খেলার পাতা

১০ই মে ভোরবেলা আমি, রেবুফত, ফুথারকে আর পানসি পূর্ব তিলিচো পাসের ক্যাম্প ছেড়ে মানাংভোটের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলাম। ওদিকে, আমরা রওনা হয়ে যাবার পর, বেলা ন’টা নাগাদ আংথারকে-কে সঙ্গে নিয়ে আইজ্যাকও বেরোল। ওদের লক্ষ্য ছিল ক্যাম্পের উত্তরপূর্বে মুক্তিনাথ হিমালয়ের ওপর কোনও উঁচু জায়গা, যেখান থেকে দক্ষিণের বিশাল তুষারপ্রাচীরটা ভালোভাবে দেখা যাবে। মোটামুটি ১৮,০০০ ফিট উচ্চতায় একটা সুবিধেজনক জায়গায় পৌঁছে আইজ্যাক কম্পাস আর সেক্সট্যান্ট বার করে প্রচুর মাপজোক নিল, অনেক ছবি তুলল। আর আইজ্যাক যখন এসব নিয়ে ব্যস্ত, আংথারকে পাথর সাজিয়ে সাজিয়ে আট ফিট উঁচু একটা স্মারক স্তূপ বা কেয়ার্ন (cairn) বানিয়ে ফেলল। একটু পরেই ভোরবেলার মেঘেরা ফের ফিরে এসে আকাশ ছেয়ে ফেলল;ওরাও তাই বাধ্য হয়ে ক্যাম্পে ফেরার রাস্তা ধরল।

তাঁবুর ভেতর উপুড় হয়ে শুয়ে আইজ্যাক তার মাপজোক সমস্ত ম্যাপে ফেলল, “হুমমম… এইবারে বোঝা গেছে!! অবশেষে ধীরে ধীরে সব পরিষ্কার হচ্ছে!”

আইজ্যাকের পর্যবেক্ষণের ফলে যা প্রমাণ হয় তা হল, আমাদের ক্যাম্পের দক্ষিণদিক বরাবর বিস্তৃত যে দানবীয় তুষারপ্রাচীরের কথা এতবার বলছি, সেটাই আসলে অন্নপূর্ণা হিমাল বা অন্নপূর্ণা পর্বতপুঞ্জ (massif)। সেই সুদর্শন ত্রিকোণ শৃঙ্গটি, যার নাম গঙ্গাপূর্ণা, তার ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; কেননা ঐ শৃঙ্গটি থেকেই বিভিন্ন দিকে আরও কতগুলি পর্বতশ্রেণী ছড়িয়ে পড়েছে যাদের একটিতে আছে অন্নপূর্ণা। তার মানে দাঁড়ায় একটাই – আমাদের পূর্ব তিলিচো পাসের ক্যাম্প থেকে দেখলে অন্নপূর্ণা ওই প্রকাণ্ড তুষারপ্রাচীরের পেছনেই কোথাও হবে।

অর্থাৎ রেবুফত আর আমি সোনার হরিণের পেছনে ছুটে মরছি। ইসস… আগে যদি জানতাম! অবশ্য ভৌগোলিক অনুসন্ধান ব্যাপারটাই এরকম; অনেক দ্বিধাদ্বন্দ্ব, ভুলচুক, প্রচুর এলোপাথাড়ি খোঁজ… আর তারপর হঠাৎ একদিন তোমার সামনে উন্মোচিত হবে সত্য… এক আবিষ্কার!

পাসের ওপর ক্যাম্পে রাত নামল, স্তব্ধ হিমশীতল রাত। পরদিন ভোরবেলা দেখা গেল আকাশ পরিষ্কার। সুযোগ পেয়ে আইজ্যাক ফের মাপজোক করতে লেগে পড়ল। পূবদিকে মানাংভোট উপত্যকার ওপারে বিরাট বিরাট কতগুলি শৃঙ্গ দেখা যাচ্ছিল, তাদের সবার মাথা ছাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে শঙ্কু আকৃতির মানাসলু, নেপালের আরেক আট-হাজারি শৃঙ্গ।

কিছুক্ষণ পরেই আকাশ মেঘলা হয়ে এল, জোর বাতাস বইতে লাগল। ক্যাম্পের সবাই তাঁবুর ভেতরেই সেঁধিয়ে রইল, আর মাঝে মাঝে দূরবীন চোখে মানাংভোটের রাস্তার দিকে দেখতে লাগল আমরা ফিরছি কিনা। তিনটে নাগাদ ফুথারকে এসে পৌঁছল, আর আইজ্যাককে আমার চিঠিটা দিল। আইজ্যাক জানত ও চিঠিতে নতুন কিছু থাকার সম্ভাবনা নেই। এখান থেকে ওই তুষারপ্রাচীরের দিকে এগিয়ে গিয়ে কোনও লাভ নেই। বরং উল্টোদিকে মুক্তিনাথ হিমালয় বরাবর যতটা সম্ভব ওপরে উঠে দেখা যেতে পারে ওই তুষারপ্রাচীরের মাথার ওপর দিয়ে অন্নপূর্ণার দেখা পাওয়া যায় কিনা। আগের দিন আইজ্যাকরা যে অবধি গেছিল, সেখান থেকে ও একটা অসাধারণ হিমবাহ দেখেছে, তার ওপর একটা সুন্দর শৃঙ্গ, বিশ হাজার ফিটের ওপর উঁচু। আইজ্যাক ঠিক করল সেটায় চড়ে দেখবে।

