গল্প স্মৃতি ঋজু গাঙ্গুলি শরৎ ২০১৭

 ঋজু গাঙ্গুলী  র অন্যান্য লেখা

কাজিরাঙ্গা ন্যাশনাল পার্কের তোরণদ্বার কহোরায় এসে পৌঁছনোর পর থেকে সুরজিৎ যে গাড়িটার জন্য অপেক্ষা করছিল, অবশেষে সেটা বাংলোর সামনে এসে দাঁড়াল।

অসমের নামের সঙ্গে চা, কামাখ্যা, আর কাজিরাঙ্গা একেবারে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। কিন্তু ভিড় করা ট্যুরিস্ট, ফটোগ্রাফার বা ব্যবসায়ীদের নজরের বাইরে সবুজ আর নীলের আড়ালে এখনও কোথাও কোথাও লুকিয়ে আছে এক আদিম পৃথিবী। সুরজিতের এবারের অ্যাসাইনমেন্টটা তেমনই এক লুকিয়ে থাকা অজ্ঞাত জায়গার সঙ্গে জড়িত। তবে তার থেকেও ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হল, ও নিজে এই এলাকায় প্রতি দু’মাসে একবার করে এসেও এবং ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট ও ট্যুরিজমের বিভিন্ন লোকের সঙ্গে যথেষ্ট সদ্ভাব রেখেও যে জিনিসটা জানতে পারেনি, দিল্লিতে বসে ওর বিভাগের এক অফিসার বা সঠিকভাবে বলতে গেলে তাঁর বন্ধুস্থানীয় এক ব্যবসায়ী সেই খবরের সন্ধান পেয়েছেন! খবরটা অবশ্য এতই অবিশ্বাস্য যে সেটাকে কানাঘুষো বা গুজব বলাই যথাযথ। তবুও সেটার টানেই দিল্লি থেকে আসছেন ভদ্রলোক।

প্রথম যখন ব্রিফটা পেয়েছিল সুরজিৎ তখন ও হেসেই ফেলেছিল। ব্রিফে সংক্ষেপে অথচ স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল একটা অবিশ্বাস্য কথা। কার্বি-আংলং-এর পাহাড়ে অনেক অনেক গভীরে বাস করেন এক দেবতা। এই দেবতা সবরকম মনস্কামনা কিন্তু পূর্ণ করেন না। ইনি ফিরিয়ে দেন হারানো স্মৃতি।

“আপনি এটা পড়েছেন স্যার?” হেসে হেসেই বলেছিল সুরজিৎ, “আজকের যুগে এসব জিনিস কেউ মানে?”

কিন্তু তারপর ওর বসের গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে ও বুঝতে পেরেছিল, আর কেউ না নিলেও দিল্লির কোনও অফিসার এবং তাঁর ব্যবসায়ী বন্ধু ব্যাপারটাকে খুব সিরিয়াসলি নিয়েছেন। চুপচাপ ব্রিফটা পড়ে ফেলেছিল সুরজিৎ। আর সেটা পড়ার পর থেকেই ওর মধ্যে একটা অস্বস্তির ভাব দানা বেঁধেছিল।

যে বিশেষ জায়গাটায় ওকে যেতে হবে সেই ব্যবসায়ীর সঙ্গে, সেটা একটা গুহা। গুহার ভেতরে ঠিক কী আছে সেটার কোনও স্পষ্ট উত্তর না পেলেও স্থানীয় এক অতি প্রবীণ বাসিন্দার থেকে এটুকু জেনেছিল সুরজিৎ, যে সেই গুহার ভেতরে অনেক অনেক গভীর অবধি চলে যাওয়া একটা গর্তের নিচে একটা পাথরের মধ্যে বাস করেন দেবতা। তাঁর আলাদা করে কোনও নৈবেদ্য প্রয়োজন হয় না। গুহার ভেতরেও তাই কোনও পুরোহিত বা ধর্মগুরু নেই। ভক্তকে শুধু পাথরটা স্পর্শ করতে হয়।

“তারপর?” রুদ্ধশ্বাস কন্ঠে জিজ্ঞেস করেছিল সুরজিৎ।

স্পষ্ট করে কিছু বলেনি কেউ। তবে এটা বোঝা গেছিল যে এমন শক্তিশালী দেবতার সান্নিধ্যও স্থানীয় মানুষজনের বিশেষ কাঙ্ক্ষিত নয়। কারণ, গুহাটার অবস্থান চিহ্নিত করতে পারে ও সেখানে ওদের নিয়ে যেতে পারে এমন একজন কার্বিকে খুঁজে বের করতেই ওর দম বেরিয়ে গেছিল। কেন লোকে সেই গুহায় যেতে চায় না সেটা অবশ্য তার কাছ থেকেও সুরজিৎ জানতে পারেনি।

স্মৃতিভ্রম সারানোর এমন একটা অব্যর্থ উপায় কেন আরও বেশি প্রচার পায়নি বা এটাকে নিয়ে একটা জম্পেশ ব্যবসা না ফেঁদে কেন ব্যাপারটা এত গোপন রাখা হয়েছে, সেটাই ভাবছিল সুরজিৎ। ওর মনে এই ধারণাটাই জমাট বাঁধছিল যে এগুলো শুধুই কথার কথা।

গাড়িটা ইন্সপেকশন বাংলোর গেটের সামনে এসে দাঁড়ানো মাত্র একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুরজিৎ ভাবল, কালো মেঘে ঢাকা আকাশের নিচে দ্রুত আলো কমে আসার সময় জঙ্গল সম্বন্ধে অনভিজ্ঞ কাউকে নিয়ে এই ঘোর বর্ষাকালে ট্যুরিস্ট কমপ্লেক্সের বাইরে বেরোনোটা মোটেই যুক্তিযুক্ত নয়। কিন্তু ‘কর্তার ইচ্ছায় কর্ম’ কথাটা শুধু বাংলা ব্যাকরণে নয়, তার বাইরের জগতেও খাটে। ও মনে মনে তৈরি হল আগামী কয়েক ঘন্টার কার্যক্রমের জন্য।

