খেলার পাতা অন্নপূর্ণা মরিস হারজগ অনুবাদ তাপস মৌলিক শরৎ ২০১৯

আগের পর্বগুলো একত্রে এই লিংকে

তাঁবুর ভেতর বসে দুপুরের খাবার খেতে খেতে সবাই নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলছিল। আমি সেই আলোচনায় খুব একটা অংশগ্রহণ করছিলাম না, বর্তমান পরিস্থিতি থেকে মনটা যথাসম্ভব সরিয়ে আধোঘুমে ডুবে থাকার চেষ্টা করছিলাম। জীবনীশক্তি ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে আমার। সভ্য জগতে ফিরতে হলে যে দুর্গম লম্বা রাস্তা এখনও পেরোতে হবে তার কথা ভাবতেই আতঙ্ক হচ্ছিল।
ফের একবার আমায় পরীক্ষা করল অডট। কোনোরকম লুকোছাপা না করে বলল, আমার হাত-পায়ের তুষারক্ষত এতটাই গুরুতর যে ব্যাপারটা কোনদিকে গড়াবে তা আগেভাগে ঠিকঠাক বলা খুব মুশকিল। আধবোজা চোখে শুনলাম সে আইজ্যাককে বোঝাচ্ছে, শুকনো গ্যাংগ্রিন কোনোভাবে যদি একবার গ্যাস গ্যাংগ্রিনে রূপান্তরিত হয় তখন ক্ষতিগ্রস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলি তৎক্ষণাৎ কেটে ফেলা ছাড়া আর কোনও রাস্তা থাকবে না। সেটা না করলে ক্ষতস্থানগুলি থেকে বিষাক্ত টক্সিন ছড়িয়ে পড়ে সারা শরীরেই সেপ্টিসেমিয়া হয়ে যেতে পারে; আবার কখনও কখনও অ্যান্টিবায়োটিক ইঞ্জেকশনের প্রভাবে এই সেপ্টিসেমিয়া কোনও বিশেষ অঙ্গ, যেমন শুধু লিভারে বাসা বাঁধতে পারে।
ইতিমধ্যে টেরে কতগুলো বেতের লাঠি তার দিয়ে বেঁধে ইংরিজি ‘এল’ অক্ষরের মতো একটা চেয়ার তৈরি করে ফেলল। আহতদের বইবার জন্য আল্পসে এরকম চেয়ার ব্যবহৃত হয়। এর সুবিধে হল, এতে পা দুটো সামনে টান করে ছড়িয়ে বসা যায়, সাধারণ ‘দ’-আকৃতির চেয়ারে বসলে পাগুলো যেমন ল্যাগব্যাগ করে শূন্যে ঝোলে সেটা হয় না, ফলে বয়ে নিয়ে যাওয়া আহত মানুষটির কষ্ট অনেক কম হয়। টেরের দেখাদেখি শেরপারা আমার জন্যও ওরকম একটা চেয়ার বানিয়ে ফেলল।
তাঁবুর ছাদে অবিশ্রান্ত ধারায় বৃষ্টি পড়ে চলেছে। গুলির মতো বড়ো বড়ো জলের ফোঁটা সে বৃষ্টির! ভয় হচ্ছিল, তাঁবুর ক্যানভাস শেষমেশ ছিঁড়েই না যায়। ভোঁতা, অবসন্ন অনুভূতি নিয়ে আধো-ঘুম আধো-জাগরণে সে রাত কাটল। সকালে ধীরে ধীরে চোখ মেলে শুনলাম বাইরে আবহাওয়ার উন্নতি হয়েছে। সন্ধে অবধি এরকম থাকলেই মঙ্গল! প্রচণ্ড খাড়াই পথে আজ আমাদের বারো হাজার ফিট উচ্চতা থেকে পনেরো হাজার ফিটে উঠতে হবে। ২৭ এপ্রিলের সেই পাসে পৌঁছনোর আগে পুরো রাস্তায় কোথাও তাঁবু ফেলার জায়গা নেই আর। টেরের কল্যাণে ল্যাচেনাল আর আমার চেয়ার দুটো অবশ্য খাসা হয়েছে। ধন্যবাদ টেরে! সামনের কঠিন রাস্তার কথা ভেবে মনে যে ত্রাসের সঞ্চার হচ্ছিল সেটা এই চেয়ার দেখে সামান্য হলেও কমেছে।
কুলিরা একজনের পেছনে আরেকজন সারি বেঁধে ধীরে ধীরে চড়াই ভেঙে চলেছে। রাস্তা বলতে কিছু তো নেই! ঢালটা এতটাই খাড়াই যে মাঝে মাঝে মাটি কেটে ধাপ বানাতে হচ্ছিল ওঠার জন্য। কুলিদের অবশ্য কোনও চাঞ্চল্য নেই। কুয়াশার মধ্যে নিঃশব্দ ছায়ামানবের মতো ধীরস্থির কিন্তু অক্লান্তভাবে তারা ওপরে উঠে চলল। চেয়ারের ঝাঁকুনিটা না থাকলে গোটা ব্যাপারটা একটা স্বপ্ন আর আগেপিছের মানুষদের অশরীরীর মতোই মনে হত। ঝাঁকুনি বলে ঝাঁকুনি! সারা গায়ে ব্যথা হয়ে গেল একেবারে! ল্যাচেনালকে দেখে হিংসে হচ্ছিল, কুলির পিঠে বাঁধা চেয়ারে বসে ব্যাটা দিব্যি ঘুমোচ্ছে। আমিও আপ্রাণ চেষ্টা করলাম আধোঘুমে ডুবে থাকার, পারলাম না।
