উপন্যাস বীরোল দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য শরৎ ২০১৯

দেবজ্যোতির আগের উপন্যাসগুলিঃ নরসের, বারে বারে আসে, হার্বার্ট ওয়েস্টবর্ণদূত  

বীরোল

দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য

 প্রথম অধ্যায়
বিল্লু ও কাইকর

ছ’টা তেতাল্লিশের লঞ্চ ভোঁ দিয়েছে। এখান থেকে ঝুপসি বটগাছের ফাঁক দিয়ে তার পেছনদিকটা দেখা যায়। বটগাছের গায়ে সোডিয়াম ভেপারের কমলা রঙের আলো। খানিক খানিক তার জলেও গিয়ে পড়েছে। জলে টান আছে বেশ। এখান থেকেই টের পাওয়া যায়।

লোকজন হুড়মুড় করে টিকিট কাউন্টারের পাশ দিয়ে জেটির দিকে ছুটছিল। পরের লঞ্চ আসতে আরো বিশ মিনিট। বিল্লু আধখাওয়া টোস্ট বিস্কুটটা কামড়ে ধরে ঘাটের সিঁড়ি ডিঙিয়ে ওপরের দিকে ছুটল।

ভিড়ের ফাঁক দিয়ে এঁকেবেঁকে ছুট দিয়েছে হিলহিলে শরীরটা। ছুটতেছুটতেই হঠাৎ একটা জিনিস দেখে গতি কমাল বিল্লু। বুড়োমতন, ষণ্ডা চেহারার একটা লোকের বুকপকেট থেকে একটা একশো টাকার নোট লোভনীয়ভাবে উঁকি দিচ্ছে। ফাউ রোজগার। মন্দ কী? পাশ দিয়ে যেতে যেতে দু-আঙুলের একটুখানি খেলা শুধু।

লোকটার পরণের কালো পাঞ্জাবিটা অনেকটা কাবুলিদের আলখাল্লার মত। পকেট থেকে উঁচু হয়ে থাকা নোটটা আধো আলোতেও পরিষ্কার দেখা যায়। হনহন করে লঞ্চের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, আর চোখদুটো সার্চলাইটের মত এদিকওদিক ঘুরছে তার।

কাজটা সহজ হবে না। বিল্লু লোকটার ঠিক পেছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে ডানদিকে একটা পা বাড়িয়ে দিল। ওপাশের বেঁটে একটা লোক হুমড়ি খেয়ে পড়েছে তার ওপরে। তার ধাক্কায় সে নিজে কালো আলখাল্লার গায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে আঙুলদুটো নোটটার দিকে বাড়িয়ে দিতে যেতেই খেয়াল করল লোকটা তার মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছে আর নীচু গলায় কিছু একটা বিড়বিড় করে বলছে। তার ঠোঁটদুটো হালকা একটা হাসিতে বেঁকে উঠছিল।

বিল্লু বুঝল, বিপদ। বোধ হয় পুলিশের লোক। প্লেনড্রেসে আছে। কিন্তু এখানে তো বাগবাজার থানার নিত্যগোপাল সাহার ডিউটি থাকে। সুরিন্দর চাচার থানায় বলা আছে। কাজেই বিল্লুদের চিনলেও কিছু বলে না। এ আবার কোত্থেকে উদয় হল এসে?

তাড়াতাড়ি সে লোকটার গায়ের ওপর থেকে সরে এল। তারপর পাঁইপাঁই করে ছুট দিল ভাসমান প্ল্যাটফর্মের দিকে। বাগবাজার হাওড়া লঞ্চের এই ট্রিপে ওর ডিউটি। একশো টাকার লোভে লঞ্চ মিস হলে সুরিন্দর চাচা ছেড়ে কথা বলবে না। 

লম্বা জেটি পেরিয়ে ভাসমান প্ল্যাটফর্মে গিয়ে যখন পৌঁছুল বিল্লু, ততক্ষণে লঞ্চের রশি খুলে নিচ্ছে। হুড়মুড় করে বাকি লোকজনের সঙ্গে রেলিং পেরিয়ে তার ভেতর উঠে আসতে আসতে সে আড়চোখে খেয়াল করেছিল, আলখাল্লা পরা লোকটাও লঞ্চে এসে উঠেছে। ভিড় ঠেলে উল্টোদিকের রেলিঙের কাছে গিয়ে দাঁড়াতে কেউ একজন তার পকেটে থেকে বের হয়ে থাকা নোটটার দিকে দেখিয়ে কিছু বলল। সাবধান করছে বোধ হয়।  লোকটা তাতে আলখাল্লার জেব থেকে একটা মোটাসোটা থলে বের করে টাকাটা তার ভেতর ঢুকিয়ে থলেটা ফের জেবের ভেতর ভরে নিল। ততক্ষণে বিল্লুর যা দেখার দেখা হয়ে গেছে।

থলেটা বেশ ভারী। এ লোক পকেটে পঁচিশ টাকা রাখা ডেলিপ্যাসেঞ্জার নয়। তবে পুলিশও নয় বোধ হয়। পুলিশ ওরকম টাকার থলে নিয়ে ঘুরত না। থলেয় টাকা নিয়ে ঘুরছে যখন, হয়ত গ্রামগঞ্জের মানুষ হবে। টাকাপয়সা নিয়ে হাওড়া যাচ্ছে ট্রেন ধরে বাড়ি ফিরবে বলে। কাজটা হলে দু’চারদিন চাইকি ছুটিও দিতে পারে সুরিন্দর চাচা। ভাবতে ভাবতেই বিল্লু মাউথ অর্গ্যানটা বের করে নিল পকেট থেকে। তারপর ভিড়ের একেবারে মাঝখানটায় গিয়ে দাঁড়িয়ে তাতে ফুঁ দিল।

মুখের এদিক থেকে ওদিকে যন্ত্রটাকে একবার টেনে দিতেই যেন একটা বিদ্যুতের ঝলক খেলে গেল হঠাৎ। সাতটা সুর নানান তারে এঁকেবেঁকে খেলে উঠে বাতাসে ছড়িয়ে গিয়ে সবার নজর টেনে আনছে ময়লা জামাপ্যান্ট পরা ডিগডিগে ছেলেটার দিকে।

এই সময়টা একটা মজার জিনিস ঘটে। কেমন করে হয় বিল্লু জানে না, কিন্তু ও মাউথ অর্গানে ফুঁ দিলে লোকজন কেমন যেন উদাস হয়ে যায়। চেনা কোন গান বা রাগটাগ নয়। সে সব বিল্লু পারে না। শুধু মাউথ অর্গ্যানে ঠোঁট দিলে কতগুলো অন্যরকম সুর ওর নিজে নিজেই চলে আসে। একই সুর দুবার আসে না কখনো। বিল্লু চেষ্টা করে দেখেছে। কিছুতেই হয় না।

আর সে সুরগুলো উঠতেই লোকজনের কেমন যেন ভোল বদলে যায়। এমনিতে চোখকান সব খোলাই থাকে, নড়াচড়াও করে দিব্যি, কিন্তু বাজনাটা চলতে থাকে যখন, বিল্লুকে তখন যেন ওরা আর দেখতেই পায় না। গায়ে গিয়ে ধাক্কা দিলেও টের পায় না। উদাস হয়ে শুধু শুনতে থাকে। কেন যে এমন হয় তা অবশ্য বিল্লু জানে না।

শেয়ালদা স্টেশনে ওই বাজিয়ে ভিক্ষে করত একসময় বিল্লু। যতক্ষণ ও বাজাত লোকজন থ হয়ে থেমে শুনত। তারপর শেষ হলে নড়েচড়ে উঠে যার যার কাজে যেত। পয়সা আসত না বিশেষ।

তা ওই বাজনার কাজ দেখেই তো সুরিন্দর ওকে তুলে আনল দলে! বলে ও দিয়ে ভিক্ষের চেয়ে অনেক বেশি রোজগার করতে পারবে বিল্লু। কথাটা অবশ্য মিথ্যে নয়। কাজকর্ম শিখেপড়ে নিয়ে আয়রোজগার তার অনেকটাই বেড়েছে আজকাল। বাজাতে বাজাতে পছন্দসই কোনো পকেটে হাত গলিয়ে মানিব্যাগটা তুলে নিলেই হল। টেরও পাবে না।

সুরিন্দর লোক খারাপ নয়। মাঝেমধ্যে মারধোর করলেও সর্দার হিসেবে নিজের কাজটা ঠিকঠাক করে। পুলিশের হাত থেকে বাঁচানো, রোজগার থেকে ওদের হিস্যে দেয়া, সব। ফলে বিল্লুর এখন বেশ ক’টা ভালো জামাকাপড় হয়েছে। পয়সা বাঁচিয়ে একটা স্মার্টফোনও কিনেছে শেয়ালদা উড়ালপুলের তলা থেকে। অবশ্য কাজে আসবার সময় ছেঁড়া জামাপ্যান্টের মেক আপটা ওকে নিতেই হয়।

আজকে মাউথ অর্গ্যান একটা মজার সুর ধরেছে। বেশ হালকা ফুরফুরে চাল। লোকজন সব খুশিখুশি মুখে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। লঞ্চ চলেছে নদী বেয়ে নিজের মনে। বাজাতে বাজাতে বিল্লু আস্তে আস্তে ভিড়ের মধ্যে দিয়ে আলখাল্লা পরা লোকটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। আজ আর ছোটোখাটো কাজে মন নেই তার।

লোকটা রেলিঙে ভর দিয়ে পাথরের মত দাঁড়িয়ে আছে নদীর জলের দিকে চেয়ে। বিল্লু আস্তে আস্তে তার কাছে এগিয়ে গিয়ে, এক হাতে মাউথর্গ্যানটা বাজাতে বাজাতে অন্য হাতটা তার আলখাল্লার জেব-এর মধ্যে শুধু একপলকের জন্য ঢুকিয়ে দিল। সুরিন্দর চাচার শিক্ষা। বলে পাখির পেটের তলা থেকে তার ডিম নিয়ে আসতে পারে চাচা। পাখি টের পায় না। মানুষ তো কোন ছাড়। চোখের পলক ফেলতে না ফেলতে থলেটা বিল্লুর হাতে চলে এল। গোলাঘাটের লঞ্চঘাটায় ভিড়ছে লঞ্চ। এই অবধি বিল্লুর এলাকা। এখান থেকে সুলেমান উঠবে। দূরে জেটির ওপর তাকে দেখা যাচ্ছিল। আনমনে এদিক ওদিক হাঁটছে।

থেমে থাকা ভিড়টার মধ্যে দিয়ে বাজনাটা বাজাতে বাজাতেই জেটির দিকে এগিয়ে গেল বিল্লু। তারপর চলন্ত লঞ্চ থেকে টুক করে একটা লাফ দিয়ে নেমে এল সে। তার খেয়াল হল না, থেমে থাকা মানুষজনের মধ্যে একজন মানুষ হঠাৎ মুখ এগিয়ে তীক্ষ্ণ চোখে দেখল তার ঘাড়ের দিকে। মাউথ অর্গ্যানের জাদু তার ওপর কাজ করেনি। বাজনা শুনতে শুনতেই আলখাল্লা পরা সে মানুষটার মুখে তখন একটুকরো হাসি ফুটে উঠেছে। যেন ভীষণ কোন দুশ্চিন্তা শেষ হয়েছে তার এমনিভাবে একটা লম্বা শ্বাস ফেলল সে।

ততক্ষণে সুলেমানের দিকে একটুকরো হাসি ছুঁড়ে দিয়ে মাউথ অর্গ্যান পকেটে ভরে লম্বা লম্বা পায়ে জেটি ছেড়ে অন্ধকার রাস্তায় পা দিয়েছে বিল্লু। বাজনা থামতে লোকজনও নড়েচড়ে উঠে একে একে নেমে আসছে এবার।

খানিক বাদে লঞ্চ হাওড়ার দিকে রওনা হতে তার ওপর থেকে একটা ব্যাপার দেখে একটু চমকেই উঠেছিল সুলেমান। বিল্লু জেটিতে ফিরে এসেছে! এমনটা হবার কথা নয়। ওর তো এখন ঘাঁটিতে গিয়ে রোজগার জমা দিয়ে ঘুমিয়ে টুমিয়ে ফের সকালের ফিরতি লঞ্চে কাজ করবার কথা! তাহলে?

তবে সে নিয়ে বেশিক্ষণ মাথা ঘামাবার সময় ছিল না তার। হাতে সময় কম। নিজের কাজ সামলাতে হবে আগে। অন্যের ব্যাপার নিয়ে পরে ভাবা যাবে’খন।

জেটিতে উঠে এসে এদিকওদিক চেয়ে দেখল একবার বিল্লু। লঞ্চ চলে গেছে। আলখাল্লা পরা লোকটা নামেনি এখানে। হাওড়া গিয়ে ট্রেন ধরবে নিশ্চয়! হঠাৎ ফিক করে একটু হেসে ফেলল সে। লোকটা যখন টের পাবে, তখন তার মুখটা কেমন হবে সেই ভেবে।

দূরে সাড়ে আটটার আহিরিটোলার লঞ্চটা আসছিল হাওড়া থেকে। সেদিকে তাকিয়ে পকেটে হাত দিয়ে থলেটা একবার ছুঁয়ে দেখে নিল সে। কী আছে ওতে কে জানে! ওটা তার এখন জমা করে দেবার কথা ছিল। অথচ…

একটা ভীষণ ইচ্ছে হচ্ছিল তার জিনিসটাকে খুলে একটিবার দেখতে। অনেক কষ্টে লোভটা সামলাল বিল্লু। এখন নয়। রেশমি কাপড়ের গায়ে জরির কাজ করা দামী বটুয়া। তার মত পোশাকের ছেলের হাতে ওটা দেখলে লোকজনের সন্দেহ হতে পারে।

হাওড়াগামী লঞ্চের এক কোণে বসে আলখাল্লা পরা মানুষটা তখন তাঁর পোশাকের অন্য একটা জেব থেকে  টেনিস বলের আয়তনের স্ফটিকের গোলা বের করে এনে ক্লান্ত চোখে সেটার দিকে তাকিয়েছিলেন। কেউ উঁকি দিলে দেখতে পেত, তার মধ্যে মৃদু সবজেটে আলোয় ছোট্টো একটা ছেঁড়া জামাপ্যান্ট পরা ছেলের মূর্তি একটা নির্জন জেটিতে পায়চারি করছে। ক্লান্ত লাগছিল কাইকরের। ঘাঁটিতে না গিয়ে পুঁটুলিসহ ফিরিয়ে আনা গেছে একে। তবে তার জন্য যথেষ্ট শক্তি খরচ করতে হয়েছে তাঁকে। অত্যন্ত সাবধানে, খুব হালকা কিছু মানসিক স্পর্শে…

পুঁটুলিটা অন্য কারো হাতে যাওয়া উচিত নয়। যোগাযোগ কেটে যাবে। একে তিনি হারাতে চান না। পরাধীন ভারতবর্ষের স্বার্থে। না! ওই ভিখিরির চেহারাতেও তাঁকে ফাঁকি দিতে পারেনি বীরোল। চেহারার মিলটা দেখে প্রথমেই সন্দেহ হয়েছিল তাঁর। তারপর যখন মাউথ অর্গ্যানে ফুঁ দিল, ওর মধ্যে মিশে থাকা হিপনোটগুলোকেও চিনে নিতে ভুল হয়নি তাঁর।

তবে এ সবই পরোক্ষ প্রমাণ। চেহারায় মিল সমাপতন হতে পারে। হিপনোটগুলোও প্রাকৃতিক। অনেকেই পারে। র জন্য জাদুশক্তির প্রয়োজন হয় না। আধুনিক যুগের সূচনায় ইউরোপে জাদুবিজ্ঞানের নবজাগরণের পরে মেইজট, বাটফিরেন বা আলাদি খান সাহেবের মত গবেষকরা সেগুলোকে সংগ্রহ করে নিদ্রাগীতির স্বরলিপি বানিয়েছেন শুধু। কাজেই এর মাউথ অর্গানে ওই সম্মোহনী সুরের টুকরোগুলো থেকে কিছুই নিশ্চিতভাবে প্রমাণ হয় না।

কিন্তু ঘাড়ের চামড়ার ঠিক নীচে ওই গ্রন্থিটা!  সাদা চোখে ধরা পড়বে না। কিন্তু সুষুম্নার গোড়ায় উন্নততম জাদুশক্তির আধার ওই গ্রন্থির মৃদু রাইমিন বিচ্ছুরণ তাঁর শিক্ষিত অনুভূতিকে এড়িয়ে যেতে পারেনি।

এ-গ্রন্থি কোটিতে একটা মেলে না। প্রকৃতির বিচিত্র খেয়ালে প্রতি শতাব্দিতে একজন বা দুজন ভাগ্যবানের তা জুটে যায়। কোন উত্তরাধিকারী তা পেলে পৃথিবীজোড়া ব্রিটিশসাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দু খোদ বাকিংহাম প্যালেসও ধন্য হয়ে যাবে।

প্রকৃতির এ দান মানুষ তার সমস্ত বিদ্যা দিয়েও অনুকরণ করতে শেখেনি এখনো। হ্যাঁ। একুশ শতকের উন্নততম জাদু মানুষকে মহাকাশেও পৌঁছে দিয়েছে। কিন্তু তবু রাইমিন নার্ভের ওই পুঁটুলির রহস্য এখনো দুনিয়ার মালিক ব্রিটিশের গভীরতম জাদুরও নাগালের বাইরেই থেকে গেল!

স্ফটিকের ভেতরের ছবি বদলে গেছে। ফের গঙ্গা পেরোচ্ছে ও। নিজের ডেরায় ফিরে যাচ্ছে। সাবধানী চোখে ভয়ে ভয়ে এদিকওদিক তাকাচ্ছে বারবার।

একটা ছিঁচকে চোর! বীরোল! লঞ্চ থেকে নেমে সাবওয়ে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ নিজের মনেই হো হো করে হেসে উঠলেন কাইকর। আর তারপরেই সাবধান হয়ে গেলেন তিনি। হালকা হাসির সময় এ নয়। একে সঙ্গে নিয়ে ফিরতে হবে। সাধারণ কোন মানুষ হলে একটা সামান্য জাদু মুদ্রাতেই কাজ হয়ে যেত। কিন্তু একে সেভাবে বশ করা যাবে না।

এই জাদুহীন বিশ্বে এ ছেলে নিজের শক্তিকে জানে না। জানবার কথাও নয়। তবু রাইমিনের রাজটিকা যার শরীরে তার মুখোমুখি হওয়া সহজ নয়। ওকে নিয়ে যেতে জাদুর সরাসরি ব্যবহার করা বিপজ্জনক হতে পারে। সরাসরি ম্যাজিকের মুখোমুখি হলে তার ঘায়ে হঠাৎ সে ঘুমন্ত শক্তির বিস্ফোরণের ভয় আছে। শক্তির অনুরণন! তার অনিয়ন্ত্রিত বিচ্ছুরণের আঘাত থেকে বাঁচবার ক্ষমতা স্বয়ং ভাইসরয় লুসগ্রাম তিনিগলেরও নেই। ওকে অন্যপথে ধরতে হবে, কৌশলে বাধ্য করতে হবে সুড়ঙ্গ ব্যবহার করতে। হাতে সময় নেই বেশি।

সাবওয়ের এদিকটার একটা বাঁকের মুখে আলোটা জ্বলছে না। মানুষজন অন্ধকার জায়গাটাকে ছেড়ে আলোকিত জায়গাগুলো দিয়ে হেঁটে চলেছে। তাদের নজর এড়িয়ে আস্তে আস্তে  জায়গাটার দিকে এগিয়ে গেলেন কাইকর। তাঁর কালো আলখাল্লা মিশে গেছে অন্ধকারের সঙ্গে। মাথার ওপর তুলে ধরা তাঁর হাত প্রকৃতির কোন গোপন শক্তিভাণ্ডারের সঙ্গে তাঁর শরীরের সংযোগ স্থাপন করছিল। মৃদুগলায় উচ্চারিত দুতিনটে শব্দ; শক্তিভাণ্ডারকে জাগিয়ে তোলবার পাসওয়ার্ড…

…এক মুহূর্তের জন্য একটা চাপা, নীলাভ আলো ছড়িয়ে গেল জায়গাটায়। টহলে বের হওয়া এক পাহারাদার চোখের কোণে তার আভাস পেয়ে একঝলকের জন্য সেদিকে তাকিয়েছিল। সেখানে আলো-আঁধারির মধ্যে একতাল অন্ধকারকে মাটির সঙ্গে মিশে যেতে দেখেছিল যেন সে। তাড়াতাড়ি সঙ্গের টর্চ থেকে শক্তিশালী একটা আলোর ঝলক ছুঁড়ে দিল সে জায়গাটার দিকে। তারপর বোকাবোকা চোখে আলোয় ধুয়ে যাওয়া ফাঁকা জায়গাটার দিকে একটুক্ষণ তাকিয়ে রইল খানিকক্ষণ। চোখের ভুল? তা-ই হবে।

কেষ্টপুর খালের এদিকটা ছায়াছায়া অন্ধকার। চার নম্বর ট্যাঙ্কের সামনে বাস থেকে নেমে হাঁটতে হাঁটতে বিল্লু ফুটব্রিজের এ পাশটায় এসে দাঁড়াল। সাড়ে ন’টা মত বাজে বোধ হয়। জায়গাটা নির্জন হয়ে গেছে। ভারী অস্বস্তি হচ্ছিল তার। গোলাঘাটের কালেকশান সেন্টারে পুঁটুলিটা জমা করে আসবার কথা ছিল। সেটাই নিয়ম। শিফট শেষ হলে সবচেয়ে কাছের ঘাঁটিতে মাল জমা দেয়া। এ নিয়ম ভাঙলে সুরিন্দর বেজায় রেগে যায়। সুরিন্দরের কথা মনে পড়তে ম্লান একটা হাসি ফুটে উঠল বিল্লুর মুখে। কপালে অনেক দুঃখ আছে তার। কেন যে হঠাৎ এমন ইচ্ছেটা হল আজ! হঠাৎ মনে হল, পুঁটুলিটা সে জমা দেবে না। কিছুতেই না।

ব্যাপারটা অন্যায়। অবুঝ ইচ্ছেটাকে বাগ মানাবার অনেক চেষ্টাও করেছিল বিল্লু। কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। ঘাঁটির দিকে যেতেযেতেই কোন অদৃশ্য শক্তি যেন তার পা-দুটোকে নিজের থেকেই ঘুরিয়ে দিল ফের লঞ্চঘাটের দিকে।

ফুটব্রিজ পেরোলেই ওপাশের উড়ালপুলের নিচে তার আস্তানা। সিঁড়ির দিকে পা বাড়িয়েও ফের নেমে এল বিল্লু। ওরা তার আস্তানা চেনে। সাড়ে সাতটায় কাজ শেষ হয়েছে। এখন সাড়ে নটা। ঘাঁটিতে রিপোর্ট না করে এতক্ষণ একটা ছেলে উধাও থাকলে সুরিন্দর খুঁজতে লোক পাঠাবেই।

সুলেমান তাকে গোলাঘাট জেটিতে নামতে দেখেছে। অতএব প্রথম খোঁজ ওদিকে হবে। থানা, হাসপাতাল কোথাও যখন পাবে না, তখন তার আস্তানাতেও উঁকি মারবে ওরা। কথাটা ভাবতেই একটু শিউরে উঠছিল বিল্লু। সুরিন্দরের ফ্ল্যাট লেকটাউনে। যদি নিজেই চলে আসে দলবল নিয়ে খুঁজতে? বা, যদি ল্যাংড়াকে পাঠায়? ল্যাংড়া মারবার আগে হাতে লোহার আংটি পরে তাতে রুমাল জড়িয়ে নেয়। ওতে গায়ে দাগ পড়ে না।

একটা ঝাঁকুনি দিয়ে চিন্তাটাকে মাথা থেকে সরিয়ে দিল বিল্লু। আগে তাকে জানতে হবে থলেটা তাকে এমন করে টানছে কেন? আছেটা কী ওতে? সাবধানে ঢোলা জামার নীচে হাত দিয়ে সেটাকে একবার ছুঁয়ে দেখে নিল বিল্লু। তারপর সিঁড়ির পাশ দিয়ে নেমে গেল খালপাড়ের অন্ধকারে। এখানে অনেক ঝোপঝাড়। বিল্লু তার অন্ধিসন্ধি চেনে।

একটা টগরের ঝার হয়ে আছে এখানটা। পায়ের নীচে স্যাঁতসেঁতে, ভ্যাপসা গন্ধ মাখা মাটি কাত হয়ে নেমে গেছে ঘোলা জলের দিকে। এখান থেকে বাঁহাতি খানিক এগোলে একটা বড়ো রাধাচুড়ার গাছ আছে। ওর গোড়ায় মাটি শক্ত। ঝোপঝাড়ও আছে খানিক চারপাশে। আস্তানায় জায়গার ভাগ নিয়ে মধ্যে একদিন মাঝরাত্রে মারপিট হল। বোমাটোমাও পড়েছিল দু’একটা। তখন হানাপাড়ার ভুবনদা ওকে ছুরি নিয়ে তাড়া করেছিল। পুল পেরিয়ে এসে বিল্লু তখন ভয়ের চোটে লুকোতে গিয়ে এই জায়গাটা খুঁজে বের করে।   

টগরের ঝারটা ডানহাতে ধরে ব্যালেন্স করে এগোতে যাবে, ঠিক তখন মাথাটা একেবারে ঝনঝন করে উঠল বিল্লুর। ঘাড়ের কাছে তীব্র একটা ব্যথা হঠাৎ ঝিলিক দিয়ে উঠেছে। দু’হাতে মাথাটা চেপে ধরে কাদার মধ্যেই বসে পড়ল বিল্লু। মাথার ভেতর কেমন একটা ওলটপালটের অনুভূতি। চোখের সামনে হঠাৎ একটা কুয়াশার পর্দা নেমে এসেছে যেন।

চুপ করে একটুক্ষণ বসে রইল সে। ব্যথাটা যেমন হঠাৎ করে এসেছিল ঠিক তেমন হঠাৎ করেই থেমে গেছে। চোখের ঝাপসা ভাবটাও কেটে গেছে ওই সঙ্গে। খালের উলটোদিকের রাস্তায় গাড়িদের আলোগুলোর আসা-যাওয়া ফের একবার পরিষ্কার।

অন্ধকারের মধ্যে একদলা গাঢ় অন্ধকারের মত ছোট্টো শরীরটা এগিয়ে গিয়ে রাধাচুড়া গাছটার তলায় বসেছে। কাইকর সাবধানে স্ফটিকটাকে এবার নিজের চোখের সামনে তুলে ধরলেন। মাত্রই একমুহূর্তের সরাসরি সংযোগ। এর স্মৃতির একটা প্রতিলিপি বের করে আনা। তবু ওইটুকু আঘাতেই যেভাবে ওর জাদুগ্রন্থি সাড়া দিয়ে উঠল তাতে একমুহূর্তের জন্য আতঙ্ক হয়েছিল তাঁর। পড়াশোনা এগোয়নি কাইকরের। সাধারণ নাগরিক জাদুর বাইরে তাঁর ক্ষমতা নেই বিশেষ। এ শক্তির বিস্ফোরণ ঘটে গেলে তাকে সামলানো তাঁর সাধ্যের বাইরে ছিল।

একটু বাদে স্ফটিকটার দিকে তাকিয়ে মৃদু একটা হাসি ছড়িয়ে পড়ল তাঁর ঠোঁটে। ঝুঁকি নেয়াটা বিফল হয়নি। বিপ্লবীর জীবন। জন্মভূমিকে স্বাধীন করবার জন্য যেকোন ঝুঁকিই তাঁর কাছে স্বাগত। এর স্মৃতি তাঁর এবারের কাজটায় সাহায্য করবে। স্ফটিক গোলকটাকে নিজের কপালে আলতো করে ঠেকিয়ে ধরলেন তিনি। চোখের সামনে ছবি ফুটে উঠছে কিছু। নিজের মা বাপকে দেখেনি কখনো ও। বড়ো ভয়ে ভয়ে থাকে। উড়ালপুলের তলার একচিলতে জায়গা হারাবার ভয়, কাজ করতে গিয়ে মানুষজনের মারের ভয়—সুরিন্দর—

হঠাৎ সামনে ফুটে ওঠা ছবিটাকে স্থির করে দিলেন কাইকর। ছেলেটার গভীর আতঙ্কের স্মৃতি কুয়াশার মতো জড়িয়ে আছে সুরিন্দর নামের মানুষটার ছবিটাকে। একে দিয়ে কাজ হতে পারে।

আস্তে আস্তে ছবিটাকে অবলম্বন করে ছেলেটার স্মৃতিতে ডুব দিচ্ছিলেন কাইকর…লোকটার ঠিকানা, কাজকর্ম… তার যতটুকু আছে এর স্মৃতিতে….

…বিরাট চেহারার মানুষটা কি সাঙ্ঘাতিকভাবেই না মারছে ছেলেটাকে! লাথির পর লাথি এসে পড়ছে ছোট্ট শরীরটার ওপরে। একটা ন্যাকড়ার পুতুলের মতই ঘরটার এদিক থেকে ওদিকে গড়িয়ে যাচ্ছে তার শরীরটা। কপালের দুপাশের শিরাদুটো দপদপ করে উঠছিল তাঁর। ভিখারি বিল্লু—না না–বিপ্লবী অনৌসিকের ছেলে বীরোল—নিজের বিশ্বে এভাবে তার গায়ে কেউ হাত দিলে সে হাতটা তিনি—

একটা ঝাঁকুনি দিয়ে নিজেকে সংযত করলেন কাইকর। ফুটব্রিজের ওপরের এই জায়গাটা থেকে নীচের অন্ধকারে গাছটার গোড়ায় ছেলেটার মৃদু নড়াচড়া তাঁর তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে ঠিকই ধরা পড়ছিল। ওর সবচেয়ে দুর্বল জায়গাটার খোঁজ পেয়ে গেছেন তিনি। হ্যাঁ। জাদু দিয়ে ওকে বশ করবার বিপজ্জনক চেষ্টা আর নয়। এই পথেই কাজ উদ্ধার করতে হবে তাঁকে।

পুলের এক কোণে শুয়ে থাকা ভিখিরিটা ঘুমঘুম চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে দেখছিল। একনজর সেদিকে তাকিয়ে দেখলেন তিনি। নিজের আসল শক্তির কোনরকম সাক্ষি এখানে ছেড়ে যাওয়া অনুচিত হবে। যাতায়াতের সুড়ঙ্গ সরকারের হাতেও আছে। দেশজোড়া বিদ্রোহের আগুন জ্বলেছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে। এ-সময়ে সরকারী গোয়েন্দা বিভাগ অনেক বেশি সতর্ক। গা ঢাকা দেয়া বিপ্লবীদের সন্ধানে বিভিন্ন সমান্তরালে তার এজেন্টদের উপস্থিতিও বাড়ানো হচ্ছে। জীবিত বা মৃত অবস্থায় তাঁর মাথার ওপর চড়া দাম হেঁকে রেখেছে সরকার। যা করবার সাবধানে করতে হবে এখানে। 

আলখাল্লার আড়াল থেকে ডানহাতের তর্জনিটা একবার ভিখিরিটার দিকে বাড়িয়ে ধরলেন কাইকর। একেবারেই সাধারণ, মাধ্যমিক স্তরের জাদু। আগে থেকে না জানলে তাকে জাদু বলে চেনা সম্ভব নয়।

ফল হল প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই। বড়ো আরামে চোখদুটো বুজে এসেছে মানুষটার। সেদিকে একনজর তাকিয়ে দেখে নিলেন তিনি। তারপর ফুটব্রিজের ওপর থেকে হঠাৎ করেই মিলিয়ে গেল তাঁর শরীরটা। অবিশ্বাস্য গতিতে ভেসে চলা অদৃশ্য শরীরটা তখন এগিয়ে যাচ্ছিল লেক টাউনের একটা বিশেষ ফ্ল্যাটের দিকে।

***

“ছেলেটার খবর পাওয়া গেল?”

ফ্ল্যাটবাড়িটার নীচে এইখানটা অন্ধকার। আসল ব্যাবসার লোকজনকে সুরিন্দর সাধারণত তার ফ্ল্যাটে ধারেকাছে আসতে দেয় না। এখানে সে গণ্যমান্য একজন ট্যুর অপারেটর। তার সুনামের দাম আছে।

আজ অবশ্য উপায় নেই। কতক্ষণ এই খোঁজাখুঁজির হাঙ্গাম চলে কে জানে। দলের একটা ছেলে এভাবে হারিয়ে যাওয়া ভালো চিহ্ন নয়। দলের অনেক খবর রাখে এ। লোকাল থানাকে ভয় নেই। ব্যবস্থা করা আছে। কিন্তু লালবাজারের ক্রাইম ব্রাঞ্চের কোন টিমের হাতে পড়লে—

সুরিন্দর তাই ঘরে তালা দিয়ে এইখানটায় নেমে এসে দাঁড়িয়েছে। অসহায়ভাবে হাতদুটো ঘষছিল সে। পুলিশ হতে পারে। আবার অন্যকিছুও হতে পারে। এই রাস্তার ভিখিরিগুলোকে বিশ্বাস করা যায় না। সুলেমান খবর দিয়েছে ওর হাতে একটা ভারী পুঁটুলি দেখেছে সন্ধেবেলা। বড়ো কোন দাঁও মেরেছে। নিয়ে কেটে পড়বার চেষ্টা করছে না তো?

