গল্প বুবুন শুভ্রনীল চক্রবর্তী বসন্ত ২০২০

শুভ্রনীল চক্রবর্তী

আজ রবিবার। খাওয়াদাওয়ার পর বুবুন দোতলার জানালার কাছে বসে ওদের বাড়ির সামনের মাঠটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল। দুপুরবেলা এখন, তাই মাঠে কেউ নেই, শুধু দুটো কুকুর মাঠের কোণ ঘেঁষে মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটা বাড়ির কার্নিশের ছায়ায় বসে ঝিমোচ্ছিল। বুবুন জানে, বিকেল পড়লেই আর এ মাঠ ফাঁকা থাকবে না। রনি, ঋতম, সপ্তর্ষি, দেবজিৎ সবাই একে একে মাঠে চলে আসবে। এই ধূ ধূ করা নির্জীব একফালি মাঠ আবার সজীব হয়ে উঠবে; ফুটবলে লাথির আওয়াজে আর কিছু দামাল ছেলের অবিশ্রান্ত গোল গোল বলে চিৎকারে সারা পাড়া মুখরিত হয়ে উঠবে। আর সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বারবার বাড়ির ভিতরে বল পড়ার জন্য পাশের বাড়ির দজ্জাল ঘোষকাকিমার তারস্বরে শাপশাপান্তের আওয়াজে পাড়ায় টিকে থাকা দায় হয়ে উঠবে। শুধু বুবুন সেখানে থাকবে না। টিউশনির হাত থেকে রবিবারেও নিস্তার নেই ওর। চারটে থেকে ছ’টা পর্যন্ত দেবাশিস স্যারের কাছে ইংলিশ, তারপর সাতটা থেকে ন’টা পর্যন্ত অনুব্রত স্যারের কাছে ভূগোল। একদিনও ডুব মারা বা কামাই করার উপায় নেই। তার জননীটি যে কী চিজ, তা সে হাড়ে হাড়ে জানে। বাবাও ভয়ে মায়ের সামনে মুখ খোলার সাহস পান না।

বুবুনের ভালো নাম অনুরূপ ভট্টাচার্য, একটা নামী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ক্লাস এইটের ছাত্র। তার মা অনুরাধাদেবী কলকাতার একটি নামী মেয়েদের স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষিকা, ফিজিক্স পড়ান। ঘরে বাইরে দু-জায়গাতেই তাঁর দাপট সমান। স্কুলের মেয়েরা তাঁর ভয়ে তটস্থ হয়ে থাকে। শোনা গিয়েছিল, কোন একদিন তার ক্লাস নাইনের পিরিয়ড ছিল টিফিনের পর। টিফিন পিরিয়ড শেষ হওয়ার প্রায় পনেরো মিনিট পর দুটি মেয়ে হন্তদন্ত হয়ে তার ক্লাসে এসে ঢোকে। ততক্ষণে ক্লাস শুরু হয়ে শেষ হওয়ার পথে। অনুরাধাদেবী তাদের কিছু বলেননি, ক্লাসে ঢুকতেও বারণ করেননি। কিন্তু ক্লাস শেষ হওয়ার পরই সটান ডেকে পাঠিয়েছিলেন নিজের রুমে। ভিতরে কী হয়েছিল কেউ জানে না, তবে সেদিন বিকেল আড়াইটা থেকে চারটা পর্যন্ত স্কুলের মেইন গেটের সামনে নবম শ্রেণির অদ্রিজা চক্রবর্তী এবং সমাদৃতা বসুকে রাস্তার পথচলতি সমস্ত লোক বিধ্বস্তভাবে ‘চেয়ার’ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় যে প্রত্যক্ষ করেছিল, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

কাজেই অনুরাধাদেবীর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে নতুন করে আর কিছু বলার নেই। তাই খেলার জন্য টিউশন মিস করলে তার কী দশা হতে পারে, তা একমাত্র বুবুনই জানে। ঐজন্য এসকল ভাবনাকে প্রশ্রয় দেওয়া বুবুন বহুদিন আগেই ছেড়ে দিয়েছে। তার মায়ের একটাই লক্ষ্য, তিনি যেভাবে অদ্বিতীয়ভাবে তাঁর নিজের শিক্ষাজীবন অতিবাহিত করেছেন এবং বর্তমানে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন, বুবুনও সেইভাবেই তার পরম্পরা ধরে রাখুক ও তাঁর নাম উজ্জ্বল করুক। বুবুন ফার্স্ট বয় না হলেও ক্লাসে দশের মধ্যে প্রতিবারই থাকে। কিন্তু তার মায়ের মতে, স্কুল ডিভিশনে নাকি ফার্স্ট না হলে তার কোনও মূল্য থাকে না। এ কারণে বুবুনের উচিত সমস্ত প্রকার খেলাধুলো ও বিনোদন জগতের প্রতি যবনিকা টেনে তার পুরো সময় পড়াশোনায় নিবিষ্ট থাকা। এর জন্য প্রয়োজনীয় যা ব্যবস্থা নেওয়ার তাও তিনি নিয়েছেন। এইট পড়তে না পড়তেই প্রতি বিষয়ে দুই বা ততোধিক টিউটর, বিভিন্ন জায়গার স্টাডি মেটেরিয়াল, আরও কত কী! বেচারা বুবুনের অবস্থা কীরকম হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। তবে বুবুনের ভাগ্য ভালো, তার বাবা মোটেই তার মায়ের মতন নন। বাবা নিজেও এককালে খেলাপাগল মানুষ ছিলেন। তিনি চান যেন বুবুন পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলোটাও করুক, যাতে তার সবদিক থেকেই সুস্থভাবে বিকাশ হয়। বাড়িতে বুবুনের বাবাই তার মনের কথাটা খানিকটা হলেও বোঝেন।

কিন্তু তাঁর কথা বুবুনের মা শুনতে চাইলে বা বুঝতে চাইলে তো! এমনিতেই প্রাইভেট কোম্পানির সামান্য মাইনের কর্মচারী বুবুনের বাবার সঙ্গে তার মায়ের স্ট্যাটাস বা চালচলনের আকাশপাতাল ফারাক। বাড়ির সমস্ত সিদ্ধান্ত বুবুনের মা-ই নেন। সেখানে বুবুনের বাবার ভূমিকা যৎসামান্য। ঠারেঠোরে বুবুনের মা তার বাবাকে যেন বুঝিয়ে দিতে চান যে তার মতো নিম্নমধ্যবিত্ত কর্মচারীর সঙ্গে বুবুনের মায়ের মতো উচ্চবংশজাত অভিজাত ডিগ্রিধারী মহিলার বিয়ে হওয়াটা নিছকই একটা করুণার বহিঃপ্রকাশ। উদ্দেশ্য এই, যাতে সংসারের হাল তাঁর নিজের হাতে থাকে এবং এর অন্যথা হলেই সংসারে অশান্তি অনিবার্য।

বুবুনের বাবা সেটা বোঝেন, আর তাই তিনি বুবুনের মাকে বিশেষ ঘাঁটান না। সে সাহস বা সামর্থ্য কোনওটাই তাঁর নেই। প্রাইভেট কোম্পানির চাকরি তাঁর। ছুটিছাটা বিশেষ পান না, তাই বুবুনকেও বেশি সময় দিতে পারেন না। কিন্তু যতটুকু সময় তাঁর হাতে আসে, বুবুনের মায়ের নজর বাঁচিয়ে বুবুনকে যন্ত্র নয় মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য কোনও ত্রুটি তিনি রাখতে চান না। সুযোগ পেলেই লাইব্রেরি থেকে মহান জীবনী সংক্রান্ত বই এনে ছেলের হাতে তুলে দেন অথবা সপ্তাহের যেদিন বুবুনের বিকেলে টিউশন থাকে না সেদিন বুবুনের বাবাই বুবুনকে পাঠিয়ে দেন রনি-সপ্তর্ষিদের সঙ্গে মাঠে ফুটবল খেলার জন্য। অবশ্য সবটাই ঘটে অনুরাধাদেবীর অজ্ঞাতে, চোখের আড়ালে।

কিন্তু আজ সেটা হবার জো নেই। রবিবার বলে মায়ের আজ ছুটি, মা বাড়িতে। অতএব খেলতে যাওয়ার নো কোশ্চেন। হঠাৎ বুবুনের মনে পড়ে গেল অনুব্রত স্যারের দেওয়া হোম-ওয়ার্কের কথা। সপ্তাহ জুড়ে এত টিউশনি আর ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের প্রেশারে বুবুন ভুলেই গেছিল হোম-ওয়ার্কের কথা। জানালার পাশ থেকে সরে এসে ভূগোল খাতা নিয়ে বসল বুবুন।

