গল্প ঘনশ্যামবাবুর পরোপকার অদিতি ভট্টাচার্য শরৎ ২০১৭

অদিতি ভট্টাচার্য   র সব লেখা একত্রে 

ঘনশ্যামবাবুকে মনে আছে তো? সেই যে লটারিতে পাওয়া টাকায় আবাসিক বিদ্যালয়ের ছাত্রদের খাইয়েছিলেন? খাওয়ানোর কথা ছিল প্রতিবেশীদের, কিন্তু তাঁরা টিভিতে ক্রিকেট খেলা দেখতে দেখতে সে কথা বেমালুম ভুলে গেছিলেন। ঘনশ্যামবাবু আর কী করেন? অত খাবারদাবার নষ্ট হবে? তাই সেসব নিয়ে সোজা চলে গেলেন সেই ইস্কুলে। সেটা আবার খবরের কাগজে জানাতেও ভোলেননি। ফলে পরের দিন কাগজে ওঁর ফটোসহ এই খবরটা প্রকাশিত হল। মা’র মৃত্যুদিনে ঘনশ্যামবাবুর মহানুভবতার কথা। কিন্তু ওঁর মা মোটেই আগস্ট মাসে মারা যাননি, এই কথাটা বলতে ঘনশ্যামবাবু তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে বলেছিলেন, “দিনক্ষণ নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন কেন? মা যে মারা গেছেন সেটা তো সত্যি। তাছাড়া আমার উদ্দেশ্য কত মহৎ সেটা দেখুন।”

এই হচ্ছেন ঘনশ্যামবাবু। পাড়ার সবাই তাঁর স্বভাবের সঙ্গে বিলক্ষণ পরিচিত আছেন। কেউ বিশেষ ঘাঁটানও না তাঁকে। আগুপিছু কিছু না ভেবে যা দুমদাম করে কথা বলেন, কাজ করেন!

তাই যখন সম্পূর্ণ এক অপরিচিত ভদ্রলোককে নিয়ে ঘনশ্যামবাবু তাঁর প্রতিবেশী অখিলেশবাবুর বাড়িতে উপস্থিত হলেন তখন অখিলেশবাবু একটু সন্ত্রস্তই হলেন। ঘনশ্যামবাবু কখন কী করেন, কী বলেন কিচ্ছু বলা যায় না। ওঁর জন্যে কম অপ্রস্তুতে পড়তে হয়নি সবাইকে, মনোমালিন্যের সৃষ্টি অবধি হয়েছে। তা সে যাই হোক, বাড়িতে এসেছেন, মনের ভাব গোপন রেখেই অখিলেশবাবুকে হাসিমুখে আপ্যায়ন করতে হল।

অপরিচিত ভদ্রলোকের নাম প্রতুল বিশ্বাস। ঘনশ্যামবাবুই বললেন, আলাপও করিয়ে দিলেন।

“প্রতুলবাবুও এই শহরেরই বাসিন্দা। আমাদের পাড়ার নন অবশ্য। আমার সঙ্গে আলাপ হাঁটতে গিয়ে। রোজ ভোরে রেলের মাঠে গিয়ে দু’চক্কর লাগাই, তা জানেন তো? একদিন দেখি ইনিও হাঁটছেন। তারপর প্রায়শই দেখা হতে লাগল, দেখতে দেখতে একদিন আলাপও হয়ে গেল।”

“তা তো হবেই। ভালোই তো, আলাপ পরিচয় হওয়া তো ভালোই,” অখিলেশবাবু বললেন।

“অবশ্যই ভালো,” ঘনশ্যামবাবু কথাটা যেন একেবারে লুফে নিলেন, “আলাপ হল বলেই না উনি ওঁর সমস্যার কথাটা আমাকে বলতে পারলেন। আমি তো শুনেইছি, তবুও আপনার কাছে এলাম, আপনিও একটা পরামর্শ দিন। তিনজনে মিলে আলাপ-আলোচনা করলে একটা রাস্তা ঠিক বেরিয়ে যাবে, তাই না?”