কথাটা মনে হতে ঠোঁট চেপে একটু হাসল সুরিন্দর। তা যদি হয়… তাহলে  পালাবে কোথায়? আগের বার সোনার নেকলেসটা নিয়ে পালাবার পর ভিখুকে খুঁজে বের করতে পাঁচদিন সময় লেগেছিল তার। ঠুঁটো হয়ে এখন পাইকপাড়া ব্রিজের তলায় ভিক্ষে করে। নেমকহারামি সুরিন্দর সহ্য করে না। তা সে যত ওস্তাদ আর্টিস্টই হোক না কেন!

“না,” ল্যাংড়া মাথা নাড়ল একবার, “ঝুপড়িতেও নেই। ভালো করে দেখে এসেছি। ওখানে ফেরেনি। গেল কোথায়?”

“যাবে আর কোথায়? ঠিক খুঁজে বের করব। রাতটা যাক। আরে—এটা আবার কে?”

একেবারে গায়ের ওপর এসে হুমড়ি খেয়ে দাঁড়ানো কালো আলখাল্লা পরা মানুষটা তার দিকে তাকিয়ে আলগা একটু হাসল।

“কী চাই? ভিক্ষেটিক্ষে এখানে—”

“কিছু চাই না সুরিন্দরবাবু। একটা জিনিস দেবার আছে। একটা খবর।”

“আমায় তুমি-”

“চিনি। ভালো করেই চিনি। বলত বলতেই সুরিন্দরের পেছনদিকে একটা হাত বাড়িয়ে মানুষটা বিদ্যুতগতিতে ল্যাংড়ার পকেটে ঢোকানো হাতটা চেপে ধরেছে, “মেশিনটা বের না করে আমার কথা শোন। উপকার হবে।”

একটা আর্তনাদ করে উঠল ল্যাংড়া। মানুষের আঙুল এমন লোহার মত শক্ত হতে পারে না। হাতটা আস্তে আস্তে তার মুঠোর থেকে অস্ত্রটাকে খুলে নিচ্ছিল তীব্র যন্ত্রণা দিয়ে।

খানিক বাদে ধাতব যন্ত্রটাকে নিয়ে সেটাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতেদেখতেই মানুষটা নীচুগলায় বলল, “আমার কাছে তোমার ছেলেটার খবর আছে।”

“তুমি—আ-আপনি—”

“আমি কে সে নিয়ে তোমার মাথা না ঘামালেও চলবে সুরিন্দর,” সাবধানে—খুব সাবধানে—গলার স্বরে একটা দুটো হিপনোট মিশিয়ে দিচ্ছিলেন কাইকর। প্রায় নিজেদের অজান্তেই শান্ত হয়ে আসছে লোকদুটো। তাঁকে বিশ্বাস করছে। পরে, প্রভাব কেটে গেলে এ নিয়ে একটু অবাক হলেও সন্দেহ করবে না বলে আশা করা যায়।

“যে জন্য এসেছি সেটা বলি। তোমার ছেলেটা কোথায় লুকিয়েছে আমি জানি। আর এ-ও জানি, তাড়াতাড়ি তুমি কিছু না করলে আইবি-র যে দলটা তোমার ওপর নজর রাখছে গত দু’মাস ধরে, ও তাদের হাতে চলে যাবে। এইমুহূর্তেও জায়গাটায় ওদের কয়েকজন সাধারণ পোশাকে এসে জড়ো হচ্ছে।”

লোকটা অনেককিছু জানে। কেমন করে? সুরিন্দর সাবধানে নিজের পকেটের দিকে হাতটা বাড়িয়ে দিতে গিয়েও একটা ঝাঁকুনি খেয়ে থেমে গেল। তার হাতের দিকে তাকিয়ে একমুহূর্তের জন্য যেন ঝলসে উঠেছে লোকটার চোখ দুটো। আর সঙ্গেসঙ্গেই একটা অবুঝ, যুক্তিহীন ভয় মনের গভীর থেকে উঠে এসে সাপের মত পেঁচিয়ে ধরল তার মনটাকে। এর সঙ্গে যাওয়া দরকার তার। দেরি করা যাবে না আর। বিল্লুকে এখনই  ফিরিয়ে না আনতে পারলে…

…আর ভাবতে পারছিল না সুরিন্দর। মানুষটা তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। পকেট থেকে হাতটা সরিয়ে এনে এবার সে নীচু গলায় বলল, “জায়গাটা দেখিয়ে দিন শুধু। খুশি করে দেব।”

“বলছি। ফুটব্রিজের তলায় নেমে……”

কয়েক মুহূর্ত বাদে ফ্ল্যাটের সামনে থেকে ধেয়ে যাওয়া স্কুটারটার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন কাইকর। তারপর রাস্তার অন্যদিকের অন্ধকার কোণটার দিকে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

থলেটার মুখ একটা রেশমি সুতো দিয়ে বাঁধা। অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে সেটার ফাঁস আলগা করে ভেতরে হাত চালিয়ে একটু হতাশ হল বিল্লু। গুটিকয়েক ছোটো নোট, কয়েকটা খুচরো পয়সা, আর একটা ভারী বল। শক্ত। বোমাটোমা নয় তো? খুব সাবধানে জিনিসটার গায়ে আঙুল বুলিয়ে দেখে নিল বিল্লু। কাচের মত মসৃণ! বোমা এরকম হয় না।

আস্তে আস্তে জিনিসটাকে পুঁটুলি থেকে বের করে আনল সে। আর তারপরেই চমকে উঠল। বাইরে আনতেই হালকা সবজেটে হয়ে উঠছে কালো জিনিসটা। তার মধ্যে আবছায়া কিছু একটা নড়াচড়া করছে দেখা যায়। তাড়াতাড়ি জিনিসটাকে দু’হাতে ধরে চোখের কাছে নিয়ে এল সে।

তার হাতের তালুর ছোঁয়া পেয়ে জিনিসটার আলো খুব তাড়াতাড়ি উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল। উজ্জ্বল, কিন্তু মোলায়েম। বলটার বাইরে তার একটা ফোঁটাও ছড়িয়ে যাচ্ছে না! ভারী মজার জিনিস। সম্ভবত কোন নতুন, দামি খেলনা। আজকাল তো রোজই কত আশ্চর্য জিনিস বের হচ্ছে। কিন্তু, গেঁয়ো লোকটা এ-জিনিস পেল কোথায়?

জিনিসটার ভেতরের আবছায়া ছবিটা ততক্ষণে একটু স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একটা জঙ্গুলে জায়গা। হালকা হাওয়ায় ঝোপঝারগুলো নড়ছে… না, শুধু ঝোপঝাড় নয়। জায়গাটার কাদাটে মাটির একটা জায়গাও নড়ছে একটু একটু। নড়ছে, আর সেই সঙ্গে সঙ্গে কাদার একটা স্তূপ ঢেউয়ের মত উঁচু হয়ে উঠছে ওপরের দিকে….আস্তে আস্তে ভেঙেচূরে একটা মানুষের মত চেহারা নিচ্ছিল সেটা।     

জিনিসটা তাহলে একটা নতুন মডেলের ভিডিও গেম। দামি হবে খুব। একটা ম্লান হাসি ফুটে উঠছিল বিল্লুর ঠোঁটে। এটা নিয়ে যদি সুরিন্দরের কাছে যায়ও সে, তাহলেও সে বিশ্বাস করবে না। বলবে আসল মাল সরিয়ে দিয়ে ফ্যান্সি মার্কেটের একটা সস্তা গেম এনে—

কেন যে সে তখন ঘাঁটিতে না ফিরে এভাবে চলে এল! এবার? এ-শহরের কয়েকটা বাঁধা জায়গা বাদে দুনিয়ার আর কোন জায়গার খবর তার জানা নেই। আজ হোক, কাল হোক সুরিন্দর তাকে ধরবেই। আর তারপর…

…তাদের সামনে বসিয়ে, দেখিয়ে দেখিয়ে ভিখুর হাত পাগুলো মুচড়ে ভেঙেছিল সুরিন্দর! মাল নিয়ে পালাবার শাস্তি। কথাটা ভাবতেই মেরুদণ্ডের মধ্যে দিয়ে একটা কাঁপুনি ছড়িয়ে গেল তার। আর তারপরেই হাতে ধরা বলটার ভেতরে একটা জিনিস নজরে পড়ে একেবারে স্থির হয়ে গেল সে। জিনিসটা কোন গেম নয়! অন্ধকারের মধ্যেও ফুটব্রিজের গোড়াটাকে স্পষ্ট চেনা যাচ্ছে সেখানে। সেটাকে পেছনে রেখে অন্ধকার আলখাল্লা পরা লোকটা আস্তে আস্তে শিকারী প্রাণীর মত  এগিয়ে আসছিল… 

গলা থেকে একটা চাপা আর্তনাদ বের হতে গিয়েও মাঝপথে সেটা আটকে গেল বিল্লুর। বাঘের মত ঝাঁপ দিয়ে এসে হঠাৎ দুটো শক্তপোক্ত হাত তার মুখটাকে চেপে ধরেছে পেছন দিক থেকে এসে। তার কানের কাছে একটা ভারী আওয়াজ নীচুগলায় বলছিল, “আওয়াজ কোরো না। ফুটব্রিজের ওপরে দেখ।”

বলতে বলতেই তার শরীরটাকে চেপে ধরে রেখে হাতদুটো তার মাথাটাকে ঘুরিয়ে ধরেছে ফুটব্রিজের দিকে। সেখানে সুরিন্দরের অন্ধকার চেহারাটা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে।

“ল্যাংড়া এই মুহূর্তে ফুটব্রিজের সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছে। ও তোমার লুকোবার জায়গাটার খবর জানে।” লোকটার গলা আশ্চর্যরকম শান্ত। যেন গল্প করছে তার সঙ্গে। “ওরা দুজনেই অস্ত্র নিয়ে তৈরি হয়ে এসেছে। আর কয়েক মিনিটের মধ্যে এখান থেকে সরে না গেলে..”

বিল্লু কোন কথা বলল না। ল্যাংড়াকে তারা দোপেয়ে হাউন্ড বলে ডাকে আড়ালে। তাকে ফাঁকি দেয়ার ক্ষমতা তার নেই। শুধু দু’ফোঁটা গরম জল এসে পড়ল লোকটার হাতের ওপর। 

“আমি একটা জায়গা জানি। তুমি চাইলে…”

কথাটা বলতে বলতেই লোকটা তার মুখের ওপর থেকে হাতটা সরিয়ে নিয়ে জড়িয়ে ধরে তুলে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে তাকে।

“তুমি কে?”

“শ-স্‌-স্‌–শোনো—”

বলতে বলতে ঠোঁটে আঙুল দিয়ে পেছনের দিকে ইশারা করল মানুষটা। সেখানে অন্ধকারের মধ্যে অনেকটা দূরে একটা টর্চের আলো জ্বলে উঠেছে হঠাৎ। এদিক ওদিক দুলছিল আলোটা। মানুষটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আলো ফেলছে চারদিকে। দূর থেকে ঝোপঝাড় ভাঙবার মৃদু মটমট শব্দ আসছিল।

“এদিক দিয়েই গেছে সুরিন্দর ভাইয়া। মাটিতে ছাপ আছে,” হঠাৎ ল্যাংড়ার  নাকিসুরের কথাগুলো রাত্রের বাতাসে ভেসে গেল। ফুটব্রিজের মাথায় দাঁড়ানো মানুষটা দ্রুতপায়ে নেমে আসছিল ব্রিজের এদিকটাতে।

ভয়ের একটা ঢেউ ছড়িয়ে গেল বিল্লুর সারা শরীরে। প্রাণপণে আলখাল্লা পরা মানুষটাকে চেপে ধরেছে সে। যেন তার আড়ালে লুকিয়ে নিজেকে বাঁচাতে চায়।

আস্তে আস্তে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন মানুষটা। তারপর শান্ত গলায় বললেন, “স্ফটিকটা বের করে হাতে নে। যা দেখবি তাতে ভয় পাস না। আমি কী করছি আমি জানি। প্রশ্ন করবি না। আমাদের হাতে সময় বেশি নেই।”

বলতে বলতেই কয়েক পা দূরে গিয়ে দাঁড়িয়ে নিজের কাছে রাখা স্ফটিকের গোলকটাকেও বের করে সামনে তুলে ধরেছেন মানুষটা। “এইভাবে ধর। বুকসমান উঁচুতে। সামনের দিকে বাড়িয়ে ধর।”

যন্ত্রের মত নিজের হাতের স্ফটিকের বলটাকেও তুলে ধরেছে ছেলেটা। তার হাতের মধ্যে আস্তে আস্তে গরম হয়ে উঠছিল জিনিসটা। গরম, আর উজ্জ্বল। চোখ ধাঁধানো তীব্র আভায় একসঙ্গে জ্বলে উঠেছে প্রাকৃতিক জাদুশক্তির আকরিক মেসমর লেন্সিং রকের খণ্ডদুটো। তার আণবিক গড়ণে ব্রহ্মাণ্ড জুড়ে বয়ে চলা সেই অজ্ঞেয়, অন্ধকার শক্তির স্রোত শক্তিশালী লেন্সের মতই প্রতিফলিত হয়ে কেন্দ্রীভূত হচ্ছিল তাদের সামনের একটা বিন্দুতে।

দূরে টর্চের আলোটা থমকে গেছে হঠাৎ। পিনিয়াল গ্রন্থি সক্রিয় না থাকলে লেন্সিং রক এর বিচ্ছুরণ দেখা সম্ভব নয়। কিন্তু এ-মুহূর্তে অকল্পনীয় শক্তির দুটো ভয়াল স্রোত দেশকালের একটা বিন্দুতে কেন্দ্রিভূত হয়ে যে থরথরো কাঁপুনি তুলেছে, তার ছোঁয়া বুঝি গিয়ে লাগছিল টর্চধারীর মস্তিষ্কের গভীরে ঘুমিয়ে থাকা পিনিয়াল গ্রন্থিতে। এ বিশ্বে সেই লুপ্তপ্রায় অঙ্গ তার অর্থ বুঝতে পারে না। কিন্তু তবু কোন অজানা ভয়ে থমকে গিয়ে সে ডাক দিল, “সুরিন্দর ভাইয়া।”

একটা মৃদু গোঙানির শব্দ পেয়ে চোখটা বিল্লুর দিকে ঘুরিয়ে ধরলেন কাইকর। স্ফটিকটাকে ধরে রেখেই থরথর করে কাঁপছে ছেলেটা। তার ঘাড়ের পেছন থেকে হালকা লালচে একটা আলো জেগে উঠছিল।

মাথাটা বরফের মত ঠান্ডা হয়ে গেল কাইকরের। খালের জলের ওপর দুই শক্তিস্রোতের আঘাতবিন্দুতে একটা কাঁপাকাঁপা রামধনু রঙের ফুটকি দেখা দিতে শুরু করেছে। দেশকালের ওই গহ্বর বড়ো হয়ে ওঠবার জন্য আরো কিছু সময় নেবে। কিন্তু সে-সময় তাঁর হাতে নেই। জাদুশক্তির বিচ্ছুরণের অনুরণনে এ ছেলের রাইমিন গ্রন্থি সচেতন হয়ে উঠছে। অকল্পনীয় ধ্বংসক্ষমতায় পৌঁছে বিস্ফোরিত হতে কয়েক মুহূর্ত সময় নেবে তা। যা করবার এর মধ্যেই করতে হবে তাঁকে।

মনস্থির করে নিলেন কাইকর। তারপর বাঁ হাতের আংটিটা আলোর ফুটকিটার ঘুরিয়ে ধরে অস্ফূট গলায় দু’একটা শব্দ উচ্চারণ করলেন। সাবধানতার সময় আর নেই এখন। প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই একটা তীব্র আলোর স্রোত আংটি থেকে বের হয়ে এসে ঘা মারল ফুটকিটার গায়ে। থরথর করে কেঁপে উঠেছে রাত্রের আকাশবাতাস। আকস্মিক তীব্র আঘাতে এক লাফে বড়ো হয়ে উঠেছে ফুটকিটা। একটা রামধনুরাঙা ঝিলিমিলি পর্দা যেন কেউ ঝুলিয়ে দিয়েছে খালের অন্ধকার জলের ওপর।

একটা বিরাট লাফে বিল্লুর ওপরে ছিটকে গেলেন তিনি। ব্যাপারটা ছেলেটার পক্ষে যন্ত্রণাদায়ক হবে। কিন্তু এ ছাড়া বিপদটাকে আটকাবার আর কোন পথ নেই।

হাতের আংটিটাকে তার মাথায় চেপে ধরতে অস্ফূট একটা আর্তনাদ করে তাঁর কোলেই লুটিয়ে পড়েছে ছেলেটা। চেতনাহীন শরীরটার ঘাড়ে ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসতে থাকা গ্রন্থিটার দিকে একনজর দেখে নিয়ে, তাকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে খালের জলের ওপরে একটা লাফ দিলেন কাইকর। তারপর দুলতে থাকা ঝিলিমিলি পর্দাটা  হঠাৎ এগিয়ে এসে বাতাসে ভাসমান শরীরদুটোর চারপাশে জড়িয়ে গিয়ে মিলিয়ে গেল রাতের অন্ধকারের সঙ্গে।

দ্বিতীয় অধ্যায়
এনকাউন্টার

“জাদুবিদ্যার মত যন্ত্রবিদ্যাও একটি বিজ্ঞান। বন্ধুগণ, মধ্যযুগের যন্ত্রবিদ বিজ্ঞানী গ্যালিলিওর অর্জিত প্রাচীন, রহস্যময় সেই জ্ঞানের সাধনাকে আজও যে কজন মানুষ নিরন্তর সাধনায় উন্নততর করে চলেছেন, আপনাদের সামনে এখন উপস্থিত হচ্ছেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম, মহান সাধক হাসান গ্যালিলিন…”

“লোকটার পোশাকটা দেখেছিস ত্রিকা? ওকে কী বলে জানিস?” সুষেণ মঞ্চে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে থাকা মানুষটার দিকে ইশারা করলেন একবার। ত্রিকা একদৃষ্টে সেদিকেই তাকিয়ে ছিল। দেখতেদেখতেই মাথা নাড়ল সে একবার, “আমি ইতিহাস বইতে ছবি দেখেছি। জিপসিদের পোশাক। ষোড়শ শতাব্দির অন্ধকার যুগে সবাই ওরকম পরত।”

“হুম। কী বলে ওগুলোকে বল তো?”

“জামা আর ট্রা— কী যেন?”

“ট্রাউজার। ঠিক।” সুষেণ খুশি হয়ে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। পুলিশের চাকরি। দিনরাত্রির তফাৎ নেই। মেয়েটা যে কখন চোখের আড়ালেই বড়ো হয়ে গেল, টেরই পেলেন না। জিপসিরা লেকটাউনে তাঁবু খাটাবার পর থেকেই ত্রিকা আবদার ধরেছিল, তাকে সার্কাস দেখাতে নিয়ে আসতে হবে। আজ অনেক কষ্টে সন্ধেবেলার এই সময়টুকু বের করে তাকে নিয়ে জিপসিদের খেলা দেখতে এসেছেন।

তাঁবুর সবক’টা আলো নিভিয়ে দেয়া হয়েছে। তার ঠিক মাঝখানে জ্বলে থাকা একটামাত্র আলোর বৃত্তের মাঝখানে এসে দাঁড়ানো মানুষটার বয়স হয়েছে। কিন্তু এখনো তাঁর মেরুদণ্ড সিধে। মঞ্চে উঠে এসে হাতে ধরা একটা ছোটো লাঠি নিয়ে তিনি দর্শকদের মাথার ওপরে নিশানা করলেন। মৃদু লাল একটা আলোর বিন্দু লাঠিটার মাথায় ফুটে উঠতেই একটা মৃদু গুঞ্জন ছড়িয়ে গেল দর্শকদের মধ্যে। তাদের মাথার ওপরে, তাঁবুর ছাদের গায়ে হঠাৎ করেই ভেসে উঠেছে একটা অতিকায় টেরোডকটাইল।

ত্রিকা তার বাবার আলখাল্লায় মুখ গুঁজে ভয়ে কাঁপছিল। সুষেণ তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন একবার, “তাকিয়ে দেখ। ভয় পাস না। সব চোখের ভুল। ওদের আসলে কোন ক্ষমতাই নেই রে মা। বুনোটা ওর পোশাকের আড়ালে লুকোনো কোন জাদুস্ফটিক দিয়ে আমাদের-”

কথাগুলো মানুষটার কানে গেল বুঝি। হাতের লাঠিটাকে স্থিরভাবে ধরে রেখেই তিনি বুকের কাছে লাগানো একটা বড়োসড়ো কালো বোতামের গায়ে মৃদু চাপড় দিয়ে কথা বলে উঠলেন, “জাদু নয় মহোদয়। চোখের ভুলও নয়। প্রাচীন জিপসি বিজ্ঞান জাদুমন্ত্রের শক্তিতে দৃষ্টিভ্রম ঘটায় না। পশ্চিমের মহাদেশের যাযাবর বিজ্ঞানসাধক মাইম্যানের আবিষ্কৃত লেজার রশ্মির বিচ্ছুরণে শূন্যে যেকোন অবয়ব সৃষ্টি করা সম্ভব।”

লোকটার কথাগুলো গমগম করে ধাক্কা খাচ্ছিল সার্কাসের তাঁবুর দেয়ালে। একটুক্ষণ নাটকীয় বিরতি দিয়ে তিনি ফের বললেন, “আমি তার প্রমাণ দিতে পারি। তার জন্য একজন স্বেচ্ছাসেবক প্রয়োজন হবে আমার।”

বলতে বলতেই একজন সহকারীর হাতে লাঠিটা ধরিয়ে দিয়ে তিনি নেমে এসেছেন দর্শকদের মধ্যে। সুষেণের সামনে এসে ত্রিকার মাথায় হাত রেখে বলেছেন, “এস দেখি আমার সঙ্গে।”

ত্রিকা বাবার আলখাল্লায় মুখটা একেবারে গুঁজে দিল এবার। কিছুতেই যাবে না সে। সুষেণ হাসছিলেন। ছোটোবেলায় তিনিও এমন অবস্থায় পড়েছেন। হাসতে হাসতেই মেয়েকে একটা ঠেলা দিয়ে তিনি বললেন, “বোকা মেয়ে কোথাকার। যা না! গিয়ে দ্যাখ কতো মজা।”

আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়িয়ে মঞ্চে গিয়ে দাঁড়াল ত্রিকা। তার মুখটা দুহাতে ধরে মানুষটা নরম গলায় বললেন, তুমি তো একজন জাদুকর।”

ত্রিকা বেশ গর্বের সঙ্গে মাথা নাড়ল। সবে গত বছর অভিষেক হয়ে প্রথম স্ফটিক হাতে পেয়েছে সে। পিনিয়ালের জাদুগ্রন্থি পুরোপুরি জাগাতে তার আরো দু-বছরের প্রশিক্ষণ দরকার হবে। তবে এর মধ্যেই স্ফটিকের ছোটোখাটো ব্যবহার দেখিয়ে সে মাকে মাঝেমাঝেই তাক লাগিয়ে দিতে শুরু করেছে।  

“তাহলে বলো তো, দ্বিতীয় কোনো জাদুস্ফটিকের দু’হাতের মধ্যে এলে তোমার জাদুস্ফটিক কী করবে?”

এইটা ত্রিকাকে ক্লাসে এরই মধ্যে পড়ানো হয়েছে। ক্যাথলিক নানদের স্কুল। পড়াশোনায় দিশি স্কুলদের থেকে অনেকটাই এগিয়ে তারা। ল্যাবে গিয়ে পরীক্ষা করে দেখিয়েছেনও লুইজা ম্যাম। সে গর্ব গর্ব মুখে বলে দিল, তাহলে আমার জাদুস্ফটিক একটু একটু কাঁপবে। হাতে ধরলে টের পাওয়া যাবে।”

“ভেরি গুড। তোমার সঙ্গে তোমার জাদুস্ফটিক আছে তো?”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে সেটাকে হাতে ধরে দেখে বল দেখি আমার কাছে কোন জাদুস্ফটিক আছে কি?”

ত্রিকা খুব লক্ষ্মীমেয়ের মত তার জোব্বার পকেটে হাত দিয়ে সেখানে রাখা জাদুস্ফটিকের পুঁটুলিটাকে ছুঁয়ে দেখল একবার। তারপর মাথা নেড়ে বলল, “উঁহু। এখানে কোন জাদুস্ফটিক নেই কাছাকাছি।” তারপর একটু সাহস পেয়ে বলে, “তোমার গলার আওয়াজ এত জোরে হচ্ছে কোন জাদুটায়?”

“নো জাদু। একটা যন্ত্র দিয়ে। তুমি দেখতে চাও?” বলতে বলতেই নিজের কলার থেকে কালোরঙের বোতামটা খুলে এনে একটা ক্লিপ দিয়ে সেটা ত্রিকার জোব্বার গলায় আটকে দিয়ে, সহকারীর হাত থেকে লাঠিটা নিয়ে সেটা ত্রিকার হাতে গুঁজে দিলেন তিনি। তারপর বললেন, “এ যন্ত্রটাকে বলে মাইক্রোফোন। এইবার লাঠিটা এদিক ওদিক দোলাতে দোলাতে বল দেখি, ‘গ্যালিলিনের কাছে কোন জাদুস্ফটিক নেই—’”

ভারী মজা পেয়েছে ত্রিকা। মাইক্রোফোন তার তীক্ষ্ণ সুরেলা গলার শব্দকে ছুঁড়ে দিচ্ছিল তাঁবু জুড়ে। তার হাতের এলোমেলো দুলুনির আদেশ মেনে আলোয় গড়া উড়ন্ত সরীসৃপ তার ডানা ঝাপটে বারবার ছুঁয়ে যাচ্ছিল দর্শকদের। দর্শকদের মধ্যে থেকে কখনো ভয়ের শব্দ, কখনো অপ্রস্তুত হাসির আওয়াজ উঠছে বারবার।

খিলখিল করে হাসছিল ত্রিকা। এত আনন্দ সে জীবনে কখনো পায়নি। স্কুলে গিয়ে বলবার মত একটা গল্প হবে কালকে। একটু লুকিয়ে লুকিয়ে বলতে হবে অবশ্য। সে জিপসিদের বিজ্ঞানের বুজরুকি দেখতে গিয়েছিল জানলে ক্লাসটিচার নীনাম্যাম শাস্তি দেবেন। নীনাম্যাম কুসংস্কার সহ্য করতে পারেন না।

সেদিকে দেখতে দেখতেই দর্শকের আসন থেকে মাথা দোলাচ্ছিলেন ক্যাপ্টেন সুষেণ রায়। নিজের ছোটোবেলার কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল তাঁর। একবার তো এমন এক আসরের পর ঠিকই করে ফেলেছিলেন বাড়ি ছেড়ে জিপসিদের সঙ্গে পালিয়ে যাবেন তাদের যন্ত্রবিদ্যা শিখতে। তারপর বড়ো হয়ে বুঝেছেন, যন্ত্র আসলে একটা বুজরুকি। হাতসাফাইয়ে দক্ষ এই অশিক্ষিত জিপসিরা লুকোন জাদুস্ফটিক দিয়েই এইসব গণসম্মোহনের ভেলকি দেখায়। ত্রিকাও পড়াশোনা আর একটু এগোলে  নিজেই বুঝে যাবে…

জোব্বার পকেটে মৃদু একটা কাঁপুনি তাঁকে সুখস্মৃতিটা থেকে বের করে আনল হঠাৎ। কেউ ডাকছেন। পকেট থেকে নিজের স্ফটিকটা বের করে আনলেন সুষেণ। প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই মৃদু আলো জ্বলে উঠেছে তাতে। আস্তে আস্তে তার ভেতরে একটা গম্ভীর মুখ ভেসে উঠছিল। অধীক্ষক সার কারমেন হ্যাক তীব্র নীল চোখ মেলে তাঁর দিকে দেখছিলেন সেখান থেকে। তারপর তাঁর চিন্তাটা সুষেণের মস্তিষ্কে ছুঁল এসে। 

“শুভসন্ধ্যা ক্যাপ্টেন। অসময়ে বিরক্ত করবার জন্য দুঃখিত। বিষয়টা কোড আলফা। সরাসরি পিনিয়াল সংযোগের অনুমতি দিন।”

একটা বিরক্তির ভাব ছেয়ে যাচ্ছিল সুষেণের মনে। কোড আলফা, তার মানে ফের একটা স্বদেশী এনকাউন্টার।

বিরক্তিটাকে অবশ্য মুখে প্রকাশ করলেন না তিনি। কর্তব্য কর্তব্যই। একটু হেসে মাথা নেড়ে প্রায় অস্ফূট আওয়াজে কয়েকটা অক্ষর উচ্চারণ করলেন সুষেন। পিনিয়াল গ্রন্থির ওপর থেকে রক্ষাবরণ সরে গেছে এবার। সেখানে জাদুস্ফটিক বেয়ে সরাসরি হ্যাক-এর আদেশটা এসে পৌঁছোচ্ছিল।

শুনতে শুনতে কোঁচকানো ভুরুদুটো সমান হয়ে আসছিল সুষেণের। কাইকর! জীবিত বা মৃত একে ধরতে পারলে মোটা পুরস্কার ঘোষণা করা আছে। পদোন্নতির সুযোগও মিলবে। 

মাথার মধ্যে সদ্য এসে পৌঁছোন তথ্যগুলো একবার নাড়াচাড়া করে নিয়ে তিনি বললেন, “আমি এখুনি রওনা হচ্ছি মহান। জায়গাটা কাছেই।”

“কার সঙ্গে কথা বলছ বাবা?”

ত্রিকা কখন যেন ফিরে এসে তাঁর পাশের চেয়ারটাতে বসে পড়েছে। তার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন সুষেণ। একে এখন ভোলাতে হবে একটু।

“সত্যিকার টেরোডকটাইল দেখতে যাবি?”

“সত্যি!” চোখদুটো বড়োবড়ো হয়ে উঠল ত্রিকার। চিনের গুয়াংঝাউতে ল্যাম্বার্ট অ্যান্ড কম্পানি পুরোন কিছু পুথির মন্ত্র নিয়ে গবেষণা করে ফের ডাইনোসরের কয়েকটা প্রজাতির ফসিলে প্রাণ ফিরিয়ে এনেছে । খবরটা ম্যাম সেদিন কারেন্ট অ্যাফেয়ার্সের ক্লাশে দেখিয়েওছেন ক্রিস্টাল বল-এ।

“একদম। আগামি মাসে তোর জন্মদিনে আমরা সবাই মিলে…” বলতে বলতে ত্রিকার মুখের কাছে মুখটা নামিয়ে এনে তিনি বললেন, “কিন্তু এখন যে আমাকে একটু বেরোতে হবে? একটা দুষ্টু লোককে ধরতে হবে গিয়ে।”

ত্রিকা একটুক্ষণ ভুরু কুঁচকে ভাবল। বড়োরা অনেকসময় ভোলাবার জন্য মিথ্যে কথা বলে। খানিক বাদে মুখ তুলে সে বলল, “বলো প্রমিস।”

“প্রমিস। কিন্তু এবারে আমাকে যেতে হবে। তোকে-”

জিপসি বৈজ্ঞানিক তার ইলেকট্রনিক মিউজিকের খেলাটা শুরু করেছে এখন। বিখ্যাত খেলা। ছোট্ট একটা বাক্স বসিয়ে দিয়েছে সে টেবিলের ওপর। তার গায়ের বোতাম টিপলে বাক্সটা নানান রকম গান গেয়ে উঠছে। সেদিকে সতৃষ্ণ চোখে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে বলল, “আমায় তাহলে বাড়িতে পাঠিয়ে দাও।”

একটা স্বস্তির শ্বাস ছাড়লেন সুষেণ। মেয়েটা তাঁর ভারী লক্ষ্মী। জাদুস্ফটিকটা বের করে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, “বাড়ি না। একটা সারপ্রাইজ আছে। মা আজ মামাবাড়ি গেছে। যাবি?”

জায়গাটা অনেকটা দূর। শিলিগুড়িতে। কথা বলতে বলতেই মনস্থির করে নিয়েছিলেন সুষেণ। ত্রিকাকে এখন পাবলিক রিপ্‌ল্‌ স্টেশনে নিয়ে যাবার সময় নেই। হাতের স্ফটিকটা তার মাথার ওপর তুলে ধরলেন তিনি। অনেকটা অতিরিক্ত শক্তি খরচ হবে এতে। তবে পুলিশ দফতরের স্ফটিকে জাদুশক্তির কোন সীমা বাঁধা থাকে না।

স্ফটিকটাকে স্থির করে ধরে রেখে অস্ফূট গলায় মন্ত্রটা উচ্চারণ করবার সঙ্গেসঙ্গে তাঁবুর মেঝেতে মিশে গেল ত্রিকার শরীরটা। পরের মুহূর্তেই স্ফটিকের মধ্যে তার হাসিভরা মুখটা ভেসে উঠল।

“পৌঁছে গেছি বাবা।”

“যা, দিম্মার সঙ্গে গল্প কর গিয়ে,” বলতে বলতেই স্ফটিকটাকে এবার নিজের দিকে ঘুরিয়ে ধরে অন্য কয়েকটা শব্দ উচ্চারণ করলেন সুষেণ। প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই একটা ঘন কুয়াশার মত অন্ধকার তাঁকে ঘিরে ধরল এসে…. 

