গল্প বাঘের খপ্পরে সুমনকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বসন্ত ২০২০

বাঘের খপ্পরে

সুমনকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়

পাশের গ্রামে ফুটবল খেলার মাঠে একটা বেশ বড়সড় সার্কাস এসেছে। সার্কাসে নাকি খুব ভালো ভালো খেলা দেখাচ্ছে। অনেকগুলো বাঘ, হাতি, উট, দুটো সিংহ, তারপর কুকুর, পাখি এইসব নানারকম জীবজন্তু আর পশুপাখি আছে নাকি এই সার্কাস দলে। রোজ দু’বার করে খেলা দেখাচ্ছে। টিকিটও নাকি খুব সস্তা। পাঁচ টাকা, আর দশ টাকা। গ্যালারিতে যারা বসবে, তাদের পাঁচ টাকা টিকিট। আর যারা রিংয়ের কাছাকাছি চেয়ারে বসবে, তাদের টিকিটের দাম দশ টাকা। ছোটোদের নাকি হাফ টিকিট, মানে বড়োদের টিকিটের দামের অর্ধেক দাম।

সবরকমের লোকজন, মানে বাচ্চা-বুড়ো, ছেলেমেয়ে, কচিকাঁচা সবাই রোজ দলবেঁধে সার্কাস দেখতে যাচ্ছে। রোজই হাউসফুল হচ্ছে। লোকজনের মুখে শুধুই সার্কাসের কথা, আর সার্কাসের গল্প। যারা দেখতে গেছে তারা তো বলছেই, যারা দেখেনি তারাও অন্যের মুখে শুনে সেইসব গল্প করছে। যেন সার্কাসের পরব জমেছে।

রাত্তিরবেলা সার্কাসের তাঁবুর পাশ থেকে একটা খুব জোর আলো আকাশে ফেলে চারপাশে ঘোরানো হয়। ওটাকে বলে সার্চ লাইট। আট-দশখানা দূরের গ্রাম থেকেও ঐ আলো দেখতে পাওয়া যায়। মনে হয় যেন একটা লম্বা আলো আকাশের এ-মাথা থেকে ঘুরে ও-মাথায় মিলিয়ে গেল। আবার খানিক পরে দেখা যাবে। আবার! আবার! এইভাবে যতক্ষণ না রাত্তিরের খেলা দেখানো শেষ হচ্ছে, ততক্ষণ ঘুরতেই থাকবে। এটাকে বলে প্রচার। এই আলো কোথা থেকে আসছে, কেন আসছে জানতে চেয়ে লোকে সার্কাসের কথা জানতে পারবে। অমনি সবাই দলবেঁধে সার্কাস দেখতে আসবে। সার্কাসওয়ালার রোজগার বেড়ে যাবে।

বুবলা আর পাপাই ক’দিন ধরেই বাবা-মাকে জ্বালিয়ে মারছে সার্কাস দেখতে যাবার জন্যে। বুবলার দিদিও মাকে বলছে। বুবলার মা মেয়ে-ইস্কুলের দিদিমণি। পাপাইয়ের মাও তাই। সেইজন্যে ছুটি না পেলে ওঁদের যাওয়া হচ্ছে না। তবে দুই মায়ে যুক্তি হয়েছে, সবাই যখন ভালো বলছে আর ছেলেমেয়েরাও ছাড়ছে না, তখন সামনের রবিবার দিন সকলে মিলে সার্কাস দেখতে যাওয়া যাবে।

বুবলা আর পাপাইয়ের আনন্দ দেখে কে! রবিবার হতে আর ক’দিন বাকি তার হিসেব হয়ে গেল। কে কী জামা পরে যাবে হিসেব হয়ে গেল তারও। তারপর আফসোস, ইস, রবিবার কেন আজ হল না! কেন আজই হল না?