অখিলেশবাবু মনে মনে প্রমাদ গুনলেন। ঘনশ্যামবাবু মুখে যতই ‘তিনজনে মিলে আলাপ-আলোচনা’র কথা বলুন, কার্যক্ষেত্রে উনি আজব এক পরামর্শ দেবেন। সেটা প্রতুলবাবু মানলে মানুন, কিন্তু তার সঙ্গে অখিলেশবাবুর নাম জুড়ে গেলেই মুশকিল। আবার না অপদস্থ হতে হয়।

“সমস্যা? মানে, আমি তো কিছুই জানি না। তাছাড়া আমি মানে, আমি আবার কী পরামর্শ দেব?” অখিলেশবাবু আমতা আমতা করে বললেন।

“আহা, আগে শুনুনই না। আপনাকে সব খুলে বলব বলেই তো এসেছি। আমিই বলি তাহলে,” ঘনশ্যামবাবু প্রতুলবাবুর দিকে তাকালেন।

প্রতুলবাবু সম্মতি জানালেন।

“কী হয়েছে জানেন, প্রতুলবাবু অনেকদিন আগে এক ভদ্রলোকের কাছ থেকে একটা বই এনেছিলেন পড়বেন বলে। পড়েওছিলেন কিছুটা, তারপর ভুলেও গেছিলেন। বইটা ওঁর কাছেই পড়ে আছে…”

“এটা আবার কোনও সমস্যা নাকি? বইটা গিয়ে ফেরত দিয়ে দিন, তাহলেই হয়ে গেল,” অখিলেশবাবু বলে উঠলেন। কোনওমতে ঘনশ্যামবাবুর হাত থেকে ছাড়া পেলে বাঁচেন। “যে ভদ্রলোকের বই তিনিও কি ভুলে গেছেন? বইটা ফেরত চাইছেন না?”

“আপনি শুনুন তো আগে পুরোটা। যাঁর বই তিনিও ভুলেই গেছিলেন বোধহয়, তাঁর বেশ বয়স হয়েছিল। তারপর যা হল তাতে তো তিনি ভোলাভুলির উর্দ্ধেই চলে গেলেন,” বললেন ঘনশ্যামবাবু।

“মানে?”

“মানে দুম করে তিনি মারা গেলেন। ব্যস, বইয়ের কথা আর কে বলবে? প্রতুলবাবু তো বেমালুম ভুলেই গেছিলেন। মনে পড়েছে এই ক’দিন আগে। আর মনে পড়ার পর থেকেই খুব গ্লানিতে ভুগছেন। কারুর জিনিস নিয়ে এভাবে ভুলে যাওয়া তো আর ঠিক নয়। তার ওপর আবার বই বলে কথা!”

“তা ওঁর বাড়িতে গিয়ে ফেরত দিয়ে আসুন না। কেউ তো নিশ্চয়ই আছে। ওঁর স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে – কেউ না কেউ তো থাকবেই বাড়িতে। তাদেরই কাউকে গিয়ে দিয়ে আসুন না,” অখিলেশবাবু সমাধান বাতলালেন।

“সেইখানেই তো মুশকিল। ওঁর মেয়ে পুনে না চেন্নাই কোথায় যেন থাকে। ভদ্রলোকের কাজকর্ম মিটতেই মাকে নিয়ে নিজের কাছে চলে গেছে। এদিকে দালাল লাগিয়েছে বাড়িটা বিক্রি করার জন্যে।”

“তাহলে আর কী করা যাবে? এতদিন যখন ও বই প্রতুলবাবুর কাছেই ছিল, এখনও নাহয় থাক।”

“না না, তা হয় না, এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে। আমার মাথায় একটা কথা ঘুরছে জানেন?”

অখিলেশবাবু ঠিক এই ভয়টাই পাচ্ছিলেন। এই ‘কথা’টা যে অতি অদ্ভুত কিছু হবে তা বলাই বাহুল্য।

“আজ ভোরে হেঁটে ফিরছিলাম প্রতুলবাবু আর আমি। হঠাৎ দেখি প্রতুলবাবু বললেন, ‘আশ্চর্য!’ অবাক হয়ে দেখি কিছু দেখছেন উনি। কী জিজ্ঞেস করতে আঙুল দিয়ে দেখালেন। সেদিকে তাকিয়ে দেখি একটা টোটো দাঁড়িয়ে। কার টোটো জানেন? আমাদের সুভাষবাবুর। আরে শংকরের বাবা, বুঝতে পেরেছেন তো?”

