একেকজনের পুষ্যি হরেক টিঙ্কু,টাইগার আর টেডি রাহুল গুহঠাকুরতা

টিঙ্কু,টাইগার আর টেডি

রাহুল গুহঠাকুরতা

।১। টিঙ্কু- এক সাচ্চা বীরের বিদায়-গাথা

টিঙ্কু আমাদের ছেড়ে চলে গেল, চিরকালের মতো। টিঙ্কু কোনো মানুষ নয়, লাল টকটকে এক রোড আইল্যান্ড মোরগ। আমার বহু লেখাতে ঘুরেফিরে এসেছে যে লাল মোরগের কথা,ও সে। গত পাঁচবছর সুখে দুঃখে আমার মতো এক অতি সাধারণ মানুষকে সঙ্গ দিয়ে চলে গেল এক সাচ্চা বীর,এক প্রকৃত দলপতি।

আজকাল এই ব্যস্ত জীবন,চারদিকে এত খুনোখুনি, মৃত্যুমিছিল। জানি, দুদণ্ড স্থির হয়ে এক মোরগের কথা শোনার সুযোগ কোথায়? তবুও আমি বলব, স্বগতোক্তির মতোই বলব। এটাই আমার বিদায়ী দোস্তের প্রতি আমার শেষ শ্রদ্ধার্ঘ্য।

টিঙ্কুকে আমরা কিনে এনেছিলাম মাটিগাড়া হাট থেকে, একঝাঁক মুরগির সঙ্গে। আমার মুরগির খোঁয়াড়ে তখন একচ্ছত্র অধিপতি ‘মোটা’, এক বিশালদেহী মোরগ। রোড আইল্যান্ড মুরগি বাড়ানোর ঝোঁকে কেনা মুরগিগুলোর সঙ্গে টিঙ্কু ছিল ফাউ‌। রোগা শালিকের মতো হাড়জিরজিরে এক বাচ্চা। একটা পা কোনো আঘাতে বাঁকা মতো। মোটা মোরগ, মুরগিগুলোকে তার হারেমে স্বাগত জানালেও টিঙ্কুকে মেরে ফেলতে চাইল। মহা মুশকিল, ওকে রাখি কোথায়? হঠাৎ আমাদের ক্যাম্পবেল হাঁসের দলের সর্দারনী ‘কালী’ এসে প্যাঁকপ্যাঁকিয়ে কী যেন বলল।ব্যস, সেই থেকে টিঙ্কু হয়ে গেলো হাঁসের দলের সদস্য। 

‘মোটা’ ওকে তাড়া করলেই কেন জানি না, ও এসে আমার পেছনে লুকোত। মায়া পড়ে গেল। আমি ওকে আলাদা করে বাটিতে গম আর ভুট্টার দানা নিজে হাতে খাওয়াতাম। তখনো বাচ্চা,ভেবেছিলাম ও বোধহয় মুরগি। বলতাম, বড়ো হয়ে লাল টুকটুকে ডিম খাওয়াবে। যত্ন পেয়ে তরতরিয়ে বেড়ে উঠল, ভাঙা পা-ও সেরে উঠল। লাল রঙে যেন আলো ঠিকরে পড়ে, বিশাল লাল ঝুঁটি গজালো। ডাক ফুটল, বুঝলাম এ বড়ো রূপবান এক মোরগ।

এক রবিবার সকালের জলখাবার খেয়েই কী যেন মনস্থির করে নিল। আমার দিকে চেয়ে বারকয়েক কোঁকোর কোঁ ডেকে (বোধহয় অনুমতি চাইছিল) হাঁসের দল সমেত সোজা মুরগির খোঁয়াড়ে ঢুকে পড়ল। লড়ে আদায় করে নিল নিজের স্থান। হাঁসেরাও ওর সঙ্গেই রয়ে গেল। সেই থেকে এতদিন ও মুরগি আর হাঁসের দলের অবিসংবাদি দলপতি ছিল।

