গল্প- গোল্ডেন হ্যান্ডশেক- ইমন চৌধুরী শরৎ ২০২০

গোল্ডেন হ্যান্ডশেক

ইমন চৌধুরী

বেশ কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে বসে ছিল সৈকত। বুকের ভেতর জমে থাকা রাশি রাশি রংবেরঙের এলোমেলো সুতো গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল সে। মন কিছুতেই একজায়গায় স্থির হয়ে থাকে না, বারেবারে বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়। অথচ ভাবার জন্যে অঢেল সময় নেই সৈকতের হাতে, হাতে ওর এখন অনেক কাজ।

মেল বক্সটা আরেকবার চেক করে নিয়ে পকেট থেকে মোবাইল বের করে সৈকত। ডায়াল লিস্টের প্রথমেই জেপি নাম। সবুজ বাটনে আঙুল ছুঁইয়ে সে কানে ফোন লাগায়। বিটলসের গান বাজছে, জেপির কলার টিউন, ‘শি লাভস ইউ… ইয়েহ ইয়েহ ইয়েহ…’ চলতে চলতে গানটা বন্ধ হয়ে গেল হঠাৎ। যান্ত্রিক স্বর জানাল ও-প্রান্তের মানুষটি ব্যস্ত আছেন, কিছুক্ষণ পরে আবার চেষ্টা করুন। সৈকত আবার ফোন করল, এবারে আর সময় লাগে না, গান শুরু হয়েই থেমে যায়। বেশ পেশাদারী কায়দায় কথা বলে জেপি, “হ্যালো, জেপি হিয়ার।”

সৈকতের হাসি পেয়ে যায়, যেন জেপি ওর নাম্বার চেনে না। “একবার ক্যান্টিনে আসতে পারবি? কয়েকটা কথা ছিল।”

কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে জেপি। সৈকত বুঝতে পারে ও শব্দ খুঁজছে।

“আমি আজ প্রচণ্ড বিজি সৈকত।”

“তবুও আয়, আমি ওয়েট করছি।”

উত্তরের অপেক্ষা না করেই ফোন কেটে দেয় সৈকত। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে উঠে দাঁড়ায়।

ক্যান্টিনের একদম শেষপ্রান্তের একটা চেয়ারে বসেছে সৈকত। এখান থেকে লিফট-লবি দেখা যায়। জেপি লিফট থেকে বেরিয়ে এলেই সৈকত ওকে দেখতে পাবে। কাউন্টারে বলা আছে, জেপি এলে টেবিলে দু’কাপ মসালা-চা দিয়ে যাবে। মাস কয়েক আগে অফিস ক্যান্টিনে এই সময় খুব ভিড় থাকত। করোনা পৃথিবী বদলে দিয়েছে, কিছুই আর আগের মতন নেই। কিছু ইমারজেন্সি ডিপার্টমেন্ট ছাড়া এখন আর কেউ অফিসে আসে না। সকলে নিজের নিজের বাড়িতে ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ রেখে কানে হেড ফোন গুঁজে একেকটা ব্যক্তিগত অফিস খুলে বসেছে। সৈকত শুনেছে অথরিটি ভাবছে অফিস স্পেস ছোটো করে দেবে, কস্ট-কাটিং। মুহূর্তের জন্যে ওর ঠোঁটে একটা অদ্ভুত উদাসীনতা মাখা হাসি দেখা যায়।

একটু পরেই লিফট লবিতে জেপিকে দেখা যায়। সাদা ফুল স্লিভ শার্ট, কালো ডেনিমের প্যান্ট। জেপি বরাবরের মতো ঝকঝকে চকচকে। পনেরো বছর আগে জেপি আর সৈকত একই দিনে এই কোম্পানিতে জয়েন করেছিল। দু’জনেই তখন সদ্য পাস আউট। জেপির মাথায় তখন একমাথা কোঁকড়ানো চুল। চোখের নিমেষে পনেরোটা বছর কেটে গেছে। সেদিনের জয়প্রকাশ ধীরে ধীরে জেপি হয়ে উঠেছে, অ্যানালিস্ট সৈকত হয়ে উঠেছে ডাইরেক্টর। টাক পড়তে শুরু করেছিল বলে বছর খানেক আগে জেপি একদিন পুরো মাথা ন্যাড়া করে ফেলেছিল। তারপর থেকে ওর মুখের চকচকে ভাবটা যেন আরও বেড়ে গেছে। নিজেকে খুব ভালো মেনটেন করে জেপি।

টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল জেপি। মৃদু হেসে বলল, “আই অ্যাম রিয়েলি সরি সৈকত, হোপ ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড…”

“ইটস ওকে মেট।” হাত দেখিয়ে সৈকত ওকে সামনের চেয়ারে বসতে বলল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে কাচের গ্লাসে দুটো চা এসে গেল।

জেপি কথা খুঁজে পাচ্ছে না। জেপির মতো স্ট্রিট-স্মার্ট ছেলের এমন হয় না সাধারণত। সৈকতের ওর কাছ থেকে আর নতুন কিছু শোনার নেই। ও নিজেই বলতে শুরু করে।

“খুব ছোটবেলা আমি পৌষমেলায় একবার হারিয়ে গেছিলাম জানিস! শান্তিনিকেতনের পৌষমেলায় তুই কখনও গেছিস কি না জানি না। আমার বাবার এক বন্ধুর বাড়ি ছিল শান্তিনিকেতন। আমরা ছোটবেলা প্রায়ই যেতাম সেখানে।”

জেপি অদ্ভুতভাবে চেয়ে থাকে সৈকতের দিকে। এই ছেলেটাকে ও গত পনেরো বছর ধরে জানে চেনে। এই ঝাঁ-চকচকে কর্পোরেট দুনিয়ায় সৈকত চিরদিনই ব্যতিক্রম। সৈকত জেপির দিকে না তাকিয়েই নিজের গল্প বলে চলেছে। সে ফিরে গেছে ওর ছেলেবেলায় কোন এক পৌষমেলায়। এখন সে হারিয়ে গেছে।

সৈকত এখন দেখতে পাচ্ছে, হাজার হাজার মানুষের ভিড়ে হাতে লাল রঙের একটা বেলুন হাতে একটা ছোট্ট ছেলে চারদিকে তাকিয়ে মাকে খুঁজছে। কত মানুষ, কত আওয়াজ, ‘হরেক মাল পাঁচ টাকা, পাঁচ টাকা, পাঁচ টাকা…’ ওই যে ওইখানে এককোণে বসে একটা লোক সাবানের ফেনায় ফুঁ দিয়ে বুদবুদ উড়িয়ে দিচ্ছে, সৈকত সে বুদবুদের পিছনে দৌড়াতে শুরু করেছে। ওর হাতে লেগে ভেঙে যাচ্ছে গোল গোল বুদবুদ। ওই বাঁদিকে একটা লোক রংবেরঙের কানের দুল বিক্রি করছে। পাশেই চিনেমাটির কাপ-ডিশের দোকান… কীসের যেন আওয়াজ শুনে সৈকত সামনে তাকাতেই দেখতে পেল নাগরদোলা ঘুরছে। সৈকত হাঁ করে তাকিয়ে থাকে নাগরদোলার দিকে। বন বন করে ঘুরছে বিরাট চাকা, কত রঙ কত আলো। ঠিক এই সময় হঠাৎ কে যেন পিছন থেকে ডাকে ওকে, “কী নাম তোমার বাবু? তুমি কি হারিয়ে গেছ?”

সৈকত ঘাড় ঘুরিয়ে বড়ো বড়ো চোখে তাকায়। একটা লম্বা রোগা মতন লোক, সারা মুখ খোঁচা খোঁচা দাড়ি, থুতনির কাছটা উঁচু, ওর সামনে দাঁড়িয়ে দাঁত বের করে হাসছে।

“মা, মা…” সৈকত চিৎকার করে ওঠে।

“মাকে খুঁজছ? এসো আমার সঙ্গে। আমি তোমাকে মায়ের কাছে নিয়ে যাব।” লোকটা হাত বাড়িয়ে সৈকতকে কোলে তুলে নেয়।

ভিড়ের মধ্যে লম্বা পা ফেলে লোকটা দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাছিল। ওর কোলের মধ্যে বসে ঘাড় উঁচু করে চারদিকে মাকে খুঁজছিল সৈকত। মাঝে মাঝে সে চিৎকারও করছিল, “মা… ও-মা…”

হাজার হাজার মানুষের সমবেত কণ্ঠস্বরের মধ্যে সৈকতের গলার স্বর কোথায় হারিয়ে যায়।

মাকে সেই রাতে সৈকত খুঁজে পায়নি; কিন্তু মা ঠিক ওকে খুঁজে নিয়েছিল। হঠাৎ একটা বাঁকের মুখে চিৎকার করে ওঠে একটা কণ্ঠ, “টুবাই!”

