গল্প আমার মেয়ে রাই অর্পণ পাল বর্ষা ২০১৯

আমার মেয়ে রাই

অর্পণ পাল

মেয়ে এসে বলল, “বাবা, আমার সব গোছানো শেষ। এবার গাড়ি ডাকো।”

মেয়ে আজ যাবে অন্য এক স্কুলের হস্টেলে, কাল থেকে তার সেখানে আবাসিক-জীবন শুরু। এবারে সেভেনে উঠল ও। পড়াশুনোয় বেশ ভালো, ফাইনাল পরীক্ষায় সব বিষয়েই নব্বইয়ের ওপর নম্বর পেয়েছে। আমাদের গ্রামের স্কুলে তার পড়াশুনো যে মন্দ হচ্ছিল তা নয়, তবু নেহাত চাপে পড়েই এই সিদ্ধান্ত নিতে হল। এখানে থাকলে ওর লেখাপড়া ভালো ভাবে হচ্ছে না, আর আমার কাজেরও ক্ষতি হচ্ছে—এমন কিছু কারণেই এই হোস্টেলব্যবস্থার মধ্যে ওকে পাঠিয়ে দেওয়া। বাড়ি থেকে দূরে একা থাকা— কী যে হবে, সেটাই ভাবছি এখন।

যে স্কুলের হোস্টেলে ও থাকবে, সেটা আমাদের এই গ্রাম থেকে তিরিশ কিলোমিটার দূরে। যদিও সেটাও গ্রাম্য এলাকা, তবু মুক্তকেশীগঞ্জ গ্রামের সেই স্কুলটি আশেপাশের আট দশটা ব্লকের মধ্যে সবচেয়ে ভালো স্কুল। সেখান থেকে বছর তিনেক আগেই একটি মেয়ে মাধ্যমিকে ষষ্ঠ হয়েছে রাজ্যে। বেশ বড় স্কুল, উচ্চমাধ্যমিক স্তরেও নামডাক আছে যথেষ্ট।

মেয়ে রেডি হয়েছে, ওর সঙ্গে আজ আমি যাব। তিনটে বড় বড় ব্যাগে ওর জামাকাপড়, বই আর অন্য কিছু জিনিস সাজিয়ে দিয়েছে আমাদের কাজের মহিলা রাজুর মা। আমি আমার ঘরে সকাল থেকেই একটা লেখা নিয়ে পড়ে আছি, লেখাটা আজ শেষ না করলেই নয়। কিন্তু এখন বেরোতে হবে, সারাদিন আর লেখাটা নিয়ে বসতেই পারব না। এজন্য আমারও কিঞ্চিৎ দুশ্চিন্তাও যে হচ্ছে না তা নয়। একদিকে মেয়ে চলে যাচ্ছে, সেই দুশ্চিন্তারও ওপর এই এক।

মেয়ের ডাকে লেখা ছেড়ে উঠে বারান্দায় এসে দেখি ব্যাগ তিনটে মেঝেতে রাখা। আর রাজুর মা নিচু হয়ে বসে একটা নাড়ুভর্তি কৌটো একটা ব্যাগে ভরছে, যে নাড়ু মেয়ে নির্ঘাত নিয়ে যেতে চেয়েছে। ও নাড়ু বড্ড ভালোবাসে। রাজুর মা খুব ভালো নাড়ু বানায়, আমি আগে বেশ কয়েকবার খেয়েছি।

বারান্দায় মিত্রার ছবির সামনে আজ একটা ধুপকাঠি জ্বলছে। মেয়ে দেখলাম, সেই ছবিটার সামনে দাঁড়িয়ে হাত জোড় করে কিছু বলছে, চোখ বন্ধ। তার মুখ নড়া দেখে কী বলছে বোঝা গেল না। পরে আমার কি এটা জিজ্ঞেস করা ঠিক হবে?

