খেলার পাতা

 অন্নপূর্ণা->মরিস হারজগ->অনুবাদঃ তাপস মৌলিক

KhelaAnnapurna01 (Small)

উচ্চতার হিসেবে অন্নপূর্ণা (৮০৯১ মিটার) বিশ্বের ১০ নম্বর পর্বতশৃঙ্গ১৯৫০ সালে ৮০০০ মিটারের চেয়ে উঁচু প্রথম শৃঙ্গ হিসেবে অন্নপূর্ণা জয় করেন মরিস হারজগের নেতৃত্বে এক ফরাসী অভিযাত্রী দল আটহাজারি শৃঙ্গগুলিতে মোট ২২টি  বিফল অভিযানের পর তাদের এই সাফল্য সারা বিশ্বে হৈচৈ ফেলে দেয়। জয়ঢাকে ধারাবাহিকভাবে চলছে সেই অভিযান নিয়ে হারজগের লেখা রুদ্ধশ্বাস কাহিনী। এবারে পঞ্চম পর্ব।

শীর্ষচিত্রঃ ২৭শে এপ্রিল, ১৯৫০ মিরিস্তি খোলার গিরিখাত ধরে এগিয়ে দেখা অন্নপূর্ণা

ফোটোঃ অন্নপূর্ণা অভিযান

KhelaAnnapurna02 (Small)অন্নপূর্ণার খোঁজে

      “অডট, তাড়াতাড়ি করো, প্রচণ্ড খিদে পেয়ে গেছে।”

    সকাল থেকে ল্যাচেনাল আর টেরের নানারকম ডাক্তারি পরীক্ষা করছে অডট। নাক, কান, গলা, বুক, পেট সবকিছুর প্রায় বিশ রকমের নিয়মমাফিক চেক আপ। এর মধ্যে ফ্ল্যাক টেস্ট বলে একটা পরীক্ষা ছিল, যেটা আমাদের সবারই বিলক্ষণ মনে আছে। একটা নলের মধ্যে ফুঁ দিয়ে চার সেন্টিমিটার পারদের সমান বায়ুচাপ ধরে রাখতে হবে। পরীক্ষাগুলো সবই খালি পেটে করতে হত। আর কোনও অনুসন্ধানপর্ব থেকে সদ্য ফিরলে এমন খিদে হত, যে জলখাবার না খেয়ে বসে থাকতে থাকতে অডটকে শাপশাপান্ত করতেই ইচ্ছে করত।

    টেরের চেক আপ চলছে। ল্যাচেনালের হয়ে গেছে। সে একটা প্লেটে একগাদা সসেজ নিয়ে এসে টেরের পাশে দাঁড়িয়ে দেখিয়ে দেখিয়ে খাচ্ছে। টেরে মাঝেমাঝেই টেরিয়ে টেরিয়ে ল্যাচেনালের প্লেটের দিকে তাকাচ্ছিল, শেষে আর থাকতে না পেরে চেঁচিয়ে উঠল, “অ্যাই ল্যাচেনাল, আমার চোখের সামনে থেকে দূর হও তো এক্ষুনি! ব্যাটা শুওরের মত সসেজ খাচ্ছে!”

    “শাট আপ। একদম চুপ। এরকম চ্যাঁচালে টেস্টের রেজাল্ট কি ঠিক আসে? ফের প্রথম থেকে করতে হবে কিন্তু,” অডট এক ধমক দিল টেরেকে। ওর কোনও মায়াদয়া নেই।

    আমি একটু সংশয়ে ছিলাম, অডটের বোধহয় ডাক্তারির চেয়ে পাহাড় চড়াতেই বেশি উৎসাহ দেখব। আমার চিন্তার কোনও কারণ ছিল না। অডট দেখলাম পর্বতাভিযাত্রী আর ডাক্তারের এক নিখুঁত যুগলবন্দী। দলের সবার স্বাস্থ্য, ফিটনেস, কে কতটা উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পেরেছে – সে সব বিষয়ে অডট নিয়মিত আমায় ওয়াকিবহাল রাখত। আহা, সব পর্বতাভিযানেই যেন এরকম একজন অডট থাকে।

    এদিকে আমি, আইজ্যাক আর রেবুফত মানাংভোটের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিলাম। মিরিস্তি খোলা ধরে অন্নপূর্ণার রাস্তা বেশ ঝামেলার আছে। মানাংভোটের দিক থেকে বরং সোজা হওয়ার কথা।

    “টিলম্যানকে আমাদের শুভেচ্ছা জানিও,” খাওয়া শেষ করে ল্যাচেনাল মজা করে বলল। টিলম্যানের নাম হিমালয় পর্বতাভিযানের সঙ্গে জড়িত সবাই জানে। সেই টিলম্যান যিনি এখনও পর্যন্ত মানুষের জয় করা সর্বোচ্চ শৃঙ্গ নন্দাদেবীতে (২৫,৬৪৫ ফিট) উঠেছিলেন। ফ্রান্স থেকে রওনা হওয়ার সময় আমরা খবর পেয়েছিলাম টিলম্যান এবার ওই মানাংভোটের আশেপাশেই অনুসন্ধান চালাতে আসছেন। তবে তাঁর দলবল নেহাতই ছোট বলে শুনেছিলাম; তাতে আমার মনে হয়েছিল মানাসলু (আরেক আটহাজারি শৃঙ্গ, ২৬৬৪০ ফিট) বা অন্নপূর্ণার শৃঙ্গে ওঠার সম্ভাব্য রুট খুঁজে বার করার জন্য প্রাথমিক অনুসন্ধান চালানোই তাঁর উদ্দেশ্য। পর্বতাভিযাত্রীরা অবশ্য নিজেদের পরিকল্পনা আগেভাগে রাষ্ট্র করতে খুব একটা পছন্দ করে না। তবে দু’দুটো অভিযান যদি একই অন্নপূর্ণার শৃঙ্গে ওঠার জন্য একসঙ্গে চেষ্টা করে, সেটা খুবই আশ্চর্যের হবে।

KhelaAnnapurna03 (Small) KhelaAnnapurna04 (Small) KhelaAnnapurna05 (Small)

তুকুচার সুন্দরী মুক্তিনাথের পথে চলা   হিন্দু তীর্থযাত্রীরা    ছবিঃ মার্সেল                                     আইজ্যাক 