“এইখানে?”

“আজ্ঞে হ্যাঁ স্যার।”

খালের ধারের নরম মাটি উঁচু হয়ে উঠে আস্তে আস্তে দশজন মানুষের রূপ নিচ্ছিল। সবার সামনে দাঁড়ানো মানুষটা খালের অন্ধকার জলের দিকে তাকিয়ে দেখলেন একবার। খালের ওপারে জিপসিদের সার্কাসের তাঁবুর আলো এখান থেকে চোখে পড়ে।

“খবরটা আশা করি ঠিকই এনেছেন দুপ্রিন। দু’দুবার ভুল খবর দিয়ে আমাদের ঘুরিয়েছেন আপনি। এবার ভুল হলে-”

পাশে দাঁড়ানো মানুষটা তাঁর হাতের স্ফটিকের দিকে একমনে কিছু দেখছিল। লোকটা কুখ্যাত অপরাধী। নিষিদ্ধ জিপসিবিজ্ঞানের চর্চা করে একাধিকবার জেলও খেটেছে। রানাঘাটের ওদিকে রূপ পরিবর্তনের একটা বে-আইনি ফার্ম চালায়। আন্ডারওয়ার্ল্ডের সঙ্গে ভালো যোগাযোগ আছে ওই ফার্মের কল্যানে। তবে, সেই সূত্রেই আবার মাঝেমধ্যে ভালো কিছু খবর এনে দেয় বলে সুষেণের ডিপার্টমেন্ট সবকিছু জেনেও কিছু বলে না তাকে।

“দুপ্রিন বারবার ভুল করে না স্যার। এইখান থেকেই সে অন্য সমান্তরালে রওনা হয়েছিল। এইখানেই সে ফিরে আসবে। কেন গিয়েছিল জানি না। সম্ভবত বিপ্লবীদের জন্য কোন নিরাপদ আস্তানার…”

“আন্তঃসমান্তরাল সুড়ঙ্গের ব্যবহার সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকে দুপ্রিন। এদের হাতে তা যাওয়া সম্ভব নয়।”

ক্ষয়াটে দাঁত বের করে নিঃশব্দে হাসল লোকটা। তারপর মাথা নেড়ে বলল, “আপনার কাছে আর কী-ই বা লুকোব স্যার? সোনা ফেললে এ শহরে সব করা যায়। আপনি চাইলে আমি একবার আপনার গোটা ফ্যামিলিটাকেই একটা ইন্টারেস্টিং বিশ্বে ঘুরিয়ে আনতে পারি স্যার। কমপ্লিট ম্যাজিকলেস দুনিয়া। সবকিছু ওই জিপসিদের মত যন্ত্রে চলে। কেউ টের পাবে না। আপনি…”

পেছনে দাঁড়ানো কনস্টেবলগুলো কান খাড়া করে তাঁদের কথা শুনছিল। সুষেণ সাবধান হলেন। প্রস্তাবটা লোভনীয়, কিন্তু ওপরতলায় এ খবরটা গেলে প্রধান তন্ত্রক তা ভালোভাবে নেবেন না। এসব আলোচনা আড়ালে হওয়াই বাঞ্ছনীয়। দুপ্রিনের দিকে ফিরে গলাটা কঠিন করে তিনি বললেন, “ওসব বাজে কথা ছাড়ুন। এখানে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আর কতক্ষণ সময় নষ্ট করতে হবে সেটা বলুন।”

নিজের স্ফটিকটার দিকে তাকিয়ে একমনে কিছু  দেখছিল দুপ্রিন। এবার মুখ তুলে হেসে বলল, “আর দেরি হবে না স্যার। সামনে দেখুন।”

সেখানে খালের জলের ওপরে একটা রঙিন আলোর ফুটকি দেখা দিয়েছে তখন। আস্তে আস্তে বড়ো হয়ে উঠে একটা রামধনু নকশার পর্দার মতন চারদিকে ছড়িয়ে যাচ্ছিল ফুটকিটা।

সেদিক একনজর দেখেই হঠাৎ শরীরটা টানটান হয়ে গেল সুষেণের। তাঁর চাপা গলার আদেশে চারপাশে ছড়িয়ে গিয়ে পোজিশান নিতে থাকা দলটার প্রত্যেকের হাতে উঠে এসেছে যার যার হত্যাস্ফটিক। মৃদুগলায় বাতাসে ভাসিয়ে দেওয়া মন্ত্রগুলোর আদেশ মেনে তীব্র শক্তির কয়েকটা আলো ফুটে উঠছিল স্ফটিকগুলোর মাথায়। অন্ধকার ঝোপঝাড়গুলোর মধ্যে, শিকারের অপেক্ষায় থাকা নেকড়ের দলের চোখের মত জ্বলছিল আলোর বিন্দুগুলো।

***

তাদের চারপাশ থেকে মিলিয়ে যেতে থাকা আলোর পর্দাটার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছিল বিল্লু। লোকটা বোধ হয় কোন হিপনোটিজম জানে। ঘাড়ে যন্ত্রণাটা উঠতেই লাফ দিয়ে এসে কপালে কী একটা চেপে ধরল। সঙ্গেসঙ্গে মাথা জুড়ে আগুনের একটা হলকা বয়ে গিয়েই এক মুহূর্তের জন্য সব অন্ধকার হয়ে এসেছিল তার।

সন্ত্রস্ত চোখে চারপাশটা একবার ভালো করে দেখে নিয়ে বিল্লু বলল, “যাবে না? এইখানে আর থাকলে ওরা..”

মানুষটা একটু হাসলেন তার দিকে তাকিয়ে, “ওরা এখানে নেই বিল্লু। আমরা এখন অনেক দূরে চলে এসেছি। আর কোন ভয় নেই তোমার।”

মানুষটা পাগল নাকি? নাকি সুরিন্দরেরই লোক। তাকে নিয়ে খেলছে? মজা করছে! হ্যাঁ। তাই হবে। হাতের ডাইনে খালের ওপর দিয়ে ফুটব্রিজটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল এখান থেকে।

“এস আমার সঙ্গে। অনেক কাজ আছে। এখানে বেশিক্ষণ থাকা নিরাপদ হবে না।” হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন মানুষটা। তাঁর গলায় অস্থিরতার আভাস ছিল।

তাঁর পেছনদিকে চোখ ফেলে বিল্লুর হঠাৎ আতঙ্কে শ্বাস বন্ধ হয়ে এল। ল্যাংড়া আর একা নয়।  ঝোপঝাড়ের মধ্যে থেকে একটা অর্ধবৃত্তের মত চেহারা নিয়ে দশটা আলোর বিন্দু আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে তাদের দিকে। 

সেদিকে চোখ ধরে রেখে কয়েক পা পিছিয়ে গেল বিল্লু। তার পায়ের তলায় খালের জলের ছোঁয়া। ওই জলের মধ্যে ডুব দিয়ে ভেসে যেতে পারে যদি সে? যদি—

“বিল্লু! বীরোল—তুমি-”

ততক্ষণে প্রায় হাঁটুজলে নেমে গেছে বিল্লু। পায়ের পাতার নীচে ভুসভুসে পাঁক তাকে আঁকড়ে ধরছিল। সেই বাধা ঠেলে প্রাণপণে আরো গভীর জলের দিকে নেমে যেতে যেতেই সে বলল, “আপনি আমায় মিথ্যে কথা বলেছেন। আমরা কোথাও যাইনি। সুরিন্দর তার দলবল ডেকে এনেছে।”

তার চোখের দৃষ্টি অনুসরণ করে এইবার পেছনদিকে ঘুরে দেখলেন কাইকর। আলোর অর্ধবৃত্তটা নিঃশব্দে ছোটো হয়ে আসছিল তাঁকে ঘিরে। এইবার একেবারে হঠাৎ করেই একসঙ্গে দপ করে জ্বলে উঠল সেগুলো। তারপর তাদের মালিকদের হাতের স্ফটিক থেকে আগুনের গোলার মত বাতাসে লাফ দিয়ে উঠে আলোকিত করে তুলল গোটা জায়গাটাকে। তাদের থেকে ঝরে পড়া ঝিকিমিকি কুয়াশার  একটা ঘেরাটোপ গড়ে উঠছিল তাঁকে ঘিরে। এ মৃত্যুকুয়াশাকে কাইকর চেনেন। নাজি হেক্সেনদের আবিষ্কার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইহুদি জাদুকরদের বন্দি রাখা হত এর ঘেরাটোপে। এর ছোঁয়া শরীরে লাগলে শিকারের জীবনীশক্তিকে এক নিমেষে শুষে নিয়ে ছিবড়েটাকে জ্বালিয়ে দেয় তা দাউদাউ করে।

তাঁর চারপাশের বাতাস গর্জন করে উঠেছে ততক্ষণে, “আপনাকে ঘিরে ফেলা হয়েছে কাইকর। বাধা দেবার চেষ্টা করবেন না। আপনার জাদুস্ফটিক মাটিতে নামিয়ে রেখে এগিয়ে আসুন। আমি, ক্যাপ্টেন সুষেণ রায়—ইংল্যান্ডেশ্বরী মহান চতুর্থ এলিজাবেথের নামে আপনাকে…”

সামনের খালের জলের দিকে একবার তাকিয়ে দেখলেন কাইকর। সেখানে একটা জায়গায় কয়েকটা বুদবুদ উঠছিল শুধু। আলোগুলো জ্বলবার আগেই জলে ডুব দিতে পেরেছে তাহলে ছেলেটা।

হঠাৎ একটা অস্বস্তিকর ভয় ছড়িয়ে গেল তাঁর মেরুদণ্ড বেয়ে। এ বিশ্বের বাতাসে জাদু। প্রতিমুহূর্তে অসংখ্য মানুষ তাদের রোজকার জীবনকে বেঁচে চলেছে তাই দিয়ে। তারা এর শক্তিধর রাইমিন গ্রন্থির কথা জানবে না! কোন নিরোধক জাদুর প্রলেপ তাতে দেবার সময় এখনও পাননি কাইকর। একটা জীবন্ত বোমার মত সেই জাদুর সমুদ্রে ভেসে চলবে ছেলেটা। তারপর, কোন ব্যস্ত রাস্তায়, বা ঘনবসতি অঞ্চলে, একটা অনুরণন! অকল্পনীয় ধ্বংসক্ষমতা নিয়ে জেগে ওঠা অনিয়ন্ত্রিত রাইমিন গ্রন্থি! তাছাড়া, ব্রিটিশ পুলিশ এর অস্তিত্ব টের পেলে…

এ হতে দেয়া যায় না। একটা তিক্ত হাসি একমুহূর্তের জন্য খেলে গেল তাঁর ঠোঁটে। বিপ্লবীর জীবন! পুলিশের সঙ্গে লুকোচুরি তাঁর আজকের নয়। এখান থেকে তিনি বের হয়ে যেতে পারেন সহজেই। কালোবাজারে দুপ্রিনের থেকে চড়া দামে কেনা আরিকানিয় বর্মের প্রতিরোধ জাদু এদের যে কোন অস্ত্রকে রুখে দিতে পারে। মৃত্যুকুয়াশার তীব্র ক্ষয়কারী জাদুও আইরিশ রেজিস্ট্যান্স সেল-এর আবিষ্কৃত এই বর্মের কোন ক্ষতি করে না। কিন্তু, এ ছেলেটাকে এখানে একা রেখে তিনি চলে যেতে পারেন না। একটাই পথ খোলা আছে তাঁর সামনে এখন। একটাই পথ..

..রাইমিন গ্রন্থির উপস্থিতি এই পুলিশের দলটা আজ টের পাবে। কিন্তু তা কাউকে বলবার জন্য বেঁচে থাকবে না ওদের একজনও।

“আমি আত্মসমর্পণ করছি,” বলতে বলতে আস্তে আস্তে সংযোগ স্ফটিকটাকে মাটিতে নামিয়ে রাখলেন কাইকর।

“বেশ। এবার নিজের জাদুস্ফটিক বের করে মাটিতে রাখুন। তারপর মাথার ওপর হাত তুলে…”

পুলিশের দলটা আরো কাছে এগিয়ে এসেছে। ঝোলা থেকে নিজের জাদুস্ফটিকটা বের করে আনলেন কাইকর। তারপর নীচু হয়ে মাটিতে নামিয়ে রাখবার মুহূর্তে সেটাকে হঠাৎ দু’হাতের মধ্যে চেপে ধরলেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গেই স্ফটিক থেকে বের হয়ে আসা আলোর একটা ধারা পাক খেয়ে উঠল তাঁকে ঘিরে। তারপর আলোকিত শরীর নিয়ে জলের বুকের বুদবুদগুলোকে লক্ষ করে ঝাঁপ দিলেন তিনি।

জ্বলন্ত গোলকগুলো প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই ধেয়ে এসেছিল তাঁর দিকে। মাথার ওপর একত্র হয়ে তীব্র আলোর ধারায় ভাসিয়ে দিচ্ছিল তাঁর শরীর। হাতের স্ফটিকটাকে তুলে ধরে তাদের একটা গোলকের দিকে নিশানা করলেন কাইকর। নিঃশব্দ শক্তির একটা ধারা ছুটে গিয়ে গোলকটাকে অন্ধকারের আবরণে মুড়ে দিচ্ছে যখন, ঠিক তখন তাঁকে ঘিরে হাজার বাজের শব্দ নিয়ে যেন গর্জে উঠল দশটা হত্যাস্ফটিক।

মৃত্যুমুখী জাদুর ধারাগুলো তাঁর আলোকিত বর্মের গায়ে নির্বিষ কামড় দিয়ে ঠিকরে যাচ্ছিল বারবার। তিনি টের পাচ্ছিলেন, জলের তলায় তাঁর পায়ের কাছে লুকিয়ে থাকা ছোট্ট শরীরটা থরথর করে কেঁপে উঠছে সে আঘাতগুলোর ধাক্কায়।

আর তারপর, হঠাৎ শরীরে মৃদু উষ্ণতার ছোঁয়া পেয়ে চমকে জলের দিকে তাকিয়ে দেখলেন তিনি। একটা আবছা লালচে আলো ছড়িয়ে যাচ্ছিল জলের তলা থেকে উঠে এসে। খালের জলে রক্তের ম্লান রঙ ধরছিল তার ছোঁয়ায়। অনুরণন! মহারানির পুলিশের মৃত্যুজাদু তাঁর বর্মে দাঁত ফোটাতে পারেনি। তার বদলে, সে ছোঁয়ায় সাড়া দিয়ে জেগে উঠছে ছেলেটার রাইমিন গ্রন্থি!

চূড়ান্ত আঘাতের জন্য নিজেকে তৈরি করে নিলেন কাইকর। বিপ্লবী আইরিশ গবেষক আরিকানার দীর্ঘ সাধনার ফল এই জাদুবর্ম আজ তার চূড়ান্ত সহনক্ষমতার পরীক্ষা দিতে চলেছে।

“নিষিদ্ধ আরিকানিয়ান জাদুবর্ম! ঈশ্বরের নামে শপথ করে বলছি, আমি এ-জাদুটা ওদের বেচিনি।”

তার দিকে তাকিয়ে হালকা একটা হাসি ছড়িয়ে গেল সুষেণের ঠোঁটে। দুপ্রিন ছাড়া এ জিনিস চোরাপথে আনবার মত কোন স্মাগলার কলকাতার কালোবাজারে নেই। এদের কাছে কোন নীতিবোধ আশা করাই যায় না।

“ঈশ্বরের নামটা আর নাই বা নিলে দুপ্রিন। এখন বল, জিনিসটার প্রতিরোধশক্তি কতটা? আরো লোক আনাতে হবে কি?”

“দরকার হবে না। শক্তিবিচ্ছুরণটা মিনিট সাতেক ধরে রাখলেই কাজ হয়ে যাবে স্যার। আমি আমার স্ফটিকটাও নয় চালু করে নিচ্ছি। তবে ও কিন্তু একা নয়।”

“একা নয়? মানে?”

নিজের স্ফটিকটা বের করে আনতে আনতেই দুপ্রিন বলল, “ওর পাশে তাকিয়ে দেখুন…”

তার কথাটা শেষ হবার আগেই পায়ের নীচের মাটি দুলে উঠল সুষেণের। একটা বিচিত্র আলো উঠে আসছিল খালের জল থেকে। সে আলোর মধ্যে, জলের আবরণ ছেড়ে একটা ছোটো অন্ধকার চেহারা উঠে আসছিল কাইকরের পাশে।  

হঠাৎ ছায়াটার পাশ থেকে একটা লাফ দিয়ে বাতাসে উড়ে গেল কাইকর। কিন্তু শেষরক্ষা হল না। পুলিশের দলটার দিকে মুখ ঘুরিয়ে অন্ধকার মূর্তিটার চোখ তখন ঝলসে উঠেছে নরকের আগুণ নিয়ে। ধেয়ে আসা সেই রামধনু রঙের আগুনের স্রোতে পুড়ে ছাই হয়ে যাবার ঠিক আগে সুষেণের চোখে পড়েছিল, সর্বগ্রাসী সেই অগ্নিস্রোতের ধাক্কায় বাতাস থেকে খালের জলে ছিটকে পড়ছে কাইকরের শরীরটা।

***

অতবড়ো শরীরটাকে পাড়ে টেনে আনতে গিয়ে হাঁফিয়ে পড়েছিল বিল্লু। সবকিছু গুলিয়ে যাচ্ছিল তার। চেনা পৃথিবীটা কেমন যেন অচেনা ঠেকছে একেবারে। এমনকি নিজেকেও এখন অচেনা ঠেকছে তার। কেমন করে..

ঘাড়ের যন্ত্রণাটা মিলিয়ে গেছে একেবারে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পায়ের কাছে শুয়ে থাকা শরীরটার দিকে ফিরে দেখল সে। মানুষটার শরীরের অনেকটাই পুড়ে গেছে। তবে নিঃশ্বাস চলছে একটু একটু। ফের একবার খালের নোংরা জল তুলে এনে তার চোখেমুখে ঝাপটা দিল সে। তারপর নীচু হয়ে ডাকল, “শুনতে পাচ্ছেন?”

হঠাৎ চোখদুটো খুলে গেল মানুষটার। স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন তিনি। তারপর ঠোঁটদুটো আস্তে আস্তে নড়ে উঠল তাঁর, “আমাকে তুলে ধরে বসিয়ে দাও।”

“আপনি চোট পেয়েছেন,” বিল্লু মাথা নাড়ল, এই অবস্থায় আপনাকে…”

“আঃ! যা বলছি তাই করো।” ধমকটা দিয়েই যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠলেন মানুষটা। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে আস্তে আস্তে বললেন, “রাইমিনের আগুন ছুঁয়েছে আমাকে। বেশি সময় নেই হাতে।”

খুব সাবধানে, ক্ষতগুলোকে বাঁচিয়ে বিল্লু তাঁকে তুলে ধরে বসিয়ে দিল। একদৃষ্টে তার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন তিনি। এখানে ওখানে পুড়ে যাওয়া হাতদুটোর আঙুল বড়ো আদরে তার মুখটাকে ছুঁয়ে যাচ্ছিল বারবার।

খানিক বাদে, মাথাটা নীচু করে যেন নিজের মনেই তিনি বললেন, “হাসানের জ্ঞানযন্ত্রের গণনা যখন একাদশ সমান্তরালে তোমার অস্তিত্বের সম্ভাবনার খবর দিল, তখন বিপ্লবীসঙ্ঘের অনেকেই তাকে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল। একবিংশ শতকের উন্নততম জাদুবিদ্যার যুগে বিজ্ঞানের ওই মধ্যযুগীয় কুসংস্কারকে তারা বুজরুকি বলেই দাবি করেছিল। কিন্তু আমি তার বিজ্ঞানে বিশ্বাস রেখেছিলাম। নতুন করে আশায় বুক বেঁধেছিলাম আমি। অনৌসিককে বলেছিলাম, এক বীরোলকে সম্পূর্ণ তৈরি হয়ে ওঠবার আগেই রুখে দিয়েছে শয়তান তিনিগালের জাদু। এইবার আর এক বীরোল তার জায়গা নেবে..”

“বীরোল! কিন্তু আমি তো..”

তার কথার কোন জবাব দিলেন না কাইকর। একটুক্ষণ থেমে, দম নিয়ে বিল্লুর হাতদুটো জড়িয়ে ধরে তিনি ফের বললেন, “বড়ো ইচ্ছা ছিল, নিজে হাতে তোমাকে গড়ে তুলব আমরা। তারপর একদিন অনৌসিকপুত্র বীরোলের নেতৃত্বে ভারতের জাতীয় সেনা, আই এন এ, ফের একবার গর্জে উঠবে, “দিল্লি চলো।” ব্রিটিশের শক্তিশালী জাদুকে চুর্ণ করে লালকেল্লার চুড়ায় অবশেষে উড়বে ত্রিবর্ণরঞ্জিত জাতীয় পতাকা। কিন্তু সে আর আমার দেখে যাওয়া হবে না।”

“আমি…”

মৃদু একটা হাসি ছড়িয়ে গেল কাইকরের ফ্যাকাশে ঠোঁটে, “নিজেকে তুমি এখনো জান না বিল্লু। যে ভয়ঙ্কর শক্তির মালিক তুমি, তার একটা সামান্য অনিয়ন্ত্রিত ঝাপটাই আজ ব্রিটিশের পোষা ওই পুলিশদলকে শেষ করে দিয়েছে। এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দিয়েছে নাজি হেক্সেনদের তৈরি ইহুদিনাশক মৃত্যুকুয়াশার বন্দিশালাকে। জেনে রাখো এই পরাধীন ভারতবর্ষের মুক্তির জন্য তোমাকে আমাদের…”

“আমরা পরাধীন নই।”

বড়ো কষ্টে একটু হাসলেন মানুষটা, “তোমার বিশ্বে হয়ত নও। কিন্তু এই সমান্তরালে আমরা তাই। তবে সে কথা বোঝবার সময় তোমার এখনো হয়নি। বড়ো আশায় বুক বেঁধে আমি..”

মানুষটার ব্যথায় ভরা চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে বুকের ভেতরটা অকারণেই মোচড় দিয়ে উঠছিল বিল্লুর। তাঁর কথার অর্থ সে কিছুই বুঝতে পারছে না। শুধু তার মধ্যেকার দুঃখের সুরটুকুকে সে ঠিকই অনুভব করতে পারছিল।

“আমায় কী করতে হবে?” 

“তার সরল চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে একটা অব্যক্ত ব্যথায় ভরে উঠল কাইকরের মনটা। তার অজান্তেই বড়ো গভীর সঙ্কটে এনে ফেলেছেন তিনি ছেলেটাকে। একটু বাদে প্রায় ফিসফিস করে তিনি বললেন, “টিকে থাকতে হবে বিল্লু। আজকের ঘটনার পর ব্রিটিশ গোয়েন্দা বিভাগের নজর ফের একবার আমাদের দিকে পড়বে। যদি তারা জানতে পারে কাকে আমি সঙ্গে করে এনেছিলাম, তাহলে জাদুকরদের সবচেয়ে শক্তিশালী ঘাঁটিতেও তুমি নিরাপদ নও।”

“কিন্তু আমি একলাএকলা… কেমন করে…”

“একটাই পথ খোলা আছে তোমার সামনে। জিপসিদের জাদুকররা ঘৃণা করে। হাসান গ্যালিলিনের সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখায় আমাকেও সে ঘৃণার মুখোমুখি হতে হয়েছে বহুবার। তুমি তার কাছে আশ্রয় নিও। কেউ সন্দেহ করবে না। তাকে বোলো, অন্তত ছ’মাস যেন সে তোমাকে লুকিয়ে রাখে। তারপর… সে জানে কী করতে হবে। এসো, মাথাটা নামাও…”

বলতে বলতেই তার ঘাড়ের ওপরে হাতটা রেখে চোখ বুঁজলেন কাইকর। রাইমিন গ্রন্থির ওপর জাদু-প্রতরোধক শক্তিশালী নিরাপত্তা আবরণটা তৈরি করে দিতে দিতেই তিনি টের পাচ্ছিলেন, জীবনীশক্তির শেষ বিন্দুটুকু অবধি নিংড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে তাঁর, মন্ত্রের প্রতিটি শব্দ উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে।

“আপনি… কী হল আপনার? হাসান গ্যালিলিন কে?”

বিল্লুর উৎকন্ঠিত গলাটা তাঁর চোখ নেমে আসতে থাকা শান্তির ঘুমটাকে একটু সময়ের জন্য সরিয়ে দিল যেন।  হঠাৎ পরিপূর্ণ চোখে বিল্লুর দিকে চাইলেন তিনি। মৃত্যুর দরজায় পৌঁছে একমুহূর্তের জন্য সম্পূর্ণ সজাগ হয়ে উঠেছে তাঁর চেতনা, “তোমার রাইমিন গ্রন্থি এখন নিরাপদ। যখন অনৌসিকের কাছে পৌঁছোবে, তিনি তোমার সুপ্ত পিনিয়ালকে জাগিয়ে তুলে ফের একবার রাইমিনের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দেবেন তোমাকে। ততদিন, জাদুশক্তিহীন সাধারণ জিপসি হয়ে  হাসান গ্যালিলিনের নিরাপদ আশ্রয়ে…আঃ…” 

“হাসান গ্যালিলিন! তিনি…”

“খালের ওপাশে; জিপসিদের তাঁবু। তাঁর দেখা পেলে বোলো, আমি…”

হঠাৎ একটু যেন শিউরে উঠল বিল্লু। নিঃশ্বাস থেমে গিয়েছে কাইকরের। আস্তে আস্তে তাঁর শরীরটা ধুলো হয়ে মিশে যাচ্ছিল মাটির সঙ্গে। সেদিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল সে। এ-দুনিয়ার আর কোনকিছুই তাকে অবাক করছে না এখন। অবাক হবার অনুভূতিটাই তার উধাও হয়ে গিয়েছে গত কয়েকঘন্টায়।

একসময় আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল সে। দূরে, খালের উল্টোদিকের শহরের আকাশে জিপসিদের বিরাট তাঁবুগুলো চোখে পড়ছিল। শো শেষ। তাঁবু থেকে বের হয়ে আসা মানুষজন পথের একপাশের শেডগুলোতে এসে দাঁড়াচ্ছে, তারপর একেকবারে তাদের একেকটা দল গল্প হাসাহাসি করতে করতেই নীচু হয়ে মিশে যাচ্ছে মাটির মধ্যে। কেমন একটা দুঃস্বপ্নের মত লাগছিল বিল্লুর। স্বপ্নে যেমন অনেক আজব জিনিসকেও ভারী স্বাভাবিক ঠেকে, এখানেও তাই ঠেকছিল তার। অথচ…

তাঁবুগুলোর দিকে ফের একবার চোখ ঘোরাল বিল্লু। এই চেনা অথচ একেবারে অচেনা কলকাতাটার উদ্ভট, বিচিত্রদর্শন ঘরবাড়ির ভিড়ে ওই তাঁবুর চেহারাগুলোই তার যেন চেনা ঠেকে একটুখানি। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল সে পুল পেরিয়ে সেই তাঁবুগুলোর দিকে।

খালের এপাড়ে লেকটাউন শহরটা আলোয় আলো হয়ে আছে। আলোটা কোথা থেকে আসছে সেটা বিল্লু বুঝতে পারছিল না। কোন স্ট্রিট ল্যাম্প নেই এখানে, অথচ আলোটা আছে। সেই আলোয় তাকে তাঁবুগুলোর দিকে এগিয়ে যেতে দেখে শেডের তলায় জড়ো হওয়া নানারঙের আলখাল্লা পরা লোকগুলো বেশ একটু অবাক হয়েই নিজেদের মধ্যে কিছু বলাবলি করছিল।

তাদেরই বয়সী একটা মেয়ে হঠাৎ শেড ছেড়ে খানিকটা এগিয়েও আসতে গিয়েছিল তার দিকে। কিন্তু সে রাস্তায় নেমে আসবার আগেই হঠাৎ একটা মৃদু সাড়া পড়ে গেল ভিড়টার মধ্যে। সবাই প্রায় একসঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে তার দিক থেকে। একেবারে চুপ হয়ে গেছে মানুষগুলো। মেয়েটাও কেমন ভয় পাওয়া মুখে এক ছুটে গিয়ে মিশে গেছে ভিড়টার ভেতর।

“ইউ, স্টপ রাইট দেয়ার!”

কড়া গলার ধমকটা কানে যেতে বিল্লু পেছনে মাথা ঘোরাল। দুজন মানুষ কখন যেন সেখানে এসে মাটির বুক থেকে উঠে দাঁড়াচ্ছে। তাদের একজন হঠাৎ হাতে উঠে আসা স্ফটিকের বলটা তার দিকে ঘুরিয়ে ধরে মৃদুগলায় কিছু একটা বলল।

প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই অসহ্য যন্ত্রণায় মুচড়ে উঠল বিল্লুর শরীরটা। যেন আগুনের তৈরি একটা দড়ি দিয়ে তাকে পাকে পাকে বেঁধে ফেলেছে কেউ। ব্যথায় নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল তার।

দৃশ্যটা দেখে ভিড় করে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর ভেতর থেকে মৃদু গুঞ্জন উঠল একটা। তাদের কয়েকজন শেড থেকে বের হয়ে আসছিল রাস্তার দিকে।

দু’নম্বর মানুষটা সাহেব। তার গভীর নীল চোখে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল হঠাৎ। এগিয়ে আসতে থাকা লোকগুলোর দিকে ঘুরে সে ঠাণ্ডা গলায় ভাঙা ভাঙা বাংলায় বলে উঠল, “কিছুক্ষণ আগে এখানে একটা স্বদেশী টেররিস্ট হামলা হয়েছে। গোটা এলাকায় নৈশ কারফিউ জারি করা হয়েছে। পুলিশকে নিজের কাজ করতে দিন। শেডের বাইরে কোন নেটিভ পা দিলে কর্তব্যে বাধাদানের অভিযোগে তার স্ফটিক বাজেয়াপ্ত করা হবে।”

জাদুমন্ত্রের মতই কাজ হল তার কথাগুলোতে। মানুষগুলো শেডের নীচে ফিরে গেছে আবার। দু’নম্বর এবার বিল্লুর দিকে ফিরল।

“লাইসেন্স দেখা।”

বিল্লু কী বলবে ভেবে পাচ্ছিল না। খানিক বাদে একটু ইতস্তত করে সে বলল, “লাইসেন্স—কী?”

হঠাৎ লোকটার ডানহাতটা সপাটে তার গালে এসে আছড়ে পড়ল, “জিপসি শেয়াল, তুই জানিস না মহারানির রাজত্বে লাইসেন্স ছাড়া তাঁবুর বাইরে আসা জিপসিদের জন্য নিষিদ্ধ?”

“আ-আমি-জিপসি নই। আমি…”

“এক নম্বর লোকটা এইবার তাদের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বিল্লুর দিকে একনজর দেখে নিয়ে সে মুখে একটা ঠাণ্ডা হাসি ছড়িয়ে বলল, “জিপসি নোস? কলকাতার ছেলে? ভালো। তাহলে তোর জাদুস্ফটিক বের করে দেখা! নামধাম দেখি। নাকি সেটাও…”

“আঃ মিস্টার লাল! বাজে কথা বলে সময় নষ্ট করা আপনাদের ইণ্ডিয়ানদের একটা রোগ।” সাদা চামড়ার মানুষটা বিশ্রী গলায় তার সহকর্মীকে ধমকে উঠল হঠাৎ, “বলাবাহুল্য, এ মিথ্যে বলছে। ভালো করে দেখুন একে। অসভ্য জিপসি পোশাক। নেটিভ হলেও কোন ভদ্রসন্তান এ ধরনের পোশাকে পথে বের হবে না। এখন একে গার্ড করুন। আমাকে প্রশ্নগুলো করতে দিন।”

“সরি সার,” লাল নামের মানুষটা মাথা নীচু করে একপাশে সরে দাঁড়ালেন। 

“খালের ওপারে যে এক্সপ্লোশানটা হল, তুই ওখানে ছিলি?”

“আ-আমি…”

“মিথ্যে কথা বলবার চেষ্টা করবি না জিপসি ভিখিরি। কয়েক মিনিট আগে ওখান থেকে বেরিয়ে এসে তোকে ফুটব্রিজে উঠতে দেখেছি আমি। তুই ওই স্বদেশী গুণ্ডা কাইকরের সঙ্গে ছিলি। কেন? কে পাঠিয়েছিল তোকে ওর কাছে?”

