গল্প প্রতীক্ষা রাজকুমার রায়চৌধুরী শরৎ ২০১৭

  রাজকুমার রায়চৌধুরী  র সমস্ত লেখা একত্রে

।।এক।।

বাস থেকে সবে নেমেছি। হঠাৎ একটা লোক প্রায় মাটি ফুঁড়ে উঠে এল। কালো ঢ্যাঙা চেহারা, চোয়াড়ে মুখ। ঢোলা প্যান্টের উপর ময়লা হলুদ পাঞ্জাবি।

“আমার নাম ভবতারণ। আপনার নাম তাহলে প্রাণগোপাল?”

আমি রেগে গিয়ে বললাম, “আমি ভবতারণ বলে কাউকে চিনি না।”

বলেই মনে হল, বন্ধু হয়তো রাস্তা চিনতে কাউকে পাঠিয়েছে। এমনই ক্যাবলা লোক যে আমার নামটাই ভুলে গেছে।

“না না, আপনার নাম প্রাণগোপাল। না হলে আমার নাম ভবতারণ নয়। আচ্ছা, আমার নাম ভুজঙ্গ। তা হলে আপনার নাম হরিপদ।”

আচ্ছা পাগলের পাল্লায় পড়া গেছে। আমি চুপচাপ হাঁটা শুরু করলাম। সন্ধে হয়ে গেছে। শহরতলির নির্জন রাস্তা। খানিকটা হেঁটে মাঠ পার হয়ে বন্ধুর বাড়ি। কিন্তু কী মুস্কিল, পাগলটাও আমার সঙ্গে হাঁটা শুরু করল!

“আচ্ছা, আমার নাম শশিকান্ত যদি, আপনার নাম বঙ্কুবিহারী হয়।”

“দেখুন, আপনার নাম জানবার আমার কোনও ইচ্ছে নেই। আপনি আমাকে ফলো করবেন না।”

আমার একটু ভয় করতে লাগল। ছিনতাইবাজ নয়তো, পাগলের অভিনয় করছে?

“স্যর, আমার নামটা আমি ভুলে গেছি। কিন্তু আপনার নামটা ঠিক জানলে আমার নামটাও মনে পড়বে। ওহো স্যর, আপনার নাম নন্দদুলাল। তাহলে আমার নাম বিরূপাক্ষ, বিরূপাক্ষ সামন্ত।”

“আমার নাম বিকাশ রায়। হয়েছে তো? এবার ফিরে যান।”

“না না, হতেই পারে না।” মাথা দুলিয়ে লোকটা বলে উঠল। “তাহলে আমি ছবি বিশ্বাস। আমার নাম ছবি বিশ্বাস নয়, সত্যি বলছি, স্যর।”

ইতিমধ্যে মাঠ পেরিয়ে বন্ধু পরিমল মৈত্রের নির্দেশিত গলিতেও ঢুকে পড়েছি। পরিমল যা বলেছিল, হুবহু মিলে যাচ্ছে। একদিকে কয়েকটা পুরনো বাড়ি, অন্যদিকে একটা কারখানার উঁচু দেয়াল। বাড়িগুলোতে টিম টিম আলো জ্বলছে। কিন্তু গেটের থামে বাসিন্দাদের নাম লেখা৷ এখনও পুরো অন্ধকার নামেনি। নামগুলো পড়া যাচ্ছে। প্রথম বাড়িটায় দুটো নাম লেখা, ভবতারণ মল্লিক, প্রাণগোপাল মল্লিক। পরের বাড়িটাতে তিনটে নাম – ভুজঙ্গ প্রামাণিক, হরিপদ প্রামাণিক, মিতালি প্রামাণিক। নামগুলো পড়ে অস্বস্তিতে পড়লাম। এই নামগুলোই তো পাগলটা আওড়াচ্ছিল। অবশ্য স্বাভাবিকভাবেই মিতালির নাম বলেনি। এদিকে তো টনটনে জ্ঞান। তবে কি পরের বাড়িতে দেখব? ঠিক তাই। তৃতীয় বাড়িতেও তিনটে নাম। শশীপদ রায়, সুনন্দা রায়, বঙ্কুবিহারী রায়।

