ক্যামেরার পেছনে

আজ তো স্ট্রিট ফোটোগ্রাফি নিয়ে আলোচনা করব। স্ট্রিট ফোটোগ্রাফি শুনলেই মনে হয় এ আর এমন কী ব্যাপার! রাস্তায় ক্যামেরা হাতে করে দাঁড়িয়ে থাকব, সামনে দিয়ে কত লোকজন যাচ্ছে, গাড়িঘোড়া যাচ্ছে! সুযোগমতন ক্লিক করব।

প্রথমেই বলি, স্ট্রিট ফোটোগ্রাফি হল সবথেকে কঠিন ব্যাপার। স্ট্রিট ফোটোগ্রাফি মানে যে শুধু রাস্তার আশপাশের ছবি তুলতে হবে এমন কোন কথা নেই। আমরা যখন স্ট্রিট ফোটোগ্রাফি করব, খেয়াল রাখতে হবে, কোন ঘটনা ঘটছে এমন ছবি তুলতে হবে।  ছবি থেকে একটা গল্প যেন ভেসে ওঠে। রাস্তার ওপর কোন দোকানের ভেতরের ঘটনার ছবিও তোলা যেতে পারে। রাস্তা ছাড়াও সমুদ্র বা নদীর ধারের ঘটনা, রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো পশুপাখির ছবিও চলবে। কিন্তু ফটোটিতে একটা ঘটনা থাকতে হবে বা ছবিটি অর্থযুক্ত  হতে হবে। কয়েকটা উদাহরণ দিচ্ছি।

ধরো, একটা দোকানের সামনে একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে আর তুমি রাস্তার ওপর দিক থেকে ছবিটা তুললে। ছবিটা যখন দেখছ, খেয়াল করে দেখ এর মধ্যে কী কোন গল্প বা ঘটনা লুকিয়ে আছে? যদি না থাকে তবে কিন্তু এটা স্ট্রিট ফোটোগ্রাফি হল না। কিন্তু, এই ছবিতে দেখানো দোকানটির নাম দেখ ‘ফটো ডিভাইন স্টুডিও’ আর তার সামনে দুটি লোক বেশ ভক্তি ভক্তি সাজপোশাক পরে দাঁড়িয়ে আছে। তাহলে কিন্তু একটা গল্প তৈরি হল। অথচ ঐ নামের দোকানটার সামনে লোকদুজন যদি সাধারণ প্যান্টশার্ট পরে দাঁড়িয়ে থাকত তাহলে সেটা অর্থহীন ছবি হয়ে যেত।

onetwothree54 (1) (Small)স্ট্রিট ফোটোগ্রাফি করাটা বেশ চ্যালেঞ্জিং।  ছবি তোলবার আগের মুহূর্ত অবধিও অধিকাংশ সময় জানা যায় না তোমার সামনে ঠিক কী ঘটনা ঘটতে চলেছে। এছাড়াও রাস্তাঘাটে ফটো তোলবার আরো অন্য বিপদ আছে। কেউ আপত্তি করতে পারেন, বাজে কথাও শুনতে হতে পারে। আমার একটা অভিজ্ঞতা বলি, একবার এক মাছবাজারের ছবি তুলছিলাম। হঠাৎ এক মেছুনি এক মগ জল আমার ক্যামেরার দিকে তাক করে ছুঁড়ে দিল। সঙ্গে নানান কথা। ভাগ্য ভালো যে ক্যামেরাতে জল লাগে নি। আমি কিন্তু তার ছবি তুলছিলামই না। এসব ক্ষেত্রে তাড়াতাড়ি স্পট থেকে চলে যাওয়াই ভালো। তাছাড়া যখনতখন অনেক মন্তব্যও শুনতে হতে পারে। এইসব মনে রেখেই তোমাকে ক্যামেরা হাতে রাস্তাতে বেরোতে হবে। স্ট্রিট ফোটোগ্রাফির একটা জরুরি কথা হল, সাবজেক্ট যদি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে পোজ দেয় তাহলেই সমস্যা। সে আর স্ট্রিট ফোটোগ্রাফি থাকবে না।

এক কথায় খুব সচেতনভাবে চারদিকে নজর রাখতে হবে। কী ঘটনা ঘটতে চলেছে তার আন্দাজ লাগাতে হবে, যার ছবি উঠছে তাকে সচেতন করে দেয়া চলবে না, আর নিজের বিপদ সম্পর্কেও সচেতন থাকতে হবে।

রাস্তাতে মানুষের পোর্ট্রেট তোলা যেতে পারে। কিন্তু কখনই সেটা ইনডোর শট হবে না। পোজ দিলেও চলবে না।

ডকুমেন্টেশান বা তথ্যছবি অথবা সংবাদছবি আর স্ট্রিট ফোটোগ্রাফির মধ্যেও তফাৎ আছে। কোনো জায়গায় হয়ত বেড়াতে গেছ। জায়গাটা সম্বন্ধে ধর ফিরে এসে তোমাকে লিখতে হবে। ধরা যাক সেখানে একটি বিখ্যাত মন্দির আছে। তাহলে এই মন্দিরের ছবিটা খুবই জরুরি। তুমি রাস্তা থেকেই হয়ত মন্দিরটির ছবি তুললে। সেখানে কোন লোকজন থাকতেও পারে, না থাকলেও ক্ষতি নেই। সেটা সাধারণত ডকুমেন্টেশান। কিন্তু তুমি ধরো যদি মন্দিরের ছবি তুললে তার সামনে কোন ঘটনা ঘটছে এমন একটা অবস্থাতে, তাহলে সেটা তথ্যছবি আর স্ট্রিট ফোটোগ্রাফি দু-ই হবে। কিন্তু রাস্তার ধারে একটা মন্দির, আর কিছুই নেই সে ছবিকে স্ট্রিট ফোটোগ্রাফি বলা যাবে না।

