খেলার পাতা অন্নপূর্ণা মরিস হারজগ অনুবাদ তাপস মৌলিক বর্ষা ২০১৯

আগের পর্বগুলো একত্রে এই লিংকে

জুন মাসের সেই ছ’তারিখেই শুরু হয়েছিল আহতদের নিচে নামিয়ে নিয়ে যাওয়ার দুঃসাধ্য প্রচেষ্টা। অবিশ্রান্ত বৃষ্টির মধ্যে ভয়ঙ্কর খাড়াই সব রাস্তায় পাহাড় ছেড়ে সমতলে নামার সেই দীর্ঘ এবং কষ্টকর প্রক্রিয়া চলেছিল টানা পাঁচ সপ্তাহ, সেই সময়ের মধ্যে ধীরে ধীরে সামলে উঠেছিল আহতরাও। আরোহণের মতো অবতরণের ক্ষেত্রেও এই অসাধারণ সাফল্য অভিযানের সমস্ত সদস্যদের কাছে এক গর্ব করার বিষয়, পর্বতারোহণের ইতিহাসে তা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
দুটো স্কি রানার বা ব্লেডের ওপর বসানো খুব হালকা একটা স্লেজ ছিল আমাদের। শেরপারা এর সঙ্গে পরিচিত নয়। তাই অডট আর আইজ্যাক ঠিক করল, যে তিনজনকে স্লেজে চাপিয়ে নামাতে হবে তাদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম আহত রেবুফতকে দিয়ে পরীক্ষাটা শুরু করা যাক। ইংরিজি ‘ভি’ অক্ষরের মতো বিন্যাসে চারজন শেরপা স্লেজের দু’পাশে দড়ি ধরে রইল, নেতৃত্বে রইল শ্যাজ। দুপুর আড়াইটেয় শুরু হল তাদের যাত্রা। রেবুফতকে দড়ি দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে স্লেজের সঙ্গে বাঁধা হল যাতে পড়ে না যায়। সন্ধের পর শেরপা চারজন ফিরে এল দু’নম্বর শিবিরে, সঙ্গে শ্যাজের লেখা একটা চিরকুট – এরপর থেকে স্লেজ নামানোর জন্য যেন ছ’জন শেরপা নিয়োগ করা হয়।
এরমধ্যে অডট তার সমস্ত রুগিদের ইঞ্জেকশন ইত্যাদি দিয়ে ফেলল, সন্ধেটা গেল ড্রেসিং পালটাতে। রাত নামতেই আবহাওয়া ফের খারাপ হয়ে এল, ভারী তুষারপাত শুরু হল আবার। সবাই বেশ চিন্তান্বিত হয়ে পড়ল। ঠিক হল, যত শীঘ্র সম্ভব বাকি আহতদের নিচে নামিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে, নইলে হয়তো বড্ড দেরি হয়ে যাবে। সৌভাগ্যবশত পরদিন সকালে যখন ঘুম ভাঙল সবার, আকাশ তখন পরিষ্কার। এবার আমাকে নামানো হবে। অডট আমার হাত-পা পরীক্ষা করে দেখল, বদলে দিল ব্যান্ডেজ। দেখলাম খুবই সন্তুষ্ট সে, আমার নাকি ‘দর্শনীয়’ উন্নতি হয়েছে! জামাকাপড় পরিয়ে স্লিপিং ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে আমায় বাঁধা হল স্লেজের ওপর। শেরপাদের দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তৈরি হল আংথারকে। চোখে ব্যান্ডেজ থাকায় দেখতে পাচ্ছিলাম না কিছু, তবে উষ্ণ রোদের সংস্পর্শে বুঝলাম আবহাওয়া ভালো। এভাবে চোখ বেঁধে আমায় টেনে নিয়ে যাবে ভাবলেই বিরক্ত লাগছিল। শুনে খুব খুশি হলাম, আইজ্যাক আমার সঙ্গে যাবে, যাতে আমার একলা না লাগে। ভয় করছিল খুব। বিশেষত যেখানে খাড়া পাথুরে দেওয়াল, সেখানে এরা আমায় নামাবে কী করে? কিন্তু শেরপারা প্রচণ্ড বুদ্ধিমান, ওদের দু’বার দেখাতে হয় না কিছু। পরে নিচের শিবিরে পৌঁছে আইজ্যাক বলছিল, সে কতটা শ্রদ্ধা করে ওদের। “ফ্রান্সে এরকম একটা দল পাওয়া কষ্টকর হত,” বলল সে, “স্লেজ নামানোর সময় প্রত্যেকে যথাসাধ্য করছিল, প্রতিটা পদক্ষেপ একেবারে নিখুঁত এবং ছন্দবদ্ধ এদের।”

 কয়েকটা ঝাঁকুনি দিয়ে চলতে শুরু করল স্লেজটা। খুব দুর্বল লাগছিল, কানেও কম শুনছিলাম যেন! তবে অডটের গলা চিনতে পারলাম, পেছন থেকে আমাদের বিদায় শুভেচ্ছা জানাচ্ছে। নিশ্চয়ই পেছনে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছে সে। স্লিপিং ব্যাগের ভেতর ঘামছিলাম আমি, নিশ্চয়ই রোদ খুব চড়া। কখনো-সখনো পিঠটা নরম তুষারে ঠেকে যাচ্ছিল। মাঝে মাঝে আইজ্যাক কাছে এসে দু-একটা কথা বলছিল, ভরসা পাচ্ছিলাম তাতে। হঠাৎ উৎরাই ঢালটা বেশ খাড়া হয়ে এল, দড়ি দিয়ে বাঁধা থাকা সত্ত্বেও স্লেজের ওপর পিছলে নেমে গেলাম কিছুটা। নামার গতি রোধ করার জন্য শেরপারা এবার স্লেজের দু’পাশে উলটো ‘ভি’ অক্ষরের মতো বিন্যাসে দড়ি ধরে চলতে শুরু করল। খাড়াই পাথুরে দেওয়ালটার ওপরে হাজির হলাম আমরা। দেওয়াল বেয়ে আমায় নামানোর সময় আন্দাজ করলাম ওপরে আইজ্যাক একটা আইস অ্যাক্স গেঁথে তাতে দড়ি বেঁধে বিলে করছে।
এরপর দু’পাশ থেকে প্রতিধ্বনির শব্দে বুঝলাম বড়ো বড়ো বরফের স্তূপে ভরা অঞ্চলের মধ্য দিয়ে চলেছি। ক্ষিপ্র গতিতে জায়গাটা পেরিয়ে এল শেরপারা, নিশ্চয়ই স্তূপগুলো ধ্বসে পড়ার আশঙ্কা আছে। তারপর ফের পাথুরে ঢাল। মনে আছে ঢালটা এখানে খুবই খাড়াই। শেরপারা কীভাবে যে স্লেজশুদ্ধু নামাল আমায়, কোনোদিনই তা জানতে পারব না! আইজ্যাক পরে বলেছিল, চোখ বাঁধা না থাকলে সে বিপজ্জনক দৃশ্য আমি সহ্য করতে পারতাম না! শেরপাদের সেই অসম্ভব কসরতের কথাও আমি কল্পনা করতে পারব না। অবশেষে সবার স্বস্তির নিঃশ্বাস শুনে বুঝলাম নিচের হিমবাহ প্রান্তরে পৌঁছে গেছি। স্লেজটা ফের অনুভূমিক অবস্থায় ফিরে এসেছে, তুষারের ওপর শুয়ে আছি। কিছুক্ষণের বিশ্রাম, তারপর একেবারে দুরন্ত গতিতে স্লেজ টেনে নিয়ে চলল শেরপারা। কল্পনার চোখে দেখতে পাচ্ছিলাম, আমার দু’পাশে তিনজন করে শেরপা স্লেজের দড়ি টানতে টানতে তুষারপ্রান্তরের মধ্য দিয়ে দৌড়ে চলেছে। তারপর গতি কমল। বুঝলাম, এক নম্বর শিবিরের মোরেন অঞ্চলে পৌঁছে গেছি!
