ক্যামেরার পেছনে ওয়ান টু থ্রি ক্লিক শম্পা গুহমজুমদার শরৎ ২০১৬

এই লেখার সব এপিসোড একত্রে

cam01

স্থাপত্যের ছবি

বন্ধুরা,তোমরা যখন এই সংখ্যা পড়ছ তখন পুজো একদম দরজায় কড়া নাড়ছে।পুজোর ছুটিতে অনেকেরই  বেড়াতে যাবার প্ল্যান করছ! অনেকেই দিল্লী,জয়পুর ও আগ্রা হয়তো বেড়াতে যাচ্ছ। পুরো রাজস্থান বেড়ানোরও টিকিট কাটা হয়ে গেছে। দশ,পনেরোদিনের মধ্যে রাজস্থান,দিল্লী অনেকেই বেড়াতে যান। সেইভাবে দেখতে গেলে ভাল করে রাজস্থান বেড়াতে হলে  এক মাসের বেশি সময় লেগে যাবে। কিন্তু বাস্তবে তো এতদিন থাকা খুবই মুশকিল,কারণ অফিস,স্কুল অ্যাবসেন্ট করে বেশিদিন তো আর থাকা যায় না।ওদিকে দিল্লী আমরা নানা কাজের জন্য যেমন যাই, আবার সেটি পৃথিবীবিখ্যাত একটি টুরিস্ট স্পটও তো বটে। এবারে একটু দিল্লীর গল্পই করি।

দিল্লী বলতেই কুতুব মিনার,লাল কেল্লা,জামা মসজিদ,হুমায়ুনের সমাধি এবং ন্যাশনাল মিউজিয়াম,রাষ্ট্রপতি ভবন,ইন্ডিয়া গেট এইসব দ্রষ্টব্য স্পটকেই বুঝি। একদিন বা দুদিনের সিটি ট্যুরে বেশিরভাগ লোকই ঘুরে থাকেন। কিন্তু দিল্লী খুঁটিয়ে দেখতে  গেলে কিন্তু এক মাসেও কুলাবে না। বেশিরভাগ মানুষই দুই কি তিনদিন দিল্লী ঘুরে জয়পুর বা আগ্রা চলে যান। হাতে সময় কম থাকলে এইভাবেই বেড়াতে হবে।

আবার তিনচার দিনেও কিন্তু একটু অন্যভাবে জায়গাটাকে চেনা যায়। এর জন্য কিছু প্রস্তুতি বেড়াতে যাবার আগেই সারতে হবে। যেখানে যাব,সেই জায়গাটি সম্পর্কে খুব ভাল করে পড়ে নিতে হবে। যেহেতু  ফোটোগ্রাফিটা তোমার হবি তাই অন্য ট্যুরিস্টদের সঙ্গে ফোটোগ্রাফারের তফাত তো থাকবেই! দিল্লী যাবার আগে তোমাকে ভাবতে হবে কী ধরণের ফোটো তুলবে। ট্রাভেল, স্ট্রিট বা ডকুমেন্টারি। চল ,তাহলে দিল্লীর ঐতিহাসিক সৌধগুলির ফোটো তোলা যাক।

দিল্লী একটি ঐতিহাসিক শহর। বহু বছরের ইতিহাস এই শহরে লুকিয়ে আছে। দিল্লীর ইতিহাস পাওয়া যায় খ্রীঃপূঃ ৩৫০০ সাল থেকে,অর্থাৎ আজ থেকে ৫৫০০ বছর আগেই দিল্লী শহরের গোড়াপত্তন ঘটে। মহাভারতের ইন্দ্রপ্রস্থই সম্ভবত আজকের দিল্লী। তোমর রাজবংশীয়রা ৭৩৬ খ্রীঃ মেহেরৌলির লালকোটে যে রাজ্যস্থাপন করেন,তাই এখনকার দিল্লী।

একটু বেশি ইতিহাস বলে ফেললাম কি? আসলে তোমাদের আগেও বলেছি যে কোথাও বেড়াতে যাবার আগে বা কোনো উৎসবের ছবি তোলার আগে বিখ্যাত আলোকচিত্রীদের তোলা ঐসব জায়গার ফোটোগুলো খুব ভাল করে দেখে নিতে হবে। কোনো ঐতিহাসিক জায়গার ফোটো তোলার আগে সেখানকার  ইতিহাসটাও ভাল করে জানতে হবে…তাই এত কথা বলা।

মনে রাখতে হবে  আমরা যেসব বিশ্ববিখ্যাত আলোকচিত্রীদের তোলা ফোটো দেখেছি, মানে এই নয় যে আমিও সেরকম একটা ফোটো তোলার চেষ্টা করব।ভাল ছবি আমাদের মনে ও চিন্তনে একটি ছাপ ফেলে যায়।এবার নিজের নিজস্বতা দিয়ে একই জায়গার অন্য ধরণের ফোটো তোলার চেষ্টা করতে হবে। যেমন,তাজমহলের এত সুন্দর ও বিখ্যাত সব ছবি আছে, যেগুলি হয়তো আমাদের পক্ষে তোলা সম্ভব হবে না। একটি ভাল ছবি তোলার জন্য হয়ত ফোটোগ্রাফার বহুবার,নানান ঋতুতে নানান সময়ে গেছেন এবং অশেষ পরিশ্রমের পরেই হয়তো সূর্যাস্তের একটি অসাধারণ রঙিন আকাশের ব্যাকগ্রাউন্ডে  তাজমহলের ফোটো তোলা সম্ভব হয়েছে। এদিকে তুমি যখন তাজমহলে গেলে তখন ধূসর আকাশ। তাহলে মনের দুঃখে কি তুমি ফোটো তুলবে না? অবশ্যই তুলবে। কিন্তু একটু  অন্যভাবে তোলো। অন্য একটি গল্প ছবিটিতে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা যেতেই পারে। তাজমহলের ব্যাকগ্রাউন্ডে এক গ্রাম্য দম্পতির বসে থাকার সাদা কাল বিখ্যাত ছবিটি কিন্তু মুন্সীয়ানার প্রেক্ষিতে আগের বলা ছবিটির চেয়ে অনেক বাঙময়। আবার কাঁটাতারের মধ্যে ধুসর তাজমহলের বেদনা যেন এত বেশি প্রাণ পায় অথবা তাজমহলের পেছনের যমুনা নদীর ধারে আবর্জনা আর তাজমহলের শ্বেতশুভ্র সৌন্দর্যের বৈপরীত্য একেকটি ছবিতে মূর্ত হয়ে ওঠে।

