গল্প ছোটোরাজার পোষা ড্রাগন রতনতনু ঘাটী শরৎ ২০১৮

রতনতনু ঘাটী  র সব লেখা একত্রে

অগ্নিগড় এইটুকুনি একটা ছোট রাজ্য। তার তিনদিকে তিনটে নদী। সে নদীগুলোর নাম বসুধা, নন্দিনী আর ছুটনি। একদিকে একটা মস্ত বড় ঘন জঙ্গল। জঙ্গলের মাঝ বরাবর একটা উঁচু পাহাড় আছে। অগ্নিগড় রাজ্যের তিনজন রাজা। একজনও রানি নেই। কারণ, কোনও রাজাই এখনও বিয়ে করেননি।

রাজাদের তিনটে রাজপ্রাসাদ। বড় রাজপ্রাসাদে থাকেন বড়রাজা ইন্দ্রধর। তিনিই বড় ভাই। খুব কড়া ধাতের মানুষ। দোষ করলে তাঁর কাছ থেকে ক্ষমা পাওয়া খুব কঠিন। তাই তাঁরই হাতে রাজ্যশাসনের ভার।

অন্য দু”জন রাজা নিজের হবি নিয়ে সারাদিন ব্যস্ত থাকেন। তাই তাঁদের হাতে আর রাজ্যশাসনের জন্যে সময় কোথায়?

মেজোরাজা বজ্রধর। খুব জেদি স্বভাব তাঁর। পাহাড় তাঁর খুব প্রিয়। তাই যখনই মন টানে, তিনি রাজ্যের একমাত্র পাহাড়ে চলে যান। জীবনের বেশির ভাগ সময় তিনি রকক্লাইম্বিং নিয়ে মেতে থাকেন। দেশবিদেশের অনেক পাহাড়ই এখন তাঁর হাতের তালুর মতো চেনা। ইতিমধ্যে তিনি রকক্লাইম্বিংয়ের নানা নতুন নতুন কৌশলও আবিষ্কার করে ফেলেছেন। ভাবছেন সেসব নিয়ে একটা বই লিখবেন। আজকাল মানুষের পাহাড় নিয়ে আগ্রহ দিনদিন বাড়ছে। কিন্তু রকক্লাইম্বিং নিয়ে বাজারে ভাল বই পাওয়া যায় না।

তবে বই লেখা তাঁর একদম ধাতে নেই। গুরুগৃহে পড়ার সময় কিছুতেই লিখে পরীক্ষা দিতে চাইতেন না। লেখার বেলায় তাঁর খুবই আলস্য। তিনি থাকেন মাঝারি রাজপ্রাসাদে।

আর ছোটরাজার নাম চন্দ্রধর। তিনি একটু কোমল স্বভাবের মানুষ। তিনি ফুল ভালবাসেন, পাখি ভালবাসেন। গাছ লাগাতে পারলে তাঁর মন খুশি হয় সবচেয়ে বেশি। পশুপ্রাণীর দুঃখ সইতে পারেন না। কেউ কোনও পশু ধরেছে শুনলে তিনি তক্ষুনি ছুটে যান সেখানে। তারপর তার কাছ থেকে দরকার হলে টাকা দিয়ে কিনে সে প্রাণীকে জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে আসেন।

কিন্তু মানুষ তো নিজেকে পালটেও ফেলে সময় সময়। ছোটরাজাও তাই। ইদানিং তাঁর হবি পালটেছে। বেশ কিছুদিন তাঁর পশুপাখি পোষার শখ হয়েছে। সে-নিয়ে দিনরাত বিস্তর বই পড়ছেন। বিদেশ থেকে নানা বড় বড়  বই আনিয়েছেন। বড়রাজা ইন্দ্রধরের কাছ থেকে প্রায় ভিক্ষে চেয়ে নিয়েছেন পাঁচশো বিঘে জায়গা রাজ্যের এক প্রান্তে। সেখানে তিনি “বনাঞ্চল”  নামে গড়ে তুলেছেন একটা অরণ্য। সেখানে পশুপাখির খাবারদাবারেরও ব্যবস্থা করেছেন। যাতে পশুপাখিদের বনাঞ্চলের বাইরে না যেতে হয় খাবার খুঁজতে। সেও বড়রাজার রাজকোষ থেকে অর্থ নিয়ে। এ নিয়ে বড়রাজা কখনও কিছু বলেন না। মনে মনে ভাবেন, ছোটভাই খেয়লি স্বভাবের। থাকুক না পশুপাখি নিয়ে! এসব তো দোষের কিছু নয়।

