উপন্যাস ভুবনডাঙার ভূত কৃষ্ণেন্দু দেব শীত ২০১৬

uponyasbhubondanga1কৃষ্ণেন্দু দেব

।।এক।।

ভুবনডাঙার নরহরি মণ্ডল সেদিন সন্ধ্যাবেলা নিজের ছাগলটা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। এই বুড়ো বয়সে আর বেশি ধকল নিতে পারেন না। একটুতেই হাঁপিয়ে পড়েন। সেই সময়েই রতন ব্যাট হাতে বাড়ি ফিরছিল। তাকে ডেকে নরহরি নিজের সমস্যার কথা বললেন। সব শুনে রতন মন্তব্য করল, “চিন্তা কোরো না খুড়ো, ছাগলটা ঠিক খুঁজে পাওয়া যাবে। তুমি লং-অনটা দেখো, আমি কভার আর এক্সট্রা কভারটা দেখছি।” এই বলে সে একদৌড়ে পূর্বদিকের বাঁশবনটার ভিতর ঢুকে গেল।

নরহরি মণ্ডল রতনের কথা কিছু বুঝতে না পেরে চুপচাপ এক জায়গায় দাঁড়িয়ে রইলেন। একটুবাদেই অবশ্য রতন ছাগলের দড়ি হাতে বাঁশবন থেকে বেরিয়ে এল। বলল, “এই নাও খুড়ো, তোমার ছাগল। যাও, এবার খুশি মনে প্যাভিলিয়নে ফিরে যাও।”

ছাগলটা ফিরে পেয়ে খুড়ো খুশি হলেন বটে, তবে এবারও ওঁর মুখ থেকে কোনও কথা সরল না।

রতন আসলে এক ক্রিকেট পাগল ছেলে। ওর বাবার পোলট্রির ব্যবসা। কিন্তু সেদিকে রতনের মন নেই। যত মন ঐ ক্রিকেট খেলায়। কলেজে পড়ার সময় ও কলকাতার নামী ক্লাবে ট্রেনিংও নিয়েছে। তারপর গ্রামের ছেলেদের নিয়ে একটা টিম বানিয়েছে। তাদের নিয়ে ও এখন গ্রামের মাঠেই প্র্যাকটিস করে আর এদিক ওদিক নানা টুর্নামেন্ট খেলে বেড়ায়।

uponyasbhubondanga03যাই হোক, সেদিন ছাগল খুঁজে যখন রতন বাড়ি ফিরল, তখন সন্ধ্যা গড়িয়ে গেছে। সবে সে বারান্দায় পা রেখেছে, এমন সময় ওর ভাই এসে খবর দিল, পোলট্রিতে চোর ঢুকেছে। কথাটা শোনামাত্র রতন ব্যাট হাতে ছুটল পোলট্রির দিকে। পোলট্রি ফার্মটা ওদের বসত বাড়ির ঠিক পিছনেই। ওখানে গিয়ে দেখে কী, একটা রোগা-সোগা লোক দু’হাতে দু’টো মড়া মুরগি নিয়ে হেলতে-দুলতে চলে যাচ্ছে। রতন যেই না তাকে ব্যাট উঁচিয়ে তাড়া করতে যাবে, অমনি লোকটা মুরগিসমেত হঠাৎ বাতাসে মিলিয়ে গেল। মুরগিচোরটা যে মানুষ নয়, একটা জলজ্যান্ত ভূত, সেটা বুঝতে রতনের আর দেরি হল না।

দু’দিন বাদে গ্রামের জীতেনখুড়োরও ঐ একই ধরনের অভিজ্ঞতা হল। সেদিন সকালবেলা উনি বাজার থেকে চারাপোনা, কাঁচকলা আর থানকুনি কিনে এনেছিলেন। আমাশাটা ক’দিন ধরে বড়োই ভোগাচ্ছে। তাই পথ্য হিসাবে থানকুনির রস আর কাঁচকলা দিয়ে মাছের ঝোলের ব্যবস্থা। তা সবেমাত্র উনি মাছের ব্যাগটা কলতলায় গিন্নিকে দিয়েছেন, অমনি কোথা থেকে সেই ভূতটা ব্যাগটা ছোঁ মেরে তুলে হাওয়া হয়ে গেল।

জীতেনখুড়ো আদতে একজন অসুখ-বিলাসী মানুষ। সারাবছরই উনি হাজারো অসুখ নিয়ে দিন কাটাতে ভালবাসেন। গ্যাস-অম্বল, সর্দিকাশি, দাঁতব্যথা, টনসিল, গেঁটেবাত, ডায়াবেটিস, কোলাইটিস – কী নেই ওঁর! কোনোদিন ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে যদি মনে হয় শরীরে কোনো উপসর্গ নেই, তাহলে খুড়োর খুব চিন্তা শুরু হয়ে যায়। ভাবেন এটা কোনো অশুভ লক্ষণ নয় তো! আর ঠিক তক্ষুনি দাঁতের গোড়াটা টনটন করে উঠলেই উনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়েন। যাক বাবা, দুশ্চিন্তার কিছু নেই।

অত্যধিক রোগে ভোগার জন্যই হয়ত, জীতেনখুড়ো একটু ভীতু প্রকৃতিরও বটে। তাই ভূতে মাছের ব্যাগ নিয়ে চলে যাওয়ায় উনি বেশ চিন্তিত হয়ে পড়লেন। প্রতিদিন ভোরবেলা হাঁটতে বেরনো খুড়োর পুরনো অভ্যাস। মর্নিংওয়াকে গেলেই ওঁর মেজাজটা ফুরফুরে হয়ে যায়। কিন্তু ভূত দেখার পরদিন সকালে আর তেমনটা হল না। ঘুরেফিরে খালি মাছ চুরির ব্যাপারটা মাথায় চলে আসতে লাগল। এই বিপদ থেকে কীভাবে রক্ষা পাবেন, মনে মনে তাই ভাবছেন, এমন সময় দেখলেন আশিসদা হন্তদন্ত হয়ে স্টেশনের দিকে যাচ্ছে।

uponyasbhubondanga02আশিসদা ব্যারাকপুরের একটা বেসরকারি কোম্পানিতে বেশ উঁচু পদে চাকরি করে। নিপাট ভদ্রলোক। শুধু একটাই দোষ, কথা বলার সময় কোনো বাক্য পুরো বাংলায় বলে না। তাতে এক বা একাধিক ইংরাজি শব্দ থাকবেই। তবে অধিকাংশ সময়ে আবার ঐ সমস্ত ইংরাজি শব্দের বাংলা তর্জমাও সে শ্রোতাকে শুনিয়ে দেয়, যাতে তার বুঝতে অসুবিধা না হয়। ভুবনডাঙার ছেলেছোকরারা তাই আড়ালে-আবডালে আশিসদাকে ‘মোবাইল ইংলিশ টু বেঙ্গলি ডিকশনারি’ বলে ডাকে।

এহেন আশিসদাকে সাতসকালে ট্রেন ধরতে যেতে দেখে জীতেনখুড়ো জিজ্ঞাসা করলেন, “কী ব্যাপার রে আশিস, আজ এত সকাল সকাল চললি যে? চাকরিতে প্রমোশন হল নাকি?”

আশিসদা উত্তরে বলল, “না না খুড়ো, প্রমোশনের ম্যাটার নয়। আসলে আমার ফাদার-ইন-ল মানে শ্বশুরমশাই হসপিটালাইজড হয়েছেন। ইচ্ছা আছে তাঁকে সকালে একবার ভিজিট করে তারপর অফিসে রিচ করব, মানে পৌঁছাব।”

“তাই নাকি? তা কবে হল এসব?”

“ইয়েসটারডে মানে গতকাল রাত্রে। পারহ্যাপস, কয়েকদিন ধরেই উনি সিক ছিলেন। গিন্নি আমাকে বাই ফোন নিউজটা দিল। সে তো মেয়েকে নিয়ে লাস্ট সানডে থেকে ওখানেই স্টে করছে।”

“তা আজ বাড়ি ফিরবি তো?”

“অফ কোর্স! দিনকাল খারাপ। বাড়ি তো আর এম্পটি মানে খালি রাখা যায় না। থিভসের তো আর অভাব নেই!”

“সে তো বটেই। তার ওপর আজকাল আবার ভূতের উপদ্রব শুরু হয়েছে। কাল তো আমার মাছসমেত ব্যাগটা নিয়ে পালিয়েই গেল।”

“রিয়্যালি! আরে আমিও তো ঘোস্টটাকে গত পরশু ফেস করেছি। হতচ্ছাড়া আমাকে তো রীতিমত ইনসাল্ট করেছে। পুরো ঘটনাটা আমি তোমাকে পরে এক্সপ্লেন করব। এই প্রবলেমটার একটা পার্মানেন্ট সলিউশন মানে স্থায়ী সমাধান হওয়া দরকার।”

“সে তো ঠিকই। আমি গোলকদাকে কালই সব ঘটনা জানিয়েছি। উনি কোনও একটা দিন মিটিঙে বসার কথা বলছিলেন। তোকে সময়মতো সব জানাব’খন।”

“অলরাইট। মিটিঙের ডেট ফিক্স হলে আমাকে জানিয়ো। আজ আর টাইম নেই, বাই।”

ওদিকে গোলকজ্যাঠাও পরেশবাবুর সাথে কথা বলে মিটিঙের দিনক্ষণ ঠিক করে ফেললেন। তাঁর নিজের বাড়িতেই সামনের রবিবার সকাল ন’টায় ভুবনডাঙার ভূতপীড়িতদের নিয়ে মিটিং হবে। গোলক চক্রবর্তী একজন প্রবীণ এবং অতি বিচক্ষণ মানুষ। চিরকালই গ্রামের লোক কোনও সমস্যায় পড়লে প্রথমেই ওঁর শরণাপন্ন হয়। এবারও তার অন্যথা হয়নি। জীতেনখুড়োদের কাছে ভূতের উপদ্রবের কথা শুনেই উনি ছুটে গিয়েছিলেন পরেশ মণ্ডলের বাসায়। পরেশবাবু আসলে একজন ভূত বিশেষজ্ঞ। চাকরি সূত্রে ওঁকে একসময় বাংলার বিভিন্ন জায়গায় বদলি হতে হয়েছে। আর ঐ প্রতিটা জায়গাতেই উনি একাধিক ভূতের সংস্পর্শে এসেছেন, জেনেছেন তাদের মনের কথা। সেই সুবাদে ভূতেদের মনস্তত্ত্ব নাকি পরেশবাবুর নখদর্পণে। তাই গোলকজ্যাঠার বিশ্বাস, সবকিছু বিশদে জানলে ভদ্রলোক নিশ্চয়ই এই অভূতপূর্ব ভৌতিক সমস্যা সমাধানের একটা পথ বাতলে দিতে পারবেন।

।।দুই।।

রবিবার মর্নিংওয়াক সেরে জীতেনখুড়ো একটু তাড়াতাড়িই বাড়ি ফিরে এলেন। পেটের সমস্যাটা তো ছিলই, তার ওপর আজ ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই দাঁতের গোড়াটা কেমন যেন টনটন করছে। তাই পেয়ারা পাতা সেদ্ধ করে, সেই জলে সামান্য নুন আর লবঙ্গ দিয়ে খুড়ো প্রথমে কুলকুচি করবেন। তারপর বাগানে ঢুকবেন তাঁর ভেষজ গাছগুলোর পরিচর্যা করতে। আসলে এতকাল বিভিন্ন রোগের হাত থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য খুড়ো চেষ্টার কোনও কসুর করেননি। অ্যালোপ্যাথি, হোমিওপ্যাথি, ইউনানি, রেইকি, আকুপাংচার – বাদ দেননি কিছুই। কিন্তু যেদিন উপলব্ধি করলেন, অসুখ-বিসুখ ছাড়া উনি বেঁচে থাকতে পারবেন না, সেদিন থেকেই ঝুঁকলেন কবিরাজির দিকে। হাজার হোক লতা-পাতা-ছাল-মূলের কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই, খরচাও বেশ কম। এখন বাগানে নানা ভেষজ গাছ লাগিয়ে নিজেই নিজের চিকিৎসা করছেন।

uponyasbhubondanga04যাই হোক, সেদিন ন’টা বাজার খানিক আগেই জীতেনখুড়ো গোলকজ্যাঠার বাড়ি হাজির হলেন। রতন আর আশিসদা ইতিমধ্যেই সেখানে পৌঁছে গিয়েছিল। একটু বাদে গোলকজ্যাঠার পুত্রবধূ নয়নতারা লুচি আর ছোলার ডাল নিয়ে হাজির হল বৈঠকখানায়। আর পিছন পিছন জলের গ্লাস নিয়ে ঢুকল ওর বর গোবিন্দ। নয়নতারা জীতেনখুড়োর দিকে তাকিয়ে বলল, “নিন খুড়ো, আগে আপনারা একটু জলযোগ সেরে নিন, তারপর মিটিঙে বসবেন।”