শেহজাদ, অর্থাৎ যে ব্যবসায়ীটি নিজের স্মৃতি পুনরুদ্ধারের শেষ চেষ্টা হিসেবে এই দেবতার স্মরণ নিয়েছেন এবং তাঁর দুই সঙ্গীর জন্য চা-জলখাবারের ব্যবস্থা করা, অনিচ্ছুক স্থানীয় প্রবীণ মানুষটিকে আরও এক রাউন্ড নরম-গরম কথা শুনিয়ে সেই গুহায় যাওয়ার জন্য শেষ অবধি রাজি করানো, এসব করতে পাঁচটা বাজল। সব মিটিয়ে ওদের দলটা যখন চেকপোস্ট পেরিয়ে রবার প্ল্যানটেশনের পাশ দিয়ে জঙ্গলের দিকে এগোল, ততক্ষণে ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে গেছে চারপাশ। বাতাসের ভেজা ভাবটাও গাঢ়তর হয়ে বৃষ্টির দিকে বাঁক নিচ্ছে। পচা পাতা, শেওলা ধরা পাথর, আর গাছের মরা ডালে লুকোনো একটা পথ ধরে সাবধানে উঠতে উঠতে সুরজিৎ কিছুক্ষণ আগে শোনা কথাগুলো ভাবছিল।

চা দেওয়ার সময় সুরজিৎ নিজেকে সামলাতে পারেনি। ব্যবসায়ীর এক সঙ্গীকে জিজ্ঞেস করেই ফেলেছিল, “এত বড়ো ব্যবসায়ীকে নিয়ে এমন একটা জায়গায় এলেন কেন আপনারা? আর কোনও চিকিৎসায় কি কোনও ফল হচ্ছে না?”

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভদ্রলোক বলেছিলেন, “খুব একটা প্রচার না করে যতটা করা সম্ভব ততটা চিকিৎসা হয়েছে। কিন্তু তাতে কোনও ফল হয়নি। ওঁর চিন্তাভাবনাগুলো ঘোলাটেই থেকে গেছে। ক’দিনের মধ্যেই আমাদের কোম্পানির একটা বোর্ড মিটিং আছে। তার আগে…”

“তার আগে?” জানতে চেয়েছিল সুরজিৎ।

“আপনি কর্পোরেট জগতের ব্যাপারটা বোধহয় জানেন না সুরজিৎ,” ক্লিষ্ট হাসি ঠোঁটের কোণে ফুটিয়ে বলেছিলেন ভদ্রলোক, “স্যারের স্মৃতিলোপ পেয়েছে এটা জানলে মিটিং অবধি অপেক্ষা করতে হবে না। তার অনেক আগেই শেয়ার বাজারে আমাদের গ্রুপের সবক’টা স্টক ধ্বসে যাবে। সঙ্গে যাব আমরা সব্বাই।

“স্যারের মেয়ে এদেশের সবচেয়ে নামকরা অ্যানথ্রপলজিস্টদের অন্যতম। তিনি নিজে এই অঞ্চলের প্রবাদ ও কিংবদন্তী নিয়ে কাজ করতে গিয়ে এই দেবতার সন্ধান পেয়েছিলেন। বাবার এই অবস্থায় তাঁর হঠাৎ মনে পড়ে কথাটা। আপনাদের বিভাগের এক বড়োকর্তা সরকারি চাকরিতে ঢোকার আগে আমাদের সংস্থাতেই কাজ করতেন। তাঁর সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকায় কিছু খোঁজখবর করে জানা যায়, হ্যাঁ, দেবতা এখনও আছেন তাঁর অলৌকিক ক্ষমতা নিয়ে। আর সেজন্যই আমাদের এখানে আসা, স্রেফ আপনাদের কয়েকজন বাদে আর কাউকে কিচ্ছু না জানিয়ে। এবার বাকিটা দেবতার কৃপা।”

বৃষ্টিটা শুরু হল কিছুক্ষণের মধ্যেই। ছাতা সামলে, গাছের ডাল সপাং করে মুখের ওপর যাতে এসে না পড়ে সে ব্যাপারে যথাসাধ্য সতর্ক থেকে এবং ঢাল বেয়ে ওঠার সময় যাতে পাথরের ফাঁক দিয়ে নেমে আসা জলের স্রোত আর কাদায় পা না পিছলে যায় সেসব মাথায় রেখে চলছিল ওরা। নীরব প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে থাকা একঝাঁক গাছে ভরা সেক্রেড গ্রোভ পেছনে ফেলে ওরা উঠে নেমে ঢুকে যাচ্ছিল পাহাড় আর জঙ্গলের একটা নজর এড়িয়ে যাওয়া ভাঁজে। অন্ধকারে চোখটা সয়ে এলেও ওরা কেউই টর্চ নেভাচ্ছিল না। কারণ, বর্ষার জঙ্গলে সাপ থেকে শুরু করে সব প্রাণীকে দূরে রাখার জন্য আলো আর শব্দই সেরা উপায়।

বেশ কিছুক্ষণ পরে পাহাড়ের গায়ে এমন একটা ফাঁক সুরজিতের চোখের সামনে ভেসে উঠল যেটার ভেতরে টর্চের আলোটা স্রেফ হারিয়ে গেল। আশেপাশে তাকিয়েই সুরজিৎ বুঝল, মন্দির তো দূরের কথা, আর পাঁচটা গুহার সঙ্গেও এর কোনও সাদৃশ্য নেই। ফাঁকটা গোলাকার। এমন আশ্চর্যরকম সুষম জ্যামিতিক আকার প্রাকৃতিক গুহায় হওয়া অসম্ভব।