    তিনিগাঁওয়ে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করে রাখার জন্য ফুথারকে আগেই বেরিয়ে গেল। আট দিনের রসদ নিয়ে বেরোচ্ছি আমরা। আর এই ক’দিন, যখন আমরা থাকব না, ধৌলাগিরির পূর্ব হিমবাহ ধরে ওঠার একটা চেষ্টা করতে অডট আর টেরে যথেষ্ট সময় পাবে। অবশ্য কোজি আর শ্যাজ ওই রাস্তাতেই গেছে; ওরা যদি সফল হয় তবে তো কথাই নেই। দু’দিন বিশ্রাম পেয়ে অনেক কাজের কাজ হয়েছে; ফ্রান্সে চিঠি পাঠাতে পেরেছি, অভিযানের হিসেবপত্র ঠিকঠাক করা গেছে, আর বেসক্যাম্প যাতে মসৃণভাবে চলে সে দিকেও নজর দেওয়া গেছে। তবে হাতপা গুটিয়ে ক্যাম্পে বসে থাকতে কি আর ভালো লাগে? ফের পথে বেরিয়ে যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম তাই।

    তিব্বত যাবার রাস্তা ধরে সারি দিয়ে ব্যবসায়ীদের বড় বড় দল চলেছে, নুন আর চাল নিয়ে যাচ্ছে তারা। আমাদের চলার পথে মারফা বলে একটা ছোট্ট গ্রাম পড়ল। বাড়িগুলোর মাথায় মাথায় বৌদ্ধদের পবিত্র পতাকা পতপত করে উড়ছে। গ্রামে ঢোকার মুখে রাস্তার মাঝে পরপর কয়েকটা পাথরের দেওয়াল পড়ল, তাদের গায়ে পবিত্র বৌদ্ধ মন্ত্র খোদাই করা – ‘ওম মণিপদ্মে হুম’। বৌদ্ধদের ধর্মীয় রীতি হল সবসময় এরকম দেওয়ালের বাঁদিক দিয়ে যাওয়া। ওদের রীতিকে সম্মান জানাতে আমরাও তাই করলাম। তুকুচার থেকে মারফায় তিব্বতির সংখ্যা বেশি। গ্রামে ঢুকতেই কচিকাঁচার দল ও গ্রামের লোকজন সোৎসাহে আমাদের ঘিরে ধরল, ওদের মুক্তহস্তে ‘মিঠাই’ বিতরণ করা হল। এতে আমাদের দলটা সম্বন্ধে মারফার বাসিন্দাদের ভালো ধারণা তৈরি হওয়া উচিত। সেটা হয়েওছিল। পরে দরকারের সময় এ গ্রাম থেকে অনেক কুলি পাওয়া গেছিল।

KhelaAnnapurna06 (Small) তিব্বত পথযাত্রীরা                                  ছবিঃ মার্সেল আইজ্যাক

    আমাদের চারপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্যে ধীরে ধীরে একটা পরিবর্তন আসছিল। ক্রমশ আমরা যেন এক রুক্ষ জনহীন পার্বত্য মরুভূমির দিকে এগিয়ে চলেছিলাম। চারপাশে হলদেটে পাহাড়ের গা, শুকনো স্বচ্ছ আবহাওয়া। বোঝাই যাচ্ছিল আমরা ক্রমশ তিব্বতের দিকে এগিয়ে চলেছি, যদিও সীমান্ত এখান থেকে ঝাড়া একদিনের পথ।

    সন্ধ্যেবেলা তিনিগাঁও পৌঁছলাম। তিনিগাঁও ছন্নছাড়া একটা গ্রাম। গ্রামের আদিম এবং অত্যন্ত অপরিচ্ছন্ন বাসিন্দারা সন্দেহের চোখে আমাদের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল, তারপর আমাদের ঘিরে ধরে হৈহল্লা করতে করতে গ্রামের একমাত্র মোটামুটি ভদ্রস্থ বাড়িতে নিয়ে এল। সেখানে ফুথারকে হাসিমুখে আমাদের অভ্যর্থনা জানাল। দেখি এরমধ্যেই সে বেশ গুছিয়ে বসেছে। গ্রামের মহিলারা তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে, আর সে শান্তভাবে তাদের ধর্মের বাণী শোনাচ্ছে। বাড়িটা এ গ্রামের প্রধানের বাড়ি, এ পথে চলা ব্যবসায়ীদের দলের জন্য সরাইখানা হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। গ্রামপ্রধান বেশ ঝানু ব্যবসায়ী, গ্রামের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত জিনিসপত্র তিনি কমদামে ব্যবসায়ীদের থেকে কেনেন, আর তারপর গ্রামে বিক্রি করেন।

    পরদিন সকালে অন্ধকার থাকতেই আংথারকে আমাদের জলখাবার দিয়ে দিল। পরিষ্কার আকাশে তখনও কয়েকটা তারা মিটিমিটি করছে। দূরে, আবছা অন্ধকারের মাঝে একা মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ধৌলাগিরির মাথায় সূর্যের আলো সবে এসে পড়েছে। সে এক স্বর্গীয় দৃশ্য।

    তিনিগাঁওয়ের সেই শিকারি, যে বলেছিল তিলিচো পাস নিয়ে যাবে আমাদের, আজ বলল, পাসটা ভালই চিনি বটে, তবে ওখানে পৌঁছতে কতক্ষণ সময় লাগবে তা বলতে পারব না। পিঠের মালপত্রের ভারে কুঁজো হয়ে আমরা সারি দিয়ে রওনা দিলাম। শেরপা হিসেবে আমাদের সঙ্গে আছে আংথারকে, ফুথারকে আর পানসি; এছাড়াও বেশ কয়েকজন তিব্বতি কুলি নেওয়া হয়েছে। ওরা যাতে তাড়াতাড়ি হাঁটতে পারে সে জন্য সব্বাইকে বুটজোড়া দিয়েছিলাম আমরা, কিন্তু দেখা গেল বুটজোড়ার পাছে কোনও ক্ষতি হয় সে আশঙ্কায় ওরা সবাই পায়ে না পরে ঘাড়ের দু’পাশে দুটো বুট ঝুলিয়ে রওনা দিল। বরফে পৌঁছে অবশ্য সেগুলো ঠিক জায়গায় পরা হয়েছিল।