লুচি আর ছোলার ডাল দেখে তো খুড়ো হাঁ হাঁ করে উঠলেন। বললেন, “রক্ষে করো মা জননী! পেটের রোগে একেবারে জেরবার হয়ে যাচ্ছি। জল খেলেও চোঁয়া ঢেকুর উঠছে। এসব আমার চলবে না।”

গোবিন্দ সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, “কোনও চিন্তা নেই খুড়ো, নিশ্চিন্তে খাও। তোমার বৌমা যখন লুচি বানাবার জন্য ময়দা মাখছিল, আমি তখন তাতে দশফোঁটা নাক্স ভোমিকা মাদার ফেলে দিয়েছি। আর ছোলার ডালে কার্বোভেজ টু হানড্রেড। তাই ও দু’টোর কোনোটাতেই আর তোমার পেটের প্রবলেম হবে না।”

একথা শোনামাত্র নয়নতারা রাগে গজগজ করতে করতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তার এই রাগের অবশ্য যথেষ্ট কারণ আছে। গতবছর ওরা দু’জন দিঘা বেড়াতে গিয়েছিল। সঙ্গে নয়নতারার দিদি-জামাইবাবুও ছিলেন। স্নান করতে নেমে গোবিন্দকে কয়েক ফোঁটা হোমিওপ্যাথিক ওষুধ সমুদ্রের জলে ফেলতে দেখে নয়নতারার স্কুল টিচার জামাইবাবু জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “ভাই গোবিন্দ, জলে তুমি ওটা কী দিলে?”

গোবিন্দ জবাবে বলেছিল, “রাস টক্স টু হানড্রেড। আসলে এখন সিজন চেঞ্জের সময় তো, অনেকক্ষণ জলে থাকলে ঠাণ্ডা লাগার একটা সম্ভাবনা থাকে। রাস টক্স সেটা আর হতে দেবে না।”

“কিন্তু ওষুধ তো খেতে হয়, ওটা সমুদ্রের জলে ফেলে কী লাভ হল?”

“আসলে কী জানেন দাদা, হোমিওপ্যাথি ওষুধ যত ডাইলিউটেড হয়, তত তার ক্ষমতা বাড়ে। সমুদ্রের জলে পাঁচ ফোঁটা দিয়েছি মানে ভাবুন কতটা ডাইলিউট হয়ে যাবে। এবার চান করার সময় মুখে তো জল ঢুকবেই। তার সঙ্গে ঐ ওষুধের যে দু’একটা মলিকিউল পেটে যাবে, তাতেই দারুণ কাজ হবে।”

গোবিন্দর মুখে এই ব্যাখ্যা শুনে নয়নতারার কেমিস্ট্রি পড়া জামাইবাবু সেদিন নাকি সি-বিচেই অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন। তারপর থেকে নয়নতারা যতবারই বাপের বাড়ি গেছে, ততবারই তাকে গোবিন্দর রাস টক্স নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে। আর তাই গোবিন্দ কোনও হোমিওপ্যাথি ওষুধের কথা বললেই নয়নতারার ভীষণ রাগ হয়ে যায়। আর একটা কথা তো বলাই হয়নি। গোবিন্দ কিন্তু আদতে মোটেই কোনও পাশ করা ডাক্তার নয়, সে পঞ্চায়েতের কর্মী। তবে হোমিওপ্যাথি তার নেশা, মেটিরিয়া মেডিকা তার ধ্যান-জ্ঞান।

uponyasbhubondanga05সেদিন ন’টা বাজার খানিক পরে পরেশবাবুর দেখা মিলল। আর তার পিছন পিছন সাইকেল সহযোগে প্রবেশ ঘটল নিতাইখুড়োর। পরেশবাবুকে দেখেই গোলকজ্যাঠা বলে উঠলেন, “কী ব্যাপার পরেশবাবু! আজ কি সূর্য পশ্চিমদিকে উঠেছে নাকি? আপনার মতো একজন পাংচুয়াল মানুষও কিন্তু আজ পাক্কা দশ মিনিট লেট।”

পরেশবাবু জবাবে বললেন, “আমি কিন্তু ঠিক সময়েই বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলাম। মাঝরাস্তায় এসে দেখি একটা গাছের তলায় নিতাইবাবু সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। বললেন, ওঁর সাইকেলটা নাকি চলছে না। আমি প্রথমে ভাবলাম চেন-টেন পড়ে গেছে বুঝি। কিন্তু একটু বাদেই ওঁর সঙ্গে কথা বলে মালুম হল যে উনি হঠাৎ সাইকেল চালাতেই ভুলে গেছেন। বেশ কিছুক্ষণ ওঁকে প্যাডেল করা শেখাতে চেষ্টা করলাম বটে, কিন্তু তাতে কোনও ফল হল না। তাই শেষে উনি সাইকেলটা সঙ্গে নিয়ে হেঁটে হেঁটেই বাকিটা পথ এলেন। তাই এখানে পৌঁছতে আমার একটু দেরি হয়ে গেল।”

একথা শোনামাত্র সকলের চোখ গেল নিতাইখুড়োর দিকে। নিতাইখুড়ো অবশ্য কোনও কথা বললেন না, কেবল একটা অপরাধী অপরাধী মুখ করে বৈঠকখানার এককোণায় বসে পড়লেন। ওঁকে দেখে মনে হল, যেন কী একটা অন্যায় করে ফেলেছেন।

আসলে খুড়োর একটা সমস্যা আছে। অবশ্য ওটাকে সমস্যা না বলে রোগ বলাই ভালো। নিতাইখুড়ো মাঝেমধ্যেই বেশ কয়েক ঘন্টার জন্য কোনও একটা ঘটনা বা কোনও একটা জানা জিনিস বেমালুম ভুলে যান। বছর পনেরো আগে প্রথম যেদিন সমস্যাটা দেখা দিয়েছিল, সেদিনই ওঁকে খোয়াতে হয়েছিল চাকরিটা।

আসলে হয়েছিল কী, উনি কলকাতার একটা বেসরকারী কোম্পানিতে ক্যাশ কালেকশনের কাজ করতেন। কোম্পানির মূল গোডাউনটা ছিল বাইপাসের ধারে, একটা ফাঁকা জায়গায়। বছর পনেরো আগে একদিন খুড়ো সকাল সকাল গোডাউনে পৌঁছে গিয়ে কোম্পানির মালিক দত্তবাবুর সাথে কথা বলছেন, এমন সময়ে হঠাৎই শর্ট শার্কিট থেকে ওখানে আগুন লেগে গেল। আর আগুনে প্রথমেই টেলিফোন লাইনটা গেল পুড়ে। তখন তো আর মোবাইল চালু হয়নি। সামনে কোনও টেলিফোন বুথও ছিল না। তবে ফায়ার ব্রিগেডটা কাছাকাছিই ছিল। দত্তবাবু জলদি নিতাইখুড়োকে দমকলে খবর দিতে বললেন।

সেইমত খুড়োও দৌড়ে বের হলেন গোডাউন থেকে। কিন্তু তারপরই আগুন লাগার ব্যাপারটা হঠাৎ তাঁর মাথা থেকে একদম উবে গেল। খুড়ো একটা বাস ধরে সোজা চলে গেলেন বড়োবাজার। সেখানে বিভিন্ন দোকানে ঘন্টাদুই ক্যাশ কালেকশনের পর আবার ফিরে এলেন গোডাউনে। ততক্ষণে সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। লোকের ভিড় উপচে পড়ছে। ঠিক কী হয়েছে তা বুঝে ওঠার আগেই দত্তবাবু নিতাইখুড়োর সামনে এসে দাঁড়ালেন। গম্ভীর গলায় জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি এতক্ষণ কোথায় ছিলেন নিতাইবাবু?”

নিতাইখুড়ো সরল মনে জবাব দিলেন, “আজ্ঞে, বড়োবাজারে ক্যাশ কালেকশন করছিলাম। শ্রীরাম এন্টারপ্রাইজের হরিলাল সাউ কিছুতেই দু’হাজারের বেশি দিল না।”

এই উত্তরের পর, বলাই বাহুল্য, খুড়ো চাকরি থেকে বরখাস্ত হলেন। সেদিন রাত্তিরেই অবশ্য তাঁর সব কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু তখন বড়ো দেরি হয়ে গেছে। পরবর্তীকালে খুড়োর ঐ সাময়িক স্মৃতিলোপের ঘটনা মাঝেমধ্যেই ঘটতে লাগল। অনেক ডাক্তার-বদ্যি দেখিয়েও কোনও ফল হল না। তারপর থেকে প্রায়শই নানা ঘটনা ভুলে গিয়ে এবং সেজন্য গিন্নির গঞ্জনা সহ্য করে এখন নিতাইখুড়ো দিব্যি চালিয়ে যাচ্ছেন।

যাই হোক, একটু বাদেই মিটিং শুরু হয়ে গেল। ঠিক হল, প্রথমে সবাই নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা বলবেন। সব শুনে পরেশবাবু নিজের মতামত জানাবেন। প্রথমে গোলকজ্যাঠাই মুখ খুললেন। কীভাবে ভূতটা গত পরশু সকালে তাঁর বৌমার হাত থেকে একটা গোটা ইলিশ ছিনিয়ে নিয়ে গেছে, সে কথাই সকলকে শোনালেন। ইলিশটা হাতছাড়া হওয়ার শোক যে তিনি তখনও সামলে উঠে পারেননি, তা তাঁর কথাতেই বিলক্ষণ বোঝা গেল।

এরপর এল আশিসদার পালা। সে বলতে শুরু করল, “আমি ঐ ঘোস্টটাকে একেবারে ফেস-টু-ফেস মানে মুখোমুখি মিট করেছি। লাস্ট থারস্‌ডে মানে বৃহস্পতিবার আমি একটু রাত করে বাড়ি ব্যাক করছিলাম। বউ আর মেয়ে তো কিছুদিন ধরে ইন-ল’জ হাউজে মানে শ্বশুরবাড়িতে আছে। তাই ট্রেন থেকে নেমে একেবারে ডিনার সেরে বাড়ি ফিরছি। এমন সময় সাডেনলি দেখি, আমার বাড়ির এনট্রান্সের সামনে একটা রোগা-পটকা লোক অবজেকশনেবল পোজ নিয়ে মানে আপত্তিকর ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে।”

“আপত্তিকর ভঙ্গিতে মানে?” রতন জিজ্ঞাসা করল।

আশিসদা জবাবে বলল, “মানে আর কী? একটা বিয়ার মানে ভাল্লুক দু’পায়ে স্ট্যান্ড হলে যেমন দেখায়, অনেকটা সেভাবে দাঁড়িয়েছিল। আর মুখটাকে ডিসটর্ট মানে বিকৃত করে আমাকে ভেংচি কাটছিল। আমি প্রথমে ভাবলাম কোনও মেন্টালি ডিসঅর্ডার্ড পার্সন মানে মানসিক বিকারগ্রস্ত লোক বুঝি। পারহ্যাপস, একটু ভয়ও লাগছিল। তবু সাহস করে একটু ফরোয়ার্ড মুভমেন্ট করতেই ও আমাকে বক দেখিয়ে এয়ারে ভ্যানিশ হয়ে গেল।”

অশিসদার গল্প শেষ হতেই গোলকজ্যাঠা নিতাইখুড়োকে তাঁর অভিজ্ঞতার কথা বলতে বললেন। নিতাইখুড়ো তখনও বোধহয় মনে মনে সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দিচ্ছিলেন। তাই প্রথমটা উনি একটু থতমত খেয়ে গেলেন। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে বলতে শুরু করলেন, “গত মঙ্গলবার সকালে দোকান থেকে চারটে ডিম কিনে বাড়ি ফিরলাম। ডিমের ঠোঙাটা টেবিলের ওপরে রেখে খবরের কাগজে চোখ রাখলাম। টেবিলটার পিছনেই আমার ঘরের জানলা। একটুবাদে গিন্নি চা নিয়ে ঘরে ঢুকবার সময়ে ঐ জানলার দিকে তাকিয়ে ‘কে ওখানে’ বলে চেঁচিয়ে উঠল। আমি অবশ্য চোখ তুলে কাউকে দেখতে পেলাম না।

