গল্প আলোর কৌটো জয়তী রায় শরৎ ২০২০

জয়তী রায়ের আগের গল্প- চোখ, গজুমামা জিন্দাবাদ

আলোর কৌটো

জয়তী রায়

যদি বলো মধুপুর গ্রাম কেন বিখ্যাত, লোক বলবে শ্যামকালী মন্দির আর তার সেবায়েত সাধুচরণের জন্য। দূর দূর থেকে লোক আসবে। মন্দিরের পাশে বড়ো বটগাছের ছায়ায়, লাল সিমেন্টের বাঁধানো বেদিতে বসে পড়বে থপাস করে। পাশে রতন মুদির থেকে জল-বাতাসা, চিঁড়ে-মুড়কি কিনে খাবে। বটগাছটি বুঝে বুঝে সুন্দর বাতাস ধরে আনবে গায়ে গায়ে বয়ে চলা নদী রূপসা থেকে। গাছের সারা শরীরে মানুষ লাল সুতো বেঁধে বেঁধে আসল রঙটি বদলে দিলেও সে কিছু মনে করে না। সাধুচরণ হাসতে হাসতে বলবে, ‘মানুষ জানে লোভ করতে। গাছ জানে ত্যাগ করতে।’
মানুষটি রসিক। তান্ত্রিকদের মতো বিকট নয়। সাধাসিধে পোশাক, কপালে সিঁদুর-চন্দন দুটোর ফোঁটা, নিরামিষ খেয়ে সারাদিন শ্যামা সঙ্গীত গাইবে। কেউ যদি বলে, এ তুমি কেমন কালী সাধক হে! পশু বলি দিচ্ছ না, কথায় কথায় হুঙ্কার দিচ্ছ না, কাউকে তেড়ে মারতে আসছ না—লোকে মানবে কেন?
সাধু হেসে বলে, ‘মারণ-উচাটন বশীকরণ সব নীচু মানের সাধনা। ওসব করব কেন রে! মা বলে ডাকলেই যখন সে কথা শোনে!’
সেকথা একশো বার মানবে গাঁয়ের লোক। পাথরের প্রতিমা সাধুর ডাকে কথা শোনে। কার বাড়িতে চুরি হল মেয়ের বিয়ের গয়না, চোর বেরোল নিজের মামাতো ভাই। ব্যাটা কলকাতায় গিয়ে হিরো হবে ভেবেছিল। সাধু বলে দিল তার নাম। হিরোগিরি গেল গোল্লায়, এখন জিরো হয়ে জেলে।
দয়ালবাবু গাঁয়ের মাথা। কিন্তু মানুষ বড়ো সাধাসিধে। সাধু একদিন নিজের থেকে ডেকে বললে, “তোমার মাথায় বিপদ ঝুলছে গ। এখন ক’দিন গঞ্জের দোকানে যেওনি বাপ।”
গঞ্জের নামকরা কাঠের ব্যাপারী দয়াল। টেন্ডার ভরতে যেতেই হবে। না হলে অন্য কেউ গাপ করবে। সাধুর বারণ না শুনে দুই লেঠেল, এক বন্দুক নিয়ে চলল। তারপরের কথা সবাই জানে। প্রাণ নিয়ে ফেরেনি কেউ। অঘোর জঙ্গলের সামনে পড়েছিল ছিন্নভিন্ন হয়ে। কে করল, কী করল, কে বুঝবে?
