গল্প ফড়িং সাহেবের বাংলো দীপঙ্কর চৌধুরী শরৎ ২০২০

অষ্টাদশ শতাব্দীতে নীলকর সাহেবরা যখন চাষীদের দাদন দিয়ে পূর্বভারতে নীলের চাষ করানো শুরু করে, তখন তা মস্ত এক সামাজিক অত্যাচারের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

 এ-গল্প দীনবন্ধু মিত্র তাঁর অমর নাটক ‘নীলদর্পণ’-এ  শুনিয়ে গেছেন।  ‘এনিমেল ফার্ম’-এর  রচয়িতা  জর্জ অরওয়েল-কে  ইংরেজি সাহিত্যের এক শ্রেষ্ঠ লেখক মানা হয়, তাঁর বাবা ছিলেন এক নীলকর সাহেব, এরিকের (জর্জ) জন্মও উত্তরবিহারের চম্পারণেই হয়েছিল, যেখানে আমি প্রথম ‘ফড়িং সাহেবের বাংলো’-র কথা শুনি।

গোড়া থেকেই বলি তাহলে।

পেশায়  হলেম  ইন্সুরেন্স কোম্পানির দালাল, এখন অবশ্য গালভরা নাম হয়েছে ‘কনসাল্ট্যান্ট।’ পাটনায় আমার মক্কেল ও শুভানুধ্যায়ী ইমতিয়াজ আলী সাহেব এক সাতসকালে ফোন করেছেন, “বলি, নিদ্রা z আইতেসেন নাকি? কিসু জরুরি বাত আসিল জে!”

 এঁরা আদতে হলেন শ্রীহট্টের বাসিন্দা, শাহ্‌  পরাণের বংশধর (গর্ব করে বলেন)। অনেকেই জানে না যে উনি আসলে বাঙালি। আমার সঙ্গে অবশ্যি বাংলা ছাড়া অন্যভাষায় কক্ষনো কথা বলেন না।

“তা, হুজুর, আপনি কি এই রোববার সক্কালবেলাতেও ফজরের নমায পড়বার জন্যে উঠে পড়েছেন?” শুধোই। যদিও উনি আমার বাপের বয়সী মানুষ, ওঁর সঙ্গে সম্পর্কটা আমার বন্ধুত্বেরও বটে, কারণ উনি আমার পেশেন্টও হন।

বলছি ক্রমশ সে কথা।

“রবিবারে ফজরের নমাজ পড়তে হবে না এমন কোনো বিধান তো নেই,ডাক্তারবাবু,” হেসে বললেন উনি।

 “আসেন, আসেন, চলে আসেন। নাশতাটা গরীবের ঘরেই সারবেন’খন। বৌমা মেটে চচ্চড়ি পাকাচ্ছেন।”

এরপর হুউস করে আমার নতুন কেনা হিরো হোন্ডাখানি চালিয়ে ন’টার মধ্যেই ওঁর চিতকোহরার   ভগ্নপ্রাসাদে পৌঁছে যেতে আর দেরি করলাম না।

 বলা যায় না, নতুন ব্যাবসা পাওয়া যেতে পারে।

***

“তা স্যর, এই সক্কাল সক্কাল স্যুটেড বুটেড হয়ে কোথায় বেরোতে চল্লেন?” ওঁর পেল্লায় ড্রয়িং রুমে ঢুকে শ্বেতপাথরের গোল টেবিলটার উপরে হেলমেটখানা রাখতে রাখতে পুছি।

হুস্‌ করে খানিক তামাকের সুবাস ছড়িয়ে পাইপের লেজ দিয়ে সামনের ছেঁড়া-ছোবরার গদিওয়ালা সোফাটায় বসতে দেখিয়ে শুধোন, “আপনার ঔষধের মেয়াদ আর কদ্দিন, এ-মাসে?”

আমি প্রমাদ গণি।

এই রে!  কোথায় ভাবলুম নতুন  ব্যাবসা পাবো…

“তিন,” হাতের তিনটি আঙুল তুলে ধরে দেখিয়ে বললুম।

“ভেরি গুড।”

ফের পাইপের এক ফোঁস ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, “বলি, মোতিহারীর নাম শুনেছেন তো বটে?”

“আলবাৎ শুনেছি। কেন শুনবো না?  গতমাসেই সেখানকার হরদেওপ্রসাদ বর্মা-সাহেব আধ কোটি টাকার টার্ম ইন্সুরেন্স করালেন যে আমার কাছ থেকে। আগে আমাদের কঙ্কড়বাগ স্টেট ব্যাঙ্কের কেশিয়ার ছিলেন।”

“বেশ। মোতিহারীর হরবীর হলো আমার বাল্যবন্ধু। এই পাটনারই বড়ে গুরদ্বারার পাশেই ওদের আদি বাড়ি ছিল। আমার ছোটবেলার খেলুড়ে। বহু বচ্ছর পরে কানাডা থেকে সম্প্রতি দেশে ফিরে হাঁপানিতে বড্ড কাহিল হয়ে পড়েছে বেচারা, আমায় কাল বলছিল ফোনে। এখন সে মোতিহারীর কাছে ছেলের ফার্মহাউজে থাকছে। মনিন্দর সিং কহলোঁ-র নার্সারির নাম শুনেছেন তো? খুব নাম করেছে ইদানীং।  পাটনাতেও ওদের ফুলের দোকানের আউটলেট আছে। এখন আপনার ‘জল-পড়া’  যদি  হরবীরের হাঁপানি ভালো করে দিতে পারে..…..বলা যায় না, আরও আধ কোটির পলিসি হয়ত…।”

***

এবার তাহলে বলি।

অধমের নাম শ্রীমান জীবকনারায়ণ বসু।  দক্ষিণরাঢ়ী কায়স্থ। বদ্যির বংশ নই যদিও, হাঁফানির এক অব্যর্থ স্বপ্নাদ্য ঔষধ আছে আমার পিতৃদেবের  কাছ থেকে পাওয়া। একদিন নিরম্বু উপবাস করে পরের দিন প্রাতে দিতে হয় এ- টোটকা–সম্পূর্ণ বিনামূল্যে (কোনো  টাকাপয়সা নিলে কিন্তু আর এই ঔষধ কাজ করবে না)। আরও অনেক মানা-গোনা পুজো-আচ্চা আছে। যেমন গুড় বা টক আর খেতে পারবে না রুগী বাকি সারা জীবনটায়, ইত্যাদি ইত্যাদি।

তবে তাম্বাকু সেবনে কোনোরূপ বাধা নাই।

তাই না ইমতিয়াজ সাহেব  ফক্‌    ফক্‌     করে  পাইপে ‘প্রিন্স হেনরি’  টেনে চলেছেন এখন আমার সামনে বসে। এ- টোটকা পাবার আগে মাসে দশ দিন বিছানায় শুয়ে কোঁকাতেন।

