গল্প বারবেলা শিশির বিশ্বাস শরৎ ২০১৭

শিশির বিশ্বাসের আগের গল্পগুলো 

শনিবারে এমনিতেই ভিড় কম। তায় আবার সকালের দিকে ঘন্টা কয়েক শিয়ালদহ মেন লাইনে ট্রেনের গোলমাল। দুই মিলিয়ে আজ এই দুপুরেও কলেজ স্ট্রিটের বইপাড়া প্রায় ফাঁকাই বলা যায়। কাউন্টারের ওধারে একলা বসে অনিন্দ্য নতুন একটা বই উল্টে দেখছিল। মোবাইলে এস.এম.এস এল একটা। আজকাল এস.এম.এস-এর বেশিরভাগই অপ্রয়োজনীয় বিরক্তিকর জিনিস। অনিন্দ্য তাই বেশিরভাগ সময়েই ইগনোর করে ব্যাপারটা। তাতে অনেক সময়েই দরকারি মেসেজ মিস করেছে ও। কিন্তু তাতে অভ্যেসটা যায়নি। আজ কাজ নেই তেমন। অনিন্দ্য হাতের বই নামিয়ে রেখে পকেট থেকে বের করল মোবাইলটা। আর তখনই খেয়াল হল, নতুন দামি মোবাইলটা কেনার পর গত দু’দিন ও একটা এস.এম.এসও ওপেন করেনি। অনেকগুলো মেসেজ জমে রয়েছে। হাতে মোবাইলটা নিয়ে এক এক করে মেসেজগুলো দেখছিল। হঠাৎ মস মস শব্দে কেউ দোকানে ঢুকল। ও ঘাড় তোলার আগেই চোস্ত ইংরেজিতে কেউ বলল, “হাই মিস্টার!”

অনিন্দ্য ঘাড় তুলে দেখল, কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে বছর তিরিশ বয়সের ধোপদুরস্ত পোশাকে এক সুঠাম চেহারার যুবক। চোখে চোখ পড়তেই সামান্য ঝুঁকে বো করে বলল, “ইয়েস স্যার, ইয়েস্টারডে ইউ ওয়্যার নট ইন দ্য শপ। বাট ওয়ান নাইস এজড ম্যান আস্কড মি টু সি নেক্সট ডে।”

অনিন্দ্যর বুঝতে অসুবিধা হয় না, মানুষটি যার কথা বলছে তিনি ওর বাবা। আসলে পৈতৃক এই দোকানে বাবাই বসেন। একসময় কর্মচারীও ছিল একজন। কিন্তু কলকাতার কলেজ স্ট্রিট পাড়ার বইয়ের দোকানে সেই দিন এখন আর নেই। আসলে মিডিয়ার নানা হাতছানিতে বই পড়ার অভ্যেসটাই আজকের নতুন প্রজন্ম হারিয়ে ফেলেছে। অথচ কয়েক বছর আগেও অবস্থাটা ছিল অন্যরকম। ওর কৈশোর, মানে এই আশির দশকেও বই ছিল এক লোভনীয় জিনিস। বলা যায়, ওই বই পড়ার টানেই সময় পেলেই ও চলে আসত বাবার এই দোকানে। ওদের এই দোকানে শুধু বাংলা নয়, উঁচু মানের দরকারি ইংরাজি বইও রাখা হয়। কী ভিড়টাই না হত সেই সময়। মনে পড়ে, তখন ও দোকানে এসে নতুন কোনও ভালো বই এলে খুঁজে নিয়ে বসে পড়ত। ওরই মাঝে খদ্দেরও সামলাত। এ ব্যাপারে বাবাও উৎসাহ দিতেন। তবে স্কুলে পড়ার সময় আসা হত কম। কিন্তু কলেজ, তারপর ইউনিভার্সিটির জীবনে ফাঁক পেলে প্রায় রোজই চলে আসত এই দোকানে। পাশ করে বের হবার পর অবশ্য বেশি দিন বসে থাকতে হয়নি। বছর ঘোরার আগেই চাকরি। বাবার এই বইয়ের দোকানের সঙ্গে সম্পর্ক তারপরেও যায়নি একেবারে।

শনিবারে অফিস ছুটি। বাড়িতে বসে না থেকে এই দিনে ও তাই চলে আসে দোকানে। ইতিমধ্যে অবস্থা পাল্টেছে। বিক্রিবাট্টা কম। তাই বিদায় দিতে হয়েছে কর্মচারীদের। বাবারও বয়স হয়েছে। শনিবারে তাই আর আসেন না। ও একাই চালিয়ে নেয়। সন্দেহ নেই, কাস্টমার ভদ্রলোক আগের দিন কোনও বিশেষ বইয়ের জন্য এসেছিলেন। সম্ভবত দোকানে বইটা ছিল না। বাবা পরের দিন আসতে বলেছিলেন।