কিছুক্ষণ পড়ে রইলাম স্লেজের ওপর। শেরপারা একটা বড়ো ভ্যালি টেন্ট খাড়া করল, তারপর আমায় নিয়ে এল সেই তাঁবুর ভেতর। আইজ্যাক আমার পাশেই শোবার ব্যবস্থা করল। এরপর থেকে সবসময় আমরা একই তাঁবুতে থেকেছি, আপন ভাইয়ের মতো দিনরাত আইজ্যাক আমার খেয়াল রেখে গেছে। নামতে আমাদের সময় লেগেছে দু’ঘন্টা কুড়ি মিনিট। অসাধ্যসাধন করেছে শেরপারা। ওরা না থাকলে যে কী হত!
এক নম্বর শিবিরে আমার চারপাশে কী চলেছে আইজ্যাক সংক্ষেপে বলল আমায়। এরকম অন্ধ হয়ে পড়ে থাকাটা চূড়ান্ত হতাশাজনক একটা ব্যাপার। চোখে ঠুলি পরানো কলুর বলদের মতো লাগছিল নিজেকে। জানি আমার তুষারঅন্ধতা অন্যদের মতো অত গুরুতর নয়, তাই বার বার চোখটা খুলে দিতে বলছিলাম। কিন্তু কলুর বলদের যে কোনও মতামত থাকতে নেই!
বাইরে মেঘ ঘনিয়ে এসেছে আবার, হালকা তুষারপাতও শুরু হয়েছে। তা সত্ত্বেও শ্যাজ এবং নোয়েলের সঙ্গে শেরপারা ফের দু’নম্বর ক্যাম্পে ফিরে গেল ল্যাচেনালকে নামিয়ে আনতে। বিকেল তিনটে নাগাদ ভারী তুষারপাত শুরু হল। একা একা তাঁবুতে শুয়ে নানা কথা ভাবছিলাম। চারিদিক নিঃশব্দ, কেবল মাঝে মাঝে বরফে ফাটল ধরার আওয়াজ সে নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করছিল। আশঙ্কা হচ্ছিল। এরা তাঁবুটা কোথায় ফেলেছে কে জানে! হঠাৎ একটা ফাটলে ঢুকে যাবে না তো? পরক্ষণেই এরকম বালখিল্য ভাবনার জন্য লজ্জা হচ্ছিল। বহু বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন পর্বতারোহী হিসেবে আমার জানা উচিত, বরফের প্রান্তরে ওরকম হঠাৎ করে এক সেকেন্ডে ফাটল সৃষ্টি হয় না।
আইজ্যাক এক নম্বর শিবিরের কাজকর্ম দেখাশোনা করছিল। শেষ বিকেলে পাঁচটা নাগাদ সে অবাক হয়ে দেখে ঘন কুয়াশা ফুঁড়ে নোয়েল আর ল্যাচেনালের স্লেজ-পার্টি হাজির, সবাই আপাদমস্তক তুষারে ঢাকা। শেরপারা এবারে মাত্র পৌনে দু’ঘন্টা সময় নিয়েছে! ওদের অকল্পনীয় পরিশ্রম গেছে আজ, সবাই ক্লান্ত বিধ্বস্ত। কিন্তু এই শিবিরে বেশি খাবার মজুত নেই, মুশকিল! আরও চিন্তার বিষয়, শেরপাদের কিছু সরঞ্জাম ওপরে তিন আর চার নম্বর শিবিরে রয়ে গেছে। এই ব্যাপারটা ওদের বেশ ভাবিয়ে তুলল, কেননা হিমালয় অভিযানের সাধারণ রীতি অনুসারে শেরপাদের যার যার নিজের সাজসরঞ্জাম নিজেকেই নিয়ে আসতে হয়। পরের অভিযানে ওরা সমস্যায় পড়ে যাবে। বার বার আক্ষেপ করছিল ওরা। আংথারকে তো একসময় বলেই বসল, নিজেদের সরঞ্জাম উদ্ধার করতে তারা ফের তিন নম্বর শিবির অবধি যেতে চায়।
আংথারকে-কে তাঁবুতে ডেকে কড়া হুঁশিয়ারি দিলাম আমি, কেউ যেন আর দু’নম্বর শিবিরের ওপরে না যায়, সে যাই পড়ে থাক ওপরে। সঙ্গে অবশ্য এও জানালাম, তার নেতৃত্বে সমস্ত শেরপাদের কর্মকুশলতা এবং ব্যবহারে আমরা খুবই সন্তুষ্ট। আশ্বাস দিলাম, ফেলে আসা সরঞ্জামের জন্য চিন্তা নেই, সবাইকে যথেষ্ট ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। খুশি মনে খবরটা বাকি শেরপাদের দিতে বেরিয়ে গেল আংথারকে।
ল্যাচেনালের শুশ্রূষার জন্য তাড়াতাড়ি আরেকটা তাঁবু খাড়া করা হল। তারপর অন্যদের তাঁবু। প্রচণ্ড ব্যস্ততা চতুর্দিকে। ম্যাজিকের মতো একের পর এক তাঁবু গজিয়ে উঠল পাশাপাশি। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিশাল বরফের দেওয়ালের পাদদেশে সেই ফাঁকা তুষারপ্রান্তর তাঁবুতে তাঁবুতে ছয়লাপ ছোটো এক গ্রামের চেহারা নিল।

পরদিন সকালটা শুরু হল ভালোই, কিন্তু বেলা এগারোটা নাগাদ ফের মেঘ করে এল। কিছুক্ষণ পরে তুষারপাতও শুরু হয়ে গেল যথারীতি। অডট এখনও দু’নম্বর শিবির থেকে নামেনি। দূর থেকে ক্রমাগত তুষারধ্বস নামার আওয়াজ আসছিল। ক্রমশ আরও ঘন ঘন নামছিল ধ্বস। খুব চিন্তা হচ্ছিল। আইজ্যাক এর মধ্যেও মজা করছিল, “ওই তিনটে সাঁইত্রিশের মালগাড়ি গেল, এবার বিকেল চারটের হিমালয়ান এক্সপ্রেস!” ওই দুশ্চিন্তার মধ্যেও হাসি পেয়ে গেল আমার।
দুপুরবেলা চোখে টেলিস্কোপ লাগিয়ে আইজ্যাক দেখল, দু’নম্বর ক্যাম্পের শেষ তাঁবুটা খোলা হচ্ছে। বিকেলে গাধার মতো মোট বইতে বইতে বাকি শেরপাদের সঙ্গে নিয়ে নামল আমাদের ডাক্তার সাহিব। রুকস্যাক নামিয়ে রাখার আগেই তার জিজ্ঞাসা, “কেমন আছে আমার রুগিরা? গতকালের পর থেকে উন্নতি হয়েছে কোনও?”