আর হ্যাঁ, প্রথম ঔষধ দিতে পারা যাবে যে কোনো মাসের পূর্ণিমা থেকে নয় দিনের মধ্যে। দশম দিনে দিলে আর কাজ করবে না  এ- ঔষধ । ফের পরের পূর্ণিমার জন্যে অপেক্ষা করতে হবে। আমার পেশেন্ট  হিসেবে   ইমতিয়াজ সাহেব জানেন সেটা।

ওঁর অনুরোধ আমার কাছে আদেশ। উনি আমার পিতৃসম।    শুভানুধ্যায়ী।

 “তাঁর ঠিকানাটা তাহলে একটা কাগজে লিখে দিন। আমায় তো সেক্ষেত্রে আজই বেরিয়ে পড়তে হয়, কারণ মাঝের একটা দিন তো পুজো-আচ্চায় যাবে।” বলি।

“আর উপোসে। জানি তো। তাই না ধড়াচুড়ো পরে বসে আছি। নাশতা করে নিয়ে আমায় বোরিং রোডে নামিয়ে দিয়ে যেও। ড্রাইভার ব্যাটা……” আলী সাহেব।

আসলে ওঁর কোনো ড্রাইভার-ফ্রাইভার  নেই।  আমি জানি। ভাঁড়ে-মা-ভবানী অবস্থা। তবে, পুরনো খানদানিত্ব বজায় আছে ষোলর উপরে আঠেরো আনা। মানুষটি খাঁটি ও সাচ্চা।

পিলিয়নে বসতে বসতে শুধোন আমায়,  “ভাই বসু-জা, আপনি ফড়িং সাহেবের  নাম শুনেছেন?”

সাহেবের নাম ‘ফড়িং?’

হুস্‌  করে  হাসি পেয়ে হাতের স্টিয়ারিং আমার টলে যায় আরকি!

আমার পিঠে মৃদু চাপড় দিয়ে খুঁক্‌  খুঁক্‌  হেসে বলেন ইমতিয়াজ, “না হে না। ফড়িং নয়  ফড়িং নয়, আসলে ফেরিং। আদতে দিনেমার হবে হয়ত, বৃটিশ নয়। মোতিহারি পেরিয়ে নীলকুঠি ছিল ওঁর, রিচার্ড ব্লেয়ারের খাস  দোস্ত্ হতেন।”

“তিনি আবার কিনি?”

“এই তো তোমাদের মুশকিল, এজেন্ট সাআব। পড়াশুনো-টুনো তো আর করো না বিশেষ। পৃথিবীবিখ্যাত    “1984”   উপন্যাসটা পড়েছ কিনা?  সেই লেখক জর্জ অরওয়লের বাপ  ছিলেন এই রিচার্ড ব্লেয়ার। দুঁদে নীলকর সাহেব ছিল ব্যাটা।”

“তা, হুজুর, আপনার স্যাঙাৎ রুগী হরবীর-জীর সঙ্গে এই ফড়িং সাহেবের তাল্লুক কী?” বাইক চালাতে চালাতে ঘাড় ঘুরিয়ে শুধোই।

মার্চ মাস পড়ে গেছে। এখনও এখানে ঠান্ডাটা রয়ে গেছে। বিশেষ করে সকালে এই মোবাইক চালালে মালুম হয়।

মাফলারখান ভালো করে জড়িয়ে নিলুম আমি।

“মোতিহারী শহর পেরিয়েই পড়বে ঐ ফড়িং সাহেবের বাংলো।   বিখ্যাত বা কুখ্যাত জায়গা। যাকেই শুধোবে দেখিয়ে দেবে। তার উল্টোদিকেই হলো হরবীরের….”

“কুখ্যাত কেন? ভূত-টুত আছে নাকি সেথায়?” শুধোই।

“ছিল। এখন গ্যামাক্সিন-টিন দিয়ে….।” হো হো করে হেসে বলেন উনি।

আলী সাহেবের কথার হেঁয়ালি বুঝি এমন সাধ্য আমার নেই। কখন সিরিয়াস কথা বলছেন আর কখন জোক—বোঝা যায় না।

মোতিহারীর ‘কহলোঁ নার্সারি’ খুঁজতে হলো না বিশেষ। শহরের চৌহদ্দি ছাড়িয়েই ডাইনে মস্ত বাগিচা, গেটে বাহারি সাইনবোর্ড।

পাটনা থেকে উত্তরে বেরিয়ে  গঙ্গা-জীর উপরে  মস্ত  ‘গান্ধী সেতু’ পেরিয়ে মুজঃফরপুর। সেখান  থেকে বাঁয়ে তেরছা বেরিয়ে গেছে মোতিহারী শহরের রাস্তা। মোট একশ’ মাইলের কিছু কমই হবে রাস্তা। নতুন বাইক চালিয়ে কানে গানের ইয়ারফোনের  লেজ-টা  ঢুকিয়ে আরামসে ঘণ্টা তিনেকের মধ্যে পৌঁছে যাব ভেবেছিলাম। কিন্তু সেতুর উপরে প্রচণ্ড জ্যাম মেজাজটাই দিলে  খারাপ করে।  তাই, মোতিহারীর ‘কহলোঁ ফার্ম’-এ’ যখন ঢুকছি, ফাগুন মাসের সূয্যি পাটে বসে গেছে ততক্ষণে।

সাড়ে পাঁচটা বাজে।

ইমতিয়াজ সাহেবের দেওয়া খামখানা গেটের সিকিউরিটির হাতে দিতে সে আমায় বেঞ্চিতে বসিয়ে রেখে অন্দরে চলে গেল দীর্ঘ মোরাম বিছানো পথ বেয়ে। যাবার আগে ‘সাব’ যে এখন আউট-অব্স্টেশন, লক্ষ্মৌ গেছেন, সেটাও জানিয়ে যেতে ভুললো না।

সে কী? এবার তাহলে ঔষধ  দেবো কী করে? একবার ভাবলাম ইমতিয়াজ সাহেবের মোবাইলে  ফোন করে জানাই সেটা তাঁকে  এখনই; তারপর ভাবলাম, এসেই যখন পড়েছি এতোদূর , সরাসরি বাড়ি ঢুকে দেখিই না কী হয়।

দৌড়তে দৌড়তে ফিরে এলো সেই গার্ডসাহেব। মস্ত এক জিভ কেটে বলল, “গোস্তাকী মাফ, গোস্তাকী মাফ, ডক্টর সাআব। আপনি পাটনা থেকে নবাবসাহেবের পৈগাম নিয়ে এসেছেন, আগে বলবেন তো…”

***

চারিদিকে এতো এতো রঙবেরঙের ফুলফলারি দেখলে এমনিতেই মন ভালো হয়ে যায়। তার উপরে ঘরফেরা পক্ষীকুলের কলতান—কিচির-মিচির। “ফ্লোরা এন্ড ফনা” হলো মানুষের ন্যাচরাল বন্ধু।

 কিন্তু গৃহস্বামীই যখন নেই তখন আমার এখানে আসাই তো বৃথা গেল। হাঁফানির মহৌষধি দেবো কাকে ? ইমতিয়াজ সাহেব যদি এটা আগে বলতেন…

“আপকো আনে মেঁ কো ঈ তকলীফ তো নহী হুই?”