onetwoalauddin (Medium)

এখানে সম্রাট আলাউদ্দিন খলজির সমাধির একটি ছবি আছে। একটু চিন্তা করলেই মনে পড়ে যাবে সম্রাট আলাউদ্দিনের কাহিনি। অত্যন্ত উন্নাসিক ও দাম্ভিক এই সম্রাট নিজের কাকাকে হত্যা করে সিংহাসনে বসেন ও এক বিশাল সাম্রাজ্য স্থাপন করতে সফল হন। শেষ বয়েসটা ওঁর খুবই বেদনাদায়ক। এক কঠিন রোগে ভোগার পর ওঁর মৃত্যু হয়। আবার কথিত আছে যে ওঁর সেনাপতি মালিক কাফুর ওঁকে হত্যা করেন।তাই এই দীনহীন  অনাড়ম্বর সমাধিতে দাঁড়িয়ে যে অদ্ভুত এক অনুভূতি হয় এবং ফোটোর মধ্যে আলাউদ্দিনের বর্ণাঢ্য জীবন ও সমাধিক্ষেত্রের দীনতার যে বৈপরীত্য,তা মূর্ত হয়ে ওঠে। ইতিহাসটা জানলে তবেই ছবির মধ্যে এই বৈপরীত্য ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা সম্ভব হবে।

আরো যে কথাটি বলব তা হল বাড়িতে গিয়ে ভোরবেলা উঠতেই হবে। আগেই বলেছি সুর্য যত নিচের দিকে থাকবে,তখন মোলায়েম আলো ছায়াকে দীর্ঘায়িত করবে। বিকেলের আলোও ছবির পক্ষে খুবই সুন্দর। এখানে ইমান জামিনের যে স্মৃতিসৌধটির ফোটো দিয়েছি, এটি সেভাবে বিখ্যাত নয়। সুবিশাল কুতবমিনারের পাশে অতি ক্ষুদ্র একটি সমাধি। অনেক পর্যটকই এটি না দেখে চলে যান। ঐতিহাসিক দিক থেকেও এটি বিখ্যাত নয়। তাহলে এই ছবিটাকে কী করে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ করা যাবে? এই ছবিটি যদি বেলা বারোটার সময় তোলা হত,তবে সাধারণ একটি ফোটো হত। একমাত্র ভোরবেলাতেই সমাধিটিকে ঘিরে যে জাফরি লাগানো আছে,তার ফাঁক দিয়ে সূর্যের নরম আলো সমাধিবেদির উপর এসে পড়ে। সেই আলোছায়াতেই ঠিক এইসময়টাতেই সাধারণ সমাধিটি অসাধারণ হয়ে ওঠে।      

onetwoImam Zamin's Tomb (Medium)

ইলতুৎমিসের সমাধিক্ষেত্রটি খুবই শৈল্পিক কারুকার্যখচিত। দিনের অন্য সময়ে এর ছবি খুব সুন্দর উঠবে। কিন্তু সকালের সূর্যের একফালি আলো সমাধিবেদিতে এসে পড়াতে ছবিতে  একটি অন্য মাত্রা যোগ হয়েছে।

onetwoiltutmis (Medium)

রজোঁ কি বাওলির প্রাঙ্গনে খুপরি খুপরি আলো পড়ে ছবির কিছুটা আকর্ষণ বাড়িয়েছে।

onetwoRajon ki Baoli (Medium)

onetwoSafdarjung's Tomb,Delhi (Medium)

একই কথা সফদারজং সমাধিবেদির ক্ষেত্রেও। আর আকাশের নীল রঙের ব্যাকগ্রাউন্ডে ধরতে হলে ভোরবেলা কি বিকালবেলা। অবশ্য নানা ঋতুতে আকাশের রঙেরও পরিবর্তন ঘটে। লোদি গার্ডেনে বড়া গম্বুজের ভেতর থেকে শিশা গম্বুজের ছবিটা তোলা হয়েছে। অনেকেই এই তোরণটিকে ফ্রেম করে শিশা গম্বুজের ফোটো নেবেন। এই একটি কমন অ্যাঙ্গেল। তাহলে সবাই যা তুলছে,তার থেকে একটু অন্যরকম কীভাবে করা যাবে? পুরনো এই সৌধগুলোতে পায়রা থাকবেই। একটু ধৈর্য ধরে এদের গতিবিধি লক্ষ করলেই পায়রার উড়ন্ত ভঙ্গিমা ফ্রেমবন্দি করা সম্ভব। সত্যিকারের ছবি তোলাকে ভালবাসলেই এই পরিশ্রম করা কোন কষ্টের ব্যাপার নয়।

onetwoLodhi garden (Medium)

আচ্ছা,তোমাদের পুজো খুব ভাল কাটুক।অনেক জায়গাতে বেড়াতে যাও আর প্রাণভরে ছবি তোলো।