গল্প ধোঁয়াফুল অরিন্দম দেবনাথ শরৎ ২০১৭

 অরিন্দম দেবনাথ  এর সমস্ত লেখা একত্রে

সূর্য তখনও ওঠেনি। পুবদিকের আকাশটা একটু লাল হতে শুরু করেছে। কনকনে ঠাণ্ডা। ঘুম ভেঙে গেছে বুকুর। কিন্তু কাঁথার তলা থেকে বের হতে ইচ্ছে নেই ছেলেটার। টিনের চাল থেকে টুপ টুপ করে ঠাণ্ডাগুলো ঝরে পড়ছে জল হয়ে। খুব মশা। তাই মশারি টাঙানো। মা মশারির ওপর একটা কাপড় মেলে রাখে, যাতে ওই জল হয়ে খসে পড়া ঠাণ্ডাগুলো মশারির ভেতর না যেতে পারে। কুয়াশার মতো ঝরে পড়া জলগুলো কাপড়টাকে ভিজিয়ে দেয়।

ভতরা পাহাড়ের কোলে এই ভুতরা গ্রামে এই একটাই টিনের চাল দেওয়া বাড়ি, যার দেওয়াল আবার ইটের। বাকি আরও যে ক’টা বাড়ি আছে সেগুলোর চালগুলো সব খড়ের আর দেওয়াল মাটির। খড়ে ছাওয়া ঘরগুলো টিনের চালের চেয়ে গরম। কিন্তু বর্ষাকালে জল পড়ে এখান ওখান থেকে। তাছাড়া বর্ষাকালে খুব পোকা হয় খড়ের চালে। আর অনেক সময় সাপেরা বাসা বানায় ওই খড়ের মধ্যে। খড়ে ছাওয়া বাড়িগুলোর দেওয়ালগুলো সব মাটির। দেওয়ালগুলো খুব সুন্দর করে মাটি দিয়ে লেপা, আর অধিকাংশ বাড়ির দেওয়ালের ওপর সাদা রঙ দিয়ে আলপনা আঁকা। নানাধরনের নক্সা অথবা জীবজন্তুর ছবি।

গ্রামের লোকেরা যে খুব গরিব তা নয়। অধিকাংশ পরিবারের কেউ না কেউ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চাকরি করে। দুয়েকজন বয়স্ক লোক বাদ দিলে গ্রামের সবাই লিখতে পড়তে পারে। অদ্ভুতভাবে গ্রামের কোনও পরিবারই পাকাবাড়ি বানাতে চায় না। সবাই জন্ম থেকে দেখে আসা মাটির বাড়ি আর খড়ের চালই পছন্দ করে। প্রায় সবার বাড়িতেই টেলিভিশন আছে। এমনকি দুয়েকজনের বাড়িতে কম্পিউটারও আছে। সৌরশক্তি অথবা গোবর-গ্যাস চালিত বিদ্যুতের ব্যবস্থা সবার ঘরে। শুধু কাছাকাছি গাড়ির রাস্তায় পৌঁছতে হলে দু’ঘণ্টা হাঁটতে হয়। কিন্তু এটা নিয়ে আক্ষেপ নেই গ্রামের কারও।

দাদুর ডাকাডাকিতে আর শুয়ে থাকা হল না বুকুর। তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে উঠে, হাতমুখ ধুয়ে স্কুলের পোশাক পরে নিল বুকু। গরম ভাত খেয়ে টিফিন কৌটো ব্যাগে ভরে বুকু ছুটল স্কুলে। বুকুদের স্কুলে টিফিন দেয়। তবুও বুকুর মা আলাদা করে টিফিন কৌটোয় খানিক খাবার দিয়ে দেয় বুকুর জন্যে।

বুকুদের স্কুলটা অন্য স্কুলের থেকে একদম আলাদা। জঙ্গলের মাঝে অজস্র গাছপালার মধ্যে ঘরগুলো সব লুকিয়ে আছে। ঘরগুলো সব ইটের, কিন্তু বাইরের দেওয়ালগুলোতে গাছপালা আঁকা। বুকুরাই সব এঁকেছে। দু’তিন বছর পর পর ছবিগুলো নতুন করে আঁকা হয়। খুব সামনে না গেলে বোঝাই যায় না যে ওগুলো সব পাকাবাড়ি। বুকুরা শুনেছে, এক বিদেশি সাহেব নাকি এই বাড়িগুলো নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তৈরি করেছিল বহু বছর আগে। বুকুর বাবাও এই স্কুলে পড়ত।