“বুবুন!” গম্ভীর গলায় মায়ের আওয়াজ শুনতে পেল বুবুন।
ত্রস্ত গলায় বুবুন সাড়া দিল, “হ্যাঁ মা, বলো।”
“সব স্যারের হোম-ওয়ার্ক কমপ্লিট?”
“হ্যাঁ মা, দেবাশিস স্যারেরটা হয়ে গেছে, অনুব্রত স্যারের কয়েকটা প্রশ্ন বাকি ছিল।”
“ক’টা থেকে আজ তোমার অনুব্রত স্যারের কাছে পড়া?”
ভয়ে ভয়ে বুবুন বলল, “সন্ধে সাতটা।”
“এদিকে এসো।”
আতঙ্কিত মুখে ধীরে ধীরে মায়ের দিকে এগিয়ে গেল বুবুন।
“কোনও স্যার হোম-ওয়ার্ক দিলে সেটা পড়তে যাওয়ার অন্তত দু’দিন আগে শেষ করে রাখবে, এই কথাটা আমি তোমাকে কতবার বলেছি?”
বুবুন নিশ্চুপ।
“কী হল, মনে পড়ছে না?”
বুবুনের মুখে উত্তর নেই। অনুরাধাদেবী বললেন, “এদিকে এগিয়ে এসো।”
বুবুন এগিয়ে এল ধীরে ধীরে। হুকুম হল, “হাত পাতো।”
সপাৎ করে হরিদ্বার থেকে আনা মোটা মজবুত বেতটার বাড়ি পড়ল বুবুনের হাতে। যন্ত্রণায় বুবুনের সারা শরীর কেঁপে উঠল।
“এবার মনে পড়েছে?”
বুবুন কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু সেটা শেষ না হতেই আবার আরেক ঘা। এবারে বুবুনের গলা চিরে একটা অস্ফুট আর্তনাদ বেরিয়ে এল। “মনে পড়েছে মা, মনে পড়েছে!”
“তবে সেটা করে রাখা হয়নি কেন?”
“ভুলে গিয়েছিলাম, মা।”
“লুকিয়ে ফুটবল খেলতে যাওয়া বা পড়া বাদ দিয়ে অন্য বই পড়তে তো ভুল হয় না! এত সাহস তোমার আসে কোত্থেকে? কার প্রশ্রয়ে দিন দিন তোমার এত বাড় বাড়ছে?”

বুবুন চুপ করে আছে দেখে অনুরাধাদেবী বলে চললেন, “আধঘন্টার মধ্যে জিওগ্রাফি কমপ্লিট করে আমার রুমে ম্যাথসের খাতা নিয়ে চলে আসবে। তোমার ম্যাথসের উইকনেস আমি বার করছি। একঘণ্টা ম্যাথস করার পর দেবাশিস স্যারের কাছে পড়তে যাবে। হেঁটে যাবে, হেঁটে আসবে। তারপর অনুব্রত স্যারের কাছে পড়ে এসে তুমি মঙ্গলবার দিনের রাকেশ স্যার আর অভিজিৎ স্যারের পড়া কমপ্লিট করে রাখবে। তারপর রাত বারোটা থেকে একটা পর্যন্ত আজ যে ম্যাথসগুলো দেখিয়ে দিলাম ঐগুলো কোশ্চেন ব্যাঙ্ক থেকে সলভ করবে। আমার জানা আছে তোমার মতো বাঁদর ছেলেকে কীভাবে শায়েস্তা করতে হয়। প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির গোল্ড মেডালিস্ট এই অনুরাধা ভট্টাচার্যের ছেলে হয়ে আমার নামটা ডোবাতে তোমায় আমি দেব না। গাধা পিটিয়ে ঘোড়া কীভাবে করতে হয় আমার জানা আছে ভালোই।”

চলে যাচ্ছিলেন অনুরাধাদেবী। ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, “আরেকটা কথা। যতদিন না পর্যন্ত ফাইনাল এক্সাম শেষ হচ্ছে ততদিন পর্যন্ত তোমার দিন শুরু হবে সকাল সাড়ে পাঁচটায় আর শেষ হবে রাত একটায়। আমার মনে হয় চার ঘণ্টা ঘুম এনাফ। মনে থাকবে?”

বুবুন আস্তে করে ঘাড় নাড়ল।

“আর এবার থেকে যেদিনই অবাধ্য হতে দেখব সেদিনই তোমার খাওয়া বন্ধ থাকবে। সেই হিসেবে আজ তোমার খাওয়া বন্ধ। মনে থাকবে? এখন যাও।”

কোনও কথা বলতে পারে না বুবুন। ধীর পায়ে সে ঘরে ঢোকে। হাতের আঙুলগুলো যন্ত্রণায় এখনও কনকন করছে। বুক চিরে একটা দম ফাটা কান্না বেরিয়ে আসতে চাইছে। প্রচণ্ড অবসন্ন লাগছে, ইচ্ছা করছে ঘুমিয়ে পড়তে।

ধীরে ধীরে নিজেকে সামলাল বুবুন। আচ্ছন্নের মতন বসে বসে সে জিওগ্রাফি হোম-ওয়ার্ক করা শুরু করল। তারপর মায়ের থেকে মুক্তি পেয়ে যখন সে দেবাশিস স্যারের কাছে পড়তে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে, তখন একবার জানালার দিকে চোখ পড়ল তার। দেখল, ইতিমধ্যে রনি-সপ্তর্ষি-অভীকরা আসতে শুরু করে দিয়েছে। দেবলদা তার কুশলী পায়ে ফুটবলটা নিয়ে জাগলিং শুরু করেছে। আর পারে না বুবুন। চোখের কোণে এসে যাওয়া জলটা চট করে জামার হাতায় মুছে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে বুবুন।

আজ শেষ পরীক্ষা। কোশ্চেন মোটামুটি সোজাই হয়েছিল। সকলের পরীক্ষাই কমবেশি ভালোই হয়েছে, সবাই খুশি। ক্লাসের অনেকেই ছুটিতে নানান জায়গায় বেড়াতে যাবে, তারই আলোচনা করছিল সবাই জম্পেশ করে। ক্লাসে প্রথম হয় সুমন্ত। ওর বাবা বিশাল বড়োলোক। প্রতিবারই ছুটিতে ওরা কোনও না কোনও জায়গায় যায় এবং বলাই বাহুল্য সেগুলো কোনওটাই স্বল্প দূরত্বের নয়। এবারেও তার ব্যতিক্রম হবে না। গতবার ওরা ভেনিস গেছিল। সেখানে কীভাবে তারা গন্ডোলা চেপে জলমগ্ন গোটা শহর ঘুরে বেরিয়েছিল সেই গল্প করছিল। এবারে ওরা যাচ্ছে প্যারিস। সবাই খুব উৎসুকভাবে সুমন্তের মুখে ভ্রমণকাহিনি শোনার জন্য ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে। ভিড়ে দাঁড়িয়ে ছিল রনিও। হঠাৎ খেয়াল করল রনি, বুবুন নিঃশব্দে ভারী ব্যাগটাকে কোনওরকমে সামলাতে সামলাতে বেরিয়ে যাচ্ছে। ছুটে গিয়ে রনি পথ আটকাল বুবুনের। “কোথায় যাচ্ছিস, বুবুন?”

ম্লান হেসে বুবুন বলল, “আমার আর যাওয়ার জায়গা আছে কোথায় বল তো? স্কুল থেকে বাড়ি, বাড়ি থেকে টিউশন, ব্যস, আর কী।”

“কিন্তু এখন তো পরীক্ষা শেষ হয়ে গেছে। এখন তো আমরা অন্তত কিছুদিনের জন্য হলেও ফ্রি। তোর মা কি এখনও বাড়ি গিয়ে তোকে পড়তে বসাবে নাকি? আয়, একটু রিল্যাক্স কর।”

“না রে। পরীক্ষা শেষ হয়েছে বলে মুক্তি দেবে এমন বান্দা আমার মা নয়। হয়তো দেখবি আজ থেকেই নাইন-টেনের বই নিয়ে আমায় বসিয়ে দিয়েছে কিংবা নতুন কোনও স্যারের কাছে নিয়ে গিয়ে আমার ফার্স্ট এন্ট্রি করিয়ে দিয়ে এল মাধ্যমিকের স্পেশাল ব্যাচের জন্য। আমার সঙ্গে বাকি কারুর মিলবে না, সে তো তুই জানিস।”

“তোর চেহারাটা খারাপ হয়ে গেছে, বুবুন। চোখের নিচে কালি পড়েছে, অনেক রোগা হয়ে গেছিস। আন্টি কি তোকে এই ক’দিনে ঘুমোতেই দেয়নি নাকি? কী হাল করেছিস নিজের, খেয়াল আছে?”

“ছাড়, বাদ দে। আমার কথা ভাবলে আরও কষ্ট হবে তোর। আমি বরং চলি, দেরি হয়ে গেলে কপালে দুঃখ আছে।” বলে হাঁটা দেয় বুবুন।

কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে রনি আবার বুবুনকে ডেকে বলল, “বুবুন দাঁড়া, আসল কথাটাই তো বলতে ভুলে গেলাম।”

বুবুন ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, “কী?”