সেদিন জমিদারের একটি মাত্তর নাতির ভেদবমি। জমিদার-গিন্নি দৌড়ে এসে আছড়ে পড়ল মন্দিরের চাতালে। তখন রাত দশটা। গিন্নির সে কী কান্না! “যত ডাক্তারই দেখুক বাবা, আমি তোমার ভরসায় রইলাম।”
সাধু মন্দিরের দরজা বন্ধ করে সারারাত পুজো করলে। মাঝে মাঝে জড়িবুটি মেশানো চরণামৃত। পরদিন নাতি উঠে খেলতে লাগল। জমিদারবাবু বড়ো খুশি। সাধুর কথায় কাঙালি ভোজন লাগিয়ে দিলেন মস্ত করে। সাধুর নামে জয়-জয়কার। সে হেসে হেসে কয়, “ওরে, অলৌকিক ক্ষমতা সবার মধ্যে আছে। তবে তার প্রয়োগ? বুঝে বুঝে করতে হবে বাপ। লোকের অমঙ্গল করো যদি, ক্ষমতা একদিন তোমাকেই ছোবল মারবে।”
হাসিখুশি মানুষটিকে ভারি ভালোবাসে গাঁয়ের লোক। মন্দির ঘিরে আছে গাছ। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন সে বাগানে বসলে মন জুড়িয়ে যায়। বাড়তি পাওনা সাধুর গলায় অপূর্ব গান।
তবে সবটাই এমন ভালো ভালো গল্প হলে তো হয়েই যেত। তাই কখনও হয়? জীবন বয়ে চলে রূপসা নদীর মতো। কখনও তার শান্ত রূপ। কখনও বা ভয়ংকর। সাধুচরণের মতো সাদা মানুষেরও শত্তুর থাকে! অবাক হলেও সত্যি। লোক এত মানে, এত ভক্তি করে, তবুও…
নৌকা করে, রেলগাড়ি করে লোক আসছে তো আসছেই। সাধু টাকা না নিলে কী হবে, টুং-টাং ঠং-ঠং পয়সা পড়ে পড়ে পাহাড়। অমাবস্যা আর কালীপুজোয় ভক্তরাই প্যান্ডেল করে, মেলা বসিয়ে দেয়। শ্যামা কালীর মেলা। তাতেও দেদার আয়। একদলের চোখ মটকায়, নোলা দিয়ে জল পড়ে। রাগে দাঁত কিড়মিড়। লোভে কান চুলকে ওঠে। লুকিয়ে জোট পাকায়।
নদীর হুই পাড়ে শশ্মান ঘাট। পুরনো এক ভাঙা দেউল সেখানে। ভাঙা ইটের পাঁজা। সাপখোপের আড্ডা। বাদুড়-চামচিকের বাসা। সে দেউল কোন দেবতার আর কেই বা ভেঙে দিল, সে নিয়ে প্রচুর গল্প আছে। বলে, ওই দেউলে দেবতার পুজো নয়, অপদেবতার পুজো হত। সে পুজো করত একদল কাপালিক। কাপালিক বললেও বোঝানো যায় না। অতি গোপন আর উৎকট সাধন ছিল তাদের।
দেশে তখন ঘোর অমঙ্গল। কাপালিক নেতা মানুষ নয়। ছিল রাক্ষসের মতো। পিশাচসিদ্ধ। তার ছিল পোষা দুই ডানাওয়ালা পিশাচ। সে দুটো লোকের বাড়ি ঢুকে ঢুকে অত্যাচার করত। সে যে কী অবস্থা গেছে! অনেকদিন আগের কথা। লোকের মুখে মুখে তাতে রঙ চড়েছে অনেক। আজও দিনেমানে ওই জঙ্গলে ঢুকতে ভয় খায় লোক। দেউল ভাঙলে কী হবে! অপদেবতার শক্তি চলে যায় না। তাকে আবার জাগিয়ে তোলা যায়। তখন আবার শুরু হবে মন্দের বিরুদ্ধে ভালোর লড়াই।
সাধুচরণ গল্প করে। শ্রোতা হাঁ করে শোনে। মন্দিরে রাত বাড়ে। ধূপের গন্ধ, হাতজোড় করে বসে থাকা ভক্তের দল ভাবে, কেমন ছিল সে অপদেবতা? কেমন বিকট দর্শন? কী করে তাকে ধ্বংস করল?