পরমুহূর্তে সৈকত মাকে দেখতে পায়। মা এসেই ওকে সেই লম্বা রোগা মানুষটার কোল থেকে কেড়ে নেয়। লোকটা মুহূর্তে ভিড়ের মধ্যে কোথায় যেন অদৃশ্য হয়ে যায়, ওকে আর খুঁজেই পাওয়া যায় না। মা সেই রাতে সৈকতকে জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কেঁদেছিল। আর মেলা ঘোরা হয়নি, টুবাইকে বুকে আগলে বাড়ি ফিরেছিল মা। সবাই বলে ওই লোকটা খারাপ ছিল। সে সৈকতকে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিল। হয়তো আর একটু হলেই সেই রাতে সৈকতের জীবন বদলে যেত, আর কখনও সে মাকে দেখতেও পেত না। কত কী যে হতে পারত!

“আমার এখনও সেই লোকটার মুখটা মনে পড়ে। জানি না ও সত্যি খারাপ মানুষ ছিল কি না, জানি না ওর সঙ্গে সেদিন চলে গেলে আমি চিরদিনের মতো হারিয়ে যেতাম কি না। আমার শুধু মনে হয় ছোটবেলা হারিয়ে যাওয়া খুব সহজ ছিল জেপি। বড়ো হলে আর অত সহজে হারিয়ে যাওয়া যায় না।”

চা শেষ হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। জেপি কোনও কথা না বলে সৈকতের দিকে তাকিয়ে আছে।

“এই প্রতিদিনের রুটিন, মিটিং, কল… আমার দমবন্ধ হয়ে আসে। আমি প্রচণ্ডভাবে এই সবকিছুর থেকে মুক্তি চেয়েছিলাম। রোজ রাত্রে বিছানায় শুয়ে আমার হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে। একা একা কোন একটা রঙিন নাগরদোলার দিকে হাঁ করে চেয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। তোকে বলেছি বোধহয়, গতবছর পৌষমেলায় পুরো ফ্যামিলি নিয়ে আমি শান্তিনিকেতন গেছিলাম। কেন জানি না আমার মনে সেই ছোটবেলা থেকে একটা ধারণা রয়ে গেছিল, মনে হত পৌষমেলাতে অত মানুষের ভিড়ে খুব সহজেই হারিয়ে যাওয়া যায়। কী জানিস, শৈশবের মায়া মেশানো স্মৃতি যেখানে জমে থাকে, বড়ো হয়ে সেখানে না যাওয়াই ভালো। মায়াজাল ছিঁড়ে যায়, বড়ো কষ্ট হয় তখন। এবারে মেলায় আর কিছুতেই আমি হারিয়ে যেতে পারিনি জেপি। মেলার কিছুই আমাকে আর অবাক করেনি—না রঙ, না আলো, কোনও ইন্দ্রজাল তৈরি হয়নি, হাজার মানুষের ভিড় আমাকে বিস্ময়ে অভিভূত করেনি, বিরক্ত করেছিল শুধু।”

“এসব কথা আজ কেন বলছিস সৈকত!” জেপির গলার স্বরে এখন আর সেই পেশাদারী মোড়ক নেই। এখন সে আবার সৈকতের বন্ধু হয়ে উঠেছে।

একটুক্ষণ চুপ করে থাকে সৈকত, যেন সে কিছু শুনতেই পায়নি।

“দক্ষিণেশ্বরে আমাদের বাড়িটা আমার ঠাকুরদার তৈরি। যখন ছোটো ছিলাম তখন ওই বাড়ির ছাদে আমি একা-একাই দেওয়ালে বল ছুড়ে ক্রিকেট খেলতাম। কী বিশাল বড়ো ছিল ছাদটা তখন। একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে দৌড়ে বেড়াতাম; ঘাড় উঁচু করে দেখতাম কোন গাছে কোন পাখি বাসা করেছে। আজ যখন ছাদে যাই, দেখি সেই একই ছাদ কী প্রচণ্ড রকম ছোটো হয়ে গেছে। বিস্মিত হওয়ার মতো কোনও উপাদানই আর বাকি নেই। মানুষ বড়ো হলে ছাদ ছোটো হয়ে যায় জেপি।”

