খেলার পাতা চেস বক্সিং অরিন্দম দেবনাথ বর্ষা ২০১৭

 খেলার জগতটাই ধীরে ধীরে পাল্টে যাচ্ছে। যেমন ধরা যাক ক্রিকেটের কথা। সাবেকি বনেদি ধৈর্যের খেলা পাঁচ দিনের টেস্ট সিরিজ তো প্রায় শেষের মুখে।পঞ্চাশ ওভারের ‘ওয়ান ডে’ও ইতিহাস হতে বসেছে। এখন ক্রিকেট কুড়ি ওভারের খেলা। সামনে কি আরও পরিবর্তন আসছে সেটা ভবিষ্যৎ বলবে।

দাবা খেলার সাথে আমরা অনেকেই পরিচিত। খবরের কাগজ, বিভিন্ন পত্রিকা, টেলিভিশন, রেডিওতে প্রায়ই দাবা সম্পর্কিত খবরা খবর থাকে। সাধারনত দাবাকে আমরা বুদ্ধির খেলা বলে জানি। বহু প্রাচীন মস্তিস্কের খেলা দাবাও পেয়ে গেছে একটা নতুন রূপ।

ঠিক কবে দাবা খেলার উদ্ভাবন হয়েছিল সঠিক জানা না গেলও আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে  গুপ্ত যুগে ভারতবর্ষে এই খেলার উৎপত্তি হয়েছিল বলে মনে করা হয়। ভারতবর্ষ থেকে এই খেলা পারস্যদেশ হয়ে ইউরোপে পৌঁছয়। তারপর ছড়িয়ে পরে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে। কিছু ঐতিহাসিকের মতে দাবার সূচনা হয়েছিল চিন দেশে। আবার কেউ কেউ বলেন মিশরে এই খেলার প্রথম প্রচলন হয়।

বহু বছর ধরে এই খেলা কল্পনাবিলাসীদের সময় কাটানোর মাধ্যম বলে পরিচিত ছিল।  ইউরোপিয়ানরা  এই সময় কাটানোর ভারতীয় খেলাকে নিয়মকানুনে বেঁধে পুরো দস্তুর খেলার আধুনিক রুপ দেয়। ১৮৫১ সালে লন্ডনে প্রথম দাবা প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। এবং এই প্রতিযোগিতায় ব্রিটিশদের চমকে দিয়ে  অ্যাডলফ অ্যান্ডারসন নামে এক জার্মান দাবাড়ু চেস মাষ্টার খ্যাতি জিতে নেন। ১৮৮৬ সালে প্রথম বিশ্ব দাবা চ্যাম্পিয়নশিপ অনুষ্ঠিত হয়।

মাত্র কিছু বছর আগে ২০০৩ সালে দাবা খেলার এক নতুন রূপ জন্ম নিল। দাবা খেলার সাথে সম্পূর্ণ বিপরীত ধর্মী আর এক খেলা বক্সিংএর  মিশ্রণে তৈরি হল ‘চেস বক্সিং’। ওই বছর নেদারল্যান্ডের আমস্টারডাম শহরে আইপি রুবিন (Iepe Rubingh) নামে এক বক্সার জিন লাউস ভেন্সট্রা’র (Jean Louise Veenstra) সাথে, এক  হাজার উৎসাহী দর্শকের সামনে বক্সিং লড়ার ফাঁকে ফাঁকে দাবা খেলে জন্ম দিলেন দাবা বক্সিং’এর।

যদিও ১৯৭০ দশকে লন্ডনের শহরতলির একটা বক্সিং ক্লাবে রবিনসন পদবীধারী দুই বক্সার ভাই, বক্সিং করার ফাঁকে ফাঁকে দাবা খেলতেন মস্তিস্ককে ক্ষুরধার করতে। ১৯৭৯ সালে ‘মিস্টরি অফ চেস বক্সিং’ নামে একটি কুং-ফু মুভি’ও তৈরি হয়েছিল। যদিও কোনটাই ঠিক খেলার রূপ ছিল না।

 ১৯৯২ সালে প্রকাশিত, এঙ্কি বিলাল ( Enki Bilal) নামে এক যুগোস্লাভিয়ান লেখকের কল্পবিজ্ঞানের গ্রাফিক কমিক, “ফ্রইদ ইকুএতেউর” (Froid Equateur) দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে, আইপি রুবিন এই চেস বক্সিং নামের নতুন খেলার কথা ভেবেছিলেন।

