গল্প কমলাদিঘি উপাসনা পুরকায়স্থ বর্ষা ২০২০

উপাসনা পুরকায়স্থর আরো গল্প– ফটিকহেডস্যার, পুনুর পড়াশোনা

কমলাদিঘি

উপাসনা পুরকায়স্থ

এক

ধর্মনগর মফস্বল শহরটির নয়াপাড়া থেকে হুড়ুয়া যাবার পথের একধারে বড়সড় এক দিঘি। নাম তার, কমলাদিঘি। সবাই বলে, এই দিঘি নাকি বহুকাল আগে কোন এক ধনকুবের জমিদার অথবা রাজা খনন করেছিলেন। তবে সেই খননকার্যের সময় অর্থাৎ সন তারিখ কারও জানা নেই। সেই সময় প্রতিবছর নাকি এই অঞ্চলে গ্রীষ্মকালে পুকুর, নদী আর সমস্ত জলাশয় শুকিয়ে কাঠ হয়ে যেত। ফলে চারদিকে তীব্র জলাভাব দেখা দিত। এই ভয়ংকর জলাভাব থেকে প্রজাদের রক্ষা করতে গিয়ে দীর্ঘকায় অতি গভীর এই দিঘির জন্ম। তবে তারপর একসময় সুদীর্ঘকাল অযত্নে পড়ে থেকে থেকে সংস্কারের অভাবে আজ এই কমলাদিঘির অবস্থা একেবারে বেহাল। চারদিক জঙ্গলাকীর্ণ, জলের উপরিভাগে সবুজ পুরু শ্যাওলার আস্তরণ, অসংখ্য ভাসমান কলমিলতা শালুক-শাপলা-কচুরিপানার দাম আর জলের তলায় রয়েছে গভীর পাঁক। এককালের রাজা বা জমিদার আমলের পাকা বাঁধানো ঘাট কালের নিয়মে ভেঙেচুরে গুঁড়িয়ে গিয়ে একেবারে জরাজীর্ণ অবস্থা।

এত পুরনো আমলের দিঘি তো, তাই এতকাল পরেও এতে কিলবিল করছে কত কী মাছ। লোকে বলে, কতকালের রাক্ষুসে আকৃতির মাছেরা সব সারা গায়ে শ্যাওলা মেখে জলের তলায় এখন রাজত্ব করে বেড়াচ্ছে। শোল-মহাশোল, চিতল, বোয়াল, আড়, রুই, কাতলা থেকে শুরু করে ল্যাঠা, কই, ট্যাংরা, সরপুঁটি সবই রয়েছে এতে। শোনা যায়, বেশ ক’বছর আগে একবার নাকি খুব জোর ভূমিকম্প হয়েছিল ঐ অঞ্চলে। তখন এর এত বেহাল অবস্থাও ছিল না। দিঘি লাগোয়া গোবিন্দ চৌধুরীদের অত উঁচু মন্দিরের চুড়ো ভেঙে দিঘির জলে ধপাস! হঠাৎ করে অমন কাণ্ডে হতবুদ্ধি হয়ে ছোটোবড়ো বহু মাছ লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে নাকি ডাঙায় উঠে পড়েছিল। সেই ভূমিকম্পের পর তো দিঘিতে আর মাছের দেখা নেই, সব বেপাত্তা। জেলেরা জাল ফেললে, একটিও মাছ নেই। পরে এই জেলেরাই মাছ ধরতে গিয়ে আবিষ্কার করেছিল, জলে ডুবে থাকা ভাঙা মন্দিরের চুড়োর ভেতর সকল মাছেদেরকে ঢুকিয়ে দিয়ে, বাইরে শুয়ে পাহারা দিত মস্ত কোনও এক প্রাণী। সেই প্রাণীটি যে এখন কোথায়, তা আজ আর কেউ জানে না। তবে সেই ভূমিকম্পের পর, বছর দুই বাদে ভাঙা মন্দিরের চুড়োটাকে নাকি আশেপাশের সকলের মিলিত প্রচেষ্টায় কোনও উপায়ে ডাঙায় তুলে ফেলা হয়েছিল। তারপর ও-কাহিনিরও ইতি। এরই মধ্যে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হয়েছে বহু পট পরিবর্তন। অবশ্য সেই ভূমিকম্পেরও তো প্রায় একযুগ হতে চলল। এ-দিঘিতে মাছ ধরার অনুমতি এখন আর কারও নেই।

তা এই কিছুদিন আগে নয়াপাড়ার রাধেশ্যাম গোয়ালা তাঁর ছাগল ক’টাকে নয়াপাড়া বড়ো মাঠের ধারে চরতে দিয়ে বারীন তালুকদারের বাড়ি দুধের পাওনা আদায়ে গিয়েছিলেন। ফিরে এসে মাঠে শিমলি ছাগলটাকে দেখতে না পেয়ে খুঁজতে খুঁজতে কমলাদিঘির ওখানটায় এসে তো তাঁর ভিমরি খাবার জোগাড়! বিশাল এক অজগর সাপ কমলাদিঘির পাশের ওই ঘন জঙ্গলের ওখানটায় শুয়ে রয়েছে! রাধেশ্যামের অত আদরের শিমলি এই অজগরের অত বড়ো মুখের ভেতরে আটকে ছটফট করে মরছে। শিমলির মুখ থেকে গ্যাঁজলা বেরোচ্ছে। তারপর তো বহু চেঁচামেচি করে লোক জড়ো করে যখন ছাগলটাকে উদ্ধার করা গেল, তখন তার আধমরা অবস্থা। নাহ্, শেষ অবধি তো তাকে আর বাঁচানোই গেল না।

যাই হোক, কিছু সংখ্যক অলিখিত মালিকের দৌরাত্ম্যে এখন এ-দিঘিতে মাছ ধরতে কেউ আসে না, ভয় পায়। লুকিয়ে-চুরিয়ে ও-কাজ করে ধরা পড়ে গেলে তার পরিণতিতে হাজতবাসের আশঙ্কাও একেবারে অমূলক নয়। এদিকে কিছু প্রমোটার শ্রেণীর লোক তো আবার দিঘিটাতে মাটি ভরে নিয়ে বহুতল বাসস্থান নির্মাণের পরিকল্পনা ফেঁদে চলেছে।

দুই

এখানকার নয়াপাড়া অঞ্চলের বারুই পরিবারের ছেলে পুনু এখন ক্লাশ সেভেনে পড়ে। বড়ো হয়ে ওঠার পর যখন থেকে একটু বুঝতে শিখেছে সে, এই দিঘিটাকে দেখে আসছে। স্কুলে যাওয়া আসার পথে, নয়াপাড়া বড়ো মাঠে খেলতে যাওয়ার পথে অহরহ। এ অঞ্চলের লোকেদের মুখে মুখে এই দিঘি নিয়ে কত্ত গালগল্প! শুনে শুনে পুনুর কৌতূহল আর বিস্ময় চরমে। ঘন ঝোপঝাড়, সারি সারি তাল-খেজুর-আমড়া আর তেঁতুলগাছের আড়ালে আলোআঁধারীতে মোড়া দিঘিটা এখন আশেপাশের আরও চার গাঁয়ের সকলের কাছেই এক অপার রহস্যের আধার। জেলেপাড়ার অধরচাঁদ জেলের ছেলে মেছুয়া বাবুলদাদা বলে, “দিঘিটা তো মাছের আড়ত। জলের তলায় যেন খই ফুটছে! আমরা মেছুয়া জাত, ওসব জলাশয় চোখে দেখলেই এক লহমায় সব বুঝে যাই।” বাবুল আফসোস করে, “জুতসই চার ফেলে উইপোকা, কেঁচো নয়তো চিংড়িমাছ বড়শিতে গেঁথে টোপ ফেললে ফাতনা একনিমেষে সুড়ুত করে কোথায় উধাও হবে তার কোনও ঠিকঠিকানা নেই! তবে এত লুকিয়ে-চুরিয়ে কাজ করতে বাপু কার ভালো লাগে! তেমাথার মুদির দোকানটাতে আবার মাঝে মাঝে গুণ্ডা রসিক বসে থাকে। ওর চোখে পড়ে গেলে মাথাটাকে থেঁতলিয়ে বস্তায় পুরে, পাঁকে পুঁতে দেবে!”