কাস্টমার লক্ষ্মী। তায় ফাঁকা দোকান। ব্যস্ত হবার কথা। কিন্তু তার ছিটেফোঁটাও দেখা গেল না অনিন্দ্যর ভেতর। ততক্ষণে আগন্তুকের আপাদমস্তক মেপে নিয়েছে ও। নির্ভেজাল বাঙালি। সন্দেহ নেই, কোনও ইংরেজি স্কুলে পড়া নব্য যুবক। সেই দৌলতে বিলিতি বুলিটা রপ্ত করেছে ভালোই। আর আজকাল কলকাতার পথেঘাটে এই এক ব্যাপার শুরু হয়েছে। চোস্ত ইংরেজিতে দু’চারটে বুলি ছাড়তে পারলেই খানিক অতিরিক্ত সম্ভ্রম পাওয়া যায়। এরাও সেই সুযোগটা নেয়। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, আগন্তুক নির্ভেজাল বঙ্গসন্তান। কলকাতার কলেজ স্ট্রিট পাড়ার দোকানে বই কিনতে এসে ইংরেজি বলার যে দরকার হয় না, তা বেশ জানে। তবুও যে ইংরেজিতে কথা বলছে, তা ওই কারণেই। বাবা হলে এসব নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে এতক্ষণে মিষ্টি কথায় চলে আসত কাজের ব্যাপারে। কিন্তু অনিন্দ্যরও বয়সও তেমন বেশি নয়। সামান্য কড়া একটা জবাব চলে এসেছিল মুখে। ওই সময় মাস কয়েক আগের একটা ব্যাপার মনে পড়ে গেল।

অফিস থেকে মাইনে ই.সি.এস-এ হয়। তাই ডেবিট কার্ড ব্যবহার করতে হয় ওকে। একদিন টাকা তোলার জন্য এ.টি.এম বুথের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। ভেতরে মেশিনের সামনে দাঁড়িয়ে একজন বাংলা অপশনে কাজ করছিলেন। দেখে একটু অবাকই হয়েছিল। এ.টি.এম মেশিনে বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি তিনটে অপশন থাকলেও কখনও বাংলা ব্যবহারের কথা মনে হয়নি ওর। বরাবর ইংরেজিটাই ব্যবহার করে। ওর সামনে দাঁড়িয়েছিলেন দুই তরুণী। অবাক হয়ে একজন তো পাশে সঙ্গিনীকে চাপা গলায় বলেই ফেললেন, “এই, দ্যাখ দ্যাখ, ভদ্রলোক বাংলা ইউজ করছে রে!”

শুনে অজান্তে ঠোঁটের কোনায় হাসি এসে গেছিল অনিন্দ্যরও। এর মাস কয়েক পরে কাগজের এক কোনায় ছোট একটা সংবাদ দেখে চমকে উঠেছিল। নামি এক ব্যাঙ্ক তাদের কলকাতার এক এ.টি.এম মেশিনে বাংলা অপশন হঠাৎই বন্ধ করে দিয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই মেশিনে বাংলা অপশন মাসে দু’চারজনের বেশি কাস্টমার ব্যবহার করেন না। অথচ মেশিনে উর্দু অপশন রাখার জন্য স্থানীয় কিছু মানুষ অনেকদিন ধরেই দরবার করে আসছেন। ব্যাঙ্কের কর্তপক্ষ তাই বাংলা আপাতত বন্ধ করে দিয়েছেন। চেষ্টা চলছে ওই জায়গায় উর্দু অপশন দেবার। সেই থেকে অনিন্দ্য এ.টি.এম মেশিনে আর কখনও ইংরেজি ব্যবহার করেনি।

কড়া জবাবটা তাই চেপেই গেল অনিন্দ্য। তবুও তখনই কথা না বলে চোখ নাচাল একটু। ওধারের যুবকটি তাই দেখে সামান্য শ্রাগ করে বলল, “এক্সকিউজ মি, স্যার। আ অ্যাম ফ্রম গভর্নর হাউস। ম্যাডাম সেন্ড মি ফর আ বুক।”

অনিন্দ এবার নড়ে বসল সামান্য। খোদ গভর্নরের স্ত্রী ভদ্রলোককে একটা বই কেনার জন্য পাঠিয়েছেন। হেলাফেলা করা যায় না। কিন্তু যুবকটির ফের ইংরেজি কথার পর একেবারে চুপ করেও থাকতে পারল না। যথেষ্ট মিষ্টি করেই বলল, “কিছু মনে করবেন না ভাই, আপনাকে বঙ্গভাষী বলেই মনে হচ্ছে। আর এটাও বিলেত নয়। কলকাতার কলেজ স্ট্রিট পাড়া। বিলিতি বুলিটা না বললেও চলে। তাই না? যাই হোক, কী বই চাইছিলেন?”

