গল্প -চলনদার শিবশংকর ভট্টাচার্য শীত ২০১৬

golposhibshankar01একেবারে মোক্ষম সময়ে রায়কাকু এলেন। বটতলায় দাশুর দোকানের আড্ডা বেশ জমে উঠেছে। ঘন্টাখানেক তেড়ে বৃষ্টি হয়েও আকাশের মেঘ কাটেনি। বড়দার দোকান থেকে গরম পেঁয়াজির প্রাণহরা সৌরভ ছড়িয়ে পড়েছে সাঁঝের বাতাসে। এমন সময় রায়কাকুর স্কুটার এসে দাঁড়াল।

রায়কাকু মানেই গল্প! কারণ, ভারতে এমন কোনও জায়গা নেই যেখানে উনি যাননি। ছেলেবেলা থেকে ষাট পেরোনো অবধি কতরকম চাকরি যে করেছেন আর ছেড়েছেন, তার হিসেব নেই। মেদিনীপুরের এক পাণ্ডববর্জিত গাঁয়ে চায়ের দোকানের বয়গিরিতে যার শুরু, শেষ আপাতত খান্নাদের মোটর ট্রেনিংয়ের স্কুলে। মাঝে নাকি বছর দশেক জাপানে এরোপ্লেন তৈরির কারখানায় কেটেছে। ইস্কুলে কলেজে পড়ার ব্যাপারটা রহস্যময়। তবে খানপাঁচেক বিদেশি ভাষা জলের মতো বলতে পারেন আর কৌস্তভকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ক’টা ভয়ঙ্কর কঠিন অঙ্ক মাটির দাওয়ায় দেশলাইকাঠি দিয়ে করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। মোট কথা, রায়কাকুর গুণের ফিরিস্তি দিতে বসলে আসল গল্পের আর জায়গা থাকবে না। কাজেই ওগুলো থাক।

রায়কাকু এসেই বললেন, “একটা কথা মনে রাখবি, পেটে খিদে থাকলে গল্প কখনও জমে না। কাজেই মনের ভেতরকার খাই খাই ব্যাপারটা আগে মেটানো দরকার।”

খানিকবাদে খাওয়াদাওয়া মিটলে আদা মেশানো চায়ের কাপে লম্বা একটা চুমুক দিয়ে রায়কাকু আয়েস করে বসলেন।

“তোদের আজকের সমস্যাটা কী? মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে আমি আসবার আগে কোনও একটা আলোচনা হতে হতে থেমে আছে। ঠিক কি না?”

দাশু মনমরা হয়ে বসেছিল। বলে উঠল, “ভূত আছে কি নেই পরিষ্কার করে বলে দিন তো কাকু! এরা কেউ ভূত-টুত বিশ্বাস করে না। বলছে বাজে গপ্পো সব!”

অমনি মুখিয়ে উঠল মনীশ, দেবু আর আজিজ, “ভূত কেউ দেখেছে নিজের চোখে? বিশ্বাস অমনি গাছ থেকে পড়বে, না?”

রায়কাকু দু’হাত তুলে থামালেন সবাইকে।

“মনীশ, তুমি তো ফিজিক্স পড়েছ?”

“আজ্ঞে হ্যাঁ।”

“নিউটনের সূত্র পড়েছ?”

“হ্যাঁ কাকু।”

“শক্তি ব্যাপারটাকে কি চোখে দেখা যায়?”

“তা কী করে সম্ভব!”

“নিউটন বলে কোনও মানুষ আদৌ ছিলেন কী করে জানলে?”

“ওটা তো আলাদা ব্যাপার হয়ে গেল কাকু। বিজ্ঞানের এতবড়ো মনীষী…”

“কথা হল, চোখে না দেখলেও আমরা মানছি নিউটন ছিলেন, তাঁর মহাকর্ষ অভিকর্ষ ব্যাপারগুলোও সত্যি। ভূত বিশ্বাস করতে বলছি না। প্রমাণ না পেলে অবিশ্বাসও কোরো না।”

“কাকু, আপনি নিজে ভূত বা আত্মায় বিশ্বাস করেন?”