এমন মোরগ দেখা তো দূর, আমি কখনো শুনিওনি। সবসময় কুকুরের মতো আমার পায়ে পায়ে ঘুরত। আমি বাটিতে করে কিছুটা দানা নিজে হাতে খাইয়ে না দিলে সেদিন খেতই না। আমি কোনো কারণে ঘরের বাইরে না গেলে সোজা বেডরুমে ঢুকে এসে একবার দেখা করে যেত। খাবার পেলে সব হাঁসমুরগিকে ডেকে এনে খাওয়াত। শুধু আমার স্ত্রী বেগুন পোড়া বা ভাজা করে দিলে সেটার কোনো ভাগ হত না।

আমি ওকে মুরগির বাচ্চাদের বাঁচাতে গোখরোর উদ্যত ফনার সামনে রুখে দাঁড়াতে দেখেছি। বিশাল গোখরোর ফনায় লাথি মেরে রক্তাক্ত করতে দেখেছি। রাতের বেলা একা লড়াই করে ভামবেড়ালের গ্রাস থেকে মুরগির ডিম বাঁচাতে দেখেছি। শীতের আঁধার রাতে একবার হিংস্র বনবেড়াল মুরগির খোঁয়াড়ে চড়াও হল,তখন ও একা লড়ে তাকে ঠেকিয়ে রেখেছিল। আমি বনবেড়ালকে তাড়াতে গেলে পোষা কুকুর টেডিও ভয়ে সঙ্গে আসেনি। কিন্তু টিঙ্কু সাচ্চা দোস্তের মতো কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়ে হানাদারকে ভাগিয়েছিল।

তবে ওই লড়াইয়ে ওর পালক মাতা হাঁস ‘কালী’ মারা যাওয়ার পর থেকেই ও কেমন যেন বুড়িয়ে যেতে লাগল। মুরগির কোনো বাচ্চা অসুস্থ হয়ে পড়লেই ও তাকে আমার কাছে এনে হাজির করত। আশা, আমি হয়তো বাচ্চাটাকে সারিয়ে তুলব। অসহায় আমি কখনোই ওর আশা পূরণ করতে পারিনি, তবুও আমার ওপর ভরসা ওর কখনো টাল খায়নি। টিঙ্কু ছিল সাচ্চা দলপতি। কখনো ওর দলে দুর্বলের ওপর অত্যাচার ঘটতে দেয়নি। সবসময় সবচেয়ে দুবলা বাচ্চাকে নিজের বিশাল ডানায় আশ্রয় দিয়ে দুনিয়াদারি শিখিয়েছে‌। দুঃখজনক, আমার পুষ্যিদের আর কেউ টিঙ্কুর মহত্বকে অর্জন করতে পারেনি। ও মোরগ জীবনের শেষপ্রান্তে পৌঁছেছিল। শরীর ভারী হয়ে গিয়েছিল,পায়ের পুরোনো চোট বেশ ভোগাচ্ছিল। শরীরের আগুন-লাল রঙ ধীরে ধীরে কালচে হয়ে যাচ্ছিল। অবশেষে আজ সকালে বিদায় নিল সাহসী,লড়াকু, স্নেহময় এক সাচ্চা নেতা।

বিদায় বন্ধু, বিদায়। আমি ঠিক জানি, স্বর্গ বলে যদি কিছু থাকে তবে তার বাগানের সবচেয়ে সুন্দর গাছটায় তুমি তোমার বিশাল লাল ডানায় উড়াল ভরে গিয়ে বসেছ।