বুকুর বাবা মিলিটারিতে কাজ করে। অনেক দূরে থাকে। বুকুদের স্কুলে অনেক বই আছে। বিশাল বড়ো লাইব্রেরি। আর আছে অনেকগুলো কম্পিউটার। বুকুর বাবা একটা কম্পিউটার স্কুলকে কিনে দিয়েছে।

স্কুলের মাস্টারমশাইরা খুব ভালো। স্কুলে বকাবকি মারধোর একদম নিষিদ্ধ। মাস্টারমশাইরা এমনভাবে পড়া পড়ান যে সবকিছু মাথার মধ্যে ছবি হয়ে বসে যায়। বুকুদের বাড়ি থেকে স্কুল প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে। খুব বেশি হলে হেঁটে কুড়ি মিনিট লাগা উচিৎ। কিন্তু বুকুর লাগে প্রায় একঘণ্টা।

বুকু ক্লাস ফোরে পড়ে। ওদের গ্রামের আরও কয়েকটা ছেলেমেয়ে ওই একই স্কুলে পড়ে। কিন্তু বুকু ওদের সঙ্গে যায় না। গাছপালার ফাঁক দিয়ে পায়ে চলা রাস্তা দিয়ে একা একা হেলতে দুলতে স্কুলে যায় বুকু। চলার পথের দু’পাশের গাছপালাগুলো সব ওর বন্ধু। ও সবক’টা গাছকে খুব ভালো করে চেনে। ও জানে কখন গাছে ফুল ফুটবে, কখন গাছে পাতা ঝরে নতুন পাতা আসবে, কখন ফল হবে। গাছগুলোর সাথে কথা বলতে থাকে বুকু আপন মনে। ওর স্কুলের বন্ধুরা ওকে পাশ কাটিয়ে চলে যায় মুচকি হেসে। ওদের স্কুলের অঘোষিত নিয়ম, কারও আচরণ যদি তোমার পছন্দ না হয় তাহলে তাকে কিছু বলতে পারবে না। মাস্টারমশাইদের জানাতে হবে। তিনি সেই ছাত্রের সাথে কথা বলে তাকে শোধরাবেন। বুকুর বন্ধুরা বুকুর এই স্বভাবটা, মানে বুকুর গাছেদের সাথে বিড়বিড় কথা বলা, গাছেদের সামনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা এসব বুকুর ক্লাস টিচারকে জানিয়েছিল। তিনি একদিন স্কুল ছুটির পর লুকিয়ে লুকিয়ে বুকুর কার্যকলাপ লক্ষ করেন। আর তার পরদিন তিনি ওর বন্ধুদের চুপিচুপি ডেকে বলেন, “বুকু খুব স্বাভাবিক, আর ও গাছপালা জন্তুজানোয়ারদের খুব ভালোবাসে। তাই স্কুলে আসার সময় আর স্কুল থেকে ফেরার সময় গাছপালার মাঝে খানিক সময় কাটায়। তোমারা ওকে কেউ বিরক্ত করবে না।”

বুকুদের গ্রামের আশেপাশের জঙ্গল পাহাড়ে ভালুক আর হাতির বাস। আর আছে অজস্র পাখি। বুকুর বন্ধুরা শুধু একটা কথা জানে না যে জঙ্গলের ভালুক, পাখি আর হাতিগুলো ওর বন্ধু। কয়েকটা খরগোশ সকালবেলা জঙ্গলের ঝোপে লুকিয়ে অপেক্ষা করে কখন বুকুর পায়ের শব্দ পাওয়া যাবে। বুকুর পায়ের শব্দ পেলে ওরা টুক করে জঙ্গলের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে, আর বুকু ওদের কোলে তুলে একটু আদর করে আবার নামিয়ে দেয়। আর ওরা আবার জঙ্গলে ঢুকে পড়ে। কয়েকটা শালিকপাখি বুকুর এত প্রিয় যে ওর কাঁধে এসে বসে।