ছোটরাজা চন্দ্রধরের বনে কোন্‌ পশু বা পাখি নেই? বাঘ-সিংহ-হাতি-ঘোড়া-গন্ডার-বাইসন-হরিণ যেমন আছে, তেমনি ময়না, কাকাতুয়া, ফিঙে, মাছরাঙা, বউকথাকও, বুলবুলি, কোন্‌ পাখি নেই?

পাখির নিজের বাসা বানাতে কষ্ট হবে ভেবে ছোটরাজা চন্দ্রধর গাছে গাছে পাখির বাসা বানিয়ে দিতে পারবে এমন লোককে ডেকে এনে চাকরি দিয়েছেন। সে সারাদিন গাছপালার মাথায় উঠে খড়কুটো, শুকনো লতাপাতা দিয়ে পাখির বাসা বানিয়ে চলে। সব পাখি যে বাসায় গিয়ে বাস করে তা নয়। তবু পাখিদের বাসা না বানিয়ে দিতে পারলে ছোটরাজার মন কাঁদে।

বাঘ-সিংহের জন্যে গুহা বানানোর লোকও আছে তাঁর হাতে। হিংস্র পশুদের জন্যে বনাঞ্চলের একটা দিক নির্দিষ্ট করে ঘিরে দিয়েছেন উঁচু প্রাচীর দিয়ে। দিনের বেশির ভাগ সময় তিনি বনাঞ্চলে থাকেন। পশুপাখির সুখ-দুঃখের হিসেব নেন। রাতে ফিরে আসেন ছোট রাজপ্রাসাদে।

একদিন হঠাৎ ছোটরাজা চন্দ্রধরের কাছে খবর এল, একটা কোন দেশে নাকি ড্রাগন থাকে। তিনি ভাবলেন, ড্রাগনের কথা তো বইয়ে পড়েছি। সে তো কল্পনার প্রাণী! চিন দেশের লোকেরা ড্রাগনের পুজো করেন। এরকম কত কথাই না পড়েছেন। কিন্তু সত্যি সত্যি ড্রাগন আছে নাকি? শুরু করে দিলেন খোঁজখবর।

দিন যায়, মাসও কেটে যায়। দেখতে দেখতে বছরও কেটে যায় যায়। এমন সময় খবর পেলেন, ইন্দোনেশিয়ায় কয়েকটা ছোট ছোট দ্বীপ আছে। সেখানে নাকি ড্রাগনরা ঘুরে বেড়ায়। তখন থেকেই তাঁর মাথায় ড্রাগন ভর করে বসল যেন।

একদিন বড়রাজা ইন্দ্রধরের কাছে গিয়ে চন্দ্রধর বললেন, “দাদা, আমি খবর পেয়েছি, একটা দ্বীপে নাকি ড্রাগন আছে। আমি একটা ড্রাগনের বাচ্চা নিয়ে এসে আমার বনাঞ্চলে রাখব? অনুমতি দিন!”

বড়রাজা শুনে বললেন, “এটা একটা মানুষের রাজ্য। সেখানে তুমি বাঘ-সিংহ রেখেছ, তাও বারণ করিনি। বাঘ-সিংহ মানুষের সঙ্গে মিশতেও পারে। কিন্তু ড্রাগন এনে পুষবে? এতে আমার মন সায় দিচ্ছে না। কবে বলতে কবে কী না বিপদ ঘটিয়ে বসবে? ড্রাগন বলে কথা? তখন রাজ্যবাসীর কাছে কী কৈফিয়ত দেব? না না, তুমি ড্রাগন পোষার ইচ্ছে ত্যাগ করো। এতে আমার রাজ্যের বদনাম হবে।”

