খবরের কাগজ বর্নাটক সুমন পাল ১৩ডিসেম্বর ২০১৭

জয়ঢাকের খবরের কাগজের সমস্ত আশ্চর্য খবর এই লিঙ্কে

সুমন পাল

গত ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৬ হরেন্দ্র কুশারী বিদ্যাপীঠ, ৪৫ স্টেশন রোড, ঢাকুরিয়া, কলকাতা ৭০০০৩১-এর কিছু ছাত্রদের নিয়ে শিক্ষামূলক ভ্রমণ অনুষ্ঠিত হল বিড়লা ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড টেকনলজিক্যাল মিউজিয়াম, ১৯ এ, গুরুসদয় দত্ত রোড, কলকাতা ৭০০০১৯-এ। সেখানে টেলিভিশন গ্যালারিতে ক্রোমা-কী শো নামক একটি প্রদর্শন ছিল। ক্রোমা-কী শো কী, কীভাবে, বা কেন তারই কিছু জানার ও জানানোর চেষ্টা করা হল এই প্রবন্ধে।

***

সিনেমা বা টেলিভিশনের পর্দায় আমরা আমাদের পছন্দের চরিত্রগুলোকে দেখতে দেখতে নিজেরাই অজান্তে কখনও কখনও সেই চরিত্রগুলোর সঙ্গে নিজেদের গুলিয়ে ফেলি। যদি এমন হত আমাদেরও দেখা যেত টেলিভিশনের পর্দায়-ইত্যাদি ইত্যাদি। স্কুলের গণ্ডি না পেরোনো শিশু কিশোরদের ক্ষেত্রে সময়টা আরও স্বপ্নের, ফ্যান্টাসিপূর্ণ। পছন্দের কার্টুন চরিত্রগুলো, ব্যাটম্যান থেকে সুপারম্যান, শক্তিমান থেকে বাঁটুল, বা ছোটা ভীম তাদের তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। এহেন চরিত্রের পোশাকের মোড়কে কিছু সময়ের অভিনয় এবং তার প্রদর্শন যদি হয় সরাসরি টেলিভিশনের পর্দায়, তবে তো সোনায় সোহাগা। এরকমই কিছু কচিকাঁচা সজল, সন্দীপ, সুদীপ ও শুভজিতের আনন্দ উদ্ভাসিত ও একইসাথে কৌতূহলোদ্দীপক মুখগুলো ধরা পড়ল নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলার প্রেক্ষাপটে চলমান ক্যামেরার সাহায্যে টেলিভিশনের পর্দায়। কেউ সুপারম্যান তো কেউ আরব্য উপন্যাসের আলাদিন, জিনি ও তার দোসর বাঁদর। বিড়লা ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড টেকনলজিক্যাল মিউজিয়াম, কলকাতা-র টেলিভিশন গ্যালারীতে ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৬-র ঠিক বেলা ১২ টার একটি শো-এ যার পোশাকি নাম ক্রোমা-কী শো।

শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মাঝারি মাপের একটি ঘরে একদিকের দেওয়াল জুড়ে সবুজ পর্দা ও তার সামনে কোমর উচ্চতার সবুজ রঙের একটি স্থায়ী মঞ্চ। সামনে বেশ কিছুটা জায়গা ছেড়ে দিয়ে বেশ কিছু দর্শকাসন ও তিন চারটি ওয়াল হ্যাঙ্গিং টিভি বিভিন্ন দেওয়ালে। আর চলমান শুটিং করার জন্য প্রয়োজনীয় মুভি ক্যামেরা। এই হল মিনি স্টুডিও।

