গল্প বুদ্ধ ও মহাভারত কর্ণ শীল শরৎ ২০২০

কর্ণ শীলের আগের গল্প- ভয়াল দেবতার মন্দিরে

বুদ্ধ ও মহাভারত

কর্ণ শীল

এক

“এই একটিমাত্র ব্যাপার যেটি প্রকৃত অর্থেই বিশ্বজনীন। সে তুমি বলতেই পারো হাওয়া, পাখি এরাও সীমান্ত মানে না, সে অর্থে বিশ্বজনীন। তা বাপু ফেরেলের সূত্রটি খুলে দেখো, পবনদেবের মতিগতিও দেশ-সীমা-অক্ষাংশ মেনে বেমালুম বদলে যায়। আর পাখি, ফুল? হে হে, তাই যদি হত আমাদের ঘনাদার ঙগারুসেরচঙ্ ব্রাহ্মিণী হাঁস আমাদের তালপুকুরে চরতে আসত, আর কমলনগর মাঠের বাদায় গুচ্ছের টিউলিপ আর ড্যাফোডিল ফুটে থাকত। ওসব কথার কথা বাপু। এক খিদে আর নেশা বাদে কোনও কিছুই বিশ্বজনীন নয়।”

দীঘা থেকে ফেরার পথে একটি ধাবা পড়ে ডানকুনির কাছাকাছি। আমাদের কাছে সেটি অবশ্য চায়ের দোকান-কাম-রেস্তোরাঁ। ধুতি-পাঞ্জাবি পরা লোকটির হাতে চা পরিপূর্ণ বিশাল স্টিলের মগটি দেখে যারপরনাই আশ্চর্য যেমন হয়েছি, কৌতূহলও বেড়ে গেছে একই সঙ্গে। দলে আমরা ছিলাম চারজন। চোখের ইশারায় বাকিদের ডেকে তাঁকে ঘিরে বসলাম। এক কথা-দু’কথায় নেশার কথা উঠল। দেখলাম, নেশার ব্যাপারে তাঁর সমকক্ষ জ্ঞান খুব কম লোকেরই আছে। তিনিই বলছিলেন, “তা বুঝলে কি না, নেশার মধ্যে সবচেয়ে বড়ো নেশা হল ক্ষমতার নেশা। ওটি যার ঘাড়ে একবার চেপেছে, না মরা অবধি নিস্তার নেই।”

আমাদের মধ্যে নবীন ছাত্র-রাজনীতি করত কলেজে পড়ার সময়। সে বলল, “ক্ষমতার নেশা তো যুগে-যুগেই ধ্বংসাত্মক। ট্রয়ের যুদ্ধ, বিশ্বযুদ্ধ এমনকি আমাদের মহাভারতেও শক্তির নেশাতেই এত বড়ো ধ্বংসলীলা সম্ভব হল।”

“কিন্তু বুদ্ধদেবের সংযম না থাকলে যে মহাভারতের যুদ্ধটাই হত না হে!” বলেই আমাদের অর্ডার করা চিকেন তন্দুরি থেকে একটি পুরুষ্টু মশলাদার টুকরো যেন অন্যমনস্কভাবেই তুলে নিলেন। মুখে দেওয়ার ঠিক আগেই যেন তাঁর সম্বিৎ ফিরল। “এ-হে-হে, দেখেছ! মাথাটাই গেছে আমার। ছি ছি!”

তাঁর লজ্জাকে আদুরে মেমসাহেবের গাউন দিয়ে পোষা কুকুরকে ঢেকে দেওয়ার মতো করে পুরো প্লেটটাই তাঁর লজ্জাবনত হাতের সামনে বাড়িয়ে দিয়ে বললাম, “বলেন কী?”

সাইফুদ্দিন কাঁইমাই করে উঠেছে। ইতিহাসের মাস্টার, তায় বেশ বইপত্তর ঘাঁটাঘাঁটি করছে ইদানীং ভারতবর্ষের প্রাচীন দেবদেবী নিয়ে। “বলেন কী মশাই? মহাভারত যুদ্ধ তো কৃষ্ণপুরাণ অনুযায়ী বলছে খ্রিস্টপূর্ব চৌদ্দশো কি তেরোশো নাগাদ। সে তুলনায় বুদ্ধ তো এদিনের খোকা। ইশাপূর্ব চারশো শতাব্দীর দিকে জন্ম।”

পুদিনার চাটনি আর রায়তায় গোবদা নরম তুলতুলে টেংরিটা খুব যত্ন সহকারে মাখিয়ে নিতে নিতে তিনি বললেন, “কোন বুদ্ধের কোথা বলছ?”

সাইফুদ্দিন চমকে গিয়েছিল। আমরাও। সাইফুদ্দিনের জোরালো গলা, “যতদূর জানি বুদ্ধদেব, শাক্যসিংহ, সিদ্ধার্থ তো একজনই।”

টেংরিটায় একটা বড়সড় কামড় বসিয়ে তিনি কিছুক্ষণ নিমীলিত চোখে চিবোলেন। তারপর বললেন, “হ্যাঁ, সিদ্ধার্থ বুদ্ধ একজনই বটে। তবে বুদ্ধ যে মাত্র একজনই তা তোমাকে কোন পণ্ডিত হট লাইনে জানিয়েছেন শুনি? মহাযানী মতানুসারে সমগ্র বুদ্ধমণ্ডল দুটি কল্পে বিভক্ত। ব্যূহকল্প ও ভদ্রকল্প। আর প্রতি কল্পে এক হাজার সংখ্যক বুদ্ধের বিচরণকাল। ব্যূহকল্প ও ভদ্রকল্পের মধ্যে যোগসাধন করেন সাতজন আদি মহাবুদ্ধ। যেমন ব্যূহকল্পের নয়শত আটানব্বইতম বুদ্ধ ছিলেন বিপাশি, নয়শত নিরানব্বইতম শিখী। ব্যূহকল্পের সহস্রতম বা শেষ বুদ্ধ বেসাভু। এবার শুরু হয় ভদ্রকল্প। তার প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ বুদ্ধরা যথাক্রমে হলেন ককুসন্ধ, কোনাগমন, কাশ্যপ এবং সিদ্ধার্থ গৌতম। এই শেষোক্ত জনই হলেন তোমাদের শাক্যসিংহ, করুণাসিন্ধু ইত্যাদি।”

সাইফুদ্দিন চুপ করে গেছে। অনেকক্ষণ পরে প্রথম মুখ খুললাম আমি, “তা যদিও বা হয়, এর সঙ্গে মহাভারতের সম্পর্ক কী?”

প্লেটটা চেঁছেপুঁছে শেষ করে ইংরেজি ‘এস’ লেখা সিগারেটের একটি ধাতব বাক্স পকেট থেকে বার করেই আবার চমকে গেলেন। “এ-হে-হে, শিশিরের বাক্সটা আমার পকেটে কখন যেন বেখেয়ালে চলে এসেছে।”

তাঁর অন্যমনস্কতার স্বরূপ ততক্ষণে আমরা বুঝতে পেরে গেছি। চুপ করে রইলাম। একটি সিগারেট ধরিয়ে তিনি বললেন, “অ্যা-পারো…”

আমরা সম্মিলিতভাবে তাকিয়েছি ধাবার হেঁশেলের দিকে, পারোনাম্নী কোনও অর্ডায় বয় বা গার্লের উদ্দেশ্যে। ক্ষীণ আশা, পুরো বিলটা হয়তো তিনিই দেবেন।

বেশ কিছুক্ষণ কিছুই ঘটল না। তিনি আমাদের দৃষ্টি লক্ষ করে বললেন, “ওদিকে কী দেখছ? নাম শুনেছ অ্যাপারোর?”

