গল্প ধন্বন্তরি শিবশংকর ভট্টাচার্য শরৎ ২০১৭

শিবশংকর ভট্টাচার্যর সমস্ত গল্প একত্রে  

অনুকুলবাবুর বড্‌ডো ভুলো মন। এ-নিয়ে তাঁর পেছনে কম লাগত না লোকে, তাঁর নিজের অস্বস্তিরও অন্ত নেই। লেখাপড়ায় বেশিদূর এগোতে না পারা আর বার চারেক চাকরি চলে যাওয়ার কারণটাও তাই। কেমিস্ট্রি অনার্স নিয়েও পার্ট-ওয়ানের পর আর শেষ করা যায়নি। অথচ নম্বর যা পেয়েছিলেন তাকে খারাপ বলা যায় না। বিশেষ করে প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস চলার সময় তাঁর কাজ করার নিখুঁত ধরণ দেখে কলেজের বুড়ো দপ্তরি ভিখারি অবাক চোখে চেয়ে থাকত। এতদিন পরে আজ কলেজ স্কোয়ারের বেঞ্চে বসে হঠাৎ ভিখারির মুখটা মনে পড়ে গেল তাঁর।

এত দিন তো মনে পড়েনি! অবশ্য রোজকার কাজকর্মের ঠ্যালায় অনেকগুলো বছর মনের শান্তি ছিল না। অবসর না পেলে পুরোনো দিনের চিন্তা মাথায় আসবে কোত্থেকে। ঘুম থেকে উঠে চান খাওয়া কোনোমতে সেরে সেই যে ওষুধ কোম্পানির ল্যাবরেটরিতে ঢুকতেন ছুটি হতে হতে রাত সেই আটটা ন-টা। একঘেঁয়ে কাজ দিনের পর দিন। তারপর মেসে ফিরে খাওয়া আর ঘুম। আশ্চর্য একদিনও ছুটি নিতে ইচ্ছে করত না তাঁর। রবিবারেও ওভার টাইম কাজ করাটা অভ্যেস দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। অবশ্য বাড়তি কিছু টাকাও জমাতে পেরেছেন এজন্যে মাসে মাসে। অবশেষে ওষুধ কোম্পানির চাকরিটা থেকে আজই ছুটি হয়ে গেল তাঁর। বাকি যে ক-টা বছর বাঁচবেন আবসরের আর চিন্তা নেই। তবে কলকাতা শহরের এত লোকের ভিড়ে আর নয়।

অবসর নেবার ঢের আগেই একথা ভেবে রেখেছিলেন তিনি। বছর খানেক আগে হুগলীর এক উকিলবাবুর সুত্রে নিলামে একটা ভাঙা বাড়ি কেনা আছে। গঙ্গার গা ঘেঁষা নির্জন জায়গা, এখানে থেকে, তাঁর লুকোনো শখ হোমিওপ্যাথির চর্চা করবেন বলে ভেবে রাখা আছে। এবার মেসের পাট চুকিয়ে ওখানে চলে যাওয়ার ওয়াস্তা। ভাগ্যিস বিয়ে করাটা হয়ে ওঠেনি! বউছেলেপুলে থাকলে নির্ঘাৎ তারা এখানে থাকতে রাজি হত না। একে জঙ্গল তায় সেটা নাকি হানাবাড়ি- তবে গঙ্গার ধার আর নির্জনতাকেই পাশ মার্ক দিয়েছেন অনুকুলবাবু। ঘিঞ্জি শহর, বিশেষ করে শেয়ালদা- বৌবাজারজাতীয় দমবন্ধ পরিবেশে থেকে ঘেন্না ধরে গিয়েছে তাঁর।। ভুতটুতের ভয়ও নেই তাঁর।

“ঘুগনি খাবেন বাবু?”

চমকে তাকালেন অনুকূলবাবু। গরীব চেহারার একটি লোক- মাথায় কলাইকরা হাঁড়ি, কাঁধে ব্যাগে বোধহয় শালপাতার ঠোঙা ইত্যাদি। “কাবলিছোলার ঘুগনি বাবু, নারকেল দিয়ে। খান না, ভালো লাগবে।”

কার মতো যেন কথা বলার ধরন? চিন্তাটা মাথায় আসতে আসতেও আসছে না। সাড়া না পেয়ে চলে যাচ্ছে লোকটা। পেছন থেকে ক্লান্ত চলার ধরনটাও যেন চেনা। খেলেই হত একপাতা। কিন্তু ডাকতে গিয়েও ডাকা হল না। মনে পড়ছে কার সঙ্গে মিল! বাবার। বাবাও ট্রেনে ঘুগনি বেচতেন এক সময়। মা শেষ রাতে উঠে রেঁধে দিতেন রোজ। সেই গন্ধে রোজ ঘুম ভাঙ্গত তার। স্মৃতির অতল থেকে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে চলে যাওয়া বাবা-মা আর নদীর ধারে আমগাছের তলায় খড়ে ছাওয়া মাটির বাড়িটার স্মৃতি এক ঝলকে ফিরে এসেছে তার মনে। এতদিন তাঁদের ভুলে ছিলেন কী করে? ভেবে চোখে জল এল তার।