হঠাৎ কী মনে হল, পাশে তাকিয়ে দেখলাম পাগলটা নেই। পেছনে ফিরেও দেখতে পেলাম না। হয়তো কাছেই কোনও ঝুপড়িতে থাকে। বোঝাই যাচ্ছে, এইসব বাড়ির নামগুলো ওর মাথায় ঘোরে। এটাই ওর পাগলামি। এরপর আর একটা বাড়ি, তারপর বাচ্চাদের খেলার ছোটো একটা পার্ক। পার্কের প্রায় পাশ ঘেঁষে কতকগুলো ফ্ল্যাটবাড়ি। দ্বিতীয় বাড়িটার তিনতলায় পরিমলের ফ্ল্যাট। আমি এবার নিশ্চিত, শশিপদের পরের বাড়িতে বিরূপাক্ষর নাম পাব। ঠিক তাই। তবে চারজনের নাম লেখা – বিরূপাক্ষ, মোহন, অনুরাধা ও সুজিত। সবাই সামন্ত। কিন্তু নন্দদুলালের নাম পেলাম না। ওটা হয়তো পাগল নিজের মাথা থেকে বার করেছে।

।।দুই।।

পরিমলের বাড়ি পৌঁছতেই দেখলাম ও বাড়ির নীচে আমার জন্যে অপেক্ষা করছে। তিনতলায় একসঙ্গে উঠলাম। পরিমল এখন ক’দিন একাই আছে। স্ত্রী শ্রেয়া ও পরিমলের দশ বছরের মেয়ে মাধুরী শ্যামবাজারে পরিমলের শ্বশুরবাড়ি গেছে। সিঁথির মোড়ে কী একটা সার্কাস হচ্ছে, মামার সঙ্গে মাধুরী দেখতে যাবে। তিনতলায় পরিমলের ফ্ল্যাটে ঢুকে সোফায় আরাম করে বসে ওকে পাগলটার গল্প শুরু করতে বলল, “এখন থাক, বরং কফি খাওয়া যাক। পরে তোর গল্প শুনব’খন।”

পরিমল আমার স্কুলের বন্ধু। কলেজেও দু’বছর এক সঙ্গে পড়েছি। পরে ও ইকনমিক্স নিয়ে পড়ে। পিএইচডি করে একটা বিদেশি ব্যাঙ্কে কাজ করে। শহরতলিতে ফ্ল্যাট কিনেছে, কারণ সস্তায় বড়ো ফ্ল্যাট পেয়েছে। নিজের গাড়ি নিজেই চালায়। অফিস যাতায়াতের সমস্যা নেই। স্কুল-কলেজে সবরকম খেলাধুলোয় পারদর্শী ছিল। এখনও সুগঠিত চেহারা। মাঝারি হাইট। শ্যামলা রঙ। মুখে এখনও ছেলেমানুষী ভাব আছে।

আমি ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে সল্টলেকে একটা আইটি কোম্পানিতে কাজ করি। সল্টলেকেই একটা ফ্ল্যাট কিনেছি। স্ত্রী সংযুক্তা সল্টলেকের একটা স্কুলে পড়ায়। ন’বছরের সন্তান শৌনক সল্টলেকের একটা স্কুলে পড়ে। সংযুক্তার বাবা-মা সল্টলেকেই থাকেন। স্কুল ছুটির পর শৌনক দাদু-দিদিমার কাছে চলে যায়। বিকেলে ওখানেই খেলাধুলো করে। সন্ধেবেলা সংযুক্তা ওকে বাড়ি নিয়ে আসে।

কফি খেতে খেতে পরিমলকে পাগলের গল্পটা তারিয়ে তারিয়ে বললাম। পরিমল চুপচাপ শুনল।

“তুই বোধহয় ভবাপাগলার খপ্পরে পড়েছিলি।”

“ভবাপাগলা?”