“তোর রাজারহাট ফ্ল্যাটটার কী খবর?” জেপি জিজ্ঞেস করে।

“নির্মীয়মাণ বহুতল।” সৈকত শব্দ করে হাসে। “প্রোজেক্ট ডিলে হয়ে গেছে। জানি না কবে হবে। মাসের শেষে শুধু ই.এম.আই গুনছি। বৌ বলে, ‘পনেরো বছর হয়ে গেল চাকরি করছ, এখনও একটা ফ্ল্যাট কিনতে পারলে না!”

“রিয়েল এস্টেটের বাজার খুব খারাপ। তুই তো সবই জানিস। তোকে আর নতুন করে কী বলব।”

“জেপি, এই অফিস আর টাকার নেশায় আমি বন্দি। আমি এই সবকিছু ছেড়ে পালিয়ে যেতে চাই। আজ বহুদিন হল আমি সেই মানুষটাকে খুঁজি—সেই রোগা লম্বা মানুষটা, একমুখ খোঁচা খোঁচা দাড়ি মুখটা… আরেকবার যদি সে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়, আমি আর কোনোদিকে না তাকিয়ে ওর সঙ্গে চিরদিনের জন্যে চলে যাব।”

“এরকমভাবে ভাবিস না সৈকত। জীবনে বাঁধনের দরকার আছে। বাঁধন আছে বলেই তুই মুক্তি খুঁজছিস। একবার মুক্তি পেলে দেখবি মনে হবে কেউ এসে বেঁধে রাখুক, আঁকড়ে ধরে থাকুক।”

“আমি কিছুতেই পারি না জেপি, হয়তো আমি মানুষটা সামাজিক হতে পারিনি।”

কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে ওরা দু’জনেই। তারপর সৈকত জেপির দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বলে, “আজ দুপুরে তোর কাছ থেকে ফোনটা পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছিল জেপি। চুপ করে বসে ছিলাম অনেকক্ষণ। কিন্তু জানিস, তারপর হঠাৎই আমি প্রচণ্ড খুশি হয়ে উঠি। অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করি, আমি ঠিক এমনটাই চেয়েছিলাম।”

আজ দুপুরে জেপি কল করেছিল সৈকতকে। প্রফেশনাল কল। হেড এইচ.আর জয়প্রকাশ মিত্রের কাছ থেকে পেঙ্গুইন প্রোজেক্টের ডিরেক্টর সৈকত বাসুর কাছে একটা কল এসেছিল।

“ইয়েস জেপি।”

“হোপ ইউ আর ডুইং ফাইন সৈকত।”

সৈকতকে কোনও উত্তর দেওয়ার সুযোগ দেয়নি জেপি, সে ইংরাজিতে একনাগাড়ে কথা বলে গেছিল।

কোভিড পরবর্তী সময়ে কোম্পানি এখন অভূতপূর্ব পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। এই সময়ে ইন্টারন্যাশনাল মার্কেটে পেট্রোলের দাম হু হু করে পড়ে যাওয়ার জন্যে ইউ.এস-এর সবচেয়ে বড়ো গ্যাস অ্যান্ড অয়েল ফার্মের সঙ্গে এই কোম্পানির পাঁচ বছরের যে কন্ট্রাক্টটা সই হওয়ার কথা ছিল তার কোনও সম্ভাবনা এখন আর নেই। প্রোজেক্ট পেঙ্গুইন যেহেতু ওই অয়েল ফার্মের ডাটা-সায়েন্স ডিপার্টমেন্টকে সাপোর্ট করার জন্যেই তৈরি করা হয়েছিল, তাই কোম্পানি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, প্রোজেক্ট পেঙ্গুইন স্ক্র্যাপ করে দেওয়া হবে।

জেপি একটুক্ষণের বিরতি নেয়। সৈকতের ততক্ষণে বুঝে গেছে এই নীরবতা ঝড়ের পূর্বলক্ষণ। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জেপি আবার শুরু করে।