“যাই হোক, টেবিলে চা রেখে ডিমের ঠোঙাটা হাতে নিতেই গিন্নির কেমন একটা সন্দেহ হল। ঠোঙাটা খুলে দেখল তাতে শুধু চারটে ডিমের খোলা পড়ে আছে। আর যায় কোথায়! সঙ্গে সঙ্গে গজর গজর শুরু করে দিল। ওর বক্তব্য, আমি বেভ্রম বলে নাকি সমস্ত দোকানদার আমাকে ঠকিয়ে নেয়। সেদিন ডিমওলা নাকি আমাকে গোটা ডিমের বদলে ঐ ডিমের খোলাগুলোই বিক্রি করেছে। আর দাম দিয়ে আমি তা-ই কিনে এনেছি। এসব কথা শুনলে আর কারই বা মাথার ঠিক থাকে বলুন! আমি তাই তক্ষুনি চা-খবরকাগজ সব ফেলে রেখে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম।

“সবে ব্যাজারমুখে বাড়ির উঠানে এসে দাঁড়িয়েছি, এমন সময় কোথা থেকে যেন একটা খ্যাংড়াকাঠি মার্কা লোক আমার সামনে হাজির হল। তারপর ফিকফিক করে হাসতে হাসতে বলল, কী দাদা, বৌদির কাছে খুব ঝাড় খেয়েছেন বলে মনে হচ্ছে? ভাববেন না, সংসারে থাকলে অমন একটু আধটু হয়। সে যাক গে, যে কথা বলতে আসা। ডিম চারটে বেশ ভাল ছিল, যেমন সাইজ, তেমন স্বাদ। বহুদিন অমন ডিম খাইনি। এবার একদিন হাঁসের ডিম নিয়ে আসবেন তো। একথা বলেই ব্যাটা হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।”

এরপর একে একে রতন আর জীতেনখুড়োও তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা বললেন। সব শোনার পর পরেশবাবু সকলকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “আপনাদের কথা শুনে এটুকু পরিষ্কার যে ভূত একাধিক নয়, একটাই। আর সঙ্গে এটাও পরিষ্কার যে সে খাবারের সন্ধানেই মূলত এবাড়ি ওবাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু আমি যতদূর জানি, ওরা মড়া খেয়েই নিজেদের খিদে মেটায়। তাহলে হঠাৎ কেন মাছ-মাংস-ডিম খাচ্ছে সেটা ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। যদি ভূতটার সঙ্গে আমার একবার সাক্ষাৎ হত, তাহলে ওর এমন আচরণের কারণটা আমি জেনে নিতে পারতাম। যাই হোক, আপনাদের একটা কথা বলে রাখি, খুব বিপাকে না পড়লে কিংবা কোনও বিশেষ কারণ না থাকলে কিন্তু ওরা কখনও মানুষকে বিরক্ত করে না। তাই অযথা কেউ ভয় পাবেন না। আমি একটু খোঁজখবর নিয়ে দেখি কিছু করতে পারি কি না।”

জীতেনখুড়ো একথা শুনে বললেন, “তাহলে ও আমাদের বড়ো কোনও ক্ষতি করবে না বলছেন?”

“দায়িত্ব নিয়ে বলছি।” পরেশবাবু বেশ দৃঢস্বরে উত্তরটা দিলেন।

“আর ফারদার যদি আমাকে ভেংচি কাটে?” বলাই বাহুল্য, প্রশ্নটা আশিসদার।

পরেশবাবু আশিসদাকেও আশ্বস্ত করলেন, “ও হয়তো সেদিন আপনার ঘরে খাবারের সন্ধানে গিয়েছিল। কিন্তু কিছু না পেয়ে রাগের বশে আপনার সাথে অমন আচরণ করেছে। ও নিয়ে ভাববেন না।”

সেদিনকার মতো সভা ভঙ্গ হল।

।।তিন।।

ঐদিন সন্ধ্যাবেলা কিছু কাজ মিটিয়ে পরেশবাবু বাড়ি ফিরলেন। ওঁর স্ত্রী মেয়ের কাছে ক’দিনের জন্য বেড়াতে যাওয়ায় বাড়িটা ফাঁকাই ছিল। দরজার তালা খুলে পরেশবাবু ঘরে ঢুকলেন। চোখ গেল নিজের পড়ার ঘরের দিকে। দেখলেন সেখানে আলো জ্বলছে। তৎক্ষণাৎ হাজির হলেন সেখানে। দেখলেন একটা রোগাপটকা লোক তাঁর আরাম কেদারাটায় বসে এক মনে একটা গল্পের বই পড়ছে, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘সেই সময়’।

পরেশবাবুর আর বুঝতে বাকি রইল না যে এই মক্কেলই আসলে সেই ভূত যার কথা আজ সকালে আলোচনা হচ্ছিল। পরেশবাবু ভূতটাকে বেশ ঝাঁঝালো স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, “কী ব্যাপার, আপনি অনুমতি ছাড়াই আমার বইতে হাত দিয়েছেন যে!”

ভূতটা তো আর পরেশবাবুকে চেনে না। তাই সে ওঁকে ঘাবড়ে দেওয়ার জন্য উল্টে প্রশ্ন করল, “আপনার সদর দরজা বাইরে থেকে তালা লাগানো ছিল। তাহলে আমি আপনার ঘরের ভিতরে ঢুকলাম কীভাবে বলুন তো?”

“ভূতেরা যেভাবে ঢোকে। তা এনিয়ে অত গর্ব করার কী আছে?”

“যাঃ বাবা, তার মানে আপনি ভূতে ভয় পান না?”

“না, পাই না।”

“বুঝেছি। তা মানুষের কোনও ক্ষতি করার ক্ষমতা যে আমাদের আদৌ নেই, এই গূহ্য কথাটা জানলেন কী করে মশাই?”

“বেশি বাজে না বকে, এখানে কেন এসেছেন বলুন।”

“এসেছিলাম খাবারের খোঁজে। রান্নাঘরে কিছুই পেলাম না। বারান্দা দিয়ে যাওয়ার সময়ে এই ঘরের বুকশেলফটায় চোখ পড়ল, দেখলাম থরে থরে বই সাজানো। ‘সেই সময়’টাও আছে। ওটা পুরো শেষ করার আগেই অ্যাক্সিডেন্টটা হয়েছিল তো। তাই ভাবলাম সুযোগ যখন পেয়েছি বাকিটা পড়েই ফেলি। বেড়ে লিখেছে যা হোক।”

“কিন্তু ভূতেরা তো এভাবে নিজেদের আস্তানা ছেড়ে লোকের বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়ায় না। আপনার কি কোনও ভৌতিক সমস্যা আছে নাকি মশাই?”

“আপনি ঠিকই ধরেছেন। ভূত হওয়ার দিন থেকেই আমি একটা অভূতপূর্ব সমস্যায় পড়েছি।”

“কী সমস্যা আমায় বলুন। দেখি কিছু করতে পারি কি না।”

“বলতে পারি, তবে তার আগে আমাকে জানতে হবে আমাদের ভূত-জগৎ সম্পর্কে আপনি কতটা ওয়াকিবহাল। আসলে ভূত জীবনে আসার আগে তো অনেক মানুষের সাথে মিশেছি। তাদের বেশিরভাগই দেখেছি মুখে কেবল বড়ো বড়ো কথা বলে, কাজের বেলায় লবডঙ্কা। তাই…”

“বাব্বা! আপনি এমন ভাব করছেন যেন নিজের সমস্যার কথা বলে আমাকে কৃতার্থ করবেন। যাই হোক, ভূত-জগৎ সম্পর্কে আমার জ্ঞানগম্যি নিয়ে যখন আপনি সন্দেহ প্রকাশ করেইছেন, তখন বলি, অপঘাতে মৃত্যু হলে মানুষ ভূত হয়। ভূত হওয়ার পর কোনও একটা বড়ো গাছ অর্থাৎ বৃক্ষ হয় তার আস্তানা। সেখানেই সে দিবারাত্র থাকে। মাসে দু’টো মড়া পেলেই তার খিদে মিটে যায়। আর কোনও বিশেষ কারণ না থাকলে সে মানুষকে জ্বালাতন করে না।”

“আরে! আপনি তো আমাদের সম্পর্কে সবকিছুই ঠিকঠাক জানেন দেখছি। আসল কথাটা হচ্ছে, নিজের থাকার জায়গা পেয়ে গেলে কোনও ভূত সত্যিই মানুষকে বিরক্ত করে না। কিন্তু আমি ঐ থাকার জায়গাটাই পাইনি যে!”

“মানে! আপনি বলতে চাইছেন যে এই ভুবনডাঙায় যত বড়ো বড়ো গাছ আছে, তার সবক’টাই ইতিমধ্যে অন্য ভূতেরা দখল করে বসে আছে?”

“না, তা ঠিক নয়। অনেক গাছই ফাঁকা আছে। কিন্তু সেগুলোতে আমার চড়বার জো নেই। কারণ, নতুন ভূত আইন অনুযায়ী আমার জন্য কেবল শ্যাওড়াগাছই বরাদ্দ।”

“নতুন ভূত আইন মানে?”

“আগে কেউ ভূত হলেই তাকে আমাদের পুনর্বাসন দপ্তর থেকে এলাকা বলে দেওয়া হত। সে ঐ এলাকায় গিয়ে একটা পছন্দসই গাছ দেখে তাতে চড়ে বসত। কিন্তু গতবছর নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর তারা নতুন ভূত আইন বানিয়েছে। তাতে এলাকার সাথে গাছের নামও বলে দেওয়া হচ্ছে। আজকাল অপঘাতে মৃত্যুর সংখ্যা নাকি অনেক বেড়ে গেছে। তাই এই ব্যবস্থা।”

“তাই নাকি!”

“না হলে আর বলছি কী! অপঘাতে মৃত্যুরও আবার আলাদা তিনটে সেকশন হয়েছে – আত্মহত্যা, খুন ও দুর্ঘটনা। প্রতিটা সেকশনের আন্ডারে আবার একাধিক সাব-সেকশন। যেমন ধরুন, সেকশন আত্মহত্যার ক্ষেত্রে কেউ যদি গলায় দড়ি দিয়ে মরে তার জন্য বট-অশ্বত্থ বরাদ্দ, দড়ি-কলসি নিয়ে ডুবে মরলে সজনে-আমড়া, বিষ খেলে শাল-সেগুন – এইরকম আর কি। আবার সেকশন দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে, বাসে চাপা পড়লে নারকেল-সুপুরি, ট্রেনে কাটা পড়লে আম-কাঁঠাল…”

“আপনার মৃত্যু কীভাবে হয়েছিল?”

“ট্রামের ধাক্কায়। যেহেতু এরকম কেস খুব কম হয়, তাই আমার জন্য শুধু শ্যাওড়াগাছই বরাদ্দ।”

“কিন্তু গ্রামের উত্তরদিকের কালীমন্দিরটার পাশে তো একটা শ্যাওড়াগাছ আছে। আপনি ওটায় চড়ে বসছেন না কেন?”

“ওটাতেই তো চড়তে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমি আসার আগেরদিনই এক ছোকরা গাছটার দখল নিয়েছে। কলেজে পড়া ছেলে, জানেন! মোবাইলের হেডফোন কানে গুঁজে রাস্তা পার হচ্ছিল। দিয়েছে ট্রামে পিষে। তা হতভাগা মরলি তো মরলি, আমার আগেরদিনই মরলি! নতুন আইনে আবার একবৃক্ষে দু’জনের অবস্থান নিষিদ্ধ।”

“তাই আপনি কোথাও থাকার জায়গা না পেয়ে এবাড়ি ওবাড়ি চড়ে বেড়াচ্ছেন। সে নয় ঠিক আছে, কিন্তু মড়ার তো অভাব হয়নি। তাহলে গেরস্তের মাছ-মাংস নিয়ে পালাচ্ছেন কেন?”