khe09

১২ই মে সকালে আবহাওয়া দেখা গেল চমৎকার। আইজ্যাক আর আংথারকে ভোরবেলাই বেরিয়ে পড়ল। সকাল সাতটায় ওরা আগের দিন আংথারকের তৈরি সেই স্মারক স্তূপের কাছে পৌঁছে গেল; সাড়ে আটটায় পা রাখল হিমবাহের ওপর। হিমবাহটা খুব চড়াই নয়, তবে নতুন পড়া আলগা তুষারের আস্তরণে হিমবাহের শক্ত বরফ ঢেকে আছে, তাই খুব তাড়াতাড়ি চলা সম্ভব হচ্ছিল না। ধীরে ধীরে উচ্চতা বাড়িয়ে ওরা উপস্থিত হল ক্রিভাস বা ফাটলে ভর্তি হিমবাহের একটা অংশে। ওদিকে আকাশ ফের মেঘে মেঘে ছেয়ে আসছে।

আইজ্যাকদের উদ্দেশ্য ছিল যথাসম্ভব কম সময়ে যতটা পারা যায় ওপরে ওঠা, যাতে অন্নপূর্ণার দেখা মেলে। কঠিন ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তায় পা বাড়াবার কোনও প্রয়োজন ছিল না। আইস অ্যাক্স দিয়ে বরফের ওপর ধাপ কেটে কেটে ওরা উঠতে শুরু করল। ভাগ্য ভাল যে কঠিন অংশটা খুব লম্বা ছিল না। একটু পরেই ওরা হিমবাহের ওপরের ঢালে পৌঁছে গেল আর ঘন কুয়াশার মধ্যে পা রাখল শৃঙ্গটির চূড়ায়।

কিন্তু হায়! অন্নপূর্ণা কোথায়? কুয়াশার জন্য দু’হাত দূরেও কিছু দেখা যায় না যে! নিজে ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে আছে সেই নিয়েই আইজ্যাকের মনে সন্দেহ দেখা দিল। আবহাওয়ার উন্নতির জন্য বৃথাই ওরা অপেক্ষা করতে লাগল। সাড়ে বারোটা বাজল। অল্টিমিটারে উচ্চতা দেখাচ্ছে ২০,৩০০ ফিট। দমে অবশ্য ওদের খুব একটা টান পড়েনি, যা থেকে বোঝা যায় উচ্চতার সঙ্গে আমরা ধীরে ধীরে বেশ ভালোই মানিয়ে নিচ্ছি। আইজ্যাকের জয় করা এই শৃঙ্গটিই এখন অবধি এই অভিযানের পক্ষ থেকে পৌঁছনো সর্বোচ্চ বিন্দু। আর এই প্রথম আমরা ২০,০০০ ফিটের চেয়ে উঁচু কোনও শৃঙ্গ জয় করলাম।

আবহাওয়ার কোনও উন্নতি হল না দেখে সওয়া তিনটে নাগাদ ওরা নামতে শুরু করল। তুষারপাত সত্ত্বেও যে পথে ওরা উঠেছিল তা আবছা দেখা যাচ্ছিল, নামতে বিশেষ অসুবিধে হয়নি। সাড়ে চারটে নাগাদ ক্যাম্পে পৌঁছল ওরা, আর পৌঁছে দেখল অভিযানের নেতা কিনা দিনদুপুরে তাঁবুর ভেতর স্লিপিং ব্যাগে ঢুকে ভোঁস ভোঁস করে নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে। কিন্তু কী হয়েছে তার?

এদিকে মানাংভোটে, ১১ই মে ভোরবেলা, খুব কষ্টেসৃষ্টে আমাদের চোখ খুলল। সামান্য কিছু জলখাবার খেয়ে, সংগৃহীত রেশন আর আমার চিঠি নিয়ে, ফুথারকে তিলিচো পাসের ক্যাম্পের উদ্দেশে বেরিয়ে গেল। রেবুফত, পানসি আর আমিও একটু পরেই বেরোলাম; মার্সিয়ান্দি খোলার উপত্যকা ধরে নিচের দিকে এগিয়ে চললাম, যদি অন্নপূর্ণার কোনও খোঁজ পাই। আমাদের সামনে, অনেক দূরে, মানাসলু শৃঙ্গের চূড়া দেখা যাচ্ছিল।

আমাদের উদ্দেশ্য ছিল গঙ্গাপূর্ণা থেকে এদিকে নেমে আসা পর্বতশ্রেণীটা যেখানে শেষ হয়েছে, সেই চিন্দি অবধি গিয়ে গিরিশিরাটিকে বেড় দিয়ে ঘুরে ওর পেছনে কী আছে দেখা। তবে সন্ধ্যের মধ্যেই মানাংভোটে ফিরে আসতে হবে সেটাও খেয়াল ছিল।

দুপুরবেলা চিন্দি পৌঁছে গেলাম। সেখানে চৌন্দিকিউ নদী এসে মিশেছে মার্সিয়ান্দি খোলায়। চৌন্দিকিউ-এর উজানে চেয়ে দেখলাম সেদিকে উপত্যকা ক্রমশ সরু হয়ে গিয়ে গভীর জঙ্গলাকীর্ণ এক গিরিখাতের সৃষ্টি করেছে। বুঝলাম ওদিকে এগিয়ে আর কোনও লাভ নেই। নিশ্চিত হলাম যে অন্নপূর্ণা আর যেখানেই থাক, এদিকে নয়। চিন্দির অধিবাসী বা শিকারি, যাদেরই জিজ্ঞেস করলাম, কেউই অন্নপূর্ণার কথা জানে না। মহা উৎসাহে তারা ব্যাখ্যা করতে শুরু করল যে ‘অন্নপূর্ণা’ মানে হল শস্যের দেবী… ইত্যাদি ইত্যাদি। মানাংভোটে ফিরে আসা ছাড়া কোনও গতি ছিল না। সেটাও ফিরতে হল খালিপেটে, কেননা আমাদের সঙ্গে খাবারদাবার কিছু ছিল না।