“জানিস, আমাদের পাড়ার ফুটবল টিমের স্ট্রাইকার বাবলুদা সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে পড়ে গেছিল, পায়ের হাড় সরে গেছে। এখন কম সে কম দু’মাস মাঠের বাইরে থাকতে বলেছে ডাক্তার। তাই বুবুন, আমি বলছিলাম কী, এই ক’টা দিন প্লিজ তুই বাড়িতে একটু ম্যানেজ করে খেলতে আয়। আমাদের টিমে ভালো স্ট্রাইকার নেই। বাবলুদা যাওয়াতে পুরো টিমের স্পিরিটটাই নড়ে গেছে। সামনের উইকে পাশের কলেজটা থেকে দাদারা খেলতে আসবে। তোর খেলা তো দেখেছি, তুই স্ট্রাইকার পোজিশনে যথেষ্ট ভালো খেলিস। একটু দেখ না, ভাই।”

বুবুন ব্যঙ্গার্থক একটা হাসি দিয়ে বলল, “ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সেই এককথা। তোরা আমার সমস্যাটা কোনোদিনই বুঝলি না, আর বুঝিয়েও লাভ নেই।” বলে বুবুন চলে গেল।

রনির হয়তো আরও কিছু বলার ছিল, কিন্তু তার আর বলা হল না।

রাতে খাওয়ার টেবিলে বসে অনুরাধাদেবী বুবুনকে বললেন, “পরীক্ষা হয়ে গেছে বলে ভেবো না যা খুশি করার স্বাধীনতা পাবে। কাল থেকে ম্যাথ আর ফিজিক্যাল সায়েন্সটা ঘেঁটে দেখবে। আর যতদিন না পর্যন্ত তোমার স্যারেরা নাইনের ব্যাচ শুরু করছেন ততদিনে পড়া বেশ খানিকটা এগিয়ে রাখা চাই।”

বুবুন ঘাড় নাড়ল। অনুরাধাদেবী বললেন, “আমি তোমার পরীক্ষা কেমন হয়েছে আর জিজ্ঞেস করলাম না। তার কারণ তুমি ভালো করেই জানো। আমি এক্সপেক্টেশন বা প্রেডিকশনে নয়, রেজাল্টে বিশ্বাসী। মোট কথা, এটুকু জেনে রাখো, স্কুলে টপ করতে না পারলে অনুরাধার ছেলে হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করা যায় না এবং দুঃখের কথা প্রতিবারই তুমি তাতে ব্যর্থ হয়েছ। এবার কী হবে তা সময়ই বলবে।”

বুবুনের বাবা খাচ্ছিলেন, আর না থাকতে পেরে বললেন, “আহ্‌ অনু! তুমি তখন থেকে ছেলেটাকে দাবড়াচ্ছ, ওকে শান্তিমতো খেতেও দিচ্ছ না। ও কি আর যে সে ছেলে নাকি? প্রথম না হলেও ক্লাসে দশের মধ্যে তো থাকেই। সে ছেলেকে এমনভাবে বলা কি ঠিক? এবারও নিশ্চয়ই ভালো রেজাল্ট করবে, তাই না বুবুন?”

অনুরাধদেবী বুবুনের বাবার কথায় পাত্তা না দিয়ে বলে চললেন, “ও হ্যাঁ, আরেকটা জরুরি কথা ছিল। তোমার ম্যাথস আর ফিজিক্সের যা অবস্থা তাতে তোমার ভবিষ্যতের কথা ভাবলে আমার যথেষ্ট চিন্তা হয়। তাই এবার ঠিক করেছি তোমার ম্যাথস আর ফিজিক্সে দু’জন টিচার বাড়িয়ে দেব। আসলে আমিই দেখতে পারতাম, কিন্তু আমার হাতে সময় কম। কাল বিকেলে খোঁজ পেয়েছি একজনের, রিটায়ার্ড ভদ্রলোক, হিন্দু স্কুলে পড়াতেন, বেশ নামডাক। ঠিক করেছি তার কাছেই তোমায় দেব। কাল বিকেলে আমার সঙ্গে যাবে, তোমার নাম এন্ট্রি করাতে হবে।”

“আর সবচেয়ে জরুরি জিনিসটা হল, এখন তোমার ক্লাস নাইন হয়েছে, এরপর মাধ্যমিক, সো আমি ঠিক করেছি নেক্সট মাসে তোমায় কোনও ইন্সটিটিউটে ভর্তি করাব। তার কারণ জানোই তো, এখন যা কম্পিটিশন, তাতে আগেভাগে ভবিষ্যতের জন্য লেগে পড়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ। এখন থেকে মেডিকেল বা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করলে পরের দিকে তোমার অনেক সুবিধা হবে। কাজেই যদি জীবনে কিছু করতে চাও, তাহলে এখন থেকেই শুরু করে দাও।”

বুবুনের বাবা চুপ করে শুনছিলেন। এবার বললেন, “একটু বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেলছ না অনু? তোমার মনে হয় না ছেলেটার উপর বড্ড বেশি চাপ দেওয়া হয়ে যাচ্ছে? স্কুল আর প্রাইভেট টিউশন সামলে ছেলেটার কাছে আর সময়ই থাকে না, তার উপর আরও বোঝা চাপিয়ে দিলে ও তো মুখ থুবড়ে পড়বে। ওকে একটু খোলা হাওয়াতে শ্বাস নিতে দাও। দেখবে একদিন যে ছেলেকে নিয়ে তোমার এত চিন্তা, সেই ছেলে ঠিক নিজের নিয়মে সবকিছু করে নিয়েছে। আমাদের বুবুন বুঝদার ছেলে, আর সবচেয়ে বড়ো কথা ওর শরীরে তোমার রক্ত বইছে। ও ঠিক করে নেবে। আমাদের কাজ শুধু ওকে সঠিক পথ দেখানো।”

বুবুনের মা হাতটা তুলে অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললেন, “বড্ড বেশি অনধিকার চর্চা হয়ে যাচ্ছে না? তুমি কী মনে কর, তোমার নিয়মে বা তোমার পথে চালনা করে আমি আমার ছেলেকে মানুষ করতে পারব? অবশ্য তোমার থেকে আর কী-ই বা আশা করা যায়। তোমার কাছে স্বপ্ন, লক্ষ্য আর সাফল্যের কী মানে, সে তো আমি খুব ভালো করেই জানি। কাজেই ও বিষয়ে নিজের জ্ঞানদান না করে চুপচাপ খেয়ে উঠে পড়ো।”

বুবুনের বাবা আর খেলেন না। নিঃশব্দে উঠে চলে গেলেন। বুবুন মনে কষ্ট পেল। এ-বাড়িতে বাবাই তার একমাত্র বন্ধু। কিন্তু বাবার কথার কোনও দামই নেই বাড়িতে। মা যেমনভাবে চালাবেন, তেমনভাবেই চলতে হবে সকলকে। মার মুখের উপর কোনও কথা বলা গর্হিত অপরাধ। ছোটোবেলায় মায়ের বাবার প্রতি এই আচরণ দেখে যত না মায়ের উপর রাগ হত, তার থেকে বেশি রাগ হত তার বাবার উপর। এখন ক্রমে বাবার এই শীতলতা বুবুনের চোখ-সওয়া হয়ে এসেছে। সে বুঝে গেছে, বাবার অসীম সহ্যশক্তি। সংসারে সমস্তরকম অশান্তি এড়িয়ে যাতে বুবুনের মাথার উপর থেকে ছাদ কোনওদিন সরে না যায়, তার জন্য বাবা নিজের যাবতীয় মানসম্মান বিসর্জন দিয়ে একার চেষ্টায় এই সংসার টিকিয়ে রেখেছেন। হয়তো অন্য কেউ হলে আজ বুবুনের মাথার উপর থেকে ছাদটা কবেই দু’ভাগ হয়ে যেত। মাঝেমধ্যে তার বাবার জন্য ভীষণ মায়া হয়। চল্লিশের কোঠা সদ্য অতিক্রান্ত মানুষটার চেহারায় এর মধ্যেই যেন অকাল প্রৌঢ়ত্বের ছাপ পড়েছে। দেখলেই মনে হয় জীবনের চড়াই উতরাই সহ্য করতে না পেরে কেউ যেন অদৃষ্টের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করেছে।

টেবিলে রাখা কাচের গ্লাসটা লক্ষ করছিল বুবুন। টেবিলে একটা কাচের গ্লাস উলটো করে রাখা ছিল। একটা ছোটো পিঁপড়ে সেটার ভিতরে আটকা পড়েছে। বেরোতে না পেরে গ্লাসের গা বেয়ে ওঠানামা করছে। বুবুন আড়চোখে সেটার দিকে তাকিয়ে একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের ঘরে চলে গেল।

আজ অনুরাধাদেবী একটু তাড়াতাড়িই স্কুলের জন্য বেরিয়ে গিয়েছিলেন। বাড়িতে বলে গিয়েছিলেন, আজ তাঁর স্কুলে পেরেন্ট-টিচার মিটিং আছে, তাই ফিরতে দেরি হবে। বুবুন যেন সময় নষ্ট না করে সব হোম-ওয়ার্ক করে নেয়, আর বিকেল হলে ঠিক সময়মতো পড়তে চলে যায়।

বুবুনদের রেজাল্ট বেরোতে এখনও বেশ কিছুদিন দেরি। ইতিমধ্যে বুবুনের দু’জন নতুন টিচার বেড়েছে। ফলত তার সপ্তাহের আর কোনও বিকেলই খালি পড়ে নেই। রনিরা দুয়েকদিন ডাকতে এসে অনুরাধাদেবীর দাবড়ানি খেয়ে আর আসেনি। সকালে রনিরা আসে না, তাই বুবুনেরও আর সুযোগ হয় না খেলার।