“হ্যাঁ, ওর আসল নাম কেউ জানে না। আর জানতেও পারবে না। প্রথমে ও নিজেকে ভবতারণ মনে করত। তাই ভবাপাগলা হিসেবেই লোকে ওকে জানত। কিন্তু ও নিজের আরও কতকগুলো নাম সাজেস্ট করল। সবচেয়ে মজার ব্যাপার, ওর মতে আমার নাম না জানলে ওর নিজের নাম জানতে পারবে না। তোকে যে নামগুলো বলেছিল, তাদের কেউ বেঁচে নেই।”

“কী বলছি তুই! এর আগের তিনটে বাড়িতে ওই নামগুলো দেখলাম। টিমটিম করে হলেও আলো জ্বলছে! অবশ্য কিছু মহিলাদের নামও… ওগুলো ভূতুড়েবাড়ি বলতে চাস?”

“না না, ওগুলো ভূতুড়েবাড়ি নয়। শোন, এখন ওসব কথা ছেড়ে দে। আমরা পুরনো দিনের গল্প করি। খাওয়াদাওয়ার পর ভবাপাগলার গল্প হবে। আজ আমার হাতের রান্না খাবি।”

পরিমল খুব ভালো রাঁধে আমি জানি।

“আজ রাতের মেনু কী?”

“ভাত, মুগের ডাল, ফুলকপি চিংড়ি সহ আর কষা মাংস। রুটিও আছে। রুটি অবশ্য পাড়ার দোকান থেকে আনা। ভাত-ডাল অনিমা, মানে আমার কাজের লোক করে দিয়ে গেছে। ফুলকপি, মাংস আমার রাঁধা। এ দুটো তোর ফেভারিট, তাই না? তবে তোর সবচেয়ে প্রিয় পোস্তবড়া নেই।”

আমি বললাম, “পোস্তর দরকার নেই। যা বললি, তাতেই তো ডি লা গ্র্যান্ডি মেফিস্টোফিলিস!”

ছোটবেলার গল্প করতে করতে কত রাত হয়েছে বুঝতে পারিনি। মোবাইলে সংযুক্তার ফোন আসতে দেখলাম, রাত দশটা বেজে গেছে। পরিমল বলল, “বউকে বল, রাতটা এখানেই কাটাবি।”

সংযুক্তা ধরেই নিয়েছিল, রাত্রে বাড়ি ফিরব না। ও এখন বাপের বাড়িতে আছে। ও আর শৌনক তাহলে ওখানেই রাত্রে থাকবে।

পরিমল সত্যি ভালো রাঁধে৷ একটু ভালোই রাঁধে। খাওয়াটা একটু বেশিই হয়ে গেল। রাত্রে খাওয়াদাওয়ার পর পরিমল বলল, ওর কাছে একটা ভালো হাঙ্গারিয়ান ওয়াইন আছে, আমি ইন্টারেস্টেড কি না।

“টকাই?”

“কী করে জানলি?”

“আমি কিছুদিন হাঙ্গেরিতে ছিলাম। না, বুদাপেস্টে নয়, দেবরিসেনে। ওখান থেকে টকাই প্রভিন্সে গিয়েছিলাম। ওখানকার ওয়াইন খুব বিখ্যাত।”

টকাইয়ে একচুমুক দিয়ে পরিমল বলল, “তোকে খাবার আগে বলিনি। হয়তো ভালোভাবে খেতে পারতিস না।”

“কেন বল তো?”

“ভবাপাগলা দু’বছর হল মারা গেছে।”

আমি বললাম, “সে কী? আমি তাহলে ভবাপাগলার ভূতের সঙ্গে কথা বললাম! দেখ, আমি ভূতপ্রেতে বিশ্বাস করি না।”

“সেটা আমি জানি। তবে তুই একা নস। গত দু’বছরে বেশ কয়েকজনই ভবাপাগলাকে বাসস্ট্যান্ডে দেখেছে। আশা করি, তুই নিজের নামটা বলিসনি। তবে বিকাশ রায় ইজ ভেরি গুড। হা হা হা…”

“কিন্তু আমার আসল নাম বললে কী হত?”