চোঙ্গোর আর সেপচিয়া শৃঙ্গের মাথায় মেঘ জমতে শুরু করল। আমাদের ছবি তুলতে দেবে না! অথচ তথ্যপ্রমাণ হিসেবে ছবি তুলে রাখাটা জরুরি। ভাবলাম, মেঘেদের কিছুটা সময় দেওয়া যাক। একটু বিশ্রাম নিই, যদি মেঘ কেটে যায়। সবাই যে যার মত আরামদায়ক কোণ খুঁজে নিয়ে বসে পড়লাম। রেবুফত তো প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়ল। পানসি আরাম করে বসে তার শেষ সিগারেটটা ধরাল। আমি পাহারাদারের মত ঠায় বসে রইলাম, মেঘ কেটে গেলেই সবাইকে ডেকে তুলব।

অবশেষে, কিছুক্ষণ পরে চোঙ্গোর আর সেপচিয়া মেঘের ভেতর থেকে উঁকি দিল। রেবুফতের ছবি তোলা সারা হলে আমরা আবার মানাংভোট ফেরার রাস্তা ধরলাম। গরমের জন্য চলতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল। পথে, যখনই কারও সঙ্গে দেখা হল, কিছু রসদ অর্থাৎ সাম্পা ইত্যাদি পাওয়া যাবে কিনা জিগ্যেস করল পানসি। কিন্তু সবার মুখেই শুধু না আর না। যখন আমাদের আস্তানা সেই গুদামঘরে ফিরলাম, তখন বিকেল গড়িয়ে গেছে।

“তাহলে? আমরা খালি হাতেই ফিরে যাচ্ছি শেষ অবধি?” রেবুফত হতাশভাবে বলল।

“এটুকু অন্তত জানা গেল যে অন্নপূর্ণা এদিকে নয়।”

“হুমমম… তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে।”

“খাবারদাবার সামান্যই আছে। যেটুকু আছে নিয়ে নাও, তারপর পানসির সঙ্গে থোরাং পাস পেরিয়ে মুক্তিনাথ হয়ে তুকুচা ফিরে যাও। ও পথে গেলে তিলিচো পাসে ওঠার চড়াইটা ভাঙতে হবে না; তাছাড়া একদিন আগে তুকুচা পৌঁছে যাবে। খালিপেটে পথ চলে ক্লান্ত হয়ে পড়বে; টাকাপয়সা যা আছে তাই দিয়ে মুক্তিনাথ থেকে ঘোড়া ভাড়া করে নিও।”

“আর তুমি?”

“আমার জন্য চিন্তা কোর না। এই একটা চকোলেটের বার নিলাম, এই জ্বালানির সাহায্যে আমি তিলিচো পাসের ক্যাম্পে পৌঁছে যাব।”

“কিন্তু সে তো অনেক লম্বা রাস্তা!”

“চিন্তা নেই। কাল সকালে ঐ ক্যাম্পে পৌঁছে যাব আমি। কাল আইজ্যাকের সঙ্গে ওই বিশাল তুষারপ্রাচীরটার দিকে এগিয়ে দেখার ইচ্ছে আছে।”

সামান্য কিছু মুখে দিয়ে আমরা আলাদা আলাদা রাস্তায় রওনা দিলাম।

এবারে রাস্তায় আমি একা। খাবার বলতে শুধু একটা চকোলেটের বার। ন’হাজার ফিট উচ্চতা থেকে উঠতে হবে ষোল হাজার ফিটেরও ওপরে। খুব হিসেব করে চলতে হবে। আমার পরিকল্পনা ছিল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এগোনোর। যেখানে সম্ভব সেখানে দৌড়ব। যতক্ষণ না আর এক পাও এগোনো অসম্ভব হয় ততক্ষণ থামব না।

এক ঘন্টা বাদে খাংসার পৌঁছলাম। এক মিনিটও সময় নষ্ট না করে মার্সিয়ান্দি খোলার উপত্যকা ধরে উজানে এগিয়ে চললাম। পায়ে চলা রাস্তার চিহ্ন ক্রমশ এদিক ওদিক ছড়িয়ে গিয়ে সরু হতে হতে হারিয়ে গেল। নদীখাত ধীরে ধীরে সংকীর্ণ হয়ে এল। চড়াই উৎরাই পেরিয়ে আমি এগিয়ে চললাম। সময় দ্রুত চলে যাচ্ছে। শক্ত মাটিতে ফুথারকে যেখানে ধাপ কেটেছিল সে জায়গাটা পেয়ে গেলাম। তারপর পড়ল নুড়িপাথরের ঢালগুলি। উঁচুনিচু ঢালগুলো পেরিয়ে অবশেষে এসে হাজির হলাম সেই জায়গাটায় যেখানে নদী পেরিয়েছিলাম।