সাধু বলে, “মানুষ বিপদে পড়লে কেউ না কেউ আসে। যুগে যুগে এমনটি ঘটে। চিন্তা কোরো না। পিশাচের হাত থেকে বাঁচাতে কেউ তো আসবেই।”
দূর জঙ্গলে কে যেন বিকট হেসে ওঠে। আগাছা, লতা, বিষাক্ত কাঁটা গাছের ঝোপে ঝোপে খিকখিক হাসি ছড়িয়ে পড়ে। সে হাসি শুনে শিউরে উঠে দৌড়ে পালায় হরিণ। জঙ্গলের ঝরনায় জল খেতে আসা হাতি, শুঁড় দিয়ে জড়ায় নিজের শিশুকে। রূপসা নদীর উপর দিয়ে বাতাস বইতে থাকে পচা মাংসের গন্ধ নিয়ে। তবে এপারে এসে থমকে যায় সব। মায়ের নামগানে বিভোর সাধু, টের পায় না তার পিছনে কে যেন নিঃশ্বাস ফেলে। কে যেন ছক কষে। কে যেন ছুরিতে শান দিয়ে চকচক, লকলক জিভ দুলিয়ে গভীর জঙ্গলে জাগিয়ে তুলছে পিশাচসিদ্ধ রাক্ষস। লক্ষ্য তাদের একটাই। শ্যামা কালীর মন্দিরের দখল। জল পড়া, তেল পড়া, বশীকরণ দিয়ে ব্যাবসা করা। গাঁজা থাকবে। মদ থাকবে। লোক হাত খুলে টাকা দেবে। সেই টাকা নিয়ে ধনী হবে এরা। ভাঙা দেউলের ধার দিয়ে, ঘাস-জঙ্গল মাড়িয়ে ছোপ ছোপ শব্দ। ঘন ঘন শ্বাস। মুশকোমতো, লম্বামতো, লাল লাল চোখ, বড়ো বড়ো বাবরি চুল, পরনে খাটো ধুতি, লোমশ হাত-পা। মুখ জুড়ে কাটা দাগ। গুণে গুণে চারজন লোক সেখানে বসে। রাত গভীর হচ্ছে। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে দেউলের দিকে। সেখানে ধীরে ধীরে পাকিয়ে উঠছে ধোঁয়ার কুণ্ডলী। লোকগুলোর মুখ দেখা যায় না। উত্তেজিত শ্বাস শোনা যায়। বিড়বিড় মন্ত্র শোনা যায়। জঙ্গল ত্রাসে চুপ। গাছপালা চুপ। মহাশশ্মান চুপ।
জাগছে। জাগছে। সে জাগছে।
ধীরে ধীরে কালো গাঢ় ধোঁয়ায় ঢেকে যায় চারদিক। অর্ধেক মানুষ, অর্ধেক পাখি—বিরাট শরীর একটু একটু করে বেরিয়ে আসে। কদাকার চেহারা দেখে প্রাণ উড়ে যায়। পৃথিবী কাঁপতে থাকে।
সঙ্গে সঙ্গে চারজন বলে ওঠে, “গড় করি মহারাজ। গড় করি পিশাচরাজ। জয় হোক। জয় হোক।”
লম্বা নখ বাড়িয়ে মাটিতে ঘা মারল সেই পিশাচ। আবার। আবার। প্রতিবার শব্দ হল, ঢং ঢং ঢং।
“এখানে মাটি খুঁড়ে বার করো কালীর মূর্তি। নিখুঁত শিশু চুরি করে বলি দাও। ব্যস, আমাদের জয়যাত্রা শুরু। মনে রেখো, শিশু বলি চাই। তবেই জাগব আমি।”
দমাদম কোদালের ঘা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আকাশ বাতাস কেমন আকুলি বিকুলি। কী যেন হতে চলেছে! ভয়ংকর কিছু?
