্যাহ্নকাল। পথে এক বেগবতী নদীতে স্নানে নেমেছেন হুমায়ূন। বটুয়া রেখেছেন নদীর তীরে। তাঁর পোশাকপরিচ্ছদ হাতে এক গাছের তলায় দাঁড়িয়ে কমবয়সী এক খিদমতগার, জোহর। হুমায়ূন বাল্যকাল থেকেই আলাভোলা মানুষ, খামখেয়ালিপনা তাঁর রক্তে। এ বিষয়ে পিতা বাবরও যথেষ্ট অসন্তুষ্ট ছিলেন তাঁর প্রিয় পুত্রের প্রতি। হুমায়ূন স্নান শেষে উঠে এলেও নদীপাড় থেকে মণিমুক্তোর বটুয়া তুলে নিতে বেমালুম ভুলে গেলেন। আনমনা হয়ে পা চালিয়েছেন তাঁবুর পথে। এমনি সময় পেছন থেকে দৌড়ে আসা জোহরের ডাকে চমক ভাঙল তাঁর। জোহর বাদশাহর আমানত ফিরিয়ে দিয়ে জানাল, “আপনার বটুয়াটা নদীর পাড়েই ভুলে এসেছেন শাহেনশাহ। এই নিন।”

হুঁশ ফিরল হুমায়ূনের। রক্তের একটা লাভা স্রোত বয়ে গেল তাঁর পিঠ বেয়ে। জোহরের কাঁধে হাত রেখে বললেন, “এতে কী আছে তুমি জানো?”

“না, শাহেনশাহ।”

একরাশ সন্তুষ্টি ঝরে পড়ল হুমায়ূনের কণ্ঠ বেয়ে। “সততা আর আনুগত্যের এক অনন্য নজির আজ স্থাপন করলে তুমি জোহর। এ হারালে আমরা আত্মহত্যা ভিন্ন আর কোনও পথ ছিল না।”

পারস্য দেশের উদ্দেশ্যে হুমায়ূনের এই যাত্রা কিন্তু গুপ্ত রইল না। হুমায়ূন তখন রাজস্থানের যোধপুরে তাঁবু ফেলেছেন। লোকালয় এড়িয়ে নির্জন স্থান বেছে নিয়েই তাঁবু ফেলে রাত্রিবাস করে থাকে দলটা। তবুও কী উপায়ে হুমায়ূনের সন্ধান পেয়ে গেল স্থানীয় এক রত্নব্যবসায়ী। এক সন্ধ্যাকালে সে এসে উপস্থিত হুমায়ূনের তাঁবুতে। সরাসরি প্রস্তাব দিল, “আমি এদেশিয় এক রত্নব্যবসায়ী হুজুর। আপনার সবচাইতে মূল্যবান রত্নখানা সমুচিত মূল্যে কিনে নিতে ইচ্ছুক।”

প্রস্তাব শুনে দু’চোখে যেন স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠল হুমায়ূনের। দৃপ্তকণ্ঠে জানালেন, “কান খুলে শুনে রাখো হে জহুরি। মণিমুক্তোর প্রতি আমার এই আসক্তি ও ভালোবাসা তুমি কোনও মূল্যেই খরিদ করতে সক্ষম হবে না। কারণ, এর কোনও নির্ধারিত মূল্য হয় না। তলোয়ারের ক্ষমতাতেই তা একমাত্র হাসিল করা সম্ভব। বলো, আছে সে ক্ষমতা তোমার?”

জহুরি আর তিলমাত্র কালক্ষেপ করা সমীচীন বোধ করল না, বেরিয়ে গেল দ্রুতপদে। গভীর রাতে গুপ্তচরেরা সংবাদ নিয়ে এল, জহুরি আর কেউ নন, স্বয়ং যোধপুর-রাজ মলদেব।

১৫ জুলাই, ১৫৪৪।

হুমায়ূন পৌঁছেছেন সুদূর পারস্যের রাজধানী কাজভিনের উপকণ্ঠে। সঙ্গে স্ত্রী বেগা বেগম ও চল্লিশ জন অনুগতের বর্ণাঢ্য এক শোভাযাত্রা। পারস্য সম্রাট শাহ তহমাস্পের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে এসেছেন তিনি। পনেরো মাসের শিশু আকবরকে রেখে এসেছেন দিল্লিতে আত্মীয়পরিজনদের হেফাজতে।

হুমায়ূনের এই আগমন খুব একটা মনঃপূত হল না পারস্য সম্রাটের। হুমায়ূন যতই একে সৌজন্য সাক্ষাৎ বলে আখ্যা দিন না কেন, শাহ তহমাস্প জানেন ভাগ্য তাড়িত হুমায়ূন এক অর্থে পারস্যের সাহায্য প্রার্থনা করতেই উপস্থিত হয়েছেন এসে। তবুও মনের অসন্তোষ গোপন রেখে ভূতপূর্ব দিল্লি সম্রাটের সম্মানার্থে রাজধানীতে তিনদিনের মহোৎসবের ঘোষণা করলেন শাহ তহমাস্প। হুমায়ূনকে যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে রাজদুর্গ থেকে খানিকটা দূরে শাহী মেহমানখানায় আপ্যায়ন করলেও একরকম নজরবন্দীই করে রাখলেন তাঁকে। শাহ তহমাস্পের অনুমতি ব্যতীত হুমায়ূনের কোথাও যাওয়া বা কারও সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ একেবারে বন্ধ করে রেখেছেন।

হুমায়ূন পারস্য সম্রাটের সাক্ষাৎ প্রার্থী হয়ে অপেক্ষার প্রহর গুনছেন। এরই মধ্যে একদিন তলব এল দরবারে হাজির হওয়ার। হুমায়ূন তড়িঘড়ি দরবারে উপস্থিত হতেই শাহ তহমাস্প সহাস্যে আপ্যায়ন করলেন তাঁকে। সঙ্গে করে দরবার কক্ষের বিভিন্ন শিল্পকলা ঘুরিয়ে দেখালেন অতিথিকে। তাঁর শরীর-স্বাস্থ্যের খোঁজ নিলেন। শেষে আচমকা প্রশ্ন করে বসলেন, “কী সাহায্য চাই, ভূতপূর্ব দিল্লি সম্রাট? কী প্রত্যাশা করেন আমার কাছে?”

সুবিশাল এক চিত্রপটে মুগ্ধ দৃষ্টি ফেলে রেখেছিলেন হুমায়ূন তখন। থতমত খেয়ে গিয়ে কোনোমতে উত্তর দিলেন, “না মানে, এমন কিছু বাক্যালাপ তো এখনও আপনার সঙ্গে আমার হয়নি পারস্য সম্রাট। আপনি কী উপায়ে…”

“চতুর্দিকের শুভাশুভ সকল সংবাদ আমার কাছে যথাসময়ে পৌঁছে যায় মোগল সম্রাট। কী চান, শের শাহকে শায়েস্তা?”

এরপর দীর্ঘক্ষণ গুপ্ত মন্ত্রণায় মগ্ন রইলেন দু’জনে। শেষে বিদায়ের মুখে শাহ তহমাস্প হাসি মুখে জানালেন, “আগামীকাল শুধুমাত্র আপনার সম্মানে এক শিকার খেলার আয়োজন করা হয়েছে মোগল সম্রাট। প্রস্তুত থাকবেন, যথাসময়ে খিদমতগার পৌঁছে যাবে আপনার মহলে।”

মেহমানখানায় ফিরে যাচ্ছেন হুমায়ূন। পথ অল্পই। সঙ্গে অতি বিশ্বস্ত পার্শ্বচর বৈরাম বেগ। সামান্য দূরত্বে চারজন সশস্ত্র পারস্য রক্ষী।

অল্প এগিয়েই মনোহর এক খোলা প্রান্তরে ঘোড়া থামালেন হুমায়ূন। দেখেন দূরে এক গাছতলায় নিমগ্ন চিত্তে ছবি এঁকে চলেছে এক চিত্রকর। বিকেলের রোদ লেগে সোনা রং ধরেছে প্রান্তরের কচি ঘাসের ডগা।

পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলেন সে চিত্রকরের কাছে হুমায়ূন। চিত্রকর ডুবে আছে তার শিল্পকর্মে। চমক ভাঙল আগন্তুকের উচ্ছ্বসিত প্রশংসায়। চকিতে ঘাড় ফিরিয়ে হুমায়ূনের চোখে চোখ পড়তেই ঝুঁকে এল শিল্পীর পদ্ম পাপড়ির মতো চোখের পাতা। হুমায়ূনও উত্তেজিত অথচ শিষ্ট স্বরে বলে উঠলেন, “এ কি, তুমি নারী!”

মাথায় পাগড়ি বাঁধা চিত্রকরটিকে পেছন থেকে দেখে তাকে পুরুষ বলেই ভুল হয়। সে অনুচ্চ স্বরে জবাব দিল, “আদাব সম্রাট, আমি মহিন বানু খানম। সুলতানের ভগিনী।”

“তবে, তবে কি তখন দরবারে যে চিত্রপটটা দেখলাম, সেটাও তুমিই… মানে এখনও দেখছি সে চিত্রটাই আঁকা হচ্ছে!”

উত্তর এল, “আপনার অনুমান নির্ভুল দিল্লি সম্রাট। সে চিত্রপট আপনার পছন্দ হয়েছে বলে তার ছোটো এক প্রতিচিত্র আপনাকে ভেট করতে ইচ্ছে করি।”

মনে মনে অত্যন্ত প্রীত হলেন হুমায়ূন তাতে। এগিয়ে গিয়ে উপস্থিত চিত্রটা খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করলেন তিনি। চিত্র তখনও কিছুটা অসম্পূর্ণ যদিও, তবুও দেখতে দেখতে হুমায়ূন বলে উঠলেন, “হুম, নিখুঁত প্রতিচিত্রই বটে। সেই পদ্মফুল, সেই নারী, অবিকল দুই চোখ। আচ্ছা, এ নারীমূর্তি তো আমার দেশের বলে মনে হয়। তুমি কি হিন্দুস্তানে গিয়েছ কখনও মহিন?”

মহিন সামান্য হেসে উত্তর দেয়, “না সম্রাট। সে সৌভাগ্য হয়নি কখনও। শুনেছি জন্নতের চেয়ে কম নয় সে দেশ। তবে দরবারে সাজানো চিত্রটা আমি এক প্রত্যক্ষদর্শী দূতের মুখে বিবরণ শুনে এঁকেছিলাম।”

হুমায়ূন খুশি হয়ে বললেন, “বেশ। আমি এর নাম দিলাম পদ্মাবতী।”

মহিন তৃপ্ত কণ্ঠে জবাব দিল, “এই আমার পারিতোষিক সম্রাট।”

হুমায়ূন ব্যস্ত কণ্ঠে বলে উঠলেন, “না না, তা হয় না। ভেট হলেও আমার তরফে যৎসামান্য কিছু একটা তোমায় কবুল করতেই হবে মহিন। দিল্লিতে থাকলে আমার সবচেয়ে মূল্যবান রত্নগুলোর একখানা তোমায় দিতাম।”

সুকুমার কান্তি হুমায়ূনের সরল ভাষ্য মহিনের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। মৃদু হাস্যে বলে, “বেশ। পাওনা রইলাম তবে।”

হুমায়ূন বিদায় জানিয়ে ঘোড়ার পিঠে লাফিয়ে ওঠেন। মহিন অসম্পূর্ণ চিত্রে মন দেয়।

***

শিকার খেলার জন্যে যে স্থান নির্বাচন করা হয়েছে তা রাজধানী কাজভিন থেকে বেশি দূরে নয়। কাঁটা ঝোপঝাড়ে পরিপূর্ণ মাঝারি এক জঙ্গল। চারপাশে উন্মুক্ত প্রান্তর। শিকার খেলার উপযুক্ত স্থান এ নয়। এখানে ঠিক কেমন শিকার পাওয়া যাবে হুমায়ূন তাতে যথেষ্ট সন্দিগ্ধ। শাহী তাঁবুতে বসে কখনও বরফ দেওয়া শরবত, কখনও বা সুরা পাত্রে চুমুক দেওয়া ছাড়া আপাতত আর কোনও কাজ নেই। শিকার-টিকার দুয়েকটা যা করবার তা খিদমতগারেরাই করে আনবে।

ক্রমে সন্ধ্যা অতিক্রান্ত হল। খিদমতগারেরা শাহী তাঁবুর সামনে অগ্নিকুণ্ড জ্বেলেছে। জ্বলবে রাতভর।

রাত এক প্রহরও অতিক্রান্ত। সুরার পাত্রে শেষ চুমুক দিয়ে শাহ তহমাস্প জানালেন, “দিল্লি নিয়ে আর চিন্তিত হবেন না সম্রাট। দিল্লি ফের ফিরে পাবেন আপনি। আর সে ব্যবস্থা করব আমি। শাহজাদা মুরাদ যাবে আপনার সঙ্গে। আর সঙ্গে যাবে বারো হাজার বিশেষ অশ্বারোহী যোদ্ধা ও তিনশো অস্ত্রবাহক।”

চোখমুখ ঝলমল করে উঠল হুমায়ূনের। আল্লাহ মেহেরবান! মুখ তুলে চাইলেন তবে তিনি!

পরক্ষণেই বিদঘুটে এক ঢেঁকুর তুলে শাহ তহমাস্প জানালেন, “তবে বিনিময়ে আপনাকেও এর মূল্য দিতে হবে। তা অবশ্য যৎসামান্যই।”

“হুকুম করুন শাহ।”

মুহূর্তে হিংস্র বাঘের মতো জ্বলে উঠল পারস্য সম্রাটের দুটো চোখ। হিসহিসে কণ্ঠস্বরে বললেন, “আপনি সুন্নি। তাই তো? বিনিময়ে শিয়া ধর্ম গ্রহণ করতে হবে আপনাকে।”

হুমায়ূনের উৎসুক চোখের দৃষ্টি মাটিতে নেমে এল ধীরে ধীরে। অন্তরাত্মা কাঁপছে তিরতির করে। কিন্তু মুখের অভিব্যক্তিতে তা বিন্দুমাত্র প্রকাশ করা যাবে না। প্রাণহানির সম্ভাবনা প্রবল।

 আরেক পাত্র সুরা টেনে নিলেন শাহ। হাতে তুলে পাত্রটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে দেখতে যেন স্বগতোক্তি করলেন, “সম্মত থাকলে ভালো। নয়তো বাইরের ওই অগ্নিকুণ্ডেই আজ… রক্ষা পাবে না আপনার বেগম বা অনুচরেরাও কেউ।”

হুমায়ূন খানিক ভেবে নিয়ে জানালেন, “আমার কোনও আপত্তি নেই সম্রাট। তবে যদি দয়া করে দুটো দিনের সময় দেন তো…”

“বেশ। দিলাম। জবাব কী হবে তা তো একরকম স্থির করাই রইল।”

পরদিন প্রাসাদে ফিরলে পারস্য সম্রাটের সবচাইতে আদরের বোন মহিন গিয়ে বসল তাঁর পায়ের কাছে। ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল সে। আশ্চর্য সম্রাটের প্রশ্নের উত্তরে জানাল, “চারদিকে আপনি শুধু শত্রুরই জন্ম দিয়ে গেলেন সম্রাট। অটোমান, উজবেক, সিরকাসিয়া, ফ্রাঙ্ক সবাই আপনার শত্রু—মিত্র একজনও নেই। শুনেছি মহম্মদ হুমায়ূন এসেছেন হিন্দুস্তান থেকে আপনার সাহায্য চাইতে। তাঁর হাতে নিজের হাতটা রাখা যায় না সম্রাট? হিন্দুস্তানের মতো দেশে আপনার একজন মিত্র থাকা আবশ্যক।”

শাহ তহমাস্পের টনক নড়ল। আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে দাঁতে দাঁতে পিষে বিড়বিড় করলেন, “অপদার্থ আমীরগুলো এতদিন শুধু উলটো পরামর্শই দিয়ে এসেছে আমাকে। নিজেও বিভ্রান্ত হয়েছি, তলিয়ে দেখিনি কোনোদিন।”

***

আজ পারস্য সম্রাটকে জবাব পাঠাবার শেষদিন। নিজের সর্বাপেক্ষা বিশ্বস্ত অনুচর বৈরাম বেগকে ডেকে পাঠালেন হুমায়ূন। হাতে একটা মাঝারি মাপের মুক্তোর কৌটো। বললেন, “যাও বৈরাম, সম্রাট বাবরের সেই হিরে আর মূল্যবান এ ক’টা চুনিপান্না দিয়ে এসো পারস্য সম্রাটকে। তাঁকে কুর্নিশ জানিয়ে বোলো…”

বৈরাম বেগের চক্ষুদ্বয় বিস্ফারিত। কোনোমতে বললেন, “গুস্তাখি মাফ শাহেনশাহ, কিন্তু ওই হিরে…”

বৈরামের কাঁধে সস্নেহে হাত রাখলেন হুমায়ূন। ম্লান হেসে বললেন, “এ-ই আমাদের একমাত্র মুক্তির পথ বৈরাম। এতগুলো প্রাণের চেয়ে এ বড়ো নয়। তাছাড়া শাহজাদা আকবরের ভবিষ্যৎ এখন আমার এই সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। শাহকে বোলো…”

“কিন্তু সম্রাট, ভেবেচিন্তে অন্য কোনও পথ একটা কি বের করা যেত না? আপনার পূর্বপুরুষের এমন জিনিস…”

হুমায়ূন অল্পক্ষণ তাকিয়ে রইলেন বৈরাম বেগের চোখে। তারপর সিন্দুক খুলে একখানা পত্র বের করে হাতে দিলেন বৈরামের। বৈরাম পড়তে শুরু করলেনー

‘দিল্লি সম্রাট,

সেদিন আপনি কোনও এক কার্যকারণবশত নিজের মূল্যবান কোনও রত্ন আমাকে ভেট করতে ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। আমি তা ভবিষ্যতে গ্রহণ করব কথা দিয়েও আজ পরিস্থিতি বিশেষে সে সিদ্ধান্ত বদল করতে বাধ্য হলাম। আপনার হাতে উপস্থিত এক অদ্বিতীয় রত্ন রয়েছে বলে আমি বিশেষ সূত্রে যেমন জ্ঞাত হয়েছি তেমনই আপনার বিরুদ্ধে গভীর এক ষড়যন্ত্র রচিত হয়েছে বলেও সংবাদ পেয়েছি। আমার একান্ত অনুরোধ, সেই রত্ন আপনি পারস্য সম্রাটের হাতে অর্পণ করে বিপন্মুক্ত হোন। আপনি সপরিবারে অক্ষতদেহে হিন্দুস্তানে ফিরে যান, এই আমার সবিশেষ কামনা। আমার সসম্ভ্রম আদাব গ্রহণ করবেন।

অনিবার্য কারণবশত নিজ পরিচয় প্রকাশে অক্ষম হলেও আপনি আমাকে চিনে নিতে ভুল করবেন না বলেই বিশ্বাস করি। আমার এই কৃতকর্মের জন্য আমি সর্বান্তঃকরণে আপনার ক্ষমা প্রার্থী।

  • পদ্মাবতী’

পত্র পাঠ শেষে বৈরাম বেগ বিচলিত দৃষ্টি মেলে হুমায়ূনের মুখে তাকালে হুমায়ূন জানালেন, “কাল গভীর রাতে দূত মারফত সেই প্রতিচিত্র ও এই পত্র এসে পৌঁছেছে আমার হাতে। এবার তুমিই বলো, আর কোনও পথ খোলা আছে আমাদের?”

দ্রুতবেগে বেরিয়ে গেলেন বৈরাম বেগ।

হুমায়ূনের আদেশমতো বাবরের সেই আশ্চর্য হীরকখণ্ড ভেট করলেন পারস্য সম্রাটকে। শাহ তহমাস্প অভিভূত। চোখ কপাল থেকে নামছেই না তাঁর। বৈরাম জানালেন, “এ হিরে পৃথিবীতে অদ্বিতীয় সম্রাট। নাম বাবরের হিরে। ওজন আট মিশকাল। এর বিনিময়ে সারা দুনিয়ার লোকের আড়াই দিনের খাদ্য যোগানো সম্ভব।”

“মরহাবা!” সিংহাসন ছেড়ে লাফিয়ে উঠলেন শাহ তহমাস্প। দু’হাতে বৈরামের দু’কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন, “আজ থেকে তোমার উপাধি হল খাঁ, বৈরাম। বৈরাম খাঁ। রাজধানীতে আজ ঢোল-শহরত হোক তোমার সম্মানে।”

হর্ষধ্বনি উঠল দরবার জুড়ে।

কিন্তু বৈরামের হৃদয়ে তাতে আনন্দের পরশ লাগেনি কোনও। থমথমে কণ্ঠস্বরে জানালেন, “শাহেনশাহ হুমায়ূন এবার বিদায় অনুমতি প্রার্থনা করছেন, পারস্য সম্রাট। আর এই বিদায়বেলায় এই যৎসামান্য মণিমুক্তো ক’টা আপনার নজরানায় পেশ করেছেন।”

“সে কি? এত শীঘ্র বিদায়! আমি যে তাঁর মাথায় তাজ পরাব মনস্থ করেছি। পারস্য দেশের সর্ববৃহৎ রাজসম্মান।”

বৈরাম জানালেন, “এই হিরের বিনিময়ে তিনি একটা অনুরোধও করে পাঠিয়েছেন। দিল্লি পুনরুদ্ধারে আপনার সহায়তা…”

কথা শেষ করতে পারলেন না বৈরাম। তার আগেই শাহ বলে উঠলেন, “কথার খেলাপ আমি করি না বৈরাম খাঁ। সাহায্যের বিনিময়ে যে শর্ত আমি আরোপ করেছিলাম তা ফিরিয়ে নিলাম। আর কথামতো শাহজাদা মুরাদ তার দল নিয়ে যাবে তোমাদের সঙ্গে। যাত্রার দিনক্ষণ জানিয়ে যেও।”

সন্ধে ঘনাতেই খুশির জলসা বসল ইস্পাহানের চল্লিশ স্তম্ভওয়ালা রাজপ্রাসাদে। রাজবেদিতে আসীন দুই ব্যক্তি—শাহ তহমাস্প ও হুমায়ূন। উপভোগ করছেন রাজনর্তকীর মদির নৃত্য। বাবরের হিরে প্রথমবারের মতো পরদেশি সম্রাটের রাজকোষ আলোকিত করে তুলল।

দিন দুইয়ের মধ্যেই হুমায়ূন যাত্রা করলেন হিন্দুস্তানের উদ্দেশ্যে। পারস্য রাজদরবারে বিদায় শেষে বেরিয়ে আসতে সহসা চোখ গেল রাজপ্রাসাদের জনানা মহলের অলিন্দের খিড়কিতে। স্থির দাঁড়িয়ে এক রমণী। অন্তঃস্থল বিদীর্ণ করে দীর্ঘ এক শ্বাস নির্গত হল হুমায়ূনের। দৃষ্টি নামিয়ে আনলেন তিনি। ওদিকে শুধু আবছা একটা অবয়ব ছাড়া আর কিছু দৃষ্টিগোচর হল না সেই রমণীর। টলটলে চোখদুটি তখন ঝাপসা তার।

।। চার ।।

তিন বছর পর। ১৫৪৭ সাল।

দাক্ষিণাত্যে সুবিশাল বাহমনি সাম্রাজ্যের অবসান ঘটেছে। আহমদনগর, বিদার, বেরার, বিজাপুর এবং গোলকুণ্ডা—এই পাঁচটি রাজ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে সুবিশাল দাক্ষিণাত্যের তখন ছন্নছাড়া অবস্থা। আহমদনগরের সিংহাসনে বসেছেন বুরহান নিজাম শাহ। তাঁর কাছে সন্ধান পাওয়া গেল বাবরের সেই হিরের। আশ্চর্যের ব্যাপার! নজরে এল আহমদনগরের রাজসভায় পারস্যদেশের রাষ্ট্রদূত শের শাহের আনাগোনা। তবে কি তাঁর হাতেই পারস্য সম্রাট শাহ তহমাস্প পাঠালেন তা বুরহান নিজাম শাহের কাছে?

না, ভারতের হিরে ভারতে ঠিক এই পথে প্রত্যাবর্তন করেনি। গল্পটা অন্য।

হিরেটা পুনরায় ভারতে এসেছিল মিতহর জমাল নামে পারস্যদেশীয় এক রাজকর্মচারী মারফত।

পারস্য সম্রাট শাহ তহমাস্প একদিন মিতহর জমালকে তলব করলেন দরবারে। জানতে চাইলেন, “হিন্দুস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতির বর্তমান সংবাদ কী, জমাল?”

জমাল সবিনয়ে উত্তর দিল, “দাক্ষিণাত্যের অবস্থা শোচনীয় সম্রাট। পাঁচ-পাঁচটা রাজ্যে বিভক্ত হয়ে গোটা দাক্ষিণাত্য ছিন্নভিন্ন হয়ে আছে। তা সুলতানের কোনও পরিকল্পনা যদি থাকে তবে এই সুবর্ণসুযোগ কিন্তু।” চোখমুখ চকচক করে উঠল জমালের।

“না। হিন্দুস্তানের মতো দেশ আক্রমণ করতে কত হিসেব কত নিকেশের প্রয়োজন হয় তা জানা আছে তোমার? তাছাড়া দিল্লির সিংহাসনে এখন শের শাহের যোগ্য উত্তরসূরি ইসলাম শাহ সুরি।” ক্রুদ্ধ পারস্য সম্রাট জোর ধমক দিলেন। তারপর খানিক শান্ত হয়ে বললেন, “পরিকল্পনা একটা আছে বটে, তবে তা মিত্রতার।” হুমায়ূনের ভেট দেওয়া সেই হিরে জমালের হাতে সঁপে দিয়ে আদেশ দিলেন, “যত শীঘ্র সম্ভব এটা শিয়া মিত্র আহমদনগর-রাজের হাতে পৌঁছে দাও। জানাবে, নতুন রাজ্যলাভের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন স্বরূপ পারস্য সম্রাটের পক্ষে ভেট।”

এই অমূল্য রত্ন হাতে পেয়ে চোখদুটো ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইল জমালের। কোনোক্রমে একটা ঢোঁক গিলে বলল, “গুস্তাখি মাফ সুলতান, কিন্তু এই মহামূল্য জিনিস… এ দুনিয়ায় আর একটিও নেই যে এমন!”

