গল্প ভয়ে ভূত দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় শরৎ ২০১৭

দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের আগের গল্পঃ হংসরাজের বংশধর

সন্ধেবেলা পড়তে বসে ছোট্ট গোলমালটা আবিষ্কার করল বাপন। ব্যাগ থেকে বইগুলো বার করতে করতে মলাট দেখেই খটকা লেগেছিল। পাতা উলটে বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে গেল।  

“এই রে এই বইটা তো –”, বলতে গিয়েও কথা আটকে গেল বাপনের। “আরে আমার অঙ্ক বইটা কোথায় গেল?” তাজ্জব ব্যাপার! সকালে স্কুলে যাবার সময় সব বইগুলো সে ব্যাগে ঢুকিয়েছিল, ঠিক মনে আছে। তাহলে এ বইটা কি ঐ পলাশবনীর মাঠে পিপুল গাছের তলায় যে বংশী নামে খুদে ছেলেটার সঙ্গে আলাপ হল, তার? কিন্তু এমন করে বই বদল হল কখন? আর তা সম্ভব হলই বা কী করে?

বাপন কিছুক্ষণ চিন্তা করল একমনে। যে ভাবেই বদলাবদলি হয়ে থাকুক না কেন বইটা বংশীকে ফেরত দিয়ে অঙ্ক বইটা নিয়ে আসা দরকার। নাহলে কপালে দুর্গতি নাচছে! বাপনদের স্কুলের গণিতের স্যার আজ স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছেন, “শুধু পরীক্ষার সময় পড়ে কিস্যু হয় না। আজ প্রথম দিন ছেড়ে দিলাম, ছুটি। মনে মনে তৈরি হয়ে নাও। আগামিকাল থেকে সবাইকে নিয়ম করে ক্লাসের পড়া ক্লাসে বসেই করতে হবে। প্রতিদিন আমি বাজিয়ে দেখে নেব কে কে ফাঁকি দিচ্ছে!”

শুধু মুখের কথা নয়, কথা বলার সময় হাতে ধরা মোটা কঞ্চিটা সবাইকে দেখিয়ে দেখিয়ে টেবিলের ওপর নামিয়ে রেখেছিলেন আলতো করে।

বাপন বইটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। আজকের দিনটা দুপুরের পর থেকেই কেমন গোলমেলে হয়ে আছে। এটুকু মনে পড়ছে যে দুপুরবেলা সে বিশ্রীভাবে ঘুমিয়ে পড়েছিল। উঠতে উঠতে সন্ধে হয়ে গেছে। ঘুম থেকে উঠেই চারপাশ কেমন যেন অচেনা ঠেকছিল। দুপুরে পর থেকে মা বাবা কাউকে দেখেনি সে। দেখবার কথাও নয়।  

বাপনের বাবা স্থানীয় সিমেন্ট কারখানায় সিকিউরিটির কাজ করে। আজ তাঁর ইভনিং শিফ্‌ট, দুপুর দুটো থেকে রাত দশটা পর্যন্ত ডিউটি। মা ফুলুকাকিদের সঙ্গে আদ্রার হাটে গেছে হাতে বোনা ঝুড়ি বিক্রি করতে। হাট ভাঙলে ফিরবে। দেরি হবে।    

ঠাকুমা এই সময় উঠোনে খাটিয়ার ওপর বসে ঝিমোয়। নিশ্চয়ই ঘরে হ্যারিকেনটা জ্বালিয়ে রেখে খাটিয়ায় গিয়ে বসে পড়েছে। ঘুম থেকে ওঠাবার জন্য একবারও ডাকাডাকি করেনি। বাপন বইটা আরেকবার উলটে পালটে দেখল। একেবারে ছোটদের অক্ষর পরিচয়ের বই। কিন্তু ভারী আজব বই তো! কী সব লেখা রয়েছে বইয়ের মধ্যে!

