গল্প আজব মানুষের গজব কাহিনী চুমকি চট্টোপাধ্যায় শরৎ ২০১৮

চুমকি চট্টোপাধ্যায়

দুপুর থেকেই আকাশ কালো করে মেঘ জমতে শুরু করল। রিন্টু বার বার বারান্দায় বেরিয়ে আকাশের দিকে তাকাচ্ছে আর ঘরে ঢুকে বিড়বিড় করছে। “বৃষ্টি হোস না যেন। আজ আমাদের ফুটবল কম্পিটিশনের সিলেকশন। পনেরো দিন বাদে ইন্টারক্লাব ফুটবল টুর্নামেন্ট শুরু হবে। প্লিজ, প্লিজ ঠাকুর! বৃষ্টিটা আটকাও যে করে হোক।”

নিজের ভেতর থেকেই কে যেন বলল, “ইইহ্‌, প্রয়োজনে ঠাকুর ঠাকুর আর অন্য সময় মনেও পড়ে না! ঘোড়ার ডিম ঠেকাবে বৃষ্টি, ঠাকুরের খেয়ে কাজ নেই!”

আজ সিলেকশন ভেস্তে গেলে আবার সেই পরের রবিবার। রিন্টুরা ওই সময় বেড়াতে যাচ্ছে বাড়ির সবাই মিলে। ফলে রিন্টু বাদ পড়ে যাবে। ফুটবল খেলতে দারুণ ভালোবাসে রিন্টু, খেলেও ভালো। কিন্তু বৃষ্টি হলে সব মাটি হয়ে যাবে।

বারান্দায় দাঁড়িয়ে মেঘের দিকে তাকিয়ে থাকা রিন্টুর চমক ভাঙে কারুর ডাকে।

“কী রে? ওপরে তাকিয়ে কী দেখছিস?”

রিন্টু ঘাড় নামিয়ে দেখে, শোভন। একেবারে খেলার পোশাক পরে রেডি। জিজ্ঞেস করে, “এখনই মাঠে যাচ্ছিস? সবে তো দুটো বাজে। চারটের সময় যেতে বলেছে তো সমরদা।”

শোভন বলে, “সে তো জানি। কিন্তু যদি বৃষ্টি নামে? তখন তো সিলেকশন হবে না। তাই আগে আগে যাচ্ছি। দেখি কী হয়। তুই কি যাবি?”

রিন্টু ভাবে, কথাটা খারাপ বলেনি শোভন। গিয়েই দেখা যাক। বলে, “পাঁচটা মিনিট দাঁড়া, ড্রেস পরে আসি।”

রিন্টুদের বাড়ি থেকে হেঁটে ভিয়েনা স্পোর্টিং ক্লাবের মাঠে পৌঁছতে মিনিট সাতেক লাগে। গল্প করতে করতে পৌঁছে গেল দুই বন্ধু। গিয়ে দেখে, সমরদা ক্লাবঘরের ভেতর বসে আছে। কিছু চেনা মুখও রয়েছে ভেতরে। ইতিমধ্যে গড়গড় করে ডেকে মেঘেরা জানান দিল, আমরা আসছি ঝেঁপে। আর মিনিট পাঁচেকের মধ্যে এসেও গেল।

সমরদা জানিয়ে দিল, “অমিয়, সেলিম, রিন্টু আর শোভন সিলেক্টেড। বৃষ্টির ভ্রূকুটি উপেক্ষা করেও সময়ের আগেই মাঠে এসেছে এরা, অতএব এদের ফুটবল খেলাটার প্রতি শ্রদ্ধার খাতিরে এদের নিয়ে নেওয়া হল। বাকিদের সিলেকশন আগামী রবিবার হবে।”

দু’হাত তুলে নাচতে নাচতে ক্লাবঘর থেকে বেরিয়ে যে যার বাড়ির পথ ধরল। শোভন বলল, “তুই চলে যা, রিন্টু। আমি একটু রানাদার বাড়ি হয়ে ফিরব।”

