খবরের কাগজ-যে বাতি এখনও নেভেনি – সেন্টিনিয়াল লাইট -অরিন্দম দেবনাথ-১৯ অক্টোবর ২০১৭

দীপাবলীর বিশেষ সংবাদ

কিছুদিন পর পর বাড়ির ইলেকট্রিক বাতি খারাপ হয়ে যায় আর তা বদলাতে হয়। এটা আর নতুন কথা কি? কিন্তু এরকম কিছু বাতির সন্ধান পাওয়া গেছে যা কিনা একশো বছরেরও বেশি সময় ধরে জ্বলছে! সত্যি অবাক হবার মতই বিষয়। জয়ঢাকের তরফে খোঁজ খবর নিয়েছেন  অরিন্দম দেবনাথ ।

        বিশ্ব জুড়ে এমন কিছু ইলেকট্রিক বাতির সন্ধান পাওয়া গেছে যেগুলো শতাব্দী প্রাচীন এবং এখনও সমান সজীব। এরকমই একটি ইলেকট্রিক বাতি দেখতে হলে যেতে হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের  ক্যালিফোর্নিয়ার, লাইভমোরের ৪৫৫০ ইস্ট এভিনিউর ‘লাইভমোর প্লিসেনটন অগ্নিনির্বাপক বিভাগে’।

        ১৯০১ সাল থেকে প্রায় নিরবচ্ছিন ভাবে জ্বলে চলেছে এই বাতি। ১৯০১ সাল থেকে মাত্র কয়েকবার সামান্য সময়ের জন্য প্রতিস্থাপন ও বৈদ্যুতিক সংযোগ বদলাবার জন্য নেভান হয়েছিল এই বাতি। গিনেস বুকে ও রিপ্লের ‘বিলিভ ইট অর নট’-এ নথিভূক্ত হয়েছে এই বাতিটির কথা। জন্মলগ্নের পর ইলেকট্রিক বাতির দুনিয়া আমুল বদেলে গেলেও  এই নিবন্ধটি লেখার সময় পর্যন্ত আলো দিয়ে চলেছে শতাব্দী প্রাচীন, ‘বাল্‌ব্‌’ জগতের পিতামহ, এই বাতিটি।

           ১৮৯০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেলবি ইলেকট্রিক কোম্পানির হাতে তৈরি কার্বন ফিলামেন্টে প্রস্তুত প্যাঁচওয়ালা এই বাল্‌ব্‌টি প্রথমে একটি জামাকাপড় প্রস্তুত কোম্পানির মালিকানাধীন ছিল।তারপর বাল্‌ব্‌টি তৎকালীন ‘লাইভমোর পাওয়ার কোম্পানির’ মালিক ডেনিস বার্নাল সংগ্রহ করে লাইভমোরের দমকল সংস্থাকে দান করেন। লাইভমোরের দমকল তথা পুলিশ বিভাগ তার গ্যরাজে এটিকে লাগান। তারপর থেকে সবার অগোচরে নিরন্তন জ্বলে চলেছিল এই আলো।          

           ১৯৭২ সালে মাইক ডানস্টান নামক এক সাংবাদিকের নজরে আসে গ্যরাজে টিমটিম করে জ্বলতে থাকা প্রাচীন এই বাল্‌ব্‌টি। তিনি প্রায় এক সপ্তাহ ধরে অনেক নথিপত্র ঘেঁটে ও দমকল বিভাগে কর্মরত এবং লিভারমোরের বেশ কিছু প্রাচীন বাসিন্দার সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে ট্রাই-ভ্যালি হেরাল্ড পত্রিকায় একটি বিশেষ প্রতিবেদন লেখেন – ‘লাইট বাল্‌ব্‌ – মে বি দি ওয়ার্ল্ডস ওল্ডেস্ট’।

