চটি কথা (বিশ্ব চটি দিবস বা ফ্লিপ-ফ্লপ ডে উপলক্ষে বিশেষ প্রতিবেদন) খবরের কাগজ ১৬ জুন ২০১৭

জয়ঢাকি খবরকাগজ

(সম্পূর্ণ কাগজ পড়তে ওপরে ক্লিক কর)

বিশেষ প্রতিবেদন

 ফি বছর জুন মাসের তৃতীয় শুক্রবার পালিত হয় বিশ্ব চটি দিবস বা ওয়ার্ল্ড ফ্লিপ-ফ্লপ ডে। সেদিন আয়োজক সংস্থার প্রতিষ্ঠানে আগত অতিথিরা চটি পায়ে এলে বিশেষ কিছু সুবিধে পান। এ উপলক্ষ্যে দান  হিসেবে যা অর্থ ওঠে, তা যায় ক্যাম্প সানশাইন নামে এক প্রতিষ্ঠানে, যেখানে দুরারোগ্য রোগে মৃত্যুপথযাত্রী শিশুদের শেষ দিনগুলো আনন্দে কাটাবার বন্দোবস্ত করা হয়।এ বছর চটি দিবস পালিত হল ১৬ জুন। সে উপলক্ষে জয়ঢাকি প্রতিবেদন

চটি কথা

অরিন্দম দেবনাথ

 পদতলে ফিতেওয়ালা খোলা জুতো বা চটির সাথে আমরা সবাই পরিচিত। বিশ্বের সব দেশেই চটি ব্যবহার হয়। বলতে গেলে চটি ছাড়া আমাদের দৈনন্দিন জীবন প্রায় অচল।বিশেষত গ্রীষ্মকালীন আবহাওয়ায় চটির বিকল্প চটিই!

কতরকম চটি আছে!রাবারের চটি, চামড়ার চটি, প্লাস্টিকের চটি, কাপড়ের চটি, কাঠের চটি, পাথরের চটি, ধাতু দিয়ে তৈরি চটি, ঘাসের চটি, গাছের ছালের চটি, মোটা চটি, পাতলা চটি, বাহারি চটি, সাদামাটা চটি! সাদামাটা দশ টাকা  থেকে শুরু করে কয়েক লাখ টাকা দামের বাহারি চটি বাজারে পাওয়া যায়।

চটির ইতিহাস যে কত পুরনো তা বলা মুশকিল।সভ্যতার সেই আদিকাল থেকে চটির ব্যবহার চলে আসছে।চটি হল সবচাইতে বেশি ব্যবহৃত পায়ের আবরণ।অনুমান করা হয় তীক্ষ্ণ পাথরের খোঁচা, তপ্ত বালির উত্তাপ, কাদা ও বরফের ঠাণ্ডা, জঙ্গলে পোকামাকড়ের কামড় থেকে পদযুগলকে আবৃত করার ভাবনা আমাদের আদি পূর্বপুরুষদের মাথায় আসে। উৎপত্তি হয় ভি আকৃতির ফিতেওয়ালা পাদুকা। ধীরে ধীরে চটি থেকে পুরো আবৃত জুতো “বুট” সৃষ্টি হয়।