‘ব-য়ে বাবলা গাছে বাঘ উঠেছে/ ভ-য়ে ভূতের ভয়ে ঘুম ছুটেছে।’

এই রকম পড়া তো ছোটবেলায় কখনও পড়েনি বাপন। কে জানে বাবা বংশীদের স্কুলে কী সব বই পড়ানো হয়!

বাপন ঘর ছেড়ে দুয়ারে এল। খাটিয়ায় বসে ঠাকুমা ঢুলছে। মাথার ঘোমটা ঝুলে পড়ে মুখ ডাকা পড়ে গেছে। বাপন সাইকেলটা হাঁটিয়ে নিয়ে যেতে যেতে ঠাকুমার উদ্দেশ্যে চেঁচিয়ে বলল, “একটু আসছি!” তারপর ঠাকুমাকে পাশ কাটিয়ে বাড়ির বাইরে এল। বংশী বলেছিল ওর বাড়ি আনাড়া স্টেশনের কাছে। সে না হয় একটু খুঁজে নেওয়া যাবে। গ্রামের পরিবেশে সবাই একে ওপরকে চেনে জানে। বাপনদের গ্রাম শেষ হলেই পলাশবনীর মাঠ। মাঠ মানে উঁচু নিচু ধু ধু প্রান্তরের মধ্যে একটা খুদে টিলা, তাকে ঘিরে ঘন শিমূল আর পলাশের বন। জঙ্গলের ওপারে একটা প্রায় ভেঙে পড়া পোড়ো বাড়ি আছে। শোনা যায় ব্রিটিশ আমলে কোন পাগলা সাহেব থাকতেন ওই বাড়িতে। মাথায় লম্বা লম্বা জটপাকানো চুল ছিল। খুব বাংলা শেখার শখ ছিল তাঁর। ছোট ছেলেদের পেলেই ডেকে শোনাতে শুরু করে দিতেন নিজে কেমন বাংলা শিখেছেন। মরার পর তাকে ওই বাড়ির মধ্যেই কবর দেওয়া হয়। ওদিকে যেতে বাপনের মতো সব ছোটরাই ভয় পায়। এদিকে দুটো বড় পিপুল গাছ আছে রাস্তার ধারে। এই মাঠ ছাড়িয়ে মাইল খানেক সামনে এগোলে একটা লেভেল ক্রসিং পরে। ওপারে রেললাইনের পাশ দিয়ে আনাড়া স্টেশনের পল্লীতে যাবার রাস্তা।

বসন্তের মিহি হাওয়া বইছে। আকাশে বাঁকা চাঁদ উঠেছে। সেই মৃদু জ্যোৎস্নায় বেশ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে চারপাশ। শুধু বনে পলাশ আর শিমূলের লাল ফুলগুলো সন্ধ্যার আবহে কালো কালো দেখাচ্ছে।

বাপন যেতে যেতে দুপুরের ঘটনাটা মনে করার চেষ্টা করল। আজ নতুন ক্লাসের প্রথম দিন বলে ফিফথ পিরিয়ডের পর ছুটি হয়ে গিয়েছিল। তিনটে নাগাত। বাপন সাইকেল চালিয়ে পলাশবনীর মাঠের কাছে এসে দেখেছিল রাস্তার পাশে পিপুলগাছের তলায় একটা সাত-আট বছরের ছোট ছেলে ঝিম মেরে বসে রয়েছে। বাপন প্যাডেলে চাপ দিয়ে তাড়াতাড়ি কাছে এগিয়ে গিয়েছিল। যদিও বসন্তকাল, তবু পুরুলিয়ায় তিনটে মানে ভর দুপুরবেলা। মাথার ওপর খাঁ খাঁ করছে রোদ। এই টাঁড়-ভূমিতে কাঠ ফাটা রোদে দুপুরের শুষ্ক গরম হাওয়ার হলকা লেগে অসুস্থ হয়ে পড়া অস্বাভাবিক নয়। বাপন ছেলেটাকে মাথা নীচু করে বসে থাকতে দেখে চটপট ব্যাগ খুলে বোতল বার করে ছেলেটার চোখে মুখে জল ছিটিয়ে দিয়েছিল।

“কী নাম তোর? শরীর খারাপ লাগছে?”