“বুঝব না কেন? শংকর স্টোর্সের শংকর তো? জানি জানি। সুভাষবাবু একখানা টোটো কিনেছেন, নিজেই চালাচ্ছেন। দেখা হয়েছিল একদিন, বললেন, ‘রিটায়ার করে গেছি, আমাদের পেনশনও নেই। ছেলেটার দোকান আপনাদের পাঁচজনের আশীর্বাদে ভালোই চলছে। তাও নিজে একটা কিছু করা ভালো, তাই কিনেই ফেললাম। পরিশ্রম নেই তো তেমন।’ কিন্তু সুভাষবাবুর টোটো দেখে প্রতুলবাবুর আশ্চর্য হওয়ার কী হল? এরকম টোটো তো কতই চলছে রাস্তায়,” অখিলেশবাবু বললেন। ব্যাপার যে কোনদিকে যাচ্ছে তা কিছুই বুঝতে পারছেন না।

প্রতুলবাবু এতক্ষণ একটা কথাও বলেননি। চুপ করে বসেছিলেন। যা বলার ঘনশ্যামবাবুই বলছিলেন, কিন্তু এবার বললেন।

“টোটো দেখে অবাক হইনি মশাই। অবাক হয়েছি আপনাদের ওই সুভাষবাবুকে দেখে। মন্মথবাবু, মানে যাঁর কাছ থেকে আমি বইটা এনেছিলাম তাঁর সঙ্গে মুখের অদ্ভুত মিল! বিশ্বাস হয় না! যেন বছর দশ-পনেরো আগের মন্মথবাবু! অনেক কাল থেকে দেখছি মন্মথবাবুকে। আমার ভুল হয় কখনও?”

“সেও নাহয় হল। এরকম মিল অনেক সময় দেখা যায়। কিন্তু তার সঙ্গে আপনার সমস্যার কী সম্পর্ক?” অখিলেশবাবু কিছুই বুঝতে পারছেন না।

“আহা, বুঝতে পারলেন না?” ঘনশ্যামবাবু আবার বলতে শুরু করলেন, “প্রতুলবাবুর ইচ্ছে বইটা ফেরত দেওয়ার মানে মন্মথবাবুকেই দেওয়ার। কিন্তু সেটা তো আর সম্ভব নয়। তাই আমি বলেছি যে বইটা সুভাষবাবুকেই দিয়ে দিতে আর ভাবতে যে ওটা উনি মন্মথবাবুকেই ফেরত দিয়েছেন। প্রতুলবাবুর অশান্তিও তাহলে দূর হবে। ভালো বলিনি?”

শুনে কিছুক্ষণ আর বাক্যস্ফূর্তি হল না অখিলেশবাবুর। তারপর অতি কষ্টে বললেন, “সে আবার কী? তা কী করে হয়? আমাদের সুভাষবাবুর সঙ্গে মন্মথবাবুর মুখের মিল থাকাটা নেহাতই কাকতালীয়। তাছাড়া ওঁকে হঠাৎ করে একটা বই দিতে গেলে, তাও আবার এই কারণে, উনিই বা কী ভাববেন?”

“কিন্তু এছাড়া তো আর কিছু করার নেই। মানুষের জীবনের কথা কিছুই বলা যায় না। আমাদেরও তো বয়স হয়েছে। কখন কী হয় তার ঠিক নেই। এই দেখুন না, মন্মথবাবুই কীরকম দুম করে চলে গেলেন! সেরকম হঠাৎ করে যদি প্রতুলবাবুরই কিছু হয়ে যায় তাহলে আমাদেরই কি খারাপ লাগবে না যে ভদ্রলোকের একটা উপকারও করতে পারলাম না! ভেবে দেখুন। তাছাড়া প্রতুলবাবুও তো একটা অশান্তি নিয়ে যাবেন, ওঁর আত্মার শান্তি হবে না। সেটাও কি ঠিক?” ঘনশ্যামবাবু দমবার পাত্র নন।

অখিলেশবাবু আড়চোখে তাকিয়ে দেখলেন প্রতুলবাবুর মুখটা একেবারে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। আশ্চর্য আর কী? জ্যান্ত প্রতুলবাবুর সামনেই ঘনশ্যামবাবু ওঁর আত্মার শান্তি অশান্তি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছেন!