রাত হয়েছে, লোকজনের ভিড়ও কমে এসেছে। খালি বেঞ্চগুলোর দখল নিচ্ছে ভবঘুরের দল। উঠে পড়লেন অনুকুলবাবু, গোছগাছ আছে। এত বছরের জমা জিনিসপত্তর থেকে দরকারিগুলো নিয়ে নতুন জায়গায় যাওয়া। যেমন ভুলোমনের মানুষ তিনি। অবশ্য মেসের ম্যানেজারবাবু সাহায্য করবেন বলে কথা দিয়েছেন। মেসে রাতের খাওয়াদাওয়ারও সময় হল। বিদায়ী ভোজটা নাকি ভালোই হবে আজ।

এতদিন বাদে হঠাৎ করে পুরোনো দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যাওয়াতে ভালো যেমন লেগেছে, অবাকও তিনি কম হননি। মন ব্যাপারটা ভারি অদ্ভুত, কী করে যে ভুলে ছিলেন সব। আবার হঠাৎ মনে ফিরেই বা এল কী করে? সবকিছু নিজের খেয়ালে কে যেন চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কে চালায়? ভগবান? উঁহু! ঈশ্বরে বিশ্বাস নেই তাঁর। তবে কে? ডানহাতের তর্জনী উঠে এসে কপাল ছুল তার। করোটির মধ্যে থাকা সেই ঘোলাটে পদার্থটি- ব্রেন! মস্তিষ্কের গ্রে ম্যাটার! তড়িৎ প্রবাহের ব্যাপারে মগজটায় আলো জ্বালা আর নেভা। আলো আর অন্ধকার। কতদিনের কথা মনে রাখতে পারে মানুষ। চার-পাঁচ বছর বয়সের আগের কথা নাকি কারও মনেই থাকে না। কিন্তু জাতিস্মর? তাদের নাকি আগের জন্মের কথাও মনে থাকে। নাঃ তাহলে আবার পুনর্জন্মের কথাটাও মানতে হয়। পার্ট-টু অবদি বিদ্যে হলেও বিজ্ঞানেরই তো ছাত্র তিনি। ওসব বিশ্বাস করতে মনে চায় না। আবার সরাসরি অবিশ্বাস করতেও পারছেন কই? নরেন্দ্রপুরের সেই কচি মেয়েটা কী করে বর্ধমানের জমিদারবাড়ির সব গোপন কথা তায় সিন্দুক খোলার নম্বর বলে দেয় ঠিকঠাক!

মালপত্তর খুব কম হল না শেষ পর্যন্ত। কিছু বইপত্তর, থালা-বাটি-গেলাস ছাড়া বেশিরভাগটাই নানারকম কেমিক্যাল ভরতি শিশি বোতল। পোশাক বলতে সামান্য কিছু ধুতি, জামা আর র‍্যাপার। বিছানার বান্ডিলটা সাধনবাবুর উপহার। তার ভেতর নাকি একটা পুরোনোদিনের ইকমিক কুকার আর স্পিরিট ল্যাম্পও আছে। উঃ পারেন বটে ভদ্রলোক! প্রায় চল্লিশ বছর ম্যানেজার হিসেবে মেস চালানোর পর তাঁর হিসেব বলা যায়- একান্নবর্তী পরিবারের পাকা গিন্নিদের মত।

সাধনবাবু অবশ্য অত হাবিজাবি কেমিক্যাল নিয়ে যেতে বারণ করেছিলেন, “কী মশাই, অত বিপজ্জনক ব্যাপার সব বয়ে নিয়ে যাবেন!ও তো অনেক হল, এখন এ-বয়সে খান-দান ঘুমোন,গঙ্গার হাওয়ায় বেড়ান, তা না!” তবু না নিয়ে পারেননি অনুকূলবাবু। বুরেট পিপেট কনডেন্সার ফানেল বার্নারের সঙ্গে এত কালের সঙ্গ এককথায় ছেড়ে যাওয়া মুশকিল। সঙ্গে রইল। এরা ছাড়া আর তার আপনার বলতে আছেটা কী! ইচ্ছে হলে একটু ঘাঁটাঘাঁটি করবেন এই আর কি!

ভোর পাঁচটার ট্রেনটাই ধরা গেল শেয়ালদা থেকে। সাধনবাবু ট্রেনে লটবহর সহ তুলে দিয়ে বলে গেলেন যোগাযোগ রাখতে। ঠিকানা আর ফোন নম্বর তো আছেই। আর কখনও মন খারাপ হলে বা নিঃসঙ্গ লাগলে কলকাতার এই মেসে দিন কতক কাটিয়ে যেতে- এঁরাও ছুটি-ছাটায় চলে যাবেন দেখা করতে। ট্রেন ছাড়লে অনুকূলবাবু যতক্ষণ দেখা যায় চেয়ে রইলেন প্ল্যাটফর্মের সাধনবাবুর দিকে। দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে বিদায় জানানোর সময় ম্যানেজার সাধনবাবুর চোখ শুকনো ছিল না তার নিজেরও তাই। একেই বলে আত্মার আত্মীয়। চল্লিশ বছর একসঙ্গে থাকা কম কথা তো নয়। আবার কবে দেখা হবে কে জানে! যেখানে যাচ্ছেন এদের ছেড়ে সেখানে মন টিকলে হয়!