ফোর্থ পিরিয়ডের ঘণ্টা পড়ল। এখন আধঘণ্টার টিফিনের বিরতি। ঘণ্টা পড়ার দশ মিনিট পর ক্লাস ইলেভেনের রুম থেকে বেরোলেন অনুরাধাদেবী। রুমে যাওয়ার পথে স্কুল-ক্যান্টিনের বেয়ারাকে দেখতে পেয়ে তাকে তাঁর খাবারটা তাঁর রুমে পৌঁছে দেওয়ার আদেশ করলেন। সিঁড়ি দিয়ে ওঠবার পথে দুটি মেয়ে তাঁকে দেখে নিচু গলায় গুড মর্নিং বলল। তাদেরকে গ্রাহ্য না করে অনুরাধাদেবী নিজের রুমে এসে প্রথমে কাঁধের ব্যাগটা রাখলেন, তারপর ফ্যান চালিয়ে জানালাটা খুলে দিলেন।

খানিকক্ষণ বসার পর তার নিজস্ব অ্যাটাচড বাথরুমে ঢুকে ভালো করে নিজের মুখচোখ ধুলেন, চশমার কাচটা জল দিয়ে ভালো করে পরিষ্কার করলেন। তারপর বেরিয়ে এসে জানালাটা বন্ধ করে এসিটা চালু করলেন। ক্লাসরুমের গুমোট ভাবটা কেটে গিয়ে এখন বেশ স্বস্তি লাগছে। প্রসন্ন মনে অনুরাধাদেবী তাঁর ড্রয়ার থেকে বার করলেন ক্লাস নাইনের অ্যানুয়াল পরীক্ষার খাতাগুলো। আর কয়েকদিন পরই রেজাল্ট, খাতা দেখা মোটামুটি শেষ। এখন স্ক্রুটিনির পর্ব চলছে। নামী স্কুল, তাই খাতা দেখা বা ছাত্রছাত্রীদের মূল্যায়নে শিথিল হওয়া অনুরাধাদেবীর ঘোরতর অপছন্দ। আর এ কারণেই যেসব ছাত্রছাত্রীদের খাতা তাঁর কাছে আসে স্ক্রুটিনির জন্য, খুব কম ছাত্রছাত্রীই আছে যাদের নম্বরের কোনও পরিবর্তন হয় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাঁর হাতে পড়া খাতাগুলোর অবস্থা হয় শোচনীয়। আর এ কারণে টিচার্স মিটিংয়েও অন্য শিক্ষিকাদের বকাবকি করতে ছাড়েন না অনুরাধাদেবী। সময় কম, কাল-পরশুর মধ্যেই স্ক্রুটিনি কমপ্লিট করে সব খাতা জমা করতে হবে। অনুরাধাদেবী ব্যাগের সাইড চেন থেকে একটা ডট পেন বের করলেন।

সবে প্রথম খাতাটা দেখা শুরু করেছেন, এমন সময় তাঁর মোবাইলটা হঠাৎ বেজে উঠল। বুবুনের স্কুল থেকে ফোন। ভ্রূটা সামান্য কুঁচকে ফোনটা ধরলেন অনুরাধাদেবী। “হ্যালো।”

“হ্যালো, মিসেস ভট্টাচার্য বলছেন?”

“হ্যাঁ, বলছি।”

“অসময়ে আপনাকে বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত, ম্যাডাম। আসলে অনুরূপ ভট্টাচার্যের বিষয়ে আপনাকে একটা জরুরি ইনফরমেশন দেওয়ার ছিল, তাই আপনাকে ফোনটা করা। কাইন্ডলি যদি একবার সময় করে স্কুলে আসতে পারতেন, তাহলে খুব ভালো হত।”

“কিন্তু আমি তো এখন আমার স্কুলে রয়েছি। আর আপনি বুবুনের বিষয় যে জরুরি ইনফরমেশন দেওয়ার কথা বলছেন, সেটা কী?”

“সেটা জানার জন্য আপনাকে একবার আমাদের স্কুলে আসতে হবে, ম্যাডাম। সব কথা তো আর ফোনে বলা যায় না। কিছু জিনিস দেখাতে হবে আপনাকে। তাই বলছিলাম, যদি কাল-পরশু বা সম্ভব হলে আজই আপনি স্কুলে আসতে পারতেন তাহলে ভালো হয়। আপনার ব্যস্ততাটা আমরা বুঝতে পারছি, তবুও আশা করব, আপনি আমাদের সহযোগিতা করবেন। নমস্কার।”

ওপাশ থেকে ফোনটা রাখার আওয়াজ এল। অনুরাধাদেবী সাংঘাতিক ভ্রূকুটি করে কিছুক্ষণ বসে রইলেন। কেন এভাবে বুবুনের স্কুল থেকে তাঁকে ফোন করে ডাকছে, তার মাথামুণ্ডু বুঝতে পারছেন না তিনি। তিনি তাঁর নিজের ছেলেকে যতদূর জানেন, তাতে ডেকে বলার মতন গর্হিত অপরাধ সে করতে পারে বলে তাঁর মনে পড়ল না। আর এখন স্কুলও খোলেনি, সুতরাং জরুরি কথা পরীক্ষা ছাড়া আর কী বিষয়েই বা হতে পারে? আর পরীক্ষা নিয়ে হলে বুবুনের জন্য তাঁকে এভাবে ফোন করে কেন জরুরি তলব? বুবুন তো আগেও এরকম পরীক্ষা দিয়েছে। কই, কখনও তো তার স্কুল থেকে কোনওদিন এরকম ফোন আসেনি! কারণ তিনি জানেন, তাঁর ছেলে ফার্স্ট-সেকেন্ড না হোক, কিন্তু ফেল করার মতন ছেলে নয় কিছুতেই। তবে কি এবার…

অনুরাধাদেবীর সারা শরীর এসি রুমের ভিতরেও ঘেমে উঠল। মাথার মধ্যে হাজারটা চিন্তা ভিড় করে আসছিল। কিছুতেই স্থির থাকতে পারছিলেন না অনুরাধাদেবী। কালবিলম্ব না করে অনুরাধাদেবী স্থির করে ফেললেন, আজই তাঁকে একবার বুবুনদের স্কুলে যেতে হবে।

ইতিমধ্যে ক্যান্টিনের বেয়ারা তাঁর জন্য স্যান্ডউইচ আর কফি নিয়ে এসে দরজার বাইরে এসে নক করছিল। দরজা খুলে অনুরাধাদেবী তাকে বললেন ফিরিয়ে নিয়ে যেতে, তিনি খাবেন না। তারপর ঘরে ফিরে এসে চটজলদি দরকারি জিনিসগুলো তাঁর ব্যাগে পুরে নিলেন। রওনা হবার আগে একবার বড়দির সঙ্গে দেখা করে তাঁকে বলে এলেন যে তিনি বিশেষ জরুরি কাজে একবার বেরোচ্ছেন, কতক্ষণে ফিরতে পারবেন জানেন না। তাই তাঁর পরের দুটো পিরিয়ড যেন অন্য কোনও ম্যাডাম নিয়ে নেন। আর এও বলে গেলেন যে পাঁচটা থেকে পেরেন্ট-টিচার মিটিং, তিনি তার আগেই ফিরে আসার চেষ্টা করবেন।

বাইরে বেরিয়ে মেইন রোডের উপর একটা চলন্ত অটোকে দাঁড় করিয়ে তাতে চেপে রওনা দিলেন অনুরাধাদেবী। তাঁর স্কুল থেকে অটোতে বুবুনদের স্কুল যেতে লাগে মিনিট পনেরো-কুড়ি। যাওয়ার পথে রাস্তার লোকসমাগম, গাড়িঘোড়ার আওয়াজ কিছুই কানে আসছিল না অনুরাধাদেবীর। বুবুনদের স্কুলে না পৌঁছানো পর্যন্ত কিছুতেই যেন সংশয়টা কাটছে না।

এসবের মাঝেই বুবুনের মা খেয়াল করেননি কখন বুবুনদের স্কুল চলে এসেছে। তাঁর সম্বিৎ ফিরল অটোওয়ালার ডাকে। “ম্যাডাম, আমরা এসে গেছি।”

“কী? ও হ্যাঁ হ্যাঁ, দাঁড়াও।”

অটো থেকে নেমে ভাড়া মিটিয়ে অনুরাধাদেবী স্কুলের মেইন বিল্ডিংয়ের দিকে এগিয়ে চললেন। লিফটে তিনতলায় ওঠার পর সোজা এগিয়ে গিয়ে ডানদিকের হেড মিস্ট্রেস সুরঞ্জনা মহাপাত্রের রুম।

“আসুন, ম্যাডাম।”

অনুরাধাদেবী ঘরে ঢুকে দেখলেন আরও দু’জন মহিলা মিসেস মহাপাত্রের রুমে বসে আছেন। দু’জনকেই চিনতে পারলেন অনুরাধাদেবী। একজন সেকেন্ড বয় অরুণাভের মা, অন্যজন দেবরূপের মা। ওঁরা দু’জনেই অনুরাধাদেবীকে দেখে একটু মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন। মিসেস মহাপাত্র তাঁদেরকে বললেন, “আচ্ছা, আপনাদের ব্যাপারটা আমি দেখছি, আপনারা একটু বাইরে গিয়ে ওয়েট করুন। আমার মিসেস ভট্টাচার্যের সঙ্গে কিছু জরুরি কথা আছে। বসুন, ম্যাডাম।”