এই পরিস্থিতিতে কোম্পানি লিডরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, প্রোজেক্ট পেঙ্গুইনের পে-রোলে থাকা রিসোর্সদের উইথ ইমিডিয়েট এফেক্ট টার্মিনেট করা হবে। সৈকতকে রিকুয়েস্ট করা হচ্ছে আজকেই অফিস পোর্টালে রিজাইন করে দেওয়ার জন্যে।

কিছুক্ষণের জন্যে আবার সব কিছু চুপচাপ। সৈকতের মাথায় মধ্যে মাসের শেষের ই.এম.আই.-এর অঙ্কটা ফুটে ওঠে। কয়েক মুহূর্তের বিরতি নিয়ে সে প্রশ্ন করে। “যদি রিজাইন না করি তাহলে কী হবে?”

জেপি যেন ঠিক এই প্রশ্নটার জন্যেই অপেক্ষা করছিল।

সৈকত যদি আজকে রিজাইন করে, কোম্পানি নিশ্চিত করবে যেন ওর এগজিট প্রসিডিওর স্মুথ হয় এবং সেই সঙ্গে সে ছয় মাসের বেসিক স্যালারি পাবে। এক্সিট লেটারে টার্মিনেশন সংক্রান্ত কোনও কথা লেখা থাকবে না। কিন্তু সৈকত যদি রিজাইন না করে তাহলে আগামী সপ্তাহের মধ্যেই কোম্পানি ওকে লো পারফর্মিং রিসোর্স বলে টার্মিনেট করবে। সেক্ষেত্রে সে কোনোরকম সুবিধা পাবে না। এখন সৈকতকে বেছে নিতে হবে সে কী চায়।

ফোনটা রেখে অফিসের বাইরে বেরিয়ে একটা সিগারেট ধরায় সৈকত। বিড়বিড় করে সে, “ফায়ারড।” মাথা ঘুরছে। পায়ের তলার মাটিটা কেমন সরে সরে যাচ্ছে। নিশ্চিত জীবনটা হঠাৎ একেবারে অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। কী করবে এখন সৈকত? বিলাসবহুল গাড়ি, রাজারহাটের ফ্ল্যাটের ই.এম.আই, ছেলের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ফি, বছরে একবার বিদেশ ভ্রমণ, পাঁচতারা হোটেল, রেস্তোরাঁ, দামি পারফিউম, দামি কোট… মাথায় অনেকগুলো সংখ্যা ভেসে বেড়ায়। বাথরুমে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ায় সৈকত। নিজের চোখে চোখ রাখে। অনেকদিন পরে নিজেকে সে এমন খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করে। জীবনে এই প্রথমবারের জন্য উপলব্ধি করে যে সে বুড়ো হয়ে গেছে।

ফিরে এসে নিজের চেয়ারে বসে সৈকত। ঠিক এই সময়ে ওর মনে পড়ে গত পনেরো বছরে কত রাত সে ভেবেছে চাকরি ছেড়ে ও হারিয়ে যাবে। কতবার মনে হয়েছে, সে দিনরাত টাকার পিছনে ছুটে জীবনটা অপচয় করছে। স্ত্রীর সঙ্গে এই নিয়ে কত ঝগড়া। এই তো কয়েকদিন আগে ওকে স্ত্রী বলেছিল, “প্রতিদিন এক কথা ঘ্যানঘ্যান না করে চাকরিটা ছেড়ে দাও। আমাদের কথা ভাবতে হবে না তোমাকে। তুমি নিজে যদি না চাও তবে কোরো না চাকরি। যা আছে তাতে আমাদের দিব্যি চলে যাবে।”

সৈকত ফ্যালফ্যাল করে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে ছিল। নিজেকে প্রশ্ন করেছিল, সে কি চাকরি ছাড়তে পারবে কোনোদিন? চাকরি ছাড়ার জন্যে যে প্রচণ্ড সাহস লাগে তা কি আছে ওর? সেই রাতে স্বপ্নে সৈকত আবার সেই খোঁচা খোঁচা দাড়ির মুখটাকে দেখেছিল। ওর সামনে এসে হেঁ হেঁ করে হেসে ওঠে সে। ‘কী বাবু, হারিয়ে যেতে চাও? যাবে আমার সঙ্গে?’

