উপন্যাস

uponyas02 (Medium)

লোহার জং ধরা গেটটাতে হাত রেখে ঘাড় উঁচু করে পুরোনো বাড়িটাকে দেখছিল অভি। বাড়িটা পূবমুখো, সকালের রোদের তাই অবাধ যাতায়াত বাড়িটার ভেতরে, বাইরে। পুরোনো বাড়ি। হ্যাঁ, এই নামেই সবাই জানে বাড়িটাকে। অন্তত অভি তার মা, দিদা, দাদু, মামা, মামীদের কাছে এই নামই শুনে এসেছে। পুরোনো বাড়িতে থাকতেন কে? বুড়োদাদু মানে অভির মার ঠাকুর্দা যিনি প্রায় একশো বছরের কাছাকাছি এসে এই ক’দিন আগে মারা গেছেন।

অভি একবার ছোটোবেলায় বুড়োদাদুকে জিজ্ঞেস করেছিল, “তোমার বাড়িটাকে সবাই পুরোনো বাড়ি বলে কেন?”

বুড়োদাদু হো হো করে হেসে উঠেছিলেন, বলেছিলেন, “আমাকে তোরা সবাই বুড়োদাদু বলিস কেন বল তো? আমি বুড়ো বলে। বুড়ো মানেই তো পুরোনো। আমিও পুরোনো, আমার বাড়িও পুরোনো।”

ছোটোবেলায় যুক্তিটা বেশ মনঃপূত হলেও বড়ো হয়ে অভি বুঝেছিল কারণটা অন্য। এই অঞ্চলে এককালে বুড়োদাদুর বাপ, ঠাকুর্দাদের ভালোই জমিজমা ছিল, প্রভাব প্রতিপত্তিও ছিল। বাড়িটা নাকি সেই সময়ের। বুড়োদাদু তাকে যথাযোগ্য সংস্কার করে ভালোভাবে টিঁকিয়ে রেখেছিলেন। সেইজন্যেই বোধহয় পুরোনো বাড়ি নাম। অবশ্য আদ্যিকালের বাড়ির এর থেকে উপযুক্ত নাম আর কীই বা হতে পারে। পুরোনো বাড়ি বুড়োদাদুর খুব প্রিয় ছিল। বয়স হয়েছিল, ছেলেমেয়েরা তো কবেই নানান দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছে, কেউ কাছে থাকত না, বুড়োদাদু কিন্তু পুরোনো বাড়ি ছেড়ে নড়েন নি, হাজারবার বলা সত্ত্বেও। না বাড়ি বিক্রি করেছেন, না এখানে বসবাসের পাট তুলেছেন। জীবনের শেষ মুহূর্ত অবধি তো এখানেই রয়ে গেলেন।

পুরোনো বাড়ি দেখতে দেখতে এসবই ভাবছিল অভি। এর আগে একবার গরমের ছুটিতে এখানে এসেছিল অভি। তখন বেশ ছোটো ছিল। বুড়োদাদুও বেশ শক্ত সমর্থ ছিলেন। মুগুর ভাঁজা চেহারা ছিল ওনার। অভিকে নিয়ে পুকুরে সাঁতার কাটতে যেতেন, ঘুড়ি ওড়াতেন, আরো কত কী! ঘুড়ির সুতোর কতরকম মাঞ্জা শিখিয়ে দিয়েছিলেন। আর আসা হয় নি এরপর। বুড়োদাদুর সঙ্গে দেখা হয়েছে পারিবারিক অনুষ্ঠানে। অবশ্য শেষ কয়েক বছর বুড়োদাদু বাড়ি ছেড়ে কোথাও যেতেন না। এত বছর পর অভি যখন আবার এল, তখন বুড়োদাদুই নেই।

বুড়োদাদু কিন্তু শেষ অবধি মোটামুটি সুস্থই ছিলেন। বরাবর ব্যায়ামের অভ্যেস ছিল আর অত নিয়মে থাকতেন বলেই কী! অথচ বুড়োদাদুর ছেলেমেয়েদের দেখো, নানা অসুখবিসুখে কাবু। অভির দাদুই তো আসতে পারেন নি শরীর খারাপ বলে। মেজদাদু আর ছোড়দাদু এসেছেন রাজুমামা, তপুমামাকে সঙ্গে নিয়ে। অভির হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা শেষ, তাই ও-ও জুটে গেছে ওনাদের সঙ্গে। পুরোনো বাড়ির একটা ব্যবস্থা করতে হবে তো। এখানে থাকার তো আর কেউ রইল না। আজকাল জমির দাম এদিকেও বেশ ভালোই।

অভির অবশ্য এসব আলোচনা ভালো লাগছে না, খালি জমি বাড়ির দাম নিয়ে কচকচি। ও তাই খালি এদিক ওদিক ঘুরেই বেড়াচ্ছে। এত বড়ো বাড়িটা ওর কাছে বরাবরই রহস্যময় লাগে। এত ঘর, কোনো কোনো জায়গা দিনের বেলাতেও অন্ধকার, কোনো ঘরে রাজ্যের জিনিস ডাঁই করে রাখা, পা ফেলারও জায়গা নেই। লম্বা লম্বা টানা বারান্দা, আলোছায়ার লুকোচুরি খেলা সেখানে নিত্য চলে। ছোটোবেলায় অভির খুব থাকতে ইচ্ছে করত এখানে, কিন্তু সুযোগ হত না। এত বছর পরে এখানে এসে অভির মনে হচ্ছে বুড়োদাদু এখনও এখানে আছেন। দেখতে তো পাচ্ছে না ওনাকে কিন্তু তিনি যেন রয়ে গেছে এই পুরোনো বাড়ির আনাচে কানাচে। মনে হওয়াও কিছু আশ্চর্যের নয়, এসে অবধি কত কিছু যে শুনছে পুরোনো বাড়ির সম্পর্কে, বুড়োদাদুর সম্পর্কে! এমন কী এও কানাঘুষো শুনেছে যে  পুরোনো বাড়িতে নাকি ভূত আছে!

কথাটা প্রথম শুনেছিল এ বাড়ির পুরোনো চাকর বিশুর কাছে। বুড়োদাদুর কাছে যে চব্বিশ ঘন্টা থাকত সেই বিশুর কাছে। শুনে তো অভি হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিল।

“কী যে বলো তুমি বিশুদা! ভূত বলে আবার কিছু আছে নাকি!”

uponyas03 (Medium)“বললে পেত্যয় যাবে নি, রাতবিরেতে যে কত কী হয় এখেনে তার ঠিক নেই! আমি তো রাতে কত্তাবাবুর ঘরের সামনের ওই ছোটো ঘরটাতে সেই যে ঢুকতুম, দরজা বন্ধ করে শুতুম, ভোরের আগে খুলতুমও নি, নড়তুমও নি,” বলেছিল বিশু।

“ওই ঘরে ভূত ঢোকে না?”

“না। এই দেখো লক্ষ্মণ ওঝার কাছ থেকে মন্ত্রপূত তাবিজ নিয়ে এসেছি। সব সময় এটিকে ধারণ করি। এটি সঙ্গে থাকলে আর বিপদের ভয় নেই,” বিশু হাতে বাঁধা একটি তাবিজ দেখায়, তারপর হাত জোড় করে, চোখ কপালে তুলে বার কয়েক রামনাম করে।

“তোমার নাহয় তাবিজ আছে, কিন্তু বুড়োদাদু? বুড়োদাদু কী করত? বুড়োদাদুকে ভূত ধরত না?” অভি জিজ্ঞেস না করে পারে নি।

বিশু সন্তর্পণে এদিক ওদিক দেখে দুকানে হাত ঠেকিয়েছিল, তারপর গলা নামিয়ে ফিসফিস করে বলেছিল, “কত্তাবাবু আমার মনিব ছিলেন, অন্নদাতা। মিছে কথা বলব নি, দয়ার শরীর ছিল, বিপদে আপদে সাহায্য করতেন, কিন্তু……”

“কিন্তু? কিন্তু কী?”

“কিন্তু ওসব ভূত পেরেতের সঙ্গে ওনার ওঠাবসা ছিল। ভূত নামানো, তাদের বশ করা এসব উনি জানতেন,” বিশু বলেছিল।

“কী!” অভি তো অবাক, আরো কিছু জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল এমন সময় বাড়ির ভেতর থেকে “অ্যাই বিশে কোথায় গেলি” বলে মেজোদাদু এক হাঁক পেড়েছিলেন।

বিশুও অমনি দৌড়েছিল, যাবার আগে বলেছিল, “এসব কথা আমি যে তোমাকে বললুম কাউকে আবার বোলো নি যেন।”

এখন বিশুদাকে বাজার নিয়ে আসতে দেখে অভির কথাগুলো আবার মনে পড়ে গেল। বিশুদার সঙ্গে রাজুমামাও গেছিল। রাজুমামার মুখটা কেমন যেন গম্ভীর গম্ভীর। অভিকে দেখে শুধু “কী রে এখানে কী করছিস” বলে উত্তরের অপেক্ষা না করেই ভেতরে ঢুকে গেল।

অভি ভাবছিল ভূতের কথা। শুধু ভূতে হচ্ছে না, আবার বুড়োদাদুকেও এর সঙ্গে জড়ানো! ভূত বশ করা! ধুর! যত্তসব আজগুবি কথা! তার থেকে রাজুমামা মুখটাকে অমন গোমড়া করে রেখেছিল কেন সেটাই বরং খোঁজ নেওয়া যাক। বৈঠকখানায় ঢুকে দেখল সবাই সেখানেই আছে। এখন আর শুধু রাজুমামা নয়, বাকি সবার মুখও গম্ভীর। কী ব্যাপার? না বাজারে গিয়ে রাজুমামা জানতে পেরেছেন যে এ বাড়ির ভূতের বদনাম ভালোই আছে। চট করে কেউ কিনতে চাইবে না, কিনলেও জলের দরেই দিতে হবে।

“এসব হচ্ছে চালাকি বুঝলি? যাতে ভালো দামে বিক্রি না করা যায়,” মেজোদাদু বললেন, “যারা রটাচ্ছে তারাই কিনবে। এই হচ্ছে মতলব।”

“এইটি বাবা করে গেলেন। কত বছর ধরে বলে আসা হচ্ছে এখানকার সব কিছু বিক্রি করে আমাদের কাছে চলে আসতে! কিন্তু না, শুনল না! জেদ করে এখানেই রয়ে গেল। এখন ঠেলা সামলাই আমরা। ফেলে রাখলেও দেখব দুদিন বাদে জবরদখল হয়ে গেছে,” বললেন ছোড়দাদু।

“ভূতের বাড়িই যদি হবে তাহলে শ্যামসুন্দরের কষ্টিপাথরের মূর্তি চুরি হয়ে গেল কী করে? চোরেরা তার মানে ভূতের ভয় পায় না!” রাজুমামা বলল।

অভির এখন মনে পড়ল, একবার শুনেছিল বটে পুরোনো বাড়ি থেকে ঠাকুরের মূর্তি চুরি হয়ে গেছে।