এদিকে হয়েছে কী, হঠাৎ হইহই করে একটা খবর রটে গেল কিনা সার্কাসের একটা বিরাট বাঘ রাত্তিরবেলা কীভাবে খাঁচা খুলে কিম্বা খোলা পেয়ে বেরিয়ে পালিয়েছে। শুনে পর্যন্ত সমস্ত লোকজন ভয়ে কাঁটা হয়ে গেছে। এ কী কথা! কখন কোথা থেকে কার ঘাড়ে যে হালুম করে ঝাঁপিয়ে পড়ে কচমচিয়ে চিবিয়ে খাবে, তা কেউ বলতে পারে! তাই সব লোক ঘরে খিল দিয়ে বসে রইল। অফিস যাওয়া বন্ধ, কাজকম্ম বন্ধ, ইস্কুল-পাঠশালায় যাওয়া বন্ধ। খেলতে যাওয়াও বন্ধ! আশেপাশের চার-পাঁচখানা গ্রামে মানুষ আছে কি না বোঝার উপায় রইল না।

দু’দিন ধরে বহু খোঁজাখুঁজি করেও বাঘের হদিশ করতে পারল না সার্কাসের লোকজন। সবাই ভয়ে ভয়ে দিন কাটাচ্ছে। এরই মধ্যে একদিন, দুপুরবেলা সবাই ঘুমিয়ে পড়লে বুবলা একগাছা দড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল চুপিচুপি। পাপাইদের বাড়িতে গিয়ে পাপাইকে ডাকল, “ঘরে লুকিয়ে বসে থেকে কী হবে? চল, দু’জনে মিলে বাঘটাকে খুঁজে বার করে, বেঁধে সার্কাসওয়ালাকে দিয়ে আসি। নইলে আমাদের সার্কাস দেখা যে বন্ধ হয়ে যাবে রে!”

পাপাই একবার উঁকি দিয়ে দেখে এল তার মায়েরা ঘুমিয়েছে, না জেগে আছে। বাড়ির সকলেই ঘুমিয়ে আছে দেখে একগাছা লাঠি হাতে বেরিয়ে এসে বলল, “চল তাড়াতাড়ি।”

বুবলা বলল, “লাঠি কী হবে রে?”

পাপাই বলল, “বাহ্‌ রে, বাঁধবার পরে বাঘটাকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে নিয়ে যেতে হবে না? তখন তো এই লাঠিটা লাগবে। তাছাড়া লাঠিটা দেখলে ভয়ও পাবে, নইলে তো আমাদের খেয়ে ফেলতেও পারে!”

বুবলা তাড়াতাড়ি চলতে চলতে বলল, “যাহ্‌! সার্কাসের বাঘ মানুষ খায় না। দেখিস না, যারা খেলা দেখায় তাদের কি খায়?”

“না রে,” পাপাই জানায়, “বাবা বলছিলেন, যারা বাঘ-সিংহি নিয়ে খেলা দেখায় তাদের হাতে ব্যাটারি লাগানো চাবুক থাকে। ওই চাবুকের ভয়ে ওরা খেলা দেখানো-ওয়ালাদের কিছু বলে না।”

বুবলা বলল, “হ্যাঁ রে, ঠিকই বলেছিস। ওদের হাতে তো সরু সরু ছিপটি থাকেই। তাই দিয়ে সপাং সপাং করে মারে।”

পাপাই বলে, “বুবলা, আমাদের তো ব্যাটারি দেওয়া ছিপটি নেই, বাঘ আমাদের খেতে এলে আমরা কী করব?”

“আমরা তো বাঘের সামনে যাব না।” বুবলা উত্তর দিল, “আমরা শিকারিদের মতো গাছে উঠে বসে থাকব। যেই না বাঘ গাছের নিচে এসে দাঁড়াবে, অমনি দড়ির ফাঁস ছুড়ে দিয়ে বাঘটাকে আটকে ফেলব। তারপর বাঘকে তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া তো ছাগল তাড়ানোর মতো সোজা।”

পাপাই বলল, “সেই ভালো। চল আমরা চালতাবাগানের পিছনের আমবনটায় গিয়ে বসে থাকি। বইয়ে পড়েছি, বাঘ আছে আমবনে।”

“আমিও পড়েছি।” বুবলা উত্তর দিল, “বাঘ থাকে আমবনে, গায়ে চাকা চাকা দাগ। চল, আমরা আমবনেই যাই।”

কিন্তু চালতাবাগানের আমবনে ওদের আর যেতে হল না। আমবনে যাবার আগে একটা পুকুরপাড়ের ওপর দিয়ে যেতে হয়। সেখানে কিছু বট-পাকুড়-আমড়া আর কয়েতবেলের গাছ আছে। আর গাছের নিচে আছে ঘন বনতুলসীর ঝোপ। বনতুলসীর ঝোপ বেশ বড়োই, জায়গায় জায়গায় সেগুলো বুবলা-পাপাইয়ের মাথা ছাড়িয়ে উঠেছে।

ঝোপের মাঝখান দিয়ে সরু পায়ে চলা পথ। সেই সরু পথ দিয়ে বকবক করতে করতে আর ঝোপ ঠ্যাঙাতে ঠ্যাঙাতে দুই ভীষণ সাহসী বীর চলেছে আমবনে বাঘ ধরতে। হঠাৎ যেন কানের পাশে বাজ পড়ল। কে যেন বিরাট হুঙ্কার ছাড়ল, ‘ঘিঁয়াও!’