শাহ তহমাস্প খানিকটা আনমনা স্বরে উত্তর দিলেন, “পারছি না, সহ্য করতে পারছি না। বড্ড ভয়ংকর এ। আমার সবচাইতে প্রিয় বোনটা… এত দক্ষ একজন সওয়ার সে, অথচ সমতল পথে ঘোড়া থেকে পড়ে…” পরক্ষণেই সতর্ক হয়ে তাড়াতাড়ি বললেন, “যাও যাও, নিয়ে যাও। বিদেয় হও শীগগিরই। এ আমার কোনও কাজের নয়।”

***

আহমদনগরে দরবার বসে গেছে যথাসময়ে। দরবার রক্ষী এসে জানাল, “পারস্য দেশের এক দূত বাইরে অপেক্ষা করছে শাহ-এ-আলম। দরবার কক্ষে প্রবেশের অনুমতি চাইছে।”

বুরহান নিজাম শাহ হাত তুলে অনুমতি দিলেন। মিতহর জমাল কুর্নিশ জানিয়ে শাহ তহমাস্পের ভেট ও শুভেচ্ছা বার্তা তুলে দিল তাঁর হাতে। অমূল্য এই হিরের গল্প বুরহান নিজাম বিলক্ষণ অবগত আছেন। ভেট দর্শনমাত্র চোখমুখ উল্লসিত হয়ে উঠল তাঁর।

কিন্তু ঠিক দুইদিন পরেই পারস্য দূত জমালের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হল। এক বার্তাবাহক রওনা হয়ে গেল পারস্যের পথে। কেন? জমালের দেওয়া পারস্য সম্রাটের উপহার জাল। বারংবার পরীক্ষা করে শাহী জহুরিরা তা নিশ্চিত করেছে। হীরকখণ্ডের ওজনও অনেক কম।

জমাল দেশ থেকে প্রস্তুত হয়েই এসেছিল। ভারতের দাক্ষিণাত্যে প্রবেশ করেই এক রত্নব্যবসায়ীর ছদ্মবেশ ধরেছিল সে। বাবরের হিরের কাছাকাছি দেখতে অন্য এক হিরে কিনে আহমদনগর সুলতানের হাতে তুলে দিয়েছিল।

কিন্তু শত চেষ্টাতেও জমালকে বন্দী করা গেল না। বাবরের হিরে অজ্ঞাত কোন রত্নব্যবসায়ীর হাতে বিক্রি করে দিয়ে ভোজবাজির মতো মিলিয়ে গেল জমাল। কৃষ্ণার তীর ঘেঁষে কার্নুল, অনন্তপুর ও গোলকুণ্ডার বিভিন্ন হিরেপান্নার খনি ঘিরে রত্নব্যাবসা তখনও তুঙ্গে। ক্রেতা বা বিক্রেতার অভাব নেই কোনও।

পারস্যে বসে সংবাদ পেয়ে অগ্নিশর্মা হলে শাহ তহমাস্প। কিন্তু মিতহর জমালের টিকির নাগালও পেলেন না। বাবরের হিরে চলে গেল কোন অজ্ঞাত হাতে। এরপর দীর্ঘ এক সময় পর্যন্ত তার হদিশ পাওয়া গেল না আর।

।। পাঁচ ।।

১৬৩০ সাল।

বিদেশি এক তরুণ ঘুরে বেড়াচ্ছে গোলকুণ্ডার অলিতে গলিতে। সুদূর পারস্যের ইস্পাহান থেকে ভারতে এসেছে সে ভাগ্যান্বেষণে। নাম তার মহম্মদ সৈয়দ, বয়স ঊনচল্লিশ। সে সহৃদয় ও বুদ্ধিমান মানুষ। সঙ্গে তেমন কিছু টাকাকড়িও নেই যে হিরে-জহরতে পূর্ণ এ নগরে বিরাট কোনও বাণিজ্যের সাহস করে। সৈয়দ নগরের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মহলে মহলে ঢুকে নকশা করা জুতো বিক্রি করতে শুরু করল। এ ব্যাবসায় তখন প্রতিদ্বন্দ্বী নেই বললেই চলে। নিজের বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগিয়ে সৈয়দ দু-চার বছরের মধ্যেই বেশ কিছু বাণিজ্যতরীর অধিপতি হয়ে উঠল। গোলকুণ্ডার বণিক মহলে দ্রুত তার নামও ছড়িয়ে পড়ল।

সম্ভ্রান্ত বণিক মহম্মদ সৈয়দ এবারে হিরের বাণিজ্যে মন দিলেন। তৎকালীন বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ হিরে বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল ছিল গোলকুণ্ডা। হিরের বাণিজ্য সম্পর্কে সৈয়দের কমবেশি পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে। পারস্যে থাকাকালীন তাঁর মনিব সে দেশ থেকে ভারতের দক্ষিণ দেশে ঘোড়া চালান দিয়ে বিনিময়ে সমমূল্যের হিরে সংগ্রহ করে ফিরে যেতেন। পারস্যে সে হিরে কেনাবেচার দায়িত্ব ন্যস্ত ছিল সৈয়দের ওপর।

কিন্তু বাণিজ্যে তেমন উচ্চাভিলাষ নেই সৈয়দের। তাঁর লক্ষ্য গোলকুণ্ডা সুলতান আবদুল্লা কুতুব শাহের দরবার। ধনসম্পত্তির লোভ দেখিয়ে হাত করলেন দরবারের জনাকতক মোসাহেবকে। এদের মুখে উচ্চ প্রশংসা শুনে সৈয়দের একদিন তলব এল গোলকুণ্ডা রাজদরবার থেকে। সুলতান নিজে ছিলেন বহুভাষী, সাহিত্য ও সঙ্গীতের এক উচ্চ গুণগ্রাহী মানুষ। সৈয়দের ব্যবহারে খুশি হয়ে সুলতান তাঁকে রাজপ্রাসাদের মহাফেজখানার তত্ত্বাবধায়ক পদে নিযুক্ত করলেন। বছর দুই ঘুরতেই সৈয়দ পেলেন মছলিপত্তমের আধিকারিক পদ। শেষে মীর জুমলা নাম নিয়ে পারস্যের সহায়সম্বলহীন তরুণ মহম্মদ সৈয়দ কর্ণাটকের শাসক হয়ে বসলেন।

একের পর এক প্রাচীন মন্দির ভেঙে মীর জুমলা সেখানে প্রভূত ধনরত্ন সংগ্রহ করে চলেছেন। সময়ে সময়ে তা থেকে বাছাইকরা কিছু পরিমাণ মণিমুক্তো গোলকুণ্ডা রাজদরবারে পাঠিয়ে দিয়ে সুলতানের মনও রক্ষা করে চললেন।

এক সন্ধ্যায় মীর জুমলা নিজের মহলে বসেছেন রাশিকৃত চিঠিচাপাটির উত্তর লিখতে। এমন সময় তাঁর দেহরক্ষী এনে হাজির করল হত দরিদ্র এক মজুরকে। সর্বাঙ্গে তার কালিঝুলি মাখা। মীর মুখ তুলে চাইলেন। দেহরক্ষী তৎক্ষণাৎ জানাল, “এ কুলি মন্দির ভাঙতে গিয়ে এমন এক বস্তু খুঁজে পেয়েছে হুজুর, যা আমি কেন, রাজ্যের কেউই বোধহয় চাক্ষুষ করেনি আজ পর্যন্ত।”

“কী সেই বস্তু? কই, দেখি।”

দেহরক্ষী কটিবন্ধে সযত্নে রক্ষিত রেশমের এক বটুয়া তুলে দিল মীরের হাতে। মীর বটুয়া খুলে তা চাক্ষুষ করে অভিভূত হয়ে পড়লেন। সন্তুষ্ট চিত্তে জানালেন, “এর যোগ্য বকশিস তুমি পাবে কামরান আলি।”

কামরান জানতে চাইল, “আর এ কুলি হুজুর?”

চোখদুটো দপ করে জ্বলে উঠল সহসা মীর জুমলার। শীতল কণ্ঠে আদেশ দিলেন, “উপস্থিত দুটো হাত আর জিহ্বাটা কেটে ছেড়ে দাও। আর নজর রেখো।”

সে রাতে দুই চোখের পাতা এক মুহূর্তের জন্যেও এক করতে পারেননি মীর জুমলা। থেকে থেকে কেবলই মাথার ভেতরে কে যেন বলে উঠছিল, ‘বাবরের হিরে! বাবরের সেই অমূল্য হিরে!’

মীর জুমলা সক্ষম হলেন সহসা হারিয়ে যাওয়া বাবরের সেই হিরের পুনরুদ্ধার করতে।

***

দিল্লির মসনদে তখন শাহজাহান। বিজাপুর সাম্রাজ্যের অধীনে পুনের জায়গীরদার শাহজি ভোঁসলেকে দিল্লির বিরুদ্ধাচরণে পরোক্ষভাবে মদত দেওয়ার অপরাধে শাহজাহান আহমদনগর ও গোলকুণ্ডার শাসকদের শাস্তি প্রদান হেতু ইদানীং দৌলতাবাদে এসে উপস্থিত হয়েছেন। সঙ্গে সুবিশাল সৈন্যসামন্ত।

গোলকুণ্ডার সুলতান আবদুল্লা কুতুব শাহ দিল্লি অধিপতির সবরকম শর্ত মেনে তাঁর বশ্যতা স্বীকার করে নিলেন।

৭ জুলাই, ১৬৫৬ সাল।

দিল্লির সেনা ছাউনি নিস্তরঙ্গ। যে যুদ্ধের সম্ভাবনায় সৈনিকেরা উত্তর থেকে দক্ষিণের দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে এসেছে তার প্রয়োজন পড়েনি। আহমদনগর, বিজাপুর আর গোলকুণ্ডা দিল্লি সম্রাটের অধীনতা স্বীকার করে সন্ধিপত্রে নিজেদের নামাঙ্কিত মোহর ছাপ দিয়েছে। এবার পুনরায় দিল্লির পথে প্রত্যাবর্তন। সম্রাটের আদেশের অপেক্ষামাত্র।

এমনি একদিনের পূর্বাহ্ণে মীর জুমলা বর্ণাঢ্য এক শোভাযাত্রা সঙ্গে করে শাহজাহানের তাঁবুর সামনে উপস্থিত হলেন এসে। পরিচয় প্রকাশ করে সংবাদ পাঠালে সম্রাটের তলব এল। মীর জুমলা প্রবেশ করলেন শাহী তাঁবুতে।

যথাবিহিত অভিবাদন সেরে মাথা তুলে দাঁড়ালেন মীর জুমলা। শাহজাহানের চোখে কৌতুক খেলে বেড়াচ্ছে। জানতে চাইলেন, “সহসা এই আগমনের হেতু কী, মীর জুমলা?”

মীর সরাসরি জানালেন, “আমি শাহেনশাহর অধীনে কাজ করতে ইচ্ছুক।”

স্মিত হাসলেন শাহজাহান। বললেন, “কারণ? আবদুল্লা কুতুব শাহের খাস বেগমের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কে লিপ্ত রয়েছে, এই ভয়ে?” বলে নিজের রসিকতায় নিজেই হেসে উঠলেন।

মীর জুমলার মুখ কঠিন হয়ে উঠেছে। উত্তর দিলেন, “না শাহেনশাহ। আমার অপরাধের কারণে বন্দী আমার পুত্র আমিনের মুক্তির কৃতজ্ঞতা স্বরূপ। আর তাছাড়া আমার হাতে এমন এক বস্তু এসে পড়েছে যা বংশানুক্রমে তা বর্তমান শাহেনশাহর কাছেই থাকা উচিত।”

ধনুকের মতো বেঁকে উঠল শাহজাহানের ভ্রূ যুগল। “কী সে বস্তু, মীর জুমলা?”

“এই যে, শাহেনশাহ।” বলে মূল্যবান কাপড়ে সুদৃশ্য কারুকাজ করা একখানা থলে শাহজাহানের হাতে তুলে দিলেন মীর।

শাহজাহান থলে খুলে লাফিয়ে উঠলেন নিজের আসন ছেড়ে। উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন, “কিন্তু এ তো, এ তো…”

মীর জুমলার মুখে স্মিত হাসির রেখা। কণ্ঠস্বর শীতল। “হ্যাঁ শাহেনশাহ, আপনার আন্দাজ মিথ্যে নয়। এ-ই মোগল বংশের প্রতিষ্ঠাতা আপনার পূর্বপুরুষ সম্রাট বাবরের হিরে। আমি পরীক্ষা করে দেখেছি।”

শাহজাহান দ্রুতপদে এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরলেন মীর জুমলাকে। আবেগ তাড়িত কণ্ঠে বলে উঠলেন, “এ হিরে আমার ময়ূর সিংহাসনে শোভা পাবে মীর জুমলা। আমার এক অশেষ উপকার করলে তুমি। দিল্লি চলো আমার সঙ্গে, তোমাকে আমার সবিশেষ প্রয়োজন।”

তৃতীয় অধ্যায়

।। এক ।।

পারস্য দেশের উত্তর খোরাসানের অখ্যাত এক বাজার। হাটবার। পণ্যসামগ্রী, বণিক-মহাজন, খরিদদার, পণ্যবাহী ঘোড়ার গাড়ি—চতুর্দিক সরগরম। বাজার লাগোয়া একটেরে একটা জায়গায় অস্থায়ী ত্রিপল খাটিয়ে বসে আছেন কোতোয়াল সাহেব। বাজারের মুখে সহসা হল্লা উঠল একটা। কোথাকার এক বেয়াদব কাঠুরে ছোকরার সঙ্গে জোর বচসা বেধেছে এক ব্যাপারীর। ব্যাপারী যতই চিৎকার করে বোঝাবার চেষ্টা করছে যে ‘কাঠের বোঝা তোমার গাধার পিঠ থেকে সব মাথায় করে নিয়ে নামাও বাজারে, হাতে হাতে নামাতে নামাতে বাজার ভেঙে যাবে’, কাঠুরে তাতে কানই দিচ্ছে না কোনও। সে তার পাগড়ি খুলে মোট বইতে রাজি নয়। বচসা সামান্য হাতাহাতিতে গিয়ে পৌঁছার পর উৎসাহী দর্শকেরা দু’জনকেই কোতোয়াল সাহেবের দরবারে এনে হাজির করল শেষে।

আদ্যোপান্ত নালিশ শোনবার পর কোতোয়াল সাহেব চোখ তুলে চাইলেন কাঠুরের দিকে। সুগঠিত ঋজু দেহ, সামান্য বাঁকা নাক, ঈষৎ লম্বাকৃতি মুখমণ্ডলের এক যুবা দাঁড়িয়ে মাথা উঁচু করে। যুবক আফশার গোষ্ঠীর এক তুর্কি উপজাতি। ক্ষুদ্র দুই চোখে অগ্নি দৃষ্টি। ক্রোধ নয়, কিন্তু এ দৃষ্টি সাধারণ এক কুলি-কামিনেরও নয়। কোতোয়াল দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইলেন তার চোখে। যেন রোমাঞ্চকর এক ভবিষ্যৎ পড়ে নিতে চাইছেন তিনি। শেষে নামমাত্র একটা জরিমানা করে আর ব্যাপারীর কাজে অন্য দু’জন কুলিকে লাগিয়ে দিয়ে সেই তেজি যুবককে বসিয়ে রাখলেন নিজের পাশে। তারপর হাট ভাঙতে নিজের কর্তব্য সমাধা শেষে যুবককে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন কোতোয়াল।

অতি সামান্য ঘটনা। অথচ ইতিহাস সাক্ষী, কতশত রাজামহারাজা তুচ্ছ এক ঘটনায় পথের ফকির হয়েছেন, আবার কতশত ফকির বনে গিয়েছেন রাজা।

***

রাজদরবার বসে গেছে। সুলতান প্রশ্ন করলেন, “বলো, কী চাও যুবক?”

যুবক মুহূর্তমাত্র কালক্ষেপ না করে সগর্বে উত্তর দিল, “রাজকার্য, সুলতান।”

অজ্ঞাত অখ্যাত এই যুবকের উচ্চাভিলাষের মনে মনে তারিফ করলেন পারস্য সম্রাট। তাঁর আনুকূল্যে যুবক ভর্তি হল পারস্য সৈন্যবাহিনীতে। নাম তার নাদির কুলি বেগ।

তারপর কেটে গেছে বেশ কিছু বছর। সেনাবাহিনীতে অসমসাহসী নাদিরের বীরত্বের কাহিনি লোকের মুখে মুখে। ঘটে গেছে কিছু ঘটন-অঘটন। পারস্যের সফাবিদ রাজবংশের তখন টালমাটাল অবস্থা। নাদির ততদিনে পারস্য সম্রাটের মুখ্য পরামর্শদাতা।

১৭৩৬ সাল। সমস্ত জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটিয়ে পারস্যের সিংহাসন অধিকার করলেন নাদির শাহ। প্রাচীন সফাবিদ রাজবংশের অবসান ঘটল পারস্যে।

দেখা গেল যে নাদির শাহ চিরাচরিত প্রথায় রাজপ্রাসাদে বাস করে রাজদরবারে বসে রাজ্য শাসনে বিশ্বাসী নন। তাঁর দরবার বসত পৃথক সময়ে পৃথক স্থানে সৈন্যসামন্ত পরিবৃত হয়ে নিজস্ব তাঁবুর মধ্যে। সে তাঁবু অষ্টপ্রহর পরিপূর্ণ থাকত বিপুল অস্ত্রসম্ভারে। নিজেও সজ্জিত থাকতেন যোদ্ধার সাজে। তিনি প্রকৃতই এক যুদ্ধোন্মাদ শাসক, যুদ্ধই তাঁর প্রাণ।

নাদির শাহ ছিলেন পারস্যের সবচাইতে ক্ষমতা লোভী ও ধন লোলুপ সম্রাট। গুপ্তচর মারফত বাবরের সেই হিরের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে তিনি যথেষ্ট অবহিত রয়েছেন। পাশাপাশি দিল্লির মোগল রাজকোষ অঢেল ধনরত্নে পরিপূর্ণ—এ সংবাদও তাঁর অগোচর নয়। তা হাসিল করতে তিনি অনুমোদন করলেন দীর্ঘ মেয়াদী এক পরিকল্পনার।

সে পরিকল্পনা মাফিক রাতের আঁধারে দিল্লির উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেল একদল অশ্বারোহী। তারা মুঘল সম্রাট মহম্মদ শাহের কাছে রাজনৈতিক আশ্রয় ভিক্ষা চাইবে। পারস্য সম্রাট নাদির শাহের বিরোধী দল হিসেবে নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করবে।

১০ মে, ১৭৩৮ সাল।

আফগানিস্তানের বুকে জোরদার এক আঘাত হানলেন নাদির শাহ। সঙ্গে অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত দেড় লক্ষ সুশিক্ষিত সেনা। ধীরে ধীরে অগ্রসর হয়ে কান্দাহার ঘিরে ফেললেন প্রথমে।

২১ মে তারিখে নাদির শাহ মোগল সাম্রাজ্যের সীমা অতিক্রম করে মোগল সম্রাটের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী কাবুলের পথে অগ্রসর হলেন। কাবুল তৎকালীন মোগল সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ এক সামরিক ঘাঁটি। বাবরের পর কোনও শত্রুপক্ষের এমন অভিযান ভারতে আর হয়নি এযাবৎ।

নিজের পরিমিত সৈন্য সংখ্যা ও অপ্রতুল অস্ত্রশস্ত্রে দিশেহারা কাবুলের রাজ্যপাল নাসির খাঁ বারংবার দিল্লির সাহায্য চেয়েও কোনও উত্তর পেলেন না। মরিয়া হয়ে শেষ চেষ্টা করলেন নাদির শাহকে রুখতে। কুড়ি হাজার আফগান উপজাতি সেনা নিয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করলেন তিনি।

***

কাবুলের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটা পার্বত্য দুর্গ দখল করে একটায় বসে আছেন নাদির শাহ। গুপ্ত সভা বসেছে অভিযানের পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে। প্রশ্ন রাখলেন, “মোগল রাজ্যপালের কী সংবাদ?”

আমীরদের মধ্যে একজন উপহাসের সুরে উত্তর দিলেন, “যতটুকু সংবাদ পেলাম, তিনি এবারে শেষ চেষ্টা চালাবেন আমাদের রুখতে। সে প্রস্তুতিই নিচ্ছেন।”

অট্টহাস্যে ফেটে পড়ল গুপ্ত সভা। কে একজন টিপ্পনী কাটল, “ঢাল নেই, তলোয়ার নেই, নিধিরাম সর্দার!”

আমীরদের এই বাল্যখিল্য আচরণে অত্যন্ত ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন নাদির শাহ। ধমকে উঠে বললেন, “শত্রুকে কখনও দুর্বল ভাবতে নেই, সে যতই ছোটো হোক। পচা শামুকেও পা কাটে। নির্বোধের মতো আচরণ কোরো না।” তারপরেই আবার জানতে চাইলেন, “আক্রমণ কোন পথে হবে জানা গেল কিছু?”

নতমস্তক আমীর জানালেন, “মূল খাইবার গিরিপথে সুলতান।”

চোখদুটো ঝিকিয়ে উঠল সুলতানের। হিসহিস করে বললেন, “বিকল্প পথ সন্ধান করো। অবিলম্বে।”

দু’দিনের মধ্যেই স্থানীয় এক যুবককে নিয়ে হাজির হলেন আমীর। উপযুক্ত পুরস্কারের বিনিময়ে দীর্ঘকাল অব্যবহৃত অত্যন্ত দুর্গম এক গিরিপথের সন্ধান দিল সে। সে পথের নাম চাতচুবি, মূল খাইবার গিরিপথের সমান্তরাল।

খাইবার গিরিপথ থেকে তেত্রিশ কিলোমিটার দূরবর্তী বারিকব নামের এক স্থানে এসে থামলেন নাদির শাহ। এক পুত্র মুর্তজা মির্জার হাতে অবশিষ্ট সৈন্যের দায়িত্ব সঁপে দিয়ে অপর পুত্র নাসেরউল্লা কুলির সঙ্গে বারো হাজার সৈনিক রওনা করিয়ে দিলেন চাতচুবির পথে। নিজে দশ হাজার অশ্বারোহী সঙ্গে করে পশ্চাৎবর্তী হলেন সে দলের।

নাসির খাঁর কুড়ি হাজার সেনা তখন খাইবার গিরিপথ ধরে এগোচ্ছে পারস্য সেনার সন্ধানে। সুবিধেমতো স্থানে ঘিরে ফেলে নাদির শাহ অতর্কিতে আক্রমণ করে বসলেন তাদের। কিছু বোধগম্য হওয়ার পূর্বেই কাবুল সেনা ছত্রভঙ্গ হয়ে কিছু মাটি নিল, কিছু পালিয়ে গেল। নাসির খাঁ সহ অবশিষ্ট সেনা বন্দী হল নাদিরের হাতে।

।। দুই ।।

নাদির শাহ যখন পথের সব বাধা একে একে গুঁড়িয়ে দিয়ে দিল্লির উদ্দেশ্যে লাহোরের পথে এগিয়ে চলেছেন, দিল্লি বাদশাহ মহম্মদ শাহ রঙ্গিলা তখন দেহে নারীর পোশাক ও মুক্তোখচিত পাদুকা পায়ে সাহিত্য, শিল্পকলা আর শাহী বাইজি নিয়ে মশগুল।

দিল্লির অধীন উত্তর ভারতের অওয়ধ ও দাক্ষিণাত্যের অউরঙ্গাবাদের দুই শাসক যথাক্রমে সাদাত আলি খাঁ ও নিজাম-উল-মুলক পরস্পর ছিলেন শত্রুভাবাপন্ন। কেউ কারও ছায়াটুকুও সহ্য করতে পারেন না। অথচ এঁরাই তখন দিল্লির মূল চালিকাশক্তি। এই শক্তি ও দিল্লি সম্রাটের ওপর নিজেদের প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠা প্রদর্শন করবার উদগ্র বাসনা তাঁদের করে তুলেছিল একে অপরের দুর্ধর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী। সুযোগ পেলে একে অপরকে কাঁচা চিবিয়ে খান।

সুলতানের পত্র হাতে পারস্য দূত দ্রুত রওনা হয়ে গেল দিল্লির পথে। নাদির শাহ দিল্লি সম্রাটকে লিখে পাঠালেন—

‘দিল্লি অধীশ্বর,

আমার বিরুদ্ধাচরণকারী একদল শত্রু পারস্য ত্যাগ করে বর্তমানে আপনার শরণাধীন। আমার শত্রুকে যিনি আশ্রয় দেন, তিনিও আমার শত্রু। এর পূর্বেও আমি পত্র দ্বারা আপনাকে বার কয়েক অনুরোধ পাঠিয়েছি রাজনৈতিক বন্দী হিসেবে এদের ইস্পাহানের হাতে তুলে দিতে। আপনার পক্ষে কোনোরকম উত্তর মেলেনি।

দ্বিতীয়ত, আমি অবগত হয়েছি যে মোগল সীমান্তে পারস্য রাষ্ট্রদূতের কিছু জিনিসপত্র আটক রেখেছে দিল্লির শুল্ক বিভাগের কর্মচারীরা। এরা এই সাহস পায় কোথা থেকে?

এইবারে আমি সশরীরে উপস্থিত হয়েছি আপনার দর্শনলাভের বাসনায়। সে দর্শন আপনি যুদ্ধক্ষেত্রে দেবেন, নাকি সন্ধিপত্রে চুক্তি মারফত মিত্রতার হাত বাড়িয়ে—সে আপনার অভিরুচি।

শুভেচ্ছা জানবেন।

আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী,

পারস্য সম্রাট’

এ পত্রেরও কোনও উত্তর এল না দিল্লি থেকে।

এবারে খাইবার গিরিপথ ধরে পাহাড়ের ওপর থেকে নেমে এল পারস্য সেনা। তিনমাসের মধ্যে পৌঁছে গেল দিল্লির মাত্র চল্লিশ ক্রোশ দূরে উত্তর করনালে।

করনালে পৌঁছে জোর একটা ধাক্কা খেল নাদির বাহিনী। তাকিয়ে দেখে, চতুর্দিকে জনপ্লাবনের মতো পথ আটকে দাঁড়িয়ে দশ লক্ষ ভারতীয় সেনা। এই সুবিশাল মিত্র সেনা এসেছে দিল্লি, অওয়ধ ও দাক্ষিণাত্য থেকে। এই সেনা প্রস্থে এক ক্রোশ, আর দৈর্ঘ্যে আট ক্রোশ। বিশালকায় এই সেনা দিল্লির প্রায় তিন ক্রোশ দূরে বিস্তৃত এক প্রান্তরে মিলিত হয়েছিল পরস্পর।

কিন্তু সফলতার অন্য নাম নাদির শাহ। অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রে সজ্জিত মাত্র দেড় লক্ষ সুশিক্ষিত পারস্য সেনা অচিরেই হারিয়ে দিল দশ লক্ষ ভারতীয় সেনাকে।

কী উপায়ে?

দিল্লি, অওয়ধ ও দাক্ষিণাত্যের এই মিত্রশক্তির কোনোরকম অনুশাসন ছিল না বললেই চলে। যুদ্ধযাত্রার দিন কয়েকের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে গেল যে সুবিশাল এই সেনাদলকে সুযোগ্য নেতৃত্ব দেওয়ার মতো কেউ নেই। সেনাপতি আর সর্দারেরা যে যার দলকে যে যার মতো করে নির্দেশ দিয়ে চলেছেন। দেখা গেল, এই সেনাদলের গতি এতই মন্থর যে সারাদিন কুচ করেও ক্রোশ তিনেকের বেশি অগ্রসর হতে অক্ষম।

অওয়ধ থেকে বিপুল সৈন্যবাহিনী সহ রওনা হয়ে সাদাত আলি খাঁ দিল্লি পৌঁছতে খানিকটা বিলম্ব করে ফেলেছিলেন। উপস্থিত হয়ে দেখেন দিল্লি ফৌজের সঙ্গে দাক্ষিণাত্যের নিজাম-উল-মুলকের সেনা আগেই মিশে গেছে। ঈর্ষা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলেন না সাদাত আলি খাঁ। সেনাকে না থেমে সোজা যুদ্ধক্ষেত্রে কুচ করতে আদেশ দিলেন। মনে মনে হাসলেন নিজাম-উল-মুলক।

এদিকে সাদাত আলি খাঁর সেই মান্ধাতা আমলের যুদ্ধসজ্জা। সেই প্রাচীন যুদ্ধরীতি। সুযোগ পেয়ে ফাঁদ পাতলেন নাদির শাহ। সরাসরি আক্রমণের আমন্ত্রণ জানাল তাঁর একদল অশ্বারোহী। সাদাত আলি খাঁ দ্রুত আক্রমণ হানলেন শত্রুর ওপর। কাছাকাছি আসতেই সহসা এক পর্দার মতো যেন সরে গেল নাদিরের অশ্বারোহীর দলটা। সাদাত দেখলেন অত্যাধুনিক বন্দুক হাতে নিশানা তাক করা একদল শত্রুর মুখে দাঁড়িয়ে আছেন সেনা সহ তিনি। অল্পক্ষণের ব্যাপার। খুব কাছে থেকে বন্দুক ছুড়ে কাবু করে ফেলল অওয়ধ সেনাকে শত্রুদল। অসামান্য বীরত্বের সঙ্গে লড়েও একসময় আহত হয়ে বন্দী হলেন সাদাত আলি খাঁ।

।। তিন ।।

বন্দী সাদাত আলি খাঁকে প্রাথমিক শুশ্রূষার পর হাজির করা হল শাহী তাঁবুতে। সম্রাট নাদির শাহ বসে রয়েছেন নিজের আসনে। অবনত মস্তকে তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন সাদাত আলি খাঁ।

কোনোরকম ভণিতায় গেলেন না নাদির। কঠিন স্বরে বললেন, “মাথা তোলো সাদাত আলি খাঁ। কার জন্যে নিজের প্রাণ নিয়ে খেলছ? বিশ্বাসঘাতক সেই মোগল বাদশাহর জন্যে? ওদিকে তিনি তাঁর মুখ্য পরামর্শদাতা হিসেবে নিজাম-উল-মুলককে নিয়োগ করেছেন, সে সংবাদ রাখো?”