টর্চের তীব্র নীলচে সাদা আলোয় চারপাশটা দেখে নিচ্ছিল ওরা সবাই।

শারীরিক কষ্টটা মুখে না ফুটিয়ে সবার সঙ্গেই হেঁটে এসেছিলেন শেহজাদ। গুহার সামনে পৌঁছে তিনি আবার বোবা দৃষ্টিতে সামনে তাকিয়ে রইলেন রেইনকোট বেয়ে নামা জলের স্রোত, আশেপাশে বৃষ্টিভেজা জঙ্গলের নিজস্ব শব্দ আর গুহাটাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে।

স্থানীয় মানুষটির দিকে তাকাল সুরজিৎ। সামনের দিকে টর্চটা ঝাঁকিয়ে গুহাটা দেখিয়ে, আর নিজের দিকে আঙুল তুলে সজোরে মাথা নেড়ে সে হনহনিয়ে পেছনে হেঁটে জঙ্গলের মধ্যে হারিয়ে গেল।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল সুরজিৎ। স্থানীয় কার্বিটি যে ওদের গুহার কাছে পৌঁছেই দিয়ে ফিরে যাবে সেটা আগেই ঠিক হয়ে গেছিল। কেন সে গুহার ভেতরে ঢুকবে না, এ প্রশ্নের উত্তরে সে ভেঙে কিছু বলতে না চাইলেও এটুকু সুরজিৎ বুঝেছিল যে লোকটি কোনও কারণে গুহার দেবতাকে ভয় পায়। নিজের অস্বস্তিটা যথাসাধ্য চাপা দিয়ে, নিজের টর্চটা সামনে ধরে, সাবধানে পা ফেলে গুহায় ঢুকল সুরজিৎ। ওর পেছনেই এলেন শেহজাদ ও তাঁর দুই সঙ্গী।

টর্চের আলোয় আশেপাশের দেওয়ালটা প্রায় ঝলমলিয়ে উঠতে দেখে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল সুরজিৎ। কারণ, অসমের পাহাড়ের কোনও গুহায় এমন জিনিস এর আগে ও দেখেনি। ও বুঝতে পারল, গুহার দেওয়াল, ছাদ, মায় মেঝে এতটাই মসৃণ, যা শুধু দেবতার দর্শনার্থীদের পায়ের বা হাতের ছোঁয়ায় হওয়া অসম্ভব।

আরও একটা জিনিস বুঝতে পারল সুরজিৎ। গুহাটা বাঁক নিয়ে অনেক নিচে নেমে গেছে ঠিকই, কিন্তু যত গভীরেই হোক না কেন একটা গম্ভীর কাঁপুনি উঠে আসছে গুহার নিচ থেকে। যেমনটা হয় কোনও শক্তিশালী মোটর চলতে থাকলে।

ঠিক কতক্ষণ ধরে ওরা চারজন নিচে নেমেছিল, তা খেয়াল নেই সুরজিতের। কয়েক মিনিট হতে পারে, কয়েক ঘন্টাও হতে পারে। গুহাটা প্রথমে যত বড়ো ছিল, পরে কিন্তু আর তা থাকেনি। নিরেট পাথরের মধ্য দিয়ে কিছুটা সর্পিল, কিছুটা সরলরৈখিক এবং ক্রমেই ছোটো হতে থাকা একটা সুড়ঙ্গের শেষে পৌঁছয় ওরা। এখানেও কোনও বড়ো ঘর বা গুহা নেই। বরং মনে হয় যেন একটা বিপুল বিস্ফোরণে পাহাড়ের মধ্যে একটা ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়েছে। আর, ওদের ঠিক সামনেই রয়েছে একটা পাথর বা শক্ত কালো কাচের তৈরি একটা পাথুরে জিনিস। সেটার কিছুটা অংশ পাহাড়ের মধ্যেই ঢুকে আছে।

কিন্তু জিনিসটার যে অংশটুকু দেখা যাচ্ছে তার মতো কিছু কখনও দেখেনি সুরজিৎ। মানুষের দৈর্ঘ্যের তুলনায় কিছুটা কম, মসৃণ এবং প্রায় ডিমের মতো চেহারার জিনিসটার যেটুকু দেখা যাচ্ছে সেটুকু কালো অস্বচ্ছ কাচ বা সেরকমই কিছু দিয়ে তৈরি। তার তলায় পাক খাচ্ছে কুয়াশার মতো কিছু, যার ভেতরে জ্বলছে নিভছে নানারঙের মৃদু আলো।

এই কি তাহলে সেই দেবতা, যিনি স্মৃতি ফিরিয়ে দেন?

সুরজিতের মনে পড়ে কার্বিটির বলে দেওয়া কথাগুলো। যাঁর স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে হবে, তাঁকে দেবতাকে স্পর্শ করে থাকতে হবে। ওর ইশারায় শেহজাদের দুই সঙ্গী সন্তর্পণে শেহজাদকে এগিয়ে আসতে সাহায্য করে, যাতে তিনি অদ্ভুত জিনিসটাকে হাতের নাগালে পান। নিজের কাঁপতে থাকা হাতদুটো কালো কাচের মতো মসৃণ তলটার ওপর রেখে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়েন শেহজাদ। তাঁর শরীরটা থরথরিয়ে কেঁপে ওঠে।

ঝিকমিকে কুয়াশার ঘূর্ণন বেড়ে ওঠে। সুরজিৎ বুঝতে পারে, মেশিন চলার মতো গম্ভীর যে শব্দটা ওরা গুহায় ঢুকে নেমে আসার সময় পাচ্ছিল সেটার উৎস ওই জিনিসটাই। কারণ, কুয়াশার ঘূর্ণির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সেই আওয়াজের দাপট ক্রমেই বেড়ে উঠছিল গোটা সুড়ঙ্গ জুড়ে। শেহজাদের মুখের দিকে তাকিয়ে আঁতকে ওঠে সুরজিৎ। সে মুখ ফ্যাকাশে, বিন্দু বিন্দু ঘামে ভরা এবং থরথর কাঁপুনিতে প্রায় বেঁকে গেছে! শেহজাদকে অবশ্যম্ভাবী হার্ট অ্যাটাক থেকে বাঁচানোর জন্য দূরে সরিয়ে আনার কথা ভাবলেও সুরজিৎ বোঝে, অন্য দু’জন সেটা হতে দেবে না। তাই কিছুটা হাল ছেড়ে দিয়েই ও অপেক্ষা করে এরপর কী ঘটে তা দেখার জন্য।