ছোটরাজা চন্দ্রধর মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছেন দেখে বড়রাজা রক্ষীর হাতে খবর পাঠালেন, মেজোরাজা বজ্রধর যেন এক্ষুনি একবার রাজদরবারে আসেন।

রক্ষীর সঙ্গে মেজোরাজা হন্তদন্ত হয়ে এসে হাজির হলেন রাজদরবারে। বড়রাজা ইন্দ্রধর মেজোরাজার দিকে তাকিয়ে বললেন, “শোনো বজ্রধর, চন্দ্রধর নাকি আমার রাজ্যের বনাঞ্চলে ড্রাগন পুষতে চায়? তোমার কী মত?”

মেজোরাজা পাহাড়-পর্বত নিয়ে থাকেন। ওয়ান পয়েন্ট ক্লাইম্বিং, থ্রি পয়েন্ট ক্লাইম্বিং, ফুট হোল্ড, হ্যান্ড হোল, হিল ট্রেকিং নিয়ে তাঁর কাজকারবার। ড্রাগন পোষার ভাল-মন্দ কিছুই জানেন না। শুধু বললেন, “আপনার যা

ভাল মনে হয়, তাই করুন। তবে আশপাশের রাজ্যের সব রাজারই তো বাঘ-সিংহ-হাতি-ঘোড়া অনেক আছে।

“কিন্তু কারও কি ড্রাগন আছে? কই, কখনও শুনিনি। সেদিক থেকে দেখলে একটা নতুন ব্যাপার হবে আমাদের অগ্নিগড় রাজ্যে।”

বড়রাজা দোটানায় পড়ে গেলেন। কোনও সিদ্ধান্তে আসতে পারলেন না। খানিক চুপ করে থাকার পর ছোটরাজাকে বললেন, “আমি কয়েকদিন ভেবে দেখি!”

তারপর থেকে দিন গুনতে গুনতে মাস ছ’য়েক পেরিয়ে গেল। বড়রাজার কাছ থেকে ড্রাগন পোষার অনুমতি এল না। মনমরা হয়ে ছোটরাজার দিন কাটতে লাগল।

এমন সময় একদিন বড়রাজা ডেকে পাঠালেন ছোটরাজা চন্দ্রধরকে। রাজদরবারে চন্দ্রধর আসতে বড়রাজা বললেন, “অনেক ভেবে দেখলাম, তোমার ড্রাগন পোষায় অনুমতি দেওয়া যায় না। কিন্তু শুনেছি, তুমি সেই থেকে খুব মনমরা হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছ! তাই নিরুপায় হয়ে তোমাকে অনুমতি দিলাম। কিন্তু একটা শর্ত আছে।”

এতক্ষণ মাথা নিচু করে বড়রাজার কথা শুনছিলেন চন্দ্রধর। এবার তাঁর মুখের দিকে তাকালেন। অস্ফুটে জানতে চাইলেন, “কী শর্ত মহারাজ?”

বড়রাজা বললেন, “তোমার ড্রাগন যদি আমার রাজ্যে কোনও বিপদ ঘটায়, তবে তার দায় কিন্তু তোমার উপরেই বর্তাবে।”

বড়রাজার মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন ছোটরাজা চন্দ্রধর। তারপর ঘাড় নেড়ে সায় দিলেন।

নতুন উৎসাহে ছোটরাজা চন্দ্রধর খোঁজখবর শুরু করে দিলেন। ইন্দোনেশিয়ার কোমোডো দ্বীপ থেকে একজন লোক একটা কোমোডো ড্রাগনের বাচ্চাকে এক মস্ত খাঁচায় ভরে নিয়ে একদিন এসে সত্যি-সত্যি হাজির হল অগ্নিগড় রাজ্যের সিংহদরজায়। খবর গেল ছোট রাজপ্রাসাদে চন্দ্রধরের কাছে। সে খবর নিমেষে পৌঁছে গেল বড়রাজা ইন্দ্রধরের কাছেও।

বড়রাজা রাজরক্ষীদের ডেকে আদেশ দিলেন, “ড্রাগনকে রাজপ্রাসাদের ভিতরে আর আনার দরকার নেই। চন্দ্রধর সরাসরি ড্রাগনকে নিয়ে যাক বনাঞ্চলে।”