চকিতে চোখ তুলে তাকালেন সাদাত আলি খাঁ। দৃষ্টি ফেললেন পারস্য সম্রাটের চোখে। কেঁপে উঠল সর্বাঙ্গ সাদাতের। বিড়বিড় করে যেন স্বগতোক্তি করলেন, “বাদশাহ সলামত এই প্রতিদান দিলেন আমার সেবার? বিশ্বাসঘাতকতা করলেন শেষে? এ অপমানের প্রতিশোধ আমি…”

তারপর নাদির শাহকে বললেন, “এ যুদ্ধে আপনার জয় নিশ্চিত পারস্য সম্রাট। দিল্লির অঢেল ধনরত্ন তো আপনারই সেকথা বলা বাহুল্য, তবে…”

“তবে?” মৃদু হাসির আভাটা মিলিয়ে গিয়ে ভ্রূ কুঁচকে উঠল নাদির শাহের।

সাদাত আলি খাঁ পরামর্শ দিলেন, “যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ বাবদ এককালীন অর্থের একটা পরিমাণ নিশ্চয়ই ধার্য করে রেখেছেন আপনি। তা যদি একশো গুণও বৃদ্ধি করেন সেও পেয়ে যাবেন আদেশমাত্রই। সে ব্যবস্থা আমি করে দেব। বাদশাহ সলামত যদি আপনার চাহিদা অনুযায়ী সমস্ত ধনরত্ন ও টাকাকড়ি মিটিয়ে দিয়ে ফেরত যাবার অনুরোধও জানান, তবুও পিছু হটবেন না আপনি। কারণ, দিল্লি রাজদরবারে আপনার জন্যে অপেক্ষায় রয়েছে অমূল্য এক বস্তু।”

মনে মনে হাসলেন নাদির শাহ।

সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই তুর্কি বাহিনী দ্বারা চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলা দিল্লি সেনার নাভিশ্বাস চরমে উঠল। এমনিতেই দিল্লি সেনা নিয়মিত বেতন পাচ্ছে না, মানসিক অবস্থা চরমে। দ্বিতীয়ত, তুর্কি সেনা পুরো ফৌজকে অবরোধ করে রাখায় দিল্লি সেনাবাহিনীতে দেখা দিল চরম খাদ্য সঙ্কট। এমতাবস্থায় দিল্লি সেনার যুদ্ধে আর মন নেই, প্রাণ নিয়ে পালাতে পারলে বাঁচে।

ঠিক সুযোগ বুঝে পারস্য সম্রাটের বার্তা এল মোগল বাদশাহ মহম্মদ শাহের শিবিরে। পত্রের সঙ্গে এক সাদা রুমাল। নাদির শাহ এবারে সন্ধি চান। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে মহম্মদ শাহও মুষ্টিমেয় ক’জন দেহরক্ষী সঙ্গে করে নাদির শাহের শিবিরে এসে উপস্থিত হলেন মনের আনন্দে। যুদ্ধবিগ্রহ তাঁর দু’চক্ষের বিষ।

মোগল বাদশাহের সম্মানে পারস্য সম্রাটের শিবিরে মস্ত খানাপিনার, মনোরঞ্জনের আয়োজন হল। একসময় মহম্মদ শাহ বিদায় চাইলে নাদির শাহ বলে উঠলেন, “এত ব্যস্ত কী সুলতান? এখনও তো অতিথিসৎকার তেমন কিছুই করে উঠতে পারলাম না। আপনি বিশ্রাম নিন দয়া করে। আর আপনার দেহরক্ষীদের অস্ত্রশস্ত্রগুলোও সব এখানেই জমা রেখে তারাও বিশ্রাম নিক বরং।”

আষাঢ়ে মেঘ ঘনিয়ে এল মোগল সম্রাটের মুখে। বিলক্ষণ বুঝে গেলেন, একরকম বন্দী হয়েছেন তিনি পারস্য যুদ্ধ শিবিরে।

পরদিন মোগল শিবিরে উপস্থিত হয়ে মহম্মদ শাহের ব্যক্তিগত হারেম, দাসদাসী ও গোটা শাহী তাঁবুটাই উঠিয়ে নিয়ে এল তুর্কিরা। মোগল সেনার সর্দারদেরও স্থান হল নাদিরের শিবিরে। ধীরে ধীরে মোগল তোপখানাও উঠিয়ে আনা হল পারস্য শিবিরে।

তার পরদিন ক্ষুধার্ত, ক্লান্ত মোগল সেনাদের ঘরে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হল।

মহম্মদ শাহ বন্দী হওয়ার পর রাতের অন্ধকারে শুধু একজন পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন মোগল শিবির ছেড়ে। তিনি দিল্লি দরবারের মারাঠা রাজদূত আনন্দ রাম মুখলিস। সুদীর্ঘ ঘন জঙ্গলের পথ অতিক্রম করে তিনি কোনোরকমে দিল্লি পৌঁছলেন প্রথমে। তারপর সেদিনই দিল্লি ত্যাগ করে দক্ষিণের পথ ধরলেন। পুনেতে বসে লিখে পাঠালেন মারাঠা পেশোয়াকে, ‘দিল্লির সিংহাসন নতুন শাসকের অপেক্ষায় রয়েছে। মোগলদের দিন শেষ। বিস্তারিত পরের পত্রে।’

।। চার।।

ঠিক এক সপ্তাহ বাদে হাতির পিঠে দুই সম্রাট নাদির শাহ ও মহম্মদ শাহ লাল পাগড়িধারী এক বিশেষ তুর্কি সৈন্যদলের প্রহরায় দিল্লির পথে রওনা হলেন।

দিল্লি পৌঁছে শাহজাহানাবাদ দুর্গে নতমস্তকে গিয়ে ঢুকলেন মহম্মদ শাহ।

আর পরদিন সুবিশাল এক শোভাযাত্রা করে বিজয়ী নাদির শাহ ধুমধাম করে প্রবেশ করলেন দিল্লি রাজদরবারে। প্রাসাদে ঢুকেই নাদির শাহ দিল্লি সম্রাটের শাহী মহল অধিকার করে নিলেন প্রথমে। মহম্মদ শাহকে বাধ্য করলেন তাঁর জনানা মহলে গিয়ে বাস করতে।

তার পরের দিনটা ছিল দিল্লির পক্ষে দুঃস্বপ্নের এক দিন।

প্রায় চল্লিশ হাজার তুর্কি সেনা নগরে ডেরা ফেলেছে এসে। অনেকেই প্রজাদের ঘরে ঘরে পর্যন্ত গিয়ে ঢুকছে অস্থায়ী বাসের উদ্দেশ্যে। এর প্রতিফলন দেখা গেল দিল্লির বাজারে বাজারে। খাদ্যশস্য সহ যাবতীয় পণ্যসামগ্রীর দাম বেড়ে গেল রাতারাতি। পাহাড়গঞ্জের বাজারে তুর্কি সেনার সঙ্গে ব্যাপারীদের ঝামেলা বাধল জিনিসপত্রের দরদাম নিয়ে।

ঝগড়া তখন তর্কাতর্কির সীমা পার করে হাতাহাতিতে গিয়ে ঠেকেছে। ঠিক তখন কোত্থেকে কে রটিয়ে দিল, পারস্য সম্রাট নাদির শাহকে দিল্লি সুলতানের হারেমের এক নারী রক্ষী হত্যা করেছে। ব্যস, লেগে গেল ধুন্ধুমার। পথেঘাটে তুর্কি সেনা চোখে পড়লেই কচুকাটা শুরু করল দিল্লিবাসী। দুপুর গড়াতে গড়াতে প্রায় ন’শো তুর্কি মারা পড়ল সেদিন।

ওদিকে এই সংবাদ পেয়ে গর্জে উঠলেন নাদির শাহ। সন্ধের মধ্যেই দিল্লিবাসীকে এর সমুচিত জবাব দেওয়ার আদেশ জারি করলেন তিনি। শুরু হল নরমেধ যজ্ঞ। লাল হয়ে উঠল দিল্লি।

পরদিন পুবের আকাশ ফর্সা হওয়ার অপেক্ষামাত্র। নাদির শাহ রাজপ্রাসাদ থেকে বেরিয়ে এলেন এই নর সংহারকে স্বয়ং নেতৃত্ব দিতে। পুরোদস্তুর যোদ্ধার সাজে সজ্জিত হয়ে সটান গিয়ে হাজির হলেন লাল কেল্লা থেকে চাঁদনি চৌকের পথে সিকি ক্রোশ দূরত্বে রৌশন-উদ-দৌলা মসজিদে। মাদ্রাসার ছাদে দাঁড়িয়ে সকাল ঠিক ন’টায় নিজের তলোয়ার কোষমুক্ত করে উঁচিয়ে ধরলেন তিনি। এর অর্থ যতক্ষণ না তলোয়ার পুনরায় কোষবদ্ধ হচ্ছে ততক্ষণ তুর্কি সেনা ক্ষান্ত হবে না। শুরু হল আক্রমণ। তুর্কি সেনা দিল্লিবাসীর ঘরে ঘরে ঢুকে চালাল নিধন যজ্ঞ। চলল যথেচ্ছ হারে লুটপাট। অল্প ক’দিনের মধ্যেই দিল্লির পথঘাটে পচাগলা মৃতদেহের দুর্গন্ধে আকাশ বাতাস দূষিত হয়ে উঠল।

প্রায় তিরিশ হাজার দিল্লিবাসী প্রাণ হারাল বিদেশি শত্রুর হাতে। অসংখ্য নারী বন্দী হল। দুধের শিশু পথের ধুলোয় লুটোচ্ছে। চতুর্দিকে শুধু হাহাকার।

আর সইতে না পেরে নিজাম-উল-মুলক উপস্থিত হলেন সাদাত আলি খাঁর মহলে। অনুরোধ করে বললেন, “আর নয় ভাই, এবারে পারস্য সম্রাটকে মিনতি করো এ ধ্বংসলীলা বন্ধ করতে। চারদিক যে ছারখার হয়ে গেল!”

সাদাত আলি খাঁ এ অনুরোধ কানেও তুললেন না। গর্জে উঠে নির্দেশ দিলেন, “বেরিয়ে যান, এক্ষুনি বেরিয়ে যান এখান থেকে।”

অপমানিত নিজাম-উল-মুলক দ্রুত বেরিয়ে গেলেন সাদাত আলি খাঁর মহল থেকে।

সন্ধের পর সংবাদ এল সাদাত আলি খাঁ বিষপানে আত্মহত্যা করেছেন নিজের মহলে। চিরকুটে লিখে গেছেন, দেশের শত্রুর সঙ্গে মিত্রতার মূল্য ও দেশবাসীর এই রক্তের ঋণের বোঝা বওয়া তাঁর পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না।

নিজাম-উল-মুলক এক মুহূর্তও দেরি করলেন না আর। সোজা গিয়ে হাজির হলেন নাদির শাহের সামনে। নিজের উষ্ণীষ খুলে হাঁটু গেড়ে করজোড়ে ভিক্ষা চাইলেন নাদিরের কাছে। “এ ধ্বংস বন্ধ করুন সম্রাট! রহম করুন। আপনার সেনাকে এটুকু অন্তত আদেশ দিন যে তারা যেন নির্দোষ ও অবলাদের হত্যা না করে। বিনিময়ে আমার প্রাণ কেড়ে নিন আপনি।”

কিছুক্ষণ ভাবলেন নাদির শাহ। জানলেন, “একটা শর্তে। আমি দিল্লি শাসন করতে আসিনি। দিল্লি ত্যাগ করার পূর্বে আমার একশত কোটি টাকা চাই।”

তৎক্ষণাৎ সে শর্তে সম্মতি দিলেন নিজাম-উল-মুলক। শেষে নিজের তলোয়ার কোষবদ্ধ করলেন নাদির। সেনাকে আদেশ পাঠালেন এ হত্যালীলা ও লুটপাট এবারে বন্ধ করতে। দিল্লি শান্ত হল। বিক্ষিপ্ত ডাকাতি, লুটপাট ইত্যাদি চালু থাকলেও প্রাণে বেঁচে গেল অবশিষ্ট দিল্লিবাসী।

পরদিন সকালে নিজাম-উল-মুলক গেলেন মহম্মদ শাহের সাক্ষাতে। শেষে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মোট পাঁচটা ভাগে ভাগ করে দেওয়া হল দিল্লিকে। একেক ভাগ থেকে আদায়কৃত অর্থের পরিমাণ নির্দিষ্ট করা হল। কান্নার রোল উঠল দিল্লি জুড়ে। আরোপিত পরিমাণ অর্থের সংস্থান করতে না পেরে কেউ বিষ পান করল, কেউ বা গলায় দড়ি দিল। প্রকৃত দিল্লি লুট শুরু হল এবারে।

নিজাম-উল-মুলক নির্দিষ্ট দিনে নির্দেশিত অর্থ তুলে দিলেন নাদির শাহের হাতে। দীর্ঘ এক শ্বাস ফেলে উক্তি করলেন, “তিনশো আটচল্লিশ বছরের অর্জিত অর্থ এক মুহূর্তে হাতবদল হয়ে গেল।”

নাদির শাহ কল্পনাও করতে পারেননি যে এত কম সময়ের মধ্যে এই প্রভূত পরিমাণ অর্থ তাঁর সামনে এনে হাজির করা হবে। তাঁর ফাঁদ ছিল অন্য। আসল লক্ষ্য অর্থ নয়। বিস্ফারিত চোখে রাশিকৃত সে ধনভাণ্ডারের পানে তাকিয়ে রইলেন নাদির শাহের অন্যতম এক আমীর মির্জা মেহদি অস্তরাবাদী। বলে উঠলেন, “এ যে হিরেমোতির সাগর দেখছি! এও সম্ভব! আমাদের মুন্সীর তো সারাজীবন লেগে যাবে এ ধন জমাখাতায় তুলতে।”

এটুকুই শুধু নয়, দিল্লির বিভিন্ন সর্দার, দরবারি, ব্যাপারী, চতুর্দিকের রাজামহারাজা ও আমীর-ওমরাহদের পেশ করা নজরানার পাহাড়ও কম উঁচু হয়নি। সে ধনরত্নের পরিমাণও সুবিশাল। মাসের পর মাস কারিগর ও স্বর্ণকারেরা লেগে রইল সোনারূপোর গয়নাগাটি, বাসনকোসন গলিয়ে নিরেট ধাতুতে গড়ে নিতে যাতে পারস্য অবধি তা বয়ে নিয়ে যেতে সুবিধে হয়।

নাদির শাহ তাঁর আমীরদের ডেকে নির্দেশ দিলেন, “ধনরত্ন যা জমেছে তাতে প্রত্যেক সৈনিকেরও কিছু না কিছু প্রাপ্তি ঘটা উচিত। আপাতত সবক’টা তলোয়ারের বাঁট সোনা দিয়ে বাঁধিয়ে দাও ওদের। আর শাহী তাঁবুকে মণিমুক্তো দিয়ে সাজিয়ে তোলো। পাশাপাশি দিল্লির যত দক্ষ রত্নকার রয়েছে চৌদ্দ মাসের চুক্তিতে তাদের নিয়োগ করে নাও।”

নাদির শাহ এই অনাকাঙ্ক্ষিত ধন সম্ভার পেয়ে অত্যন্ত আনন্দিত, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তীব্র উত্তেজনায় টগবগ করছেন বাবরের সেই হিরে হাতে পাওয়ার অপেক্ষায়। এক্ষেত্রে অহেতুক তাড়াহুড়ো করা যাবে না, সরাসরি চাপও দেওয়া যাবে না। কাজ হাসিল করতে হবে অত্যন্ত কৌশলে। এই হিরেখানা হস্তগত করবার উদ্দেশ্যেই তো হিন্দুস্তানে পদার্পণ তাঁর।

ফলে সহসা মহম্মদ শাহের প্রতি অত্যন্ত শিষ্ট ও বিনম্র আচরণ শুরু করলেন তিনি। একসঙ্গে দরবারে উপস্থিত হয়ে মুখ্য সহায়ক রূপে তাঁকে নিজের পাশে বসিয়ে রাজকার্য শুরু করলেন নাদির শাহ।

***

আজ নাদির শাহের পুত্র নাসেরুল্লার শাদি। পাত্রী বাদশাহ মহম্মদ শাহের এক ভ্রাতুষ্পুত্রী। সন্ধ্যাকালে যমুনার তীরে অদৃশ্যপূর্ব আতসবাজির ভেলকি উপভোগ করল দিল্লিবাসী। দিল্লি দরবার গমগম করছে চতুর্দিক থেকে নিমন্ত্রিত হয়ে আসা রাজারাজড়া, আমীর-ওমরাহদের আনন্দ উল্লাসে। বিবাহ আসরে নাদির শাহ ছোট্ট এক ভাষণে ঘোষণা করলেন, “আজ থেকে দিল্লি সম্রাট আমার বিশেষ মিত্র হিসেবে ঘোষিত হলেন। ভবিষ্যতে মারাঠা বা অন্য যেকোনও শত্রু দিল্লি আক্রমণ করার আগে একবার অন্তত যেন পরিণামটা ভেবে নেয়। কারণ, তাকে দিল্লির পাশাপাশি পারস্যের দুর্ধর্ষ তুর্কি সৈন্যবাহিনীর বিরুদ্ধেও লড়তে হবে। আর তার ফল হবে মারাত্মক।”

।। পাঁচ ।।

দিল্লির শাহী বাগিচায় অস্থির পায়চারিরত নাদির শাহ। মধুমাস। ফুলে ফুলে ভ্রমরের গুঞ্জন। তা সত্ত্বেও নাদিরের মনপ্রাণ অত্যন্ত বিক্ষিপ্ত।

নূপুরের ক্ষীণ নিক্বণে নাদির মুখ তুলে দেখলেন, মন্থর অথচ শঙ্কিত পদক্ষেপে এদিকপানেই এগিয়ে আসছে নূর বাঈ।

“আদাব, শাহেনশা।” কণ্ঠস্বর সামান্য কম্পিত নূর বাঈয়ের। “দাসীর কি কোনও অপরাধ হল?”

নূর বাঈয়ের চোখে একবার দৃষ্টি ফেলেই গুটিয়ে নিলেন নাদির শাহ। জানালেন, “না। অপরাধ তোমার নয়।”

“গুস্তাখি মাফ, তবে এই পত্রপাঠ উপস্থিত হবার আদেশ, শাহেনশাহ?”

“গুস্তাখি আমার এই অবাধ্য হৃদয়ের, নূর বাঈ, তোমার নয়। মহফিলে তোমার মুখটা চোখে পড়লেই…” সহসা স্তব্ধ হয়ে গেলেন পারস্য সম্রাট। আর কিছু উচ্চারণ করতে সক্ষম হল না তাঁর কণ্ঠ। সামান্য অপেক্ষার পর ফের জানালেন, “আমার মনপ্রাণ, শ্বাসপ্রশ্বাস সব এখন তোমার সিন্দুকে আটকা পড়েছে নূর! বিলক্ষণ বুঝতে পারছি, এই যুদ্ধবিগ্রহ, ধনরত্ন সব তোমার তুলনায় নিতান্তই তুচ্ছ।”

আনত-মুখী নূর বাঈয়ের ক্ষীণ কণ্ঠ ভেসে এল, “আমি সামান্য এক নর্তকী শাহেনশাহ, মহান পারস্য সম্রাটের যোগ্যা নই।”

“সে বিচার আমার ওপরেই নয় ছাড়ো।”

***

চাঁদ উঠেছে। তবে ত্রয়োদশীর, আলো ম্লান। মৃদুমন্দ বাতাসে গন্ধরাজের সুবাস। শাহী বাগিচার স্বচ্ছ নীল সরোবরের বাঁধানো ঘাটে অর্ধ শয়ান নাদির শাহ। নূর বাঈয়ের কোলে মাথা তাঁর।

“নূর!” অত্যন্ত আবেগ ঘন স্বর প্রক্ষেপ।

চুলে বিলি কাটা আনমনা আঙুল মুহূর্তে স্থির হল নূরের। “আদেশ, জাহাঁপনা।”

“দিল্লিতে আর বেশিদিন কাটাতে পারছি না নূর। ওদিকে ইস্পাহানের সিংহাসন খালি। দুশ্চিন্তা হচ্ছে।”

“যথার্থ জাহাঁপনা। আপনার জিনিস সর্বদাই আপনার। পরের ঘরে দু’দিনের বেশি থাকা যায় না, মন উচাটন হয়।” গম্ভীর কণ্ঠস্বর নূরের।

ধড়মড় করে উঠে বসলেন নাদির শাহ। দু’হাতে প্রেয়সীর মুখ তুলে আকুল কণ্ঠে জানতে চাইলেন, “রাগ করলে নূর!”

“না।”

“চলো না, পারস্যেই কাটিয়ে দেবে বাকিটা জীবনটা। দু’জনে একসঙ্গে। আমার অর্ধেক ধনরত্ন তোমার। সে থেকে তোমাকে বারংবার সেধে চলেছি, তোমার সেই এক গোঁ ‘না’। আচ্ছা, আমার জন্যে কি তোমার এতটুকুও…”

তৎক্ষণাৎ নাদির শাহের মুখে হাত চাপা দিয়ে পরমুহূর্তেই সসংকোচে গুটিয়ে নিল নূর। নাদিরের চোখ থেকে দৃষ্টি নামিয়ে ক্ষমা চাইল, “গুস্তাখি মাফ করবেন জাহাঁপনা। আপনি জানেন না এ ক’দিনে কতটুকু ভালোবেসে ফেলেছে এই দাসী আপনাকে।” মুখ ফিরিয়ে আবেগাশ্রু গোপন করল সে।

চিবুক ফিরিয়ে ধরলেন পারস্য সম্রাট প্রেয়সীর। কণ্ঠে একরাশ আবেগ ঢেলে ডাকলেন, “নূর!”

নূর বাঈ নাদির শাহের চোখে চোখ রাখল। কোনও উত্তর দিল না। দু’চোখ টলটল করছে জলে তখনও।

নাদির শাহ আক্ষেপ করলেন, “দিল্লি ছেড়ে যাব শীগগির। অথচ তুচ্ছ একটা স্বপ্ন পূরণ হল না আজও।”

নূর অনেকটা সামলে নিয়েছে নিজেকে। উৎসুক কণ্ঠে জানতে চাইল, “সেটা কী, জাহাঁপনা?”

ফোঁস করে দীর্ঘ এক শ্বাস ছেড়ে নাদির শাহ বললেন, “মোগল বংশের গৌরব সম্রাট বাবরের সেই হিরে। কোথায় গেলে যে এক নজর চাক্ষুষ করে জীবন সার্থক করব সেটাও অজানা।

“আচ্ছা নূর, তুমি তো দিল্লি সুলতানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। তুমি জানো না কোথায় আছে তা?” সামান্য উত্তেজনা প্রকাশ পেল নাদিরের কণ্ঠে।

নূর সহসা বলে উঠল, “আরে সে তো হাতের কাছেই জাহাঁপনা, দিল্লি সম্রাটের উষ্ণীষের গুপ্ত স্থানে!”

কথাটা বলে ফেলেই থরথর করে কেঁপে উঠল নূর বাঈ। তীক্ষ্ণ কণ্ঠে, “হায় আল্লাহ, এ আমি কী করলাম! এ কী গুনাহ হয়ে গেল!” বলে মুখে উড়ুনির আঁচল চাপা দিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে গেল বাগিচা ছেড়ে অন্ধকারে।

নাদির শাহের চোখদুটো চকচক করে উঠল। নূরের প্রয়োজন ফুরিয়েছে তাঁর।

সারারাত নিজের শয্যায় ছটফট করল নূর বাঈ। বিড়বিড় করে নিজেকে অভিসম্পাত করে চলেছে আর ভেবে চলেছে এই বিপদ থেকে পরিত্রাণের উপায় কী। কী উপায়ে সেই হিরেকে রক্ষা করা যায়। সোজা দিল্লি সম্রাটকে সংবাদ পাঠাবে? কিন্তু তাতে তো তাঁর প্রাণহানির সম্ভাবনা প্রবল। পারস্য সম্রাটের নজর যখন একবার সে হিরের ওপর পড়েছে তা তিনি হাসিল করবেনই যে উপায়েই হোক। সারারাত তোলপাড় চিন্তা করেও সে হিরে রক্ষা করবার কোনও উপায় বের করতে সক্ষম হল না নূর বাঈ। তারপর ভোররাত থেকে তাকে কেউ আর দেখতে পায়নি মহলে।

পরের দিনটা ইতিহাসের এক বিশেষ দিন। দিল্লির বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে মহম্মদ শাহকে দিল্লির সিংহাসন ফিরিয়ে দিলেন নাদির শাহ। তবে বিজিত সিন্ধু প্রদেশের উত্তর-পশ্চিম এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল মোগল সম্রাটকে আর ফিরিয়ে দিলেন না, নিজের অধিকারেই রাখলেন। সেখানে আফগান সর্দারদের তত্ত্বাবধানে নতুন এক রাজ্যের উদ্ভব ঘটাবেন তিনি।

মহম্মদ শাহ এক ঘোরের মধ্যে রয়েছেন। দিল্লি সিংহাসনে তিনি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবেন এ ছিল তাঁর কল্পনারও অতীত। এই সুযোগে নাদির শাহ আচমকা আহ্বান জানালেন, “আসুন মিত্র, প্রাচীন প্রথা মেনে আমরা পরস্পর উষ্ণীষ বদল করি। এ আমাদের মিত্রতার প্রতীক হয়ে থাকুক।”

মহম্মদ শাহের টনক নড়ল তখনই। কিন্তু নিরুপায় তিনি। একান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও কাঁপা হাতে নিজের উষ্ণীষ খুলে পরিয়ে দিলেন পারস্য সম্রাটের মাথায়। নাদির শাহও নিজের উষ্ণীষ রাখলেন মহম্মদ শাহের মাথায়। সে উষ্ণীষে বাজপাখির এক বৃহৎ পালক গোঁজা।

মুহূর্তের মধ্যে দরবার ভঙ্গ করবার নির্দেশ দিয়ে নাদির ছুটে গিয়ে প্রবেশ করলেন অন্দরমহলে, নিজের খাস কক্ষে। একটানে মাথার পাগড়ি ছুড়ে ফেললেন শয্যায়। কোথাকার কোন খাঁজ থেকে বেরিয়ে এল আজব এক হীরকখণ্ড, যা নাদির শাহ জীবনে প্রথমবারের মতো চাক্ষুষ করলেন। দীর্ঘকালের প্রার্থিত সে রত্ন। উল্লসিত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠলেন, “এ যে কোহ-ই-নূর! সুভান-আল্লাহ!” ফার্সি ভাষায় যার অর্থ, ‘আলোর পর্বত’।

বাবরের হিরে ইতিহাসে স্থান করে নিল কোহ-ই-নূর নামে। নবজন্ম হল তার।

।। ছয়।।

দিল্লিতে নাদির শাহ পদার্পণ করেছেন আজ সাতান্ন দিন অতিক্রান্ত হল। এবারে বিদায় নিতে হয়। সাতশো হাতি, চার হাজার উট ও বারো হাজার ঘোড়ায় টানা গাড়িভর্তি ধনরত্ন সঙ্গে করে নাদির শাহ ফিরে চললেন পারস্যের উদ্দেশ্যে।

দ্রুতগামী আরবি ঘোড়ায় দলের পুরোভাগে স্বয়ং পারস্য সম্রাট। দলটার মাঝে মাঝে ও শেষভাগে তাঁর অতি বিশ্বস্ত সেনাধ্যক্ষরা সতর্ক প্রহরা দিয়ে এগিয়ে নিয়ে চলেছে দলটাকে। এ ব্যবস্থা সত্ত্বেও লুঠের পরিমাণ ধীরে ধীরে লোপ পেতে শুরু করল। ঘোড়া ছুটিয়ে নাদির শাহের কাছে পৌঁছল এক সেনাধ্যক্ষ। জানাল, “ধনরত্নে সৈনিকদের কুদৃষ্টি পড়েছে শাহেনশাহ। এরা বিকৃত উল্লাসে গোপনে মুঠো মুঠো ধনরত্ন পথেঘাটে ছড়িয়ে চলেছে। স্থানীয়রা তা টের পেয়ে আমাদের পিছু নিয়েছে জঙ্গলে গা ঢাকা দিয়ে। কিছু হাতে এলেই পালিয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া…”

মুখ লাল হয়ে উঠল নাদির শাহের একথা শুনে। জানতে চাইলেন, “তাছাড়া?”