মহিলা দু’জন আড়চোখে অনুরাধাদেবীর দিকে তাকাতে তাকাতে রুমের বাইরে গেলেন। মিসেস মহাপাত্র ঘণ্টি বাজিয়ে একজন কর্মচারীকে হুকুম করলেন চা নিয়ে আসার জন্য। তারপর অনুরাধাদেবীর দিকে ফিরে শুরু করলেন, “ম্যাডাম, উই আর এক্সট্রিমলি সরি। আপনার অসুবিধাটা আমরা বুঝি, কিন্তু আজ আপনাকে ডেকে না এনে আমাদের হাতে আর কোনও উপায় ছিল না। আসলে ঘটনাটা অনুরূপকে নিয়েই, আর যেটা ঘটেছে সেটা একেবারেই অনভিপ্রেত। তাই আপনার সঙ্গে আলোচনা করাটা জরুরি।”

“আপনারা ঠিক কী বলতে চাইছেন তা আমার কাছে পরিস্কার হচ্ছে না, মিসেস মহাপাত্র। প্লিজ যদি একটু ডিটেলে বলেন।”

“আসলে ক্লাস এইটের অ্যানুয়াল পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোবে ক’দিনের মধ্যেই। ইতিমধ্যে আমাদের খাতার ইভ্যালুয়েশনও শেষের পথে। আর সেটা করতে গিয়েই আমাদের চোখে একটা অপ্রীতিকর ব্যাপার ধরা পড়েছে।”

বলতে বলতেই ঘরে ঢুকলেন একজন রাশভারী চেহারার মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক। তাঁকে দেখেই মিসেস মহাপাত্র বলে উঠলেন, “এই যে মিঃ রায়, আপনি এসে গেছেন? বাহ্‌, ভালোই হয়েছে। আপনিই তাহলে অনুরাধাদেবীকে পুরো বিষয়টা বুঝিয়ে বলুন। ম্যাডাম, ইনি হচ্ছেন আমাদের ম্যাথস টিচার মিঃ তরুণ রায়।”

“নমস্কার।”

প্রতি নমস্কার করে মিসেস মহাপাত্রের পাশের চেয়ারে বসে নিজের গাম্ভীর্য বজায় রেখে মিঃ রায় বললেন, “ম্যাথস কপি ইভ্যালুয়েশনের সময় অনুরূপের কপিতে স্টেপল করা অবস্থায় একটি চিট পাওয়া গেছে।”

“হোয়াট!”

মাথা নেড়ে মিঃ রায় বললেন, “আপনি ঠিকই শুনেছেন, ম্যাডাম। আমি ম্যাথস করাই, অনুরূপের ম্যাথসে উইকনেস আমার অজানা নয়। আর এবার ম্যাথস কোশ্চেন যথেষ্ট টাফ হয়েছিল। ক্লাসের টপাররাও কেউ আশি-পঁচাশির বেশি নম্বর পায়নি। সেখানে বুবুনের খাতা দেখে আমি বেশ অবাকই হয়েছিলাম। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন খাতা, কোথাও কোনও ভুল নেই। শুধু লাস্ট পাতার আগের পাতায় যত্ন করে লুকিয়ে রাখা দুটি মাইক্রো জেরক্স। এই দেখুন।”

মিসেস মহাপাত্রের টেবিলের একপাশে ডাঁই করে রাখা ছিল পরীক্ষার খাতাগুলো। সেখান থেকে বুবুনের খাতা বের করে মিঃ রায় বললেন, “এই দেখুন, লুজ শিটগুলো স্টেপল করার সময়ে খেয়াল করেনি। কাঁচা বয়স তো, নকল করার পর চিট যে সরিয়ে ফেলে দিতে হয়, সেটা মাথায় নেই। চিটদুটো তাই রয়ে গেছে এর ভিতরে। আর সেইজন্যই আমরা নোটিশ করেছি, নাহলে তো ব্যাপারটা নজরেই আসত না।”

মিসেস মহাপাত্রও গম্ভীর গলায় বললেন, “অনুরূপের মতো ছেলের থেকে এ ঘটনা আশা করা যায় না, ম্যাডাম। আর তাছাড়া এটা আমাদের স্কুলের আউট অফ কালচার। রেয়ারলি এই ঘটনা শোনা যায়, আর হলে স্টুডেন্টদের এগেইন্সটে দৃষ্টান্তমূলক স্টেপ নেওয়া হয়। আর আপনি ভালো করেই জানেন, আমাদের স্কুলের একটা রেপুটেশন আছে। সেই স্কুলে এধরনের ঘটনা ঘটলে ছাত্রদের নৈতিক শিক্ষাদানের বিষয়ে আমাদের উপর আঙুল উঠতে বাধ্য। জেনারেলি এই ধরনের কেসে আমরা স্টুডেন্টদের টিসি দিয়ে থাকি। সেই হিসেবে আমাদের পক্ষে আপনার ছেলেকে আর স্কুলে রাখা সম্ভব নয়, ম্যাডাম। তবে…”

মিসেস মহাপাত্র একটু থেমে আবার বললেন, “তবে আপনার কথা আমরা জানি। আপনি বহুবার এখানে এসেছেন ও সর্বোপরি আপনি একজন দায়িত্বশীলা শিক্ষিকা ও মা। তাই আমরা এ আশা রাখি যে আপনি ব্যাপারটার মর্ম বুঝবেন ও ভবিষ্যতে আপনার সন্তান যাতে এধরনের কাজ না করে সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখবেন। আর তাই আমরা ঠিক করেছি, অনুরূপকে আমরা আরেকটা সুযোগ দেব এখানে পড়া চালিয়ে যাওয়ার। বাট সরি টু সে ইউ, অনুরূপকে প্রোমোশন দেওয়া যাবে না। যে অপরাধ সে করেছে, তার জন্য এটুকু শাস্তি তার প্রাপ্য। আশা করি অনুরূপ সৎভাবে পরীক্ষা দিয়ে পরের বছর ভালো রেজাল্ট করবে। নমস্কার।”

শেষ কথাগুলো অনুরাধাদেবীর যেন কানে ঢুকছিল না। তাই মিসেস মহাপাত্র কথা শেষ করার কিছুক্ষণ পরে অবধি থম মেরে বসে রইলেন তিনি। কথা বলার সামর্থ্য তাঁর ছিল না। কীভাবে যে তিনি মিসেস মহাপাত্রের রুম থেকে বেরিয়ে এলেন, তা তিনিই জানেন।

অরুণাভের মা আর দেবরূপের মা বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁরা সবটা শুনেছেন। দেবরূপের বোন সমাদৃতা অনুরাধাদেবীর স্কুলে পড়ে। পূর্বের ঘটনার জন্য অনুরাধাদেবীর প্রতি এখনও তাদের ক্ষোভ মেটেনি।

বেরিয়ে আসতে আসতে অনুরাধাদেবী শুনতে পেলেন, “নিজেকে তো হিটলারনি মনে করে। স্কুলে হিটলার ক্যাম্প খুলে রেখেছে। এদিকে নিজের ঘরে যে কালসাপ, সে হুঁশ তো নেই। এসব মানুষের এমনভাবেই শিক্ষা পাওয়া উচিত।”

“স্কুলে এমন হাবভাব, আশেপাশের কেউই যেন মানুষ নয়। এবার বোঝ কেমন লাগে। ওঝার ঘরেই ভূত বেরুল তো!”

আরও অনেক কথাই শুনতে পাচ্ছিলেন বুবুনের মা, কিন্তু সেগুলো কোনওটাই তাঁর বোধগম্য হচ্ছিল না। তাঁর মাথা কাজ করছিল না। তাঁর মুখচোখ লাল হয়ে গেছে, ঘন ঘন নিঃশ্বাস পড়ছে। আরও যাতে কিছু শুনতে না হয় সেজন্য কানে হাতচাপা দিলেন অনুরাধাদেবী। এরই মধ্যে কে যেন সবকিছু ছাপিয়ে বলে উঠল, “চোরের মায়ের বড়ো গলা।”

অনুরাধদেবীর সামনে দুনিয়া টলমল হয়ে উঠল। তিনি সিঁড়ির রেলিংটাকে কোনওমতে আঁকড়ে না ধরলে হয়তো পড়েই যেতেন। তারপর আস্তে আস্তে আচ্ছন্নের মতো সিঁড়ির ধাপের উপরেই ধপ করে বসে পড়লেন তিনি।

বুবুনের আজ মহা আনন্দ। সুব্রত স্যার আজ মা বেরিয়ে যাওয়ার পরই বাড়ির ফোনে ফোন করে জানিয়েছেন যে বিশেষ কাজে তাকে দিল্লি যেতে হয়েছে, আজ পড়াতে পারবেন না। ফলে বিকেলে অপ্রত্যাশিতভাবে ছুটি মিলেছে। আর আজই পাড়ায় পাশের কলেজ থেকে দাদারা খেলতে আসবে। মায়ের ফিরতে দেরি হবে, কাজেই খেলতে কোনও বাধা নেই।