রানাদা ওকে ইংরেজিটা দেখিয়ে দেয়।

*****

রিন্টুদের বাড়িটা হাওড়া জেলার সলপের একটু ভেতরদিকে। বেশিরভাগ গ্রাম যখন প্রায় শহর হয়ে উঠছে সেখানে ওদের এই নস্করপাড়া এখনও দিব্যি গ্রাম রয়েছে। রিন্টুদের বাড়ি থেকে বড়ো রাস্তা, মানে যে রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলে, পৌঁছতে গেলে তিনটে পুকুর পড়ে। তার দুটো ছোটো হলেও, একটা বেশ বড়ো। তাছাড়া প্রচুর বাঁশঝাড় আছে। কলাগাছও অনেক। অন্যান্য গাছপালাও ভালোরকমই আছে। প্রমোটরদের কোপে পড়ে এদের দেহ রাখতে হয়নি এখনও।

রিন্টুর বাবা ডাক্তার। হাওড়া জেনারেল হাসপাতালে আছেন। একটু খিটকেল ধরনের মানুষ। ডাক্তার হিসেবে নাম থাকলেও মানুষ হিসেবে লোকজন একটু ভয়ই পায়। ব্যবহার দেখে মানুষটা ঠিক কেমন বোঝা যায় না। হাতে গোনা দুয়েকজন বলে, ডাক্তারবাবুর মুখটা ট্যাড়াব্যাঁকা হলেও অন্তরটা সোজা। যারা বলে তারা অবশ্য বুড়ো মানুষের দলে পড়ে। ছেলেছোকরারা বিশেষ ধারেকাছে ঘেঁষে না।

রিন্টুও প্রবল ভয় পায় বাবাকে। বিশেষ করে স্কুলের রেজাল্ট বেরোবার সময়। উফ্, সে যে কী একটা কাঁপুনি আপনা আপনি হতে থাকে ভেতর থেকে বলে বোঝাবার নয়। মনে হয় অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ব্রেক ডান্স করছে! আবারও তো সেই সময় এসে গেল। এবার ক্লাস নাইন হবে রিন্টুর।

বাবার ইচ্ছে রিন্টু ডাক্তারি পড়ে। এদিকে জীবনবিজ্ঞান সাবজেক্টটা রিন্টুর দু’চক্ষের বিষ। কী যে সাপ-ব্যাঙের পৌষ্টিক তন্ত্রমন্ত্র পড়তে হয়, বিচ্ছিরি লাগে। পড়া যদিও বা ম্যানেজ করা যায়, ওসব আবার আঁকতে হয়! উফ্, যমযন্ত্রণা! আরে কে কীভাবে হজম করবে, নিঃশ্বাস নেবে, কার কেমন ধারা রক্ত সংবহন হবে শরীর দিয়ে তা আমি জেনে কী করব ছাতা! আমি তো আর ওইসব প্রাণীদের সঙ্গে বাস করতে যাচ্ছি না যে ওদের শরীর খারাপ করলে আমি ডাক্তারি করব!

রিন্টুর পছন্দ ফিজিক্স। পুরো পৃথিবীটাই তো ফিজিক্সে চলছে। ওহ্‌, দারুণ লাগে সাবজেক্টটা। বাবাকে খুব কায়দা করে পটাতে হবে। যদিও এখনও ক’বছর সময় আছে।

এসব কথা ভাবতে ভাবতে বাড়ির দিকে হাঁটছিল রিন্টু। ক্লাব থেকে ওদের বাড়ির পথে একটা ছোটো পুকুর পড়ে। সেই পুকুরটা ঘিরে গাছপালাই বেশি। একটাই মাত্র বাড়ি আছে পুকুরের ধারে। সেও প্রচুর পুরনো। রাস্তা থেকে জং ধরা টিনের চালের কিছুটা দেখা যায়। আর দেখা যায় দুটো জানালা। তিন খোপের জানালাগুলোর খানিক খোপে কাঠ আছে, খানিক আবার ফাঁকা। বাড়িটার পর থেকে সমাদ্দারদের কারখানার পাঁচিল শুরু। কারখানাটা পাঁচিলের ওধারে। এখন বোধহয় উঠেও গেছে।