“তাই আমি ঠিক করেছি বইখানা সুভাষবাবুকেই দিয়ে দেব। মানে প্রতুলবাবু দেবেন, নিজের হাতে দেবেন, দিয়ে নিশ্চিন্ত হবেন। দেখবেন বইটা? সঙ্গে আছে। বার করুন তো প্রতুলবাবু।”

অখিলেশবাবু বেশ বুঝতে পারছেন ব্যাপার হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। ঘনশ্যামবাবুর মাথায় যা এসেছেন তা উনি করেই ছাড়বেন। আর প্রতুলবাবু বাকশক্তিরহিত তো বটেই, চিন্তাভাবনাও কিছু করতে পারছেন কি না সন্দেহ। উনি কম্পিত হাতে সঙ্গের ব্যাগটার ভেতর থেকে বইটা বার করলেন। বেশ ছেঁড়াখোঁড়া বই, স্বচ্ছ একটা পলিব্যাগে পোরা। এক ঝলক দেখে অখিলেশবাবুর মনে হল বইটার সামনে পেছনের বেশ কিছু পাতাই নেই। সেই বই নিয়ে এত কাণ্ড! কী বলবেন ভাবছিলেন, এমন সময় মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। ওঁর এক পুরনো বন্ধুর।

“ফোন এসেছে, আমার বন্ধুর…,” অখিলেশবাবু কথা খুঁজে পেলেন।

“আপনি কথা বলুন, কথা বলুন। আমরা উঠি, কাজটাও সেরে ফেলি। এসব কাজ ফেলে রাখতে নেই। দেখি সুভাষবাবুকে পাই নাকি, টোটো নিয়ে তো নানান দিকে যান,” ঘনশ্যামবাবু উঠে পড়লেন। চলেও গেলেন প্রতুলবাবুকে সঙ্গে নিয়ে।

অখিলেশবাবু ভাবলেন, ভাগ্যিস ফোনটা এসেছিল। নাহলে আমাকেও পাকড়ে নিয়ে যেতেন! সে এক কেলেঙ্কারি হত। আর আমি কোনও পরামর্শও তো দিইনি। যা করেছেন ঘনশ্যামবাবু নিজের বুদ্ধিতে করেছেন।

পরের দিন অখিলেশবাবু ভোরবেলায় সবে ঘুম থেকে উঠেছেন, দরজার ঘন্টি বাজল। খুলে দেখেন সুভাষবাবু। ওঁকে এই ভোরে দেখেই অখিলেশবাবু বুঝলেন ঘনশ্যামবাবুর কাজ সারা হয়ে গেছে। যা পরোপকারের ভূত মাথায় ঢুকেছিল! সুভাষবাবুর মুখচোখও কেমন যেন। মনে হচ্ছে সারারাত নিদ্রাহীনই কেটেছে।

“কী হয়েছে বলুন তো? এত সকাল সকাল এভাবে?” যথাসাধ্য স্বাভাবিকভেবেই জিজ্ঞেস করলেন অখিলেশবাবু।

“খুব বিপদে পড়েছি, বাঁচান দাদা। কারুর কিছুতে থাকি না, খেটে খাই, আমার সঙ্গে এ কী শত্রুতা!” সুভাষবাবু বলতে গেলে প্রায় ডুকরে উঠলেন।

“কী হয়েছে বলবেন তো? বসুন আগে, বসুন,” অখিলেশবাবু বললেন।

ঘনশ্যামবাবু যে কিছু গোলমাল করেছেন তা ভালোই বুঝতে পারলেন। কিন্তু মনে হচ্ছে তো ওঁকেও জড়িয়েছেন। নাহলে এই সাতসকালে সুভাষবাবু এলেন কেন?

সুভাষবাবু চেয়ারে বসে একটু সামলালেন। তারপর বললেন, “কাল সন্ধেবেলার ঘটনা এটা। ক’টা হবে? সাতটা বোধহয়। বাজারের কাছে সওয়ারি নামাচ্ছি। আরও তিনজন দাঁড়িয়ে, উঠবে। তাদের নার্সিং-হোমে নিয়ে যেতে হবে, এমারজেন্সি। এমন সময় দেখি ঘনশ্যামবাবু হনহন করে এলেন। সঙ্গে আরও একজন ভদ্রলোক। এসেই বললেন, ‘ইনি এই বইটা আপনাকে দিতে চান, এটা রাখুন।’ আমি কিছু বলার আগেই ওই ভদ্রলোক আমার হাতে একটা বই ধরিয়ে দিলেন। বই! বই কেন? আমি এত অবাক হয়ে গেছিলাম যে এর বেশি আর কিছু বলতেই পারিনি।