এক মহিলা কণ্ঠস্বরে আমার চিন্তার রেশ ভাঙলো।

বছর ষাট-পঁয়ষট্টির এক পৃথুলা  সর্দারনী, পরনে সাদাটে সালওয়ার-কুর্তা, দোতলার সিঁড়ি ভেঙে নামতে নামতে  শুধোলেন আমায়; আমি তখন বৈঠকখানার সোফায় বসে। সন্ধ্যের অন্ধকার নেমে এসেছে। মস্ত ড্রয়িংরুমটায়  জ্বলছে এক সি.এফ.এল বাতি।

অনুমান করলাম, ইনি হরবীর সাহেবের পত্নী, মণিন্দরের মা  হবেন।

উঠে দাঁড়ালাম। দু’হাত জোড় করে নমস্কার জানালাম। উনি হাতের ইঙ্গিতে বসতে বললেন।

“আপকা দওয়াই কা বহোত তারিফ ইমতিয়াজ সে সুনী হুঁ। ভালো হয়ে যাবে তো হাঁফানি এক্কেবারে?”

“কিন্তু সাহেব তো বাড়ি নেই, শুনলাম? ওঁর সঙ্গে বসে যে কিছু পুজো-আর্চার ব্যাপার আছে।” বলি।

“তার জন্যে কোনো অসুবিধে হবে না। আমি সম্পূর্ণ প্রস্তুত। রোগ সেরে গেলে ভালো ইনাম পাবেন।”

ইগোতে লাগল আমার।

বললাম, “কোনরূপ ইনাম বা টাকাপয়সা নিতে পারবো না, আলীসাহেব বলে দেননি আপনাকে? আমায় বখশিস-টখশিস  দিলে আর রোগ সারবে না। এ- দাওয়াই আমার ঘরের গোপন সম্পদ।”

জবাব শুনে উনি লজ্জিত হলেন কিনা দেখতে পেলাম না, কারণ তৎক্ষণাত বিজলী লাইন চলে গেল। ঘর অন্ধকার। শুধু কোথা থেকে যেন আলো পড়ে ওঁর চোখের পুরু প্লাস লেন্সের চশমার কাচ জ্বলজ্বল করছে।

“রঘুনাথ, বাত্তি লে আও।” উচ্চৈঃস্বরে ভৃত্যকে আদেশ দেন উনি।

ততক্ষণ অন্ধকার মুখোমুখি বসে থাকি আমরা।

চুপচাপ।

দূরে কোথায় ক্যাঁক্ক্যাঁক্ ক্যাঁক্ক্যাঁক করে কোন্এক রাতপাখি ডেকে উঠল। আমি মহিলাকে শুধোলাম,

“এখানে ফড়িং সাহেবের বাংলো   বলে নাকি এক কুখ্যাত…. ”

“কুখ্যাত টুখ্যাত হতে যাবে কেন?” আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে রাগী গলায় বললেন সেই মহিলা, “ঐ তো উল্টো দিকেই। ও’বাড়ির মস্ত হাতার মধ্যে ধুতরো গাছের ঝোপ হয়ে আছে। আর ধুতরো থেকে যে হাঁপানি বাড়ে সেটা কে না জানে?”

“তা, সাহেব কি ঐ ফড়িং সাহেবের বাংলোর হাতায় মর্নিং ওয়াক-টোয়াক করতে যান নাকি?” শুধোই।

“সাহেব যেতে যাবে কেন? আমি গিয়েছি মাঝেসাঝে, কারণ এখানকার দিশি লোকজনের মুখে মুখে ঘোরে—ঐ ফড়িং সাহেবের বাংলোর হাতায় নাকি হাঁফানি রোগের নিদান আছে। যত্ত ফালতু কতা।” বেশ বিরক্ত হয়ে বললেন মালকিন; তারপর সম্পূর্ণ প্রসঙ্গ পালটিয়ে বললেন, “তুমি দীর্ঘপথ সফর করে এসেছ। বিশ্রাম করো এখন। রঘুনাথ তোমার কামরা দেখিয়ে দেবে। নেয়েধুয়ে নাও। ডিনারে দেখা হবে। ঠিক আটটা। তাড়াতাড়ি শুয়ে পোড়ো।” উঠে পড়লেন মালকিন।

কানাডিয়ানের কী মিলিটারি মেজাজ রে বাবা!

চাকরটি তখন বাতি হাতে ঢুকছে।

“মে আই আস্ক আ কোশ্চেন?” ওঁকে শুধোই।

দাঁড়িয়ে গেলেন মালকিন।

“হোয়াটস স্পেশাল এবাউট দিস বাংলো? পোড়ো নীলকর সাহবের কুঠি বৈ তো নয়। ভূত-টুত আছে নাকি সেখানে?”

আমার প্রগলভতায় অসন্তুষ্ট হলেন তিনি। ভুরু কুঁচকে উঠল। বললেন, “ডোন্ট আস্ক সিলি কোয়েশ্চেন্স। ইমতিয়াজ  বলে দেয়নি তোমায় ঐ বাংলোয় কক্ষনো না যেতে, তার দিকে না তাকাতে? গর্ত আছে সেখানে, বুঝলে, মস্ত বড় গর্ত আছে। সবাই জানে। কক্ষনো যাবে না সেখানে।”

“সাপের গর্ত?’

আমার শেষ প্রশ্নের কোনো উত্তর পেলাম না।

***

সূর্য উঠে যাবার সঙ্গে সঙ্গেই বিছানা ছেড়ে দেওয়ার অভ্যাসটি পিতামহ করিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন, যিনি ছিলেন কলকাতা পুলিশের এক কিংবদন্তী অফিসার।

 এলার্ম-ঘড়িটা তাই মগজে গেঁথে গেছে আমার। ভোর পাঁচটা নাগাদ ‘কহলোঁ ফার্মে’-র আরামপ্রদ শয্যা ছেড়ে উঠে পড়েই মনে পড়ে গেল পুজোপাঠে বসে পড়ার আগে একবার ঢুঁ মারতে হবে উল্টো দিকের ‘ফড়িং সাহেবের বাংলো’-তে । তথায় যেতে মানা বলেই  বেশি করে যাবার টানটা অনুভব করছি।  আমাদের এই সর্দার-সাহেব ততক্ষণে নিশ্চয়ই  লক্ষ্মৌ থেকে ফিরে আসবেন।

আজ আমার নিরম্বু উপবাস।

পুজোর উপকরণ হিসেবে কিছু  হরিতকীরও দরকার ছিল। বেশ হয় যদি সেই বাংলোর  হাতার জঙ্গলে পেয়ে যাই।

‘গর্ত’ না কী যেন বললেন মহিলা, সে-সব বাঁচিয়ে চললেই হবে। সাপ খোপ থাকতে পারে সেখানে।

এতো কাছে এসেও শুধু ‘গর্ত’ আছে বলে এক প্রাচীন বা ঐতিহাসিক নীলকুঠি দেখতে যাবো না, তা কি হতে পারে নাকি?