দাশুর এগিয়ে দেয়া সিগারেট ধরিয়ে একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে রায়কাকু বেশ নাটুকে মেজাজে আবৃত্তি করলেন, “দেয়ার আর মোর থিংগ্‌স ইন হেভেন অ্যান্ড আর্থ, হোরেসিও! হ্যামলেট হোরেসিওকে বলছেন। আসলে শেক্সপিয়ার নিজের বিশ্বাসের কথাই হ্যামলেট দিয়ে বলিয়েছেন। তা নইলে ঘটনা মোড় নেবার অন্য আরও দিক ছিল। বাপের প্রেতাত্মা নিয়ে বাড়াবাড়ি করতেন না নাট্যকার। আমার জীবনের একটা ঘটনার কথা বলি। ভূত আছে কি নেই সমাধানের ভার তোমাদের ওপর।”

ঠিক এইসময় ইলেকট্রিক সাপ্লাই কর্পোরেশনের রসবোধের পরিচয় পাওয়া গেল হঠাৎ লোডশেডিং হয়ে যাওয়ায়। রায়কাকু বলা শুরু করলেন –

ঘটনাটা বেশিদিনের নয়। তোমরা জানো, চাকরির খাতিরে মাঝে মাঝে অদ্ভুত কিছু কাজের জন্য ডাক আসে আমার। বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে অসুবিধে থাকলেও না বলবার সুযোগ থাকে না। তখন শীত বেশ জমিয়ে পড়েছে, পৌষসংক্রান্তির কাছাকাছি সময়। মহারাজা তিলকপ্রসাদ সিংদেও ফোন করলেন, তাঁর রোলস রয়েজ গাড়িটি পানাগড়ের কাছে হঠাৎ জবাব দিয়েছে। সুরজ সিংয়ের পেট্রোল পাম্পে গাড়ি রেখে তিনি ময়ূরভঞ্জে ফিরছেন। আমি যেন অবিলম্বে পানাগড় পৌঁছে যাই। লেপ-টেপ ছেড়ে উঠতে হল। মুকুটহীন হলেও মহারাজার আদেশ, তা ছাড়া পুরনো বন্ধুও বটে। ঘড়িতে সকাল আটটা। ট্রেন ধরে পানাগড় পৌঁছতে অনেক বেলা হবে। কাজেই পুলওভার দস্তানা উলের মোজা ক্যারিয়ারে পুরে আমার দশ বছরের পুরনো সঙ্গী ল্যামরেটায় স্টার্ট করলাম। আমায় যেন চেনে গাড়িটা। মেজাজ মর্জি বোঝে। গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড ধরে বর্ধমান হয়ে আড়াই ঘন্টায় পানাগড় পৌঁছে গেলাম।

হ্যাঁ, রাজার গাড়ি বলে কথা! লম্বায় পাক্কা বিশ ফুট আর চওড়ায় ফুট নয়েক! উনিশশো তিরিশ সালের মডেল। দেখলে মনে হবে সবে নতুন গাড়ি জাহাজ থেকে খালাস হল! গাড়ি চালু করতে আধঘন্টার বেশি লাগল না। লাগবার কথাও নয়। স্পার্ক প্লাগে সামান্য কার্বন জমেছিল। গোলমাল যাই থাক, এ গাড়ির নাম শুনেই তল্লাটের আট দশটা নাম করা গ্যারেজের পাকা মিস্ত্রিও হাত লাগাতে রাজি হয়নি। যন্ত্রপাতি খুলে-টুলে পরিষ্কার করে আবার পরিয়ে দিতেই নিঃশব্দে স্টার্ট নিয়ে নিল রোলস রয়েজ। দেরি হয়ে গেল সুরজ সিংয়ের জন্য। পুরনো বন্ধু, সহজে কি আর ছাড়তে চায়! রাজার ডেপুটি সেক্রেটারি মিস্টার সিন্ধেও বললেন, ওঁর তরফ থেকে আমায় আপ্যায়ন করা হয়নি। শুনলে হিজ হাইনেস রাগ করবেন। অবশেষে বেলা চারটে নাগাদ রোলস রয়েজ গেল ধানবাদমুখী আর আমি সিন্ধের হাত থেকে একটা মোটাসোটা খাম পকেটে পুরে ফিরতি পথে রওনা হলাম। সুরজ সিং বিদায় দেবার সময় কী যেন বলতে গিয়েও বলল না।