সজল কে উপুড় করে, মঞ্চে শুইয়ে দিয়ে তার গায়ের ওপর চড়িয়ে দেওয়া হল টকটকে লাল রঙের উড়নি। লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশন এর সঙ্গে সঙ্গে সজল সুপারম্যান টিভি-র পর্দায় আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে, হাত নেড়ে সকলকে অভিবাদন জানানোর সঙ্গে সঙ্গেই তুমুল হাততালি ও হর্ষ। দ্বিতীয় দৃশ্য – কার্পেটের উপর বসে আকাশে ভ্রমণ সুদীপের, সেই কার্পেটের দুটি কোনা আঁকড়ে ধরে মাটির সঙ্গে সমান্তরালে উড়ছে শুভজিত ও তার পিঠের উপরে বসে সন্দীপ (চিত্র ১)।

borna4

চিত্র ১ –সবুজ পর্দার সামনে তিন কুশীলব ও চূড়ান্ত দৃশ্যে তারা

এই দৃশ্য পর্দায় আসার সঙ্গে সঙ্গেই বিস্ময়, আনন্দ, কৌতূহল সব অভিব্যাক্তি একই সঙ্গে মিলে মিশে ফুটে উঠলো সকলের মুখে। মুন্ডুহীন ধড়, চুলের মুঠো ধরে থাকা ধড় বিহীন মুণ্ডু এমন দৃশ্যও এরপর অভিনীত হয়েছে। বিস্তারিত আলোচনা নিষ্প্রয়োজন। কিন্তু ব্যাপারটি ঘটছে কিভাবে? সবুজ প্রেক্ষাপটে সবুজ রঙের পোশাক ছাড়া আর সবই হয়েছে দৃশ্যমান এবং পশ্চাৎপটকে বদলে দেওয়া হয়েছে সুবিধা মতো।

দুই ধরনের ছবি বা ভিডিও ফ্রেমকে একত্রিত করার এই কৌশল হল ক্রোমা কী (Chroma key)। এর মাধ্যমে ছবি তোলার সময় পিছনে থাকা একটি প্রেক্ষাপটকে সম্পূর্ণ পাল্টে একেবারে স্বচ্ছ করা যায় এবং পরিবর্তে নতুন একটি ব্যাকগ্রাউন্ড সেখানে সংযোজন করা যায়। এই কৌশলটিকে কালার কিইং (colour keying), বা কালার সেপারেশন ওভারলে (colour-separation overlay বা CSO)-ও বলা হয়। এই নামকরণটি প্রথম করে ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন (BBC)। তাছাড়া এটি গ্রিনস্ক্রিন (greenscreen), এবং ব্লুস্ক্রিন (bluescreen) নামেও পরিচিত। একটি রঙ-কে আটকে তার পরিবর্তে অন্য রঙ বা প্রেক্ষাপট সংযুক্ত করা হয় বলে একে নাম দিলাম বর্ণাটক (বর্ণ + আটক)।

এই কৌশলটির বহুল ব্যবহার হয়, আবহাওয়ার খবর প্রচারের সময়, যেখানে দেখা যায় সংবাদপাঠক একটি স্যাটেলাইট ম্যাপের সামনে অবস্থান করে আবহাওয়ার খবর বলতে থাকেন, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি দাড়িয়ে থাকেন একটি বড় নীল ব্যাকগ্রাউন্ডের সামনে, এবং কম্পিউটারের মাধ্যমে নীল অংশটি মুছে দিয়ে ঠিক সেস্থানে ম্যাপটিকে প্রতিস্থাপন করা হয়। এখন যদি সংবাদপাঠক নীল রংয়ের পোশাক পড়ে থাকেন, তবে তাঁর ছবিও প্রতিস্থাপিত হয়ে যাবে। এই কৌশলে রং হিসেবে নীলের সাথে সবুজও ব্যবহৃত হয় (চিত্র ২)। বর্ণাটক বিনোদন শিল্প, যেমনঃ চলচিত্র ও টেলিভিশনে বহুল ব্যবহৃত হয় কারণ বর্ণাটক তূলনামূলকভাবে অনুষ্ঠানের উৎপাদন খরচও কমিয়ে দেয়।borna3

চিত্র ২–সংবাদপাঠক প্রকৃতপক্ষে দাড়িয়ে আছেন একটি বড় সবুজ ব্যাকগ্রাউন্ডের সামনে কিন্তু কম্পিউটারের মাধ্যমে সবুজ অংশটি মুছে দিয়ে ঠিক সেস্থানে স্যাটেলাইট ম্যাপটিকে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে।