ছেলেটা মুখ তুলে বলেছিল, “বংশী।”

বাপনের ছেলেটাকে দেখে মনে হচ্ছিল সে ভীষণ ভয় পেয়েছে। বাপনের মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল অনেকক্ষণ। যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না এইসময় কেউ এসে ওকে সাহায্য করবে। বাপন নিজের বোতল থেকে বংশীকে জল খাইয়েছিল।

বলেছিল, “সঙ্গে জল নিয়ে স্কুলে যাস না কেন?”

ছেলেটার ব্যাগ বই খাতা আলুথালু ছড়িয়ে ছিল মাটিতে। বাপন গুছিয়ে দিয়েছিল। হ্যাঁ, মনে পড়েছে, বাপনের খোলা ব্যাগটা উলটে সেই সময় একবার বইপত্র বাইরে এসে পড়েছিল। বোধহয় তখনই বইটা উলটপালট হয়ে গেছে ঢোকাতে গিয়ে।

বাপন এরপর বংশীকে সাইকেলে বসিয়ে বাড়ি পৌঁছে দিতে চেয়েছিল। বংশী বাপনের সাইকেলে উঠতে চায়নি চায়নি। বলেছিল, চাকায় পা ঢুকে যাবার ভয় করে। তখন বংশীর এমন আজব যুক্তির ঠেলায় আনমনে অঙ্ক-বইটা পিপুলতলায় পড়ে থেকে যায়নি তো? বাপন আশঙ্কায় সাইকেলের ব্রেক চাপল। মাটিতে পা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে ভাবল, সে যেন বড্ড তাড়াতাড়ি গ্রাম ছাড়িয়ে পলাশবনীর মাঠে এসে পড়ল! বাপনের বুকটা ভয়ে কেঁপে উঠল এরপর। ওখানে পিপুলতলায় অন্ধকারে কেউ যেন বসে রয়েছে! বংশীর মতোই কোনও ছোট ছেলে? বাপন হালকা চাঁদের আলোয় চোখ বড় বড় করে আবার দেখার চেষ্টা করল। না, কেউ তো নেই।

তবে কি ভুল দেখলাম? বাপন এমনটা ভেবে ইতস্তত করল কিছুক্ষণ। অঙ্কের বইটা ওখানে পড়ে গিয়ে থাকতে পারে। কিন্তু একটু আগের ভুল-দেখাটার ধাক্কায় বুকটা এখনও কেমন কাঁপছে। বাপন পিপুলগাছের দিকে এগিয়ে যাবার সাহস জোগাড় করতে পারছিল না।

সে নিজেকে একবার বোঝাল সত্যিই ওখানে কেউ বসে নেই। বংশী নামে ছোট ছেলেটাকে সে দুপুরবেলা দেখেছিল ওই জায়গায়। বাপন পিপুল গাছের দিকে এগোতে গিয়েও থেমে গেল। হাওয়াটা হঠাৎ বেশ জোরে বইছে সোঁ সোঁ করে।  সামনে পলাশবনীর মাঠে সব কটা গাছই মাথা দোলাচ্ছে ঘন ঘন। দেখে মনে হচ্ছে ওগুলো যেন গাছ নয়, একদল লম্বা লম্বা ছায়া মানুষ একজোট হয়েছে মাঠের মধ্যে। রাস্তা নির্জন। এদিকে আর কোনও মানুষের আনাগোনার উদ্যোগ নেই।

বাপন সিদ্ধান্ত বদলে সাইকেলে চেপে বসল। আগে বংশীর বাড়িতেই যাওয়া যাক। ওর বই যখন ব্যাগে চলে এসেছে, অঙ্ক বইটা ওর কাছে থাকারই সম্ভাবনা বেশি।