তারপর মেয়ে আমার সামনে এসে উবু হয়ে বসে প্রণাম করল। এইটুকু মেয়ে আমার, এবার সত্যি সত্যিই সে চোখের আড়ালে গিয়ে থাকবে। কী খাবে কী করবে, কিচ্ছু দেখতে পাব না। ভাবলেই কেমন একটা হচ্ছে বুকের মধ্যে। কাউকে এই অনুভূতির কথা বলা যায় না, আবার মনে হয় কাউকে বলতে পারলে একটু হাল্কা লাগত।

আমি মেয়ের মাথায় হাত রাখলাম। খুব চেষ্টা করেও চোখের জল আটকাতে পারছি না। মেয়ে কিন্তু একটুও কাঁদছে না। ও এই বয়সে এত আবেগহীন হতে পারছে কী করে? মেয়েরা বিয়ের পর বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় কত কাঁদে। আর এইটুকু মেয়ে, যদিও তার বিয়ে হয়নি; সে যাচ্ছে হোস্টেলে, আসবে হয়তো মাসে একবার; কিন্তু তার কি একটুও কান্না পাচ্ছে না?

মেয়ের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, সে এখনও মায়ের ছবির দিকে তাকিয়ে আছে। তারপর মুখ নামিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “বাবা, হরিকাকুকে ফোন করবে না? আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে তো। এগারোটার মধ্যে স্কুলে ঢুকতে হবে না?”

হরি আমার বন্ধু। তার গাড়ি আছে। কথা হয়ে আছে, ওকে এগারোটার দিকে ফোন করলেই গাড়িটা নিয়ে আসবে, ওটাতেই করে আমরা যাব। এখন বাজে দশটা দশ। হরিকে ফোন করার কথা মেয়ে মনে করাল। আমি হরিকে ফোন করে দিলাম। ও জানাল এক্ষুনি আসছে।

মেয়েকে বললাম, “শোন মা, এবারে ওখানে গিয়ে খুব ভালো করে পড়াশুনো করিস কিন্তু। আমি তোর স্যার বা ম্যাডামদের মাঝেমধ্যেই ফোন করে তোর খবর নেব। তুইও আমাকে ফোন করিস রোজ একবার করে। আর বাইরে একা বেরোবি না। বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলো করিস, আর চেষ্টা করবি একদম ওদের সঙ্গে ঝগড়া না করার। মনে রাখবি, ওরাই তোর সবচেয়ে কাছের মানুষ হয়ে উঠবে কিন্তু আস্তে আস্তে। ওদের সঙ্গে ঝগড়া করলে বা সম্পর্ক খারাপ করলে তোরই ক্ষতি। একা বন্ধুহীন থাকতে কেমন লাগে, আমাকে দেখে সেটা বুঝতে পারিস তো?”

মেয়ে হাসল। ও নিশ্চয়ই জানে, বাবা এই বিশাল একা বাড়িতে কীভাবে একা থাকে। এখন ওর বাবা আরও একা হয়ে পড়ছে। ও যেটা জানে না, রাজুর মাকে আমি সামনের মাস থেকেই আসতে বারণ করে দেব। আমার একার জন্য আর কাজের লোকের প্রয়োজন দেখছি না। ও থাকলে ওর স্কুলের টিফিন রেডি করে দেওয়া,ও স্কুল থেকে ফিরলে ওকে খাবার দেওয়া, ওর জামাকাপড় কেচে দেওয়া— এইসব কাজের জন্যই রাজুর মাকে রেখেছিলাম। এখন সে-সবের পাট চুকে যাচ্ছে।

হরি চলে এল মিনিট তিনেকের মধ্যেই। আমার মেয়ে আর রাজুর মা ততক্ষণে ব্যাগগুলো বাড়ির সামনের রাস্তায় নামিয়ে রেখেছে। আমিও একটা ব্যাগ নামালাম। গাড়িটায় এবার ব্যাগগুলো তুলতে হবে।

দ্বিতীয় ব্যাগটা তোলার সময় মেয়ে হঠাৎ, “দাঁড়াও বাবা, একটা জিনিস আনতে ভুলে গেছি” বলে ছুট্টে বাড়ির মধ্যে ঢুকে গেল। দেখলাম সে আমার লেখবার ঘরের দিকেই গেল। আমি ব্যাগগুলো গাড়ির পিছনে তুলে দিয়ে গাড়িতে উঠে বসলাম। রাজুর মাকে বললাম, “তুমি এবার বাড়ি চলে যেও। এবেলা আর কোনও কাজ নেই। ওবেলা এসো। রাজুর মা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, রাই সোনা গাড়িতে উঠুক, তারপর যাচ্ছি।”