প্রায় ৮০০০ বছরের পুরনো দক্ষিণ আমেরিকার আনাশাযি(Anasazi) সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ থেকে পুরাতত্ববিদরা খুঁজে পেয়েছেন পশুচর্মের পদতল (সোল) বিশিষ্ট গাছের বাকলের বিনুনি করা বাহারি ভি আকৃতির চটি।তবে চটি পরার অধিকার সবার ছিল কিনা, সেটা বলা দুরূহ। কারণ আদিকালে পা খোলা চটি পরা ছিল আভিজাত্যের  প্রতীক। মূলত ধনী, সর্দার বা রাজপরিবারের লোকেদের চটি পরার প্রমাণ পাওয়া গেছে। মিশরের জাদুঘরে প্রদর্শিত এক ছবিতে প্রায় ৫১০০ বছর আগে ফারাও নারমের পেছনে এক চটিবাহকের উপস্থিতি আছে।চটি  সে সময় ছিল প্রভুত্বের প্রতীক। প্রভুর অনুপস্থিতিতে তাঁর চটিকে রাজসিংহাসনের রেখে আমত্যরা রাজকার্য পরিচালনা করতেন। বহু পরে রোমান সাম্রাজ্য কালে সাধারণ মানুষ পায়ে চটি পরার অধিকার পায়। রামায়ণে রামের অনুপস্থিতিতে তাঁর খড়মকে (এক ধরনের কাঠের চটি) সিংহাসনে বসিয়ে ভরত দেশ চালাতেন বলে উল্লেখ আছে। দেবতাদের মধ্যে  চটির ব্যবহারের কল্পনা যে ছিল তার প্রমাণ জুতো পরিহিত প্রাচীন সূর্যমূর্তি বা কার্তিক ঠাকুরের মূর্তি।

তবে আদিকালে যাঁদের জুতো পরার অধিকার ছিল তাঁরাও নিয়মিত চটি পরতেন না বলে ঐতিহাসিকরা মনে করেন। চটি সে সময় ছিল বাইরে বেরনোর পোশাকের অংশ। ঘরের ভেতরে খালি পায়েই থাকতেন সকলে। শুধুমাত্র ভ্রমণকালে চটি পরতেন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিরা।

চটি বা জুতোর বহুল প্রচলন শুরু হয় আলেকজান্ডার দি গ্রেটের সময় থেকে। গ্রিকরা এই সময় থেকে সাহিত্য, বিজ্ঞান চর্চায় বেশি করে আগ্রহী হয়ে ওঠে, খেলাধুলাকে নতুন রূপ দিতে শুরু করে ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা চালু করে। চটি নিয়ে রীতিমত গবেষণা করে রকমারি চটি ও পা ঢাকা জুতো প্রস্তুত শুরু হয় এ সময়। সৌভাগ্যবশত গ্রিকরা তাদের এই উদ্ভাবনের বিভিন্ন পর্যায়ের বিবরণ নথিভুক্ত করেছিলেন সুচারুভাবে এবং একএকটি ধরণের চটি বা জুতোর একরকম নামকরণ করেছিলেন।

গ্রিকদের মতো রোমান সাম্রাজ্য কাল ধরেও জুতোর আকৃতির পরিবর্তন শুরু হয়। ইউরোপ জুড়ে সাম্রাজ্যবিস্তারের স্বপ্ন দেখা রোমান শাসকরা প্রথমেই সৈনিকদের পায়ের পরিচর্যা করার কথা উপলব্ধি করেছিলেন।কাদা বরফ ভেঙে এগোতে চামড়া দিয়ে প্রায় হাঁটু পর্যন্ত ঢাকা পদতলে পুরু পশুর চামড়ার তলায় ধাতব পেরেক লাগানো সামরিক জুতোর উদ্ভব হল। রোমান শাসক সিয়াস সিজার (Caius Caesar) ওরফে  কালিগুলার নামে এই জুতোর নাম দেওয়া হল ‘কালিগা’।চটির ইংরাজি নাম স্যান্ডেল এসেছে ল্যাটিন শব্দ স্যান্ডেলিয়াম থেকে।কিন্তু এসময়েও ইচ্ছেমত সবরকম জুতো পরার অধিকার সবার ছিল না। পদাধিকার ও আভিজাত্য অনুযায়ী জুতোর রকমফের ঘটত।কালক্রমে সামরিক বাহিনী থেকে চটি চিরনির্বাসিত হয়। পরিবর্তে আসে পা ঢাকা বুট।