আমাদের হাঁ হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে তাঁর ঠোঁটের হাসিটা চওড়া হয়ে বাঁ চোখের নিচে অবস্থিত আঁচিল পর্যন্ত একটা আন্দোলন তুলল। টনি স্টার্ক যেমন করে একটি স্ট্যান্ডার্ড ফাইভের ছাত্রকে রোবোটিক্স শেখায়, তেমন সুরে বললেন, “আহা! তোমাদেরই বা দোষ কোথায়? সি.আই.এ বা কে.জি.বি যাদের আস্তানার খোঁজে সাতটি মহাদেশে কম করে আট হাজার চর মোতায়েন করেও টিকিটিও খুঁজে পায়নি, তাদের খোঁজ জানা কি আর তোমাদের কম্ম হে? অল প্যারানর্মাল অ্যান্ড আর্কিওলজিকাল রিসার্চ অ্যানালিটিক উইং, সংক্ষেপে অ্যাপারো। A P A R A W। দুনিয়ার যত সরকার থেকে খেদানো প্রত্নতাত্ত্বিক, ইঞ্জিনিয়ার, সৈন্য থেকে শুরু করে জেল পালানো আসামীদের পর্যন্ত স্রেফ পয়সা দিয়ে কিনে নিয়ে এক পাগলা রাশিয়ান ভূ-তাত্ত্বিক আলহাইকসান্দের অ্যাপারো তৈরি করে ওই ধরো ১৯৭০-৭৫ নাগাদ। এসব সংস্থার তো আর ঘটা করে নারকেল ফাটিয়ে কি বেলুন উড়িয়ে উদ্বোধন হবে না! চুপেচাপে কাজ শুরু হল, আর তার প্রমাণ পাওয়া গেল খোদ আলহাইকসান্দের রাশিয়াতেই।”

আমরা উৎসুক, “কীরকম?”

“দুই চাষি, বুঝলে, তাদের রাস্পবেরি ঝোপে পাতা ফাঁদে এক শেয়াল পেয়েছে। শেয়াল লেজ ধরো পড়েছে ভ্লাদিমিরের সীমানায়, আর মুড়ো নিকোলাইয়ের জমিতে। তুমুল ঝগড়া হাতাহাতি হওয়ার উপক্রম। এরই মধ্যে, নিকোলাই তার ওয়ালনাট গাছের নিচে কিসের যেন একটা বাঁট দেখতে পেয়েছে। বেশ নকশা তোলা বাঁট, বাকিটা মাটিতে পোঁতা। রাগের মাথায় সেটি ধরে টানতেই, ঝকঝকে এক তলোয়ার বেরিয়ে এসেছে। তার ফলা এতটাই ঝকঝকে আর উজ্জ্বল যে দুই স্যাঙাতেরই চোখ গেছে ঝলসে। অ্যাইসা থতমত খেয়েছে আনাড়িটা, আপনি চলা জাদু তলোয়ারের ঘায়ে দুই চাষারই বাঁহাত গেছে উড়ে। তারা যন্ত্রণায় কাতর হবে কী, চোখ ছানাবড়া। দু’জনের হাত কেটে সে তলোয়ার তাদের চোখের সামনে সেঁধিয়ে গেছে ওয়ালনাট গাছের নিচে। এবার আর হাতলটিও চোখে পড়ে না। ততক্ষণে অ্যাপারোর রেডারে ধরা পড়ে গেছে এক বিরাট ম্যাগনেটিক ফ্রিকোয়েন্সি। আলহাইকসান্দ সচরাচর লোকসমক্ষে আসে না। তার অধস্তন কর্মচারীরা সরেজমিন তদন্ত করে রিপোর্ট দাখিল করল। রিপোর্ট দেখে আলহাইকসান্দ মুচকি হাসল। একটি শব্দই শুধু তার মুখ থেকে বেরোল, ‘ম্মেখ্-খ্লেডনতস্।”

নবীন ফস করে বলে বসল, “ব্যস, অমনি একটা বাজখাঁই গুল ঝেড়ে রাখলেন। এবার নিশ্চয়ই কিছু নৈবেদ্য পেশ করতে হবে ওই আজগুবি ব্যাপারখানা জানতে হলে? কিছু মনে করবেন না, আমি কার সঙ্গে যেন আপনার খুব মিল পাচ্ছি, কিন্তু মনে করতে পারছি না কার।”

ভদ্রলোক কালো ফ্রেমে চশমাটা খুলে ধুতির খুঁট দিয়ে মুছতে মুছতে নবীনকে বললেন, “কার সঙ্গে মিল খুঁজে পাচ্ছ জানি না, তবে আমার খাঁই তোমার সেই আনুমানিক মানুষের মতো নাও তো হতে পারে, কী বলো? এক কাপ নামমাত্র চিনি দেওয়া কড়া লিকারের দুধ চা বললেই হবে। এবার ভেবে দ্যাখো, এই লোকসান যে পুষিয়ে যাবে, সে গ্যারান্টি দিতে পারছি না কিন্তু।”

নবীন টেবিলে ঘুসি মেরে উঠে দাঁড়াল, “চায়ের ভয় বাঙালিকে দেখাবেন না মশাই। ইলেকট্রিক বিলে কারচুপি করে আমরা চায়ের দোকানে উজির নাজির। বলুন এবার, কত চা লাগে আমি দেব পয়সা।”

ভদ্রলোক চশমাটি পরে নিলেন। দৃষ্টি দিয়ে নবীনকে অভিষিক্ত করলেন যেন। তারপর বললেন, “এ ব্যাপারটা অল্পের মধ্যে সেরে দিয়ে আসল ব্যাপারের দিকে যাব। ম্মেখ্-খ্লেডনতস্ হলো মন্ত্রপূত এক তলোয়ার। রাশিয়ান রূপকথাতে ওর খোঁজ বিস্তর মিলবে। তবে এ তলোয়ারটির সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হল প্রকৃত বগাতীরের হাতে না পড়লে এ তলোয়ার প্রয়োগকর্তা এবং আক্রান্ত, উভয়েরই ক্ষতি করে। বগাতীর হল রুশি নাইট বিশেষ, তাদেরও কীসব প্রতিজ্ঞা-টতিজ্ঞা করতে হয়।

“আলহাইকসান্দ তার তৈগার ভূগর্ভস্থ ফেসিলিটিতে বসে একের পর এক স্যাটেলাইট পজিশনিং দেখে চলেছে। রাশিয়ার ব্যাপারটি তার মনে দাগ কাটলেও আন্দোলন তুলতে পারেনি। এমন সময় সামনের স্ক্রিনে একটা নির্দিষ্ট বিন্দুতে প্রবল চৌম্বকীয় তরঙ্গ ধরা পড়ল। রাশিয়ার ঘটনাটিতে যে তরঙ্গটি ধরা পড়েছিল, তার প্রায় কয়েকশো গুণ বেশি। জায়গাটি নেপালের উত্তরে। অক্ষাংশ ৩০.৬৬৮২° উত্তর, দ্রাঘিমা ৮১.২২৯৯° পূর্ব।

“আলহাইকসান্দ তার সঙ্গী থেকে শুরু করে কর্মচারীদের কাউকে বিশ্বাস করত না। ব্যাপারটা সে পুরো চেপে গেল বাকি উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের কাছে। প্ল্যান আঁটল, একেবারে নীচুতলার কর্মচারীদের নিয়ে সে জায়গাটায় হানা দেবে। তারা পয়সার কাজি, প্রশ্ন একেবারেই করে না, বোঝেও কম। সুতরাং তাদের কাছে মূল ব্যাপারটা নিয়ে জবাবদিহি করার কোনও ব্যাপারই নেই।