“তোমরা পুলিশে খবর দাওনি?” অভি জিজ্ঞেস করল।

“থানা পুলিশ সবই করা হয়েছিল। কিন্তু ওই পর্যন্তই। অতবড়ো কষ্টিপাথরের বিগ্রহ, ও  একবার গেলে আর পাওয়া যায় রে! গয়নাগাঁটিও মন্দ ছিল না। আগেকার দিনে অনেক বাড়িতেই এরকম থাকত। একরাতেই সব হাপিশ হয়ে গেল,” বললেন মেজোদাদু।

“ভূতের বদনামটা মনে হয় শেষের দিকে হয়েছে, একেবারেই হালে। নাহলে আগে তো শুনতাম অনেকে কিনতে টিনতে চাইছে বাড়িটা,” রাজুমামা বলল।

“আমার তো মনে হয় দাদুর মাথাটাও আর ঠিক ছিল না শেষ দিকে। কথাবার্তাও কীরকম যেন গোলমেলে ঠেকত। আরে বয়সটা দেখো! সে যাই হোক, কথা হচ্ছে আমরা আর ক’দিন এখানে কাজকর্ম ছেড়েছুড়ে বসে থাকব? যে ক’দিন আছি তার মধ্যেই যা করার করতে হবে,” তপুমামার বক্তব্য।

 এ ব্যাপারে সবাই একমত। মুশকিল হচ্ছে বাড়িটা কারুর দায়িত্বেও রেখে যাওয়ার উপায় নেই। বিশু পরিষ্কার বলে দিয়েছে সে এখানে একা থাকতে পারবে না। এখনই তো কাজকর্ম করে রাতে কেটে পড়ছে। বিশ্বাসী লোক ছাড়া রাখাও যায় না।

অভির মনে কিন্তু বেশ উত্তেজনা। জীবনে এই প্রথম কোনো ভূতুড়ে বাড়িতে থাকার সুযোগ হল! যদিও গতকাল রাতে কিছুই বোঝে নি, এক ঘুমেই রাত কাবার হয়েছে। অভি ঠিক করেই নিয়েছে ভূত না দেখে ও নড়বে না এখান থেকে। এই সুযোগ ছাড়া যায় নাকি! তাছাড়া বাড়িটা ওর বরাবরই খুব ভালো লাগে। পুরো বাড়িটাই তো ভালো করে এখনো দেখা হল না।

অভি উঠে গিয়ে বিশুর সঙ্গে আবার গপ্পো জুড়ল। ওই তো থাকত বুড়োদাদুর সঙ্গে।

“আচ্ছা বিশুদা, কাল তো খুব বললে যে এ বাড়িতে রাতবিরেতে কত কিছু হয়। কী হয় সেটা বলবে তো, নাহলে বুঝব কী করে?”

“সে অনেক কিছু হয় বাবা, অনেক কিছু হয়। আমি বেশি কিছু বললে তোমার দাদুরা ভেবে বসবেন আমিই এসব রটাচ্ছি! চাকর বই তো নই,” বিশু কিছুই বলতে চায় না।

“কেউ কিচ্ছু ভাববে না। তাছাড়া জানতে পারলে তো ভাববে! আমি কাউকে কিচ্ছু বলব না। বলো না, বলো না,” অভিও নাছোড়বান্দা।

“রাতবিরেতে যে কত কী হয়! থেকে থেকে পেতনির কান্না!”

“পেতনির কান্না! সেটা আবার কী?”

“এই দেখো, তুমি কলকেতার ছেলে, পেতনির কান্না তুমি জানবে কী করে? সে অতি সব্বনেশে জিনিশ। মনে হবে খুনখুন করে কেউ কেঁদেই যাচ্ছে। খুব জোরে নয়, কিন্তু একটানা কেঁদেই যায়, মাঝে একটু হয়তো থামল, আবার শুরু হল। কিন্তু সেই কান্না শুনে তুমি যদি উঠে খোঁজাখুঁজি করতে যাও, তাহলেই আর রক্ষে নেই! পেতনি দেবে ঘাড়টি মটকে!”

“এ বাড়িতে পেতনি কাঁদে?”

“কাঁদেই তো। আমি কতবার শুনেছি। কানে বালিশ চেপে রামনাম জপেছি। সে কান্না যে শুনেছে সেই জানে,” বিশু বলতে বলতেই শিউরে ওঠে।

“তখন বুড়োদাদু কী করত?”

“ওনার কথা আলাদা। বললুম না ওনার সঙ্গে তেনাদের যোগসাজশ ছিল।”

“কী করে বুঝলে তুমি?”

“এক রাত্তিরের কথা বলি শোনো। তোমার বুড়োদাদুর ঘরখানা তো দেখেছ। পেল্লায়। কত জিনিসপত্তর। মাঝখানে এই বড়ো এক পালঙ্কে তিনি শুতেন। ঘরের সামনেই একখানা ছোটো ঘর। ওটাতে আমি শুতুম। এক রাতে খটখট আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল। ভাবলুম কত্তাবাবুর কি কিছু দরকার হল? দু ঘরের মাঝের দোর বন্ধ থাকে না। দোর খুলে ঢুকে যা দেখলুম……” বিশু চুপ করে যায়।

“কী দেখলে বলো না, ও বিশুদা, বলো না,” অভিরও না শুনলেই নয়।

“দেখলুম ঘরে কত্তাবাবু নেই। ঘরে একটা টিমটিম করে আলো জ্বলত। তাতেই দেখলুম পালঙ্কে কত্তাবাবুর জায়গায় অন্য কে একটা শুয়ে আছে। তার মুখখানা, ওরে বাবা সে কথা ভাবলেও এই এতদিন পরে এই দিনের আলোতেও আমার গায়ে কাঁটা দেয়। একটা অন্য লোক শুয়ে। মুখ হাঁ করে এই অ্যাত্তো বড়ো বড়ো দাঁত বার করে। দেখেই আমি দৌড়। কত্তাবাবু কোত্থাও নেই!”

“আরে বাথরুমেও তো যেতে পারে, কী বাইরে যেতে পারে।”

“না না বাথরুমের দোরে তো বাইরে থেকে হুড়কো লাগানো ছিল। আর ঘরের বাইরে যেতে হলে তো আমার পাশ দিয়েই যেতে হবে। সে দোর তো আমি নিজে বন্ধ করে শুয়েছি। কিছুক্ষণ পরেই কত্তাবাবুর ডাক, ‘বিশে, এই বিশে।’ ভয়ে  কাঁপতে কাঁপতে গেলুম। কত্তাবাবু বললেন, ‘কী হয়েছে? ঘরে ঢুকেছিলিস কেন?’ আমতা আমতা করে কোনরকম বললুম, ‘কীসের যেন আওয়াজ হল তাই…’ কত্তাবাবু আমাকে দেখে বললেন, ‘হুঁ, যা এবার।’ কত্তাবাবু তো ঘরেই ছিলেন না, জানলেন কী করে যে আমি ঘরে ঢুকেছিলুম? আর সেই লোকটাই বা গেল কোথায়? লোক নয়, লোক নয়, অন্য কিছু,” বিশু আবার রাম রাম করতে শুরু করল।

“রাত্তিরে অন্ধকারে কী দেখতে কী দেখেছ,” অভি বিশ্বাসই করতে চাইল না, “আচ্ছা বলো তো তুমি নিজে দেখেছ বুড়োদাদুকে কিছু করতে মানে ওই ভূত টূত নামাতে? মানে এমনি আয় আয় করে ডাকলেই তো আর ভূত এসে হাজির হবে না! দেখেছ কিছু করতে বুড়োদাদুকে? কোনো অদ্ভুত, অস্বাভাবিক কিছু?”

“মিছে কথা বলব নি। কত্তাবাবুর আত্মা ঘুরে বেড়াচ্ছে এখেনে। এই বাড়ি ছেড়ে কত্তাবাবুর আত্মা যাবে নি। মিছেকথা বললে আমারই ঘাড় মটকে দেবেন। ছেলেপুলে নিয়ে ঘর করি, মিছে কথা বলব নি। আমি কিচ্ছু দেখি নি। আমাকে অনেকে শুধিয়েছে এ কথা, কিন্তু আমি কিচ্ছু দেখি নি। অনেক উপকার  করেছেন কত্তাবাবু, মিছে কথা বলব নি।”

“তুমি তো সবসময় থাকতে বুড়োদাদুর সঙ্গে। তোমার কি মনে হয় বুড়োদাদুর মাথার কোনো গোলমাল টোলমাল হয়েছিল? মানে বয়স তো অনেক হয়েছিল, হতেই পারে,” অভি জানতে চাইল।

“না না ও কথা মুখেও এনো নি,” বিশু একেবারে হাঁ হাঁ করে উঠল, “ও কথা কত্তাবাবুর শত্তুরেও বলবে না। বয়স যতই হোক জ্ঞান বুদ্ধি এক্কেবারে টনটনে ছিল। শরীরও বটে একখানা ছিল। মিছে কথা বলব নি অমন লোহার শরীর কজনার থাকে? কত্তাবাবু বলতেন, ‘বুঝলি বিশে, মুগুর ভাঁজা শরীর আমার, সেঞ্চুরি করেই ছাড়ব।’ শেষ কটা দিন শুয়েছিলেন, নইলে এক্কেবারে চাঙ্গা ছিলেন। কিন্তু তুমি এত কথা শুধোচ্ছ কেন বলো দিকিনি?”