ইতিহাসে আমার বেশ আগ্রহ আছে।

এবার একটা অন্য গল্প।  প্রাসঙ্গিক কিন্তু।

ঋষি অরবিন্দের এক্কেবারে সমবয়সী, জিলা খুলনায়  ১৮৭২ সনে এক হতদরিদ্র পরিবারে একটি সন্তান জন্ম নিয়েছিল।  অল্প বয়সে অনাথ হয়ে কলকাতায় এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়িতে প্রায় গৃহভৃত্যের কাজে নিয়োজিত হয়েছিল সে। পড়াশোনায়, বিশেষত গণিতে ছেলেটির প্রবল আগ্রহ দেখে গৃহস্বামী তার উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা করে দেন। কালে ছেলেটি স্কলারশিপ নিয়ে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হয়, সাম্মানিক বিষয় ছিল  গণিত। লণ্ডনের কিংবদন্তী পুলিশ কমিশনার এডোয়ার্ড হেনরী (আই সি এস। পরে  বেঙ্গল গভর্ণমেন্টের আই জি পুলিশ হন) যখন ফিঙ্গারপ্রিণ্ট-বিজ্ঞানের   পুষ্টির জন্যে বেঙ্গল-পুলিশের এক স্ট্যাটিস্টিক্যাল  উইং খোলবার পরিকল্পনা করেন, উপযুক্ত ছেলে  চেয়ে প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যক্ষকে পত্র লিখেছিলেন তিনি। গণিতের তুখোড় ছাত্র এই  আজিজুল হকের নামই রেকমেন্ড করেছিলেন প্রিন্সিপ্যাল গ্রিফিত সাহেব। অতএব, ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়ে অপরাধী নির্ণয়ের জগৎবিখ্যাত  ‘হেনরী মেথড’ –এর পিছনের গাণিতিক সাহায্যটা এসেছিল এই বাঙালী-গণিতজ্ঞের কাছ  থেকে যাঁর নাম আজিজুল হক। ইহা ঐতিহাসিক সত্য, রেকর্ডেড হিস্ট্রি।

না, একটু ভুল বললাম।

একজন নয়, দুই জন।

‘হেনরী মেথড’-এর পিছনের গাণিতিক সাফল্যের দ্বিতীয় স্থপতিটি ছিলেন নদে জেলার কায়স্থসন্তান হেমচন্দ্র বসু, প্রেসিডেন্সী ম্যাথস অনার্সে আজিজুলের সহপাঠী। এ- দুইয়ে মিলে ‘হক-বসু’ এপ্রোচ, সম্প্রতি যা  বিশ্বস্বীকৃতি পেয়েছে, দেরিতে হলেও।

আরও একজন মানুষের  কথা এখানে বলতেই হয়।

প্রথম অলিম্পিক পদকজয়ী ‘ভারতীয়’ হিসেবে  ১৯০০ সনের প্যারিস ওলিম্পিয়াডে দুইটি রৌপ্যপদক জিতে বেনেপুকুরের এংলো-ইন্ডিয়ান  ও সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের প্রাক্তনীছাত্র  নর্মান প্রিচার্ড সাহেব ঠাঁই করে নিয়েছেন ইতিহাসের পাতায়, কারণ তিনি দৌড়েছিলেন  ‘বৃটিশ ইণ্ডিয়া’-র  ব্যানারে। তার চার বছর আগে ১৮৯৬-এর প্রথম ওলিম্পিকে (এথেন্স) কৃষ্ণনগরের ছেলে চার্লস জেমলিন ইউনিয়ন জ্যাক-তলে চারশ’ মিটার দৌড়ে থার্ড হন, কিন্তু হায়, সেকালে ব্রোঞ্জ পদক দেবার চল শুরু হয়নি। তাই, ‘অফিশিয়াল রেকর্ড’ গড়ে ওঠেনি। চার্লেসের জন্ম কেষনগরেই, পিতা সেখানকার পাদ্রী ছিলেন।

চার্লস ও হেমচন্দ্র বাল্যবন্ধু ছিলেন।

এখানে আরেকটি তথ্য প্রাসঙ্গিক।

 আজিজুল-হেমচন্দ্রের কর্মজীবনের বেশিরভাগ সময়টা উত্তরবিহারের মোতিহারি-দ্বারভাঙ্গা অঞ্চলেই কেটেছে, যেখানে ছিল  আজিজুল সাহেবের শ্বশুরালয়।

 সন  ১৯১২-তে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি থেকে বিহার-উড়িষ্যা বেরিয়ে এলো। আজিজুল হক বিহার-পুলিশ অপ্ট  করলেন। পুলিশের চাকরি থেকে অবসর নেবার  পরে এখানেই উনি থেকে যান।  মোতিহারীর ভূমিতেই তিনি শেষনিদ্রায় শায়িত রয়েছেন।

এই প্রাসঙ্গিক উপক্রমণিকাটি বলে নিয়ে  ফিরে আসি আজকের কাহিনীটিতে।

কথায় বলে, ‘এক্সেপশন প্রুভস দ্য ল’, অর্থাৎ ‘ব্যতিক্রমই কানুনটিকে  প্রমাণ করে’। চম্পারণ জিলার নীলকর-সাহেব  এডোয়ার্ড ফেরিং সাহেব এমনই এক ব্যতিক্রমী নীলকর  ছিলেন।

বিপত্নীক  আপনভোলা বৃদ্ধ। সংসারে আপন বলতে কেউ নেই। এক দঙ্গল শিশু সর্বদাই তাঁর পিছে পিছে ঘুরতো মিষ্টি মিষ্টি কদমা বা ফুটকড়াই খেতে পাবার লোভে।

নীলদর্পণ নাটকের প্রভাবেই হোক্ বা, ১৮৬২ খৃষ্টাব্দের নীলচাষ-নিরোধী আইনের ফলে… বাংলাদেশ থেকে নীলচাষ বন্ধ  হয়ে গেলেও উত্তর বিহারে তারপরেও বহু বছর নীলচাষ রমরম করে চলেছে। তার প্রমাণ, দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ফিরে এসে ভারতবর্ষে প্রথম ‘সত্যাগ্রহ আন্দোলন’ গান্ধিজীকে করতে হয় এই চম্পারণ জিলাতেই, ১৯১৭ সনে। আমাদের আজকের এই কাহিনীর সময়টা এর চাইতে বছর তিন চার আগের, ১৯১৩ নাগাদ। সম্পূর্ণ ‘এ ওয়ার্ক  অব্‌   ফিকশন’ নয় এ-খানি , এর অনেক মাল-মশলা ইতিহাসের পাতায় বা মুখের গল্পে ধরা আছে।

আমাদের এই ফড়িং সাহেব (বা ফেরিং সাহেব) জেলার আরও প্রত্যন্ত আমোল্বা অঞ্চলের  নীলকুঠিটিতে না  থেকে মোতিহারী শহরের উপান্তে এই বাংলোখানা কেন কিনেছিলেন বা বানিয়েছিলেন তার কারণ জানে না কেউ। ও’ অঞ্চলের ‘ওরাল হিস্ট্রি’ বলে, সাহেবের নাকি হাঁফানির টান ছিল, তাই…

এটা কোনো যুক্তি হল?