আমার প্রশ্ন শুনে পরিমল একটু গম্ভীর হল, “গতবছরে এক ভদ্রলোককে বাসস্টপের কাছে প্রায় অর্ধমৃত অবস্থায় রাস্তায় পড়ে থাকা অবস্থায় পাওয়া যায়। বয়স পঞ্চান্নর কাছাকাছি। পাড়ার লোকেরা ধরাধরি করে কাছের একটা নার্সিংহোমে নিয়ে যায়। কিন্তু ওঁকে বাঁচানো যায়নি। সেই রাত্রেই মারা যান। ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক। ডাক্তার ভুঁইয়ার মতে, মানে নার্সিংহোমের যে ডাক্তার ওঁকে দেখছিলেন, ভদ্রলোক নাকি হঠাৎ একটা সাংঘাতিক শক পান। সেটা ভয়ও হতে পারে।”

“ভদ্রলোকের নামটা কী?”

“শশীপদ।”

“শশীপদ?”

“আরে না, তুই যা ভাবছিস তা নয়।” আমার আঁতকে ওঠা দেখে পরিমল আশ্বস্ত করে, “এনার পুরোনাম শশীপদ সাঁপুই। বড়ো রাস্তার উল্টোদিকের এক গলিতে ওঁর বাড়ি। তাছাড়া, এ-পাড়ার শশীপদ তো কয়েকবছর আগে মারা গেছে।”

“কিন্তু প্রথম নামটা তো শশীপদ। ওই জন্যেই তুই জানতে চেয়েছিলি আমি আমার আসল নামটা ভবাপাগলাকে বলেছি কি না? তাছাড়া, তুই আরও কত ভূত আমদানি করবি কে জানে। ভাগ্যিস, আমার নাম শশীপদ, ভুজঙ্গ, নন্দদুলাল বা অন্য কোনও মৃতব্যক্তির নাম নয়।”

আমার কথা শুনে পরিমল হাসতে থাকে।

“আসল ব্যাপার খুলে বল তো, একটু ঝেড়ে কাশ।”

“তাহলে শোন। যে নামগুলো ভবাপাগলা তোকে বলেছিল, তারা সবাই একটা বড়ো গাড়ি ভাড়া করে মন্দারমণি বেড়াতে গিয়েছিল। যাবার পথে একটা ট্রাকগাড়িতে ধাক্কা মারে। ঘটনাস্থলেই ন’জন মারা যায়। বাকি যাত্রীদের হসপিটালে নিয়ে গেলে হসপিটাল মৃত ঘোষণা করে। গাড়ির ড্রাইভার আশ্চর্যজনকভাবে বেঁচে যায়। ওই হল ভবাপাগলা।”

আমি বললাম, “তাহলে প্রবলেম সোজা। যে ট্রাভেল এজেন্ট গাড়ি ভাড়া দিয়েছিল, তারাই তো বলতে পারবে। পুলিশের গুঁতোয় সব বেরুবে।”

“ওখানেই তো গন্ডগোল। যে ড্রাইভার কোলকাতা থেকে গিয়েছিল সে কোলাঘাটের কাছে খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে। একটা ছোটো নার্সিংহোমে তাকে ভর্তি করে ওরা খুব সম্ভবত ভবাপাগলাকে নিয়ে মন্দারমণি যাচ্ছিল। অন্তত পুলিশের তাই ধারণা। পুলিশ ওই নার্সিংহোমেরও খোঁজ পায়। কোলকাতা থেকে যে ড্রাইভার গিয়েছিল ওর নাম পাপু সিং। ও পরদিনই নার্সিংহোম থেকে ছাড়া পেয়ে বাড়ি চলে আসে। পুলিশ অনেক জেরা করেও ওর কাছ থেকে কিছু বার করতে পারেনি। ও ভবাপাগলাকে চেনে না। হ্যাঁ, একটা কথা, বিরূপাক্ষ সামন্তর কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি৷ আশেপাশের সব হসপিটাল, নার্সিংহোম এমনকি ওষুধের দোকানগুলোতে তল্লাশি চালিয়েও কিছু পায়নি।”