অভি ভাবছিল অন্য কথা। তপুমামা বলছিল বুড়োদাদুর মাথার ঠিক ছিল না, উলটোপালটা কথাবার্তা বলত আর বিশুদা বলছে ওসব কিছুই না। কার কথা সত্যি? হতে পারে বিশুদা মনিবের নামে কিছু বলতে চায় না। বুড়োদাদু অনেক উপকার করেছে ওদের, তাই বলছে।

বিশুর কথায় চমকে উঠল, তাড়াতাড়ি সামলে নিয়ে বলল, “তোমাকে ছাড়া আর কাকে জিজ্ঞেস করব? আমরা কি কেউ থাকতাম এখানে? একমাত্র তুমিই তো থাকতে বুড়োদাদুর সঙ্গে সারাক্ষণ। এই যে বাড়িটার নামে উলটোপালটা কথা রটেছে, এতে কত ক্ষতি হল বলো তো? এখন তো আর এখানে থাকার কেউ রইল না। ফাঁকা পড়ে থাকলে এবার সত্যি সত্যিই ভূতের বাড়ি হবে, এতদিন না হয়ে থাকলেও,” বিজ্ঞের মতো বলল অভি।

বিশুও সায় দিল, বলল, “এইটা তুমি হক কথা বলেছ। কিন্তু এ বাড়ির নামে হাজার কথা আছে। নেহাত কত্তাবাবু ছিলেন তাই আমি থাকতুম। আমাকেই কম লোকে শুধিয়েছে নাকি? দিনের বেলা তো বেরোতুম, বাড়ি যেতুম, দোকান বাজার করতুম, ওই যখন বামুনমাসি রান্নাবান্না করতে আসত, কাজলের মা ঘরদোর পরিষ্কার করতে আসত। রাস্তায় বেরোলেই হাজার কথা। এ এই শুধোয় তো ও ওই শুধোয়! বলব কী, কতজন তো এ বাড়ির কোন ঘরে কত্তাবাবু থাকেন, কোনদিকে কী দরজা জানলা আছে তা পয্যন্ত শুধোত। তবে এই বিশের মুখ দিয়ে একটা কথাও বেরোত না। আগে তো কত্তাবাবুর কাছে আমার খুড়ো থাকত। খুড়ো মরল যেবার ওই খুব জল হল সেবার। মরার আগে খুড়ো আমাকে কত্তাবাবুর কাছে নিয়ে এসেছিল, বলছিল, ‘দেখ বিশে কেটে দু টুকরো করে ফেললেও একটা কথাও বাইরে বলবি নে।’ আমি ভাবতুম না জানি কী আছে এখেনে। পরে বুঝলুম ওই তেনাদের জন্যেই সবার এত কুতূহল। ভাবে সব সময়েই বোধহয় তেনারা যাচ্ছেন আসছেন।”

এদিকে ভূতের বাড়ি বলে এত ভয়, আবার ওদিকে এত কৌতূহলও! কী জানি বাবা কী ব্যাপার। বিশু কাজে ব্যস্ত হয়ে গেল, অভিও উঠে পড়ল ওখান থেকে। ঘুরতে ঘুরতে মন্দিরের সামনে এল। বাড়ির সংলগ্ন ছোট্ট মন্দির। শ্যামসুন্দরের মূর্তি চুরি হয়ে যাবার পরে ফোটো রাখা আছে একটা। ওতেই পুজো হয়। একজন পুরুতমশাই আসেন রোজ, পাঁচ মিনিটেই পুজো সেরে কেটে পড়েন। অভি দেখেছে তাঁরও কীরকম তাড়া। যেন দিনের বেলাতেও বেশিক্ষণ থাকলে ভূতে ধরবে। নাহ এই ভূতের ব্যাপারটার মীমাংসা না করলেই নয়। আজ রাতে জেগে  থাকতে হবে, যদি পেতনির কান্না শোনা যায়। সব মিলিয়ে পুরো ব্যাপারটাই যেন কেমন গোলমেলে লাগছে।

অভি বাড়ির ভেতরে ঢুকতে যাচ্ছে এমন সময় আবার বিশুর সঙ্গে দেখা।

“তুমি খালি এদিক ওদিক ঘুরঘুর করে বেড়াচ্ছ কেন বলো তো? যাও, বৈঠকখানায় যাও, সরকারবাবু এসেছেন, এই চা দিয়ে এলুম,” বিশুদা বলল।

“সরকারবাবুটা আবার কে?” অভি জিজ্ঞেস করল।

“বাজারের কাছে ওই লাল রঙের বাড়িটায় থাকেন। কত্তাবাবুর কাছে খুব আসতেন। কত্তাবাবুর থেকে অনেক ছোটো, কিন্তু ওই এক ওনার সঙ্গেই কত্তাবাবু খুব গল্পগাছা করতেন। যাও, যাও, বাইরে বাইরে ঘুরে না বেড়িয়ে ঘরে যাও।”

অভি গেল। দেখল বৈঠকখানায় একজন ভদ্রলোক বসে আছেন। সাদা চুল, ধুতিপাঞ্জাবি পরা। দাদুরের বয়সী হবেন বলে অভির মনে হল। মেজদাদু অভির সঙ্গে ওনার পরিচয় করিয়ে দিলেন। অভি বুঝল সেই বাড়ি বিক্রি নিয়েই কথাবার্তা হচ্ছে।

“যা বদনাম রটেছে এই বাড়ির! এ আর বিক্রি করা যাবে বলে মনে হচ্ছে না। করলেও দাম পাব না। থাক পড়ে থাক, কী আর করা যাবে,” তপুমামা বেশ হতাশ।

“আপনারাও কি তাহলে এটাকে ভূতের বাড়ি বলেই মেনে নিচ্ছেন?” সরকারবাবু জানতে চাইলেন।

“আমাদের মানামানিতে কী যায় আসে? লোকে তো তাই মানছে দেখছি,” বললেন মেজদাদু।

“আপনারা থাকুন ক’দিন। লোকজনের সঙ্গে কথাবার্তা বলুন। তাছাড়া বাড়িতেও তো অনেক জিনিসপত্র আছে, সেসবেরও তো ব্যবস্থা করতে হবে।”

“জিনিস বলতে কটা খাট আলমারি চেয়ার টেবিল, ড্রেসিং টেবিল – এইসব। তাও বাবা আগেই অনেক কিছু বিক্রি করে দিয়েছিলেন। এত কাঠের জিনিসের যত্ন করা সম্ভব হচ্ছে না বলে। অবশ্য যেগুলো আছে সেগুলোও সব সেগুন, মেহগনী কাঠেরই, সেগুলোর দাম ভালোই হবে। ওগুলো বিক্রি করে দেব। কিন্তু আসল জিনিসেরই তো কোনো ব্যবস্থা করা যাচ্ছে না। আমরাই বা কদ্দিন থাকব? ছেলেদেরও অফিস আছে,” এবার ছোড়দাদু বললেন।

“আপনারা ক’দিন থাকুন না এখানে। তাহলে হয়তো এর ভূতুড়ে বদনাম ঘুচলেও ঘুচতে পারে। তাছাড়া এত তাড়াতাড়ি তো কিছু হয় না। থাকুন, দেখুন। আপনাদের বাবার খুব আক্ষেপ ছিল যে আপনারা এখানে আসেন না বা এলেও বেশি থাকেন না।”

“কী দেখব মশাই? দেখার কিছুই নেই। বহু পুরোনো বাড়ি। যত তাড়াতাড়ি সম্ভভ এটাকে বিক্রি করা যায় ততই ভালো। বাবা যে কী করে এখানে থাকতেন বাবাই জানেন,” বললেন মেজদাদু।

“আমার মনে হয় তাড়াহুড়ো না করাই ভালো। সব ভালো করে দেখেশুনে নিন। এত বছর একটা মানুষ এখানে বাস করতেন, নানান জিনিস তো থাকবেই। বাড়ি ফাঁকা রেখে চলে গেলে চুরিচামারির ভয়ও আছে।”

“আর কী চুরি হবে! চুরি যা হবার তা তো হয়ে গেছে। অত দামী কষ্টিপাথরের মূর্তিটা চুরি হয়ে গেল, সঙ্গে গয়নাগাটিও! পুলিশে খবরও তো আমি আর বড়োদা এসে দিয়েছি। বাবা শুধু খানিক হইচই করা আর আমাদের খবর দেওয়া ছাড়া কিছুই করেন নি। সাধে বলি বাবার মাথার গোলমাল হয়েছিল!” মেজদাদু বেশ বিরক্তই।

সরকারবাবু অল্প একটু হেসে উঠে পড়লেন।

সরকারদাদু কেন এতবার এখানে থাকতে বলছেন? উনি কি ভূতের ব্যাপারে কিছু জানেন? ওনার সঙ্গে তো বুড়োদাদুর ভালোই ভাব ছিল। অভি সারা দুপুর এসব ভাবল আর পুরো বাড়িটায় ঘুরঘুর করে বেড়াল। দোতলার বেশিরভাগ ঘরই বন্ধ, জিনিসপত্রও কিছুই নেই বিশেষ। দোতলার তিনটে ঘরে অভিদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে এই ক’দিন। গোটাতিনেক খাটবিছানা আছে। আগেও দাদুরা এলে এখানেই থাকতেন। বুড়োদাদু নাকি বেশ কয়েকবছর একতলায় থাকতে শুরু করেছিলেন, দক্ষিণদিকের বড়ো ঘরটায়। ওনার থাকার সুবিধের জন্যে ওদিকটা ঠিকঠাকও করা হয়েছিল। ঘরটাকে একটা সুইটের মতো করা হয়েছিল। ঘরের সঙ্গে আরেকটা ছোটো ঘর যেখানে বিশুদা শুত, লাগোয়া বাথরুম তো ছিলই। ঘরখানা পেল্লায়, বুড়োদাদুর খাটটাও। ঘরে ড্রেসিং টেবিল আছে, আলমারি আছে, সবই পুরোনো দিনের আসবাবপত্র। এগুলোর কথাই বোধহয় ছোড়দাদু বলছিলেন।

অভি সারা দুপুর ওই ঘরে কাটাল। আলমারি সব খোলাই, সব ঘাঁটাঘাঁটি করে বেড়াল। বই আছে অনেক, বুড়োদাদুর বই পড়ার নেশা ছিল বোঝা যায়। গোয়েন্দা গল্পের বই আছে, হাসির গল্পের বই আছে, অনেক ক্লাসিক বই আছে, বাংলা, ইংরিজি – দুইই, কিন্তু ভূতপ্রেতের মানে ভূত নামানো বা ভূত বশ করা এসবের কোনো বই নেই। বুড়োদাদু গানও শুনতেন। একখানা চোঙওয়ালা পুরোনো গ্রামোফোন রাখা রয়েছে, সেটা অবশ্য এখন আর চলে না। সিডি প্লেয়ার, টিভি এসব তো আছেই। ঘরটা খুব সুন্দর। এত আলো-হাওয়া। জানলা দিয়ে তাকালে বাগান, কত গাছপালা। অনেককাল বাগানের যত্ন নেওয়া হয় না মনে হয়, ঝোপঝাড় হয়ে গেছে।

**********

বিকেলে বিশু বেরোচ্ছিল, অভিও তার সঙ্গে গেল। বিশু বাজারে যাচ্ছিল, রাস্তাতেই পড়ল সরকারবাবুর বাড়ি। উনিও কোথাও বেরোচ্ছিলেন।

অভি ওনাকে দেখে বলল, “বিশুদা তুমি বাজারে যাও, আমি সরকারদাদুর সঙ্গে কথা বলি। তুমি তো মুরগি কিনতে যাচ্ছ, আমি ঠিক খুঁজে নেব।”

বিশু চলে গেল। অভি সরকারদাদুর কাছে গেল।

“কি, বিশুর সঙ্গে বেরিয়েছ?” উনি জিজ্ঞেস করলেন।

“হ্যাঁ, সারাদিন বাড়িতে থেকে থেকে আর ভূত ভূত শুনে শুনে বোর হয়ে যাচ্ছি।”

সরকারদাদু হেসে উঠলেন অভির কথা শুনে, বললেন, “তা তোমার কী মনে হয়? ভূত ওখানে আছে সত্যি?”

