ক্রিসমাস স্পেশাল এক বিচিত্র যাত্রার কথা স্বপ্না লাহিড়ী শীত ২০১৬

special01

যাত্রীবাহী জাহাজ এস. এস. ওয়াররিমু মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরের স্থির নিস্তরঙ্গ জলরাশি কেটে কেটে এগিয়ে যাচ্ছিল ভ্যাঙ্কুভার থেকে অস্ট্রেলিয়ার দিকে। জাহাজের যাত্রীরা কেউ কেউ ডেকে ঘুরে বেড়াচ্ছেন কেউ বা নিজেদের মধ্যে গল্পগাছা করতে মগ্ন। নাবিকেরা তাদের নিজের নিজের নির্দিষ্ট কাজে ব্যস্ত, এতগুলো যাত্রীকে নিরাপদে তাদের গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দিতে হবে।

জাহাজের ন্যাভিগেটর ‘নটিক্যাল আলমানাক’-এর চার্টটি টেবিলে রেখে জাহাজের অবস্থান চার্ট তৈরি করছিলেন। আমি যে সময়ের কথা বলছি তখনকার জাহাজগুলো আধুনিক জাহাজের মতো কমপিউটারাইজড, অর্থাৎ, কমপিউটার-এর সাহায্যে গতিবিধি নির্ধারণ করতে পারত না। তারা সূর্য চন্দ্র ও আরও প্রায় সাতান্নটি গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থানের সঙ্গে দিক-বলয়ের কোণ সেক্সট্যান্ট নামক যন্ত্রের সাহায্যে নির্ধারিত করতেন ও নটিক্যাল চার্ট দেখে এই বিশাল জলরাশির মধ্যে জাহাজের সঠিক অবস্থিতি নির্ধারণ করতেন।

চার্টটি নিয়ে ন্যাভিগেটর, জাহাজের ক্যাপ্টেন জন ফিলিপ্স-এর কাছে এলেন। ওয়াররিমু তখন প্রশান্ত মহাসাগরে ০ ডিগ্রি, ৩১ মিনিটস উত্তর অক্ষাংশ এবং ১৭৯ ডিগ্রি, ৩০ মিনিটস পশ্চিম দ্রাঘিমাংশ ধরে এগোচ্ছে। তারিখটা ছিল ৩০শে ডিসেম্বর ১৮৯৯। চার্টটি দেখে ‘মেট’ পেটন বলে উঠলেন, “আরে, আমরা তো বিষুবরেখা ও আন্তর্জাতিক তারিখ রেখার প্রতিচ্ছেদ বিন্দু থেকে মাত্র কয়েক মাইলই দূরে রয়েছি।”

ক্যাপ্টেন ব্যাপারটা বুঝতে পেরে জাহাজটির যাত্রাপথ ও গতিসীমার একটু পরিবর্তন করে অপেক্ষা করতে
থাকলেন। শান্ত স্থির জল ও পরিষ্কার আকাশ ক্যাপ্টেনকে সাহায্যই করল। মধ্যরাত্রে ওয়াররিমু ঠিক সেই বিন্দুতে পৌঁছে গেল যেখানে বিষুবরেখা ও আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা একে অপরকে প্রতিচ্ছেদ করছে।

এই অবস্থানের ফল হল অদ্ভুত, ওয়াররিমুর সামনের অংশটি তখন দক্ষিণ গোলার্ধের গ্রীষ্মকালের মাঝামাঝি এবং পেছনের অংশটি উত্তর গোলার্ধের শীতকালের মাঝামাঝি পৌঁছে গেল। শুধু তাই নয়, সামনের অংশটির তারিখ ছিল ১লা জানুয়ারি ১৯০০ সাল ও পেছনের অংশটির তারিখ ৩১ ডিসেম্বর ১৮৯৯! তার মানে জাহাজটি শুধুমাত্র দুটি আলাদা তারিখ, দুটি আলাদা মাস, দুটি আলাদা ঋতু ও দুটি আলাদা সালই নয়, দুটি আলাদা আলাদা শতাব্দীরও সাক্ষী হয়ে একটি অভূতপূর্ব ও অবিস্মরণীয় ইতিহাস রচনা করল।

 সম্পাদকীয় সংযোজনঃ

এস এস ওয়ারিমু এক বিচিত্র জাহাজ ছিল। তার জীবনে অনেক অভিজ্ঞতা। ১৮৯২ সালে অস্ট্রেলিয়ার নিউক্যাসলে এই ৫০০০ টনের জাহাজের জন্ম। সে ছিল লোহার তৈরি সর্বপ্রথম জাহাজগুলোর একটা। ওপরের ঘটনার চার বছর আগে এই ওয়ারিউতে চেপেই মার্ক টোয়েন তাঁর বিশ্বভ্রমণের পথে অস্ট্রেলিয়ায় গিয়েছিলেন। তাঁর “ফলোইং দ্য ইকুয়েটর নামের বিখ্যাত বইতে বিষুবরেখার প্রথম দর্শনের যে রোমঞ্চকর বিবরণ আছে তা এই ওয়ারিমুতে বসেই দেখা। জাহাজের একপাশে পরিবার আর অন্যপাশে তিনি আর মাঝখান দিয়ে আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা এই অবস্থায় নিজেদের বয়সের মাথা গোলানো অদলবদল নিয়ে দুর্দান্ত সব রসিকতার জন্মও এই ওয়ারিমুর বুকে।  ১৯১৬ সালে অস্ট্রেলিয়া নিউজিল্যান্ড এর মালিকানা ছেড়ে ওয়ারিমু সিঙ্গাপুরে আসে যুদ্ধজাহাজ হয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিতে। এইখানেই বহু সেনাকে সাগর পারাপার করাবার পর ১৯১৮ সালে রহস্যজনকভাবে ওয়ারিমু তলিয়ে যায় তিউনিসের কাছে, সম্ভবত এক ফরাসি যুদ্ধজাহাজের সঙ্গে সংঘর্ষে।  এমনিভাবেই সবার অলক্ষ্যে হারিয়ে গেল অস্ট্রেলিয়ানদের এই প্রবাদপ্রতিম জনপ্রিয় জাহাজ। সঙ্গের ছবিটি ওয়ারিমুকে নিয়ে একটা পুরোনো অস্ট্রেলিয়ান পিকচার পোস্টকার্ডের।

Advertisements

2 Responses to ক্রিসমাস স্পেশাল এক বিচিত্র যাত্রার কথা স্বপ্না লাহিড়ী শীত ২০১৬

  1. Swapna Lahiri says:

    স্নেহের দেবজ্যোতি, ওয়াররিমুর আরও নতুন তথ্য আমরা জানতে পারলাম। লেখাটি আরও সমৃদ্ধ করার জন্য ধন্যবাদ। লেখক

    Like

  2. তথ্যমূলক এই লেখাটি পড়ে নতুন কিছু জানা হল। অনেক ধন্যবাদ!

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s