বিশ  মাইল দূরের আমোল্বা  গ্রামের নীলকুঠিতে তাঁর হাঁফানি হতো, আর শহরের কাছের এই বাংলোতে থাকলে হতো না? দুই জায়গার আবহাওয়া তো একই।

ফাগুন-সকালের ফুরফুরে হাওয়ায় একটু হালকা জগিং করতে করতে রাস্তা পেরিয়ে ঢুকে এসেছি  উল্টো দিকের ফড়িং সাহেবের বাংলোতে।

মস্ত বড় চৌহুদ্দি।

চারিভিতের দেওয়াল ভেঙে টেঙে একসা। একটা হরিতকী   গাছের সন্ধান করছি।  সারা জায়গাটায় জঙ্গল হয়ে রয়েছে। স্বাভাবিক। একশো বছরেরও বেশি পুরনো সম্পত্তির আর কী হাল হবে, বিশেষত, যেখানে ফড়িং-সাহেবের আপনার বলতে আর কেউ ছিল না, শোনা যায়। কে আর দেখাশোনা করবে?

এরই মধ্যে সাপের গর্ত-টর্ত নাকি আছে, সর্দারনী বলছিলেন, না?

 সাবধানে পা ফেলতে হবে, কারণ কোনো সর্পরাজের গায়ে পা পড়লে তিনি আমায় অতিথি  বলে ছেড়ে দেবেন, এমনটা ভাববার কোনো কারণ নেই।

“বোস-দা, একটু আগুন হবে?”

বেশ খানিকটা দৌড়ে এসে বাগানটার মধ্যে এক ভাঙাচোরা লোহার বেঞ্চিতে বসে হাঁফাচ্ছি, এমন সময় কোত্থেকে এক উটকো লোক ঢিপ্‌ করে বাড়িয়ে গলা ঐ প্রশ্নটা করলে।

ফস্‌  করে বড্ড রেগে যেতুম কারণ আমি প্রবল ধুম্রপানবিরোধী।  গেলুম না লোকটার মুখে নিখাদ বাঙলাভাষা শুনে, এই উত্তরবিহারের মাটিতে।

ভালো করে অবলোকন করে দেখি বকের মতো  সরু রোগা তেঢেঙ্গে এক মাঝবয়সী লোক হলদে  দাঁত বের করে হাসছে।

হাতে এক না-ধরানো সিগ্রেট। গালে দু-দিনের না-কামানো কাঁচাপাকা দাড়ি। সাদা পায়জামা-কুর্তা পরনে।

গায়ের রঙ ধবধবে সাদা। সাহেবদের মতন!

রাগ ও অবাক মেশানো স্বর বেরিয়ে এল।

বলি, “নেই। কিন্তু আপনি আমার নাম জানলেন কী করে? আমি তো আপনাকে চিনি না।”

“স্বাভাবিক। কিন্তু আপনার ঠাকুর্দার ইয়ে …মানে…আমায় চিনতেন, বুঝলেন? তাছাড়া নাম তো নয়, পদবী  ধরে ডেকেছি আপনাকে,” বিশ্রী দৃষ্টিকটুভাবে নিতম্ব   চুলকাতে চুলকাতে বললে লোকটা। গা জ্বলে গেল আমার।

আ-জ্বলা সিগারেটের মুখে একটা ফুঁ দিয়ে বাঁ-কানে গুঁজে রাখল।

পাগল নাকি লোকটা? ঠাকুর্দা-ফাকুর্দা কী সব বলছে!

আমার বেঞ্চিটা থেকে পাঁচ-পা দূরে ঘাসের উপরে উবু হয়ে বসে বেশ হাসি   হাসি মুখ করে আমাকে,  যাকে বলে, আমাকে নিরীক্ষণ করতে লাগল লোকটা।

আমারও, কেন জানিনা, এবার  বেশ মজা লাগতে লাগল লোকটার ধরন ধারণ দেখে। শুধোলেম, “এখানে নাকি অনেক সাপের গর্ত টর্ত আছে? আপনি চেনেন, ইয়ে, মানে জানেন, কোথায় কোথায়?”

“যঝ্যাঃ! কে যে সব গুজব রটায়…? গত ডেড়শ’ বছরে কেউ এই ফড়িং-মামার বাংলোয় সাপের কামড়ে মরেনি, হ্যাঁ। তুমি কি আমার চে’ বেশি জানো হে কালকের ছোকরা?”

হাসি পেয়ে গেল লোকটার বাক্যি শুনে, বিশেষত  ঐ ‘ফড়িং-মামা’ শুনে।

পাগল অবশ্যই। বেহেড।

বললুম, “তার মানে আপুনি বলতে চাইছেন যে এখানে কোনো গর্তই নাই?”

“সেটা আবার কে বললে?” ফস করে রেগে উঠল সেই লোক।

ঠিক এই সময়ে এক দঙ্গল বক একযোগে ক্যাঁ ক্যাঁ ডাকতে ডাকতে  উত্তরদিকপানে উড়ে গেল , আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলুম আলগোছে।

কী যে বলতে চায় লোকটা! সক্কাল সক্কাল ভালা এক পাগলের পাল্লায় পড়া গেল যা হোক্‌,  ভাবি।

উঠে পড়ি এবার। বাগানে ঘুরে দেখি কোনো হরিতকী গাছ নজরে পড়ে কিনা। ঘরে ফিরে স্নান-টান করে পুজোয় বসতে হবে আমায়।

আজ যে আমার নিরম্বু উপবাস!

“কৈ? গর্তটা দেখলেন না তো?”

আমি উঠে হাঁটা লাগাতে লোকটা আমার পিছে পিছে  আসতে আসতে নাছোড় ভঙ্গিতে শুধোয়।

“টা?”  জিজ্ঞেস করি, “এখানে কি একটাই সাপের গর্ত আছে নাকি?”