।২। টাইগার-এক আমৃত্যু যোদ্ধা

সে বহুবছর আগের কথা। উত্তরবঙ্গ বলতে তখন জলাজঙ্গল আর চা বাগান। সাপ বাঘের আস্তানা আর ম্যালেরিয়ার ডিপো। শিলিগুড়ি তখন ছোটো শহর, জলপাইগুড়ির রমরমা। ডুয়ার্সে ট্যুরিজম তখন কষ্টকল্পনা, গঙ্গাপারের বাবুমশাইরা কেবল দার্জিলিং বেড়াতে আসতেন। দার্জিলিং শহর তখনো কংক্রিটের জঙ্গল হয়ে ওঠেনি, চারদিকে কেবল সবুজ রঙা কাঠের বাংলো তাতে লালটুকটুকে টিনের চাল। ম্যালে বেড়াতে বেড়াতে পেঁজা তুলোর মতো মেঘদের ছুঁয়ে দেখা যায়, তারাও দুষ্টুমিতে আলতো ভিজিয়ে দিয়ে আমোদ করে। গ্লিনারিসে সাদা চামড়া সায়েব মেমের ভিড় উপচে পড়ে। গোলঘরের লাঞ্চ তখনো স্বাদকোরকের অতুল আনন্দ। চা বাগানগুলোতে তখনো গুটিকয় সাদা চামড়ার ম্যানেজার টিমটিম করে টিকে আছেন। ঠিক এমন সময়ে টাইগার এসেছিল আমাদের বাড়িতে।

না, ঠিক আমাদের বাড়িতে নয়, টাইগার ছিল আমার পিসেমশাইয়ের পোষা কুকুর। বাবা আর পিসেমশাই দুজনের চাকরি করতেন একই চা বাগানে। ম্যানেজার ছিলেন স্কটিশ সাহেব গর্ডন মিলার। দুর্দম ডাকাবুকো তেমনি জাঁদরেল শিকারী। সবসময় তার ছায়াসঙ্গী ছিল বিশাল আর হিংস্র টিবেটিয়ান ম্যাস্টিফ কুকুর বুচ। বুচ আর মিলার সাহেব দুজনে মিলে বহুবার তখনকার কুখ্যাত ডাকাতদলের মোকাবিলা করেছিলেন। চা বাগানে তখন জঙ্গুলে কানুন চলতো। একবার প্রায় দুশো সশস্ত্র শ্রমিক মিলার সাহেবকে আক্রমণ করে, বুচ নাকি একাই সেই হিংস্র ভিড়কে রুখে দিয়েছিল। যাই হোক,বুচ ছিল মাদী কুকুর। মিলার সাহেব বড়ো শখ করে তাকে ক্রসব্রিড করান কোনো এক শেফার্ড ডগের সঙ্গে। কয়েকটি বাচ্চা হয়। এমন এক রাতেই ঘটে যায় দুর্ঘটনা। বাংলোর বারান্দা থেকেই বুচকে চিতাবাঘে ধরে নিয়ে যায়। অমন দুর্দান্ত কুকুর-ও কোনোভাবেই বাধা দিতে পারেনি। রাগে অপমানে সাহেব কুকুরের দুধের বাচ্চাগুলো সব দান করে দিয়ে জঙ্গল থেকে একটা চিতাবাঘের বাচ্চা ধরে এনে পোষ্য বানান। সেই বাঘের বাচ্চার কারণেই পরে সাহেবকে একটি পা খোয়াতে হয় আর বাঘটি সাহেবের বন্দুকের গুলিতে মারা যায়। সে অন্য প্রসঙ্গ, আমি বরং টাইগারের গল্প বলি।

পিসেমশাই-ও শখ করে একটা বাচ্চা চেয়ে এনেছিলেন, কিন্তু দুদিনেই তাঁর শখ মিটে যায়। বাচ্চাটা তখনো দুধ ছাড়েনি,কে তার দেখাশোনা করবে? এবার বাবা দায় নিলেন। ফিডিং বোতলে করে দুধ খাইয়ে ওকে বাঁচিয়ে তুললেন। দেখতে দেখতে ছোটো বাচ্চা হৃষ্টপুষ্ট হয়ে উঠতে থাকল,শখ করে তার নাম দেওয়া হলো টাইগার। কিন্তু ওর যে কিছুতেই ক্ষিদে মেটে না!বোতলের পরে বোতল দুধ উড়ে যায়। এবার সে ভাত রুটি খাওয়া ধরল। কাজের লোক রুটি বানিয়ে হয়রান, হাঁড়ি ভরা ভাত নিমেষে ফিনিশ।