“তাছাড়া শাহেনশাহ, আমার সন্দেহ সৈনিকেরাও কিছু না কিছু…”

কথা শেষ হল না সৈন্যাধ্যক্ষের। তার আগেই নাদির শাহ হাত তুলে থামিয়ে দিয়ে হুকুম দিলেন, “কড়া নজর রাখো। প্রয়োজনে আরও পাহারা বাড়াও। অকর্মার ঢেঁকি ওই আমীর ক’টাকে নামিয়ে আনো শিবিকা থেকে। পায়ে হেঁটে পাহারা দিক।”

“তবে কি সেনাবাহিনীকে…” আমতা আমতা করে জানতে চাইল সৈন্যাধ্যক্ষ।

“সময় আসুক। যাও।”

পাঞ্জাব পৌঁছে চিনাব নদী পার করবার ঠিক আগমুহূর্তে নাদির শাহ বিশ্রামের হুকুম শোনালেন। দিল্লির মণিমুক্তোখচিত শাহী তাঁবু খাটিয়ে দেওয়া হল তড়িঘড়ি। সম্রাট তাতে বসে এক এক করে প্রত্যেক সেনাকে তল্লাশির নির্দেশ দিলেন। সে নির্দেশে পারস্যের সুবিশাল সৈন্যবাহিনী চঞ্চল হয়ে উঠল সহসা। অনেকটা মরিয়া হয়েই ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ল। অনেকেই গোপনে নদীপাড়ে, জঙ্গলে গর্ত খুঁড়ে, পাহাড়ের খাদের কিনারায় যার যার চুরি করা ধন লুকিয়ে ফেলে নিশান কেটে রাখতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। পরে কখনও সুযোগ মিললে তা উদ্ধার করে নিয়ে যাবে এসে।

এই চঞ্চল পরিস্থিতিতে ধনরত্নে বোঝাই একটা উট ভড়কে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল নদীর বুকে। চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই তলিয়ে গেল তীব্র স্রোতের টানে।

বিশ্রাম শেষে পুনরায় শুরু হল পথচলা। পথে পড়ল মানসুনি নামে আরেক নদী। সেখানেও বেশ ক্ষয়ক্ষতি হল লুঠের মালের। অসময়ের বানে ভেসে গেল বেশ কিছু ধনরত্ন বোঝাই পশুর গাড়ি। কিছু পা পিছলে পড়ে গেল অতল খাদে।

যে পথে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন নাদির শাহ, সে পথে ফিরে যাননি তিনি। ফিরবার পথ ধরেছিলেন অন্য, হিন্দুকুশ পর্বতের মাঝ বরাবর গিরিপথে।

শেষে একসময় যে ধনসম্পদ নিয়ে দেশের মাটিতে পা রাখলেন নাদির শাহ তার পরিমাণও অকল্পনীয়। পারস্যে পৌঁছেই নাদির নিজের ব্যক্তিগত ধনরত্ন, অলঙ্কারাদি ও দৃষ্টিনন্দন বহুমূল্য ধাতব তৈজসপত্র সব হেরাতে পাঠিয়ে দিলেন। সেখানে এক প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হল। নাদির শাহের রত্নখচিত শাহী তাঁবুও সামিল করা হল তাতে।

পারস্য সম্রাটের তাঁবুর সৌন্দর্য শব্দ সজ্জায় ব্যাখ্যা করা অসম্ভব। তাঁবুর বাইরের দিকটা বহুমূল্য লাল রঙের কাপড়ের মোটা পট্টি দ্বারা বেষ্টিত। পট্টির ভেতরের দিকটা আবার বেগুনি রঙের মখমলের কাপড়ের। তাতে আঁকা বিভিন্ন পশুপাখি, ফুল-পাতায় জুড়ে দেওয়া হয়েছে রাশি রাশি হিরে, মোতি, মাণিক্য, পান্না, গোমেদ ইত্যাদি রত্ন। তাঁবুর খুঁটিগুলোও একই সাজে সজ্জিত। তাঁর সিংহাসনের দু’পাশে দুই পর্দা—তাতে মণিমুক্তো খচিত দুই দেবদূতের চিত্র। তাঁবুর ছাদ মোট সাতটা ভাগে বণ্টিত। একস্থান থেকে অন্যস্থানে নিয়ে যাওয়ার সময় দুটো ভাগ আলাদা করে মোটা সুতি কাপড়ে জড়িয়ে কাঠের বাক্সে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। এই বাক্সের ভার কেবল এক হাতির দ্বারাই বওয়া সম্ভব, মানুষের ক্ষমতার বাইরে। অন্য বাক্সে দেবদূত আঁকা দুই পর্দা। তাঁবুর দেওয়াল, খুঁটি, বিভিন্ন অংশ জুড়ে রাখবার কীলক—সব স্বর্ণনির্মিত। এগুলো বইতে পারে কমপক্ষে পাঁচটা হাতি। অর্থাৎ, শাহী তাঁবু অন্যত্র সরিয়ে নিতে হলে মোট সাতটা হাতির প্রয়োজন। আর নাদির শাহ কখনও রাজপ্রাসাদ বা নির্দিষ্ট একস্থানে বসে রাজত্ব করেন না। তিনি সাম্রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে যাযাবরের মতো ঘুরে রাজ্য পরিচালনা করেন।

***

দিনটা ১৫ মে, ১৭৪১ সাল।

নাদির শাহ তখন তেহরানের অলবুর্জ পর্বতের সংকীর্ণ এক স্থানে তাঁবু গেড়েছেন। হারেমের বেগমদের সঙ্গে করে গিরিপথে প্রমোদ ভ্রমণে বেরিয়েছেন। সঙ্গে অল্পসংখ্যক খোজা দাসদাসী। পাহাড়ের কোন খাঁজ থেকে সহসা গর্জে উঠল এক বন্দুক। কেঁপে উঠল গোটা পাহাড়। গরম সীসার খণ্ড নাদিরের বাহু ছুঁয়ে লাগাম ধরে রাখা হাতের আঙুল স্পর্শ করে ঘোড়ার গলায় বিঁধল গিয়ে। হুড়মুড় করে মাটিতে পড়ে গেলেন তিনি। ঘোড়াটা মারা গেল।

কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সন্ধান চালিয়ে জানা গেল, নাদির শাহের নিজেরই এক পুত্র রজা কুলি গুপ্ত ঘাতকের মাধ্যমে পিতাকে হত্যা করে পারস্যের সিংহাসন দখল করতে চায়। ক্রোধান্ধ নাদির তখন আদেশ দিলেন, রজা কুলির দুই চোখ অবিলম্বে উৎপাটিত করে তাঁকে পেশ করা হোক।

সেকাজ সম্পন্ন হলে মানসিকভাবে অত্যন্ত পীড়িত হয়ে পড়লেন পারস্য সম্রাট। দিনে দিনে আমীর-ওমরাহদের প্রতি দুর্ব্যবহার, আর প্রজাদের প্রতি ঘৃণা অত্যন্ত বৃদ্ধি পেতে শুরু করল তাঁর। লঘু অপরাধে মুণ্ডচ্ছেদের মতো গুরু দণ্ড তখন পারস্যে সাধারণ ঘটনা। ধীরে ধীরে নিজের বিশ্বস্ত আমীরদেরও চক্ষুঃশূল হয়ে পড়লেন তিনি।

।। সাত ।।

পশ্চিমাংশের পাহাড়ি উপজাতি কুর্দিরা অত্যন্ত ঝামেলা শুরু করেছে ইদানীং। নাদির শাহের একেকটা ফরমান কলাপাতার মতো ছিঁড়ে ফেলে দিচ্ছে। অবিলম্বে এদের সমুচিত শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন।

১৭৪৭ সালের বসন্তের এক সকালে নাদির শাহ রওনা হলেন কেরমন শাহী শিবিরের উদ্দেশ্যে। ডিঙোতে হবে দশৎ-এ-লুৎ নামে অত্যন্ত দুর্গম বিস্তীর্ণ এক মরু পথ। নাদির তখন যকৃতের সংক্রমণে কাবু।

অনেক কষ্টে ১৯ জুন খোরাসান হয়ে কলত পৌঁছলেন তিনি। এই কলতেই ভারত থেকে লুটে আনা সুবিশাল সম্পদের পাহাড় একত্র করে রেখেছেন নাদির। আর এই কলতেই জীবনের শেষ অধ্যায় রচিত হয়েছিল তাঁর।

নাদির বিলক্ষণ উপলব্ধি করতে পারছিলেন যে চতুর্দিকে একের পর এক ষড়যন্ত্র গজিয়ে উঠছে তাঁর বিরুদ্ধে। তাই কলতে পৌঁছেই নিজের ঘোড়াটাকে অষ্টপ্রহর প্রস্তুত রাখতেন হারেমে। যেকোনও মুহূর্তে প্রয়োজন পড়তে পারে।

নাদিরের বিশ্বস্ত আমীরদের মধ্যে দু’জনের ওপর যথেষ্ট সন্দেহের উদ্রেক হয়েছে তাঁর। তাঁরা মহম্মদ কুলি খাঁ ও সলাহ খাঁ। দু’জনেই সুলতানের আত্মীয়স্বজন। প্রথম জন নাদিরের সৈন্যাধ্যক্ষ ও দ্বিতীয় জন শাহী হারেমের অধিকর্তা। সলাহ খাঁ নাদিরের চোখে-চোখেই থাকেন অষ্টপ্রহর, কিন্তু মহম্মদ কুলি খাঁকে নিয়ে যথেষ্ট চিন্তিত তিনি। মহম্মদ কুলি খাঁ যেমন বাহাদুর সৈন্যাধ্যক্ষ, তেমনই ধুরন্ধর এক রাজপুরুষ।

নাদির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আসন্ন বিপদআপদ থেকে মুক্ত থাকতে চার হাজার আফগান সেনার দুর্ধর্ষ এক দল তৈরি করবেন নিজের দেহরক্ষী হিসেবে। সেরকমই একটা দল রয়েছে তাঁর সেনাবাহিনীতে। আফগান সর্দার আহমদ খাঁ আবদালি রয়েছেন দলটার নেতৃত্বে। এই সেনাদল নাদিরের অত্যন্ত বিশ্বস্ত। তুর্কি সেনাদলের সঙ্গে সদ্ভাব নেই তাদের।

সে রাতেই প্রথম প্রহরে আহমদ খাঁ আবদালিকে তলব পাঠালেন নাদির শাহ। দিল্লি আক্রমণের পূর্বে আফগানিস্তানের কান্দাহার অধিকার করতে গিয়ে আবদালি নজরে আসেন নাদির শাহের। প্রথম দেখাতেই অত্যন্ত পছন্দ হয়ে যায় পারস্য সম্রাটের তাঁকে। নাদির শাহ চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করতেন আবদালিকে।

আবদালি সম্রাটের তলব পেয়ে শাহী তাঁবুতে এসে প্রবেশ করতেই সম্রাট বলে উঠলেন, “দেখো আবদালি, আমি শাহী দেহরক্ষীদের ওপর ঠিক সন্তুষ্ট নই। কিন্তু তোমার ওপর কতটা বিশ্বাস বা ভরসা রাখি সে তোমার অজানা নয়। আমি চাই কাল সকালেই আমার বিরোধী সব সর্দারদের তুমি বন্দী করে ফেলো, আর কেউ বাধা দিলে তৎক্ষণাৎ তার মুণ্ডচ্ছেদ করবে। এ আমার প্রাণ রক্ষার দায়, আর এক তুমি ও তোমার যোদ্ধাদের ওপরই কেবল বিশ্বাস রাখতে পারি আমি।”

আহমদ খাঁ আবদালি এই গৌরবে অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে বেরিয়ে গেলেন তৎক্ষণাৎ।

কিন্তু দুর্ভাগ্য নাদিরের, এই গুপ্ত আদেশও আর গুপ্ত রইল না। ঘড়িভর সময়ের মধ্যেই তা কানে কানে পৌঁছে গেল তাঁর বিরোধী শিবিরে।

***

তড়িঘড়ি সে রাতেই গুপ্ত এক সভা বসেছে। পৌরহিত্য করছেন মহম্মদ কুলি খাঁ স্বয়ং। সভায় এসে উপস্থিত হলেন সলাহ খাঁ, সঙ্গে অপর দুই সর্দার। গুপ্ত কক্ষে প্রবেশ করতেই জোর চমকে উঠল দুই সর্দার। মহম্মদ কুলি খাঁর পাশের আসনে যিনি বসে আছেন তিনি আর কেউ নন স্বয়ং সম্রাটেরই ভ্রাতুষ্পুত্র আলি কুলি। মহম্মদ কুলি খাঁ জানালেন, “আমাদের এতদিনের তিল তিল করে গড়ে তোলা স্বপ্ন পূরণের সময় এসেছে। যে মোক্ষম সময়ের অপেক্ষায় ছিলাম আমরা তা সমাগত।”

সলাহ খাঁ সমর্থন জানিয়ে বললেন, “হ্যাঁ, যা করবার আজ রাতেই করতে হবে। আর সময় নেই। কারণ, কাল সকালেই সবার হাতে হাতকড়া পরাবে আহমদ খাঁ আবদালি। সেরকমই হুকুম হয়েছে।”

মহম্মদ কুলি খাঁ উত্তরে বললেন, “কিন্তু তার আগে আমাদের নিজেদের মধ্যে অতীত-বর্তমানের সকল অসন্তোষ, ঘৃণা ঝেড়ে ফেলতে না পারলে এ কাজ সুসম্পন্ন হবে না। সেজন্যে একটা চুক্তিপত্র তৈরি করে রেখেছি আমি। দলের বাকি ষাট সদস্যের প্রত্যেকের সম্মতি চাই এতে।”

“নিশ্চয়ই। আমাদের সবার পূর্ণ সমর্থন থাকবে এ প্রস্তাবে।” মুখোমুখি উপবিষ্ট দুই সর্দার বলে উঠলেন একসঙ্গে।

মহম্মদ কুলি খাঁর চোখে চোখ রাখলেন সলাহ খাঁ। জিজ্ঞেস করলেন, “সময়?”

অনুচ্চ স্বরে নিজেদের মধ্যে রচিত হল এক অন্যতম ঐতিহাসিক ষড়যন্ত্র।

মন্ত্রণা শেষে বিদায় নিল সকলে। বেরিয়ে যাওয়ার আগে মহম্মদ কুলি খাঁ চুক্তিপত্রে সঙ্গীদের সবার সম্মতি আদায় করে নিতে মনে করিয়ে দিলেন ফের।

রাত তখন ঠিক দুটো। মন্দ কিরণে চাঁদ হেলে পড়েছে পশ্চিমে। নাদির শাহের তাঁবু ঘিরে মশাল ও অস্ত্র হাতে প্রহরা দিচ্ছে তাঁর শাহী রক্ষীদল। চতুর্দিক শুনশান, আবছায়া অন্ধকার।

অতর্কিতে একটা হল্লা উঠল শাহী তাঁবুর সামনে। কোত্থেকে রে রে করে তেড়ে এল পনেরো-কুড়ি জনের সশস্ত্র একটা দল। আরেকটা দল তাঁবু ঘিরে ফেলেছে ততক্ষণে। রক্ষীরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা বন্দী হল শত্রুপক্ষের হাতে। বিকট পাশবিক উল্লাসে চিৎকার করতে করতে দলটা ঢুকে গেল নাদির শাহের তাঁবুতে। সহসা ঘুম ভেঙে যেতেই সর্বাঙ্গ একবার কেঁপে উঠল নাদির শাহের। তবে সে মুহূর্তকাল মাত্র। পরক্ষণেই তীব্র হুঙ্কারে বলে উঠলেন, “কে তোরা? আমার তলোয়ার কই?”

আততায়ীরা দলে যতই ভারী হোক, বিপক্ষের মানুষটা দোর্দণ্ড পরাক্রমী নাদির শাহ। সম্রাটের এই হুঙ্কারে দলটা উলটো পায়ে ফিরতি পথ ধরল তক্ষুনি। কিন্তু পেছনে তখন মূর্তিমান দুই বিপদের মতো এসে দাঁড়িয়েছেন মহম্মদ কুলি খাঁ ও সলাহ খাঁ। পালিয়ে আসা দলটার দিকে আগুন চোখে তাকাতেই সবাই ফের সঙ্গ নিল তাঁদের। সম্রাটের তাঁবুতে প্রবেশ করলেন দু’জনে।

নাদির শাহের হাতে এতটা সময় ছিল না যে পালটা একটা জবাবের জন্যে তিনি প্রস্তুত হন। তার আগেই মহম্মদ কুলি খাঁ দৌড়ে এসে মোক্ষম এক তলোয়ারের আঘাত হানলেন সম্রাটের শরীরে। মাটিতে পড়ে গেলেন নাদির। সম্পূর্ণ নিরস্ত্র তিনি। বুঝে গেলেন তাঁর শেষ সময় উপস্থিত, শিয়রে নাচছে মূর্তিমান দুই যমদূত। তবুও শেষ চেষ্টা একটা করলেন, “আমাকে মুক্তি দাও তোমরা। বিনিময়ে আমার যা আছে নিয়ে যাও।”

উত্তরে সলাহ খাঁ এক কোপে মুণ্ডুটা ধড় থেকে আলাদা করে অপেক্ষারত এক রক্ষীর হাতে তুলে দিল সম্রাটের। তৎকালীন দুনিয়ার সর্বাপেক্ষা সম্পদশালী সুলতানের প্রাণবায়ু নির্গত হয়ে গেল।

তারপর শুরু হল পরিকল্পিত দ্বিতীয় পর্যায়, যথেচ্ছ লুটপাট। নাদিরের বিশ্বস্ত লোকদের খুঁজে খুঁজে এনে চলল নিধন যজ্ঞ।

এই সুযোগে কোন এক দাসী দৌড়ে বেরিয়ে গেল শিবির থেকে। চোখের পলকে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল কোথায়।

অল্প সময়ের ব্যবধানেই চতুর্দিক কাঁপিয়ে নিজের দুর্ধর্ষ দলটাকে নিয়ে হাজির হলেন আহমদ খাঁ আবদালি। অকুস্থলে পৌঁছেই আক্রমণ হানলেন মহম্মদ কুলি খাঁর দলবলের ওপর। তলোয়ার নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে মহম্মদ কুলি খাঁ আঘাত হানতে হানতে ক্রুদ্ধ চিৎকার করে উঠলেন, “বিশ্বাসঘাতক! চুক্তি ছিল কোহিনূর তোর, আর পারস্য আমার।”

মহম্মদ কুলি খাঁর আঘাত প্রতিহত করতে করতে আবদালির কণ্ঠে উত্তর এল, “আবদালি নিজের শত্রুর শেষ রাখে না। এইবারে মৃত্যুর জন্যে প্রস্তুত হও মহম্মদ কুলি খাঁ।”

সকালের আলো ফুটতে ফুটতে শত্রুদলের কেউ বেঁচে রইল না আর। লুণ্ঠিত ধনরত্নও সব একজায়গায় জড়ো করা হয়েছে এনে। আহমদ কুলি খাঁ পায়ে পায়ে গিয়ে দাঁড়ালেন নাদির শাহের শবদেহের পাশে। শোকপ্রকাশের অছিলায় নাদির শাহের বাজুবন্ধখানা খুলে নিলেন কৌশলে। কোহিনূর জ্বলজ্বল করছে তাতে।

আর বিলম্ব করা চলে না এক মুহূর্তও। নিজের অশ্বারোহী দলটাকে ইঙ্গিতে আদেশ দিয়ে তৎক্ষণাৎ রওনা হয়ে গেলেন কান্দাহারের পথে। নিজের দেশ হাতছানি দিচ্ছে তাঁকে।

পরবর্তী সত্তর বছর কোহিনূর যে দেশের গৌরব বৃদ্ধি করে চলেছিল তার নাম আফগানিস্তান।

চতুর্থ অধ্যায়

।। এক ।।

আহমদ খাঁ আবদালি কোহিনূর হাতে আফগানিস্তানের পথে। কোহিনূর তাঁর বাজুবন্ধে বাঁধা। সন্ধের পূর্বেই সংবাদ নিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে এল এক আফগান সর্দার। পারস্যের কলতে আবদালির খাস গুপ্তচর সে। জানাল, “দশ হাজার তুর্কি সেনা ধাওয়া করেছে সর্দার। আমি কোনোমতে জঙ্গলে গা ঢাকা দিয়ে এসে পৌঁছেছি তাদের নজর বাঁচিয়ে।”

স্মিত হাসলেন আবদালি। মাথা দুলিয়ে উত্তর দিলেন, “সে সন্দেহ আমার শুরু থেকেই ছিল হে। কত দূরে রয়েছে এরা?”

“খুব বেশি দূরে নয় সর্দার। একবেলার ব্যবধান মাত্র আর। দ্রুতগতিতে দূরত্ব কমানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে তারা। এক্ষুনি কোনও ব্যবস্থা না নিলে…”

কথা সম্পূর্ণ হল না গুপ্তচরের। আবদালি হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “তোমার কর্তব্য এখনও সম্পন্ন হয়নি রহমত খাঁ। ছোটো একটা টুকরি নিয়ে তুমি হেরাতের পথে রওনা হয়ে যাও তুর্কিদের একবার দেখা দিয়ে। তবে খবরদার, একজন আফগানের প্রাণও যেন নষ্ট না হয়। তুর্কিদের সামনাসামনি হবে না কিছুতেই। পরে সময় সুযোগ বুঝে ফিরে এসো কান্দাহারে। আমাকে সেখানেই পাবে।”

পারস্যের তুর্কি সেনা আবদালির ফাঁদে পা দিল সহজেই। তারাও হেরাতের অভিমুখে ঘোড়া ছোটাল আবদালির ছোট্ট দলটার পেছনে।

আহমদ খাঁ আবদালি নির্বিঘ্নে পৌঁছে গেলেন কান্দাহারে।

কান্দাহারে পৌঁছার মুখে ভাগ্যদেবী ফের সদয় হলেন আবদালির প্রতি। দূরে পাহাড়ের খাঁজে দেখা গেল ইস্পাহান থেকে একটা দল চলেছে কান্দাহারের পথে। সেখানে অবস্থিত পারস্য সম্রাটের জনাকতক সৈন্যাধ্যক্ষ আফগানিস্তান রক্ষা করে চলেছে যার যার সৈন্যদল নিয়ে। দলটা মোটা রকমের টাকাকড়ি নিয়ে যাচ্ছিল সৈন্যদলের বেতন মিটিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে। সম্রাটের করুণ পরিণতি বিষয়ে তারা তখনও অবগত নয়। কাল বিলম্ব না করে আবদালি ঝাঁপিয়ে পড়লেন দলটার ওপর। টাকাকড়ি ভাগ করে দিলেন সঙ্গী দলের প্রত্যেককে সমান ভাগে।

***

নাদির শাহের হত্যার একমাস বাদে কান্দাহারের নিকটবর্তী শের সুর্খ দরগায় এক বিশেষ সভার আয়োজন করা হল। চব্বিশ বর্ষীয় আহমদ খাঁ আবদালিকে কেবলমাত্র আবদালি জনগোষ্ঠীরই নয়, সম্পূর্ণ আফগানিস্তানের শাসক রূপে অভিষিক্ত করা হল সে সভায়। সুফি ফকির আবদুল গফুর তাঁকে পাদশাহ উপাধি দিয়ে উষ্ণীষে যবের মালা রেখে অভিষেক ক্রিয়া সম্পন্ন করলেন। ‘সম্রাট দুর্রি-এ-দুর্রান’ নামে জয়জয়কার উঠল। আহমদ শাহ আবদালি নামে আফগানিস্তানের সিংহাসনে বসলেন তিনি।

সহসা নাদির শাহের কথা স্মরণে এল আবদালির।

নাদির শাহের দিল্লি অভিযানে আবদালি তাঁর সঙ্গেই ছিলেন। পারস্য সম্রাটের খাস পরিচারক তখন বছর তেরোর কিশোর আবদালি। আফগানিস্তানের পূর্ববর্তী অভিযানে গিয়ে ছেলেটাকে বেশ পছন্দ হয়ে যায় নাদিরের। আবদালিকে নিজের সঙ্গে রাখাই মনস্থ করেন তিনি।

দিল্লি বিজয়ের পর নাদির শাহ তখন লাল কেল্লায় বসে বিশ্রাম নিচ্ছেন। দিল্লি সম্রাট মহম্মদ শাহের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ দাক্ষিণাত্যের নিজাম-উল-মুলক লাল কেল্লার নিজ মহল থেকে রওনা হয়েছেন নাদির শাহের সাক্ষাতে। দেওয়ান-ই-খাসের কয়েদখানার সামনে এক আফগান কিশোরকে ইতস্তত ঘুরতে দেখে থমকে দাঁড়ালেন তিনি। কিশোরকে ডেকে পরিচয় জানতে চাইলেন। উত্তর এল, “আমি আহমদ খাঁ আবদালি। আফগানিস্তানের বাসিন্দা, পারস্য সম্রাটের খাস পরিচারকদের একজন।”

এগিয়ে গিয়ে একেবারে মুখোমুখি হয়ে অপলক তাকিয়ে রইলেন নিজাম-উল-মুলক আহমদের মুখে। নিজাম একজন দক্ষ মুখাবয়ব চরিত্র নির্ণয়কারী। আহমদের মুখে খানিকক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে তারপর হাত ধরে টেনে নিয়ে চললেন নাদির শাহের খাস মহলে। উপস্থিত হয়ে বললেন, “এ পারস্য সম্রাটের খাস পরিচারক রূপে নিজের পরিচয় দিচ্ছে। এ কি সত্য, সম্রাট?”

নাদির শাহ খানিকটা আশ্চর্য হয়ে উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ! কেন?”