তা, হয়েছে বৈকি! রেবুফত এখন হাঁটতে পারছে, ওর চোখও সেরে উঠেছে প্রায়। ল্যাচেনালের পায়ের পাতায় রক্ত সঞ্চালন শুরু হয়েছে ফের, আঙুলগুলো ছাড়া বাকি অংশে উষ্ণতাও ফিরে এসেছে, যদিও কালো হয়ে থাকা গোড়ালিটা এখনও দুশ্চিন্তার। আমার পায়ের অবস্থারও উন্নতি হয়েছে, দেখে খুশি হল অডট। এত সহজভাবে পরিস্থিতিটা সে আমায় বুঝিয়ে বলল, খুব ভালো লাগল আমার।
“মনে হয় তোমার বাঁ হাতের আঙুলগুলো সবই কেটে বাদ দিতে হবে, তবে আশা করি ডান হাতের আঙুলগুলোর দুটো করে গাঁট বাঁচাতে পারব। সবকিছু ঠিকঠাক চললে হাত দুটো মোটামুটি চালিয়ে দেওয়ার মতো থাকবে। পায়ের কথায় আসি। ভয় হচ্ছে দু’পায়ের সব ক’টা আঙুলই হয়তো বাদ যাবে, তবে তাতে তোমার হাঁটতে অসুবিধে হবে না। মানে, প্রথম প্রথম নিশ্চয়ই একটু সমস্যা হবে, তারপর ঠিক অভ্যেস হয়ে যাবে দেখো।”
ভাবছিলাম অডট যদি তড়িঘড়ি ইঞ্জেকশনগুলো না দিত সেদিন, তাহলে কী দশা হত আমার! সেই ওষুধের ক্রিয়া নিশ্চয়ই চলছে এখনও। আরও ইঞ্জেকশন দিতে হবে নাকি! কী করে সহ্য করব কে জানে! যাই হোক, শৃঙ্গ বিজয়ের পর এই প্রথম আজ আমরা সবাই একসঙ্গে হয়েছি। অসুস্থদের অবস্থারও উন্নতি হয়েছে অনেক। সাফল্য উদযাপনের এই সুযোগটা তাই কিছুতেই হাতছাড়া করতে চাইছিলাম না আমি। এবার একটু আনন্দ করাই যায়! মুরগির মাংসের একটা টিনের কৌটোই বেঁচে ছিল কেবল, সেটা ঘিরে বসলাম সবাই। এক বোতল শ্যাম্পেনও খোলা হল। মাত্র এক বোতলের পক্ষে নিজেরাই সংখ্যায় বেশি আমরা, সবারই ইচ্ছে করছে খেতে, কিন্তু আমি বদ্ধপরিকর ছিলাম যেভাবেই হোক শেরপাদেরও এই উদযাপনে সামিল করতে হবে। আংথারকে-কে আমাদের তাঁবুতে নিমন্ত্রণ জানালাম তাই, ওর সঙ্গে বসে শ্যাম্পেন খেলাম সবাই। আমাদের সবারই মনের কথা ওকে বলল আইজ্যাক, “নাও, অনেক কষ্ট করেছ! তবে আমাদের অভিযানের এই সাফল্য পৃথিবী মনে রাখবে চিরকাল। তোমাদের কথাও লেখা থাকবে ইতিহাসে।”
অজস্র সমস্যাসংকুল পরিস্থিতির মধ্যেও সেদিন আমরা আনন্দ করেছিলাম খুব। শিবিরের পরিবেশও অচিরেই আনন্দময় হয়ে উঠল। পরের রানারের হাতে পাঠানোর জন্য লুসিয়ান ডেভিস-কে একটা টেলিগ্রাম লেখা হলঃ FRENCH HIMALAYAN EXPEDITION 1950 SUCCESSFUL STOP ANNAPURNA CLIMBED JUNE 3RD 1950 – HERZOG
উৎসব শেষ হতে না হতেই ফের ইঞ্জেকশনের পালা শুরু হল। পায়ের ইঞ্জেকশন দুটো ঝটপট হয়ে গেল। তারপর অডট হাত নিয়ে পড়ল। এ দুটোই সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক। এক ঘন্টা ধরে সমস্ত প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হল। রাত যত বাড়ে, অডট ততই অধৈর্য হয়ে পড়ে।
“ওরকম নড়াচড়া করছ কেন?” চিৎকার করে উঠল সে।
“ঠিক আছে, চেষ্টা করছি, নড়ব না আর, কিন্তু চিৎকার আমায় করতেই হবে। পাত্তা দিও না, তোমার যা করার করে যাও।”
ঠিক সময়ে টেরে আবার আমার তাঁবুতে চলে এসেছে। যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাচ্ছিলাম আমি, টেরে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রইল আমায়।
“এইবারে পেয়েছি ধমনীটা! নোড়ো না, একদম নড়বে না, মরিস!” অডট চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
“ধুত্তোর!” ফের চিৎকার করে ওঠে সে, “ধমনী খুঁজে পাই তো ইঞ্জেকশনের ছুঁচে রক্ত জমে যায়! এ আর হবে না আমার দ্বারা!”