ভয়ানক বেড়ে উঠল সে, যেমন আকারে তেমন স্বভাবে দানব। বিশাল লালচে কালচে নেকড়ে বাঘের মতো চেহারা, শরীরের লোমগুলো বেশ বড়োবড়ো আর কর্কশ। কোনো শেকলে তাকে বেঁধে রাখা যেত না, মোটা মোটা স্টিলের শেকল সে হেলায় ছিঁড়ে ফেলত। বড়ো বড়ো বেড়াও সে প্রকান্ড লাফে টপকে যেত। বাবা এক বিকেলে ওকে নিয়ে বেড়াতে বেরিয়েছিলেন,পাশের মাঠে চরছিল একদল ছাগল। টাইগারের এক ঝটকায় বাবা মাটিতে পড়ে গেলেন,স্টিলের চেনে হাত কেটে রক্তারক্তি। টাইগার একটা ছাগলকে টুঁটি কামড়ে মেরে ফেলল, হিংস্রভাবে কাঁচা মাংস ছিঁড়ে খেতে লাগল। সেই থেকে সবাই তাকে ভয় পেত,কেউ ভালোবাসতো না।

সে একা-একাই থাকত, বড়ো বদমেজাজি। কোনো বন্ধু ছিল না তার। চেন ছিঁড়ে একা একাই চা বাগানে, বনে জঙ্গলে ঘুরত। বুনো খরগোশ এমনকি পোষা ছাগল মেরে খেয়ে ফেলত, বাবাকে প্রায়ই ক্ষতিপূরণ দিতে হত ওর জন্য। চান না করে গায়ে বুনো গন্ধ, যেন জংলি বাঘ। আকারে এক ভয়াল দানব। গলায় অসম্ভব জোর। হৌ হৌ হৌ, তিনবার চেঁচাত সে, ক্রমান্বয়ে গর্জন করত, নিস্তব্ধ বাগানে মাইল-কে-মাইল দূর থেকেও শোনা যেত তার গর্জন।

টাইগারের আর একটা হিংস্র শখ ছিল। যেকোনো কুকুরকে দেখতে পেলেই তাকে আক্রমণ করে হত্যা করত। কুলিবস্তির কুকুরগুলো দলবেঁধে লড়েও বাঁচতে পারত না। টাইগার নামটাই তখন এক মূর্তিমান আতঙ্ক। ঠিক এমন সময়ে জন্ম হল আমার।

জানি না কেন, টাইগার প্রথম দেখাতেই আমাকে ভালোবেসে ফেলেছিল। শুনেছি,আমি দোলনায় শুয়ে থাকতাম, টাইগার ঠায় সেখানে শুয়ে শুয়ে একদৃষ্টে আমাকে দেখত। চেঁচাত না,পাছে আমি ঘুম ভেঙে উঠে কাঁদি।

ধীরে ধীরে বড়ো হলাম। টাইগারকে কত যে অত্যাচার করেছি! ঘোড়া বানিয়ে পিঠে চাপতাম,ওর বড়ো বড়ো চুলগুলো ধরে টানতাম,মাথায় চাঁটি মারতাম,কখনো রাগ করেনি সে। আরো বড়ো হলাম। আমার তেমন কোনো বন্ধু ছিল না। চা বাগানের স্টাফ কোয়ার্টারে আমার কাছাকাছি বয়সের একটি ছেলেই ছিল। কিন্তু সে একবার আমার রোপণ করা (আমি বলতাম পোষা) তেঁতুলচারা উপড়ে ফেলায় আমি তাকে বেদম মেরেছিলাম,বন্ধুত্ব টেকেনি। মেয়েদের রান্নাবাটি খেলায় আমি বাজার করতাম। ঘাসফুলের ফুলকপি আর জবাপাতার লুচি এনে দিয়েই আমার খেলা ফুরোত। বাকি সময় কেবল আমি,আমার পোষা একঝাঁক পিঁপড়ে,রামপাঁঠা ঝন্টু,কালী গাই আর আমার ছায়াসঙ্গী টাইগার। কত নির্জন দুপুরে যে আমি মুগ্ধ হয়ে গাছপালার মগডালে পাখি দেখতাম, আর টাইগার একমনে আমাকে দেখত, কী দেখত কে জানে?