ঘুম ভেঙে যায়। সারারাত জেগে থেকে ভোরবেলা সৈকত ছাদে যায়। এই বয়সে হারিয়ে যাওয়া যায় না। এই ছাদটার মতো সারা পৃথিবীটাও বড্ড ছোটো হয়ে গেছে। এখন ওর বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতা লোপ পেয়েছে। সেই ভোরবেলা সৈকত উপলব্ধি করেছিল, ওর চাকরি ছাড়ার সাহস নেই। এ জীবনে কোনোদিন সে একা একা পাহাড়ে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতে পারবে না, অনিশ্চিত ভবিষ্যতকে ভালোবেসে আঁকড়ে ধরতে পারবে না। আর্থিক নিশ্চয়তা ওকে অক্ষম করে দিয়েছে। এখন এমনকি ও কলেজ জীবনের মতো একটানা বসে গল্পের বইও পড়তে পারে না।

আজ দুপুরে হতাশার সমুদ্রে ডুবে যেতে যেতে হঠাৎ সহসা সৈকতের মনে হয়, জীবন ওর সামনে সুযোগ এনে দিয়েছে। আজীবন কারাবাসে দণ্ডিত আসামীকে হঠাৎ মুক্তি দিয়েছে বিধাতা। শিশুর মতো উচ্ছ্বল হয়ে ওঠে সে। এতদিনের দৈনন্দিন জীবনে অভ্যস্ত প্রায় মৃত সৈকত নতুন করে জীবনের সন্ধান পায়। কত কিছু পড়ার আছে, কত কী জানার আছে, কত জায়গা যাওয়ার আছে। নাই বা থাকল রাজারহাটের ফ্ল্যাট, নাই বা থাকল গাড়ি। সংসারে কেউ তো বলেনি ওকে যে আরও টাকা চায়। সে নিজের নেশায় নিজে মত্ত ছিল এতদিন। কত কিছু এতদিন করতে পারেনি সৈকত, কত মুহূর্ত সে উপভোগ না করেই বয়ে যেতে দিয়েছে অযথা।

জেপি খুব শান্ত স্বরে বলে, “তোর যা কোয়ালিফিকেশন সৈকত, চাকরি পাওয়া তোর কাছে কোনও ব্যাপার নয়। ভেঙে পড়িস না।”

সৈকত হেসে ওঠে। “তুই ভুল করছিস জেপি। এই কাচের ঘর থেকে আমি মুক্তি চেয়েছিলাম বহুবছর আগে, কিন্তু আমার সাহস ছিল না। তুই আমাকে মুক্তি দিয়েছিস। এ জগতে আমি আর কখনও ফিরে আসব না।”

জেপি সন্দেহের চোখে তাকায় সৈকতের দিকে। আজকে সৈকতকে করা ফোনটা ছিল জেপির জীবনের সবচেয়ে কঠিন ফোন কল। করতে হয়, জীবনে এমন অনেক কঠিন কাজ মানুষকে করতে হয়।

“তোর কখনও এই হাই, হ্যালো, থ্যাঙ্ক ইউ, হ্যাপি উইকএন্ড-এর জীবন থেকে মুক্তি পেতে ইচ্ছে হয় না জেপি?”

“মুক্তি কি কোথাও আছে সৈকত? গরাদ ধরে দাঁড়িয়ে আছি, কোন দিকটা জেল তা কি কেউ জানে! এক রুটিন থেকে মুক্তি পেয়ে অন্য রুটিনে বন্দি হয় মানুষ। তবে তুই যদি মুক্তি পাস, যদি তুই সত্যি হারিয়ে যেতে পারিস আমি খুশি হব। বাঁধনের মায়া কাটিয়ে হারানো সহজ তো নয়। বাড়ির যে ছাদটাকে তুই চোখের সামনে বড়ো থেকে ছোটো হয়ে উঠতে দেখেছিস, সেই ছাদটারও একটা মায়া আছে। নতুন কিছু দেখে বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতা যখন কমে যায়, পুরনো জিনিসের স্মৃতি তখন আরও বেশি টানে।”

“জানিস, একটু আগে আমি দেখছিলাম, সার্চ করছিলাম এভারেস্টের বেস ক্যাম্পে যাওয়ার ট্রেক রুট। বহুবছর পর আমি আবার নিজের মধ্যে জীবনীশক্তি খুঁজে পাচ্ছি। থ্যাঙ্ক ইউ জেপি। আমি জানি আমার কাছে কোটি কোটি টাকা থাকলেও আমি নিজে থেকে কখনও রিজাইন করতে পারতাম না।”

জেপি হাত বাড়িয়ে দেয়। অল্প হেসে বলে, “এই হাত মেলানো কে কর্পোরেট টার্মিনোলজিতে কী বলে জানিস তো?”