হতাশ লাগছিল অডটকে, তবে মুখে যাই বলুক না কেন, জানি সে হাল ছাড়ার পাত্র নয়। ছাড়ব না আমিও, সে যতই যন্ত্রণা হোক! আমার তাঁবু থেকে এরকম কাতর আর্তনাদ শুনে শিবিরের বাকি সবাই চুপ মেরে গেছে। শেরপারাও সব চুপ। ওরা কি ওদের বড়া সাহিবের জন্য প্রার্থনা করছে? আমি হাপুস নয়নে কেঁদে চলেছিলাম, থামতে পারছিলাম না কিছুতেই, আর মাঝে মাঝে মৃগী রোগীর মতো কেঁপে কেঁপে উঠছিলাম।
অবশেষে, কিছুক্ষণ বিরতির পর রাত দশটা নাগাদ ইঞ্জেকশনের পালা সাঙ্গ হল। সারা তাঁবু রক্তে মাখামাখি। অডট আর তার সহকারী আইজ্যাক বেরিয়ে গেল তাঁবু ছেড়ে। টেরে তখনও আমায় বুকে জড়িয়ে রেখেছে, ধীরে ধীরে পিঠে চাপড় মেরে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করছে যেন। এত বিপর্যস্ত আমি কখনও বোধ করিনি। ক্লান্ত, বিধ্বস্ত – মনে হচ্ছে প্রতিরোধ ক্ষমতার শেষ সীমায় পৌঁছে গেছি। মমতামাখা গলায় টেরে বলে চলেছিল, “সব ঠিক হয়ে যাবে, দেখে নিও!”
“টেরে, সবই তো শেষ আমার! এরা যা করছে আর সহ্য করতে পারছি না আমি!”
“জীবন তো শেষ হয়ে যায়নি, মরিস!” বলল টেরে, “আবার ফ্রান্স দেখবে তুমি… আমাদের সেই ফ্রান্স, শ্যাময় উপত্যকা…”
“হ্যাঁ, শ্যাময় হয়তো দেখব, কিন্তু আর যে পাহাড়ে চড়তে পারব না!” অবশেষে মনের গহন থেকে অবরুদ্ধ আবেগটা বেরিয়ে এল সমস্ত দ্বিধা আর কর্তব্যপরায়ণ নির্লিপ্ত দলনেতার মুখোশ ঠেলে, “আর পাহাড়ে চড়া হবে না আমার! কতকাল ধরে ভেবে এসেছি আইগার শৃঙ্গে উঠব, আর তো হবে না এ জীবনে…”
হু হু করে বুক ঠেলে ওঠা কান্নায় আমার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেল। টেরের বুকে মুখ লুকিয়ে ফুলে ফুলে কেঁদে চললাম আমি। মাথায় ঝরে পড়ছে টেরের চোখের জল, টেরেও যে কাঁদছে! সেই একমাত্র আমার এই ব্যক্তিগত বিপর্যয় হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে পেরেছিল।
“না, আইগারে হয়তো আর চড়া হবে না, তবে আমি নিশ্চিত পাহাড়ে আবার ফিরে আসতে পারবে তুমি,” বলল টেরে, তারপর দ্বিধাভরে যোগ করল, “নিশ্চয়ই আগের মতো শক্ত শক্ত রুটে আর উঠতে পারবে না!”
“জানি আগের মতো পারব না আর, কিন্তু টেরে, সহজ রুটেও যদি পারি তাহলেও যে অনেক! পাহাড় আমার সবকিছু, জীবনের সেরা দিনগুলো আমি পাহাড়ে কাটিয়েছি। বিখ্যাত বা দুর্গম কোনও শৃঙ্গে ওঠা কিংবা চমকপ্রদ কিছু করে দেখাতে চাই না আমি, শুধু পাহাড়ের রাজ্যে নিজেকে উপভোগ করতে চাই, হোক না সে সহজ রাস্তায়…”
“সেটা ঠিকই পারবে, দেখো তুমি,” টেরে বলল, “আমি জানি, পারবে। আমিও তো তোমার মতোই, পাহাড় ছাড়া আমরা থাকতে পারব না।”
“কিন্তু পাহাড়ই তো সব নয়, টেরে, জীবনে তো অন্য দিকও আছে! সেখানে কী হবে?”
“আমি নিশ্চিত, ঠিকই মানিয়ে নিতে পারবে তুমি।”
কিছুক্ষণ সব চুপচাপ। তারপর টেরে বলল, “নাও, ঘুমোও এখন।”
মায়ের মতো পরম মমতায় টেরে আমার গায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। অসাধ্যসাধন করেছিল সেদিন সে, আমার ব্যথাতুর হৃদয়কে শান্ত করতে পেরেছিল। তারপর, শেষবারের মতো আমি ঠিক আছি কিনা দেখে নিয়ে সে ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেল। এমন বন্ধু আর কোনোদিন পাইনি আমি!

পরদিন সকালে অডট আমার চোখের ব্যান্ডেজ খুলে দিল। সবকিছু ফের দেখতে পেয়ে বেশ ভালো লাগছিল। দেখলাম আবহাওয়া পরিষ্কার। কত তারিখ আজ? জিজ্ঞেস করলাম আমি। গত কয়েকদিন যেন একটা দীর্ঘ নিরবচ্ছিন্ন রাতের মতো কেটে গেল!