সেইমতো খাঁচাসুদ্ধ ড্রাগনকে নিয়ে যাওয়া হল বনাঞ্চলে। তাকে ছেড়ে দেওয়া হল বাঘ-সিংহের মতো ওরকম একটা লোহার নেট দেওয়া বিস্তীর্ণ ঘেরা জায়গায়। আর ড্রাগন-আনা লোকটিকে মোটা টাকা দিয়ে ফেরত পাঠানো হল তার দেশে। চন্দ্রধর অনেক বইপত্র ঘেঁটে কোমোডো ড্রাগনের খাবারের একটা তালিকা তৈরি করে ফেললেন। অনেক ছোটখাটো পশুই ড্রাগনের প্রধান খাদ্য। তাই সমস্যায় পড়তে হল না চন্দ্রধরকে।

খাবার এলে ছোটরাজা চন্দ্রধর নিজের হাতে ড্রাগনকে খাবার দিতে যান। অন্য কেউ ভয়ে সেখানে যেতে চায় না। ড্রাগনের চেরা লাল জিভ দেখলে সকলেই ভয়ে দৌড়ে পালায়। বই পড়ে ছোটরাজা চন্দ্রধর এও জেনেছেন, ড্রাগন নাকি দু-একজন লোক, যারা তাকে খেতে দেয়, তাদের মনে রাখতে এবং চিনতে পারে। নিজে তা পরীক্ষা করেও দেখেছেন। যখন খাবার নিয়ে ছোটরাজা ড্রাগনের ঘেরা জায়গায় যান, তখন খাবারের লোভে হোক, বা তাঁকে চিনতে পেরে হোক, ড্রাগনটা কিন্তু লম্বা লেজ মাটিতে ঘষটাতে ঘষটাতে ছুটে আসে। ছোটরাজার দিকে তাকিয়ে দেখে।

মেজোরাজা আর বড়রাজা মিলে একদিন বনাঞ্চলে ড্রাগনকে দেখতে গেলেন। ফিরে এসে তাঁরা দাসদাসী, অমাত্য-পারিষদের কাছে বললেন, “ড্রাগনটা দেখতে যেন কেমন। আমাদের বাঘ বা সিংহের মতো অমন সুন্দর নয়। বেশ একটা ভয়-ভয়ই লাগল দেখলে।”

সে-কথা ছোটরাজার কানেও পৌঁছল। তাতে অবশ্য তিনি কান দিলেন না। ড্রাগন পুষেছেন, এ নিয়ে তাঁর মধ্যে একটা গর্বও যেন দিনদিন বাড়তে লাগল।

ড্রাগনের খবর অগ্নিগড় রাজ্যে তো বটেই, আশপাশের দশ-বিশখানা রাজ্যে ছড়িয়ে পড়তে বেশিদিন সময় লাগল না। এসব রাজ্যের মানুষ কখনও ড্রাগন দেখেনি। লোকের কৌতূহল দিনদিন বাড়তে লাগল। তখন একদিন ছোটরাজা ভাবলেন, সাধারণ লোকের জন্যে ড্রাগন দেখার ব্যবস্থা করলে কেমন হয়? খরচখরচার কথা মাথায় রেখে এও ভাবলেন, আচ্ছা, ড্রাগন দেখার জন্যে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টিকিটের ব্যবস্থা করলে কেমন হয়?

কথাটা মন্ত্রীর মারফত বড়রাজার কাছে পাঠানো হল। ছোটরাজা চন্দ্রধর নিজে গিয়ে টিকিটের কথা বলতে পারলেন না বড়রাজাকে। কিন্তু যা হওয়ার তাই হল। বড়রাজা টিকিটের কথা শোনামাত্র নাকচ করে দিয়ে মন্ত্রীকে বললেন, “অগ্নিগড় রাজ্যের এখনও এমন দুর্দিন ঘনিয়ে আসেনি যে, ভিন রাজ্যের মানুষকে ড্রাগন দেখিয়ে অর্থ উপার্জন করতে হবে! যদি সাধারণ লোক ড্রাগন দেখতে আসে তো আসুক না। সত্যি কথাই তো, কেউ কখনও ড্রাগন দেখেনি!”