বুবলা আর পাপাই শুনল, ‘হিঁয়া আও!’

হুঙ্কারে চমকে গিয়ে দড়ি-লাঠি ফেলে এক লাফে সামনের কয়েতবেল গাছটায় দু’জনে হ্যাঁচোড়প্যাঁচোড় করে উঠে পৌঁছে গেল প্রায় মগডালে। পাপাই প্রায় চুপিচুপি বলল, “কে আমাদের ‘হিঁয়া আও’ বলে ডাকল বল তো? রাক্ষস নাকি!”

বুবলা বলল, “হেই! রাক্ষস কি হিন্দি বলে নাকি? এ মনে হল সার্কাসের বাঘটা। শুনে শুনে হিন্দি শিখে ফেলেছে।”

পাপাই ভয়ে ভয়ে বলে, “তাহলে কী হবে রে, বুবলা? লাঠিটা তো ফেলে এসেছি!”

“আমিও তো দড়িটা ফেলে এসেছি।” বুবলার উত্তর। তারপর বিজ্ঞের মতো বলে, “ভয় পাচ্ছিস কেন? বুদ্ধি খাটাতে হবে। দাঁড়া না, বাঘ বাবাজিকে জব্দ করতে হবে।”

বাঘটা আসলে বনতুলসীর ঝোপে ঘুমোচ্ছিল শুয়ে শুয়ে। ঘুমের মধ্যে তার কানে বুবলা-পাপাইয়ের গলা যেতে সে ঘুমের মধ্যেই হুঙ্কার ছেড়েছিল। নিজের হুঙ্কারে নিজেরই ঘুম গেছে ভেঙে। এদিকে সেই সময়টুকুর মধ্যেই বুবলা-পাপাই উঠে গেছে কয়েতবেল গাছের ডালে। নইলে বাঘ যদি জেগে থাকা অবস্থায় ওদের দেখতে পেত, তাহলে কী যে হত ভাবলেই শিউরে উঠতে হয়! হাত-পা হিম হয়ে যায়।

স্বপ্ন দেখছে মনে করে বাঘ আবার ঘুমোতে যাচ্ছে, এমন সময় আবার ফিসফিসানি কথা কানে এল। ‘তাহলে তো স্বপ্ন নয়!’ ভাবল বাঘ। কথার শব্দ লক্ষ করে বাঘ চোখ মেলল, আর চোখ মেলতেই নজরে পড়ল কয়েতবেল গাছের ডালে দু-দুটো নধর মানুষের বাচ্চা! আহ্‌! কতদিন যে মানুষের মাংস খাওয়া হয়নি! সোয়াদ বোধ হয় ভুলেই গেছে সে—ভাবল বাঘ। এই দুটোকে দিয়ে টিফিন খাওয়াটা হলে মন্দ হয় না। ‘আ-উ’ করে বাঘ একটা আড়াইতলা হাই তুলল।

গাছের ওপর থেকে বুবলা-পাপাই সেটা শুনতে পেল। বুবলা বলল, “ওই দ্যাখ, আবার কেউ বলল ‘হাউ’!”

পাপাই বলল, “সত্যি, এ বাঘ না হয়ে যায় না। তখন হিন্দি বলছিল, এখন আবার ইংরিজি বলছে। আমি জানি, হাউ মানে কেমন আছ। মনে হয় ভাব করতে চাইছে। নেমে দেখবি?”

বুবলা বলল, “না রে, আমি হিতোপদেশের গল্পে পড়েছি, দুষ্টু লোককে বিশ্বাস কোরো না।”

পাপাইয়ের তবুও সন্দেহ যায় না। “কিন্তু এ তো দুষ্টু নাও হতে পারে।”

বুবলা বিজ্ঞের মতো জবাব দেয়, “সেটা তো আগে জানতে হবে। নইলে ভালো ভেবে আমরা নামি, আর ঘাঁউ করে আমাদের ধরে কাঁউ কাঁউ করে যদি খেয়ে ফেলে, কে আমাদের বাঁচাবে?”