নদীটা ফের পেরোতে হবে। এবার আর লম্ফঝম্পের কোনও প্রশ্নই ওঠে না। জুতো দুটো খুলে ঘাড়ের দু’পাশে ঝুলিয়ে নিলাম। অন্ধকার হয়ে আসছে। এই সময়ে নদীর বরফঠাণ্ডা জলে পড়ে গেলে ব্যাপারটা খুব সুবিধের হবে না। বেশ সাবধানে নামলাম নদীতে, জলের নিচের প্রতিটা পাথর পরখ করে করে পা ফেলতে লাগলাম। প্রচণ্ড স্রোত জলে। হঠাৎ পিছলে গেলাম। সামলাতে গিয়ে আরও গভীর জলে গিয়ে পড়লাম। অনেক কসরত করে শেষমেশ ওপারে গিয়ে উঠতে পারলাম। একেবারে কাকভেজা হয়ে গেছি ততক্ষণে। জামাকাপড় নিংড়ে নিয়ে জুতোদুটো উপুড় করে ঘটির মতো ভেতর থেকে জল ফেললাম। ঠাণ্ডায় কাঁপতে কাঁপতে ফের ওই ভেজা জামাকাপড়ই পরতে হল। দাঁতে দাঁতে লেগে ঠকঠক করে শব্দ হচ্ছে তখন। তিলিচো ক্যাম্প এখান থেকে আরও চারঘন্টার পথ, অথচ খুব বেশি হলে আর মাত্র এক ঘন্টা দিনের আলো থাকবে। ভাবনাচিন্তার বেশি সময় ছিল না। সময় নষ্ট না করে ফের চড়াই ভাঙা শুরু করলাম। একটা শক্ত মাটির খাড়াই ঢাল বেয়ে উঠতে গিয়ে দু’তিনবার পিছলে যেতে যেতে বাঁচলাম।

এই সময় নদীখাত থেকে একটা ঠাণ্ডা হাওয়া উঠল যা একেবারে হাড় পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিয়ে গেল। অন্ধকার হয়ে গেছে। সামনে আর কিছু দেখা যাচ্ছিল না। আর এগোনো সম্ভব নয় বুঝে একটা সুবিধেজনক ঘাসে ঢাকা জায়গা খুঁজতে শুরু করলাম যেখানে রাতটা কাটানো যায়। শেষে একটা ঝোপের মধ্যে আশ্রয় নিলাম। উইন্ডচিটারটা দিয়ে পুরো শরীরটা ঢেকে নিয়ে বসলাম। পা দুটো বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে গেছে, হাঁটুতে হাঁটুতে লেগে খটাখট আওয়াজ হচ্ছে। উইন্ডচিটারের হুডটা মাথার ওপর ভালো করে টেনে দিয়ে আমি গভীরভাবে ভাবতে বসলাম, চকোলেটের বারটা এখনই খেয়ে নেব, না কাল সকালে? শেষে খেয়েই নিলাম। আর তারপর আমার শেষ সিগারেটটা ধরালাম।

জায়গাটার উচ্চতা প্রায় ১৪,০০০ ফিট হবে। ভাবতে অদ্ভুত লাগছিল, এই বিশাল হিমালয় পর্বতের এক অজানা জায়গায়, অচেনা এক নদীর ধারে, এই অন্ধকার রাত্রে, প্রচণ্ড ঠাণ্ডায়, একা… সম্পূর্ণ একা আমি একটা ঝোপের মধ্যে বসে আছি। জামাকাপড়ের একটা সুতোও শুকনো নেই, সব ভেজা। অসম্ভব পরিশ্রান্ত, ক্লান্ত আর ক্ষুধার্ত; সঙ্গে কোনও খাবার নেই। আরও দু’হাজার ফিট চড়াই ভাঙতে হবে। পারব তো? একটা দমকা ঠাণ্ডা হাওয়া জামাকাপড়ের ফাঁকফোকর দিয়ে ঢুকে আবার আমায় কাঁপিয়ে দিয়ে গেল। আর সেই সঙ্গে শুরু হল তুষারপাত। আমি চোখ বুজলাম, শরীরের মাংশপেশিগুলিকে শিথিল করে দিলাম; তারপর মনটাকে শান্ত, সমাহিত করার চেষ্টা করতে লাগলাম।

সময় যেন আর কাটতে চায় না। নিচে প্রচণ্ড গর্জনে বয়ে চলেছে মার্সিয়ান্দি খোলা। তার আওয়াজে যেন মাটি কাঁপছে। সেই ভয়াল গর্জন সঙ্কীর্ণ গিরিখাতের দেওয়ালে দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে এক অপার্থিব পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। একেই পুরো শরীর ভেজা, তার ওপর নদীখাত থেকে উঠে আসা স্যাঁতসেঁতে জলীয় বাষ্পে আরও ঠাণ্ডা লাগছে। দাঁতে দাঁত চেপে সব সহ্য করতে লাগলাম। মাঝে মাঝে হুডের নিচ থেকে মাথা বার করে চারদিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করতে লাগলাম, আবহাওয়ার কোনও উন্নতি হচ্ছে কিনা। কোনও পরিবর্তন নেই। এরপর যদি কুয়াশা নেমে আসে তাহলে আর রাস্তাই চিনতে পারব না।