তারপর থেকে অগ্নিগড় রাজ্যে বহিরাগত মানুষের আনাগোনা অনেক বেড়ে গেছে। সকলেই ড্রাগন দেখতে আসছে। সেই উপলক্ষে কিছু ছোটখাটো খাবারদাবারের দোকান পশরা সাজিয়ে বসতে শুরু করে দিয়েছে বনাঞ্চল জঙ্গলের পাশে। এর ফলে ছোটরাজা চন্দ্রধরের কাজ অনেক বেড়ে গেছে। পাছে ড্রাগন দেখতে গিয়ে কেউ লোহার নেটের ফাঁক দিয়ে হাত ঢুকিয়ে দেয়! তা হলে আর রক্ষে নেই! জেনেছেন, ড্রাগনের জিভের লালাও নাকি খুব বিষাক্ত। সেজন্যে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সব সময় লক্ষ-নজর করেন। হিসেব করে দেখলে চন্দ্রধরের এখন মাসে দু’ দিনও ছোট রাজপ্রাসাদে আর যাওয়ার সময় হয় কিনা সন্দেহ।   

ওখানেই একটা মাঝারি সাইজের তিনতলা বাড়ি বানানো হয়েছে। তার নাম রাখা হয়েছে “অবসর ভিলা।” এই নামই বাড়িটার সঙ্গে বেশ মানানসই। কেননা, একে প্রাসাদ বলা যাবে না কোনও মতেই। সেখানেই ছোটরাজা চন্দ্রধর থাকেন। সকাল-সন্ধে ড্রাগনকে খেতে দেন নিজের হাতে। দেখভাল করেন। এখন ড্রাগনও ছোটরাজাকে বেশ চিনে গেছে। নেটের কাছে গেলে ড্রাগন মুখ তুলে কী যেন বলতে চায়। ছোটরাজা সে কথা নিজের মতো করে অনুবাদ করে গলা উঁচু করে সকলকে বলেন, “ও আমার কাছে আদর চাইছে!”

সময় সময় বড়রাজা ইন্দ্রধর ব্যস্ত রাজকার্যের ফাঁকে খোঁজ নেন ড্রাগনের। জেনেছেন, এখন ড্রাগনটা বেশ বড়সড় হয়েছে লম্বায়। ওজনেও পঞ্চাশ-ষাট কেজির বেশি বই কম নয়। তার চোখ দুটো আরও বেশি লাল

আর ভয়ানক হয়েছে। জিভটা লকলকে আগুনের শিখার মতো আরও বেশি লাল। তবে ওই একবারের বেশি বড়রাজার পক্ষে আর যাওয়ার সময় হয়ে ওঠেনি ড্রাগনের কাছে। কখনও কখনও বরাদ্দের বাইরে ড্রাগনের জন্যে খাবার পাঠিয়ে দেন। অমাত্য-মন্ত্রীরা এই অহেতুক খরচ সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি হেসে বলেন, “যতই হোক, অগ্নিগড় রাজ্যের একমাত্র ভিনদেশি অতিথি! তাই একটু ঘটাপটা না করলে কি হয়!”

।। ২।।

সে বছর অগ্নিগড় রাজ্যে ফসল ভাল হল। প্রজাদের মনে আনন্দ চলকে উঠল। পুলকিত হল বড়রাজার মনও। তিনি মন্ত্রীকে ডেকে বললেন, “মন্ত্রীমশাই, কিছুদিন ধরে আমার সমুদ্র-বিহারে যেতে মন চাইছে। অনেক দিন পরে এবার আমার রাজ্যে সুখের বাতাস বইছে। আপনি মাসখানেকের জন্যে আমার সমুদ্র-বিহারের আয়োজন করুন!”