বেশ কিছুদিন আগে একদিন পুনুর মা পুনুকে পাঠিয়েছিলেন তেমাথার ওই মুদির দোকান থেকে এক প্যাকেট বিস্কুট কিনে আনতে। এই সাতসকালে বাবুল ওই মুদির দোকানের বারান্দায় বেঞ্চিতে বসে বসে দোকানের মালিক পীযূষকাকুর সঙ্গে গল্প করছিল। বছর খানেক আগে একদিন নাকি সে মাঝরাতে লুকিয়ে কমলাদিঘিতে খেপলা-জাল ছুড়ে মেরেছিল। তারপর তার হাতের রশিতে সে কী ভীম টান! গল্প শুনে পুনু বিস্কুটের কথা বুঝি ভুলেই বসল; দোকানের একধারে সে দাঁড়িয়েই থাকল। বাবুল বলে চলল—

একে মাঝ-রাত্তির, তায় এই বর্ষাকাল বলে ছিল সাপখোপ-জোঁক-পোকামাকড় ওসবের ভয়। এই জঙ্গল আর ঝোপঝাড়ই হচ্ছে এদের লুকিয়ে থাকার আস্তানা। হঠাৎ করে এদের যে কেউ এসে আক্রমণ করে বসলে অবাক হওয়ার যে কিছু নেই সেকথাটা কেউ জানুক না জানুক, মেছুয়া বাবুল সেটা ভালো করেই জানে। পরিষ্কার আকাশ, আকাশে পঞ্চমীর চাঁদ। নক্ষত্রের আলো আর ঝোপেঝাড়ে হঠাৎ জ্বলে ওঠা জোনাকির আলো—সব মিলেমিশে কেমন যেন এক স্নিগ্ধ হালকা আলোর আস্তরণ চারপাশ জুড়ে। অবশ্য যদিও এতে কোনও কিছুই ঠিক তেমন করে স্পষ্ট নয়, তবুও এই অস্পষ্ট আলোতেই নাকি মেছুয়া বাবুলের চোখদুটো জ্বলে ওঠে, ও সব দেখতে পায়!

একনাগাড়ে এতটা বলার পর বাবুল একটু দম নিল। এদিকে পুনু ভাবছিল, ও রে বাবা রে, মাঝরাতে অন্ধকারে খেপলা-জাল হাতে জঙ্গলের ভেতরে ঐ দিঘির ধারে! দুঃসাহস আর কাকে বলে!

হাতের রশিটাকে আমড়াগাছে পেঁচিয়ে শক্ত গিঁট বেঁধে নাকি বাবুল ঝাঁপ দিয়েছিল জলে। কিন্তু শেষরক্ষা আর হয়ে ওঠেনি। জল তোলপাড় করে জাল ছিঁড়ে সেদিন কিছু একটা যেন বেরিয়ে গেল। সেটা মাছ না অন্যকিছু, তা বাবুলের কাছে সেটি আজও এক বিস্ময়। এদিকে জলের তলার পাঁকে তার পা পুঁতে গিয়ে ভীষণরকম নাজেহাল অবস্থা। বাবুল নাকি জলে ডুব দিয়েই বুঝে গিয়েছিল, তার জালে যা আটকেছে, সেটি ছোটোখাটো কোনও কিছু নয়। জলের তলায় সে কী উত্তাল ঘূর্ণিঝড়! বাবুল চেতনা হারাতে বসেছিল, দু’চোখে অন্ধকার দেখছিল। তারপরেও মনে বল সঞ্চয় করে যখন সেটিকে সে জালে পেঁচিয়ে নিরস্ত করবে ভেবে দু’হাতে জাপটে ধরতে যাচ্ছে, ঠিক তখুনি ওকে বিশাল এক ঝটকায় কাত করে ফেলে দিয়ে, জাল ছিঁড়ে জানোয়ারটা বেরিয়ে গেল। তারপর তো কোনোরকমে দিঘির ধারে নেমে আসা আমড়াগাছের কতগুলো শেকড়বাকড় শক্ত মুঠিতে আঁকড়ে, কোনোরকমে শরীরটাকে টেনে-হিঁচড়ে ডাঙায় এনে ফেলেছিল সে। সেই থেকে বাবুলের মতো জাত মেছুয়াও নাকি এই কমলাদিঘিতে জাল ফেলতে আর সাহস করেনি কোনোদিন।

ওসব গল্প শুনে পুনুর শরীর জুড়ে কেমন এক উত্তেজনার স্রোত। কতদিন তো সে ভেবেছে, ছিপ আর টোপ জোগাড় করে একদিন কমলাদিঘিতে গিয়ে সে মাছ ধরবে। সন্ধের দিকে যখন ওদিকটাতে কেউ থাকে না, পাশের রাস্তাটাও ফাঁকা শুনসান তখন। কিন্তু সত্যিকথা বলতে কী, আজ অবধি সে-কাজ করতে সাহসে কুলোয়নি তার। একে তো ওখানে মাছ ধরতে হয় লুকিয়ে-চুরিয়ে, তায় বাড়ির লোক জানতে পেলে পুনুর আর রক্ষে থাকবে না যে!

যাই হোক, বিস্কুট হাতে বাড়ি ফিরছিল পুনু, পথে কুমোরপাড়ার নগেনখুড়োর ছেলে নেতাইর সঙ্গে দেখা। নেতাই আর পুনু দু’জনেই এখানকার দয়াময়ী বিদ্যানিকেতনের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র। দু’জনে ভারি বন্ধুত্ব—একসঙ্গে খেলাধুলো ঘোরাঘুরি সবকিছু। নেতাইকে দেখে পুনুর হাতের মুঠোয় এখন স্বর্গ পাবার আনন্দ। কমলাদিঘিতে বাবুলদাদার মাছ ধরার সেই কাহিনি সে নেতাইকে শোনায়, এইমাত্র বাবুলের মুখে ঠিক যেমনটা সে শুনে এল। মাঝরাতে খেপলা-জাল ছিঁড়ে ফেলার পর জলের তলার সেই ঘূর্ণিঝড়, তারপর জাল ছিঁড়ে কিছু একটা বেরিয়ে যাওয়া সব সব। পুনুর মুখে ও-কাহিনি শুনে ভয়ে বিস্ময়ে নেতাইর শরীর জুড়ে শিহরন! “ও রে বাবা রে, কী বলছিস রে পুনু! ওখানে জলের তলায় কাদের ঘরবাড়ি রে ভাই! অবশ্য ওতে তো আর অবিশ্বাসের কিছু নেই—এ দিঘি নিয়ে অমন কত কথাই তো লোকমুখে শোনা যায়।”