“শুক্রবার, ৯ জুন,” বলল আইজ্যাক।
সে মুহূর্তে ল্যাচেনালকে বেস ক্যাম্পে নামিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছিল। একটা হালকা বেতের চেয়ারে বসিয়ে শেরপারা পিঠে বয়ে নামাবে ওকে। মান্ধাতার আমলের এই অদ্ভুত পদ্ধতি আমার কোনোদিনই পছন্দ নয়। ল্যাচেনাল অবশ্য এর সঙ্গে পরিচিত, আল্পসে অনেক উদ্ধারকার্যের সময় সে নিজেও আহতদের নামিয়েছে এই উপায়ে। সে দেখি এভাবে নামার জন্য তৈরি একেবারে, যদিও পরে আর তার এত উৎসাহ ছিল না! কিছুক্ষণের মধ্যেই শেরপারা পালা করে ল্যাচেনালকে পিঠে নিয়ে নামতে শুরু করল। ওদের দলের সঙ্গে রইল কোজি আর নোয়েল। ল্যাচেনালের পা দুটো অনিয়ন্ত্রিতভাবে ঝুলতে লাগল শূন্যে, যন্ত্রণায় কাতরাতে লাগল সে। বিকেলে শেরপারা ফিরে এল এক নম্বর শিবিরে, একটু পরে ফিরল কোজিও। নামতে ঘন্টা দুই সময় লেগেছিল ওদের। রেবুফতও নেমে গিয়েছিল একইসঙ্গে। সারাদিন শুয়ে শুয়ে বিশ্রাম করলাম আমি, বাকি সবাই নিচে নামার প্রস্তুতি হিসেবে মালপত্র বাঁধাছাঁদা করতে লাগল।

পরদিন রওনা হওয়ার আগে অডট আমায় পরীক্ষা করল। দেখলাম সে বেশ সন্তুষ্ট। অসম্ভব যন্ত্রণাদায়ক হলেও অ্যাসিটাইলকোলিন ইঞ্জেকশনগুলির জন্য নিশ্চিতভাবে আমার হাত-পায়ের অন্তত বেশ কিছুটা অংশ বেঁচে গেছে। চেয়ারে বসিয়ে পালা করে আমায় বয়ে নিয়ে যাবে আজীবা, সরকি, ফুথারকে এবং চিনি। রাস্তাটা এতদিনে সবার মুখস্থ হয়ে গেছে, পাথুরে অংশ বিশেষ নেই। তা সত্ত্বেও প্রতিটা পদক্ষেপে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি লাগছিল। প্রতি মুহূর্তেই মনে হচ্ছিল এই বুঝি পড়ে গেলাম! মাঝে মাঝেই শেরপাদের পা পিছলে যাচ্ছিল, বেশ বুঝতে পারছিলাম। আজীবা আর চিনি তো বেশ কয়েকবার পিছলে গেল। সঙ্গে সঙ্গে আতঙ্কিত হয়ে দু’হাত বাড়িয়ে দিচ্ছিলাম আমি, যদিও জানি ওতে কোনও লাভ নেই। তুষারে ঢাকা অংশে নামার সময় বরং ভয় কম লাগছিল। খাড়া উৎরাই পাথুরে পথে আশঙ্কা হচ্ছিল, আমার বাহক যদি একবার কোনোভাবে পড়ে যায়, তাহলে আমার হাত-পায়ে ফের ভালোরকম চোট লাগবে। “সরকি, সাবধানে! খুব সাবধানে!” মাঝে মাঝেই চিৎকার করে উঠছিলাম আমি। বিপজ্জনক পাথুরে ঢালগুলোয় দু’জন শেরপা মিলে একে অন্যকে সাহায্য করে নামাল আমায়। অবশেষে নিচে বেস ক্যাম্পের দেখা পাওয়া গেল। মনে হচ্ছিল যেন সারা দিন ধরে চলেছি, বাস্তবে সময় লেগেছিল মাত্র আড়াই ঘন্টা। কোনও বিপদআপদও হয়নি।
অভিযানের সকলেই আজ বেস ক্যাম্পে নেমে আসবে। সমস্ত কাজকর্মের কেন্দ্রবিন্দু এখন এই বেস ক্যাম্প। আমায় একটা তাঁবুর ভেতরে ঢুকিয়ে শুইয়ে দেওয়া হল। হঠাৎ প্রচণ্ড উত্তেজিত অবস্থায় ছুটতে ছুটতে আইজ্যাক সেই তাঁবুর ভেতর হাজির, “কুলি! কুলি! কুলিরা চলে এসেছে!”

অদ্ভুতদর্শন এই কুলিরা নিজেদের ছোটো ছোটো দলে ভাগ হয়ে একসঙ্গে বসেছিল। দেখে চিনতে পারলাম অনেককেই। পনেরো দিন আগে ওদের সঙ্গে যে চুক্তি হয়েছিল সেইমতো ওরা ফিরে এসেছে। কথা রেখেছে। আইজ্যাক তাই উল্লসিত। সে চটপট ওয়্যারলেস সেটটা চালু করে ফেলল। আবহাওয়ার খবরের সময় এখন। বিশেষ করে আমাদের উদ্দেশেই বর্ষার আগমনসংক্রান্ত আবহাওয়ার এক সতর্কবার্তা প্রচারিত হল ইংরিজিতেঃ
‘আকাশবাণী দিল্লি,
নেপালের অন্নপূর্ণা পর্বতশৃঙ্গে ফরাসি অভিযানের জন্য বিশেষ আবহাওয়ার সংবাদঃ
পূর্ব হিমালয়ে ক্রমশ ছড়িয়ে পড়া বর্ষা আজ ১০ জুন অন্নপূর্ণা অঞ্চলে পৌঁছবে…’
অর্থাৎ গত কয়েকদিনের ঝড়বৃষ্টি, যা আমাদের বিপর্যস্ত করে ফেলেছে, সেটা নেহাতই প্রাক-বর্ষার দুর্যোগ ছিল। আসল বর্ষা শুরু হচ্ছে আজ। হিমালয় তথা এশিয়ার সর্বপ্লাবী বর্ষার কথা শুনেছি, দেখিনি কখনও। কাল থেকে নিশ্চয় আকাশ ফুটো করে বন্যার মতো নিরবচ্ছিন্ন জলধারা নেমে আসবে আমাদের ওপর। খবরটা শুনে অবশ্য কারও তেমন চাঞ্চল্য দেখা গেল না, নির্বিকারভাবেই শুনলাম সকলে। বেস ক্যাম্প অবধি তো নেমে এসেছি, এরপর দেখা যাক কী হয়!