“আরে বই, বই। খারাপ কিছু নয়, রাখুন রাখুন। আসলে যাঁর বই সে ভদ্রলোক মারা গেছেন। তাই এটা আপনাকে দিচ্ছেন ইনি,’ ঘনশ্যামবাবু আবার বললেন।

“বলে ওনারা যেরকম এসেছিলেন সেরকমই হনহন করে চলেও গেলেন। এদিকে যারা নার্সিং-হোমে যাবে তারাও তাড়া দিচ্ছে। তাই আমি আর কিছু বলার বা কিছু করার সময়ই পেলাম না। গতকাল বলতে নেই খুব ভালো ভাড়া হচ্ছিল। একটুও বসার সময় পাইনি। বইটার কথা ভুলেই গেছিলাম। মনে পড়ল সেই এগারোটার সময়, বাড়ি ফিরে তখন সবে খেতে বসেছি।”

“তাহলে ঘনশ্যামবাবুর কাছেই যান। আমি আর কী করব?” অখিলেশবাবু কাটানোর চেষ্টা করলেন।

“ঘনশ্যামবাবু বললেন আপনিও জানেন সব। তাই এলাম। কী ব্যাপার বলুন তো?”

“কিচ্ছু জানি না ভাই, কিচ্ছু জানি না। ঘনশ্যামবাবু আর ওই ভদ্রলোকের খেয়াল হয়েছে বইটা আপনাকে দেবেন। এসব ঘনশ্যামবাবুর মাথাতেই এসেছে। আমি এসবের মধ্যে নেই,” অখিলেশবাবুর গা পিত্তি জ্বলে গেল।

একখানা লোক বটে ঘনশ্যামবাবু! কিছু গণ্ডগোল না পাকালে যেন শান্তি পান না।

“বইটার কথা বাড়িতে সবাইকে বললাম। শুনে শংকরের মা দেখি কপাল চাপড়াতে লাগল। কী বলল জানেন?”

“কী বললেন?”

“বলল খুব খারাপ ব্যাপার। ওই যে ভদ্রলোক মারা গেছেন সে এই বইয়ের জন্যেই নয়তো? ওই জন্যেই বইটা কেউ ফেরত চায়নি। আর ঘনশ্যামবাবুর সঙ্গের ভদ্রলোকই বা বইটা রাখতে চাইছেন না কেন? নিশ্চয়ই খারাপ কিছু আছে। শংকরের মা বলল, এসব তুক-তাক, মন্ত্রতন্ত্রের ব্যাপার হতে পারে। ও আবার এসব খুব মানে কিনা। এখন এটাকে নিয়ে আমি যে করি!”

“যা খুশি করুন। ফেলে দিন, দিয়ে দিন, যা খুশি। আপনার স্ত্রী কিছু বলেননি?”

অখিলেশবাবু বুঝলেন, ব্যাপার খুব ঘোরালো হয়ে যাচ্ছে। এর থেকে যত দূরে থাকা যায় ততই ভালো। হাজার হোক ঘনশ্যামবাবুর কীর্তি। ঘোরালো না হয়ে যায় কোথায়?

“ফেলে দিলে হবে না। শংকরের মা বলল, আবার কাউকে দিয়ে দিতে হবে। নাহলে আমাদেরই অমঙ্গল হবে। কাকে দিই এখন?” সুভাষবাবুকে বেশ চিন্তিত দেখাল।

“আমাকে নিশ্চয়ই নয়? মানে আমাকে দিতেই আসেননি তো?” অখিলেশবাবু আঁতকে উঠে বললেন।

ওঁর এখন মনে হচ্ছে সুভাষবাবু খুব একটা ভুল কিছু বলেননি বোধহয়। প্রতুলবাবু একটা বই একজনের কাছ থেকে নিয়ে এসে একেবারে ভুলেই গেলেন। যাঁর বই তাঁরও মনে রইল না। আবার এতদিন বাদে ফেরত দেওয়ার জন্যে হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে পড়লেন! হতেই পারে গোলমেলে কিছু।

“এ কী বলছেন?” সুভাষবাবু একেবারে হাঁ হাঁ করে উঠলেন, “আপনি, বৌদি আমার টোটোয় কত চড়েন, এতদিন থেকে চিনি আপনাকে। আপনাদের কোনও ক্ষতি হোক এ কখনও আমি চাইতে পারি? দেখি কী করা যায়।”

সুভাষবাবু চলে গেলেন। অখিলেশবাবুরও ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল।