বর্ধমান শহরটা কেমন ঘিঞ্জি জানো তো! বেনারস বাদে ভারতের আর কোনও শহরের পথে বোধহয় এত সাইকেল আর রিকশা একসঙ্গে দেখা যায় না। স্টেশনের পাশে নেতাজি মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের বিখ্যাত রসকদম্ব আর সীতাভোগ মিহিদানা কিনে ক্যারিয়ারে ভরে কার্জন গেট টাউন হল বাঁকাপুল পার হয়ে কিছুটা যাবার পর যেন একটু ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লাগল। পুলিশ লাইনের কাছে দাঁড়িয়ে পুলওভার আর মোজা চাপিয়ে তবে নিশ্চিন্ত। খোলা গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডে কম স্পিডে স্কুটার চালানো মানে বিপদ ডেকে আনা। তার ওপর বিকেলের আলো কমে আসছে। শীতের বেলা। ঘড়িতে দেখলাম বিকেল সওয়া পাঁচটা বেজেছে। অতএব চলো মুসাফির বাঁধো গাঠেরি। একটা ব্যাপার মাথায় এল না কিছুতেই। গ্র্যান্ড ট্র্যাঙ্ক রোড আজ এত নির্জন কেন! অন্তত পাঁচশোবার এ পথে নানানধরনের গাড়ি চালিয়েছি আমি, সে মার্সেডিজ বেন্‌জ ট্রাকই বলো আর লিমুজিন রোলস রয়েজই বলো। এরকম ফাঁকা রাস্তা কখনও পাইনি। অবশ্য চালাবার পথে ওসব এলোমেলো চিন্তা বেশিক্ষণ মাথায় থাকে না আমার। আধঘণ্টার মধ্যে যখন পালসিট ক্রসিংয়ে দাঁড়াতে হল তখন সাঁঝের শেষ আভাটুকুও মিলিয়ে গিয়ে চারদিক নিশ্চিদ্র অন্ধকার। দু’দিক থেকে দুটো মালগাড়ি ক্রস করবে, লালবাতি জ্বেলে গেট বন্ধ। ট্রাফিক রুল আমার কাছে বাইবেলের পাতা। কাজেই অন্তত দশ পনেরো মিনিটের জন্য নিশ্চিন্ত। দূর থেকে গাড়ির শব্দ শোনা গেল। ছোট্ট আলোর ফুলকির মতো হেডলাইট এগিয়ে আসতে আসতে বড়ো হচ্ছে, গুম গুম শব্দ বাড়তে বাড়তে একেবারে কাছে এসে গম গম ঝম ঝম করে দিগ্বিদিক কাঁপিয়ে চলে গেল মালগাড়িটা। গার্ডের গাড়ির লালবাতিটা দুলতে দুলতে ছোটো হতে হতে মিলিয়ে গেল! আবার নির্জন হয়ে পড়ল জায়গাটা। কেমন গা ছমছম করা নির্জন! ছেলেবেলা থেকেই রেলগাড়ির শব্দ ভালবাসি, মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম। হঠাৎ মনে হল স্কুটারটা যেন একটু দুলে উঠল। আশ্চর্য! স্টার্ট বন্ধ গাড়ি নড়ে golposhibsankar02ওঠার তো কোনও কারণ নেই! স্কুটারের সিট থেকে নেমে দাঁড়ালাম। নাঃ আবার দুলে উঠেছে! যেন কেউ দুষ্টুমি করে পেছন থেকে ঠেলছে। হঠাৎ গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল আমার, এ আবার কী! পকেটে পেন্সিল টর্চটা ছিল, জ্বেলে নিশ্চিন্ত হলাম। একটা বেশ বড়সড় কালো কুকুর। হাতখানেক তফাতে দাঁড়িয়ে আমার মুখের দিকে চেয়ে আছে। কেমন পোষমানা ভাব। চোখদুটো দেখে মনে হল ধড়াচূড়াসহ আমায় তার বেশ পছন্দ হয়েছে। কাছে ডাকতেই এগিয়ে এল। গায়ে মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে আরামে গর গর করতে লাগল। মস্ত বড়ো কুকুর। জাতে দেশি হলেও প্রায় অ্যালসেশিয়ানের মতো বড়ো। এরকম কুকুর পথে ঘাটে বড়ো একটা দেখা যায় না। গায়ের লোমগুলো ভেজা ভেজা। জিভ বার করে হাঁপানো দেখলে মনে হয় বেশ কিছুটা ছুটে এসেছে কুকুরটা। মনে মনে ভাবছি, বেশ হত এরকম একটা কুকুর পেলে। এমন সময় গেট উঠল। কুকুরটা মাথায় হাত বুলিয়ে আবার কিক করলাম স্টার্টারে। ঝড়ের বেগে আমায় নিয়ে এগিয়ে গেল ল্যামব্রেটা। সে দিন অমাবস্যা কি প্রতিপদ মনে নেই, তবে এরকম নিশ্চিদ্র অন্ধকার আর কখনও দেখিনি। বোধহয় বড়ো রকমের কোনও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের জন্য রাস্তার আলোগুলোও জ্বলছিল না। গাড়ির আলোয় হঠাৎ হঠাৎ ঝাঁপিয়ে আসা গাছগুলো ছাড়া আর কোথাও কিছু দেখা যাচ্ছিল না। পালসিট কর্ডলাইন গেট ছাড়িয়ে আরও আধঘন্টা পর পৌঁছলাম রসুলপুর রেলগেটে। আজ আমার ফেরার কপাল ভাল নয়। এটাও বন্ধ! দাঁড়িয়ে আছি তো আছিই, ট্রেনের দেখা নেই! স্কুটারটা আবার দুলে উঠল! চমকে পেছন ফিরে তাকালাম। এবার রাতের অন্ধকারেই ওর জ্বলজ্বলে চোখদুটো দেখতে পেলাম। সেই বিশাল কালো কুকুরটা! আমাকে যে পছন্দ হয়েছে বেশ বোঝা যাচ্ছে ওর চোখের ভাষায়। ওকে আনন্দ দেবার জন্য স্কুটারের টেল লাইটটা জ্বালালাম। প্রথমটা হকচকিয়ে পিছিয়ে গেলেও ব্যাপারটা উপভোগ করছে বোঝা গেল। কাছে এসে ঘাড় কাৎ করে দেখল কিছুক্ষণ। এবার সামনের সাইড ল্যাম্পদুটো জ্বেলে দিলাম। খুব খুশি! লাফিয়ে লাফিয়ে বারকয়েক প্রদক্ষিণ করল আমায়। তারপর সামনে স্কুটারের হ্যান্ডেলের ওপর সামনের থাবা দুটো তুলে দিল। ওর হিমে ভেজা মসৃণ লোমে ঢাকা মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললাম, “আমার সঙ্গে যাবি?”