ধীরে ধীরে ডিম্বাকৃতি জিনিসটার মধ্যে কুয়াশা আবার স্থির হয়ে যায়। আলোগুলো স্তিমিত হয়ে যায়। সোজা হয়ে দাঁড়াতে গিয়ে পড়ে যাচ্ছিলেন শেহজাদ। পরম যত্নে তাঁকে ধরে মাটিতেই বসিয়ে দেয় তাঁর এক সঙ্গী। সুরজিতের দিকে তাকান শেহজাদ। ধকলে ভেঙে যাওয়া মুখের মধ্যেও জ্বলজ্বল করে ওঠা সেই বুদ্ধিদীপ্ত চোখজোড়ার দিকে তাকিয়েই সুরজিৎ বুঝতে পারে, দেবতা তাঁর অলৌকিক শক্তিতে ফিরিয়ে দিয়েছেন শেহজাদের স্মৃতি। এর মধ্যে সুরজিতের নজর পড়ে পাথরে গেঁথে যাওয়া জিনিসটার দিকে। ও দেখতে পায়, নিস্তেজ ভঙ্গিতে ঘুরপাক খাচ্ছে রঙিন কুয়াশা। কেন যেন, ওর খুব মন খারাপ হয়।

শেহজাদ ওকে জড়িয়ে ধরে ধন্যবাদ দিয়েছিলেন। তাঁর দুই সঙ্গীও ওকে কীভাবে ধন্যবাদ দেবে বা পুরস্কৃত করবে, তা বোধহয় ভেবে পাচ্ছিল না। স্রেফ দায়সারা ‘হুঁ, হ্যাঁ’ দিয়ে কাজ চালাচ্ছিল সুরজিৎ। ও শুধু শেহজাদকে জিজ্ঞেস করতে চাইছিল, ঠিক কীভাবে ফিরে এল তাঁর স্মৃতি।

সুড়ঙ্গ দিয়ে ওপরে উঠতে কতক্ষণ লেগেছিল তা খেয়াল করেনি সুরজিৎ। বৃষ্টির মধ্যেই ওরা ফিরে এসেছিল ইন্সপেকশন বাংলোয়। সেখান থেকে গাড়ি শেহজাদ ও তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে রওনা দেবে যোরহাট, আর সেখান থেকে ভারতীয় বায়ুসেনার বিশেষ অনুমতিক্রমে চার্টার্ড ফ্লাইটে তাঁরা চলে যাবেন দিল্লি।

বাংলোয় যখন হুড়মুড়িয়ে রান্না চাপানো হয়েছে, শেহজাদ নিজেই সুরজিতের অনুচ্চারিত প্রশ্নটার উত্তর দিলেন।

“ওই কাচ বা পাথরের মতো জিনিসে হাত দেওয়ার পর আমার ঠিক কী হয়েছিল জানি না, তবে বন্ধ চোখের সামনেও আমি যেন বেশ কয়েকটা আলোর বিন্দু দেখেছিলাম। তারপর যা হয়েছিল তাকে একটা ঝড়ের সঙ্গেই তুলনা করা যায়! আমার মাথায় এখনও পর্যন্ত যত স্মৃতি ছিল, যার মধ্যে এমন অনেককিছু আছে যাদের অস্তিত্ব সম্বন্ধেই আমার ধারণা ছিল না, তার সবক’টা চোখের সামনে ফুটে উঠল এক এক করে।

“আমার গোটা জীবনের স্মৃতি আমাকে আবার দেখতে শুনতে বুঝতে হলে এমনিতে অনেক সময় লাগার কথা। কিন্তু মনে হচ্ছিল, যেন মাথার ক্ষমতা বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়ে কেউ সব স্মৃতিকে তুলে ধরছে আমার সামনে। মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছিল, বুকের ভেতরে হৃদপিণ্ড এত জোরে আওয়াজ তুলছিল যে মনে হচ্ছিল, আমার মস্তিষ্ক বা হার্ট জবাব দেওয়ার আগে বোধহয় কানের পর্দাই ফেটে যাবে।

“এভাবে কতক্ষণ ছিলাম জানি না, তবে একটু একটু করে মনে হল, বন্ধ চোখ আর মনের সামনে চলতে থাকা ক্যামেরার রোলটার গতি যেন কমে এল, আর তারপর একসময় বন্ধ হয়ে গেল। চোখ খুলে বুঝতে পারলাম, আমি কোথায়। এও বুঝলাম, আমি সব সঅঅব মনে করতে পারছি!”