মাস তিনেক কেটে গেল। এর মধ্যে অখিলেশবাবু সুভাষবাবুকে আর ওই বইয়ের কথা জিজ্ঞেসও করেননি। ওঁর টোটোতে চড়লেও নয়। সুভাষবাবুও নিজে থেকে কিছু বলেননি। বোঝাই যায়, কেউই আর ও প্রসঙ্গ উত্থাপন করতে চান না। আর ঘনশ্যামবাবুকে তো তারপর থেকে বেশ এড়িয়েই চলেন অখিলেশবাবু। বলা যায় না আবার কীসে জড়িয়ে পড়েন।

রবিবারের সকাল। অখিলেশবাবুর মন বেশ প্রসন্ন। আজ চিংড়িগুলো খুব ভালো পেয়েছেন। সাইজও বেশ বড়ো, পকেটের পক্ষেও তেমন কষ্টকর নয়। বাজার করে ফিরছেন, এমন সময় কে যেন ডাকল পেছন থেকে, “অখিলেশদা।”

ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন রঞ্জন, রঞ্জন পাকড়াশি। অনেক কাল বাদে দেখা। অখিলেশবাবু দাঁড়িয়ে পড়লেন।

“আরে রঞ্জন যে! অনেকদিন পরে দেখলাম। তারপর সব খবরাখবর বল।”

“এই তো চলে যাচ্ছে। আপনি, বৌদি কেমন আছেন? দেখতে দেখতে কীরকম দিন কেটে যায় দেখুন! আগামীকাল রিটায়ার করছি, জানেন তো?”

“বল কী! তোমারও সময় হয়ে গেল! সত্যি, কোথা দিয়ে যে দিন কেটে যায় বোঝা যায় না। তা এখন পোস্টিং কোথায় তোমার?”

“শেষ পোস্টিংটা বাড়ির কাছেই হয়েছিল, বুঝলেন। রথতলার লাইব্রেরিটা অনেক বড়ো করা হল না? ওখানেই বদলি হয়ে এসেছি। ওখান থেকেই রিটায়ার করছি। এর মধ্যে একখানা অদ্ভুত ব্যাপার হয়েছে, জানেন তো?”

রঞ্জনবাবু কথাটা সবে শেষ করেছেন, এমন সময় ঘনশ্যামবাবু উপস্থিত সেখানে। “কী ব্যাপার মশাই, কতদিন আপনার দেখাসাক্ষাৎ নেই যে?”

“এই একটু ব্যস্ত ছিলাম। অনেকদিন বাদে এনার সঙ্গে দেখা হল, কথা বলছি,” কথাতেই স্পষ্ট যে অখিলেশবাবু এড়াতে চাইছেন ঘনশ্যামবাবুকে।

কিন্তু ঘনশ্যামবাবু ওসব পাত্তা দেওয়ার লোকই নন। অখিলেশবাবু একজনের সঙ্গে কথা বলছেন, এখন এখানে না থাকাই শ্রেয়। এসব ওঁর মনেই হয় না।

উলটে বললেন, “সে তো দেখতেই পাচ্ছি। উনি কী একটা ব্যাপারের কথা বলবেন বলছিলেন না?”

রঞ্জনবাবু একটু হকচকিয়ে গেলেও সামলে নিয়ে হেসে বললেন, “অদ্ভুত ব্যাপারই বটে। গত বৃহস্পতিবার আমার বাড়িতে এক ভদ্রলোক এসে হাজির। একেবারে যে অপরিচিত তা নন, আমাদের পাড়াতেই থাকেন। তবে তেমন আলাপ ছিল না। ভদ্রলোক বেশ কিছুদিন আগে বাজার সেরে বাড়ি ফিরে দেখেন ওঁর বাজারের একটা ব্যাগে একটা বই, প্লাস্টিকে মোড়া। বইয়ের অবস্থাও বিশেষ ভালো নয়। সেদিন উনি মুদিখানার দোকানে গেছেন, সবজি বাজার করেছেন, ফলের দোকানেও গেছেন। কোথা থেকে যে ব্যাগের ভেতর বই এল তা বুঝতেও পারলেন না। যেতে আসতে দুটো তিনতে টোটোতেও চেপেছেন। মুদিখানার দোকানটা থেকে অনেকদিন থেকে জিনিসপত্র কেনেন, চেনা দোকান। পরে তাদের গিয়ে জিজ্ঞেসও করেছিলেন। তারা তো শুনে আকাশ থেকে পড়েছে।”

“বইটা কী ছবি-টবি নিয়ে? মানে গুহা-টুহায় যেরকম ছবি-টবি আঁকা থাকে না, আদিম মানুষ যেসব ছবি-টবি আঁকত, সেই নিয়ে?” ঘনশ্যামবাবু আর কতক্ষণ চুপ করে থাকবেন?