ট্রেন কিছুটা এগোতেই অবশ্য মনটা ভালো হতে আরম্ভ করল। কলকাতা শহর ছেড়ে যেতেই জানলার বাইরেটা সবুজ দেখাচ্ছে। শহরে থাকলে আকাশের রংটাও তো বোঝা যায় না ঠিক মতো। বাড়িঘর যা আছে স্টেশনগুলোর কাছাকাছি। তারপরেই বড়ো বড়ো গাছ, তুঁতে রঙের আকাশের নীচে দিগন্তছোঁয়া মাঠ। ধানক্ষেতগুলোয় কত রকম সবুজ। মাঝ মাঝে হলুদ রঙের খোপ চোখ জুড়িয়ে  দিচ্ছে। বোধহয় সর্ষেক্ষেত। বহুবছর আগে খাস কলকাতার রাস্তাতেও গরুর গাড়ি নজরে পড়ত। বহুদিন বাদে ধানবোঝাই গরুর গাড়ি দেখে মনটা কেমন করে উঠল তাঁর। নাঃ, শহর ছেড়ে মফঃস্বলে থাকতে আসার বুদ্ধিটা ঠিকই করা হয়েছে। ঘন্টাখানেকের মধ্যেই তাঁর স্টেশন এসে গেল।

ঘোড়ার গাড়িতে মালপত্তর তুলে উকিলবাবুর বাড়ি হয়ে তাঁর জায়গায় পৌছতে একটু দেরিই হল। পুরোনো আমলের পাথর বিছানো রাস্তাটা একটা পুল পেরিয়ে শেষ হয়ে গিয়েছে। আর বাড়ি অবদি একটা জঙ্গুলে সুঁড়িপথ আছে বটে, গাড়ি যাবার মতো নয়। অগত্যা গাড়োয়ান নিজেই মাথায় করে তার মালপত্র পৌঁছে দিয়ে গেল।

পুল থেকেই নজরে পড়ে গঙ্গার বাঁকের গা ঘেঁষা নিঃসঙ্গ বাড়িটা। কচ্ছপের পিঠের মতো বেশ উঁচু জমির ওপর বলে অতদূর থেকেও নজরে পড়ে। চারদিকে আম-জাম-কাঁঠাল আর আশ্চর্য দুটো গাছ দেখে অবাক হলেন অনুকূলবাবু- আমলকি আর হরিতকি! এখানে কে লাগিয়ে ছিল? এ তো সাধারন বুনো গাছ নয়! আগেরবার এগাছ ঝোপঝাড়ের জন্যে দেখতে পাওয়া যায়নি। এবার উকুলবাবুর লোক ঝোপঝাড় মোটামুটি পরিষ্কার করে ফেলায় দেখা যাচ্ছে। সদর দরজায় কড়া নাড়াতেই একটি ছেলে হাসিমুখে দরজা খুলে দাঁড়াল। উকিলবাবু আলাপ করিয়ে দিলেন, “এই হল আপনার অ্যাসিস্ট্যান্ট। জঙ্গল কাটা, ঘরদোর পরিষ্কার করা বলুন, সব এ-ই করেছে। বেচারা অনাথ সাঁওতাল ছেলেটিকে ভরসা করে রাখতে পারেন। কথাটা পরিষ্কার বলতে পারে না, তবে কাজ বড়ো ভালো করে। ওর নাম দুখি।”

ভালোই লাগল অনুকূলবাবুর দুখিকে। বিশেষ করে ওর মুখের সরল হাসিটা দেখে। ওর নাম হওয়া উচিত ছিল সুখী। বছর পনেরো হবে বয়স। দুখি কাজে বহাল হয়ে গেল।

“খোকা, ওদিকে যাবি না, জলে কুমির আছে।” বহু দূর থেকে কার যেন গলার আওয়াজ কানে এল- খুব চেনা গলা! তাঁর সেই ভুলতে বসা মায়ের গলার মতো যেন। লোকজন তো নজরে পড়ছে না! গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল অনুকূলবাবুর। ভুল শুনলেন? আবার শুনলেন যেন, “যাস না বলছি খোকা, কুমির নিয়ে গেলে ভালো হবে?”

সামনের ঝোপটা পেরোতেই ভুল ভাঙল। গঙ্গার গা ঘেঁষে ক-টা অস্থায়ী কুঁড়েঘর। ঘর না বলে তাঁবু বা ছাউনি বললে ভালো হয়। কোনোমতে বাতিল টিন আর টারপোলিনের ঢাকনা দেওয়া। ঝোপঝাড়ের আড়ালে বলে চোখে পড়েনা। বেদের দল মনে হল। তাদেরই অল্প বয়সি বউ তার ছেলেটিকে শাসন করবার চেষ্টা করছে। কবে এল এরা? আগের যাত্রায় তো নজরে পড়েনি তাঁর!

মনে পড়েছে, ছেলেবেলায় তাঁকেও মা এভাবেই সাবধান করতেন। ভয় পেতেন খুব কুমিরকে। নেহাত বানানো কথা- কুমির দেখা যায়নি গঙ্গায় কখনও। মা-র কথা মনে পড়ার আর একটি কারণ আছে- তাঁদের ছোটোবেলার বাড়িটা ঠিক এরকমই ছিল। শহর থেকে দূরে গঙ্গার বাঁকে বড়ো আমগাছ তলায় খড়ের চালার মটির বাড়ি। এই কি সেই জায়গা? এর চেনা চেনা লাগে কেন সব!

“বাবুর বাড়ি কি এখানে?”

চমকে তাকালের অনুকূলবাবু। রোগা আর বেজায় লম্বা এক বুড়ো মানুষ যেন হঠাৎই বাতাস ফুঁড়ে উদয় হয়েছে। চেহারা দেখে মনে হয় ওই নতুন বেদে বস্তির বাসিন্দা। ভারি বিনীতভাবে চেয়ে রয়েছে তাঁর দিকে।

“হ্যাঁ, নতুন এসেছি। কেন?”