তখনো চা বাগানে বিজলি আসেনি। শনিবার বিকেলে বাবা কোম্পানির গাড়ি নিয়ে চলে যেতেন শিলিগুড়ি,সপ্তাহের বাজার করে আনতে। ফিরতে রাত হত। রান্নাঘরটা মূল কোয়ার্টার থেকে বেশ কিছুটা দূরে। পেছনেই বিরাট সবজি বাগান, তার পরেই চা বাগান শুরু। রাতের বেলা মা লম্ফ-র আলোয় লাকড়ির উনুনে রুটি বানাতেন, আমরা রান্নাঘরে গুটিসুটি মেরে বসে থাকতাম। একটা হুতোম পেঁচা দূরগুম দূরগুম করে চেঁচিয়ে আমাদের ভয় দেখাত। তখন চা বাগানে বড়ো বাঘ(রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার) থাকত। একটা বাঘ রান্নাঘরের পিছনের চা বাগানে ডাক ছাড়ত, ক্রমাগত ডাকত, “আঁউম আঁআআউমম।” আমরা তড়িঘড়ি রাতের খাবারটা নিয়ে শোবার ঘরে পালিয়ে আসতাম।

একবার তেমনি এক রাতে মাংস রান্না হচ্ছে। এমন সময় নিকষ কালো আঁধার যেন কেঁপে উঠলো বাঘের হুঙ্কারে। কিন্তু মাংস যে রান্না হয়নি? আমরা ঘরে যাই কীভাবে? বাঘটা ডেকেই যাচ্ছে,আমরা ভয় পাচ্ছি। এমন সময় সেই চেনা গর্জন, “হৌ হৌ হৌ”,টাইগার এসে পড়েছে। বাঘ সিংহে ওর থোড়াই কেয়ার, সোজা ছুটে গেল আঁধার সবজিবাগানে।

তারপর বহুক্ষণ কেবল বাঘের ঘড়ঘড় গোঙরানি আর টাইগারের গরগর গজরানো। জানালা দিয়ে তাকিয়ে কিছুই বোঝা যায় না। কেবল নিকষ কালো আঁধারের বুকে সহস্র জোনাকির আলপনা। আমরা টাইগারের আশা ছেড়ে দিয়ে শোবার ঘরে চলে এলাম। কিছু পরে টাইগার ফিরে এল। গায়ের লোমগুলো খাড়া হয়ে গেছে,পেশিগুলো থরথর করে কাঁপছে। ভয় পেয়েছে কিন্তু বাঘটাকে হটিয়ে দিয়ে এসেছে। সে-রাতে বোধহয় ওর মা বুচের আত্মা শান্তি পেয়েছিল।

একরাতে মিলার সাহেব চিতাবাঘ শিকার করতে বেরিয়েছেন। ভদ্রু এক্কার শুয়োরটাকে আরাম করে খাচ্ছিল বাঘটা, সাহেবের গুলিটা ফশকাল। বাঘটা সোজা বড়ো নালায় ঝাঁপিয়ে পড়ে পালাল। কোয়ার্টারের পাশে নালার ধারেই কম্বলমুড়ি দিয়ে বসে ঝিমোচ্ছিল চৌকিদার বাহাদুর। বাঘ ওর পাশ কাটিয়ে চলে গেল, চৌকিদারের কোনো হেলদোল নেই। সাহেব বললেন, “বাহাদুর, তুম তো সচমুচ বাহাদুর হো। তুমহারা পাশ সে টাইগার গুজরা, ফির ভি ডরে নেহি?”