প্রায় অসাড় ও আধঘুমন্ত অবস্থায় একসময় অনুভব করলাম দিনের আলো ফুটছে। মনটা খুশি হয়ে উঠল। যাক, রাতটা তাহলে কাটিয়ে দিতে পেরেছি! চারদিক আরও কিছুটা পরিষ্কার না হলে এগোনো যাবে না। অপেক্ষা করতে লাগলাম। এই শেষের মুহূর্তগুলো যেন বিশেষ করে দীর্ঘ মনে হচ্ছিল। তর সইছিল না আর। উইন্ডচিটারটা পরে নিয়ে ফের এগোতে শুরু করলাম। খিদেয় পেট জ্বলে যাচ্ছে। তার ওপর প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। ভাবলাম চড়াই ভাঙতে শুরু করলে ঠাণ্ডাটা কেটে যাবে, শরীর গরম হয়ে উঠবে। আবহাওয়ার সামান্য উন্নতি হয়েছে। তাও একটু পরপরই রাস্তা খুঁজে বার করার জন্য থামতে হচ্ছিল। দুর্বল হাঁটুদুটো কাঁপছিল আমার, এক পাও এগোতে চাইছিল না আর। তাও জোর করে ধীরে ধীরে ওপরে উঠতে লাগলাম। পেছনদিকে দেখতে পেলাম মানাংভোট সকালের সোনালি রোদে ভেসে যাচ্ছে, কিন্তু আমার এখানে এখনও রোদ এসে পৌঁছয়নি।

প্রতিবার বিশ্রামের সময় আমি কিছুদূরে একটা সুবিধেজনক বোল্ডার আগে থাকতে বেছে রাখছিলাম যার ওপর পরের বার বসব। ধীরে ধীরে সামনের পাথরগুলির দূরত্ব কমতে লাগল, অর্থাৎ ঘন ঘন থামার দরকার হচ্ছিল, আর বিশ্রামের সময়ও সেই অনুপাতে বাড়তে থাকল। মনে সন্দেহ উঁকি দিচ্ছিল, সত্যিই ক্যাম্পে পৌঁছতে পারব তো? কোনও রকমে শরীরটাকে টেনেহিঁচড়ে সামনের ঠিক করে রাখা পাথরটা অবধি নিয়ে গিয়ে পুরো শরীর ছেড়ে দিয়ে সটান শুয়ে পড়ছিলাম। আশ্চর্য, পরমুহূর্তেই মনে হচ্ছিল শরীরটা একটু ভালো লাগছে, একটু যেন দম পাচ্ছি ফের। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেবার পর মনে হচ্ছিল, আর তো মাত্র একটু রাস্তা বাকি, এভাবে হাল ছেড়ে বসে থাকব? হেরে যাব আমি? তাই কখনও হতে পারে? আবার একটু দূরে একটা পাথর বেছে নিয়ে শরীরটা টেনে তুলে এক পা দু’পা করে এগিয়ে যাওয়া। মনে হচ্ছিল বেশ তাড়াতাড়িই এগোচ্ছি যেন, আসলে এগোচ্ছিলাম কিন্তু শামুকের গতিতে। পরের পাথরটায় পৌঁছনোমাত্র ফের ধপাস করে বসে পড়ছিলাম। এক গজ দু’গজ করে উচ্চতা বাড়ছিল। শেষে এমন একটা জায়গায় পৌঁছলাম, যেখান থেকে ক্যাম্পটা দেখা যায় না বটে, কিন্তু জানি যে সেটা আর মাত্র দু’শো গজ দূরে।

চিৎকার করার চেষ্টা করলাম, কিন্তু গলা দিয়ে কোনও আওয়াজই বেরোল না। হাঁটুদুটো এত কাঁপছিল যে হেঁটে চড়াই ভাঙা তো দূরের কথা, স্রেফ দাঁড়িয়ে থাকাই মুশকিল হয়ে পড়ল। তখন হামাগুড়ি দিয়ে এগোতে শুরু করলাম। দেখলাম চার হাত-পায়ের সাহায্যে এগোনোটা তুলনায় সহজ আর নিরাপদ। মাথাটা সীসের মত ভারী লাগছিল, ঘুম পাচ্ছিল, দু’চোখ জুড়ে নেমে আসছিল ঘুম। অবশেষে, শরীরের শেষ শক্তিবিন্দুগুলি একত্র করে পাসের ওপর পৌঁছে একটা সমতল চাতালের মতো পাথরে শরীরটাকে ধড়াস করে ফেলে দিলাম। ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুম, শান্তির ঘুম! অবশেষে শান্তি। সময় বয়ে চলল। যখন চোখ মেললাম মনে হল যেন এক শতাব্দি পেরিয়ে গেছে। মাথা তুলে দেখলাম, আরে, ওই তো ক্যাম্প দেখা যাচ্ছে! মাত্র কুড়ি গজ দূরে। আমি লোকজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করতে লাগলাম। কিন্তু কুলিরা নিজেদের মধ্যে খোশগল্পে মত্ত। একটা বড়সড় আগুন জ্বালিয়েছে ওরা, তার চারিদিকে ঘিরে বসে চলেছে ওদের আড্ডা। ইস, ওরা যদি আমায় দেখতে পেত! যদি ওদের একজনও এদিকে একবার ঘাড়টা ফেরায়! আমি দু’একটা ছোট নুড়ি তুলে নিয়ে ওদিকে ছুঁড়লাম, কেউ শুনতে পেল না। গলা দিয়ে কোনও আওয়াজ বেরোচ্ছে না, চিৎকার করার প্রশ্নই নেই। কান-মাথা সব কেমন ভোঁ ভোঁ করছে।

ভাবলাম, একবার যখন ক্যাম্পের দেখা পেয়ে গেছি, তখন ওখানে পৌঁছনো আর কেউ ঠেকাতে পারবে না। শরীরেও মনে হল একটু হলেও যেন শক্তি ফিরে পেয়েছি। দাঁতে দাঁত চেপে উঠে বসলাম। তারপর চার হাত-পায়ে হামাগুড়ি দিয়ে দিয়ে একটা জন্তুর মতো ক্যাম্পের দিকে এগিয়ে চললাম। হঠাৎ ফুথারকে ফিরে তাকাল, “বড়া সাহিব!!”