দুপুরের একটু আগে পুরো দলটা মিরিস্তি খোলা নদীখাতের চড়াই ভেঙে সেই জায়গাটায় উঠে এল যেখানে শ্যাজ আসার সময় পথচিহ্ন হিসেবে ফ্রেঞ্চ আলপাইন ক্লাবের তেকোনা একটা পতাকা পুঁতে রেখেছিল। কুলিদের মতলব ছিল আজকের মতো সেখানেই রাত কাটানোর। তারা বলল, ওপরে পাসের আগে তাঁবু ফেলার ভালো জায়গা আর নেই, আর সন্ধের মধ্যে পাসে পৌঁছনো প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। আইজ্যাক আর অডট অবশ্য ওদের সে প্রস্তাবে কর্ণপাতই করল না, আহতদের কুলিদের পিঠে আগেভাগে রওনা করিয়ে দিয়ে নিজেরাও শেরপাদের সঙ্গে পাসের দিকে হাঁটা দিল। কুলিরা বাধ্য হল তাদের অনুসরণ করতে। শুরু হল নীলগিরি পর্বতের একের পর এক গিরিশিরা পেরিয়ে পাসের দিকে সেই দীর্ঘ ক্লান্তিকর যাত্রা।
কুয়াশা ঘিরে এল চারদিকে। দৃষ্টিসীমা সংকুচিত হয়ে এল দশ গজেরও নিচে। তারই মধ্যে একজনের পেছনে আরেকজন লাইন দিয়ে এগিয়ে চলল কুলিরা। পিঠে বোঝা নিয়ে হাঁটার সময় পরিশ্রমে তাদের ঠান্ডা লাগছিল না বটে, কিন্তু থেমে পড়লেই দাঁতে দাঁতে খটাখট। কম্বল কেটে তৈরি একটা জামা ছাড়া কিছুই নেই ওদের গায়ে। আমি যে কুলির পিঠে ছিলাম তার চলার ছন্দের সঙ্গে ক্রমাগত নড়েচড়ে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু কিছুতেই তার গতিবিধি আগাম আন্দাজ করতে পারছিলাম না। কখনও সে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে, কখনও লম্বা লম্বা পা ফেলে এগোয়, কখনও ছোটো ছোটো পদক্ষেপে, কখনও আবার সামনে না এগিয়ে পাশাপাশি হাঁটে! মাঝে মাঝে আপনা থেকেই যেন কোনোকিছু আঁকড়ে ধরার জন্য হাত দুটো এগিয়ে বা উঠে যাচ্ছিল আমার, যদিও জানি ওতে কোনও লাভ নেই। অনেক নিচে অতল গিরিখাতের মধ্যে প্রচণ্ড স্রোতে বয়ে চলেছে মিরিস্তি খোলা, এখান থেকেও তার গর্জন শোনা যাচ্ছে।
শেষ বিকেলে পশুপালকদের অস্থায়ী একটা ডেরায় পৌঁছলাম আমরা। পাসের এপাশে এরকম একটাই আস্তানা দেখেছি। বোঝা গেল, সন্ধের মধ্যে পাসে পৌঁছনোর কোনও সম্ভাবনাই নেই আর। আজ রাতের মতো তাই এখানে তাঁবু ফেলাই যুক্তিযুক্ত। এই বর্ষায় পশুপালকরা কেউই নেই এখন, পাথর ঘেরা ছাদহীন আস্তানাটা শূন্য। তার পাশে ঘাসের মাঠে নামিয়ে দেওয়া হল আমায়। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম কখন এদের তাঁবু খাটানো হবে, ভেতরে ঢুকে একটু আরাম করে শোব।

পরদিন ভোর হল। কুয়াশাচ্ছন্ন বিষণ্ণ এক ভোর। বৃষ্টি পড়ে চলেছে অবিরত, কুড়ি গজ দূরত্বের বাইরে কিছু দেখা যাচ্ছে না। তার মধ্যেই রওনা হলাম আমরা। পাসে পৌঁছোতে হলে আজ আমাদের আরও অনেকগুলি গিরিশিরা আড়াআড়ি পেরোতে হবে। পাশাপাশি দুটো গিরিশিরার মধ্যবর্তী প্রতিটি খাঁজ বেয়ে নেমে চলেছে ছোটো বড়ো একেকটা নদী বা ঝরনা, নিচে গিয়ে তারা সব মিশেছে মিরিস্তি খোলায়। আড়াআড়ি গিরিশিরাগুলি পেরোনোর অর্থ, পেরোতে হবে সে সমস্ত খরস্রোতা জলধারাও। ব্যাপারটা খুব সহজ হবে না। অন্তত আমার পক্ষে দিনটা খুবই যন্ত্রণাদায়ক হতে চলেছে। বেশ বুঝতে পারছিলাম আমার শারীরিক অবস্থা ক্রমশ খারাপ হয়ে আসছে। শরীরে আর একবিন্দু শক্তিও অবশিষ্ট নেই। মানসিকভাবেও ক্রমশ ভেঙে পড়ছিলাম আমি।
বেশ কিছুক্ষণ ধরে শ্যাজ আমায় উৎসাহিত করার চেষ্টা করছিল এই বলে যে পাস আর খুব দূর নয়। হঠাৎ আইজ্যাকের গলায় একটা উল্লসিত চিৎকার শুনলাম, “মরিস, তুমি এখন কালী গন্ডকী উপত্যকায়। আমরা মিরিস্তি খোলা উপত্যকা থেকে বেরিয়ে এসেছি।”
আমার থেকে মাত্র কয়েক গজ দূরে ছিল আইজ্যাক, তা সত্ত্বেও তার সেই চিৎকার যেন খুবই আবছাভাবে পৌঁছল আমার কানে। এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত সন্দেহ নেই, কিন্তু খুব যে উৎফুল্ল হয়ে উঠলাম তা বলতে পারি না। আমার কুলি যখন আমায় নিয়ে আইজ্যাকের সামনে দিয়ে এগিয়ে গেল, দেখলাম সে সিনে ক্যামেরায় ভিডিও তুলছে। পাগল নাকি! এই কুয়াশাচ্ছন্ন আলোআঁধারির মধ্যে ছবি আসে কখনও? ছবি তোলার মতো আলো কোথায়? তাও আবার কিনা রঙিন ফিল্ম!!