“আঃ! সাপ সাপ করে নাতি যে আমার মাথা পাগল করে তুললে! বলি, সাপ আবার আপনি পেলেন কোত্থেকে,শুনি?” বিরক্ত হয়ে বলল লোকটা।

“সাপ না তো কি মানুষ থাকে গর্ততে?” উষ্মা ঝরে পড়ল আমার গলা থেকে।

“আজ্ঞে হ্যাঁ, থাকে। তা-ই থাকে। হয়েছে? আমি থাকি সেই গর্তে (নিজের বুক ঠুকে বলল সে)। হ্যাঁ।   দেখবে সেই গর্তটা? ভয় পাবে না তো আবার?” বলতে বলতে আমার ডান হাতটা পাকড়ে ধরে হিড় হিড় করে বাম দিকের জংলী পথে হাঁটা দিলো সেই লোক।

কী জোর হাঁটছে রে লম্বু! আমি পাল্লা দিতে পারছি না।

“একটু ধীরে চলুন না, ঠাকুর্দা,” ব্যাঙ্গ করে ডাকলাম, “আপনার গত্ত তো আর পালিয়ে যাচ্ছে না!” বলতে বাধ্য হলুম।

“হেঃ হেঃ হেঃ হেঃ….আপুনি এক ওলিম্পিক চ্যাম্পিয়নের সঙ্গে দৌড়ুচ্ছেন, এটা মনে রাখবেন কিন্তু,” ঘাড় ঘুরিয়ে বেশ মজার স্বরে বললে সে বেহেড লোক। পরক্ষণেই প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে শুধোল, “আচ্ছা, ভালো কথা,   সোয়ালেট কাহাকে বলে, নিশ্চয়ই জানিস না? কী, জানিস্‌  না তো? তখনই বুঝেছি, ইংরিজিতে কাঁচা।”

পাগলটা বলে চলে, “সোয়ালো হলো ভার্ব, মানে ঢোঁক দিয়ে গিলে ফেলা, এই এমন করে [লোকটা অভিনয় করে দেখালো]। সেই থেকে  সোয়ালেট, মানে গর্ত, গভীর গর্ত। যা সব কিছু গিলে নেয়। হুঁ হুঁ বাবা, বোঝলা কিছু? ভয় পাচ্ছিস না তো? সত্যি করে বল্। আমার গা ছুঁয়ে বল্।”  বলল।

বলো তোমরা, এমন বেহেডের পাল্লায় পড়লে হাসি পাবে না মানুষের?

হঠাৎ সোঁ সোঁ করে এক ঠান্ডা হাওয়ার স্রোত কোত্থেকে জানি ভেসে আসতে লাগল ।

জোলো ঠান্ডা হাওয়া।  হু হু করে আসছে। যেন কোনো নদী বা সমুদ্রের কাছাকাছি এসে পড়েছি। আমার চুল উড়ছে, পরনের ট্রাকস্যুটও। সামনের ঐ পাগলা লোকটার পরনের পাঞ্জাবী-পায়জামাও পৎ পৎ করে উড়তে লাগল । যেন অদৃশ্য কোনো পেডেস্টাল ফ্যানের কাছে দাঁড়িয়ে আছি আমরা।

“বোস্, বোস্ বসে পড়্ বসে পড়্। শীগগির বসে পড়, নৈলে মোর মতো তোরেও টেনে নে যাবে গত্তে।” বলতে বলতে আমার হাত ধরে মাটিতে বসিয়ে দিলো লোকটা, “আজ আবার হাঁপের টানটা উটসে!”

কী থতমত অবস্থা!

আমরা দুই মদ্দ  উবু হয়ে ভূঁয়ে বসে আছি পরস্পর হাত ধরাধরি করে, আর যেন ঝড়ের মতো উঠেছে নিকটে কোথাও; আমাদের চুল উড়ছে, উড়ছে পরনের বসনও।

মিনিট পাঁচেক এ-ভাবে থাকার পর টানটা কমল অনেকটা। লোকটা তড়াক করে লাফিয়ে উঠে টুস্‌কি দিয়ে  আমায় বলল, “গেট আপ্। গেট আপ ফাস্ট!”

বলতে বলতে দৌড় লাগালো উল্টো দিক পানে। আমি কি দৌড়ে পারি সেই ‘ওলিম্পিক দৌড়বীর’-এর সঙ্গে?

“নাঃ। তোকে দিয়ে হবে না। বলব আমি হেমু-কে, দেখা হলে পরে।” পিছনপানে ঘাড় ঘুরিয়ে আমাকে উদ্দেশ্য করে বললে সেই আজীব জীবটি।

তারপর হাঁফাতে  হাঁফাতে বাগানের মধ্যেই  পড়ে থাকা  একটা মস্ত গাছের গুঁড়ির উপরে থপ্‌  করে বসে পড়লাম আমি।

একটু দূরে এক পাথুরে বেদীর উপরে সে-ও বসলো। হাঁফাতে হাঁফাতে ফতুয়ার পকেট থেকে একটিমাত্র দেশলাই কাঠি বের করে ফশ করে চট্টানে ঘসে সিগ্রেটখানা ধরিয়ে ফেলল সে।

 বহুৎ রাগ হল আমার।

বললুম, “আপনার কাছে মাচিস ছিল তো আমার কাছে চেয়েছিলেন কেন?”

আমার কথায় বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে দু’বার ধোঁয়ার রিং ছেড়ে বললে সে, “কলকেতা থেকে আজিজুল এখানে শ্বশুরবাড়িতে এসেছে শুনে ফড়িং সাহেব ডেকে পাঠিয়েছিলেন তাকে, সেটা জান তো? [যেন এটা আমার জানবার কর্তব্যের মধ্যে পড়ে]। তখন বুড়োর হাঁফানির টানটা বড্ড বেড়েছে।”

“আজিজুল কে?”  আমার নিরীহ প্রশ্ন।

“আজিজুলরে চিনস্‌ নাই? আরে, কলকাতা পুলিশে চাকরি করে। অঙ্কে খুব মাথা!”