কুকুরটা ঘাড় কাৎ করে আমার চোখের দিকে চাইল। যেন বলল, ‘নিয়ে চলো।’ চোখের দৃষ্টিটা অদ্ভুত! যেন কাছে থেকেও কত দূরে! খুব পোষ না মানলে এরকম দৃষ্টি হয় না। আমি বরাবরই কুকুর ভালবাসি। ভাবলাম স্কুটারের পেছনের সিটে বসিয়ে নিয়ে আসি কলকাতায়। রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে, কোথায় কী অঘটন ঘটাবে। এমন সময়ে গমগমে আওয়াজ তুলে ট্রেনটা লেভেল ক্রসিং পেরিয়ে গেল। এটা প্যাসেঞ্জার ট্রেন। বাইরে থেকে রাতের প্যাসেঞ্জার ট্রেন দেখতে বড়ো ভাল লাগে। চৌকো আলোর ছুটন্ত ফ্রেমগুলোয় কত লোকের মুখ, দূরের যাত্রীসব। ট্রেন চলে যাবার পর আবার চারধার শুনশান। লেভেল ক্রসিংয়ের গেট খুলে যাচ্ছে। কুকুরটাকে দেখতে পেলাম না কোথাও। স্কুটারে স্টার্ট দিতে যাব এমন সময় কেবিনম্যান এল। হাতের লাল সবুজ লন্ঠন তুলে আমায় দেখে যেন একটু অবাক হল লোকটা।

“কাঁহা যানা হ্যায় বাবুজি?”