ধীরে ধীরে উৎরাই ঢাল ধরে পাসের দিকে নামা শুরু হল। কুলিরা প্রায়ই বৃষ্টিভেজা স্যাঁতসেঁতে মাটিতে পিছলে সরসর করে নেমে যাচ্ছিল। এতে ওদের তাড়াতাড়ি নামতে সুবিধে হয়, কিন্তু ভয়ঙ্কর ঝাঁকুনির চোটে আমার প্রাণ ওষ্ঠাগত। অঝোর ধারায় বৃষ্টি শুরু হল ফের। কুয়াশার মধ্যে আমাদের পুরোনো তাঁবু ফেলার জায়গাটা খুঁজছিলাম, কিন্তু কুলিরা দেখি উৎরাই ধরে নেমেই চলেছে আরও। কী হচ্ছে ব্যাপারটা বুঝছিলাম না! আগে থেকেই ঠিক করা ছিল আজ পাসে পৌঁছেই তাঁবু ফেলব আমরা। এগিয়ে যারা আছে, পেছনের লোকজনের কথা বিলকুল চিন্তা না করে আরও নেমেই চলেছে তারা। বোঝা যাচ্ছিল আজই তারা জঙ্গলের কিনারায় অর্থাৎ ট্রি লাইন অবধি নেমে যেতে চায়, কিন্তু সেখানে পৌঁছোতে এখনও দু’ঘন্টার ওপর লাগা উচিত। সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করলাম আমি। এখন এই সন্ধের সময় বৃষ্টির মধ্যে অতটা রাস্তা নামার ঝুঁকি নেওয়া পাগলামির সামিল। তার ওপর, আরও দু’ঘন্টা এই ভয়ানক ঝাঁকুনি আমি সহ্য করতে পারব বলে মনে হচ্ছিল না। একদমই নেতিয়ে পড়েছিলাম আমি, শরীরে আর একফোঁটাও জোর নেই। আইজ্যাককে বললাম, থামতে বলো সবাইকে, পুরোনো ক্যাম্প সাইটেই আজ তাঁবু ফেলব আমরা। যারা এগিয়ে গেছিল, প্রচণ্ড অনিচ্ছাসত্ত্বেও ফের চড়াই ভেঙে একে একে ফিরে এল তারা। জল-সপসপ ঘাসজমির ওপর একের পর এক তাঁবু খাটিয়ে ফেলল শেরপারা।

পরদিন ঘুম ভাঙল ভোরবেলা। আর একটা কঠিন দিনের যাত্রা বাকি। আজই সেই দিন। আজ আমরা প্রায় ছ’হাজার ফিট উৎরাই বেয়ে একেবারে চ্যাজিউ খোলা নদীর ধারে নেমে যাব। রাস্তা ভয়ানক খাড়াই। কুলিরা কীভাবে এই পেছল উৎরাই পথে নামবে কে জানে, বিশেষত যারা আমায় আর ল্যাচেনালকে পিঠে নিয়ে নামছে।
রওনা হতে না হতেই একজন কুলির পা পিছলে গেল, গড়িয়ে গড়িয়ে প্রায় পঞ্চাশ গজ নেমে গেল সে। ভয় হচ্ছিল একেবারে ছ’হাজার ফিট নিচে নদীখাতের মধ্যেই বুঝি অদৃশ্য হয়ে যাবে লোকটা, ভাগ্য ভালো হাঁচরপাঁচর করে ঘাস-পাথর আঁকড়ে কোনোমতে নিজেকে থামাল সে, তারপর উপুড় হয়ে পড়ে রইল ঢালের ওপর। তার পিঠে যে রুকস্যাকটা ছিল সেটা গড়িয়ে চলল ঢাল বেয়ে, স্যাক থেকে ছিটকে বেরিয়ে একটা খাবারের কৌটো পাথরে ঠোকা লেগে ফটাস শব্দে ফাটল। প্রচণ্ড গতিতে গড়াতে গড়াতে লাফিয়ে অনেক নিচে একটা পাথরে ড্রপ খেয়ে সুন্দর এক উপবৃত্তাকার রেখা তৈরি করে শূন্যে অদৃশ্য হয়ে গেল বোঝাটা। লোকটা স্বাভাবিকভাবেই বেজায় ঘাবড়ে গেছিল, ঢালের ওপর খানিক পড়ে থেকে ধীরে ধীরে উঠে এসে ফের যোগ দিল দলের সঙ্গে। তুকুচার বাসিন্দা এক তিব্বতি সে। অভিযানের তরফ থেকে কুলিদের সবাইকেই ট্রেকিং বুট দেওয়া হয়েছিল নিরাপত্তার খাতিরে। বেশিরভাগ কুলিই সে বুট পায়ে গলায়নি। অল্পসংখ্যক যারা বুট পরে হাঁটছিল, এ লোকটা তাদের অন্যতম!
হঠাৎ পেছন থেকে শুনি এক ‘গেল! গেল!’ চিৎকার। ওপর থেকে একটা পাথর গড়িয়ে পড়ছে ল্যাচেনালের ঘাড়ে। শেষমুহূর্তে টেরে পাথরটার গতিপথ কিছুটা পরিবর্তন করতে সক্ষম হল। বেঁচে গেল ল্যাচেনাল, কিন্তু পাথরটা এসে পড়ল তার কুলির ওপর। সে বেচারা ল্যাচেনালকে পিঠে নিয়ে কুঁজো হয়ে হাঁটছিল, দেখতে পায়নি কিছুই। পিছলে পড়ে গেল সে, পাথরটা এসে লাগল তার নাকে। সারা মুখ রক্তে ভেসে যাচ্ছে তার, শরীরের অনেক জায়গাও কেটেছড়ে গেছে। ওই বৃষ্টির মধ্যে কাল সন্ধেবেলা কিনা এই বিপজ্জনক রাস্তায় নামতে চাইছিল এরা! ভাগ্যিস থামিয়েছিলাম সবাইকে!
আইজ্যাক, রেবুফত আর শ্যাজ আগে আগে নেমে জঙ্গলের কিনারায় অপেক্ষা করছিল। খুব সাবধানে ধীরে ধীরে নামতে নামতে বাকিরাও একে একে জড়ো হল সেখানে। কার রুকস্যাক খোয়া গেছে জানার জন্য ঠিক হল সবার বোঝাই একবার মিলিয়ে দেখা হবে।
“মনে হয় ওটা আমারই ছিল,” বলল শ্যাজ, “আর আজই আমার মানিব্যাগ আর ফাউন্টেন পেন দুটোই রুকস্যাকের ভেতর রেখেছিলাম আমি!”
একদৃষ্টে একজন কুলির দিকে তাকিয়ে ছিল শ্যাজ। কুলিটার সামনে একটার ওপর আরেকটা – দুটো রুকস্যাক রাখা। ওপরের স্যাকটা তুলল সে, সবাই দেখল নিচের রুকস্যাকটার সামনের পকেটে বড়ো বড়ো করে লেখা – ‘মার্সেল শ্যাজ’!