“নাতিটার শরীর খারাপ। ওষুধ থাকে যদি- তাই বলছি।”

“নাম কী তোমার?”

“রডরিগস বিশ্বাস। ঘর ওইখানে”- আঙুল তুলে নতুন বস্তি দেখাল লোকটি। নাম শুনে একটু অবাক হলেন অনুকুলবাবু। লোকটা বেদে নয়, ওলন্দাজ খ্রিষ্টান। এককালে হুগলীর এ-অঞ্চলের মালিক ছিল এরাই। হার্মাদ দস্যুদের বংশধর।

“কী হয়েছে নাতির?”

“মনে হয় সান্নিপাতিক। পাঁচদিন ধরে জ্বর কমছে না।”

“ডাক্তার দেখাওনি কেন?”

“টাকা কোথায় বাবু? তাই বলছিলাম যদি ওষুধ থাকে…”

“নাতির বয়স কত?”

“দশ।”

চিন্তায় পড়লেন অনুকুলবাবু। লুকিয়ে মেটিরিয়া মেডিকা পড়া বা নিজের চিকিৎসা নিজে করার অভ্যেস করেছিলেন নেহাত ডাক্তার খরচা কমানোর কথা ভেবে। অবশ্য তেমন অসুখ-ই বা করল কথায় তাঁর। সাধারণ অসুধেই কাজ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু সান্নিপাতিক! এর মানে টাইফয়েড! চুপ করে দাঁড়িয়ে নেই তিনি। সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে কখন যে  লোকটার পিছু পিছু চলতে শুরু করেছেন টের পাননি। চমক ভাঙল বস্তির একটা ঘরের সামনে এসে। চটের পর্দার আড়ালে ছোটো একটা ছেলে কাঁথা জড়িয়ে শুয়ে আছে। ঢোকার আগে কেন যে বাতাস শুঁকলেন ঘরে ঢুকে তাঁর গলার কাছে কী একটা শিরায় হাত দিয়ে স্পন্দন অনুভব করলেন, জিভের রং, চোখের রং দেখলেন, সবই একটা ঘোরের মধ্যে। বাইরে বেরিয়ে এসে যেন তাঁর চটকা ভাঙল মাথার থেকে যেন কে বলল সান্নিপাতিক নয় হে, হাম হয়েছে। ওষুধ পড়লেই কমে যাবে! অনুকূলবাবু রডরিগসকে ডেকে বললেন, “চলো আমার সঙ্গে।” অবাক লোকটা চলল তাঁর পিছু পিছু। তাঁর মুখ চোখ দেখে মনে হল এমন অবাক জীবনে হয়নি। অবাক অনুকূলবাবু কিছু কম হননি নিজেও। অবশ্য ওষুধ নিয়ে রডরিগস চলে যাবার পর। তার আগে অবধি কেমন একটা ঘোরের মধ্যে ছিলেন তিনি। যেন আড়াল থেকে আর কেউ তাঁকে চালাচ্ছিল! কে?

দুখি ছেলেটি দিনকয়েকের মধ্যেই বাড়ির ভেতরকার জঙ্গল পরিষ্কার করে ফেলার পর অনুকূলবাবু জিনিসপত্র গোছানোয় লেগে গেলেন। এর মধ্যে রডরিগস দলবল নিয়ে দেখা করে কৃতজ্ঞরা জানিয়ে গেছে। তাঁর ওষুধে তিনদিনেই জ্বর কমে গেছে তাঁর নাতির।

চিকিৎসার ব্যাপারটা লোক জানাজানি হলে মুশকিল ছিল। হল না কিছু, জলপুলিসের লোকেরা এদের হঠাৎ গজিয়ে ওঠা আস্তানাগুলো ভেঙে দেওয়ায়। তবে অনুকূলবাবু এবার থেকে একটু সাবধান হয়ে গেলেন। তিনি মোটেও চিকিৎসক নন, হাতুড়ে নন। কেন যে অমন অকারণ পরোপকার করতে গেলেন! কী করে একবার কপালগুণে ছেলেটা সেরে উঠল, যদি অন্যরকম কিছু হত! এবাড়িতে তখন আর থাকাও চলত না। খুব বাঁচা বেঁচে গিয়েছেন এবারকার মতো। তবে হঠাৎ ফাঁকা হয়ে যাওয়া বেদে পাড়াটার দিকে চেয়ে মনটাও খারাপ হয়ে গেল তাঁর। বেচারা গরিব লোকগুলো! রডরিগস লোকটার চেহারা একটু ডাকাত ডাকাত হলেও ভারী বিনয়ী। কেন যে ওদের পেছনে পুলিশ লাগল!

একটা নতুন রোগ হয়েছে তাঁর নিজেরই। স্বপ্নদেখা রোগ। সারা জীবন ওষুধ কোম্পানীর কাজে খাটাখাটনিতে রাতের ঘুমটা হত বেশ জমিয়ে, হালকা ঘুম বা স্বপ্ন দেখার ব্যাপার ছিল না কোনকালেও। অবাক কাণ্ড, শুধু রাতে নয় দিনেও যেন স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন। অথচ দিনের বেলা তাঁর ঘুমোনোর অভ্যাস নেই। স্বপ্নগুলোও যেন বাস্তব ধরণের- যেন চোখের সামনেই অনেক কিছু ঘটতে দেখছেন। হ্যালুসিনেশন নয় তো?