“ওর ভবিষ্যৎ অত্যন্ত উজ্জ্বল। কপালে রাজলক্ষণ সুস্পষ্ট। কোনও এক সিংহাসন অপেক্ষা করে রয়েছে তার।”

তুচ্ছাতিতুচ্ছ এক পরিচারক সম্পর্কে নিজাম-উল-মুলকের এই ভবিষ্যৎবাণীতে মুখটা সহসা কালো হয়ে উঠল নাদিরের। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে একটানে সুতীক্ষ্ণ ফলার খঞ্জরখানা বের করে আনলেন কটিদেশ থেকে। আহমদের কানের একখানা লতি ফুটো করে দিয়ে অট্টহাস্যে বলে উঠলেন, “যেদিন রাজা হবি, সেদিন এই চিহ্ন আমার কথা মনে করাবে তোকে।”

আজ সেই দিন। সেই কিশোর পরিচারক আজ আফগানিস্তানের মতো দুর্ধর্ষ বীরদের এক দেশের রাজা―আহমদ শাহ দুরানি।

।। দুই ।।

দুরানি সিংহাসনে বসেই প্রথমে কাবুল ও হেরাত জয় করলেন প্রথমে। তারপর নজর গেল মণিমাণিক্যের আঁতুড়ঘর ভারতের দিকে। কাশ্মীরের মাটিতেও উড়ল তাঁর বিজয় ধ্বজা।

আহমদ শাহ দিল্লি আক্রমণ করলেন। যা হত্যা লীলা ও লুটপাট চালালেন দিল্লিতে, তা বোধ করি নাদির শাহের আমলেও ঘটেনি। নাদির শাহের ধ্বংসলীলার পর দিল্লি ধীরে ধীরে পুনরায় সামলে উঠছিল। কিন্তু আহমদ শাহ আবদালির এই আক্রমণের পর পরবর্তী পঞ্চাশ বছরেও দিল্লি সামলে উঠতে পারেনি আর।

সমগ্র উত্তর ভারতের বিভিন্ন স্থানে মোট আটবার আক্রমণ করবার পর ১৭৬১ সালের ১৪ জানুয়ারি পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে পশ্চিম ভারতের অন্যতম শক্তিশালী মারাঠা সেনাকে হারিয়ে জয় হাসিল করল আফগান সেনা। আহমদ শাহ আবদালির এ ছিল সবচাইতে বড়ো বিজয়।

পরদিন বাহুতে কোহিনূর বেঁধে সরহিন্দের সুফি মাজারে উপস্থিত হলেন আহমদ শাহ আবদালি। তৎকালীন ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সামরিক শক্তি মারাঠাদের বিরুদ্ধে জয়ী হয়ে আহমদ শাহ আবদালি আফগানিস্তানের সর্বকালীন সর্বশ্রেষ্ঠ জঙ্গি সর্দারের তকমা পেলেন।

কিন্তু আহমদ শাহ আবদালির ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল না। আফগানিস্তানের রাজসিংহাসনে অভিষিক্ত হওয়ার পরপরই তাঁর নাকে একটা আঁব ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে লাগল। ক্রমে তা এতটা বিষাক্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়ল যে আবদালি মনে মনে মৃত্যুর প্রহর গুনতে শুরু করলেন।

মারাঠা যুদ্ধের সময়ই তাঁর নাকখানা প্রায় গলে গিয়েছিল সে রোগের প্রকোপে। মূল্যবান হিরে-জহরত খচিত এক নকল নাক তিনি লাগিয়ে রাখতেন সেখানে।

এইবারে মাজারে মসজিদে দরগায় তিনি এ রোগমুক্তির প্রার্থনা জানিয়ে ফিরতে লাগলেন।

***

আফগানিস্তানে তীর্থের উদ্দেশ্যে হিন্দুস্তানের এক সন্ন্যাসী দল গজনির পথে যাত্রা করেছে। কয়েকদিনের অক্লান্ত পদযাত্রার পর সহসা গিরিপথের অনুচ্চ এক শৃঙ্গে নজরে এল সুবিশাল এক অশ্বারোহী দল এগিয়ে আসছে তাঁদের দিকেই। দলের সর্দার আর কেউ নন, স্বয়ং আফগান সুলতান। সন্ন্যাসীরা চোখের পলকে যে যেমন পারলেন, কেউ ঝোপঝাড়ের আড়ালে, কেউ বা গিরি খাঁজে আত্মগোপন করলেন। কেননা, আফগান সুলতান এর মধ্যেই মথুরায় অসংখ্য হিন্দু মন্দির ও অমৃতসরে শিখ ইবাদতগাহ গুঁড়িয়ে দিয়েছেন। এখন এই পথে বিধর্মী সন্ন্যাসীর দলটাকে চোখে পড়লে কচুকাটা না করে ক্ষান্ত হবেন না। সন্ন্যাসীরা রুদ্ধশ্বাসে প্রহর গুনে চলেছে কখন আবদালির দলটা পাশ কেটে বেরিয়ে যায়।

স্থানটা অতিক্রম করতে গিয়েও থমকে দাঁড়ালেন আবদালি। সৈন্যাধ্যক্ষকে আদেশ দিলেন, “আমার কেমন একটু সন্দেহ হচ্ছে যে এই স্থানে আমরা ছাড়াও আরও কেউ বর্তমান। হয়তো আত্মগোপন করেছে সে। সন্ধান করো।”

বেশি সময় নিল না। অচিরেই আফগান সৈন্যদের হাতে ধরা পড়ল সন্ন্যাসীদের দলটা। সুলতানের সামনে টেনে আনা হল সবাইকে। সকলে থরহরি কম্প। তবে আবদালির চোখে কিন্তু কোনও রোষ নেই। ধীরেসুস্থে নেমে এলেন ঘোড়ার পিঠ থেকে। সন্ন্যাসীদের বিনতি জানালেন তাঁর রাজসভায় তাঁরা যেন আজ সন্ধ্যায় অতি অবশ্যই পদধূলি দেন।

সন্ন্যাসী দলটা রাজসভায় পৌঁছলে তাঁদের কাছে আবদালি মিনতি করলেন তাঁর রোগমুক্তির। তিনি শুনেছেন হিন্দুস্তানের সন্ন্যাসীদের অলৌকিক ক্ষমতার কথা।

এগিয়ে এলেন পূর্ণ পুরী, সন্ন্যাসীদের দলপতি। জানালেন, “না সুলতান। আপনার এ ব্যাধির কোনও চিকিৎসা আমাদের কারও জানা নেই। আপনি মনে করে দেখুন, কোনও গুরুতর পাপকাজ আপনি কখনও করেছেন কি না। এ ব্যাধি স্বয়ং ঈশ্বর প্রদত্ত সুলতান। আমাদের কারও সাধ্য নেই তা থেকে মুক্ত করবার।”

আহমদ শাহ আবদালি মাথা নিচু করে খানিক হতাশ বসে রইলেন। তারপর উজির শাহবলী খাঁকে আদেশ দিলেন, “এঁদের সকলকে হেরাতগামী হাতির পিঠে বসিয়ে দাও। আর প্রত্যেক মাহুতকে লিখিত আদেশ ধরিয়ে দাও যে এঁরা যাত্রাপথে যেখানেই নামবেন, বিশ্রাম আহারাদি করবেন, কোনও অসুবিধে যাতে না হয়।”

***

১৭৬৭ সাল। আহমদ শাহ আবদালি শেষবারের মতো ভারত থেকে খাইবার গিরিপথে ফিরে যাচ্ছেন নিজ দেশে। দুর্ধর্ষ এক শিখের দল কখন গোপনে তাঁর পিছু নিয়েছে টের পাননি। শিখেরা বিনা বাধায় পাঞ্জাবের গুরুত্বপূর্ণ দুর্গাদি, রোহতাস ও উত্তর রাওয়ালপিন্ডির সমগ্র ভূখণ্ড নিজেদের অধিকারে নিয়ে এল।

***

১৭৭২ সালে আহমদ শাহের শারীরিক অবস্থার অত্যন্ত অবনতি ঘটল। শরীরে বাসা বেঁধেছে মারণ কর্কট ব্যাধি। মনপ্রাণ অত্যন্ত অবসাদগ্রস্ত। রাজপাট ত্যাগ করে তাঁর প্রিয় পার্বত্য অঞ্চল মুর্ঘাতে জীবনের শেষ আশ্রয় গ্রহণ করলেন সর্বশ্রেষ্ঠ এই আফগান সর্দার। সেখানেই শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

।। তিন ।।

তৈমুর শাহ। আহমদ শাহ আবদালির উত্তরসূরি। বেঁটেখাটো মানুষটির জন্ম পারস্যে। পশতু জানেন না, ফার্সিতে কথা বলতে পছন্দ করেন। বাঁহাতে কোহিনূর আর ডানহাতে পরে থাকেন পোখরাজ। ফার্সি সুফি, বিদ্বান ও কবিদের দ্বারা ঘিরে থাকলেও তৈমুর শাহের তলোয়ারও কম রক্ত পিপাসু ছিল না। পিতার আমলে সিন্ধু অঞ্চলের বৃহদাংশ শিখদের অধীনে যাওয়ার পর অবশিষ্ট আফগান রাজ্য রক্ষা করতে ঝলসে উঠল তাঁর তলোয়ার।

১৭৭৮-৭৯ সালে বিদ্রোহী মুলতান পুনরায় নিজের কবজায় নিয়ে আসেন তৈমুর। রাজধানী ফেরার পথে অসংখ্য শিখ মুণ্ডু দেশবাসীর জন্যে উপহার স্বরূপ সঙ্গে আনেন তিনি।

পেশোয়ারে নিজের শীতকালীন রাজধানী স্থানান্তর করলেন তৈমুর শাহ। সেখানেই এক প্রাণঘাতী ষড়যন্ত্রের হাত থেকে অল্পের জন্যে রক্ষা পান তিনি। এতে আতঙ্কিত হয়ে শুরু করেন শত্রু নিধন যজ্ঞ। মনে সামান্য সন্দেহের উদ্রেক হলেই কাউকে মুণ্ডু চ্যুত করতে হাত কাঁপত না তাঁর।

শেষে বসন্তের এক দিনে পেশোয়ার থেকে কাবুল যাত্রার পথে আচমকা মৃত্যু হয় তৈমুর শাহের। ঘনিষ্ঠের হাতে সুরার পেয়ালায় বিষপান করতে হয় তাঁকে।

***

তৈমুর শাহ ছত্রিশ জন সন্তানের জনক ছিলেন। এঁদের মধ্যে চব্বিশ জন পুত্রসন্তান। তৈমুর শাহ নিজের উত্তরাধিকারী ঘোষণা করে যেতে পারেননি। ফলে তাঁর পুত্রদের মধ্যে শুরু হল এক মরণপণ প্রতিযোগিতা, কে বসবে সিংহাসনে। তাতে কেউ বন্দী হল, কেউ বা গুরুতর আহত। বেশ ক’জনের প্রাণও কেড়ে নেওয়া হল।

শেষপর্যন্ত জয়ী হলেন তৈমুর শাহের পঞ্চম পুত্র জমান। কিন্তু অন্দরমহলে তখন চূড়ান্ত ষড়যন্ত্র ও বাইরে দোর্দণ্ডপ্রতাপ শিখ রাজা রণজিৎ সিং। তাঁর দাপটে ভারত আক্রমণের সাধ শাহ জমানের স্বপ্নেই বিচরণ করছে। ভারত তখন ধীরে ধীরে ব্রিটিশ আগ্রাসনের শিকার হতে চলেছে।

এমনি সময়ে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ক’জন পাত্রমিত্র আফগানিস্তান সুলতানকে এক শিকারের আয়োজনে রাজি করিয়ে ফেলল। অত্যন্ত শীত পড়েছে সেবারে। শিকার খেলা হবে জম্পেশ। শাহ জমান রাজদুর্গ থেকে রওনা হলেন শিকার শিবিরের উদ্দেশ্যে।

পৌঁছে একপ্রস্থ খানাপিনার পর যে যার মতো বেরিয়ে পড়ল শিকারে। একসময় সূর্য পশ্চিমের পাহাড়ের আড়ালে মুখ লুকোলে অন্ধকার নেমে এল পাহাড়ের গা বেয়ে। শাহ জমান কিঞ্চিৎ অস্থির হয়ে উঠলেন। অনেকটা দূর এসে লক্ষ করলেন উপস্থিত তিনি এবং তাঁর একমাত্র অঙ্গ রক্ষকই রয়েছেন পাহাড়ি এক ঝরনার কিনারায়, পাত্রমিত্ররা সব বেপাত্তা।

আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করবার পর রাজদুর্গে ফিরে যাবেন মনস্থ করেছেন, এমন সময় পাহাড়ের একদিক ফুঁড়ে একদল মশাল হাতে কারা যেন তেড়ে আসতে লাগল তাঁকে লক্ষ্য করে। প্রত্যেকের হাতে খোলা তলোয়ার। সুলতানেরই প্রজা নিশ্চয়ই তারা, তবে চোখেমুখে আনুগত্যের লেশমাত্রও দৃষ্টিগোচর হল না। মশালের ধিকিধিকি আলোয় ভাঁটার মতো জ্বলছে তাদের চোখ। সুলতানের অঙ্গ রক্ষক চঞ্চল হয়ে উঠল। চকিতে রাজদুর্গের অন্দরমহলের বর্তমান পরিস্থিতি চোখে ভেসে উঠল শাহ জমানেরও। প্রমাদ গোনলেন তিনি। অঙ্গ রক্ষকের আকুল আর্তিতে আর এক মুহূর্তও কালক্ষেপ না করে পালিয়ে চললেন রাজদুর্গের পথে।

শাহ জমানের সাম্রাজ্যের সীমান্ত চতুর্দিকে অনেকটাই সংকুচিত হয়ে এসেছে ততদিনে। ভাইয়েরা যারা রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে মুখ্য শাসকের পদে ছিল তারা সকলে কাবুলের সিংহাসনের প্রতি লালায়িত হয়ে উঠেছে। একে একে যে যার ক্ষমতা অনুযায়ী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে আফগান বাদশাহের বিরুদ্ধে। শাহ জমানের হাতে তখন ছোটো এক দল সেনা ব্যতীত আর বিশেষ কিছু নেই।

অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে অনেক কষ্টে শাহ জমান যখন কাবুল রাজদুর্গের প্রধান দ্বারে পৌঁছলেন তখন রাত নেমে গেছে। দুর্গের প্রধান দ্বার রুদ্ধ। কোনও প্রহরা নেই বাইরে। অনেক হাঁকডাক করেও কোথাও কোনও সাড়া পেল না তাঁর অঙ্গ রক্ষক। শাহ জমান তখনও ভাবতেই পারেননি যে আফগানিস্তান রাজদুর্গের দ্বার চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে তাঁর জন্যে। এ সিংহাসন তাঁকে আর কামনা করে না।

রাতের প্রথম প্রহর অতিক্রান্ত হয়েছে। তুষার ঝরে পড়ছে অবিরাম। এই অবস্থায় বাইরে থাকা আর নির্ঘাত মৃত্যুর হাতে নিজেকে সঁপে দেওয়া একই কথা। উপরন্তু পেছনে ধেয়ে আসছে সাক্ষাৎ মৃত্যুদূতেরা। শাহ জমান আর অপেক্ষা করলেন না। দৌড়ে মিলিয়ে গেলেন অন্ধকারে।

মধ্যরাত্রে জলালাবাদ ও খাইবারের মাঝামাঝি এক দুর্গে আশ্রয় পেলেন শাহ জমান আর তাঁর অঙ্গ রক্ষক। দুর্গখানা আশিক নামে এক শিনবারি গোষ্ঠীর সর্দারের। দুর্গে বাদশাহের আদর-আপ্যায়নের কোনোরকম ত্রুটি রাখল না সে। শয্যায় শুয়ে শাহ জমানের নিশ্চিন্ত চোখ বুজে আসতেই আশিক দুশো শিনবারিকে সংকেত পাঠিয়ে ডেকে এনে দুর্গের চতুর্দিকের সব প্রবেশ পথ বন্ধ করে দিল যাতে ভেতর থেকে একটা কাকপক্ষীও বাইরে বেরিয়ে আসতে না পারে। বন্দুকধারী রক্ষীরা ততক্ষণে ঘিরে ফেলেছে দুর্গ।

অনতিবিলম্বে আশিকের পুত্র ঘোড়ার পিঠে রাজদুর্গে ছুটে গেল শাহজাদা মহমুদের কাছে শাহ জমানের বন্দী হওয়ার সংবাদ নিয়ে। সুলতানের ভাই মহমুদ ততক্ষণে কাবুল অধিকার করে বসেছেন।

শাহ জমান ঘুম ভেঙে অনেক ডাকাডাকি করলেন আশিককে। কোনও উত্তর এল না। অঙ্গ রক্ষক তখন উন্মাদের মতো আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছে কক্ষের একেকটা দরজা ভাঙার। শাহ জমানও হাত লাগালেন সঙ্গে। সফল হলেন না।

ওদিকে উল্লসিত শাহজাদা মহমুদ তৎক্ষণাৎ আশিকের পুত্রের হাতে প্রভূত ইনাম পাঠিয়ে দিলেন।

রাত তৃতীয় প্রহর। আচমকা দরজা খুলে শাহ জমানের কক্ষে উপস্থিত হল আশিক। পেছনে একদল খুনে সর্দার। কক্ষে প্রবেশ করেই আশিক হুকুম দিল, “ওই রক্ষী ব্যাটাকে যমের বাড়ি পাঠিয়ে দাও আগে। জলদি করো, সময় বড়ো কম।”

খুনেরা বাদশাহের অসহায় অঙ্গরক্ষককে টেনে হিঁচড়ে বের করে নিয়ে গেল।

পরদিন। রাত গভীর হয়নি তখনও। আশিক নজরবন্দী শাহ জমানের সামনে এসে জানাল, “আপনাকে আমার সঙ্গে একবার যেতে হবে বাদশাহ।”

শাহ জমান একবার আশিকের মুখের দিকে তাকালেন শুধু, কোনও প্রশ্ন করলেন না। আশিক তাঁকে নিয়ে হাজির হল এক গুপ্ত কুঠুরিতে। কুঠুরিতে পা রেখেই চমকে উঠলেন শাহ জমান। সামনে বসে রয়েছেন মূর্তিমান শাহ মহমুদ। মহমুদ সরাসরি প্রশ্ন করলেন, “কোহিনূর কোথায়?”

“সে আর তুমি পাবে না।” কণ্ঠস্বর সামান্য কেঁপে গেলেও বিচলিত হলেন না শাহ জমান। “এ দুর্গে ঢোকার আগেই নদীতে ছুড়ে ফেলে দিয়েছি সব।”

মুহূর্তে গনগনে হয়ে উঠল শাহ মহমুদের চোখমুখ। শুরু করলেন একের পর এক প্রশ্ন। কিন্তু শাহ জমান বিন্দুমাত্রও টললেন না। তাঁর মুখে একই উত্তর, “সেসব এখন নদীর গর্ভে।”

ক্রুদ্ধ শাহ মহমুদের ইঙ্গিতে দু’দিক থেকে গনগনে লোহার শিক হাতে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল দুই যমদূত। শাহ জমানের চোখদুটো উপড়ে নিল তারা। আফগানিস্তানের বাদশাহের স্থান হল আশিকের গুপ্ত কুঠুরিতে।

আশিক এইবারে দেহ তল্লাশি শুরু করল শাহ জমানের। কিন্তু অনেক সন্ধান করেও কাঙ্ক্ষিত বস্তুটি হাসিল করতে সক্ষম হল না সে।

শাহ জমান বন্দী হয়েছেন বুঝতে পেরে তাঁর পরিধেয় সকল মণিমাণিক্য সেই কক্ষেই লুকিয়ে ফেলতে সক্ষম হয়েছিলেন প্রথম রাতেই। কক্ষের দরজায় খঞ্জর চালিয়ে গর্ত করে লুকিয়ে ফেলেছিলেন সেগুলো। পোখরাজখানা আশিকের দুর্গে প্রবেশের আগেই পাশের একটা ঝোরার তীরে মস্ত এক পাথরখণ্ডের নীচে চাপা দিয়ে এসেছিলেন। আর কোহিনূরখানা হাত ফসকে বন্দী কক্ষের কোন দেওয়ালের ফাটলে গিয়ে আটকে গেছে তা টের পেলেন না আর।

।। চার ।।

আরেক শাহজাদা শাহ সুজা তখন মাত্র চৌদ্দ বছরের যখন শাহ জমানকে বন্দী করে অন্ধ করে দেওয়া হল। সেদিন শিকার যাত্রায় সেও সঙ্গ নিয়েছিল বাদশাহের। বাদশাহের প্রিয়তম ভাই সে। শিকারে নেমেই কৌশলে কিশোর শাহ সুজাকে বাদশাহের কাছ থেকে সহজেই পৃথক করে ফেলেছিল ষড়যন্ত্রকারীর দল। শাহ সুজা একসময় নিজের ওপর আক্রমণের আভাস পেতেই পালিয়ে গেল কোন গিরিপথে। তারপর থেকে এ যাবত সে তুষারাবৃত পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে আত্মগোপন করে ফিরছে। খাদ্যের সন্ধানে ছদ্মবেশে গাঁয়ে নেমে আসত কখনও সখনও।

তিন বছর পর অনেক কষ্টে গাঁয়ে গাঁয়ে ঘুরে গোপনে এক সৈন্যবাহিনী গড়ে ১৮০৩ সালে কাবুলের সিংহাসন অধিকার করতে সক্ষম হলেন শাহ সুজা।

সিংহাসনে আরোহণ করে প্রিয়তম জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ভূতপূর্ব বাদশাহ শাহ জমানের বিরুদ্ধে সকল ষড়যন্ত্রকারীকে ক্ষমা করে দিলেন তিনি। একজন ব্যতীত, সে আশিক শিনবারি। শাহ সুজার সেনা গিয়ে আশিকের দুর্গ মাটিতে মিশিয়ে দিল। আশিক তার দলবল সহ বন্দী হল। কাবুলে এনে আশিকের মুখে বারুদ ঠেসে উড়িয়ে দেওয়া হল তাকে। সঙ্গীদের ওপর শুরু হল অকথ্য অত্যাচার। বাদশাহের হুকুম মেনে আশিকের দুর্গের সকল সম্পত্তি এনে হাজির করা হল কাবুল রাজদরবারে। কিন্তু তাতে দুরানি বংশের অমূল্য দুই রত্নের সন্ধান পাওয়া গেল না। শাহ সুজা হন্যে হয়ে সন্ধান চালিয়ে যেতে লাগলেন এদের। কোহিনূর তখন দুরানি বংশের গৌরব।

অতি বিশ্বস্ত দু’জন অনুসন্ধানকারী নিয়োগ করলেন বাদশাহ। আদেশ দেওয়া হল, যে উপায়েই হোক, ও-দুটি রত্ন বাদশাহের চাই।

***

সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হয়েছে। মাটিতে মিশে যাওয়া আশিক শিনবারির দুর্গের আশেপাশে দিনভর চিরুনি তল্লাশি চালিয়েছে দুই অনুসন্ধানকারী। কিন্তু এক হতাশা ছাড়া আর কিছু হাতে এল না। অনেকটা দূরে আলোর এক ক্ষীণ রেখা চোখে এসে পড়ল তাদের। দু’জনেই অত্যন্ত তৃষ্ণার্ত। একটু জলের আশায় তারা পা বাড়াল সে আলো লক্ষ্য করে।

প্রায় ধ্বসে পড়া একটা মাজার। তাতে কষ্টেসৃষ্টে মাথা গোঁজা চলে এমন এক কক্ষের মেঝেতে বসে আছেন এক মৌলবি সাহেব। চিরাগের আলোয় একমনে নতুন কাগজে নকল করে চলেছেন পুরনো কোন পুথি। দুই আগন্তুক এসে উপস্থিত হতেই চোখ তুলে জানতে চাইলেন, “কী চাই বাবারা?”

উত্তর এল, “আমরা পথিক, মৌলবি সাহেব। একটু জল চাই।”

মৌলবি নিজের মাদুরে তাদের বসতে দিয়ে উঠে গেলেন জল আনতে। ফিরে এসে দেখেন অত্যন্ত উত্তেজিত কণ্ঠে নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলে চলেছে দুই আগন্তুক। একজন আশ্চর্য হয়ে জানতে চাইল, “এ আপনি কোত্থেকে পেলেন মৌলবি সাহেব, এ তো…”

হাসলেন মৌলবি। জানালেন, “এ আমার কাজের সঙ্গী বলতে পারো। ভাঙাচোরা ঘরে থাকি, চারদিক থেকে হু হু করে হাওয়া ঢুকে কাগজপত্র সব এলোমেলো করে দেয়। তখন এ দিয়ে চাপা দিয়ে রাখি ওগুলো।”

দ্বিতীয় অনুসন্ধানকারী বিস্ফারিত চোখে প্রশ্ন করল, “কী বলছেন আপনি! কী এটা আপনি জানেন না?”

মৌলবি শান্ত কণ্ঠে উত্তর দেন, “কী আবার, ওই নকশাকাটা একটুকরো কাচ বৈ তো নয়। কেন? তোমরা এমন করছ কেন এটা হাতে নিয়ে? কী এ?”