কুলিদের সমস্ত বোঝা মিলিয়ে দেখে আইজ্যাক ঘোষণা করল, “রেবুফতের রুকস্যাকটাই গেছে, কোনও সন্দেহ নেই।”
বলা বাহুল্য, রেবুফত মোটেই খুশি হল না। এই দীর্ঘ বিপদসংকুল অবতরণ তার কাছেও প্রচণ্ড যন্ত্রণাদায়ক হয়ে দাঁড়িয়েছে, পায়ে বাসা বাঁধা তুষারক্ষত এখনও যথেষ্ট বেগ দিচ্ছে তাকে। হতাশভাবে ঘাড় গোঁজ করে বসে রইল সে। হঠাৎ আইজ্যাক চিৎকার করে উঠল, “ও কী রেবুফত! ওটা কীসের ওপর বসে আছ তুমি?”
দম দেওয়া কলের পুতুলের মতো তড়াক করে লাফিয়ে উঠল রেবুফত। দেখা গেল, যে রুকস্যাকটার ওপর সে বসে ছিল তার ওপর বড়ো বড়ো করে লেখা – ‘গাসটন রেবুফত’! শেষ অবধি জানা গেল, খোয়া যাওয়া বোঝাটা বিশেষ কোনও একজনের নয়, ওর মধ্যে বাড়তি কাপড়জামা ছিল।
জঙ্গলে ঢুকে পড়লাম আমরা। একটু পরেই শুরু হল লতা-পাতা-ঝোপঝাড়ে প্রায় দুর্ভেদ্য ঘন জঙ্গল। কুয়াশা আর অঝোর বৃষ্টিধারার মধ্যে মনে হচ্ছিল যেন সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে হেঁটে চলেছি, বড়ো বড়ো গাছপালার আড়াল থেকে এই বুঝি দৈত্যাকার কোনও অক্টোপাস বেরিয়ে আসবে! যাবার সময় এই জঙ্গলই রডোডেনড্রন ফুলের শোভায় লালে লাল হয়ে ছিল। এরপরই সেই স্বর্গীয় ‘তোরণ-পথ’, যাবার সময় যে পথের দু’পাশ থেকে ফুলে ফুলে ভরা শাখাপ্রশাখা মাথার ওপর নুয়ে পড়ে আমাদের অভিবাদন জানিয়েছিল।
কুলিরা একটা ফাঁকা জায়গা দেখে দাঁড়িয়ে পড়েছে। খুব স্বাভাবিক! নাগাড়ে বেশ কিছুক্ষণ হাঁটা হয়েছে, এবার একটু বিশ্রাম তো করাই যায়! কাঠকুটো জড়ো করে ঝটপট আগুন জ্বালিয়ে ফেলল তারা, তারপর আগুন ঘিরে বসে পড়ল গোল হয়ে। অডট অধৈর্য হয়ে পড়ছে। ওর মতে আজকের রাস্তার সবচেয়ে দুর্গম অংশটা এখনও পেরোইনি আমরা, তাই সময় নষ্ট করা উচিত নয় মোটেই। নতুন করে সে আমায় মরফিন ইঞ্জেকশন দিল। ইঞ্জেকশনগুলো ক্রমশ আরও যন্ত্রণাদায়ক হয়ে উঠছে আমার কাছে। রোগা হতে হতে একেবারে হাড্ডিসার হয়ে পড়েছি আমি। শেষ দুটো ইঞ্জেকশন দেওয়ার সময় যন্ত্রণায় কয়েক মুহূর্তের জন্য চেতনাই হারিয়ে ফেললাম। অনুভব করছিলাম, সমস্ত শেরপা এবং কুলির দৃষ্টি আমার ওপর। নিশ্চয় দেখার মতোই চেহারা হয়েছে আমার! ওদের চোখে সম্পূর্ণ নতুন এক অভিব্যক্তি দেখলাম আজ, যা আগে কখনও দেখিনি। কী ছিল সেই দৃষ্টিতে? করুণা? সমবেদনা? ওরা কি এখনও ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা জানিয়ে চলেছে আমার জন্য? নাকি ইতিমধ্যেই খরচের খাতায় ফেলে দিয়েছে আমায়? ফের রওনা হওয়ার আগে, শেরপা আর কুলিরা মিলে জঙ্গল থেকে সবচেয়ে সুন্দর সুন্দর ফুল যা পেল সমস্ত খুঁজে এনে একটা মালা গেঁথে আমার হাঁটুর কাছে বিছানার ওপর রেখে মাথা ঝুঁকিয়ে প্রণাম জানাল সবাই। ওদের এই নিবেদন গভীরভাবে স্পর্শ করল আমায়, দু’চোখ আপনা থেকেই জলে ভরে উঠল ভালো লাগায়। এরপর থেকে আমাদের দীর্ঘ প্রত্যাবর্তন পথে যখনই সম্ভব হয়েছে তখনই জঙ্গল থেকে নানা রঙের ফুল সংগ্রহ করে আমার বিছানার পাশে রাখত শেরপারা।