“আজ্ঞে না অফিসার। ও কোন স্বদেশী গুণ্ডার সঙ্গে ছিল না। আমি এবং আমাদের অনেক সদস্যই তার সাক্ষ্য দেবেন।”

পেছন থেকে মৃদু, শান্ত গলার কথাগুলো ভেসে আসতে হঠাৎ বিল্লুকে ছেড়ে সেদিকে ঘুরে দাঁড়ালেন অফিসার। সেখানে এসে দাঁড়ানো বয়স্ক মানুষটার পরণে জিপসিদের হাস্যকর থ্রি-পিস স্যুট ও টাই। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁর উপস্থিতি কিছুটা সম্ভ্রম জাগায়।

“আপনি-”

কোটের পকেট থেকে একটা ছোটো কার্ড বের করে এনে অফিসারের হাতে তুলে দিলেন মানুষটা। তারপর মৃদু হেসে বললেন, “আমার লাইসেন্স। আমি হাসান গ্যালিলিন। এই জিপসিদলের মালিক।”

“এ আপনার দলের ছেলে? সেক্ষেত্রে স্বদেশীদের এনকাউন্টার স্পটে এ কী করছিল তার জবাব আপনাকে দিতে হবে মিস্টার গ্যালিলিন।”

মৃদু একটা হাসি ছড়িয়ে গেল গ্যালিলিনের মুখে, “নিশ্চয় দেব মিস্টার কারমাইকেল। আমার একটা ত্রুটি হয়েছে। তার জন্য প্রয়োজনীয় জরিমানাও দেব। তবে জিপসিরা এ দেশের বিপ্লবীদের সঙ্গে জড়িত নয়। তদন্তে যখন বের হবে আমাদের দলের একটা নির্বোধ শিশু, আমারই ভুলে তাঁবু ছেড়ে বের হয়ে পথ হারিয়ে ওদিকে গিয়ে পড়েছিল, তখন আপনার একটা অন্য বিপদ আসবে এ আমি হলফ করে বলতে পারি। যে সময়টা আপনি এখানে নষ্ট করছেন, সে-সময় যদি একজন আসল অপরাধীও অকুস্থল থেকে পালিয়ে গেছে বলে প্রমাণিত হয়…”

“আপনি পুলিশকে তার কাজ শেখাতে আসবেন না হাসান। আপনাকে আমরা চিনি। জানবেন, আপনার গতিবিধির ওপরেও আমাদের…”

কারমাইকেলের গলায় হঠাৎ করেই যেন একটু জোরের অভাব দেখা দিচ্ছিল। হঠাৎ মাঝপথেই থেমে গিয়ে লালের দিকে ফিরে তিনি বললেন, “লাইসেন্স ছাড়া দলের একজন জিপসিকে শহরের রাস্তায় বের করবার জন্য এঁর বিরুদ্ধে মামলা রুজু করবার ব্যবস্থা করবেন আপনি। এখন চলুন…”

মানুষদুজন চলে যেতে হাসান এসে বিল্লুর সামনে দাঁড়ালেন। হাসি হাসি ভাবটা হঠাৎ একেবারে উধাও হয়েছে। নিঃশব্দে তার মুখের দিকে একটুক্ষণ চেয়ে দেখলেন তিনি। তারপর তার ঘাড়ের পেছনে আঙুল চালিয়ে কিছু একটা অনুভব করে নিলেন। এইবার ফের একটু একটু হাসি ফুটেছে তাঁর মুখে।

“তোমার নাম কী?”

“আমি বিল্লু।”

“আমার সঙ্গে এস।”

বলতে বলতেই তার একটা হাত ধরে তাঁবুগুলোর দিকে হাঁটা শুরু করেছেন হাসান গ্যালিলিন। “তুমি পথে একলা ঘুরছিলে। সেটা উচিত হয়নি। আমি না এসে পড়লে হয়ত আজ ব্রিটিশের জেলে যেতে হত তোমাকে। কোন ক্যারাভানের সদস্য তুমি?”

হঠাৎ থেমে দাঁড়িয়ে তাঁর দিকে ঘুরে তাকাল বিল্লু। তারপর আস্তে আস্তে উচ্চারণ করল, “কা-কাইকর আর নেই। আমাকে সে তোমার কাছে…”

কথাটা বলবার সঙ্গে সঙ্গেই আশ্চর্য একটা বদল এল লোকটার আচরণে। ঠোঁটে একবার আঙুল ছুঁইয়ে তাকে চুপ করতে বললেন তিনি। তারপর তার হাত ধরে দ্রুত এগিয়ে গেলেন তাঁবুর দিকে। আগেই বোঝা উচিত ছিল তাঁর। ছেলেটার মুখে অনৌসিকের আদল পরিষ্কার। ও কে তা তিনি জানেন। একাদশ সমান্তরালের পৃথিবীতে, তাঁদের প্রথম সমান্তরালের অনৌসিকপুত্র বীরোলের এই প্রতিলিপির উপস্থিতির গণনা তাঁর কাছ থেকেই করিয়ে নিয়েছিল কাইকর। মৃত্যুর আগে কেন সে তাকে তাঁর কাছে আসতে বলে গেছে সেটাও অনুমান করে নিতে কোন অসুবিধা হচ্ছিল না তাঁর।

খানিক বাদে প্রধান তাঁবুতে পৌঁছে বিল্লুর মুখোমুখি হলেন হাসান, “কতদিন সে তোমাকে আমার আশ্রয়ে থাকতে বলেছে? তুমি জানো?”

“ছ’মাস।”

“বেশ। এখন তুমি বিশ্রাম নাও। কাল সকালে ফের কথা বলব আমরা, কেমন?”

ছেলেটাকে একজন সহকারীর হাতে তুলে দিয়ে দ্রুতপায়ে নিজের ল্যাবের দিকে চললেন হাসান। আজ রাতে আর ঘুম আসবে না তাঁর। অনেক কিছু ভাববার আছে। খুব বড়ো একটা জুয়া খেলতে চলেছেন তিনি এই জাদুরাজপুত্রকে নিয়ে।  

তৃতীয় অধ্যায়
সার্কাসের দলে

চোখ খুলে প্রথমে সে কোথায় আছে তা বুঝতেই পারছিল না বিল্লু। তার মাথার ওপর রঙিন কাপড়ের ছাদ। একপাশে কাপড়ের দেয়ালে চৌখুপি কাটা জানালা। সেখান দিয়ে ঝকঝকে রোদ এসে পড়ছিল তার মুখে। একটা হ্যামকের মধ্যে শুয়ে ছিল সে। কিছু দূরে মাটির ওপর একটা বিছানা পাতা।

একটু অবাক হয়ে এদিকওদিক চোখ ফেলছিল বিল্লু। কালকের সব ঘটনাগুলো এইবার একটু একটু করে তার স্মৃতিতে ফিরে আসছে। কাইকর, হাসান গ্যালিলিন…

কিন্তু আলোভরা এ ঘরটা তার সেই ভয়ঙ্কর স্মৃতিগুলোকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছিল এই মুহূর্তে। ভারী সুন্দর করে সাজানো চারপাশটা। একপাশে একটা স্ট্যান্ডে উজ্জ্বল রঙের কয়েকটা মেয়েদের পোশাক সাজানো। খানিক দূরে একটা কাঠের টেবিলের ওপর কিছু বই। এদিক ওদিক কয়েকটা অচেনা যন্ত্র ছড়িয়ে।

সেগুলোর দিকে চোখ বোলাতে বোলাতেই হঠাৎ ঘরের এক কোণে অন্য একটা টেবিলের ওপর রাখা যন্ত্রটার দিকে তার চোখ গেল। চৌকো পর্দা লাগানো একটা বাক্স! পর্দাটার গায়ে একটা ঘড়ির ছবি ভাসছিল। তাতে সময় দেখাচ্ছে বেলা দশটা। তার সামনে একটা কি বোর্ড! কমপিউটার?

আস্তে আস্তে হ্যামক থেকে নেমে গিয়ে যন্ত্রটার সামনে দাঁড়াল বিল্লু। কিবোর্ডটায় আঙুল ছোঁয়াতেই ঘড়িটা মিলিয়ে গিয়ে সেখানে জটিল কিছু সংখ্যা আর জ্যামিতিক ছবির সার ভেসে উঠেছে। আস্তে আস্তে তার সামনে টুলটায় বসে পড়ল সে। পড়াশোনা খুব বেশি হয়নি তার। তবু, পর্দার লেখাগুলো তাকে কোন অজানা রহস্যের মতই টানছিল।

“এই, এই, ওখানে কী করছিস তুই? কি বোর্ডে আঙুল দিবি না খবরদার। সেই সক্কালবেলা থেকে যুদ্ধ করছি ওই অঙ্কটার সঙ্গে তা জানিস? এখনো মেলেনি।”

কথাগুলো বলতে বলতেই একটা মেয়ে হঠাৎ তাঁবুর দরজা সরিয়ে সটান ঢুকে এল ভেতরে। বিল্লুর চেয়ে খানিকটা বড়ো হবে মাথায়। মুখটা ঠিক যেন হাসান গ্যালিলিনের অল্পবয়েসের রূপ। ফুলকাটা টপ আর লাল  স্কার্টে ভারী মানিয়েছে তাকে। ভেতরে ঢুকে এসে হাতে ধরা একরাশ বুনো ফুল একটা ফুলদানিতে সাজাতে সাজাতে সে বলল, “কী সুন্দর ফুল যে ফোটে এখানে ওই খালটার ধারে ধারে! কাল থেকে আর পাব না। ধুস!”

“কেন পাবে না?”

“আজ বিকেলে কলকাতা ছেড়ে গুয়াহাটির দিকে চলে যাব যে আমরা! সব লটবহর এয়ারশিপে বোঝাই করা হচ্ছে। শুধু তুই ঘুমিয়েছিলি বলে আমার তাঁবুটা খোলা হয়নি।”

“গুয়াহাটি! সে তো অনেক দূর! ট্রেনে গোটা একটা দিন লাগে।”

মেয়েটা হঠাৎ চুপ করে দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকাল, “এক দিন নয়। ছ’মাস লাগবে কম করে গুয়াহাটি পৌঁছুতে। রাস্তায় থামতে থামতে আর শো করতে করতে যাব যে!  কিন্তু  ট্রেন জিনিসটা কী রে? কোনো মেশিন?”

বিল্লু একটু অবাক হয়ে মেয়েটার দিকে ঘুরে দেখল। তাকে নিয়ে মজা করছে না তো? কিন্তু মেয়েটার মুখে মজা করবার কোন চিহ্ন ছিল না। একটুক্ষণ চুপ করে থেকে সে বলল, “তোমাদের এখানে রেলগাড়ি চলে না? লোহার লাইনের ওপর লোহার গাড়ি। তাতে চেপে অনেক লোক একসঙ্গে দূরদেশে ঘুরতে যায়। ”

“উঁহু। তোদের ইলেভেনথ প্যারালালের যানবাহনের কথা আমি কী করে জানব?”

“ইলেভেনথ প্যারালাল কী? তুমি কে?”

মেয়েটা ঝকঝকে একসার দাঁত দেখিয়ে হাসল একটু, “পরের প্রশ্নটা সোজা। আমার নাম লীলা। আমাকে দিদি বলবি। নইলে মার খাবি। তোর নাম তো বিল্লু? বাবা বলেছে। আর আগের প্রশ্নটার জবাব বেশ ঝামেলার। ব্যাঙ্গালোরের জিপসি ইশকুলে যেটুকু পড়েছি বলছি। এক হাজার দুশোটা সমান্তরাল পৃথিবীর হদিশ মিলেছে এখন অবধি। আরো নাকি অগুনতি আছে। প্রত্যেকটা জায়গায় মানুষের সভ্যতা নানান রাস্তায় এগোয়। আমরা তার এক নম্বর। তোর পৃথিবীটা এগারো নম্বর। এর বেশি জানতে গেলে লণ্ডন স্কুল অব স্প্যাশিও-টেম্পোরাল ম্যাজিক-এ যেতে হবে। সেখানে কোন জিপসি বা নেটিভের ঢোকা বারণ। ফলে তুই আমি পারব না। তবে, জিপসি হলে স্কুল শেষ করবার পর অ্যাডভান্সড ফিজিক্সের কোর্স করলেও জানতে পারা যায়। বাবা ব্যাঙ্গলোর আর ম্যাসাচুসেটস্‌, দু’জায়গাতেই ভিডিও কনফারেন্সে নিজে ও কোর্সটা দেয়।”

“কমপিউটারের ওই বিচ্ছিরি অঙ্কগুলো বুঝি ওই নিয়ে?” এইবার বিল্লুর একটু সমীহ হচ্ছিল মেয়েটার প্রতি।

“একদম নয়। আমি অত ফিজিক্সটিজিক্স বুঝি না। বাবার সঙ্গে সার্কাসে কাজ করছি আর ফাঁকে ফাঁকে কমপিউটারের কাছে নিজে নিজেই ইঞ্জিনিয়ারিং ডিজাইন শিখছি। ভালো করে শিখলে ব্যাঙ্গালোরে একটা কাজ পেয়ে যেতে পারি। তাহলে ওখানেই সিটিজেনশিপ নিয়ে সেট্‌ল্‌ করে যাব। আর তুই? কদ্দূর পড়েছিস ইশকুলে? তোদের তো শুনেছি সব জায়গায় সবার জন্য ইশকুল চলে।”

বিল্লু ঠোঁট উলটে দিল, “ইশকুলে আর আমায় নেবে কে? কেষ্টপুর বস্তিতে কলেজ থেকে দিদিরা পড়াতে আসে মাঝেমাঝে। ওরাই বাংলা পড়তে আর মুখেমুখে যোগবিয়োগ করতে শিখিয়েছিল। ব্যস।”

মেয়েটা হঠাৎ তার দিকে ঘুরে তাকাল। তার চোখদুটো ভারী দুঃখী হয়ে উঠেছে হঠাৎ। নিজের মনেই বলল, “এখানে নাহয় ম্যাসাচুসেটস আর ব্যাঙ্গালোরের জিপসি স্টেটদুটো ছাড়া জিপসি ছেলেমেয়েদের কোথাও ইশকুলে যাওয়া বারণ। কিন্তু বাবা যে বলল তুই যে পৃথিবী থেকে এসেছিস সেখানে সব্বাই জিপসি! কেউ জাদুকর নয়! সেখানে ব্রিটিশরা অনেকদিন আগে ভারত ছেড়ে নিজের দেশে ফিরে গেছে! তাও তুই ইশকুলে যেতে পাসনি?” তারপর বিল্লুর জবাবের জন্য অপেক্ষা না করেই মাথা নেড়ে হেসে হেসে বলে, “এই দেখ, আসল কথাটাই ভুলে গেছি। বাবা বলল, তোকে খাইয়ে নিয়ে ক্যারাভানে চলে যেতে সোজা। তারপর এ তাঁবুটা খোলা হবে।”

বলতে বলতে সে একপাশের দেয়ালের কাছে দাঁড় করানো একটা যন্ত্রের সামনে গিয়ে তার গায়ে আঙুল ঠেকাতে ছোটো একটা আলো জ্বলে উঠল তাতে। সেদিকে দেখিয়ে লীলা বলল, “ফুডসিন্থটা পোর্টেবল তো! বেশি কিছু বানাতে পারে না। নো ম্যাজিক কিন্তু। দেখি আজ কী দেয়!”

বলতে বলতেই যন্ত্রটার গর্তের ভেতর থেকে হালকা আওয়াজ করে একটা থালা ভেসে উঠেছে। তার ওপর ধোঁয়া ওঠা বাটিদুটোর দিকে একনজর দেখে লীলার মুখে হাসি ফুটে উঠল একটু। “পরিজ। আমার ফেভারিট। আয় খেয়ে নিই।”

খেতেখেতেও বিল্লুর চোখদুটো কমপিউটারের পর্দাটার দিকেই আটকে ছিল। হঠাৎ করে ভুরুদুটো কুঁচকে উঠেছে তার। লীলার খাওয়া ততক্ষণে শেষ। নিজের বাটিটা ফুডসিন্থের গর্তে ফেলে দিতে দিতে সে বলল, “জানিস তো না কিচ্ছু। তাহলে অত করে দেখছিসটা কী অঙ্কটাতে?”

খালি হয়ে যাওয়া বাটিটা নিয়ে  ফুডসিন্থের দিকে যেতেযেতে বিল্লু হঠাৎ বলল, “ভুল করেছ একটা লীলাদিদি। তাই উত্তর  মেলেনি তোমার।”

“ভুল! মানে?”

“সে জানি না। আমি এসব বড়োদের কঠিন অঙ্ক জানব কোথা থেকে? তবে চার নম্বর লাইনে ভুলটা আছে সেটা টের পাচ্ছি।”

কোন উত্তর দিল না লীলা। শুধু চুপচাপ এগিয়ে গেল তার মনিটরের দিকে। কয়েক সেকেন্ড অঙ্কটার দিকে তাকিয়ে থেকে তারপর যখন সে বিল্লুর দিকে ঘুরে তাকাল তখন তার দৃষ্টিতে ভয়, সম্ভ্রম আর কৌতুহলের ছায়া খেলা করে যাচ্ছিল একইসঙ্গে, “ঠিক বলেছিস। কনটুর ইনটিগ্রেশানের একটা ধাপে ছোটো একটা ভুল করছিলাম ওখানটায়। চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তুই কী করে…”

জানি না লীলাদিদি,” বিল্লু অসহায়ভাবে মাথা নাড়ল, “অঙ্কটার দিকে দেখতে দেখতে হঠাৎ কপালের সামনের দিকটা চিনচিন করে উঠল একবার। একমুহূর্তের জন্য জিনিসটা ভারী সহজ মনে হল। আর তারপর আবার যে কে সেই…”

হঠাৎ মনিটর ছেড়ে তার দিকে এগিয়ে এল লীলা। তার কাঁধদুটো ধরে, নীচুগলায় ফিসফিস করে কতকটা নিজের মনেই সে বলছিল, “তুই কে রে বিল্লু? কেন তুই আসবার সঙ্গেসঙ্গে বাবা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের একেবারে সীমান্তের ওই বুনো এলাকাটার দিকে ক্যারাভান নিয়ে রওনা হচ্ছে?”

যেন একজন ডুবন্ত মানুষের মতই হঠাৎ তাকে প্রাণপণে জড়িয়ে ধরল বিল্লু। তার কাঁধে মুখটা গুঁজে দিয়ে বলল, “আমি তো বিল্লু। আহিরিটোলা-হাওড়ার লঞ্চে মাউথ অর্গ্যান বাজিয়ে পকেট মারি। এ আমি কোথায় এলাম? এ আমার কী হচ্ছে লীলাদিদি?”

শরীরটা তার কান্নার ধাক্কায় কেঁপে কেঁপে উঠছিল। গত তের-চোদ্দঘন্টায় তার চেনা দুনিয়াটার একেবারে ওলটপালট হয়ে যাবার ধাক্কা এইবার তার বুকে এসে বেজেছে।

থরথর করে কাঁপতে থাকা শরীরটাকে দু-হাতে চেপে ধরে লীলা ফিসফিস করে বলছিল, “বোকা ছেলে। কাঁদতে নেই জানিস না? চোখ মোছ। তোর এখন হাতে অনেক কাজ। বাবা বলে দিয়েছে গুয়াহাটি যাবার পথে  ছ’মাস ধরে অনেক পড়তে হবে তোকে। অনেক কিছু শিখতে হবে যে! ”

“কেন লীলাদিদি? কী শিখব আমি?”

“এই কেনটার উত্তর আমি জানি না রে। বাবা জানে। শিখবি একাদশ সমান্তরালের ইতিহাস, ভুগোল, জিপসিদের বিজ্ঞান, গণিতশাস্ত্র সবকিছু। প্রথমে আমার কাছে স্কুলস্তরের পড়াশোনা। তারপর বাবা আছে, উমেরকাকা, জিনি আন্টি ওরাও আছে। কাল রাত্রে বাবা সব কাজ ভাগ করে দিল তো!”

“আর পড়তে হবে না। খোল বলছি শিগগির।”

পেছন থেকে দুটো হাত এসে বিল্লুর মাথার দুপাশে লাগানো ইলেকট্রোড দুটোকে খুলে নেবার চেষ্টায় ছিল।

“আঃ লীলাদিদি। ভালো হচ্ছে না বলছি। রিভিশানটা শেষ করে নিতে দাও প্লিজ। উমের স্যার টেস্ট নেবেন ছ’টার সময়। তোমার তো মজা। টেস্ট দিতে হয় না।”

“হয় না-ইতো! আমি বড়ো হয়ে গেছি না! কথা শোন বলছি। আমি তোর দিদিমণি না? ওয়েপন ট্রেনিং-এ এখনো কিন্তু…”

“ইঃ! ওয়েপন ট্রেনিং তুমি দাও বুঝি? জিনি আন্টির কাছে দুজনেই প্র্যাকটিশ করি তো!  প্রথম দু’মাস যখন পড়াতে, তখন দিদিমণি ছিলে। এখন শুধু দিদি। তোমার কথা শুনতে আমার বয়ে গেছে। যাও!”

লীলা হাসি হাসি মুখে বিল্লুর দিকে তাকিয়ে দেখল একবার। গত ছ’টা মাস ধরে তাদের ক্যারাভান বাংলার নানান শহরে থামতে থামতে এগিয়ে চলেছে উত্তরবঙ্গ ছাড়িয়ে পুবমুখো ‘অহোম’দের দেশের দিকে।  আস্তে আস্তে বদলে গেছে  চারপাশের ছবিগুলো। বিল্লু তার কিচ্ছুটি চেয়ে অবধি দেখেনি।

কলকাতা ছাড়বার পরের দিন লীলা তার কপালে প্রাথমিক গণিতের চিপটা লাগিয়ে জ্ঞানসঞ্চার চালু করবার পর থেকে আশ্চর্য বদল এসেছে ওর মধ্যে। তৃষ্ণার্ত মাটির মত, আশ্চর্য মেধায় সে শুষে নিয়ে চলেছে জাদুপৃথিবীর ইতিহাস আর তার পাশাপাশি জিপসি জ্ঞানভাণ্ডারের সমস্ত সঞ্চিত সম্পদ।

ঠিক দেড়মাস সময় লেগেছিল তার, লীলার স্কুলস্তরের সমস্ত জ্ঞানকে দখল করে হাসান গ্যালিলিন-এর উচ্চতর বিজ্ঞানের ক্লাশে পৌঁছোতে। পাশাপাশি উমের আর জিনির কাছে ইতিহাস, আধুনিক যন্ত্রবিদ্যা, যুদ্ধবিদ্যার পাঠেও পিছিয়ে থাকছে না সে। জিপসি সার্কাসের তুচ্ছ যান্ত্রিক খেলাগুলো এরই মধ্যে কোন ফাঁকে যে রপ্ত করে নিয়েছিল তা লীলা জানে না। কিন্তু রওনা হবার মাসতিনেকের মাথায় হাসানের কাছে গিয়ে সার্কাসের শোয়ে অংশ নেবার অনুমতি চায় সে। তার পরীক্ষা নেবার পর হাসান আপত্তি করেননি। এই মুহূর্তে শোয়ের প্রধান আকর্ষণ হয়ে উঠেছে তার নিজের তৈরি খেলা ‘উড়ন্ত সংগ্রাম’। 

“এই বিল্লু! লক্ষ্মী ভাই। ঠিক দশ মিনিট। একবার শুধু সামনেটা তাকিয়ে দ্যাখ! কী সুন্দর! কী সুন্দর!”

“উফ্‌ফ্‌। আচ্ছা ঠিক আছে। কিন্তু ওই দশ মিনিটই কিন্তু।” বলতে বলতেই চোখ থেকে সেন্সোভিশান গ্লাসদুটো খুলে নিল বিল্লু। আর তারপরেই গলা থেকে বিস্ময়ের একটা শব্দ উঠে এল তার, “সত্যি! কী সুন্দর রে লীলাদিদি!”

“এইজন্যেই বড়দের কথা মধ্যে মধ্যে শুনতে হয়।” লীলা মিটিমিটি হাসছিল তার পাশে বসে, “এই নে। এই দুরবিনটা দিয়ে দ্যাখ। ভালো দেখতে পাবি।”

এয়ার কুশনে ভর দিয়ে বড়ো বড়ো মেঘের টুকরোর মতই তাদের চারপাশে স্থির হয়ে ভেসে ছিল জিপসিদের গোটা ক্যারাভানটা। পাহাড়ে সন্ধে নামছে। তাদের পায়ের নীচে নীলচে সবুজ ধোঁয়াশা ছড়িয়ে স্থির হয়ে আছে পূর্ব হিমালয়ের কামাখ্যা পর্বতশ্রেণী। তার ফাঁক দিয়ে দিয়ে রূপোর স্রোতের মত পাক খেয়ে বয়ে চলেছে ব্রহ্মপুত্রের ধারা। তার বুকে অস্তগামী সূর্যের সিঁদুরে ঝিলিক।

“ভাগ্যিস জাদুকরদের পাবলিক রিপ্‌ল্‌ ট্রান্সপোর্টে জিপসিদের ওঠা বারণ!” তার কানের কাছে লীলার কথাগুলো গুণগুণ করছিল, “ওই মাটিতে মিশে গিয়ে অকাল্ট রিপ্‌ল্‌-এর ভেলকিতে এক লহমায় যেখানে খুশি পৌঁছে গেলে এই মজাটা থাকত কোথায় বল দেখি? তার চাইতে এই বেশ হাওয়ায় ভেসে ভেসে থামতে থামতে, দেখতে দেখতে যাওয়া…”

“দারুণ দেখতে কিন্তু মন্দিরটা। কেমন সুন্দর পাহাড়ের মাথায় তৈরি করেছে!” দুরবিন থেকে চোখ না সরিয়েই হঠাৎ বিল্লু বলল।

“ইতিহাসের প্রাইমারি মডিউলটার কিছু মনে আছে? তাহলে বল দেখি ওটার ব্যাপারে কী জানিস?”

“জানি তো! ওটা কামাখ্যার মন্দির। ওখানকার অহোম তাইদের জাদু কলেজ এক হাজার বছরের পুরোন। এই একটা দুর্গকে হাজার চেষ্টা করেও ভাঙতে পারেনি ব্রিটিশরা সেনাবাহিনীর জাদু। তাইতো গুয়াহাটির বাইরে অবধি এসে ওদের সাম্রাজ্য থেমে গেছে। আর পুবদিকে এগোতেই পারেনি।”

“বিল্লু..”

পেছন থেকে গম্ভীর গলার শব্দটা পেয়ে ওরা দুজন ঘুরে দেখল একবার। পাশের এয়ারশিপটা থেকে কখন যেন উমের এসে তাদের কাছে নেমেছেন। ছোটো গ্লাইডারটাকে ভাঁজ করে রাখতে রাখতেই একটু হেসে বললেন,

“ছ’টা বাজে। তুমি তৈরি?”

বিল্লু দুরবিনটা লীলার হাতে ফিরিয়ে দিল। সেটা হাতে নিয়ে লীলা জানালার ধারে গিয়ে বসেছে। বিল্লুর শিক্ষার ব্যাপারে হাসান গ্যালিলিনের আদেশ বড়ো কড়া।  তার শৃঙ্খলা ভাঙবার সাহস তার নেই।

হালকা স্থিরতাড়িতিক আকর্ষণে ঘরের মেঝের একটা অংশ উঁচু হয়ে একটা কাউচ-এর চেহারা নিচ্ছিল। সেটা গড়ে ওঠা শেষ হতে হাতে ধরা শেপারটাকে পকেটে রেখে তাতে বসে উমের বিল্লুকে ডাকলেন, “এখানে এসে আমার পাশে বোসো। ইতিহাসের এই শেষ পরীক্ষায় তোমার জন্য পাঁচটা প্রশ্ন আছে বিল্লু। শুরু করি?”

বিল্লু তার অ্যাডভান্সড হিসট্রি চিপের ইলেকট্রোডগুলো ফের কপালের দুপাশে লাগিয়ে নিতে যাচ্ছিল  তাড়াতাড়ি। হাসান বাধা দিলেন, “না। কোন যান্ত্রিক স্মৃতিভাণ্ডারের রেফারেন্স নয়। এ প্রশ্নগুলোর উত্তর তোমাকে নিজস্ব স্মৃতি আর বিচারবুদ্ধি থেকে দিতে হবে….”

“আধুনিক ইউরোপের জাদুসভ্যতার উত্থানবিন্দু বলতে কোন সময়টাকে তুমি চিহ্নিত করবে বিল্লু?”

একমুহুর্ত চুপ করে রইল বিল্লু। ১৬৮৩ সালের ১২ আগস্ট  দিনটাকে ইতিহাসের পাতায় এই উত্থানবিন্দু বলে দেখানো হয়। সে দিন রাজা দ্বিতীয় চার্লস তাঁর বিখ্যাত শিক্ষা সনদের মাধ্যমে ব্রিটেনের সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞানশিক্ষা ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে জাদুভিত্তিক শিক্ষাদানকে বাধ্যতামূলক করেন। কিন্তু এর সঙ্গে সে একমত নয়। একটু ভেবে নিয়ে সে বলল, “১৬৭৮ সালের ১২ আগস্ট।”

“সালটা ভুল করেছ বিল্লু।” একটু বিরক্ত ভাবে মাথা ঝাঁকাচ্ছিলেন উমের।

বিল্লু শান্ত গলায় প্রতিবাদ করল, “না উমের সার। আপনি আমার মত জানতে চেয়েছেন। আমার মতে, ওই দিনটিতে আইজ্যাক নিউটনের মাত্র ছত্রিশ বছর বয়সে গুপ্তঘাতকের হাতে প্রাণ দেয়াটাই এই সমান্তরাল পৃথিবীতে জাদুসভ্যতার উত্থানবিন্দু।”   

বিস্মিত দৃষ্টিতে তার দিকে একবার ঘুরে দেখলেন উমের। লীলাও সামান্য চমকে উঠে এদিকে ঘুরে বসেছে ততক্ষণে। খানিক বাদে উমের বললেন, “এর সপক্ষে তোমার যুক্তি?”