আজ অমাবস্যা। ঘোর অন্ধকার। সেই সঙ্গে প্রবল বৃষ্টি। বাজ পড়ল। ঝলকে উঠল আলো। বড়ো বড়ো গাছ মাথা দুলিয়ে চলছে ভয়ংকর আক্রোশে। গ্রামের বাড়ির সব দরজা-জানালা বন্ধ। অজানা আশঙ্কা চেপে বসেছে সবার মনে। এমন ঝড়, এমন বৃষ্টি আগে দেখেনি কেউ। শ্যামাকালী মন্দিরে আজ কোনও লোক নেই। দোকানের ঝাঁপ ফেলে রতন মুদি চলে গেছে বাড়ি। মন্দিরের দরজা বন্ধ করে জেগে আছে সাধুচরণ। টিমটিম প্রদীপের আলো। বসে আছে সিধে হয়ে। সোজা চোখ মূর্তির দিকে।
এমন সময় তার দরজায় এসে দাঁড়ায় কেউ। পিছন ফিরে বসা সাধুর দিকে তাকিয়ে বলে, “শোনো, এদিকে তাকাও।”
“যা বলার ওখান থেকেই বলো।”
“যদি প্রাণ বাঁচাতে চাও, মন্দির ছেড়ে পালাও।”
“কেন? এ আমার মায়ের মন্দির।”
“যাবে না?”
“না।”
“তবে গাঁয়ের সব জলে, পুকুরে সব জায়গায় মিশিয়ে দেব বিষ। মরে যাবে সব লোক। ভেসে উঠবে মাছ। মহামারী ছড়িয়ে পড়বে।”
সাধু এবার সামনে ঘোরে। চৌকাঠের ওপারে যে দাঁড়িয়ে, তাকে দেখে ভয় পাবার কথা। ভাঁটার মতো লাল চোখ জ্বলছে। জলে ভেজা শরীর, কালো বলিষ্ঠ। প্রদীপের টিমটিম আলোতেও মুখের হিংস্র ভাব ঢাকা পড়েনি।
শান্ত ভঙ্গিতে সাধু বলে, “তোমাদের পিশাচরাজ এখনও জাগেনি। তাকে ছাড়া তোমাদের কোনও শক্তি নেই।”
“জাগবেন পিশাচ রাজ। শিশু বলি দেব এই মন্দিরে। জাগবেন তিনি।”
“আমি বেঁচে থাকতে তিলমাত্র ক্ষতি কারও হবে না কখনও। শিশু বলি দেবে তোমরা? এত সাহস?”
হা হা হা করে হেসে ওঠে ভয়ংকর কাপালিক। “কে আটকাবে? তুমি? ঘাস খাওয়া পূজারি? মনে রাখিস, আমরা আসছি। ভালোয় ভালোয় যাবি তো যা। না হলে তোকে ধরেও বলি দেব।”
বাইরের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল রাক্ষসটা। রেখে গেল একরাশ বুনো গন্ধ।
লড়াই তবে শুরু? তার কিছু নেই। ওদের অনেক কিছু আছে। তবে, তার আছে বিশ্বাস। ওদের সেটা নেই। তার আছে মানুষের ভালো করার ইচ্ছে। ওদের সেটা নেই।
বেদির ওপর বসানো দুই হাত লম্বা মায়ের মূর্তি। সাধুচরণ হাত দিয়ে চাপ দিলে। অল্প শব্দ করে পায়ের নিচে ফাঁক হল বেদি। সাধুর চোখ দুটো শান্ত। আছে। আছে সেই জিনিস। হাত ঢুকিয়ে বার করে আনল ছোট্ট এক কৌটো। স্ফটিকের তৈরি কৌটোর মধ্যে উজ্জ্বল হয়ে জ্বলছে আলো। আলো নয়। জীবন্ত কিছু।
বেদি আবার যথাস্থানে। মন্দিরের দরজা খুলে বেরিয়ে গেল সাধুচরণ।
দুর্যোগ থামল। সকাল হল। গাঁয়ের লোক দেখল, হাট করে খোলা মন্দিরের দরজা। সাধু কোথাও নেই। বদলে চারজন বিকট দর্শন কাপালিক সারা মন্দির চত্বর জুড়ে তাণ্ডব করছে। ত্রিশূল, মরা মানুষের খুলি, হাড়গোড়… বদলে গেছে মন্দির। শ্যামাকালীর মূর্তির বদলে কালো রূপের মহাকালী মূর্তি। কাপালিকদের মহা তর্জন গর্জন, “যা চাস তোরা তাই পাবি। তোদের কোনও দুঃখ থাকবে না।”
লোক অমনি গদগদ। সত্যি তো! যা চাই তাই পাব? সাধু এমন করে বলে না। তারা হাতজোড় করে বসে রইল।
“শত্তুর মারতে চাস? জমির দখল চাস? যা চাইবি তাই পাবি।”
কিছু লোক মিনমিন করে বলতে গেল, “আমাদের সাধু গেল কোথায়?”