“হয়তো বিরূপাক্ষ গাড়ি থেকে নেমে গিয়েছিলেন সিগারেট বা পান কেনার জন্য। গাড়িটা নিশ্চয়ই ওঁর জন্য কোথাও অপেক্ষা করত।”

“বিরূপাক্ষর কোনও নেশা ছিল না। তবে অন্য কারণে নামতেই পারেন। কিন্তু গাড়ির দুর্ঘটনার খবর পেয়েছিলেন এটা নিশ্চিত করে বলা যায়।”

“তাহলে পুলিশের কাছে গেলেন না কেন? দেখ পরিমল, আমি ভূতে বিশ্বাস করি না। আর আমার যে হ্যালুশিনেসন হয়েছিল তাও মনে হয় না।”

“তাহলে তোর কী মনে হয়?”

“আমার মনে হয়, কেউ ভবাপাগলার ভূতের অভিনয় করছে। তার উদ্দেশ্য বিশেষ কাউকে খুন করা। যাতে লোকের মনে হয়, ভবাপাগলার ভূত খুন করেছে।”

আমার কথা শুনে পরিমল বলে, “রাজেশ, তুই তো আগাথা ক্রিস্টির গল্পের প্লট বলছিস!”

“দেখ, কথায় বলে ট্রুথ ইজ স্ট্রেঞ্জার দ্যান ফিকশন। পয়রোর কাজ এটা নয়, বরং লেকক এটার সমাধান করতে পারে।”

“সে আবার কে?”

“ফরাসী লেখক Gaboriau-এর ডিটেকটিভ হিরো। অবশ্য শার্লক হোমস বা পয়রোর মতো অত গ্রে ম্যাটার নেই। কিন্তু যতক্ষণ না অপরাধী ধরতে পাড়ছে বুলডগের মতো লেগে থাকবে, যেটা এক্ষেত্রে দরকার। শোন, রাত হয়ে গেছে। শুয়ে পড়া যাক। দু’জনেরই কাল অফিস আছে। নতুন কোনও ঘটনা ঘটলে জানাস।”

।।তিন।।

এরপর কয়েক সপ্তাহ কেটে গেছে। আমি আমার কাজ ও শৌনকের পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। আর পরিমল পরে শুনলাম ভুবনেশ্বর গিয়েছিল। হঠাৎ একদিন সকালে পরিমলের ফোন এল, “শোন, আর একটা মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ওই বাসস্ট্যান্ডের কাছে।”

“হার্ট অ্যাটাক?”

“না, খুন। এর আগে একজনের হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল, তাঁর নাম নন্দদুলাল। তবে আমাদের চেনা নন। উঁনি প্রাণে বেঁচে যান। কিন্তু এবারে খুন। নাম শুনলে তুই চমকাবি বলে মনে হয় না।”

“বিরূপাক্ষ সামন্ত?”

“ঠিক ধরেছিস। তোর ধারণাটাই বোধহয় সত্যি। বিরূপাক্ষকে গলা টিপে মারা হয়েছে। এখানকার লোকেদের বদ্ধমূল ধারণা, ভবাপাগলার ভূতই বিরূপাক্ষকে মেরেছে। কিন্তু থানার ওসি তোর ওই লেককের মতোই। ছ’মাস অনুসন্ধান করে ভবাপাগলার আসল নাম বার করেছে। আসল নাম নবকান্ত ঘরামি, মেচেদায় বাড়ি।”

“চলবে। ওর কি কোনও ভাই আছে?”