রাজুর মা রাইকে প্রচণ্ড ভালোবাসে। ওকে হোস্টেলে পাঠানো হবে শুনেই সে একচোট কেঁদে নিয়েছিল। এখনও দেখলাম তার চোখ ছলছল করছে। মেয়েকে খাওয়ানো, জামাকাপড় পরিয়ে স্কুলে দিয়ে আসা, ফিরে এলে আবার তার খাবার রেডি করে দেওয়া, তার জামাকাপড় কেচে দেওয়া, তার ব্যাগ থেকে বইখাতা বের করে টেবিলে সাজিয়ে রাখা— এইসব তো রাজুর মা-ই করত এতদিন। এবার সে এ বাড়িতে প্রায় কর্মহীন হয়ে পড়ল বলতে হবে।

মেয়ে আবার ছুটেই বেরিয়ে এল। দেখলাম, তার হাতে একটা খবরের কাগজে মোড়া চারকোণা চ্যাপ্টা বস্তু। দেখেই বুঝলাম জিনিসটা কী।

আমার ঘরের লেখার টেবিলের ঠিক ওপরে এটা টাঙানো থাকে। মানে এতদিন ছিল। মেয়ে এটা নিয়ে যাচ্ছে। মানে ওর থাকবার জায়গার সামনেই রাখবে। আর রোজ দেখবে। মায়ের ছবি না দেখলে ওর দিন শুরুই হয় না।

এবার দেখলাম, মেয়ের চোখে জল। আমি বললাম, মাকে সাবধানে রাখিস, পড়ে গিয়ে ভেঙে না যায়।

মেয়ে আমার দিকে হাসল, “তোমার চেয়েও বেশি যত্নে রাখব, দেখো।”

আমি হাসতে গিয়েও থেমে গেলাম। এটা ও সত্যিই বলেছে। এইটুকু মেয়ে, কিন্তু একদম বড়দের মতোই কথা বলে।

গাড়ি ছেড়ে দিল।

স্কুলটার কম্পাউণ্ড বেশ বড়। আমার অভিজ্ঞ চোখ বলল অন্তত পাঁচ বিঘা জায়গার ওপর স্কুল আর হোস্টেলটা। সামনে বড় খেলার মাঠ। এই স্কুলটায় মাধ্যমিক অব্দি ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে পড়ে, ইলেভেনে আর টুয়েলভে শুধু ছেলেরা। দুটো হোস্টেল আছে ছেলে আর মেয়েদের, দুটোই একেবারে আলাদা। চারদিকে সবকিছুই ঝকঝকে পরিষ্কার, নিয়মকানুনও খুব কড়া শুনেছি। আমার এক বন্ধুর দাদা এখানে ইংরেজির মাস্টার, সেই দাদাই রাইকে ভর্তি করতে মূল উদ্যোগটা নিয়েছে। আজ আমাদের স্কুলে ঢুকতে দেখে সেই অনির্বাণদা স্টাফরুম থেকে নেমে এল।

“এই যে প্রবাল! এসে গেছিস, বাহ বাহ। আয়, তোর মেয়ে কই? ওহ বাবা বেশ বড় হয়ে গেছে তো! কী যেন নাম… হ্যাঁ রাই। আয় রাই… নেমে আয়।”

অনির্বাণদা, আমি জানি আমার মেয়েকে নিজের মেয়ের মতোই খেয়াল রাখবে। এই দাদাটি আছে বলেই আমি খুবই নিশ্চিন্তে আছি। মেয়ে এখানে ভালোই থাকবে। মেয়েদের হোস্টেল যিনি চালান, সেই রূপাদির সঙ্গে আমি আগের বার এসে কথা বলেছিলাম। আমার মেয়ে এর আগে কখনও বাইরে একা থাকেনি শুনে সেবার সেই দিদির কী হাসি। “আরে, এখানকার বেশিরভাগ মেয়েই তো তাই। কিন্তু দেখুন, সবাই কত আনন্দে আছে। এত বন্ধু একসঙ্গে পাওয়া, তাও আবার তাদের সঙ্গে রাতদিন দেখা হচ্ছে, একসঙ্গে খেলাধুলো করছে, পড়ছে— এত কিছু কোথায় পাবে এরা? দু’দিন বাদেই দেখবেন মা-বাবাকে… ওহ সরি— মানে আপনাকেই ভুলে যাবে।”

দিদির কথাবার্তা শুনে আমি আরওই নিশ্চিন্ত বোধ করি সেদিন। আমার মেয়ে এখানে ভালোই থাকবে, এই ধারণা আমার মধ্যে বদ্ধমূল হতে থাকে।