“দুটি স্নাইপার, পাঁচজন বলিষ্ঠ কুলি, আর দু’জন শখের জিওলজিস্টকে দিয়ে আলহাইকসান্দের দশ জনের টিম তৈরি। রুশি স্বরাষ্ট্র দপ্তরকে সামরিক অস্ত্রবিজ্ঞানের গল্পকথা ভজিয়ে এক্সকাভেশনের খরচাপাতিও কিছুটা তুলে নেওয়া গেছে। এবার শুধু একজন ওই অঞ্চলের ভালো গাইড পেলেই হয়। নেপাল-ভারত-তিব্বত-ভূটান, চারটে দেশের ট্র্যাভেল পেজে প্রয়োজনীয় গাইডের হালহকিকতের বর্ণনা দিয়ে বিজ্ঞাপন দিয়ে দিল আলহাইকসান্দ, তাও তার ফেসিলিটির এক সিকিওরিটি অফিসারের মেয়ের ফেসবুক প্রোফাইল থেকে। গোপনীয়তাই সাফল্য, এ দর্শন আলহাইকসান্দের শুধু ব্যবসায়িক প্রদর্শন নয়, জীবনের মূলমন্ত্রও বটে।

দুই

“১ মে, ২০০৬। তমস্ক বোগাশেভো-কলকাতা ফ্লাইটে চেপে বসল আলহাইকসান্দ অ্যান্ড কোং। কলকাতার দমদম এয়ারপোর্ট পৌঁছতে ৫ মে। মাঝে চারটি শহরে নামতে হবে। মস্কো, বেজিং, সিঙ্গাপুর, কাঠমাণ্ডু। কাঠমাণ্ডু এয়ারপোর্টেই চেক আউট করা যেত। কিন্তু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যাবতীয় মাফিয়া, উগ্রপন্থীর সেফ করিডর হয়ে আছে শহরটা। তার চেয়ে কলকাতা অনেক বেশি শান্ত, সুরক্ষিত। সময় কিছু বেশি লাগবে, রাস্তাও অনেক বেশি, তবুও সাবধানের মার নেই। তাই কাঠমাণ্ডু পিছনে ফেলে তারা কলকাতার দিকে উড়ে চলল, যদিও ঘুরে এই কাঠমাণ্ডুতেই আসতে হবে স্থলপথে।

“জুন মাসটা কলকাতার আকাশে মেঘ জমে। বিরাট বিরাট বাড়িগুলোর ওপর মেঘ ঝুঁকে পড়ে ঘোমটার মতো। বাড়িগুলো ঝাপসা দেখায়। তবে আলহাইকসান্দ জানে, হিমালয়ের প্রাচীর একবার পার করে যেতে পারলে আর মৌসুমী বায়ু তার নাগাল পাবে না।

“পার্ক স্ট্রিটের এক অনামী রাত্রিবাসে মাথা গোঁজার ঠাঁই হল। বিলাসিতা কোনোমতেই চলবে না। নিজের চেহারাটা লুকিয়ে ফেলতে পারলে খুশি হত আলহাইকসান্দ, কিন্তু তা যেহেতু সম্ভব নয়, যতদূর সম্ভব আড়ম্বরহীন থাকা যায়।

“সন্ধ্যা নাগাদ পিয়েত্রো, আলহাইকসান্দের এক কুলি পার্ক স্ট্রিট মোড়ে সিগারেট কিনতে গিয়েছিল। ফেরার সময় বর্ষাতির হুডিতে ঢাকা সতর্ক কানে সে শুনতে পেল কেউ একজন পিছনে আসছে। চট করে ঘুরে না দাঁড়িয়ে, একটা বাড়ির খিড়কির দরজার নিচে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরাল পিয়েত্রো। মাথার ওপর দরজার অতিরিক্ত ছাদের অন্ধকার, খুব সতর্কভাবে আড়চোখে রাস্তার দিকে তাকাতেই তার নজরে পড়ল ভেপার ল্যাম্পের আবছা আলোয় একটা লম্বা সিড়িঙ্গে লোক যেন হঠাৎ ধরা পড়ে যাওয়ায় ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। অল্প আলোয় লোকটার চেহারা যা বোঝা যায়, পিয়েত্রো কেন, পার্ক স্ট্রিট মোড়ের একটা রিকশাওয়ালাও তাকে এক হাতে তুলে আছাড় মারতে পারে। ছ’ফুটি দেহটাকে যতটা সম্ভব সোজা রেখে পিয়েত্রো লোকটার দিকে এগিয়ে গেল। টিয়াপাখির ঠোঁটের মতো নাক, হাস্যকর রঙচঙে জামার কলারের উপর দিয়ে কন্ঠার হাড়টা ঠেলে বেরিয়ে এসেছে, চোখদুটো কোটরগত। পিয়েত্রো কোমরে হাত দিয়ে বলল, ‘হু দ্য হেল আর য়্যু?’

“লোকটা হাতজোড় করে বলল, ‘ইয়েস সার, আই হেল, নো হেভেন। রাইস ইটিং বেঙ্গলি, গাইড সার, গাইড।’

“পিয়েত্রো রেগে কাঁই। লোকটার কাঁধে দশমনি হাতদুটো রেখে বলল, ‘তাহলে চোরের মতো পিছু নিয়েছিলি কেন? জানিস, পিয়েত্রো আমার নাম, পিয়েত্রো মানে জানিস?’

“সিয়েট্টেতে রচ্চা, সিনোরে।’

“কী বললি রে হতচ্ছাড়া?’ পিয়েত্রোর চোখ কপালে উঠে গিয়েছে।

“লোকটা কাঁচুমাচু হয়ে বলল, ‘আজ্ঞে হুজুর, সীতারামের র-চ্চা খেয়ে এই সিনার হাড় এই ওড়ে বলে এখনই অম্বলে বুক জ্বলে যাচ্ছে। সেটিই নিবেদন করলুম। তার ওপর হুজুর যদি ওই হাত আমার গায়ের ওপর চাপিয়ে দেন, আমি কি আর আস্ত থাকব?’

“পিয়েত্রো হাত নামিয়ে নিল। একটু সাবধান হল। যতই হোক এ কলকাতা, এদেরই বাসস্থান। যদি দলে ভারী হয়, ঝামেলা। এরা তো ছাড়বেই না, উপরন্তু আলহাইকসান্দ এসব উটকো ঝামেলা একদম রেয়াত করবে না। গলাটায় যতটা সম্ভব নরম পালিশ মেরে সে বলল, ‘তুমি গাইডের বিজ্ঞাপন দেখে এসেছ?’

“অনেকটা তাই। আমার ভাইপোর ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটা ট্র্যাভেল পেজের খবর এসেছিল। ফ্লাইট নম্বর, আর ফোন নম্বরও তো দেওয়া ছিল আপনাদের। ওদিকে সব ফোন অফ। সেই দমদম থেকেই সঙ্গে আছি। এমন সব চেহারা আপনাদের, দৈত্যদানবের দল, সামনে আসার সাহস হয়নি। এই আপনাকে একা দেখে তাও একটু সাহস পেয়েছিলাম। তাও দেখি, আপনি একাই একশো।

“লোকটার মিষ্টি কথায় পিয়েত্রো বিশেষ খুশি হল বলে মনে হল না। যদিও লোকটার যুক্তিতে বিশেষ ফাঁক নেই। আলহাইকসান্দের নির্দেশ ছিল আগামীকাল থেকে ফোন অন করার। এ লোকটা আজই হাজির। সন্দেহ ঝেড়ে ফেলল পিয়েত্রো। বলল, ‘এসো। সিটি ভিউ লজ চেনো তো, ওখানেই আছেন আমাদের চিফ। তাঁর সঙ্গে কথা বলে দেখো।’

“লোকটা ভারি ধন্য হওয়ার ভান করে পিয়েত্রোর পিছনে পিছনে চলতে লাগল। পিয়েত্রো কেন যেন মনে হচ্ছিল, লোকটা নিখুঁত ইটালিয়ানে তার নামের অর্থ বলেছে একটু আগে। ইটালিয়ানে সিয়েট্টেতে কথার অর্থ ‘আপনি’ আর রচ্চা হল ‘পাথর’। পিয়েত্রো নামের অর্থ ‘পাথর’।

“আলহাইকসান্দ অনেক সময় নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল লোকটাকে। ম্যাপ দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘এ জায়গা ভালো চেনো তো?’

