গল্প লালাজির গল্প অনসূয়া খাসনবীশ শরৎ ২০১৭

বুড়োগাছ আর নুড়ির সারাদিন গল্প চলে।

“কেমন দিন দেখছ, লালাজী?”

“কালকের মতো হাওয়া দিচ্ছে না আজ দাদু। আজ বড়ো কুয়াশা।”

“না লালাজী, আজকের দিনটাই সবচেয়ে সুন্দর। দেখছ কুয়াশা। তাতে সব পাখিরা গাছেই রয়েছে। কেউ কোত্থাও নড়ছে না। আজ তাহলে খুব আড্ডা হবে সবাই মিলে। তাই আজকের দিনটাই সব থেকে সুন্দর লালাজী।”

লালাজী এক কালে একটা বড়ো পাথর ছিল। বুড়োগাছের তলায় থাকত। ঝর্ণার জলের ধাক্কায় ক্ষয়ে ক্ষয়ে পাথর এখন নুড়ি হয়ে গেছে। বুড়ো সেই ছোট্ট লাল টুকটুকে নুড়িকে ডাকে লালাজী বলে। ঝর্ণার পাশে জলের আমেজে তারা সারাদিন, কখনও কখনও রাতেও গল্প করে। বুড়োগাছ তাকে পাহাড়ের গল্প বলে। ঝর্ণা নামার আগের পাহাড় ছিল পাথুরে। সেই শক্ত জমি থেকে তখন গুটি কয়েক চারাগাছ সদ্য মাথা তুলেছে। তারপর ঝর্ণার জলে এত গাছ হয়েছে, পাখি এসেছে, ঝিঁঝিঁ ডেকেছে। পুরনো কিছু গাছ জলের দাপটে ভেঙে গেছে। কিছু পাহাড়ের নড়াচড়ায় ভেঙে গেছে।

বুড়ো গাছেরও এখন বয়েস হয়েছে অনেক। ঝর্ণার জল তার শেকড়ে ছুঁয়ে গেছে। জলে ভিজে তার শেকড়ে নরম হয়ে গেছে। তাই সে ডেকে বলে, “লালাজী, আমার সময় হয়ে এল। তুমি জলের সাথে বয়ে যেও। যেখানে জল নিয়ে যায়, চলে চলো। জলকে ভয় পেও না। তৈরি থেকো, এই জলই তোমায় তোমার লক্ষ্যে পৌঁছে দেবে।”

লালাজী বুঝতে পারে না। ঠোঁট ফুলিয়ে বলে, “আমি তোমার সাথেই থাকব দাদু। আমি এখানেই থাকব। তুমিই বা যাবে কোথায় ?”

“না লালাজী, আমি অনেক বুড়ো হয়ে গেছি। আমার শেকড় আমায় যেতে দেয় না। কিন্তু তোমায় যেতে হবে। তবে তুমি ভেব না লালাজী, আমি তোমার মনে শেকড় বানিয়ে থাকব।”

লালাজী তার চারদিকে পাতাটাতা দেখিয়ে বুড়োকে বলে, “এই তো আমারও শেকড় আছে দেখ। আমিও কোথাও যাব না।”

বুড়ো হাসে। তারপর  বলে, “শেকড় কি কেবল গাছের থাকে লালাজী? শেকড় থাকে আমাদের সবার মনে। সেই শেকড়ের সাথে বেঁধে থাকে আমাদের সব বন্ধুরা। কথা দাও, তুমি তাদের সবসময় মনে রাখবে। যখন তোমার কাছে কেউ থাকবে না, এই শেকড়  তোমায় পুরনো বন্ধুদের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে।”

“দাদু, তাহলে তোমার মতো আমারও শেকড় আছে?”