তিন

দিনকয় বাদে নয়াপাড়া বড়ো মাঠে বিকেলের খেলা সেরে বল হাতে মাঠ থেকে একসঙ্গে দু’জনে বাড়ি ফিরছিল—পুনু আর নেতাই। পথে পাড়ারই কালীমন্দিরের বারান্দায় কৃষ্ণপুর অঞ্চলের মহাদেবজ্যাঠাকে ঘিরে অমন লোকজন, ভিড় দেখে দু’জনে থমকে দাঁড়াল। তারপর জ্যাঠার মুখে সেদিন কমলাদিঘিকে নিয়ে যা শুনলো ওরা, তাতে ওদের দু’জনেরই বাকরোধ হবার জোগাড়। জ্যাঠা বলছিলেন, দিন দশেক আগে জ্যাঠা নাকি একদিন শেষ-বিকেলে জুরি নদীতে জাল ফেলবেন ভেবে তাঁর শখের খেপলা-জালটা হাতে হুড়ুয়ার রাস্তা ধরে যাচ্ছিলেন। সেদিন ঘরে মাছ-সবজি কিছুই ছিল না। তাই জ্যাঠা ভেবেছিলেন, ক’টা চুনোপুঁটি জুটে গেলেও রাতে মাছের ঝালে ভাত খাওয়া যাবে। তা কমলাদিঘির পাশ দিয়ে যাওয়ার পথে হঠাৎ কী জানি কী মনে হতে জ্যাঠাকে তাঁর অতদিনের শখ পূরণের ইচ্ছাতে পেয়ে বসল। ভর সন্ধেবেলা দিঘির চারপাশটা তখন একেবারেই শুনসান, কেউ কোথাও নেই। চুপচাপ নিঃশব্দ পায়ে জাল হাতে দিঘির ওপারে বাবলা, তাল আর শেয়ালকুচির ঝোপের আড়ালে গা-ঢাকা দিলেন জ্যাঠা। তারপর খেপলা-জালটাকে সঠিক হাতের কায়দায় জলে ছুড়ে মারলেন। ঝুপ করে একটা আওয়াজ উঠল।

জ্যাঠা বলছিলেন, “ঝুপ করে একটা আওয়াজ উঠল। চারপাশে একটু ঢেউ, জলে একটা আলোড়ন তুলে জালটা ডুবে গেল। খানিক বাদে ভারি বুদবুদ উঠতে দেখে বুঝতে পারলুম জালটা মাটি স্পর্শ করেছে।”

এক মুহূর্ত সব চুপচাপ। আর অতটা অবধি তো সব ঠিকঠাকই ছিল। আর তারপরই ঘটল যত বিপত্তি! দড়ি ধরে শত টানাটানিতেও জালটা নড়ছে না কেন? জ্যাঠার নাকি মনে হচ্ছিল, কেউ বুঝি জালটাকে শক্ত হাতে টেনে রেখেছে। মাছ জালে আটকে গেলে সে একরকম—জালের ভেতরে মাছের ছটফটানি, জাল থেকে বেরোবার জন্যে তার আছারিপিছারি। আর অমন সব ব্যাপারগুলো জ্যাঠার কাছে নতুন কিছু নয়। কিন্তু এ তো সেরকম কিছু না। জাত মেছুয়া না হলেও মাছ ধরা ব্যাপারটা জ্যাঠার জীবনে আর পাঁচটা শখের মতোই একটা। কিন্তু এ তো মনে হচ্ছে, জালে যেন কয়েক কুইন্টাল মাল চাপিয়ে দিয়েছে কেউ!

জ্যাঠা বলছিলেন, “কোনও অবস্থাতেই লুকিয়ে-চুরিয়ে কোনোদিন জীবনে কিছু করতে যাইনি। ধিক্কার দিচ্ছিলাম নিজেকেই নিজে। দুটো মাছের জন্যে এ কেমন হ্যাংলামো আজ আমার! আর হ্যাংলামোও ঠিক নয়, আসলে মাছ ধরা ব্যাপারটা তো আমার এ জীবনে নেহাত আনন্দ আর বড্ড এক শখের ব্যাপার। তবুও, তবুও, ছি ছি! একাজ আজ ভগবান মেনে নেননি একেবারেই, তাই এই হাল হল আমার!” বলতে বলতে মুখে ফুটে ওঠা বিন্দু বিন্দু ঘাম ধুতির খুঁটে মুছে নিয়ে ফের বলে চললেন উনি, “শত টানাটানিতেও হাতে ধরে থাকা জালের রশিটাকে নড়াতে পারলুম নে। অথচ দাঁড়িয়ে থেকে খানিক সময় নিয়ে বিষয়টাকে যে ভালো করে পরখ করব, তারও তো কোনও উপায় নেই। সরকারি দিঘি, তারপর আবার পাড়ার কতিপয় মস্তান লোকেদের বড্ড লোভ-লালসার শিকার এ দিঘি। কে কখন কোথা দিয়ে এসে পড়বে, তারপর ঘটবে মহা কেলেঙ্কারি! ধরে নিয়ে গিয়ে গুম করে ফেলবে, নয়তো পুলিশের হাতে তুলে দিলে হাজতে পুরতে কতক্ষণ!”

যাই হোক, মনে সাহস সঞ্চয় করে পরনের গামছাটাকে গুটিয়ে আড়াআড়ি করে গুছিয়ে নিয়ে শক্ত গিঁট বেঁধে নিলেন জ্যাঠা। তারপর ঝাঁপ দিলেন জলে। ভুস করে ডুব দিয়ে জলের তলায় পৌঁছে হাতড়ে হাতড়ে পাঁক আর আবর্জনায় জড়ানো জালটিকে একসময় খুঁজেও পেলেন উনি। আর ঠিক তখুনি হাতে পায়ে ঠেকল একটা পিচ্ছিল বস্তু।

জ্যাঠা বলেই চললেন, “শক্ত হাতে ধরে ওটাকে গায়ের জোরে উপরের দিকে ঠেলে দিতে চাইলুম। কিন্তু বোধ হচ্ছিল যেন ভয়ংকর পিচ্ছিল পর্বত-প্রমাণ কিছু একটা!”

এদিকে জলের তলায় সব বস্তুকেই তো তার নিজের ওজনের চেয়ে বেশ খানিকটা হালকা বলেই অনুভূত হয়। দু’হাতে সেটাকে জাপটে ধরার চেষ্টা করতে করতে জ্যাঠার আবার মনে হল, সেটা যেন শক্ত চতুষ্কোণ-মতো বিরাট একটা কিছু! আসলে জলের তলায় এ যে কী বস্তু, ভালো করে কোনও কিছুই তো বোঝার উপায় নেই। দু’হাতে তাকে উপরের দিকে ঠেলে দিতে যেতেই মুহূর্তে সেটি হাত ফসকে পিছলে কোথায় যে সরে পড়ল কে জানে! তারপরই লম্বা শিকলের মতো কিছু একটা জিনিস এসে কী করে যেন তাঁর দুই পায়ে চেপে বসল, আর পা দুটোকে শক্ত বাঁধনে বেঁধে ফেলল। পরের ক’টা মুহূর্ত জলের তলায় সে কী তাণ্ডব, ঘূর্ণিঝড়, তুফান! জালটাকে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে, এক ধাক্কায় জ্যাঠাকে উলটে ফেলে দিয়ে জালের ভেতর থেকে হুড়মুড় করে অতিকায় কিছু একটা যেন বেরিয়ে গেল!