“তুই দেখছি ব্যোমকেশের ভাত মারবি! নবকান্ত ওরফে ভবাপাগলার একটা ভাই আছে। তবে যমজ নয়। যদিও একইরকম দেখতে। মনে হয় তুই যা ভাবছিস, পুলিশও তাই ভাবছে। বিরূপাক্ষ একটি ঘুঘু লোক। ড্রাগ থেকে নারীপাচার সব চক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিল।”

আমার একটা কথা মাথায় এল। “শোন পরিমল, ভবাপাগলা হয়তো বিরূপাক্ষকে ব্ল্যাকমেল করছিল। পরে ভবাপাগলাকে বিরূপাক্ষ মেরে ফেলে। ভবাপাগলার ভাই প্রতিশোধ নিতে বিরূপাক্ষকে মারে। ব্যস, গল্প শেষ।”

“দেখ, কেসটা এখন সিআইডি নিয়েছে। তোকে হয়তো একটা কথা বলা হয়নি। অনুরাধা, মানে বিরূপাক্ষের স্ত্রী বেঁচে আছে।”

“সেকি রে!”

“হ্যাঁ, পিকনিকের দিন ওঁর শরীর খারাপ ছিল। আর অনুরাধা বিরূপাক্ষের দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী। পুলিশ তিনদিন ধরে ওঁনাকে জেরা করেছে। কিন্তু উনি নাকি কিছুই জানেন না। বিরূপাক্ষ একটা ইনশিউরেন্স কোম্পানিতে কাজ করতেন। কাজের সূত্রে নানা জায়গায় যেতে হত। মাঝে মাঝে রাত্রে বাড়ি ফিরতেন না। আর পিকনিকের আইডিয়াটা ওঁরই। এর বেশি কিছু পুলিশ ওঁর কাছ থেকে আদায় করতে পারেনি।”

আমার আজ পুনে যেতে হবে। পরিমলের কাছ থেকে বিদায় নিলাম।

।।চার।।

খবরটা প্রথম পাতাতেই ছিল। পুনে থেকে ফিরেছি সাতদিন হল। সকালে চা খেতে খেতে বাংলা কাগজে চোখ বোলাচ্ছিলাম। বেশ বড়ো করেই খবরটা ছিল।

আবার রহস্যজনক খুন। পরিমলদের পাড়ার বাসস্টপে আবার একজনকে খুন করা হয়েছে। পুলিশকে জিজ্ঞাসা করলে একই বক্তব্য। তদন্ত চলছে। অন্য খুনের সঙ্গে এর কোনও সম্পর্ক আছে কি না খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মৃতব্যক্তির নামও পুলিশ বলতে অক্ষম। এক অতি উৎসাহী মহিলা সাংবাদিক পরিমলেরও বক্তব্য রের্কড করেছে। খবরটা পুরো পড়ার আগেই পরিমলের ফোন।

“আজকের কাগজ দেখেছিস?”

“হ্যাঁ, কিন্তু কে খুন হয়েছে?”

“তুই তো শার্লক হোমস। তুই অনুমান কর না।”

“ভবাপাগলার ভাই?”

“ঠিক। কিন্তু তোর থিওরি আর খাটছে না। ওসিও তোর থিওরি মেনে নিয়েছিলেন।”

“দেখ, নতুন তথ্যের ভিত্তিতে থিওরি মডিফাই করতে হয়। এবার মনে হয় মেইগ্রেটের দরকার হবে।”

“সে আবার কে?”

“ফরাসী লেখক জর্জ সিমেননের ডিটেকটিভ ইনস্পেকটার জুল মেইগ্রেট। সাধারণ মানুষের মনের অন্ধকার দিক তুলে ধরতে সিমেননের জুড়ি নেই।”

“তোর মেইগ্রেট এখানে থাকলে কী করত?”

“শ্রীমতি অনুরাধাদেবীর দিকে নজর দিত।”

“কিন্তু পুলিশ তো ওঁকে জেরা করেছে।”

পরিমলের কথা শুনে হেসে বললাম, “ওরকম মামুলি জেরায় কিছু হবে না। ওঁর মোবাইলের সব রের্কড, ইমেল, ডায়েরি সব চেক করতে হবে। চব্বিশ ঘন্টা নজরদারিতে রাখতে হবে। মোট কথা ওঁকে অসম্ভব মানসিক চাপে রাখতে হবে। কিন্তু তোদের পল্লবী ঘোয কি সেটা করবেন?”