“সে একটু হেসে বলল, ‘অক্সিজেন সিলিন্ডার হয়তো লাগবে না হুজুর, তবে দুটি চাঁদ একই সঙ্গে পাশাপাশি দেখলে আপনার সঙ্গীদের দমবন্ধ হয়ে আসতে পারে।’

“আলহাইকসান্দ হাসল, ‘বেশ বেশ। কাল দুপুর সাড়ে বারোটার মধ্যে শেয়ালদা স্টেশন। মনে থাকবে তো? কী নাম যেন বললে তোমার?’

“আজ্ঞে দাঁ সার, নফরকৃষ্ণ দাঁ।’

তিন

“ছড়িয়ে ছিটিয়ে ট্রেনে চড়েছে দলটা। সবাই এক বগিতে নয়। লাল পর্দা টানা এসি থ্রি টিয়ার কামরার পুরোটাই বুক করা হয়েছে আলহাইকসান্দ আর তার দলের অন্য সদস্যদের নামে। কিন্তু ওই নামেই। আদতে ভিতরে আছে আলহাইকসান্দ নিজে আর শুনতে আশ্চর্য লাগলেও সেই শুঁটকো গাইড নফর।

“ট্রেন ছাড়ার বেশ কিছুক্ষণ পর আলহাইকসান্দ তাকে বলল, ‘তুমি ঝাড়া হাত-পা হয়ে বসো, আমি ফ্রেশ হয়ে আসি, কথা আছে।’

“মেঝের ওপরে গড়ুরাসনে বসে পড়তে যায় নফর। আলহাইকসান্দ হাঁ হাঁ করে ওঠে, ‘করো কী? পুরো কামরাটাই দু’জনের। সিটের ওপর জম্পেশ করে বসো।’

“কৃতজ্ঞতায় গলদশ্রু হয়ে সে হাতজোড় করে নরম গদির ওপর এমন করে বসে যেন তার গা থেকে তাতে নোংরা লেগে যাবে। হাতমুখ ধুয়ে আলহাইকসান্দ ফিরে এসে দেখে লোকটা একটা স্টিলের টিফিন ক্যারিয়ার খুলে এক বাটি পায়েস আর শুকনো মুড়ি চিবুচ্ছে। সে খিঁচিয়ে ওঠে, ‘তুমি কি এতদিন গাইড হয়ে উলুবেড়ে-বর্ধমান যেতে নাকি হে? তোমার জন্য হাজার মকশো করে খাবার কিনিয়ে আনলুম, আর তুমি কিনা পায়েস-মুড়ি চিবোচ্ছ?’

“নফর এক চামচ পায়েস মুখে দিয়ে বলল, ‘যাঁর জায়গায় যাচ্ছি, তাঁর প্রিয় খাবার দিয়েই যাত্রা শুরু করলে ভালো হয়, নাকি?’

“আলহাইকসান্দের মুখ দেখে মনে হল সে ভূত দেখেছে। এক লাফে নফরের মুখের কাছে চলে এল। চোখদুটো জ্বলে উঠল তার। হিসহিস করে বলে উঠল, ‘এই কালো বাঁদরের বাচ্চা, তুই কী কী জানিস বল তো। পিয়েত্রো তোর কথা তবে ঠিকই শুনেছে। তুই কাদের স্পাই? র, না কেজিবি?’

“নফর আশ্চর্যজনকভাবে শান্ত। ‘কালো বাঁদরের বাচ্চা নামটা আমার পক্ষে বড়ো বেশি সম্মানের হয়ে গেল ব্র্যাদ। এতদিন চামচিকে কি নেংটি ইঁদুরের বেশি উঠতে পারিনি। অবশ্য তোমার রংটাও আমার চেয়ে খুব বেশি সাদা নয়, তৈগার আন্ডারগ্রাউন্ড ফেসিলিটিতে থাকলে আমার চামড়াতেও অমন ফর্সা গোছের একটা ভাব চলে আসত। আর নিজের নাম ভাঁড়ানোর আগে বিভিন্ন ভাষার সঠিক উচ্চারণটাও ভালোভাবে জানা উচিত। যাই হোক, চুপ করে বসো, আমি অ্যাপারো’র শত্রু নই। তবে অ্যাপারো যে অজাতশত্রু তা বলা যায় না।’

“আলহাইকসান্দ ধপ করে বসে পড়ল সিটের ওপর। তার মুখ দেখে মনে হল, তার সামনে একটি জলজ্যান্ত প্রাগৈতিহাসিক দানো গোছের কিছু একটা বসে আছে।

“পায়েস-মুড়ি শেষ করে নফর ঢকঢক করে কিছুটা জল গলায় ঢেলে নিল। তারপর হাতদুটো ঘষে নিয়ে ধাঁ করে একটা প্রশ্ন করে বসল, ‘এপিসেন্টার তো নিশ্চয়ই বোঝো। বোঝারই কথা। অ্যাপারোর চিফ তো মুখ দেখে করা হয়নি তোমাকে।’

একটু ধাতস্থ হয়েছে আলহাইকসান্দ। মুখ খুলল, কিন্তু খুব নীচু স্বরে, ‘হ্যাঁ, জানি। তাতে কী?’

“তাতে ব্যাপারটি হচ্ছে এই, পৃথিবী শুধু ভূ-তত্ত্ব দিয়ে চলে না। এতে ঐতিহাসিক প্রমাণ, সাহিত্যিক উপাদানও বেশ জরুরি ব্যাপার। যেহেতু তোমার রাডারে অক্ষাংশ ৩০.৬৬৮২° উত্তর, দ্রাঘিমা ৮১.২২৯৯° পূর্বতে একটি উচ্চ চৌম্বকীয় তরঙ্গ দেখা দিয়েছে, তুমি উটের মতো মুখ উঁচিয়ে সেদিকেই রওনা দিলে। আসল ব্যাপারটি আলাস্কার মতো। মনে পড়ছে আলাস্কার ভূমিকম্প? ৭.৯ মাত্রার ভূমিকম্পটির উপকেন্দ্র যেখানে ছিল, তার পূর্বপ্রান্তে প্রায় ৩৩০ কিলোমিটার দূরে সবচেয়ে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল।’

“ট্রেনের প্রচণ্ড দুলুনির মধ্যেও আলহাইকসান্দ সিধে হয়ে বসে ছিল জ্যান্ত মড়ার মতো। ট্রেনের ধাধ্বিনাক-নাধ্বিনাক, আর কয়েকটি হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকুনি ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই। আলহাইকসান্দ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘এখন কী হবে নফর? আমার যে লাখ লাখ টা… রুবল জলে যাবে!’

“নফর মুচকি হেসে বলল, ‘জলে তো যেতেই হবে। তবে রাক্ষসতাল হ্রদের জলে নয়।’

“ক্যুপের লাল পর্দার ফাঁক দিয়ে উলটোদিকের জানালা দেখা যায়। সাঁ সাঁ করে ছুটছে বাবলাগাছ, হলুদ প্রাচীর, একটা সাদা মন্দির।

“আরও একটু দক্ষিণে নেমে ২৬.৮৫০৫° উত্তর, ৭৫.৭৬২৮° পূর্বতে আসতে হবে। ওই চৌম্বকীয় মহা তরঙ্গের আসল উপকেন্দ্র সেইখানেই।’

“আলকহাইকসান্দ পুরোটাই সামলে উঠেছে এতক্ষণে। কড়া গলায় বলল, ‘তুমি এত নিশ্চিত হচ্ছ কী করে যে রাক্ষসতাল হ্রদে আমরা কিছুই পাব না?’

“রাক্ষসতাল হ্রদ কার তৈরি এবং তিনি কেন তা খনন করেছিলেন?’