অবাক বিস্ময়ে উঠে দাঁড়াল সে। তারপর সবাই মিলে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ি কি মরি ছুটে এল আমার দিকে। বেঁচে গেলাম! আমাকে একটা এয়ার ম্যাট্রেসের ওপর শুইয়ে দিল ওরা। একটা ছোট্ট ভেজা পাখির ছানার মত আমি তখন থরথর করে কাঁপছি। সামান্য কিছু খেয়ে নিলাম প্রথমে, অল্প একটু পানীয়। শুনলাম আইজ্যাক তখনও ফেরেনি, তবে যে কোনও সময়ই ফিরবে এবার। আমি কুলীদের আমার জন্য কিছু খাবার তৈরি করতে বললাম। কুলীদের সাহায্য নিয়ে ফুথারকেই রান্না চাপাল। একটু পরেই বড় বড় ডেকচিতে খাবার ফুটতে শুরু করল, এমনই তার সুঘ্রাণ যে আমার পক্ষে আত্মসংবরণ করে বসে থাকা কষ্টকর হয়ে উঠল।

রান্না শেষ হওয়ামাত্র আমি সোজা সেই ডেকচিগুলো থেকেই খেতে শুরু করে দিলাম। এতটা ফুথারকে আশা করেনি! সে ক্যাম্পের সবার জন্য রান্না চাপিয়েছিল। প্রায় দেড়ঘন্টা ধরে, বিরামহীন ভাবে, দ্রুত গতিতে এবং স্ফূর্তির সঙ্গে আমি খেয়ে চললাম, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভোজ। খেয়ে দেয়ে পেট ফুলিয়ে শেষে ঢুকে পড়লাম স্লিপিং ব্যাগের নিশ্চিন্ত আরামের ভেতর।

ভাবছিলাম, খাবারদাবার ছাড়া সন্ধের মুখে এভাবে একলা বেরিয়ে কী মারাত্মক ভুলটাই না করেছিলাম! অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের ফলে আর একটু হলে বেঘোরে প্রাণটাই যেতে বসেছিল! আজ যদি কোনওভাবে এখানে এসে পৌঁছতে না পারতাম, তাহলে কী যে হত! কাল ১৩ই মে সকালে এরা ক্যাম্প গুটিয়ে তুকুচার পথে রওনা দিত, আমি নিজেই কিনা চিঠি লিখে ওদের নির্দেশ দিয়েছিলাম! ১৪ই বিকেলে তুকুচা পৌঁছে রেবুফতের কাছে খবর পেত যে আমি এ রাস্তায় রওনা দিয়েছিলাম। আমার খোঁজে যদি এখানে ফিরে আসত ওরা, তাহলেও সেটা ১৬ই বিকেলের আগে সম্ভব ছিল না। ততদিন কি আর আমি এই পৃথিবীতে থাকতাম?

এইসব ভাবতে ভাবতে ঘুমের দেশে তলিয়ে গেছিলাম। ঘুম ভাঙল আইজ্যাকের ডাকে।

“হ্যালো মরিস, গুড মর্নিং।”

উঠে বসলাম, “আইজ্যাক!”

“২০,০০০ ফিটের চেয়েও উঁচু একটা শৃঙ্গ জয় করে এইমাত্র ফিরলাম আমরা।”

খবর আদানপ্রদান হল। আইজ্যাক মাপজোক করে কী কী বার করেছে বলল। যা বুঝলাম, অন্নপূর্ণার খোঁজে অন্নপূর্ণা পর্বতপুঞ্জের গোটা উত্তরদিকটাই আমরা চষে ফেলেছি।

“অন্নপূর্ণার ভাণ্ডারের চাবিকাঠি এই বিশাল তুষারপ্রাচীরের উত্তরে নেই, সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত,” বললাম আমি, “আমাদের দক্ষিণদিকেই যেতে হবে; কোজি, অডট আর শ্যাজ ২৭শে এপ্রিল মিরিস্তি খোলা ধরে যে রাস্তায় গেছিল সে দিক দিয়ে।”

“তাহলে এখানে বসে থেকে আর কিছু করার নেই আমাদের,” আইজ্যাক বলল, “যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তুকুচায় ফিরে যেতে হবে।”

KhelaAnnapurna07 (Medium)

যে সব অঞ্চলে ভৌগোলিক অনুসন্ধান চালিয়েছে অন্নপূর্ণা অভিযান। স্কেচম্যাপঃ মার্সেল আইজ্যাক

পরদিন তুকুচার উদ্দেশে রওনা দিলাম আমরা। এ জায়গা ছাড়তে পেরে কুলিরা খুব খুশি। বাইরের জগৎ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে তিন দিন ধরে ওরা এখানে বসে আছে, তেমন কিছু কাজও নেই কারও। ওদের তাড়া লাগাবার কোনও দরকারই পড়ল না তাই, এমনকি পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবারও প্রয়োজন হল না। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তাঁবু গোটানো, মালপত্র বাঁধাছাঁদা সব হয়ে গেল। আমি আর আইজ্যাক যখন গল্প করতে করতে তৈরি হচ্ছি, আংথারকের তত্ত্বাবধানে কুলিরা তখন সব সারি বেঁধে রওনা দিয়ে দিয়েছে। আংথারকে সোজা ওদের বরফজমা তিলিচো হ্রদের বুকের ওপর দিয়ে নিয়ে গেল। এইবারে কুলিরা টুঁ শব্দটিও করল না, বিনা বাক্যব্যয়ে সোজা হেঁটে হ্রদ পেরিয়ে ওপারে চলে গেল।

এই তিনদিনে পশ্চিম তিলিচো পাসের ওপরের বরফ কিছুটা গলে গেছে। পাসের ওপর পৌঁছে কিছুক্ষণ দাঁড়ালাম আমরা। পেছন ফিরে চেয়ে দেখলাম সেই চিরতুষারের রাজ্যের দিকে, সেই সুবিশাল দুধসাদা বরফজমা তিলিচো হ্রদ, দক্ষিণের সেই দানবীয় তুষারপ্রাচীর… জীবনে আর কোনওদিন হয়তো এখানে আসা হবে না!