লোকেরা এবাড়িটাকে হানাবাড়িই বা বলে কেন? কোনো ভৌতিক ব্যাপার দেখেছে কেউ এখানে এখানকার যোগাযোগ বলতে তাঁর পরিচিত উকিলবাবু- সত্যনারায়ণ ব্রহ্ম। তাঁর কাছেই এব্যাপারে খোঁজখবর নিতে গেলেন অনুকূলবাবু। সত্যবাবু হেসেই অস্থির, “দূর মশাই, ভূতটুতের কথা শুনিনি কোনো কালে। তবে শ-দুই বছর আগে এই বাড়ি তৈরি করান এক ভীষগাচার্য মানে ভেষজ চিকিৎসক। তাঁর ব্যাপারে কিংবদন্তী আছে নানারকম! তিনি নাকি তন্ত্রসাধনাও করতেন। আশ্চর্য চিকিৎসা করতেন। মরা মানুষকেও নাকি বাঁচিয়ে তুলতেন! যতসব আবোলতাবোল কথা।”

অনুকূলবাবু অবাক হলেন-

“তান্ত্রিক ছিলেন?”

“তিব্বত থেকে তন্ত্র শিখে এসেছিলেন। এসব পুরোনোকালের  শোনা কথা । তন্ত্রমন্ত্রে আমার আবার বিশ্বাস নেই। আপনার?”

মাথা নাড়লেন অনুকূলবাবু। যেন হঠাৎই মনে পড়ে গিয়েছে কিছু সত্যবাবুর। এবার গলার স্বরটা একটু নীচের দিকে।

“ভদ্রলোককে কেউ মরতে দেখেনি। হঠাৎ উধাও হয়ে যান!”

“কতদিন আগে?”

“সিপাই বিদ্রোহের কয়েক বছর আগে। তারপর কয়েক বছর ওলন্দাজ ডাকাতরা দখন নিয়েছিল ওবাড়ির। টিকতে পারেনি। তারপর থেকে তো খাস হয়ে সরকারের দখলেই ছিল একশো বছর। এবার আপনি এলেন। কেন, কিছু অসুবিধে বুঝছেন?”

“না না, অসুবিধে কিছু নয়, এমনি একটু খোঁজখবর নিয়ে গেলাম।”

সত্যবাবুকে তেমন কিছু ভেঙে না বললেও বাড়ির ইতিহাস জানা গেল খানিকটা। আমলকী, হরিতকী ইত্যাদি গাছ কারও ভেষজ চর্চার আভাস পাওয়া গেলেও তার সঙ্গে তন্ত্র! আরও ভেষজ গাছপালা থাকার কথা, খুঁজে দেখতে হবে। আর ভৌতিক ব্যাপারে তিনি নিজে বিশ্বাসী বা অবিশ্বাসী কোনওটাই তো নন। ভালো করে নজর রাখতে হবে। প্রমাণ পেলে নিশ্চয়ই মেনে নেবেন। তবে এতদিন একা থাকার ফলে ভূতের ভয়টা তাঁর নেই। কী হয় না হয় দেখাই যাক না!

মরা মানুষ বাঁচিয়ে তুলতেন? সত্যবাবুর অনেক কথার মধ্যে ওই কথাটা সবচাইতে মনে পড়ছে অনুকূলবাবুর। এও কি সম্ভব? তাহলে তো বিজ্ঞানের জগতে তোলপাড় হয়ে যাবার কথা। অবশ্য পুরাণ ঘাঁটলে ওরকম তো কত ঘটনাই পাওয়া যায়। অনেক কিছু পরে প্রমাণও হয়ে গিয়েছে। যেমন টেস্টটিউব বেবি, জীবজন্তুর ক্লোন, মহাকাশচারীদের অনন্তকালের শীতঘুম, গাছপালার প্রাণ, ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়ার প্রভাব, আরও কত কী! কেমিক্যাল ল্যাবরেটরিতে হাত পাকাবার অভিজ্ঞতা তো সারা জীবন করা গেল, এবার পড়াশুনোর বহরটা বাড়ানো দরকার। সব মিলিয়ে নিজের গোপন শখটাকে ঠিকঠাক চেহারা দেবার একটা অদম্য তাগিদ বেশ অনুভব করলেন অনুকূলবাবু। বিদ্যে শিখবার জন্য, শেখাবার জন্য অতীশ দীপঙ্কর, রামমোহন, গঙ্গাধর মহারাজের মতো এ-বাড়ির পুরনো মালিক কত বছর আগে তিব্বতে পৌঁছে গিয়েছিলেন, আর তিনি অনুকূলচন্দ্র রায় বাড়িতে একটু চিকিৎসার চর্চা করতে পারবেন না? রোগের চিকিৎসাই করবেন তিনি। বইপত্তর জোগাড় করবেন। আর পিছু ফেরা চলবে না।

কলকাতার মেসের পাশেই থাকেন মহেশ কবিরাজ। মেসে থাকার সময় ছুটির দিনে অনুকূলবাবু যেতেন তাঁর কাছে। তাঁর লেখা বনৌষধির বই বিখ্যাত। আটানব্বই বছর বয়সে পৌঁছেও চিকিৎসা করেন মাঝেমাঝে, জটিল রুগী পেলে। অনুকূলবাবু তাঁর সঙ্গে দেখা করে বেশ কিছু পুরনো পুঁথি আর গাছগাছড়ার বীজ সংগ্রহ করে নিয়ে এলেন।

কবিরাজমশাই ভারি অবাক হলেন অনুকূলবাবুকে দেখে, “কোথায় ছিলে হে? মাস খানেক তোমাকে দেখতে পাইনি?”