তাঁবুর দরজা দিয়ে একজন কুলি হঠাৎ একটা চিরকুট বাড়িয়ে দিল। খবর পাঠিয়েছে শ্যাজ। সে মিরিস্তি খোলা নদী কোথায় সহজে পেরোনো যাবে দেখতে এক দিনের রাস্তা এগিয়ে গেছে। লিখেছে এক বিকেলেই নদীর জল প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট করার উপায় নেই। যত শীঘ্র সম্ভব এই উপত্যকা ছেড়ে পালাতে হবে আমাদের, নয়তো নন্দাদেবী অভিযানে টিলম্যানের দলের মতো নদীর ফাঁদে পড়ে যাব।
পরদিন ভোর হতে দেখি পূর্বাভাস মতো অঝোরধারায় বৃষ্টি পড়ে চলেছে। শেরপারা যুদ্ধকালীন তৎপরতায় শিবির গুটিয়ে ফেলল। ওদের নির্দেশ দেওয়া ছিল, অতিরিক্ত খাবারদাবার যা আমাদের পক্ষে আর নিচে বয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, সমস্ত যেন কুলিদের মধ্যে বিতরণ করে দেওয়া হয়। সেইমতো সরকি আর আংথারকে বাড়তি খাবারের কৌটো আর জমানো দুধের টিউবগুলো কুলিদের দিকে বাতাসে ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিতে লাগল, কুলিরা হই হই করে ঝাঁপিয়ে পড়ল সেগুলোর ওপর। যাত্রা শুরুর আগেই বকশিশ! এ যে পড়ে পাওয়া চৌদ্দ আনা! ওদিকে অডটের মাথা খারাপ, ওষুধপত্র প্রায় ফুরোনোর মুখে। এমনই দুর্ভাগ্য, আমায় ইঞ্জেকশন দেওয়ার সময় হাত থেকে পড়ে গিয়ে ছুঁচটা গেল ভোঁতা হয়ে, সিরিঞ্জও ভাঙল। ব্যাপার গুরুতর! অ্যাসিটাইলকোলিনের মাত্র দুটো অ্যামপুল বেঁচে আছে আর। ল্যাচেনালকে দেওয়ার পর আমার দু’হাত আর শুধু ডান পায়ে দেওয়া গেল ইঞ্জেকশন, থামতে হল সেখানেই। সবাই খুব চিন্তিত হয়ে পড়ল, আমি নির্বিকারভাবে মৃতপ্রায় একটা মানুষের মতো পড়ে রইলাম। বাঁচা গেছে ইঞ্জেকশন শেষ! ওই দুর্বিষহ যন্ত্রণা আর সইতে হবে না অন্তত!
আংথারকের তদারকিতে কুলিদের দলের শেষ সদস্যটি বোঝা নিয়ে রওনা হয়ে যাওয়ার পর ল্যাচেনালকে নামানো শুরু হল। প্রথমে শেরপারা চেষ্টা করল একটা স্ট্রেচারে শুইয়ে ওকে নামাতে। কয়েক পা যাওয়ার পরেই স্ট্রেচার বাতিল করে স্লেজ পরীক্ষা করে দেখা হল। সে প্রচেষ্টাও বিফলে যাওয়ায় ফের সেই বেতের চেয়ার! চেয়ারে বসিয়ে বাঁধার আগে অডট ল্যাচেনালকে একটা মরফিন ইঞ্জেকশন দিয়ে দিল। আমাকেও বসানো হল আরেকটা চেয়ারে, পা দুটো জোড়া করে একটা ভেজা স্লিপিং ব্যাগে পুরে দড়ি দিয়ে বেঁধে দিল ওরা, যাতে অনিয়ন্ত্রিতভাবে শূন্যে দোল না খায়। শুধু স্লিপিং ব্যাগ কেন, সবকিছুই ভেজা! অবিশ্রান্ত ধারায় বৃষ্টি পড়ে চলেছে। চারপাশের উঁচু উঁচু দেওয়াল থেকে জলধারার সঙ্গে ছোটো ছোটো পাথর গড়িয়ে পড়ছে, কাছে-দূরে বিভিন্ন জায়গায় ধ্বস নামার শব্দ। হিমবাহের মোরেন অঞ্চল দিয়ে রাস্তা, জলে-কাদায়-বালিতে একেবারে মাখামাখি হয়ে আছে, খালি পায়ে হাঁটা কুলিদের পায়ের পাতা ডুবে যাচ্ছে কাদায়। দূর থেকে আমাদের দেখলে মনে হবে যেন কোনও রণক্ষেত্র থেকে যুদ্ধবিধ্বস্ত একটা দল সহায়-সম্বল যা আছে সব নিয়ে পালিয়ে আসছে!
আমি আর ল্যাচেনাল দুই পঙ্গু অভিযাত্রী, অডট, টেরে, কোজি, আইজ্যাক, সরকি আর আটজন কুলি – আমাদের এই শেষ দলটা অত্যন্ত কষ্টেসৃষ্টে শম্বুকগতিতে এগিয়ে চলেছিল। রাত্রি নামার আগে নির্দিষ্ট আস্তানায় পৌঁছোতে পারব কি আমরা? দূরত্বের বিচারে ব্যাপারটা অসম্ভব নয়, বরং সোজাই। কিন্তু পিঠের বোঝায় নুয়ে পড়া কুলিরা যেরকম মন্থরগতিতে এগোচ্ছে, যেভাবে মোরেনের এই কঠিন পথে প্রতি পদে পিছলে যাচ্ছে, তাতে মনে ঘোরতর সন্দেহের উদয় হল। সময় দ্রুত বয়ে চলল। কিছুক্ষণের জন্য মেঘ সরে গেল, থামল বৃষ্টিও। আমাদের সঙ্গে টর্চ কিংবা খাবারদাবার কিছু ছিল না। শেষ দলটার যে এত দেরি হবে আংথারকে আন্দাজ করতে পারেনি, তাই ও সবের ব্যবস্থাও করেনি। অগত্যা সাহায্য চাইতে সরকি-কে তাড়াতাড়ি এগিয়ে যেতে বলা হল।
অচিরেই এক বর্ণ-গন্ধ এবং দিকচিহ্নহীন প্রান্তরে হারিয়ে গেলাম আমরা। চারদিকে শুধু পাথর আর পাথর, হিমবাহবাহিত আলগা পাথর ছড়ানো ‘স্ক্রি’ অঞ্চল। অন্ধকার হয়ে আসছে, দৃষ্টির সীমাও আসছে কমে। অসীম ধৈর্যের সঙ্গে কুলিরা ধীরে ধীরে কিন্তু না থেমে এগিয়ে চলেছে, কারও মুখে কিন্তু কোনও অভিযোগ নেই। রাত নেমে এল। সবার রুকস্যাক খুঁজেপেতে মোট তিনটে টর্চ পাওয়া গেল। কুয়াশার মধ্যে তিন সাহেবের দেখানো টর্চের আলোয় আমাদের শোভাযাত্রা চলল। কিছুক্ষণ রেহাই দেওয়ার পর বৃষ্টি শুরু হল আবার, আর শুরু হল একদম মুষলধারে। অবশেষে একটা প্রচণ্ড খাড়াই আর পেছল চিমনির মতো গলিপথ বেয়ে কোনোমতে নামার পর এক প্রশস্ত পাথুরে চাতালে পৌঁছে ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত, উদ্বিগ্ন কুলির দল থামল। তখন রাত আটটা পেরিয়ে গেছে।