এরপর হুড়মুড় করে নামার পালা। ট্রি লাইনে পৌঁছে গেলাম; দেওদার গাছের এক অসাধারণ অরণ্যের মধ্যে দিয়ে রাস্তা। জোরালো হাওয়া দিচ্ছে, তবে হাওয়াটা আমাদের পেছন থেকে আসছে, তাই চলতে সুবিধেই হচ্ছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনিগাঁও পৌঁছে গেলাম।

পরদিন সকালে মারফা হয়ে তুকুচা ফিরে চললাম। ঘটনাবহুল ও কর্মক্লান্ত ছ’দিনের পর তুকুচার বেস ক্যাম্পে ফিরতে সবারই বেশ ভালো লাগছিল। যখন ক্যাম্পের কাছাকাছি পৌঁছে গেছি, অডট আমাদের দেখতে পেয়ে এগিয়ে এল।

“কী ডাক্তারবাবু, খবর আছে কোনও?”

“সবাই বেস ক্যাম্পে এখন। প্রত্যেকেই সুস্থ, এক্কেবারে ফিট। তোমাদের কী খবর?”

“রেবুফত ফিরেছে?”

“হ্যাঁ, গতকাল ফিরেছে ক্যাম্পে।”

“বেশ। আজ ১৪ই মে। আমাদের খুব তাড়াতাড়ি আগামী কর্মপন্থা ঠিক করতে হবে। আজ বিকেলে জরুরি মিটিং-এ বসব সবাই।”

এদিকে আমরা যে ক’দিন ছিলাম না তখন ধৌলাগিরিতে কী কী হচ্ছিল? গত সোমবার, ৮ই মে বিকেলে ধৌলাগিরির পূর্ব হিমবাহের ক্যাম্প থেকে নোয়েল প্রায় দৌড়তে দৌড়তে এল; প্রচণ্ড উত্তেজিত। বলল, ও যখন এক শেরপার সঙ্গে হিমবাহ ধরে নামছিল, তখন কোজি আর শ্যাজকে একটা নালার মতো প্রচণ্ড খাড়াই বরফের ঢালে উঠে যেতে দেখেছে। ওরা যদি ওই রাস্তায় সফল হয় তাহলে পূর্ব হিমবাহের ওপরের দিকের ঝুলন্ত বরফের চাঁইভর্তি বিপজ্জনক জায়গাটা আমরা এড়িয়ে যেতে পারব। আসলে এই নতুন রাস্তাটাও ওই আগের রাস্তার মতোই কঠিন আর বিপজ্জনক, এ পথে পদে পদে তুষারধ্বস নামার সম্ভাবনা। মাথা তুলে তাকালেই দেখা যাবে প্রায় ১৫০০ ফিট ওপরে নীল বরফের বিশাল বিশাল চাঙড় ঝুলে আছে, যে কোনও মুহূর্তে ভেঙে পড়ার অপেক্ষায়। ঠিক যখন নোয়েল ওপরে তাকিয়ে কোজি আর শ্যাজের কেরদানি দেখছিল, একটা বিশাল বরফের চাঁই খসে পড়ল, আর টন টন বরফ দুরন্ত গতিতে ভীম গর্জনে সেই নালা বেয়ে নেমে এসে নোয়েলের ঠিক পাশে পূর্ব হিমবাহের চাতালের ওপর পড়ে ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে গেল।

“অথচ কী দুর্ভাগ্য দেখো, ক্যামেরাটা বার করারই সুযোগ পেলাম না!” নোয়েল বলল।

কোজি আর শ্যাজ অবশ্য এগিয়ে চলল। এসব ছোটখাটো ব্যাপার ওদের দমিয়ে রাখতে পারে না! কিন্তু ওই নালা থেকে বেরিয়ে এসে পাশের পাথুরে ঢালে ওরা চেষ্টা করেও পা রাখতে পারল না। বহুক্ষণ লেগে ছিল ওরা, তবে বারো গজের বেশি এগোতে পারেনি; পাথুরে ঢালটা প্রচণ্ড পেছল আর একেবারেই নিরাপদ নয়। শ্যাজের একটাই সান্ত্বনা, হিমালয়ের বুকে ১৬,০০০ ফিটের ওপরে সে প্রথম রক পিটন গেঁথে আসতে পেরেছে সেদিন। সমস্তরকম উপায়ে চেষ্টা করে দেখার পর ওরা হাল ছেড়ে দেয়, আর ন’তারিখে নিচে নেমে আসে।

এরপর ছিল অডট আর টেরের পালা। যাওয়ার সময় ওদের দেখা হল কোজি আর শ্যাজের দলের শেরপাদের সঙ্গে; বিমর্ষবদনে নেমে আসছিল ওরা; তবে তাতে অডট আর টেরে দমবার পাত্র নয়। ওরা পূর্ব হিমবাহের ডান তীরে (true right bank) প্রায় ১৬,৫০০ ফিট উচ্চতায় একটা বিশাল খাড়া পাথরের দেওয়ালের নিচে তাঁবু ফেলল। রাতের বেলা একটা পাথর ওদের তাঁবুর সামনে দিয়ে ঢুকে দিব্যি পেছন দিয়ে বেরিয়ে গেল।