আজকে হোস্টেলে গিয়ে ব্যাগপত্র রেখে মেয়ে সোজা চলে যায় ক্লাসঘরের দিকে, ক্লাসের ঘণ্টা বেজে গেছে, শুনতে পেলাম।

স্কুল শুরু হয়, আমি হেডমাস্টারের সঙ্গে একবার দেখা করে যাব বলে অফিস ঘরের দিকে এগোই। হরিও আমার সঙ্গে আসে। আমরা একসঙ্গেই তো ফিরব।

হেডমাস্টার পরিমল সাহা ভারী ভালো মানুষ, আগেই জেনেছি। যেটা সচরাচর দেখা যায় না। আগের দিনের মতো আজকেও আমাকে দেখে চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে বসতে দিলেন, পাশের ঘরে গিয়ে বলে এলেন চা বানাতে। বড় স্কুলে সবসময় চা বানানোর ঠিক বন্দোবস্ত করা থাকে, আমার জানা আছে।

এসে তিনি চেয়ারে বসে বললেন, “আপনার মেয়েকে ক্লাসে দিয়ে এসেছেন তো? ঠিক আছে। আজ থেকেই ওর দায়িত্ব আমাদের। বাড়ি ছেড়ে যারা এখানে এসে থাকে, তাদের আমরা একটু বেশিই যত্ন নিই। তারা যে বাড়িতে নেই, এটাই বুঝতে দিই না আরকি। থাকা-খাওয়া নিয়ে কিচ্ছু অসুবিধা হবে না, ও নিয়ে আপনাকে ভাবতেও হবে না। আর আপনাকে শুধু অনুরোধ মাঝেমধ্যে এসে একটু দেখা করে যাবেন। মেয়েকে তো দেখবেনই, সেটার পাশাপাশি আমাদের সঙ্গেও দেখা করবেন। পড়াশুনোর কী হাল, সেটা আমরা আপনাকে তাহলে নিয়মিত জানাতে পারব আর কি। তবে আপনার মেয়ে যেরকম ব্রিলিয়ান্ট, ও এখানে উন্নতি করবে তাতে সন্দেহ নেই।”

হেডমাস্টার বড্ড বেশি কথা বলেন। যদিও মানুষটা ভালো— শুনতে শুনতে ভাবছিলাম। আমার আর বলার মতো কিছু ছিল না। যা বলবার, উনিই তো বলে দিলেন।

আমি শুধু আস্তে আস্তে জিজ্ঞেস করলাম, “মেয়ে রোজ রাতে যেন আমাকে একটা করে ফোন করে, এটা একটু দেখবেন প্লিজ। যদিও রূপাদিকে বলেছি, তবু আপনাকেও বলা রইল, আসলে আমার একটা মাত্র মেয়ে, বুঝতেই পারছেন; দিনে অন্তত একবার কথা না বলতে পারলে…”

“আরে, ও নিয়ে আপনি কিচ্ছু ভাববেন না, আচ্ছা আমাদের রূপাদিকে আমি না হয় আর একবার বলে দেব, অনেকেই তো তাদের বাবা কিংবা মাকে রাতে দিনে যখন দরকার রূপাদির ফোন থেকেই ফোন করে, আমিই ওঁর ফোনে রিচার্জ করে দিই প্রতি মাসে।”

এইরকম আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তা হল, চা বিস্কুট এল, আমরা খেলাম। তারপর বাইরে বেরিয়ে ঠিক করলাম, আর একটু থেকে যাই। এই ক্লাসটা শেষ হলে মেয়ের সঙ্গে আর একবার দেখা করে চলে যাব। ক্লাসে কী হল-টল, একটু জেনে গেলে ভালোই হয়।

গাড়িতে বসে একটা সিগারেট ধরালাম, সেটা শেষ করার আগেই বেল পড়ে গেল। প্রথম পিরিয়ড শেষ হল।

ক্লাস থেকে বেরিয়ে অনির্বাণদা-ই আমাদের দেখতে পেয়ে আবার এগিয়ে এল।

“এই যে, প্রবাল, আছ তাহলে। বাহ। তোমার মেয়ের ক্লাস তো হয়ে গেছে, একবার দেখা করেই যাও। চলো, আমি তোমায় ওই ক্লাসটা ঘুরিয়ে আনি।”