বলেই চলে সে তারপর।

আজিজুল এসে সেলাম বাজালে। এ-তল্লাটে বুড়ো নীলকর-কে ভালোবাসত না এমন লোক ছিল না, তার উপর সাহেব আজিজুলের বিশ বছরের জ্যেষ্ঠ।

“কী হে জামাই, তুমি নাকি এখন খান-সাহেব  উপাধি পেয়েছ ছোটলাট-সাহেবের কাছ থেকে?” আজিজুলের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসতে হাসতে বলেছিলেন ফড়িং সাহেব।

“সবই আল্লাহ্‌ মিঞার দোয়া।”

 বড়ই ঈশ্বরবিশ্বাসী আদমী ছিলেন কাজী আজিজুল হক সাহেব, শৈশবে অনাথ।

“আজিজ, বল্‌ তো, বিশ মাইল দূরে আমোল্বা গ্রামের নীলকুঠি ছেড়ে মোতিহারী শহর ঘেঁষে এই বাংলো আমি কেন কিনলাম? তোর মামাশ্বশুর তা বলে দামও তো আর কম নেয় নি আমার কাছ থেকে।” ফুঁক ফুঁক পাইপ টানতে টানতে আর মিটিমিটি হাসতে হাসতে  জেমস ফেরিং বলেছিলেন খান-সাহেব আজিজুল হক-কে (হাঁফের টান টা যেদিন না উঠতো, মহার্ঘ্য ইম্পোর্টেড ভার্জিনিয়ান  তাম্বাকু ফুঁকিতেন ফড়িং সাহেব।)

 “সেটা আমি কেমন করে জানব, সাহেব?” আজিজুলের স্বীকার।

“কেন, তোর বস্‌ রে শুধোস্‌ না!  সে তো পাক্কা জাসুস!” [কলকাতা পুলিশের তৎকালীন কিংবদন্তী  কমিশনার  এডোয়ার্ড হেনরী সাহেব সম্পর্কে আমাদের এই ফড়িং সাহেবের ছোট ভায়রা-ভাই হতেন, (দু’জনেই কোয়েকার), ঠাট্টা –এয়ার্কির সম্পর্ক। ]

“তুমি তো ভাই আজিজুল, বলতে গেলে চার্লস ডারউইনের নাকে ঝামা ঘষে দিয়েছ!”  হেঁয়ালি করে বললেন ফড়িং সাহেব।

“কেন স্যার? আমার অপরাধ?” কাজী আজিজুল হক সত্যিই বিনয়ী মানুষ ছিলেন। হাত জোড় করে শুধোলেন। বিদ্যা দদাতি বিনয়ং।

“তুমি কি ভাবছ যে ধ্যাদ্ধ্যাড় মোতিহারীতে পড়ে থাকে বলে বুড়ো এই নীলকর সাহেব কোনই খবর রাখে না? কলকেতার দ্য-স্টেটসম্যান  কাগজ আমি ডেইলি সাবস্ক্রাইব করি হে, তিন দিন পরে আসে যদিও।  তাই এ-খবর রাখি যে এনথ্রোপোমেট্রি পদ্ধতি হাঠিয়ে গণিতভিত্তিক অঙ্গুঠি-ছাপ দিয়ে অপরাধী সনাক্তকরণের পদ্ধতি তুমি আবিষ্কার করেছ সেটা চার্লস ডারউইনের মাসতুতো ভাই ফ্রান্সিস গ্যালটনের করা ছিল, সেটা জানো তো?”

“আজ্ঞে।”

“আর, কৃতিত্বটা লুঠছে তোমার বস্‌ এডোয়ার্ড। পুলিশ-কমিশনার কিনা, তাই।”

“হুজুর, এ তো আমার অফিসিয়াল দায়িত্ব, জব-প্রোফাইল। আমি করতে বাধ্য, কারণ আমি কলকাতা পুলিশের মাইনে করা ইন্সপেক্টর। ও’সব প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে আজ আমায় কেন ডেকেছেন সেটা যদি তাড়াতাড়ি বলেন। আমার জোহরের নমাজের সময় হয়ে যাচ্ছে।” ধর্মভীরু আজিজুল হক নিবেদন করলেন।

“বেশ, শোনো তাহলে। সিঙ্কহোল কাকে বলে জানো তো তা? সোয়ালেট-ও বলে  তাকে অনেকে।” নিভে যাওয়া পাইপে পুনঃ অগ্নিসংযোগ করতে করতে বললেন ফড়িং সাহেব।

“না হুজুর। জানি না।” সরল স্বীকারোক্তি আজিজুল হকের।

“প্রকৃতির মধ্যে যেমন স্বাভাবিক ফোয়ারা জন্মে যায়, চোরাবালির সৃষ্টিও যেমন স্বাভাবিকভাবে হয়ে যায়, তেমনি প্রকৃতির খেয়ালে ছোট-বড় গভীর-অগভীর নানা প্রকারের গর্ত সৃষ্টি হয়, হয়ে যায়। সীনোট বা সিঙ্কহোল   তাকেই বলে। মেক্সিকো দেশে এমন রহস্যময় গর্ত দেখা গেছে। কোনো কোনো সিঙ্কহোল এতোই গভীর হয়ে থাকে যে তার দশ হাতের মধ্যে এসে পড়লে সে সোঁ সোঁ করে তার নিজের মধ্যে আকর্ষণ করে, টেনে নেয় আশপাশের জীবজন্তু বা মানুষকে!”

“বলেন কী!” উত্তেজনায় আজিজুলের চোখ ছানাবড়া।

“তা হলে আর বলেছি কী? মাস তিনেক আগে হাঁফানির টানে পাগলের মতো  ছুটে ছুটে অদ্রক ঝোপের সন্ধান করতে করতে হঠাৎ এখান, ঠিক এই বাংলোর হাতার মধ্যে হঠাৎ এক প্রবল ঠাণ্ডা হাওয়া ও টান অনুভব করি। কী বলব তোমায় আজিজুল, তার সম্মুখে এসে মুহূর্তের মধ্যে হাঁফের টান মিলিয়ে গেল আমার। সেই সিঙ্কহোলের টান টেনে নিলো আমার হাঁফের টান। সুস্থ সবল মানুষ হয়ে উঠলাম আমি। সেটি ছিল পাতকুয়ার মতো এক অপ্রশস্ত কিন্তু অতি গভীর এক গর্ত। আমার এই বাংলোর হাতার মধ্যেই রয়েছে। এক লুকানো সিঙ্কহোল। সোয়ালেট।”

“আর তাই আপনি মামুজানের নিকট হতে এই বাংলো কিনে…”

“ন্যাচরেলি। এই বাংলোয়, এই সোয়ালেটের নিকটে থেকে আমি সুস্থ! সম্পূর্ণ সুস্থ! কেন আমি সুস্থ-সবল থাকতে চাইব না? সকলেই তো তাই চায়, না?”