তাহলে মূল যে বস্তু বা ব্যক্তি (সাবজেক্ট)-র ছবি তোলা হবে, তার পিছনে একটি একক বর্ণের বা খুবই কম পাল্লার তফাৎ বিশিষ্ট বর্ণের প্রেক্ষাপট রাখা হয়। সাধারণত রাখা হয় নীল বা সবুজ বর্ণের পর্দা কারন এই রঙ দুটি আমাদের শরীরের কমপ্লেক্সন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। আগে থেকে সিলেক্ট করে রাখা নির্দিষ্ট রঙের ভিডিও ক্লিপের অংশ বিকল্প প্রেক্ষাপটের রঙ দ্বারা প্রতিস্থাপিত করে দেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়াকেই সাধারণভাবে ‘keying’, বা ‘keying out’ বা শুধু একটি ‘কী’ বলা হয়ে থাকে। এটি নেহাতই একটি পোশাকি নাম।

তো এই ‘কী’ প্রক্রিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল সাবজেক্ট এবং প্রেক্ষাপটের রঙ পৃথকীকরণ। প্রেক্ষাপটের রঙ নীল নেওয়া হবে যখন সাবজেক্ট মূলত সবুজ রঙের (যেমন গাছপালা) যদিও সবুজ রঙ ক্যামেরার ইমেজ সেন্সরের পক্ষে বেশী সংবেদনশীল। আর তাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রেক্ষাপট হিসেবে নেওয়া হয় সবুজ রঙকে। সবুজের ক্ষেত্রে টিভির সেন্সরে বেশী পিক্সেল বণ্টিত হয় ফলে আমাদের চোখের সংবেদনশীলতা আপাতভাবে অনেকখানি বেড়ে যায়। তাই সবুজ ক্যামেরা চ্যানেলে অপ্রত্যাশিত সঙ্কেত (noise) ঢোকে কম এবং উৎপন্ন হয় ঝকঝকে বর্ণাটক। উপরন্তু, সবুজ রঙের প্রেক্ষাপটকে সমভাবে আলোক উদ্ভাসিত করতে অন্যান্য রঙের পর্দা থেকে আলো লাগে কম। এছাড়াও উজ্জ্বল সবুজ বিশেষ সুবিধা দিয়ে থাকে একটি নীল পটভূমির থেকে কারন একটি সাবজেক্টের চোখের রঙ বা কোন সাধারন জিন্স-এর পোশাক অভিন্ন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়। এখন ডিজিটাল কালার টিভি-র যুগ। এখানে রঙ নির্দেশিত হয় তিনটি প্রাথমিক বর্ণ লাল, সবুজ ও নীলের তীব্রতার লেভেল দ্বারা। শুট করা ভিডিও এবং পূর্ব নির্বাচিত রঙের মধ্যে একটি সহজ সাংখ্যিক তুলনা দ্বারা বর্ণাটকের ব্যাপারটি করা হয়। পর্দায় একটি নির্দিষ্ট সময়ে যদি রঙ একদম ঠিক ঠিক মিলে যায় বা একটি সীমার মধ্যে থাকে, তখন ভিডিওটি বিকল্প পটভূমি দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়।