চুপ করে থাকেন শেহজাদ।

ওঁদের পুরো দলটা চলে গেলে সুরজিৎ ঘড়ি দেখে বুঝেছিল, সেই রাতে বেরোতে চাইলে বাংলোর কেয়ারটেকার ওকে বোধহয় বেঁধে রাখবে। কিন্তু ও ঠিক করেই ফেলেছিল, সুযোগ পাওয়ামাত্র ও যাবে ওই গুহায়, দেবতার কাছে।

সেইমতো পরদিন ভোরে আকাশের গায়ে লেগে থাকা পোঁচ পোঁচ কালি একটু ফিকে হয়ে আসামাত্র টর্চ আর লাঠি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল ও। জঙ্গলে ভোর হয় তাড়াতাড়ি। তাই চেকপোস্ট পেরোনোর সময়ে ওকে বিশেষ কৈফিয়ৎ দিতেও হয়নি। আলো বেড়ে ওঠা এবং বৃষ্টি না হওয়ার ফলে সুড়ঙ্গের কাছে পৌঁছতে বিশেষ সময় লাগল না ওর। সুড়ঙ্গে ঢুকে পড়ল সুরজিৎ।

আবার সেই টর্চের আলোয় ঝকমকিয়ে ওঠা দেওয়াল দু’পাশে রেখে, ক্রমশ সংকীর্ণ হয়ে আসা পথ বেয়ে হনহনিয়ে হেঁটে ও পৌঁছে গেল ডিম্বাকৃতি জিনিসটার দিকে। চুপচাপ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে নিজের বাড়ি, মা, বোন, এমনকি অফিসের স্নেহপ্রবণ কিন্তু রাগি বসের মুখটাও মনে করে একটা বড়ো শ্বাস নিয়ে কাচের ওপর হাত দিয়ে সামনে ঝুঁকে দাঁড়াল সুরজিৎ।

মুহূর্তের মধ্যে সুরজিতের বন্ধ চোখের সামনে তৈরি হল কয়েকটা আলোর বিন্দু। প্রস্তুত ছিল সুরজিৎ, তাই বিন্দুগুলোকে মনে মনেই গুনে নিতে পারল ও। দুই, তিন, পাঁচ, সাত…

প্রায় রিফ্লেক্সের বশে সুরজিৎ ভেবে নিয়েছিল ‘নয়’, কিন্তু নিজের মনের ঘোড়ার লাগামে একটা মস্ত টান দিয়ে তাকে থামাল ও। মনে মনে ও পরপর আলোর বিন্দু দিয়ে একটা সংখ্যা তৈরি করতে চাইল।

এগারো!

দ্রুতগতিতে, হয়তো বা সেকেন্ডের ভগ্নাংশে, ওর বন্ধ চোখের সামনে সারি বেঁধে দাঁড়াল তেরোটা আলোর বিন্দু। সুরজিৎ বুঝতে পারল, ওর ভাবনাটা সঠিক পথে চলেছে এবং এখন ওকে শূন্যস্থান পূর্ণ করতে বলা হচ্ছে। ও এও বুঝতে পারল, কাচ বা পাথরের ওপার থেকে এই সংকেত যে ওর মগজে পাঠাচ্ছে, সেও যেন দম আটকে অপেক্ষা করছে ওর উত্তরের জন্য। ধীরে, নিজের ধুকপুক করতে থাকা বুকের শব্দকে পাত্তা না দিয়ে ও আলোর পর আলো বসিয়ে তৈরি করতে চাইল একঝাঁক সংখ্যা।

সতেরো, উনিশ, তেইশ, উনত্রিশ, একত্রিশ…

আলো জুড়ে সংখ্যা বানাতে গিয়ে সুরজিতের সব গুলিয়েই যেত। কিন্তু ও আসলে একটাই বিন্দুকে বারবার করে বসাচ্ছিল মনের মধ্যে একটা পর্দার বুকে, যতক্ষণ না উদ্দিষ্ট সংখ্যাটা বোঝানো যায়। ‘একত্রিশ’ সংখ্যাটা তৈরি হওয়ামাত্র সংখ্যায় নয়, বরং এক বিচিত্র নকশার মতো করে সুরজিতের মনে ভেসে এল একটা কথা, “তুমি কে?”

বিস্ময়ে নিজের অজান্তেই চোখ খুলে ফেলেছিল প্রায় সুরজিৎ। কিন্তু অতি কষ্টে নিজেকে সংযত রেখে ও নিজের নাম বলল। উত্তরে কোনও প্রতিক্রিয়া বা প্রশ্ন ভেসে না আসায় ওর খেয়াল হল, শুধু নামের তো কোনও অর্থ নেই! হুড়মুড়িয়ে নিজের বিস্তৃততর পরিচয় দিতে শুরু করল ও – বাঙালি, ভারতীয়, এশিয়ান।

একটু ভেবে ও নিজের ব্যাপকতম পরিচয়টাই দিল – মানুষ, পার্থিব।

এবার যে আলোর সংকেতগুলো ওর মনে ভেঙেচুরে ভেসে এল সেগুলো স্পষ্টতই হাসির, তবে দুঃখমেশা হাসির।

“আমি এই জায়গায় রয়েছি যতদিন ধরে তাতে এই পরিচয়গুলোর কোনও মানে নেই। তবে তোমার আগেও আরও অনেকে আমার কাছে এসেছে। আমি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছি, খুঁজে বের করতে চেয়েছি তাদের পরিচয়। কিন্তু তুমি যা বলছ সেই কথাই তাদের কাছ থেকেও শুনেছি। তাদের অজস্র স্মৃতি আমি বিশ্লেষণ করেছি। তাদের ভালোমন্দ যাবতীয় কাজ ও তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অনুভূতি আমার মধ্য দিয়ে বাহিত হয়েছে। কিন্তু যা খুঁজছি আমি, তা তো কোথাও পাইনি!”

আর থাকতে না পেরে প্রশ্নগুলো করেই ফেলল সুরজিৎ, “কে তুমি? কী খুঁজছ তুমি?”