“খামোখা ভূত কেন থাকতে যাবে তাই তো বুঝতে পারছি না। হতে পারে ইচ্ছে করে রটানো হয়েছে যাতে আমরা বাড়িটা ভালো দামে বিক্রি করতে না পারি।”

“ভূতুড়ে বদনাম কিন্তু আজকের নয়। তখন তোমার মার দাদু বেঁচে।”

“কিন্তু ভূতটা দেখেছে কে? আর রটালোই বা কে?” অভি জিজ্ঞেস করল, বিশুর কাছে যা শুনেছে সেসব একদম চেপে যায়।

সরকারদাদু কিছুক্ষণ চুপ করে কী যেন ভাবলেন, তারপর বললেন, “বিশু এমনিতে খুবই বিশ্বস্ত। কিন্তু ভূতের কথা ওর কাছেও লোকজন শুনেছে। আগে তো বিশুর এক কাকা থাকত তোমার বুড়োদাদুর কাছে। তারপর বিশু আছে।”

“ভূত থাকলে বুড়োদাদু থাকতেন কী করে? আপনার সঙ্গে তো বুড়োদাদু অনেক গল্প করতেন, ভূতের ব্যাপারে আপনাকে কিছু বলেন নি কখনো? আপনার কী মনে হয় ও বাড়িতে সত্যিই ভূত আছে?”

“আমাকে কেউ এই ব্যাপারে কোনোদিন কিছু জিজ্ঞেস করে নি। এই তুমি করলে বলে বলছি। যদি সত্যিই ও বাড়ি থাকার পক্ষে বিপজ্জনক হত তাহলে আমি তোমাদের থাকতে বলতাম না। আর যাই হোক ও বাড়িতে ভূত নেই। এ কথা আমি জোর দিয়ে বলতে পারি। মুশকিল কী জানো, লোকে বিশুদের কথাই বিশ্বাস করতে ভালোবাসে।”

“আমার তো অনেককাল বুড়োদাদুর সঙ্গে দেখাই হয় নি। সেই কোন ছোটোবেলায় একবার এসেছিলাম। ইদানীং তো উনি কোথাও যেতেন না, তাই আর দেখাও হয় নি। ওনার সঙ্গে কথা বলতে নিশ্চয়ই খুব ভালো লাগত আপনার। এখানে এসে অবধি এত কিছু শুনছি যে কৌতূহল ক্রমশ বাড়ছে।”

সরকারদাদু বললেন, “তোমার বুড়োদাদুর মতো বুদ্ধিমান লোক আমি খুব কম দেখেছি। শেষ বয়স অবধি মাথা একেবারে ঠিক ছিল। ছেলেরা বিশেষ এখানে না আসায় একটা দুঃখ ছিল, বলতেন, ‘এদের খালি জমির দাম, বাড়ির দামে উৎসাহ, অন্য কিছুতে নয়।’ নানারকম কথাবার্তা হত আমার সঙ্গে। আমি বোঝাতাম, ‘ছেলেদের ডেকে এবার সব বাড়ি, জমি – কোথায় কী আছে না আছে সব বুঝিয়ে দিন। আপনিও নিশ্চিন্ত।’ তাতে বলতেন, ‘আমি মরলে ব্যাটারা ঠিক আসবে। এসব দিকে নজর খুব। জানুক, নিজেরা চেষ্টা করে যা জানার জানুক। এসব তো ওদেরও। নিজেদের বাড়ি, ঘর, জায়গা নিজেরা বুঝবে।’ এই ছিল ওনার বক্তব্য। নিজের মতো নিজে দিব্যি কাটিয়ে গেলেন এত বছর।”

“এদিকে সবাই ভূত ভূত করে কিন্তু চুরি তো একবার হয়েছিল, শ্যামসুন্দরের মূর্তি?”

“হ্যাঁ তা হয়েছিল। এ নিয়ে একবার কথা হয়েছিল ওনার সঙ্গে, বলেছিলেন, ‘চোর চুরি করবে –এ আর আশ্চর্যের কী, চোরের কাজই চুরি করা। গৃহস্থকে সাবধান থাকতে হবে।’ এর বেশি কিছু বলেন নি, এ নিয়ে আর কোনদিন কোনো কথাও হয় নি। তবে ও বাড়ির সব কিছুকে নেহাতই পুরোনো আবর্জনা ভাবাটা বোধহয় ঠিক হবে না। আর কিছু না হোক অনেক স্মৃতি বিজড়িত তো বটেই। ওই যে বিশু আসছে, তুমি তো এবার ফিরবে। আমিও একটু ঘুরে আসি। পরে আবার দেখা হবে।”

সরকারদাদু চলে গেলেন। অভিও বিশুর সঙ্গে বাড়িমুখো হল। মাথায় সরকারদাদুর কথাই ঘুরছে। আশ্চর্য ব্যাপার। একদিকে লোকের বিশ্বাস এটা ভূতুড়ে বাড়ি, অন্যদিকে সরকারদাদু জোর গলায় বলছেন যে ভূতের কোনো ব্যাপারই নেই। বরং ওঁর কথার মধ্যে যেন অন্য কিছুর ইঙ্গিত আছে মনে হল।

“বিশুদা, তোমার খুড়ো তোমাকে বলে গেছিলেন কোনো কথা বাইরে না বলতে আর তুমি ভূতের কথা রটিয়ে বেড়ালে?” অভি বলল।

বিশু একটু থমকাল, তারপর বলল, “কী বলছ তুমি! আমি এধারের কথা ওধার করি না। ধম্মে সইবে না। তবে মিছে কথা বলব নি, সে রাতে কত্তাবাবুর বিছানায় অমন একটা লোককে দেখে ভয় পেয়েছিলুম। সে কথাটা বলেছিলুম। তা কত্তাবাবুই তো বলতেন, ‘বুঝলি বিশে, আমার পূর্বপুরুষেরা গোপনে অনেক তন্ত্রচর্চা করেছেন। আমিও একেবারে কিছু জানি না ভাবিস না।  একলা বুড়ো পেয়ে কেউ কিছু করবে সে ভয় নেই। আমাকে পাহারা দেবার জন্যে আছেন তেনারা।’ এরপর আর অবিশ্বেস করি কী করে। লোকে যে কানাকানি করে এ বাড়িতে ভূত আছে সে কথাও কত্তাবাবু জানতেন। তবে কত্তাবাবু সঙ্গে থাকলে ভয় ছিল না। কত্তাবাবু মানুষ ভালো ছিলেন। তেনারাও ছিলেন, তবে আমাকে জ্বালান নি। এই ভর সন্ধ্যেবেলায় মিছে কথা বলব নি। ওই এক রাতেই যা………  রাম রাম রাম………”

“মেজদাদু তোমাদের পূর্বপুরুষেরা তান্ত্রিক ছিলেন বা বুড়োদাদু এসব চর্চাটর্চা করতেন?” বাড়ি ফিরেই অভি মেজদাদুকে এসব জিজ্ঞেস না করে পারল না।

মেজদাদু তো আকাশ থেকে পড়লেন, “তান্ত্রিক? তন্ত্রচর্চা? কস্মিনকালেও তো এসব শুনি নি বাবা! তুই কোথা থেকে শুনলি?”

“এই শুনলাম। বাজারে গিয়েছিলাম না? বুড়োদাদুই নাকি বলতেন………”

“কী বলতেন? উনি তান্ত্রিক? এসব স্রেফ রটনা। কার কাছে শুনলি তুই? ওই বিশে? সুযোগ পেয়ে তোর কাছে গপ্পো ফেঁদেছে। এসব উলটোপালটা কথা রটানো হচ্ছে। ইচ্ছে করেই, এখন আমি বেশ বুঝতে পারছি সব চাল। জলের দরে বাড়িটা বাগানোর মতলব। ভূতই কি যথেষ্ট ছিল না, আবার তন্ত্রচর্চা! আমাদের কথা শুনে বাবা যদি আগেই বিক্রির ব্যবস্থা করতেন তাহলে আর এ অবস্থা হত না,” মেজদাদু বেশ রাগ রাগ গলায় বললেন।

“লোকে এসব রটিয়ে বেড়াচ্ছে জেনেও চুপচাপ বসে রইল। সাধে আমার মনে হত যে বাবার মাথার ঠিক নেই!” বললেন ছোড়দাদু।

“বুড়োদাদু তো রেলে চাকরি করতেন। সবসময় তো এখানে থাকতেন না। কে থাকত তাহলে এখানে? বাড়ি ফাঁকাই থাকত?” অভির প্রশ্ন আর শেষই হয় না।

“ফাঁকা কোনোকালেই থাকত না। আমার ঠাকুরদা, ঠাকুমা থাকতেন। পুষ্যি ছিল গোটাকতক। তাছাড়া ছোটোকাকা ছিলেন যাকে বলে এক নম্বরের বাউণ্ডুলে। আজ এখানে তো কাল ওখানে। মধ্যপ্রদেশ না রাজস্থান কোথাকার এক এক রাজার এস্টেটে মাঝে চাকরি করতেন। বেশ কিছুকাল ওখানেই ছিলেন। বাবাও গেছেন। তারপর যখন কাজকর্ম সব ছেড়েছুড়ে এখানে থাকতে শুরু করলেন, বাবাও এখানে চলে এলেন। দু ভাই-এ ভাব ছিল খুব। ছোটোকাকা মারা গেছেন অনেক কাল। বাবার মতো দীর্ঘায়ু ছিল না ওনার,” মেজদাদু বললেন।

“আচ্ছা মেজদাদু, এ বাড়িতে ওইসব পুরোনো খাট আলমারি ছাড়া আর কিছু থাকতে পারে কি?” অভি জিজ্ঞেস করেই ফেলল, মাথায় সরকারদাদুর কথাটা ঘুরছে যে।

মেজদাদু অভিকে দেখলেন, তারপর বললেন, “তোর কী হয়েছে বল তো? এতক্ষণ তো এ বাড়ির ইতিহাস শুনলি, এখন আবার এ কী প্রশ্ন! কী ভাবছিস তুই? কিছু লুকোনো টুকোনো আছে? ওই যে কী যে্ন বেশ বলে, গুপ্তধন? পাগল ছেলে!” মেজদাদু হেসেই ফেললেন, “দেখছিস তো ভূতের চোটেই অস্থির হয়ে যাচ্ছি, তুই আর ডালপালা জুড়িস না। আগেকার দিনে কিছু পয়সাকড়ি থাকলেই লোকে এরকম একটা বড়ো বাড়ি ফেঁদে বসত। যৌথ পরিবার ছিল তো তখন, মেলা লোকজন। তাছাড়া শুনেছি জমিজমাও মন্দ ছিল না, তবে বিরাট জমিদারি কিছু নয়। গয়নাগাটি যা ছিল মা দিয়ে গেছেন, যাকে যা দেবার। টাকা পয়সা ব্যাঙ্কে। এছাড়া আর কিচ্ছু নেই। তুই আর রাতদিন ওই বিশেটার সঙ্গে লেগে থাকিস না। মাথায় আরো হাজার কথা ঢুকবে।”