    বেশ কয়েকঘন্টা হাঁটার পর সেই শিকারিকে তিলিচো পাসের ব্যাপারে আর অত নিশ্চিত বোধ হল না। আমরা অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করলাম, কিন্তু দেখা গেল তিলিচো পাস ঠিক কোথায় সে জানে না। বোঝা গেল, সে আসলে কোনও শিকারিই নয়, নেহাতই সাধারণ একজন গোচারক, পাহাড়ে ইয়াক চরায়। এদিকের পাহাড়ে গরু চরানোর জন্য যে বুগিয়ালগুলি আছে, ও শুধু সেগুলির রাস্তাই চেনে। যতই রাস্তা ওপরদিকে ওঠে, ততই তার বোলচাল কমতে থাকে। শেষে দেখা গেল সে সানন্দে আমাদের অনুসরণ করে পেছন পেছন হাঁটছে। এভাবেই তিলিচো পাস পৌঁছলাম।

    এখানে আমাদের জন্য একটা চমক অপেক্ষা করছিল। ম্যাপ অনুযায়ী পাসের ওদিকে একটা গভীর উপত্যকা থাকার কথা যা মানাংভোটের দিকে নেমে গেছে। ডানদিকে অন্নপূর্ণা কোথায়? এ যে দেখি চিরতুষারের রাজ্যে পৌঁছে গেছি! চারদিকের বরফ আর ঝকঝকে নীল আকাশের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে থাকা অগুনতি তুষারাবৃত শৃঙ্গ আমাদের চোখ ধাঁধিয়ে দিল। দেখা গেল, ডানদিকে অন্নপূর্ণার বদলে দাঁড়িয়ে আছে অজস্র তুষারশৃঙ্গের সমন্বয়ে গড়া এক দানবাকৃতি প্রাচীর, যার বেশ কটা শৃঙ্গের উচ্চতা ২৩০০০ ফিটের ওপরে। সামনে কোনও গভীর উপত্যকা নেই, আছে একটা বিস্তৃত বেসিন, কড়াইয়ের মত একটা অবতল অঞ্চল, তার কেন্দ্রে আয়তাকার বিশাল এক বরফজমা হ্রদ। পুরো অঞ্চলটাই তুষারে ঢাকা, তাই হ্রদটা ঠিক কতটা জায়গা জুড়ে আছে বোঝা গেল না। আর বাঁদিকে খাড়া পাহাড়ের পাথুরে গা সোজা নেমে গেছে সেই দুধসাদা হ্রদের বুকে।

KhelaAnnapurna07 (Small) তিলিচো হ্রদ-> ছবি উইকিপিডিয়া
  “কিন্তু সে হতচ্ছাড়া অন্নপূর্ণা গেল কোথায়?”, আইজ্যাক বলল।

    “ডানদিকে ওই সুন্দর তিনকোণা শৃঙ্গটা দেখ, দূরে। আমি নিশ্চিত অন্নপূর্ণা ওর পেছনে।”

    “আমি অতটা নিশ্চিত হতে পারছি না,” বলল আইজ্যাক।

    “আমিও না,” রেবুফত যোগ করল।

    “আর তিলিচো পাসটাই বা কোনদিকে?”, আইজ্যাকের প্রশ্ন।

    “এই বেসিনটার ওপাশেই হবে। হ্রদটা পেরোতে হবে আর কি! ওপারে গেলে নিশ্চয়ই মানাংভোট উপত্যকার দেখা মিলবে।”

    “হুমমম, না দেখে এ ব্যাপারেও মোটেই নিশ্চিত হতে পারছি না।”

    যাই হোক না কেন, আমাদের ওই তুষারহ্রদের দিকেই নামতে হবে। এক ঘণ্টা পর হ্রদের কিনারায় পৌঁছে গেলাম। পানসি দুপুরের খানা তৈরি করতে বসল, আর ওদিকে আমাদের আলাপ আলোচনাও চলল।

    “কান্ডটা দেখেছ একবার! ম্যাপে কোনও হ্রদের চিহ্নই নেই। অথচ এ হ্রদটা অন্তত চার মাইল লম্বা তো হবেই!”

    “আরে দূর! ম্যাপের কথা ছাড়ো। ওই যে ডানদিকে অতগুলো উঁচু উঁচু তুষারশৃঙ্গ দেখতে পাচ্ছ, ওগুলো ম্যাপে দেখানো আছে নাকি?”

    “হ্রদের জলটা কোনদিকে নামছে বলো তো?”

    “কোথাও নামছে বলে মনে হচ্ছে না। দেখছ না, জায়গাটা একটা ফানেলের মত? চারপাশের জল এসে হ্রদে জমছে শুধু।”

    “আমি বলছি শোনো, এই হ্রদের জলটাই মানাংভোটের দিকে নামছে, উপত্যকা ধরে।”

    দেখা গেল প্রত্যেকেরই নিজস্ব একটা মতামত আছে, আর সেটা সে জোরগলায় প্রতিষ্ঠা করতে ব্যাকুল। আসল সমস্যাটা হল হ্রদের ওপারে কী করে পৌঁছনো যায়। মালপত্র কাঁধে তুলে আমরা হ্রদের বাঁ তীরের পাথুরে জায়গা ধরে এগোতে শুরু করলাম। একটু পরেই পাড়টা এত খাড়াই হয়ে উঠল যে বাধ্য হয়ে বরফজমা হ্রদের আয়নার মত মসৃণ বুকে নেমে আসতে হল। কুলিদের ব্যাপারটা ঠিক সাহসে কুলোলো না, ভয়ে দাঁড়িয়ে গেল তারা। কেউ কেউ বলল এখান থেকেই ফিরে যাবে। তখন আমি কোমরে একটা নাইলনের দড়ি বাঁধলাম, দড়ির একদিক ধরা রইল আইজ্যাকের হাতে, সে ধীরে ধীরে দড়ি ছাড়তে লাগল, আর আমি হ্রদের বুকে তীর থেকে প্রায় পঞ্চাশ গজ ভেতরে এগিয়ে গেলাম। সেখানে লাফালাম, ঝাঁপালাম, নাচলাম, আইস অ্যাক্স দিয়ে দমাদ্দম ঠুকে হ্রদের বরফের চাদর ভাঙার বৃথা চেষ্টা করলাম, তারপর হাঁক পাড়লাম, “চলে এসো ভাইসব, কোনও ভয় নেই, এই বরফের চাদর ভেঙে জলে পড়ে যাবার কোনও সম্ভাবনাই নেই, পাথরের মত শক্ত।”