আমি গেলাম। অনির্বাণদা জানাল, “এই স্কুলে এ-বছর মাধ্যমিকের যে ব্যাচটা, সেটা মারাত্মক সব ভালো ভালো ছেলেমেয়েতে ভর্তি। মাধ্যমিকে একজন কেন, একাধিকজন স্ট্যান্ড করলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।”

শুনে আমার আনন্দ হলেও মেয়ের কথা ভেবে আবার মনটা খারাপ হয়ে গেল। আজ থেকে আমাকে বাড়িতে একাই থাকতে হবে।

সেভেনের সি সেকশনে গিয়ে দেখি, মেয়েদের দিকে তিন নম্বর বেঞ্চে বসে আছে রাই। এক ধারে, পরে ক্লাসে ঢুকেছিল তো, তাই বোধ হয়। আমাকে সে দেখতে পেল। বাইরের দিকেই তাকিয়ে বসেছিল। উঠে বাইরে এলে আমি তাকে বললাম, “এই আমি আসছি রে। ভালো করে মন দিয়ে ক্লাস কর, ঠিকঠাক খাওয়াদাওয়া করিস। আর রাত জাগবি না একদম। ঠিক আছে? কোনও সমস্যা হলে আমাকে ফোন করবি। আমি যাই।”

মেয়ে বলল, “আচ্ছা। তুমিও রাতে জাগবে না এবার থেকে। ঠিকমতো খাবে। আর তোমার আসল কাজ যেটা, সেটায় সবসময় লেগে থাকবে। আর কেউ তোমাকে তো আর ডিস্টার্ব করবে না। আমাকে দেখতে আসবে কিন্তু মাঝেমাঝে।”

দেখলাম, মেয়ের চোখে জল। মুখটা কঠিন হয়ে আছে। আমি মেয়ের মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিলাম। এবার যাওয়া উচিত। বাচ্চাদের সামনে চোখ থেকে জল বেরিয়ে আসাটা কেমন দেখাবে!

বাড়িতে এসে লেখার টেবিলে বসে দেওয়ালের দিকে তাকাতে দেওয়ালের সাদাতর অংশটা চোখে পড়ল। এখানেই ছিল ছবিটা। রাই নিয়ে গেছে। হোস্টেলে দেখে আসা হল না ওটাকে ও কোথায় রাখছে। থাক, পরের বার দেখে আসা যাবে। এ বাড়িতে ওর মায়ের আরও ছবি আছে। তার থেকে একটা এনে এখানে লাগিয়ে দিতে হবে এক্ষুনি। এই ফাঁকা জায়গাটা আমার কেমন সহ্য হচ্ছে না।

আমি উঠে গিয়ে পাশের ঘরের দেওয়াল থেকে একটা ছবি খুলে আনলাম। সেটা আগের ছবির জায়গায় লাগাচ্ছি, রাজুর মা পিছন থেকে বলল, “দাদাবাবু, খেতে আসুন, অনেক বেলা হয়ে গেল।”

“দাঁড়াও, এটা লাগিয়ে নিই। রাই এখানকার ছবিটা নিয়ে গেছে কাগজে মুড়ে। মা-কে না দেখে ও থাকতেই পারে না। আমার আর একটু লেখার কাজ বাকি আছে। তুমি খেয়ে নিয়ে বাড়ি চলে যাও, আমি পরে খাব। কিচ্ছু ভেবো না।”

রাজুর মা চলে গেল, দেখতে পেলাম। আমার মতের ওপর কথা চলে না, ও সেটা জানে। আমি ছবিটা লাগানো হয়ে গেলে চেয়ারে বসলাম। লেখাটা এইবেলা শেষ করতেই হবে।

কিন্তু লিখতে বসেই টের পেলাম, আমার কলম থেকে একটাও অক্ষর বেরোচ্ছে না। সকালে তাও কিছুটা লিখতে পেরেছিলাম, পাতা দুয়েক, কিন্তু এখন সেটুকু পড়তে গিয়ে দেখলাম, কিচ্ছু মনে নেই কী লিখেছি। মনে হচ্ছে অন্য কারও লেখা পড়ছি। তবু সবটা পড়বার পর খেয়াল করলাম, এর পর কী লিখব, কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। অথচ এই গল্পটা শুরু করবার সময় আমার মাথায় সবটাই ঠিক করা ছিল। শেষে কী হবে, কতগুলো চরিত্র থাকবে, কী তারা বলাবলি করবে নিজেদের মধ্যে— সব। কিন্তু এখন মাথা পুরো ফাঁকা। ভাবলাম, খেয়ে এসে একবার চেষ্টা করব।