একটু থেমে নিজের চিন্তাতাকে গুছিয়ে নিল বিল্লু। তারপর বলল, “বিষয়টা নিয়ে আমি অনেক ভেবেছি স্যার। বিজ্ঞানচিন্তার ইতিহাসের মধ্যযুগে কোপার্নিকাস, ব্রুনো, গ্যালিলিওরা চেষ্টাটা প্রথম শুরু করেছিলেন। জাদুপন্থী চার্চের অত্যাচারে তাঁদের সে কাজ পূর্ণতা পায়নি। কিন্তু এরপর নিউটন যখন মাধ্যাকর্ষণের তত্ত্ব তৈরি করে, জাদুর বদলে বিজ্ঞান দিয়ে গোটা বিশ্বটাকে বোঝবার কাজটাকে বেশ কিছুদূর এগিয়ে গেলেন তখন ইংল্যাণ্ডের রাজশক্তি তাঁকে গোপনে সমর্থন দিতে শুরু করে।

“এতে ভয় পেয়ে ইউরোপের জাদুর সমর্থক পাদ্রি পুরুতরা তখন তাঁর বিরুদ্ধে গণ আন্দোলন গড়ে তোলেন। পরিণতিতে গুপ্তঘাতকের হাতে প্রাণ দিতে হল নিউটনকে। খেয়াল করলে দেখবেন, এরপরই  ইংল্যান্ডের সিংহাসনের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় চার্চের হাতে। শুরু হয় বিজ্ঞানসাধকদের বিরুদ্ধে জাদুকরদের কুখ্যাত হত্যালীলা-বৃটিশ ইনকুইজিশান।

“চার্লসের শিক্ষাসনদ এসেছিল এর পাঁচ বছর পরে। তার জোরে রাজকোষের টাকায় অক্সফোর্ড, কেম্ব্রিজ, এডিনবরা, মিলানের মত ইউরোপের প্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বদলে গেল জাদুশিক্ষা আর জাদুগবেষণার শক্তিশালী কেন্দ্রে। আর আমরা, বিজ্ঞানসাধক জিপসিরা কোণঠাসা হতে হতে ব্রাত্য ভবঘুরের দলে বদলে গেলাম।”

বলতে বলতেই উত্তেজিত হয়ে উঠছিল বিল্লুর গলাটা, “ব্যাঙ্গালোর, বা ম্যাসাচুসেটস-এর মত সামান্য কয়েকটা জিপসি স্টেটের হতদরিদ্র যন্ত্রভিত্তিক সমাজ এখন আমাদের সম্বল। জাদুসভ্যতা আমাদের অনুন্নত, বর্বর অপরাধপ্রবণ মানুষ ভাবে। আমি একাদশ সমান্তরালের পৃথিবীর সন্তান স্যার। সেখানে থাকতে শিক্ষার অভাবে তার ইতিহাস জানার সৌভাগ্য আমার হয়নি। তবে অনুমান করতে পারি, সেখানে নিউটনের এভাবে অকালমৃত্যু হয়নি। হয়ত সেইজন্যই সেখানে এখন পৃথিবীজোড়া যন্ত্রবিদদের শাসণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।”

তার উত্তেজিত মুখটার দিকে তাকিয়ে উমের কিছু একটা বলতে গিয়েও সামলে নিলেন নিজেকে। নিজেকে জিপসি বলে দাবি করছে বিল্লু। যন্ত্রসভ্যতায় ডুবে থাকা একাদশ সমান্তরালের পৃথিবীর মানুষ সে। প্রথম সমান্তরালে এসেও জিপসিদের হাতেই এখন অবধি তার শিক্ষাদিক্ষা। সে হিসেবে সে দাবি সে করতেই পারে।

অথচ, প্রকৃতির বিচিত্র খেলায় সে জাদুকর সমাজের স্বপ্নের রাইমিন গ্রন্থিরও মালিক। প্রকৃতি তাকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম জাদুকর হবার শক্তি দিয়েই গড়ে তুলেছেন।  আসলে বিল্লুর কোন জাতি নেই। জাদু আর যন্ত্র, এই দুয়েই সমান অধিকার তার। 

কথাটা মনে আসতে নিজের মনেই মাথা নেড়ে একটু হাসলেন উমের। জিপসিদের জাদুকররা ঘৃণা করে। ভয় পায়। জিপসিদের জন্য তাদের জ্ঞানভাণ্ডারের দরজা বন্ধ থেকেছে চিরকাল। উল্টোদিকে, জিপসিদের প্রযুক্তির ব্যবহার জাদুকরদের সমাজে নিষিদ্ধ। আইনত দণ্ডনীয়। আজ অবধি কোন জাদুকর জিপসিদের জ্ঞানভাণ্ডারে উঁকি দিয়ে দেখেনি। জানবার চেষ্টাও করেনি কী অমূল্য সম্পদ লুকিয়ে আছে সেখানে। বিল্লুই প্রথম সে নিয়ম ভাঙল।

ভাগ্যের একটা খেলা শক্তিশালী জাদুর এক উত্তরাধিকারীকে তাঁদের হাতে কিছুদিনের জন্য তুলে দিয়েছিল। হাসান সে সুযোগের ব্যবহার করেছেন। হয়ত ওর হাতেই একদিন গড়ে উঠবে প্রথম সমান্তরালের এই জাদুপৃথিবীর নতুন ইতিহাস। যে ইতিহাসের পাতায় সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে সেই দিনটার কথা, যেদিন এক তরুণ নেতার হাত ধরে জাদু আর বিজ্ঞান একসঙ্গে কাজ করতে শিখেছিল, যেদিন প্রথম সমান্তরালের এই পৃথিবীতে মানুষের সভ্যতার প্রকৃত উত্থানের শুরু।

***

রাত বয়ে যাচ্ছিল। গোটা ক্যারাভানটা ঘুমিয়ে পড়েছে। বাতাসে তাদের এয়ারশিপগুলো সাদা সাদা মেঘের স্তূপের মত স্থির হয়ে ভেসে থাকে। নিজের ছোট্টো কেবিনটাতে বসে বাইরের আকাশের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়েছিলেন হাসান গ্যালিলিন। আজ রাতটা স্বাধীন অহোম গণরাজ্যের সীমান্তে অপেক্ষা করতে হবে তাঁদের। জাদুসভ্যতার যেকোন রাষ্ট্রের মতই, বিজ্ঞানসাধক জিপসিদের এরাও বিশ্বাস করে না। রাতের অন্ধকারে তাদের সীমানায় ঢোকবার অনুমতি মেলেনি তাঁর ক্যারাভানের।

সেখানে অন্ধকারের বুকে মাঝেমাঝেই জোনাকির মত তিনটে আলোর বিন্দু বিচিত্র, জটিল নকশা কেটে একে অন্যকে ঘিরে পাক খেয়ে চলেছে। মাঝেমাঝেই অন্ধকার চিরে এদিক ওদিক ছুটে যাচ্ছিল তীব্র লাল আলোর  রশ্মিগুলো। কখনো কখনো একে অন্যের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে এক মুহুর্তের জন্য শক্তির ফুলঝুরি ছিটিয়ে ফের নিভে যাচ্ছিল তারা।

ওরা জেগে আছে। বিল্লু আর লীলা। জিনির প্রশিক্ষণে সারারাত জেগে থেকে জেটবেল্টে ভর করে এরিয়াল কমব্যাটে নিজের দক্ষ করে তুলছে এখন। নিজের জাদুশক্তি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ একটা ছোট্ট ছেলেকে বিজ্ঞানের দুনিয়ার পাঠ দিয়ে গড়ে তুলেছেন তাঁরা!

হঠাৎ একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এল তাঁর গলা থেকে। তীক্ষ্ণধি ছেলেটা খুব তাড়াতাড়ি শিখে নিচ্ছে সবকিছু। এই ছ’মাসে নিজেদের যাবতীয় জ্ঞান উজাড় করে ওকে তৈরি করে দিয়েছেন তিনি। সেই করতে করতেই কখন যেন একটা গভীর মমতাও এসে গিয়েছে তাঁর ওর ওপরে। হয়ত আরও কিছুদিন ওকে হতে পেলে…

কিন্তু তা হবার নয়। এবারে ওকে যেতে দিতে হবে। এই পরাধীন দেশের মুক্তির জন্য জাদুকরদের তাকে এখানে আনা। আগে সে কর্তব্য সম্পূর্ণ করতে হবে তাকে। তারপর… হয়ত কখনো…

আসলে, যে কারণে এতটা ঝুঁকি নিয়ে কাইকর ওকে খুঁজতে একাদশ সমান্তরালে গিয়েছিল তা হাসান জানেন। এক সমান্তরাল থেকে আরেক সমান্তরালে যাতায়াতের জন্য প্রয়োজনীয় মেসমর লেন্সিং রক একুশ শতকের জাদুকরদের কাছে আছে। কিন্তু বীরোলের অবিকল প্রতিরূপ কোন সমান্তরালে রয়েছে তার গণনা জাদুবিজ্ঞানের পক্ষে অসম্ভব ছিল। এর জন্য, জিপসিদের প্রতি বহু শতাব্দির পুরনো ঘৃণাকে জয় করে, আইন ভেঙে   কাইকর তাঁর কাছে এসেছিলেন। প্রয়োজনীয় কোয়ান্টাম ক্যালকুলেশনের সাহায্য চাইতে। সে-সময় কাইকর তাঁকে সবই বলেছেন। ওর ওপর ভারতীয় বিপ্লবীদের দাবি অনেক বেশি। আগে সে দাবি মেটাতে হবে ওকে। তারপর…তাতে সফল হলে তখন…

তবে উপস্থিত অনৌসিকের শিবিরে খবরটা পৌঁছোন দরকার। প্রকাশ্যে সেটা করবার উপায় নেই। কাইকরের গতিবিধি অনুসরণ করে, বিপ্লবীদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ থাকবার সন্দেহ ব্রিটিশ সরকারের ওপরমহলে চিরকালই আছে। প্রমাণের অভাবে এখনো কিছু করতে না পারলেও তাঁর গতিবিধির ওপরে তাদের নজর থাকবেই।

একটা লম্বা শ্বাস ফেলে সামনে রাখা বাক্সটা থেকে একটা ছোটো স্ফটিক তুলে আনলেন হাসান। কাইকরের থেকে পাওয়া। ভারতীয় বিপ্লবীদের জন্য অহোম মিলিটারি ইনটেলিজেন্সের উপহার। ক্লাসিফায়েড জেড ব্যাণ্ড সংযোগতরঙ্গে কাজ করে এটা।  কামাখ্যার জাদুকলেজের অবদান। ব্রিটিশ গোয়েন্দা দফতর এখনো এর সবগকেতের পাঠোদ্ধার করবার মত জাদুতরঙ্গের সন্ধান পায়নি। 

স্ফটিকটা তাঁর হাতের স্পর্শ চেনে।  আস্তে আস্তে সবজেটে একটা আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল তা। খানিক বাদে তার মধ্যে আবছা একটা চেহারা ভেসে উঠল। ঘন খয়েরি আলখাল্লায় ঢাকা জাদুকরটি সেখান থেকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন তাঁর দিকে।

“অভিবাদন কমাণ্ডার গগৈ। আমি হাসান গ্যালিলিন। বিপ্লবী অনৌসিকের কাছে পাঠানো কাইকরের উপহার আমি সঙ্গে করে এনেছি। খবরটা তার কাছে পৌঁছানো প্রয়োজন।”

“আগে বলুন কাইকর নিজে না এসে একজন জিপসিকে…” গভীর অবিশ্বাস ঝরে পড়ছিল কমাণ্ডার গগৈয়ের গলা থেকে।

“তিনি শহীদ হয়েছেন। আমি আপনাকে খুলে বলছি…”

ঘন্টাখানেক বাদে কথা শেষ করে একটা লম্বা শ্বাস ছাড়লেন হাসান, “আমার ওপর দেয়া দায়িত্ব আমি পালন করেছি কমাণ্ডার। এবার আপনি খবরটা…”

“নিশ্চিন্ত থাকুন। অনৌসিক রাত শেষ হবার আগেই খবর পেয়ে যাবেন। বাকি সমস্ত ব্যবস্থাও আমি করে দেব।”

আস্তে আস্তে মিলিয়ে এল স্ফটিকের মধ্যের ছবিটা। তাঁর চোখের বিস্ময়ের দৃষ্টিটা হাসানের মুখে বিচিত্র একটুকরো হাসি ফুটিয়ে তুলছিল। একজন কুসংস্কারাচ্ছন্ন ভবঘুরে জিপসির কাছে এতটা কর্তব্যবোধ সম্ভবত অহোম সেনাবাহিনীর একজন কমাণ্ডার স্তরের জাদুকর আশা করেননি।

রাত শেষ হয়ে আসছিল।  পুবদিকে পাহাড়ের মাথা লাল হয়ে উঠছে আস্তে আস্তে। হঠাৎ একটা মৃদু ঝাঁকুনি খেয়ে নড়ে উঠল হাসানের এয়ারশিপ।  অবতরণের অনুমতি দিয়েছে অহোম সরকার।

তাঁর পায়ের নীচে আস্তে আস্তে বড়ো হয়ে উঠছিল স্বাধীন অহোমের রাজধানী গুয়াহাটির জাদুমন্ত্রকের অতিকায় টাওয়ারগুলো। তার পাশে, দিসপুরের মেলাপ্রাঙ্গণে একে একে অবতরণ করছে জিপসি ক্যারাভানের এয়ারশিপগুলো। তারপর  হাওয়া বের করে দিয়ে একেকটা অতিকায় তাঁবুতে বদলে যাচ্ছে তারা দেখতে দেখতে। সেদিকে চোখ ধরে রেখে নিজের কমিউনিকেটরটা বের করে হাতে নিলেন হাসান। এক এক করে ইনস্টলেশান রিপোর্টগুলো ভেসে উঠছে সেখানে।  এখন কয়েক ঘন্টা নিঃশ্বাস ফেলবারও অবসর থাকবে না তাঁর।

“রহস্যময় জিপসি বিজ্ঞানের নতুন চমক। বিস্ময়বালক ও তার দুই সঙ্গীর সম্পূর্ণ যন্ত্রভিত্তিক উড়ন্ত অভিযান। হত্যাস্ফটিকের সাহায্য ছাড়াই শূন্যে মৃত্যুরশ্মির চমকপ্রদ লড়াই….”

          অতিকায় প্রধান তাঁবুর সামনে মানুষের সারিটা সাপের মত এঁকেবেঁকে দিসপুরের মেলাপ্রাঙ্গণ থেকে বহুদূর অবধি ছড়িয়ে গেছে। রঙবেরঙের আলখাল্লায় ঢাকা দর্শকের সার মাথা উঁচু করে ভাসমান অক্ষরগুলোর দিকে দেখছিল। হলোগ্রাফিক প্রজেক্টর থেকে ছুঁড়ে দেওয়া বর্ণাঢ্য শব্দগুলো বাতাসে ভাসছে, কখনো কখনো বা নেমে এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে তাদের মাথায়। হঠাৎ তার মধ্যে টাইটস পরা বিল্লুর ছবিটা ভেসে উঠতেই একটা হররা উঠল জনতার মধ্যে। গত কয়েকমাসে জিপসি সার্কাসের এই নতুন নায়কের ছবিটা প্রচারের কল্যানে দেশবিদেশে অনেকটাই পরিচিত হয়ে উঠেছে।

উত্তেজিত ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েদের স্ফটিক থেকে ছুঁড়ে দেয়া জাদুর স্রোত, আগুনের শিখার মত বারবার ঝিলিক দিয়ে উঠছিল বিল্লুর হাসিমুখ ছবিটাকে ঘিরে। নতুন নায়ককে স্বাগত জানাচ্ছে তারা। গ্রিনরুম থেকে বাইরের দিকে সে দৃশ্য দেখতে দেখতে  নিজের মনেই একটু হাসল লীলা। শিশুরা জিপসিদের ঘৃণা করে না।

“কী দেখছিস রে লীলাদিদি?” বিল্লু কখন যেন তার শোয়ের পোশাকটা পরে লীলার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। ঘুরে দাঁড়িয়ে তার টিউনিকের কাঁধটা একবার একটু সোজা করে দিল লীলা। জিনি আন্টি তাদের অস্ত্রগুলো একটা ট্রেতে করে নিয়ে আসছিলেন। অস্ত্রগুলো আসল। শক্তিশালী। জিনি আন্টি নকল খেলনা নিয়ে শো করা পছন্দ করেন না।

ঠিক সেই সময়, তাঁবুর মূল প্রবেশপথের সামনে এসে দাঁড়ানো দুজন জাদুকর তীক্ষ্ণ চোখে বিল্লুর ভাসমান ছবিটার দিকে দেখছিলেন। খানিক বাদে একে অন্যের দিকে মুখ ঘুরিয়ে একটু সম্মতিসূচক মাথা নাড়লেন তাঁরা। তারপর মূল দরজার খানিক দূরে একটা ছোটো দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে কর্তব্যরত জিপসিটির সামনে একটা স্ফটিকের টুকরো তুলে ধরলেন।

তার মধ্যে ভেসে থাকা ছবিটার দিকে একনজর তাকিয়েই সসম্ভ্রমে দরজা থেকে সরে দাঁড়াল জিপসি পাহারাদার। অহোম সরকারের দেয়া বিশিষ্ট অতিথির অনুমতি নিয়ে এসেছেন এই দুই জাদুকর। কিছুক্ষণ বাদে তাঁদের সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে মঞ্চের সামনে, অন্য বিশেষ আসনগুলো থেকে খানিক দূরে দুটো আসনে বসিয়ে দিয়ে বিনীত ভঙ্গীতে সরে আসতে গিয়েছিল সে, তখন অতিথিদের একজন তাকে ইশারায় ডাকলেন, “হাসান গ্যালিলিনকে গিয়ে জানাও, অতিথিরা  উপস্থিত।”

বলতে বলতেই হাতে উঠে আসা সোনার চাকতিটা তিনি এগিয়ে ধরেছেন  তার দিকে, “খবরটা কেবল হাসানের জন্য। অন্য কেউ…”

চাকতিটা পকেটে ভরতে ভরতে মানুষটাকে একটা সেলাম ঠুকে দিল জিপসি পাহারাদার, “আদেশ পালিত হবে মহান।”

***

“সবার শেষে,আজকের মূল আকর্ষণ, উড়ন্ত সংগ্রাম। বাংলার চোদ্দটি শহরে সকলের অকুন্ঠ প্রশংসা কুড়িয়ে আজ আপনাদের এই মহান ঐতিহ্যবাহী জাদুনগরীতে বিজ্ঞানের বিস্ময়কর, জাদুহেন প্রদর্শনী উপস্থিত হয়েছে। বন্ধুগণ, খেলাটি বিপজ্জনক। আমাদের অনুরোধ এ খেলা চলাকালিন আপনারা যেকোনরকম জাদুর প্রয়োগ থেকে যথাসাধ্য সংযত থাকবেন। মহামান্য দর্শকদের অনুরোধ করা হচ্ছে আপনারা যার যার জাদুস্ফটিককে আগামি দশ মিনিটের জন্য নিষ্ক্রিয় রাখবেন। মনে রাখবেন, মনঃসংযোগের বিন্দুমাত্র ব্যাঘাতে একটি যন্ত্রের কম্যান্ডের সামান্যতম ভুলেও মৃত্যুরশ্মির আঘাতে ধুলো হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারেন একজন খেলোয়াড়…” লাউড স্পিকার গমগম করে বেজে উঠছিল কথাগুলো।

গোটা তাঁবুতে নীরন্ধ্র অন্ধকার নেমে এসেছে। বাতাসে হালকা বাজনার শব্দ শুনতে শুনতেই যেন নিঃশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষায় ছিল দর্শকের দল।

শুধু সেই অন্ধকারের মধ্যে, ঘন কালো আলখাল্লার আড়ালে তখন জেগে উঠেছে দুই বিশেষ অতিথি জাদুকরের হাতের স্ফটিক। হাতের নিঃশব্দ মুদ্রায় তাদের সুনির্দিষ্ট একটা কাজের জন্য তৈরি করে নিচ্ছিলেন তাঁরা।  কামাখ্যা জাদুকলেজের অ্যাডভান্সড রিসার্চ ল্যাবের এই শেষতম আবিষ্কারের খবর এখানকার সেনাবাহিনীর শীর্ষস্থানীয়রা বাদে এখনো কারো কাছেই নেই।

অন্ধকারের মধ্যে হঠাৎ একটা তীব্র নীল আলোর বিন্দু জেগে উঠল তাঁবুর এক কোণে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মিউজিক সিস্টেমে বেজে ওঠা গম্ভীর শব্দের তালে তাল মিলিয়ে বাতাসে ভেসে উঠেছে দুটো মানুষের মূর্তি। তাদের জেটপ্যাক থেকে বের হয়ে আসা আয়নের স্রোত বাতাসে ওজনের মৃদু গন্ধ ছড়িয়ে দিচ্ছিল।

বাতাসে ভেসে উঠে তাঁবুর দু’পাশের ছাদের কাছে পজিশন নিল লীলা ও জিনি। লাউডস্পিকারে হাসানের গম্ভীর গলাটা ভেসে আসছিল, “বন্ধুরা, হাসান গ্যালিলিন সার্কাসের দুই অভিজ্ঞ যোদ্ধার লীলা গ্যালিলিন ও জিনিয়া হেরম্যানের বিরুদ্ধে একলা মৃত্যরশ্মির দ্বন্দ্বে আসছেন… বিস্ময়বালক…”

বলতে বলতেই দর্শক আসনের মাঝখানের একটুকরো ফাঁকা জায়গায়  আরো একটা নীল আলোর শিখা জ্বলে উঠল। পরের মুহুর্তেই সেখান থেকে বাতাসে লাফ দিয়ে উঠে ভেসে গেল বিল্লুর শরীরটা। নিজের জেটপ্যাককে নিয়ন্ত্রণ করে দর্শকদের মাথার ওপর দিয়ে জটিল নকশায় ভাসতে ভাসতেই  তার হাতে উঠে এসেছে মৃত্যুরশ্মির অস্ত্র।

হঠাৎ করেই অস্ত্রটা থেকে তীব্র লাল লেজারের একটা ধারা ছুটে গেল জিনির শরীরকে লক্ষ করে। দর্শকদের মধ্যে মৃদু হিস হিস শব্দ উঠল একবার। আর তারপরেই হাততালির শব্দে ফেটে পড়ল গোটা তাঁবু। আশ্চর্য দক্ষতায় নিজেকে বাঁচিয়ে অন্যদিকে ভেসে গিয়েছেন তিনি। তারপর সেখান থেকে পালটা আক্রমণ শানিয়েছেন।

ততক্ষণে দ্বিতীয় একটা রশ্মিও বিল্লুকে লক্ষ করে ভেসে এসেছে তাঁবুর অন্য প্রান্তে ভাসমান লীলার অস্ত্র থেকে। এক মুহূর্তের জন্য বুঝি চোখ বন্ধ করে ফেলেছিলেন দর্শকরা। পরমুহূর্তেই হাততালির শব্দে ফের ভরে গেল গোটা তাঁবু। নিজেকে এক ধাক্কায় অনেকটা ওপরে নিয়ে গিয়েছে বিল্লু। তার তলায় দুই বিপরীতমুখী মৃত্যু আলোর ধারা একে অন্যের গায়ে ধাক্কা খেয়ে আলোর ফুলঝুরি তুলেছে তাঁবুর আকাশে।

সময় পার হয়ে যাচ্ছিল দ্রুত। আশ্চর্য, অবিশ্বাস্য দক্ষতার প্রদর্শনীতে গড়ে উঠছিল একের পর এক শ্বাসরোধকারী মুহুর্ত। দর্শকরা তৈরি হচ্ছিলেন এ খেলার চূড়ান্ত দৃশ্যের জন্য। প্রচার মাধ্যমের কল্যাণে খেলার এই শেষদৃশ্যের কথা তাঁদের অজানা নেই।

বাতাসে ভাসতে ভাসতেই  বিল্লুকে ঘিরে বৃত্তটা ছোটো করে আনছিল জিনি ও লীলা। এইবার একেবারে তার কাছাকাছি এগিয়ে এসে তারা দুজন একসঙ্গে তাদের অস্ত্র তুলে ধরেছে তার শরীর লক্ষ করে।

ট্রিগারে চাপ দিয়েছে ওরা।  দুটো রশ্মি এক হয়ে গিয়ে মূর্তিমান মৃত্যুর মতই ধেয়ে আসছে তার দিকে। বিল্লু তার অস্ত্রের শক্তি চুড়ান্ত স্তরে বাড়িয়ে নিল। শরীর ছোঁবার আগেই তাকে রুখে দিতে হবে একটা নিখুঁত, আঘাতে। সেই সংঘাতে যুদ্ধের শেষদৃশ্যে বাতাসে গড়ে উঠবে অতিকায় আলোর একটা ফুল। কিন্তু হিসেবের একচুল এদিক ওদিক হলে…

আর ঠিক সেইমুহূর্তেই হঠাৎ অন্ধকারের আড়ালে দুই অতিথির হাতে তীব্র  শক্তিতে ঝলক দিয়ে উঠেছিল দুটো জাদুস্ফটিক। বিল্লুর দিকে ধেয়ে যাওয়া দুটো লেজারের মধ্যে দিয়ে তার শরীর লক্ষ করে উড়ে গেল তাদের অদৃশ্য, শক্তিশালী ঝলক। পরের মুহুর্তেই ধেয়ে আসা লেজারের ধারাদুটো কোন বাধা না পেয়ে ছুটে গেল তাদের সামনের ফাঁকা বাতাস চিরে। তীব্র ওজনের গন্ধে তখন ভরে উঠছে তাঁবুর আকাশ।

চমকে উঠে ফাঁকা জায়গাটার দিকে ছুটে গিয়েছিল লীলা আর জিনি। কিন্তু ততক্ষণে তাদের কানে আটকানো খুদে স্পিকারে সরব হয়ে উঠেছে হাসানের গলাটা, “ভয় পেয়ো না। ওর কোন ক্ষতি হয়নি। বিল্লু তার কর্তব্যের পথে রওনা হয়ে গেছে।”

হঠাৎ মাঝ-আকাশেই থেমে গেল উড়ন্ত যোদ্ধা দু’জন। আলোর বন্যায় ভেসে যাচ্ছে গোটা তাঁবু। সেই আলো পেরিয়ে তাদের দিকে উড়ে এসে দুজনকে দুপাশে নিয়ে হাসান বলছিলেন, “অহোম প্রজাতন্ত্রের সম্মানিত দর্শকদের জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত করা এই অন্তর্ধানের চমক দিয়ে শেষ হল আজকের অনুষ্ঠান। বন্ধুগণ, আশা করি আগামী দিনগুলোতে আমরা বারংবার আপনাদের আশীর্বাদ পাব।”

কথাগুলো বলতে বলতেই তাঁবুর ঠিক মাঝখান দাঁড়ানো মঞ্চের ওপর বিল্লুর ছোটোখাটো শরীরটা কোথা থেকে যেন এসে এসে হাজির হয়েছে। নীচু হয়ে চারদিকে ঘুরেঘুরে দর্শকদের প্রণাম জানাচ্ছিল সে। 

হাততালির শব্দে ফেটে পড়ছিল গোটা তাঁবু। অবিশ্বাস্য এই প্রদর্শনী দেখে তৃপ্ত, উল্লসিত দর্শকদের নজরের আড়ালে তখন বিশেষ অতিথির আসন থেকে আস্তে আস্তে মাটিতে মিশে যাচ্ছিলেন দুই আগন্তুক জাদুকর।

প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই মেলাপ্রাঙ্গন থেকে প্রায় কুড়ি কিলোমিটার দূরে, কামাখ্যাপাহাড়ের নির্জন উত্তর ঢালে,গভীর অন্ধকারে  চুপচাপ বসে থাকা একটা ছেলের পাশের মাটি উঁচু হয়ে উঠে সেই দুজন মানুষের রূপ নিল।

“ভয় পেয়েছ কি?”

“না। হাসান স্যার আমায় আগেই জানিয়েছিলেন আপনারা আজকে আমাকে নিতে আসবেন। কিন্তু লীলাদিদি জানে না। সে ভয় পাবে।”

মানুষদুজনের মধ্যে অপেক্ষাকৃত কমবয়সীটি নিঃশব্দে হাসলেন, “ভেবো না। হাসান এইবার তাদের সব কথাই বলবেন। এর পরের শো’গুলোতে তোমার উপস্থিতি চালু রাখবার জন্য অবশ্য তাকে সামান্য একটু জাদুর সাহায্য নিতে হয়েছে আমাদের তরফ থেকে। সার্কাসের আর একজন দক্ষ খেলোয়াড় এ-জন্য বিপ্লবীসঙ্ঘের সহায়তায় নিজের রূপ পরিবর্ত্ন করে তোমার রূপ ধরতে সম্মত হয়েছে। বিপ্লবের প্রতি হাসান গ্যালিলিন আর তাঁর দলের এই গভীর আনুগত্য আমরা ভুলব না। এখন চলো। অনেকটা পথ যেতে হবে আমাদের।”

কথাগুলো বলতে বলতেই মানুষদুজন দু’পাশ থেকে তার হাত ধরেছেন এসে। একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল তার শরীরে। পায়ের নীচের শক্ত পাথুরে মাটি যেন ঘন তরলের একটা ঢেউয়ের মত উঠে আসছে পা বেয়ে। সেই তরলের সঙ্গে গলেমিশে মাটির সঙ্গে মিলিয়ে যাচ্ছিল তার সমস্ত শরীর—সমস্ত অস্তিত্ব..

***

নরম, তলতলে কাদামাটির মধ্যে থেকে উঠে দাঁড়াচ্ছিল তারা তিনজন। মাথার ওপর তারাভরা আকাশটা স্থির হয়ে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। তার নীচে গাঢ় অন্ধকারের মত আকাশের দিকে উঠে গেছে বাটির মত মাথাওয়ালা একটা পাহাড়।

তাদের চারপাশে জলের ছলছল শব্দ। ভেজা ঠাণ্ডা বাতাস তার শরীরে কাঁপুনি ধরাচ্ছিল। দু’হাতে নিজেকে জড়িয়ে ধরে বিল্লু সামনের আকাশ ছোঁয়া ঘন অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে দেখল একবার। তারপর বলল, “এ কোথায় এলাম? কী করে..”

“রিপ্‌ল্‌ ট্রান্সপোর্ট কখনো ব্যবহার করনি, তাই না?”

বিল্লু বোকার মত মাথা নাড়ল একবার।

“এ পাহাড়কে বলে সোফেট নেং। গুয়াহাটি থেকে আশি কিলোমিটার দূরে। উমইয়াম লেক এর মাঝখানে। খাসিদের পবিত্র পাহাড়। প্রাচীন রহস্যময় জাদুর কেন্দ্র। কামাখ্যার থেকেও পুরোন। খাসি জাদুকররা বলেন এইখানে তাঁদের সাত দেবতার হাত ধরে পৃথিবীতে জাদু এসেছিল। তাঁদের ভাষায় তাই জাদুর নাম কা হাইনিউ স্কুম বা সাতটি শিকড়।”

“সত্যি?”

“না। বিশ্বাস। পৃথিবীর অনেক জায়গার মানুষের লোকগল্পেই এমন বিশ্বাস আছে।  বাস্তবে, জাদুশাস্ত্র মানুষের দীর্ঘ চেষ্টায় তিলে তিলে গড়ে উঠেছে। আকাশ থেকে আসেনি। এখন এসো। হাত ধরো। অনেকটা পাহাড় বাইতে হবে আমাদের। সোফেট  নেং এর পথ খুব সহজ নয়।”

“রিপ্‌ল ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করে…”

মানুষটা অন্ধকারে হাসলেন একটু, “না। পবিত্র এই পাহাড়ের গায়ে চলাচলের জন্য কোন জাদুর ব্যবহার এখানে নিষিদ্ধ। স্থানীয় সংস্কারকে আমরা শ্রদ্ধা করি।”

চতুর্থ অধ্যায়
একটি ব্যর্থ প্রচেষ্টা

মানুষটা কেমন অকালে বুড়িয়ে গিয়েছেন। বিল্লু তাঁর মুখের দিকে একনজর তাকিয়েই চোখ নামিয়ে নিল ফের। তীব্র চোখদুটো যেন তার মাথার ভেতর হাতড়ে সবকিছু জেনে নিতে চাইছিল। এখানে আসবার পর গত তিনটে দিন তাকে নিয়ে অজস্র পরীক্ষানীরিক্ষা চালিয়েছেন অভিজ্ঞ জাদুবিদদের একটা দল। তারপর, আজ সকালে  তাকে পাহাড়ের বুকের একেবারে ভেতরের এই ছোট্টো দু’কামরার ঘরটাতে নিয়ে আসা হয়েছে এই মানুষটার কাছে।

মানুষটা তাঁর হাতে ধরা স্ফটিকের বুক থেকে বাতাসে ভাসমান লিপিগুলোতে শেষবারের মত চোখ বুলিয়ে নিয়ে ম্লান হাসলেন একটু। তারপর সেটা হাতে ধরে এগিয়ে এলেন তার একেবারে কাছে। তাঁর ছোঁয়ায় আদরের স্পর্শ ছিল।

“আমাকে একটুও চেনা ঠেকছে কি তোমার?”

বিল্লু দুদিকে মাথা নাড়ল।

একটু হতাশ হলেন যেন মানুষটা। তারপর স্ফটিকটা তার সামনে ধরে বললেন, “আর এঁকে?”

সেখানে ধীরেধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকা সুন্দর মুখটার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল বিল্লুর। এ মুখ তার চেনা। কোথায় দেখেছে সে তা তার মনে নেই। অথচ—কিছু অস্পষ্ট স্মৃতি হঠাৎ করেই মনের কোন অন্ধকার কোণ থেকে মাথা জাগাচ্ছিল তার মুখটা দেখে। একটা লম্বা প্ল্যাটফর্ম। তীব্র শীতের রাত। প্ল্যাটফর্মের এক কোণে শক্ত মেঝের ওপর শুয়ে আছে সে। মুখটা তার ওপরে ঝুঁকে আছে যেন। অস্ফুট সুরে কী একটা গান গেয়ে চলেছে  ঠোঁটদুটো। বড়ো সুন্দর সুরটা! বড়ো আরাম! চোখে ঘুম নামে সে গলার শব্দে…”

“তোমার বাবা-মায়ের কথা বল বিল্লু। আমি শুনতে চাই।”

একটুক্ষণ থেমে থেকে বিল্লু মাথা নাড়ল, “বাবাকে দেখিনি। আমার জন্মের আগেই তিনি মারা গিয়েছিলেন। আমার মা আমাকে নিয়ে শ্রীরামপুর স্টেশনে ভিক্ষা করত। আমার যখন তিন বছর বয়স তখন মা ট্রেনে কাটা পড়ে…”

“থাক। বলতে হবে না। তোমার কষ্ট হচ্ছে।”

দুটো কর্কশ হাত তার চোখের কোণে ফুটে ওঠা জলের ফোঁটাগুলো বড়ো আদরে মুছিয়ে দিচ্ছিল, “এস, তোমাকে একটা জিনিস দেখাই। দুটো ছবি। এই যে! দেখ তো…”

মানুষটার হাতে ধরা স্ফটিকটা থেকে দুটো ছবি বাতাসে ভেসে উঠেছে পাশাপাশি। একটা তাঁর নিজের ছবি। আর অন্যটা…

স্তম্ভিত হয়ে সেদিকে দেখছিল বিল্লু। যেন মানুষটার কমবয়সের অবিকল একটা ছবি। তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। এ মুখ তার বড়ো চেনা। সেদিকে চোখদুটো ধরে রেখে সে আস্তে আস্তে প্রায় নিজের মনেই বলল, “আ-আমি..আপনার মুখের সঙ্গে..”

“হ্যাঁ বিল্লু। প্রত্যেক সমান্তরালের ইতিহাসে যতটুকু এলাকা প্রকৃতির হাতে থাকে তাতে ঘটনাস্রোত একই পথে চলে। বদল আসে শুধু মানুষের জীবনে। তার সমাজে। তার একেকটা সিদ্ধান্ত সমাজকে এক একটা সমান্তরাল পৃথিবীতে এক এক পথে বইয়ে দেয়। একাদশ সমান্তরালেও তুমি আমাদেরই সন্তান। সেখানে আমি মৃত। তোমার মা পথের ভিখিরি হয়ে তোমাকে তিনবছর বয়সে ছেড়ে যান। আর এখানে…”

“এখানে—কী?”