একটানা অতটা বলার পর মহাদেবজ্যাঠার গলা ভেদ করে একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল। “জলের তলার অন্ধকারে তেমন করে কিছুই তো ঠাহর করতে পারলুম নে, সবই রহস্য হয়ে রইল। মাথা ঘুরে গেল, ভয়ে ভাবনায় প্রাণ উবে গেল। শেকলটাও যে কোথা থেকে এসে পায়ে পেঁচিয়ে দিল কে জানে!” একটু দম নিয়ে ফের জ্যাঠা বলতে লাগলেন, “দু’হাতে টানাটানি করে ভাগ্যিস শেকলের বাঁধনটুকু ছাড়াতে পেরেছিলাম, তাতে বোধকরি বেঁচেও ফিরেছিলাম। কোনোরকমে প্রাণ হাতে করে পাড়ে ওঠে এসে হাতের কব্জিতে গিঁট বাঁধা দড়িটাকে ধরে টানতে এবারে জালটাও সুড়সুড় করে চলে এল।”

জ্যাঠার অত শখের জালটির চেহারা দেখে ওঁর তো চক্ষু চড়কগাছ! জাল কোথায়, এ তো দড়ির মাথায় লেগে আছে শক্ত নাইলনের সুতোয় বোনা জালের একটুকরো! জালের কথা বলতে গিয়ে জ্যাঠার চোখদুটো ছলছল করে উঠল। “এই দুর্মূল্যের বাজারে নাইলনের সুতোয় বোনা জাল আবার আরেকটা কেনা তো আমার পক্ষে সহজসাধ্য নয়!”

যাই হোক, ডাঙায় উঠে আসার পর উত্তেজনার দমক খানিকটা কমে এলে নাকি জ্যাঠার নজরে এল, সারা গায়ে, বিশেষ করে হাতে পায়ে তাঁর অসংখ্য ক্ষত আর তা থেকে গলগল করে বইছে রক্তের ধারা। আর এই ক্ষতস্থানগুলোতে কী অসহ্য জ্বালা যন্ত্রণা!

এতক্ষণে পুনু-নেতাই দু’জনেরই চোখে পড়ল ফতুয়া এবং খাটো ধুতি পরে থাকা জ্যাঠার শরীরের হাত-পায়ের অনাবৃত অংশের দিকে। দেখে ওদের দু’জনের শরীর শিরশরিয়ে ওঠল, গায়ে কাঁটা দিল! এ যে হাত-পায়ের স্থানে স্থানে অসংখ্য ক্ষত আর তাতে কালো কালো শুকনো রক্ত জমাট বেঁধে আছে এখনও!

চার

গল্প শেষ হতে ব্যস্তসমস্ত মহাদেবজ্যাঠা হনহনিয়ে চলে গেলেন বাঁ-হাতি রাস্তা ধরে। জমায়েত হওয়া লোকেরা তখন বিস্ময়ে একে অপরের মুখের দিকে তাকাচ্ছিল, আর নিজেদের মধ্যে কত কী আলোচনা করছিল। একজন পুনুদেরই পাড়ার লোক রামতনু দাস বলছিলেন, “হে ভগবান, এখানে এই মন্দিরে সন্ধেবেলা লুটের বাতাসা কুড়োতে এসে এ কী বিস্ময়! রক্ষে করো ঠাকুর! এ তো বড্ড বিপদ গেছে মহাদেবটার মাথার উপর দিয়ে!”

তখন সকলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কদমতলার পাট ব্যবসায়ী যোগেন তরফদারের মন্তব্য, “এই মহাদেব ব্যাটা যেন সর্বক্ষণ গাঁজার কলকেতে দম দিচ্ছে! এই বৃদ্ধ বয়সে ওসব গাঁজাখুরি গল্প ফেঁদে মহাদেবের ক’পয়সা উপার্জন হচ্ছে কে জানে!”

তা একে পুরোপুরি গাঁজাখুরি গল্প বলতে পুনু, নেতাই এবং এখানকার কিছু সংখ্যক লোকের মহা আপত্তি। কারণ, মহাদেবজ্যাঠাকে এতদ অঞ্চলের সকলেই চেনে। আশেপাশের চার গাঁয়ের কেউ মহাদেবজ্যাঠাকে অমনি অমনি গাঁজাখুরি গল্প বলে বেড়াতে শুনেনি কখনও। মহাদেবজ্যাঠার মতো একজন বয়স্ক, সৎ, স্বল্পবাক মানুষ, ধর্মকর্মে যাঁর অমন মতি, সে অতগুলো মিথ্যে কথা বানিয়ে বানিয়ে সাজিয়ে গুছিয়ে বলতে পারবে বলে তো বিশ্বাস হয় না। আর অতসব গল্প বানিয়ে বলতেই বা যাবে কেন জ্যাঠা?

যোগেনজ্যাঠার মন্তব্য শুনে-টুনে নেতাই শুধু জানাল, “এ গল্প মিথ্যে গল্প নয়। কারণ, মিথ্যে বলার মতো লোকই তো নন এই মহাদেবজ্যাঠা। আর কথাগুলো বলার সময় তাঁর চোখমুখের চেহারা আমি দেখেওছি, মিথ্যে বলা মুখের ছবি ওটা নয়!”

কমলাদিঘির ব্যাপারে অতসব শুনে এসে বাড়ি ফিরে পুনু গুম হয়ে বসে রইল। পুনুকে অমন নিঃশব্দে বসে থাকতে দেখে ওর মা জিজ্ঞাসা করলেন, “কী রে পুনু, খেলার মাঠে ঝগড়া করেছিস বুঝি?”

মায়ের কথা ক’টা বুঝি পুনুর কানেই পৌঁছল না। পুনু ভাবছিল অন্য কথা। কমলাদিঘির ঐ নোংরা জলের তলায় এ কেমন রহস্য! এ মাছ, না অন্য কিছু! তিমি-হাঙর-কুমির ওসব কি! মনে তো হয় না। তবে কি সেই অত যুগ আগের রাজাদের আমলের প্রচুর ধনসম্পত্তি মণিমাণিক্য হিরে-জহরত কোনও কিছুতে ভরে কেউ বা কারা এই দিঘির জলে লুকিয়ে রেখেছে? আর হতে পারে সেই ধনসম্পত্তির মালিক রাজাদের আত্মা যক্ষের মতো জলের তলায় সেগুলো আগলে রাখছে। কে জানে! আর তা যদি হয়, তবে সেটা জলের তলায় ঘূর্ণিঝড় তুলে দিলেও অবাক হওয়ার কিছু নয়। অবশ্য এসবই তো হচ্ছে একেবারেই নিজস্ব ভাবনা-চিন্তার কথা। এ রহস্যের সমাধান কোথায়?

পরদিন বিকেলে নয়াপাড়া মাঠে খেলতে গিয়ে বিষয়টা নিয়ে নেতাই আর পুনুতে অনেক আলাপ আলোচনা হল। নেতাই বলল, “না রে ভাই, আমার আর কোনও কাজে মন বসছে না। খেলতে পর্যন্ত ভালো লাগছে না। এ দিঘি রহস্যের সমাধান কোথায়!”

পুনু বলে, “অত ভেবে কোনও লাভ নেই। বড়ো বড়ো মেছুয়ারা হার মানছে, আর তুই এত ভেবে ভেবে এর কী করবি? মেছুয়া বাবুলের কথাই ধর না, সে ব্যাটা তো সোজা লোক না। বয়েস খুব বেশি হবে না, কিন্তু একেবারে পাকা মেছুয়া যাকে বলে, একেবারে তাই। ওর গল্প শুনে তো গায়ে কাঁটা দেয়!”