অনিন্দ্যর কথায় হঠাৎ কেমন মিইয়ে গেল যুবকটি। মুখ দেখে বুঝতে অসুবিধা হয় না, এমনটা একেবারেই আশা করেনি সে। তবে সামলে নিল মুহূর্তেই। তাড়াতাড়ি পকেট থেকে একটা ছোটো কাগজ বের করে কাউন্টারে রাখল। স্লিপটা হাতে নিয়ে  অনিন্দ্য দেখল বাইরের একটা আনকমন ইংরেজি বই। দোকানে থাকে না সবসময়। তবে শেলফে খোঁজ করতে পেয়ে গেল একটা কপি। সম্ভবত বাবা গতকালই আনিয়ে রেখেছেন। বইটা এনে দিতে সেটা হাতে নিয়ে দেখছিল যুবকটি। অনিন্দ্য বলল, “সাড়ে পাঁচশো টাকা দাম। ক্যাশমেমো কাটব?”

“ও শিওর।” সামান্য ব্যস্ত হয়ে যুবকটি বলল, “কিন্তু পেমেন্টটা ক্রেডিট কার্ডে নিতে হবে।”

ক্রেডিট কার্ডে পেমেন্ট নেবার ব্যবস্থা ওদের দোকানে রয়েছে। কিন্তু লাইন খারাপ থাকার কারণে গতকাল থেকে ‘ডেটা ক্যাপচারিং মেশিন’ অফ হয়ে রয়েছে। হাতের ক্যাশমেমো বইটা খুলছিল অনিন্দ্য। ওই কথায় সেটা বন্ধ করে বলল, “না ভাই, আমাদের মেশিন খারাপ হয়ে রয়েছে। ক্যাশ দিতে হবে।”

অনিন্দ্যর কথায় যুবকটি চোখে তেমন ভাবান্তর হল না। মাথা নেড়ে বইটা নামিয়ে রেখে বলল, “তাহলে হল না, স্যার।”

যুবকটি চলে গেল এরপর। ওদের দুটো দোকান পরে ‘ওরিয়েন্ট বুক এজেন্সি’। মিনিট দশেক কাটেনি। হঠাৎ সেখান থেকে চিৎকার চেঁচামেচি, হইচই। কিছু একটা ঘটেছে সন্দেহ নেই। খোঁজ নিতে একটু পরেই অনিন্দ্য জানতে পারল ব্যাপারটা। প্রায় স্তম্ভিত হয়ে গেল। ওরিয়েন্ট বুক এজেন্সির মালিক প্রণব রায় নিজেই ছিলেন দোকানে। হঠাৎ এক ধোপদুরস্ত পোশাক পরা যুবক দোকানে এসে চোস্ত ইংরেজিতে একটা বই চায়। সে নাকি গভর্নর হাউস থেকে আসছে। বইটা গভর্নরের স্ত্রীর খুবই দরকার। প্রণব রায় বয়স্ক অভিজ্ঞ মানুষ। ছেলেটির মুখে চোস্ত ইংরেজি, তায় গভর্নরের ওয়াইফের কথা শুনে একটু ঘাবড়েই গিয়েছিলেন। বইটা ওর দোকানে ছিল না। কিন্তু তাই বলে ফিরিয়ে দিতে পারেননি। কর্মচারীকে দিয়ে স্লিপ পাঠিয়ে অন্য দোকান থেকে আনিয়ে দিয়েছিলেন। খাতির করে চাও খাইয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বইটা আর নেওয়া হয়নি তার। পেমেন্টের জন্য যে ক্রেডিট কার্ড তিনি দিয়েছিলেন, সেটি কাজ করেনি। ক্ষমাটমা চেয়ে যুবকটি চলে গিয়েছিলেন এরপর। আর তাঁর খানিক পরেই প্রণববাবুর খেয়াল হয়, তাঁর দামি মোবাইলটি উধাও। যুবকটি দোকানে ঢোকার সময় মোবাইলে কথা বলছিলেন। তারপর সেটা নামিয়ে রেখেছিলেন কাউন্টারের উপর। কাস্টমারকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় আর খেয়াল ছিল না। সন্দেহ নেই, কোনও এক ফাঁকে যুবকটি তুলে নিয়েছে সেটা। বুঝতেও পারেননি।

খবরটা শোনার পর অজান্তেই একটা স্বস্তির নিশ্বাস বেরিয়ে এল অনিন্দ্যর বুক থেকে। হাতের নতুন কেনা মোবাইলটার দিকে একবার তাকাল। পাঁজি-পুঁথিতে তেমন বিশ্বাস নেই। তবু ছোকরার ওই ইংরেজি বুলিতে গোড়াতেই মেজাজটা বিগড়ে না গেলে শনিবারের বারবেলার কোপটা যে ওর উপর দিয়েই যেত তাতে সন্দেহ নেই এখন।

গ্রাফিক্‌সঃ ইন্দ্রশেখর

জয়ঢাকের সমস্ত গল্পের লাইব্রেরি এই লিংকে

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s