“আরে সেটাও তো এই নতুন আইনের জন্য। ওতে বলা আছে নিজস্ব আস্তানা না থাকলে কেউ মড়া ছুঁতে পারবে না। দেখুন দিকি, কী সব্বনেশে আইন! আচ্ছা, গাছ আমার নেই বলে কি খিদেও থাকবে না?”

“সে তো ঠিকই। তা আপনার এলাকা কতটা?”

“পুনর্বাসন দপ্তর থেকে তো বলেছিল নন্দনপুর মৌজা। খবর নিয়ে জানলাম যে আপনাদের এই ভুবনডাঙাই নন্দনপুর মৌজার সিংহভাগ দখল করে আছে।”

“তা ঠিক। তবে এদিক ওদিক আরও কিছু জায়গা থাকতে পারে। আমাকে গ্রামের অন্যদের সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলতে হবে। সামনের ক’টাদিন আমি এখানে থাকব না। বড়োমেয়ের বাড়ি রানাঘাটে যাব। ফিরতে ফিরতে শনিবার বিকাল। আপনি বরং ঐদিন রাত আটটা নাগাদ আরেকবার আমার বাড়ি আসুন। আশাকরি আপনার সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।”

“ঠিক আছে। এখন যাই তাহলে?”

“হ্যাঁ, আসুন। ভালো কথা, আপনার নামটাই তো জানা হয়নি। বলতে বাধা নেই নিশ্চয়ই।”

“না না, নাম বলতে বাধা থাকবে কেন? আমার নাম হরিসাধন।”

“বাঃ, বেশ নাম। দেখবেন এই ক’টাদিন গ্রামের লোককে বেশি জ্বালাতন করবেন না যেন। আর কাউকে ভেংচি-টেংচিও কাটবেন না ভাই। আর ইয়ে, শুনুন, মুখে আপনার ওরকম খোঁচা খোঁচা দাড়ি কেন? আমার খুব অস্বস্তি হয়। সামনের শনিবার যখন আসবেন, অবশ্যই কামিয়ে আসবেন।”

“সে উপায় নেই। নিজের গাছ না থাকলে নতুন ভূত আইনে ধোপা-নাপিত সব বন্ধ।”

“এতো খুব জ্বালা হল দেখছি। কোন গাধারা এমন আইন বানিয়েছে কে জানে! ঠিক আছে, সামনের শনিবার আসুন। দেখি আপনার জন্য কী করতে পারি।”

হরিসাধন সেদিনকার মতো পরেশবাবুকে নমস্কার জানিয়ে চলে গেল।

।।চার।।

পরের শনিবার ঠিক সন্ধ্যা সাতটায় ভুবনডাঙার ভূতপীড়িতরা সবাই পরেশবাবুর বাড়ি হাজির হলেন। হরিসাধনের স্থায়ী আস্তানা পাওয়া নিয়ে যে সমস্যা তৈরি হয়েছে, সে বিষয়টা পরেশবাবু জানালেন সবাইকে। সব শুনে আশিসদা প্রশ্ন করল, “পরেশবাবু, আপনি এতটা সিওর হচ্ছেন কী করে যে নিজের পার্মানেন্ট হ্যাবিট্যাট পেয়ে গেলেই হরিসাধন আর আমাদের ডির্স্টাব মানে বিরক্ত করবে না?”

পরেশবাবু মৃদু হেসে জবাব দিলেন, “নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। আমি আগেও অনেকগুলো কেস দেখেছি যেখানে ভূতেরা মানুষকে নানাভাবে বিব্রত করত। কিন্তু তাদের নিজস্ব সমস্যা মিটে যেতেই তারা সেই উপদ্রব বন্ধ করে দিয়েছে এবং উল্টে মানুষের উপকারও করেছে।”

“উপকার করেছে! কী বলছেন আপনি?” এবার নিতাইখুড়ো প্রশ্নটা করলেন।

জবাবে পরেশবাবু বলতে শুরু করলেন, “ঠিকই বলছি। আপনাদের বরং জলভূতের ঘটনাটা বলি। তাহলেই সবকিছু আপনাদের কাছে জলের মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে।

“তখন আমি বারুইপুরে পোস্টেড। একদিন সকালে খবর পেলাম হোটরের কাছে একটা গ্রামে হঠাৎ ভূতের উপদ্রব শুরু হয়েছে। ভূতটা নকি ভোর থেকে একনাগাড়ে টিউবওয়েল পাম্প করে যাচ্ছে, কাউকে কাছে ঘেঁষতে দিচ্ছে না।

“তখনই ছুটে গেলাম সেখানে। অনেক চেষ্টা-চরিত্রের পর ভূতটার মনের কথা জানতে পারলাম। তার নাম ছিল পাঁচুগোপাল। জীবিত অবস্থায় সে ছিল একজন কুষ্ঠরোগী। গ্রামের লোক ভয়ে দীর্ঘদিন তাকে অচ্ছুত করে রেখেছিল। কেউ তাকে টিউবওয়েল ছুঁতে দিত না। তাই আগেরদিন রাত্রে অ্যাক্সিডেন্টে মৃত্যুর পর ভূত হওয়া মাত্রই সে কল পাম্প করে গতজন্মের আক্ষেপ মেটাচ্ছে।

“যাই হোক, আমি অনেক কষ্টে পাঁচুকে বোঝাতে সমর্থ হলাম যে কাজটা মোটেই সে ঠিক করছে না। এতে লোকে তাকে খারাপ ভাববে, মানবসমাজে ভূতেদের রেপুটেশনও নষ্ট হবে।

“পাঁচু আমার কথা বুঝল বটে, তবে টিউবওয়েলের হাতল ছাড়তে মোটেই রাজি হল না। তখন ঠিক হল, গ্রামের কেউ কল পাম্প করবে না। তাদের সকলের বালতি পাঁচুই ভরে দেবে। পরের দিকে শুনেছি, গ্রামের লোককে নাকি আর কলতলাতেও আসতে হত না। তারা ভোর হলেই নিজেদের দরজার বাইরে বালতি-কলসি সব রেখে দিত। পাঁচুই সেগুলোতে জল ভরে আবার যার যার দরজার সামনে রেখে আসত।”

পরেশবাবুর গল্পটা সকলেরই মনে ধরেছে বোঝা গেল। গোলকজ্যাঠা পরেশবাবুকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তাহলে হরিসাধনের জন্য একটা শ্যাওড়াগাছের ব্যবস্থা করতে পারলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে বলছেন?”

পরেশবাবুকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে গোবিন্দ বলল, “আচ্ছা, সামন্তদের ঐ মাঠটায় শ্যাওড়াগাছের একটা চারা পুঁতে দিলে হয় না?”

কথাটা শোনামাত্র জীতেনখুড়ো ভীষণ ক্ষেপে গেলেন। বললেন, “তোর যেমন বুদ্ধি! আজ চারা পুঁতবি, দশবছর পর সেটা বড়ো হবে, তারপর ভূতটা তাতে চড়ে বসবে। আর ততদিন আমাদের মাছ-মাংস ছেড়ে ডাঁটা চিবতে হবে, তাই তো?”

প্রস্তাবটা দেওয়া খুব ভুল হয়ে গেছে বুঝতে পেরে গোবিন্দ চুপ করে গেল। এই সময়ে রতন একটা কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু ঠিক তখনই পরেশবাবুর বিশাল দেওয়াল ঘড়িটায় ঢং ঢং করে আটটা বেজে উঠল। আর সঙ্গে সঙ্গে হরিসাধন হাজির হল তার খোঁচা খোঁচা দাড়ি নিয়ে।

।।পাঁচ।।

হরিসাধনের আগমন ঘটতেই সবাই চুপ করে গেল। জীতেনখুড়ো আশিসদার দিকে একটু সরে বসলেন। হরিসাধন পরেশবাবুকে উদ্দেশ্য করে বলল, “আপনার কথামতো আমি ঠিক আটটায় চলে এসেছি। সেদিন কিন্তু আপনি আমায় কথা দিয়েছিলেন যে আমার একটা আস্তানা খুঁজে দেবেন। এইভাবে আমি আর দিন কাটাতে পারছি না। টানা পাঁচদিন ইলিশ খেয়ে আমাশার মতো হয়ে গেল।”

হরিসাধনের কাঁদুনি শুনে পরেশবাবু ওকে হাত তুলে আশ্বস্ত করলেন। তারপর বাকিদের উদ্দেশ্যে বললেন, “আচ্ছা, নন্দনপুর মৌজার মধ্যে আর কোনও শ্যাওড়াগাছের হদিশ কি আপনাদের কাছে আছে?”

গোলকজ্যাঠা প্রশ্নটা শুনে খানিক মাথা চুলকে কী যেন ভাবলেন, তারপর ছেলেকে জিজ্ঞাসা করলেন, “আচ্ছা গোবু, তোর ছোটো মামা হরনাথ তো আমাদের পাশের গ্রাম মানে ঘুঘুডাঙায় থাকে। ওর বাড়ির পিছনে তো একটা শ্যাওড়াগাছ ছিল। তা ওদের এলাকাটা নন্দনপুর মৌজার মধ্যে পড়ে কি না জানিস?”

গোবিন্দ সেই মুহূর্তে কী যেন একটা বিষয় নিয়ে গভীর চিন্তামগ্ন ছিল। তাই সে বাবার প্রশ্নটা বোধহয় শুনতেই পেল না। উল্টে হরিসাধনকে জিজ্ঞাসা করল, “আচ্ছা, আপনার আমাশার মতো হয়েছে বললেন। সঙ্গে কি তলপেটে কিনকিনে ব্যথা আছে? আর একটু বেশি জলতেষ্টা পাচ্ছে? তাহলে চেলিডোনিয়াম মাদার রাত্রিবেলা শোবার আগে আধকাপ জলে দশফোঁটা ফেলে খেয়ে দেখতে পারেন।”

ছেলের এই মন্তব্য কিছুক্ষণের জন্য গোলকজ্যাঠাকে বাকরুদ্ধ করে দিল। তিনি শুধু মনে মনে নিজের পুত্রবধূ নয়নতারার অগাধ সহ্যশক্তির প্রশংসা করতে লাগলেন। ভাবলেন ভাগ্য করে তিনি অমন বৌমা পেয়েছেন। অন্য কেউ হলে এতদিনে নিশ্চয়ই তাঁর পাষণ্ড ছেলেটাকে ছেড়ে চলে যেত। হতচ্ছাড়া মর্কট এখন মানুষ ছেড়ে ভূতের চিকিৎসা করছে!

হরিসাধন কিন্তু চুপ থাকল না। সে বলল, “ওসব ওষুধে আমাদের কোনও কাজ হয় না।”

তারপর জীতেনখুড়োর দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, “এই তো আজ দুপুরে একমুঠো চিংড়ি খাওয়ার পর চোঁয়া ঢেকুর উঠছে দেখে ওর বাড়ি গিয়ে একপাতা ডাইজিন নিয়ে চিবোলাম। কই, কোনও উপকার হল না তো!”

হরিসাধনের কথা শুনেই জীতেনখুড়ো আঁক করে উঠলেন। পরেশবাবুর দিকে তাকিয়ে অনুযোগের সুরে বললেন, “দেখুন দিকি কাণ্ড! রাতবিরেতে যদি দরকার লাগে, তাই একপাতা ডাইজিন কিনে রেখে দিয়েছি। ব্যাটা পুরোটাই মেরে দিয়েছে! ভাগ্যিস কথায় কথায় ব্যাপারটা বলে ফেলল, না হলে তো জানতেই পারতুম না। ইস্‌, মুখটা কীরকম যেন টকটক লাগছে। এত রাত্তিরে আবার ওষুধের দোকানে ছুটতে হবে।”

নিতাইখুড়ো এতক্ষণে মুখ খুললেন। তিনি গোবিন্দকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “বাজে কথা না বলে গোলকদা তোকে যা জিজ্ঞাসা করল তার উত্তর দে। তোর ছোটোমামার বাড়ি কি নন্দনপুর মৌজার মধ্যে পড়ে?”