বাহাদুর অম্লান বদনে বলে,“হাঁ, টাইগার গুজরা, কোই বাত নেহি।” সাহেব না বুঝলেও আমরা তো বুঝেছি,বাহাদুর আসলে বাঘটাকে আমাদের কুকুর ‘টাইগার’ ভেবেছিল। 

একবার পুজোয় আমার লাল জামাপ্যান্ট হয়েছে, খুব আনন্দ। নতুন কাপড় পরে বিকেলে একা একাই বেড়াতে বেরিয়েছি। হঠাৎ দেখি তিনটে মোষ চরছে। লাল পোশাক দেখেই ওরা চোখ লাল করে ফোঁসফোঁস করতে লাগল। আমি তো বাড়ির দিকে দে ছুট। বাড়ির সামনে পৌঁছে দেখি, সর্বনাশ, গেট বন্ধ। এদিকে মোষগুলো এসে পড়েছে। আমি প্রাণপণে গেটে ধাক্কা মেরে চ্যাঁচাচ্ছি। কেউ শুনল না,কেবল একজন ঠিক আমার আর্তনাদ শুনেছিল। এক ঝটকায় চেন ছিঁড়ে এক বিশাল লাফে গেট টপকে বেরিয়ে এল টাইগার। কালান্তক যমের মতো মারমুখী মোষগুলো আর আমার মাঝে রুখে দাঁড়ালো আমার দোস্ত। সে প্রাণ-বাজি-রাখা লড়াইয়ে মোষগুলো আহত হয়েছিল। আমার প্রাণ বেঁচে গেলেও আহত মোষের চিকিৎসায় কিছু ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছিল।

এরপর আমি শহরে চলে যাই,স্কুলে ভর্তি হতে হবে যে। জিপে চড়ে যেতে যেতে দেখেছিলাম, টাইগার রাগে ক্ষোভে জিপটাকেই আক্রমণ করছে। আমার চলে যাওয়া রুখতে চলন্ত জিপের টায়ার কামড়ে ছিঁড়ে ফেলতে চাইছে। 

তারপর বহুবছর আর বাগানে ফেরা হয়নি। শুনেছিলাম,টাইগার আমাদের বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। পিসেমশাই তখন পাশের চা বাগানে কর্মরত,বাগানটা হাইওয়ের লাগোয়া। টাইগার সেখানেই গিয়ে উঠেছে। দেখতে দেখতে তার বয়স হয়েছিল চোদ্দো। দাঁত পড়ে গিয়েছিল,নখে আর ধার ছিল না। তবে তার ‘হৌ হৌ হৌ’ গর্জন, তখনো বহুমাইল দূর থেকেও শোনা যেত। আর একটা জিনিস সে ভোলেনি। রোজ হাইওয়ের ধারে গিয়ে বসে থাকত। কোনো জিপ দেখলেই তাড়া করত, টায়ার কামড়ে ছিঁড়ে দিতে চাইত।

এমনই এক মনখারাপ বিকেলে, এক জিপের টায়ারের নীচে থেঁতলে প্রাণ দিল এক আমৃত্যু যোদ্ধা। লাল রক্তের ওপরে প্রতিফলিত হচ্ছিল শেষ বিকেলের গোলাপি আলো। টাইগার জীবনের শেষদিন পর্যন্ত লড়াই ছাড়েনি। টাইগার,ভাইরে,তোকে আজও বড়ো মনে পড়ে।

৩। টেডি

সেবছর চা বাগানে বুনো হাতির বড়োই উৎপাত। বাগানটার অবস্থা তেমন ভালো তো নয়। ওই চলছে আরকি ধুঁকে ধুঁকে।‘চলতি কা নাম চা বাগান’ বলা যায় বোধহয়? ঠিকমতো মজুরি মেলে না। অনেক শ্রমিক পালিয়েছে এধার ওধার। পেট বড়ো বালাই, ‘বলি শরীরটাকে তো রাখতে হবে, নাকি?’