পাপাই বলে, “সেকথা ঠিক। মা পর্যন্ত এখানে নেই।”

“মাও নেই, দিদিও নেই।” বুবলা বলল, “তবে দিদির যা সাহস, এখানে থাকলেই কী আর না থাকলেই কী!”

ঠিক সেই সময় বাঘ দাঁড়িয়ে উঠে মাটিতে লেজ আছড়ে হুঙ্কার দিল, ‘ঘ্রাই হুম!’

পাপাই জিজ্ঞেস করল, “কী বলছে বল তো? এটাও কি ইংরিজি?”

বুবলা বলল, “মনে হচ্ছে, বলল কাম ডাউন।”

“কাম ডাউন? তার মানে কী রে? কাম মানে তো জানি, এসো।”

বুবলা উত্তর দিল, “কাম ডাউন মানে আমি জানি, নেমে এসো। আমি গাছপালায় উঠলে বাবা মাঝে মাঝে গম্ভীর গলায় আমায় বলেন, ‘বুবলা, কাম ডাউন’।”

“কেন নামতে বলছে বল তো? পাপাই সন্দেহের সুরে বলে, “ভাব করতে চাইছে বলেই তো মনে হচ্ছে।”

বুবলা ভালো করে দেখে বলে, “ভাব করতে চাইলে কি ঐরকম করে হুঙ্কার দেয়? কী জানি! আবার কেমন লেজ আছড়াচ্ছে দ্যাখ! না রে, নেমে কাজ নেই।”

বাঘ ততক্ষণে গাছের নিচে এসে দাঁড়িয়েছে। ওপর দিকে জ্বলজ্বল করে তাকাচ্ছে, আর বুবলা-পাপাইকে দেখে মুখ দিয়ে টস টস করে লাল পড়ছে। বাঘ সড়াৎ করে লাল টেনে আবার হুঙ্কার দিল, ‘ঘ্রাই হুম!’

বুবলা বলল, “পাপাই, বাঘটা কিন্তু একদম ভালো নয়। দ্যাখ না, আমাদের দেখতে ওর মুখ দিয়ে কীরকম লাল ঝরছে! আমাদের খাবে বলে বারবার বলছে, কাম ডাউন!”

পাপাই চিৎকার করে উঠল, “ওই দ্যাখ বুবলা, শয়তান বাঘটা লাফ মারছে!”

সত্যিই বাঘটা পেল্লায় একটা লাফ দিয়ে উঠে গাছের একটা মোটা ডালে ধাক্কা খেয়ে ধপাস করে নিচে পড়ল। আবার লাফ মারল। আবার। কিন্তু বুবলা-পাপাই তো মগডালে। তাদের ধরা কি সোজা কথা!

পাপাই একটু যেন ভয় পেয়েই বলে, “কী রে বুবলা, ধরে ফেলবে নাকি!”

বুবলা বলে, “দাঁড়া না, ধরাচ্ছি। কাদের ধরতে এসেছে জানে না তো। টের পাবে এইবার।”

আসলে কয়েতবেল গাছে এইসা বড়ো বড়ো কাঁচা কয়েতবেলগুলো দেখে মাথায় বুদ্ধি এসে গেছে বুবলার। “দ্যাখ, বাঘ ঐ ধুমসো শরীর নিয়ে এতদূরে কখনওই লাফিয়ে উঠতে পারবে না।” বুবলা বলে, “কিন্তু লাফাতে লাফাতে একসময় হাঁফিয়ে পড়বে, আর তখনই শুরু হবে আমাদের খেল!”

“কী করবি?” পাপাই বড়ো বড়ো চোখ করে জিজ্ঞেস করে, “বাঘটাকে বাঁধতে পারবি?”