“আজ্ঞে চাকরি থেকে অবসর নিয়ে মফস্বলে আছি। এই একটু ভেষজ কবিরাজির চর্চা করতে ইচ্ছে হল।”

“তাই চলে এলে? তা ভালো। মাঝেমাঝে কী হল না হল খবরটা দিও।”

“তা তো বটেই। আপনার আশীর্বাদ ছাড়া, হেঁ হেঁ…”

ফিরবার পথে মেসে না গিয়ে পারলেন না। ম্যানেজার ভারি অবাক, “কী ব্যাপার, মশাই? একমাসেই দশ বছর বয়েস কমিয়ে ফেলেছেন যে! ভালো চেঞ্জ লাগিয়ে ফেলেছেন! হাতে ওসব কী?”

না খাইয়ে কিছুতেই ছাড়লেন না সাধনবাবু। ফলে বাড়ি ফিরতে রাত হয়ে গেল। আকাশে মেঘ জমছিল বিকেল থেকেই। এবার টিপ টিপ করে বৃষ্টি শুরু হল। পথঘাট শুনশান। টর্চের আলোয় কোনওমতে পুলটা অবধি পৌঁছে হাতের ঝোলা নামিয়ে বাড়ির দিকে চেয়ে গাটা হঠাৎ ছমছম করে উঠল তাঁর। বাড়িতে কোনও আলো নেই, অন্ধকার বাড়িটা যেন অতিকায় দানবের মতো চেয়ে আছে তাঁর দিকে।

দুখী-ছোঁড়া কোথায় গেল? তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে সদর দরজায় পৌঁছে কড়া নেড়ে কোনও সাড়া পাওয়া গেল না। শেষটা খিড়কি-দরজার তালা খুলে ঘরে ঢুকে চমকে উঠলেন অনুকূলবাবু। রান্নাঘরের মেঝেতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে দুখী। বাতাসে তীব্র একটা গন্ধ, খুব চেনা গন্ধ তাঁর।

অনেক জলের ছিটে আর স্মেলিং সল্ট শোঁকানোর পর জ্ঞান ফিরতে দুখী আঙুল দিয়ে রান্নাঘরের মেঝের দিকে দেখিয়ে ভাঙা গলায় কিছু বলার চেষ্টা করল। খুব ভয় পেয়েছে দুখী। কথা বোঝার উপায় নেই। অবশ্য ওর চিকিৎসা করাটাই আগে দরকার।

দু’ডোজ ওষুধ খাইয়ে ওকে বিছানায় শুইয়ে খোলা ছাদে গঙ্গার দিকে মুখ করে বসলেন অনুকূলবাবু। যা দেখার কাল সকালবেলা দেখা যাবে।

অনেক রাতে শুয়ে অদ্ভুত এক স্বপ্ন দেখলেন তিনি। মস্ত বড়ো একটা বৌদ্ধস্তূপের পাশে মুণ্ডিত মাথা এক সন্ন্যাসী বসে আছেন। তাঁর চারপাশে অজস্র বেতের সাজিতে গাছের মূল, পাতার কুঁড়ি আর ফল, যেন শিশিরে ভেজা টাটকা। শতমূলি, অশ্বগন্ধা, উলটচণ্ডাল আর রামতুলসি চিনতে পারলেন আর বাকিগুলো অচেনা। ধ্যান শেষে সন্ন্যাসী শ্বেতপাথরের পাত্রে তৈরি করেছেন মিশ্রণ। হাত পেতে কে এসে দাঁড়ালেন? রাজপুরুষের মতো তাঁর পোশাক। ও কী! বাঁ-হাতের কবজির ওপর যেন তলোয়ারের কোপ লেগেছে, মুখে অবশ্য কোনো বিকার নেই। কোনো মহাযোদ্ধা হবেন।সন্ন্যাসী সেই ক্ষতের ওপর খলে তৈরি ওষুধ ঢেলে বেঁধে দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন! তাঁর চাউনি এবার অনুকুলবাবুর দিকে। স্মিতহাসিমুখে চেয়ে হাতে স্বস্তিমুদ্রা দেখালেন। সন্ন্যাসীর মুখটা যেন তাঁর চেনা! এ যেন পুরাণ থেকে উঠে আসা কেউ! বৌদ্ধসাধু, চিকিৎসক জীবক! কিন্তু এত চেনা মনে হল কেন? কোথায় দেখেছেন এঁকে!