গোবিন্দ মাথা চুলকে জবাব দিল, “বছরখানেক আগে দোতলা করার সময় ছোটোমামা আমাকে একবার ওর জমির পরচাটা দেখিয়েছিল বটে। যতদূর মনে পড়ছে, ওটা নন্দনপুর মৌজার মধ্যেই পড়ে।”

“তাহলে তো প্রবলেম সলভড্‌ মানে সমস্যার সমাধান হয়েই গেল।” আশিসদা মন্তব্য করল।

জীতেনখুড়ো বললেন, “দ্যাখো ঐ গাছটা এখন আদৌ আছে কি না। কেটে ফেলাও তো হতে পারে। আবার কেউ ইতিমধ্যে দখল করেও নিতে পারে।”

পরেশবাবু একথা শুনে বললেন, “সেসব ব্যাপার এখন ভাবার দরকার নেই। গোলকবাবু আপনি হরিসাধনকে জায়গাটা ঠিক কোথায় সেটা বুঝিয়ে দিন। ও নিজে গিয়ে দেখে আসুক। তারপর না হলে অন্য ব্যবস্থার কথা ভাবা যাবে।”

গোলকজ্যাঠা তখন একেবারে ছবি এঁকে তাঁর ছোটোশালার বাড়ির অবস্থান বুঝিয়ে দিলেন। আর হরিসাধন তৎক্ষণাৎ ‘দুগ্গা দুগ্গা’ বলে নিজের বাসার খোঁজে বেরিয়ে গেল।

।।ছয়।।

পরেশবাবুর হিসাব মতো পাঁচ মিনিটের মধ্যেই হরিসাধনের ফিরে আসার কথা ছিল। কিন্তু ফিরতে ফিরতে সে প্রায় আধঘন্টা লাগিয়ে দিল। ওকে তখন আর চেনাই যাচ্ছে না। দাড়ি কামানোর ফলে মুখটা পুরো পাল্টে গেছে। ওকে দেখেই পরেশবাবু বেশ রাগের সুরে বলে উঠলেন, “থাকার জায়গা যে পেয়ে গেছেন সেটা তো আপনার মুখ দেখেই মালুম হচ্ছে। তা ফিরতে এত দেরি করলেন যে?”

হরিসাধন জবাবে বলল, “কিছু মনে করবেন না। আমি শ্যাওড়াগাছটাতে নিজের নেম প্লেটটা ঝুলিয়েই চলে আসছিলাম। কিন্তু পাশের বটগাছটাতে থাকা আমাদেরই এক জ্ঞাতিভাইয়ের ডাকে দাঁড়িয়ে পড়তে হল। ওর নাম সনাতন। একটা সেলুন দোকান ছিল। মেয়ের বিয়ে দেওয়ার পর দেনার দায়ে মাসদুয়েক আগে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। সনাতন খুব ভালো, বুঝলেন। দাড়িটা না কামিয়ে কিছুতেই ছাড়লে না। বলল, দাদা, এইভাবে আপনাকে ঘুরতে দেখলে আমার যে ভীষণ বদনাম হয়ে যাবে। লোকে ভাববে আমার কোনও আক্কেল নেই। এরপর কি আর না বলা যায় বলুন? ওখানে পাঁচটা মিনিট খেয়ে গেল।”

“আর বাকি বিশ মিনিট?” পরেশবাবুর প্রশ্নে তখন বিরক্তির সুর।

“বাকি সময়টা আমি ছিলাম আপনাদের গ্রামের ঐ উত্তরের বাঁশবনটায়।”

“ওখানে আপনি কী করছিলেন?”

“আসলে শর্টকাট হবে বলে ঐ পথে আসছিলাম। হঠাৎ দেখলাম বাঁশবনের ভেতর তিনটে লোক চাপা গলায় কী যেন একটা শলা-পরামর্শ করছে। কৌতূহলটা চাপতে পারলাম না। ভাবলুম একটু শুনেই যাই। ওখানেই বিশটা মিনিট খেয়ে গেল।”

“তা কী শুনলেন?”

“ওরা আজ রাতে আপনাদের গ্রামে মাধব রায় নামে কে একজন আছেন, তাঁর বাড়িতে ডাকাতি করবে। আজ দুপুরে মাধববাবুদের একটা জমি নাকি বিক্রি হয়েছে। পেয়েছেন প্রায় লাখ চারেক টাকা। শনিবার, ব্যাঙ্ক তাড়াতাড়ি বন্ধ হয়ে যায়। তাই সে টাকা আজ ব্যাঙ্কে জমা পড়েনি, রাখা আছে মাধববাবুর শোওয়ার ঘরের সিন্দুকে। ওরা আজ রাত বারোটা নাগাদ মাধববাবুর বাড়ির পিছনের পাঁচিল ডিঙিয়ে ঢুকবে। তিনজনের একজন অবশ্য পাঁচিলের বাইরে পাহারায় থাকবে। কোনও বিপদ বুঝলে বাঁশি বাজিয়ে সাবধান করে দেবে। আর বাকি দু’জন ভিতরে ঢুকে অপারেশন চালাবে।”

“আপনি ঠিক বলছেন?”

“আহা, খামোখা মিথ্যা বলতে যাব কেন? আপনারা আজ আমার এতবড়ো উপকার করলেন। আমি তো আর ইলিশ-হারাম নই, তাই বাঁশবনে বসে মশার কামড় খেতে খেতেও পুরো প্ল্যানটা শুনে তবে এলাম।”

একথা শুনে, বলাই বাহুল্য, সকলেই বেশ অস্থির হয়ে উঠল। রতন বলল, “তাহলে তো এখনই গিয়ে মাধবজ্যাঠাকে পুরো ব্যাপারটা জানানো দরকার।”

রতনের প্রস্তাব শুনে গোলকজ্যাঠা একেবারে হাঁ হাঁ করে উঠলেন। বললেন, “ভুলেও অমন কাজ করিস না রতন। জানিসই তো মাধবদা খুব ভীতু মানুষ। তার ওপর দু-দু’বার হার্ট অ্যাটাক হয়ে গেছে। ডাক্তারের কথামতো রোজ ঘুমের ওষুধ খেয়ে আটটার মধ্যেই শুয়ে পড়ে। এই অবস্থায় ঘুম ভাঙিয়ে ডাকাতির কথা জানাতে গেলে লোকটা নির্ঘাত হার্টফেল করেই মারা যাবে।”

এইসময়ে নিতাইখুড়ো একটা প্রস্তাব দিলেন। বললেন, “তাহলে বরং পুলিশে খবর দেওয়া যাক। ওরা এসেই ঐ তিন ডাকাতকে পাকড়াও করবে’খন।”

“তাহলেই হয়েছে। থানা কতদূর একবার ভাব তো! দিনেরবেলাই ওরা আসতে চায় না। আর এই রাত্তিরে এসে ওরা ডাকাত ধরবে! এখন থানায় গেলে তুমি ওদের কারুর আদৌ দেখা পাবে কি না সন্দেহ। তাই থানার ভরসা ছেড়ে দাও।” গোবিন্দ মন্তব্য করল।

“আচ্ছা, থানায় তো টেলিফোন আছে। একটা ফোন তো করা যেতেই পারে।” এই বলে পরেশবাবু থানার নাম্বার ডায়াল করলেন।

ওদিক থেকে একটা গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “হ্যালো, কে বলছেন?”

“আমি ভুবনডাঙা থেকে পরেশ চক্রবর্তী বলছি। একটু দারোগাবাবুকে দেবেন?”

“উনি তো সত্যনারায়ণের সিন্নি খেয়ে খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। কুড়ি-পঁচিশবার ইয়ে করে এখন হসপিটালে ভর্তি। স্যালাইন চলছে। আপনি যা বলার আমাকে বলতে পারেন। আমি থানার মেজবাবু শশধর চাকলাদার বলছি।”

“দ্যাখো কাণ্ড! আসলে আমাদের গ্রামের মাধব রায়ের বাড়িতে আজ রাতে ডাকাতি হবে। সে খবরটা জানানোর জন্যই ফোন করেছিলাম।”

“আরিব্বাস! কী যুগ পড়ল মাইরি! ডাকাত নিজের নামধাম সব জানিয়ে থানায় ফোন করে তারপর ডাকাতি করতে যাচ্ছে!”

“আহা, আমি ডাকাতি করতে যাব কেন? আমার কাছে একটা বিশ্বস্ত সূত্রে খবর এসেছে যে আজ রাত্রে মাধববাবুর বাড়িতে কয়েকটা ডাকাত হানা দেবে। সেটাই আপনাকে বলছিলাম।”

“তা আপনার বিশ্বস্ত সূত্রটি কে তা জানতে পারি?”

“না, সেটা ঠিক বলা যাবে না।”

“তাহলে কিছু করাও যাবে না।”

“আচ্ছা, তাহলে বলছি শুনুন। একটা অত্যন্ত দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন ভূত আমাদের এই খবরটা দিয়েছে।”

“কে দিয়েছে বললেন, একটা ভূত!”

“আজ্ঞে হ্যাঁ।”

“তাহলে আমাদের কাছে ঠিক খবরই ছিল। ভুবনডাঙার একটা পার্টে ইদানীং জোর গাঁজার চাষ হচ্ছে। দেখি, কাল সকালেই রেইড করতে হবে।”

“আমি গাঁজা খাই না।”

“সেটা কাল সকালেই বোঝা যাবে। যত্তোসব!” মেজবাবু ফোনটা রেখে দিলেন।

এই ফোনালাপের পর পরেশবাবু বেশ খানিকটা মুষড়ে পড়লেন। সকলের উদ্দেশ্যে বললেন, “পুলিশ তো আমার কথা বিশ্বাসই করল না। তাহলে কী করা যায় বলুন তো?”

আশিসদা বেশ উত্তেজিত স্বরে মন্তব্য করল, “আমরা যদি এখন সমস্ত ভিলেজারের কাছে ডাকাতির হোল ম্যাটারটা এক্সপোজ করে দিই মানে জানিয়ে দিই, তাহলে কেমন হয়?”

“তাহলে ডাকাতগুলোর কাছেও সে খবর পৌঁছে যাবে। সেক্ষেত্রে ডাকাতিটা আটকানো যাবে ঠিকই, কিন্তু শয়তানগুলোকে আর বোল্ড আউট করা যাবে না।” রতন কথাগুলো বলল।

“তাহলে তুই কী করতে বলিস, রতন?” গোলকজ্যাঠা জানতে চাইলেন।

রতন জবাবে বলল, “আসুন না, আমরাই সকলে মিলে ডাকাতগুলোকে পাকড়াও করি। সাহস আর বুদ্ধি করে এগোতে পারলে, আমার বিশ্বাস, এই টিম নিয়ে আমরা ঠিক ম্যাচটা বের করে নিতে পারব।”

রতনের এই আহ্বানে সবাই মনে দারুণ বল পেল, সঙ্গে জেগে উঠল নিজহাতে ডাকাত ধরার আকুল বাসনাও। সকলে সমস্বরে বলল, “তবে তাই হোক।”

পরেশবাবু বললেন, “যদিও রতন আমাদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ, তবুও ও-ই আজ আমাদের টিমের ক্যাপ্টেন। ও যেভাবে বলবে, আমরা সবাই সেভাবেই চলব।”

বাকি সবাই এই প্রস্তাবে সমর্থন জানাল।

এবার রতন বলল, “এখন প্রায় সাড়ে ন’টা বাজে। সবাই যে যার প্যাভেলিয়নে ফিরে যান। তাড়াতাড়ি খাওয়াদাওয়া সেরে একঘন্টার মধ্যে মাধবজ্যাঠার বাড়ির পিছনে যে কৃষ্ণচূড়া গাছটা আছে, তার তলায় চলে আসুন। কে কোন পজিশনে ফিল্ডিং করবেন, ওখানেই বলে দেব। আর হ্যাঁ, সবাই বাড়ি থেকে একগাছা শক্ত দড়ি নিয়ে আসবেন। আর পারলে এমন কোনও অস্ত্র যা দিয়ে অপোনেন্টকে আউট করা যায়।”

জীতেনখুড়ো জিজ্ঞাসা করলেন, “টর্চ লাগবে না?”

রতন বলল, “না, টর্চের কোনও দরকার নেই। আজ পূর্ণিমা। আকাশও একদম পরিষ্কার। চাঁদের আলোই ফ্লাড লাইটের কাজ করবে।”

গোলকজ্যাঠা আর গোবিন্দকে খেতে দিতে দিতে নয়নতারা পুরো ব্যাপারটা শুনে নিল। বর আর শ্বশুর ডাকাত ধরতে যাচ্ছে শুনে সে মনে মনে খুব উত্তেজিত হয়ে উঠল। খাওয়া শেষ হতেই সে গোবিন্দকে জিজ্ঞাসা করল, “হ্যাঁ গো, তুমি আজ কী অস্ত্র নেবে?”