এবার আসা যাক আলোকিতকরণের ব্যাপারটায়। সাবজেক্টকে শুট করার সময় সেই অবস্থায় আলোর উজ্জ্বলতা যা আছে তার সঙ্গে ব্যাকগ্রাউন্ড যেটা আগে থেকে ঠিক করে রাখা আছে, যা দিয়ে দৃশ্যটি প্রতিস্থাপিত করতে হবে এই দুটি অবস্থার আলোর উজ্জ্বলতা মোটামুটি একইরকমের হতে হবে। যদি দিনের বেলায় সূর্যের বিক্ষিপ্ত আলো (diffused light)-তে শুটিং করা হয় তাহলে স্টুডিওতে যে শুট হবে তার আলোগুলিকে এমনভাবে পর্দায় ফেলতে হবে যাতে একই অনুভূতি হয়। কোন ছায়া না পড়ে। অন্যদিকে যদি সূর্যের সরাসরি আলোতে শুটিং করা হয় যেখানে সাবজেক্টের ছায়া পড়বে, তখন স্টুডিওর শুটিং-এ এমনভাবে আলো ব্যবহার করতে হবে যাতে একই উজ্জ্বলতার আলো, সঠিক মাপের এবং ঠিকদিকে ঐ ছায়া উৎপন্ন করে। না হলে দুটি ভিন্ন ফ্রেমের উপরিপাতনের ফলে যে বিভ্রমে আমাদের তাক লেগে যাওয়ার কথা তা মোটেও ফলপ্রসূ হবে না। অতএব, এই কাজটি করতে হবে খুবই বিবেচনার সাথে। আর একটি ব্যাপার হল রঙিন পর্দার সামনে দৃশ্য রেকর্ড করতে ব্যবহৃত ক্ষেত্রের গভীরতা ও পটভূমির ক্ষেত্রের গভীরতা সুসংগত হওয়া আবশ্যক।

এবার আসি জামা কাপড়ের রঙের বিষয়ে। আগেই বলেছি, নীল পর্দার সামনে শুটিং-এ নীল রঙের জিন্স পরা যাবে না। তাহলে পর্দার সঙ্গে সঙ্গে জিন্স পরিহিত অংশও চূড়ান্ত দৃশ্যে প্রতিস্থাপিত হয়ে যাবে। অর্থাৎ ব্যাকগ্রাউন্ড যে রঙের হবে তার সঙ্গে যেন সাবজেক্টের কোন অংশের রঙ এক না হয়।

অবশ্য এর উলটোটাও হতে পারে। যদি আমরা ইচ্ছাকৃত ভাবে চাই যে শরীরের কোন বিশেষ অংশ চূড়ান্ত দৃশ্যে অদৃশ্য থাকুক, তাহলে একই রঙের পোশাক দ্বারা ঐ বিশেষ অংশ ঢেকে দিলেই কেল্লা ফতে। যেমন, ধড়বিহীন মুন্ডু (চিত্র৩) বা মুন্ডুবিহীন ধড়। এছাড়া এরকম দৃশ্য আমরা আরও দেখেছি রামায়ণ বা মহাভারতের দৃশ্যে। তীর বা বল্লম সৈন্যদের মুন্ডু কেটে উড়িয়ে নিয়ে চলল আর দেহ পড়ে রইল তার জায়গায়।borna2

চিত্র ৩ – মাথা ব্যতীত সম্পূর্ণ শরীর সবুজ পর্দা দিয়ে ঢেকে দেওয়ায় চূড়ান্ত দৃশ্যে দেখা যাচ্ছে ধড়বিহীন মুন্ডু

বর্ণাটকের এই পুরো ব্যাপারটা কিভাবে করা হয়ে থাকে তা নিচের ফ্লো-চার্ট থেকে সংক্ষেপে বোঝা যেতে পারে।

চিত্র ৪ – বর্ণাটকের ফ্লো-চার্ট

borna1

আমাদের বিনোদনের পিছনেও যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সুন্দর মেলবন্ধন রয়েছে তা আমরা বিশেষ একটা ভাবি না। কিন্তু একটু গভীরে গিয়ে ভাবলে শুধু অবাক ই যে হতে হবে তা নয়, জানার পরিধিও আরও ব্যাপক হবে আমাদের।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার

প্রবন্ধে ব্যবহৃত চিত্রগুলির (চিত্র ১ ও ৩) জন্য লেখক তার সহকর্মী শ্রী অলোক গায়েন ও শ্রী সপ্তসোম চক্রবর্তী-র কাছে সবিশেষ কৃতজ্ঞ। একটি চিত্র (চিত্র ২) নেওয়া হয়েছে আন্তর্জাল থেকে।

তথ্যসূত্র

১। ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৬ বিড়লা ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড টেকনলজিক্যাল মিউজিয়াম-এ অনুষ্ঠিত ক্রোমা-কী শো-এর উপস্থাপনা।

২। উইকিপিডিয়া https://en.wikipedia.org/wiki/Chroma_key

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s