রাজুর মায়ের রান্নার হাত বেশ ভালো। তবু আমার ইদানীং খেতে বিশেষ ভালো লাগে না। সামান্য খাই, বেশিরভাগটা পড়ে থাকে, বিকেলবেলা এসে রাজুর মা খেয়ে নেয়। আমার আজও রুচি নেই দেখলাম। সামান্য খেলাম, বাকিটা ফ্রিজে ঢুকে গেল।

খেয়ে এসেও একটুও লিখতে পারলাম না। মনে হচ্ছে, গল্প লেখা আমার কাজ না, আমাকে জোড় করে এখানে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। খেলার মাঠে নিয়ে ছেড়ে দিলেও নির্ঘাত এটাই আমার মনে হত। ক্রিকেট খেলায় আমার দক্ষতা, আর লেখালিখিতে আমার দক্ষতা একই পর্যায়ে নেমে এসেছে। যাকে বলে শূন্য।

বিছানায় গিয়ে গড়িয়ে গেলাম। কী আরামের এই হুয়ে থাকা। মেয়ে বাড়িতে থাকলে দুপুরে আমাকে একদম ঘুমোতে দেয় না, ও স্কুল থেকে ফিরে যেন আমাকে কাজ করতে দেখে, এটাই ছিল ওর নির্দেশ। আমি রোজ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতাম সে নির্দেশ। দুপুরে খেয়েই লিখতে বসতাম। মেয়ে ফিরত তিনটে নাগাদ, তখন আমি পুরো জেগে। ও ফিরলে একসঙ্গে খেতে বসতাম।

আজ থেকে সবই তাহলে পাস্ট টেন্সে বলতে হচ্ছে আমাকে? খেতাম? বসতাম?

বিছানায় গিয়ে শুয়ে গড়াবার সঙ্গে সঙ্গেই আমার চোখে নেমে এল ঘুম। গভীর ঘুম। আর কিচ্ছু মনে রইল না। মেয়ের চলে যাওয়া, একটুও লিখতে না পাড়ার আক্ষেপ— কিচ্ছু না।

ঘুম ভাঙল সন্ধেয়, রাজুর মায়ের ডাকাডাকিতে। দাদাবাবু, ঘুমোচ্ছেন, এদিকে যে সন্ধে নেমে এল। “উঠুন, চা খাবেন।”

আমি উঠে বসলাম। মাথা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। একেবারে শুরুতে কোথায় আছি, কে আমি, কিচ্ছু বুঝতে পারলা না। তারপর আস্তে আস্তে সব পরিষ্কার হল। মেয়ে নেই। তাকে এখন অনেকদিন দেখতে পাব না। বুকটা ধড়ফড় করে উঠল। আর একদিন এরকম হয়েছিল। একদিন না, আরও বেশ কয়েকদিন।

উঠে মুখেচোখে জল দিলাম। চা খেলাম। একটু মুড়ি খেলাম। খেয়ে লিখতে বসলাম। আর তক্ষুনি আবার টের পেলাম, আমার কলম থেকে লেখা হারিয়ে গিয়েছে।

বড় বড় লেখকদের এই ব্যাপারটা হয় বলে শুনেছি। এক একসময় তাঁরা কিচ্ছু লিখতে পারেন না। তখন বাইরে কোথাও ঘুরে আসেন, মানে শর্ট ট্রিপে ঘুরে আসেন ঝাড়খণ্ড বা বিহারের কোনও জায়গা থেকে। একটু হাওয়াবদল করলে, মানে একঘেয়েমি কাটালে আবার ফিরে আসে লেখার হাত। আমাকেও এবার কি সেরকম বায়ুপরিবর্তনে যেতে হবে নাকি?