গহন অরণ্যপথে ফের শুরু হল আমাদের যাত্রা। শেরপারা আগে আগে চলছিল, কুকরির এক একটা দক্ষ কোপে পথরোধকারী সরু সরু ডালপালা, বাঁশের কঞ্চি এবং আগাছা সাফ করে রাস্তা তৈরি করতে করতে এগোচ্ছিল তারা। পায়ের তলার মাটি জলে-কাদায় প্রচণ্ড পেছল হয়ে আছে, চলতে চলতে সবাই মাঝে মাঝে পিছলে পড়ছিল। এমন কেউ নেই যে সেদিন একবারও আছাড় খায়নি। কোজি, আইজ্যাক, অডট, শ্যাজ আর টেরে এগিয়ে গেল শেরপাদের সঙ্গে রাস্তা তৈরি করতে করতে। পরিকল্পনামাফিক নোয়েল সবসময়ই একদিনের পথ এগিয়ে আছে। রেবুফত রইল ল্যাচেনাল আর আমার সঙ্গে। মরফিন ইঞ্জেকশনটা দিয়ে অডট কাজের কাজ করেছে। একেবারেই বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিলাম আমি, ওষুধের প্রভাবে দেখলাম যন্ত্রণা অনেক কম অনুভব করছি। বেশিরভাগ সময়ই আধবোজা চোখে একটা ঘোরের মধ্যে পড়ে রইলাম। আমার ঠিক পেছন পেছনই বয়ে আনা হচ্ছিল ল্যাচেনালকে, সেও একইভাবে পড়ে আছে।

নদীখাতে নামার আগে রাস্তার শেষ অংশটুকু প্রচণ্ড খাড়াই। ঢালটা প্রায় নব্বই ডিগ্রি খাড়া দেয়ালের মতো, সেই দেয়ালের গা বেয়ে সরু পায়ে চলা পথ কৌণিকভাবে নেমেছে। পথের পাশের খাড়া দেয়ালের গায়ে গজিয়ে থাকা ঝোপঝাড় আঁকড়ে ধরে একে একে এগিয়ে চলেছে কুলিরা। মনে মনে ভাবলাম, এবারে আর রক্ষে নেই! জীবিত অবস্থায় আমার এ রাস্তা পার করার সম্ভাবনা হাজারে এক ভাগ। আমার বাহক পড়ল সমস্যায়। পিঠে অত লম্বা একটা চেয়ারে একজনকে বসিয়ে এ রাস্তায় সোজাসুজি এগোনো অসম্ভব। খাড়া দেয়ালটার দিকে মুখ করে গাছপালা আঁকড়ে ধরে সে পাশাপাশি পা ফেলে এগোতে শুরু করল, ফলে চেয়ারশুদ্ধু আমি তার পিঠে ঝুলে রইলাম এক্কেবারে খাদের ওপর। কখনও কখনও আগে আগে চলা শেরপারা মাথার ওপরের নরম মাটিতে তাদের আইস অ্যাক্স গেঁথে আমার কুলিকে সাহায্য করছিল যাতে সেই অ্যাক্স ধরে তার এগোতে সুবিধে হয়। বিস্ফারিত চোখে নিচে তাকিয়ে দেখি ঠিক আমার তলা দিয়ে প্রচণ্ড স্রোতে গর্জন করতে করতে বয়ে চলেছে চ্যাজিউ খোলা। যে কোনও মুহূর্তে আমি সোজা ওই জলে গিয়ে পড়তে পারি। একবার যদি আমার বাহকটির পা পিছলে যায় তাহলেই – ব্যস! সে হয়তো ঢালের গায়ের ঝোপঝাড় আঁকড়ে ধরে একেবারে নিচে পড়ে যাওয়া থেকে রেহাই পেয়ে যাবে, কিন্তু আমার কী হবে? আমি নিজেকে বাঁচাব কী করে? মৃত্যুভয় কাকে বলে এখন আমি জানি। সেই শীতল আতঙ্কের সঙ্গে যুঝবার শারীরিক বা মানসিক কোনও ক্ষমতাই আর অবশিষ্ট নেই আমার। ল্যাচেনালের দিকে তাকিয়ে দেখি সেও ভয়ে একেবারে কাঁটা হয়ে আছে! ভাগ্য ভালো ওর হাত দুটো খোলা, প্রয়োজনে কিছু আঁকড়ে ধরার সুযোগ আছে তাও! আমার কুলি এক পা এক পা করে এগোয়, আমি একেকটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি, ভাবি আমার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা আর এক ধাপ বাড়ল! নিচে পৌঁছনোর আগে পাঁচ গজ মতো জায়গায় রাস্তা বলে কিছুই নেই। বিরাট এক পাথরের চাঁইয়ের খাড়া পেছল গা বেয়ে সরু একটা খাঁজ আড়াআড়ি চলে গেছে, সেই খাঁজে পা ফেলে ফেলে এগোতে হবে। অসীম সাহসে ভর করে আমার বাহক রওনা হল সেই পথে। সত্যি, সেলাম জানাই এই অকুতোভয় কুলিদের! শত বিপদসংকুল পথেও এদের ইতস্তত করতে দেখিনি কখনও। পাথরের চাঁইটার গায়ে ছোট্ট ছোট্ট খাঁজ আঁকড়ে পাশাপাশি পা ফেলে ফেলে এগিয়ে চলল আমার কুলি। পা দুটো কোথায় রাখছে সেটা দেখার মতো অবস্থাতেও সে নেই, অন্য কুলিরা দূর থেকে নির্দেশ দিতে থাকল পরের পদক্ষেপ ঠিক কোথায় ফেলতে হবে!