অনেকদিন পরে ক্লাবে যাওয়া হল। পরীক্ষার গুঁতোয় বেশ কিছুদিন খেলা বন্ধ ছিল। আকাশ মেঘলা থাকায় ছ’টাতেই বেশ অন্ধকার নেমে গেছে। মেঘের বদান্যতায় সুয্যিমামার আজ ডিউটি একটু কম দিতে হল। পুকুরটার ধার দিয়ে যাবার সময় রিন্টুর চোখ চলে যায় সেই টিনের চালওয়ালা বাড়িটার দিকে। জানালাদুটো বন্ধ, ভেতরে আলো জ্বলছে। আর অদ্ভুতরকম কিছু দেখা যাচ্ছে সেই আলোয়। রিন্টুর গাটা একটু শিরশিরিয়ে ওঠে। ওই বাড়িটাতে তো কেউ থাকত না এতদিন। তাহলে?

রিন্টু দৌড় লাগায়। রাস্তায় কাদা থাকায় বুটের স্পাইকগুলো গেঁথে যাওয়াতে বেশ বেগ পেতে হয় ওকে। জুতোয় করে মন খানেক কাদা নিয়ে বাড়ি পৌঁছয় রিন্টু। ঢোকার মুখেই পাপোশটাতে কাদা লেপে জুতোজোড়া কোনওরকমে খুলেই বাথরুমের দিকে দৌড়য়। হাত-পা না ধুয়ে মায়ের সামনে গেলে বকা খেতে হবে। কিন্তু মাথায় ঘুরতে থাকে পুকুরধারের সেই বাড়িটার কথা। কে থাকে ওখানে? আর ওই অদ্ভুত নক্সাগুলোই বা কী?

রিন্টুর মামাতো দাদা অলয় ওদের বাড়িতে থাকে। ফার্মাকোলজি নিয়ে পড়াশোনা করে কলকাতার একটা বড়ো ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করে। মামা-মামি রাঁচিতে থাকে। দাদা কলকাতায় মেসে থাকতে চেয়েছিল, কিন্তু রিন্টুর মায়ের অনুরোধ আর বাবার ধমকে সে ইচ্ছে বাতিল করতে হয়েছে।

রিন্টুরও খুব পছন্দ দাদাকে। যদিও দাদার গল্প করার মতো সময় থাকে না, তাও ছুটির দিনে জমিয়ে আড্ডা হয় দাদার সঙ্গে। সবকিছু দাদকে বলে রিন্টু। দাদার মধ্যে বেশ একটা ইন্সপিরেশনাল ব্যাপার আছে। দাদা যখন বলে, ‘ঠিক পারবি’ বা ‘হয়ে যাবে, ভাবিস না’, তখন বেশ একটা জোশ আসে রিন্টুর মধ্যে। আজকের ঘটনাটা দাদাকে না বলা অবধি শান্তি পাবে না রিন্টু। যত রাতই হোক, বলতেই হবে।

অলয় বাড়ি ফিরল রাত সাড়ে ন’টা নাগাদ। রিন্টু বারান্দায় বসে অপেক্ষা করছিল দাদার ফেরার। ঘরে থাকলে টের নাও পেতে পারে তাই। মা দু’বার বলে গেছে, “কী রে, অন্ধকার বারান্দায় বসে মশার কামড় খেয়ে ডেঙ্গি না বাধালে হচ্ছে না তো? বেড়ানোটা ভেস্তে তবে শান্তি হবে ছেলের। যা, ঘরে যা।”

“হ্যাঁ হ্যাঁ, এখুনি যাচ্ছি। সুন্দর হাওয়া দিচ্ছে বলে বসে আছি।”

“বাবা এসে দেখলে হাওয়া খাওয়া বের করবে তোর।”

অলয়কে আসতে দেখে দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামে রিন্টু। অলয় ঢুকতেই বলে, “দাদা, খুব জরুরি জিনিস বলার আছে।”

“বেশ তো। খাওয়াদাওয়ার পর আমার ঘরে চলে আসিস।”

*****

রাতের খাওয়া শেষ। অলয়ের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয় রিন্টু।

“বল, কী বলবি। কোনও সমস্যা?”