“আমার পরিচয় দেওয়ার জন্য তোমার কাছ থেকে একটা শব্দ ধার নিতেই হচ্ছে। আমি হলাম স্কাউট নম্বর ৮৯৪৪৬৭। মহাবিশ্বের বিভিন্ন কোণে প্রাণের অস্তিত্বের সন্ধানে আমারই মতো অনেক স্কাউটকে পাঠানো হয়েছিল অনেক-অনেকদিন আগে।”

“কোত্থেকে?” প্রশ্নদুটো সুরজিতের মন থেকে প্রায় ছিটকে বেরিয়ে আসে।

উত্তরে সুরজিতের বন্ধ চোখের সামনে একটা বিরাট আলোর বল প্রথমে তৈরি হয়। তারপর তা ভেঙে যেতে থাকে দ্রুত, অতি দ্রুত। ছোটো থেকে আরও ছোটো হয়ে ইতস্তত ছড়িয়ে যেতে থাকে আলোর দানাগুলো, আর ততই নিকষ কালো হয়ে ওঠে তাদের পেছনে মখমলের মতো ছড়িয়ে থাকা অন্ধকারটা।

সুরজিৎ বুঝতে পারে, ও মনের চোখ দিয়ে মহাকাশের বুকে ছড়ানো একটা বিরাট নক্ষত্রমণ্ডলী দেখতে পাচ্ছে! পায়ের নিচে অল্প কাঁপতে থাকা পাথরের অস্তিত্ব সুরজিৎকে বুঝিয়ে দিচ্ছিল ও কোথায় আছে। কিন্তু মনের চোখে ফুটে ওঠা এই আশ্চর্য প্রতিচ্ছবি থেকে ওর মনে হচ্ছিল, যেন এক অজানা আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে ও।

নিজের স্মৃতি হাতড়ে ও বোঝার চেষ্টা করে নিজের চেনাজানা রাতের আকাশে ও এমন কোনও নক্ষত্রমণ্ডলী দেখেছে কি না। কিন্তু তেমন কিছু খুঁজে পায় না। কালো আকাশের বুকে ফুটে থাকা অসংখ্য আলোকবিন্দুর মধ্যে বিশেষ একটা বিন্দু এবার বড়ো হতে থাকে ওর সামনে। সামনে থাকে একটা মাত্র গোলাকার গ্রহ, যার সর্বাঙ্গ জুড়ে ধোঁয়ার পুরু আস্তরণ। তার নিচে নামতে থাকে সুরজিৎ এবং ও দেখতে পায়…

যতদূর চোখ যায়, ওর সামনে শুধু আলো।

আলো সম্বন্ধে বলা হয়, তাকে নাকি দেখা যায় না। বরং যাকে সে আলোকিত করে সেই দৃশ্যমান হয়। কিন্তু এখানে ওর পায়ের নিচে মাটি, দূরে জল, আশেপাশে আকাশ, এইসব জুড়ে ওর চোখের সামনে রয়েছে শুধু নানা আকারের আলো। তারা কেউ স্থির, কেউ সচল, কেউ প্রবল বেগে ধাবমান। সুরজিতের মনের মধ্যে ভেসে আসে কথাগুলো, “যা দেখছ, সেটাই আমার গ্রহ। শরীর আর যন্ত্রের ভেদরেখা অনেক আগেই ভেঙে ফেলেছিলেন আমার স্রষ্টারা। তারপর তাঁরা নিজেদের আর কোনও আকারেই রাখতে চাননি। শুধু শক্তি হিসেবে, যাকে তুমি আলো বলে ভাবছ, রয়ে গেছে তাঁদের রসবোধ, ইচ্ছে, আর কৌতূহল। জান নিশ্চয়ই, যেকোনও বুদ্ধিমান প্রাণী অন্যের থেকে আলাদা হয় স্রেফ এই তিনটে জিনিস দিয়েই?”

সুরজিতের মনের মধ্যে আজন্মলালিত ভাবনাগুলো প্রতিবাদ জানায়, “তাহলে ভাষা, সংস্কৃতি, বা…” একটু থমকে ও বলে, “ধর্মর সঙ্গে বুদ্ধিমত্তার কোনও সম্পর্ক নেই, একথাই বলতে চাও?”

“বলতে চাই নয়,” আওয়াজটা ওর মনে এবার যেন গমগমিয়ে ওঠে, “এটা প্রমাণিত সত্য। অসংখ্য গ্রহে প্রথমে গড়ে ওঠা ও পরে ধ্বংস হওয়া বা টিকে যাওয়া সভ্যতাকে খুঁটিয়ে দেখে এটাই জানা গেছে।”

প্রশ্নটা অনেকক্ষণ ধরেই মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। সুযোগ পেয়ে সেটা এবার সুরজিৎ করেই ফেলে, “তোমায় দেখতে কেমন?”

“তুমি তো আমায় দেখতে পাচ্ছ।”

চমকে উঠে চোখ খোলে সুরজিৎ। ও বুঝতে পারে, প্রায়ান্ধকার সুড়ঙ্গের দেওয়াল থেকে প্রতিফলিত আলো ছাড়াও গুহার ভেতরটা স্পষ্ট হয়ে আছে কাচের মতো মসৃণ তলটার পেছনে দ্যূতিময় হয়ে ওঠা রঙিন কুয়াশার আলোয়। ওর মাথায় আবার একঝাঁক আলো দপদপিয়ে ওঠে, “এই তো আমি। আমার মতো স্কাউটদের তৈরি করা হয়েছে তরল হিলিয়ামকে প্লাজমা তথা আয়ন বানিয়ে। মহাকাশের তাপমাত্রা, যাকে তোমরা পরম শূন্য বা অ্যাবসলিউট জিরো বলে থাক, তা সেন্টিগ্রেড স্কেলে শূন্যের থেকে অনেক অনেক নিচে। সেই তাপমাত্রায় একমাত্র হিলিয়াম তরল থাকতে পারে। ওই অবস্থায় হিলিয়াম সুপার-কন্ডাক্টর হয়ে যায়, অর্থাৎ তার মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হলে কোনওরকম লয়-ক্ষয় না হয়ে তা বয়ে চলতে পারে অনেক-অনেকদিন ধরে।

“আমাদের তৈরি করার সময় আমাদের ভেতরে তথ্য সংগ্রহ করার, তা বিশ্লেষণ করার, আর সময় হলে তা মূল গ্রহে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য দরকারি সব তথ্য ভরে দেওয়া হয়। শুধু আমাদের ভরে রাখা হয় একটা দুর্দান্তরকম টেকসই চেম্বারে, যেটা আবার বসানো হয় একটা মহাকাশযানে।

“তুমি যে হিসেবে সময় গোনো সেই হিসেবে আমার বয়স বোঝাতে গেলে ঝামেলা হবে। তাই শুধু এটুকু বলি, আমি অনেকদিন ধরে মহাকাশে ঘুরেছি, আর অনেক কিছু দেখেছি জেনেছি। কিন্তু ফেরার পথে…”

“কী হয়েছিল ফেরার পথে?” সুরজিৎ জানতে চায়।

“তোমার ভাষায় আমি একটা প্রবাদ পাচ্ছি, ‘রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়’। তুমি কি কথাটা মান?”