“সবই জানবে তুমি। সে জন্যই তো কাইকরের এত খুঁজে, এত ঝুঁকি নিয়ে তোমাকে এই সমান্তরালে আনা। তবে তার আগে দু-একটা পরীক্ষার প্রয়োজন আছে। স্ফটিকটা ধরো। ওর দিকে তাকিয়ে তোমার নিজের আর আমার মুখদুটোর কথা ভাব দেখি…”

চোখের সামনে সামনে স্ফটিকটা তুলে ধরল বিল্লু। জিনিসটা যেন একটা বন্ধ দরজা। তার চাবিটা বিল্লুর জানা। শুধু কোথায় সেটা আছে তার স্মৃতিতে তা সে খুঁজে পাচ্ছিল না কিছুতেই।

“ভাব বিল্লু। মনকে একটা বিন্দুতে সংহত কর।”

তার সারা শরীর স্থির হয়ে গেছে। চোখদুটো শুধু তীব্র মনঃসংযোগে তাকিয়ে থাকে স্ফটিকটার দিকে। আস্তে আস্তে তার থেকে বাতাসে মাথা জাগাচ্ছিল দুটো ছবি। অস্পষ্ট, ভাঙাভাঙা…

হঠাৎ কপালের কাছে তীব্র একটা যন্ত্রণা এসে যেন ধাক্কা দিয়ে জাগিয়ে তুলল তাকে। ভাঙা ভাঙা ছবিদুটো উধাও হয়েছে।

“আ-আমি পারছি না।”

“ঠিক এই সিদ্ধান্তেই আমরাও পৌঁছেছি অনৌসিক,” হঠাৎ তার পেছন থেকে অন্য একটা গলা কথা বলে উঠল। লম্বাচওড়া মানুষটা কখন যে নিঃশব্দে ঘরের ভেতর এসে দাঁড়িয়েছেন তা বিল্লু টের পায়নি।

“ও পারছে না। পারবেও না। পিনিয়াল গ্রন্থিকে জাগিয়ে তোলবার সঠিক বয়স পার হয়ে গিয়েছে এর। গত ছ’মাস ধরে ওর মস্তিষ্কে ওই বর্বর জিপসিদের ইলেকট্রনিক শিক্ষা প্রোগ্রামিং-এর প্রভাব আরো দুর্বল করেছে এর পিনিয়ালকে। সেখানে সাইকোটনিন ক্ষরণের মান এই মুহূর্তে প্রায় শূন্য। একে পূর্ণশক্তিতে জাগিয়ে তোলবার মত জাদু আমাদের শাস্ত্রে নেই। আমি জানি এর রাইমিন গ্রন্থি শক্তিশালী। কিন্তু তাকে নিয়ন্ত্রণ করবার মত পিনিয়াল অ্যাক্টিভিটি না থাকলে…”

মানুষটার দিকে চোখ ফেলে এক মুহূর্তের জন্য দৃষ্টিটা একটু কঠোর হয়ে উঠল বুঝি অনৌসিকের, “জিপসিরা আমাদের আইন মেনে চলে না জীবাক। আমাদের আইনবিরুদ্ধ শিক্ষা একে দিলেও কাইকরের অনুরোধ মেনে ছ’মাস ধরে একে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা দিয়েছে সে। একথা ভুলে যাবেন না। একজন জাদুকরকে রীতিবিরুদ্ধ শিক্ষা দেয়ার অপরাধে তার সে কৃতিত্ব খাটো হয় না। কিন্তু তাই বলে, একটা চেষ্টা না করে এভাবে শুরুতেই হার মেনে নেয়া আমি উচিত বলে মনে করছি না। কতটা ভরসা করে আছে ওর ওপরে আমাদের পরিকল্পনা তা আপনার অজানা নয়। আপনি চাইলে অন্য কাউকে এ দায়িত্ব আমি…”

তাঁর চোখে চোখ রেখে একমুহূর্ত স্থির হয়ে রইলেন জীবাক। দুটো তীব্র ব্যক্তিত্ব যেন ইচ্ছাশক্তির যুদ্ধে নেমেছে। খানিক পরে নিজের চোখ নামিয়ে নিলেন তিনি। তীব্র চোখে বিল্লুর দিকে একমুহূর্ত তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে বললেন, “আমি চেষ্টা করব অনৌসিক। তবে সেটা এই যন্ত্রদাস কতটা সহ্য করতে পারবে তা আমার জানা নেই। অনেক যন্ত্রণা পাবে এ। হাসান গ্যালিলিনের পথে সরাসরি জ্ঞান প্রতিস্থাপন করে পিনিয়াল গ্রন্থিকে জাগানো যায় না। অর্ধমৃত গ্রন্থিকে নতুন করে সাইকোটনিন ক্ষরণের জন্য জাগিয়ে তোলার পথ অনেক বেশি কঠিন।”

বলতে বলতেই হঠাৎ হাতদুটো বিল্লুর দিকে খুলে ধরেছেন জীবাক। প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই জ্বালাধরানো আগুনের একটা হলকা এসে যেন তার সমস্ত চেতনায় ছড়িয়ে গেল। তীব্র যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গিয়ে ঘরের এক কোণে ছিটকে পড়ল সে।

তার ছটফট করতে থাকা শরীরটার কাছে এসে দাঁড়িয়ে ব্যাঙ্গভরা গলায় জীবাক বলছিল, “রাইমিন গ্রন্থির মালিক! জাদুবিশ্বের রাজপুত্র! অথচ প্রাথমিক স্তরের সামান্য একটা ধাক্কা সামলাবার মত ক্ষমতাও নেই। হাঃ!  তবে হ্যাঁ। কথা দিয়েছি। চেষ্টা আমি করব। যতক্ষণ এর শরীরে প্রাণ থাকবে…”

“সাবধান জীবাক। এ আমার আশ্রিত। এর কোন ক্ষতি হলে আমি…”

একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বিল্লুকে তুলে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বড়ো বড়ো পায়ে সরে যেতে যেতে জীবাক একটুকরো বিদ্রূপের হাসি ছড়িয়ে দিলেন অনৌসিকের উদ্দেশ্যে, “জানি। বিপ্লবের অবসংবাদি নেতার দুর্বলতার কথা শুধু আমি নয়, সকলেই জানেন। আপনার চিন্তার কোনো কারণ নেই।”

***

“বিল্লু।”

সবাই চলে গেছে। ফাঁকা ঘরটার মধ্যে কেবল অনৌসিক আর বিল্লু মুখোমুখি এখন। ঘরের এক কোণে চুপ করে দাঁড়িয়েছিল সে।  তখনও তার ভেতরকার কাঁপুনি থামেনি।

“আ-আমি জীবাকের কাছে যাব না। আমি…”

হঠাৎ তার কাছে এসে দুই কাঁধে হাত রেখে দাঁড়ালেন অনৌসিক, “আমি জানি তোমার ভয় হচ্ছে। জীবাক বড়ো নিষ্ঠুর। তবে তার কারণ আছে। তার পরিবারের প্রত্যেকটি সদস্য মারা পড়েছে ইংরেজের পুলিশের সঙ্গে এনকাউন্টারে। সর্বস্ব দিয়েছে ও দেশের জন্য। ওর বুকের ভেতর সবসময় যে আগুন জ্বলে তাই ওকে এমন নিষ্ঠুর করে তুলেছে বিল্লু। তবে এ-ও সত্যি যে, ওর আমাদের সেরা শিক্ষক। তোমাকে তৈরি করবার জন্য ওর চেয়ে উপযুক্ত কোন গুরু এখানে নেই।”

হঠাৎ মুখ তুলে অনৌসিকের দিকে পূর্ণ চোখে তাকাল বিল্লু, “না অনৌসিক। এ যুদ্ধ আমার নয়। আমার পৃথিবীতে এ যুদ্ধ আমাদের পূর্বপুরুষরা জিতে গিয়েছেন অনেকদিন আগে। কাইকর আমাকে এখানে নিয়ে এসেছেন আমার ইচ্ছার পরোয়া না করেই। তাতে আমার লাভ হয়েছে জানি। হাসান গ্যালিলিন আমার জীবনকে আমূল পালটে দিয়েছেন অনৌসিক। যা শিক্ষা তাঁর কাছে পেয়েছি, তাতে একজন জিপসি যন্ত্রবিদ হিসেবে বাঙ্গালোর বা ম্যাসাচুসেটসে আমি সম্মানের জীবন গড়ে নিতে পারব। আপনাদের যুদ্ধের জন্য আপনারা অন্য সৈনিক খুঁজে নিন।”

তার মুখের দিকে তাকিয়ে চোখদুটো হঠৎ নরম হয়ে এল অনৌসিকের। বীরোলও এমন ছিল। এমনকি রেগে গিয়ে ওই চোখ কুঁচকে তাকানোটুকু পর্যন্ত। বড়ো ইচ্ছা করছিল তাঁর দু’হাতে ওকে জড়িয়ে ধরে বুকে টেনে নিয়ে—

অনেক কষ্টে নিজেকে সংযত করলেন তিনি। দুর্বলতার সময় এ নয়। বিল্লু তাঁর অস্ত্র। সব আশা শেষ হয়ে যাবার পর, সঙ্ঘের সবার বিরোধীতাকে অতিক্রম করে, নিজের জীবন উৎসর্গ করে কাইকর একে খুঁজে এনে তুলে দিয়েছে তাঁর হাতে। মুহূর্তের কোন দুর্বলতায় তাকে হারাতে তিনি চান না। আস্তে আস্তে তার কাছে এগিয়ে এসে তিনি বললেন, “না বিল্লু। এ যুদ্ধ তোমারও। দুর্লভ রাইমিন গ্রন্থির মালিকের এ-কথা বলা সাজে না। এবার তোমায় সবকিছু বলবার সময় হয়েছে। এস আমার সঙ্গে।”

তাঁর হাতের ইশারায় তখন ঘরটার অন্যপাশে একটা ছোট দরজা খুলে গেছে। বিল্লুকে সঙ্গে আসতে ইঙ্গিত করে সেদিকে এগিয়ে গেলেন অনৌসিক।

***

অন্ধকার ঘরটা ঠিক কতটা বড়ো তা বোঝা যায় না। তার একেবারে অন্যপাশে দেয়ালের কাছে সবজেটে একটা আলোর আভা জেগে ছিল। সেটাকে লক্ষ করে অভ্যস্ত পায়ে এগিয়ে গেলেন অনৌসিক। তারপর তাঁর হাতের ইশারায় একটা মোলায়েম আলোয় ভরে গেল গোটা ঘরটা।

অস্বচ্ছ সবজেটে আলোর আবরণে ঘেরা জায়গাটার দিকে হাতের স্ফটিকটা লক্ষ করে অস্ফুট কয়েকটা শব্দ উচ্চারণ করছিলেন অনৌসিক। আস্তে আস্তে স্বচ্ছ হয়ে আসছে সবুজ আবরণটা। সেদিকে চোখ রেখে হঠাৎ গলা থেকে একটা চাপা শব্দ বের হয়ে এল বিল্লুর। অনৌসিকের হাতটা একটা ঝাঁকুনি দিয়ে ছাড়িয়ে সে বড়োবড়ো পায়ে এগিয়ে গেছে সেদিকে। অদৃশ্য হয়ে আসতে থাকা সবুজ জাদুর আচ্ছাদনের ভেতর তখন স্পষ্ট হয়ে উঠছিল একটা লম্বাটে টেবিল।

তার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে একনজর দেখেই চোখ ঘুরিয়ে নিল সে। সেখানে শুইয়ে রাখা শ্বেতপাথরের মত সাদা মূর্তিটার মুখে তীব্র অমানুষিক যন্ত্রণার ছাপ।

“আমি—আমার মূর্তি—এখানে—”

মলিন একটুকরো হাসি ছড়িয়ে গেল অনৌসিকের মুখে, “হ্যাঁ বিল্লু। তুমি। কিন্তু তুমি নও। ও আমার একমাত্র ছেলে। বীরোল। দুর্লভ রাইমিন গ্রন্থির মালিক। পরাধীন ভারতবর্ষের একমাত্র আশার প্রদীপ। ব্রিটিশ গুপ্তচরবাহিনীর নজর এড়াতে পারেনি ও বিল্লু। রাইমিন গ্রন্থির সম্পূর্ণ বিকাশ হবার আগেই আক্রমণ হেনেছিল ওরা।

“আমি ওকে বাঁচাতে পারিনি বিল্লু। ওর বাবা হয়েও চোখের সামনে  লুজগ্রাম তিনিগলের বিধ্বংসী জাদুতে ওকে পাথরের মূর্তিতে বদলে যেতে দেখতে হয়েছে আমাকে। আমি- আমি তার বাপ হয়েও..

“তবে গর্বের কথা কী জানো? ওর অর্ধজাগ্রত রাইমিন গ্রন্থির মুখোমুখি হবার জন্য স্বয়ং ভাইসরয় তিনিগলকে মাঠে নামতে হয়েছিল। যদি আর কিছুদিন সময় পেত ও! আর একটু প্রস্তুতি…”

স্থির হয়ে পাথরের মূর্তিটায় নিজের মুখটাকে দেখছিল বিল্লু। খানিক পরে নীচু গলায় সে বলল, “মৃত্যুর আগে ও…”

তার কথাটা শেষ করতে না দিয়ে ফের হাহাকার করে উঠলেন অনৌসিক, “মৃত নয় বিল্লু। বীরোল আমার বেঁচে আছে। রাইমিন গ্রন্থির মালিককে কোন জাদুই হত্যা করতে পারে না। আর তাই, মৃত্যুর চাইতেও ভয়ঙ্কর এ সাজা পেতে হয়েছে ওকে। জাদু পাথরের আবরণে, আঘাত পাবার অসহ্য যন্ত্রণার মুহূর্তে স্থির হয়ে আছে ওর চেতনা। মৃত্যুর আগে কাইকর তোমার রাইমিন গ্রন্থিকে জাদুর আবরণে মুড়ে দিয়ে গিয়েছিলেন। তা না হলে, ব্রিটিশ পুলিশ সামান্যতম আভাস পেলেও এতদিনে তোমার ওই একই দশা হত।” 

হঠাৎ শিউরে উঠল বিল্লু। মূর্তিটার মুখে যে অসহ্য যন্ত্রণার ছাপ সে দেখেছে সে যন্ত্রণাকে তাহলে প্রতিটা মুহূর্তে সহ্য করে চলেছে তার এই অসহায় প্রতিরূপ!

“ওকে প্রাণে ফিরিয়ে আনা যায় না অনৌসিক? কোন জাদুতে, অথবা, হাসান গ্যালিলিনের বিজ্ঞানসাধনার পথে…

“জানি না বিল্লু। জিপসির বিজ্ঞানের বুজরুকি তো তুচ্ছ, স্বয়ং আমরা জাদুকররাও এক্ষেত্রে অসহায়। একেবারে নতুন কোন জাদুর প্রয়োগ ঘটেছে এখানে। ব্রিটিশ সেনাবিভাগের গবেষণাগার থেকে উঠে আসা অজানা কোন অস্ত্র। যতটুকু বুঝেছি, সে জাদুর আক্রমণ শিকারের শরীরকে ঘিরে বায়ুকণাদের জমাট বাঁধিয়ে কঠিন বর্ম গড়ে তোলে।

“তবে সাইকোমেকানিকসের তৃতীয় সূত্র বলে, প্রত্যেক জাদুর সমান ও বিপরীত প্রতিজাদুর অস্তিত্ত্ব থাকবেই। অতএব এর প্রতিকার আছে। হয়ত তিনিগল সে সন্ধান জানেন। অথবা হয়ত এখনো তা ব্রিটিশ গবেষকদেরও অধরা রয়ে গেছে।

“তবে সে কথা থাক। এই যন্ত্রণা নিয়ে জীবন্মৃত হয়ে থাকাই ওর নিয়তি। কিন্তু তুমি এবার বল, যে স্বদেশের মুক্তির যুদ্ধে আমি আমার ছেলেকে এমনভাবে হারিয়েছি, যে স্বদেশকে ভালোবাসার ফলে তোমার প্রতিরূপ প্রতিমুহূর্তে এই ভয়াবহ যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে চলেছে, সে দেশের মুক্তির যুদ্ধ কি তোমারও যুদ্ধ নয়? বল বিল্লু। কিছুই গোপন রাখিনি তোমার কাছে আমি। এবার তুমি যে জবাব দেবে আমি তা মেনে নেব।”

আস্তে আস্তে মূর্তিটার কাছে গিয়ে দাঁড়াল বিল্লু। নিঃশব্দে তার যন্ত্রণাদীর্ণ কপালে ডানহাতটা ঠেকিয়ে শান্ত গলায় তার উদ্দেশ্যে বলল, “এই দেশ আমার স্বদেশ নয়। এর স্বাধীনতা আনবার যুদ্ধটা তোমার। তবে আমারও একটা কর্তব্য আছে এখানে। তা আমি পালন করব। প্রতিজ্ঞা করছি, আমি তোমাকে ফিরিয়ে আনব বীরোল। এ অন্যায়ের মূল্য চোকাতে হবে তিনিগলকে।”

খানিক বাদে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকা অনৌসিকের দিকে ফিরে তাকাল বিল্লু, “আমি প্রস্তুত অনৌসিক। কখন শুরু করতে হবে?”

“প্রজেকশান।”

সামরিক গোয়েন্দা দফতরের অফিসারটি, মাটিতে পড়ে থাকা মানুষটার দিকে এগিয়ে গিয়ে তার কপালে তর্জনি ঠেকাল। থরথর করে কেঁপে ওঠা শরীরটার গলা চিরে দুর্বল গোঙানি উঠে এল একটা। তার প্রতিরোধ ভেঙে মস্তিষ্ককে নিংড়ে নিয়ে তখন একটা আলোর ধারা তার চোখ থেকে বেরিয়ে এসে সামনের অতিকায় পর্দাটাকে আলোকিত করে তুলেছে।

-পাহাড়ের এক পাশে একটা খোলামেলা চত্বরে মুখোমুখি দাঁড়ানো দুজন আলখাল্লায় ঢাকা মানুষ। বিরাট চেহারার মানুষটা নিজের স্ফটিক উঁচিয়ে ধরেছে ছোটোখাটো চেহারার মানুষটার দিকে। একটা তীব্র শক্তির ঝলক তা থেকে বের হয়ে ধেয়ে গেল ছেলেটার বুক লক্ষ করে। প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই ছেলেটার হাতের স্ফটিকও জীবন্ত হয়ে উঠেছে। দুর্বল, কাঁপাকাঁপা শক্তির ধারাটা তার থেকে বের হয় এসে আক্রমণকারী ধারাটাকে ছুঁয়েই নিভে গেল। আটকাতে পারেনি সে সেই আক্রমণকে। তীব্র শক্তির ধাক্কায় মাটিতে ছিটকে পড়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল কিশোরটি।

একটা চাপা হাসির শব্দ উঠল জমায়েত হওয়া অফিসারদের মধ্যে। টুকরো মন্তব্য ভেসে এল একটা, “অনৌসিকের অস্ত্র! হাঃ!”

লুজগ্রাম তিনিগলের হাতের ইশারায় ছবিটা হঠাৎ থেমে গেছে। মেঝের ওপর পড়ে থাকা বিপ্লবীটির শরীর মাড়িয়ে ছবিটার সামনে এগিয়ে গেলেন তিনি। আঙুলের ইশারায় কাতরাতে থাকা কিশোরের মুখটা এগিয়ে এসে বড়ো হয়ে উঠেছে পর্দায়।

“মুখটাকে ভালো করে দেখুন। কাইকর একাদশ সমান্তরালে বিনা কারণে যায়নি। একে অবজ্ঞা করবেন না।”

ঘরের সবক’টা মুখ তখন ঘুরে গেছে পর্দার দিকে। চাপাগলায় কথাবার্তার শব্দ ভেসে আসছিল তাদের দিক থেকে।

“বীরোল। দুর্লভ রাইমিন গ্রন্থির মালিক। আমি এ গ্রন্থির শক্তি জানি।  একবার তাকে প্রস্তরীভূত করেছিলাম। ফের সে ফিরে এসেছে তার নতুন প্রতিরূপ নিয়ে। জেন্টলমেন, জুয়েল ইন দ্য ক্রাউন ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের জাদুশক্তির প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বী যদি কেউ থেকে থাকে তবে সে এই বীরোল।”

“মাফ করবেন মাননীয় ভাইসরয়,” লালবাজারের পুলিশ প্রধান জেমস হিক্‌স্‌ বিনীত গলায় বাধা দিলেন তাঁকে, “অহোম গণরাজ্যের এজেন্টদের থেকে টিপ অফটা মেলবার পর একাদশ সমান্তরালে একটা গোয়েন্দা দল পাঠিয়েছিলাম। যন্ত্রভিত্তিক আদিম জিপসি সমাজের ছেলে এ। চেহারায় অনৌসিকপুত্র বীরোলের আদল থাকলেও জাদুশক্তিতে এ তার সঙ্গে তুলনীয় যে নয় তার একটা প্রমাণ আপনি দেখলেন।”

বলতে বলতেই মাটিতে পড়ে থাকা মানুষটার দিকে ইঙ্গিত করলেন তিনি, “এটি ছাড়াও, সোফেট নেং থেকে  অপহরণ করে আনা এই বিপ্লবীর স্মৃতিতে ধরে রাখা তার প্রশিক্ষণের সমস্ত ছবিতেই এই ব্যর্থতার প্রমাণ আছে। আমরা নিশ্চিত, বীরোলের জাদুশক্তির ছিটেফোঁটাও নেই এর। এর অপুষ্ট পিনিয়ল গ্রন্থির…”

ছবিটা হঠাৎ মিলিয়ে গেল দেয়াল থেকে। সেদিক থেকে চোখ ফিরিয়ে মাটিতে পড়ে থাকা  লোকটাকে পা দিয়ে একবার নাড়িয়ে দেখলেন তিনিগল। স্থির হয়ে গেছে তার শরীরটা। পুলিশি মাইন্ড প্রোবিং-এর ক্রমাগত আঘাত অবশেষে সব যন্ত্রণার অবসান করে দিয়েছে তার। তার নাক বেয়ে ঝরে পড়া রক্তের ধারা তিনিগলের  জুতোকে ছুঁয়ে যাচ্ছিল। 

“এর শরীরটাকে সরিয়ে নিয়ে যান। আরো একটা স্বদেশী কুকুর কমল। যাক। যা বলছিলাম,” বলতে বলতে ফিরে এসে নিজের চেয়ারে বসলেন লুজগ্রাম তিনিগল।

“জেন্টলমেন, এর পিনিয়াল গ্রন্থি দুর্বল হতে পারে। কিন্তু এর আবির্ভাব মুহূর্তের অগ্নিকাণ্ডের কথা ভুলে যাবেন না। তার জাদুপ্রকৃতির বিশ্লেষণ থেকে সেখানে রাইমিন বিচ্ছুরণের অস্তিত্বের সম্ভাবনা পাওয়া গেছে।”

“অসম্ভব,” হঠাৎ প্রতিবাদ করে উঠলেন হিক্‌স্‌, “কর্মক্ষম পিনিয়াল গ্রন্থি ছাড়া রাইমিন বিচ্ছুরণকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তাছাড়া, এর আবির্ভাবের পর এক বছরেরও বেশি সময় কেটে গেছে। এর মধ্যে একবারের জন্যও গোটা এলাকায় রাইমিন বিচ্ছুরণের কোন চিহ্ন মেলেনি।”

হঠাৎ কঠোর চোখে হিক্‌সের দিকে একবার দেখলেন তিনিগল, “মিস্টার হিক্‌স্‌, জাদুগ্রন্থির শারীরবিদ্যায় আপনার যতটা দক্ষতা দেখছি, তার খানিকটাও যদি নিজের ডিপার্টমেন্টের কাজে আপনার থাকত তাহলে হয়ত প্রথম আবির্ভাবেই আপনার অফিসারের হাতে ধরা পড়েও এ ছাড়া পেতে পারত না। কিন্তু তা হয়নি।”

“সুপারিন্টেন্ডেন্ট কারমাইকেল এ-জন্য শাস্তি পেয়েছেন মাননীয় ভাইসরয়। আমি আমার কর্তব্যে..”

“ত্রুটি করেননি, তাই তো? তাহলে বলুন তো হিক্‌স্‌, লেকটাউন এনকাউন্টারের পর প্রায় ছ’মাস ধরে ছেলেটা জিপসিদের ক্যারাভানের সঙ্গে ব্রিটিশ ভারতের একাধিক শহর ছুঁয়ে গেল, কিন্তু আপনার গোয়েন্দা বিভাগের জাদুকররা তার উপস্থিতির কোন খবর পেল না কেন?

“এর পাশাপাশি, অহোম গণরাজ্যে আমাদের স্থানীয় এজেন্টরা কিন্তু অসাধ্য সাধন করে দেখিয়েছেন। ছেলেটা সেখানে পৌঁছোবার পর গত সাতমাস ধরে এর গতিবিধির যাবতীয় খবর তাঁরাই জোগাড় করে প্রথম আমাকে জানান। এরপর, সোফেট নেং এর শক্ত বিপ্লবী ঘাঁটি থেকে এদের দলের একজনকে অপহরণ করে এনে সাম্রাজ্যের গভীর কৃতজ্ঞতা অর্জন করেছেন তাঁরা। সামান্য নেটিভ হয়েও সাম্রাজ্যের প্রতি যে দায়বদ্ধতা এঁরা দেখিয়েছেন তা থেকে আমাদের শেখা উচিত হিক্‌স্‌।”

হিক্‌স্‌-এর পাশে বসা সার্জেন্ট বরদলোই-এর মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল। স্বয়ং ভাইসরয়ের প্রশংসার মূল্য অনেক। তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়ে তিনি বললেন, “আমি সম্মানিত মাননীয় ভাইসরয়। আমাদের চেষ্টার কোন ত্রুটি থাকবে না। কথা দিচ্ছি , আগামী একমাসের মধ্যে আমরা একে..”

হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিলেন তিনিগল। এই একটা ক্ষেত্রে তিনি সামান্য দেশিয় এজেন্টদের ওপরে ভরসা করতে পারবেন না। রাইমিন বিচ্ছুরণের একটা সম্ভাবনা দেখা গিয়েছে এ ক্ষেত্রে। তা যদি সত্যি হয়, সেক্ষেত্রে বীরোলের এই প্রতিরূপ নিঃসন্দেহে তার রাইমিন গ্রন্থিকে নিয়ন্ত্রণ করতে জানে না। তা নাহলে, নিয়ন্ত্রিত রাইমিন বিচ্ছুরণ শুধু শত্রুরই মহড়া নিত।  কাইকরকে প্রাণ হারাতে হত না লেকটাউনের সেই এনকাউন্টারে।

অনিয়ন্ত্রিত রাইমিন গ্রন্থি! একটা হিমশীতল অনুভূতি নেমে যাচ্ছিল তিনিগলের মেরুদণ্ড বেয়ে। চাকরিতে যোগ দেবার আগে ব্যাভেরিয়ান কলেজ অব ম্যাজিকে কয়েক বছর শিক্ষকতা করেছিলেন তিনি। জাদুবিজ্ঞানের অনেক অন্ধকার দিক সম্বন্ধেই গভীর জ্ঞান আছে তাঁর। সাধারণ অফিসাররা না জানলেও, তিনি তো জানেন, নিয়ন্ত্রণহীন এ শক্তির ধ্বংসক্ষমতা কত ভয়ঙ্কর স্তরে পৌঁছোতে পারে! যে দুর্লভ শক্তি প্রকৃত অধিকারীকে জাদুবিশ্বের ঈশ্বর বানাতে পারে, অনিয়ন্ত্রিত হলে সে শক্তিই তার মালিককে দানব করে তুলতে পারে এক নিমেষে। একে আটকাতে হবে। যে কোন মূল্যে।

“আপনারা নিজের নিজের এলাকায় ফিরে যান,” তিনিগলের শান্ত গলায় তাঁর ভেতরের উত্তেজনার ছোঁয়া লাগছিল না, “এইখান থেকে এ কেসের দায়িত্ব আমি নিজের হাতে নিলাম।”

উপস্থিত অফিসাররা সকলেই উঠে দাঁড়িয়েছেন। তাঁলে স্যালিউট করে বের হয়ে যাওয়া হিক্‌স্‌ ও বরদলই এর দিকে একনজর দেখে সেনাপ্রধান ফ্লেমিং মৃদু গলায় বললেন, “অহোম গণরাজ্যের মদতে সেখানে গড়ে ওঠা স্বদেশী উগ্রপন্থীদের ঘাঁটিতে আক্রমণ শানাবার এটা একটা ভালো সুযোগ মিস্টার ভাইসরয়। আমি পূর্বসীমান্তের কোচবিহার ছাউনিতে গোর্খা ডিভিশনকে তৈরি হতে নির্দেশ দিচ্ছি।”

“না ফ্লেমিং,” মৃদু হাসলেন তিনিগল, “আমার নিজস্ব দেহরক্ষীর দল এ যুদ্ধে আমার সঙ্গে যাবে।”

“ভাইসরিগ্যাল গার্ড?” একটু ভুরু কুঁচকে তাঁর দিকে ঘুরে তাকালেন ফ্লেমিং, “এমনকি বীরোলের বিরুদ্ধে অভিযানেও তো আপনি তাদের…”

“মহারানির সনদ মনে করে দেখ ফ্লেমিং। শ্রেষ্ঠতম আর হিংস্রতম জাদুযোদ্ধাদের নিয়ে তৈরি ভাইসরিগ্যাল গার্ডদের ব্যবহার একমাত্র চূড়ান্ততম বিপদের সময়েই করা যেতে পারে। বীরোলের প্রতিরূপের এই সমান্তরালে এসে পৌঁছোনকে আমি সেই জেড প্লাস স্তরের বিপদসঙ্কেত বলে মনে করছি।

“আসল বীরোল তার রাইমিন গ্রন্থিকে নিয়ন্ত্রণ করতে জানত। সে নিরাপদ শত্রু  ছিল। এই প্রতিরূপ তা নয়। যদি সত্যিই এর কাছে সে শক্তি থেকে থাকে তবে তার নিয়ন্ত্রণ সে করতে শেখেনি। নিয়ন্ত্রিত রাইমিনের বিচ্ছুরণ একটা ছোটো প্রজাপতিকে কোন আঘাত না দিয়ে টেনে আনতে পারে শক্তির মালিকের কাছে। আবার প্রয়োজনে একটা একশো টনের মহাকাশযানকে চাঁদের কক্ষপথ পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারে একটা সুসংহত ডেল্টা আট স্তরের বিচ্ছুরণে। তাহলে, এ শক্তির পূর্ণমাত্রায়, ডেল্টা ষোল স্তরের একটা অনিয়ন্ত্রিত বিচ্ছুরণ ঘটলে তার ফলাফল আন্দাজ করতে পারছ  তুমি?  না ফ্লেমিং। আমি কোন ঝুঁকি নিতে রাজি নই।”

***

ঘরটা ঝিলের একেবারে পাশে। ঠিক ঘর নয়। এ পাহাড়টার গায়ে মৌমাছির চাকের মত অজস্র ছোটোবড়ো গুহা। তারই একটায় গত সাত মাস ধরে তার জায়গা হয়েছে।

ভোর হয়ে আসছিল। বিল্লু জানালার কপাটটা হাট করে খুলে দিল। ঠাণ্ডা হাওয়ার একটা স্রোত ঢুকে আসছে ঝিলের জল ছুঁয়ে। পুবে শিলং পাহাড়ের পেছনটা লাল হয়ে উঠছে আস্তে আস্তে।

সারা রাত জেগে থাকবার ক্লান্তি আর ঠাণ্ডা হাওয়া, এই দুয়ে মিলে যেন চক্রান্ত করে তার চোখদুটো বুঁজিয়ে আনছিল।

ঘুম আসেনি তার কালকে রাতে। আসবার কথাও নয়। পাহাড়ের একেবারে কেন্দ্রস্থলে, অনৌসিকের পরীক্ষাগারের পুরু পাথুরে দেয়ালের নিরাপত্তায় কাল ফের একবার তার রাইমিন গ্রন্থির পরীক্ষা নিয়েছেন জীবাক। দেয়ালের গায়ে একটা একফুট গভীর সুড়ঙ্গ খোঁড়বার কথা ছিল তার নিয়ন্ত্রিত বিচ্ছুরণে।

আরিকানিয়ান রক্ষাবর্মে তার শরীর ঢেকে দেয়া হয়েছিল। তারপর, গ্রন্থির ওপরের রক্ষা আবরণ সরিয়ে নিয়ে, নিরাপদ দূরত্ব থেকে তার ওপর মৃদু আঘাত হেনে গ্রন্থিকে উত্তেজিত করে তোলা হয় ফের।

প্রাণপণে তার বিচ্ছুরণকে নিয়ন্ত্রণ করবার চেষ্টা করতে করতে কয়েক মুহুর্ত পার হবার পর যখন বিল্লুর সবে একটু বিশ্বাস আসছে যে হয়ত সে এবার পারবে, ঠিক তখনই বিস্ফোরণটা হল। ঘাড়ের তীব্র যন্ত্রণার ঝলকটা তার সব অনুভূতিকে ঢেকে দিয়েছিল কয়েক মুহূর্তের জন্য। যখন চেতনা ফিরল, তখন তাকে ঘিরে থাকা ঘরটার দেয়ালের কয়েকফুট পুরু পাথর গলে গিয়ে ধিকিধিকি আলো ছড়াচ্ছে। পরিমাপ স্ফটিক দেখাচ্ছিল ডেলটা চার স্তরের একটা বিচ্ছুরণ ঘটেছে। অথচ এর এক দশমাংশ শক্তিতে কাজটা করবার কথা ছিল তার।

কিছুই বলেননি তাকে জীবাক। শুধু ঠোঁট উলটে একটা হতাশার ভঙ্গী করে বের হয়ে গিয়েছিলেন পরীক্ষাগার থেকে।

একটা ঝাঁকুনি দিয়ে নিজেকে সচেতন করল সে। আজ ফের তার সাধারণ জাদুযুদ্ধের পরীক্ষা। এই ক’মাস ধরে বড়ো কঠোর প্রশিক্ষণের মধ্যে দিয়ে চলেছে সে। তবু, একেবারে নিম্নস্তরের জাদুর ওপরে খুব বেশিদূর এগোনো হয়নি তার। জীবাক অনেকটা জিনির মত। নকল আক্রমণ প্রতি-আক্রমণের খেলা তাঁর শেখাবার পদ্ধতির মধ্যে পড়ে না। দিনের পর দিন তাঁর শক্তিশালী জাদুর বিরুদ্ধে ব্যর্থ প্রতিরোধ গড়তে গড়তে…

বিল্লু একবার তার নিজের শরীরটার দিকে চেয়ে দেখল। এর প্রতিটি আঘাতের দাগকে সে চেনে। তার তীব্র যন্ত্রনার স্মৃতিগুলোকে সে আলাদা আলাদাভাবে বলে দিতে পারে। প্রথম দিন প্রশিক্ষণে নেমে ডান কাঁধে জীবাকের সেই আঘাতটা! প্রতিরোধ করতে পারেনি বিল্লু। নিতান্তই আত্মরক্ষার জান্তব তাড়ণায় তার দুর্বল পিনিয়াল ক্ষীণ একটা সাড়া দিয়েছিল বটে, কিন্তু..