“না না, সমস্যা কিছু নয় গো, দাদা। একটা ভালো খবর দিই তোমাকে। আমি ইন্টারক্লাব ফুটবল টুর্নামেন্টে সিলেক্ট হয়েছি।”

“কেয়া বাত! জবর খবর! খুব ভালো খেলে জিততে হবে কিন্তু। তুই পারবি ঠিক।”

“এই জন্যেই তোমাকে এত ভালোবাসি, দাদা। তুমি না ঠিক এনার্জি ড্রিঙ্কের মতো। কথা বললেই ইন্সট্যান্ট এনার্জি! আর একটা ব্যাপারও তোমাকে বলছি।”

“বল।”

যা কিছু দেখেছে সব খুলে অয়নের কাছে বলে রিন্টু। অয়ন হেসে বলে, “মেঘলা আকাশে বিদ্যুৎ চমকে কোনও নক্সা তৈরি হয়ে থাকবে হয়তো।”

“না, দাদা। আমি যখন ফিরছিলাম তখন বৃষ্টি থেমে গেছিল। বিদ্যুৎও চমকাচ্ছিল না। তুমি প্লিজ আমার সঙ্গে রবিবার দিন চলো না, দাদা। সত্যি সত্যি আমি অদ্ভুত কিছু নক্সা দেখেছি। এলিয়েন এসে বাসা বাঁধেনি তো?”

“হা হা হা হা হা হা… এটা মারাত্মক বলেছিস। এলিয়েন এখানে? সলপে?”

“কেন? আসতে পারে না বুঝি? ওরা তো পরিত্যক্ত জায়গাই খোঁজে। প্রথম কিছুদিন লুকিয়ে থাকবে, তারপর সুযোগ বুঝে অ্যাটাক করবে।”

“ওহ্‌, এই সায়েন্স ফিকশন পড়ে পড়ে মাথাটা গেছে। চল ঠিক আছে। রবিবার এলিয়েন অভিযানে যাব তোর সঙ্গে। পাক্কা।”

“রবিবার তো হবে না, দাদা। আমরা মন্দারমণি যাচ্ছি না? তুমি প্লিজ শনিবার একটু তাড়াতাড়ি অফিস থেকে ফেরো। আটটার মধ্যে ফিরলেই হবে। বাবার আসতে তো দশটা কম করে। তার মধ্যেই আমরা ফিরে আসব। প্লিজ, দাদা।”

“সে নাহয় ম্যানেজ করলাম। কিন্তু এলিয়েন যদি অ্যাটাক করে আমাদের? বন্দী করে রাখে বা খেয়েই ফেলে তখন তো কেউ জানবে না রে! সেক্ষেত্রে পিসোকে কি বলে রাখবি ব্যাপারটা?”

“উফ্ দাদা, তুমি কী যে বলো! বাবাকে? যেতেই দেবে না ওখানে। বলবে ঘরের খাচ্ছ, ঘরেই থাকো। যেদিন নিজের পয়সায় খাবে সেদিন এসব চচ্চড়ি পাকিও। কিচ্ছু হবে না। কাউকে বলতে হবে না, দাদা। আমরা তো আর বাড়ির ভেতর ঢুকব না। বাইরে থেকে দেখব। সেদিন আমি ছবিতে দেখা এলিয়েনের মতো একটা মাথা যেন দেখেছি এক নজরে। ওদের যেমন মাথাটা বড়ো হয়, অনেকটা তেমন। আরও কেমন জট পাকানো দড়ির মতো সব জিনিস! চলো না, দাদা।”