“গোল্ডেন হ্যান্ড শেক।”

ওরা দু’জনেই হেসে ওঠে।

এখানে আসার আগে সৈকত অফিসের শেষ মেলটা টাইপ করে এসেছে। এখন ফিরে গিয়ে ও সেই মেলটা পাঠিয়ে দেবে, তারপরেই মুক্তি। সৈকতের ঠোঁটের কোণে হাসি দেখা যায়। যখনই মানুষ ভাবে যে হিসাব মিলিয়ে এনেছে, তখনই হিসাব বদলে যায়।

এই সময় সৈকতের ফোনটা বেজে ওঠে।

“হ্যালো।”

“হ্যালো, ইজ ইট সৈকত বাসু?”

“ইয়েস।”

ব্যাঙ্গালোর থেকে কোম্পানির রিজিওনাল হেড ভারতী আইয়ার ফোন করেছে। অনেকবার সে জেপিকে ট্রাই করেছে, জেপির ফোন আউট অফ নেটওয়ার্ক। এই ফ্লোরটাতে এরকম হয় মাঝে মাঝে।

প্রোজেক্ট পেঙ্গুইন স্ক্র্যাপ করা হয়েছে, জব কাট হচ্ছে। কিন্তু সেই লিস্টে সৈকতের নাম নেই। কোথাও একটা ভুল হয়েছে। সেই ভুলের জন্যেই সৈকতের কাছে এই ভুল ইনফর্মেশন গেছে, সৈকত যেন কিছুতেই রিজাইন না করে।

ফোন রেখে দেয় ভারতী। সৈকত ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে জেপির দিকে।

“কী হয়েছে সৈকত? কার ফোন ছিল?”

চোখের কোলে জল চিকচিক করে ওঠে সৈকতের। বুকের মধ্যে এক অস্বাভাবিক উন্মাদনা। কী করে অস্বীকার করবে সে যে এই মুহূর্তে সে প্রচণ্ড প্রচণ্ড সুখী? চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হচ্ছে সৈকতেরম ‘আই অ্যাম নট ফায়ারড।’

প্রায় দৌড়ে এসে সৈকত জেপিকে জড়িয়ে ধরে।

ঠিক এই মুহূর্তে সৈকত বুঝতে পারে, যে গত পনেরো বছরের কোন এক সময়ে সে কাচের ঘরের বাঁধনটাকেও ভালোবেসে ফেলেছিল। আবেগ বিহ্বল সৈকত এখন কিছুতেই বুঝতে পারে না কোনটা সত্যি, আর কোনটা মিথ্যা। তবে ও জানে, এ আবেগও একদিন থিতিয়ে আসবে।

গভীর রাতে সৈকত আবারও সেই খোঁচা খোঁচা দাড়িভর্তি মুখটা দেখতে পায়। এমনটা তো সত্যি নয় যে সৈকত হারিয়ে যেতে চায় না। এমনটা তো সত্যি নয় যে সৈকত এভারেস্টের বেস ক্যাম্পে যেতে চায় না। কিন্তু ও যে পারে না। সৈকত আমাদের সবার মতো ভিতু। সে কিছুতেই নিশ্চয়তা ছেড়ে অনিশ্চয়তার পথে পা বাড়াতে পারে না। সৈকত আমাদের সকলের মতোই সেই পথটাই নির্বাচন করে, যে পথে সবচেয়ে বেশি মানুষ হেঁটে গেছে। সেজন্যেই, শুধুমাত্র সেজন্যেই কোথাও কোনও তফাত ধরা পড়ে না। সৈকত বেশিরভাগ মানুষের মতো সফল হতে গিয়ে প্রতিবার ব্যর্থ হয়ে যায়।

ছবি: স্যমন্তক

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

1 Response to গল্প- গোল্ডেন হ্যান্ডশেক- ইমন চৌধুরী শরৎ ২০২০

  1. রুমেলা says:

    দুর্দান্ত গল্প

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s