“রাক্ষসরাজ রাবণের তৈরি। তার তীরে বসে তপস্যা করে দিব্য শক্তি লাভের জন্য তিনি ওটি তৈরি করিয়েছিলেন।’

“নফর হো হো করে হেসে উঠল। আলহাইকসান্দ বিরক্ত হয়ে বলল, ‘এতে অত দন্তবিকশিত করার কী হল?’

“নফর হাসি থামিয়ে বলল, ‘হাসছি অন্য কারণে। তবে তুমি ধরে নিতে পারো তোমার নির্বুদ্ধিতায় হাসছি। দাঁড়াও দাঁড়াও, রেগে যেও না। বলি। রাক্ষসরাজ রাবণের তপস্যা পরবর্তী যুদ্ধ, বিজয়, পরাজয় যেটুকু আমরা জানি, তাতে কী মনে হয়, তিনি কোনও শক্তিশালী শক্তি সেখানে অবশিষ্ট রেখে গেছেন? আশ্চর্য হয়ে লাভ নেই আলহাইকসান্দ, অ্যাপারোর কাজের হালহকিকত আমার সবিশেষ জানা আছে। এই বিভিন্ন দিব্য অস্ত্র, অন্তত মহাকাব্যগুলিতে তাই বলা আছে, এ শক্তিগুলি কাজে লাগিয়ে তুমি যে আখেরে মানুষের ভালোই করতে চাও, আমি জানি। নইলে সঙ্গে যেতাম না তোমার। অন্তরালে থেকে তোমার কাজটি কেঁচিয়ে দিতাম। এই নফরকে তুমি বন্ধুও ভাবতে পারো, নফরও ভাবতে পারো। কাজে আমি তোমার বেশ ভালোই লাগব।’

“আলহাইকসান্দ শেষ প্রতিবাদ করল, ‘তবে মানস সরোবরই বা কী করে নিশ্চিত হচ্ছ তুমি, আই মিন ২৬.৮৫০৫° উত্তর, ৭৫.৭৬২৮° পূর্ব আর কী?’

“নফর হতাশ হয়ে বলল, ‘ওটির পাড়েই যে কাংরিবোক, শি-পো নামক মহা শক্তিশালী চৈনিক বিজ্ঞানীর গবেষণাগার বা ভিনগ্রহের স্পেস শিপ। যাকে মহাকাব্যে আদিদেবতা শিবের বা শি-পোর লীলাভূমি কৈলাস পর্বত বলা হয়েছে। সব জেনেও অন্ধ সেজে থাকছ কেন?’

“আলহাইকসান্দ ফিক করে হেসে বলল, ‘তোমাদের মা দুগ্গাও কি চিনা নাকি হে?’

“নফর আড়মোড়া ভেঙে বলল, ‘না, তিনি ক্রিটান।’

“অ্যাঁ!’

“নফর মুহূর্তের মধ্যে সিটের ওপর শুয়ে নাক ডাকতে শুরু করল।

চার

“নিউ জলপাইগুড়ি গাড়ি থামার পরেও নফরের নাকডাকানি এক ফোঁটাও কমলো না। রাত দুটো বলছে হাতঘড়িতে। আলহাইকসান্দের ঘুম না আসার দুটো কারণ—এক, লাগেজভর্তি দামী জিনিসপত্র। চোর-ডাকাত ঢুকলে আগ্নেয়াস্ত্র বার করার উপায় নেই—সেসব পিয়েত্রোর কাছে রাখা মেটাল ডিটেকশন প্রুফ ভিতর দিকে কার্বাইডের আস্তরণ দেওয়া স্যুটকেসে। দুই, নফর লোকটা বিশেষ সুবিধার নয়। মুখে বলছে বটে অ্যাপারোর মিত্রপক্ষ, কিন্তু যেসব তথ্য আর তাদের বিশ্লেষণ সে মাথায় নিয়ে বসে আছে, বাঁহাতের কড়ে আঙুলের নাড়ায় পৃথিবীর নকশা বদলে দিতে পারে।

“সেল ফোনটা বেজে উঠল। পিয়েত্রোর নম্বর। “চিফ, পঞ্চান্ন মিনিট পর ট্রেন ছাড়বে। এদিক ওদিক একটু দেখে আসব?”

“ফোনটা কেটে ‘রিফিউত্তো’ টাইপ করে বারণ করে দিল পিয়েত্রোকে।

“গাড়ি ছাড়ল ভোর তিনটে পাঁচে। ট্রেনটা কিছুদূর গড়াতেই নফর এক লাফে উঠে পড়ে নিজের লাগেজের কাছে পৌঁছে গেল। সেগুলো কাঁধে তুলে আলহাইকসান্দকে বলল, ‘তোমারগুলোও তুলে নাও, নামতে হবে।’

“বলেই তর্কের বিন্দুমাত্র সময় না দিয়ে দরজার দিকে উধাও হয়ে গেল। অগত্যা আলহাইকসান্দও তাকে অনুসরণ করল অনেকটা বাধ্য হয়েই। একটা খাবারের দোকানের পিছনে তাকে টেনে নিয়ে গেল নফর। বিস্কিটের বয়ামগুলোর আড়াল থেকে পিয়েত্রোরা যে কামরায় আছে সেটির চলে যাওয়া দেখল আলহাইকসান্দ।

“ওভার ব্রিজের দিকে এগোতে এগোতে নফর বলল, ‘পকেটে লাখ লাখ টা… ইয়ে, রুবল থাকলেও গাড়ি কিন্তু দরদাম করবে মাছিচোষা সুদখোরের মতো।’

“আলহাইকসান্দ দেখল তার যাবতীয় প্রশ্ন এখানে করা সম্ভব নয়। চতুর্দিকে প্রচুর লোক তাদের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে; তাকিয়ে আছে সীমা সুরক্ষা বলের জওয়ানরাও।

“ট্রেন ছেড়ে দেওয়ার পর এমন লাফিয়ে কেউ নামে না। তার উপর সে ট্রেন যদি আবার ঘণ্টা খানেক দাঁড়িয়ে থাকে। দাঁত কড়মড় করতে করতে আলহাইকসান্দও ওভার ব্রিজের দিকে এগোল।

“আলহাইকসান্দ দরদাম করবে কী, তার আগেই নফর এক গাড়িওয়ালা ঠিক করে অ্যাইসা ধস্তাধস্তি শুরু করেছে গাড়িভাড়া নিয়ে যে, মাছ বাজারে আসা হিসেবি গৃহিণীও তা দেখে লজ্জা পেতে বাধ্য। বিস্তর টানাহ্যাঁচড়া, ওঠানামার পর রফা হল ওই চারটি হাজার টাকাই গাড়িওয়ালা নেবে। নফর খুব খুশি হয়ে বলল, ‘পথে যা টোল ট্যাক্স পড়বে আলহাইকসান্দই তা দেবে।’

“উত্তরে ড্রাইভার কটমট করে নফরের দিকে তাকাতে আলহাইকসান্দ জিজ্ঞাসা করল, ‘নফর, টোল ট্যাক্সের কথায় হুজুর অত রেগে গেলেন কেন?’

“নফর একগাল হেসে বলল, ‘এই এন.জে.পি থেকে পশুপতি ট্র্যাভেলস ওয়ে দিয়ে নাক বরাবর গেলে কাঠমাণ্ডুর মধ্যে কোনও টোল গেট পড়ে না।’

“আলহাইকসান্দ আকাশ থেকে পড়তে যাবে, এরই মধ্যে গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে।

“লোকটাকে স্রেফ ধোঁকা দিলে?’