অবশেষে চ্যাজিউ খোলার নদীখাতে এসে পৌঁছলাম। বর্ষার জলে নদী ফুলেফেঁপে উঠেছে। আমার একটু পরেই ল্যাচেনালও এসে পৌঁছল। দেখে মনে হল সে ভয়ভাবনার ঊর্ধ্বে উঠে গেছে, নির্বিকারচিত্তে আয়েশ করে বসে আছে কুলির পিঠে। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, শক্ত করে হাতে হাত ধরে মানবশৃঙ্খল তৈরি করে কুলির দল একসঙ্গে সেই খরস্রোতা নদী পেরোল। ওপারে পৌঁছে একশো গজ মতো জঙ্গলাকীর্ণ পথ চড়াই ওঠার পর গাছপালার ফাঁক দিয়ে দূরে পশুচারকদের পরিচিত আস্তানাটা দেখতে পেলাম। ওখানেই আজ রাতের মতো বিশ্রাম নেব আমরা।
শেষ রাস্তাটুকু পেরোনোর আগে কুলির দল একটু বিশ্রাম নেবার জন্য দাঁড়াল। আমার আর ভালো লাগছিল না। আমার বাহককে বললাম যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমায় ক্যাম্পে নিয়ে যেতে। একটা খাড়া পাথুরে টিলার পাদদেশ থেকে চড়াই ওঠার সময় আমার মনে হল সে রাস্তা ভুল করছে, যাবার সময় এ পথে আসিনি আমরা, কিন্তু সঙ্গী শেরপারা জানাল তারা নিশ্চিত ঠিক পথেই যাওয়া হচ্ছে। অগত্যা সে পথেই এগোনো হল। একটু পরেই এমন খাড়াই এক ঘাসের ঢালে উপস্থিত হলাম আমরা যে আড়াআড়ি ঢালটা পেরোতে তুষারঢাল পেরোনোর মতো কসরত দরকার। না থেমে এগিয়ে চলল শেরপারা। আতঙ্কিত হয়ে আমি আইজ্যাকের উদ্দেশে হাঁক পেড়ে এদের থামাতে বললাম। মনে হচ্ছিল যে কোনও মুহূর্তে নিচে খাদে পড়ে যেতে পারি সবাই। কিন্তু, কুলিরা দেখি কথা শোনার পাত্রই না! শ্যাওলা ধরা, পেছল একটা খাড়াই পাথুরে ঢালে উপস্থিত হলাম আমরা। আমার বাহকের পিঠে বাঁধা চেয়ারে বসে ঢালটার গা থেকে প্রায় এক গজ বাইরে শূন্যে ঝুলতে ঝুলতে দেখলাম নিচে অতল খাদ। শেরপারাও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল, কিন্তু বলল, এখন আর পিছু ফেরার উপায় নেই কোনও। এই ঢালের পথে পেছন ফিরতে পারবে না আমার কুলি, সামনের দিকেই এগোতে হবে তাকে। আমি আর সহ্য করতে পারছিলাম না, ‘বাঁচাও, বাঁচাও’ বলে চিৎকার জুড়ে দিলাম। তবে দেখলাম, ভাগ্যটা সত্যিই আজ ভালো আমার! কয়েক পা বিপজ্জনকভাবে এগোনোর পরই রাস্তা সহজ হয়ে এল। ফের ঘাসের ঢালে উঠে এলাম আমরা এবং নিয়মিত পায়ে চলা রাস্তাটাও খুঁজে পেয়ে গেলাম। ল্যাচেনালের কুলি নিচ থেকে সব দেখছিল। সে আর আমাদের মতো ভুল করল না, গোড়া থেকেই ঠিক রাস্তায় উঠে এল। ক্যাম্পেও পৌঁছলাম আমরা, বৃষ্টিও থেমে গেল একেবারে।
একটা তাঁবুর ভেতরে এনে শুইয়ে দেওয়া হল আমায়। অবশেষে শান্তি! কথা বলার মতো শক্তি অবশিষ্ট ছিল না আমার, তাও ফিসফিস করে অডটকে বললাম, “যাক, বাঁচা গেল! কঠিন পথ এখানেই শেষ! এরপর থেকে লেটে অবধি সোজা রাস্তা।” দীর্ঘ ফেরার পথে বারবারই আমার লেটে গ্রামের কথা মনে পড়ছিল। তার ছায়াসুনিবিড় পাইন বন, অপরূপ ঘাসে ছাওয়া পাহাড়ের ঢাল, ছড়িয়েছিটিয়ে পড়ে থাকা সবুজ মসে ঢাকা গ্রানাইট পাথর – হুবহু আল্পসের শ্যাময় উপত্যকার মতো। ওখানে পৌঁছে একটু লম্বা বিশ্রাম নেবার ইচ্ছে ছিল আমার। বন্ধুরা সে প্রস্তাবে সানন্দে রাজি হয়ে গেল। সবাই মিলে তুকুচা অবধি গিয়ে ফের লেটে-তে নেমে আসার কোনও মানে হয় না। ঠিক হল, কয়েকজন তুকুচা গিয়ে সেখানে রাখা মালপত্র নিয়ে আসবে, বাকিরা অপেক্ষা করবে লেটে-তে। ওখানে বসেই আমরা পুরো অভিযানের জিনিসপত্র ফের গোছগাছ করব। তারপর বাড়ি ফেরার পালা, শুরু হবে নেপালের কালী গণ্ডকী উপত্যকা ধরে ভারত সীমান্ত অবধি আমাদের দীর্ঘ পদযাত্রা।
“আমার আইস অ্যাক্সটা কোথায়?” শ্যাজকে জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
বেশ কিছুদিন ধরে ওটা আমার নজরে পড়ছিল না। ল্যাচেনালের অ্যাক্সটা খোয়া গেছে, সুতরাং আমারটাই ছিল একমাত্র আইস অ্যাক্স যা অন্নপূর্ণা শীর্ষে পৌঁছেছে। আমার কাছে ওটার গুরুত্ব তাই অসীম। দেখা গেল বেস ক্যাম্প ছাড়ার পর কেউই ওটা দেখেনি। শ্যাজ একে একে সমস্ত শেরপার আইস অ্যাক্স পরীক্ষা করে দেখল, কারও কাছেই পাওয়া গেল না সেটা। খুব দুঃখ হল মনে। এমনিতে ব্যাপারটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়, তবে আমি ভেবেছিলাম ফ্রান্সে ফিরে আমাদের অভিযানের স্মারক হিসেবে ফ্রেঞ্চ আলপাইন ক্লাবকে অ্যাক্সটা উপহার দেব। (দু’দিন পরে পাওয়া গেছিল অ্যাক্সটা।)
পরদিনের হাঁটাটা বেশি ছিল না। লেটে বেশি দূর নয় এখান থেকে। অডট বলল, দুপুরের মধ্যে পৌঁছলেই যথেষ্ট, তাড়াহুড়োর কোনও দরকার নেই। বেশ কিছুদিন পর আজ বর্ষার মেঘ ছিঁড়ে সূর্যের দেখা মিলেছে। সকালের নরম উষ্ণ রোদে গা এলিয়ে কিছুক্ষণ তাই আয়েশ করাই যায় আজ! কুলিরা একে একে রওনা হয়ে গেল। ধীরে ধীরে তৈরি হয়ে আমরাও ক্যাম্প ছাড়লাম তারপর।