ভালুকগুলো বুকুর বন্ধু হয়ে ওঠার পেছনে একটা গল্প আছে। একদিন স্কুল থেকে ফেরার সময় বুকু শোনে জঙ্গলের ভেতরে একটা জন্তু কাঁদছে। গাছপালার ভেতর দিয়ে বুকু এগিয়ে দ্যাখে, একটা ভালুকের বাচ্চা কাঁদছে। ওর ঘাড়ের কাছে মস্ত একটা ঘা। খানিক দূরে একটা ফাঁকা জায়গায় অনেকগুলো ভালুক বসে আছে। বুকু কোনওরকম ভয় না পেয়ে ভালুকের বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নিল। কী আশ্চর্য, ভালুকছানাটা কান্না বন্ধ করে দিল! দূরে যে বড়ো বড়ো ভালুকের দল বসে আছে তাতে কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই বুকুর। একটা ভালুক শুধু খানিকটা এগিয়ে এল আর তারপর আবার শুয়ে পড়ল মাটিতে। সম্ভবত মা-ভালুক। ভালুকটার চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছিল। বুকুর চোখ দিয়েও জল বেরিয়ে এল। ওর হঠাৎ মনে পড়ল একটা গাছের কথা। বুকু ভালুকছানাটাকে মাটিতে নামিয়ে রেখে ছুট লাগাল ওর একটা প্রিয় গাছের দিকে।

বুকু এই গাছটার নাম দিয়েছে ধোঁয়াফুলের গাছ। কাঁটা কাঁটা পাতাওয়ালা এই গাছটায় অদ্ভুত সুন্দর ফুল হয়। ফুলগুলো একটা বাটির মতো। আর তার ভেতর সাদা চুলের মতো আঁশ। সেগুলো আবার কখনও কখনও শুঁড়ের মতো বাটির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে। সেগুলো যখন হাওয়ায় দোলে তখন দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন ধোঁয়া বের হচ্ছে। বুকু এই জঙ্গলে এই একটাই ধোঁয়াফুলের গাছ দেখেছে।

বুকু একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে জঙ্গলের ঘুরতে ঘুরতে এই গাছটা দ্যাখে। গাছটা খুব ভালো লাগে বুকুর। মাঝে মাঝে বুকু ওই গাছটার কাছে যায়। কেন যে কালচে পাতার গাছটা বুকুকে টানত বুকু নিজেও বুঝত না।

একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে বুকু গাছটার কাছে গিয়ে দ্যাখে একটা হলদে রঙের লম্বা ঠোঁটওয়ালা পাখি গাছটার তলায় বসে আছে, আর ওর ঠোঁটের কাছে একটা ঘা। ঘাটা থেকে রক্ত পড়ছে। তখনই একটা ফুল টুপ করে গাছ থেকে পড়ল,  আর পাখিটা গিয়ে ওই ফুলটার ভেতরে ঠোঁটটা ঢুকিয়ে দিল। খানিক পরে যখন ঠোঁটটা ফুল থেকে বের করল তখন ওর ঠোঁট দিয়ে আর রক্ত পড়ছে না। বুকু ছোটো হলেও বুঝল ওই ফুলটার মধ্যে এমন একটা কিছু আছে যা রক্ত পড়া বন্ধ করে দেয়। ছুটতে ছুটতে বুকু ধোঁয়াফুলগাছের কাছে গিয়ে দেখল, একটাও ধোঁয়াফুল নিচে পড়ে নেই। বুকু দেখেছে গাছের নিচে পড়া ফুলেই রোগ সারে। কোনও পাখি পর্যন্ত গাছের ওই ফুল ছোঁয় না যতক্ষণ পর্যন্ত না ফুল নিজে থেকে মাটিতে পড়ে।

বুকু গাছের তলায় বসে রইল। মনে রইল না বাড়ি যাবার কথা। আচমকা একটা জোর হাওয়া উঠল আর একটা ফুল খসে পড়ল। বুকু ফুলটা নিয়ে ছুটল জঙ্গলের মাঝে যেখানে ভালুকছানাটা দেখেছিল। সেখানে গিয়ে দেখল ভালুকগুলো এখনও বসে আছে আর ভালুকছানাটা আবারও কাঁদছে। বুকু একছুটে গিয়ে বাচ্চা ভালুকটাকে কোলে তুলে নিল। তারপর ওর গায়ে খানিক হাত বুলিয়ে মাটিতে নামিয়ে রাখল বাচ্চাটাকে। তারপর ফুল থেকে আঁশগুলো বের করে দু’হাত দিয়ে সেগুলো ডলল। খানিক রসমতো বের হল তা থেকে। কী করতে হবে না বুঝে বুকু ফুলের আঁশ আর রস সবসুদ্ধু চেপে ধরল ভালুকবাচ্চাটার ঘাড়ের ঘাটার ওপর। খানিক ছটফট করার পর ভালুকবাচ্চাটা শান্ত হয়ে গেল। বুকু ভালুকবাচ্চাটাকে কোল থেকে নামিয়ে দিতে ভালুকবাচ্চাটা বুকুর পাটাকে চেটে টুক টুক করে চলে গেল ওর মার কাছে। আশ্চর্য! সবক’টা ভালুক চুপ করে শুয়ে বসে ছিল দূরে।