“না, ওটা মজা করলুম, একটু যদি আপন-টাপন ভাবে। এসব পথে ড্রাইভারদের একটু খোশমেজাজে রাখতে হয়।’

“সরাসরি সিমিকোট পর্যন্তই তো গাড়ি করতে পারতে বাপু। কাঠমাণ্ডু থেকে আবার মানসের জন্য গাড়ি করতে হবে।’

“জানালার বাইরে হিলকার্ট রোডের দোকানপাট ঘুমোচ্ছে। প্রচণ্ড বেগে এগিয়ে আসছে শিলিগুড়ি শহরের উত্তরপ্রান্ত। নফর খুব শান্ত গলায় বলল, ‘আমরা মানস সরোবর যাচ্ছি না।’

“আলহাইকসান্দ নফরের গলাটা টিপে ধরতে গিয়েও থমকে গেল ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে। রাগটা হজম করার জন্য নিজের হাতের মুঠোটাই এমন জোরে চেপে ধরল, যে গাঁটগুলো ফ্যাকাসে রক্তশূন্য হয়ে গেল। অনেকক্ষণ পর সে প্রশ্ন করল, ‘তবে আমরা কোথায় যাচ্ছি? ট্রেনের কামরায় যে অত ফলাও করে ঘোষণা করলে মানস সরোবরের কথা!’

“নফর ছিক করে একটা বিরক্তির শব্দ করল। ‘চোখ কান খোলা রাখতে হয় সবসময়। পাঁচটা ইন্দ্রিয় তো আর ফুলদানি নয় যে, দেহের ওপর সাজিয়ে রাখলেই হল। তারা বিস্তর কাজকম্মোও জানে। সেগুলিকে ব্যবহার করতে জানতে হয়, নইলে ব্রহ্মজ্ঞানী মারুতিও স্রেফ বাঁদর হয়ে পড়ে থাকেন।’

“আলহাইকসান্দ ভাবছিল ড্রাইভারকে ঘুষ খাইয়ে লোকটাকে গুমখুন করবে কি না। কিন্তু যার উদ্দেশ্যে এত রাগ, তার কোনও ভ্রূক্ষেপই নেই। একমনে বলে চলেছে, ‘দিন হলে বুঝতে পারতাম না। ট্রেনের কামরায় পর্দার ওপারে ছায়াটা যতক্ষণ ঠায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল, সাধারণ প্যাসেঞ্জার বা আর.পি.এফ হলে তা হত না।’

“তার মানে?’

“স্পাই। সোজা কথায় গুপ্তচর। হয় অচেনা কেউ বা ডাবল এজেন্ট। ওই একটা অ্যাপারো খুলে তুমি দুনিয়ার মাথা কিনে নাওনি। অমন অ্যানালিটিকাল উইং বিশ্বে খান পঞ্চাশেক আছে।’

“আলহাইকসান্দ ডুবতে থাকা জাহাজের মাস্তুলটির মতো গলা বাড়িয়ে জানতে চাইল, ‘তবে যাচ্ছিটা কোথায়?’

“মায়াতনুযস্য দিব্যৌকাশঃ খে যস্য প্রভাবতপ্রণতৈঃ শিরোভিং।

অধরায়ণ পদ্মরমতপত্রম্ বোধয়া জুপুঃ পরমৈসিয়াস্ক।।’

“নফরের মুখে সুপরিচিত শ্লোকটি শুনে আলহাইকসান্দ চমকে গেল। ভূত দেখার মতো নফরের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এখানে এটা বলার অর্থ?’

“নফর মৃদু হাসল। ‘যে চৌম্বকীয় মহা তরঙ্গের খোঁজে আপনি চলেছেন হুজুর, এ শ্লোক তারই চাবিকাঠি। কৈলাসের উত্তর যে হ্রদের কথা বলা হয়েছে তা আপনার কাছে রাক্ষসতাল হ্রদ হলেও, ট্রেনের কামরায় আমি মানস হ্রদের কথা বললেও আসলে তা দেবদহ হ্রদ। হ্যাঁ হ্যাঁ, চোখ বড়ো বড়ো করতে হবে না আর। লুম্বিনি উদ্যানের পাশে অবস্থিত দেবদহ।’

“নফর, কিন্তু দেবদহ তো কৈলাসের উত্তরে নয়।’

“উত্তর এখানে দিক নয় আলহাইকসান্দ, উত্তর এখানে উত্তরণের অপর নাম। মানবতা থেকে দেবত্বে উত্তরণের কথা। মহাভারতের সভাপর্বের শুরু মনে পড়ে? তুমি মহাভারত পড়েছ, আমি জানি। ময়দানব কৈলাসের উত্তরে যে বিন্দু সরোবরের নাম করেছেন, তা এই উত্তরণের হ্রদ দেবদহ। বুদ্ধের জন্মস্থান। তবে সিদ্ধার্থ বুদ্ধ নয়। ইনি আরও আরও আগে। মহাভারতের অনেক আগে। ইনি খুব সম্ভবত ব্যূহকল্পের কোনও বুদ্ধ।’

“তাই বা কী করে জানতে পারো তুমি?’ আলহাইকসান্দের গলায় কিঞ্চিৎ সম্ভ্রম।

“মহানাগো ধর্মবিশেষতর্সাদবুদ্ধেস্বতিতেসু ক্রৈধিকারহঃ।

যমব্যাজন ভক্তিবিশিষ্টনেত্রপৈহঃ সমব্যকিরমস্ক।’

“আলহাইকসান্দ আচ্ছন্নের মতো বলল, ‘দুই বিশাল মহানাগ, যাঁরা পূর্ববর্তী বুদ্ধগণের সেবা করে এসেছেন, ভক্তিপ্রসন্ন দৃষ্টিতে নবজাতক শ্রীবুদ্ধের দিকে তাকিয়ে রইলেন, তাঁদের বিরাট বিরাট ডানা মেলে বুদ্ধকে ব্যজন করলেন ও তাঁর সুন্দর দেহে মন্দার ফুল বর্ষণ করলেন।’

“ও মাই গড! টিরোসর্স!’

“টিরো বা টেরো। টিরোসর্স কুলনাম। টেরোড্যাকটিল বলে আমাদের মতো ছোটলোকেরা।’

“আলহাইকসান্দ এবার হো হো করে হেসে উঠল। ‘শুনেছিলাম বটে এখন মারিজুয়ানা সবদেশেই খুব সস্তা। তাই বলে এত! সঙ্গে কি আরও কিছু মিশিয়েছ বাবা নফর? প্রায় তেরো কোটি বছর আগে মানুষ! গুলের একটা সীমা থাকা উচিত।’

“নফর স্বভাবসিদ্ধ হাসিটি হেসে বলল, ‘ওহে আনাড়ি রুশি, বগাতীরের আপনি চলা তলোয়ার, মোজেসের আপনি জ্বলা অনির্বাণ মোমদানি, আর্থারের দৈব তলোয়ার, হেডিসের বাইডেন্ট, পোসাইডনের ট্রাইডেন্ট—এসবই তো জড়ো করার চেষ্টা করছ, ভুলে গেলে চলবে? একটু আধটু গাঁজা না থাকলে অ্যাপারোর সার্থকতাটিই যে আগাগোড়া শূন্য হয়ে যায়। আর তেরো কোটি বছর আগে যে মানুষ ছিলই, তা কে বলেছে? বুদ্ধের তামাম প্রাচীন যেসব মূর্তি পাওয়া যায়, তাতে তার কানগুলি লক্ষ করে দেখো। ও রাম, শিব, শ্যাম, হোমো কোনও পিথেকাস বা সেপিয়েন্সের সঙ্গেই মেলে না।’

“এলিয়েন থিয়োরি?’