মাথার ওপর একটা বিশাল পাথর চাতালটার কিছু অংশ বৃষ্টি থেকে আড়াল করে রেখেছে। আমাকে আর ল্যাচেনালকে সেই ছাউনির নিচে নামিয়ে রাখা হল। সবাই বলল, এই বিপজ্জনক রাস্তায় অন্ধকারে বৃষ্টির মধ্যে আজ আর আমাদের বয়ে সামনের শিবিরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। টেরে ঠিক করল আমাদের সঙ্গে থেকে যাবে। অডট, আইজ্যাক আর কোজি তাড়াতাড়ি রওনা দিল শিবিরের দিকে। কয়েক পা এগিয়েই ওরা দেখা পেল সরকি আর ফুথারকের। তারা শিবির থেকে আমাদের খোঁজে পিছিয়ে আসছে। সরকিকে বলা হয়েছিল শিবির থেকে খাবারদাবার নিয়ে আসতে, সে একটা কফিভর্তি ফ্লাস্ক নিয়ে এসেছে কেবল! সরকিকে আমাদের কাছে পাঠিয়ে ফুথারকে-কে ফেরত নিয়ে অডটরা নেমে গেল শিবিরে, পৌঁছল ঘন্টাখানেক পর। ওদের কাছে আমাদের দুর্দশার কথা শুনে খাবারদাবার আর প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে তৎক্ষণাৎ শ্যাজ আমাদের উদ্দেশে রওনা দিল, সঙ্গে নিল দাওয়াথোন্ডুপ-কে। এদিকে আমাদের ছাউনিতে পরিস্থিতি তখন মোটেই সুবিধের নয়। টেরে যদিও রসিকতা করে পরিবেশ হালকা করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল, ওতে কাজ হচ্ছিল না তেমন। ল্যাচেনাল তখনও মরফিনের ঘোরে ঝিমোচ্ছে, কিন্তু আমি নির্দিষ্ট শিবিরে পৌঁছোতে না পারার জন্য ক্রমাগত শাপশাপান্ত করে চলেছিলাম সবাইকে।
যখন সবাই প্রায় ধরেই নিয়েছি নিচের শিবির থেকে আর কেউ আসবে না আজ, ঠিক তখনই উদয় হল শ্যাজ। সারা গা বেয়ে বৃষ্টির ধারা গড়িয়ে নামছে তার। আমার দিকে চেয়ে একটু হেসে সে ঘোষণা করল, স্লিপিং ব্যাগ, গরম জামাকাপড় আর খাবারদাবার নিয়ে এসেছে ওরা। আর কী চাই? কিছুক্ষণের মধ্যেই সোঁ সোঁ শব্দে একটা স্টোভ জ্বলতে শুরু করল। সকালের পর থেকে কেউ কিছু খাইনি আমরা। কৌটোর ঢাকনা খুলে স্টোভের ওপর গরম বসানো খাবারের গন্ধে সবার নোলা সকসক করে উঠল। এদিকে দাওয়াথোন্ডুপ কয়েকটা এয়ার ম্যাট্রেস ফুলিয়ে চাতালের ওপর দিব্যি বিছানা করে ফেলেছে! আমার খাবার ইচ্ছে তেমন ছিল না, কিন্তু ম্যাট্রেস আর স্লিপিং ব্যাগের আরামটা উপভোগ করছিলাম। সারা রাত ধরে বৃষ্টি চলল, ঘুমোতে পারলাম না একফোঁটা। ঠান্ডায় দাঁতে দাঁত লেগে ঠকঠক করে কাঁপছি, ওদিকে মাথার মধ্যে ঘুরছে হাজার শঙ্কা আর দুশ্চিন্তা!

পরদিন সকালে আবহাওয়ার উন্নতি হল। মেঘেদের বিন্যাস আজ বদলে গেছে। চারপাশের খাড়া খাড়া পাহাড়ের দেওয়ালের গা ঘেঁষে তারা ক্রমশ ওপরদিকে উঠে চলেছে। শ্যাময় উপত্যকায় এরকম হলে আবহাওয়া ভালো থাকবে বোঝায়। ফের সেই বেতের চেয়ারের মধ্যে বসিয়ে দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলা হল আমায়। আর ভালো লাগছিল না। ল্যাচেনালেরও একই দশা। এরকমভাবে অন্যের পিঠে নিছক একটা বোঝা হিসেবে চলতে কার আর ভালো লাগে! যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সামনের শিবিরে পৌঁছনোর চেষ্টা করছিলাম আমরা। বারে বারেই জিজ্ঞেস করছিলাম, “কত দূর আর?”
প্রতিবারই একই উত্তর দেওয়া হচ্ছিল আমায়, যেন আমি একটা বাচ্চা ছেলে, “এই তো এসে পড়েছি, আর পাঁচ মিনিট!”
অবশেষে একটা ছোটো সমতল মাঠের ওপারে আমাদের তাঁবুগুলোর হলদে রঙের ছাদ নজরে এল। আকাশ তখন পরিষ্কার। আইজ্যাক, নোয়েল আর অডট আমাদের সাদর অভ্যর্থনা জানাল। দুর্দশার পালা অবশ্য তখনও শেষ হয়নি আমাদের। মিরিস্তি খোলার ওপর শ্যাজ যে অস্থায়ী সেতুটা বানিয়েছে সেটা বিকেল অবধি টিকবে না। তখনই নদীর জল সেতুর মাত্র এক ফুট নিচ দিয়ে বয়ে চলেছে। নামেই সেতু, চার-পাঁচটা গাছের গুঁড়ি বুনো লতা দিয়ে পাশাপাশি বেঁধে নদীর দু’পারে দুটো বড়ো বোল্ডারের ওপর ফেলে রাখা হয়েছে। মালপত্র এবং অসুস্থদের ওপারে বয়ে নিয়ে যাওয়ার আগে আরেকটু শক্তপোক্ত করে বাঁধা হল গুঁড়িগুলো। তাও কুলিরা কেউই পিঠে করে আমাদের ওপারে নিয়ে যেতে রাজি হল না ভয়ে, শেরপারাও বলল ব্যাপারটা খুব বিপজ্জনক। অবশেষে এগিয়ে এল আজীবা। বাকিরা ওকে সাহায্য করার জন্য সেতুর দুই প্রান্তে দাঁড়াল। তাঁবুর ভেতর বসে বসে বুঝতে পারলাম ল্যাচেনালকে প্রথমে ওপারে নিয়ে যাওয়া হল। আজীবা ফিরে এল তারপর, চেয়ারশুদ্ধু আমাকে পিঠে তুলে নিয়ে দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে গেল সেতুর দিকে। নিচ দিয়ে প্রচণ্ড স্রোতে পাক খেতে খেতে বয়ে চলেছে মিরিস্তি। জলের ছিটে লেগে ভিজে যাচ্ছে আজীবার পা দুটো, প্রতি মুহূর্তে পিছলে যাওয়ার আশঙ্কা। অসহায়ের মতো অন্যের ওপর নির্ভর করা ছাড়া কিছুই করার নেই আমার। চোখ বন্ধ করে থাকার চেষ্টা করলাম, পারলাম না। খুবই সাবধানে এগোচ্ছে আজীবা, তবু ওর কানে কানে ফিসফিস করে বললাম, “খুব ধীরে ধীরে, আজীবা!”