গোবিন্দ সাথে সাথে আঙুল দেখিয়ে বলল, “ঐ বাক্সটা।”

জবাব শুনে তো নয়নতারার মাথাটা আবার গরম হয়ে গেল। সে মুখ বেঁকিয়ে বলল, “হুঁ, উনি হোমিওপ্যাথি ওষুধের বাক্স বগলে নিয়ে ডাকাত ধরবেন! যত্তোসব!”

তারপর আর একমুহূর্তও ওখানে না দাঁড়িয়ে সোজা চলে গেল রান্নাঘরে এবং সেখান থেকে শ্বশুরের কাছে।

।।সাত।।

ওরা বাপ-ব্যাটা যখন মাধব রায়ের বাড়ির পিছনের কৃষ্ণচূড়া গাছটার তলায় পৌঁছাল, তখন সেখানে একমাত্র রতন ছাড়া আর সবাই হাজির হয়ে গেছে। কিন্তু দেখা গেল কারুর হাতেই কোনও অস্ত্র নেই। একমাত্র পরেশবাবুর হাতে একটা ইয়া মোটা কাঠ-মলাটের এনসাক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা শোভা পাচ্ছে। তবে একগাছা করে দড়ি সবাই নিয়ে এসেছে।

মিনিট পাঁচেকের মধ্যে রতনও চলে এল। ওর হাতে তিনটে উইকেট। রতন বলল, “আপনারা দেখছি সবাই সাড়ে দশটা বাজার আগেই চলে এসেছেন। একটা কাজ সেরে এলাম বলে আমার সামান্য দেরি হয়ে গেল। এখন দশটা চল্লিশ। হাতে বেশি সময় নেই। আমি বরং গেমপ্ল্যানটা আপনাদের সঙ্গে আলোচনা করে নিই। এগারোটার মধ্যেই আমাদের ফিল্ডিং সাজিয়ে ফেলতে হবে।”

পরেশবাবু বললেন, “সেই ভাল, তোমার প্ল্যানটা আগে আমাদের ভালো করে বুঝিয়ে দাও।”

রতন তখন বলতে শুরু করল, “হরিসাধনের কথা অনুযায়ী ডাকাত আছে মোট তিনজন। তাদের মধ্যে যে একটু রোগা এবং বুড়ো মতন, সে বাইরে দাঁড়িয়ে পাহারা দেবে। আর বাকি দু’জন ষণ্ডামার্কা লোক পাঁচিল ডিঙিয়ে ভিতরে ঢুকবে। যে বাইরে থাকবে, তার কাছে কোনও অস্ত্র থাকবে বলেও মনে হয় না। আমাদের টিমে গোলকজ্যাঠা আর জীতেনখুড়োর বয়স সবচেয়ে বেশি। তাছাড়া পাঁচিল টপকানোও বোধহয় ওঁদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই ওঁরা থাকবেন ঐ গালি পজিশনে যে ঝোপটা আছে, ঠিক তার পিছনে। সুযোগ বুঝে ওঁরা বাইরের ডাকাতটাকে কাবু করবেন।”

এটুকু বলে রতন গোলকজ্যাঠা আর জীতেনখুড়োর দিকে তাকালো এবং ওঁরা দু’জন তার প্রস্তাবে সম্মতি জানালেন। তখন রতন খুশি মনে আবার বলতে শুরু করল, “আর আমরা বাকি পাঁচজন পাঁচিল ডিঙিয়ে ভিতরে ঢুকব। কিছুক্ষণ আগে, মানে পরেশবাবুর বাড়ি থেকে ফেরার পথে আমি এই পাঁচিলটায় উঠে ভিতরের পজিশনটা ভাল করে দেখে নিয়েছি। ওপাশে পাঁচিল টপকে নামলেই অনসাইডে একটা খড়ের গাদা আছে। তার আড়ালে লুকবো আমি আর আশিসদা। আর বাকি তিনজন অফসাইডে যে অ্যাসবেস্টস শিটটা দাঁড় করানো আছে, তার পিছনে গা ঢাকা দেবেন। সবাই মাথায় রাখবেন ডাকাতদু’টোকে আউট করতে হলে কিন্তু আমাদের সকলকে খুব ঠাণ্ডা মাথায় বোলিং আর ফিল্ডিং করতে হবে। একটা ছোট্ট ভুল হলেও কিন্তু ম্যাচটা আমাদের হাতের বাইরে চলে যেতে পারে।”

নিজের বক্তব্য শেষ করে রতন একটা করে উইকেট ধরিয়ে দিল জীতেনখুড়ো, আশিসদা আর গোবিন্দর হাতে। আর বলল, “দড়ি সঙ্গে নিতে কেউ ভুলবেন না কিন্তু। এগারোটা বেজে গেছে। চলুন যে যার পজিশন নেওয়া যাক।”

ইতিমধ্যে গোবিন্দ তার ওষুধের বাক্স খুলে ফেলেছে। একটা শিশি থেকে ড্রপারে করে ওষুধ তুলে প্রত্যেকের মুখে দশ ফোঁটা করে ফেলে দিল। বলল, “এটা আলফালফা, নার্ভ খুব স্ট্রং করে।”

তারপর সকলে গোল হয়ে দাঁড়াল কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে। মাঠে ফিল্ডিং করতে নামার আগে ক্রিকেটাররা যেভাবে একসাথে হাতে হাত রাখে, ওরাও সেইভাবে শপথ নিল আর সমস্বরে বলে উঠল, “আমরা লড়ব, আমরা ধরব।”

হরিসাধন যে সেইসময়ে ওপরে, কৃষ্ণচূড়ার ডালে বসে পা দোলাচ্ছে, তা অবশ্য ওরা কেউ খেয়াল করল না।

ঝোপের আড়ালে বসে গোলকজ্যাঠা আর জীতেনখুড়োর চিন্তার শেষ নেই। ঝোঁকের বশে রতনের প্রস্তাবে রাজি তো হয়ে গেছেন, কিন্তু কীভাবে ওঁদের ভাগের ডাকাতটাকে কাবু করবেন, তা কিছুতেই ভেবে পাচ্ছেন না। এদিকে সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। ঠিক এমন সময়ে হরিসাধন গাছ থেকে এক লাফে ওঁদের সামনে এসে দাঁড়াল। অনুযোগের সুরে বলল, “আপনাদের কাণ্ডজ্ঞানটা কীরকম মশাই? যে আপনাদের ডাকাতগুলোর খবর দিল, তাকে বাদ দিয়েই টিম গড়ে নিলেন?”

গোলকজ্যাঠা সঙ্গে সঙ্গে জিভ কেটে বললেন, “এটা একটা মস্ত ভুল হয়ে গেছে বটে। তা এখন তুমি কী করবে ভাই?”

“কী আর করব। হাত গুটিয়ে তো আর বসে থাকতে পারি না। আপনাদের তো কোচের পদটা খালি আছে। তাই ভাবছি আমি কোচিংয়ের দায়িত্বটাই নেব। আপনাদের কোনও আপত্তি নেই তো?”

“না না, আপত্তি থাকবে কেন? এ তো উত্তম প্রস্তাব। আমরা তো দু’জনে এতক্ষণ, কীভাবে আমাদের ভাগের ডাকাতটাকে জব্দ করা যায়, সেকথা ভেবেই নাজেহাল হয়ে যাচ্ছিলাম।”

“ভাবনাটা এবার কোচের ওপর ছেড়ে দিন। আমি যেমন টিপস্‌ দেব, সেভাবে বোলিং করবেন, দেখবেন উইকেট পড়তে বেশি সময় লাগবে না।” একথা বলে হরিসাধন ওঁদের দু’জনকে কোচিং করাতে শুরু করে দিল।

খানিকবাদেই পাঁচিলের ভিতর থেকে মশা মারার চটাস চটাস শব্দ আর সাথে ‘সাংঘাতিক মসকিউটো’, ‘ইনটলারেবল জ্বলুনি’ ইত্যাদি শব্দবন্ধগুলোও ভেসে আসতে লাগল। হরিসাধন আর একমুহূর্ত অপেক্ষা না করে সোজা চলে গেল পাঁচিলের ওপারে, আশিসদার একদম মুখের সামনে। বেশ ধমকের সুরেই বলল, “আঃ, এত শব্দ করছেন কেন? ডাকাতদের শ্রবণশক্তি কিন্তু ভূতেদের চেয়েও বেশি। ওরা তো মশাই একমাইল দূর থেকেই আপনাদের উপস্থিতি টের পেয়ে যাবে। তাহলে ডাকাত ধরবেন কীভাবে?”

হরিসাধনের কথায় আশিসদা খুবই লজ্জা পেয়ে গেল। জিভ কেটে বলল, “সরি, আর এরকম মিসটেক হবে না।”

।।আট।।

বারোটা বাজার সামান্য আগেই তিনখানা ছায়ামূর্তি চুপিসারে মাধব রায়ের বাড়ির পিছনে হাজির হল। লোকগুলোর চেহারা হরিসাধন যেমনটা বর্ণনা করেছিল, এক্কেবারে সেরকম। ওদের দু’জন গাঁট্টাগোঁট্টা মাঝবয়সী আর একজন রোগাসোগা, বয়স্ক। ওরা তিনজন প্রথমে চারদিকটা ভালো করে দেখে নিল। তারপর চাপাস্বরে নিজেদের মধ্যে সেরে নিল কিছু কথা। তারপর জোয়ান ডাকাতদু’টো পাঁচিল টপকে ভিতরে ঢুকে পড়ল।

মাধব রায় নিজের বাড়িটা বানিয়েছেন একটা বিশাল বাস্তুজমির ঠিক মাঝ বরাবর। তাই স্বভাবতই ঐ বাড়ির সামনে, পিছনে আর দু’পাশে অনেকটা করে জায়গা। ঐ ফাঁকা জায়গাগুলোতে বালগোপালের মন্দির, খড়ের গাদা, রান্নাঘর, বেল-সুপুরি-আম-কাঁঠাল ইত্যাদি নানা গাছ এবং অনেক হাবিজাবি জিনিস আছে। আর পুরো জমিটাই ঘেরা একটা ছ’ফুট লম্বা পাঁচিল দিয়ে।

ডাকাতদু’টো পাঁচিল টপকে ভিতরে ঢুকে প্রথম চারদিকটা একবার ভালো করে দেখে নিল। তারপর নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কথা বলতে লাগল। নির্জন রাত্রি। তাই তাদের বার্তালাপ শুনতে খড়ের গাদা বা অ্যাসবেস্টস শিটের পিছনে লুকনো লোকগুলোর কোনও অসুবিধা হল না।

একজন ডাকাত অন্যজনকে বলল, “তুই ডানদিকটা যা। ঐ মন্দিরটার ওপাশটা – সবটা ভালো করে দেখে নিবি। মনে তো হচ্ছে এখন আর কেউ জেগেটেগে নেই। তবুও একবার সবটা দেখে নেওয়া ভালো। আমি ঐ বাঁদিকটা দেখে আসছি। ওটা তো রান্নাঘর বলে মনে হচ্ছে।”

একথা শুনে দ্বিতীয় ডাকাতটা বলল, “ঠিক বলেছ সর্দার। ওপরে ওঠার আগে একবার পুরো জায়গাটা রেইকি করে নেওয়া ভাল। দু’দিকটা দেখে নিয়ে আমরা আবার এখানেই ফিরে আসব। তারপর দোতলায় ওঠা যাবে।”

অতঃপর দু’জন দু’দিকে পা বাড়াল।

পাঁচিলের বাইরে ঝোপের আড়ালে তখন গোলকজ্যাঠা আর জীতেনখুড়ো তাঁদের ভাগের ডাকাতটার ওপর কড়া নজর রেখে চলেছেন। তাঁরা লক্ষ করলেন ডাকাতটা কখনোই এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকছে না। অনবরত পায়চারি করছে। একবার তাঁদের ঝোপের দিকে আসছে, আবার উল্টোদিকে ফিরে যাচ্ছে। কীভাবে লোকটাকে আউট করতে হবে তার ব্লু-প্রিন্ট একটু আগেই হরিসাধন বানিয়ে দিয়েছে। এবার সেইমতো গোলকজ্যাঠা মুভ শুরু করলেন। ডাকাতটা যেই না ঝোপের দিকে এসে মুখ ঘুরিয়েছে, অমনি তিনি নিঃশব্দে লোকটার পিছু নিলেন। বেশ কয়েক পা যাওয়ার পর লোকটার কাঁধে আলতো করে হাত রেখে চাপা গলায় জিজ্ঞাসা করলেন, “আচ্ছা, এটা কি মাধব রায়ের বাড়ি?”