“মানব নাই বা কেন? নৃতত্ত্ববিদগোষ্ঠীর মতে আদিম মানুষের মস্তিষ্ক এতটাই অপুষ্ট ছিল যে সকাল বিকেল তাদের ভাষা বদলে যেত, এখন পাখিদের যেমন। সকালে যে ইশারায় তারা জল বোঝাত, বিকেলে সেটিই হয়ে যেত নুন পাথর। সে জায়গায় দাঁড়িয়ে মানুষের পক্ষে কল্পনা করে এলিয়েনের ছবি পাথুরে দেওয়ালে আঁকা সম্ভব নয়। তারা যা দেখেছে তাই এঁকেছে।’

“আর এই সংস্কৃত শ্লোক, সে তো আর লাখ কোটি বছরের পুরনো নয়।’

“এ তো আচ্ছা একগুঁয়ে! এই যে আমরা এক্সকাভেশনে যাচ্ছি, তার গপ্পো যদি একশো কি দেড়শো বছর কেউ লেখে, সে কি ধারাবিবরণী দেবে না দেবদহের তীরে তোমার আমার রেখে আসা কোনও চিহ্ন বা তোমার আমার নাতি তস্য নাতনির কাছে শুনে শুনেই লিখবে, নাকি? ওহে বিজ্ঞানপ্লব জাহাজ, শ্রুতির নাম শুনেছ? শুনে শুনে মনে রাখা হত একসময়। বিশ্বের প্রাচীনতম গ্রন্থটিও যে ওই শুনে-শুনেই কয়েকটি প্রজন্ম চলে এসেছে। ঋগবেদ তার নাম। আচ্ছা, এলিয়েন থিওরি বাদই না হয় দিলাম। হয়তো অন্য কোনও উন্নত প্রযুক্তির জীব পৃথিবীতে ছিল সে সময়।  তাদের বিজ্ঞান, প্রযুক্তির, অস্ত্রবিদ্যা অনেক বেশি উন্নত ছিল এখনকার ছিল। হতে পারে না?’

“কী আশ্চর্য! তারা এখন তবে কোথায়?’

“এবার সত্যিই আমার সন্দেহ হচ্ছে, তুমি অ্যাপারোর চিফ আদৌ কি না? আরে এত উল্কাবৃষ্টি, পাঁচটা বড়ো বড়ো তুষার যুগ গেছে গ্রহটার উপর দিয়ে। ডাইনোসরের মতো হয়তো সেই উন্নত জাতিও বিলুপ্ত হয়ে গেছে। পাঁচ তুষার যুগ গুণিত এক উল্কাবৃষ্টি, উন্নত জীবের নাম মাথা, হাতে রইল রামপিথেকাস, প্রাচীনতম মানুষ। অবশ্য এলিয়েন থিয়োরিটিই বুদ্ধজন্মের ক্ষেত্রে বেশি প্রযোজ্য।’

“আলহাইকসান্দ আর প্রতিবাদ করছে না। উৎসুক গলায় বলল, “কীরকম?’

“নফর খুব মনোযোগ দিয়ে কেটে কেটে বলল, ‘শাক্যবংশীয় সব রাজপুত্রের জন্মই অদ্ভুত। যেমন ঔরভের জন্ম হয়েছিল ঊরুদেশ থেকে, পৃথুর জন্ম হয়েছিল হাত থেকে, ইন্দ্রতুল্য মান্ধাতার জন্ম হয়েছিল কপাল থেকে এবং কক্ষিবৎ জন্ম নিয়েছিলেন পুরোবাহু থেকে। এসব কী আসলে? উন্নতমানের জেনেটিক্স? ক্লোনিং ইঞ্জিনিয়ারিং? মানুষের পক্ষে সম্ভব কি এসব?’

“শেষ একটা কথা জানতে চাই। দেবদহের জলে সত্যিই কি কোনও শক্তি আছে?’

“প্রথম শ্লোকের ওই জায়গাটায় মন দাও—অধরায়ণ পদ্মরমতপত্রম্ বোধয়া জুপুঃ পরমৈসিয়াস্ক। অর্থাৎ, আকাশের দেবতারা তাঁদের শ্রেষ্ঠ আশীর্বচন ঢেলে দিলেন বুদ্ধের জ্ঞানের উপর। রাজপুত্রকে কী আশীর্বচন দিতে পারেন দেবতা বা অন্য লোকের গ্রহজীবেরা? স্বাভাবিকভাবেই শক্তি, অস্ত্র যা বুদ্ধ কোনোকালেই ব্যবহার করেননি।’

“আলহাইকসান্দের নিঃশ্বাস দ্রুত হল। ‘অর্থাৎ সেগুলি রয়ে গেছে সেখানেই?’

“নফর কিছু বলল না। বাইরে তাকাল। দ্রুতবেগে বালান নদী পার হচ্ছে ধপধপে সাদা আর্টিগা গাড়িটি।

“নদীর অন্য পাড়ে দুটি কালো স্করপিও পথ আটকে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। সামনে পাঁচ-ছ’টি লোক পায়চারি করছে, তাদের মধ্যে একজন খুব চেনা।

“গাড়িটা নদী পার করে দাঁড়াতেই পিয়েত্রো হাসতে হাসতে এগিয়ে এল। বিরাট শরীরটা হাসির দমকে দুলে দুলে উঠছে। নফরের দিকে একবার অবজ্ঞার দৃষ্টি ছুড়ে দিয়ে আলহাইকসান্দকে সে বলল, ‘চিফ, রাক্ষসতালের পথ এদিকে, আমাদের বললেন না তো?’

“মুহূর্তের মধ্যে আলহাইকসান্দের গলার সুর বদলে গেল। সেও হেসে উঠে বলল, ‘নেংটিটা সবকথা গলগল করে উগরে দিয়েছে। রাক্ষসতাল নয়, আমাদের যেতে হবে দেবদহ লেকে। এটাকে বাঁধো।’

“আর্টিগার ড্রাইভার ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলল, ‘দেবদহ তো শহর শাব। ওখানে লেক কোথায় পাচ্ছেন?’

“এবার পিয়েত্রো আর আলহাইকসান্দের অবাক হওয়ার পালা। বিস্ময়ের প্রথম ঝটকাটা কাটিয়ে পিয়েত্রো এগিয়ে গেল নফরের দিকে। তার গলার কাছটা খামচে ধরে খুনির মতো ঠাণ্ডা গলায় বলল, ‘আসল খবর এখনই যদি না বলিস, মেরে টুকরো টুকরো করে নদীতে ভাসিয়ে দেব। বুনো কুত্তাও খাবে কম, গুনবে বেশি।’

“পিয়েত্রোর দশমনি হাতদুটোর চাপে নফরের চোখদুটো কপালে উঠে গেল। চিঁ চিঁ করে সে কোনোক্রমে বলল, ‘জজজদ্দিশসুর!’

“পিয়েত্রো হাতের বাঁধন আলগা হল। নফর জোরে জোরে বেশ কয়েকবার নিঃশ্বাস টেনে নিল। আরেকটু হলেই যেন তার প্রাণটা বেরিয়ে যেত। একটু ধাতস্থ হয়ে সে বলল, ‘জগদীশপুর, জগদীশপুর তাল। লুম্বিনির পাশে। তারই প্রাচীন নাম দেবদহ।’

“পিয়েত্রো একগাল হেসে আলহাইকসান্দের দিকে তাকাল।

“পিয়েত্রো ফোনটা খুলে জগদীশপুর তাল সার্চ করছিল। আগের ফোন হিস্ট্রি উইন্ডোগুলো রিমুভ করার সময় নফর দেখে নিয়েছে মেসেজ বক্স উইন্ডো। ‘চিফ’ কন্ট্যাক্ট থেকে মেসেজ, ‘বেলাকোবা, এন-৫, বালান’।

“বেলাকোবা নিউ জলপাইগুড়ির পরের স্টপেজ। ওখানেই পিয়েত্রোরা নেমে পড়েছে আলহাইকসান্দের মেসেজ পেয়ে। ন্যাশনাল হাইওয়ে পাঁচ ধরে ছুটে এসেছে বালান নদীর তীর পর্যন্ত।

“নফরকে দেখিয়ে আলহাইকসান্দ তার দলের একটি লোককে রুশি ভাষায় নির্দেশ দিল, ‘এটাকে লক করো।’