এই পেছল নড়বড়ে গুঁড়িগুলোর ওপর পারবে কি আজীবা টাল সামলাতে? অডট একদৃষ্টে দেখছিল ব্যাপারটা। নির্বিকার মুখে একটা হালকা হাসি ঝুলিয়ে রেখে আমায় ভরসা দেবার চেষ্টা করছিল, কিন্তু ওর চোখের উৎকণ্ঠা চাপা পড়ছিল না। যে মুহূর্তে আজীবা সেতুটার ওপর পা রাখল, বুঝতে পারলাম কতটা ঠুনকো সেটা। দাঁতে দাঁত চেপে অত্যন্ত সাবধানে মেপে মেপে পা ফেলছিল আজীবা। ফের ওর কানে কানে বললাম, “আস্তে, আজীবা, খুব সাবধান!”
ওর পায়ের নিচে ঘুরপাক খেতে খেতে প্রচণ্ড শব্দে বয়ে চলেছে তীব্র জলস্রোত, তাকালে মাথা ঘুরে যায়। ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা শেরপারা আর খুব দূরে নয়। ভয় হচ্ছিল, প্রায় পৌঁছে গেছি ভেবে শেষদিকে তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে ভারসাম্য না হারায় আজীবা! আবার ফিসফিস করে বললাম, “খুব আস্তে, আজীবা!” আর কয়েক ইঞ্চি – তারপর ওপারের শেরপাদের বাড়িয়ে থাকা হাত আমাদের ধরে ফেলল, টেনে নিল নিরাপদ আশ্রয়ে। হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম যেন! বুক খালি করে একটা স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। মনে হচ্ছিল, গলা ছেড়ে একটু কাঁদতে পারলে বেশ আরাম হত! চরম উত্তেজনাপূর্ণ ও বিপদসংকুল সময়ের পরে টানটান হয়ে থাকা স্নায়ুগুলো অবশেষে বিরাম পেলে এমন কান্না পায়। মনে হয়, যাক এখনও বেঁচে আছি তাহলে!
আজীবা তাড়াতাড়ি একটা তাঁবুর মধ্যে আমায় নিয়ে এসে যত্ন করে বসাল। নদীর জল যে ক্রমশ বাড়ছে সেটা চোখে দেখেই বোঝা যাচ্ছিল। বাকি সদস্যরাও তাড়াতাড়ি সেতু পেরিয়ে চলে এল এপারে, তারপর লাইন দিয়ে পার হল দলের কুলিরা। ঘন্টা দুই পরে দেখা গেল লোকলস্কর মালপত্র সমস্তই এপারে চলে এসেছে। যাক! মিরিস্তি খোলার ফাঁদে ফেঁসে যাইনি আমরা! খুব জোর বেঁচে গেছি! পরদিন সকালেই দেখা গেছিল আমাদের সেই ব্রিজের আর চিহ্নমাত্র নেই, ফুলে ওঠা নদীর স্রোতে কোথায় ভেসে গেছে কে জানে!
এ পারে এসেই অডট আমায় আর ল্যাচেনালকে পরীক্ষা করে দেখল। তার আশঙ্কা ছিল, গত রাতে ওই বৃষ্টি আর ঠান্ডায় অমন খোলা জায়গায় থাকতে বাধ্য হওয়ায় আমাদের অবস্থার হয়তো অবনতি হয়েছে। ল্যাচেনালের পায়ের পাতা দুটো বেশ ফুলে আছে, তবে তুষারক্ষতর অবনতি কিছু হয়নি। দুর্ভাগ্য, আমার ডান হাতটার বেশ ক্ষতি হয়েছে! অডট আগে আশ্বাস দিয়েছিল, আঙুলগুলোর একেবারে মাথার একটা করে গাঁট শুধু কেটে বাদ যাবে। এখন বলছে, প্রতিটা আঙুলের অন্তত দুটো করে গাঁট বাদ দিতে হবে। মানসিকভাবে বড়ো কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে চলেছি!
লাঞ্চের জন্য আমরা সবাই একটা তাঁবুর মধ্যে জড়ো হলাম। গতকাল শ্যাজ মিরিস্তি খোলা নদীর গিরিখাত ধরে কিছুটা এগিয়ে দেখেছে সে পথে সোজা বাগলুং হয়ে কালী গন্ডকি উপত্যকায় পৌঁছনো যায় কিনা, যাতে আমাদের লম্বা ফেরার রাস্তাটা অনেকটা কমানো যায়। জানা গেল সে পথে ফেরার কোনও সম্ভাবনাই নেই। মাইলের পর মাইল ধরে নদীর দু’পাশেই বিশাল উঁচু উঁচু পাথরের দেওয়াল খাড়া নেমে এসেছে একেবারে জল অবধি, সৃষ্টি করেছে ভয়ঙ্কর গভীর এক গিরিখাত। অর্থাৎ, গত ২৭ এপ্রিল পাস পেরিয়ে যে পথে এসেছিলাম সে পথেই ফিরতে হবে আমাদের।
ঠিক হল, আং শেরিং অর্থাৎ পানসিকে আমাদের বিশেষ বার্তাবাহক হিসেবে পাঠানো হবে। আমাদের চিঠিপত্র এবং ক’দিন আগে লেখা টেলিগ্রামটা নিয়ে রওনা হয়ে যত দ্রুত সম্ভব সে নয়া দিল্লি পৌঁছনোর চেষ্টা করবে।

(এরপর আগামী সংখ্যায়)

খেলার পাতার সমস্ত লেখার লিংক একত্রে এইখানে