রাজার কথার নড়চড় হল না। দিনসাতেকের মধ্যে বড়রাজা ইন্দ্রধরের সমুদ্র-বিহারের ব্যবস্থা করে ফেললেন মন্ত্রী। মোট সাতখানা নৌকোর একটা নৌবহর ভেসে পড়ল বসুধা নদীতে।

বড়রাজা ইন্দ্রধর মেজোরাজা বজ্রধরকে রাজ্যের ভার দিয়ে গেলেন। ছোটরাজা যেভাবে ড্রাগন নিয়ে ব্যস্ত, তাঁকে আর কোনও কাজের কথা বলা যায় না। বড়রাজা যাওয়ার সময় বলে গেলেন মেজোরাজাকে, “তুমি রাজার মতো মন নিয়ে রাজ্যশাসন করবে। মনে রেখো, এ তোমার পর্বতারোহণ নয়। এবার চূড়োয় পৌঁছনো গেল না, তো পরের বার ফের চেষ্টা করা যাবে! রাজ্যশাসনে একবার ভুল হলে সে ভুল শোধরানো কঠিন।”

মেজোরাজা চুপ করে তাঁর কথা শুনছিলেন। বড়রাজা ফের বললেন, “আর হ্যাঁ, আমি সমুদ্র-বিহারে যাচ্ছি বটে, আমার মন কিন্তু পড়ে থাকবে অগ্নিগড়ের দিকে।”

বড়রাজা এখন অগ্নিগড়ে নেই। মেজোরাজা ভালই রাজ্য শাসন করছিলেন। এই একমাস তাঁর পাহাড় পড়ে রইল দূরে। প্রজাদের সুখ-দুঃখ নিয়ে মগ্ন থাকলেন। দেখতে দেখতে বড়রাজা ইন্দ্রধরের ফেরার দিন এসে গেল। মনে মনে মেজোরাজা ভাবলেন, বড়রাজা ফিরে এলে তিনি হাঁফ ছেড়ে ফের পাহাড়ে মন দেবেন।

বড়রাজা ইন্দ্রধর সেদিন সাতসকালে তাঁর বসুধা নদীঘাটে সাত নৌকোর নৌবহর ভেড়ালেন। তখন পুব আকাশ রাঙিয়ে সূর্যদেব মেঘের ফাঁকে উঁকি দিচ্ছেন। পাখিরা খাবার খুঁজতে বেরিয়ে পড়েছে বাসা থেকে। আট বেহারার বড়রাজার পালকি এসে পৌঁছল বড় রাজপ্রাসাদে। তিনি সবে সিংহাসনে বসে বিশ্রাম নেবেন বলে তোড়জোড় শুরু করলেন। এমন সময় খবরটা তাঁর কানে এসে পৌঁছল।

রাজরক্ষী ছুটতে ছুটতে এসে খবর দিল, “একটা দুঃসংবাদ আছে রাজামশাই! বনাঞ্চলের লোহার নেট ছিঁড়ে ড্রাগনটা বেরিয়ে পড়েছে।”

কথাটা শোনামাত্রই বড়রাজা ইন্দ্রধর হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন, “সে কী? এ তো মহা বিপদের কথা! এক্ষুনি ড্রাগন যদি মানুষ খেতে শুরু করে? ছোটরাজা কোথায়?”

রাজরক্ষী কাঁপতে কাঁপতে বলল, “তিনি তাঁর অবসর ভিলার ছাদে দাঁড়িয়ে আছেন হতভম্ব হয়ে।”

বড়রাজা সিংহাসন ছেড়ে উঠে রাগে পায়চারি করতে লাগলেন প্রাসাদের বাতায়নে। একটু পরে বললেন, “ছোটরাজাকে বলো, যেভাবে হোক, ড্রাগনটাকে আস্তানায় ধরে নিয়ে যেতে হবে। ড্রাগনটা যদি একজন মানুষকেও আক্রমণ করে, আমাকেও বন্দুক হাতে তুলে নিতে হবে। তখন কিন্তু ছোটরাজারও ক্ষমা হবে না।”