শাহ সুজার দুই অনুসন্ধানকারী এক মুহূর্তও দাঁড়াল না আর। মৌলবি সাহেবের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো সময় বা সাহস তাদের ছিল না। কটি বন্ধনীতে কোহিনূর গুঁজে সোজা ঘোড়া ছুটিয়ে দিল কাবুলের পথে।

।। পাঁচ ।।

পেশোয়ার স্থিত শাহ সুজার রাজমহল সেজে উঠেছে উৎসবের সাজে। উপলক্ষ, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একদল আধিকারিকের সাদর-অভ্যর্থনা। কোম্পানির দূত তথা স্কটিশ বিদ্বান মাউন্টস্টুয়ার্ট এলফিনস্টোনের নেতৃত্বে দলটা এসে পৌঁছল শাহ সুজার মহলে। রাজোচিত আপ্যায়নে কোনোরকম ঘাটতি রাখলেন না সুলতান। দুই বাহুবন্ধে দুই মাণিক্য বাঁধা―পোখরাজ ও কোহিনূর। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দলটা তখন ঘুণাক্ষরেও অনুমান করতে পারেনি যে আফগানিস্তানের দুরানি বংশের শেষ বাদশাহের সাক্ষাতে উপস্থিত হয়েছেন তাঁরা। প্রথমবারের মতো ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তার কোনও প্রতিনিধির চোখে কোহিনূরের জৌলুস চাষ করল।

ইংরেজ দলটা পেশোয়ার থেকে প্রত্যাবর্তনের কিছু সময়ের মধ্যেই শাহ সুজা এক খণ্ডযুদ্ধে পরাজিত হলেন। শাহ মহমুদ গোপনে শক্তি সংগ্রহে ব্যস্ত ছিলেন এতদিন। এবারে সরাসরি শাহ সুজাকে আক্রমণ করে রাজ্যপাট দখল করে বসলেন। শাহ সুজা সুযোগ পেয়ে পালিয়ে গেলেন।

পলাতক সুলতানকে প্রতিনিয়ত শত্রুর শ্যেনদৃষ্টি থেকে বাঁচিয়ে রাখতে হচ্ছে নিজেকে। তাঁর প্রাণের মূল্য এখন দ্বিগুণ। এক তো শাহ মহমুদের প্রতিদ্বন্দ্বী, দ্বিতীয়ত কোহিনূর তাঁর সঙ্গে।

***

ওদিকে পাঞ্জাবে তখন রণজিৎ সিংয়ের উত্থানকাল। পাঞ্জাবরাজ মণিমুক্তোর দারুণ শৌখিন মানুষ। কোহিনূরের সংবাদ তাঁর কর্ণগোচর হওয়া অবধি সে-রত্নের প্রেমে পড়ে গেছেন তিনি। ছলে বলে কৌশলে, যে উপায়েই হোক, কোহিনূর তাঁর চাই।

শাহ সুজার সমব্যথী হয়ে রণজিৎ সিং সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন তাঁকে। আমন্ত্রণ জানালেন নিজের রাজপ্রাসাদে। শাহ সুজা কিন্তু এলেন না। রণজিৎ সিংও হাল ছাড়লেন না। দিনের পর দিন মিত্রতার বার্তা পাঠানো জারি রাখলেন শাহ সুজার কাছে। আশ্বাস দিলেন, শাহ সুজা আর তাঁর পরিবারপরিজনের রক্ষার ভার তিনি নিতে ইচ্ছুক, পাঞ্জাব রাজপ্রাসাদের দ্বার অহর্নিশ উন্মুক্ত রইল শাহ সুজার জন্যে।

শেষে ১৮১০ সালে শাহ সুজা গোপনে সাক্ষাৎ করতে এলেন রণজিৎ সিংয়ের সঙ্গে। মহারাজা প্রভূত ধনসম্পত্তি শাহ সুজাকে উপহার স্বরূপ দান করলেন। শাহ সুজাও নিজের বেশ কিছু অমূল্য রত্ন মহারাজাকে ভেট করলেন। কিন্তু কোহিনূরের উচ্চারণটুকুও করলেন না, রণজিৎ সিংয়ের প্রস্তাবে সম্মতও হলেন না। পাঞ্জাবরাজকে শাহ সুজা কখনোই বিশ্বাস করতেন না। তিনি নিজ পত্নী বাফা বেগমের হাতে গোপনে কোহিনূর সঁপে দিয়ে মহারাজার আশ্রয়ে রেখে ফিরে গেলেন নিজের রাজ্য উদ্ধারের আয়োজন করতে।

দীর্ঘ কয়েকমাস মিত্র রাজাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও শাহ সুজা এক তিল সাহায্যও হাসিল করতে পারলেন না কোথাও। ক্লান্ত অবসন্ন শাহ সুজা বিশ্বস্ত এক সভাসদের আমন্ত্রণে অটোক স্থিত খ্যাতনামা এক দুর্গে আশ্রয় নিলেন শেষে।

আনন্দিত ও কৃতজ্ঞ সভাসদ এক মহা ভোজের আয়োজন করলেন শাহ সুজার আগমন উপলক্ষে। সুরায় সুরায় ছলকে উঠল পেয়ালা। গানবাজনায় মুখরিত চতুর্দিক। পাত্রভর্তি সুমিষ্ট তরমুজ পরিবেশন করা হয়েছে হাতে হাতে। দেখতে দেখতে জমে উঠল মহফিল।

এরই মধ্যে নেশার ঘোরে একদল লোক রসিকতার ছলে নিজেদের মধ্যে তরমুজের খোসা ছুড়াছুড়ি শুরু করতেই লেগে গেল ধুন্ধুমার। আর এই নাটকের শেষ দৃশ্যে ক্ষণকালের মধ্যেই শাহ সুজা বন্দী হলেন সেই সভাসদের হাতে।

কঠিন প্রহরার মধ্যে শাহ সুজাকে তড়িঘড়ি কাশ্মীরে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হল। সেখানেই বন্দী করে রাখা হল তাঁকে। জেরার পর জেরা চলল, লোহা গরম করে চোখ উপড়ে নেওয়ার ভয় দেখানো হল, শেষে সিন্ধু নিয়ে গিয়ে সেখানে জ্যান্ত কবর দেওয়ারও হুমকি দেওয়া হল। কিন্তু শাহ সুজার মুখ থেকে কোহিনূরের কোনও হদিশ পাওয়া গেল না।

শাহ সুজাকে শেষপর্যন্ত অতা মহম্মদের হাতে তুলে দেওয়া হল। অতা মহম্মদ তখন কাশ্মীরের সুবেদার। কাশ্মীর তখনও আফগানদের হাতে। কুহ-এ-মারান নামের এক পর্বতের শিখরে দাঁড়িয়ে থাকা এক দুর্গে বন্দী হলেন শাহ সুজা। এ দুর্গ শেরগড় নামে সুপরিচিত।

।। ছয় ।।

শাহ সুজার বেগম ও পরিবারকে তখন লাহোরের এক মহলে নজরবন্দী করে রেখেছেন রণজিৎ সিং। চাপের পর চাপ আসছে রণজিৎ সিংয়ের পক্ষ থেকে কোহিনূরের হদিশ দিতে। কিন্তু বাফা বেগম যেন ইস্পাতের তৈরি। কিছুতেই মুখ খুললেন না তিনি। অস্থির হয়ে উঠলেন রণজিৎ সিং। বাফা বেগমকে তলব করলেন রাজসভায়। কঠোর কণ্ঠে জানালেন, “বাফা বেগম, এক কোহিনূরই রক্ষা করতে পারে আপনাদের। সেটা হাতে থাকলে আমায় দিন, অথবা এর সন্ধান দিন। নয়তো…”

বাফা বেগম প্রশ্ন করলেন, “নয়তো? কী?”

“নয়তো… অ্যাই কে আছিস, বাফা বেগমের সবক’টা কন্যাকে আমার অন্দরমহলে টেনে আন এক্ষুনি।”

হিংস্র বাঘিনীর মতো গর্জে উঠলেন এবারে বাফা বেগম। চিৎকার করে বললেন, “শুনে রাখুন মহারাজ, তার আগে কোহিনূর শিলে পিষে আমার মেয়েদের গুলে খাইয়ে দেব আমি। তারপর নিজেও আত্মঘাতী হব। আর আমাদের শাহী পরিবারের হত্যার দায় হবে আপনার।”

মহারাজা রণজিৎ সিং সে যাত্রায় পিছিয়ে এলেন বটে, তবে শাহ সুজার পরিবারের ওপর অত্যাচারের মাত্রা হ্রাস করলেন না, বরং দ্বিগুণ করে দিলেন। শেষে নিজের আব্রু রক্ষার্থে বাফা বেগম বার্তা পাঠালেন, তিনি কোহিনূর মহারাজার হাতে সঁপে দেবেন একটাই শর্তে, মহারাজ শাহ সুজাকে উদ্ধার করে এনে অক্ষত দেহে তুলে দেবেন বাফা বেগমের হাতে। রণজিৎ সিংয়ের ঠোঁটে হাস্যরেখা ফুটে উঠল, সম্মত হলেন তিনি।

১৮১৩ সাল। গ্রীষ্মকাল। গুপ্তচর সংবাদ আনল শাহ সুজা বন্দী রয়েছেন কাশ্মীরে। সেনাপতি মোহকমচন্দের নেতৃত্বে দুর্ধর্ষ এক শিখ সেনার দল রাতারাতি রওনা হয়ে গেল কাশ্মীরের শেরগড়ের উদ্দেশ্যে। সুবেদার অতা মহম্মদকে পরাজিত করে শাহ সুজাকে সঙ্গে করে রাজ্যে ফিরে এলেন শিখ সেনাপতি। অতা মহম্মদ সুযোগ বুঝে পালিয়ে গেল। শাহ সুজা রণজিৎ সিংয়ের নিকট অশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেও কোহিনূর হাতছাড়া করতে সম্মত হলেন না। ক্রুদ্ধ রণজিৎ সিং শাহ সুজাকে পরিবার থেকে দূরে অন্য মহলে বন্দী করলেন।

***

গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহে লাহোর ঝলসে যাচ্ছে। খোলা আকাশের নীচে দু’দণ্ড দাঁড়াবার উপায় নেই। এমনই এক দিনে লোহার খাঁচায় বন্দী করে এনে প্রখর সূর্যতাপে ফেলে রাখা হল শাহ সুজাকে। তারপর হুকুম হল, “শাহজাদাকে নিয়ে এসো।”

অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল শাহ সুজার। কে শাহজাদা? কোন শাহজাদা? হায় পরবর দিগার, সে ছেলে তিমুর নয় তো! তাকে এনে কী কাজ?

শাহ সুজার সন্দেহ অমূলক নয়। খানিক বাদেই সুজার অন্যতম প্রিয় পুত্র মহম্মদ তিমুরকে নিয়ে হাজির হল এক রক্ষী। অত্যন্ত যত্নে প্রতিপালিত সুকুমারকান্তি জ্যেষ্ঠ শাহজাদা সে। শাহ সুজার নয়নের মণি। অগ্নি-তপ্ত এক দীর্ঘ সিঁড়ি বেয়ে উঠতে তাড়া দেওয়া হল শিশু তিমুরকে। তিমুর কচি নগ্ন পায়ে সে সিঁড়ি বেয়ে উঠছে আর সঙ্গে সঙ্গে পায়ের তলায় ফোস্কা পড়ে মরণপণ আর্তনাদ করে চলেছে। শিউরে উঠলেন শাহ সুজা। সইতে না পেরে কাঁপতে কাঁপতে বসে পড়লেন খাঁচার ভেতর। চোখে অন্ধকার দেখছেন তিনি। চিৎকার করে জানালেন, “বন্ধ করো, বন্ধ করো এ অত্যাচার! মহারাজকে বার্তা পাঠাও রক্ষী, আমি কোহিনূর তাঁর হাতে তুলে দিতে রাজি। তবে দুয়েকটা শর্ত পূর্ণ হলেই তবে তা সম্ভব।”

পরদিন লাহোরের মন্ত্রী-প্রধান ধ্যান সিং এলেন শাহ সুজার কাছে। সরাসরি প্রশ্ন রাখলেন, “কোহিনূর কোথায় বাদশাহ? মহারাজ জানতে চাইছেন।”

শাহ সুজা উত্তর দিলেন, “সে আমার হাতে নেই উপস্থিত। তবে আমার শর্ত পূর্ণ হলে কোহিনূর আমি নিজেই সঁপে দেব মহারাজার হাতে।”

“কী শর্ত?”

“শর্ত তিনটে। এক, পাঞ্জাবের মহারাজাকে নিখাদ মিত্রতার বন্ধনে আবদ্ধ হতে হবে। দুই, কয়েক লক্ষ টাকা আমার রাজকোষে জমা করবেন। টাকার পরিমাণ আমি পরে জানাব। তিন, আমার হৃত রাজ্য পুনরুদ্ধারে তিনি যথাসময়ে উপযুক্ত সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবার প্রতিশ্রুতি বদ্ধ হবেন।”

শর্তের ফিরিস্তি নিয়ে ফিরে গেলেন শিখ মন্ত্রী-প্রধান।

দুয়েকদিনের মধ্যেই পুনরায় ফিরে এলেন ধ্যান সিং। এবারে সঙ্গে আরও ক’জন বিশিষ্ট সভাসদ। জানালেন, “মহারাজ আপনার শর্তে সম্মত আছেন বাদশাহ। অর্থের পরিমাণ জানান।”

শাহ সুজা জানালেন, “সে পরিমাণ আমি মহারাজের সঙ্গে মিত্রতার বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পরই জানাব মন্ত্রী-প্রধান। আপনি তাঁকে সে বার্তাই পেশ করুন।”

পরদিন মহারাজা রণজিৎ সিং এলেন শাহ সুজার মহলে। কণ্ঠে মিত্রতার সুমিষ্ট ভাষ্য। পবিত্র গেরুয়া জলে হাত ডুবিয়ে ধর্মগ্রন্থ ও বাবা নানককে সাক্ষী রেখে নিজের তলোয়ার স্পর্শ করে শপথ করলেন, শাহ সুজার হৃত রাজ্য ফিরে পেতে ও বিদ্রোহীদের শাস্তি প্রদানে শিখ সেনা প্রয়োজন অনুসারে শাহ সুজার সেবায় উপস্থিত থাকবে।

উঠে দাঁড়ালেন দুই অধিপতি। মিত্রতার প্রতীক স্বরূপ পরস্পরের উষ্ণীষ আদানপ্রদান করলেন দু’জনে।

অধৈর্য রণজিৎ সিং প্রশ্ন করলেন, “এবারে কোহিনূরখানা পেতে পারি কি, আফগান বাদশাহ?”

।। সাত ।।

সতলজ নদীর অপর তীরে লুধিয়ানায় বসে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধি ডেভিড অক্টারলনি সম্পূর্ণ ঘটনাক্রমে তীক্ষ্ণ নজর রেখে চলেছিলেন। চর সংবাদ আনল, শাহ সুজা কোহিনূর পাঞ্জাবরাজের হাতে তুলে দিতে অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়ার পরপরই রণজিৎ সিং শাহ সুজাকে দুই মাসের মধ্যেই নগদ দুই লক্ষ টাকা পাঠিয়ে দিয়েছেন। সঙ্গে হাজার পঞ্চাশেক মূল্যের বিস্তীর্ণ এক জায়গীরও উপহার দিয়েছেন।

***

১লা জুন, ১৮১৩ সাল।

লাহোর দুর্গের মোবারক মহল আজ সেজে উঠেছে উৎসবের মেজাজে। শিখ মিত্র আসছেন পাঠান মিত্রের সাক্ষাতে। দুই পক্ষেই বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ অগুনতি। শাহ সুজা অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে স্বাগত জানালেন রণজিৎ সিংকে। সসম্ভ্রমে হাত ধরে এনে পাশে বসালেন নিজের। তারপরই সহসা এক নিস্তব্ধতা ছেয়ে গেল মহল জুড়ে। যে যার আসনে নিশ্চল বসে রয়েছেন সবাই, কেউ কোনও শব্দ উচ্চারণ করছেন না।

প্রায় ঘড়ি খানেক বাদে নিজের মৌনতা ভঙ্গ করলেন রণজিৎ সিং। বললেন, “আমার এখানে উপস্থিত হওয়ার কারণ বোধ করি পাঠান বাদশাহ বিস্মৃত হয়েছেন। তাঁকে আমার উদ্দেশ্য ব্যক্ত করুন মহামন্ত্রী।”

শাহ সুজা কোনও উত্তর করলেন না। দীর্ঘ এক শ্বাস ত্যাগ করে পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা এক খোজা রক্ষীকে চোখের ইঙ্গিতে কী আদেশ দিলেন। চিত্ত চঞ্চল হল রণজিৎ সিংয়ের। রক্ষী অবিলম্বেই গোলাকৃতি এক বটুয়া হাতে উপস্থিত হল ফের। সে রণজিৎ সিংয়ের সামনে এসে দাঁড়াতেই তিনি বটুয়া খোলার আদেশ দিলেন। বটুয়া খুলতেই চোখমুখ ঝলমল করে উঠল রণজিৎ সিংয়ের। কোহিনূর! শাহ সুজাকে ধন্যবাদ ও বিদায় জানিয়ে বটুয়া হাতে নিজ মহলের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন তিনি।

পঞ্চম অধ্যায়

।। এক ।।

“এ রত্ন একশো শতাংশ খাঁটি মহারাজ। মোগল সম্রাট বাবরের হিরেই এ, কোনও সন্দেহ নেই।”

“বেশ।” চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে রণজিৎ সিংয়ের। “আর মূল্য?”

লাহোরের তাবড় তাবড় জহুরিরা একবাক্যে বলে ওঠে, “অমূল্য মহারাজ, অমূল্য। কোনও অর্থের পরিমাণ দ্বারা এর মূল্যায়ন করা চলে না।”

কোহিনূর হাতে রাজমহলে পৌঁছেই দরবার বসার আদেশ দিয়েছিলেন মহারাজা রণজিৎ সিং। মন্ত্রী-সান্ত্রী একে একে তা চাক্ষুষ করে মহারাজাকে অভিনন্দনের বানে ভাসিয়ে নিয়ে চলেছেন। কিন্তু রণজিৎ সিংয়ের সন্দেহের নিরসন হচ্ছে না। শাহ সুজা কোনও বিশ্বাসঘাতকতা করেননি তো তাঁর সঙ্গে? দেখতে একই নকল কোনও হিরে হয় যদি? তলব পাঠালেন লাহোরের খ্যাতনামা সব জহুরিদের। জহুরিরা দুই দিন ধরে পরীক্ষানিরীক্ষা করে জানাল, এ হিরে নকল নয়, আসল কোহিনূরই।

রণজিৎ সিং নিশ্চিন্ত ও সন্তুষ্ট হয়ে তৎক্ষণাৎ শাহ সুজাকে আরও সওয়া লক্ষ টাকা উপহার স্বরূপ পাঠিয়ে দিলেন। তারপর কোহিনূর সঙ্গে করে অমৃতসর রওনা হলেন। পরীক্ষারও একটা পরীক্ষা প্রয়োজন।

অমৃতসরের জহুরিরাও একই পরিণাম জানাল পরীক্ষানিরীক্ষার। এ খাঁটি কোহিনূরই। লাহোর এবং অমৃতসর উভয় স্থানেই জহুরিদের সবরকম পরীক্ষানিরীক্ষা মহারাজের উপস্থিতিতেই করতে হয়েছে। রণজিৎ সিং কোহিনূর চোখের আড়াল করতে সম্মত নন।

অমৃতসরে কোহিনূরের যাচাই সম্পন্ন হতেই রণজিৎ সিং আদেশ দিলেন, “মন্ত্রী-প্রধান, কোহিনূর আমার পাগড়িতে গাঁথবার ব্যবস্থা করুন। আর রাজপথে হাতির পিঠে আমার শোভাযাত্রার আয়োজন করুন।”

দীপাবলি, দশেরা ও বিভিন্ন উৎসবে কোহিনূর রণজিৎ সিংয়ের বাজুবন্ধের শোভাবর্ধন করত। অন্য সময় কোহিনূর গোবিন্দগড়ের অভেদ্য দুর্গে কঠিন প্রহরায় রাজকোষে জমা থাকত।

রণজিৎ সিংয়ের কোহিনূরের সুরক্ষা নিয়ে দুশ্চিন্তার অন্ত ছিল না। অধিক মদ্যপানের পর বেহুঁশ অবস্থায় সে হিরে কেউ চুরি করে না নিয়ে যায় সে আশঙ্কায় সর্বদা কণ্টকিত হয়ে থাকতেন তিনি। তাই একস্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াতের সময় রণজিৎ সিং এক কৌশল অবলম্বন করতেন। চল্লিশখানা উট ঠিক একই সাজে সজ্জিত করা হত তখন। তাদের সবার পিঠে ঠিক একইরকম দেখতে চল্লিশখানা বাক্স। কেউ জানত না যে কোহিনূর ঠিক কোন বাক্সটায় যাচ্ছে। যদিও বেশিরভাগ সময় মহারাজার অঙ্গ রক্ষকদের ঠিক পেছনের বাক্সটায়, মানে প্রথম উটের পিঠেই থাকত কোহিনূর।

।। দুই ।।

“মহারাজের জয় হোক।”

“কী সংবাদ, রক্ষী-প্রধান?”

“ইংল্যান্ডের এক পরিব্রাজক আপনার সাক্ষাৎ প্রার্থনা করছেন মহারাজ।”

“বেশ। হাজির করো।”

রণজিৎ সিং একটু গুছিয়ে নিলেন নিজেকে। মাথার পাগড়িটা অল্প তুলে আবার যথাস্থানে বসিয়ে আঙুলের আলতো ছোঁয়ায় কোহিনূর পরখ করে নিলেন।

রক্ষী-প্রধানের সঙ্গে রাজসভায় উপস্থিত হলেন ছাব্বিশ বর্ষীয় এক ব্রিটিশ যুবক—অ্যালেকজান্ডার বার্নস তাঁর নাম। নিজের পরিচয় দিয়ে জানালেন, “ব্রিটিশরাজ উইলিয়াম চতুর্থ আপনার সেবায় উন্নত জাতের কিছু ঘোড়া উপহার স্বরূপ পাঠিয়েছেন মহারাজ।”

“তুমি ব্যাটা পরিব্রাজক, না ব্রিটিশের চর?” বিড়বিড় করলেন মহারাজা। তারপর উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে জানালেন, “সে তো উত্তম কথা। ইংল্যান্ডের রাজার প্রতি আমার অকুণ্ঠ ধন্যবাদ রইল। আপনার আগমনের উদ্দেশ্য?”

“উদ্দেশ্য বিশেষ কিছুই নয় মহারাজ। আমি ভারত ভ্রমণে বেরিয়েছি, চতুর্দিক ঘুরেফিরে দেখতে চাই।”

রণজিৎ সিং ফের বিড়বিড় করলেন, “বটে। তবেই আমার মাথার পাগড়ি থেকে তোমার চোখ সরছে না। তুমি ব্যাটা মচকাবে না তা বিলক্ষণ বুঝেছি। ভাঙতে হবে।” তারপরই সহাস্যে বললেন, “আমারও খুব ইচ্ছে হয় আপনাদের মতো পরিব্রাজকদের সঙ্গে আলাপ করি, নিজের কৌতূহল নিবৃত্ত করি। উপস্থিত আমার অতিথিশালায় বিশ্রাম গ্রহণ করুন। সন্ধ্যায় জলসা বসবে আপনার সম্মানে।”

বার্নসের আতিথেয়তায় কোনোরকম ত্রুটি রাখলেন না রণজিৎ সিং। বাইজি নাচ হল, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে গল্পগুজব হল, একসঙ্গে দু’জনে কাঢ়া পান হল। (কাঢ়া হচ্ছে দেশি মদ, মোতি চূর্ণ, কস্তূরী, ভাঙ ও আনুষঙ্গিক মশলার সংমিশ্রণে তৈরি একপ্রকার আসব। মহারাজার প্রিয় পানীয়।) বার্নস ক’দিন থেকে গেলেন শিখ রাজদুর্গে।

একদিন মন্ত্রী-প্রধান ধ্যান সিং এসে জানালেন, “পাঞ্জাব সীমান্তে সতলজের ও-পাড়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা থেকে হাজার চল্লিশেক সেনা এনে জড়ো করে রেখেছে মহারাজ।”

রণজিৎ সিং খানিকক্ষণ কী ভেবে নিয়ে আদেশ দিলেন, “দিবারাত্র সতর্ক দৃষ্টি রাখার ব্যবস্থা করুন। আর আগামীকাল ভোরে আমি হরিণ শিকারে যাব বার্নসকে নিয়ে। সে ব্যবস্থা করে রাখবেন।”

ধ্যান সিং সন্ত্রস্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, “ভাবগতিক কিছু টের পেলেন মহারাজ? লোকটা কী উদ্দেশ্যে এসে হাজির হয়েছে…”

“না। এখনও নয়। কাল শেষ চেষ্টা করে দেখব।”

না, শত চেষ্টা, শত কৌশল, শত বাকচাতুরীর ফাঁদ পেতেও অ্যালেকজান্ডার বার্নসের পেট থেকে একটা শব্দও বের করা যায়নি। শেষে ফিরে যাবার আগের রাতে খানাপিনার পর বার্নস সাগ্রহে জানালেন, “আপনার আতিথেয়তায় আমি মুগ্ধ মহারাজা। এ বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ চিরকাল স্মরণে থাকবে আমার। আগামীকাল ফিরে যাচ্ছি আমি। তার আগে একটা অনুরোধ ছিল।”

রণজিৎ সিংও সাগ্রহে জিজ্ঞেস করলেন, “হ্যাঁ হ্যাঁ, বলুন না কী চান।”

“পাঞ্জাবের গৌরব, পৃথিবীতে অদ্বিতীয় কোহিনূরকে একবার হাতে নিয়ে দুই চোখ ধন্য করতে চাই।”

মুচকি হাসলেন রণজিৎ সিং। তারপর বাজুবন্ধটা খুলে হাতে দিলেন বার্নসের। কোহিনূরের দ্যুতিতে ঝলমল করে উঠল বার্নসের মুখমণ্ডল।

কোহিনূর মহারাজের হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বার্নস এবারে আসল উদ্দেশ্যটা ব্যক্ত করলেন। জানালেন, “মহারাজ, আপনি হৃদয়বান রাজা, সে আমি দেশে থাকতেই অবগত হয়েছি। আর ধীরে ধীরে আপনার প্রতি আকর্ষিত হয়ে পড়েছি। কোহিনূর আপনার অত্যুজ্জ্বল এক গৌরব। আপনার এ গৌরব আমি সারা পৃথিবীর সামনে তুলে ধরতে চাই।”

“বেশ। আমায় কী করতে হবে তবে?” রণজিৎ সিং জানতে চাইলেন।

“ছোট্ট একটা প্রদর্শনী মহারাজ, আর কিছু নয়।”

সতলজের পাড়ে এক অখ্যাত গ্রাম রুপুর। সে গ্রামে অস্থায়ী ছাউনিতে বসে রয়েছেন একদল ব্রিটিশ হোমরাচোমরা। দলনেতা গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক। মহারাজা রণজিৎ সিংয়ের অনুমতিক্রমে পাঁচদিনের এক প্রদর্শনী সভার আয়োজন করে ফেলেছেন অ্যালেকজান্ডার বার্নস। যথাসময়ে কোহিনূর সঙ্গে করে উপস্থিত হলেন রণজিৎ সিং। ব্রিটিশদের একেকজনের চোখ ছানাবড়া হয়ে গিয়েছিল সে হিরে চাক্ষুষ করে। দিনটা ছিল ১৮৩১ সালের ২২ অক্টোবর।

কোহিনূরের প্রদর্শনী শেষ হলে বার্নস সোজা দিল্লির পথ ধরলেন।

।। তিন ।।

১৮৩৫ সালের ১৭ আগস্ট রাজসভা চলাকালীনই ভয়ানক অসুস্থ হয়ে পড়েন রণজিৎ সিং। আচমকা শক্তিশালী এক পক্ষাঘাতে শরীরের ডানদিকটা অসাড় হয়ে পড়ে তাঁর। রাতের দিকে চোখ মেললেও মুখ বেঁকে যাওয়ায় তখনই কথাবার্তা বলতে সক্ষম হলেন না তিনি। মহারাজের জ্ঞান ফিরেছে সংবাদ পেয়ে ছুটে এলেন হাকিম আজিজুদ্দিন। হাকিমের চিকিৎসায় ধীরে ধীরে অনেকটাই সুস্থ হয়ে ওঠেন রণজিৎ সিং।

এই পক্ষাঘাতের পর কোহিনূরের সুরক্ষা চিন্তায় আরও কাহিল হয়ে পড়লেন শিখরাজ।

দুই বছর একরকম নির্বিঘ্নেই কাটল। তারপর ফের একবার পক্ষাঘাতের শিকার হলেন রণজিৎ সিং। আবার শরীরের সেই দক্ষিণ ভাগেই। এবারে দীর্ঘ ছয়মাস অসাড় হয়ে পড়ে রইল তাঁর দেহের ডানদিক। বিড়বিড় করে যতটুকু কথাবার্তা বলতে সক্ষম হতেন, হাকিম আজিজুদ্দিন মহারাজের মুখে কান পেতে শুনে নিয়ে জানাতেন।

কিন্তু শিখ রাজদরবারে ইংরেজ প্রতিনিধিদের আনাগোনার কমতি নেই। কোহিনূর যেন অমোঘ এক আকর্ষণে টেনে আনছে এঁদের। কেউ বা আসছেন আফগানিস্তান গ্রাস করে রুশদের আক্রমণ ঠেকিয়ে রাখবার পরিকল্পনায় রণজিৎ সিংয়ের সাহায্য প্রার্থনায়। কখনও এসে হাজির হচ্ছেন ক্যাপ্টেন উইলিয়াম লয়েড অসবর্ন, কখনও লয়েড অকল্যান্ড, কখনও কোম্পানির গভর্নর জেনারেল, কখনও গভর্নরের চিকিৎসক ও তাঁর বোন এমিলি এডেন।

মহারাজা অবশ্য কাউকে নিরাশ করেননি। শারীরিক অক্ষমতার দরুন কখনও নিজে উপস্থিত হতে না পারলেও যথাযোগ্য সুরক্ষায় কোহিনূর পাঠিয়ে দিয়েছেন তাঁদের সামনে। মন্ত্রী-প্রধান ধ্যান সিংয়ের হাতে তখন ন্যস্ত ছিল কোহিনূরের প্রদর্শনীর সম্পূর্ণ ভার।

***

জুন মাস, ১৮৩৯ সাল। তৃতীয় ও শেষ পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হলেন রণজিৎ সিং। এইবারে তাঁর এ আঘাত সামলে ওঠা অসম্ভব মনে হল সকলের কাছেই।

রণজিৎ সিংয়ের অন্তরাত্মাও সেই মৃত্যুধ্বনি বিলক্ষণ উপলব্ধি করতে পারছে। পাঞ্জাবরাজ নিজের ধনরত্নের দানসত্র খুলে দিলেন তখন। পুণ্যধাম অমৃতসরের উদ্দেশ্যে শেষ তীর্থযাত্রায় প্রভূত দানখয়রাত করে এলেন। শিং যুগল সোনার পাতে মুড়ে লক্ষ লক্ষ গাই দান করলেন। রাশি রাশি স্বর্ণাঙ্গুরীয়, থান থান মখমলের বস্ত্রাদি, সোনার হাওদা জোড়া শত শত হাতি বিলিয়ে দিলেন। অনতিবিলম্বে জ্যেষ্ঠপুত্র খড়ক সিংকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্তও করে ফেললেন।

ধীরে ধীরে যতই মৃত্যুপথে এগিয়ে চলেছেন রণজিৎ সিং তাঁর দানধ্যানের মাত্রাও ততই বৃদ্ধি পেয়ে চলল। এর মধ্যে জুনের ২৬ তারিখে মরণাপন্ন হয়ে উঠলেন তিনি। প্রথমে বাকশক্তি হারালেন, অতিকষ্টে ইশারায় কিছু বোঝাতে সক্ষম তিনি কেবল। এমতাবস্থায় রণজিৎ সিংয়ের প্রাণপ্রিয় কোহিনূরের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্কের ঝড় উঠল রাজমহলে। যে যেমন পারছেন নিজের প্রস্তাব ও মতামত জানাচ্ছেন। তারপর আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তা সিদ্ধান্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে। এগিয়ে এলেন মহারাজের ব্রাহ্মণ ভাই গোবিন্দরাম। দাবি করলেন, “কোহিনূর নিয়ে কারও কোনোরকম দুশ্চিন্তার প্রয়োজন নেই। মহারাজ সে সম্পর্কে আমাকে আগেই নির্দেশ দিয়ে রেখেছেন।”

সমস্বরে প্রশ্ন ধেয়ে এল, “কীরকম?”