“দেখাই যাক।” বলে বুবলা পাপাইকে বুদ্ধিটা শোনায়, “দ্যাখ না, হাতের কাছে কত কাঁচা কাঁচা এইসা সাইজের কতবেল। খালি ছিঁড়ব, আর বাঘের চোখ-নাক টিপ করে মারব। তুইও মারবি। তারপর বাঘ যখন অজ্ঞান হয়ে যাবে…”

“বুঝেছি বুঝেছি, আর বলতে হবে না।” পাপাই বুবলার কথার মাঝখানে বাধা দিয়ে বলে ওঠে, “কীর’ম টিপ আমাদের হাতে বাঘ বাবাজিকে আজ দেখিয়ে দোব।”

বুবলার কথাই ঠিক হল। বাঘটা হাঁফিয়ে গিয়ে গাছের গোড়ায় বসল পা ছড়িয়ে। চোখদুটো তার রইল গাছের ওপরে বুবলা-পাপাইয়ের দিকে। জিভ বের করে বাঘটা হ্যা হ্যা করে হাঁফাতে লাগল।

বুবলা একটা বড়ো দেখে কয়েতবেল ছিঁড়তে ছিঁড়তে বলল, “কেমন হাঁফাচ্ছে দ্যাখ। মনে হয় সার্কাসের লোকগুলো ভালো করে খেতে দ্যায় না। নে, এই সুযোগ। তুই বাঁ চোখটায় টিপ করে মার, আমি মারব ডান চোখটায়।”

পাপাই একটা কয়েতবেল পেড়ে বলল, “ঠিক আছে। নে, রেডি।”

দু’জনে বাঁহাতে গাছের ডাল ধরে দাঁড়িয়ে উঠে একই সঙ্গে দুটো কয়েতবেল ছুড়ল যতটা জোরে পারা যায়। সত্যিই আশ্চর্য টিপ দু’জনের হাতে! দুটো বেল একই সঙ্গে এসে লাগল বাঘের দু’চোখে। বাঘ আতঙ্কে আর ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠল, ‘ঘাঁক!’

বাঘ একেবারে দিশেহারা হয়ে পড়েছে। সার্কাসে ব্যাটারি লাগানো ছিপটির আঘাত সে অনেক পেয়েছে, কিন্তু এইরকমের মার সে কখনও খায়নি। ভয়ে সে থরথর করে কাঁপতে শুরু করেছে। সেই সময় আবার দুটো কয়েতবেলের গোলা তার কপালে এসে লাগতেই সে আর গাছতলায় থাকা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না বুঝে লেজ তুলে চোঁ-চা দৌড় লাগাল। মাঠঘাট, ঝোপঝাড় ভেঙে বাঘ ছুটে চলল। শুধু মাঝে মাঝে তার আর্তনাদ শোনা যেতে লাগল, ‘ঘাঁয়াও, ঘাঁয়াও!’

বুবলা আর পাপাইয়ের হাসি দেখে কে। হেসে কুটিকুটি হতে হতে পাপাই বলল, “দেখলি বুবলা, বাঘটা বাংলাও জানে। যেই চোখে কয়েতবেলের বাড়ি খেয়েছে, অমনি চেঁচিয়ে উঠেছে ‘বাপ’ বলে।”

বুবলা বলল, “তাই তো। আর পালাবার সময় কীরকম ‘বাঁচাও বাঁচাও’ বলে চেঁচাচ্ছিল বল তো!”

“কিন্তু বাঘটা গেল কোথায়?” পাপাই বলে।

“আমার মনে হয় বাঘটা সার্কাসের অফিসে না গিয়ে থামবে না।” বুবলা বলল, “দেখলি না, আসলে বাঘটা কত ভিতু!”

পাপাই বলল, “তাহলে চল, বাড়ি পালাই। যদি বাবা-মায়ের ঘুম ভেঙে যায় তাহলে আমাদেরও বাঁচাও বাঁচাও বলে চেঁচাতে হবে। দুপুরবেলা বাড়ি পালানোর এইসা পিটুনি দেবে না!”

“ঠিক বলেছিস।” গাছ থেকে নামতে নামতে বুবলা বলে, “আমার একদম মনেই ছিল না কথাটা।”

দু’জনে তাড়াতাড়ি গাছ থেকে নেমেই দে ছুট বাড়ির দিকে।

দু’জনের বাড়িতেই সবাই ঘুম ভেঙে উঠে খোঁজাখুঁজি শুরু করে দিয়েছে। ওদের দেখে সবাই ধমকে ওঠে, “কোথায় গেছিলি রে, হ্যাঁ?” বাঘের ভয়ে কেউ রাস্তায় বেরোচ্ছে না, আর তোরা কোথায় ঘুরছিলি? যদি বাঘে ধরত!”