    তাও সাবধানের মার নেই বলে আমরা দুটো দলে ভাগ হয়ে রোপ আপ করে নিলাম, লম্বা দড়িতে পঁচিশ ফিট অন্তর অন্তর একেকজনের কোমর বাঁধা থাকল। কুলিদের মাথায় ঢুকল না যে এটা আমরা সবার নিরাপত্তার জন্যই করছি, ওদের আপত্তি এতে ওদের একসাথে দল বেঁধে চলার অসুবিধে। প্রথম দলটার একেবারে সামনে আমি রওনা দিলাম, প্রথমেই হ্রদের ভেতরে অনেকটা এগিয়ে গেলাম যাতে ওপারে পৌঁছনোর আগে আর ওই পাথুরে পাড়ে না উঠতে হয়। আমার পেছনে পেছনে, মালের ভারে ন্যুব্জ কুলিরা খানিক ইতস্তত করে একে একে হ্রদের ধারে এসে দাঁড়াল। তারপর ভয়ে ভয়ে এমনভাবে হ্রদের বুকে পা রাখল যেন জলেই নামছে, বিড়বিড় করে প্রার্থনামন্ত্র জপ করতে করতে নিচের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে ওরা ঠিক সেই সেই জায়গায় পা ফেলে এগোতে লাগল যেখানে যেখানে আমি পা ফেলেছি। সবকিছু ঠিকঠাকই চলল, নিরাপদেই ওপারে পৌঁছে গেলাম। আর এরপর থেকে কুলিরা কেউ আমাদের ছেড়ে ফিরে যাবার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে প্রকাশ করে নি, কেননা ফিরে যেতে হলে তো একা একা ওই বরফজমা হ্রদের ওপর দিয়েই ফিরে যেতে হবে!

    ওপারে পৌঁছে, হ্রদের ঢালু পাড় বেয়ে উঠে, অবশেষে একটা পাসে পৌঁছনো গেল। সকালে এরকমটাই আন্দাজ করেছিলাম আমরা। প্রায় ১৬,৪০০ ফিট উচ্চতার এ পাসটার নাম রাখা হল পূর্ব তিলিচো পাস, আর সকালে যেটা পেরিয়ে হ্রদের বুকে নেমেছিলাম সেটা পশ্চিম তিলিচো।

    আমি যেরকম আন্দাজ করেছিলাম, এদিকে হ্রদের জল বেরোনোর কোনও মুখ নেই। পাসের ওপর পৌঁছনোর পর মানাংভোটের দিকে নেমে যাওয়া গভীর এক উপত্যকা ধীরে ধীরে আমাদের চোখের সামনে খুলে গেল। দূরত্ব আন্দাজ করতে এখানেও আমাদের ভুল হয়েছিল। ভেবেছিলাম পাসের নিচে বেশ বড়সড় চওড়া একটা উপত্যকা বা বেসিন থাকবে, আর সেখানে মানাংভোট দেখতে পাব। বাস্তবে ব্যাপার যা দেখলাম তা বহুগুণ জটিল। পাসের ওধারে ছোট ছোট আলগা নুড়িপাথর ভর্তি অঞ্চল বা মোরেন (moraine) বেশ খাড়াই ঢালে মাইলের পর মাইল নেমে গেছে। ঢালের শেষে নুড়িপাথরের একটা উঁচু স্তূপ উপত্যকার মুখের দিক, মানে আমাদের কাছাকাছি যে দিক, সে দিকটা আড়াল করে রেখেছে। আমাদের ডানদিকে যে বিশাল তুষারশৃঙ্গগুলির প্রাচীর, তার নিচ দিয়ে উপত্যকা ধরে বয়ে চলেছে মার্সিয়ান্দি খোলা নদী, যার উৎপত্তি তিলিচো পাসে বলে জানতাম। এদিক থেকে নিচের ওই উপত্যকায় নামার একমাত্র রাস্তা হল নুড়িপাথরের স্তূপটার একপাশে একটা সরু নালার মত জায়গা। দূরে, স্তূপটার আড়ালে থাকা অংশটার পরে অবশ্য মার্সিয়ান্দি খোলার সঙ্কীর্ণ গিরিখাত ক্রমশ চওড়া হয়ে গেছে। সেদিকে ধূসর পাথর ও নুড়িবিছানো মোরেন অঞ্চলের মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে এদিকে সেদিকে কিছু সবুজের ছোঁয়া আছে, ছোট ছোট কিছু চাষের খেত দেখা যাচ্ছে।

    ডানদিকে, সেই দানবীয় তুষারপ্রাচীরের শেষে পরপর আরও কতগুলি তুষারশৃঙ্গ, তিলিচো হ্রদ থেকে যেগুলো দেখেছিলাম এগুলো তাদের চেয়েও সুন্দর ও সম্ভ্রম জাগানো। বাঁদিকে হলদেটে পাথুরে পর্বতগাত্রের মাথার ওপর দিয়ে দেখা যাচ্ছে মুক্তিনাথ হিমালয়ের বেশ কয়েকটা প্রায় ২০,০০০ ফিট উঁচু শৃঙ্গ। আর আমাদের পেছনে বরফজমা দুধসাদা তিলিচো হ্রদ। ভালো জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছি বলতে হবে! অতঃপর কী করণীয় সে ব্যাপারে আমাদের আলোচনা শুরু হল।

    আইজ্যাকের মতে ডানদিকের ওই তুষারপ্রাচীরের অগুনতি শৃঙ্গগুলির মধ্যে অন্নপূর্ণা নেই, ম্যাপে এ ব্যাপারটাও ভুল দেখানো আছে। “হতচ্ছাড়া এই মেঘগুলো একেবারে ঠিক সময়ে এসে হাজির, উঁচু উঁচু শৃঙ্গগুলো তো মেঘের জন্য দেখাই যাচ্ছে না! যা চোখে দেখতে পাচ্ছি না তাই নিয়ে আলোচনা করি কী করে?” বলল সে।

    “এই তো একটু আগেই একঝলক দেখা গেল,” বললাম আমি, “ম্যাপে কিছু ভুলভ্রান্তি আছে, মানছি আমি। কিন্তু ২৬,০০০ ফিটের চেয়েও উঁচু এতবড় একটা শৃঙ্গের অবস্থান ভুল দেখানো থাকবে? এতটা ভুল করবে কি?”