অভি আর কিছু বলল না। বুঝল বলা বৃথা। রাতে তাই শোবার পর পরই যখন তপুমামা বিকট আওয়াজ করে নাক ডাকাতে লাগলেন, অভি পা টিপে টিপে ঘর থেকে বাইরে এল। বাকি সবাইও ঘুমিয়ে পড়েছে। পুরো বাড়িটা নিস্তব্ধ, শুধু ওই নাক ডাকার আওয়াজ ছাড়া। অভির কাছে টর্চ আছে, আসার সময় মা জোর করে দিয়ে দিয়েছিলেন। সেটা এখন দিব্যি কাজে লাগছে। সিঁড়ি দিয়ে একতলায় নেমে অভি সোজা গিয়ে উপস্থিত হল বুড়োদাদুর ঘরে।

দরজা খোলাই ছিল, অভি ঢুকে গিয়েই সেটা বন্ধ করে দিল। সুইচ বোর্ড কোথায় জানত, তাই চট করে আলোও জ্বালিয়ে ফেলল।

uponyas01 (Medium)

বেশি খোঁজাখুঁজি করতে হল না। জানলায় সব বড়ো বড়ো ভারী ভারী পর্দা, কাজেই ঘরে যে আলো জ্বলছে সেটা বাইরে থেকে বোঝার সম্ভবনা কম। তাছাড়া দাদুরা আর মামারা গভীর ঘুমে মগ্ন। কে জানবে? আবার অভি সারা ঘরময় ঘুরে বেড়াল, জিনিসপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করল। কিন্তু কিছুই হল না, বরং পুরোনো বই-এর ধুলোয় বার দুই হাঁচল। ভাগ্যিস এ ঘরটা একতলায়, তাই কেউ শুনতে পেল না। খাটের তলা অবধি দেখতে ছাড়ল না। কোত্থাও কিচ্ছু নেই। অভির মনে হল মেজদাদুর কথাই ঠিক। কিছু থাকলে তো জানবেন ওনারাই। সরকারদাদুই ভুলভাল বলছেন। পুরোনো জিনিস, পুরোনোই। তাকে পুরোনো ভাবা হবে না তো কী ভাবা হবে! হয়তো বুড়োদাদুর মাথাটাই শেষ দিকে………। যতই বিশুদা আর সরকারদাদু বলুন না কেন, অভিরও এখন তাই মনে হচ্ছে। কিন্তু ভূতের ব্যাপারটা কী? শুধুই রটনা? বিশুদার সব কথাই বাজে? ঘরের দেওয়ালে বুড়োদাদুর একটা ফটো ঝুলছে। রজনীগন্ধার মালাটা শুকিয়ে গেছে, পালটানো হয় নি। অভির মনে হল বুড়োদাদুর মুখটা বেশ হাসি হাসি, যেন মজা দেখছেন। অভি সেদিকেই তাকিয়েছিল, গাটা কীরকম যেন ছমছম করে উঠল। আলো নিভিয়ে ও তাড়াতাড়ি ঘর থেকে চলে গেল।

সবে দোতলার ঘরে ঢুকেছে তপুমামা ঘুম জড়ানো গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “কী করছিস? বাইরে গেছিলিস কেন?”

অম্লানবদনে “বাথরুমে গেছিলাম” বলে অভি শুয়ে পড়ল।

তপুমামাও আবার ঘোঁররররর… ঘোঁ … করে নাসিকাধ্বনি শুরু করলেন। এ কথা সে কথা ভাবতে ভাবতে অভিও কখন যেন ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুম যখন ভাঙল তখন বাইরে ঝলমলে রোদ্দুর। ঘড়ির কাঁটা আটটা ছুঁই ছুঁই করছে। উঠে বসে জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল অভি। মনে পড়ল কাল রাতে ও বুড়োদাদুর ঘরে গেছিল। ঘরটার কথাই ভাবছিল, হঠাৎ  কী যেন মাথায় খেলে গেল। তড়াক করে বিছানা থেকে নেমে ও ছুটল হাত মুখ ধুতে। বুড়োদাদুর ঘরে যেতে হবে শিগগির, খুব দরকার। একটা জিনিস ভালো করে দেখতে হবে। কিন্তু সে ঘরে ঢোকার আগেই ছোড়দাদুর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল।

“ঘুম ভেঙেছে অভিবাবুর? নে চটপট খেয়ে নে। জলখাবার রেডি। এদিকে আবার আসবাবপত্রগুলো দেখতে লোক আসবে। চল চল খেতে চল।”

বুড়োদাদুর ঘরে যাওয়া হল না, ছোড়দাদু একরকম জোর করেই খেতে নিয়ে গেলেন। আর খাওয়া শেষ হতে না হতেই কতগুলো লোক এসে গেল বুড়োদাদুর ঘরের জিনিসপত্র দেখতে। খাট, আলমারি – এইসব। যতক্ষণ ওরা আছে কিচ্ছু করা যাবে না। অভি ছটফট করে বেড়াতে লাগল। ইশ, কাল রাতে এ কথাটা কেন মনে এল না! অভি আবার বাগানে ঘুরঘুর করতে লাগল।

“এই যে তুমি আবার বাগানে ঘুরে বেড়াচ্ছ। বাড়ির ভেতর দেখি তোমার মন টেঁকে না!” বিশু অভিকে দেখে বলল, “শোনো ওদিকে যেয়ো নি, ওদিকটা জঙ্গল হয়ে আছে। আর শোনো কত্তাবাবুর ঘরের ওই জানলার দিকেও যেয়ো নি বাপু। ওখেনে কত্তাবাবুর যুঁই ফুলের গাছ আছে আর একগাদা ফুলের টব আছে। কত্তাবাবুর খুব পছন্দের, কাউকে ধরতেও দিতেন নি। মিছে কথা বলব নি, কত্তাবাবুর আত্মা ঘুরে বেড়াচ্ছেন, তেনারাও আছেন, কিছু হলে তখন তো আমার ওপরেই সবাই পড়বে। আগে থেকে সাবধান করে দিলুম, পরে আবার বোলো নি যেন।”

বিশু চলে গেল, অভিও গেল বুড়োদাদুর ঘরের দিকটাতেই। জানলার ধারে যুঁই ফুলের গাছ। জানলার নীচে টিন দিয়ে একটা ছোটো শেড মতো করা। তার নীচে সত্যিই একগাদা টব। কয়েকটাতে তো ফুলগাছ টুলগাছ আছে বলেও তো মনে হল না, জংলা গাছ হয়ে আছে। জানলা খোলা এখন, পর্দা হাওয়ায় দুলছে। জানলার ধারে একটা ছোটো ফুটো দিয়ে টেলিফোনের তার, কেবলের তার ঢুকেছে। অভি জানলা দিয়ে উঁকি মেরে দেখল লোকগুলো এখনও ঘরের ভেতর আছে। ধুস্‌, কখন যে যাবে এরা! বিরক্তিতে অভি তারগুলো ধরে টানল। সঙ্গে সঙ্গে জানলার নীচ কী যেন নড়ার আওয়াজ হল। অভি অবাক হল, আবার নাড়াল তারগুলোকে, আবার কী নড়ল টবগুলোর পেছনে। অভি টবগুলোকে সরাল। বেশ ভারি ওগুলো। তাও কষ্ট করে সরাল আর সরাতেই যা দেখল তাতে চক্ষুস্থির! এটা এখানে কে রাখল? কেনই বা? তবে …… তবে কী? অভির মনে হল অন্ধকার একটু একটু করে কাটছে। কেউ দেখে ফেলার আগেই অভি টবগুলোকে আবার যথাস্থানে রেখে দিল।

লোকগুলো ততক্ষণে বুড়োদাদুর ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে। বাইরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাদুদের সঙ্গে কথা বলছে, তপুমামা, রাজুমামাও রয়েছে। অভি দৌড়ল ঘরের দিকে। ঘরে বিশু! বিশু এখানে কী করছে?

“তুমি আবার এখেনে এলে! এইসব বইপত্তর এখেন থেকে বের করতে হবে। সব বিককিরি হবে যে। নাও সরো, আমাকে কাজ করতে দাও দিকিনি,” বিশু বলল।

সর্বনাশ, বিশুদা এখন এখানে থাকবে! তাহলেই তো সব পণ্ড! অভি ভাবতে লাগল কী করে বিশুদাকে এখান থেকে সরান যায়।

“বিশুদা, এখানে অনেক ভালো ভালো বই আছে। আমাকে দেখতে দাও। আমি কতগুলো নিয়ে যাব বেছে বেছে। তুমি যাও, বইগুলো আমি দেখছি। বাছা হয়ে গেলেই আমি তোমাকে ডাকব।”

“হ্যাঁ আমি যাই আর তোমার দাদুরা আমাকে উস্তুম কুস্তম করুন! মিছে কথা বলব নি তোমার ওই মেজদাদুর মেজাজটা বেশ ইয়ে, বাপের মতো হননি। তুমি এখন যাও দিকিনি।”

“প্লিজ বিশুদা বইগুলো দেখতে দাও। কত ভালো ভালো বই! আমি তোমাকে এক্ষুণি ডাকব, দেখা হয়ে গেলেই। তুমি বরং দেখো মেজদাদু চা চাইছে কি না। আমি বই ঘাঁটছি আর তুমি দাঁড়িয়ে আছ দেখলে মেজদাদু আরো রেগে যাবেন, তাই না? তুমি যাও, মেজদাদু কিছু বললে আমি বলব যে আমিই তোমাকে যেতে বলেছি,” অভি শেষ চেষ্টা করল।

“দাদু এক বলে, নাতি আরেক বলে। মিছে কথা বলব নি এরা সব যেন………” বিশু গজগজ করতে করতে চলে গেল।

অভিও তার পেছন পেছন গিয়ে দরজাটা ভালো করে ভেজিয়ে দিয়ে এল। ঠিকই কিছু তো একটা আছে এ ঘরে। বুড়োদাদুর ঘর রঙ করা হয়েছিল কয়েক বছর আগে। সব দিকের দেওয়াল ঠিকঠাক রঙ করা শুধু একদিকের বাদে। কীরকম যেন বেখাপ্পা। দায়সারা করে রঙ করে হয়েছে, তাও যেন নেহাতই আনাড়ি হাতে। দেওয়ালে একখানা বড়ো ছবি ঝুলছে। বিরাট বড়ো তার ফ্রেমটা, মেঝে অবধি। সময় কম, যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে। ছবি ছেড়ে অভি জানলার কাছে গেল। তারগুলো বাইরে থেকে ঢুকে একটা বই-এর র‍্যাকের পেছন দিয়ে গেছে। কিন্তু অন্যপাশ দিয়ে যখন বেরিয়েছে একটা তার কম। গেল কোথায় সেটা? র‍্যাকের বই নামাতে লাগল অভি। হ্যাঁ আছে, র‍্যাকের পেছন দিয়ে তার ঢুকেছে যন্ত্রে। পেছনের দেওয়ালে প্লাগ পয়েন্টও আছে। র‍্যাক আর দেওয়ালের মধ্যে ফাঁক খুবই কম আর সামনে বই ভর্তি, দেখবে কে? একটা রহস্য তো ভেদ হল, কিন্তু এর প্রয়োজন কেন হয়েছিল? সেটা পরে ভাবলেও চলবে।