সকালে ঘুম থেকে উঠেও স্বপ্নের কথা মনে আছে তাঁর। তবে মনে ভয় বলে কিছু নেই। বরং অদ্ভুত একটা প্রেরণা তাঁকে শক্তি যোগাল যেন।

দুখী সুস্থ হয়ে উঠেছে। ওকে নিয়ে নীচের তলায় এলেন তিনি। রান্নাঘরের মধ্যে ঢুকতেই রাতের সেই চেনা গন্ধটা আবার পাওয়া গেল। তবে তীব্র নয়। বেশ বড়ো ঘরটার  এক কোণে বহুদিনের জমে থাকা কাঠকয়লার স্তূপ। পরিষ্কার করে ওঠা হয়নি। গন্ধটা যেন এখান থেকেই ছড়াচ্ছে।

জঞ্জালের তলায় একটা চৌকোণা লোহার ডালা। শাবল দিয়ে ডালা সরাতেই কাল রাতের ঝাঁঝালো গন্ধের ধাক্কায় মাথাটা ঘুরে গেল তাঁর। দুখী এসে দাঁড়িয়ে ছিল দরজায়। ভয় পেয়ে চিৎকার করে অনুকূলবাবুকে হাত ধরে টেনে সরিয়ে না আনলে হয়তো তিনিও জ্ঞান হারাতেন।

হাইড্রোজেন সালফাইড! গন্ধটা চিনতে পেরেছিলেন কাল রাতেই। আজ বুঝতে পারলেন মাটির তলায় কিছু রাসায়নিক পদার্থ জমা হয়ে আছে। হয়তো দুশো বছর আগে সেই চিকিৎসকের গবেষণার জায়গা ছিল এখানে। লোকের চোখের আড়ালে কাজ করবার জন্যেই মাটির তলায় ঘরের ব্যবস্থা।

অনুকূলবাবুর অনুমান ঠিক। ডালার তলায় লুকোনো সিঁড়ি নেমে গিয়েছে নীচের ঘরে। বেশ বড়ো ঘরের মাঝে টেবিল, দেওয়ালের তাকে চিনেমাটির জারে নানারকম রাসায়নিক! ইঁদুর-ছুঁচোর উৎপাতে কিছু জার ভাঙা। ডালার তলায় ছিল ভাঙা নিশাদলের জার। ওপরের ঘর চুনকামের সময় চুনজল তার ওপরে পড়ে হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস তৈরি হয়েছে। তেলের বাতি জ্বলছে দিব্যি। কিন্তু কার্বন মনোক্সাইড বা কার্বন ডাই অক্সাইড নেই কেন? উত্তর পাওয়া গেল কিছুক্ষণের মধ্যেই। পাশের আর একটা ঘর থেকে সুড়ঙ্গ চলে গেছে গঙ্গার দিকে। পাথর বাঁধানো সেই পথে খানিকটা এগিয়ে সুড়ঙ্গের খোলা মুখের কাছে যেতেই টাট্‌কা বাতাস পাওয়া গেল। ঘন ঝোপঝাড়ে ঢাকা সুড়ঙ্গের মুখ নজরেই পড়ে না। হাওয়া চলাচলের আর একটা পথ হল ছোট্ট মাপের কয়েকটা ঘুলঘুলি। এক তলার ভিতের কাছে তাঁর খোলামুখ আগে দেখতে পাননি তিনি। সুড়ঙ্গের মুখের কাছে প্রায় চুণ হয়ে যাওয়া একটা কঙ্কাল!

সুড়ঙ্গটা নিশ্চয়ই ওলন্দাজ হার্মাদদের কীর্তি! চিকিৎসক কেন সুড়ঙ্গ তৈরি করবেন? কঙ্কালটা কার? আড়েবহরে বেশ বড়ো মাপের। সচরাচর বাংলায় এত বড়ো মাপের মানুষ দেখা যায় না। একশোর ওপর বছর পার হয়ে গিয়েছে এর মৃত্যুর। এ বাড়ির আগের মালিকের কি? নাকি কোনও ওলন্দাজ দস্যুর? মনের প্রশ্ন মনেই রইল তাঁর।

মেঝের জমে থাকা জঞ্জাল পরিষ্কার করে পেট্রোম্যাক্স জ্বালাতেই ল্যাবরেটরিটা যেন প্রাণ পেল নতুন করে। নিজের জিনিসপত্র ওখানেই সাজিয়ে ফেললেন অনুকূলবাবু। মনে মনে দুশো বছর আগেকার অজানা মানুষটাকে ধন্যবাদ জানাতেও ভুললেন না। ঘরের কোনায় জমে থাকা পুরানো জঞ্জাল পরিষ্কার করতে গিয়ে দেওয়ালে এক লুকোনো কুলুঙ্গির খোঁজ পাওয়া গেল। কুলুঙ্গির মুখটা লোহার ঢাকনা দিয়ে দেওয়ালের সঙ্গে মেলানো। ওপরে চুন সুরকির আস্তরণ থাকায় চট করে বোঝা যায় না। ঢাকনা খুলতেই একটা বড়ো মাপের লোহা-কাঠের পোর্টম্যান্টো। এ- ধরনের বাক্স এখনকার দিনে দেখা যায়না। গোল ঢাকনার ওপর হাতল ধরে টানতেই সেটা বেরিয়ে এল। লোহাকাঠের তৈরি বলে উই ধরতে পারেনি। তালা ভাঙতে হল।

প্রথমে অনুকূলবাবু মনে করেছিলেন এর ভেতর জলদস্যুদের লুঠের মাল থাকতে পারে। যা পেলেন তা আরও অনেক বেশি দামী জিনিস। থাকে থাকে সাজিয়ে রাখা অনেকগুলো ভেষজবিজ্ঞানের পুঁথি, সেকেলে বাংলার লেখা- যার অনেকগুলো অক্ষর পালির সঙ্গে মেলে। আর আছে ছোট্ট ছোট্ট মাটির ঘটে অসংখ্য গাছের বীজ। একটা মোটা জাবদা খাতায় লেখা আছে কয়েক হাজার রুগীর নাম, রোগের বর্ণনা ওষুধের ফরমুলা তায় পথ্য অনুপান। এগুলোর দাম কোটি টাকার হীরে জহরতের চেয়েও বেশি তাঁর কাছে। একটা আশ্চর্য ব্যাপার হল বীজগুলো কোনো অজানা কারণে নষ্ট হয়ে যায়নি।