“তা তো বেশ, সাহেব। কিন্তু এই বান্দাকে আজকে জরুরি এত্তেলা দিয়ে ডেকে আনলেন কেন সেটা তো বললেন না?” আজিজুল।

“বলছি। বলছি। সবুর করো। সবই বলব তোমায়…,” নিভন্ত পাইপটিতে ফের অগ্নিসংযোগ করলেন উনি।  

“সোয়ালেট বা সিঙ্কহোল সম্বন্ধে তোমার কাছ থেকে জানতে চাইব না, কারণ আমার বাবা এই চম্পারণে নীলের ব্যবসায় করতে আসার আগে তিনপুরুষ আমরা নিউক্যাসেলের খনিশ্রমিক ছিলাম, গভীর মাইন বা সিঙ্কহোল নিয়েই আমাদের কারবার। আমার ঠাকুর্দা  মাইন রেসকিউ সোসাইটির ভলান্টিয়ার ছিলেন, অনেক ফেঁসে যাওয়া মাইনারকে বাঁচিয়েছেন। কিন্তু এই যে কোনো কোনো অতি গভীর গর্তের মধ্যে থেকে মানুষের হাঁফের টানের মতোই  হাওয়ার স্রোত আসে, আসে-যায়, আসতে থাকে, বাড়ে কমে, এর পিছনে নিশ্চয়ই বিজ্ঞান রয়েছে যেটাকে গাণিতিক সূত্র দিয়ে বেঁধে ফেলতে পারলে মনুষ্যজাতির প্রভূত উপকার হবে, মানুষ হাঁফানির কষ্ট থেকে মুক্তি পাবে। আমি চাই তুমি এর উপরে গবেষণা করে একটা  পথ বাতলাও।”

“কিন্তু হুজুর, এ তো জিওলজিস্টদের কাম….” হকসাহেবের নিবেদন।

“মানলাম না।   তুমি এই যে টিপসই দেখে চোরডাকু ধরছ সেটাকেও তো প্রথমে বায়োলজিস্টদের কাম বলে ভেবেছিল লোকে, পিছনের গণিতটা তুমি আবিষ্কার করলে।” ফেরিং সাহেব বললেন।

“হুম্। এটা আপনি মন্দ বলেননি হুজুর।” ভাবিত হয়ে পড়েন সেই বিজ্ঞানতাপস কাজী আজিজুল হক, “তবে, ঐ টিপসই-বিজ্ঞান তো আর আমি একা আবিষ্কার করিনি, আমার সিনিয়র বন্ধু হেমু-দাদা, হেমচন্দ্র বসু-ও যুক্ত ছিলেন এর সঙ্গে। হি ইজ মাই ফ্রেন্ড ফিলজফার এন্ড গাইড,” সবিনয় নিবেদন খান-সাহেব আজিজুল হকের, “তাঁর সঙ্গে একবার কনসাল্ট না করে…..”

“বেশ তো, করো না। আমি তো তাকেও চিনি। সম্পর্কে আমার এক ভাগ্নে হয় চার্লস। চার্লস জেমলিন, মস্ত দৌড়বীর, ওলিম্পিকের আসরে দৌড়ে এসেছে…. কেষ্টনগরে থাকে, একবার নিয়ে এসেছিল ঐ হেম বোস-কে আমার কাছে। হেমের সঙ্গে তার হলায়-গলায় ভাব। দু’জনেই কৃষ্ণগ্নগরে থাকে।”

***

লম্বু সেই  কুর্তা পরা এংলো সাহেবের কাছ থেকে এই সব গল্প শুনতে শুনতে বুঁদ হয়ে ছিলাম। 

শুধোই, “আপনি এতো সব গল্প জানলেন কেমন করে?”

“কলকাতা পুলিশের কিংবদন্তী অফিসার অমিয়ভূষণ বোস্‌  তোর দাদু হতেন, না রে?” আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে উলটে আমাকেই প্রশ্ন করলো সেই আজীব ব্যক্তি।

“আপনি কী করে জানলেন?” অবাক প্রশ্ন আমার।

“দীর্ঘদিন ছুটি নিয়ে মোতিহারীতে রয়ে গিয়ে বিজ্ঞানতাপস আজিজুল সাহেব সেবারে গবেষণা করে। সিঙ্কহোলের টান আর মানুষের হাঁফের টানের মধ্যে সাযুজ্যের যে গাণিতিক সূত্র আবিষ্কার করেছিলেন, বন্ধু-দাদা হেমচন্দ্রের উপস্থিতির অভাবে অধুরা থেকে যায় সেটা, কারণ পুরুষ রোগীর উপরে কাজ করলেও নারী-রুগীর উপরে তার প্রভাব প্রমাণ করা যায়নি। বাবা জীবকনারায়ণ, পূর্বজের সেই অধুরা কাম যে তোমাকেই আজ পূর্ণ করতে হবে! তাই না আজ আমি উঠে এসেছি।” 

সেই পাগলাটে এংলোর গলা এখন খুবই সিরিয়াস।

“চলো, ঐ সিঙ্কহোলের নুড়ি কিছু কুড়িয়ে দিই তোমায়, রুগীর মঙ্গলের জন্যে কাজে আসবে।” বলল সে!

“ফড়িং সাহেবের বাংলো” থেকে সেদিন হরিতকী না খুঁজে পেয়েই ফিরে এসেছিলুম।

তার জায়গায়, কী ভেবে, সেখানকার সিঙ্কহোলের আশপাশ থেকে কুড়িয়ে নিয়ে আসা নুড়িপাথরই কিছু কোষাকুষির পুণ্যবারিতে  চুবিয়ে রেখে যথাবিহিত পূজাপাঠ সেরেছি ‘কহলোঁ নার্সারি’-র মস্ত ড্রয়িং রুমের ভূঁয়ে পাতা অস্থায়ী ঠাকুরঘরে বসে।

সেই কঠোর সর্দারনী সারাক্ষণ অতি ভক্তিমতী সেবিকার মতো জোগাড় দিয়েছেন। শেষে হাত পেতে মন্ত্রপূত বারি চাইতে আমি বলে উঠলুম, “ইহা কাল প্রত্যুষে পেয়, এবং স্বয়ং রুগীর গণ্ডূষেই দেবো। সাহেব কাল চলে আসবেন তো?”

“আ গেল যা। এ- ছোঁড়া তো সাহেব সাহেব করে হেদিয়ে গেল। সাহেবটা আবার কে এখানে?  আমার ছেলে মণিন্দর? সে তো  লক্ষৌ গেছে বিয়ের নেমন্ত খেতে। হাঁফানি রুগী তো এই আমিই, বিধবা মানুষ….ইমতিয়াজের বাল্যবন্ধু হরবীর কৌর। দে, আমাকে তোর ঐ মন্ত্রপূত বারি দে।  জলপড়া ঐ চন্নমেত্তর পীয়ে দেখি, আমার   হাঁফানি সারে কিনা।

পুঃ– “ সোনার মোটা চেইন নিজের কাছেই রাখ, হরবীর, কারণ ইনাম নিলে আমার দোস্তের ঔষধ বলহীন হয়ে পড়বে হাওয়েভার, তোকে ধন্যবাদ,  এ-টোটকা যে মহিলারুগীতেও সমভাবে কর্মক্ষম সেটা তুইই প্রথম প্রমাণ করলি

পরের মাসের পয়লা তাঁর বান্ধবীকে পাঠানো  এই হোআ মেসেজ  আমায় ফরোয়ার্ড করেছিলেন ইমতিয়াজ আলী সাহেব। জয় জয় ফড়িং বাবা!

ছবি: জয়ন্ত বিশ্বাস

জয়ঢাকি গল্প-উপন্যাসের লাইব্রেরি 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s