তা ক’দিন হল নেতাই মাঠে খেলতে আসে না। দুই বন্ধুতে স্কুলে দেখা হয় ঠিকই, তবে নেতাই আসে না বলে বিকেলে মাঠে ফুটবল খেলাটা আর তেমন করে জমে ওঠছে না। পুনু, ভুলু, বিলু, নব, সত্যেন, গোবিন্দ—ওদের দলের গোল রক্ষকের কাজটা তো নেতাই-ই করে। ও-কাজে ওর মতো অমন পারদর্শী পুনুর দলে তো আর কেউ নেই!

স্কুলে দেখা হলে পুনু ওকে জিজ্ঞাসা করে,  “কী রে, খেলতে আসছিস না কেন রে? তুই না এলে ফুটবল হয় বুঝি? নবকে দিয়ে ও-কাজ করাতে গিয়ে আমরা যে গোল খেয়ে খেয়ে জেরবার হয়ে যাচ্ছি!”

উত্তরে নেতাই জানায়, “সেদিন খেলতে গিয়ে পায়ে চোট হল তো, তাই বাড়ি থেকে বারণ করা হয়েছে। ক’দিন খেলতে যেতে পারব না রে।”

পুনু বলে, “সে তো কবে চোট পেয়েছিলি। তার ব্যথা কি এখনও আছে?”

নেতাই উত্তর করে না, চুপ করে থাকে। পুনু ভাবে, বাড়ি থেকে যদি বারণ করে থাকে, তাহলে কী আর করা! নেতাইর বাবা আবার যা কড়া মেজাজের লোক! তা থাক, সেটা যখন মাত্র ক’দিনের ব্যাপার।

পাঁচ

নেতাইর অনুপস্থিতিতে বন্ধুরা সব ফুটবল ছেড়ে দিয়ে এখন ক্রিকেট নিয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে একদিন খেলা শেষে সন্ধে সন্ধে মাঠ থেকে বাড়ি ফিরছিল পুনু। সূর্যিঠাকুর পশ্চিম আকাশটাকে আবির রঙে রাঙিয়ে দিয়ে অস্ত গেছেন একটু আগেই। এখুনি বুঝি অন্ধকার নেমে আসবে চরাচর ঘিরে। শেষ বিকেলের আবছা আলো গায়ে মেখে পাখিরা সব ঘরে ফিরছে। কমলাদিঘির ওখানটায় পুনু এসেই পড়েছে প্রায়। ওই অতটা দূর থেকেই দিঘির ওদিকটায় তাকাতে কেমন এক গা ছমছম অজানা ভয় আর আতঙ্কে সিটিয়ে আসে ওর শরীর। কিন্তু দিঘির পাশটায় এসে ওদিকটায় নিজের অজান্তেই চোখ চলে যেতে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে সে। আরে, কমলাদিঘির পাড়ে বুনো ঝোপ-জঙ্গলের আড়ালে কে বসে রয়েছে ওটা! পায়ে চলা রাস্তা ধরে একটু এগিয়ে গিয়ে উঁকি মারতেই পুনু তো থ একেবারে! কী আশ্চর্য! এ যে বন্ধু নেতাই! একটা লম্বা সুতো দুই হাতে ধরে টেনে টেনে গুটিয়ে আনছে সে।

ক’টা মুহূর্ত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল পুনু। নেতাই ওকে দেখতে পায়নি, পাবেও না। বড়ো বড়ো দুটো তালগাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে নেতাই। নিবিষ্ট হয়ে বড়শিতে এবারে টোপ গাঁথছে। টোপ গাঁথা হয়ে গেলে, তারপর সুতোটাকে সে তাক করে ছুড়ে মারল দিঘির জলে। ছিপ, বাঁশের কঞ্চি জাতীয় কোনও কিছুই তো ওর হাতে নেই। তার মানে লুকিয়ে কাজটা করছে বলে কেবল সুতোতে বড়শি বেঁধেই কাজ চালিয়ে নিচ্ছে সে। কী বুদ্ধি! মনে মনে নেতাইর বুদ্ধির তারিফ করে পুনু। পুনু ভাবছিল, তার মানে এই ক’দিন ধরে খেলার মাঠে না গিয়ে নেতাই তাহলে ওসব কাজই করে যাচ্ছে! আর বোঝাই যাচ্ছে, এ ব্যাপারে তার বন্ধুকেও সে কিছু বলতে চায় না। যাই হোক, এক্ষুনি এই মুহূর্তে নয়, তবে যে কাজ ও করছে, সেটা তো একেবারেই ভালো কাজ নয়। আজ হোক, কাল হোক সেটা তো ওকে বুঝিয়ে বলতেই হবে। এখানে তো মাছ ধরা নিষেধ, তার উপর আবার অমন ঘন জঙ্গলের ভেতর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে! রাধেশ্যামকাকার আদরের শিমলি ছাগলটাকে তো ওখানেই একটা অজগর সাপ গিলে ফেলেছিল। অমন সব অজগর ছাড়াও কেউটে, দাঁড়াশ, চন্দ্রবোড়া আর শঙ্খিনীর মতো কত কী সাপখোপ ওখানে ঘর বেঁধে বসে আছে কে জানে! ও কি পাগল হয়ে গেল নাকি! পায়ে চোটের জন্যে মাঠে খেলতে যাওয়া বারণ-টারণ ওসব তবে ওর মিথ্যে বানানো গল্প!

তা পরদিনও সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। নেতাই মাঠে খেলতে গেল না। আর পুনু খেলা শেষে বাড়ি ফেরার পথে কমলাদিঘির ওখানে বুনো ঝোপের ধারে দেখতে পেল ওকে। দু-দুটো সুতো কব্জিতে বেঁধে ঝোপের আড়ালে দাঁড়িয়ে নিবিষ্ট একেবারে।

তারপর লাগাতার দু’দিন আবার নেতাই স্কুলেও এল না। তাহলে কি ওর শরীর ভালো নেই! তবে সে যাই হোক, মাছ ধরার বিষয়টা বন্ধুকে আর বুঝিয়ে না বললে নয়। এ পাড়ার মস্তান লোকদের চোখে পড়ে গেলেও তো মুশকিল! কোনও বিপদ-আপদ কিছু ঘটে যেতে কতক্ষণ! নানা কথা মনে আসছে পুনুর, আর ওর জন্যে মনটা উতলা হচ্ছে বারবার। এমনি এমনি স্কুল ছুটি করার পাত্র তো নেতাই নয়।

দু’দিন লাগাতার স্কুলে এল না দেখে দ্বিতীয় দিন স্কুল ছুটির পর পুনু ছুটল নেতাইর খোঁজ নিতে। মাকেও সে বিষয়টা জানিয়ে রেখেছিল আগেই, কারণ পুনুর স্কুল থেকে ফিরতে দেরি হচ্ছে দেখে তার মা যদি আবার ভাবনায় পড়ে যায়!