নিজের ঘরে ঢুকে অলয় চেয়ারে বসে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। রিন্টুর কথাগুলো কি একেবারে ফেলে দেবার মতো? সবটাই বানিয়ে বলছে কি? তা যদি হত তাহলে ওকে সঙ্গে নিয়ে খোঁজখবর করার কথা এত জোর দিয়ে বলত না। একটা গপ্পো বলেই ছেড়ে দিত। তাহলে কি সত্যিই অস্বাভাবিক কোনও ঘটনা ঘটছে ওই পরিত্যক্ত বাড়িটাতে? এলিয়েন তত্ত্বটা দাঁড়াচ্ছে না মোটেই। রিন্টু  ছেলেমানুষ, তাই কল্পনার গরু গাছে চড়েছে। এমনও তো পারে, কোনও চোরাকারবারির দল থানা গেড়েছে ওখানে আর মানুষ যাতে ধারে-পাশে না ঘেঁষে তাই ভূতুড়ে আলোর কারসাজি করেছে। নাহ্‌, ব্যাপারটা দেখতে হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার রাতে জ্বর এল রিন্টুর। চোখমুখ লাল হয়ে, হেঁচে-কেশে একশা! রিন্টুর মা কাজ চালাবার মতো ডাক্তারি জানেন এতবছর ডাক্তারের সংসারে থেকে। প্যারাসিটামল খাইয়ে দিলেন রিন্টুকে। সঙ্গে বকাও দিলেন ভালোরকম।

“কতবার বলেছি বৃষ্টিতে ভিজিস না, কথা কানে নিলে তো! রবিবার যাওয়া, নাও এখন বার্লি খেয়ে কাঁথা মুড়ি দিয়ে ঘুমাও। আজকালকার ছেলেপিলেগুলো সব একেকটা মাতব্বর!” গজগজ করতে করতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন রিন্টুর মা।

রিন্টুর মাথায় তখন বেড়ানোর ‘ব’ও নেই। ঘুরপাক খাচ্ছে শনিবারের এলিয়েন দেখার চিন্তা। যে করেই হোক শনিবার সকালের মধ্যে খাড়া হয়ে যেতে হবে। যদি শরীর খারাপ থাকে তাও দেখাতে হবে ভালো আছি। ধুস, জ্বর আসার আর সময় পেল না! মনে হয় ওই এলিয়েনদের কাজ। ওরা তো অনেক উন্নত, মনের কথা ধরে ফেলে ঠিক। আর তাই জ্বর এনে দিয়েছে। ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ে রিন্টু।

স্বপ্ন দেখে, ও ঢুকেছে একটা বাড়িতে যেখানে কোনও দেওয়াল নেই কিন্তু ছাদ আছে। হঠাৎই শব্দ পেয়ে ঘুরে দেখে, অদ্ভুতদর্শন একটা জীব দাঁড়িয়ে আছে যার মুন্ডু নেই। বুকের ওপরেই দুটো চোখ। হাতদুটো বেজায় লম্বা আর লিকলিকে। দুটো হাত বাড়িয়ে রিন্টুর গলা ধরতে আসছে। রিন্টু ভয় পেয়ে পেছন ফিরে পালাতে চাইছে আর ওই জীবটা বলছে, “কী হল তোর, শরীর এখন কেমন?”

স্প্রিং দেওয়া পুতুলের চোখের মতো চোখ খুলে গেল রিন্টুর। সামনে দাঁড়িয়ে অলয়দাদা। হাসছে। রিন্টু দরদর করে ঘামছে প্যারাসিটামল এবং স্বপ্নের ডুয়াল এফেক্টে।

“কী ওস্তাদ! আছিস কেমন? তোর কথা শুনে আমি কিন্তু বসকে বলে রেখেছি শনিবার আগে বেরিয়ে আসার কথা। এবার যদি তুই ক্যাচাল করিস, তার জন্য কিন্তু আমাকে দোষ দিবি না।”

“আমি যাবই। যে করেই হোক।”