ডাকাতটা পিছন ফিরে হঠাৎ গোলকজ্যাঠাকে দেখে ভীষণ ঘাবড়ে গেল। তবে জ্যাঠার আসল মতলবটা সে মোটেই ঠাওর করতে পারল না। নিমেষে নিজেকে সামলে নিয়ে সে বেশ কড়া সুরেই পাল্টা প্রশ্ন করল, “এত রাত্তিরে আপনি হঠাৎ মাধব রায়ের খোঁজ করছেন কেন? আপনার মতলবটা কী মশাই?”

গোলকজ্যাঠার তখন দু’টো হাতই ছিল পাঞ্জাবির পকেটে। প্রশ্নটা শোনামাত্র তিনি তাঁর বাঁ হাতটা পকেট থেকে বের করে আনলেন। তাতে শোভা পাচ্ছে একটা বড়ো সোনার আংটি। সেটা ডাকাতটাকে দেখিয়ে তিনি বললেন, “এটা মাধববাবুকে দেওয়ার ছিল। তাই ওঁর খোঁজ করছিলাম।”

অত দামি আংটিটা দেখে ডাকাতটার বোধবুদ্ধি সব লোপ পেয়ে গেল। এই রাত বারোটার সময় একজন বয়স্ক ভদ্রলোক কেন মাধববাবুকে আংটি ফেরত দিতে এসেছে, তা সে ভেবে দেখল না। সে শুধু ভাবল, এ তো ভারি মজা! তারা এসেছে মাধব রায়ের টাকা লুঠ করতে। সঙ্গে যদি সোনার আংটিটাই ফোকটে পাওয়া যায়, তাহলে তো মন্দ হয় না। এ যেন ঠিক গাছে ওঠার আগেই এককাঁদি। তাই সে সঙ্গে সঙ্গে হাসিমুখে বলল, “মাধব রায় আমার দাদা। তিনি বাড়ি নেই। আপনি ওটা আমায় দিতে পারেন। আমি দাদাকে দিয়ে দেব।”

গোলকজ্যাঠা যেন ঠিক এমনটাই চাইছিলেন। তিনি তাই সঙ্গে সঙ্গে বললেন, “তাহলে তো খুব ভাল হয়। আমি দায়মুক্ত হই। এই নিন আংটিটা।”

এই বলে আংটিটা ডাকাতটার হাতে দিতে গিয়ে ইচ্ছা করে সেটা মাটিতে ফেলে দিলেন। লোকটা সেটা কুড়োবার জন্য যেই না নিচু হয়েছে, অমনি গোলকজ্যাঠা চকিতে তাঁর ডানহাতটা পকেট থেকে বের করে আনলেন। হাতের মুঠোয় ছিল একগাদা লঙ্কাগুঁড়ো। সেটা ঘষে দিলেন ডাকাতটার দু’চোখে। বৌমা নয়নতারা তাঁকে বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে লংকা গুঁড়োটা দিয়ে দিয়েছিল।

ডাকাত বাবাজির তো তখন নাজেহাল অবস্থা। সে ভীষণ জ্বালায় ‘উফ’ বলে দু’চোখ বন্ধ করে উবু হয়ে বসে পড়ল। আর সেই অবস্থাতেই প্যান্টের পকেটে হাত ঢোকাতে গেল বাঁশিটা বের করবে বলে। কিন্তু ইতিমধ্যে ঘটনাস্থলে জীতেনখুড়ো উপস্থিত হয়েছেন। তিনি লোকটার হাতে সজোরে উইকেটের বাড়ি মারলেন। তাতেই লোকটা টাল সামলাতে না পেরে চিৎ হয়ে মাটিতে পড়ে গেল।

আর যায় কোথায়। গোলকজ্যাঠা এতটুকু সময় নষ্ট না করে এবার চেপে বসলেন ডাকাতটার পেটের ওপর। জ্যাঠার তিনমণি দেহ। ফলে ডাকাতটার তখন দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার অবস্থা, জিভ বেরিয়ে যাওয়ার জোগাড়। সে কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না।

হরিসাধন একটু দূরে দাঁড়িয়ে পুরো ব্যাপারটা পর্যবেক্ষণ করছিল। সে এবার জীতেনখুড়োকে টিপস দিল, “কী হল! আপনি আবার দাঁড়িয়ে রইলেন কেন? পকেট থেকে শিশিটা বের করুন।”

জীতেনখুড়ো তৎক্ষণাৎ কোচের নির্দেশ পালন করলেন। ঐ শিশিতে ছিল কালমেঘের রস। ইতিমধ্যে ডাকাতটা বাঁচবার একটা মরিয়া চেষ্টা হিসাবে চিৎকার করার উপক্রম করছিল। সেই সময়ে জীতেনখুড়ো তার মুখে শিশিটা ঢুকিয়ে দিলেন। তারপর দু’হাত দিয়ে চেপে ধরলেন তার নাক। ফলে লোকটা কোঁৎ করে পুরো রসটা খেয়ে ফেলতে বাধ্য হল।

একে তো লঙ্কার ঝালে লোকটার চোখদু’টো জ্বলে যাচ্ছিল। তার ওপর ঐ বিকট তেতো রস। বেচারির তখন পাগল হয়ে যাওয়ার হাল। ডাকাতটা একেবারে কাহিল হয়ে পড়ল। দড়ি তো সঙ্গে ছিলই। গোলকজ্যাঠা আর জীতেনখুড়ো এবার তার হাত-পা-মুখ কষে বেঁধে ফেললেন। ঐ অবস্থায় সে বেচারি চোখ বুজে তেতো মুখে চুপচাপ শুয়ে রইল, আর মনে মনে ভাবতে লাগল নিশ্চয়ই কোনোভাবে সে নরকে এসে পৌঁছেছে। না হলে এত খারাপ হাল আর কোথাও হওয়া সম্ভব নয়।

ডাকাতটা কাবু হয়ে যেতেই হরিসাধন গিয়ে দাঁড়াল গোলকজ্যাঠা আর জীতেনখুড়োর সামনে। বলল, “ওয়েল ডান। আপনারা দু’জনেই আজ দারুণ খেলেছেন। টিমের বাকিরাও যদি আপনাদের মতো খেলতে পারে, তাহলে আমাদের জয় নিশ্চিত।”

ওদিকে পাঁচিলের ভিতরে তখন আশিসদা এক কাণ্ড ঘটিয়ে বসল। যে ডাকাতটা মন্দিরের দিকটা দেখতে গিয়েছিল, উইকেট হাতে তার পিছু নিয়েছিল আশিসদা। রতন তাকে বলেছিল খুব সন্তর্পণে লোকটাকে অনুসরণ করতে। কিন্তু অতিরিক্ত জোশের বশে আশিসদা একটু জোরেই পা চালাল। প্ল্যানটা ছিল আশিসদা পিছন থেকে সজোরে ডাকাতটার ঘাড়ে আঘাত করবে, আর তাতে সে খানিকটা ঘায়েল হয়ে গেলেই রতন তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে।

uponyasbhubondanga06কিন্তু লোকটা তো পেশাদার ডাকাত। সে ঠিক বুঝে ফেলল কেউ তার পিছু নিয়েছে। তাই সে দ্রুতপায়ে মন্দিরটা পার হয়েই হঠাৎ বাঁদিকে ঘুরে একটা থামের আড়ালে সেঁধিয়ে গেল। লোকটা হঠাৎ চোখের আড়ালে চলে যাওয়ায় আশিসদা পড়ে গেল মহাফাঁপরে, কী করবে ঠিক ভেবে পেল না। খানিকটা ইতস্তত করে সে মন্দিরটা পার হয়ে এগিয়ে গেল সামনের দিকে। আর ঠিক তখনই লোকটা আশিসদাকে পিছন থেকে জাপটে ধরে একটা  ঠেকিয়ে ধরল তার গলায়।

এমন অতর্কিত আক্রমণে আশিসদা একেবারে দিশেহারা হয়ে গেল। ভয়ে খসে পড়ল তার হাতের উইকেটটা। ডাকাতটা এবার চাপা স্বরে বলল, “চোরের ওপর বাটপাড়ি করতে এসেছিস? দেখাচ্ছি মজা। তোর সঙ্গে আর কে কে আছে বল।”

আশিসদা তখন কাঁপা কাঁপা গলায় জবাব দিল, “বিহেভ ইয়োরসেলফ, মানে ভদ্রভাবে কথা বলুন। আমি মোটেই থিফ-ডেকয়েট মানে কোনও চোর-ডাকাত নই।”

একথা শুনে ডাকাতটা বলল, “আরিব্বাস! আবার ইংরাজি বলছে!”

তারপর ছুরিটা দিয়ে আশিসদার গলায় একটা আলতো চাপ দিয়ে বলল, “এক্ষুনি নলিটা কেটে দেব। তখন সব ইংরাজি বেরিয়ে যাবে। তোর সঙ্গে আর কে কে আছে বল।”

আশিসদা তখন মৃতপ্রায়। গলার ওপর ধারালো ছুরিটা চকচক করছে। কী বলবে, কী করবে, কিছুই ভেবে পাচ্ছে না। এই অবস্থায় হঠাৎই একটা ‘ফট’ শব্দ তার কানে এল। আর সাথে সাথে আশিসদা অবাক হয়ে লক্ষ করল যে ডাকাতটার হাত থেকে ছুরিটা খসে পড়েছে এবং লোকটাও তাকে ছেড়ে আস্তে আস্তে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে।

uponyasbhubondanga08ঘটনা কী ঘটেছে সেটা বুঝে ওঠার আগেই সেখানে হাজির হল রতন। সে মাটি থেকে একটা লাল ডিউস বল তুলে নিয়ে চাপা স্বরে বলল, “রান আউট! আমি কিনা বাউন্ডারি লাইনের ধার থেকে বল তুলে উইকেট ছিটকে দিই। আর এ তো মাত্র বিশ ফুট ডিসট্যান্স। দ্যাখো আশিসদা, ডাকাতটার ঠিক রগে মেরেছি। তাই ও এক হিটেই নক আউট হয়ে গেছে।”

আশিসদার বিস্ময়ের ঘোর তখনও কাটেনি। সে ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করল, “হ্যাঁ রে রতন, লোকটা মরে যায়নি তো?”

রতন তৎক্ষণাৎ ডাকাতটার নাকের কাছে হাত রেখে বলল, “আরে না না। এই তো দিব্যি নিঃশ্বাস পড়ছে। চল, তাড়াতাড়ি ওকে বেঁধে ফেলি। তারপর দেখি ওদিকে গোবিন্দদারা কোনও বিপদে পড়ল কি না।”

।।নয়।।

গোবিন্দ সত্যিই তখন বড়ো বিপদে পড়েছে। সে উইকেট হাতে যার পিছু নিয়েছিল, সে-ই ছিল এই ডাকাত দলটার সর্দার। লোকটার কাছে একটা গুলিভর্তি পিস্তল ছিল। কেউ যে তার পিছু নিয়েছে সেটা বুঝতে সর্দারের অসুবিধা হয়নি। তাই রান্নাঘরটা পেরিয়ে বেলগাছটার তলায় পৌঁছেই সে হঠাৎই উল্টোদিকে ঘুরে দাঁড়াল। বেচারি গোবিন্দ তখন উইকেটটা তুলে ধরেছিল ডাকাতটাকে মারবে বলে। পিস্তল দেখে তার হাত থেকে উইকেটটা পড়ে গেল। সর্দার তখন ওর মাথায় পিস্তলটা ধরে বলল, “আমাকে ঘায়েল করতে এসছিস? মজা দেখাচ্ছি। তোর সাথে আর কে কে আছে বল। না হলে এক্ষুনি এক গুলিতে মাথার খুলি উড়িয়ে দেব।”

এরকম বিপদে গোবিন্দ আগে কোনোদিন পড়েনি। পিস্তল দেখেই সে হাতদু’টো ওপরে তুলে থরথর করে কাঁপতে লাগল। মুখ দিয়ে অবশ্য একটা কথাও বের হল না। তবে মনে মনে ভাবতে লাগল, হোমিওপ্যাথি ওষুধে আজকাল নিশ্চয়ই খুব ভেজাল মেশাচ্ছে। না হলে দশ ফোঁটা আলফালফা খাওয়ার পরেও এত কাঁপুনি হবে কেন!”