শুনেই তারা বিকট চিৎকার করে আগুনে কী যেন ছুড়ে দিল। জ্বালা করে উঠল চোখ।
“চুপ! একদম চুপ। ও-ব্যাটা ভেগেছে। তোরা সন্দেশ খাবি? সোনার গয়না পরবি?”
শূন্যে যেই হাত দুলিয়ে দিল, সোনার মোহর পড়ল ঝমঝম। মিষ্টি, সন্দেশ, কচুরি, হালুয়া… মন্দিরে লেগে গেল মোচ্ছব।
বটগাছ শ্বাস ফেলে। রূপসা নদী শুকিয়ে ওঠে। মানুষ জাত নিমকহারাম বটে! শান্ত মন্দিরে এখন থেকে থেকে উৎকট চিৎকার। পিছনের জঙ্গলে গাঁজা-আফিমের কারবার। গ্রামের লোক একে অপরকে দেখতে পারে না। বিশ্বাস করে না। এদিক ওদিক হলেই এর ক্ষেত জ্বলে যায়, ওর ঘরে রোগে পড়ে লোক।
রাত গভীর হলেই চার কাপালিক ঢুকে যায় জঙ্গলের গভীরে। সেখানে লকলক জিভ পিশাচরাজ। ঘোর অন্ধকারে জ্বলজ্বল চোখ। “রক্ত কই? শিশু রক্ত? এখনও পারিসনি? হতভাগার দল! জেগে উঠবে না পিশাচ শক্তি।”
“নিখুঁত শিশু কে আছে মহারাজ?”
“জমিদারের নাতি। পরের অমাবস্যায় ওর বলি চাই।”
“কিছুতেই জমিদারবাড়ি ঢুকতে পারছি না। তারাও আসে না কেউ।”
“ঢুকতে পারিস না? কেন?” হিংস্র গলায় প্রশ্ন করে পিশাচরাজ।
“কাছাকাছি গেলেই ছিটকে ফেলে দেয় যেন কে। বুঝতে পারছি না। অন্ধকারে কত মন্ত্র পড়ি। কোনও কাজে লাগে না।”
“হুম। সাধু বসে আছে ওখানে। সঙ্গে আছে শক্তি। আলোর কৌটো। ওটা কেড়ে নিতে হবে।”
“আলোর কৌটো?” চার কাপালিক একসঙ্গে প্রশ্ন করে।
“আলোর কৌটো। ওর মধ্যে আছে শক্তি। বেরিয়ে যদি আসতে পারে, তবে সাপের মতো প্যাঁচ দিয়ে মারবে। সাধুকে আটকে ধরে কৌটো ফেলে দিতে হবে রূপসার জলে। তবে শুরু হবে অন্ধকারের রাজত্ব। শিশুবলি দিতে আর অসুবিধে হবে না।” হায়নার মতো হেসে উঠে পিশাচরাজ বলে, “সামনের তিনদিন আবার ঝড়বৃষ্টি হবে। লোকজন কম থাকবে। তোরা চেষ্টা কর। দরকার হলে গোটা বাড়িতে আগুন জ্বালিয়ে দে।”
শুনে সে কী হাসি কাপালিকদের। খারাপ কাজ যত বেশি, ওদের আনন্দ তত বেশি।
জমিদারবাড়ি। উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। বাড়ির ছাদের ঘরে বসে আছেন জমিদারমশাই আর সাধুচরণ। এই ক’দিন এখানেই গা ঢাকা দিয়ে ছিল সে। গ্রাম আর আশেপাশের সব লোক এখন কপালিকদের হাতের পুতুল, সে খবর জেনেও সে চুপ করে বসে ছিল। কারণ, আরও বড়ো সর্বনাশ এগিয়ে আসছে। সেটা হল পিশাচ শক্তির জেগে ওঠা। সেটাকে আটকাতে হবে।
“শুনুন জমিদারমশাই। আক্রমণের লক্ষ্য আপনি হবেন এবার, সেটা বোঝাই যাচ্ছে। আমি কেবল একটা জিনিস বুঝতে পারছি না।”
“সেটা কী?”