“হা হা হা… না দাদুভাই, আমার মতো নয়। আমার থেকেও শক্ত।”

লালাজী কিছু কথা বোঝে, কিছু বোঝে না। সেই রাতে খুব ঝড় উঠল। আর কড়ক্কড় করে বাজ পড়তে লাগল। লালাজী ভয়ে কেঁপে কেঁপে উঠল ঘুমের মধ্যে। সকালে উঠে দেখে খুব শোরগোল। চারদিকটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা ঠেকছে। রাতের ঝড়ে বুড়ো গাছখানা শেকড় আলগা হয়ে পড়ে গেছে জলে। সবাই বলল, ঝর্ণার জল তাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে কে জানে কত দূর।

বুড়োগাছের ডালে যত পাখি বসত তারা উড়ে উড়ে ঘুরে ঘুরে বুড়োগাছকে বিদায় জানাচ্ছে। লালাজী একা একা খুব কাঁদল ক’দিন। তার তো আর কেউ নেই। গল্পও কেউ আর বলে না। তারপর একদিন জলের ঝাপটে মাটি আলগা করে ঝর্ণা টেনে নিল তাকে। খুব ভয় হল তার। জলে সে কোনওদিন বয়ে যায়নি আগে। প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগল তীরে ফিরে আসার। কিন্তু চেষ্টাই সার। সে না পারল ফিরে যেতে, না পারল তীরে ভিড়তে। স্রোতের মধ্যে হাবুডুবু খেতে লাগল। কে যেন তার কানে কানে বলে গেল, “লালাজী, ভয় পেও না। যতদূর জল যায়, চলে চলো।”

কথাগুলো তার বুকে সাহস জোগাল। সে নিজের গা এলিয়ে দিল। এবার সে ঝর্ণার তালে তালে এগোতে লাগল বিনা পরিশ্রমে। যেই সে নিজের গা এলিয়ে দিল, অমনি দেখল, মাথার উপর টলটলে জল, তায় জোর স্রোত আর কুলকুল আওয়াজ। সে আওয়াজ বড়ো মিঠে লাগল তার কানে। জলের রঙিন মাছেদের সাথে আলাপ হল। জলের উপর দিয়ে পাখি উড়ে যেতে যেতে হাঁক দিয়ে গেল, “লালাজী, সাগরের পানে যদি যেতে পার তাহলে আবার দেখা হবে।”

সাগর! লালাজীর বুক ছ্যাঁত করে উঠল। কিন্তু সে শিখেছে, আজকের দিনটাই সব থেকে সুন্দর। তাই লালাজী সব চিন্তা ছেড়ে দু’চোখ ভরে দেখতেই থাকল। কত কী দেখল সে! পাহাড়ি বন, পাহাড়ি গাছপালা, পাহাড়ি ছোট্ট ছোট্ট ছেলেমেয়ে খেলতে আসে নদীর ধারে। লালাজী ছেলেমেয়েগুলোকে প্রাণভরে দেখে। পাথর কুড়িয়ে তারা নিয়ে যায় পকেটে পুরে। আহা কী সুন্দর ছেলেমেয়ে! আমাকেও যদি সঙ্গে নিত! তার মনে বড়ো সাধ হয়।

এরকমভাবে চলতে চলতে লালাজী অনেক পথ পেরোয়। ঝর্ণা এসে নদীতে মেশে। নদীর এ-কূল ও-কূল দেখা যায় না। রাশি রাশি জল গমগম করে ঢেউ তুলে চলেছে। লালাজী দাঁতে দাঁত চেপে হাসিমুখে জলের টানে টানে চলেছে। সে নদীর মাছেরা অন্যরকম। ভারি তাদের অহংকার। যেন তাদের থেকে সুন্দর আর কেউ নেই। লালাজীর সাথে সাথে চলে একটা ছাই ছাই পাথর। সে এসেছে আরেক পাহাড় থেকে। বাড়ির কথা মনে করে সে বড়ো কাঁদে। লালাজীরও মনে পড়ে যায় সব। ভাবে, শেকড়টা কই? দাদুভাই যে বলেছিল?