রাজার আদেশে গমগম করে উঠল গোটা রাজপ্রাসাদ। রাজরক্ষী সে আদেশ নিয়ে পাঁইপাঁই করে ছুটল বনাঞ্চলের অবকাশ ভিলার ছাদে। সেখানে ছোটরাজা বড়রাজার আদেশ শোনার জন্যে অপেক্ষা করছিলেন। আদেশ শুনে থম মেরে দাঁড়িয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। কারও সঙ্গে একটাও কথা বললেন না। তাঁর মনে পড়ে গেল ড্রাগন পোষার অনুমতি দেওয়ার সময় বড়রাজা ইন্দ্রধর একটা শর্তের কথা বলেছিলেন। ড্রাগন পোষার আনন্দে এতদিন মনেই ছিল না সেই কঠিন শর্তের কথা।

একবার ড্রাগনটার দিকে তাকালেন ছাদের উপর থেকে। দেখলেন, ড্রাগনটা হরিণদের জন্যে ঘেরা জায়গার দিকে ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। একটু যাওয়ার পর আবার থমকে দাঁড়াচ্ছে। ছোটরাজা চন্দ্রধর মনে মনে ভাবলেন, বড়রাজার নিষ্ঠুরতার কথা কে না জানে! দোষীকে শাস্তি দিতে তাঁর মন একটুও টলে না। তাই বড়রাজার হাতে বন্দুক ওঠার আগে যা হোক একটা ব্যবস্থা করে ফেলতেই হবে। তরতর করে অবকাশ ভিলার সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলেন নীচে। গায়ে জড়ানো সকালবেলার সাদা উত্তরীয়। দূরে দূরে ভয়ার্ত লোকজনের ভিড় বাড়ছে কী ঘটে দেখার জন্যে। চন্দ্রধর হরিণের জন্যে ঘেরা জায়গাটার মধ্যে ঢুকে পড়লেন। রাজরক্ষী নিষেধ করতে গেলেন, “এ কী করছেন ছোটরাজা? ড্রাগনটা ঘুরে বেড়াচ্ছে যে?”

ছোটরাজা বললেন, “ওকে এতদিন আমিই তো খেতে দিয়েছি! আজ বুঝি খিদেটা বেশি পেয়েছিল। তাই জাল কেটে বেরিয়ে পড়েছে।” এগিয়ে চললেন ড্রাগনের দিকে।

অপেক্ষা করতে পারলেন না বড়রাজা। তিনি পাইক-বরকন্দাজ-রাজরক্ষীদের নিয়ে এসে হাজির হলেন বনাঞ্চলে। তাঁর কাঁধে উদ্যত বন্দুক। সকলে দেখলেন, ছোটরাজা চন্দ্রধর তখন একেবারে ড্রাগনের সামনে।

তখনও ছোটভাইয়ের জন্যে বড়রাজা ইন্দ্রধরের মন একটুও টলল না। বন্দুকটা তাক করে দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, “ড্রাগনটা যদি চন্দ্রধরকে আক্রমণ করে, তা হলে তো আমার নিশানা লক্ষভ্রষ্ট হবে না।”

দূর থেকে ছোটরাজা চন্দ্রধরের গলা শোনা গেল। ড্রাগনকে বলছেন, “তোর তো বিকেলবেলায় খিদে পায় রে? তবে যে আজ সকাল সকাল বেরিয়ে পড়েছিস? ও হো, বুঝতে পেরেছি! আজ বুঝি তোর তাড়াতাড়ি খুব খিদে পেয়েছে? রোজ রোজ পাখিটাখি খেতে ভাল লাগছে না? তোর জন্যে আজ ভাল মাংসের ব্যবস্থা করব।” বলে গায়ের উত্তরীয়টা খুলে ড্রাগনের গলায় পেঁচিয়ে দিয়ে টানতে টানতে নিয়ে চললেন ড্রাগনের আস্তানার দিকে। একবার ড্রাগনটা শুধু মুখ তুলে জুলজুল করে তাকাল ছোটরাজা চন্দ্রধরের দিকে। তারপর লম্বা লেজটা ঘষটাতে ঘষটাতে এসে ঢুকে পড়ল তার আস্তানায়।

ছোটরাজা বনাঞ্চলের কর্মীদের দিকে তাকিয়ে আদেশ করলেন, “শিগগির যাও। ড্রাগনের খাওয়ার ব্যবস্থা করো!”

জয়ঢাকের গল্প ও উপন্যাস

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s