একটু অবাক হয়ে গেলেও উত্তর দিয়ে সুরজিতের দ্বিধা হয় না, “মানি। আমি নিজের জীবনে এর ভুরি ভুরি দৃষ্টান্ত দেখেছি।”

“আমার সঙ্গেও এমনটাই হয়েছিল।”

আলোর সংকেতেও যে গভীর হতাশা আর দুঃখ মিশিয়ে দেওয়া যায়, এটা এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে না গেলে সুরজিৎ জানতেও পারত না।

“দুটো বিরাট গ্রহের মহাকর্ষের টানাটানির ফলে আমি আমার নির্ধারিত পথ থেকে ছিটকে যাই। তারপর নিজের বেগ ফিরে পাবার চেষ্টা করতে গিয়ে আমি একটা গ্রহের খুব কাছে গিয়ে পড়ি, আর তার টানে আটকা পড়ি। ইতিমধ্যে আমার যান অচল হয়ে পড়ছিল। তাই নামতে গিয়ে আমি একটা পাহাড়ের বুকে আছড়ে পড়ি। যদি নিজের এই চেম্বারটাকে বাঁচাতে না পারতাম, তাহলে বিস্ফোরণে বাকি যানের সঙ্গে আমিও নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতাম। কিন্তু যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বলে আমি ঠিক কোন পথে যাচ্ছিলাম এবং কোথায় এসে পড়েছি, তা আমার জানা নেই।”

চোখ বন্ধ থাকলে চোয়াল ঝুলে পড়ে না। কিন্তু এই সংকেতবাহী আলোর খেলা সাময়িকভাবে থামলে নিজের ভাবনাগুলো গুছিয়ে নিতে সুরজিৎকে রীতিমতো কসরৎ করতে হয়।

“তার মানে কোন পথ ধরে তুমি যাচ্ছিলে, সেটাই তুমি ভুলে গেছ?”

আলোর সংকেতে এবার অসহায়তার সঙ্গে লজ্জাও যেন মিশে থাকে, “এটাকে ভুলে যাওয়া বলে না। অ্যাক্সিডেন্টের ফল মাত্র এটা।”

মৃদু হাসে সুরজিৎ। তারপর বলে, “তাহলে তোমার কী চাই?”

“আমি কোথায় আছি সেটা বোঝা দরকার। আমার যান না থাকলেও আমার অবস্থানটা জানলে আমি এতদিন অবধি যা জেনেছি তার সবটুকুকে আলোর মাধ্যমে আমি ছুঁড়ে দিতে পারব আমার গ্রহের উদ্দেশে।”

“আর তুমি?” সুরজিতের বুকের মধ্যে একটা খালি ভাব তৈরি হয় নিজের অজান্তেই।

খুব অবাক হওয়ার মতো করে এবার সংকেত আসে, “আমি? আমার কাজ তো তখনই শেষ হবে। তারপর তো আমার আর থাকার দরকার নেই।”

এই অদ্ভুত মহাজাগতিক স্কাউটকে জীবন বা মৃত্যুর ধারণা বোঝানো সহজসাধ্য হবে না, একথা বুঝতে পারে সুরজিৎ। ঘুরপাক খেতে থাকা ওই কুয়াশার জন্য ওর মনটা আবার বড্ড খারাপ হয়ে যায়। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ও জিজ্ঞেস করে, “তুমি কোথায় আছ সেটা বোঝার মতো স্মৃতি আমাদের কারও মাথা থেকেই পাওনি তুমি?”

“নাহ্‌,” আলোর সংকেতেও হতাশা জোরালো হয়ে ওঠে, “আজ অবধি যতজন আমার কাছে এসেছে, তাদের মধ্যে অন্তত একজনও যদি মহাকাশচারী হত তাহলেও আমি বুঝে নিতে পারতাম সব, কিন্তু এভাবে…”

হঠাৎ করে সুরজিতের মনে পড়ে যায় একটা কথা। ছোটোবেলা থেকে ও অন্য অনেককিছুর মতো মহাকাশ নিয়েও প্রচুর বই পড়েছে। আর ছোটোবেলায় ও যেখানে থাকত, সেই উত্তরবাংলার পরিষ্কার রাতের আকাশে তারা দেখা ওর সবচেয়ে পছন্দের শখ ছিল। চোখ বন্ধ করে সুরজিৎ মনে করতে চেষ্টা করে, ছোটোবেলা থেকে উত্তরবাংলা, আর বড়ো হয়ে অসমের আকাশে কী কী নক্ষত্রমণ্ডলী ও দেখেছে। তারই সঙ্গে ও মনে করার চেষ্টা করে সূর্য আর চাঁদের উঠে আসা ও নেমে যাওয়া।

সদ্য দেখা গ্র্যাভিটি, ইন্টারস্টেলার, আর এমনই কয়েকটা সিনেমার সুবাদে পৃথিবীর বাইরে মহাকাশের যে ছবিটা ওর কল্পনায় আনাগোনা করে সুযোগ পেলেই, সেগুলোকেও ও প্রাণপণে ভাবার চেষ্টা করে।