সে আজকাল বড়ো ব্যস্ত। তার ভাবনার সময় কই? ছাই ছাই পাথরের সাথে সে এগিয়ে চলে। অনেকদূর চলে চলে নদী যেন ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। এত্তো জলের ভার নিয়ে সে চলতে পারে না। ছাই ছাই পাথর বলে, এইবার নাকি নদীটা মরে যাবে। লালাজীর খারাপ লাগে। নদীটা বড্ড ভালো ছিল। নদীর মাছগুলোও চেনা হয়ে গেছিল। আশেপাশের গ্রামের ছেলেমেয়েগুলোর চোখগুলো যেন আঁকা, এই বড়ো বড়ো, কালো। টুপুস টাপুস বৃষ্টি হলে নদীটা যেন আরও সুন্দর দেখাত। নদী মরে গেলে সেই বা কোথায় যাবে? গাছদাদু বলেছিল, জলের সাথে সাথে যেতে। আজকাল মনে হয়, দাদু কিছু জানে না বাইরেটা। ওই তো সারাজীবন একটাই জায়গায় থেকে দাদু কি ঠিক জানত সব?

নদীর মাঝে মাঝেই চরা পড়েছে। সেই চরায় চেনা পাখিদের সাথে দেখা হয়ে গেল লালাজীর। তারা বলল, আর ক’শো মাইল পরেই নদী সাগরে পড়েছে। তাই নদীর এমন ক্লান্তি। এদিক ওদিক কথা বলে লালাজী জানতে পারল, সাগর নাকি বিশাল বড়ো। নোনা জল তার। সাগরের আগেই নাকি নদীতে বেশ ঘূর্ণি ওঠে, মাঝে মাঝেই। লালাজীর একটুও ইচ্ছে করল না সাগরে যেতে। একটু ভয়ও পেল। সে এখন আরও ছোট্ট হয়ে গেছে। আজকাল তার মনে হয়, কী হল এই জলের সাথে চলে চলে? আমার লক্ষ্য পেলাম কই? আর আমি চলেছিই বা কোথায়? কিন্তু ইচ্ছে করলেই কি আর হয়? জল যেখানে নিয়ে যাবে যেতে হবে।

একসময় ছাই ছাই পাথরের আর দেখা মিলল না। লালাজী একাই গিয়ে পড়ল মোহনায়। আর সেখান থেকে এক্কেবারে জলের তোড়ে সাগরে। সাগর! লালাজী অবাক হয়ে দেখতে লাগল, এই তবে সাগর! যেন শেষ নেই। কত যে মাছ, কত যে গাছ তার ইয়ত্তা নেই। আর কী সেই ঢেউ! লালাজী ভাবল, এই বুঝি শেষ। কিন্তু না। সাগরের বিশাল বিশাল ঢেউয়ের টানে লালাজী একদিন গিয়ে পড়ল তীরে। ছোট্ট টাপু তাকে কুড়িয়ে পেল। মা-বাবার কাছে বায়না করে তাকে নিয়ে চলল বাড়ি। লালাজী চলে এল কলকাতা। সেখানে টাপুর পড়ার ঘরের একটা কাঁচের বাটিতে তার জায়গা হল। অনেক রকম নুড়িপাথর সেখানে। লালাজী চোখ ভরে দেখে টাপুকে। ছোটো ছেলেমেয়ে সে খুব ভালোবাসে। টাপু খেলে, পড়ে। মাকে লুকিয়ে দুধ বাইরে ফেলে দেয়। সব দেখে সে। খুব খুশি হয় সে। এই তো চেয়েছিল সে। সারাজীবন খালি টাপুকে দেখে যাবে।

কিন্তু অনেক বছর পর যখন ঘরের সব দেখা হয়ে গেল, টাপু বড়ো হয়ে দূরে কোথায় চলে গেল। লালাজীও চোখ বন্ধ করল। দাদুগাছের সবকথা তার খুব মনে পড়ে আজকাল। এত বছর পর তার শেকড় খুঁজে পেল সে। তার নিজের মনের মধ্যে। সে আবার হুড়মুড় করে গিয়ে পড়ল, দাদুগাছের ছায়ায়। পাশ দিয়ে পাহাড়ি ঝর্ণার কুলকুল আওয়াজটাও স্পষ্ট শুনতে পেল।

“লালাজী, দিন কেমন দেখছ আজ?

“সবথেকে সুন্দর, দাদু। সবথেকে সুন্দর।”

ছবিঃ মৌসুমী

জয়ঢাকের গল্পঘর

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s