মাথার ওপর দিয়ে অনেকগুলো টিয়াপাখির ঝাঁক উড়ে গেল টি টি করতে করতে। যেন খানিক বকে গেল বুকুকে। হুঁশ ফিরল বুকুর। এই পাখিগুলো সব বুকুর বন্ধু। স্কুল থেকে ফেরার সময় মা যে টিফিনটা বুকুকে দিয়ে দেয়, বুকু সেগুলো এই পাখিদের খাওয়ায়। সেদিন বাড়ি ফিরে মা’র কাছে খুব বকা খেয়েছিল বুকু।

পরদিন স্কুলে পৌঁছতে দেরি হয়ে গেছিল বুকুর। স্কুলে যাবার পথে ভালুকের দলের দেখা পেয়েছিল বুকু। অনেকদূরে জঙ্গলে খাবার খুঁজছিল ওরা। সেই বাচ্চা ভালুকটাও দলে ছিল। ওর কালো শরীরে গলার কাছে খানিক সাদা লোম আছে। আর সেটাই ওকে দূর থেকে চিনিয়ে দিল বুকুকে। খুব আনন্দ পেয়েছিল বুকু ভালুকটাকে দেখে। স্কুলে আসার তাড়া ছিল বলে ভালুকগুলোর কাছে যায়নি বুকু।

আজ স্কুলের স্পোর্টস ছিল। বুকু খুব ভালো দৌড়তে পারে। আজ দু-দুটো বিশেষ পুরস্কার পেল বুকু। ওদের স্কুলে খুব  মজা হয়। সবাইকে সব বিষয়ে যোগ দিতে হয়। আর সবাই পুরস্কার পায়। যারা খুব ভালো ফল করে তাদের জন্যে থাকে  বিশেষ পুরস্কার।

সূর্য মাথার ওপর উঠে গেছে। বাড়ির দিকে দৌড় দেয় বুকু। দূর থেকে দেখতে পায়, মা দাঁড়িয়ে আছে। মা কিছু বলার আগেই বুকু মা’র হাতে বিশেষ পুরস্কারদুটো গুঁজে দিল। মা দাদুকে পুরস্কারদুটো দেখাতে নিয়ে গেল। বুকুর এইসব পুরস্কার-টুরস্কারের প্রতি বিশেষ কোনও উৎসাহ নেই। বুকু একছুটে ঘরে ঢুকে স্কুলের জামাকাপড় বদলে কুয়োপাড়ে গিয়ে বালতি দিয়ে জল তুলে হাতমুখ ধুয়ে মাকে বলল, “মা, খুব খিদে পেয়েছে।”

সেদিন মা বুকুর জন্যে ওর প্রিয় খিচুড়ি বানিয়েছিল। ফুলকপি, সিম আর টম্যাটো দিয়ে। ফুলকপি, সিম, টম্যাটো সব বুকুদের নিজেদের ক্ষেতের। আর বুকু ওর দাদুর সাথে রোজ চাষের ক্ষেতে হাত লাগায়। ওদের এলাকায় খুব ভালো ফসল ফলে। কিন্তু হাতি বা ভালুক, কোনও জন্তুজানোয়ার এসে ক্ষেতের ফসল নষ্ট করে না। কারণ, ওদের গ্রাম বা আশেপাশের গ্রামের লোকেরা কেউই জঙ্গলের ক্ষতি করে না। ফলে জঙ্গলের জন্তুজানোয়াররা জঙ্গলে প্রচুর খাবার পায়। ওদের জঙ্গলে প্রচুর কলাগাছ আছে। এমনকি আখও হয় প্রচুর। গ্রামের লোকেরা পালা করে ওই কলা আর আখের পরিচর্যা করে আসে মাঝে মাঝে। হাতিরা এটা ভালো বোঝে।

মাঝে মাঝে হাতিরা ওদের গ্রামের কাছাকাছি আসে, কিন্তু গ্রামে ঢোকে না। শুধু গরমকালে গ্রামের বাইরে যে বড়ো পুকরটা আছে, যাতে সারাবছর প্রচুর জল থাকে, সেটাতে এসে মাঝে মাঝে গা ডুবিয়ে বসে থাকে।