“মহারাজ জানিয়েছেন, কোহিনূর এ যাবত একজন রাজা অপর রাজাকে উপহার স্বরূপ দান করে এসেছেন। কেউ তা সঙ্গে করে স্বর্গারোহণ করবেন না। সুতরাং মহারাজও সে রত্ন দান করে যেতে চাইছেন। তাঁর ইচ্ছা কোহিনূর পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের শোভাবর্ধন করুক।”

মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল গোটা কক্ষ। কিন্তু রাজকোষের মুখ্য কোষাধিকারী মিশ্র বেলিরাম এ প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করলেন। বললেন, “এ মহারাজেরই আদেশ, নাকি আপনার ব্যক্তিগত ইচ্ছা? আর কোহিনূর কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। তাই কোহিনূর থাকবে পাঞ্জাবের যুবরাজ খড়ক সিংয়ের অধীনে, রাজ সম্পত্তি হিসেবে।”

তবে মহারাজা রণজিৎ সিং স্বয়ং ভাই গোবিন্দরামেরই পক্ষ নিলেন। ইশারায় জানালেন, কোহিনূর পুরীর জগন্নাথ মন্দিরেই দান করা হোক। যুবরাজ খড়ক সিংকে আদেশ দিলেন কোষাগার থেকে কোহিনূর এনে হাজির করতে। খড়ক সিং সঙ্গে সঙ্গে জানালেন, “কোহিনূর কোষাগারে নেই পিতামহারাজ। রয়েছে মিশ্র বেলিরামের কাছে।”

রক্ষী-প্রধান খুশহাল সিং রুক্ষ স্বরে তৎক্ষণাৎ কোহিনূর এনে হাজির করতে নির্দেশ দিলে মিশ্র বেলিরাম নানা অজুহাতের আশ্রয় নিলেন। শেষে জানালেন, “কোহিনূর উপস্থিত লাহোরে নেই। রয়েছে অমৃতসরে। আনাতে কিছুটা সময় প্রয়োজন।”

খুশহাল সিং আদেশ দিলেন, “শুনুন মুখ্য কোষাধিকারী, সূচি মিলিয়ে অবিলম্বে কোষাগারের সমস্ত ধনসম্পত্তি আপনি যুবরাজের হাতে তুলে দেবেন। এ বিষয়ে কোনোরকম অজুহাত বরদাস্ত করা হবে না।”

পালঙ্কে শায়িত রণজিৎ সিং প্রাণপণে তাঁর অসম্মতি প্রকাশ করে ছটফট করতে শুরু করলেন। কিন্তু কেউ সেদিকে দৃষ্টি ব্যয় করলেন না।

গোবিন্দরাম আবেগ ঘন কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন, “তবে কি ভগবান জগন্নাথদেবের চরণে একটা কানাকড়িও দান করা হবে না! এ কেমন অবিচার মহারাজ?”

রণজিৎ সিং তৎক্ষণাৎ ইশারায় দুই লক্ষ মূল্যের নিজের বাজুবন্ধ, রত্নখচিত কিছু অলঙ্কারাদি, সোনার হাওদা জোড়া দুটো হাতি আর নগদ পাঁচ লক্ষ টাকা জগন্নাথ মন্দিরের নামে বরাদ্দ করলেন।

মহারাজা তারপর একে একে নিজের অবশিষ্ট অলঙ্কারাদি নিজ দেহে ধারণ করলেন। অল্প পরেই তা আবার একটা একটা করে খুলিয়ে দান করে দিলেন হাতে হাতে। দেহে একখণ্ড সাদা বস্ত্র ব্যতীত আর কিছুই রাখলেন না। জন্মভূমির উদ্দেশ্যে প্রণাম জানিয়ে বিড়বিড় করলেন, “এই আমার অন্তিম পরিচ্ছদ।”

তারপর অত্যন্ত আগ্রহভরে গ্রন্থসাহেব পাঠ শুনলেন, পবিত্র ধর্মগ্রন্থকে প্রণাম জানালেন। শেষে নিজের দেহে গঙ্গাজল ছেটানোর আদেশ দিলেন।

পরদিন ২৭ জুন স্পষ্ট হয়ে গেল যে মহারাজার অন্তিমকাল উপস্থিত। বাকশক্তি আগেই লোপ পেয়েছিল, এবারে নড়াচড়ার ক্ষমতাটুকুও রইল না আর। হাকিম অতিকষ্টে নাড়ির স্পন্দন অনুভব করতে পারছেন। দু’চোখ জলে ভরে এল তাঁর। ভাই গোবিন্দরাম এগিয়ে এসে মহারাজার কানে তিনবার রামনাম উচ্চারণ করলেন। প্রত্যুত্তরে রণজিৎ সিংয়ের ঠোঁট দু’বার নড়ে ওঠেই স্তব্ধ হয়ে গেল। তৃতীয়বার রামনাম উচ্চারণের পূর্বেই জীবনদীপ নির্বাপিত হল তাঁর। সময় তখন দিনের তৃতীয় প্রহরের তিন ঘণ্টা।

চন্দন-চিতায় মহারাজা রণজিৎ সিংয়ের প্রাণাধিক প্রিয় কোহিনূর তাঁর সঙ্গী হল না।

।। চার ।।

রণজিৎ সিংয়ের চিতা ঠাণ্ডা হয়নি তখনও। কোহিনূরকে নিয়ে কল্পগল্পের ঝড় উঠল চতুর্দিকে। কোহিনূর কোথায় রয়েছে, কী অবস্থায় রয়েছে সে বিষয়ে কেউ অবগত নয়, তবুও হাজারটা সম্ভাবনার গল্প বুনে চলেছে সকলে মিলে। কেউ বলছে গোপনে কাশ্মীর পৌঁছে গেছে কোহিনূর, কারও অনুমান আর কেউ নয় মিশ্র বেলিরামই চুরি করে লুকিয়ে ফেলেছেন তা। তবে বেশিরভাগ মানুষের বিশ্বাস, অবিলম্বেই পুরীর জগন্নাথদেবের তৃতীয় চক্ষুর উন্মেষ ঘটবে কোহিনূর দ্বারা—কোহিনূর আসলে স্যমন্তক মণিই। স্যমন্তক শ্রীকৃষ্ণের জীবনে জড়িয়ে ছিল। আর জগন্নাথদেব শ্রীকৃষ্ণেরই এক অবতার। তাই কোহিনূরের সঠিক স্থান তাঁর মন্দিরেই হওয়া উচিত। মহারাজারও তাই অন্তিম ইচ্ছা ছিল।

যুবরাজ খড়ক সিং পিতামহারাজের বাজুবন্ধে কোহিনূরের উজ্জ্বল দ্যুতি চাক্ষুষ করতে করতে যৌবন পার করেছেন। রাজকোষে কোহিনূর আর শোভা পাবে না একথা তিনি কল্পনাও করতে পারেন না। অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়লেন তিনি। শুধু খড়ক সিংই নন, সুদূর ইংল্যান্ডেও এই হিরেকে ঘিরে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ল সবার কপালে। কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম আর লন্ডনের লিডেন হলের মধ্যে আচমকা চিঠিপত্রের আদানপ্রদান বেড়ে গেল।

ব্রিটিশ এজেন্ট ক্যাপ্টেন সি.এম.বেড ১৮২৩ সাল থেকেই লুধিয়ানায় ঘাঁটি গেড়ে রণজিৎ সিংয়ের ওপর শ্যেনদৃষ্টি ফেলে রেখেছিলেন। পাঞ্জাব রাজ্য সম্পর্কিত সমস্ত তথ্য নিয়মিতভাবে নিজ প্রভুদের গোচরে আনতেন। মহারাজার মৃত্যুসংবাদও ক্যাপ্টেন বেড যথাসময়ে উচ্চ মহলে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তবে বাংলা প্রেসিডেন্সি থেকে ব্রিটিশ মুখ্যালয়ে এ পত্র পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় মাস পাঁচেক লেগে গেল। ১৮৩৯ সালের ৪ ডিসেম্বর পাঞ্জাবের পরিস্থিতি অস্থির হয়ে উঠলে সে মৃত্যুসংবাদের গতি দ্রুততর হল। নয়তো কবে তা ইংল্যান্ডে পৌঁছত তা বলা মুশকিল।

ক্যাপ্টেন বেড এই প্রতিবেদনে লিখেছিলেন—

‘মহামহিম ও গভর্নর জেনারেল মহারাজার মৃত্যুসংবাদ আমার এই প্রতিবেদনের পূর্বেই হয়তো অবগত হয়েছেন। গত ২৭ জুন তিনি পরলোকগমন করেন। মহারাজ তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলোতে প্রায় সমস্ত ধনসম্পত্তি বিলিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি বিখ্যাত সেই কোহিনূর হিরে পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে দান করে গিয়েছেন। লাহোর সিংহাসন বর্তমানে শূন্য, যুবরাজ খড়ক সিং তাতে অভিষিক্ত হবেন কি না তা এখনও নিশ্চিত নই। সেরকম কিছু ঘটে থাকলে অবিলম্বে সে প্রতিবেদন আমি দাখিল করব।’

কলকাতা স্থিত কোম্পানির বিদেশ বিভাগে এই গুপ্ত প্রতিবেদন পৌঁছানোর আগেই পুরো ঘটনাক্রম সম্পর্কে প্রত্যেকেই ওয়াকিফ হাল আছেন। শুধু তাই নয়, এর কয়েকমাস আগে থেকেই ব্রিটিশ সংবাদপত্রগুলোতে মহারাজা রণজিৎ সিংকে নিয়ে যথারীতি মুখ্য সংবাদ পরিবেশন শুরু হয়ে গিয়েছে। দুই মাস আগে অর্থাৎ ২০ অক্টোবর ১৮৩৯ সালে ‘দ্য এরা’ নামের লোকপ্রিয় এক সাপ্তাহিক সংবাদপত্রে সহসা প্রকাশ পেল সাড়া জাগানো এক পত্র—

‘মান্যবর সম্পাদক মহোদয়,

গত নয় মাস ধরে চলতে থাকা বিভিন্ন জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটিয়ে পাঞ্জাব কেশরী রণজিৎ সিং শেষপর্যন্ত পরলোকগমন করেছেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চক্ষুঃশূল অমিতবিক্রম এক সিংহ তাঁর পূর্বপুরুষদের সঙ্গে মিলিত হয়েছেন শেষে। মৃত্যুর পূর্বে কোহিনূর হিরে তিনি পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে দান করে গেছেন। আর সে মন্দিরের মুখ্য পাণ্ডা তা এক নির্জীব মূর্তির কপালে স্থান দেওয়ার নিমিত্ত উঠেপড়ে লেগেছেন। অন্তিমকালে মহারাজার নিশ্চয়ই মতিভ্রম হয়েছিল, নইলে এমন এক অদ্বিতীয় সম্পদ তিনি ওই মূর্তিপূজক নির্বোধ পাণ্ডাদের হাতে তুলে দিতেন না।’

পত্র লেখক নিজেকে ‘কাশ্মীরের আওয়াজ’ বলে পরিচয় দেন এবং শিখ রাজদরবারের সমস্ত গোপনীয় তথ্য তাঁর নখদর্পণে রয়েছে বলেও দাবি করেন।

ব্রিটেন আর রাশিয়ার মধ্যে দুই দশক ধরে চলে আসা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ভারতবর্ষ তখন দাবার বোড়েতে পরিণত হয়েছে। তাই পত্র লেখক এই ‘কাশ্মীরের আওয়াজ’-এর সম্পর্ক ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে, নাকি সে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিরই কোনও কর্মচারী সে সম্বন্ধে সকলে ধন্দে পড়ে গেল। তবে এই পত্রে এটা স্পষ্ট যে এই ব্যক্তি যেই হোন কোহিনূরের একান্ত ভক্ত। তাঁর মতে কোহিনূরই হচ্ছে একমাত্র সেই চাবি যার দ্বারা পাঞ্জাব অধিকার করা সম্ভব। তিনি আরও লিখলেন—

‘হয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কোহিনূর উদ্ধার করে খড়ক সিংয়ের হাতে তুলে দিক, নয়তো জগন্নাথ মন্দিরে কোহিনূর দানের সমর্থন জানিয়ে সরাসরি খড়ক সিংয়ের বিরুদ্ধে গিয়ে শত্রুতার বার্তা দিক। তবে কোম্পানির উচিত খড়ক সিংয়ের হাতে কোহিনূর তুলে দেওয়ার বিনিময়ে এক চুক্তিপত্রে তাঁকে আবদ্ধ করা। আর শিখ সাম্রাজ্যে যদি কোম্পানি একবার গুছিয়ে বসতে পারে তবে ভারতের অবশিষ্ট রাজ্যগুলো তো ছেলের হাতের মোয়া। যুবরাজ খড়ক সিং নিতান্তই এক দুর্বল, অল্পেতেই বিচলিত ও নেশাখোর এক রাজপুরুষ। তাঁকে বশ করতে কোম্পানির বিশেষ কাঠখড় পোড়ানোর কথা নয়। সময় বিশেষে কোহিনূরও কোম্পানির হাতে চলে আসবে। আর কোহিনূর যদি জগন্নাথ মন্দিরে পৌঁছে যায় তবে কোনদিন কোন চোর তা নিয়ে পালাবে, কোম্পানির তখন হাত কামড়ানো ছাড়া আর কোনও উপায় থাকবে না। তাছাড়া হাতে পেয়ে পাণ্ডারা সেটা কোনও রত্নব্যবসায়ীর কাছে বেচে দেবে না তারই বা স্থিরতা কী? পরিবর্তে ঝুটো এক কাচের টুকরো জগন্নাথের কপালে লাগিয়ে দিলেই বা দেখছে কে?’

।। পাঁচ ।।

খড়ক সিং বাস্তবিকই একজন দুর্বল চিত্তের লোভী মানুষ। রাজকার্যে তাঁর বিন্দুমাত্র রুচি বা দক্ষতা কিছুই নেই। তার চেয়ে সুরা ও সুন্দরীদের প্রতি তাঁর আসক্তি বেশি। সভাসদদের সঙ্গেও বনিবনা নেই বললেই চলে।

‘কাশ্মীরের আওয়াজ’-এর প্রস্তাবিত কূটনীতি বা আগ্রাসন নীতি অবশ্য ব্রিটিশ শিখ সাম্রাজ্যে প্রয়োগ করবার সুযোগ পায়নি। এর আগেই পাখির চোখ কোহিনূরের ভবিষ্যৎ নির্দিষ্ট হয়ে গিয়েছিল। আর সে ভবিষ্যতের রূপকার ছিলেন রণজিৎ সিংয়ের মুখ্য কোষাধিকারী মিশ্র বেলিরাম। বেলিরাম দীর্ঘকাল ধরে এ দায়িত্ব সামলে আসছেন। লাহোরের সর্বাপেক্ষা বিশ্বস্ত ও সম্মানীয় ব্যক্তিবর্গের অন্যতম হচ্ছেন বেলিরাম। তাঁর পিতাও লাহোরের কোষাধিপতি ছিলেন। চার ভাই সেনাবাহিনীর উচ্চপদে অধিষ্ঠিত। মহারাজার একান্ত অনুগত পরিবার হিসেবে তাঁদের জুড়ি মেলা ভার।

মহারাজা ব্যতীত এক বেলিরামই ছিলেন কোহিনূরের দেখভাল করবার একমাত্র অনুমতিপ্রাপ্ত ব্যক্তি। মুক্তোখচিত অত্যন্ত সুদৃশ্য এক বাক্সে কোহিনূর ভরে তা সর্বদা নিজের হাতেই রাখতেন বেলিরাম। রণজিৎ সিং কখনও রাজ্যের বাইরে গেলে কোহিনূর সে সময় অতি সাধারণ এক বাক্সে রেখে দিতেন বেলিরাম। পাশাপাশি একইরকম দেখতে আরও কিছু বাক্সে কাচের তৈরি কোহিনূরের একেকটা প্রতিরূপও রেখে দিতেন। সশস্ত্র প্রহরায় উটের পিঠে সে বাক্সগুলোর মধ্যে ঠিক কোনটাতে আসল কোহিনূর রয়েছে তা একমাত্র বেলিরামই জানতেন। যাত্রাপথে মহারাজার কোথাও রাত্রিবাসের প্রয়োজন পড়লে বাক্সগুলো নিজের পালঙ্কের সঙ্গে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখতেন বেলিরাম। তাঁবুর বাইরের নিশ্ছিদ্র প্রহরা ফাঁকি দিয়ে চোর যদি ভেতরে ঢুকে পড়তে সক্ষমও হয় তবে একেকটা বাক্স কেটে তাকে নিশ্চিত হতে হবে যে আসল কোহিনূর কোনটা। আর ততক্ষণে মিশ্র বেলিরামের তলোয়ার চোখের পলকে নেমে আসবে তার ঘাড়ে।

বেশিদিন আগের কথা নয়। বছর চারেক আগে রণজিৎ সিং তখন শয্যাশায়ী। সুচতুর মন্ত্রী-প্রধান ধ্যান সিং নিজের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে চলেছেন গোপনে। ধ্যান সিং স্বভাবচরিত্রে অত্যন্ত ক্রুর এক ব্যক্তিত্ব শিখ রাজদরবারে। আচমকা একদিন কোষাগারে উপস্থিত হয়ে তলব পাঠালেন মিশ্র বেলিরামকে। বেলিরাম তড়িঘড়ি এসে উপস্থিত হলে ধ্যান সিং আদেশ দিলেন, “আজ বিকেলে আমার মহলে দু-চারজন সম্ভ্রান্ত অতিথি আসবেন বেলিরাম। তুমি রাজকোষাগারের সমস্ত মণিমাণিক্য নিজের হেফাজতে নিয়ে সেখানে যথাসময়ে উপস্থিত থেকো। আমি মহারাজার সমস্ত রত্নরাশি তাঁদের চাক্ষুষ করাব বলে কথা দিয়েছি। আর হ্যাঁ, কোহিনূরটাও সঙ্গে নিতে ভুল কোরো না যেন।”

বেলিরামের মাথা নিচু, কিন্তু চোয়াল কঠিন। উত্তর দিলেন, “তা সম্ভব নয় মহামন্ত্রী। স্বয়ং মহারাজার নির্দেশ ছাড়া আমি একাজ করতে অক্ষম। ক্ষমা করবেন।”

নিমেষে চোখমুখ রক্ত বর্ণ ধারণ করল ধ্যান সিংয়ের। দাঁতে দাঁত পিষে জবাব দিলেন, “বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দড়, তাই না? মহারাজা নিজে আমাকে সেই অনুমতি দিয়েছেন জানো!”

বেলিরাম সেকথায় আমল না দিয়ে জানালেন, “মহারাজা স্বয়ং যতক্ষণ না পর্যন্ত আমাকে লিখিত আদেশ পাঠাচ্ছেন, ততক্ষণ কোহিনূর তো দূর, একটুকরো সোনাও রাজকোষের বাইরে যাবে না।”

এবারে গর্জন করে উঠলেন ধ্যান সিং। “ওহে মূর্খ, তুমি কি জানো না যে মহারাজা শয্যাশায়ী, লেখাপড়া তো দূর সামান্য নড়াচড়া করতেও কষ্টবোধ করছেন?”

বেলিরামের কণ্ঠস্বর শান্ত। জানালেন, “তা আমি বিলক্ষণ অবগত আছি মহামন্ত্রী। আর তা আছি বলেই এই বাড়তি সতর্কতা। আমাকে ভুল বুঝবেন না দয়া করে।”

ধ্যান সিং আর তর্ক বাড়ালেন না। হিমশীতল এক হিংস্র দৃষ্টি বেলিরামের চোখে ছুড়ে দিয়ে বেরিয়ে গেলেন কোষাগার ছেড়ে।

***

রণজিৎ সিংয়ের আট পুত্রের মধ্যে সাঁইত্রিশ বর্ষীয় খড়ক সিং জ্যেষ্ঠ। তবে সর্বাপেক্ষা কম ক্ষমতাবান। খড়ক সিংয়ের জীবন আফিম, সুরা আর নারীতে আবদ্ধ। দিনে অন্তত দু’বার নেশার চোটে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন আর অবশিষ্ট সময়টুকু মাতাল থাকেন। সুতরাং রাজ্যাভিষেকের পর মন্ত্রী-প্রধান কর্তৃক তাঁকে ধীর বিষপ্রয়োগে শারীরিকভাবে অক্ষম করে দিয়ে পরপারে পাঠাতে বিশেষ কষ্ট করতে হয়নি। ১৮৪০ সালের ৫ নভেম্বর খড়ক সিং মৃত্যুমুখে পতিত হলেন।

খড়ক সিংয়ের অকালমৃত্যুর পর তাঁর অষ্টাদশ বর্ষীয় পুত্র নৌনিহাল সিং লাহোরের সিংহাসনে আরোহণ করেন। নৌনিহাল সিং এই বয়সেই রাজকার্যে বেশ যোগ্য ব্যক্তি। খড়ক সিংকে সভাসদেরা যতটা অপছন্দ করতেন ঠিক ততটাই পছন্দ করেন নৌনিহাল সিংকে। ঘুণাক্ষরেও কেউ টের পাননি যে নৌনিহাল সিংয়ের মাথায়ও ছায়া ফেলেছে করাল মৃত্যু। আর তা অতি সন্নিকটেই।

সেদিন রাজদরবারের সকল সভাসদবর্গের সঙ্গে মহারাজা নৌনিহাল সিং গেছেন রাভি নদীর তীরে। উদ্দেশ্য, পুণ্য সলিলে পিতার অস্থি বিসর্জন।

কিছুক্ষণের মধ্যেই রাজপ্রাসাদে সংবাদ আছড়ে পড়ল, অস্থি বিসর্জন অনুষ্ঠান সমাপনান্তে মহারাজার ফিরে আসবার পথে অনুচ্চ এক পাহাড়ের ওপর থেকে বড়সড় আকারের এক পাথর খণ্ড গড়িয়ে পড়েছে তাঁর মাথায়। গুরুতর আহত তিনি। ঘটনাস্থলের কাছেই তাঁবু খাটিয়ে চিকিৎসা চলছে তাঁর।

মহারাজা নৌনিহাল সিংয়ের মাথার আঘাত তখন অত্যন্ত সংকটজনক। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি মৃত্যুবরণ করলেন।

***

লাহোর সিংহাসন পুনরায় অভিভাবকহীন হয়ে পড়ল। রাজদরবারে অরাজকতা চলছে। মন্ত্রী-প্রধান ধ্যান সিংয়ের করাল থাবা ধীরে ধীরে সিংহাসনের দিকে আগুয়ান। এমতাবস্থায় এগিয়ে এলেন রণজিৎ সিংয়ের দ্বিতীয় পুত্র শের সিং। রাজধানীর বাইরে ব্যক্তিগত জায়গীরে বাস তাঁর। নৌনিহাল সিংয়ের অকালমৃত্যুর সংবাদ পেয়ে সত্তর হাজার সেনা নিয়ে লাহোর এসে পৌঁছলেন শের সিং। বাজুবন্ধে কোহিনূর বেঁধে শের সিং ১৮৪১ সালের ১৮ জানুয়ারি লাহোর সিংহাসনে বসেন। সে সময় শের সিংয়ের প্রত্যক্ষ বিরোধিতা করবার মতো লোক রাজপ্রাসাদে কেউ ছিল না। কিন্তু বিধাতা হয়তো মুচকি হেসেছিলেন।

দিনটা ১৮৪৩ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর।

পাঞ্জাবরাজ শের সিংয়ের অতি বিশ্বস্ত দূরসম্পর্কের দুই ভাই অজিত সিং ও লেনা সিং এসে উপস্থিত হল রাজপ্রাসাদে। তারা জানে মহারাজা শের সিং শিকার খেলার মস্ত শৌখিন। মহারাজার হাতে একখানা বন্দুক ভেট করল তারা। শের সিং পছন্দের জিনিস পেয়ে অত্যন্ত আহ্লাদিত। তৎক্ষণাৎ ধ্যান সিংকে তলব করে আদেশ দিলেন, “মহামন্ত্রী, আমি আমার এই দুই ভাইকে নিয়ে আগামীকাল খুব ভোরেই শিকারে যাব। যথোচিত ব্যবস্থা করে ফেলুন শীগগিরই।”

ধ্যান সিং আদেশ নিয়ে প্রস্থান করলে অজিত সিং বলে উঠল, “কিন্তু মহারাজ, শিকারে বেরোবার আগে বন্দুকটা একবার পরীক্ষা করে নেওয়ার প্রয়োজন ছিল না? আমরাও তো কেউ চালিয়ে দেখিনি আগে।”

“আলবাত, আলবাত। চলো তবে উদ্যানে।”

তিনজনে মিলে নেমে এলেন রাজোদ্যানে। কিন্তু অনেক চেষ্টার পরও শের সিং বন্দুকটা বাগে আনতে পারলেন না। হাল ছেড়ে দিয়ে বললেন, “না হে, এতবার ঘোড়া টিপলাম অথচ বন্দুক তোমাদের কোনও কথাই বলছে না দেখছি। কলকব্জা সব ঠিক আছে তো? দেখো তো তোমরা একবার।”

“কই, দেখি।” বলে প্রথম চেষ্টাতেই বন্দুক গর্জে উঠল অজিত সিংয়ের হাতে।

দোনলা বন্দুক, তাক করা ছিল মহারাজার বুকে। শের সিং ধপ করে পড়ে গেলেন মাটিতে। আর উঠলেন না।

নিছক অনিচ্ছাকৃত এক দুর্ঘটনা আখ্যা দিয়ে ধ্যান সিং মাটিচাপা দিয়ে দিলেন এই আকস্মিক ঘটনা।

মুহূর্ত কাল দেরি না করে কোত্থেকে উদয় হয়ে কোহিনূরের দখল নিলেন মিশ্র বেলিরাম ফের। অত্যাশ্চর্য এই রত্নের প্রতি মন্ত্রী-প্রধান ধ্যান সিংয়ের লোলুপ দৃষ্টি থাকলেও তা হাসিল করবার চক্রান্ত আরও একবার ব্যর্থ হল তাঁর। কোহিনূরের প্রতি শ্যেনদৃষ্টি রেখে চলা বেলিরাম আজও সে সুযোগ দিলেন না ধ্যান সিংকে। ক্রুদ্ধ সাপের মতো ফুঁসছেন ধ্যান সিং। মনে মনে গুছিয়ে নিলেন নিজেকে। এইবারে আনতে হবে মোক্ষম আঘাত, নিতে হবে চূড়ান্ত প্রতিশোধ।

রাত অর্ধেক অতিক্রান্ত হয়েছে তখন। মুখ্য পরিচারক এসে সসংকোচে ডেকে তুলল নিদ্রাসুপ্ত মিশ্র বেলিরামকে। জানাল, “রাজমহল থেকে জরুরি তলব এসেছে হুজুর।”

“এত রাতে? সংবাদ আনল কে?” বেলিরাম বেশ আশ্চর্য তো বটেই, খানিকটা বিরক্তও।

পরিচারক এক পত্র মনিবের হাতে দিয়ে জানাল, “মহলের এক রক্ষী এসে দিয়ে গেল হুজুর। বলল, অত্যন্ত জরুরি পত্র।”

পত্র পাঠ শেষে সর্বাঙ্গে শিহরন খেলে গেল বেলিরামের। কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে গুপ্ত পথে গিয়ে হাজির হলেন শাহী আস্তাবলে তৎক্ষণাৎ।

আস্তাবলে পৌঁছামাত্র তাঁকে পথ দেখিয়ে পেছন দিকের এক পরিত্যক্ত কক্ষে নিয়ে এল এক সহিস।

ধ্যান সিং বসে আছেন সেখানে। কক্ষের চতুর্দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঘোড়ার বাতিল সব সাজসরঞ্জাম—ক্ষয়ে যাওয়া নাল, ফেঁসে যাওয়া লাগামের গোছা, অকেজো জিন।

বেলিরাম উপস্থিত হয়ে গম্ভীর কণ্ঠে জানতে চাইলেন, “আমার ভাইয়েরা কোথায় মহামন্ত্রী?”