বাপন সাইকেল চালাতে শুরু করে আরেকবার ভয়ে ভয়ে ফিরে তাকাল পিপুল গাছে গোড়ায়।

তাকিয়েই হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল বাপনের। সত্যিই সত্যিই কে যেন গাছের তলায় বসে রয়েছে। ছোট চেহারার কোনও লোক কিংবা বংশীর মতো কোনও বাচ্চা ছেলে।

বাপন ভয়ে সাইকেলের গতি বাড়িয়ে ঢালু রাস্তায় নেমে পড়ল। গড়ানে সাইকেলে প্যাডেল করার দরকার ছিল না তবু সে প্যাডেলে চাপ দিল। এরপর গতি সামলাতে না পেরে কিছুটা হড়কে গেল। পড়তে পড়তে পা ফেলে কোনও রকমে সামলে নিল ঢালু রাস্তার পর সমতল জমি পেয়ে।  

বাপনের শীত লাগছিল এই সোঁ সোঁ করে বয়ে চলা দক্ষিণা হাওয়ায়। মনে হচ্ছিল এ হাওয়া নয়, কারা যেন জোরে জোরে দ্রুত শ্বাস প্রশ্বাস ফেলছে এই থমথমে মৃদু জ্যোৎস্নায়। তাহলে? ওই বংশী নামের ছেলেটা কি তবে কেউ নয়? বাপনের মাথার মধ্যে ভাবনাটা খেলা করতে লাগল। ছেলেটার বাড়ি যদি আনাড়া স্টেশনের কাছে হয় তবে সে দুপুরবেলা একা একা পায়ে হেঁটে এই এক মাইল দূরে পলাশবনীর মাঠে চলে এল কী করে? কোন স্কুলে পড়ে সে? তারপর বাপন বারবার নিজের সাইকেলে চাপিয়ে বাড়ি পৌঁছে দেবার প্রস্তাব দিলেও ছেলেটা রাজি হল না কেন? ব্যাপারটা বেশ সন্দেহজনক! তাহলে কী ওই বিটকেল বইটাতে যা লেখা ছিল …..ভ-য়ে …? না ঐ শব্দটা বাপন ভাবতে চায় না। তাকে যে করেই হোক এই ভয় থেকে বেরতে হবে।

কিন্তু বংশী নামে যদি কেউ না থাকে তবে সে এখন চলেছে কোথায়? বাপন সাইকেলে প্যাডেল করা থামিয়ে দিল। সাইকেলটা গড়িয়ে চলেছিল আস্তে আস্তে। ফেরার পথে তো আবার পলাশবনীর মাঠ পড়বে। সেই জোড়া পিপুল গাছ। তার মধ্যে একটা পিপুল গাছের তলায়…! তাহলে কি বাপনের ফেরার কোনও পথ নেই?

দূরে কোথাও ট্রেনের শব্দ হচ্ছে। অন্যদিন এই সময় গোমো-চক্রধরপুর প্যাসেঞ্জার আনাড়া স্টেশন ছেড়ে যায়। হয়তো রেললাইনের কাছাকাছি কোথাও চলে এসেছে সে। যদিও এত কম সময়ের মধ্যে একমাইল পথ পার হয়ে রেললাইনের আসেপাশে চলে আসা কী ভাবে সম্ভব বাপনের বোধগম্য হচ্ছিল না। আজ সব চেনা স্থান-কাল গোল পাকিয়ে গেছে। ঘুম থেকে উঠে ফাঁকা বাড়িটাই কেমন অচেনা লাগছিল বাপনের। অন্ধকারে হ্যারিকেনের আলোয় দেওয়াল, টালির চাল সব কেমন আবছা দেখাচ্ছিল। যেন একটা মায়াপুরী। ঠিক এখন এমন দেখাচ্ছে চারপাশটা। গাছগুলো লম্বা লম্বা ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে, দমকা হাওয়ায় নড়ে নড়ে উঠছে, মনে হচ্ছে জ্যান্ত মানুষের মতো হেঁটে সামনে চলে আসবে। কোনও মানুষ আসছে না কেন এই রাস্তায়? বাপন ছাড়া এই গ্রামগঞ্জের বাকি সবাই কী ঘুমিয়ে পড়ল সন্ধ্যেবেলায়!