পরপর তিনদিন একটুও লিখতে না পারার যন্ত্রণা নিয়ে বসেছিলাম জানলার ধারে। কাল রাতে রাইয়ের ফোন আসেনি, হোস্টেলের সেই রূপাদির ফোনও অফ ছিল। রাতে খুবই চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম। অনির্বাণদাকে ফোন করতে গিয়েও করিনি, ও কী-ই বা করত, ও তো আর হোস্টেলে থাকে না। সকালে উঠে অবশ্য ফোন করে রূপাদিকে পাই। তিনি জানান, তাঁদের হোস্টেলে রাতে কারেন্ট ছিল না, তাই মোবাইলের চার্জ শেষ হয়ে অফ হয়ে গিয়েছিল। রাইয়ের সঙ্গে কথা বললাম না, কারণ রূপাদি জানালেন যে সে ঘুমোচ্ছে। বুঝতে পারলাম যে রাতে কারেন্ট না থাকায় মেয়ে ঘুমোতে পারেনি। আমি তো জানি, ফ্যান না চললে ও একটুও ঘুমোতে পারে না। এখানে থাকবার সময় কারেন্ট গেলে আমি ওকে পাখার হাওয়া করে করে ঘুম পাড়াই, মানে পাড়াতাম। কিন্তু হোস্টেলে কে ওকে পাখার বাতাস খাওয়াবে?

লেখা আসে না বলে এখন আমি বই পড়ি। জানলার ধারে বসে কতরকমের বই পড়ি। একটা বাড়িতে একা একা থাকতে কি ভালো লাগে? বন্ধুদের কারোর সঙ্গেই প্রায় যোগাযোগ রাখিনি, তারাও আমার খোঁজ খবর নেয় না। বছর দুয়েক আগে স্বাতী চলে যাওয়ার পর থেকেই আমি নিজেকে একেবারে গুটিয়ে নিয়েছি, বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগও একেবারে কমিয়ে দিয়েছি। নিজেকে আবদ্ধ করে ফেলি এই বাড়িটায়। রাইকে মানুষ করব ভেবে অন্য অনেক কাজ থেকে নিজেকে সরিয়ে আনি। এখন আবার বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে আমার ইগোয় বাধছে। নির্বান্ধব একা আমি, বাড়িতে সারাদিন থাকি আর স্মৃতির জাবর কাটি। আর কবে লেখা ধরা দেবে,সেই অপেক্ষায় থাকি।

স্বাতী যখন চলে গেল, রাই তখন দশ বছরের। এই বয়সের বাচ্চাদের মেমরি যথেষ্টই স্ট্রং হয়। তাঁদের বাবামায়ের কথা সবই মনে থাকে, তারা বাবামায়ের মধ্যে তুলনাও করতে শিখে যায়। কে ভালো কে খারাপ, এই নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্বও তৈরি হয় কখনও কখনও। আর এটা আমি জানি যে রাই ওর মাকেই বেশি পছন্দ করত।

তাই স্বাতী চলে যাওয়ার পর আমার কাজটা খুব কঠিন হয়ে যায়। রাইকে কীভাবে মানুষ করব, ভেবেই তখন মাথা খারাপ। কাজটা কীভাবে করব ভেবেই পাইনা। তারপর আমি রাইকে কদিনের জন্য পাঠিয়ে দিলাম ওর মামার বাড়িতে। সেখানে দুই মামি আছে, মামাতো তিনজন দাদা আর এক বোন আছে, ভেবেছিলাম ওখানে ও ভালোই আনন্দে থাকবে। কিন্তু দিন তিনেক বাদেই ও বাড়িতে ফিরে আসার জন্য কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। আমি অগত্যা ফিরিয়ে আনি।

দেখলাম, বাড়ি ছেড়ে মেয়ে কোথাও গিয়ে থাকতেই চায় না। কতবার বেড়াতে গিয়েছি ওকে নিয়ে, বড়জোর দিন তিনেক বাদেই ফিরে আসবার জন্য বায়না শুরু করে দিয়েছে। তাই ওকে নিয়ে বড়সড় ট্যুরে যেতাম না। এই বাড়ির প্রত্যেকটা যায়গায় ও নাকি মাকে দেখতে পায়। বাইরে গেলে শুধু মায়ের কথা মনে পড়ে, তাই ফিরে আসতে চায়।