           পাঠকমহলে আলোড়ন তোলে সামান্য বাল্‌ব্‌ নিয়ে লেখা এই প্রবন্ধটি। সিবিএস টিভির সঞ্চালক চার্লস কুরাল্টের নজর কাড়ে প্রবন্ধটি। তিনি এই বাল্‌ব্‌টি নিয়ে তাঁর বিখ্যাত শো ‘অন দি রোড উইথ চার্লস কুরাল্ট’ এ একটি অনুষ্ঠান করেন। সাধারণ লোক কৌতূহলী হয়ে ওঠেন এই বাল্‌ব্‌টি নিয়ে। 

          মাইক ডানস্টান প্রবন্ধটি লিখেই ক্ষান্ত থাকেননি। তিনি যোগাযোগ করেন গিনেস বুকের ‘বিলিভ ইট অর নট’ বিভাগে এবং জেনারেল ইলেকট্রিক কোম্পানির সাথে। এরা সবাই এই বাল্‌ব্‌টিকে বিশ্বের সবচাইতে প্রাচীন প্রজ্বলিত ইলেকট্রিক বাল্‌ব্‌ হিসাবে নিশ্চিত করে।

        ১৯৭৬ সালে লিভারমোরের দমকল বিভাগ এই বাল্‌ব্‌টিকে অন্য একটি স্থানে সরানোর পরিকল্পনা করে। প্যাঁচ ঘুরিয়ে খুলতে গেলে বর্ষীয়ান এই বাতিটি পাছে ভেঙে যায় এই ভয়ে বাল্‌ব্‌টিকে তারসুদ্ধ কেটে বিশেষভাবে নির্মিত এক বাক্সে ভরে এক ইলেকট্রিক এঞ্জিনিয়ারের তত্ত্বাবধানে বাল্‌ব্‌টিকে স্থানান্তরিত করেন দমকল বিভাগ। সে সময় মাত্র ২২ মিনিটের জন্য বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে নিভে ছিল বাতিটি। পুরনো রেকর্ড অনুযায়ী এর আগে ১৯৩৭ সালে একবার বিদ্যুৎবিভ্রাট ও সংস্কারের জন্যে টানা এক সপ্তাহ নিভে ছিল বাতিটি।

            ২০০১ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার এক কমিউনিটি হলে এক সঙ্গীতঅনুষ্ঠান তথা বার-বি-কিউ পার্টির মধ্যে দিয়ে উদযাপিত হয় এই বাল্‌ব্‌-এর শততম জন্মবার্ষিকী।

             ২০১১ সালে প্রজ্বলনের ১০,০০,০০০ আলোকঘণ্টা পার করে এই বাতিটি। এবারে সে নতুন পরিচয় পায়। “ওয়ান মিলিয়ন আওয়ার বাল্‌ব্‌”। ১৯১৫ সালে দমকল দফতর “ওয়ান মিলিয়ন লাইট আওয়ার পার্টি” নামে বিশেষ অনুষ্ঠান করে উদযাপন করে সে মাইলস্টোনকে।

               পর্যটকদের ভিড় লেগেই থাকে এই বাল্‌ব্‌টি দেখার জন্য।শুধু সাধারণ পর্যটক নয়। আসেন বিশ্বের তাবড় সাংবাদিককূল। সোনি কোম্পানি একটি বিশেষ ‘বাল্‌ব্‌ক্যাম’ নামের ক্যামেরা বানিয়ে দিয়েছেন এই বাল্‌ব্‌-এর ওপর নজরদারি করার জন্য। বিশেষ পর্দায় পর্যটকদের জন্য হাজির হয় পরিষ্কার ঝকঝকে বাল্‌ব্‌-এর ছবি।