বুবলা-পাপাই হাসে। “বাঘ এতক্ষণে বোধ হয় সার্কাসের অফিসে পৌঁছে গেছে। যা মার দিয়েছি আমরা!”

দুই মায়ের গালে হাত। “বলিস কী রে! সত্যি নাকি!”

ওরা বলে, “কেন, শুনতে পাওনি? বাঘ বাঁচাও বাঁচাও বলে চেঁচাতে চেঁচাতে পালাল!”

বুবলার মা বলেন, “বাঘের ডাক শুনতে পেলুম বলেই তো খোঁজাখুঁজি করছি। হ্যাঁ রে, বাঘকে মেরে তাড়িয়েছিস, সত্যি নাকি?”

“সত্যি না তো কী?” পাপাই হাসে।

“সত্যি না তো কি মিথ্যে বলছি নাকি?” বুবলা বলে।

পাপাইয়ের মা বলেন, “এইসব সাংঘাতিক ছেলে নিয়ে কী করব, দিদি! বলি, ওদের প্রাণে ভয়-ডর কি কিছু নেই?”

“কপাল, কপাল!” নিজের কপালে হাত দিয়ে বলেন বুবলার মা, “আমাদের ভয়ে দম আটকে না গেলে ওদের শান্তি নেই।”

বুবলা কথা ঘোরানোর জন্যে বলে, “খেতে দেবে চলো না, ও মা, খিদে পেয়েছে যে!”

বুবলার মায়ের চোখে জল এসে গিয়েছিল। তিনি কোনও কথা না বলে বুবলাকে কোলে তুলে নিয়ে বাড়ি ঢুকলেন। দিদি শুধু বলল, “তোমার আদরে আদরেই তো ভূতটা বাঁদর হয়ে উঠছে।”

বুবলা মাকে আড়াল করে দিদিকে জিভ দেখিয়ে দিল।

আর বুবলা-পাপাইয়ের ধারণা সত্যি হল। কেননা কিছুক্ষণ পরেই সার্কাসের গাড়ি প্রচার করতে বেরিয়ে পড়ল, বাঘ ধরা পড়েছে, আর ভয়ের কিছু নেই। সন্ধেবেলা যথারীতি খেলা দেখানো হবে। সবাইকে দলে দলে খেলা দেখতে যাবার জন্যে অনুরোধ জানাল তারা। সেদিন সন্ধেবেলা সার্কাস দেখতে যা ভিড় হল না, অমনধারা কোনোদিন হয়নি।

দু’দিন পরে বুবলা আর পাপাই তাদের মা-বাবা-দিদিদের সঙ্গে সার্কাস দেখতে গেল। সব খেলা দেখানোর পর বাঘের খেলা শুরু হল। বুবলা আর পাপাই সেই বাঘটাকে খুঁজছে। কিন্তু সব বাঘই একরকম দেখতে। তাই তারা চিনতে পারছিল না। কিন্তু হঠাৎ একটা বাঘ ‘ঘাঁয়াও, ঘাঁয়াও’ করে চেঁচাতে চেঁচাতে একছুটে এক্কেবারে খাঁচার মধ্যে ঢুকে পড়ল। আর তক্ষুনি বুবলা-পাপাই বুঝতে পারল কোন বাঘটাকে তারা মেরে তাড়িয়েছিল।

সার্কাসের লোকেরা বহু চেষ্টা করল বাঘটাকে বাইরে আনার। কিন্তু সে কিছুতেই খাঁচার বাইরে এল না। শুধু ‘ঘাঁয়াও, ঘাঁয়াও’ বলে চেঁচাচ্ছে আর খাঁচার কোণের মধ্যে ঢুকছে।

শেষকালে সার্কাসের লোকেরা ঘোষণা করল, “মনে হচ্ছে কোনও কারণে বাঘটা ভয় পেয়েছে। ওকে দিয়ে আজ আর খেলা দেখানো যাবে না। আমরা আপনাদের কাছে ক্ষমা চাইছি।”

বুবলা আর পাপাই দু’জনে দু’জনের মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। ওরা ঠিকই বুঝতে পেরেছে আসলে কাদের দেখে বাঘ বাবাজি ‘বাঁচাও, বাঁচাও’ করে ছুটছে। কাঁচা কয়েতবেলের ঐ ব্যথা এত সহজে সে ভুলতে পারবে বলে মনে হয় না।

জয়ঢাকের সমস্ত গল্পের লাইব্রেরি এই লিংকে