গল্প পড়ন্ত বিকেলের রোদ সুমন চক্রবর্তী শীত ২০১৯

ড়ন্ত বিকেলের রোদ

সুমন চক্রবর্তী

“ছি ছি বাবা, এটা আপনি কী করলেন? একবারও ভাবলেন না আমাদের কথা? বাবিন পাড়ার সবার কাছে হাসির পাত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি আর আপনার ছেলে, আমরা লোকের কাছে মুখ দেখাবো কী করে?”

দড়াম করে দরজাটা বন্ধ করে নিজের ঘরে ঢুকে যায় জয়া। চেয়ারে চুপটি করে স্থাণু হয়ে বসে থাকেন অবিনাশবাবু। এই সবে কিছুক্ষণ আগে বাজারের থলিটা এনে রেখেছেন টেবিলের পাশে। তার মধ্যে জয়ার এই চিৎকারে কিছুটা বিরক্ত হয়েই, নিজের ঘরে গিয়ে বসেন তিনি। চুপচাপ কিছুক্ষণ খবরের কাগজটার দিকে তাকিয়ে থাকেন। কিন্তু মন বসাতে না পেরে উঠে বেরিয়ে যান ঘর থেকে। অবিনাশবাবু বাড়ির কাছেই একটা চায়ের দোকানে, অন্য বেশ কিছু সমবয়সীর সাথে নিয়মিত আড্ডা দিতে বসেন। সাধারণত বিকেলের দিকেই তিনি চায়ের দোকানে যান, তবে আজ অশান্তির ঠেলায় সকাল বেলায়।

দোকানে এসে একটা লিকার চায়ের কাপ সবেমাত্র হাতে নিয়েছেন, “কি ব্যাপার? বাড়িতে ঝামেলা হয়েছে নাকি?”, শুনে মুখ ফিরিয়ে দেখেন তার চাকরিজীবনের ট্রেনের কামরার সঙ্গী সুবিমলবাবু। কিছুটা বিমর্ষ হয়েই অবিনাশবাবু বলেন, “আর কি বলবো বলো সুবিমল। কিছুতেই যেন শান্তি নেই। ভাবলাম আমি একটু কোনো কাজে ব্যস্ত হলে বুঝি ওরা ভালো থাকবে। কিন্তু তাতেও দেখছি সেই একই ব্যাপার।”

সুবিমলবাবু সামান্য হেসে বলেন, “এতো ঘর ঘর কি কাহানি ভায়া। এতে এত মুখ গোমড়া করলে হবে? তার চেয়ে বরং কাজের কথা শোনো। একটা নতুন ছিপ কিনেছি। একদম এ-ওয়ান বড়শি। বাঁড়ুজ্যেদের পুকুরে একদিন বসা যাক নাকি?”

সুবিমলবাবুর কথা শুনে মুখ হাসির রোশনাইয়ে ভরে ওঠে অবিনাশবাবুর চোয়াল। বলেন, “কি বলছ? তাহলে চলো এই সপ্তাহেই একদিন যাওয়া যাক?” মাছ ধরবার মারাত্মক নেশা এই দুই মক্কেলের। এ কথা সেকথায় তারপর মেতে ওঠেন দুজনে। ভুলে যান সংসারের রোজকার বিরক্তি। অবিনাশবাবু বছর দুয়েক আগে রিটায়ার করেছেন। আর্থিক অনটনের জন্য পড়াশোনা করতে পারেননি ছােটবেলায়। তাই এইট পাশ পিয়নের চাকরি করেই কেটে গেছে সারাটা জীবন। তবে নিজে সুযোগ না পেলেও ছেলে সুদীপকে যোগ্য শিক্ষা দিয়েছেন। আজ সে প্রতিষ্ঠিত ডাক্তার। সুদীপের স্ত্রী জয়া সবসময় তাদের একমাত্র ছেলে রূপের পড়াশোনা নিয়ে চিন্তাশীল৷ অবিনাশবাবুর একমাত্র নাতির্টি এবারের মাধ্যমিক পরিক্ষার্থী। অবিনাশবাবুর স্ত্রী বেশ কয়েক বছর আগে গত হয়েছেন। ফলত ছেলের সংসারে এখন অবিনাশবাবুর অবস্থান, মধ্যবিত্ত বাড়ির পুরোনো কিন্তু টেকসই আলনার মতো। যেটা ইচ্ছে থেকে থাকলেও চট ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া যায় না।

তবে স্ত্রীর মৃত্যুর পর থেকে বৌমার ব্যবহারে কিছুটা হলেও তার উপর বিরক্ত অবিনাশবাবু। যদিও তাঁর প্রতি জয়ার বিরূপ হওয়ার কোনো যথার্থ কারণ তিনি নিজে খুঁজে পান না।

সন্ধেবেলায় সবে চায়ে চুমুক দিয়েছেন অবিনাশবাবু, এর মধ্যেই সুদীপের, “বাবা”, ডাক শুনে মুখ তুলে বলেন, “কী রে আজ তোর চেম্বার নেই?”