তখন বোধকরি বিকেল তিনটে হবে। কৃষ্ণপুর পেরিয়ে লাল গণেশ হয়ে তবে কুমোরপাড়া, নেতাইর বাড়ি। অতটা পথ পায়ে হেঁটে নেতাইর বাড়ির কাছে পৌঁছে তো পুনু থ! বেশ ক’টা পরিচিত-অপরিচিত মুখ ওদের বাইরের উঠোনে ভিড় করে দাঁড়িয়ে। কারোর মুখে টুঁ শব্দটি নেই, সকলেই চুপচাপ, চেহারায় বিষণ্ণতার ছাপ। কেবল কুমোরপাড়ার সন্দীপদাদা, বাদলকাকু আর গোপাল পিশেমশাইকে পুনু চিনতে পারল। পুনুকে দেখেই নেতাইর মা আর ঠাম্মার চোখে জল। পুনু যে ওঁদের বড়ো আপন, নেতাইর সমবয়সী বন্ধু, একেবারে ঘরের ছেলের মতো। কারণে অকারণে পুনুর কত আসা-যাওয়া এঁদের বাড়ি। পুনু তখন সবে উঠোন থেকে বারান্দায় পা রেখেছে, কাঁদতে আরম্ভ করলেন ওর ঠাম্মা, “ও বাবা পুনু, আমাদের নেতাইকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বাবা। গতকাল বিকেলে সেই যে খেলতে যাচ্ছি বলে বেরিয়ে গেল, আর এখনও এল না। না বলে কোথাও যাবার পাত্র যে সে নয়, সে তো তুমিও ভালো করে জানো। রোজই তো খেলতে যায়। আজ ভোরে তোমার বাবা আর তোমাদের সকল বন্ধুবান্ধবের বাড়িও ফোন করে করে খোঁজ নেওয়া হয়েছে, কোথাও যায়নি ছেলেটা।”

সব শুনে বুঝি পুনুর মাথায় বিনা মেঘে বজ্রপাত হল একখানা। তাহলে সে স্কুলের উদ্দেশ্যে বেরোবার পর বুঝি নেতাইর বাবা নগেনজেঠুর সঙ্গে তার বাবার ফোনে কথা হয়েছে। তাই বিষয়টা সে জানতে পারেনি। কিন্তু জলজ্যান্ত ছেলেটা কোথায় উবে যাবে এভাবে! নেতাইর মায়ের দু’চোখে জলের ধারা। “তুমি আমার নেতাইকে দেখেছ, বাবা? মাঠে যাচ্ছি বলে কোথায় গেল বলো তো!”

নেতাইর চার বছরের ছোটো বোন টুসি দুটো নারকোলের মালা হাতে বারান্দায় পা ছড়িয়ে বসে ছিল। পুনুকে দেখে দৌড়ে এল। “পু-পুন্নু দাদা, ভাই কুতা?”

সব দেখেশুনে পুনুর বুকটা জুড়ে কেবল হাহাকার, শূন্যি শূন্যি অনুভূতি। নেতাইকে তো সে কালও দেখেছে মাঠ থেকে ফেরার পথে, সেই বুনো ঝোপঝাড়ের আড়ালে, কমলাদিঘির পাড়ে। এবারে কথাগুলো লুকিয়ে না রেখে সত্যিটা তো বলে ফেলাই উচিত। নিঃশব্দে কাঁদছিল পুনু। দু’চোখ বেয়ে অঝোরে ঝরছিল জল। অত কাছের মানুষ, তার আত্মার আত্মীয় বন্ধু নেতাই।

খানিক ভেবেচিন্তে পুনু বলল, “নেতাই তো ক’দিন ধরে মাঠে খেলতে আসছে না, মাসিমা। দু’দিন হল স্কুলেও আসছে না, আর কাল বিকেলে খেলা শেষে মাঠ থেকে বাড়ি ফেরার পথে ওকে আমি কমলাদিঘির ধারে বড়শি-সুতো হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি।”

“কমলাদিঘির ধারে!”

একটা বুকফাটা আর্তনাদ বেরোয় নেতাইর মায়ের মুখ থেকে। সন্দীপদাদা, বাদলকাকুরাও আর উৎকন্ঠা চেপে রাখতে পারলেন না। উহ্‌, আহ্‌, আহা করতে লাগলেন উপস্থিত সবাই। ঠাম্মা মাথা বুক চাপড়াতে লাগলেন। নেতাইর মা বুক ভাঙা কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। “ও রে বাবা রে, আমার কী হবে রে! ও বাবা পুনু, যাও না বাবা, একটু খুঁজে দেখো বাবা।”

একটা অপরাধবোধ পুনুকে কেবলই কুরে কুরে খাচ্ছিল। আর দু’দিন আগে যদি বন্ধুটাকে সে সাবধান করে দিত, তাহলে অমন একটা অঘটন হয়তো ঘটে যেত না। দিঘির ধারে বুনো ঝোপের আড়ালে ওকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তক্ষুনি ডেকে এনে যদি বারণ করত সে, হায় ভগবান!

এমন সময় নেতাইর বাবাও বাড়ি ফিরলেন। দু’চোখে তাঁর শূন্য দৃষ্টি। তারপর পুনুর কাছে সব শুনে ছুটলেন কমলাদিঘির ওদিকে। তার পেছনে পেছন চলল পুনুসহ উপস্থিত বাড়ির সক্কলে।

নাহ্, নেতাইকে সেখানেও খুঁজে পাওয়া গেল না। কেবল দিঘির ধারের দুটো তালগাছের পেছনে, ঝোপঝাড়ের ধারে এক জায়গায় আদ্ধেকটা নারকেলের মালায় বেশ কিছু পিঁপড়ের ডিম আর পচা চিংড়িমাছকে ঘিরে পিঁপড়ে আর পিঁপড়েতে একাকার। বড়োরা সকলে মিলে শক্ত বাঁশ দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে জল ঘেঁটেও কোনও হদিশ বের করতে পারলেন না।

কেউ জলে পড়ে গেলে তার মৃতদেহটা তো উধাও হয়ে যায় না, ভেসে ওঠে। খুঁজে পাওয়া যায়। ঐ অত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও কিছুই আবিষ্কার করা গেল না। তারপর আবার যত ধরনের পুলিশি তদারকি—সবই বিফল হতে লাগল। সকলের কাছে এ যেন এক অপার রহস্য আর বিস্ময় হয়েই থেকে গেল।

এদিকে নেতাইর মা-বাবা, ঠাম্মা আর ছোটো বোনের কথা তো আর বলে লাভ নেই, সবাই কেঁদে কেঁদে পাগল হলেন। সে যে কোথায় গেল, তার হদিস কেউ জানে না। তবুও নেতাইর কথা মনে এলে বন্ধু পুনু সকল বন্ধুবান্ধব এবং নেতাইর আত্মীয়-পরিজনদের বুক জুড়ে কেমন এক হু হু করা শূন্যতা।

ছয়

নেতাই হারিয়ে গেছে দিন পনেরো হতে চলল প্রায়। সেই থেকে নেতাইর বাবা নগেন্দ্রনাথ বিশ্বাসের চোখে ঘুম নেই। কোথায় গেল ছেলেটা! কোথায়, কোথায় গেল সে! গোটা বাড়িটাই যেন থম মেরে গেছে। কেবল চাপা কান্নার আওয়াজ আর বুক উজাড় করা দীর্ঘশ্বাস। এ তো সহ্য করাই মুশকিল! এইটুকুনি মেয়েটার মুখের দিকেও যে তাকানো যাচ্ছে না। সে-ই বা কী বুঝেছে কে জানে, মাঝেসাঝেই কেবল দাদা দাদা করে চিৎকার করে উঠছে। ওকেই বা কী বলে বোঝাবেন তিনি! আর নিজের মাথাটা, নিজের মাথাটাকেও আর ঠিক রাখতে পারছেন কই! অমন আদরের ছেলেটা তার হারিয়ে গেল কোথায়!