    “তার মানে তুমি বলতে চাও অন্নপূর্ণা ওই তুষারপ্রাচীরের শৃঙ্গগুলির মধ্যেই আছে?”

    “অবশ্যই, ওই সুন্দর ত্রিকোণ শৃঙ্গটার পেছনেই হবে, বলেছিলাম তো!”

    “আমি চ্যালেঞ্জ করছি, নেই। আমি বলছি ওই গোটা তুষারপ্রাচীরটাই ম্যাপে দেখানো নেই।”

    “দূর, কী যে বলো! একটা বারো মাইলেরও বেশি লম্বা তুষারপ্রাচীর, যার মধ্যে প্রায় পনেরোটা ২৩,০০০ ফিটের চেয়ে উঁচু পর্বতশৃঙ্গ রয়েছে, সেটা ম্যাপে দেখানো থাকবে না?”

    “মাত্র পনেরোটা? কী বলছ তুমি!” আইজ্যাক প্রতিবাদ করল।

    “ঠিক আছে, পনেরোটার বেশিই হল না হয়,” বললাম আমি, “কিন্তু, তার মানে, তুমি বলতে চাইছ, ম্যাপে যে এই লম্বা উঁচু গিরিশিরাটা দেখানো আছে, যেটা সোজা অন্নপূর্ণার চূড়ায় উঠে গেছে, আর আমাদের চোখের সামনে যে তুষারপ্রাচীরটা দেখতে পাচ্ছি, এ দুটো এক নয়? তাহলে তো এরকম আরেকটা গিরিশিরা থাকা উচিত, তাই না?”

    “তাই মনে হচ্ছে।” আইজ্যাক ম্যাপে দেখানো অন্নপূর্ণার অবস্থান আর বিভিন্ন দিক থেকে তার দূরত্ব নিয়ে চটপট কী সব হিসেবনিকেশ করে বলল, তার মতে অন্নপূর্ণা ওই তুষারপ্রাচীরের শৃঙ্গগুলির মধ্যে থাকতেই পারে না। ওর যুক্তি শুনে আশঙ্কায় আমার হাত-পা কাঁপছিল, কিন্তু মোটেই বিশ্বাস হল না। অন্নপূর্ণা তাহলে গেল কোথায়? এতবড় একটা শৃঙ্গ বেমালুম উধাও হয়ে যাবে নাকি! কিছুক্ষণ ভেবে শেষমেশ বললাম, “ঠিক আছে, চলো এখানে থাকা যাক আজ। এখানেই তাঁবু ফেলা হোক।”

    “বেশ, তবে তাই হোক,” বলল আইজ্যাক।

    “তুমি এখানে ঘাঁটি গেড়ে বসে থাকো। কাল থাকো, পরশু থাকো, বসে বসে যতখুশি হিসেব করো, দূরবীন দিয়ে দেখো, সেক্সট্যান্ট দিয়ে রিডিং নাও। নিয়ে তোমার বক্তব্য প্রমাণ করো দেখি।”

    “কোনও আপত্তি নেই। আমি এখানে যতদিন বলবে থাকতে রাজি। কিন্তু তুমি আর রেবুফত কী করবে?”

    “আমরা মানাংভোট নেমে যাচ্ছি। আমি নিশ্চিত মানাংভোট পৌঁছনোমাত্র অন্নপূর্ণার দর্শন পাওয়া যাবে।”

    “হা হা, ওদিকে খুব একটা সুবিধে হবে বলে মনে হয় না। যাও! তবে আমার কথা যদি বলো, আমি এখানে ঘাঁটি গেড়ে থাকতেই বেশি পছন্দ করব।”

    “বেশ তো, থাকো না যদ্দিন খুশি। আমরা ফুথারকে আর পানসিকে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি। কুলিদের আর তোমার জন্য মানাংভোট থেকে সাম্পা কিনে আনব, যাতে অনেকদিন থাকতে পারো।”

    “যাও। আমার শুভেচ্ছা রইল। হয়তো টিলম্যানের সঙ্গেও দেখা হয়ে যাবে!”

    পরদিন ভোরবেলা আমি আর রেবুফত হালকা রুকস্যাক পিঠে রওনা দিলাম। মালপত্র বেশি নিলাম না যাতে মানাংভোট থেকে যতটা পারি রসদ নিয়ে ফিরতে পারি। নুড়িপাথরের ঢাল ধরে হুড়মুড় করে নামতে শুরু করলাম আমরা। আমাদের নামার তোড়ে আলগা নুড়ি গড়িয়ে গড়িয়ে নিচের দিকে রীতিমতন নুড়িপাথরের বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। পাথরে পাথরে লাফিয়ে স্রোতস্বিনী মার্সিয়ান্দি খোলার গতিপথ ধরে দ্রুত নিচে নামতে নামতে দেখলাম, সেই ত্রিকোণ শৃঙ্গ থেকে নেমে আসা একটা ঝুলন্ত হিমবাহ থেকে মার্সিয়ান্দি খোলার জন্ম। যত নিচে নামতে লাগলাম ততই বুঝতে পারলাম খোলা উপত্যকায় পৌঁছনর পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানো স্তূপ আর পাহাড়গুলো কতটা উঁচু উঁচু। খুব শীঘ্রই সবাই স্বীকার করতে বাধ্য হলাম নদীর এই পার ধরে এগোনো আর সম্ভব নয়। নদীটা পেরোতে হবে। নদীখাতে নেমে এলাম সবাই। রেবুফত মুহূর্তের মধ্যে নদী পেরিয়ে ওপারে চলে গেল। আমি ইতস্তত করতে লাগলাম। জুতোটা ভেজাব? আইস অ্যাক্সটা নদীর ওইখানে গেঁথে ওটাকে যদি একটা পোলের মত ব্যবহার করি…পোলভল্ট দিয়ে একটা পা ওই পাথরটার ওপর…তারপর লাফ দিয়ে ওই পাথরটায়…প্রথম পাথরটা অবশ্য নড়বড়ে হতে পারে…দেখাই যাক না…এক…দুই – পোলভল্টটা জমল না ঠিক, আইস অ্যাক্সটা কাত হয়ে গেল, পাথরটা গড়িয়ে গেল, আর আমি ঝপাস করে পড়লাম নদীর বরফঠান্ডা জলে।