এই দেওয়ালটাই বা ঠিক করে রঙ করা হয়নি কেন? যেন মনে হয় কিছু একটা কারণ আছে। ভাবতে ভাবতে অভি ছবিটার সামনে এসে দাঁড়াল। ইশ কী ধুলো ছবিটায়! ছবিটাও তো নষ্ট হয়ে গেছে মনে হচ্ছে। অভি ফ্রেমটার দুপাশ ধরে নাড়ানাড়ি করল। আরে এটা তো বেশ হালকা, দেখে যে রকম ভারি মনে হয় সেরকম তো নয়! ছবিটাকে দেওয়ালের হুক থেকে খুলে নামিয়ে ফেলতে অভির একটুও অসুবিধে হল না। নামাতেই দেখল ছবির পেছনে দেওয়ালে একটা ছোটো দরজা। দেওয়ালের মতোই রঙ করা দরজাটা। তার মানে এই দরজা আড়াল করার জন্যেই ছবিটা রাখা হয়েছে। এরকম ব্যাপার গল্পে পড়েছে, সিনেমায় দেখেছে কিন্তু তাদের পুরোনো বাড়িতেই যে এ জিনিস আছে তা কি স্বপ্নেও ভেবেছিল।

এই দরজা দিয়ে কোথায় যাওয়া যায়? কিন্তু জানার বা দেখার উপায় নেই, দরজায় তালা দেওয়া। চাবি, চাবি কোথায় আছে? চাবির গোছা তো ছোড়দাদুর কাছে। অভির মন খারাপ হয়ে গেল। এখন মেজদাদু, ছোড়দাদু, তপুমামা, রাজুমামা – সব্বাইকে সব কিছু বলতে হবে, তারপর চাবি পাওয়া যাবে! কী আর করা। অভি ছবিটাকে আবার দেওয়ালে ঝুলিয়ে রাখবে বলে হাতে নিল। হুকে ঝোলাতেই যাবে এমন সময় কীসে যেন হাত ঠেকল। ছবিটার পেছনে কিছু একটা আছে মনে হল। ছবিটাকে উলটে ধরে ভালো করে দেখে বুঝল একটা ছোটো চাবি, কাগজের একটা খোপের মধ্যে রাখা। আনন্দে, উত্তেজনায় অভি প্রায় লাফিয়ে উঠল, খোঁচাখুঁচি করে চাবিটা বার করে নিতেও দেরি হল না। এই তালারই চাবি এটা। তালা খুলে দরজাটা একটু জোরে ঠেলতেই ক্যাঁচ আওয়াজ করে খুলে গেল। কী অন্ধকার রে বাবা!  ইশ টর্চটা তো আনে নি। কিন্তু টর্চ একটা যে কাল দুপুরে দেখেছিল এখানে। অভি দৌড়ে এসে দেরাজটা খুলল। হ্যাঁ এইতো একটা টর্চ রয়েছে। বুড়োদাদুর। সুইচ টিপে দেখল দিব্বি জ্বলছে। ব্যাস তাহলে আর চিন্তা কিসের? টর্চ জ্বালিয়ে অভি ছোট্ট দরজাটা দিয়ে গলে গেল।

দরজাটা থেকে বেরিয়েই ছোট্ট একটা ল্যান্ডিং আর তারপরেই সরু সিঁড়ি নেমে গেছে নীচে। গেছে কোথায় এ সিঁড়ি? সুড়ঙ্গ আছে বাড়ির বাইরে যাওয়ার? এরকম গোপন পথ আগেকার দিনে থাকত অনেক রাজবাড়ি বা জমিদারবাড়িতে বিপদে আপদে পালিয়ে আত্মরক্ষা করার জন্যে – অভি পড়েছে। নাকি এটা মাটির নীচের ঘর? উত্তেজনায় অভির আর কাউকে খবর দেওয়ার কথা মনেই রইল না। সিঁড়ি দিয়ে নেমে যতে লাগল নীচে। সিঁড়ি যেখানে শেষ হল সেখানে আরেকটা দরজা। এটাতে তালা ছিল না, শুধু হুড়কো আটকানো। খুব শক্ত, বোধহয় অনেকদিন খোলা হয় নি। বেশ কসরত করে খুলতে হল অভিকে। ঘরের ভেতর বড়ো বড়ো ট্রাঙ্ক রয়েছে গোটাকতক, সব কটা তালা দেওয়া। এগুলোর চাবি অভির কাছে নেই, কাজেই এবার দাদুদের ডাকতেই হবে।

ওদিকে বাড়িতে হইচই পড়ে গেছে, অভি কোথায় গেল! রাজুমামা বুড়োদাদুর ঘরের দরজাটা খুলে ‘অভি অভি’ করে ডেকে কোনো সাড়া না পেয়ে উঁকি মেরে দেখলেন। সামনে পুরোনো বইপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে, অভি নেই। সারা বাড়ি খোঁজা হয়েছে, কোত্থাও নেই।

“আশ্চর্য! ছেলেটা গেল কোথায়? এই বিশে বাগানটা দেখ আরেকবার, সারাদিন তো বাগানেই ঘুরঘুর করে বেড়ায়। তপু ফোন কর,” মেজদাদু বললেন।

ফোন বেজে গেল, কেউ ধরল না। সবার চিন্তা আরো বাড়ল। বিশু বাগানে ঘুরে এসে বলল অভি সেখানেও নেই। আর ফোন? দেখা গেল সেটা দোতলার ঘরেই পড়ে আছে। সবাই যখন ভাবছে এবার কী করা হবে, অভি এসে হাজির।

“কী রে তুই ছিলিস কোথায়? আমরা সারা বাড়ি, বাগান খুঁজে খুঁজে হয়রান,” সবাই একসঙ্গে বলে উঠলেন।

“আমি তো বাড়িতেই ছিলাম, বুড়োদাদুর ঘরে,” বলল অভি।

“দাদুর ঘরে? আমি যে এত ডাকলাম শুনতে পাস নি? দেখতেও তো পেলাম না তোকে? কী করছিলিস ওখানে এত মন দিয়ে?” রাজুমামা তো অবাক।

অভি চুপ, মুখে চোখে উত্তেজনার ছাপ, আবিষ্কারের আনন্দ স্পষ্ট।

“মিছে কথা বলব নি, ও ঘরে তেনারা আছেন, কত্তাবাবুর আত্মা আছেন, ও ঘরে ওমন যখন তখন যাওয়া ঠিক নয়। রাম রাম রাম……” বিশু রামনাম জপতে শুরু করল।

“এই চুপ কর ব্যাটা, একদম চুপ!” মেজদাদু ধমকে উঠলেন, “আর একবার যদি ভূতের নামও করেছিস! যা এখান থেকে।”

বিশু রামনাম করতে করতেই দৌড়ল।

“ছোড়দাদু, পুরোনো বাড়ির সব চাবি তোমার কাছে আছে তো?” অভি জিজ্ঞেস করল।

“চাবি? হ্যাঁ এই তো চাবির গোছা আমার পকেটেই আছে, কিন্তু চাবি নিয়ে তুই কী করবি?” অবাক হয়ে ছোড়দাদু জানতে চাইলেন।

অভি সে কথার উত্তর না দিয়ে বলল, “এছাড়া আর কোনো চাবি পেয়েছ কি?”

“আরেকটা গোছা আছে কিন্তু সেগুলো কোন তালারই নয়। বোধহয় পুরোনো চাবি। কেন বলবি তো?”

“কোথায় সেই গোছাটা? শিগগির বলো?”

“আরে কী হয়েছে বলবি তো! চাবি ওপরের ঘরে আছে। খাটে, আমার বালিশের নীচে।”

অভি কোনো কথা না বলে দুদ্দাড়িয়ে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠল। ওর আর তর সইছে না।

চাবি নিয়ে এসে অভি বলল, “তপুমামা বাইরের দরজা টরজা সব বন্ধ করে দাও। বিশুদাকে বলো আমরা বুড়োদাদুর ঘরে কাজ করছি, ওইসব আলমারি টালমারি খালি করছি, এখন যেন আমাদের বিরক্ত না করে। তোমরা এসো আমাদের সঙ্গে।”

কেউ কিছুই বুঝতে পারছেন না, তাও সবাই গেলেন অভির পেছন পেছন বুড়োদাদুর ঘরে। এবার অভি দরজা বন্ধই করে দিল। তারপর দেখাল সেই গোপন ছোটো দরজাটা। সবার তো চক্ষুস্থির!

“কী কাণ্ড! এর কথা তো আমরা জানতামই না!” বললেন মেজদাদু, “আমরা অবশ্য বাইরে বাইরেই থেকেছি, ছোটোবেলায় ছুটিছাটায় আসতাম, বাবা যখন এখানে থাকতে শুরু করলেন আমরা তখন সবাই কলকাতাতেই। কিন্তু তাও নিজের বাড়ি তো, এটাই জানতাম না। তা এই দরজা দিয়ে কোথায় যাওয়া যায়?”

“এসো দেখাচ্ছি,” অভি বলল, “টর্চগুলো জ্বালো।”

অভি ওপর থেকে সবকটা টর্চই নিয়ে এসেছে চাবি নিয়ে আসার সময়।

সরু সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে সবাই সেই মাটির নীচের ঘরে ঢুকলেন।

“এইবার দেখতে হবে কোন চাবিতে এই ট্রাঙ্কের তালাগুলো খোলে,” অভি বলল।

তপুমামা লেগে গেলেন কাজে। একে একে সব ট্রাঙ্কই খুলল। প্রথম দুটোয় পুরোনো হয়ে যাওয়া অনেক বই পাওয়া গেল, ডায়রি, খাতাও রয়েছে কতগুলো।

মেজদাদু, ছোড়দাদু সব দেখেশুনে বললেন, “এগুলো তো ছোটোকাকার জিনিস মনে হচ্ছে। বাবা সব রেখে দিয়েছিল দেখছি ট্রাঙ্ক ভর্তি করে।”

“নাহ কাজের জিনিস কিছুই নেই। অভি তোর এত পরিশ্রম মাঠে মারা গেল!” বললেন ছোড়দাদু।

“দাঁড়াও, এই শেষ ট্রাঙ্কটাও দেখি, কী আছে এর ভেতর,” অভি বলল।

এই ট্রাঙ্কটাতে সব কাপড়ের পুঁটলি বাধাঁ জিনিস। ওপরেরটা ঠিক পুঁটলিও নয়, যেন কিছু মোড়ানো আছে, লম্বা মতো।

“খোল শিগিগির, রাজু, তপু, সাবধানে খোল এটা,” কিছু অনুমান করে উত্তেজনায় এবার মেজদাদুর গলাই কেঁপে যায়।

খোলা হল কাপড়ের মোড়ক। হ্যাঁ যা ভাবা গেছিল তাই, কষ্টিপাথরের শ্যামসুন্দরের মূর্তি। শুধু মূর্তি নয়, মূর্তির গয়নাগাটি আর কিছু বাসনকোসনও রাখা আছে পুঁটলি করে।

“শ্যামসুন্দরের মূর্তি তো চুরি হয়ে গেছিল, তাহলে এখানে এল কী করে?” রাজুমামা বললেন।