নগেন্দ্রবাবু ভাবছিলেন, এর একটা হেস্তনেস্ত না করে ছাড়বেন না তিনি। জলজ্যন্ত ছেলেটা অমন হঠাৎ করে উধাও হয়ে গেল সেটা কী করে মেনে নেবেন তিনি! থানায় তো ডায়রি করেছেন, পুলিশের লোকেরা আশ্বস্ত করেছিল খানিক, কিন্তু কোথায় কী! কেবল মুখেই বড়ো বড়ো বুলি। অতটা দিন তো হয়ে গেল, কিছুই হল না। নিখোঁজ ছেলেকে খুঁজে এনে জ্যান্ত ফিরিয়ে দিতে পারলে তিন লক্ষ টাকা পুরস্কারও ঘোষণা করেছিলেন। ছেলের জন্যে দরকারে বাড়িঘর, স্থাবর অস্থাবর সব বিক্রি করে দিতেও প্রস্তুত তিনি। অনেক ভেবেচিন্তে এবারে দিঘিটার ব্যাপারে এতদ অঞ্চলের হোমরাচোমরা লোকেদের সঙ্গে শলা-পরামর্শ করলেন খানিক। তারপর দক্ষিণা সাহা, রাতুল ভৌমিক, আনন্দ সরকার—এদেরকে বলে কয়ে অনুমতি আদায় করলেন প্রথমে। বিবেকের তাড়নাতেই বুঝি সকলেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিল। সরকারের ঘরে ছুটোছুটি করে, জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় দরখাস্তও তুলে দিলেন একখানা। অনুমতি আদায় করে নিতে দিন চারেক লেগে গেল। ওসব ব্যাপারগুলো চুকেবুকে যেতে পাম্প মেশিন ঠিকাদারকে ডেকে পাঠালেন। সাতখানা পাম্প মেশিনের ব্যবস্থা হল।

জঙ্গল এবং আবর্জনা পরিষ্কারের জন্য ডাকলেন রসুল শেখ এবং তার দলবলকে। ও-কাজ করতে গিয়ে অতগুলো লোকের একেবারে হিমশিম অবস্থা! কত কী বিষধর সাপ, বেজি, গোসাপ, ডাহুক, বক, পেঁচা, বাদুড়, শেয়াল আর ছুঁচো যে তাদের এতদিনকার আস্তানা হারিয়ে পাগল হয়ে এদিক ওদিক দৌড়ে পালাল, তার কোনও ঠিকঠিকানা নেই। এদিকে দিঘির পাড়ের স্যাঁতস্যাঁতে জায়গা, গর্ত এবং ফাঁকফোকরগুলোতে মিলল অজস্র সাপ, কচ্ছপ, ডাহুক আর বুনোহাঁসের ডিম। এমনি করে রসুল শেখ এবং তার বারোজনের দলটি দিন পাঁচেক অক্লান্ত পরিশ্রম করে দিঘির চারপাশের জঙ্গল এবং আবর্জনা সব ঝেঁটিয়ে পরিষ্কার করতে সক্ষম হল। তারপর শুরু হল জল সেচার কাজ।

কার্তিক মাস। সবে বর্ষা বিদায় নিয়েছে। দিঘিভর্তি জল। সাতটা পাম্প মেশিন দিনে পনেরো ঘণ্টা করে কাজ করছে। লোকমুখে এ কাহিনি ছড়িয়ে পড়তে অসংখ্য লোকজন ভিড় করে আসছে দূরদূরান্ত থেকে। দশম দিনে, তখন দুপুর দেড়টা কি দুটো হবে বোধকরি, দিঘিতে তখনও প্রায় কোমর জল হবে বুঝি, রসুলচাচার লোকেরা পাঁক ও আবর্জনা পরিষ্কারের জন্যে তৈরি হয়ে দিঘিতে নামতে যাচ্ছে, ও মা, হঠাৎ করে জলের ভেতরে এ যেন এক ভূমিকম্প শুরু হল! বিশালকায় এক প্রাণী দিঘির এ-মাথা থেকে ও-মাথা জল তোলপাড় করে দৌড়ঝাঁপ করে বেড়াচ্ছে। ও রে বাবা, সে কী আছারিপিছারি আর ছোটাছুটি তার! দিঘির জল কমে যেতে, সে বুঝি বিপদের আভাস পেয়েছে, তাই অমন ঘূর্ণিঝড় তুলে দিয়েছে। জল ফুলে-ফেঁপে ফোয়ারার মতো ছড়িয়ে পড়ছে এদিকে ওদিকে। সঙ্গে যোগ হল ভিড় করে দেখতে আসা অতগুলো মানুষের চিল-চিৎকার! পাঁচখানা বড়ো বড়ো জালে পেঁচিয়ে জনা পঁচিশ লোক যখন জাপটে ধরে তাকে ডাঙায় তুলল, সে এক দৃশ্য! বন্য শূকরের মতো ছুঁচোলো তার মুখ, বড়ো মার্বেল আকৃতির দুটো চোখ অক্ষিকোটর থেকে ঝুলে আছে। গাময় শ্যাওলা, তাই পিচ্ছিল। মুখে সারি সারি ধারালো দাঁত, মুখের দু’পাশে দুটো দাঁত আবার তলোয়ারের মতো বেঁকে বাইরের দিকে বেরিয়ে আছে। বিশালকায় এ কোন প্রাণী! অথচ যার নিচের অংশে রয়েছে কুমিরের মতো কাটা কাটা একটা বড়সড় লেজ, গা-ভর্তি পাথরের মতো শক্ত কালো আর বড়ো বড়ো আঁশ, আর রয়েছে পিচ্ছিল খানিকটা বাঁদরের হাতের মতো দেখতে অথচ খাটো আর শক্তসমর্থ শরীরের দু’পাশে দুটো হাত। গায়ে যেন তার অসুরের শক্তি!

ওর বাবার হাত ধরে ডাঙায় দাঁড়িয়ে ছিল পুনু। ওটাকে দেখেই সেও চিৎকার করে উঠল, “ও রে বাবা রে, তবে এই বুঝি সেই শক্তিমান! মহাদেবজ্যাঠা আর বাবুলদাদার জালে যে আটকে গিয়েছিল!”

জালের ভেতরেই পাথর মেরে মেরে ওর মাথাটাকে থেঁতলে ফেলেছিল ওরা। তারপর জালের বাঁধন খানিক আলগা করতে আরেক প্রস্থ অবাক হওয়ার পালা। নাকে যে ওর ঝলমলে দামি পাথরের নোলক পরানো! পাঁক ঘেঁটে বেরোল প্রচুর সোনা-রুপোর থালা-গ্লাস-ঘটি-বাটি-হাতা-খুন্তির পাহাড়, আর অতিকায় এক সিন্দুক! উত্তেজিত জনতার মুখে প্রাণীটিকে নিয়ে তখন কত কী গুঞ্জন! কেউ বলছে, এ আজকের প্রাণী নয়, কত যুগ ধরে এখানেই তার আস্তানা গেড়ে বসে আছে। সেই যে কতকাল আগে ভূমিকম্পের পর যাকে জেলেরা দেখেছিল।

কুমোরপাড়ার কাঠমিস্ত্রি নরেশ দাস বললেন, “পাশের রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় একেই বুঝি একদিন দেখেছিলাম, ওখানে জঙ্গলের ধারে। কিছু ভালো করে বুঝে ওঠার আগে আমায় দেখেই জলে ঝাঁপ দিল। বাড়ি গিয়ে মনে হল, ওরকম প্রাণী আবার হয় নাকি? নিজেরই ভ্রম কিছু হবে হয়তো। তাই আর কাউকেই কিছু বলতে যাইনি ও নিয়ে। হায় ভগবান! এ কীরকম জীব কে জানে!”