“আমি ওসির কানে এটা ঢুকিয়ে দিই। ওঁর কথায় পল্লবী গুরুত্ব দেন। ওসির মতে তো তোর পুলিশের চাকরি নেওয়া উচিৎ ছিল।”

“হয়তো নিতাম, কিন্তু মাইনে বড়ো কম। আর পলিটিশিয়ানদের দাদাগিরি পোষাত না।”

আমি আর কথা বাড়ালাম না। দেখা যাক, ম্যাডাম ঘোষ কী করেন।

।।পাঁচ।।

তিরিশ দিন কেটে গেছে। এখন খবর কাগজের পাতায় আর টিভি চ্যানেলগুলোতে পল্লবী ঘোষের জয়জয়কার। নারী ও শিশু পাচার, তার সঙ্গে ড্রাগ স্মাগলিংয়ের এক বিরাট চক্রের বড়ো বড়ো চাঁইদের উনি গ্রেফতার করেছেন। এই গ্যাংয়ের নেত্রী অনুরাধা সামন্ত। দু’দিন জেরার পর উনি সব স্বীকার করেছেন। বিরূপাক্ষ আর ভবাপাগলাকে উনিই খুন করিয়েছেন। এক পুলিশ অফিসার ও কিছু সরকারি হোমের আধিকারিকরাও এতে জড়িত ছিল। তবে তদন্ত এখনও চলছে। এর বেশি পুলিশ কিছু বলতে চাইছে না। খবরের কাগজগুলোতে পল্লবী ঘোষকে ব্যোমকেশ থেকে শুরু করে শার্লক হোমস, পয়রো, এমনকি মিস মার্পলের সঙ্গে তুলনা করেছে। পুরো খবরটা পড়বার আগেই মোবাইল বেজে উঠল। যা ভেবেছিলাম তাই। পরিমলের ফোন।

“আজকের কাগজে পল্লবী ঘোষের মিডিয়ার সাক্ষাতকারটা পড়েছিস? তুই ক্লু দিলি আর জয়জয়কার পল্লবী…”

“দেখ, আরাম চেয়ারায় বসে থিওরি দেওয়া আর ফিল্ডে নেমে তদন্ত করার মধ্যে অনেক তফাৎ। আমি ম্যাডাম ঘোষকে পুরো কৃতিত্ব দেব।”

“দেখ, অনুরাধা তো খুনগুলো করিয়েছে, কিন্তু ভাড়াটে খুনির সন্ধান এখনও পুলিশ পায়নি। যদিও বিরূপাক্ষের গলায় আঙুলের ছাপের সঙ্গে ভবাপাগলার আঙুলের ছাপ মিলে গেছে…”

আমি পরিমলের কথা ছিনিয়ে নিয়ে বলি, “আর কোলাঘাটের দুর্ঘটনাটা অ্যাকসিডেন্ট নয়। তাই তো?”

“তুই তো সবই জানিস দেখছি। পুলিশ লরির ড্রাইভারকে এখন জেরা করছে। আচ্ছা, ভবাপাগলাকে খুন করল না কেন? ভবাপাগলা যে স্বাভাবিকভাবেই মারা গেছে, এ ব্যাপারে পুলিশ নিশ্চিত।”

“দেখ বুদ্ধিমান ক্রিমিনালরা অকারণে খুন করে না। ভবাপাগলার সত্যিই স্মৃতিভ্রংশ হয়েছিল। শোন, ওসিকে বলবি পাপু সিংয়ের উপর একটু নজর রাখতে। বলবি যে ওসির মাথায় ওটা এসেছে। তোর ওসির প্রমোশন কেউ আটকাতে পারবে না।”

আমি ফোন রেখে ভাবলাম, পলিটিক্যাল ইন্টারফারেন্স না থাকলে বা শাসকদলের কেউ জড়িত না থাকলে পল্লবীই কেসটা গুটিয়ে আনতে পারবেন। তা না হলে সিবিআই এবং কেস বিশ বাঁও জলে।

ছবিঃ তন্ময়

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s