দুখুকে মাটি কুপিয়ে রাখতে বলে অনুকূলবাবু ঘটের বীজগুলো ভিজিয়ে রাখলেন। অঙ্কুর হওয়া বীজ মাটিতে পুঁততে হবে। তাঁর আগে বীজগুলো তৈরি করে সার দেওয়া দরকার। বর্ষা আসতে দেরি নেই। হাতে সময় বড়ো কম। একটাই চিন্তা- কোনটা কোন গাছের বীজ জানা নেই। গাছ হলে পাতা দেখে বোঝা যাবে। মহেশ কবিরাজের বনৌষধির বইতে ভালো ছবি দেওয়া আছে। এবার পড়াশুনোর মন দেবার পালা।

জমির আগাছার জঙ্গল কাটতে গিয়ে আরও অনেক দামী গাছের খোঁজ পাওয়া গেল। সবকটার নামও জানা ছিল না। পুঁথির ছবি থেকে জানা গেল। এর মধ্যে একটা নাম দেখে মাথার চুল খাড়া হয়ে উঠল অনুকূলবাবুর। বিশল্যকরণী। এই ওষধির নাম আছে রামায়ণে। শক্তিশেল অস্ত্রে মারা যাবার পর এতেই প্রাণ ফিরে পান লক্ষণ। তার মানে, মরা মানুষ বাঁচবে এতে! গাছ নয় লতা। সবুজ নয় রংটা, কালো রঙের ওপর নীলচে ডোরা কাটা। পুঁথিতে লেখা স্বয়ংপ্রভ অর্থাৎ আলো দেওয়ার ক্ষমতা আছে এর। রাতের অন্ধকারে দেখা দরকার সত্যি কি মিথ্যে।

সেদিন রাতে ঘুমিয়ে ভয়ংকর একটা স্বপ্ন দেখলেন অনুকূলবাবু। দুর্ভেদ্য জঙ্গলের মাঝে মস্ত উঁচু একটা বেদী, পাথরের সিঁড়ি বেয়ে তাঁর চূড়ায় উঠে দেখা গেল চৌকো পাথরের ওপর একটি মেয়েকে হাত-পা বেঁধে রাখা আছে। এমন সময় একজন লোক হাতে একটা কাঠের ফলক নিয়ে এসে দাঁড়াল। তাঁর সারা গায়ে উলকি আঁকা, মুখে ঈগলের মুখোশ। সূর্যের দিকে চেয়ে সে কী মন্ত্র বলতে বলতে  হাতের ফলক বসিয়ে দিল মেয়েটার বুকে। এ তো অ্যাজটেকদের সূর্যপূজা! আর দেখতে পারছে না অনুকূলবাবু। স্বপ্ন না সত্যি বুঝতেও পারছেন না। আবার এ কী দেখছেন? সন্ধের আঁধারে কে এসে দাঁড়াল বেদীর কাছে? তার হাতের পাত্রে ওষুধ, ঢেলে দিল মেয়েটার বুকে। মেয়েটি চোখ মেলে চাইল। তারপর উঠে বসল। প্রদীপের আলোয় দুজনকেই দেখা গেল! লোকটা যেন তাঁর মতোই দেখতে। হঠাৎ তাঁর মনের মধ্যে কে যেন বলে উঠল, “বিদ্রোহী উনাকে ভুলে গেলে? যে নরবলি বিরোধী ছিল! তুমিই তো সে জন্মের চিকিৎসক উনা, মনে নেই!”

শেষ রাতের স্বপ্ন ভেঙে উঠে বসেও ঠিক মতো স্থির হতে পারছেন না অনুকূলবাবু। গল গল করে ঘাম হচ্ছে। গঙ্গার দিককার খোলা ছাদে এসে ভোরের হাওয়ায় গা জুড়িয়ে গেল তাঁর। এতদিনকার ভুলো মনের সাদাসিধে মানুষটার ঘুমিয়ে থাকা মন জেগে উঠেছে। শুধু উনা বা জীবক নয়, পুরাণে পাওয়া ধন্বন্তরী, চরক, শুশ্রুত, হিট্টাইটদের সম্রাট চিকিৎসক সুব্বালুলাউমা পাঁচশো বছর আগে জন্ম নেওয়া কঙ্গোর জঙ্গলের ওঝা সাপায়া সবাই ছিলেন জন্মান্তরের তিনি নিজেই। চিকিৎসাই ছিল তাঁর সাধনা। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই ছিল তাঁর ধর্ম। রোগ-শোক দূর করে সুস্থ সমাজ তৈরি করাই ছিল তাঁর জন্মজন্মাতরের স্বপ্ন। সব মনে পড়ে গিয়েছে তাঁর এতদিন পর। গঙ্গার ওপর সূর্যোদয় হচ্ছে, সেদিকে চেয়ে তাঁর মন শান্ত হল। এবার কাজ করার সময়।

ছবিঃ শিবশঙ্কর ভট্টাচার্য্য

জয়ঢাকের সমস্ত গল্পের লাইব্রেরি এই লিংকে

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s