“কলকাতা।”

“ই রাস্তা ঠিক নেহি হ্যায় বাবুজি। ডাকুলোগ কঁহি পকড় লেগা তো খতরা বন জায়গা।”

“কিচ্ছু হবে না বাবা! আমি বহুবার এ পথে গেছি।”

“রাতকো ইহাঁ ঠের যাইয়ে না, আপ আকেলে হো!”

সত্যি বড়ো ভাল লাগল। কত ভাল মানুষ এখনও বাস করে এ দেশে। বিপদের ভয় নেই তা নয়। ডাকাতি বা ছিনতাইয়ে রসুলপুরের রাস্তার নাম আছে বেশ, তবু যেতেই হবে আমাকে। হাতে প্রচুর কাজ। তা ছাড়া, কেমন একটা আলাদা ভরসা পাচ্ছি মনে, কে যেন ভেতর থেকে বলছে বিপদ হবে না আজ! লোকটাকে ধন্যবাদ জানিয়ে স্টার্ট করলাম। ঠিক করছি ফোর্থ গিয়ারে ষাট পঁয়ষট্টি কিলোমিটার স্পিডে টানা চলব। মেমারি পৌঁছতে আধঘন্টার বেশি সময় লাগবে না তা হলে। মেমারি পৌঁছে গেলে আর চিন্তা নেই।

মোটরগাড়িতে ষাট কিলোমিটার আর স্কুটারে এরকম ফাঁকা জিটি রোডে ষাট কিলোমিটার স্পিডে চালানোয় আকাশপাতাল তফাত। ঝড়ের বেগে চলেছি। কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া ধারালো ছুরির মতো মোটা পুলওভার ভেদ করে যেন গায়ে বিঁধে যাচ্ছে। দমকা বাতাসে মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে স্কুটারসুদ্ধ আমায় উড়িয়ে নিয়ে যাবে। স্পিডোমিটারের কাঁটা ষাট পঁয়ষট্টির মাঝে দুলছে, টায়ারে একটানা একঘেয়ে শব্দ। দু’পাশ থেকে মাথার ওপর ঝুঁকে থাকা বিশাল বিশাল গাছগুলো বহুদূর থেকে নিমেষে কাছে এসে আবার বহুদূরে মিলিয়ে যাচ্ছে। হরবন্‌স সিংয়ের ধাবার দু’কিলোমিটার আগে মনে হল গোটা চারেক সন্দেহজনক লোক রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আছে! স্পিড একটুও না কমিয়ে সোজা চলেছি আমি তাদের দিকেই। কে যেন ভেতর থেকে সাহস যোগাচ্ছে আমায়! কাছাকাছি আসতেই লোকগুলো হঠাৎ হুড়মুড় করে ঝোপঝাড়ের আড়ালে পালিয়ে গেল। ঝোপের আড়াল থেকে পরক্ষণেই ভয়ঙ্কর একটা চিৎকার রাত্রির আকাশকে খানখান করে দিল। হরবন্‌স-এর ধাবাতেও দাঁড়ালাম না। পেরিয়ে আসার সময় একপলকে মনে হল, হরবন্‌স অবাক হয়ে আমার দিকে চেয়ে রয়েছে, যেন কী বলতে চায়! আরও দশমিনিট ওইভাবে চলবার পর বাঁহাতে ক্লাচ করে ব্রেক দিতে হল। আশ্চর্য পোড়া কপাল আমার আজ! মেমারি লেভেল ক্রসিংয়ের গেটটাও বন্ধ! আবার স্টার্ট বন্ধ করে অপেক্ষা করা ছাড়া গতি নেই। মেমারির কেবিনম্যান রতন পানিগ্রাহী আমার পরিচিত। ভাবলাম, ওকে ডেকে গল্প করে সময় কাটাই। তারও কোনও পাত্তা পাওয়া গেল না। বার বার যদি এভাবে ক্রসিংয়ে দাঁড়াতে হয় বড়ো বিরক্ত লাগে। তবে লেভেল ক্রসিং পার হলেই মেমারি থানা বাঁহাতে। একটু এগিয়েই বাজার। দূর থেকে বাজারের লোকজন, আলো নজরে পড়ছে। সিগারেট ধরিয়ে নেবার জন্য স্কুটারের হ্যান্ডেল ছেড়ে দেশলাই জ্বেলেছি হঠাৎ স্কুটারটা আবার দুলে উঠল। নিভে যাওয়া কাঠিটা ফেলে আবার দেশলাই জ্বালতেই দেখি, কী আশ্চর্য! সেই কালো কুকুরটা! লম্বা জিভ বার করে হাঁপাচ্ছে। চকচকে চোখদুটো আমার দিকে স্থির চেয়ে রয়েছে। যেন বলছে আমায় ফেলে পালাবে ভেবেছে? আমি তো সঙ্গেই আছি পুরো রাস্তাটা তোমার চলনদার হয়ে!