 ১১ পর্ব মিলিয়ে মোট ৪৫ মিনিটের খেলা এই চেস বক্সিং। তার মধ্যে ছয় পর্ব দাবার আর পাঁচ পর্ব বক্সিংএর। মাত্র তিন মিনিট করে সময় নির্ধারিত প্রতিপর্বের জন্যে।আর এক মিনিট সময় থাকে প্রতি পর্বের মাঝে বিরতি হিসেবে।  দাবার চাল দেবার জন্যে মোট ৯ মিনিট সময় পান এক একজন প্রতিযোগী। খেলা শুরু হয় দাবা দিয়ে, শেষও হয় দাবা দিয়ে। দাবা খেলা ও বক্সিং দুটোই চলে রিঙের ভেতরে। দাবাতে কিস্তি অথবা ঘুঁষি মেরে কুপোকাত – যেকোনো একটা করলেই জিতে যান প্রতিযোগী। সারাসরি কোণটাই না হলে বিচারকের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হয়। সব খেলার মতো এই খেলাতেও  নির্দিষ্ট নিয়ম আছে। সব চাইতে কঠিন নিয়মটা হল-সময় নষ্ট। অহেতুক সময় নষ্ট করলে শুধুমাত্র হেরে যাওয়া নয়, প্রতিযোগিতা থেকে অযোগ্য বলে নির্বাসন দেওয়া হতে পারে প্রতিযোগীকে।

খেলাটা কিন্তু মোটেই সহজ খেলা নয়। চেয়ারে বসে ঠাণ্ডা মাথায় দাবার চাল দিয়ে পরক্ষণে বক্সিং রিঙে ঘুঁষি ছোঁড়া – এক চরম স্নায়ুর লড়াই।

নতুন খেলার সূচনা করে এঙ্কি বিলাল ক্ষান্ত ছিলেন না। শুরু করলেন এই খেলাটাকে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে দিতে। বার্লিন শহরে সৃষ্টি হল ‘ওয়ার্ল্ড চেস বক্সিং অরগানাইজেশানের’।

ওই একই বছর গ্রিসে ‘ডাচ বক্সিং অ্যাসোসিয়েশান’ ও ‘ওয়ার্ল্ড চেস বক্সিং অরগানাইজেশানের’ যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হল ‘চেস বক্সিং ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ানশিপ’।

কিন্তু এই খেলা সীমিত ছিল সামান্য কিছু বক্সার ও কয়েকটি নির্দিষ্ট স্থানে। এই খেলাকে ছড়িয়ে দিতে শুরু হল নতুন কর্মকাণ্ড।

২০০৫ সালে বার্লিন শহরে অনুষ্ঠিত হল প্রথম ‘ইউরোপিয়ান চেস বক্সিং  চ্যাম্পিয়ানশিপ’। ২০০৮ সালে           ‘ইন্টারন্যাশনাল চেস ফেডারেশন’ ‘চেস বক্সিং’এর দাবার অংশকে স্বীকৃতি দিল। ২০১০ সালে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চেস বক্সিং ক্লাব তৈরি হল। ২০১১ সালে, কিকবক্সিং তথা ক্যারাটে চ্যাম্পিয়ন মন্টু দাসের নেতৃত্বে ভারতবর্ষে ‘চেস বক্সিং অরগানাইজেশান অফ ইন্ডিয়া’র’ জন্ম হল। ভারতবর্ষ ঘুরে খেলাটি ছড়িয়ে পড়ল, ইরান ও চায়নাতে।  

কিন্তু খেলাটি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে প্রয়োজন অনেক টাকার। টাকার সংস্থান করতে এগিয়ে এলেন কার্টুনিস্ট এঙ্কি বিলাল। ২০১৩ সালে চেস বক্সিংএর কয়েকটি মোটিফ এঁকে প্যারিসে নিলাম করে এক লক্ষ চুয়াত্তর হাজার ইউরো মানে প্রায় সওয়া কোটি টাকা তুলে দিলেন ‘চেস বক্সিং গ্লোবাল মার্কেটিং’ নামে এক সংস্থার হাতে।

২০১৪ সালে যোধপুরে আয়োজিত তৃতীয় ভারতীয় চেস বক্সিং চ্যাম্পিয়ানশিপে প্রতিযোগীর সংখ্যা ছিল ২৪৫। ভারতে এই খেলার জনপ্রিয়তার সাক্ষর।

                              

জয়ঢাকের সমস্ত খেলা ও অভিযান

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s