    তিলিচো পাসের ওপর থেকে নদীখাত বরাবর নুড়িপাথরের যে বড় বড় ঢালগুলো দেখেছিলাম, সেগুলো এবার সামনে পড়ল আমাদের। আলগা নুড়িপাথরের এরকম ঢাল বেয়ে ওঠা ভীষণ কষ্টকর। ঢালগুলো নুড়িদের যথাস্থানে ধরে রাখার পক্ষে বেশিই খাড়াই, একটু বেশি নাড়াচাড়া পড়লেই নুড়ির ধ্বস নামা শুরু হবে একেবারে। আমাদের অনেক পেছনে তিলিচো পাস দেখা যাচ্ছিল, যেখানে এই কয়েক ঘন্টা আগেও ছিলাম।

    পাথরের নুড়িগুলো সব একই সাইজের, যেন বড় বড় ফুটোওয়ালা কোনও দৈত্যাকার চালুনি দিয়ে সেগুলোকে ছাঁকা হয়েছে। অতিকষ্টে নুড়ির ঢালগুলো পেরিয়ে উপত্যকার চওড়া মুখটায় পৌঁছে দেখি আমাদের সামনে সরু নালার মত শক্ত মাটির এক খাড়া চড়াই।

“এ যে দেখছি সিঁড়ির মত ধাপ কেটে কেটে উঠতে হবে এবারে,” ধাঁধায় পড়ে গিয়ে বললাম।

“ঢালটা বরফের হলে বরং সুবিধে হত,” বলল রেবুফত।

শেরপারা সমস্যাটাকে কীভাবে সামলায় দেখা যাক। আইস অ্যাক্স হাতে ফুথারকে ঢালের দিকে সটান এগিয়ে গেল। তারপর নিখুঁতভাবে ভারসাম্য বজায় রেখে দাঁড়িয়ে ঝটপট ধাপ কাটতে কাটতে উঠে চলল। পানসিও পেছন পেছন অনায়াসে উঠে গেল। ওদের পদাঙ্ক অনুসরণ করা ছাড়া আমাদের বিশেষ কিছু করার রইল না।

খাড়াইটার ওপরে ঘাসের ঢাল পাব ভেবেছিলাম, কিন্তু উঠে দেখি সামনে আরেকটা একই রকম শক্ত মাটির খাড়াই, তারপর আরেকটা, তারপর আরও একটা… শেষমেশ ঘাসের সবুজ সহজ ঢালে পৌঁছনোর আগে আমাদের ঝাড়া একঘণ্টা ধরে ধাপ কেটে কেটে উঠতে হল। ঘাসের ঢাল থেকে নদীর বুকে নেমে আসতে হলে ফের সেই আলগা নুড়ি পাথরের ঢাল। বাচ্চাদের স্লিপ বেয়ে নামার মত সড়সড় করে বিস্তর ধুলোবালির মেঘ উড়িয়ে আমরা আবার নদীখাতে নেমে এলাম। এভাবে, অবশেষে মার্সিয়ান্দি খোলার সঙ্কীর্ণ গিরিখাত পেরিয়ে উপত্যকার চওড়া মুখটায় পৌঁছনো গেল।

দুপুর গড়িয়ে গেছে। নদীর ধারে বসে চটপট লাঞ্চ সেরে নিলাম আমরা। এর পর নদীর তীর ধরে এগোনো। সেটাও কিছু কম ঝকমারি নয়। মাঝে মাঝেই ঘন জঙ্গল আর ঝোপঝাড়ের মধ্য দিয়ে এগোতে বেশ কয়েক’শ ফিট চড়াই ভেঙে উঠতে হচ্ছিল আমাদের।

তুকুচা উপত্যকার থেকে এ অঞ্চলটা একেবারে ভিন্ন জগত। এখানে অনেক গরম, গাছপালাও অনেক বেশি। মাঝে মাঝেই ফুলে ভরা গাছপালা দেখা যাচ্ছে। চারপাশের পরিবেশ অত রুক্ষ নয়, তুকুচার চাইতে কোমল ও বন্ধুত্বপূর্ণ। মানুষের যাতায়াত আছে এ অঞ্চলে। বিভিন্ন দিক থেকে সরু সরু পায়ে চলা শুঁড়িপথ এসে মিলে কিছুক্ষণ পরেই মোটামুটি একটা রাস্তা তৈরি হল। মানাংভোট তখনও অনেক দূর। আমাদের সাথে কোনও তাঁবু নেই, খাবারদাবারও যৎসামান্য, তাই যে করেই হোক সন্ধ্যের মধ্যে পৌঁছতেই হবে মানাংভোটে।

পথের একটা বাঁক ঘুরতেই একটা ঢালের পেছনে হঠাৎ এক বসতির দেখা পেলাম। খাংসার নামে ছোট্ট একটা গ্রাম, ঢোকার মুখে পাথর দিয়ে সাজানো স্তূপ বা চোরতেনের ওপর বৌদ্ধদের পবিত্র পতাকা উড়ছে। নোংরা, ছন্নছাড়া বাচ্চার দল আমাদের দেখে দৌড়ে এল। এই প্রথম ওরা সাদা মানুষ দেখল, আর আমাদের তুষারপর্বত থেকে নেমে আসা দেবদূত মনে করে অবাক হয়ে চেয়ে রইল। আমরা যে ওই পর্বতশ্রেণীর ওপার থেকে আসছি সেটা ওদের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। ও পর্বতশ্রেণীর পেছনে যে কিছু থাকা সম্ভব তাই এরা জানে না! দেখা গেল এখানকার লোকজন শুধু থোরাং পাস পেরিয়ে তীর্থযাত্রীদের মুক্তিনাথ যাবার রাস্তাটাই চেনে।