“চুরি হয় নি মনে হয়। বুড়োদাদুই মূর্তি, গয়নাগাটি সব কিছু এখানে সরিয়ে রেখেছিলেন, বোধহয় চুরি হয়ে যাবার ভয়ে। কারণ এই ঘরে আসার রাস্তা তো একটাই, বুড়োদাদুর ঘর থেকে। অন্য কারুর আসার কোন সম্ভবনা আছে বলে তো মনে হয় না,” অভি বলল।

“তুই দেখালি বটে অভি! এতো আমরা কেউ জানতেই পারতাম না। আর্দ্ধেক জিনিস তো আমরা নিতাম না, পড়ে থাকত। কে হয়তো এ ঘরের সন্ধান পেত, পেয়ে সব নিয়ে নিত। যাক এখন এসব ওপরে তোলার ব্যবস্থা করতে হবে,” বললেন ছোড়দাদু।

“আশ্চর্য, বাবা এসব কিছু বলে গেল না! অভি যদি না দেখত কী হত!” মেজদাদু বললেন।

“আমাদের ওপর রাগে। বাড়ি বিক্রি করার কথা বললেই তো রেগে যেত, বলত, ‘বাড়িতে কী আছে জানল না, খালি বিক্রি করার ধান্দা!’ এখন এর মানে বুঝতে পারছি।”

তপুমামা, রাজুমামা, অভি মিলে জিনিসপত্র ওপরে তুলতে শুরু করল। বিশুকেও ডাকতে হল। এখন তো আর না জানিয়ে উপায় নেই।

বিশুর তো চক্ষু চড়কগাছ, খালি বলছে, “মিছে কথা বলব নি, এমন কাণ্ড বাপের জম্মে দেখি নি। খুড়োও কিছু বলে নি।”

সবকটা ট্রাঙ্ক ওঠানো হল বুড়োদাদুর ঘরে। নীচের ঘরে আর কিছু পড়ে রইল কীনা ভালো করে দেখা হল, তারপর তপুমামা ছোটো দরজাটাতে তালা লাগিয়ে আবার ছবিটা দেওয়ালে ঝুলিয়ে দিল।

“তুই এই দরজাটা বার করলি কী করে অভি?” রাজুমামা জানতে চাইলেন।

“কাল রাতে তোমরা ঘুমিয়ে পড়ার পর আমি এসেছিলাম এখানে। কী যেন একটা অসঙ্গতি, বেমানান কিছু আছে এ ঘরে মনে হয়েছিল। তখন ধরতে পারি নি। আজ খেয়াল হল। সব দিকের দেওয়াল এত সুন্দর করে রঙ করা, কিন্তু এ দেওয়ালটা নয়। যাহোক তাহোক করে কাজ সারা হয়েছে, যেন রঙ ফুরিয়ে গেছিল। আর তো কিছু নেই এ দেওয়ালে, শুধু এই ছবিটা ছাড়া। এটা দেওয়াল থেকে নামাতেই দরজাটা বেরিয়ে পড়ল। আর দরজায় লাগানো তালার চাবিটাও ছবির পেছনে আটকান ছিল।”

“তাই বলি, কত্তাবাবু রঙের মিস্তিরিদের এই দেওয়াল রঙ করতে দেন নি কেন!” বিশু বলে উঠল, “কাজ পছন্দ হচ্ছে না বলে মিস্তিরিদের ভাগালেন। তারপর আমাকে বললেন, ‘এই বিশে, মই-এ ওঠ, রঙ কর।’ আমি যত বলি, ‘কত্তাবাবু, আমি পারব না ভালো করে করতে,’ কত্তাবাবু ততই বলেন, ‘যা পারিস কর।’ শেষ অবধি আমিই দু পোঁচ লাগালুম। মিছে কথা বলবনি, তখনই আমার মনের ভেতর কেমন একটা সন্দ হয়েছিল।”

বিশু কথা বলায় ব্যস্ত, অন্য কেউও অত খেয়াল করছে না, অভি দুষ্টুমি করার লোভ সামলাতে পারল না। হঠাৎ নাকি সুরে কান্নার আওয়াজে সবাই চমকে উঠল।

বিশু ভয়ে লাফিয়ে উঠে বলল, “রাম রাম…, দিনে দুপুরে পেতনি কাঁদছে গো! মিছে কথা বলব নি, কত্তাবাবুর আত্মা রুষ্ট হয়েছেন। রাম রাম রাম ……”

অভি তো হেসেই গড়িয়ে পড়ল, “এই তোমার পেতনির কান্না বিশুদা? ঠিক আছে আমি এক্ষুণি বলছু পেতনিকে কান্না থামাতে।”

অভি জানলার পাশে র‍্যাকের কাছে গিয়ে বলল, “পেতনি আর কেঁদো না, চুপ করো,” পেতনি চুপ করে গেল।

“এই অভি এসব কী করছিস?” ছোড়দাদু বললেন।

“আরে বাগানে ছোট্ট একটা স্পিকার রাখা আছে টবের আড়ালে। এই দেখো তার ঢুকেছে, এই দেখো তার গেছে বই-এর র‍্যাকে। আর র‍্যাকে বই-এর আড়ালে ছোট্ট রেকর্ড প্লেয়ার। এটা অন করলেই পেতনি কাঁদে আর অফ করলেই চুপ করে যায়, বুঝলে?”

“মানে?” মেজদাদু তখনও যেন বুঝতে পারছেন না।

“মানে ভূত ফূত সব বাজে কথা। যা মনে হচ্ছে এসব বুড়োদাদুই করেছিলেন কাউকে ভূতের ভয় দেখানোর জন্যে।”

“কিন্তু কেন? বাবার এসব করার দরকার কী ছিল?”

বিশু অবশ্য এখনও এসব বিশ্বাস করতে নারাজ, “আর সেই লোকটা? যে মুখ হাঁ করে কত্তাবাবুর খাটে শুয়েছিল? সে কে? মিছে কথা বলব নি, কত্তাবাবু ঘরে ছিলেন নি।”

“লোকটা? এত কিছু যখন পাওয়া গেছে তখন লোকটার খোঁজও পাওয়া যাবে,” অভি বেশ কনফিডেন্ট, “মেজদাদু, বুড়োদাদুর সব আলমারি টালমারি ভালো করে দেখা হয়েছে?”

“না সব হয়নি। ওপর ওপর দেখেছি দরকারি জিনিসপত্রের জন্যে। ওটা? ওটাতে তো বাবার জামাকাপড় আছে। এই বিশে তুই আর এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ‘মিছে কথা বলবনি’ না করে যা, খেতে দে, পেট খিদেয় চুঁই চুঁই করছে। কটা বাজে খেয়াল আছে?”

বিশু চলে গেল। সবাই ট্রাঙ্কের জিনিসপত্র নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। মেজদাদু ফোন করেই সবাইকে খবর দিলেন। ট্রাঙ্কে বেশিরভাগই মেজদাদুদের ছোটোকাকার ব্যবহৃত জিনিসপত্র। বই, খাতাপত্রও আছে।

“বই খাতাগুলো আমাকে না দেখিয়ে যেন ফেলো না মেজদাদু, আমি দেখব কী আছে,” অভি আলমারির জামাকাপড় ঘাঁটতে ঘাঁটতে বলল।

“না বাবা তোকে না দেখিয়ে কিচ্ছু ফেলা হবে না, কিচ্ছু করা হবে না, তুই নিশ্চিন্ত থাক,” মেজদাদু হাসলেন, “চল এবার খেতে চল, অনেক কাজ আছে এর পরে।”

সবাই চলে গেল, অভিও মুচকি হেসে সঙ্গে সঙ্গে চলল। একটু পরেই রান্নাঘরের দিক থেকে আঁ আঁ…… করে বিশুর বিকট চেঁচানি আর অভির উচ্চৈঃস্বরে হাসি শোনা গেল। তপুমামা, রাজুমামা দৌড়লেন, আবার কী করল অভিটা! গিয়ে দেখলেন অভি একটা মুখোশ নয়ে বিশুকে ভয় দেখিয়েছে। বিশু ঠ্যাং ছড়িয়ে মাটিতে বসে আছে আর বলছে, “আর একটুকুন হলেই আমার পেরাণটা বেরিয়ে যাচ্ছিল! মিছে কথা বলব নি, তুমি খুব ইয়ে!”

“এই মুখোশটাই রাতে বিছানায় রেখে বুড়োদাদু সিঁড়ি দিয়ে মাটির নীচের ঘরে গেছিলেন। দরজা খুলতে আওয়াজ হতে পারে, তুমি উঠে আসতে পারো, তাই এটাকে বিছানায় এমনভাবে রেখে গেছিলেন যাতে মনে হয় কেউ শুয়ে আছে আর তাই দেখে তুমি ভয়ে আর না ঢোকো। বুঝলে বিশুদা? মুখোশটা আলমারিতেই ছিল।”

“কিন্তু বিশু দরজাটা দেখতে পায় নি কেন?” রাজুমামা বললেন।

“দরজাটা ভালো করে বন্ধ করে দিলে বোঝা শক্ত। তাছাড়া ঘরে তো আলো খুব কম ছিল আর ভয়, ভয়ে কোনো কিছু খেয়াল করেছে নাকি!” অভি তখনও হাসছে।

“যাও যাও খেতে বোসো দিকিনি। এরকম করে কোনো মনিষ্যিকে ভয় দেখায়!” বিশু রেগেই আছে।

খেতে খেতেও এইসব কথাই হচ্ছিল।

“তোর কীসে স্ট্রাইক করল অভি? তুই বারবার দাদুর ঘরে যেতিসই বা কেন?” তপুমামা জানতে চাইলেন।

“সরকারদাদুর কথায়,” অভি বলল, “সরকারদাদুর কথায় আমার প্রথম মনে হয় যে এর মধ্যে কিছু একটা ব্যাপার আছে। উনি তোমাদের অত করে এখানে থাকতে বলছিলেন আর আমাকে তো পরিষ্কার বলেছিলেন যে ভূত টূত কিচ্ছু নেই। উলটে আরো হিন্টস দিয়েছিলেন যে এ বাড়ির সব কিছুই হাবিজাবি জিনিস নয়।”

“তোর সঙ্গে আবার এত কথা কখন হল ওনার?” ছোড়দাদু অবাক।

“কাল বিকেলে বেরিয়েছিলাম না বিশুদার সঙ্গে? বাজার যেতে গিয়ে সরকারদাদুর সঙ্গে দেখা হল। বিশুদা বাজারে গেল, আমি ততক্ষণ ওনার সঙ্গে কথা বললাম।”

“ওহ! এসব করেছ, অথচ আমাদের কিছুই জানাও নি!” মেজদাদু বললেন।

“এমনি এমনি বললে তোমরা বিশ্বাস করতে? আমি তাই শিওর হতে চাইছিলাম।”