বুবুনের আরও খুশির কারণ, তার বাবা আজ বাড়িতে। তার সেফগার্ড। বাবা তাকে আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, যদিও কোনও চিন্তার কারণ নেই, তবুও মায়ের ফিরতে কতক্ষণ লাগবে সেটা ফোন করে তাঁর থেকে জেনে নিয়ে সেইমতো তাকে সাবধান করে দেবেন।

বুবুন এখন মাঠে। বহুদিন পর আবার এসব কিছু উপভোগ করছে ও। কতদিন ফুটবলটা ওর পায়ের ছোঁয়া পায়নি। রনি-দেবল-সপ্তর্ষিরা সবাই ওকে মাঠে পেয়ে দারুণ খুশি। দাদাদের সঙ্গে ম্যাচ, হারাতে পারলে আলাদাই একটা সম্মানের ব্যাপার। সবাই খুব উত্তেজিত।

খেলা শুরু হল। দাদারা কলেজ টিমে খেলে, সবাই খুব ভালো প্লেয়ার। বুবুনরা প্রথমটায় ওদের সঙ্গে পেরে উঠতেই পারছিল না। ফার্স্ট হাফ পঁচিশ মিনিটে। তার প্রথম দশ মিনিটেই দাদারা প্রায় গোল করে দিতে পারত, কিন্তু বুবুনদের গোলকিপার মনোজের অসাধারণ কিপিংয়ের জেরে সেটা হয়নি। কিন্তু তাতে বিশেষ লাভ হয়নি। কারণ, ওরা এত বেশি ছেঁকে ধরেছে যে বুবুনরা সবাই প্রায় ডিফেন্স লাইনে এসে পড়েছে, আর দাদারা ঘন ঘন কর্নার পেয়েই চলেছে। বুবুন-রনিরা মনে মনে ভাবছিল, হয়তো আর বেশিক্ষণ ঠেকিয়ে রাখা যাবে না।

খেলা এগিয়ে চলল। হঠাৎ দাদাদের নেওয়া কর্নারের জবাবে বিশুর একটা অনবদ্য ক্লিয়ারেন্সে বল পায়ে এসে লাগে বুবুনের। বল পাওয়া মাত্রই শিকারি চিতাবাঘের মতো সেটা পায়ে নিয়ে ওদের পেনাল্টি বক্সের কিছুটা বাইরে থেকে দৌড় শুরু করল বুবুন। সামনে তিনজন প্লেয়ারকে অনবদ্য কায়দায় কাটিয়ে বুবুন এগিয়ে চলল।

বুবুন এগিয়ে চলেছে, আর দাদারা তার পিছনে ছুটে চলেছে। কিন্তু বুবুনের সঙ্গে দৌড়ে পেরে উঠছে না। বুবুন ক্রমশ ওদের পেনাল্টি বক্সের কাছাকাছি চলে এসেছে। সামনে গোলকিপার ছাড়া আর কেউ নেই। সে অসহায়ভাবে নিজের পজিশন নেওয়ার চেষ্টা করছে। আরও খানিকটা এগিয়ে বু্বুনের ডানপায়ের জোরালো চাবুক শট হতভম্ব গোলকিপারের মাথার উপর দিয়ে হালকা একটা ইন্সুইং করে গোলের ভিতর ঢুকে গেল। একটা আকাশফাটা চিৎকার উঠল, গো-ও-ও-ও-ল-ল!

“বুবুন!”

হঠাৎ যেন বাজ পড়ল। মাঠের ‘গোল গোল’ বলে শুরু হওয়া রবটা আচমকা থেমে গেল। প্রথমে কেউ বুঝতে পারেনি আওয়াজটা কোনদিক থেকে আসছে। পিছনে ফিরতেই স্তম্ভিত হয়ে গেল বুবুন। অনুরাধাদেবী। বিস্ফারিত দুই চোখ, নাক দিয়ে আগুনের হলকা বেরোচ্ছে। কেশবিন্যাস অবিন্যস্ত, কাঁধে সাইড ব্যাগ। বাড়ি যাওয়ারও অবকাশ হয়নি তাঁর, সোজা স্কুল থেকে চলে এসেছেন এখানে।

বুবুন তার মায়ের অনেক শাসন ভোগ করেছে, কিন্তু আজকের মতো তাঁর রূপ এর আগে কখনও দেখেনি। হঠাৎ যেন চারদিকে সবকিছু স্তব্ধ হয়ে গেছে। প্রলয় আসার পূর্বাভাস জানাচ্ছে পারিপার্শ্বিক। বুবুন একছুট্টে মাঠ থেকে বেরিয়ে এসে মায়ের সামনে দাঁড়াল। কাঁচুমাচুভাবে উত্তর দিল, “মা, আসলে আজ সুব্রত স্যার পড়াননি, তাই এখানে এসেছিলাম। আমি এখনই চলে যাচ্ছি, মা। হোম-ওয়ার্ক আমার সব হয়ে গেছে। আমি একটুও মিথ্যা কথা বলছি না, তুমি বাড়ি গিয়ে দেখবে চলো, মা। আমি আর এখানে কখনও আসব না।”

অনুরাধাদেবী চুপ। বুবুন বুঝতে পারে না সে কী বলবে। তার কপালে দুঃখ আছে সে জানে ভালোই। কিন্তু মা এরকম বিহ্বলভাবে দাঁড়িয়ে আছে, সেটা বুবুনের কল্পনারও অতীত। হঠাৎ তার হৃৎস্পন্দনের গতি দ্বিগুণ হয়ে গেল। পূর্বে সে আর কোনও অপরাধ সংঘটিত করেছে তা ভাবতে ভাবতে নিজের অজান্তেই তার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠাণ্ডা স্রোত নেমে গেল।

অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর বুবুনের মা রুদ্ধ গলায় বলে উঠলেন, “ফুটবল। তাই না, ফুটবল! আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম, ফিজিক্স অনার্সে গোল্ড মেডালিস্ট অনুরাধা ভট্টাচার্যের ছেলে নামকরা ফুটবলার হবে। সে পায়ে বল নিয়ে ছুটে বেড়াবে, সেই সঙ্গে তুখোড়ভাবে লেখাপড়া করবে, ঘরেও জিতবে বাইরেও জিতবে, স্কুলে প্রথম ছাড়া দ্বিতীয় হবে না, এর থেকে বেশি গর্বের বিষয় আমার কাছে আর কী হতে পারে।”

বুবুন চুপ। অনুরাধাদেবী অদ্ভুত হেসে বলে উঠলেন, “শুধু তাই নয়। সে তো আজকাল পাঠ্যবইও লিখতে শিখেছে। বাজারে তার বই হু হু করে বিক্রি হবে, বহু ছাত্রছাত্রী এসে দাম দিয়ে তার বই কিনে নিয়ে পড়বে। স্যারেরাও যাতে নিজেদের ভুল শুধরে নিতে পারেন সেইজন্য সে পরীক্ষার খাতার শেষ পাতায় নিজের বইয়ের একটা ছোটো মাইক্রো জেরক্সের কপি রেখে আসবে। কারণ, আমরা তো ভুলেই গিয়েছিলাম সে সকল কিছুর ঊর্দ্ধে। তার থেকে বেশি জ্ঞান কারও থাকা সম্ভব নয়। তার অসাধ্য কিছু নেই, সে সবকিছুই পারে। তাই না? পারে না?”

বুবুন এখনও চুপ। ইতিমধ্যে সে থরথর করে কাঁপতে শুরু করেছে।

“পারে কি পারে না?” আবার সেই বাজপড়া স্বর। এগিয়ে এসে বুবুনের থুতনিসহ চোয়ালটা চেপে উঁচু করে ধরলেন অনুরাধাদেবী। মায়ের বজ্রমুষ্টির মধ্যেই কোনওরকমে আঁকুপাঁকু করে নড়ে উঠল বুবুন।

বুবুনকে ছেড়ে দিয়ে সরে এলেন অনুরাধাদেবী। এবার স্বাভাবিক গলায় বললেন, “তোমায় আমি বেশি কিছু বলব না। শুধু এটুকু জেনে রাখো, এই মুহূর্ত থেকে আমার প্রতিটি আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন না করলে তুমি যা কল্পনা করতে পারো তার থেকে শতগুণ বেশি কিছু তোমার জন্য অপেক্ষা করে আছে। এখন ঘরে চলো।”

প্রায় পুতুলের মতো অনুরাধাদেবীর পিছু পিছু বুবুন ঘরের দিকে চলল। মাঠের ছেলেরা সবাই স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

দরজা খুললেন বুবুনের বাবা। বুবুনের মা কোনও সাড়া দেননি। তাই বুবুনের সঙ্গে বুবুনের মাকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠলেন বুবুনের বাবা। বিস্মিত ভাবটা কাটিয়ে কিছু বলতে যাবেন, তার আগেই বুবুনের মা তাঁকে বললেন, ”কোনও খবর দিয়ে আসিনি, তাই বোধহয় একটু অবাক হয়েছেন, না মিস্টার রূপঙ্কর ভট্টাচার্য? ও, ভালো কথা, আপনাকে একটা বিষয় জানানোর ছিল। আপনি যেভাবে আমার ছেলের সার্বিক উন্নতির জন্য নিজের মূল্যবান সময় ব্যয় করে অকুণ্ঠভাবে উঠেপড়ে লেগেছেন, সেজন্য আপনাকে ধন্যবাদ দেওয়ার ভাষা আমার নেই। আমার ছেলে আজ যে উচ্চতায় পৌঁছেছে, তা স্বয়ং এই অনুরাধা ভট্টাচার্যরও কল্পনার অতীত। তাই আমি ভেবে দেখেছি, এই মুহূর্তে আমার দিক থেকেও কিছু না করাটা একান্তই অনুচিত। আমার ছেলে ফুটবল খেলবে, নিজের লেখা বইয়ের পাতা পরীক্ষার খাতায় লুকিয়ে রাখবে, মা হিসেবে গর্ববোধ করার পক্ষে এই কি যথেষ্ট নয়?”