“হ্যাঁ, তারপর বাড়াবাড়ি কিছু হোক আর পিসো আমাকে তাড়িয়ে দিক এখান থেকে।”

“না, দাদা। আমি ঠিক হয়ে যাব, দেখো। হোয়্যার দেয়ার ইজ আ উইল, দেয়ার ইজ আ ওয়ে।”

“ঠিক, ঠিক। ওকে, চললাম অফিস। অল দ্য বেস্ট! উঠে পড় চটপট।”

রিন্টু বুঝতে পারে, দাদাও ইন্টারেস্টেড হয়ে পড়েছে ব্যাপারটাতে। মনেপ্রাণে ভগবানকে ডাকতে থাকে ও যাতে শনিবার সকালের মধ্যে সুস্থ হয়ে যেতে পারে।

রিন্টুর বাবা ফিরে রিন্টুকে দেখে বললেন, “তোর সবথেকে বড়ো ওষুধ কী জানিস? বিশ্রাম। ভালো করে বিশ্রাম নে, ঘুমো, দেখবি দু’দিনেই ফিট হয়ে গেছিস।”

এবার একটু ভয় লাগে রিন্টুর। জ্বর যদি না কমে শনিবারের মধ্যে, তাহলে? জ্বর নিয়ে বেরিয়ে যদি বাড়াবাড়ি কিছু হয়? এবার এলিয়েনদের ডাকা শুরু করে ও। ‘ও এলিয়েন ভাইয়েরা, বোনেরা – তোমরা আমাকে সুস্থ করে দাও প্লিজ। শনিবার তোমাদের সঙ্গে দেখা করতে যাব যে। তোমরা খুব ভালো।’

প্রার্থনা মঞ্জুর হয় রিন্টুর। শুক্রবার দুপুরের পর আর জ্বর আসে না ওর। প্রার্থনা কে মঞ্জুর করেছে, ভগবান না এলিয়েন, সেটা অবশ্য ধন্দের বিষয়। যাই হোক, দু’পক্ষকেই থ্যাঙ্কু জানিয়ে পরের দিনের প্ল্যান ভাঁজতে শুরু করে রিন্টু।

আজ সেই ডি ডে। সকাল থেকে অদ্ভুত উত্তেজনায় ভুগছে রিন্টু। অলয়দাদার মুডটাও খুব ভালো আজকে। সন্ধে ছ’টা মোটামুটি টাইম ফিক্স হয়েছে।

ছ’টার মধ্যেই এসে গেল অলয়। রিন্টু তৈরি ছিল। কাঁধে একটা ছোটো ব্যাগ নিয়েছে যার ভেতরে আছে একটা মিনি টর্চ, মাখন মাখানোর ছুরি (এছাড়া কোনও অস্ত্র জোগাড় করতে পারেনি রিন্টু), একটু গোলমরিচ ফালি কাগজে ঢেলে পুরিয়া করে নিয়েছে যাতে এলিয়েনরা বেগড়বাই করলে চোখে ছিটিয়ে সামাল দিতে পারে।

ছ’টা দশে বেরিয়ে পড়ল দাদা আর ভাই। অয়নের সঙ্গে যাচ্ছে দেখে রিন্টুর মা কিছু বললেন না। কিন্তু দেখা গেল, বাইরে বেশ আলো। অন্ধকার না হলে কি আর যাওয়া যাবে ওই বাড়িটাতে? লুকিয়ে কাজ করতে অন্ধকারের থেকে ভালো বন্ধু আর কই!

এদিক সেদিক খানিক ঘুরে সুয্যিমামা পাকাপাকি অন্য গোলার্ধে চলে যাবার পর দুই মক্কেল সেই অদ্ভুত বাড়ির রাস্তা ধরে। পুকুরপাড় ধরে যেতে যেতে একসময় রিন্টু ফিসফিসিয়ে বলে, “দাদা, ওই যে… আলো দেখতে পাচ্ছ?”