হঠাৎ ছ্যাঁৎ করে উঠল মনটা। আশ্চর্য ব্যাপার! মেমারি থেকে পালসিট পাক্কা চুয়াল্লিশ কিলোমিটার। এই এতটা রাস্তা কুকুরটা আমার ঝড়ের গতিতে চলা স্কুটারের পিছু পিছু ছুটে এসেছে। এটা কী করে সম্ভব? কুকুরের তো এত জোরে দৌড়তে পারার কথা নয়! মনের মধ্যে কু-ডাক ডাকল কেউ, এটা সত্যিই কুকুর তো? কুকুরটা আবার আমার স্কুটার প্রদক্ষিণ করে হ্যাণ্ডেলের ওপর সামনের থাবাদুটো তুলে দাঁড়িয়েছে। ঘাম অথবা হিমে ভিজে জব জব করছে ওর কুচকুচে কালো লোমে ঢাকা গা। আস্তে আস্তে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ভাবছি এবার লেভেল ক্রসিংটা খুললে হয়! এমন সময় কুকুরটা আস্তে করে পা নামিয়ে একটু তফাতে সরে দাঁড়াল। ওর চাউনি যেন পরিষ্কার বলতে চায়, আমাকে অবিশ্বাস করছ? আমি তো তোমার চলনদার গো!

ভারী খারাপ লাগল আমার। সত্যিই তো! এই পথে হয়তো কত বিপদ-আপদ হতে পারত। ও আমায় পাহারা দিয়ে নিয়ে এল আর আমি যত আবোল-তাবোল ভাবছি! জিভ দিয়ে শব্দ করে কাছে ডাকলাম ওকে। অভিমানে ও যেন আরও একটু পিছিয়ে দাঁড়াল। এক চোখে অভিমান আরেক চোখে ভালোবাসা কুকুরটার। এমন সময় প্রচণ্ড আওয়াজে রাতের দিল্লি এক্সপ্রেস মেমারি লেভেল ক্রসিং পেরিয়ে চলে গেল বর্ধমানের দিকে। ট্রেন চলে যাবার পর সম্বিৎ ফিরে পেয়ে দেখি লেভেল ক্রসিংয়ের গেট উঠছে, কুকুরটা কোত্থাও নেই। গেট তোলা হলে রতন আমায় দেখে এগিয়ে এল।

“কী খবর রায়বাবু, কোত্থেকে?”

“পানাগড় থেকে ফিরছি।”

“রাত্তিরে এ পথে চলেছেন স্কুটার নিয়ে! কোনও ঝামেলা হয়নি তো?”

“নাহ্‌। কতবার গেলাম এ পথে, ঝামেলা আর কী!”