পানসি এখানকার গ্রামপ্রধান বা সুবা কোথায় থাকেন জিজ্ঞাসা করল। দুর্গন্ধযুক্ত অলিগলির ভেতর দিয়ে সোরগোল করতে করতে চলা একটা মিছিলের পেছন পেছন আমরা গ্রামের ভেতর ঢুকলাম। আমাদের সঙ্গে দেখা করতে সুবা তাঁর বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন। তাঁর চোখেমুখে কিন্তু অবাক হবার কোনও লক্ষণই দেখলাম না। স্বাভাবিক, কেননা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গৌতম বুদ্ধ এঁদের শিখিয়েছেন জগতের সবচেয়ে আশ্চর্য ঘটনার মুখোমুখি হয়েও কীভাবে নির্লিপ্ত থাকতে হয়। আমি সুবাকে বললাম, ‘আমরা কিছু সাম্পা কিনতে চাই, আমাদের কুলিরা ওই পাহাড়ের মাথায় বসে আছে।’ সুবা তারস্বরে প্রায় বিলাপের সুরে বলতে শুরু করলেন, ‘খাংসার অত্যন্ত গরীব একটা গ্রাম, বিক্রি করার মত এক ছটাক সাম্পাও আমাদের উদ্বৃত্ত নেই, এক মুঠো চালও না, মুরগির তো কথাই নেই। আপনারা মানাংভোটে যান, মাত্র এক ঘন্টার রাস্তা। ওখানে সব পাবেন।’

মনে হল মানাংভোট নিশ্চয়ই এক সব পেয়েছির দেশ। অযথা সময় নষ্ট না করে, গরম আর ক্ষুধাতৃষ্ণা উপেক্ষা করে ফের রওনা দিলাম আমরা। গ্রাম ছেড়ে বেরিয়েই দেখি, রাস্তার ওপর ইয়াকের একটা সম্পূর্ণ কঙ্কাল পড়ে আছে। ইয়াক এদের কাছে খুব পবিত্র এক প্রাণী, এই পবিত্র কঙ্কাল সরানোর কথা এরা কেউ স্বপ্নেও ভাবতে পারে না। হয়তো কঙ্কালটা মাসের পর মাস এখানে পড়ে আছে, আরও বহু বহুদিন থাকবে, যতদিন না সম্পূর্ণ ধুলোয় মিশে যায়। এরা রাস্তাটাকেই বাধ্য হয়ে বাঁদিক দিয়ে ঘুরিয়ে দিয়েছে।

খাড়া পাথুরে পাহাড়ের গায়ে ধাপকাটা কয়েকপ্রস্থ সিঁড়ি দিয়ে নেমে আমরা ফের নদীর ধারে উপস্থিত হলাম। তারপর নদীর তীরের রাস্তা ধরে তাড়াতাড়ি হাঁটা দিলাম।

“বড়াসাহিব, ঐ যে মানাংভোট,” হঠাৎ পানসি বলল।

শহরটা তিব্বতের প্রাচীন শহরগুলির মত খাড়া পাথুরে পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে বাড়ি তৈরি করে গড়ে উঠেছে। নদীখাত থেকে ওপরে তাকালে বাড়িগুলির দেওয়াল ছাড়া আর কিছু দেখা যায় না, সব মিলিয়ে মনে হয় পাহাড়ের মাথায় একটা দুর্গ। নদী পার হওয়ার জন্য একটা কাঠের পাটাতন দেখে বোঝা গেল আমরা আবার সভ্য জগতে ফিরে এসেছি।

KhelaAnnapurna08 (Small)

মানাংভোট শহর ও উপত্যকা                                                     ছবিঃ অন্নপূর্ণা অভিযান

সরু সরু বহু গলিপথ পেরিয়ে শহরটার কেন্দ্রে পৌঁছে দেখি সেখানে একটা প্রায় পঞ্চাশ গজ লম্বা বিশাল পাথরের দেওয়াল, যার গায়ে প্রার্থনামন্ত্র লেখা আর অনেক জপযন্ত্র বসানো। শহরের বাসিন্দারা আমাদের দেখার জন্য চারপাশের গলিপথ থেকে হুড়োহুড়ি করে এসে উপস্থিত হল। প্রথমে এল বাচ্চার দঙ্গল, সেই একইরকম ছন্নছাড়া তাদের চেহারা; হাতে অদ্ভুতদর্শন একটা পুরনো জপযন্ত্র ঘোরাতে ঘোরাতে এসে পৌঁছলেন এক বুড়িমা; তারপর এল কমবয়সী যুবকদের দল – তাদের বেশিরভাগেরই খুব সুন্দর চেহারা, আর তুকুচার লোকেদের থেকে এদের মুখশ্রী অন্য ধরনের।

এখানে সকলেই বৌদ্ধ। আমাদের ঘিরে ধরে ওরা সবাই চিৎকার করে কিছু বলছিল, কিছুই বুঝতে পারছিলাম না, তবে ঘাবড়াবার কোনও কারণ ছিল না। কেননা এতদিনে বুঝে গেছি, এদেশে সামান্য ‘সুপ্রভাত’ বলতে হলেও প্রত্যেকে গলা একেবারে সপ্তমে চড়িয়ে লম্বা একটা বক্তৃতা দেওয়া খুব জরুরি মনে করে। প্রায় পনেরো মিনিট ধরে কথাবার্তা চলার পর একজন শহরের প্রধান বা সুবার খোঁজে গেল। ইতিমধ্যে একটা গুদামঘরের তিনতলায় পানসি আমাদের থাকার জায়গা ঠিক করে এসেছে। মোটা কাঠের তক্তা দিয়ে বানানো একটা সিঁড়ি বেয়ে সেখানে গিয়ে উঠলাম। রুকস্যাক ঘরে রেখে আমি আর রেবুফত শহরের সেই কেন্দ্রীয় চত্বরে ফিরে এলাম।

নানারকম জল্পনাকল্পনা করতে করতে লোকজন ফের আমাদের ঘিরে এল, “আমেরিকান?”

“না, ফ্রেঞ্চ।”

“অ্যাঁ, কী? ফে…ফেঞ্চ?”

“হ্যাঁ, ফ্রেঞ্চ।”

যেন সমস্ত জল্পনার অবসান হয়ে গেছে এই ভাবে সবাই একে অন্যের দিকে চেয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, “ও আচ্ছা, আমেরিকান। বেশ বেশ। তখনই বুঝেছিলাম!”

“না না, আমেরিকান নয়। আমেরিকানরা আলাদা। যেমন ইংরেজ হয়, যেমন আমেরিকান হয়, সেরকম ফ্রেঞ্চও হয়। আমরা ফ্রেঞ্চ।”

“হ্যাঁ হ্যাঁ, সে তো বটেই, তার মানে তোমরা আমেরিকানই হলে!”