১১ তারিখ অডট আর টেরে খুব ভোরবেলা রওনা দিল, ভোর তিনটের সময়, যাতে হাতে সারাদিনটা পাওয়া যায়। ক্র্যাম্পন পায়ে বেঁধে এগিয়ে চলল ওরা, আর অনেক কষ্টে সেই বিশাল বরফের দেওয়ালটার নিচে পৌঁছল যেটা বেয়ে প্রথমবার আমি, ল্যাচেনাল আর রেবুফত উঠেছিলাম। কোজি আর শ্যাজ এই কঠিন সবুজ বরফের ঢালটারই বাঁদিকে একটা নালার মত জায়গা বেয়ে ওঠার চেষ্টা করেছিল। বরফের দেওয়ালটার বেশ খানিকটা অংশে ধাপ কেটে রাখাই ছিল, কিন্তু এখানে, ওই দেওয়াল বেয়ে না উঠে অডট ও টেরে হিমবাহটা পেরিয়ে তার বাঁ তীরে চলে এল। ধাপ কেটে কেটে এগিয়ে প্রচুর পরিশ্রমের পর তারা আগের অনুসন্ধান দলগুলি যে উচ্চতা অবধি পৌঁছতে পেরেছিল মোটামুটি সেই উচ্চতায় পৌঁছে গেল। হঠাৎ ওরা একটা সম্ভাব্য রুট আবিষ্কার করল যেটা আগের দলগুলোর পক্ষে দেখতে পাওয়া সম্ভব ছিল না। এই রাস্তায় এগিয়ে তারা বেশ কিছুটা তুষারধ্বসপ্রবণ বিপজ্জনক এলাকা এড়িয়ে যেতে পারল। যথেষ্ট ঝুঁকি নিয়ে ধীরে ধীরে উচ্চতা বাড়িয়ে অবশেষে সেই আইস ফল বা হিমানী প্রপাতটার ওপরে পৌঁছে গেল ওরা। পৌঁছে গেল পূর্ব হিমবাহের ওপরের ঢালে, যেখানে ঢালটার চড়াই অনেকটা সহজ হয়ে এসেছে।

সেখানে পৌঁছে কী দেখল তারা? দেখল ওদের সামনে মাকড়শার জালের মত ফাটলে ফাটলে কণ্টকিত এক বিশাল তুষারক্ষেত্র। সেই ক্রিভাসের জালের মধ্য দিয়ে এগোনোর কোনও রাস্তা নেই। ডানদিকে তুষারক্ষেত্রটা ফের খাড়া চড়াই উঠে গিয়ে মিশেছে ধৌলাগিরির উত্তরপূর্ব গিরিশিরার সঙ্গে। ঝকঝক করছে সেই উত্তরপূর্ব গিরিশিরা, অলঙ্ঘ্য, অপরাজেয়। এদিক থেকে ওর ওপর ওঠার কোনও রাস্তা নেই।

অডট আর টেরে সুবিবেচকের মতোই হিসেব করে দেখল, এ রাস্তায় বাধাবিপত্তি আর বিপদের ঝুঁকি বড্ড বেশি। আর এগিয়ে কী হবে, যদি বাধ্য হয়ে ফিরেই আসতে হয়? ধৌলাগিরির শৃঙ্গে ওঠার চাবিকাঠি এই পূর্ব হিমবাহের পথে নেই। আর, অন্য কোনও রুট যদি না থাকে, তাহলে এই পর্বত অপরাজেয়ই থেকে যাবে। পূর্ব হিমবাহের রাস্তা নিয়ে আমাদের মনে অনেক রঙিন স্বপ্ন ছিল, এভাবে তা বাস্তবের রুক্ষ জমিতে আছড়ে পড়ল। অডট আর টেরে ভালমতোই জানত, ওরা ব্যর্থ হলে আমরা সবাই কী পরিমাণ নিরাশ হব, তাও শেষমেশ ফিরে আসাই মনস্থ করল। সেদিন সন্ধেবেলা ক্লান্ত পায়ে ওরা ফিরে এল পূর্ব হিমবাহের নিচের বেস ক্যাম্পে, আর তার পরদিন তুকুচায়।

অভিযানের সম্পূর্ণ শক্তি যদি আমরা ধৌলাগিরির পেছনে নিয়োগ করি, তাহলে সেটা বড্ড বেশি ঝুঁকির হয়ে যাবে; ও রাস্তা বড়ই অনিশ্চয়তায় ভরা, পদে পদে দুর্ঘটনার আশঙ্কা। পক্ষে-বিপক্ষে সমস্ত যুক্তি বিশদভাবে, খুব যত্ন করে বিচার করে তবেই ও রাস্তায় আমাদের পা বাড়ানো উচিত। এদিকে ধৌলাগিরি, আর ওদিকে অন্নপূর্ণা, আসলে পুরো ব্যাপারটা নিয়েই আমাদের একেবারে নতুন করে, বাস্তবসম্মতভাবে ভাবতে হবে।

১৪ই মে বিকেলে, তুকুচার বেস ক্যাম্পের মেস টেন্ট বা রান্না করার তাঁবুতে, অভিযানের সমস্ত সদস্য একত্রিত হল, বিশেষ এক জরুরি মিটিং-এর জন্য। এবারে আমাদের যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে!

(এরপর আগামী সংখ্যায়)

আগের এপিসোডগুলো একত্রে