এত অল্প শ্রমিকে বাগানের সব সেকশনে পাতা তোলা মুশকিল। আগাছা নিড়িয়ে সাফসুতরো রাখা তো স্বপ্ন। ফলে পিকচার পোস্টকার্ডের মতো চা বাগানে এধার ওধার গাছগুলো বেড়ে উঠেছে আপন খুশিতে। ল্যানটানা ঝোপ আর ম্যাকানিয়া লতায় ঢেকে একেবারে মিনি ফরেস্ট।

বাগান থেকে দুটো ছোট্ট গ্রাম পেরোলেই ব্যাঙডুবি বনাঞ্চল। সেখানে বারোমাস একদল বুনো হাতির ডেরা, ওই যাকে রেসিডেন্ট এলিফ্যান্ট বলা হয় আরকি। তা জঙ্গল তো বাঘ, হাতি,বাইসনের ঘর। ওরা তো সেখানে রইবেই। কিন্তু মানুষ মানলে তো সেটা? গাছ কেটে বসত করবে, জঙ্গলের কাঠকুটো কুড়োবে, জঙ্গলের ফলফুল শাকপাতা সবকিছু আত্মসাৎ না করলে যেন স্বস্তি নেই। বুনো জানোয়ারগুলোর এদিকে অস্বস্তির শেষ নেই। বর্ষাকালে তবু একরকম করে চলে যায়, শীতকালে অভাব একেবারে চরমে ওঠে। শীতকাল বড়ো রুখাশুখা, এসময় গরিবের যেমন কষ্ট তেমন বনেও খাবার বাড়ন্ত। বনে গাছপালায় পাতা ঝরে গেছে,ঘাসপাতা অমিল, ফলফুল সব মানুষে কেড়ে খেয়েছে। এমনকি নদী ঝোরার জলও শুকিয়ে উঠেছে। তা জলের আর দোষ কী? মানুষ তো ধরতি মায়ের বুক চিরে পাম্প করে সব জলটাই চুষে খাচ্ছে। দেশ এখন খাদ্যে স্বনির্ভর, তিনটে ফসল ফলাতেই হবে। 

এদিকে হাতিদের রোজ যে প্রচুর খাবার চাই, আর চাই প্রচুর জল। তারা তাই রাতের আঁধারে গা ঢাকা দিয়ে গ্রামে ঢুকে পড়ে। খেতের ধান নিমেষে সাবাড়। টঙঘর থেকে পাহারাদারের হল্লা, গ্রামের লোক জেগে উঠে তেড়ে এলেই হাতিরা ঢুকে পড়ে চা বাগানে। শ্রমিক বস্তির ঘর ভাঙে, কেড়ে খায় ভাঁড়ারে লুকিয়ে রাখা চাল আটা, ঘয়লা (মাটির কলসি) ভরা হাঁড়িয়া (ভাত থেকে তৈরি ঘরে বানানো মদ)। তারপর জঙ্গলের চেহারা নেওয়া কোনো একটা নদীর ধারের সেকশনে লুকিয়ে পড়ে তারা। তো সেবছর এক শীতের রাতে  বাগানের রাত চৌকিদার শীতে নাকি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে এসে আমার কোয়ার্টারে হাজির। বলল,একদল হাতি এসে ঢুকেছে বাগানের ছেচল্লিশ নম্বর সেকশনে। বড়ো বড়ো টর্চ, মশাল আর চকোলেট বোম নিয়ে হাতি তাড়াতে হাজির হলাম সেখানে। সঙ্গে কয়েকজন চৌকিদার আর কিছু সাহসী চা শ্রমিক। সেখানেই দেখলাম তাকে। গোটা বারো হাতির দলের সঙ্গে একাই লড়ে যাচ্ছে একটা সাদাকালো রঙের ছোট্ট কুকুর। হাতিরা তেড়ে এলে উলের বলের মতো ছোট্ট কুকুরটা দ্রুত পিছিয়ে আসছে, তারপর আবার সিংহবিক্রমে তেড়ে যাচ্ছে হাতির দলটার দিকে। কী জোরালো তার গলার আওয়াজ,কী ভয়ঙ্কর তার তেজ! সে রাতে আমরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়ে হাতিদের তাড়িয়েছিলাম। তারপরই বাড়িতে নিয়ে আসি তাকে।