আমি হাল ছেড়ে দিলাম। এঁদের মধ্যে অনেকেই ব্রিটিশদের গুর্খা রেজিমেন্টে কাজ করেছেন, সাহেবদের দেখেছেন। তবে ওঁদের নিজেদের এ শহরে আমরাই প্রথম সাদা আদমি এলাম।

কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হল, অন্নপূর্ণার ব্যাপারে এঁদের কেউ কিছুই জানেন না। একটা ২৬,০০০ ফিটের চেয়েও উঁচু পর্বতশৃঙ্গের ব্যাপারে সে অঞ্চলের একটা শহরে কেউ কিচ্ছু জানবেন না, সেটা তো হয় না! যদি দূরের ঐ পর্বতশ্রেণী বরাবর অন্নপূর্ণা আরও দূরেও কোথাও থাকে, তার অস্তিত্ব সম্পর্কে অন্তত এঁদের ওয়াকিবহাল থাকা উচিত। হয়তো এখানে অন্নপূর্ণার নাম অন্য কিছু, অন্য কোনও দেবদেবীর নামে তাঁকে ডাকা হয়!

KhelaAnnapurna09 (Small)     KhelaAnnapurna10 (Small)

সাম্পা তৈরির চাক্কি                             মানাংভোটের এক বাসিন্দা ছবিঃ অন্নপূর্ণা অভিযান

সূর্য অস্ত যাচ্ছে। তখনই সে মানাংভোটের প্রহরীর মত দাঁড়িয়ে থাকা চমৎকার সেই ত্রিকোণ শৃঙ্গটার পেছনে মুখ লুকিয়েছে। পানসিকে দিয়ে শহরের বাসিন্দাদের খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে প্রশ্ন করে জানা গেল ত্রিকোণ শৃঙ্গটার নাম গঙ্গাপূর্ণা, আর ওর বাঁদিকে পরপর দুটো শৃঙ্গ হল চোঙ্গোর আর সেপচিয়া। কৌতূহল নিরসনের পর অবশেষে শহরটা একটু শান্ত হয়েছে। আমি আর রেবুফত শহরের সরু সরু অলিগলির গোলকধাঁধায় কিছুক্ষণ হেঁটে বেড়ালাম। আস্তানায় ফিরে আসার পর আমাদের শেরপারা হতাশভাবে জানাল মানাংভোট থেকে রসদ সংগ্রহ করা খুবই মুশকিল হবে, দেশটা বড়ই গরীব।

তখনই এখানকার সুবাও আমাদের সঙ্গে দেখা করতে এলেন। বৃদ্ধ মানুষ, লম্বা দাড়ি, খুবই সাধারণ পোশাকআশাক, বেশ বুদ্ধিমান দেখতে। সরাসরি কাজের কথায় আসা গেল। সুবা অনেক বাহানা দেখিয়ে জানালেন মাত্র দশ কিলো সাম্পা ছাড়া আর কিছুই উনি দিতে পারবেন না; চাল, দুধ, মুরগি কিচ্ছু না। সাম্পা ছাড়া শুধু চারটে ছোট্ট ছোট্ট মুরগির ডিম পাওয়া গেল। তিলিচো পাসের ওপর বসে থাকা আমাদের কুলিদের পক্ষে এ রসদ তো যৎসামান্য! গুরুতর ব্যাপার। ঠিক করলাম কাল সকালেই ফুথারকেকে সমস্ত রসদ সঙ্গে দিয়ে তিলিচোয় ফেরত পাঠিয়ে দেব।

তাড়াতাড়ি আইজ্যাককে একটা চিঠি লিখলাম।

প্রিয় আইজ্যাক,

ফুথারকের হাতে এ চিঠি পাঠাচ্ছি। মানাংভোটে যা কিছু সামান্য রসদ সংগ্রহ করতে পেরেছি ওর সঙ্গে পাঠালাম। তিলিচো থেকে মানাংভোট বিরাট লম্বা রাস্তা। যা বুঝলাম বলি এবার।

আমাদের দেখা সেই সুন্দর ত্রিকোণ শৃঙ্গটার নাম গঙ্গাপূর্ণা। ওর পরে একই শ্রেণীতে ২৩০০০ ফিটের চেয়ে উঁচু যে আরেকটা তুষারশৃঙ্গ আছে তার নাম চোঙ্গোর। এরপর পর্বতশ্রেণীটা ক্রমশ নিচু হতে হতে উপত্যকায় দুটো নদীর সঙ্গমস্থলে নেমে এসেছে। সেখানে মার্সিয়ান্দি খোলার সঙ্গে এসে মিশেছে চৌন্দিকিউ বলে আরেকটা নদী। জায়গাটা এখান থেকে প্রায় দু’মাইল দূর, চিন্দি নামে এক ছোট্ট গ্রাম আছে সেখানে। মানাংভোট থেকে চৌন্দিকিউএর ডানতীরে আরেকটা উঁচু পর্বতশৃঙ্গ দেখতে পাচ্ছি, ওটার নাম সেপচিয়া।

কিন্তু অন্নপূর্ণা কোথায়? সেটা এখনও রহস্য। এখানে কেউ অন্নপূর্ণার কথা জানে না।

পরিকল্পনাঃ আমি, রেবুফত আর পানসি চিন্দিতে যাচ্ছি অন্নপূর্ণা কোথায় সে ব্যাপারে কোনও তথ্য পাওয়া যায় কিনা দেখতে। যদি পাই, তবে অন্নপূর্ণার কাছে পৌঁছনোর সম্ভাব্য রাস্তাগুলি খতিয়ে দেখব, তারপর মুক্তিনাথ হয়ে যত শীঘ্র সম্ভব তুকুচা ফিরে যাব (কেননা তিলিচো হয়ে ফেরার থেকে মুক্তিনাথ হয়ে ফিরলে একদিন বাঁচবে)। যদি দেখি, এদিক দিয়ে কিছু সম্ভব নয়, তিলিচো থেকে আমাদের সেই বিশাল তুষারপ্রাচীরের দিকেই এগিয়ে দেখতে হবে, তাহলে ১২ তারিখ তিলিচোর ক্যাম্পে ফিরব। আমরা যদি না ফিরি, তোমরা ১৩ই সকালে ক্যাম্প গুটিয়ে তুকুচা ফিরে যেও।

এখন এটুকুই, মরিস।

KhelaAnnapurna11 (Small)

মরিস হারজগ। ছবিঃ কিস্টোন, ফ্রান্স

এরপর আগামি সংখ্যায়

আগের পর্বগুলো একত্রে এই লিংকে