“পিশাচ শক্তি জাগিয়ে তোলার জন্য চাই শিশু রক্ত। সেটা কার শিশু?”
“সে কি!” ঘৃণায় শিউরে উঠলেন জমিদার। “আহা, কোন মায়ের কোল খালি হবে!”
“যদি আমার অনুমান সত্যি হয়, তবে হামলা এখানে হবে। আপনার নাতির ওপরে। এই বাড়িতে।”
“তাহলে? লোকজন জোগাড় করতে হবে।”
“লোকজন কিছুই করতে পারবে না। ওরা বশীকরণ জানে। তবে সময় চলে যাচ্ছে। এই সময় শিশুবলি দিতে না পারলে ফিরে যেতে হবে পিশাচকে।”
নিজের বাবরি চুলে হাত বুলিয়ে, চোখ বুজে টান শরীরে বসল সাধুচরণ। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চলেছে। ছাদের পশ্চিমদিকে অস্ত যাচ্ছে সূর্য। আকাশ জুড়ে খেলছে রঙের ঢেউ। ধীরে ধীরে চোখ খুলল। “আজ রাতে আসছে মারাত্মক ঝড়বৃষ্টি। ওদের হামলা হবে। আপনারা কেউ আর ছাদে আসবেন না। আমি একলাই থাকব।”
“সে কি!”
“চিন্তা করবেন না। আপনি নিচে যান। ভুলেও আসবেন না ওপরে। যত শব্দ হোক, তাণ্ডব হোক, কিছুতেই আসবেন না। মনে থাকে যেন।” কড়া আদেশের সুরে কথা ক’টি বলে উঠে দাঁড়াল। আকাশের সঙ্গে মিশে গেল যেন মাথা।
বিকেল গড়াতে লাগল রাতের দিকে। রূপসা নদীকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে ছুটে এল ক্ষ্যাপা বাতাস। জঙ্গল চিরে আর্তনাদ ধেয়ে আসতে লাগল জমিদারবাড়ির দিকে। বিকট সুরে কেঁদে উঠে কারা বলছে, “দে, দে, ওরে দে।”
বন্ধ হল গ্রামের সব জানলা-দরজা। নাতিকে বুকে নিয়ে ঠকঠক কাঁপছে বাড়ির লোক। পৃথিবী জুড়ে শুরু হল তুমুল বর্ষণ।
সাধুচরণ দেখল, মাঠ পার হয়ে বাড়ির দিকে ছুটে আসছে চার কাপালিক। চার, না চারশো? মুহূর্তে তারা ঘিরে ফেলল বাড়ি। অলৌকিক উপায়ে শূন্যে শরীর ভাসিয়ে ধেয়ে আসতে লাগল সাধুচরণের দিকে। সে কী ভয়ানক চেহারা! বিদ্যুতের আলোয় দেখা যায়, শূন্যে ভাসমান বিকট চেহারার কাপালিক, দু’হাত বাড়িয়ে গলা টিপতে আসছে সাধুর।
আর উপায় নেই। এবার সাহায্য নিতেই হবে সেই অমোঘ অস্ত্রের। বৃষ্টিতে সর্বাঙ্গ ভেজা। পাশে পড়ে আছে তার ঝোলা। সেই ভেজা ঝোলার মধ্যে থেকে বার করে নিল আলোর কৌটো। কৌটো ছোট্ট। এক বিঘত। ভিতরে জীবন্ত প্রাণীর মতো কিছু একটা লাফাচ্ছে। বেরিয়ে পড়তে চাইছে।