হাতের তেলো ঘেমে ওঠে সুরজিতের। ওর মনে হয় যেন একমুহূর্তে ও ছিটকে গেছে অসমের এই পাহাড় আর জঙ্গল থেকে অনেক অনেক ওপরে, যেখানে ওর পায়ের নিচে রাজকীয় ভঙ্গিতে ঘুরপাক খাচ্ছে পৃথিবী। আর দূরে, অনেক দূরে, আকাশের প্রায় অর্ধেকটা জুড়ে রয়েছে বৃহস্পতি, আর তার কিছুটা পেছনেই জাঁকালো বলয় নিয়ে শনি! প্রায় সঙ্গে সঙ্গে সংকেত ভেসে আসে ওর কাছে।

“মনে পড়েছে!” আলোর মাধ্যমেও যে এত উচ্ছ্বাস বোঝানো যায় এ বিষয়ে সুরজিতের কোনও ধারণাই ছিল না। কিন্তু ও অনুভূতিটা বুঝতে পারে, “আমি বুঝতে পেরেছি আমি কোথায় আছি। আমি আমার পথ খুঁজে পেয়েছি!”

খুশি হয় সুরজিৎ, সঙ্গে একটু উদ্বেগও হয় ওর। এত এত মারকাটারি সিনেমায় দেখানো ভিনগ্রহীদের আক্রমণে পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার ছবিগুলো কাল্পনিক হলেও ভুলে যাওয়া তো সহজ কথা নয়!

“এবার কী হবে?” একটু ভয়ে ভয়েই জানতে চায় সুরজিৎ।

“এবার আমি আমার যাবতীয় স্মৃতি আলোর মাধ্যমে পাঠিয়ে দেব আমার গ্রহের উদ্দেশে। সেটা করতে গেলে আমাকে বিপুল পরিমাণ শক্তি টেনে নিতে হত এই গ্রহের গভীর থেকে। কিন্তু মনে হচ্ছে তার ব্যবস্থাও হয়ে যাচ্ছে।”

কথাটা হেঁয়ালির মতো শোনাচ্ছিল বলে সুরজিৎ জানতে চায়, “মানে?”

সংকেত ভেসে আসে ওর মনে, “তোমাদের গ্রহের ওপরের অংশ যে প্লেটগুলো দিয়ে তৈরি, তার মধ্যে দুটো প্লেট ঘষাঘষি করে বিপুল শক্তি তৈরি করতে চলেছে কিছুক্ষণের মধ্যেই। যেখানে এটা ঘটবে, সেটা খুব বেশি দূরে নয়। আমি সেই শক্তিটা নিজের মধ্যে টেনে নেব, যাতে আমার আধার সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায় এবং আলোর প্যাকেটগুলো নির্দিষ্টদিকে ছুটে যায়। তোমাদের এখানে এই জিনিস প্রায়ই হয়, যাকে তোমরা ভূমিকম্প বল। এবার তেমনই একটা ভূমিকম্পর শক্তি আমি নিজের মধ্যে নিয়ে নিচ্ছি। এতে তোমাদের ক্ষয়ক্ষতি অনেক কম হবে ঠিকই, কিন্তু এই পাহাড়ে একটা বড়ো ভাঙন ধরবে। তাছাড়া এই গুহা আমার আধারের বিস্ফোরণে প্রায় উড়ে যাবে।

“শেষ হওয়ার আগে তোমাকে দেওয়ার মতো আমার কিছুই নেই। তাছাড়া এটুকু বুঝেছি যে তোমার স্মৃতিশক্তি যথেষ্ট জোরালো। তাই আমার দেওয়া ঝাঁকুনিতে কোনও লাভ হবে না। শুধু ধন্যবাদ দিতে পারি তোমায়। এবার তুমি নিজের জায়গায় ফিরে যাও, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।”

শুধু মুখে নয়, মনেও স্তব্ধ হয়ে যায় সুরজিৎ। তারপর স্রেফ ‘বিদায় বন্ধু’ বলে ও হনহনিয়ে উঠতে থাকে সুড়ঙ্গ দিয়ে ওপর দিকে।

গুহা থেকে বেরিয়ে আসার পরেই সুরজিৎ বুঝতে পারে, পায়ের নিচে মাটি কেঁপে উঠেছে। পরমুহূর্তেই কান ফাটানো বিস্ফোরণের শব্দ ভেসে আসে অনেক গভীর থেকে। পাহাড়টাও যেন ভেতরদিকে ধ্বসে যায়। সদ্য হওয়া আলো ঝলমলে ভোরেও সুরজিতের মনে হয়, যেন একঝাঁক আলোকপুঞ্জ পাহাড়ের মধ্য থেকে উঠে এসে ছিটকে গেল অনন্ত আকাশের একটা বিশেষ কোণ লক্ষ্য করে। পেছনে তাকিয়ে বুঝতে পারে ও, গুহাটাও ভেতর থেকে পাথর ভেঙে পড়ে বন্ধ হয়ে গেছে।

বাংলোর দিকে হাঁটা লাগায় সুরজিৎ, আর ভাবে, একটা অভিজ্ঞতা হল বটে। লোকে দেবতার অস্তিত্ব মানলেও স্কাউট নম্বর ৮৯৪৪৬৭-এর অস্তিত্ব কিছুতেই মেনে নেবে না। আর একথা তো তারা কিছুতেই বিশ্বাস করবে না যে স্মৃতি ফিরিয়ে আনায় অব্যর্থ দেবতার নিজের স্মৃতি ফিরে এসেছিল ওর মতো এক তুচ্ছ পারচেজ ক্লার্কের দৌলতে!

স্মৃতি নয়, ঘটনাটা ওর কাছে থেকে যাবে একটা গল্প হয়েই।

ছবিঃ মৌসুমী

জয়ঢাকের গল্পঘর

Advertisements

One Response to গল্প স্মৃতি ঋজু গাঙ্গুলি শরৎ ২০১৭

  1. Sagarika Ray says:

    valo golpo

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s