বাপন সাইকেল গড়িয়ে নিয়ে যেতে যেতে চিৎকার করে ডাকল, “কেউ আছ?”

কোনও সাড়াশব্দ নেই।

কিছু দূরে একটা বটগাছ দেখা যাচ্ছে। গাছের গোড়াটা ইট সিমেন্ট দিয়ে গোল করে বাঁধানো। কেউ মাথা হেঁট করে বসে রয়েছে ওখানে। একজন বয়স্ক কেউ। এই লোকটা নিশ্চয় অশরীরী ছোট ছেলে নয়। বাপন সাইকেলের গতি বাড়িয়ে কাছে গেল।

“শুনছেন?”

লোকা মাথা তুলল না। লোকটার মাথায় লম্বা লম্বা জটাপাকানো চুল। সেই জটা সামনে ঝুলে পড়ে মুখটা ঢাকা দিয়ে দিয়েছে। ঠিক যেমন বাপনের ঠাকুমা মাথার ঘোমটা নামিয়ে ঝিমোয় তেমনই করে ঝিমোচ্ছিল লোকটা। বাপনের আরেকবার ডাকতে ইচ্ছা করছিল। কিন্তু শুকনো গলায় স্বর বেরোতে চাইল না। বাপন একটা শব্দ বললেই চারপাশে অনেকগুলো স্বর যেন ফিসফিস করে উঠছে। কিন্তু কথা বলার মতো কোথাও তো কেউ নেই। সে কোথায় এসে পড়েছে? কী করে বাড়ি ফিরবে? একটা বিদঘুটে বই, তাতে লেখা বিটকেল ছড়া। কারা পড়ে অমন বই?

“ব-য়ে বাবলা গাছে বাঘ উঠেছে/ ভ-য়ে ভুতের ভয়ে ঘুম ছুটেছে।”

মাথা নীচু করে ঝিমোতে ঝিমোতে লোকটা বিড়বিড় করে উঠল। তার সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে অসংখ্য কচি গলা এক সাথে প,ফ,ব,ভ,ম নিয়ে ছড়া বলতে শুরু করল। ঠিক যেন বটগাছের গোল বেদিতে বসা লোকটা গুরুমশাই। আর চারপাশে গোল হয়ে অনেক কচিকাঁচা ছাত্র-ছাত্রী রয়েছে তাঁকে শুনে ছড়া মুখস্থ বলবে বলে। বাপন সেই ছাত্র-ছাত্রীদের কাউকে দেখতে পাচ্ছিল না। কিন্তু তাদের সম্মিলিত স্বর ক্রমশ জোরালো হচ্ছিল। বাপন কোন ভৌতিক স্কুলে এসে পড়েছে? বাপন আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। সে ভয়ে সাইকেল ফেলে দিয়ে দৌড় দিল যে দিকে পারল। প্রাণপণ, ঊর্ধ্বশ্বাস দৌড়। যতক্ষণ দম ছিল দৌড়ল। তারপর মুখ থুবড়ে পড়ল মাঠের ঘাসের মধ্যে।

অন্ধকারের মধ্যে কে যেন জলের ঝাপট দিল বাপনের চোখে মুখে। একটা টর্চের আলো। বাপন চোখ খুলে প্রথমেই দেখল একটা ছোট ছেলে অবাক চোখে চেয়ে আছে।

কে এটা, বংশী? বাপনের মাথাটা আবার ঝিমঝিম করে উঠল। সে ভয়ে চোখ বুঝে ফেলল।

“কে তুমি বেটা?”

“বাপন। বাপন মাহাত। বাবার নাম মাধব মাহাত। গ্রাম …”, বাপন চোখ না খুলে ঘোরের মধ্যে বলে চলেছিল।

“আমার বেটা বংশী তোমাকে চেনে বলছে!”