সরকারদাদুকে খবর পাঠানো হয়েছিল, তিনি এলেন সন্ধের দিকে। সব শুনে বললেন, “কিছুটা আমি আন্দাজ করেছিলাম। বিশুর কাকা মারা যাতে আপনাদের বাবা খুব ভেঙে পড়েছিলেন। আমাকে বলেছিলেন, ‘অনেক কাজ করত নেপালটা, সেসব বোধহয় আর কাউকে দিয়ে করাতে পারব না। অত বিশ্বাসী কি আর কেউ হবে?’ আমি একবার ওনাকে বলেছিলাম, ‘একা থাকেন, দামি কোনো কিছু রাখবেন না। একবার তো চুরি হল, কিছু ব্যবস্থা করুন এবার।’ উত্তরে বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেছিলেন, ‘যদ্দিন এই গগনচন্দ্র বাঁড়ুজ্যে বেঁচে আছে তদ্দিন এ বাড়ির একটা জিনিস এদিক থেকে ওদিক হবে না।’ আরো অনেক কথাবার্তা তো হত, শুনে আমার মনে হত এ বাড়িতে মূল্যবান কিছু থাকলেও থাকতে পারে। তবে শ্যামসুন্দরের মূর্তির ব্যাপার আন্দাজ করতে পারি নি। নিজেই লুকিয়ে রেখেছিলেন চোরের হাত থেকে বাঁচাতে! উনি একবার বলেছিলেন বটে, ‘চোরের কাজ চুরি করা, গৃহস্থের কাজ সাবধান হওয়া।’ এইরকমভাবে সাবধান হয়েছিলেন! হতে পারে চুরির চেষ্টা হুয়েছিল। তখন হচ্ছিলও মূর্তিচুরি। আশেপাশের দু একটা পুরোনো মন্দির থেকে হয়েছিল। খবরের কাগজে তখন বেরিয়েওছিল মূর্তিচুরির খবর।”

“আর ভূতের ব্যাপারটা?” অভি জিজ্ঞেস করল, “আপনিই তো আমাকে বলেছিলেন যে এখানে ভূত নেই। তার মানে আপনি জানতেন? ওই পেতনির কান্নাটান্না সব ক্যাসেটে বাজে? সব সাজানো?”

সরকারদাদু হাসলেন, বললেন, “হ্যাঁ আমি জানতাম। ওই কীর্তিটা মানে বই-এর র‍্যাকে লুকিয়ে রেকর্ড প্লেয়ার রাখা, বাইরে সেইরকমই লুকিয়ে সাউণ্ড বক্স ফিট করা – এসব আমরাই করেছি। প্ল্যানটা গগনবাবুর, একদিন বললেন, ‘বাড়িটাকে ভূতের বাড়ি বানিয়ে দিলে কেমন হয়?’ আমি প্রথমে মজা ভেবেছিলাম, তারপর দেখি যে না উনি বেশ সিরিয়াস! ওই কান্নার ক্যাসেট আমিই দিয়েছিলাম। আমার কাছে ওরকম অদ্ভুত অদ্ভুত নানানা আওয়াজের ক্যাসেট, সিডি আছে। আমার শখ বলতে পারেন।”

“এত কিছু করেছেন কিন্তু আমাদের কখনও জানান নি, কিছু বলেন নি,” মেজদাদুর গলায় অভিমান।

সরকারদাদু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন, তারপর বললেন, “এসব ব্যাপারে আমার কথা বলা উচিত নয় তাও বলছি। অভিমান ওনারও ছিল। আপনারা বিশেষ আসতেন না বলে। আমি অনেকবার বলেছি আপনাদের কাছে চলে যেতে, বলতেন, ‘না না ছেলেদের ওই খুপরিতে কে যাবে? দুদিন রাখার পর একজন বলবে, এবার কদিন ওর কাছে থাকো। তারপর সেখান থেকে আরেকজনের কাছে। না না ওসব আমার পোষাবে না। যতদিন আছি এখানেই থাকব।’ ওনার মনোভাব বুঝে আমিও আর কিছু বলি।

তবে অভি একটা কাজের কাজ করেছে। বুদ্ধিমান ছেলে, বুড়োদাদুর মতো মাথা!”

এটা অবশ্য সবাই একবাক্যে মানছেন। অভি না এলে যে কী হত!

অভি এদিকে সারা সন্ধে পুরোনো বইখাতা নিয়েই বসে আছে, রাতেও ঘুমোল না। ঘুমোল অবশ্য কেউই না ওই রাতে। একে তো এইসব অত্যাশ্চর্য ঘটনা, তার ওপর বাড়িতে এত দামি দামি জিনিস। সবাই একরকম জেগেই রইল।

পরদিন একটু বেলা হতে না হতেই পুরো বাড়ি সরগরম। অভির আবিষ্কারের কথা জানতে পেরে সবাই এসে গেছে। সিঁড়ি দিয়ে নেমে সবাই মাটির নীচের ঘর দেখতে যাচ্ছে। অভির কিন্তু এসব দিকে কোনো খেয়াল, ও ওইসব পুরোনো বইখাতা নিয়েই পড়ে আছে। দুপুরে খেয়েদেয়ে উঠে যখন সবাই গল্প করছে, অভি এল সেখানে, হাতে একটা ছোট্ট জিনিস।

বলল, “এইটা পেলাম। বই খাতার ডাঁই-এর মধ্যে থেকে বেরোল। একটা ছোটো গনেশ, একটা বাক্সে ছিল।”

সবাই দেখলেন সেটা। একেবারেই ছোটো, বড়োজোর দেড় কী দুই ইঞ্চি। পেতলের তৈরি।

“এটা তুইই নে। এত বুদ্ধি তোর, এটা তোরই প্রাপ্য,” বললেন মেজদাদু।

“আমি কিন্তু ওর মধ্যে থেকে কিছু বই আর বুড়োদাদুর ভাই-এর ডাইরিগুলো নেব,” অভি বলল।

“নিয়ে যাস, নিয়ে যাস, কেউ বারণ করবে না,” ছোড়দাদু হেসে বললেন।

“কী সর্বনাশ অভি! তুই ওই একগাদা পুরোনো বইপত্তর ফ্ল্যাটে নিয়ে যাবি!” অভির মা বললেন।

কিন্তু ওঁর আপত্তি ধোপে টিকল না। সবাই এখন অভির প্রশংসায় পঞ্চমুখ।

চুপচাপ বসে থাকা অভির ধাতে নেই। ও গণেশটা নিয়ে খুটখুট করেই যাচ্ছে। হঠাৎ বলল, “আরে এর ভেতর তো কিছু আছে মনে হচ্ছে! হ্যাঁ এই দেখো, কী নড়ছে দেখো,” অভি গণেশটা পাশে বসা বাবার হাতে দেয়।

উনি ওটা কানের কাছে এনে নাড়িয়ে বললেন, “হ্যাঁ ঠিকই, কিছু নড়ছে ভেতরে।”

গণেশ একে একে সবার হাতে হাতে ঘুরল। সবাই একমত যে ভেতরে কিছু আছে। কিন্তু খোলা হবে কী করে? আবার অভির দ্বারস্থ সবাই।

“দেখ বাবা তুই কী করে খুলবি।”

কিছুক্ষণের চেষ্টার পর সফল হল অভি। গণেশের মূর্তির পেছন দিকে একটা ছোটো স্লাইডিং ঢাকনা। সেটা খুলতেই কালো রঙের মেহগনি কাঠের টেবিলের ওপর ছড়িয়ে পড়ল কতগুলো ছোট্ট ছোট্ট জিনিস। ঘরের টিউবের আলোতেও সেগুলো বেশ ঝলকাচ্ছিল।

“হিরে!” ঘরে একটা অস্ফূট গুঞ্জন উঠল

অভি একদৃষ্টে সেদিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “বুড়োদাদুর ছোটো ভাই মধ্যপ্রদেশে এক রাজার এস্টেটে কাজ করতেন। অনেক কিছুই করতেন, অড জব ম্যান বলতে পারো। একবার রাজার এক আত্মীয়র বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান চলাকালীন ডাকাত পড়ে। ওনার উপস্থিত বুদ্ধি আর সাহসের জোরেই ডাকাতরা ধরা পড়ে। রাজা খুশি হয়ে ওনাকে অনেক উপহার দিয়েছিলেন। এগুলো সেই সময়েই পাওয়া।”

“তুই এত কথা জানলি কী করে?” অভির বাবা জিজ্ঞেস করলেন।

“ওনার ডায়রিতে লেখা আছে এক জায়গায় দেখলাম, কী কী উপহার পেয়েছিলেন।”

“এগুলো তুলে রাখুন। এরকম ছড়িয়ে পড়ে থাকা ঠিক নয়,” অভির বাবা  হিরেগুলো তুলে নিয়ে মেজদাদুর হাতে দিলেন।

“এখন কথা হচ্ছে এগুলোর কী হবে,” বললেন মেজদাদু, “আমি গণেশটা অভিকে দিয়েছি। তার মানে গণেশের পেটের ভেতর থাকা হিরেও অভিরই প্রাপ্য। ও যদি নিতে চায় তো ও নিক, আমাদের কেউ আপত্তি করবে না।”

অভির মা বাবা কী যেন বলতে যাচ্ছিলেন, ছোড়দাদু থামিয়ে দিলেন, “না তোমরা কিচ্ছু বলবে না। অভির যা ইচ্ছে তাই হবে।”

অভি একবার বাবা মার মুখের দিকে তাকাল, তারপর বলল, “না এগুলো আমি নেব না। এগুলোর কী হবে সে তোমরা ঠিক করো। আমি শুধু বইখাতা, ডায়রিগুলো নেব। ওগুলো আমার।”

সপ্রশংস দৃষ্টিতে সবাই অভিকে দেখলেন। ইচ্ছে করলে ও সবকটা হিরেই নিতে পারত। সবার সামনে নাও বলতে পারত যে গণেশটার ভেতরে কিছু আছে, কেউ কিছু জানতেই পারত না। অভির অবশ্য এসব নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। ও গণেশটা নিয়ে ওপরে উঠে গেছে। আবার ওই পুরোনো খাতাগুলো খুলে বসেছে। ডায়রিতে তো সংক্ষিপ্ত দিনপঞ্জি আছে কিন্তু খাতাগুলোতে বুড়োদাদুর ছোটো ভাই-এর প্রবাস জীবনের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা আছে। মনে হয় এগুলো উনি পরে লিখেছিলেন। কত কিছু যে করেছিলেন উনি! তাছাড়া যে কাজের পুরস্কার হিরে হতে পারে সে কাজের রোমহর্ষক বিবরণ না পড়ে শেষ করা অবধি শান্তি আছে নাকি!

বৈঠকখানায় যখন সবাই বাড়ি, জমি ইত্যাদির দরদস্তুর, হিসেবনিকেশে ব্যস্ত অভি তখন মগ্ন পুরোনো খাতার পাতায়। হলুদ পাতায় খুদে খুদে অক্ষরগুলো ওকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে বহু বছর আগেকার সেই দিনগুলোতে। অভি পড়ে চলে, পড়েই চলে।

ছবিঃ শিমুল