সাধু করজোড়ে ক্ষমা চাইল প্রথমে, ‘হে অলৌকিক শক্তি, আমার কোনও উপায় নেই। এদের সঙ্গে আমি পেরে উঠিনি। তুমি যদি পারো, তবেই বাঁচে এই গ্রাম।’
কৌটোর মুখ খুলে দিল সাধু। ভিতর থেকে লাফিয়ে নামল আগুন সাপ। ছোট্ট শরীর লম্বা হতে হতে ঘিরে ফেলল জমিদারবাড়ি। চারদিকে তুমুল হট্টগোল। কাপালিকের দল, জলভরা অস্ত্র ছুড়ে ছুড়ে মারছে জ্বলন্ত সাপের দিকে। সাপ তিরবেগে গিয়ে মুখ হাঁ করে গিলে খেতে চাইল কাপালিকদের। তারাও কম যায় না। এঁকে বেঁকে মন্ত্র পড়তে লাগল। তাদের সেই নাচনকোঁদন দেখে হা হা হা করে অট্টহাসি হেসে উঠল সাধুচরণ। “ওরে মূর্খের দল! ভেবেছিলি আমি পালিয়েছি? মূর্খ কালা জাদুকরের দল! নরশিশুর বলিদান কিছুতেই হবে না তোদের। পারিস যদি আয়।”
কাপালিকের দল থমকালো একটু। কিন্তু দমে গেল না। নতুন উদ্যমে পিশাচরাজার নামে উৎকট জয়-জয়কার দিয়ে শুরু করল। হলে হবে কী! শিশুবলি না হলে পিশাচ জাগবে না। তাই কাপালিকগুলো এঁটে উঠতে পারছিল না। সাধুচরণ আর তার আলোর কৌটো এখন অনেক বেশি শক্তিশালী। সাপের মতো প্যাঁচ দিয়ে জড়িয়ে ধরল আলো তাদের সব ক’টাকে। দম বন্ধ হয়ে ছটফট করতে করতে চোখ উলটে গেল চারজনের।
কাজ শেষ হতেই আলোর কৌটো আবার ছোট্ট হয়ে ঢুকে পড়ল সাধুর ঝোলায়। বৃষ্টি মুচকি হেসে আরাম করে থেমে গেল। রূপসা নদী ছোট্ট বালিকার মতো নূপুর বাজিয়ে কুলকুল করে বইতে লাগল। ছাদের পুব কোণে শুকতারা ফুটি ফুটি করতেই জঙ্গলে পিশাচরাজ কোথায় লুকিয়ে পড়ল কে জানে! সবচেয়ে খুশি বটগাছ। যাক, বাঁচা গেল। আর কোনও খারাপ কাজের সাক্ষী হতে হবে না তাকে।
জমিদারমশাই হইহই করতে করতে সাধুকে নিয়ে মন্দিরে চললেন। ওমা! সেখানে বেদির ওপর আবার মা শ্যামাকালী দাঁড়িয়ে। গ্রামসুদ্ধু লোক তখন জেগে উঠেছে। দৌড়ে দৌড়ে এসে, লজ্জা লজ্জা মুখে জয়ধ্বনি দিতে দিতে নিজেদের নাক কান মুলে বলল, “লোভে পাপ। পাপে মৃত্যু।”

ছবি: শিমূল সরকার

জয়ঢাকের গল্প ও উপন্যাস

1 Response to গল্প আলোর কৌটো জয়তী রায় শরৎ ২০২০

  1. Manasi Ganguli বলেছেন:

    বাহ্ খুব সুন্দর গল্প

    Like

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s