আমি ভেবে দেখলাম, এইভাবে সবসময় বাড়ি আঁকড়ে পড়ে থাকা মেয়ের পক্ষে পরে খারাপ বিষয় হয়ে উঠতে পারে। ও আরও বড় হবে, কলকাতায় পড়তে যাবে, তারও পরে বিয়ে করবে একদিন, তখন? এখন থেকে ওর একটু একটু করে বাইরে থাকা অভ্যেস করানো উচিত, আমার তখন খুব মনে হল। তাই মেয়েকে আমি হোস্টেলে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলাম মাস দুয়েক আগে। তারপর ওকে রাজি করাতে আমাকে যে কত কী করতে হয়েছে, এখন ভাবি। এমনিতে বললে ও কোনও দিন রাজিই হত না।

এটা ঠিক যে রাইকে এই হোস্টেলে পাঠানো, আর সেই পাঠাতে রাজি করাবার বুদ্ধি—দুটোই আমাকে দিয়েছিল হরি।

ও-ই আমাকে একদিন বুদ্ধি দিল, “তোর মেয়েকে হোস্টেলে পাঠাবার একটা ব্যবস্থা কর। তাহলে ওর বাড়িতে থাকবার এই টান— এটা দূর হবে বাইরে থাকতে থাকতে। নতুন বন্ধুদের পেলে ও দেখবি আর বাড়িই আসতে চাইবে না।”

আমি তো শুনে আঁতকে উঠেছিলাম। যে মেয়েকে তিন দিনের বেশি বাড়ির বাইরে রাখা যায় না, সে যাবে হোস্টেলে? ওকে কিছুতেই পাঠানো যাবে না।

তখন আমার কথা শুনে হরি বলেছিল, আরে তুই আমার কথাটা পুরো শোন আগে। কীভাবে যেতে রাজি করাবি সেটাও বলি শোন।

রাইকে হরির প্রস্তাবটা পুরোটা শুনে হোস্টেলে পাঠাবার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিই আর ওর প্ল্যানমাফিক কাজ করতে শুরু করি। সেই প্ল্যান অনুযায়ী হোস্টেলে অবশেষে গেল রাই। আর যেটা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি, সেটাই ঘটেছে এরপর। আমার লেখালিখি বন্ধ হয়ে গেছে।

রাইকে শুনিয়ে শুনিয়ে বেশ কয়েকদিন ধরেই আমি বলতে থাকি যে আমার লেখালিখি হচ্ছে না ওর জন্য। ওকে পড়ানো, ওর হোমওয়ার্ক করে দেওয়া, ওর পিছনে লেগে থাকা— এতে আমার কাজের ক্ষতি হচ্ছে। ও যদি হোস্টেলে থাকত, তাহলে আমার কাজে খুবই সুবিধা হত।

এই কথাগুলো— হরির প্ল্যান অনুযায়ী— বেশ কয়েকদিন ধরে শোনানোর পর একদিন রাই-ই আমাকে বলল, আচ্ছা ঠিক আছে। বাবা আমি হোস্টেলে যাব। তুমি আমাকে ভর্তি করে দাও।  

মেয়েকে হোস্টেলে পাঠানোর জন্য যে মিথ্যে কথা বলেছিলাম, সেটাই এখন ব্যুমেরাং  হয়ে এসেছে আমার কাছে। লেখালিখি হারিয়ে গিয়েছে আমার হাত থেকে।

মাসখানেক বাদে। আবার সেই হরির গাড়ি। আবার একইরকম সকাল। রাজুর মা গাড়ি থেকে ব্যাগগুলো নামাচ্ছে। আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি। কী মিষ্টি রোদ বাইরে। ওই তো আমার রাই গাড়ি থেকে নামছে। হাতে আগেরবারের মতো সেই কাগজে মোড়া ওর মায়ের ছবিটা। এবারে আমি আর ওকে আনতে যাইনি। আমার মেয়ে আবার ফিরে আসছে আমার কাছে, এই দৃশ্যটা দেখব বলেই যাইনি। আমার বদলে গিয়েছিল রাজুর মা।

রাই নেমে সোজা আমার কাছে চলে এল। এসে বলল, “তোমার লেখার কাজে আবার ডিস্টার্ব করব। এই নাও, মা-কেও নিয়ে এলাম।”

আমি হেসে জানালাম, “আচ্ছা করিস। যত ইচ্ছে ডিস্টার্ব করিস।”  

মনে মনে বললাম, তুই থাকলেই বরং লিখতে পারব রে মা। তুই থাক।

অলঙ্করণঃ মৌসুমী

জয়ঢাকের সমস্ত গল্পের লাইব্রেরি এই লিংকে