“ না আমি কাউকে চিনি না। তোমরা আমায় ছেড়ে দাও!” বাপন চোখ বন্ধ করে কাঁদোকাঁদো গলায় বলল।

“এ খুব ভয় পেয়েছে। মাস্টারবাবুকে ডাকো!”

“না। না। ওই ভূত-মাস্টারকে ডেকো না! আমাকে ছেড়ে দাও! আমি বাড়ি যাব!” কাঁদতে কাঁদতে বাপনের চোখে আবার ঘুটঘুটে অন্ধকার নেমে এল।

এবার ইলেকট্রিকের জোরালো আলো পড়ছে চোখের ওপর। বাপন চেয়ে দেখল সে একটা পাকা ঘরের মধ্যে টেবিলে ওপর শুয়ে আছে। চারপাশে বেশ কয়েকজন লোক।

একজন গোঁফওয়ালা ভদ্রলোক বাপনের ওপর ঝুঁকে পড়ে বলছেন, “ভয় নেই। আমার নাম সঞ্জয় রায়। আমি আনাড়ার স্টেশন মাস্টার। তোমার বাড়িতে খবর পাঠিয়েছি। তোমার বাড়ির লোক এখনই এসে পড়বে।”

বাপন ভরসা পেয়ে টেবিলের ওপর উঠে বসেই পুনরায় চমকে উঠল। ওই তো বংশীও দাঁড়িয়ে রয়েছে দরজার পাশেই। বাপন ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল। ভয়ার্ত আর্তনাদ করে বলল, “আমায় ছেড়ে দাও। আমি বাড়ি যাব।”

 “দাদা আমায় চিনিতে পারছ না? আমি বংশী! আজ দুপুরে তুমি আমায়…পলাশবনীর মাঠে……। আমি তো তেনাদের কবলে পড়ে হারিয়ে গিয়েছিলাম……।”

বাপন চোখ চেয়ে বিস্ময়ের স্বরে জিজ্ঞাসা করল, “তুই সত্যিই মানুষ…? তাহলে আমার সাইকেলে উঠলি না কেন?”

“আমি তোমাকেও বিশ্বাস করতে পারিনি দাদা। ভেবেছিলাম তুমিও বোধহয় ওদের মতো মিথ্যে, আসল মানুষ নও..!” বলতে বলতে বংশী থরথর করে কেঁপে উঠল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই বাপনের বাবা মা চলে এল। বাপনকে পেয়ে মা হাউহাউ করে কেঁদে উঠল। বাবা ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল বাপনকে।

স্টেশনমাস্টার মিস্টার রায় শান্ত স্বরে বললেন, “আপনারা কান্নাকাটি করলে ও ছোট ছেলে আরও ভয় পেয়ে যাবে। ওকে ভরসা দিন, সাহস দিন।”

রাতটা গভীর ঘুমের মধ্যে কাটল বাপনের। শরীরটা একেবারে ক্লান্ত, অবশ হয়ে পড়েছিল। সকাল সকাল কুলুঙ্গিতে অঙ্কের বইটা আবিষ্কার করল বাপন। বইটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল। বইটা এখানে তো থাকার কথা নয়। এটা খুঁজে আনতে গিয়েই তো…! বাপন নিজের পড়ার ব্যাগটা খুঁজতে লাগল। না ব্যাগটা ঘরে কথাও নেই।

“মা আমার স্কুলের ব্যাগ কোথায়?” বাপন চিৎকার করতে করতে দুয়ারে এল। মা ঝাঁটা দিয়ে উঠোন ঝাঁট দিচ্ছিল। বাপনের চেঁচানি শুনে থমকে দাঁড়াল। মায়ের দেখাদেখি বাপনও থমকে দাঁড়িয়ে রইল। মুখ দিয়ে কথা বেরোচ্ছিল না ওর। মায়ের পিছনে দাঁড়িয়ে মগারামকাকা। তাঁর হাতে বাপনের স্কুল ব্যাগ।