দুপুরের খাওয়া হলে বুকু ওদের বাড়ির লেবুগাছটার কাছে চলে গেল। ওই গাছে দুটো চড়াইপাখির বাস। বুকু ওদের রোজ চাল খাওয়ায়। চড়াই পাখিদুটো ওর হাত থেকে চাল খুঁটে নিয়ে যায়। বুকু ওই গাছের কাছে বসে ওর স্কুলের পড়া পড়ে। ওদের স্কুল থেকে বাড়ির জন্যে কোনও আলাদা পড়া দেয় না। কারণ, স্কুলে মাস্টারমশাইরা যা পড়ান সেটা যথেষ্ট। তবুও মাস্টারমশাইরা বলেন, স্কুলে যা পড়ানো হয়, পারলে বাড়িতে সেটা একবার ঝালিয়ে নিতে। বুকু মাঝে মাঝে টিভিতে ডোরেমন দেখে।

ঠিক দুটোর সময় বুকুর দাদু ডাক দিল, “বুকু, চল বেগুনক্ষেত থেকে ঘুরে আসি।”

রোজ বুকু ওর দাদুর সাথে ওদের চাষ দেখতে যায়। ওর দাদু বলে, এতে শরীর আর মন দুটোই ভালো থাকে। আর বুকুর তো নিজেরই গাছপালার সাথে সময় কাটাতে ভালো লাগে।

বুকু দাদুর সাথে গিয়ে বেগুনক্ষেতে পৌঁছে দেখল যথারীতি প্রচুর বেগুন হয়ে আছে। এত বেগুন তো আর নিজেরা খাওয়া যায় না, তাই অনেকটাই সব্জিওয়ালারা কিনে নিয়ে যায়। দূর শহরে বিক্রির জন্যে। ওরা দু’দিন পরে আসবে ক্ষেত থেকে বেগুন তুলতে। বুকুর গাছ থেকে কিছু ছিঁড়তে ভালো লাগে না। কিন্তু দাদু বলে এটাই প্রকৃতির নিয়ম। এটা প্রকৃতির কীরকম নিয়ম বুকু বোঝে না। খালি বোঝে মানুষকে বাঁচতে হলে খেতে হবে, আর জন্তুজানোয়ারদেরও ঠিক তাই।

বুকু বেগুনক্ষেতে ঘুরতে ঘুরতে দেখে একটা গাছের নিচে একটা শালিকপাখি পড়ে আছে। কাছে গিয়ে দেখল, পাখিটা বেঁচে আছে। দাদুও দেখেছিল পাখিটা। কাছে এসে বলল, “ওর ডানাতে চোট লেগেছে।”

বুকু পাখিটাকে হাতে তুলে নিল। পাখিটা ঠোঁটদুটো ফাঁক করছে বার বার। বুকুর দাদু বলল, “ওর জল তেষ্টা পেয়েছে।”

বুকু সাথে সাথে পাখিটাকে দাদুর হাতে দিয়ে ছুটল জল আনতে। বুকু জানে, দাদুও পশুপাখি খুব ভালোবাসে। পুকুর থেকে পাতার বাটি বানিয়ে জল নিয়ে এল বুকু। পাখিটার ঠোঁটের কাছে জল ধরতে পাখিটা ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে জিভ বার করে জল খেল। বুকু পাখিটা বাড়ি নিয়ে আসতে চাইল। দাদু বলল, “পাখিটাকে কোনও গাছের তলায় রেখে দিতে। ভালো হবার হলে এমনিতেই হবে, না হলে মরে যাবে। বুকুর মন মানল না। কিন্তু দাদুর অবাধ্য হওয়া যায় না। তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও একটা বড়ো কাঁঠালগাছের তলায় কতগুলো শুকনো পাতা বিছিয়ে একটা বাসা বানিয়ে তার ওপর পাখিটাকে বসিয়ে দিল বুকু। রাত্তিরে খুব ঠাণ্ডা পড়ছে, পাখিটা ঠাণ্ডায় খুব কষ্ট পাবে। ওর গায়ে কি কিছু পাতা চাপা দিয়ে আসবে? বুকু দাদুকে জিজ্ঞেস করল। দাদু বুকুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, “ওদের ওসব কিছু লাগে না। ঈশ্বর ওদের শরীরে অনেক পালক দিয়েছে ওই শরীর গরম রাখার জন্যে।”

সারারাত ভালো করে ঘুম হল না বুকুর। অন্যদিনের মতো মা ডাকার আগেই ঘুম থেকে উঠে পড়ল বুকু। স্কুলে যাবার জন্যে তৈরি হয়ে রান্নাঘরে মার কাছে গেল। মা তো বুকুকে দেখে অবাক। ভাত এখনও হয়নি। ভালো করে আলোও এখনও ফোটেনি। আর ছেলে কিনা স্কুলে যাবার জন্য তৈরি!