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে নিজের পোশাকের আলমারিটার দিকে এগিয়ে গেল। আলমারিটার একেবারে নীচের তাকটা থেকে লাল রঙের একটা শার্টের হাতা বের হয়ে ছিল। কী মনে হতে নীচু হয়ে সেটাকে একবার ছুঁয়ে দেখল বিল্লু। আর তারপর, হঠাৎ মাথায় একটা কথা আসতে তাড়াতাড়ি নীচু হয়ে জিনিসটাকে টেনে বের করে আনল সে। তাকে আঘাত করে জীবাক আনন্দ পান। আজও তার ব্যতিক্রম হবে না। সেক্ষেত্রে একটু নতুন পথে চেষ্টা করে দেখতে তো দোষ নেই!”

সার্কাসের শোয়ের এই ওভার অলটা পরা অবস্থাতেই তাকে ট্রান্সপোর্ট করে নিয়ে আসা হয়েছিল এখানে। পোশাকটাকে বের করে এনে ভালো করে দেখল একবার বিল্লু। তারপর তার দুপাশে আটকানো আণবিক ব্যাটারিতে চলা জেটপ্যাকদুটোর ওপরে ঝুঁকে পড়ল সে। এ ব্যাটারিগুলো সহজে নষ্ট হয় না।

ডান হাতার তলার হোলস্টারে জিনির দেয়া লেজার গানটার পাওয়ার প্যাকও ভালো অবস্থায় আছে। জিনি ট্রেনিং এ নকল অস্ত্র ব্যবহার করত না। শোয়ের সময়েও নয়। অস্ত্রটার শক্তিকে নিরাপদ অথচ যন্ত্রণাদায়ক স্তরে বেঁধে দিতে দিতে হঠাৎ খুশিয়াল হয়ে উঠে জিনির উদ্দেশ্যে বাতাসে একটা ধন্যবাদ ভাসিয়ে দিল সে। আজ এটা কাজে লাগবে হয়ত।

জিপসি প্রযুক্তির বিষয়ে জীবাকের কোন ধারণা নেই। এখানে কারোই সে ধারণা নেই। আছে শুধু একরাশ অবজ্ঞা। আজকের মহড়ায় জাদুকর বিশ্বের একটা প্রধান আইনকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে চলেছে সে। একটুক্ষণ স্থির হয়ে বিষয়টা নিয়ে ভাবল বিল্লু। নাঃ। কোন দ্বিধা নেই তার মনে। শুধু আফশোস হচ্ছিল, আরো আগে কেন এ পথটার কথা তার মাথায় আসেনি।

মুখোমুখি যুদ্ধে নীতির কোন স্থান নেই। একটু অভিনয়, একটু ভুল বোঝানো, আর তারপর…”

***

“আক্রমণ কর বিল্লু।”

প্র্যাকটিশ গ্রাউন্ডটা সোফেট নেং এর একেবারে চূড়ার কাচের একটা ঢালের গায়ে। জমি এখানে তীক্ষ্ণ একটা কোণ করে খাড়াই নেমে গেছে উমিয়াম হ্রদের জলের দিকে।

আদেশটা আসবার সঙ্গেসঙ্গেই আলোর একটা বিন্দু মাথা তুলল ছেলেটার স্ফটিক থেকে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে তা একটা হিলহিলে সাপের মত ধেয়ে গেছে প্রায় একশো মিটার দূরে দাঁড়িয়ে থাকা জীবাকের দিকে। ধেয়ে আসা শক্তির ধারাটার দিকে অলস চোখে তাকিয়ে দেখলেন তিনি একবার। যথারীতি দুর্বল আঘাত। অকারণ সময় অপচয় করছেন অনৌসিক একে নিয়ে। তাঁর হাত থেকে অবহেলায় ছুটে যাওয়া শক্তির ঝলকটা বিল্লুর আক্রমণকে মুছে দিয়ে ধেয়ে গিয়ে ততক্ষণে আঘাত করেছে ছেলেটাকে।

সেদিকে তাকিয়ে হঠাৎ চঞ্চল হয়ে উঠলেন জীবাক। হিসেবের বাইরে কিছু একটা ঘটছে এখানে! শক্তির ধাক্কাটা, আছড়ে ফেলবার বদলে মাটি থেকে বাতাসে ছিটকে তুলেছে ছেলেটাকে। এলোমেলো হাত পা ছুঁড়তে ছুঁড়তেই সে এবার নেমে যাচ্ছে পাহাড়চূড়ার উলটো দিকে।

কিন্তু, এত শক্তিশালী আঘাত তো তিনি করেননি! যেখান থেকে পড়েছে ও তার প্রায় তিনশো মিটার নীচে হ্রদের জল। ওর চিহ্ন থাকবে না কোন। এ তিনি চাননি। অক্ষমতা তো ওর দোষ নয়।

দুটো হাত মাথার ওপর ধরে দ্রুত কিছু দুর্বোধ্য শব্দ উচ্চারণ করে উঠলেন জীবাক। তাঁর শরীরের ভার হঠাৎ হালকা হয়ে উঠছে। মাধ্যাকর্ষণকে সাফল্যের সঙ্গে প্রতিরোধ করে শরীরকে বাতাসে ভাসিয়ে তুলেছে শক্তিশালী জাদু। একটা পাখির মতই তিরবেগে তা ভেসে গেল এবার পাহাড়ের ঢাল বেয়ে। আর পরক্ষণেই তাঁর অনেকটা নীচে থেকে তিরের মত তাঁর দিকে ধেয়ে এল লাল বিদ্যুতের একটা ঝলক। তার হাতে থেকে ধেয়ে আসা শক্তিশালী লেজারের ঘায়ে ভারসাম্য হারিয়ে একটুকরো পাথরের মতই ঝিলের জলের দিকে নেমে চলল এবার জীবাকের শরীরটা।

প্রাণপণে নিজের পতনকে আটকাবার চেষ্টা করছিলেন জীবাক। পিঠের ওপর তীব্র আঘাতটা তাঁর শরীরকে অবশ করে দিয়েছে একেবারে। তলা থেকে দ্রুত তাঁকে লক্ষ করে ধেয়ে আসছিল উমিয়ামের জল। এত উঁচু থেকে তার গায়ে আছড়ে পড়বার অর্থ…

হঠাৎ একটা ঝাঁকুনি খেয়ে থেমে গেলেন তিনি। দুটো শক্তপোক্ত, লাল পোশাকে ঢাকা হাত ওপর থেকে উড়ে এসে তাঁকে জড়িয়ে ধরেছে!

তারপর, বাতাসে ওজনের হালকা গন্ধ ছড়িয়ে তাঁকে কোলে ধরে তিরবেগে আস্তানার দিকে ভেসে গেল বিল্লু। জাদুকরের ছুঁড়ে ফেলা আলখাল্লার নীচ থেকে বের হয়ে এসেছে হাসান গ্যালিলিনের সার্কাসের জীবনমরণ খেলার দক্ষ খেলোয়ার মাস্টার বিল্লুর লাল পোশাকে ঢাকা শরীর। তার মুখে যুদ্ধজয়ের হাসি ছিল। তার দুহাতের বাঁধনে জীবাকের জ্বলন্ত চোখের দিকে তার নজর ছিল না তখন। একদিনের জন্য হলেও জীবাককে হারিয়ে দিয়েছে সে আজ।

***

“এস বিল্লু।”

ঘরে এসে ঢুকে একটু হকচকিয়ে গেল সে। সাধারণত অনৌসিক তাকে নির্জনে ডাকেন। সামান্য কিছু কথাবার্তা, কিছু কুশল জিজ্ঞাসা, কিছু ছোটোখাটো খাবার, কখনো একটু হাসিঠাট্টা,তার সারাদিনের কষ্টকে মুছিয়ে দেবার চেষ্টা– এইটুকুই সে আলাপগুলো থেকে তার প্রাপ্তি হয়। অথচ আজ…

বিপ্লবী কাউন্সিলের দশ সদস্যের গোটা দলটাই সেখানে এসে উপস্থিত হয়েছেন। একে একে তাঁদের মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখছিল বিল্লু। অনৌসিক, হারিলিন, সুবেশ, জীবাক—সবাই। তাঁদের গম্ভীর মুখগুলো থেকে মনের ভাব টের পাওয়া যায় না।

“বড়ো সমস্যায় ফেলেছ তুমি আমাদের,” অনৌসিকই প্রথম নীরবতা ভাঙলেন, “আজ পর্যন্ত কোন শিক্ষানবিশের  বিচারের জন্য কাউন্সিল মিটিং ডাকবার প্রয়োজন হয়নি আমাদের।”

“আ-আমি কোন অন্যায় করিনি অনৌসিক। মুখোমুখি যুদ্ধে যেকোন পন্থায় জয় লাভ করাই আমার-”

“সে বিষয়ে তোমার বক্তব্য শোনবার পরেই আমরা কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছোতে পারব।”

“আপনি দুর্বল হচ্ছেন অনৌসিক,” জীবাকের কঠিন গলাটা টেবিলের একপাশ থেকে জেগে উঠল হঠাৎ, “যুদ্ধে নিষিদ্ধ জিপসি বিজ্ঞানের ব্যবহার করেছে এ আজ। মধযুগে রেনেসাঁর পর, যে মূলনীতির ওপর জাদুসভ্যতার ভিত গড়া হয়েছিল, সরাসরি তার মূলে আঘাত হেনেছে এই অনৈতিক আচরণ। এর শাস্তির ব্যাপারে…”

“একটু অপেক্ষা করুন জীবাক,” অনৌসিকের শান্ত গলাটা তাঁকে থামিয়ে দিল হঠাৎ, “আগে এ-বিষয়ে এর বক্তব্য শুনে নিতে চাই আমরা। বলো বিল্লু। আমাদের ইতিহাস, আমাদের আইন তুমি এই ক’মাসের প্রশিক্ষণে জেনেছ।  তা সত্ত্বেও..”

মাথা নীচু করে নিজের কথাগুলোকে সাজিয়ে নিচ্ছিল বিল্লু। দশ জোড়া চোখ তীব্র দৃষ্টিতে চেয়ে আছে এখন তার দিকে। একটু বাদে যখন সে মুখ তুলল, তখন কোন ভয়ের চিহ্ন ছিল না সেখানে।

“যতটুকু দেখেছি, তাতে একটা কথা পরিষ্কার। জিপসি বিজ্ঞানের শক্তির সম্বন্ধে কোন ধারণা আপনাদের নেই। চিরকাল তাদের ব্রাত্যই করে রেখেছেন আপনারা।”

“কারণ, তার কোন প্রয়োজন আমাদের নেই। কুসংস্কারগ্রস্ত, বুনো একটা অনুন্নত জাত…”

“একটুকরো তিক্ত হাসি ছড়িয়ে গেল বিল্লুর ঠোঁটের কোণে, “অথচ সেই ‘কুসংস্কারগ্রস্ত’ জাতটার একটা আবিষ্কারের প্রথম ধাক্কাতেই জাদুকরশ্রেষ্ঠ জীবাককে হার মানতে হল আজ। তারপর, তার অন্য একট আবিষ্কারের কল্যাণে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষাও পেলেন। অথচ..”

“ভুল করছ বিল্লু,” বিপ্লবী কাউন্টার ইনটেলিজেন্সের প্রধান সুবেশ গ্রাইস টেবিলের অন্য প্রান্ত থেকে বলে উঠলেন হঠাৎ, “জীবাক এর জন্য তৈরি ছিল না। তা না হলে হয়ত ওই আদিম যন্ত্রের শক্তিকে সে…”

“আদিম যন্ত্রটাকে আমি নীচু শক্তিস্তরে বেঁধেছিলাম,” বিল্লুর ঠোঁটের হাসিটা চওড়া হয়ে উঠছিল এবার, “পূর্ণশক্তির আঘাত করলে তা থেকে কতটা নিজেকে বাঁচাতে পারতেন তিনি তাতে সন্দেহ আছে আমার। কিন্তু আমি অন্য কথা বলছি। একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন আপনি সুবেশ। জীবাক তৈরি ছিলেন না। ব্রিটিশ জাদুকররাও জিপসি প্রযুক্তির ব্যাপারে তৈরি নন। একবার ভেবে দেখবেন, চূড়ান্ত কোন যুদ্ধে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে ভারতবর্ষে এই দুই শক্তি যদি হাত মেলায়, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়ে, তাহলে সে আঘাতের আকস্মিকতা আমাদের সবচেয়ে বড়ো অ্যাডভান্টেজ হবে।”

গোটা ঘরটা নিশ্চুপ হয়ে বসে ছিল। খানিক পরে একটা লম্বা শ্বাস ফেলে  উঠে দাঁড়ালেন বিপ্লবী জাস্টিস সেল-এর প্রধান হারিলিন। বিল্লুর দিকে তাকিয়ে বললেন, “জীবনকে এখনো কিছুই দেখনি তুমি। জাদুকর সভ্যতার দীর্ঘ ঐতিহ্যের ব্যাপারে কোন সম্মানবোধ গড়ে ওঠেনি তোমার। আমাদের আগেই বোঝা উচিত ছিল। দেশের স্বাধীনতা পাওয়া আমাদের লক্ষ। কিন্তু তার বিনিময়ে পৃথিবীতে বর্বর জিপসি সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন হোক তা আমরা চাই না। আমার সন্দেহ হচ্ছে, তুমি তারই অগ্রদূত হয়ে এসেছ এখানে। একে এখান থেকে নিয়ে যাওয়া হোক।”

বলতে বলতেই তার দুপাশে এসে দাঁড়ানো দুজন রক্ষির স্ফটিক থেকে বের হয়ে আসা জাদুশক্তির ধারা জড়িয়ে গেছে বিল্লুর শরীরে। তাদের সঙ্গে ঘর থেকে বের হয়ে যেতে যেতে হঠাৎ তার চোখে পড়ল অনৌসিকের করুণ চোখদুটোর দিকে। দলের  সর্বাধিনায়ক হলেও আইনের বিরুদ্ধে তিনি যেতে পারেন না। অথচ তাঁর চোখদুটো বলছিল, এ তিনি চাননি।

***

নির্জন এই সেলটা পাহড়ের একেবারে অন্যধারে। তার ছোটো জানালাটা দিয়ে চাঁদের হালকা আলো এসে পড়ছিল সেলের ভেতর। রাত গভীর হয়েছে। ঘুম আসেনি বিল্লুর চোখে। শুকনো চোখদুটো জ্বলছিল তার। নীতি! অজ্ঞতা আর ঘৃণার ওপর প্রতিষ্ঠিত একটা নীতির জন্য এরা জিপসিদের বিপুল শক্তিকে দূরে সরিয়ে রাখল আজ। না, আজ নয়। চিরকাল। অথচ বিল্লু তাদের কাছ থেকে দেখেছে। তাছাড়া যন্ত্রসভ্যতায় তার জন্ম। বড়ো হয়ে ওঠা। এর বিপুল ক্ষমতার কথা সে জানে। এই সমান্তরালে এই দুই শক্তি হাত মেলালে ওই ব্রিটিশ জাদুশক্তিকে প্রকৃত একটা চ্যালেঞ্জ হয়ত ছুঁড়ে দেয়া যেত এই উপমহাদেশে। হাসানও তাই চেয়েছেন। কিন্তু তা আর হবার নয়। এরা…

দূর থেকে ভেসে আসা একটা গুমগুম শব্দ হঠাৎ তার চিন্তার সুতোটাকে ছিঁড়ে দিয়ে গেল। জানালার বাইরের আকাশ থেকে চাঁদের আলো মুছে গেছে হঠাৎ। সেখান দিয়ে ছুটন্ত অন্ধকারের একটা ধারা ধেয়ে এসে আছড়ে পড়ছিল সোফেট নেং এর পাথুরে শরীরে। শক্তিশালী বিস্ফোরণে বারবার থরথর করে কেঁপে উঠছে গোটা পাহাড়টা।

          অসহায় একটা খাঁচায় ভরা জীবের মত ছটফট করছিল বিল্লু। কোন একটা আক্রমণ ঘটেছে সোফেট নেং এর ঘাঁটিতে। কারা এল?

কথাগুলো ভাবতেভাবতেই হঠাৎ সেল-এর দরজার দিকে নজর গেল তার। অনৌসিক দ্রুতপায়ে ভেতরে ঢুকে আসছিলেন। কৌতুহলী দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়েছিল বিল্লু। কিন্তু কোন প্রশ্ন করবার আগেই তিনি বললেন,  “ভাইসরিগ্যাল গার্ডদের হানা। তোমাকে তাদের হাতে তুলে দেবার দাবি করছে তারা।”

পরণের জোব্বা এক টানে খুলে ফেলল বিল্লু। বের হয়ে এসেছে তার সার্কাসের মৃত্যুখেলার পোশাক। তারপর অনৌসিকের দিকে ঘুরে বলল, আমার জেটপ্যাক আর অস্ত্রটা আমাকে ফেরত দিন। আমি আপনাদের  পাশে…”

যন্ত্রগুলো ফিরিয়ে দিতে দিতে তার মাথায় একবার হাত বুলিয়ে দিলেন অনৌসিক, “না বিল্লু। তুমি এ যুদ্ধে যোগ দেবে না। এখনো সময় আছে। পাহাড়ের অন্যধারে প্রধান প্রবেশপথের সামনে যুদ্ধ চলছে। এদিকটা এখনো খানিকটা নিরাপদ।”

“আমি তা জানি অনৌসিক,” দাঁতে দাঁত  চেপে বিল্লু তার চোখে উঠে আসা জলকে আটকাবার চেষ্টা করছিল, “কিন্তু, আপনি কি আমাকে আপনার পাশে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করবার অধিকারটুকুও দেবেন না?  আমি জীবাকের মত শক্তিমান জাদুকর না হতে পারি, কিন্তু কাপুরুষ নই অনৌসিক। আমি…”

তার মাথায় একবার হাত বুলিয়ে দিলেন অনৌসিক, “না বিল্লু। তোমার সাহস নিয়ে আমার কোন প্রশ্ন নেই। তোমায় চলে যেতে বলছি অন্য কারণে। অহোম গণরাজ্য স্বাধীন দেশ। তার একটা প্রদেশের পবিত্র ধর্মস্থানে  বে-আইনিভাবে অনুপ্রবেশ করে হানা দিয়েছে লুজগ্রামের খুনের দল। ব্যাপারটা ব্রিটিশরা গোপন রাখতে চাইবে। কাজেই এদের স্ক্যানিং ক্রিস্টালে তোমার উপস্থিতির চিহ্ন যে মুহূর্তে হারিয়ে যাবে, এরা ফিরে যাবে। ওদের স্ক্যানিং ক্রিস্টাল জাদুশক্তিকে চিহ্নিত করতে পারে। কিন্তু তোমার উড়াণযন্ত্রের শক্তির বিচ্ছুরণকে ওরা ধরতে পারবে না। ফলে তোমাকে অনুসরণ করবার সাধ্য ওদের থাকবে না।

“অনেকগুলো প্রাণ বেঁচে যাবে বিল্লু। তাছাড়া এখানে তোমার কোন জায়গা যে আর হবে না সে তুমি জানো। তুমি ফিরে যাও হাসানের কাছে। যেখানেই থাকো, ভালো থেক। আর একবার আমার  বীরোলকে আমি চোখের সামনে হারাতে চাই না বাবা।”

মাথা নীচু করে কথাগুলো শুনছিল বিল্লু। গত কয়েক মাসে পিনিয়াল গ্রন্থির বিষয়ে অনেকটাই জ্ঞান হয়েছে তার। জেনেছে বয়ঃসন্ধিকালে জাদুবিশ্বের মানুষজনের এ গ্রন্থি জগে ওঠবার জৈবরাসায়নিক পদ্ধতিকেও। এ নিয়ে একটা চিন্তাও কিছুদিন ধরে দানা বেধে উঠছিল তার মাথায়। ভেবেছিল, জিপসিদের সঙ্গে এদের একসঙ্গে কাজ করাতে রাজি করানো গেলে হয়ত কখনো…

কিন্তু তা হবার নয় আর। হঠাৎ মাথা উঁচু করে উঠে দাঁড়াল সে। এই বিপ্লবীদের কাছে নিজের নীতির জন্য সে ব্রাত্য। কিন্তু বীরোলের প্রস্তরমূর্তির কাছে করা প্রতিজ্ঞাটা সে ভোলেনি। সে প্রতিজ্ঞা যেকোন মূল্যে তাকে পূর্ণ করতেই হবে।

“একটা অনুরোধ ছিল অনৌসিক। আমাকে আরিকানিয়ান বর্মের জাদুটা দিতে পারেন?”

“আরিকানিয়ান বর্ম? কেন? তাছাড়া তাকে জাগাবার জন্য  শক্তিশালী পিনিয়াল অ্যাক্টিভিটির প্রয়োজন হয়। তুমি-”

“এখন তার বাখ্যা আমি দিতে পারব না। শুধু, এই একটা অনুরোধ আপনি রাখুন আমার। আমি চলে যাব।”

একটুক্ষণ চুপ করে থেকে তিনি বললেন, “বেশ। তাই হোক তবে। জানি না একে কীভাবে কোন কাজে ব্যবহার করতে চাইছ তুমি। তবে আমার মন বলছে, হয়ত…”

অনৌসিকের হাতে ফুটে ওঠা ছোট্ট হলদেটে ক্রিস্টালটাকে নিয়ে কোমরের পাউচে গুঁজে নিল বিল্লু।  তারপর তার লেজার ডিসরাপটারটা হাতে তুলে নিল। তার থেকে বের হয়ে আসা আগুনের ধারাটা তখন তার সেলের জানালাটাকে আস্তে আস্তে গলিয়ে দিচ্ছে।

কোমরের দুপাশের জেটপ্যাকদুটোতে চাপড় দিয়ে তাদের জাগিয়ে তুলল সে এবার। পাহাড়ের উলটদিকের বিস্ফোরণের শব্দগুলো বেড়ে উঠছিল ক্রমশ। সে শব্দে জেটপ্যাকের মৃদু গুঞ্জন শোনা যায় না।

জানালার গর্তটা দিয়ে হ্রদের ওপরের খোলা আকাশে ভেসে যেতে যেতে একবার পেছন ঘুরে দেখেছিল সে। সেখানে অনৌসিকের উদ্বিগ্ন মুখটা তার যাত্রাপথের দিকে তাকিয়ে আছে।

পঞ্চম অধ্যায়
পাশাপাশি
।১।

“নাঃ! এখনো সময় হয়নি,”একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হতাশভাবে মাথা নাড়লেন হাসান গ্যালিলিন। বিল্লুর ফিরে আসবার পর দুটো দিন কেটে গেছে এর মধ্যে। দু’দিন ধরে তার সমস্ত কথাই শুনেছেন তিনি।

“ভেবেছিলাম তুমি হয়ত পারবে। হয়ত তোমার মধ্যে দিয়েই হয়ত গড়ে উঠবে এই দুই শক্তির সেতুবন্ধ। এখন বুঝতে পারছি বিল্লু, এখনো সে-সময় আসেনি। আরো অনেক পথ পার হতে হবে সে-দিনটা আসবার আগে।”

          “সে নিয়ে ভাববার সময় এখন নয় বাবা,” লীলা এতক্ষণ চুপ করে বিল্লুর কথাগুলো শুনছিল। এইবার মুখ খুলল সে, “আগে বিল্লুকে কোন নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া দরকার। সোফেট নেং থেকে পালিয়ে এলে ও কোথায় আশ্রয় নিতে পারে তা তিনিগলের অজানা নয় আর।”

“না লীলা,” মাথা নাড়লেন হাসান, “এই মুহূর্তে সে আশঙ্কার কোন কারণ নেই। সোফেট নেং-এ ব্রিটিশ বাহিনীর বে-আইনি অনুপ্রবেশ নিয়ে  অহোম গণরাজ্য প্রতিবাদ জানিয়েছে। এই মুহূর্তে এখানে তিনিগল বা তার বাহিনীর আক্রমণের কোন আশঙ্কা নেই। কিন্তু…”

“কিন্তু কী বাবা?’

একটা ম্লান হাসি ফুটে উঠল হাসানের মুখে, “বিপদ এসেছে অন্য পথে। বিল্লুকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিদ্রোহী প্রজা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। তাকে বন্দি করে ব্রিটিশ সরকারের হাতে তুলে দেবার জন্য তীব্র চাপ তৈরি করা হয়েছে এখানকার সরকারের ওপর। এক সপ্তাহ সময় দেয়া হয়েছে অহোম সরকারকে। ”

“সরকারের তরফে কোন সিদ্ধান্ত?” উমেরের গম্ভীর গলাটা শুনে তার দিকে ঘুরে তাকালেন হাসান, “অহোম সেনাবিভাগে আমার সূত্র জানাচ্ছে, পশ্চিম ও দক্ষিণ সীমান্তের জলপাইগুড়ি ও সিলেটের ব্রিটিশ ছাউনিতে সীমান্তে ব্রিটিশ জাদুযোদ্ধাদের সংখ্যা বাড়িয়ে তোলা হয়েছে গত দু’দিনে। এ-দেশকে আক্রমণ করবার এই সুযোগ হাতছাড়া করবে না এরা।”

“আমাদের তরফে কোন সহায়তা…”

হাসান মাথা নাড়লেন, “চেষ্টা করেছিলাম। কমাণ্ডার গগৈকে প্রস্তাব দিয়েছিলাম, আক্রমণ হলে প্রয়োজনে জিপসিরা তাঁদের সহায়তা দিতে পারে। ব্যাঙ্গালোরের জিপসি সরকার সানন্দে সশস্ত্র জিপসিবাহিনী পাঠাবার জন্য সম্মতিও জানিয়েছিলেন। কিন্তু, ওরা আমাদের বিশ্বাস করে না। আমাদের শক্তিতে সামান্যতম আস্থাও নেই ওদের। প্রস্তাবটা দিতে গিয়ে বড়ো অপমানিত হতে হয়েছে আমায় উমের। তবে হ্যাঁ, সাতদিনের সময়সীমা অবধি বিল্লুকে আমাদের আশ্রয়ে রাখবার অনুমতির বন্দোবস্ত আমি করতে পেরেছি। কিন্তু তারপর…”

“বাবা, না…” লীলা বিল্লুর পাশে এসে হঠাৎ তার হাতদুটো চেপে ধরল, “ও আমার ভাই বাবা। ওকে এভাবে…”

ক্লান্ত হাতটা বিল্লুর মাথায় একবার বুলিয়ে দিলেন হাসান, “আমিও কি প্রাণে ধরে তা করতে দিতে চাই লীলা? জিপসিরা শয়ে শয়ে বছর ধরে মার খেয়েছে ওদের হাতে। বাঁচবার তাগিদেই লুকিয়ে থাকবার অনেক প্রযুক্তি আর কৌশলই এখন আমাদের কাছে আছে। কিন্তু এক্ষেত্রে বিল্লুকে সে-পথে বাঁচাতে গেলে এই স্বাধীন দেশকে অনেক রক্তপাত দিয়ে তার মূল্য চোকাতে হবে। অনেক নিরীহ মানুষের প্রাণ যাবে লীলা।”

“যাক। কিন্তু আমি ওকে এভাবে…”

হঠাৎ তার দু’হাতের বাঁধন ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়াল বিল্লু, “কিন্তু আমি তা চাই না হাসান স্যার। অসংখ্য মানুষের রক্তের বিনিময়ে কাপুরুষের মত নিজের প্রাণ বাঁচিয়ে পলাতক আসামী হয়ে বেঁচে থাকতে চাই না আমি। আর সেইসঙ্গে, এ-যুদ্ধ হারতেও আমি চাই না। একটা রাস্তা আছে স্যার। একটা শেষ চেষ্টা। এখনো পাঁচদিন সময় আছে আমাদের হাতে। নিজেকে নিয়ে একটা জুয়া খেলতে চাই স্যার। তার জন্য আপনার কাচে একটা সাহায্যের দরকার হবে আমার।”

কনফারেন্স রুমের সবগুলো মুখ হঠাৎ একসঙ্গে ঘুরে তাকাল তার দিকে। কৌতুহলী মুখগুলোর দিকে একনজর দেখে নিয়ে বিল্লু ফের বলল, “আপনাদের জিপসি চিকিৎসা-প্রযুক্তির একটু সাহায্য চাই। একটা ছোটো নিউরাল সার্জারি। তারপর আমি ওদের হাতে ধরা দেব।”

 “তার মানে?”

বিল্লু একটু হাসল, “জাদুকরদের শক্তির উৎস পিনিয়াল গ্রন্থির ব্যপারে জিপসি বিজ্ঞান বিশেষ কিছু জানে না স্যার। এই লুপ্তপ্রায় অঙ্গের ব্যাপারে বিজ্ঞান কখনোই গুরুত্ব দিয়ে ভাবেনি। কিন্তু, গত সাতমাসের জাদুশিক্ষায় আমি তা জেনেছি। সাইকোটনিন নামের একটা হরমোন নির্দিষ্ট বয়সে জাদুকর কিশোরদের মধ্যে গ্রন্থিটাকে জাগিয়ে তোলে। এ-ব্যাপারে জাদুকর সভ্যতা প্রকৃতির ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল। কারো ক্ষেত্রে তা না ঘটলে বিকলাঙ্গ হয়ে জীবনটা কাটাতে হয় তাকে ওদের সমাজে। কিন্তু আপনার বিজ্ঞান তাকে কৃত্রিমভাবে সৃষ্টি করতে পারলে…”

কথাগুলো শুনতে শুনতেই হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে হাতের কমিউনিকেটরে কাউকে কিছু বলে যাচ্ছিলেন হাসান। বিল্লু থামতে বললেন, “হরমোনটার কেমিক্যাল কমপোজিশান…”

“আমার কাছে আছে। জীবাক বড়ো কড়া শিক্ষক ছিলেন।”

“গুড। তাহলে সেগুলো বলো দেখি,” মিষ্টি গলাটা পেয়ে মুখ তুলে তাকিয়ে হাসল বিল্লু। ডক্টর ইরিনা শিলার কখন যেন ঢুকে এসে হাসানের পাশের চেয়ারটাতে বসে পড়েছেন।

বাকি পরিকল্পনাটা খুলে বলি আপনাদের। তবে এই মুহূর্তে সেটা আমাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকাটা জরুরি।” বলতে বলতেই চেয়ারটা টেনে হাসানের দিকে এগিয়ে এল বিল্লু। উৎসাহে তার মুখটা জ্বলজ্বল করছিল। হাসানের ইশারায় ঘরের অন্যান্যরা তখন এক এক করে বের হয়ে যাচ্ছেন বাইরে।

***

“কেমন আছিস রে ভাই?”

মেডিক্যাল টেন্টের দরজার পর্দাটা সরাতে একরাশ রোদ এসে পড়েছে তার অন্ধকার ভেতরটাতে। দরজায় রোদ মেখে লীলা দাঁড়িয়েছিল, “আজ ডঃ  শিলার তোকে দেখবার অনুমতি দিলেন। গত ক’টা দিন কী যে টেনশনে ছিলাম আমি!”

বিল্লু শুয়ে শুয়েই একগাল হাসল। কপালের ব্যাণ্ডেজ তার আজ সকালেই খুলে নেয়া হয়েছে। একরাশ আশ্চর্য, অচেনা অনুভূতি খেলা করে যাচ্ছিল তার সে-জায়গাটায়। এ অনুভূতিগুলোর সঙ্গে তার আগে আলাপ ছিল না।

“কাছে এসো না লীলাদিদি! দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইলে কেন?”