একটু পরেই চোয়া গ্রামে পৌঁছে গেলাম সবাই। গ্রামবাসীরা সাদর অভ্যর্থনা জানাল আমাদের, ঘরবাড়ি ছেড়ে দৌড়ে বেরিয়ে এল সব, আহতদের ঘিরে জটলা করে কৌতূহলী চোখে দেখতে লাগল। দীর্ঘদিন তার প্রিয় পানীয় থেকে বঞ্চিত দাওয়াথোন্ডুপের গলা নিশ্চয়ই ভীষণ শুকিয়ে আছে। অবশেষে প্রতীক্ষার অবসান! নোলা সকসক করে উঠল তার। “তাঁবু ফেলার অসাধারণ জায়গা,” শেরপা সর্দার আংথারকে জোর গলায় বুঝিয়ে চলল আইজ্যাক আর অডটকে, “জল আছে, রান্না করার কাঠ আছে, খাবারদাবার সব পাওয়া যাবে, আর সবচেয়ে বড়ো কথা খুব ভালো ছাং পাওয়া যায় এখানে।” কিন্তু, বেরসিক সাহেবরা বুঝলে তো! “চলো, চলো, এগিয়ে চলো সব,” হাঁক পাড়ল অডট ও আইজ্যাক। অগত্যা প্রবল অনিচ্ছাসত্ত্বেও কুলিদের দল এগিয়ে চলল সাহেবদের পেছন পেছন। অচিরেই কালী বা কৃষ্ণা গণ্ডকী নদীর তীরে উপস্থিত হলাম আমরা। যাবার সময় নদীর জল ছিল স্বচ্ছ পরিষ্কার, এখন সেখানে নোংরা কাদাগোলা কালো জল ফেনা তুলে ঘুরপাক খেতে খেতে তীব্র স্রোতে বয়ে চলেছে, কানে তালা লেগে যায় তার গর্জনে। তেমন উল্লেখযোগ্য কোনও ঘটনা ছাড়াই একটা ব্রিজের ওপর দিয়ে নদী পেরোলাম আমরা, তারপর আর ঘন্টাখানেক হাঁটার পরই পৌঁছে গেলাম আমার স্বপ্নের জায়গা লেটে-তে।
মখমলের মতো সবুজ ঘাসে ঢাকা এক প্রশস্ত ঢালে তাঁবু ফেললাম আমরা। ঢালটার তিন দিক বিশাল বিশাল তিনটে গ্রানাইট পাথরের বোল্ডারে আড়াল করা, ওপরদিকে স্নিগ্ধ সবুজ পাইন বন। শান্ত সুন্দর জায়গা, বিশ্রামের পক্ষে আদর্শ। লম্বা লম্বা পাইন গাছের ফাঁক দিয়ে বাতাস খেলা করছে। চোখ বুজলে মনে হচ্ছে যেন শ্যাময় উপত্যকাতেই রয়েছি। খেয়ালখুশিমতো ছড়িয়েছিটিয়ে তাঁবু ফেলেছে শেরপারা।পরিষ্কার রৌদ্রস্নাত দিন, নরম রোদের নেশা ধরানো আরাম। অডট ঠিক করল বদ্ধ তাঁবুর ভেতরে নয়, বাইরেই আমাদের চিকিৎসা করবে। আমার একটা পায়ের ক্ষত পেকে উঠতে শুরু করেছে, হাত দুটোর অবস্থা বীভৎস। গা গুলিয়ে ওঠা পচা দুর্গন্ধ বেরোচ্ছে সেগুলো থেকে। সমস্ত ব্যান্ডেজগুলো পুঁজে মাখামাখি হয়ে আছে। অডট তার শেষ সঞ্চয় থেকে নতুন ব্যান্ডেজ বার করল – অবশ্য সে জানে তুকুচা থেকে ওষুধপত্রের নতুন জোগান আসছে। দেখলাম এই প্রথম তার হাতে উঠে এসেছে কাঁচি। অস্ত্রোপচার করার কাঁচি দিয়ে সে আমার হাত-পায়ের ক্ষতস্থানের আলগা হয়ে আসা মরা চামড়াগুলো ছেঁটে দিতে লাগল। পায়ে তেমন ব্যথা বুঝলাম না, কিন্তু হাতের আঙুলগুলো এতই স্পর্শকাতর হয়ে আছে যে একটু ছুঁলেই যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠছিলাম। পাগলের মতো চিৎকার শুরু করলাম আমি, আর সহ্য করতে পারছিলাম না। অডট ক্ষান্ত দেওয়াই স্থির করল। ক্ষতস্থানগুলোয় লাল মারকিউরোক্রোম লাগিয়ে দিল সে।
“বাইরেই শুয়ে থাকো, ততক্ষণ আমি ল্যাচেনালের পরিচর্যা করি,” বলল সে।
ল্যাচেনালের অবস্থার বেশ উন্নতি হয়েছে। বৃষ্টির মধ্যে আমাদের দীর্ঘ যাত্রার ধকল ভালোই সামলেছে সে, নিচের উপত্যকায় নেমে আসার পর মানসিকভাবেও বেশ চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। তার বিখ্যাত খিদেও ফিরে এসেছে ফের।
বিকেলবেলা আইজ্যাক, অডট আর শ্যাজ তুকুচার উদ্দেশে রওনা দিল। সেখানে নোয়েল আর জি বি রানা ওদের অপেক্ষায় ছিল। ছড়িয়েছিটিয়ে অল্প কিছু তাঁবু এখনও দাঁড়িয়ে আছে সেখানে, তারই একটায় সারা সন্ধে ওরা পাঁচজন গল্পগুজব করে কাটাল। অবশ্য কারও মনেই তেমন ফুর্তি নেই, ওদের প্রধান ভাবনা এখন ল্যাচেনাল আর আমার শারীরিক অবস্থা। জুলাই মাসের প্রথমার্ধের আগে আমাদের পক্ষে ভারত সীমান্তে পৌঁছনো সম্ভব হবে না। অডট বলল, তার মধ্যেই যে আমার শরীরে একাধিক অস্ত্রোপচার করতে হবে তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
পরদিন সমস্ত তাঁবু খুলে ফেলা হল। গ্রামের ছোটো ছোটো বাচ্চারা আর কুলিরা ঘন্টার পর ঘন্টা জায়গাটা ঘিরে গোল হয়ে বসে রইল যদি একটা-দুটো বাড়তি খাবারের টিন কিংবা কনডেনসড মিল্কের টিউব পাওয়া যায়। নোয়েল একে একে সমস্ত কুলির পাওনাগন্ডা মিটিয়ে দিল, ভালোমতো বকশিশও দেওয়া হল সবাইকে। বিকেলবেলা ওষুধপত্র এবং চিকিৎসার সাজসরঞ্জামের নতুন জোগান নিয়ে আইজ্যাক লেটে-তে তার রুগিদের কাছে ফেরার জন্য রওনা দিল।
চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে বাকিরাও পাততাড়ি গুটিয়ে তুকুচা ছাড়ার জন্য প্রস্তুত হল। প্রায় দু’মাস যাবৎ তুকুচা আমাদের অভিযানের মূল শিবির ছিল। এই দীর্ঘ সময়ে সর্বদাই স্থানীয় গ্রামবাসীদের কাছ থেকে অত্যন্ত সহৃদয় এবং বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার পেয়েছি আমরা। কুলি ও গ্রামবাসীরা সবাই একসঙ্গে জড়ো হয়ে সাহেবদের বিদায় সম্ভাষণ জানাল। বিকেল চারটে নাগাদ আমাদের সবাই ফিরে এল লেটে-র ক্যাম্পে।
আহতদের, বিশেষত আমার শারীরিক অবস্থা এখন বাস্তবিকই আশঙ্কাজনক। গতকাল ক্যাম্পে ফিরেই অডট ঘোষণা করেছে যে পরিস্থিতি গুরুতর। সকাল থেকে সে আমার শুশ্রূষায় লেগে আছে, একের পর এক যন্ত্রণাদায়ক ইঞ্জেকশন দিয়ে চলেছে। ডাক্তার সাহেবের কপালের ভাঁজ ক্রমশ গভীর করে তুলছি আমি। উনিশ কেজিরও বেশি ওজন কমেছে আমার, একেবারে রুগ্ন হয়ে পড়েছি। জ্বরের প্রকোপ ক্রমশ বেড়েই চলেছে। সেদিন সন্ধেবেলা আমার জ্বর ছিল ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট।
“১০২ ডিগ্রি,” চোখ টিপে অডটকে বলল আইজ্যাক, ভাবছে আমি কিছু বুঝছি না!