মগারাম কাকু থমথমে মুখ করে বলল, “কাল কোথায় গিয়েছিলে খোকা? বাপরে! পলাশবনীর ওপারে জটাসাহেবের কবরে? ভোরবেলা খেঁজুর রস পাড়তে গিয়ে দেখলাম ব্যাগটা ভাঙ্গা দেওয়ালে ওপর। দেখে চেনা চেনা লাগল। কালকের ঘটনা তো সবটাই জানি। তাই নিয়ে এলাম…।”

“মানে?” বিস্ময়ে বাপন স্টাচুর মতো দাঁড়িয়ে রইল, শুধু ঠোঁট নাড়িয়ে বলল, “আমি তো ওদিকে যাইনি, ওদিকে যেতে আমার ভয় করে।”

মা বলল, “তাহলে দুপুর থেকে তুই কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলি? তুই স্কুল থেকে ফিরিসনি শুনে আমরা সব জায়গায় তন্ন তন্ন করে খুঁজছিলাম।”

বাপন ক্ষীণ স্বরে কথা আটকে আটকে বলল, “মানে? আমি তো স্কুল থেকে বাড়ি ফিরেছিলাম। ঠাকুমাকে জিজ্ঞেস করো। সারা বিকেল ঘুমলাম। উঠে পড়তে বসলাম। তারপর একটা বই সব গোলমাল করে দিল।”

“কিন্তু তুই তো বাড়ি ফিরিসনি। তোর ঠাকুমা তোর জন্য অপেক্ষা করে করে শেষে আর ফিরছিস না দেখে কান্নাকাটি জুড়ে দিল। আমি তোর বাবাকে কারখানা থেকে ডেকে পাঠালাম।”

বাপনের মুখ দিয়ে আর কোনও কথা বেরল না। তাই তো, অঙ্কের বই বাড়ির কুলুঙ্গিতে। ব্যাগ জটা সাহেবের কবরে পড়ে ছিল। বাপন চিন্তার গোলকধাঁধায় হারিয়ে গেল। কাল দুপুরের রোদের মধ্যে বংশী চলে গেল, বলা যায় পালিয়ে গেল। সাইকেলে চাপতে চাইল না। বাপন ফিরে তাকাল পলাশ আর শিমূলবনের দিকে, থরেথরে ফুটে রয়েছে লাল ফুল, বাপন মুগ্ধ হয়ে দেখছিল। এরপর একটা দমকা হাওয়া গোল গোল ধুলোর কুণ্ডলী পাকিয়ে চোখে মুখে ঝাপটা মারল। চোখে ধুলো ঢুকে মুহূর্তের জন্য অন্ধ হয়ে গিয়েছিল বাপন। তারপর কী ঘটেছিল? বাপনের মনে পড়ে না। বাপন সাইকেল চালিয়ে কোথাও একটা গিয়েছি! ওদের বাড়ির মতো দেখতে আরেকটা বাড়িতে? যেখানে কুলুঙ্গিতে হারিকেন জ্বলে, খাটিয়ায় ঘোমটা চাপা দিয়ে বসে ঠাকুমার ঝিমোয়? সবই অলৌকিক? মিথ্যে?   

তবে বংশী নামে ছেলেটা সত্যি। জটা-সাহেবের ভৌতিক স্কুল থেকে সেই বাঁচিয়েছে বাপনকে। দুপুরে বংশীর সঙ্গে কী ভূতুড়ে ঘটনা ঘটেছিল কে জানে?

বাপন ভয়ে ভয়ে দেওয়াল ঠেস দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা নিজের সাইকেলটার দিকে তাকাল। বাবা ওটা নিয়ে এসেছে রেল লাইন লাগোয়া বটতলা থেকে। বাপন সাইকেলের কেরিয়ারের দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে রইল। গতকাল অদ্ভুত বইটা ওখানেই আটকেছিল সে। না, বইটা নেই। কিংবা হয়তো ওই রকম কোনও বই আদৌ ছিল না।

গ্রাফিক্‌স্ঃ  ইন্দ্রশেখর

জয়ঢাকের গল্পঘর

 

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s