বইটা যে উনি নেড়েচেড়ে দেখেছেন সেটাও বুঝলেন অখিলেশবাবু।

“আপনি কী করে জানলেন?” রঞ্জনবাবু যথেষ্ট অবাক হয়েছেন।

“বলব, সব বলব। আপনি আগে আপনার কথা শেষ করুন,” ঘনশ্যামবাবুর উত্তর।

“উনি বইটা নিয়ে কী করবেন ভেবে না পেয়ে শেষ অবধি আমার কাছে এসেছেন। বললেন যদি লাইব্রেরিতে রাখা যায়। এদিকে বইটা ভালো করে দেখে তো আমার চক্ষুস্থির। দুর্লভ বই একটা। এখন আর পাওয়াই যায় না। আউট অফ প্রিন্ট। বইটার নাম প্রাচীন ভারতের গুহাচিত্র। আশ্চর্যের ব্যাপার কী জানেন, বইটার মলাট তো নেইই, আরও কয়েকটা পাতাও নেই। কিন্তু না থাকলেও ভেতরে দু’জায়গায় লাইব্রেরির স্ট্যাম্প আমি দেখলাম। বইটা এই রথতলার লাইব্রেরিরই! আমি এখানে আসার আগেই ইস্যু করা হয়েছিল। যে নিয়েছিল সে আর ফেরত দেয়নি। লাইব্রেরি থেকে কোনও খবর নেওয়া হয়নি কেন তাও জানি না। আমি এখানে এসে কাজ করতে করতে একদিন দেখি যে বইটা মিসিং। খুব খারাপ লেগেছিল আমার তখন। এত ভালো বই একটা। এখন আবার লাইব্রেরিতে রেখে দিয়েছি।”

“এ তো দারুণ ব্যাপার! দেখলেন অখিলেশবাবু, দেখলেন, উপকার করার ফল কক্ষনও খারাপ হয় না। বইটা আবার যথাস্থানে ফিরে গেল। কম কথা!” ঘনশ্যামবাবু যারপরনাই উল্লসিত।

এদিকে এ সবকথাই রঞ্জনবাবুর কাছে হেঁয়ালির মতো ঠেকছে। তাই বাধ্য হয়েই তাঁকে সব খুলে বলতে হল অখিলেশবাবুকে। সেই ঘনশ্যামবাবু আর প্রতুলবাবুর অখিলেশবাবুর বাড়িতে আসা থেকে সুভাষবাবুর কথা অবধি সব কিছুই।

“আসলে আপনি কী উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করছেন তার ওপরেই সব নির্ভর করে। আমার মনে হয়েছিল প্রতুলবাবু বড়ো অশান্তিতে আছেন, কিছু একটা করা দরকার। আপনার তো একেবারে মত ছিল না। কিন্তু ফলটা দেখলেন তো, কত ভালো হল? প্রতুলবাবুকে বলতে হবে ঘটনাটা,” আত্মপ্রত্যয়ের হাসি হেসে বললেন ঘনশ্যামবাবু।

রঞ্জনবাবু হো হো করে হেসে উঠলেন সব শুনে। বললেন, “এ তো দেখছি সত্যিই খুব অদ্ভুত ব্যাপার। অন্তত আমার চাকরি জীবনে এরকম ব্যাপার আগে তো কখনও ঘটেনি। আগামীকাল আমার ফেয়ারওয়েলে আপনার কথা আমি বলব ঘনশ্যামবাবু। বইটা আবার লাইব্রেরীতে ফিরে আসার পেছনে যে আপনার হাত আছে সেটাও সবাই জানুক।”

ছবিঃ অংশুমান

জয়ঢাকের সমস্ত গল্পের লাইব্রেরি এই লিংকে

 

Advertisements

One Response to গল্প ঘনশ্যামবাবুর পরোপকার অদিতি ভট্টাচার্য শরৎ ২০১৭

  1. valo golpo says:

    ভালো

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s