অলয় তাকিয়ে দেখে পুকুরঘেঁষা পাঁচিলের গায়ে একটা টিনের চালের বাড়িতে মিয়ানো আলো। ধীর পায়ে এগিয়ে চলে দু’জনে।

বাড়িটার কাছাকাছি এসে রিন্টু অলয়ের হাত টেনে ধরে। আর না এগোনোর ইঙ্গিত। বলে, “দাদা, তুমি কি ভেতরে যাবার প্ল্যান করছ? আগে বুঝে নাও ভালো করে। জানালাটা দেখো।”

অলয় দেখে, কালো মতন কিছু একটা লাগানো জানালার খোপে যার একটাতে মানুষের খুলির আকারের কিছু একটা দেখা যাচ্ছে। আলোর উৎসটা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না, তবে হ্যারিকেন বা লম্ফ টাইপের কিছু। অন্যান্য খোপে বিচিত্র কিছু নক্সা ফুটে উঠেছে ঠিকই।

রিন্টুর হাত ধরে আলতো পায়ে বাড়িটার সামনে চলে আসে অলয়। মিনিট সাতেক দাঁড়িয়ে থাকে বন্ধ দরজার বাইরে। খানিক বাদে কাশির শব্দ শোনা যায়। বেশ বাজে ধরনের কাশি। রিন্টু অলয়ের হাত চেপে ধরে ভয়ে। অলয় নিশ্চিন্ত হয়ে যায় ভেতরে মানুষই আছে, কোনও ভিনগ্রহী নয়। শুধু বোঝার চেষ্টা করে ভেতরে ক’জন আছে।

আরও মিনিট দশেক দাঁড়িয়ে কাশির শব্দ আর উহ্‌-আহ্‌ ছাড়া কিছু শব্দ আসে না ভেতর থেকে। অলয় পকেট থেকে একটা ফোল্ডিং ছুরি বের করে রিন্টুকে টেনে নিয়ে দরজার সামনে গিয়ে হালকা চাপ দেয়। খটাং করে ছিটকিনি পড়ার আওয়াজ হয় আর ভেতর থেকে কাঁপা গলায় কেউ বলে ওঠে, “কে?”

দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে ওরা। দেখে, মেঝেতে পাতা চাদরে আধশোয়া এক বুড়ো মানুষ। সামনে একটা তোবড়ানো অ্যালুমিনিয়ামের বাটি, একটা কলাইয়ের থালা, একটা চামচ, প্লাস্টিকের দুটো বোতল যার একটা ভরা একটা খালি আর দু-চারটে পোঁটলাপুঁটলি এদিক ওদিক ছড়ানো।

বন্ধ জানালার ঠিক নিচে একটা তাকমতো। তার ওপরে জ্বলছে একটা কুপি। আর জানালার ভাঙা কাচের জায়গায় জায়গায় লাগানো এক্স রে এবং সম্ভবত আল্ট্রা সাউন্ড বা স্ক্যান করা প্লেট।

বুড়ো আতঙ্কিত গলায় জিজ্ঞেস করে, “তোমরা কে, বাবা? কী চাই এখেনে?”

অলয় বলে, “আমাদের কিচ্ছু চাই না। এই বাড়িতে তো বহুদিন কেউ থাকত না। বাইরে থেকে আলো দেখে আমরা তাই খোঁজ নিতে এসেছি। আপনি কোথা থেকে এসেছেন? আর জানালায় ওগুলো কী লাগিয়েছেন?”

রিন্টু একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে বুড়োর দিকে আর ভাবছে, নির্ঘাত ছদ্মবেশ ধরেছে এলিয়েনটা বাঁচার জন্য।

“বারুইপুরে থাকতাম, বাবা। মজুর খাটতাম। বয়েসের ভারে কাজ তেমন করতে পারতাম না বলে ছেলে আর রাখতে চাইল না। বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে ইদিক-সিদিক ঘুরতে ঘুরতে এই জাগাটা পেয়ে ভাবলুম যদ্দিন কেউ না তাড়ায়, এখানেই থাকি। এই ক’দিন হল এসেছি, বাবারা। তা এটা কি আপনাদের ঘর? তাহলে চলে যাব’খন…”

“আরে, না না। আমাদের ঘর নয়। আমি জিজ্ঞেস করছি, জানালায় ওগুলো কি আপনি লাগিয়েছেন?”