ইভেন্ট ফোটোগ্রাফি মানে কোন অনুষ্ঠান, ধর্মীয় বা রাজনৈতিক ঘটনাও হতে পারে। রাস্তাতে ঘটছে এইরকম ইভেন্টের ছবি স্ট্রিট ফোটোগ্রাফির আওতাতে পড়বে। আশা করি এইবারে বোঝাতে পেরেছি কী ধরনের ছবি তুলতে হবে।

যেকোন ছবি তোলবার সময়েই মনে রাখতে হবে যেন সেটি একটু অন্যধরনের ও আকর্ষণীয় হয়। তোমার তোলা ছবিটা দেখে সবাই যেন সেইটে নিয়ে এক মিনিট চিন্তা করে। ছবির মধ্যে দিয়ে যে গল্পটি আলোকচিত্রী বলতে চাইছে তা যেন বুঝতে পারে। তাই, যখন স্ট্রিট ফটোগ্রাফি করবে বলে ভাবছ একটু তখন একটু বৈশিষ্ট্যপূর্ণ জায়গা, যেমন কালীঘাটের মন্দির, কিংবা ধরো মুম্বাইতে ভিক্টোরিয়া টার্মিনাস, বা দিল্লির পুরানা কিলা এইসব এলাকা ছবি তোলবার জন্য বাছা প্রয়োজন। হাওড়া ব্রিজের তলায় মল্লিকবাজার স্ট্রিট এ জাতীয় ফটোগ্রাফির জন্য উপযুক্ত। সারা পৃথিবী থেকে আলোকচিত্রীরা এই মল্লিকবাজার কিংবা কালীঘাট, বাবুঘাট, কুমোরটুলিতে ছবি তুলতে আসেন। onetwothree54 (2) (Small) onetwothree54 (3) (Small)মল্লিকবাজার স্ট্রিটে কলকাতার পাইকিরি ফুলের বাজার। হলুদ, কমলা, লাল ফুলেদের আশ্চর্য স্তূপগুলি অতি নোংরার মধ্যে পড়ে থাকে। খুব ব্যস্ততার মধ্যে কেনাবেচা চলতে থাকে। সকালবেলা এখান থেকেই কলকাতার সব বাজারে ফুল সরবরাহ হবে। ক্রেতাবিক্রেতাদের মুখের ভঙ্গীগুলোও খুবই আকর্ষণীয়। তুমি দাঁড়াতেই পারবে না এত ঠেলাঠেলি। তার মধ্যেই তোমাকে সঠিক মুহূর্তে শট নিতে হবে। কেউ যখন সে ছবি দেখবেন তখন এই ফুল, কাদা, ময়লা আর মানুষের মুখের অভিব্যক্তি সব মিলিয়ে অনেক কিছু চিন্তা করবার খোরাক পেয়ে যাবেন।রাস্তার দেয়ালে, বাসের গায়ে অনেক মজার মজার ফটো বা পোস্টার আর মজার মজার কিছু লেখা বা ক্যাপশান থাকে। একটু চোখকান খোলা রাখলেই এইসব মজাগুলো দেখতে পাবে। দেয়ালে হয়ত পোস্টারে কেউ কাউকে তাড়া করেছে। তার ঠিক সামনে দিয়ে কোনো লোক হেঁটে যাচ্ছে। লোকটা কিন্তু পোস্টারটাকে খেয়ালই করে নি। তুমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছ, সেখান থেকে মনে হচ্ছে পোস্টারটার ব্যক্তিটি রাস্তা দিয়ে হাঁটতে থাকা লোকটাকে তাড়া করেছে। তোমাকে তখন অতিদ্রুত শটটা নিতে হবে। লোকটা কোনক্রমে একটু বেশি এগিয়ে গেলে মজাটা আর ছবিতে ধরা যাবে না। এই হচ্ছে আসল স্ট্রিট ফটোগ্রাফি।

মজার কাজ , তাই না? চেষ্টা করে দেখ। ভালো লেগে যাবেই। কারণ স্ট্রিট ফটোগ্রাফির দুনিয়ায় প্রতিটা মুহূর্তই পরিবর্তনশীল। বিপদ যেমন আছে, তেমনই আছে উত্তেজনার খোরাক। ক্যামেরা হাতে বাড়ির সামনের রাস্তায় গিয়ে একটুখানি চেষ্টা করে দেখতেই onetwothree54 (5) (Small) onetwothree54 (4) (Small)পার। ছোটোদের হাতে ক্যামেরা দেখলে লোকজন তত বিরক্ত হয় না। বাড়ির পাশের পার্কে গিয়েও বাচ্চাদের নানান কান্ডকারখানার শট নিতে পারো। ছবিগুলো যখন দেখবে তখন বারবার ভাববে সেগুলো ইন্টারেস্টিং কিছু হয়েছে কিনা, ওর মধ্যে কোন গল্প লুকিয়ে আছে কী না। তেমন কিছু ছবি এইসঙ্গে দিয়ে দিলাম।

onetwothree54 (7) (Small) onetwothree54 (6) (Small)

আচ্ছা, আনন্দ করে ফটো তোলো। পরেরবার চলো কোথাও একটা বেড়াতে যাই ক্যামেরা নিয়ে। প্রাণ ভরে শুধু ছবি তুলব আর গল্প করব।

আগের পর্বগুলো একত্রে এইখানে