           ২০১৩ সালের ২০মের সন্ধ্যাবেলা বিশেষ পর্দায় আর ওয়েবক্যামে বাল্‌ব্‌-এর জ্বলন্ত ছবি দেখা গেল না। সবাই ধরে নিলেন এবার শেষ হয়েছে শতাব্দী প্রাচীন আলোর আয়ু। পরে একজন ইলেকট্রিক ইঞ্জিনিয়ার পরীক্ষা করে দেখলেন, না বাল্‌ব্‌টি ঠিকই আছে। সমস্যা হয়েছে, বিদ্যুৎ সংযোগে। এ সময় প্রায় টানা সাত ঘণ্টা নিভে ছিল বাতিটি।

        বিশেষজ্ঞদের মতে এই বাল্‌ব্‌টির দীর্ঘ আয়ুর অন্যতম কারণ এর নিরবিছিন্ন জ্বলন। বারবার ইলেকট্রিক বাতি নেভালে ও জ্বালালে আলোর ভেতরে যে ফিলামেন্ট থাকে তা গরমে সঙ্কুচিত ও প্রসারিত হয়। ফলে ফিলামেন্টে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ফাটল ধরে। এবং ধীরে ধীরে এই ফাটল প্রসারিত হয়ে ফিলামেন্টটি ভেঙে যায় ও ইলেকট্রিক বাতিটি অকেজো হয়ে পড়ে।

        এরকম আরও কিছু শতাব্দিপ্রাচীন বাতির একটি আছে টেক্সাসের ফোর্ট ওয়ার্থ শহরে। ১৯৭০ সালে গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ডে এটিকে বিশ্বের সবচাইতে প্রাচীন জ্বলন্ত বাল্‌ব্‌ বলে ঘোষণা করে। কারণ তখনও লিভারমোরের বাতির সন্ধান গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডের কাছে আসেনি। ‘ইটারন্যাল লাইট’ নামে পরিচিত  এই বাতিটি ‘বাইএরস অপেরা হাউস’ এর পেছনের দরজায় ১৯০৮ সালের ২১ সেপ্টেম্বর লাগানো হয়েছিল। ১৯৭৭ সালে এই অপেরা হাউসকে ভেঙে ফেলা হয় ও বাল্‌ব্‌টিকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় লাইভস্টক এক্সচেঞ্জ বিল্ডিঙের মিউজিয়ামে। এই মিউজিয়ামে স্থানান্তরের পর এই বাল্‌ব্‌টি একবারই মাত্র ভুলবশত নেভান হয়েছিল। এর পর এই বাল্‌ব্‌টিকে কোন রকম সুইচ ছাড়া সরাসরি জুড়ে দেওয়া হয় বিশেষ বিদ্যুৎ ব্যবস্থায়।      

        আর একটি শতাব্দি প্রাচীন জ্বলন্ত বাল্‌ব্‌ আছে নরওয়ের ট্রন্ডএেলগ শহরের থামসাভেন্সবানেন রেলওয়ের অধীনে। এই বাল্‌ব্‌টি ১৯০৮ সালে কিংস ওয়াগানের ভেতরে লাগানো হয়েছিল।  

        ১৯১২ সালে থেকে জ্বলা আরও একটি শতাব্দি প্রাচীন বাল্‌ব্‌-এর সন্ধান পাওয়া গেছে  নিউইয়র্ক শহরের এক লোহালক্কড়ের দোকান গাস্নিক সাপ্লাই-এর পেছনের দরজার মাথায়। ১৯৮১ সালে দোকানের মালিক এক চিঠিতে এই বাল্‌ব্‌-এর কথা গিনেস কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিল। এমনকি ১৯৮৩ সালে গিনেস কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে লিভারমোরের বাল্‌ব্‌কে জাল বলে দাবি করে দোকানের মালিক জ্যাক গাস্নিক। কিন্তু সেই দোকানটি ২০০৩ সালে ভেঙে ফেলা হয়। জানা যায়নি সেই প্রাচীন বাল্‌ব্‌টির কী হয়েছিল!

 

জয়ঢাকের খবরের কাগজের এমন সব আশ্চর্য খবরের লাইব্রেরি

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s