“অনু, তুমি কী বলতে চাইছ আমি ঠিক…”

“বুঝতে পারছ না, তাই না? ঠিক আছে, কোনও সমস্যা নেই। সবটাই আস্তে আস্তে বুঝে যাবে। যখন জানবে, তোমার আর তোমার ছেলের দু’জনের জন্যই খুব সুন্দর ব্যবস্থা করে রেখেছি আমি।” ঘরের কোণে রাখা হরিদ্বার থেকে আনা লাঠিটার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বুবুনের মা বললেন, “এত সুন্দর উপহার তোমরা দু’জনে মিলে আমাকে দিয়েছ, কী করে ভাবলে তোমাদের এই উপকারের ঋণশোধ আমি করব না?” হাতে লাঠিটা নিয়ে ক্রূরভাবে বললেন বুবুনের মা।

“অনু, অনু, দেখো তুমি…”

“আর দেখাদেখির কিছুই নেই, রূপঙ্কর। আমার যা সিদ্ধান্ত আমি নিয়ে ফেলেছি। তুমি ভালো করেই জানো, এই অনুরাধা ভট্টাচার্য একবার যে সিদ্ধান্ত নেয় তার অন্যথা স্বয়ং ঈশ্বরও ঘটাতে পারেন না। অতএব তোমাদের দু’জনেরই কোনও কিছু করার বা বলার সময় শেষ। এখন যা কিছু বলার, যা কিছু করার সবটাই করব আমি, এই অনুরাধা ভট্টাচার্য।” চোখে আগুন জ্বলে উঠল অনুরাধাদেবীর। “বুবুন, তোমায় কী বলেছি মনে আছে তো? চলো ঘরের ভিতর।”

বুবুনের বাবা কাতরভাবে বললেন, “দেখো অনু, এমন কাজ তুমি কোরো না। প্লিজ ছেলেটাকে ছেড়ে দাও। মানছি ছেলেটা অন্যায় করেছে। কিন্তু বিশ্বাস করো, এবার থেকে আর ভবিষ্যতে ও এমন কাজ করবে না। এবার থেকে আমি শাসনে রাখব ওকে; ওর কোনও কাজে আমি প্রশ্রয় দেব না। তুমি প্লিজ…”

“আর একটাও বাজে কথা কেউ বলবে না। না হলে…” চিৎকার করে উঠলেন অনুরাধাদেবী। সোজা স্বামীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বললেন, “বড়ো বেশি শখ হয়েছিল না অনুরাধার চোখ এড়িয়ে ছেলেটাকে উচ্ছন্নে যেতে দেওয়ার? কী ভাবো তুমি নিজেকে? পয়সা রোজগারের মুরোদ নেই, সাহস কী করে হয় নিজের যুক্তি আর মতামত আমার উপর চাপিয়ে দেওয়ার, আমার ছেলের উপর কর্তৃত্ব করার?” হাঁফাচ্ছিলেন অনুরাধাদেবী। “তবে আমিও অনুরাধা ভট্টাচার্য। আমিও দেখিয়ে দিতে চাই, আমার কথার অমান্য করলে, আমার আদর্শচ্যূত করে কাউকে উচ্ছন্নে পাঠালে তার কী শাস্তি আমি দিয়ে থাকি। আমার অনেক বড়ো ক্ষতি করে দিয়েছ তোমরা। অতঃপর তার সমুচিত জবাবের জন্য প্রস্তুত থেকো। চল বুবুন।”

বুবুনকে কান ধরে হিড় হিড় করে টেনে ঘরের ভিতর ঢুকিয়ে দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ করে দিলেন অনুরাধাদেবী। বুবুনের বাবা বাইরে থেকে বাধা দিতেও কোনও ফল হল না। বুবুনের বাবা বাইরে থেকে পাগলের মতো চিৎকার শুরু করলেন। “শুনছ অনু! প্লিজ লক্ষীটি, তোমার যা রাগ তা আমার সঙ্গে মিটিয়ে নাও, ওকে ছেড়ে দাও। ও যা করেছে আমার কথায় করেছে, বিশ্বাস করো! ওর কোনও দোষ নেই, আর ও যদি কিছু অন্যায় করেই থাকে এবারের মতো ওকে ছেড়ে দাও। আমি কথা দিচ্ছি, ওকে আর এমনটা করতে আমি দেব না। কিন্তু প্লিজ ওর সঙ্গে খারাপ কিছু কোরো না, ওর ভবিষ্যৎ পড়ে আছে এখনও। প্লিজ অনু!”

ভিতরে তখন লাঠির সপাসপ আওয়াজ শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। সেইসঙ্গে সম্মিলিতভাবে বুবুনের পরিত্রাহি চিৎকার আর সঙ্গে অনুরাধাদেবীর মারমুখী হুংকার। “সবক’টা শত্রু নিয়ে সংসার করছি আমি। পাপ করেছিলাম আমি তোকে জন্ম দিয়ে। আজ তোকে বুঝিয়ে দেব, বুঝিয়ে দেব যে আঘাত তুই অনুরাধা ভট্টাচার্যকে দিয়েছিস, তার শতগুণ আঘাত ফিরে পেতে কেমন লাগে। গোল্ড মেডালিস্ট অনুরাধা ভট্টাচার্যের এমন অবাধ্য চোর ছেলের কোনও প্রয়োজন নেই। তোকে মেরেই ফেলব আমি আজ।”

বাইরে থেকে পাগলের মতো দরজা ধাক্কাচ্ছেন বুবুনের বাবা, কিন্তু কোনও ফল হচ্ছে না। কোলাহল শুনে পাড়ার কিছু লোক আর মাঠের কয়েকজন ছেলে জড়ো হয়েছে বুবুনদের বাড়ির সামনে।

“প্লিজ অনু, ছেলেটাকে আর মেরো না। ও মরে যাবে!”

বুবুনের বাবার কথা কেউ শুনতে পেল না ভিতরে। বাইরে এসে তিনি সমবেত লোকেদের উদ্দেশ্যে হাতজোড় করে বললেন, “আপনাদের একটু সাহায্য দরকার। দরজাটা ভাঙতে হবে। বাইরে থেকে আমি বুঝতেও পারছি না ছেলেটা কেমন অবস্থায় আছে। প্লিজ আপনারা কয়েকজন আসুন।”

কয়েকজন লোক এগিয়ে এল। হঠাৎ সেইসময় একটা ভারী জিনিসের ভাঙার আওয়াজ এল, সেই সঙ্গে একটা গগনভেদী বিশ্রী আর্তনাদ। তারপরে সব চুপ।

“বুবুন! অনু!” বুবুনের বাবা চিৎকার করে উঠলেন। “আপনারা আসুন তাড়াতাড়ি, দরজা ভাঙতে হবে! ভিতরে মনে হয় ভয়ংকর কিছু ঘটেছে।” বলে উঠলেন তিনি।

তিনজন লোক দরজা ভাঙতে এগিয়ে এল। কিন্তু দরজাটা আর ভাঙার দরকার হল না। তার আগেই দরজাটা খুলে গেল।

দরজা খুলে বেরিয়ে এসেছেন শ্রীমতী অনুরাধা ভট্টাচার্য। একটু আগেও যার চোখে ছিল ক্ষোভের আগুন, কিন্তু এখন তার বিন্দুমাত্র অবশিষ্ট নেই সেখানে। তার জায়গায় আছে ভাবলেশহীন শূন্য এক দৃষ্টি।

“অনু, বুবুন কোথায়?”