বাবার কথার উত্তর না দিয়ে সুদীপ বলে, “তোমার জন্যে তো লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে। আজ তো বাবিনকে ওর স্কুলের বন্ধুরা রীতিমত অপদস্ত করেছে। বলেছে, কিরে দাদু আর তুই পাশাপাশি বসবি নাকি?”

ততক্ষণে পাশে রূপও এসে দাঁড়িয়েছে। তার মাথা নিচু। অনেকটা স্কুলে অপরাধ করেও ‘আমি তো কিছু করিনি’ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকার মতো। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে অবিনাশবাবু বলেন, “আমি চেয়েছিলাম আমার জীবনের অপূর্ণ ইচ্ছাটা পূরণ করতে। বুঝতে পারিনি তোমাদের এতটা অসুবিধে হবে।”

কিছুক্ষণ মানেহীন কথা এবং চিৎকার চেঁচামেচির পর ঘরে ঢুকে যায় সুদীপ। চুপচাপ তার পিছু নেয় রূপ। কিছুক্ষণ বিমর্ষ আর বিধ্বস্ত হয়ে বসে থাকবার পর অবিনাশবাবু উঠে যান তার নিজের ঘরে। বৌমার বাক্যবাণ তিনি সহ্য করতে পারেন, কিন্তু ছেলে কথা শোনালে চোখ দুটো আজও ভিজে যায়। নিজের ঘরে গিয়ে তার টেবিলের সামনে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকেন অবিনাশবাবু। মনস্থির করেন, এজন্য যখন এত অপদস্ত হতে হচ্ছে, তিনি আর এগোবেন না এই ব্যাপারে, এখানেই ইতি টানবেন।

এক অদ্ভুত আবেগ তাঁকে ঘিরে ধরে। ডান হাতটা এগিয়ে নিয়ে আলতো করে হাত বোলাতে থাকেন টেবিলে রাখা বইগুলোর উপর। মন তখন এক অদ্ভুত দোনামনার খেলায় মত্ত।

কিন্তু বইগুলোর দিকে তাকিয়ে, সেগুলোকে ছুঁয়ে এক অদ্ভুত জেদ তাকে পেয়ে বসে। না, আর কারুর জন্যে ভাবা নয়। এবার তিনি পরীক্ষা দেবেনই। সেই ছােটবেলায় পয়সার অভাবে ক্লাস এইটের পর আর পড়তে পারেননি। চাকরি পাওয়ার পর সংসার, বিয়ে, ছেলের পড়াশোনা এই সব করে ইচ্ছে থাকলেও নিজে কখনো আর মাধ্যমিক পরীক্ষাটা দিতে পারেননি। রিটায়ার করবার পর ঠিক করেছিলেন, এবার ঝাড়া হাত পা, নিথর হবার আগে মাধ্যমিক পরীক্ষা পাশ করবেনই। তাই সংসদের কাছে আবেদন জানিয়ে তাদের ছাড়পত্র জোগাড় করেন। কিন্তু এবার যে তার নাতি-ও মাধ্যমিক পরীক্ষা দিচ্ছে। তিনি আর তার নাতি একসাথে মাধ্যমিক পরীক্ষা দিচ্ছেন, এটাতে তাঁর পরিবার সমাজের কাছে হাসির খোরাক হয়ে উঠছে। মাধ্যমিক পাশ করা যে তাঁর বহুদিনের স্বপ্ন! তাই মনে মনে আবার সেই কথাটা আওড়ান, যেটা তিনি বরাবর মনে করেন। শেখার কোনো বয়স হয় না, আর ইচ্ছে পূরণের কোনো উপযুক্ত সময় হয় না। যে বয়সেই শিখতে, ইচ্ছে পূরণ করতে মন চায়, সেটাই আদর্শ সময়।

জয়ঢাকের সমস্ত গল্পের লাইব্রেরি এই লিংকে