চারপাশের সবকিছুই কেমন কুয়াশাবৃত আবছা লাগছিল আমার, যেন স্বপ্ন দেখছি। বেশিরভাগ সময়ই অচৈতন্য হয়ে পড়ে ছিলাম বিছানায়।
“কড়া ডোজের পেনিসিলিন দিতে হবে,” নির্দেশ দিল অডট।


শুয়ে শুয়ে কুয়াশার মধ্যে ছায়াশরীরদের নড়াচড়া দেখছিলাম। তারা একে একে কাছে আসছে, ঝুঁকে দাঁড়িয়ে দেখছে আমায়, তারপর নিঃশব্দে বেরিয়ে যাচ্ছে। তারা আর কেউ নয়, আমার প্রিয় বন্ধুরা, জানি আমি। এত নিস্তব্ধ কেন চারপাশ! কানে কি তালা লেগেছে আমার? হবে হয়তো! কিছুই আসে যায় না আর। কষ্টের কোনও অনুভূতি টের পাচ্ছিলাম না আমি। এক নিবিড় প্রশান্তিতে ভরে উঠছিল মন। আমার কাজ শেষ, যে দায়িত্ব আমায় দেওয়া হয়েছিল তা আমি পালন করেছি। বিবেকের কাছে আমি পরিষ্কার। শেষ প্রার্থনার সময় উপস্থিত এখন। অমোঘ চিরন্তন মৃত্যুর কাছে সেই প্রার্থনা জানিয়ে বললাম, ‘এসো, হাত ধরে নিয়ে চলো আমায়।’ বেঁচে থাকার বিন্দুমাত্র ইচ্ছাশক্তি আর অবশিষ্ট নেই আমার মধ্যে। এখন মৃত্যুর কাছে আত্মসমর্পণের পালা।
কোনও আপশোশ নেই আমার, নেই কোনও জিজ্ঞাসা। সরাসরি মৃত্যুর চোখে চোখ রেখে আমি বললাম, ‘এসো, আর অপেক্ষা কেন!’ ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎই যেন আমার বিশ্বদর্শন হল। মনে হল বাস্তব দুনিয়া ছেড়ে চিরতরে যারা চলে যায় তারা কখনওই একা নয়। ঘর থেকে বহুদূরে হিমালয়ের কোলে এই যে আমি শুয়ে আছি, এই মৃত্যুই তো আমি চেয়েছিলাম। চারপাশ থেকে সুউচ্চ তুষারাবৃত শৃঙ্গের দল সস্নেহে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আমার পায়ের নিচে ছড়িয়ে আছে ধুলোধোঁয়াভরা মলিন পৃথিবী, লক্ষ লক্ষ লোক ছুটে বেড়াচ্ছে সেখানে। কীসের পেছনে ছুটছে তারা নিজেই জানে না। সে তুলনায় আমি তো ভাগ্যবান! যে অভীষ্টে পৌঁছোতে চেয়েছিলাম পৌঁছেছি, সেখানেই আছি, থাকবও। মৃত্যুর খুব কাছাকাছি এলে মানুষ বোধহয় কোনও অতিলৌকিক ক্ষমতা অর্জন করে। অসীম বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সঙ্গে তার যোগসূত্র আবিষ্কার করে সে।
ওরা আমাকে আমার আইস অ্যাক্সটা ফেরত দিয়েছে। বাইরে সুন্দর হাওয়া দিচ্ছে, মিষ্টি ফুলের গন্ধ ভেসে আসছে সে হাওয়ায়। সবকিছু ঠিকঠাকই থাকবে। এরকমই শান্ত, স্নিগ্ধ। সবুজ মখমলের মতো ঘাসের নিচে শুয়ে থাকব আমি, বুকের ওপর রাখা থাকবে আমার প্রিয় আইস অ্যাক্সটা, তার ওপর নরম মাটি, কয়েকটা পাথর, একটা ক্রস। বন্ধুরা ফিরে যাবে। তারা জানে আমি এখানে নিরাপদ। স্যালুট জানিয়ে পেছন ফিরে ধীরে ধীরে সমতলে নেমে যাবে তারা। ওদের জন্য রইল পৃথিবীর বিস্তীর্ণ দিগন্ত। আমার জন্য, শুধুই শীতল নৈঃশব্দ।

(এরপর আগামী সংখ্যায়)

খেলার পাতার সমস্ত লেখার লিংক একত্রে এইখানে