পাঁচ

“আজ বোধহয় পূর্ণিমা। বৈশাখী পূর্ণিমা। কোনও এক সময় যেন বেনগঙ্গা নদীর জল বয়ে এসে এই হ্রদের সৃষ্টি করেছিল। দুধের মতো থৈ থৈ করছে চাঁদের আলো জগদীশপুর তালের জলে।

“আলহাইকসান্দ যেন দেখতে পাচ্ছে আকাশ থেকে একে একে নেমে আসছে দিব্যরথ। অজস্র ডানা ঝাপটে উড়ে বেড়াচ্ছে পক্ষীরাজ ঘোড়ার দল। বাতাসে ভেসে আসছে অদ্ভুত এক গন্ধ। দিগন্তে দেখে যায় শিবালিক পর্বতের রেখা।

“পিয়েত্রোর ডাকে তার বিভোর ভাবটা কেটে গেল। ‘চিফ, নেংটিটা পালিয়েছে।’

“আলহাইকসান্দ উদাস গলায় বলল, ‘তাকে আর দরকার নেই। এখন শুধু গাইগার স্ক্যান করে রেডিও অ্যাক্টিভিটি ধরা পড়লেই হল, জলে লোক নামানো হবে।’

“খুব হালকা একটা গলার শব্দ হাওয়ায় ভর করে এল। শালগাছটার নিচে একটা ছায়ামূর্তি। সেদিক থেকেই ভেসে এসেছে কথাটা, ‘পাখিটাখিগুলোর কথা কিছু ভাবলেন হুজুর?’

“নফরের গলা চিনতে বিন্দুমাত্র দেরি হল না পিয়েত্রোর। কিন্তু তার দিকে তেড়ে যাওয়ার আগেই নফরের দেহটা শূন্যে ভর করে উড়ে এল। সরু ডান পাটা আছড়ে পড়ল পিয়েত্রোর বাঁ কানের ঠিক ওপরের টেম্পোরাল অস্থির ওপর এবং একই সঙ্গে বাঁ পাটা তার কোমরের প্যালভিক গ্রিডলকে চুরচুর করে দিল।

“শূন্য থেকে যেন ভাসতে-ভাসতেই নামল নফর। পিয়েত্রোর হতজ্ঞান দেহটাকে একবার অবজ্ঞার চোখে দেখে নিয়ে নফর বলল, ‘বুদ্ধদেবের সময় এক ঋষি ছিলেন, অসিত। শূন্যে ভেসে বেড়াতে পারতেন তিনি। শাক্য রাজকুমারকে তিনিই পথ দেখান শান্তির। তিনি যখন নেই বর্তমানে, পথ আমাকেই দেখাতে হবে।’

“আলহাইকসান্দের গলায় উত্তাপ নেই। সে দুধসাদা জ্যোৎস্না দেখছিল হ্রদের জলে। খুব হালকা চালে বলল, ‘স্নাইপার দুটি কিন্তু পিয়েত্রোর বিশ্বাসভাজন।’

“নফর তার পাশে এসে দাঁড়াল। ‘অসুবিধে নেই। আর্টিগার ড্রাইভারটি আমার বিশ্বাসভাজন। লুম্বিনি পুলিশ এসেছে অনেক আগেই। তবে তোমাকে তো আমার চাই। এত বুদ্ধিমান বাঙালি যে বড়ো কম পাওয়া যায় বন্ধু।’

“আলহাইকসান্দ হেসে উঠল। খাঁটি বাংলায় বলল, “কীসে বুঝলে? রুবল বলতে গিয়ে টাকা বলে ফেলেছিলাম বলে?’

“নফর তার কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘উচ্চারণে হে বন্ধু। আমাকে আর্টিগার পিছনে তোলার পর, তোমার দলের লোকটিকে যখন তুমি রাশিয়ানে দরজা লক করার নির্দেশ দিলে, কী বললে? зáмок, স্ট্রেস দিলে a-এর ওপর। উচ্চারণ কী হল? ‘জামখ’ বা zamok, অর্থ হল ‘দূর্গ’। সঠিক রুশিয়ান উচ্চারণটি কী হত? স্ট্রেস পড়ত o-এর ওপর। উচ্চারণ হত замóк, ‘জামঅঅখ’। তখন হত ‘দরজা বন্ধ করা’। আর এত সূক্ষ্ম পার্থক্য রেখে খাঁটি উচ্চারণ বাঙালি ছাড়া আর কে করবে প্রফেসর অলোক স্থানদার ওরফে আলহাইকসান্দ? প্রত্নতত্ত্ববিভাগ তোমার কষ্টের, পরিশ্রমের দাম দেয়নি মানি। তাই বলে সারা বিশ্বের ওপর প্রতিশোধ নেওয়া কি ঠিক হবে? আর এই জলাভূমি অন্তত পনেরোটি লুপ্তপ্রায় খেচরের বাসভূমি। কোনোক্রমে যদি তুমি সেসব দিব্যাস্ত্র তুলেও আনো, এরা লুপ্ত হয়ে যাবে না? একজন বিজ্ঞানী হিসেবে তা পারবে তুমি সহ্য করতে?’

“অলোকবাবু নফরের দিকে তাকালেন। মুচকি হেসে হাত তুলে বললেন, ‘আই সারেন্ডার। তবে বন্ধু, তোমার আসল নামটি যে আমিও জানি।’

“নফর হাসল। ‘জানা মন জানাই থাক না হয়। আর সারেন্ডার নয় বন্ধু, বাড়ি ফিরি চলো। দেশের তোমাকে দরকার।’

“লুম্বিনির বনে কোথাও বসে কেউ হয়তো বড়ো মধুর হাসি হাসলেন। মনে মনে বললেন, ‘মানুষ বড়ো ভালো।’

ভদ্রলোক কালো ফ্রেমের চশমাটি পরে উঠে দাঁড়ালেন। নিঃশেষিত মাটির ভাঁড়গুলি একে অপরের গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একটা আড়মোড়া ভেঙে তিনি বললেন, “বিলটা মিটিয়ে দিও হে, আজ চলি।”

নবীন বলল, “তার মানে বুদ্ধ যদি রাজা হিসেবে অস্ত্রগুলি ব্যবহার করে রাখতেন আগে থেকেই, মহাভারতের যুদ্ধ হতই না, কারণ সেই হ্রদে ময়দানব অস্ত্রগুলি পেতেন না।”

দেঁতো হাসি হেসে ভদ্রলোক বললেন, “দেখেছ, বুদ্ধি খুলে গেছে। একেই বলে সৎসঙ্গে স্বর্গবাস।”

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “আপনার নামটা?” ভদ্রলোক তাঁর পকেটের ‘এস’ লেখা সিগারেট কেসটা থেকে একটা সিগারেট বার করলেন। ফস করে একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, “শিশিরের এই কেসটায় লক্ষ লক্ষ সিগারেট ধরে। পি.সি সরকারের ওয়াটার অব ইন্ডিয়ার মতো, বুইলে? নইলে কি আজ এই সুধীর মিত্র সিগ্রেট টানতে টানতে তোমাদের মতো অর্বাচীনের কাছে নফরকৃষ্ণ দাঁর দাস্তান শোনায়? ছোঃ।”

ভদ্রলোক বেরিয়ে গেলেন ধাবা থেকে। তাঁর ঠিকানাটা জানা হয়নি মনে পড়তেই আমি দৌড়ে বেরিয়ে এলাম।শুনশান রাত। খাটিয়ার উপর অঘোরে ঘুমোচ্ছে কয়েকটি মানুষ। মাটি কাঁপিয়ে মাঝে মাঝে ছুটে যাচ্ছে ভারী ট্রাক। দু’দিকে যতদূর চোখ যায়, জনমানুষ দেখা যায় না। সুধীর মিত্র মনে হয় হাওয়াতেই মিলিয়ে গেছেন।

ছবি: জয়ন্ত বিশ্বাস

 জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s