বুকু ওর মাকে বলল, ওর ভাত খেতে ইচ্ছে করছে না। ও মুড়ি খাবে। মা কিছু কথা না বলে ওকে একবাটি মুড়ি আর মিছরি খেতে দিল। বুকু খানিক মুড়ি খেয়ে আর খানিক মা’র অজান্তে ভরে নিল পকেটে। তারপর ব্যাগ কাঁধে বেরিয়ে পড়ল স্কুলে যাবার জন্যে। দাদুও বুকুকে এত ভোরবেলা তৈরি হয়ে স্কুলে যেতে দেখে খানিক অবাক। তারপর খানিক মুচকি হেসে বললেন, “সাবধানে যেও ভাই। বেগুনগাছের কাঁটা সামলে।”

বুকু খানিক অবাক হয়ে গেল। দাদু বুঝল কী করে যে ও এখন পাখিটাকে দেখতে যাচ্ছে! বুকু কোনও কথা না বলে ছুট লাগাল বেগুনক্ষেতে। এখনও ভালো করে আলো ফোটেনি। কুয়াশায় পা পিছলে দু’বার পড়ে গেল বুকু।

বেগুনক্ষেতে পৌঁছে দেখল, পাখিটা পালকে মুখ গুঁজে পড়ে আছে। বুকু ওর গায়ে হাত দিতে ও খানিক ছটফট করে উঠল। বুকু পাখিটাকে দু’হাতের মধ্যে তুলে নিল। কয়েকটা মুড়ি গুঁজে দিল ওর ঠোঁটে। তারপর স্কুলের দিকে চলতে শুরু করল।

একসময় বুকু পৌঁছল ওর সেই প্রিয় ধোঁয়াফুলগাছের নিচে। একটাও ফুল পড়ে নেই গাছের নিচে। বুকু কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। আজ ওর স্কুলে যাওয়াটা জরুরি। আজকে ওদের প্রথম মানচিত্র পাঠ শুরু হবে। আর বুকুর খুব ভালো লাগে ম্যাপ দেখতে। বুকু পাখিটাকে নামিয়ে রাখল পায়ের কাছে। কতগুলো ঝরা পাতা দিয়ে একটা বিছানা করে তাতে পাখিটাকে বসিয়ে দিল। তারপর পাখিটার গায়ে হাত বুলিয়ে ছুট লাগাল স্কুলের দিকে।

আজকে বুকুদের স্কুলে খুব মজা হল। কোনও পড়াশুনা হল না। একজন ম্যাজিশিয়ান অনেক ম্যাজিক দেখাল। ফাঁকা টুপি থেকে খরগোশ বের করল। তাসের খেলা, দড়ির খেলা, অনেকে অনেক খেলা দেখাল। স্কুল খানিক আগে ছুটি হয়ে গেল। বুকু ম্যাজিক দেখতে দেখতে ভুলে গেছিল পাখিটার কথা। মনে পড়তে ও ছুট লাগাল ধোঁয়াফুলগাছের দিকে। বুকু ধোঁয়াফুলগাছের কাছে পৌঁছে দেখে পাখিটা নেই। বুকুর চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগল। গাছের তলায় দু’পা ভাঁজ করে তাতে মুখ গুঁজে বসে রইল বুকু।

মাথার ওপর দিয়ে টি টি করে একঝাঁক টিয়াপাখি উড়ে বেড়াচ্ছে। অন্য সময় হলে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত বুকু। হাত নেড়ে পাখিদের ডাকত। আজ আর কোনও কিছু আর কানে ঢুকছে না বুকুর। ওর মন ভালো নেই।

পায়ে কিছুর ছোঁয়া লাগল বুকুর। মুখ তুলল বুকু। ওর চোখ জলে ভর্তি। কিছু দেখতে পারছে না বুকু। দু’হাতে চোখ কচলে পায়ের দিকে তাকাল বুকু। ঠোঁটে ধোঁয়াফুল নিয়ে বসে আছে শালিকপাখিটা।

ছবিঃ মৌসুমী

জয়ঢাকের গল্পঘর

Advertisements