জাপানে গেটা নামের কাঠের পদতলবিশিষ্ট চটি টাবি নামের মোজা দিয়ে পরা হত শীত ও স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া থেকে বাঁচার জন্য।বুড়ো আঙুল ও বাকি চার আঙুলের মাঝখান থেকে বেরিয়ে চটির শেষপ্রান্তের পদতলের দু’পাশে জোড়া থাকত দুটো ফিতে।  পূর্ব সাইবেরিয়া ও আলাস্কাতে চামড়ার মোজার ওপর দুই ফিতে বিশিষ্ট চটি  পরা হত।

ভারতবর্ষে কাঠ ও ধাতু দিয়ে তৈরি পাদুকা বা খড়মের ব্যবহার চলছে সেই আদিকাল থেকে।মোষের চামড়ার পদতলি (সোল) দেওয়া চপ্পলের (কোলাপুরি)  এখনও জুড়ি নেই। খড়মের অনুরূপ চটির পাকিস্তান, আফগানিস্তান, সিরিয়া, তুর্কি দেশেও চল আছে। যদিও খড়মের আঙুল ধরে রাখার কাঠের গুঁটির পরিবর্তে এসব দেশে কাঠের পদতলির সাথে ভি আকৃতির ফিতে লাগিয়ে ব্যবহার করা হয়।সিরিয়াতে কাঠের পদতলির সাথে রুপোর কাজ করা মুক্তো বসানো ফিতে দেওয়া  যে চটি ব্যবহার করা হয় তাকে বলে কাব-কাব। অত্যন্ত মূল্যবান বাহারি খড়মের থেকে সৃষ্ট আওয়াজ থেকে এই নামকরণ।       

 চটির চরিত্র প্রকৃতির সাথে তাল মিলিয়ে বিভিন্ন দেশে এক একরকম রূপ নিয়েছে। উত্তর আফ্রিকা ও মধ্য প্রাচ্যে মরুভূমির মাঝে চলাফেরার জন্য চটির আকৃতি বিশাল।পদতলি পায়ের থেকে অনেক বড়।দেখে মনে হবে প্রয়োজনের থেকে বড় চটি পরেছে। না, ওই বড় চটি মরুভূমিতে বসবাসকারি মানুষদের তপ্ত বালি থেকে পা’কে রক্ষা করে। প্রাচীন অ্যাজটেক ও মায়া সভ্যতাতে যে চটি ব্যবহার করা হত তার সামনের অংশটা খোলা থাকলেও গোড়ালির অংশটা ঢাকা থাকত।

এখনও পর্যন্ত প্রাচীনতম যে চটির সন্ধান পাওয়া গেছে সেটি রেডিও কার্বন পরীক্ষায় দেখা গেছে ১০০০০ বছরেরও বেশি পুরনো। ১৯৩৮ সালে আমেরিকার অরিগণ প্রদেশের ফোর্ট রক কেভে পাওয়া এই চটিটি গাছের বাকল দিয়ে বুনে তৈরি। চটির সামনের অংশটা ছিল ঢাকা আর পায়ে বাঁধার জন্য পেছনের অংশটিতে বিনুনি করা দড়ি আটকানো। পা’কে আরাম দেবার জন্যে খরগোশের লোমশ চামড়া থাকত চটির মধ্যে ।

প্রস্তরযুগের পরবর্তী সময়ে আমাদের পূর্বপুরুষরা পায়ের যত্নের জন্য খুব সচেষ্ট ছিলেন।সুমেরীয় সভ্যতা ছিল প্রকৃত পক্ষে শিল্পী সভ্যতা।অসামান্য যত্ন নিয়ে শিল্পীরা বাহারি পোশাকের পাশাপাশি বাহারি চটি সৃষ্টি করেছিলেন সে সময়।  বর্তমানে আরামদায়ক চটি বাজারে পাওয়া গেলেও আমাদের পূর্বপুরুষদের সৃষ্ট চটির ভিত্তিটা রয়ে গেছে অপরিবর্তিত। 

Advertisements