অনুরাধাদেবী বসে পড়লেন মেঝেতে। বুবুনের বাবা তাকে সরিয়ে ঘরের ভিতর প্রবেশ করলেন, আর যা দেখলেন তাতে তাঁর মাথা ঝিমঝিম করে উঠল, চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে এল। অস্ফুটে কিছু একটা বলতে চেয়েছিলেন তিনি, কিন্তু পারলেন না। তার আগেই জ্ঞান হারালেন।

আজ ক্লাস এইটের বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল বেরিয়েছে। যথারীতি প্রথম হয়েছে সুমন্ত, দ্বিতীয় হয়েছে অরুণাভ, তৃতীয় হয়েছে অভীক। বাইরের টাঙানো চার্টে তাদের নম্বর জ্বলজ্বল করছে। ছেলেদের সবারই খুব খুশি হওয়ার কথা। তার কারণ, হেড মিস্ট্রেস নিজে বলেছেন, এইবারে তাদের স্কুলের সার্বিক ফলাফল সবথেকে ভালো। হয়তো অঙ্কের নম্বরে অনেকেই সন্তুষ্ট নয়, তবুও পরিসংখ্যান অনুযায়ী এইবারেই তাদের ক্লাসে পাশের হার অন্যান্য বারের তুলনায় অনেক বেশি।

বেলা এগারোটা বাজার সঙ্গে সঙ্গে স্কুলে ছেলেদের আসা শুরু হল। কারো চোখেমুখে রেজাল্ট বেরোনোর বাড়তি উৎসাহটা নজরে পড়ছে না। খুব শান্তভাবে সবাই একসারি করে রেজাল্ট আনতে উপরে যাচ্ছে, আর যাদের নেওয়া হয়ে গেছে তারা ফিরতি সারি দিয়ে বাইরে চলে যাচ্ছে। গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মা-বাবাদের চোখেও রেজাল্ট বেরোনোর স্বাভাবিক উচ্ছ্বাসটা নেই। রেজাল্ট পাওয়া হয়ে গেলে নীরবে ছেলেমেয়েরা তাদের বাবা-মার হাত ধরে রওনা হয়ে যাচ্ছে বাড়ির দিকে। হঠাৎ দেখলে মনে হবে স্কুলটা যেন কোনও তীর্থস্থান হয়ে গেছে।

বুবুনকে বাঁচানো যায়নি। বুবুনের বাবা ঘরে ঢুকেই বুবুনকে রক্তমাখা অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ে থাকতে দেখেছিলেন। পাশে একটা ভাঙা ফুলদানি, যার টুকরোগুলো মেঝের চতুর্দিকে ছিটিয়ে রয়েছে। বুবুনের মাথাটা রক্তে ভেসে যাচ্ছিল। অনুমান করা যায়, প্রবল আক্রোশে অনুরাধাদেবী লাঠির বদলে ফুলদানি দিয়ে তাকে আঘাত করেন, যার ফলে বুবুনের এই অবস্থা। হয়তো তিনি নিজেও এ ঘটনার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না।

পাড়ার লোকেরা তক্ষুনি অ্যাম্বুলেন্স ডেকে বুবুন ও তার মা-বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছিল। বুবুনের মা সারা রাস্তা কোনও কথা বলেননি। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর বুবুনের কন্ডিশন দেখে ডাক্তারেরা প্রথমেই বলে দিয়েছিলেন, যেভাবে মস্তিষ্কের হাড় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাতে আঘাতটা খুবই গুরুতর। সঙ্গে প্রচুর ব্লাড বেরিয়েছে, অবস্থার উন্নতির আর কোনও আশা নেই বললেই চলে। এ অবস্থায় রোগী কোমায় চলে যাবে, আর সেখান থেকে কবে ফিরে আসতে পারবে বা আদৌ ফিরতে পারবে কি না বলা মুশকিল।

তবে আর খুব বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি কাউকেই। বুবুন কোমায় যাওয়ার এক-দু’দিনের মধ্যেই ডাক্তারেরা খবর দেন, বুবুন আর পৃথিবীতে নেই। অবস্থার হঠাৎ করে অবনতি হওয়ায় ডাক্তারদের আর কিছু করার ছিল না।

বুবুনের বাবার অবস্থা কেমন হয়েছিল বলে বোঝানো মুশকিল। জ্ঞান ফেরার পর থেকেই বুবুনের নাম করে এত কাতরভাবে বিলাপ শুরু করেছিলেন, যে তাঁকে সব খবর সঠিকভাবে সেই মুহূর্তে কেউ বলার সাহস পায়নি। বাধ্য হয়ে শেষপর্যন্ত তাঁকে হাসপাতালে ঘুম পাড়িয়ে রাখতে হয়েছিল। পাড়ার লোকেদের মুখেও শোকের ছায়া নেমে এসেছিল। বুবুনের বন্ধু রনি, সপ্তর্ষি সবার মুখ থেকেই হাসি মুছে গেছিল।

এরই মধ্যে পুলিশকেও খবর দেওয়া হয়। পাড়ার লোকেরা যারা গোটা ঘটনাটা জানে, তাদের মধ্যে অনেকেই বুবুনের মায়ের প্রতি ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল। তাদের ইচ্ছা ছিল অবিলম্বে তাঁকে অ্যারেস্ট করা হোক। পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এসেছিল। তারা বুবুনের বাবার সঙ্গেও কথা বলে। বুবুনের বাবা খুব বেশি কিছু বলার মতো অবস্থায় ছিলেন না। তবুও তাঁর কথায় এটা পরিষ্কার হয় যে ঘটনার সময় তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন এবং বুবুনের মা-ই প্রবল ক্রোধবশত এই কাণ্ড ঘটয়েছেন, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। অতএব তাঁকে গ্রেফতার করলে কোনও অন্যায় হবে না। পাড়ার লোকেরাও বুবুনের মায়ের এই ঘটনার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছিল।

কিন্তু বুবুনের মাকে গ্রেফতার করা যায়নি। ওই ঘটনার পর থেকে তাঁর মুখ থেকে কেউ কোনও কথাও শোনেনি। ভাবলেশহীন সেই শূন্য দৃষ্টিতে তিনি সর্বক্ষণ তাকিয়ে থাকতেন। সেই দৃষ্টিতে কী আছে কেউ জানে না। পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাঁকে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কোনও ফল হয়নি, কারণ তিনি কোনও জবাব দেওয়ার মতো অবস্থায় ছিলেন না। বাধ্য হয়ে একজন সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি জানান, প্রচণ্ড শক পাওয়ার কারণে তাঁর এমন অবস্থা হয়েছে। এ অবস্থা থেকে উন্নতির আদৌ কোনও সম্ভাবনা আছে কি না, তার আশ্বাস তিনি দিতে পারেননি।

এখন প্রায় দেড় মাস কেটে গিয়েছে। বুবুনের মায়ের অবস্থার কোনও উন্নতি হয়নি। তিনি এখন কলকাতার একটি নামী মানসিক হাসপাতালের তিনতলার দক্ষিণ-পূর্ব কোণের একটি সেলে বন্দি। আজ পর্যন্ত সেখানে তাঁকে কেউ কোনওদিন কিছু বলতে শোনেনি। তবে তাঁর রুমের কেউ কেউ নাকি তাঁকে মাঝেমধ্যে বিশেষত রাতের দিকে একটা অস্ফুট আওয়াজে গোঙানির মতো কিছু আওড়াতে শুনেছে। সেটা কী তা অবশ্য কেউ জানে না।

বুবুনের বাবা প্রথমটায় বুবুনের মৃত্যুর পর প্রচণ্ড ভেঙে পড়েছিলেন। এখন অবশ্য তিনি নিজেকে অনেকটা সামলে নিয়েছেন। কিন্তু তিনি পণ করেছেন, যেখানে থেকে তাঁর একমাত্র ছেলের মৃত্যু হয়েছে, সেখানে তিনি আর কিছুতেই থাকবেন না। বুবুনের মায়ের আর কোনও খোঁজখবর নেননি তিনি বা বলা বাহুল্য, নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি। একটু সুস্থ হবার পরই তিনি তাঁর অফিসে বদলির দরখাস্ত করেন এবং মাস খানেকের মধ্যে তাঁর আপিল মঞ্জুরও হয়। একদিন সকালবেলায় তাঁকে দেখা যায় সমস্ত জিনিসপত্র নিয়ে গাড়ি করে বেরিয়ে যেতে। তিনি কোথায় গেছেন সেটা অবশ্য কেউ জানে না।

এখন আর ও-বাড়িতে কেউ থাকে না। প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির গোল্ড মেডালিস্ট অনুরাধা ভট্টাচার্যের কঠোর হাতে স্বামী ও পুত্রকে আর শাসনের আওয়াজও কানে আসে না কারও। ক্লাসে যখন স্যার বা ম্যাডামেরা  রোল কল করেন, তখন অনুরূপ ভট্টাচার্যের নাম আর তাঁদের মুখে শোনা যায় না। স্কুলের করিডোরেও আর কখনও ওই বেঁটেখাটো ছেলেটাকে ভারী ব্যাগটাকে সামলে ধীরে ধীরে চলতে দেখা যায়নি।

বাড়ির সামনের মাঠটায় বড়ো বড়ো ঘাস গজিয়ে উঠেছে। রনি-সপ্তর্ষিরাও আর খেলতে আসে না ওখানে কেউ। শুধু মাঠের বুক থেকে ভেসে আসা এক ঝলক বাতাস আর বুবুনের বিছানার তলায় হাওয়া বেরিয়ে যাওয়া চুপসানো একটা ফুটবল বুবুনের নাম ধরে যেন কিছু বলতে চায়। বুবুন আর তাদের কথা শুনতে পায় না।

জয়ঢাকি গল্প-উপন্যাসের লাইব্রেরি এইখানে

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s