লীলা হাসল, “উঁহু। কাছে আসা যাবে না। এখনো মেডিক্যাল অবজার্ভেশনে রয়েছিস তুই।”

“ধুৎ। আসবে না তুমি তাহলে, তাই তো? তাহলে দেখ মজা…”

বলতে বলতেই হঠাৎ নিজের শীর্ণ ডানহাতটা তার দিকে বাড়িয়ে ধরেছে বিল্লু।

“এই… এই কী করছিস তুই? নামিয়ে দে আমায়! নামা শিগগির—বাবা—ডঃ শিলার…”

উত্তেজিত গলায় কথাগুলো বলতে বলতেই হঠাৎ মাটি থেকে খানিক ভেসে উঠে আস্তে আস্তে বিল্লুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল লীলা।

প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ল্যাব টেন্ট থেকে বের হয়ে প্রায় ছুটতে ছুটতে এসে ঢুকেছেন ডঃ ইরিনা শিলার। তাঁর দিকে তাকিয়ে, সাবধানে হাতের ইশারায় লীলাকে তার চৌকির পাশে নামিয়ে আনতে আনতেই একগাল হেসে বিল্লু বলল, “থ্যাঙ্ক ইউ ডঃ শিলার। অপারেশন সাকসেসফুল। আজ কী বার?”

ডঃ শিলার তাঁর ডাক্তারির যন্ত্রপাতি বের করে বিল্লুর শরীরটাকে পরীক্ষা করছিলেন। ঠোঁট চেপে গম্ভীরভাবে বললেন, “বুধবার। কথা বোলো না। আমাকে পরীক্ষাগুলো করতে দাও।”

আস্তে আস্তে তাঁর হাতদুটো ধরে একটু দূরে ঠেলে দিল বিল্লু, “ধন্যবাদ ডক্টর। আর আপনার সাহায্যের দরকার হবে না। একজন সক্ষম জাদুকর তার যেকোন শারীরিক ত্রুটিকে নিয়ন্ত্রণ করবার কৌশল জানে। আপনি আমার সে-শক্তিকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। আপনার কাজ শেষ।”

বলতে বলতেই তার শরীর থেকে প্রাণদায়ী নলগুলো নিজে নিজেই খুলে গুটিয়ে যাচ্ছিল। সেদিকে চোখ ধরে রেখেই বিল্লু লীলাকে বলল, “সময় নেই আর। আগামীকাল ওদের ডেডলাইন পার হচ্ছে। হাসান স্যারের কাছে নিয়ে চলো আমাকে।”

“তুই… সত্যিসত্যি ওদের কাছে ধরা দিবি কালকে? ” লীলার মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেছে ফের, “সেদিন আমাদের সরিয়ে দিয়ে বাবার সঙ্গে কী কথা বললি জানি না, কিন্তু তারপর থেকে বাবার মনমরা ভাবটা আর নেই। ভেবেছিলাম বুঝি তোকে হারাতে হবে না আমায়। আর আজ তুই…”

“আজ আমি ওদের কাছে ধরা দিতে যাব। আর তারপর…”

লীলার মুখটা গম্ভীর হয়ে উঠল এবার, “বিল্লু, আমি জানি তোর পিনিয়াল গ্রন্থি সক্রিয় হয়ে উঠেছে ডঃ শিলারের চিকিৎসায়। কিন্তু তার শক্তিতে একা ব্রিটিশ জাদুসৈনিকদের সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রে…”

“একা যাব কে বলল?” বিল্লুর মুখে দুষ্টুমিভরা একটা হাসি নাচছিল, “তুমি আর জিনি ম্যাডামও যাবে সঙ্গে। আর যুদ্ধ? উঁহু। সৈন্যদলের সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, এ যুদ্ধ আমরা তিনজন মিলে অন্য জায়গায় লড়ব গো লীলাদিদি।”

“আ-আমরা? তোর সঙ্গে যাব? কিন্তু…”

“সঙ্গে যাবে কে বলল আবার? তোমরা তো রওনা হয়ে যাবে আজ রাত্রে। আর আমি…

“তবে আর হেঁয়ালি নয়। গোটা প্ল্যানটাই এবার হাসান স্যার খুলে বলবেন তোমাদের। এই যে, আমার হাত ধরো। নো জেটপ্যাক কিন্তু…”

বলতে বলতে উঠে দাঁড়িয়ে লীলার হাতদুটো ধরে পালকের মতই বাতাসে ভেসে উঠছিল বিল্লু, “এখন চলো ত আমার সঙ্গে!”

।২।

বহু মানুষের গলার মৃদু শব্দটা অনেকক্ষণ ধরেই পাচ্ছিল বিল্লু।  মুখে ঠাণ্ডা হাওয়ার ছোঁয়া লাগছিল তার। খোলা আকাশ! মানুষের গলা! সমস্ত অস্তিত্ত্ব দিয়ে তাকে শুষে নিতে চায় যেন সে।

শেষ আকাশ দেখেছিল সে সাতদিন আগে। অহোম সাম্রাজ্যের সীমান্তে। সেখানে তার আত্মসমর্পণের পরের মুহূর্তেই তার চোখে যে অন্ধত্বের জাদু-আবরণ পরিয়ে দেয়া হয়েছিল, গত সাতদিন তা খোলা হয়নি।

ইচ্ছা করলে বিল্লু খুব সহজেই এ-জাদুটাকে নস্যাৎ করে দিয়ে নিজের চোখকে খুলে নিতে পারত। ইচ্ছে করলে, যে অসীম শক্তি এখন তার নিয়ন্ত্রণে এসেছে তার সামান্য অংশকে কাজে লাগিয়েই ধুলো করে দিতে পারত তাকে ঘিরে রাখা বন্দিশালার জাদুপ্রাচীর। গত সাতদিন ধরে, অন্ধের মতই তার বিচারের প্রহসন শুনতে শুনতে, নিরীহ জিপসি বৈজ্ঞানিকদের নামে অজস্র গালিগালাজ হজম করতে করতে বারংবার তার সে ইচ্ছে হয়েছে। মনে হয়েছে শক্তির একটা তীব্র বিচ্ছুরণে গুঁড়িয়ে দিয়ে যায় সে অত্যাচারী ইংরেজের এই পাপের বন্দিশালাকে।

আর, বারেবারেই কঠিন হাতে সে ইচ্ছাকে দমন করেছে সে। শুধু নিজেকে বাঁচানো তার লক্ষ নয়। বীরোলের কাছে করা প্রতিজ্ঞা পালন করতে হবে তাকে। তাকে জাগাবার জ্ঞান আছে ওই তিনিগলের কাছে। তাছাড়া, বিশ্বব্যাপী জাদুকর সমাজের সামনে অন্য একটা সত্যিকেও প্রমাণ করবার প্রয়োজন আছে তার। সেই বৃহত্তর লক্ষের সামনে, এমনকি বীরোলের জীবন বাঁচানো বা প্রথম সমান্তরালের একটা পরাধীন ভুখণ্ডের মুক্তিও তুচ্ছ কাজ।

কাছাকাছি কেউ এগিয়ে এসে দাঁড়িয়েছেন। মৃদু গলায় উচ্চারণ করা কয়েকটা শব্দের সঙ্গে সঙ্গেই হঠাৎ তার চোখের সামনে থেকে অন্ধকারের পর্দাটা সরে গেল। একটা উঁচু পাহাড়ের মাথায় খানিকটা সমতল জায়গা। চারপাশে বরফঢাকা চুড়োগুলো সকালের রোদে ঝলমল করে চোখে ধাঁধা লাগিয়ে দেয় যেন। জায়গাটাকে ঘিরে যতদূর চোখ চলে বিস্তীর্ণ ঢালগুলোর আকাশে অসংখ্য মানুষের প্রতিবিম্ব ভাসছে। ভারতজোড়া ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের নানান অঞ্চলের দর্শকদের চেতনাকে মনোবীক্ষণে এইখানে হাজির করা হয়েছে এখানে। রাষ্ট্রদ্রোহীর মৃত্যুদণ্ডের আসরে সাক্ষি থাকতে হবে তাদের। রানির আদেশে সে দণ্ডদানের দায়িত্ব স্বয়ং লুজগ্রাম তিনিগল নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন। ব্রিটিশের বিরুদ্ধে মাথা তোলবার প্রতিফল কত ভয়ঙ্কর হয়ে তার প্রমাণ হিসেবে সে শাস্তিদান তাদের দেখতে হবে আজ। 

বিল্লু জানে, এখানে লুজগ্রাম আর তার দু-একজন বিশ্বস্ত সহকারী বাদে আর কেউ সশরীরে হাজির নেই। হাই সিকিউরিটি এগজিকিউশনের তকমা দেয়া হয়েছে এই অনুষ্ঠানটাকে। হিমালয়ের উঁচু এলাকার কোন দুর্গম চূড়ার কাছাকাছি তার এই বধ্যভূমিও তিনিগলই নির্বাচন করেছেন নিরাপত্তার খাতিরে। চারপাশটা একনজর দেখে নিয়ে নিজের মনেই একটু হাসল বিল্লু। আসল কারণটা স্বাভাবিকভাবেই জনসমক্ষে বলা হয়নি। নিয়ন্ত্রণহীন রাইমিনকে স্বয়ং লুজগ্রাম তিনিগলও সমঝে চলেন। তাছাড়া তুচ্ছ একটা নেটিভ জিপসির শরীরে এহেন দৈব গ্রন্থির উপস্থিতি তাঁর শ্বেতাঙ্গ অহঙ্কারের পক্ষে  কিছুটা অস্বস্তিরও কারণ।

তার মুখোমুখি খানিকদূরে একটা টেবিলের ওপাশে স্বয়ং লুজগ্রাম অপেক্ষা করছিলেন। ঝলমলে রাজকীয় পোশাক উঠেছে আজ তাঁর শরীরে। সেদিকে একনজর তাকিয়ে খুব সাবধানে মাথাটা একটু ঝাঁকাল বিল্লু। ডান চোয়ালের দু’নম্বর মোলারের মধ্যে বসানো রেডিও ট্রান্সমিটারটা সচল হয়ে উঠেছে ঝাঁকুনিটা খেয়ে।

“লীলাদিদি…”

“রেডি। সংকেতের অপেক্ষায়।”

“জিনি ম্যাডাম…”

“তৈরি।”

অন্যমনস্কভাবে ফের একবার মাথাটা ঝাঁকিয়ে নিল বিল্লু।

ততক্ষণে বাতাস গমগম করে বেজে উঠেছে লুজগ্রাম তিনিগলের গলার শব্দে,

“উপস্থিত প্রজাবৃন্দ। আপনাদের সামনে হাজির এই বর্বর জিপসির বয়স দেখে ভুল করবেন না। এরা জন্ম অপরাধী। এই রাষ্ট্রদ্রোহী জিপসি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিপ্লবের লক্ষে প্রতিবেশী উগ্রপন্থী রাষ্ট্র অহোম গণরাজ্যের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল। আমরা প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সেই ষড়যন্ত্রকে ব্যর্থ করে দিতে সক্ষম হয়েছি। ব্রিটিশ আইনের সামনে সুবিচারের জন্য উপস্থিত করতে পেরেছি এই অপরাধীকে। মহারানি চতুর্থ এলিজাবেথের আদেশে, আমি, লুজগ্রাম তিনিগল একে চরম দণ্ড দেবার দুর্লভ সম্মানলাভ করেছি।”

নিঃশব্দে অপেক্ষা করে চলে ভাসমান অগণিত মানুষের ছবিগুলোতে। বিল্লু নিঃশব্দে একবার সেই অসহায়, দুঃখী মুখগুলোর দিকে দেখে নিয়ে চোখ ফেরাল লুজগ্রামের দিকে।

তার চোখে চোখ রেখে এইবার তাঁর হত্যাস্ফটিকটা হাতে তুলে নিলেন লুজগ্রাম। সেটা সামনে বাড়িয়ে ধরে নীচু গলায় বললেন, “ব্রিটিশ আইন মোতাবেক চরম দণ্ডদানের আগে অপরাধীর একটা শেষ ইচ্ছাকে সবসময় পূরণ করা হয়। সাম্রাজ্যের স্বার্থের বিরোধী নয় এমন যেকোন শেষ ইচ্ছা তুমি আমাকে জানাতে পার।”

এই মুহূর্তটার জন্য উমের আর জীবাককে বারংবার ধন্যবাদ দিচ্ছিল বিল্লু। ব্রিটিশ আইনব্যবস্থার নিবিড় পাঠ তাকে দিয়েছেন তার দুই শিক্ষক। না হলে এই আইনটার সুযোগ নেবার কথা তার মাথায় আসত না। একটুক্ষণ চুপ করে রইল সে। তারপর হত্যাস্ফটিকের মাথায় জ্বলে উঠতে থাকা লালালর বিন্দুটার দিকে চোখ স্থির রেখে বলল, “অনৌসিকপুত্র বীরোলকে যে জাদুতে পাথরের মূর্তি করে দিয়েছিলেন, মৃত্যুর আগে আমি তার প্রতিকার জানতে চাই মহান ভাইসরয়।”

মৃদু হাসলেন তিনিগল। তারপর তাঁর হাতের ইশারায় হঠাৎ উধাও হয়ে গেল চারপাশে জমায়েত হওয়া মনোবীক্ষণের দর্শকদের অগণিত মুখ। সেই নির্জন পাহাড়চূড়ায় তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তিনি বললেন, “এর উত্তর গোপনীয়। তবে আমি তা তোমায় দেব। কারণ সে প্রতিকারের জন্য যা প্রয়োজন, এই মুহূর্তে পৃথিবীতে তা একমাত্র যার কাছে আছে সে আর কয়েক মিনিটের মধ্যে তাকে কাজে লাগাবার অবস্থায় আর থাকবে না। তোমার কাছে বিল্লু। সে প্রতিকার এই মুহূর্তে পৃথিবীতে একমাত্র তোমার কাছেই আছে। রাইমিন গ্রন্থির একটা নির্দিষ্ট শক্তির বিচ্ছুরণ এর একমাত্র প্রতিষেধক হয়ে উঠতে পারে। তার বিচ্ছুরণের পদ্ধতি–”

গভীর মনোযোগ নিয়ে তিনিগলের প্রত্যেকটা কথাকে মাথায় গেঁথে নিচ্ছিল বিল্লু। প্রক্রিয়াটা জটিল। রাইমিন বিচ্ছুরণের ওপর চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে না পারলে যে কোন মুহূর্তে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা থেকে যায় এতে।

“তুমি কি সন্তুষ্ট?”

কথা শেষ হয়েছে তিনিগলের। বাতাসে ফের ফিরে এসেছে অগুন্তি দর্শকের ছবি। নিঃশব্দে, যেন নিঃশ্বাস বন্ধ করে তারা অপেক্ষা করছিল শেষের মুহূর্তটার জন্য।

উজ্জ্বল হত্যাস্ফটিকটাকে হাতে ধরে রেখেই এবার দর্শকদের দিকে ঘুরে তাকালেন তিনিগল, “ব্রিটিশ আইনের সর্বোচ্চ অপরাধ রাষ্ট্রদ্রোহ এই জিপসির বিরুদ্ধে প্রমাণিত হয়েছে। সহজ মৃত্যু একজন রাষ্ট্রদ্রোহীর উপযুক্ত শাস্তি নয়। এর জন্য অন্য শাস্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিচারকমণ্ডলী। তীব্র যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে—তিলে তিলে—”

তিনিগলের দিক থেকে নিজের মনোযোগ সরিয়ে নিল বিল্লু। প্রায় নিঃশব্দে ফিসফিস করে কয়েকটা দুর্বোধ্য শব্দ উচ্চারণ করে উঠেছে সে হঠাৎ। সদ্য জাগিয়ে তোলা  পিনিয়ালের আদেশ মেনে, সেই শব্দদের শক্তিতে তাকে ঘিরে এবার সক্রিয় হয়ে উঠছে অদৃশ্য আরিকেনিয়ান কবচ। তারপর, মাথাটা একবার ঝাঁকিয়ে নীচু গলায়, যেন আপনমনেই বলে উঠল  “লীলাদিদি এইবার…”

হঠাৎ তীব্র লাল আলোর ঝলকে ঝলসে উঠল তিনিগলের হাতের স্ফটিক, আর তার সঙ্গে সঙ্গেই একটা বিস্ময়ের শব্দ ছড়িয়ে গেল দর্শকদের মধ্যে। শরীরকে ঘিরে ঝলমল করে ওঠা কোন অজানা বর্মের গায়ে অবহেলায় সে আঘাতকে প্রতিহত করেছে বিল্লু।

অবিশ্বাসের চোখে সেদিকে তাকিয়ে তিনিগল হঠাৎ বলে উঠলেন, “আরিকেনিয়ান বর্ম! তোর পিনিয়াল গ্রন্থি… এ অসম্ভব!”

“জাদুবিশ্বে অসম্ভব হলেও উন্নত জিপসি মেডিক্যাল প্রযুক্তির কাছে তা নয় তিনিগল। তাঁদের সার্জারি আর হরমোন চিকিৎসা আমাকে আমার পিনিয়াল ফিরিয়ে দিয়েছে।”

বলতে বলতেই মৃদু হাসল বিল্লু। সে জানে, এই মুহূর্তে ভারতব্যাপী জাদুসাম্রাজ্যের ওই হাজার হাজার দর্শকের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে একটা নতুন দিনের খবর। বহু শতাব্দি ধরে অবজ্ঞার অন্ধকারে রেখে দেয়া জিপসিদের আজ ফিরে আসবার দিন। তাদের দিকে ঘুরে তাকাল সে, “পরাধীন ভারতবর্ষ আজ জিপসি বিজ্ঞানের শক্তির সাক্ষি থাকবে। আজ এই জাদুশ্রেষ্ঠের সমস্ত অন্যায়ের শাস্তি দিতে আমরা কোন জাদুর সাহায্য নেব না।”

“আমরা? কে আছে তোর এখানে?”

কথাটার জবাবেই যেন বা, হঠাৎ বাতাসে তীব্র শিসের শব্দ তুলে ধেয়ে এল জিনির হাতের নিখুঁত লক্ষের লেজার। একটা টাল খেয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে হত্যাস্ফটিক তার দিকে তুলে ধরেছিলেন তিনিগল, কিন্তু তাকে কাজে লাগাবার আগেই বিল্লুর মাথার ওপর দিয়ে ভেসে এসে, তার সামনে তার পোশাক, জেটপ্যাক আর লেজার ডিসরাপ্টারটাকে ফেলে দিতে দিতে দ্বিতীয়বার তাঁর ওপরে আক্রমণ শানিয়েছে লীলার হাতের ডিসরাপ্টার।

আকস্মিক জোড়া আক্রমণে  প্রথমে একটু স্তম্ভিত হয়ে গিয়েও নিজেকে সামলে নিলেন তিনিগল। বহু যুদ্ধের পোড়খাওয়া এই সৈনিক অত সহজে হার মেনে নেন না। এবারে তাঁর শরীরকে ঘিরেও জেগে উঠেছে প্রায় অভেদ্য আরিকেনিয়ান জাদুবর্মের আবরণ। হাতের সাধারণ হত্যাস্ফটিককে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আলখাল্লার পকেট থেকে এইবার তিনি বের করে এনেছেন কুচকুচে কালো একটা ফটিকের খণ্ড।

“অনৌসিকপুত্র বীরোল কোন অস্ত্রের আঘাতে পাথরের মূর্তিতে বদলে গিয়েছিলেন তা তুমি জানতে চাও, তাই না?” এবার তার শক্তির প্রমাণ তুমিও পাবে রাষ্ট্রদ্রোহী জিপসি।”

“ডিসরাপটার সর্বোচ্চ স্তরে বাঁধো লীলাদিদি। জিনি ম্যাডাম। আমি তিন গোণবার সঙ্গেসঙ্গে…” জেটপ্যাকের ধাক্কায় বাতাসে ভেসে উঠে পোজিশন নিতে নিতেই বিল্লু তখন চিৎকার করে বলে চলেছিল।

আর তারপর হঠাৎ সেই পাহাড়ের নির্জনতা ভেঙে পড়ল একটা গম্ভীর গর্জনের শব্দে। আলখাল্লার আড়াল ছুঁড়ে ফেলে জিপসি সার্কাসের লাল পোশাকে সেজে বাতাসে ভেসে ওঠা এই খেলোয়ার আর তার দুই সঙ্গীকে এইবার চিনতে পেরেছে সমবেত দর্শকদের অনেকেই। ভারতখ্যাত গ্যালিলিন সার্কাসের জনপ্রিয় তিন খেলোয়াড়কে উদ্দেশ্য করে ভেসে আসছিল তাদের সমবেত গর্জন, “উড়ন্ত সংগ্রাম… উড়ন্ত সংগ্রাম…”

চোখের সামনে সর্বশক্তিমান ব্রিটিশ এই জাদুকরকে বারংবার তিন জিপসি খেলোয়াড়ের হাতে আঘাত পেতে দেখে হঠাৎ করেই তাদের বুক থেকে খসে পড়েছে তিনিগলের ভয়ের বাঁধন। তাকে অস্বীকার করে তারা এবার নির্ভয়ে স্বাগত জানাচ্ছিল নতুন যুগের এই তিন নতুন মানুষকে।

তীব্র হলদেটে একটা আলো জ্বলে উঠছিল তিনিগলের হাতের স্ফটিকে। মানুষের অজানা কোন গহন গভীর প্রাকৃতিক শক্তি তখন তাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে উঠছে দ্রুত। চোখ ঝলসানো আলোয় জেগে উঠছিল তার মৃত্যু-আলো।

অকল্পনীয় দক্ষতায় বারংবার সেই শক্তির ধারাকে এড়িয়ে যেতে যেতেই তিনিগলকে ঘিরে একটা ত্রিভুজের মত অবস্থানে নিজেদের নিয়ে আসছিল তারা তিনজন।

“এক… দুই… লীলাদিদি, জিনি ম্যাডাম… এইবার…”

তিনটি লেজারের অতি উত্তপ্ত ধারা অকল্পনীয় ক্ষমতা নিয়ে উড়ে এসে হঠাৎ কেন্দ্রীভূত হল তিনিগলের হাতে ধরা, এলোমেলো মৃত্যুর জাদু ছড়িয়ে চলা পাথরটার গায়ে। কোন বিস্ফোরণ হল না। শুধু তিনিগলের বিস্মিত দৃষ্টির সামনে হঠাৎ রেণু রেণু হয়ে তা গুঁড়িয়ে গেল তাঁর হাত থেকে।

আস্তে আস্তে তাঁর সামনে নেমে এসে স্থির হল বিল্লু। তার হাত থেকে বের হয়ে আসা জাদুর তীব্র বাঁধন তখন পাকে পাকে ঘিরে ফেলছে তিনিগলকে।

“সমবেত দর্শকমণ্ডলী। জিপসিদের, এবং ভারতীয় জাদুকর সমাজের ওপরে বহু অন্যায় অত্যাচারের নায়ক লুজগ্রাম তিনিগলকে, এই দুই সমাজের একক প্রতিভু হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দেবার দায়িত্ব আমি নিজের কাঁধে তুলে নিচ্ছি।”

জিনির পকেট থেকে বের করে আনা খুদে ভয়েস মালটিপ্লায়ারটা থেকে উল্লসিত জনতার শব্দকে ছাপিয়ে ছড়িয়ে পড়ছিল বিল্লুর শান্ত গলার স্বর, “জিপসি বিজ্ঞানের শক্তিতে জাদুকে পরাজিত করে আজ আমরা জিপসি বিজ্ঞানের অগ্রগতির বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ রাখতে পেরেছি আপনাদের সামনে। কিন্তু লুজগ্রাম তিনিগলের শরীরকে ঘিরে রাখা আরিকেনিয়ান বর্মকে অতিক্রম করবার সাধ্য কোন যন্ত্রের নেই। একটামাত্র জাদুর শক্তি আছে একে ধ্বংস করবার। আমি, পৃথিবীতে এই মুহূর্তে রাইমিন গ্রন্থির একমাত্র মালিক, জিপসি জাদুকর বিল্লু, সেই অস্ত্রের ব্যবহার করব এই অপরাধীর ওপর। জিপসি ও ভারতীয় জাদুসমাজের ঐক্য দীর্ঘজীবি হোক।”

বলতে বলতেই হালকা একটা লালাভ আভায় ঝলসে উঠছিল বিল্লুর গোটা মাথাটাই। সদ্যজাগ্রত পিনিয়ালের নিয়ন্ত্রণে তার রাইমিন গ্রন্থির শক্তির উৎসমুখ এবার নিখুঁত পরিমাপে খুলে গিয়েছে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে তার দুই চোখ থেকে ছুটে আসা সেই করাল মৃত্যুরশ্মির আঘাত পুড়িয়ে ছাই করে দিল তাদের সামনে দাঁড়ানো অত্যাচারী শাসকের শরীরটাকে।

নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছে সমবেত দর্শকদের ছবিগুলো। নিজদের চোখকেও এ-মুহূর্তে বিশ্বাস করতে রাজি নয় তারা। আর তারপর, একটা সমুদ্রের মত গর্জন উঠে এল চারদিক থেকে। জাদুকরসমাজের জয়ধ্বনি উঠছে জিপসি সার্কাসের উড়ন্ত সংগ্রামের যোদ্ধা বিল্লুর উদ্দেশ্যে।

একনজর সেদিকে তাকিয়ে দেখে বিল্লু লীলার হাত ধরে বলল, “তোমরা ফিরে যাও দিদি। হাসান স্যারকে বলো, এখন আমাদের আত্মগোপনের সময়। খোঁচা খাওয়া ব্রিটিশ সিংহ এত সহজে ছেড়ে দেবে না। প্রত্যাঘাত আসবে এবার। জিপসি আর ভারতীয় জাদুকর প্রজা কেউ ছাড় পাবে না। কিন্তু সে-যুদ্ধে আমাদের অংশ নেয়া চলবে না। তার চাইতেও অনেক কঠিন, অনেক দীর্ঘ লড়াই অপেক্ষা করে আছে আমাদের সামনে।”

“আমরা সফল হলে কী করতে হবে সে বিষয়ে বাবার সম্পূর্ণ পরিকল্পনা তৈরিই আছে রে। এখন চল।”

“না। আমার এখন তোমাদের সঙ্গে যাওয়া হবে না গো,” ক্লান্ত একটুকরো হাসি ছড়িয়ে পড়ছিল বিল্লুর মুখে, “আরো একটা কাজ বাকি আছে আমার। সেটা শেষ করতে হবে প্রথমে। তারপর… আমি জানি কোথায় তোমাদের দেখা পাব। লোগতাকের শেল্টারের কথা আমাকে আগেই জানিয়েছেন হাসান স্যার। আমি চলি।”

বলতে বলতেই জেটের তীব্র ধাক্কায় পাহাড়ের মাথা ছাড়িয়ে ভেসে উঠল তার শরীরটা। তারপর অনেক উঁচুতে উঠে একটা লাল তিরের মত ভেসে গেল তা দক্ষিণপূর্বের দিকে। সেদিকে তাকিয়ে মৃদু হাসি ছড়িয়ে পড়ছিল লীলার বুকে। তার ভাই নিজের প্রতিজ্ঞা ভোলেনি। ও কোথায় যাচ্ছে তা লীলা জানে।

।৩।

“গোটা দেশ জেগে উঠেছে বিল্লু। লুজগ্রামের হত্যার খবর প্রচারিত হবার সঙ্গেসঙ্গেই ব্রিটিশের বিরুদ্ধে গণবিদ্রোহে সামিল হচ্ছে একে একে কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত আসমুদ্রহিমাচল ভারত। তোমাকে তারা ভারতবর্ষের মুক্তির দূতের আসনে বসিয়েছে। অহোম গণরাজ্যের জাদুকর সেনাদল, ব্যাঙ্গালরের জিপসি যান্ত্রিক সেনাবাহিনীও যোগ দিতে চলেছে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে এই শেষ যুদ্ধে। জিপসি আর জাদুকর অবশেষে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অত্যাচারী ব্রিটিশের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছে।  তুমি এ গণবিদ্রোহের নেতৃত্ব নাও। আমরা…”

তীব্র আবেগে থরথর করে কাঁপছিল অনৌসিকের গলাটা। সোফেট নেং এর পাহাড়ের গায়ে ভাইসরিগ্যাল গার্ডের আক্রমণের চিহ্ন সর্বত্র ছড়িয়ে আছে এখনো। এখনো তার বাতাসে বহু দেশপ্রেমিক বিপ্লবীর মৃত্যুর গন্ধ।

চারপাশে একবার তাকিয়ে দেখল বিল্লু। তারপর মাথা নেড়ে বলল, “এ যুদ্ধ আমার নয় অনৌসিক। এর চেয়ে অনেক বড়ো কাজ আমার অপেক্ষায় আছে যে! জিপসি আর জাদুকর সভ্যতার ঐক্যের প্রথম বীজ বোনা হয়েছে আজ। তার কিছু ফলও হয়ত ফলতে শুরু করেছে। কিন্তু, বহু শতাব্দির এই অবিশ্বাস এক দিনে ঘোচবার নয়। সেই মিলিত সমাজকে গড়ে তোলার দায়িত্ব নিতে হবে আমাকে। ভারতবর্ষে এ-বিপ্লবের নেতৃত্ব যার নেবার প্রকৃত অধিকার সে-ই আজ তা নেবে।”

“আ- আমি—”

“আপনি নন। প্রথম সমান্তরালের রাজপুত্র, রাইমিন গ্রন্থির মালিক বীরোল। এ যুদ্ধ তার। সে-ই এতে নেতৃত্ব দেবে। আমি তার মুক্তির পথ খুঁজে পেয়েছি। আমার প্রতিজ্ঞা আমি ভুলে যাইনি অনৌসিক। আসুন।”

***

টেবিলের ওপর শোয়ানো মূর্তিটার শরীরের ওপরে ঝুঁকে থাকা বিল্লুর শরীরটা পাথরের মত স্থির হয়ে ছিল। তার দু’চোখ থেকে বের হয়ে আসা সুনিয়ন্ত্রিত রাইমিন বিচ্ছুরণের হালকা আলোর ধারা ধুইয়ে দিয়ে যাচ্ছিল মূর্তিটার শরীর।

তীক্ষ্ণ চোখে সেদিকে তাকিয়েছিলেন অনৌসিক। একটু নড়ে উঠল কি বীরোল? একটা অদ্ভুত আশা-আশঙ্কার মিশ্রণ তাঁর চোখদুটোকে ঝাপসা করে দিচ্ছিল বারবার।

আর সেই অবস্থাতেই হঠাৎ সুতীব্র যন্ত্রণার তীক্ষ্ণ চিৎকারটা তাঁর বুকের ভেতর ধাক্কা দিল এসে। চমকে উঠে টেবিলটার দিকে ঘুরে তাকালেন অনৌসিক। বীরোলের শরীরটা সেখানে তার আঘাত পাবার মুহূর্তের তীব্র যন্ত্রণায় পাক খেয়ে উঠছিল বারংবার। অবশেষে সরে গেছে  তাকে বন্দি করে রাখা তিনিগলের মৃত্যু-আবরণ।

তাকে ঘিরে থাকা জাদুচিকিৎসকের দলটা ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। ঘনঘন হাঁকডাক আর তার মধ্যেই বেদনানাশক মন্ত্রগুলোর উচ্চারণ শুনতে শুনতেই সেদিকে এগিয়ে গেলেন অনৌসিক। তারপর ছেলের যন্ত্রণাদীর্ণ মাথাটা বুকে তুলে নিয়ে কান্নাভেজা গলায় বললেন, “ওয়েলকাম ব্যাক বীরোল। আমি কখনো এ দিনটা দেখবার আশা করিনি। তোমার প্রাণ ফিরিয়ে দিয়েছে এই ছেলেটা… এই…”

বলতে বলতেই পেছনে ঘুরে দেখলেন তিনি একবার। সেখানে জমা হওয়া উল্লসিত বিপ্লবীদের দলে বিল্লু কোথাও ছিল না।

***

বাইরের নির্জন অন্ধকারে, উত্তরপূর্বের আকাশে জেটপ্যাক নিঃসরণের একটা রেখা টেনে তখন এগিয়ে চলেছে এক একক উড়ন্ত মানুষ। রিপল ট্রান্সপোর্টে এক মুহূর্তেই সে হয়ত হাসানের কাছে পৌঁছে যেতে পারত। সে শক্তি তার এখন আছে। কিন্তু, শরীরে রাত্রের আকাশের ছুটন্ত হাওয়ার ছোঁয়া তখন তার ভারী মধুর লাগছিল। তার সামনে এখন অনেক কাজ।

অলঙ্করণঃ অর্ক পৈতণ্ডি

 জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

2 Responses to উপন্যাস বীরোল দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য শরৎ ২০১৯

  1. সুদীপ says:

    কেয়া বাত! কেয়া বাত! কেয়া বাত!

    এই অভিনব ভাবনার জন্যে সেলাম। অর্কদার ইলাস্ট্রেশনেরও জবাব নেই। কেয়াবাত!

    Like

  2. রুমেলা says:

    অপূর্ব

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s