“আসলে রাত্তিরবেলা এ পথে কেউ একা যায় না ইদানীং। আচ্ছা দেখা হবে।”

স্টার্ট দিয়ে আবার পেছন ফিরলাম। নাহ্‌, কেউ ঠেলছে না আর। কুকুরটা ত্রিসীমানায় নেই। ভারি মন নিয়ে লেভেল ক্রসিং মেমারি থানা পেরিয়ে বাজারে এলাম। সকালের পর ভারি খাবার কিছু খাইনি, বেশ খিদে খিদে পাচ্ছে। তা ছাড়া পেট্রোলও ভরে নিতে হবে গাড়িতে।

মেমারি বাজারে তারকেশ্বর যাবার ডানহাতি রাস্তা আর জি টি রোডের মোড়ে রঘুনাথ সিংয়ের পেট্রোল পাম্প। স্কুটারটা তেল ভরতে দিয়ে রঘুনাথের সঙ্গে যুধুষ্ঠিরের ধাবায় আরাম করে বসলাম। এক পো দুধের এলাইচি চা তৈরির অর্ডার দিয়ে কী মনে হল, বললাম মাটির ভাঁড়ে আরও এক পো ঠাণ্ডা দুধ দিতে। রঘুনাথ অবাক। আবার ঠাণ্ডাদুধ কী হবে? দুধের ভাঁড় হাতে নিয়ে শুধু বললাম, “ভাল করে চা বানাও। দু’মিনিটে আসছি।”

হেঁটে গেলাম লেভেল ক্রসিংয়ের ওপারে। দূরে আমার চলনদার দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে আমার দিকে চেয়ে আছে। ভাঁড়টা রাস্তার ধারে রেখে বললাম, “এতটা এলি আমার সঙ্গে, তোকে ফেলে একা খেতে পারি? আয় খেয়ে নে।”

এল চলনদার। দুধটা খেল চক্‌ চক্‌ করে। মাথায় গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে আস্তে আস্তে লেজ নাড়ল, তারপর মিলিয়ে গেল অন্ধকারে। পথের বন্ধুকে পথেই রেখে আসতে মনটা যেন খালি হয়ে গেল আমার।

ধাবায় ফিরে চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিতে দিতে কুকুরটা কথা বলতেই রঘুনাথ যেন শক্‌ খেল!

“পালসিট থেকে মেমারি, কুকুর পাল্লা দিল স্কুটারের সঙ্গে! মাথা খারাপ হয়েছে তোমার?”

আমি কিছুতেই বিশ্বাস করাতে পারি না ওকে।

আমাদের আলোচনা শুনে ধাবার বুড়ো মালিক যুধিষ্ঠির বলল, “রায়বাবু, আপনার কপাল ভাল। ওই কুকুর আপনাকে ভালোবাসে, নজরদারী করে নিয়ে এসেছে। নইলে এতক্ষণে আপনার ডেডবডি পড়ে থাকত রসুলপুরের রাস্তার ওপর, ও-ই মারত আপনাকে। ওটা কুকুরের দানো, দু’বছর আগে ওকে আর ওর মনিবকে বদলোকেরা মেরে ফেলেছিল। সেই থেকে ও এই পথে পথে ঘুরে বেড়ায়। কত বদলোক যে ওর হাতে মারা পড়েছে তার ঠিকানা নেই। যাক, সবই গুরুজির কিরপা! এবার ভালয় ভালয় ঘরে ফিরে যান।”

গল্প শেষ করে রায়কাকু উঠে দাঁড়িয়ে আড়মোড়া ভাঙলেন।

“কুকুরের ব্যাপারটা না হয় বুঝলাম, তবে আমার ওপরেও হয়েছিল, এমন কারও যাকে কুকুরটা ভালবাসতো?”

স্কুটারে স্টার্ট দিয়ে রায়কাকু গম্ভীর নাটুকে গলায় আবার আবৃত্তি করলেন, “দেয়ার আর মোর থিংগ্‌স ইন হেভেন অ্যান্ড আর্থ হোরেসিও, দ্যান আর ড্রিমট্‌ অফ ইন ইওর ফিলোজফি!”

ছবিঃ শিবশঙ্কর ভট্টাচার্য্য

শিবশঙ্কর ভট্টাচার্যের সমস্ত গল্প                  জয়ঢাকের গল্প ঘর

1 Response to গল্প -চলনদার শিবশংকর ভট্টাচার্য শীত ২০১৬

  1. ধৃতি দত্ত বলেছেন:

    অসাধারণ লেখা…

    Like

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s