কোনো দোআঁশলা পাহাড়ি জাতের কুকুর ছিল সে। গলায় লেগেছিল ছেঁড়া একটা চেনের টুকরো। হাতির সঙ্গে লড়াইয়ে কিনা জানি না, একটা পা তার জখম হয়েছিল। অনেক খুঁজেও তার ঘরের সন্ধান পাইনি আমি। অগত্যা সে রয়ে গেল আমাদের পরিবারেই। মেয়ে তার নাম রাখল টেডি। বেশ বড়ো বয়সেই সে এসেছিল আমাদের কাছে। জানি না কতদিন বনে-জঙ্গলে একা-একাই ঘুরে বেড়িয়েছে। আমাদের সভ্য আদব কায়দার মোটেই তোয়াক্কা করত না সে। আধা বুনো টেডি ছিল আত্মকেন্দ্রিক,নিজের মর্জির মালিক।

খেলাধুলো তেমন ভালো লাগতো না তার। কেবল আমার মেয়ে কাতুকুতু দিলে সে ভারি খুশি হয়ে দাঁত ছরকুটে হাসত। পরিপাটি করে খেয়েদেয়ে ঘুমোত মেয়ের খাটের তলায়। আমিষ ছাড়া কিছু তার মুখে রুচত না মোটেই। কী জানি, হয়তো বনবাসের সময় সে শিকার করে কাঁচা মাংসই খেয়েছে? গলায় দারুণ জোর, গাঁট্টাগোট্টা শরীরটায় শক্তিও তার কম ছিল না। তবুও সে কখনো আমাদের কোনো কাজ করত না। পাহারা দেওয়া ইত্যাদি কাজকর্মকে সে বোধহয় ছোটো মনে করত। একটা বুড়ো বাঁদর এসে আমার সাজানো বাগান তছনছ করত, টেডি দেখেও দেখত না। রাতে যখন বনবেড়াল আমাদের মুরগির খোঁয়াড়ে হানা দেয় তখন আমি আর অসমসাহসী মোরগ টিঙ্কু লড়ে গিয়েছি। কিন্তু টেডি ফিরেও দেখেনি। কি জানি,হয়তো সে মনেমনে বুনোদের পছন্দ করত! নাকি এটাই ছিল তার মানবসভ্যতার প্রতি নিঃশব্দ প্রত্যাখ্যান? কে জানে?

টেডি কুকুরদের সঙ্গেও তেমন মিশত না। ওরা যে মানুষের বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছে। তার এক এবং একমাত্র ঘোষিত শত্রু ছিল হাতি। কেন কে জানে? কোনো শীতের রাতে যখন দূরে চকোলেট বোম ফাটার আওয়াজ শোনা যেত, তখন রাগে জিঘাংসায় পাগল হয়ে যে যেত সে। মানুষ হাতি তাড়াতে চেঁচাত, টিন পিটত,পটকা ফাটাত। এদিকে দুর্জয় ক্রোধে গর্জন করত টেডি। উদাসীন ছোট্ট কুকুরটা একলহমায় বদলে যেত হিংস্র শ্বাপদে। ছিঁড়ে ফেলত মোটা মোটা চেন,ছুটে বেরিয়ে যেতে চাইত বাইরে। এভাবেই একবার বেরিয়ে গেল সে,আর ফেরেনি। আমরা অনেক খুঁজেছি, কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

আজকাল হাতিরাও খুব একটা বাগানের দিকে আসে না। হয়তো ওরা ব্যাঙডুবি ফরেস্ট ছেড়ে বেরোতে সাহস পাচ্ছে না। কি জানি, হয়তো আমাদের ছোট্ট টেডি বনের বাইরেই ওঁত পেতে বসে আছে হাতির সঙ্গে একটা হেস্তনেস্ত করবে বলে!

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s