কুটিল হাসলেন ধ্যান সিং। দুই চোখে ধিকিধিকি হিংস্র আগুন। বিনা বাক্যব্যয়ে উঠে গিয়ে ঢুকলেন পার্শ্ববর্তী কক্ষে। বেলিরাম অল্প এগিয়ে গিয়ে সুপরিচিত একটা পরিত্যক্ত জিন হাতে তুলে নিতেই কোত্থেকে চার-চারটে মিলিত কণ্ঠের আর্তনাদ এসে জোর ধাক্কা দিল তাঁকে। অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল থরথর করে। বিলক্ষণ বুঝলেন বেলিরাম, নিজেদের পাঁচ ভাইয়ের জীবনসংকট উপস্থিত। এ থেকে পরিত্রাণের উপায় বুঝি নেই আর।

তারপর পার্শ্ববর্তী কক্ষে পাঁচ ভাইয়ের ওপর শুরু হল অকথ্য অত্যাচার। বেলিরামের ভাইয়েরা জানতেও পারলেন না তাঁদের অপরাধ কী। সে প্রশ্ন মুখে আনলেই অত্যাচারের মাত্রা দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেন ধ্যান সিং। কিন্তু বেলিরামকে জেরার পর জেরা করে, মৃত্যুভয় দেখিয়েও বাগে আনতে পারলেন না তিনি। কোহিনূর উপস্থিত কোথায় রয়েছে সে সম্পর্কে একটা শব্দও ব্যয় করলেন না বেলিরাম।

দু-চারদিনের মধ্যেই চার ভাইকে একে একে গলা টিপে হত্যা করলেন ক্রূরাত্মা ধ্যান সিং। তবে বেলিরামকে হত্যা করতে সাহস পেলেন না। তাতে অনর্থ ঘটে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। রাজনৈতিক ক্ষমতা ধ্যান সিংয়ের তুলনায় মিশ্র বেলিরামের কোনও অংশে কম নয় পাঞ্জাবে। মহারাজার পরে এঁকেই ঈশ্বর মানে প্রজারা। এই সেই বেলিরাম যিনি কোহিনূরের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে স্বয়ং মহারাজার আজ্ঞারও বিরুদ্ধাচরণের ক্ষমতা রাখেন। যিনি কোহিনূর পুরীতে না পাঠিয়ে নিজের হেফাজতেই রেখে দিয়েছেন যথাসময়ে পাঞ্জাবের উত্তরাধিকারীর হাতে তুলে দেবার অভিপ্রায়ে। যিনি পুরীর পাণ্ডাদের শত শাপ-অভিশাপ বর্ষণ মাথা পেতে নিয়ে অটল থেকেছেন নিজের সিদ্ধান্তে। কোহিনূর পাঞ্জাবের, আর তা থাকবে পাঞ্জাবেই, রাজবংশের উত্তরাধিকারীর হাতে―তা তিনি যতই অযোগ্য হোন না কেন।

হতাশ ধ্যান সিং মুক্তি দিলেন বন্দীকে। প্রাণে রক্ষা পেলেন বেলিরাম।

।। ছয় ।।

১৮৪৩ সালে রণজিৎ সিংয়ের যে উত্তরাধিকারী লাহোর সিংহাসনে আরোহণ করলেন তাঁর বয়স মাত্র পাঁচ বছর, নাম দলীপ সিং। দলীপ রণজিৎ সিংয়ের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান। ১৮ সেপ্টেম্বর রাজ্যাভিষেক হয় তাঁর মা রানি জিন্দনের অভিভাবকত্বে।

১৮৪০ দশক নাগাদ প্রায় সমগ্র ভারতবর্ষই গ্রাস করে ফেলেছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। লাহোর শুধুমাত্র রয়ে গেছে হাতের বাইরে। সেখানে ফেলে রেখেছে শ্যেনদৃষ্টি। রাজদরবারের প্রতিটি গতিবিধি তাদের নখদর্পণে। দলীপের রাজ্যাভিষেকের সঙ্গে সঙ্গে সতলজের দক্ষিণ তীর বরাবর সৈন্যাভিযান শুরু হল ব্রিটিশ সরকারের। একদিকে রানি জিন্দনকে রাজকার্যে সহায়তা করবার প্রস্তাব নিয়ে মিত্রতার ভান, অপরদিকে রাজদরবারের অন্যান্য রাজশত্রুদের সঙ্গে গোপনে সখ্যতা স্থাপন―এই ছিল শিখ রাজদরবারে ইংরেজের প্রাথমিক দাবার চাল।

বাংলা থেকে সৈন্য আনিয়ে ইংরেজ সরকার যখন নিজেদের সেনাবাহিনীকে বিশাল একটা রূপ দিল তখন ১৮৪৫ সালের ১১ ডিসেম্বর শিখ অশ্বারোহীর একটা দল সতলজ নদী পার করে ছুটে গেল ব্রিটিশ শিবিরের দিকে। কোম্পানির এই ধূর্ত আগ্রাসন রুখতেই হবে যেকোনও মূল্যে।

এর দু’দিন পর ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল স্যার হেনরি হার্ডিং ব্রিটিশ সীমা অতিক্রম করবার অভিযোগে শিখ সেনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার সুযোগ পেয়ে গেলেন। ২১ ডিসেম্বর ১৮৪৫ সালে ফিরোজশাহতে সংঘটিত প্রথম অ্যাংলো-ব্রিটিশ যুদ্ধ ইংরেজের কঠিন যুদ্ধগুলোর মধ্যে একটা ছিল। তবে শেষে জয় পেল ইংরেজ বাহিনী।

তবে ইংরেজ সরকার বিলক্ষণ জানত যে যুদ্ধে সাময়িক জয় হলেও লাহোরকে কখনও বশে রাখা যাবে না। ফলস্বরূপ ভৈরোবল সন্ধি স্বাক্ষরিত হল। সে চুক্তি অনুসারে মহারাজা দলীপ সিংয়ের ষোলো বছর বয়স অবধি একজন ব্রিটিশ রেসিডেন্ট রাজদরবারে উপস্থিত থেকে নাবালক মহারাজাকে রাজকার্যে সাহায্য করবেন।

১৮৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে রানি জিন্দনের কোল থেকে নয় বছরের বালক মহারাজা দলীপকে কেড়ে নিয়ে জিন্দনকে নির্বাসনে পাঠাল ব্রিটিশ সরকার। এইবারে কোহিনূর তাঁদের হাত থেকে বেশি দূরে নয় আর।

***

১৮৪৮ সালে লর্ড ডালহৌসি গভর্নর জেনারেল হয়ে এলেন। আর এসেই শিখ সাম্রাজ্যের কফিনে শেষ পেরেকটা পুঁতে দিলেন। ততদিনে লাহোরকে অজগরের মতো গিলে ফেলেছে ব্রিটিশ সরকার। বিরোধী শিবিরে হয় আর কেউ বেঁচে নেই, নতুবা গুপ্ত কুঠুরিতে বন্দী। মোক্ষম সুযোগে চতুর্দিক থেকে চাপে ফেলে লর্ড ডালহৌসি এক ঐতিহাসিক সন্ধি স্বাক্ষর করালেন মহারাজা দলীপ সিংকে দিয়ে। রক্ত রঞ্জিত যুদ্ধবিগ্রহে ভীত, মায়ের স্নেহ ও আশ্রয় থেকে বঞ্চিত, চতুর্দিকে ব্রিটিশের রক্তচক্ষু, ভ্রষ্ট ও কাপুরুষ সভাসদদের মধ্যে দুর্বিপাকে থাকা অসহায় বালক দলীপকে ব্রিটিশরা বোঝাল, মহারাজার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হতে পারে যদি এই সন্ধিতে তিনি স্বাক্ষর করেন। সন্ধিপত্রে মহারাজার কাছ থেকে চেয়ে নেওয়া দাবিগুলোর মধ্যে কোহিনূর ছিল অন্যতম। দলীপ উপায়ান্তর না দেখে সন্ধিতে স্বাক্ষর করলেন। কোহিনূরও দীর্ঘ ছত্রিশ বছর পর সাম্রাজ্য বদল করল পুনরায়।

সন্ধিপত্রে উল্লেখ করা হল―

১) মহারাজা দলীপ সিং ও তাঁর বংশ বা উত্তরাধিকারীরা যে যার পদ থেকে বিনা শর্তে ইস্তফা দেবেন। লাহোর সিংহাসনের সঙ্গে তাঁদের আর কোনও সম্পর্ক থাকবে না।

২) বহি খাতায় উল্লেখিত ও অনুল্লেখিত পাঞ্জাব রাজ্যের স্থাবর অস্থাবর সকল সম্পত্তি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে হস্তান্তর করা হবে। তা রাজপরিবারের ঋণ পরিশোধ (যদি কিছু থেকে থাকে) ও যুদ্ধের ক্ষতিপূরণে ব্যয় করা হবে।

৩) কোহিনূর হিরে যেটা মহারাজা রণজিৎ সিং কাবুল সম্রাট শাহ সুজার কাছ থেকে হাসিল করেছিলেন, তা দলীপ সিং ইংল্যান্ডের মহারানিকে উপঢৌকন হিসেবে পেশ করবেন।

৪) মহারাজা রণজিৎ সিংয়ের রাজপরিবার, আত্মীয়বর্গ ও সভাসদদের জন্যে পেনশনের ব্যবস্থা করবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। তবে সে অর্থের পরিমাণ বাৎসরিক চার লাখ টাকার কম ও পাঁচ লাখ টাকার বেশি হতে পারবে না।

৫) মহারাজা দলীপ সিংকে আজীবন পূর্ণ সম্মান প্রদর্শনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাধ্য থাকবে। তাঁকে মহারাজা দলীপ সিং বাহাদুর খেতাবে ভূষিত করবে কোম্পানি। মহারাজার ব্যক্তিগত পেনশন বরাদ্দ করবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। তবে তাঁকে আজীবন কোম্পানির প্রতি অনুগত থাকবে হবে। তাঁর ভবিষ্যৎ বাসস্থানের সিদ্ধান্ত ও ব্যবস্থা করবে কোম্পানি।

***

জন লগিন গোটা ভারতবর্ষে কোম্পানির সর্বাপেক্ষা বিশ্বস্ত মানুষ হিসেবে প্রসিদ্ধ। শিখ সাম্রাজ্যের রাজকোষের চাবি তাঁর হাতেই তুলে দেওয়া হল নির্দ্বিধায়। কোহিনূর সহ সমস্ত ধনরত্নের সূচি তৈরি করলেন তিনি। পাশাপাশি তাঁর হাতে অর্পণ করা হল এক গুরু দায়িত্ব। বালক দলীপ সিংকে নিজের কাছে রেখে দেখভাল করবেন তিনি।

কাজে হাত দিয়েই জন লগিন বুঝে গেলেন, রণজিৎ সিংয়ের বিপুল ধনরাশির সূচি তৈরি করা একজন মানুষের পক্ষে যথেষ্ট আয়াসসাধ্য কর্ম। জনা দশেক দক্ষ কর্মচারীও এ কাজে হিমশিম খেয়ে যাবে। কিন্তু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি একমাত্র তাঁর ওপরেই সবচাইতে বেশি বিশ্বাস রাখে, ভরসা করে। এক্ষেত্রে দ্বিতীয় কোনও ব্যক্তি নিয়োগের প্রশ্ন ওঠে না।

লগিন পূর্ণ উদ্যমে শুরু করলেন নিজের কাজ। আর কাজটি শুরু করতেই খেলেন জোর এক ধাক্কা। রাজ কোষাগারের সমস্ত ধনরত্ন নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে সুপরিসর এক কক্ষে একত্র করে তন্নতন্ন করে খুঁজেও কোহিনূরের কোনও হদিশ পাওয়া গেল না। লর্ড ডালহৌসির চোখে আগুন, মনে আতঙ্ক।

অবিলম্বে তলব গেল কোষাধ্যক্ষ মিশ্র বেলিরামের কাছে। বেলিরাম উপস্থিত হয়ে কোহিনূরের হদিশ দিলে স্বয়ং লর্ড ডালহৌসি এক সহিসকে সঙ্গে করে শাহী আস্তাবলের সেই পরিত্যক্ত কক্ষ থেকে উদ্ধার করে আনলেন তা। ধ্যান সিং সেদিন উঠে গিয়ে পার্শ্ববর্তী কক্ষে ঢুকলে বেলিরাম তৎক্ষণাৎ বাতিল এক জিনের খাঁজে গুঁজে রেখেছিলেন কোহিনূরখানা।

***

কোহিনূর এভাবে মহারাজা দলীপ সিংয়ের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে সরাসরি ইংল্যান্ডেশ্বরীকে ভেট দেওয়ার অনুমতি লর্ড ডালহৌসির কাছে ছিল না। অথচ নিজের আনুগত্য প্রতিষ্ঠা করবার এমনতর সুবর্ণসুযোগ তাঁর হাতছাড়া করা চলবে না কোনও মূল্যেই। অনেক ভেবেচিন্তে এক মধ্যপথ অবলম্বন করলেন ডালহৌসি। লাহোর রাজদরবারের ভূতপূর্ব রেসিডেন্ট হেনরি লরেন্স, তাঁর ছোটো ভাই জন লরেন্স ও সিভিল সার্ভেন্ট চার্লস জি মেন্সেল―এই তিনজনকে নিয়ে একটা কমিটি গঠন করে কোহিনূর তুলে দিলেন তাঁদের হাতে। যতদিন না কোহিনূর সম্পর্কিত দ্বিতীয় কোনও আদেশ জারি হচ্ছে ততদিন হেনরি লরেন্সের নেতৃত্বে এই কমিটি তার হেফাজত করবে।

ছয় সপ্তাহ বাদে ১৮৫০ সালের ১২ জানুয়ারি ডালহৌসির স্বাক্ষরিত এক আদেশপত্র এসে পৌঁছল সিমলা থেকে। কোহিনূরের ইংল্যান্ড সফরের দিনক্ষণ সমাগত।

হেনরি লরেন্স সে আদেশপত্র পাঠ করে শোনাতেই জন বলে উঠলেন, “যাক বাবা, এতদিনে এই গুরু দায়িত্ব থেকে মুক্তি পাচ্ছি তবে। কী বলো? পদে পদে ভয়ে শুধু কাঁটা হয়ে থাকা আর সহ্য হচ্ছিল না।”

হেনরি উত্তর করলেন, “তা যা বলেছিস ভাই।”

জন তাড়াতাড়ি বললেন, “যাও তবে। আর দেরি কী? নিয়ে এসো ঐ আপদ, পাঠাবার বন্দোবস্ত করি।”

জনের এই উক্তি শুনে হেনরি আকাশ থেকে পড়লেন যেন। বিস্মিত কণ্ঠে জবাব দিলেন, “সে আমি আনব কোত্থেকে! কোহিনূর তো তোর কাছে।”

“আমার কাছে!” জন পড়লেন আরও ওপর থেকে।

ক্ষণিকের জন্যে দু’জনের চোখাচোখি হতেই হিমশীতল এক স্রোত নেমে গেল শিরদাঁড়া বেয়ে। এই সেরেছে! পারস্য দেশে রওনা হয়ে হুমায়ূন যেমন কোহিনূরের বটুয়া নদীতীরে ভুলে ফেলে এসেছিলেন, তেমনি জন লরেন্সও ডালহৌসির হাত থেকে কোহিনূরের জিম্মা নিয়ে তারপর কোথায় রেখেছেন বেমালুম ভুলে গেছেন তা। আকাশপাতাল ভেবেও কোহিনূর শেষ কোথায় দেখেছিলেন তা মনে করতে পারলেন না বিচলিত জন। কোহিনূরের বাকি দুই রক্ষক উদ্বিগ্ন দৃষ্টি ফেলে রেখেছেন জনের মুখে। ভেতরের তোলপাড় গোপন রেখে মুখে স্মিত হাসি টেনে উঠে ভেতরে চলে গেলেন জন। বলে গেলেন, “এই নিয়ে আসছি, একটু অপেক্ষা করো তোমরা।”

ভেতরে যেতে যেতে জন মনে মনে বললেন, ‘এমন ভয়ংকর বিপদে এ জীবনে এই প্রথমবার পড়লাম। অথচ হিরেটা কোথায় রেখেছি মনে পড়ছে না এখনও। সাধে কি এ হিরে এত অভিশপ্ত!’

নিজের কক্ষে ঢুকেই খাস পরিচারককে হাঁক পাড়লেন, “মোহন সিং, শুনে যাও।”

দৌড়ে এল মোহন। “হুজুর।”

“আচ্ছা, আমার কোটের পকেটে ছোটো একখানা ডিবে পেয়েছে কখনও?”

“আজ্ঞে পেয়েছি হুজুর।” মোহন জানাল, “কোটখানা সেদিন ঝাড়তে গিয়ে পেলাম। সে আমি আপনার ঐ বড়ো বাক্সটায় ঢুকিয়ে রেখেছি।”

ঝিম ধরা শরীরটা এক ঝটকায় শিথিল হয়ে গেল জনের। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন জন। এই বিশ্বাসঘাতকতার চরম মূল্য দিতে হত তাঁকে কোম্পানির কাছে। ঝকমকে চোখমুখে তাড়াতাড়ি বললেন, “কই সে ডিবে, নিয়ে এসো জলদি।”

দৌড়ে গিয়ে মেজের ওপরে রাখা টিনের একটা বাক্স খুলে কোহিনূরের ডিবেটা নিয়ে এল মোহন।

“এই যে হুজুর।” বাড়িয়ে ধরল মোহন ডিবেটা।

হ্যাঁ, এ সেই ডিবেই বটে। চোখেমুখে পরিতৃপ্ত একটা কৌতুক খেলে গেল জনের। বললেন, “খোলো এটা। দেখো তো কী আছে ভেতরে।”

মোহন সে ডিবে খুলে অবহেলায় বলে উঠল, “কই হুজুর, কী একটা কাচের টুকরো ছাড়া আর কিছু তো নেই!”

***

কোহিনূরের মতো অমূল্য রত্নের সমুদ্রযাত্রা তো নিরাপদই বলা চলে। পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা সেখানে থাকবে। কিন্তু বম্বে বন্দর পর্যন্ত তা স্থলপথে পৌঁছানো বেশ বিপদজনক। পথেঘাটে ঘাপটি মেরে রয়েছে দুর্ধর্ষ সব খুনে ঠগি।

তবে লর্ড ডালহৌসি এতে ঘাবড়াবার পাত্র নন। এমন এক ঐতিহাসিক সম্মান লাভ করতে হলে কোনও বিপদআপদকে তোয়াক্কা করলে চলে না।

সেদিন সন্ধে ঘনাবার আগেই ঘরে ফিরে গেলেন ডালহৌসি। নিজের কক্ষে গোপনে স্ত্রীকে ডেকে বললেন, “এক অমূল্য জিনিস দেখবে এসো সুজান।”

লেডি সুজান র‍্যামসের তো কোহিনূরের রূপ দেখে আর পলক পড়ে না। উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেন, “এমন জিনিস পেলে কোথায়!”

ডালহৌসি সংক্ষেপে খুলে বললেন বৃত্তান্ত। স্ত্রীকে তাঁর বিশেষ প্রয়োজন একাজে। বললেন, “তোমার একটু সাহায্য চাই সুজান। বাইরের কাউকে একাজে লাগানো যাবে না। তবে জেমসকে একবার এত্তেলা পাঠাতে হবে।”

স্ত্রীকে দিয়ে বিশেষ এক থলে তৈরি করিয়ে নিলেন ডালহৌসি। সুজান সে মোলায়েম চামড়ার ছোট্ট থলের সঙ্গে চামড়ার সরু এক ফিতেও লাগিয়ে দিলেন স্বামী যাতে তাঁর কোমর বন্ধনীর সঙ্গে এঁটে রাখতে পারেন তা। তারপর ডালহৌসি তাতে কোহিনূর পুরে তা মামুলি এক লকেটের আকারে গলায় পরে রওনা দিলেন বম্বের পথে। দূরত্ব প্রায় পঞ্চাশ ক্রোশ, মাস দুয়েকের পথ। সঙ্গে নিলেন একমাত্র সঙ্গী ভ্রাতুষ্পুত্র ক্যাপ্টেন জেমস র‍্যামসেকে। এই দু’জন বাদে কাকপক্ষীতেও টের পেল না কোহিনূরের খবর। না, ভুল হল। আরও দুটো প্রাণী সঙ্গে নিলেন ডালহৌসি, তবে তারা অবোলা―ডালহৌসির প্রাণপ্রিয় ভয়ংকর দুই কুকুর বেন্ডা ও বায়রন। এরা সাক্ষাৎ যমদূত, প্রতি রাতে তাঁবুতে ডালহৌসির বিছানা পাহারা দেবে।

কোহিনূর নিয়ে যেতে হবে অত্যন্ত সাবধানে ও অতি সাধারণভাবে। চাইলে পর্যাপ্ত অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত দু-চার হাজার সেনার কোনও দল সঙ্গে নেওয়াই যায়, কিন্তু তাতে লোকজনের নজরে পড়ে গিয়ে সন্দেহের উদ্রেক ঘটাবার সম্ভাবনা। আর তাতে কুখ্যাত ঠগি দলকে নেমন্তন্ন পাঠিয়ে নিজের বিপদ ডেকে আনা। কোহিনূরের সুরক্ষার চেয়ে গোপনীয়তা অধিক প্রয়োজন। ডালহৌসি নিয়মিত লাহোর আসাযাওয়া করে থাকেন, এক-দু’জন রক্ষীও থাকে সঙ্গে। তাই এবারে এই বিপদজনক কাজেও সেই পথই ধরলেন তিনি। তাছাড়া এমন মূল্যবান ঐতিহাসিক সম্পদ স্বয়ং গভর্নর জেনারেল কোনও সুরক্ষা বাহিনী ছাড়াই সঙ্গে নিয়ে চলেছেন এমন সম্ভাবনার কথা কারও মাথায় আসার কথা নয়।

১৮৪৯ সালের ৭ ডিসেম্বর অতি অনাড়ম্বর ও গুপ্ত এক সভার আয়োজন করলেন লর্ড ডালহৌসি। সে সভায় উপস্থিত হলেন কোহিনূরের হেফাজতকারী দলের তিন সদস্য হেনরি লরেন্স, জন লরেন্স ও চার্লস জি. মেন্সেল। আর রইলেন কোম্পানির ভারতীয় সচিব স্যার হেনরি এলিয়ট ও লাহোর তোষাখানার মুখ্য প্রবন্ধক জন লগিন। এঁদের উপস্থিতিতে রসিদে স্বাক্ষর করে আইনত কোহিনূরের দায়িত্ব নিলেন লর্ড ডালহৌসি।

প্রস্তুতি সম্পূর্ণ। এবারে বম্বের পথে রওনা হওয়ার পালা।

ডালহৌসির ভাগ্য সুপ্রসন্ন, পথে কোনও বিপদআপদের সম্মুখীন তিনি হননি। একবার মাত্র কোহিনূরের থলে ক্যাপ্টেন র‍্যামসের হাতে সঁপে দিতে হয়েছিল আধবেলা সময়ের জন্যে। সেটা অবশ্য যাত্রার প্রথমদিকের ঘটনা। হয়েছিল কী, অন্য এক সরকারি কাজে ডালহৌসিকে পাঞ্জাব প্রান্ত সীমানার গাজি খাঁ এলাকায় কোম্পানির ঘাঁটিতে যেতে হয়েছিল। সে এলাকা পৃথক, বম্বের পথে পড়ে না। আর গাজি খাঁ এলাকা তদানীন্তন সময়ে লুঠপাট ও খুনখারাপির জন্যে যথেষ্ট কুখ্যাত। দুর্ধর্ষ সব ডাকাতদলের ডেরা। মজবুত এক ছোটোখাটো সিন্দুকে কোহিনূর ভরে তার ওপর বসে পিস্তল হাতে র‍্যামসেকে সজাগ পাহারায় বসিয়ে গিয়েছিলেন ডালহৌসি। আদেশ ছিল, তাঁর না ফেরা অবধি ক্যাপ্টেন র‍্যামসে যেন নিশ্চল বসে থাকেন সেই সিন্দুকের ওপর। দ্রুত কাজ সমাধা করে হৃৎপিণ্ডটা হাতে করে উড়ে এসে পৌঁছেছিলেন ডালহৌসি নিজের তাঁবুতে সেদিন। না, অঘটন কিছু ঘটেনি। ডালহৌসির আদেশ বিন্দুমাত্র অবহেলাও করেননি র‍্যামসে। কোহিনূর আবার গলায় পরে নিলেন ডালহৌসি।

***

প্রায় দুই মাস পর ১৮৫০ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি কোহিনূর বম্বে পৌঁছে গেল নির্বিঘ্নে। তবে তক্ষুনিই কোহিনূরকে ইংল্যান্ডের পথে রওনা করিয়ে দেওয়া গেল না। কারণ, মাস দুয়েকের আগে বম্বে থেকে ইংল্যান্ডের কোনও জাহাজ নেই। অতএব উদ্বিগ্ন প্রতীক্ষা।

শেষে ১৮৫০ সালের ৬ এপ্রিল মেদিয়া নামের বাষ্পচালিত ইঞ্জিনের এক জাহাজ কোহিনূরকে নিয়ে যাত্রা করল সুদূর ইংল্যান্ডের পথে। সঙ্গে গেলেন ক্যাপ্টেন জেমস র‍্যামসে।

কোহিনূর ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল দিকচক্রবালে।

————————————-

  • কিছু ঐতিহাসিক ঘটনাবলি ও জনশ্রুতির ওপর দণ্ডায়মান বহুলাংশে এক কল্পনানির্ভর এই রচনা। ইতিহাসের কোনোরকম প্রামাণ্য দলিলরূপে তা গণ্য হবে না।
  • ঋণস্বীকার: উইলিয়াম ড্যালরিম্পল, অনিতা আনন্দ, বারিদবরণ ঘোষ, ভারতকোষ।
  • অলঙ্করণ: মৌসুমী

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

3 Responses to উপন্যাস-নূর এ হিন্দুস্তান-রাজীবকুমার সাহা শরৎ ২০২০

  1. সুদীপ says:

    দারুণ। বই চাই।

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s