ডাকাত সর্দারটাকে দেখার পর থেকেই নিতাইখুড়ো হঠাৎ কেমন যেন গুম মেরে গিয়েছিলেন। সম্ভবত খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু গোবিন্দর ঐ বিপদ দেখে তিনি আর স্থির থাকতে পারলেন না। অ্যাসবেস্টস শিটের আড়াল থেকে বেরিয়ে তেড়েফুঁড়ে এগিয়ে গেলেন ডাকাত সর্দারের দিকে। বেশ কড়া গলায় বললেন, “তোমাকে এই গ্রামে আগে কোনোদিন দেখিনি। তুমি গোবিন্দকে ধমকাচ্ছ কোন সাহসে? এক্ষুনি ওকে ছেড়ে দাও বলছি।”

তাকে পিস্তল হাতে দেখেও যে একটা বুড়ো লোক এভাবে ধমকাতে পারে, তা যেন ডাকাত সর্দার বিশ্বাসই করতে পারছিল না। সে তাই এবার পিস্তলের নলটা নিতাইখুড়োর দিকে তাক করে, গোল গোল চোখে গোবিন্দকে জিজ্ঞাসা করল, “এই বুড়োটা কে রে? কোনও পাগল-টাগল নাকি?”

ব্যস, আর যায় কোথায়! পাগল শব্দটা শুনেই নিতাইখুড়োর মাথায় যেন রক্ত চড়ে গেল। তিনি তৎক্ষণাৎ ডাকাতটার দিকে আরও কয়েক পা এগিয়ে গেলেন। তারপর চোখ বড়ো বড়ো করে বললেন, “আমায় পাগল বলা? আবার খেলনা বন্দুক দিয়ে ভয় দেখানো? দেখাচ্ছি মজা!” এই বলে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ডাকাত সর্দারের গালে সপাটে মারলেন এক চড়।

সর্দারের চেহারা রীতিমত শক্তপোক্ত। কিন্তু খুড়োর ঐ চড় খেয়ে তার মাথাও ঝিমঝিম করতে লাগল, কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন চোখের সামনে ভেসে উঠল একরাশ সরষে ফুল। তবে সামান্য বাদেই সে নিজেকে সামলে নিল। রাগে তখন সর্দারের সমস্ত শরীর কাঁপছে। অপমানের বদলা নিতে সে ট্রিগারে আঙুল রাখল। এ দৃশ্য দেখে গোবিন্দের হাড় হিম হয়ে এল। সে ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল। তার আর বুঝতে বাকি রইল না যে এবার নিতাইখুড়োর ভবলীলা সাঙ্গ হতে চলেছে। এই সময়ে গোবিন্দর কানে এল একটা ‘ঠকাস’ শব্দ, আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ‘বাবা গো’ বলে আর্তনাদ। কিন্তু শব্দটা গুলির নয়, আর কণ্ঠস্বরটাও নিতাইখুড়োর নয়। তাহলে কী ব্যাপার?

গোবিন্দ এবার সাহস করে চোখ খুলল। দেখল, ডাকাত সর্দার তার ডানহাতের কব্জিটা ধরে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে আর একটু দূরেই তার পিস্তলটা পড়ে আছে। তবে সর্দারও সহজে হার মানার পাত্র নয়। হাতের ব্যথাটা সাময়িক সামলে নিয়েই সে দু’পা এগিয়ে বাঁহাতে পিস্তলটা তুলতে গেল। কিন্তু সেটার কাছে পৌঁছানর আগেই একটা বিশাল আকৃতির কাঠ-মলাটের বই সাঁই করে উড়ে এসে সপাটে লাগল তার মুখে। এই ধাক্কা সামলে ওঠার ক্ষমতা সর্দারের ছিল না। সে চোখে অন্ধকার দেখে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। পরেশবাবু বইটা নিজের হাতে তুলে নিয়ে লোকটাকে পরীক্ষা করে বললেন, “ব্যাটা মূর্ছা গেছে। পেটে তো একফোঁটা বিদ্যে নেই। ও কি আর এনসাইক্লোপিডিয়ার ধাক্কা সামলাতে পারে। গোবিন্দ ওকে তাড়াতাড়ি বেঁধে ফেল।”

।।দশ।।

ইতিমধ্যে সেখানে রতন আর আশিসদাও হাজির হয়েছে। সকলে মিলে ওরা ডাকাত সর্দারকে পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলল। পরেশবাবু নিতাইখুড়োর পিঠ চাপড়ে বললেন, “সাবাস নিতাইবাবু! আজ আপনি অসীম সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। তবে অতটা ঝুঁকি বোধহয় না নিলেই পারতেন।”

uponyasbhubondanga07নিতাইখুড়ো অবশ্য কোনও মন্তব্য করলেন না। শুধু ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলেন পরেশবাবুর দিকে। এইসময়ে হরিসাধন বেলগাছটা থেকে টপাস করে নেমে এল। পরেশবাবুকে বেশ অনুযোগের সুরে বলল, “আপনি শুধু একা নিতাইবাবুকেই বাহবা দিচ্ছেন। আর আমি যে অত উঁচু থেকে কাঁচা বেল ছুঁড়ে একটিপে ডাকাত সর্দারের হাতের পিস্তলটা ছিটকে দিলাম, কই, সে বিষয়ে তো কিছু বলছেন না?”

পরেশবাবু সঙ্গে সঙ্গে বললেন, “সে আর বলতে। আপনি না থাকলে আজ আমাদের দুর্গতির শেষ থাকত না। নিতাইবাবু এতক্ষণে নিশ্চয়ই ভূত হয়ে যেতেন।”

“তাহলেই বুঝুন, কোচ ছাড়া খেলতে নামার কী অসুবিধা।” হরিসাধন মন্তব্য করল।

রতনকে বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছিল। সে বলল, “বাইরে গোলকজ্যাঠারা কী করছেন কে জানে। এক্ষুনি একবার দেখা উচিত।”

হরিসাধন সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, “ওঁদের নিয়ে ভাবতে হবে না। অনেক আগেই ওঁরা পাহারাদার ডাকাতটাকে কাবু করে ফেলেছেন। অবশ্য গেমপ্ল্যানটা আমারই ছিল।”

কথাটা শুনেই রতন এক লাফে পাঁচিলে চড়ে বসল। দেখল গোলকজ্যাঠা বুড়ো ডাকাতটার চোখে জলের ঝাপটা দিচ্ছেন।

পরেশবাবু এবার রতনকে জিজ্ঞাসা করলেন, “ক্যাপ্টেন, এখন কী করা হবে? এই তিনটে ডাকাতকে তো পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া উচিত।”

অশিসদা বলল, “শয়তানগুলোর এক্সজামপিলারি পানিশমেন্ট মানে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া দরকার।”

রতন বলল, “সে তো নিশ্চয়ই। কিন্তু সকাল না হলে তো কিছু করা সম্ভব নয়। আজ রাতটা এদের কড়া পাহারার মধ্যে রাখতে হবে। আমি এখানে আসার আগে আমার টিমের একটা ছেলেকে খবর দিয়ে এসেছি। ও গোটা টিম নিয়ে চলে এল বলে। পাহারা দেওয়ার কাজটা ওরাই করবে। আমিও অবশ্য ওদের সঙ্গে থাকব।”

রতনের কথা শেষ হতে না হতেই গোটা দশেক ছেলে লাঠিসোঁটা নিয়ে হাজির হয়ে গেল। রতন তাদের কীভাবে শোরগোল না করে ডাকাতগুলোকে পাহারা দিতে হবে, তা বুঝিয়ে দিতে লাগল।

একে একে পরেশবাবুরা পাঁচিল টপকে বাইরে এলেন। তারপর জীতেনখুড়ো আর গোলকজ্যাঠাকে নিয়ে বাড়ির পথ ধরলেন। যেতে যেতে গোলকজ্যাঠা বললেন, “যাক বাবা, সব ভালোয় ভালোয় মিটে গেল। আমার তো খালি ভয় লাগছিল, মাধবদার ঘুম না ভেঙে যায়।”

তারপর হরিসাধনকে উদ্দেশ্য করে তিনি বললেন, “আমি আমাদের সকলের পক্ষ থেকে আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আপনার সাহায্য ছাড়া আজ কোনোমতেই আমাদের পক্ষে এই অসাধ্য সাধন সম্ভব হত না।”

জ্যাঠার মুখে একথা শুনে হরিসাধন বলল, “আমাকে নিজের একটা স্থায়ী আস্তানা খুঁজে দেওয়ার জন্য আপনাদেরও অসংখ্য ধন্যবাদ। গত দু’সপ্তাহ ধরে আপনাদের অনেক জ্বালাতন করেছি। তবে কথা দিচ্ছি, আর কোনোদিন আপনাদের জ্বালাতে আসব না।”

এই বলে সে সাঁই করে পালেদের কার্নিশে গিয়ে বসে পড়ল। তারপর পায়ের ওপর পা তুলে একটা সিগারেট ধরিয়ে মৌজ করে টানতে লাগল।

ওখানে উপস্থিত প্রায় সবাই এতদিন হরিসাধনের উপদ্রবে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, সে আর কোনোদিন আসবে না শুনে সকলের মনই খুব খারাপ হয়ে গেল। ব্যাপারটা লক্ষ করে পরেশবাবু বললেন, “দেখলেন তো, আমি কী বলেছিলাম? ভূতেরা মোটেই খারাপ নয়। আসলে মানুষ থেকেই তো ভূতের সৃষ্টি। তাই খামোখা ভূতেরা তাদের সৃষ্টিকর্তার ক্ষতি করবে কেন বলুন।”

উপস্থিত সকলেই পরেশবাবুর বক্তব্যকে সমর্থন জানালেন। এবার আশিসদা বলল, “আজকের রাতটা আমার জীবনের একটা মেমরেবল নাইট মানে স্মরণীয় রাত্রি হয়ে থাকবে।”

গোবিন্দ বলল, “ঠিক বলেছ আশিসদা।” তারপরই হঠাৎ মাথায় হাত দিয়ে বলল, “এই যাঃ! ডাকাত ধরার আনন্দে ওষুধের বাক্সটাই ফেলে এসেছি। যাই ওটা নিয়ে আসি।”

গোলকজ্যাঠা সঙ্গে সঙ্গে ওর হাতটা চেপে ধরলেন। বললেন, “যথেষ্ট হয়েছে। এখন আর ঐ বাক্স আনতে গিয়ে কাজ নেই। তোর ঐ বাক্স কেউ ছুঁয়েও দেখবে না। কাল সকালে নিয়ে এলেই চলবে।”

জীতেনখুড়ো সঙ্গে সঙ্গে বললেন, “গোলকদা ঠিকই বলেছে। এখন চ, তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে যাই। আমার আবার তলপেটটা একটু কিনকিন করছে। কাল সকালেই আবার থানকুনির রস করে খেতে হবে।”

ডাকাত সর্দারকে চড়টা মারার পর থেকে নিতাইখুড়ো একটাও কথা বলেননি। এতক্ষণে তিনি মুখ খুললেন। বললেন, “সবই তো বুঝলাম, কিন্তু এত রাত্তিরে আমরা সাতজন কেন খামোখা মাধবদার বাড়ি গিয়েছিলাম, আর ঐ ষণ্ডামার্কা লোকটা কেন হঠাৎ বন্দুক নিয়ে গোবিন্দকে ভয় দেখাচ্ছিল, সেটাই ঠিক আমার মাথায় ঢুকছে না। আর…”

গোলকজ্যাঠা আর নিতাইখুড়োকে কথা বাড়াতে দিলেন না। মুচকি হেসে বললেন, “এত রাত্তিরে তোর আর ওসব মাথায় ঢুকিয়ে লাভ নেই। এই যে তোর বাড়ি এসে গেছে। সোজা গিয়ে শুয়ে পড়। কাল সকালে দেখবি সব বুঝতে পারছিস।”

এতক্ষণ আকাশে একফোঁটা মেঘ ছিল না। কিন্তু হঠাৎই কোথা থেকে যেন একখণ্ড মেঘ এসে চাঁদটাকে ঢেকে দিল। নিভে গেল ফ্লাড লাইট। কিন্তু তাতে কী? খেলা তো আগেই শেষ হয়ে গেছে।

ছবিঃ মৌসুমী

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s