একবার জানালার দিকে তাকিয়ে বুড়ো বলল, “হ্যাঁ, বাবা। ফাঁক দিয়ে বৃষ্টির ছাঁট আসছিল সেদিন। আমার যা কিছু সম্পত্তি সবই সঙ্গে নিয়ে ঘুরি, ছেলে তো রাখবে না ঘরে, ফেলে দেবে। তা সেসব সঙ্গে ছিল বলে কাজে লেগে গেল।” হাসতে গিয়ে কাশতে লাগল বুড়ো।

“আরে, সামলে দাদু। জল খান।” রিন্টু বলল।

“ওগুলো কী? এক্স-রে প্লেট?” অলয় জানতে চায়।

“হ্যাঁ, বাবা। বুকে কফ হতে ছেলেকে বলে কয়ে অনেক কষ্টে করিয়েছিলাম। আর একবার পাড়ার ক্লাব থেকে বিনা পয়সায় চিকিচ্ছে করিয়েছিল, তখন পেটের ছবি তুলেছিল ডাক্তাবাবু। পেটের ওপর কী একটা বুলোচ্ছিল, বেশ সুড়সুড়ি লাগছিল। হে হে হে… সেই ছবিও আছে জানালায়। ভালোই হয়েছে, ছাঁটও আসে না, রোদও কম আসে। কালো কিনা।”

“খাবারদাবার পান কোত্থেকে?”

“ওই মুড়ি-চিড়ে চিবিয়ে আছি, বাবারা। কে আর আমায় ভাত দেবে বলো। দু’দিন বাদে বাদে বেরিয়ে কিনে আনি।”

আরও কিছু মামুলি কথাবার্তার পর বেরিয়ে আসে দু’জনেই। বাড়ি ফিরতে হবে। এখানে বেশ ঝোপজঙ্গল। সাপখোপের ভয় আছে। সাইড ব্যাগ থেকে মিনি টর্চ বের করে রিন্টু। মেন রোডে এসে না ওঠা অবধি কথা বলে না কেউই।

মেন রোডে উঠে অলয় বলে, “দাদুটা কিন্তু বেশ কষ্টে আছে। খাওয়ার কষ্ট, পোকামাকড়ের কামড়ের ভয়, যদি কেউ তাড়িয়ে দেয় তার ভয়… ওই প্লেটগুলোর একপাশে আলো পড়ায় উলটোদিক থেকে ইমেজগুলো ফুটে উঠছে, যেটা তুই দেখেছিলি।”

“ধ্যাত, পুরো অ্যাডভেঞ্চারটাই মাঠে মারা গেল। কত উৎসাহ নিয়ে গেছিলাম। কী দেখব ভেবে… সব গেল।” রিন্টুর স্বরে বিরক্তি স্পষ্ট।

“তুই যা ভেবেছিলি সেসব যে নয় তাতে আমি নিশ্চিন্ত ছিলাম। আমার আশঙ্কা অন্য ছিল। সে যাক। একটা কথা কিন্তু মানতেই হবে – এক্স রে প্লেট বা আলট্রাসোনোগ্রাফিক প্লেটের এমন সদ্ব্যবহার বোধহয় পৃথিবীতে আর কেউ করেনি।” হেসে ওঠে অয়ন।

রিন্টু উপসংহার টানে, যত্তসব আজব লোকের গজব কাণ্ড!

অলঙ্করণঃ মৌসুমী

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

Advertisements

One Response to গল্প আজব মানুষের গজব কাহিনী চুমকি চট্টোপাধ্যায় শরৎ ২০১৮

  1. Rumela Das says:

    বেশ লাগলো দিদি

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s