জল সেচার সঙ্গে সঙ্গে চলল মাছ ধরার কাজ। সে কত মাছ, কত মাছ! শ্যাওলা গায়ে কতকালের বিরাট বিরাট সব চিতল-বোয়াল-রুই-কাতলা-শিং-মাগুর-শোল-মহাশোল কত কী যে মাছ, তা আর বলে শেষ করার নয়! আর পাওয়া গেল প্রচুর পুরনো কাঠ। ওদিকে দিঘির তলায় এ যেন পাঁকের পাহাড় আর কী!

শেকলে বাঁধা, শেকলে প্যাঁচানো সিন্দুকটিকে টেনে ডাঙায় তুলল রসুল চাচার লোকেরাই। তারপর ভালো করে ঘষে ঘষে এর গায়ের নোংরা খানিক পরিষ্কার করে ফেলার পর, ও রে বাবা, এ তো ঝলমল করছে এখন! এ যে উজ্জ্বল রুপো দিয়ে তৈরি এক সিন্দুক! আর সারা গায়ে তার কত কী কারুকার্য! জলের তলায় থেকে থেকে গায়ে তার অত নোংরা পাঁক আর পিচ্ছিল শ্যাওলা! তারপর ওটাকে শেকল-মুক্ত করে ঢাকনা খুলতে গিয়ে আরেক প্রস্থ হিমশিম সবার। কিন্তু বহু কষ্টে সেটির ঢাকনা খুলে ফেলার পরই সকলের মুখ একেবারে হাঁ!

সাত

প্রচুর পরিমাণে হিরে-জহরত, সোনাদানা, মণিমাণিক্য আর সোনা-রুপোর অলঙ্কারে ঠাসা সিন্দুকের ভেতরটা। আর কী আশ্চর্য, ওসব কিছুর একপাশে চোখ বুজে শুয়ে আছে আমাদের সকলের অত আদরের নেতাই! মনে হচ্ছে যেন ঘুমিয়ে আছে পরম নিশ্চিন্তে। ওর পরনে সবার পরিচিত সেই পোশাক, লাল টি-শার্ট আর সবুজ রঙের হাফ-প্যান্ট। চিত হয়ে শুয়ে থাকা ওর বুকের উপরে আড়াআড়িভাবে রাখা একটি ঝকঝকে সোনা রঙের ধাতুনির্মিত তলোয়ার, বুঝিবা সোনারই হবে সেটা!

নেতাইকে দেখেই চিৎকার করে উঠলেন ওর বাবা, “ও রে আমার নেতাই রে! মানিক আমার!”

বলতে বলতে ওর বুকের ওপর থেকে তলোয়ারটা যেই উঠিয়েছেন উনি, সঙ্গে সঙ্গে ওর দেহটাও বুঝি একটু নড়ে ওঠল। খুব ধীরে ধীরে বুক ওঠানামা করছে এখন। তার মানে নেতাই বেঁচে আছে, শ্বাসপ্রশ্বাস বইছে! কয়েকজন মিলে ধরাধরি করে সিন্দুকের ভেতর থেকে উঠিয়ে এনে একটি ভ্যান গাড়ির ওপর শুইয়ে দেওয়া হল ওকে। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই চোখ খুলে চাইল নেতাই। আর হঠাৎই তার দু’চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল বিন্দু বিন্দু জল! খবর পেয়ে নেতাইর মা, ঠাম্মা, ছোটো বোন যে যেখানে ছিল দৌড়ে এসে হাজির সেখানে। সকলেই ওকে একঝলক দেখতে চায়। হুড়োহুড়ি পড়ে গেল একেবারে। পাড়ার কাঠের ব্যবসায়ী টুলু-মাস্টার ছুটতে ছুটতে গিয়ে তাঁর জিপ গাড়িটা নিয়ে এলেন। জিপ গাড়িতে শুয়ে নেতাই চলল জেলার বড়ো হাসপাতালে। সঙ্গে গেলেন ওর মা-বাবা আর জনাকয় আত্মীয়-পরিজন। সিন্দুক ও সিন্দুকের রত্নরাজি কড়া পাহারায় পুলিশের হেপাজতে চলে গেল। অতগুলো মাছ চলল সরকারি লরিতে করে পাইকারি বাজারে। আর সেই অদ্ভুত মৃত প্রাণীটির কী হল? তাকে তো সকলের মতামত নিয়ে সসম্মানে কালাছড়া মহাশ্মশানের একধারে কবর দেওয়া হল। প্রচুর লোকজন কোদাল, শাবল, গাঁইতি নিয়ে ওখানে জড়ো হয়েছিল। পুনু আর পুনুর বাবাও গিয়েছিলেন সকলের সঙ্গে।

তবে কী করে ছেলেটা ওখানে গেল, কী করে সিন্দুকের ভেতরে ঢুকল, কী করেই বা অতদিন বেঁচে রইল, আর তার সঙ্গে ঐ অতিকায় প্রাণীটিরই বা কী যোগসূত্র তা তো কেউ কিছু জানতেই পেল না আজ অবধি। এ যেন বিরাট এক প্রশ্নচিহ্ন হয়ে সকলের মনের ভেতর জেগে রইল পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-পরিজন সবার মনে।

জেলার বড়ো হাসপাতালে মাস দেড়েক চিকিৎসার পর নেতাই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেছিল ঠিকই, তবে পূর্বে ঘটে যাওয়া ঘটনার কথা কিছুই মনে করতে পারত না সে। আর ডাক্তারের বারণ মেনে বাড়ির লোক, আত্মীয়-পরিজন কেউই তাকে ঐ ব্যাপারে কোনও প্রশ্ন করেনি। অতি উৎসাহী কেউ কখনও করে থাকলেও সেই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে নেতাই কেমন যেন ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকত প্রশ্নকর্তার মুখের দিকে। নেতাইর মা-বাবার কথা হচ্ছে, কী ঘটেছিল সেই সময় আর কী করে কী হল নাই বা জানলাম আমরা অত কিছু! ঘরের ছেলেটা যে ঘরে ফিরে এসেছে ভগবানের দয়ায়, সেটাই তো বড়ো কথা।

এদিকে ওর ছোটো বোন তো দাদাকে ফিরে পেয়ে আহ্লাদে আটখানা! একবার গান করছে তো পরমুহূর্তেই দু’হাত তুলে নাচ শুরু! বন্ধু পুনু আর খেলার সঙ্গীরাও নেতাইকে ফিরে পেয়ে মহাখুশি! নয়াপাড়া বড়ো মাঠে আবার কী করে ফুটবল খেলা শুরু হবে, তারই পরিকল্পনায় ব্যস্ত সবাই। ওর মা-ঠাম্মারা পাড়ার কালীমন্দিরে গিয়ে টুকরিভর্তি লুটের বাতাসা সহ মানতের পুজো দিয়ে এলেন।

নেতাইর বাড়ি জুড়ে এখন উৎসবের আনন্দ!

অলঙ্করণঃ স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়

জয়ঢাকের গল্প ও উপন্যাস

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s