গল্প দুটোই গোরু, দুটোই গাধা কৌশিক ভট্টাচার্য শরৎ ২০১৮

কৌশিক ভট্টাচার্য

আবার বাঘেদের আর চিতাদের মধ্যে ধুন্ধুমার লড়াই বেধে গেল।

লড়াই বেধেছে সেটা অবশ্য কোনও খবরই নয়। কত যুদ্ধ যে ওদের মধ্যে হয়ে গেছে এতকাল ধরে সে-সব লিখতে গেলে দু’হাজার পৃষ্ঠার ইতিহাস বই হয়ে যাবে। কাজেই সে-কথা থাক।

বড়ো কথাটা এই যে, লড়াই বাধায় সবচেয়ে সমস্যা হলো বাঘের ছানার আর চিতার ছানার। ওরা দু’জনে ভীষণ বন্ধু। সেই যে স্কুলে প্রথমদিন এ ওর গাল চেটে দিয়েছিল, বন্ধুত্ব সেই সেদিন থেকে। স্কুলেও ওরা সবসময় দু’জনে দু’জনের পাশে বসে আর রোজ এ ওর টিফিন ভাগ করে খায়। স্কুলের সবাই ওদের এই বন্ধুত্বের কথা জানে। জানেন ভালুকস্যারও। এখন এমন হয়েছে যে ওদের দু’জনের কেউ একজন পড়া না পারলেই ভালুকস্যার খুব আলতো করে ওদের দু’জনের মাথা ঠুকে দেন আর মজা করে বলেন, “দুটোই গোরু, দুটোই গাধা।” ক্লাসের সবাই হাসে, ওরাও হাসে।

বাড়িতে বড়োরা অবশ্য ওদের এই বন্ধুত্বকে মোটেই ভালো চোখে দেখে না। কতবার বাঘের ছানা বাবাকে বলতে শুনেছে, “আরে দূর দূর, চিতারা আবার বাঘ নাকি! গায়ে ডোরা নেই, চাকা চাকা দাগ, গুটলির মতো চেহারা। আমরা একটা টোকা মারলে কোথায় উড়ে যাবে তার ঠিক নেই।” এসব কথা বন্ধুকে কি বলা যায়? তাও একদিন, যেদিন বাবা ওকে খুব বকেছিল, সেদিন বাবার উপর রাগে ও বন্ধুর কাছে নালিশ করেছিল বাবার নামে। আর কী আশ্চর্য, ওর বন্ধু তখন ওকে বলল, ওর বাবাও নাকি ওকে বার বার বলে দিয়েছে বাঘেদের থেকে দূরে থাকতে। বলেছে, “ভীষণ পাজি আর বদমাশ ওই বাঘগুলো। লোভী, আর সবসময়ে খালি গুণ্ডামি আর মস্তানি।” আরো বলেছে, “নেহাত আমাদের এলাকাতে বাঘেরা সংখ্যায় কম, তাই চুপচাপ আছে। তবুও ওদের খেদিয়ে এ জঙ্গল থেকে দূর করে দেওয়াই আমাদের পক্ষে ভালো হবে।” শুনে চিতার বাবার উপরও খুব রাগ হয়েছে বাঘের ছানার। সে লোভী? সে গুণ্ডামি আর মস্তানি করে সবার সাথে?

বাঘের ছানা বুঝতে পারে না, এত লড়াই কীসের জন্য। জঙ্গলে খাবারের তো অভাব নেই। পেট ভরে সবার সঙ্গে খাও-দাও আর হল্লাহল্লি করে আহ্লাদে দিন কাটাও। এসব লড়ালড়ি-মারামারি আবার নিজে থেকে ডেকে আনার কোনও মানে হয়?

ওদের জন্মের ঠিক আগে যখন শেষ লড়াইটা হয়েছিল, বহু বাঘ আর বহু চিতা তাতে মরে। তখন জঙ্গলের অন্য প্রাণীরা এসে সালিশি করে পুরো এলাকাটা দু’দলের মধ্যে ভাগ করে দেয়। এখন দু’দল সেই দু’পাড়ায় থাকে আর মাঝে মাঝে সীমানায় এসে একে অন্যকে মুখ ভ্যাংচায়। ভুলেও কেউ অন্যের পাড়ায় যায় না।

ওদের স্কুলটা দু’দলের এলাকার ঠিক সীমানায়। ওরা জানে, এই নিয়ে ভালুকস্যারের একটা ভয় রয়েছে। প্রায়ই ওদের বলেন, “যত তাড়াতাড়ি পারিস সব শিখে নে। আবার যদি লড়াই লাগে সবচেয়ে আগে বন্ধ হয়ে যাবে এই স্কুলটা।”

ঠিক তাই হল। লড়াইও বাধল আর লড়াই বাধার সঙ্গে সঙ্গে স্কুলটাও গেল বন্ধ হয়ে।

লড়াইয়ের কারণটা সেই খাবার নিয়ে। বাঘ আর চিতাদের একসাথে আনবার জন্য ভালুকস্যার চেষ্টা করেছিলেন সবাইকে নিয়ে একটা পিকনিক করার। কিন্তু যেই বাঘেরা শুনল যে পিকনিকে চিতারা হরিণের মাংস পিছনের ঠ্যাং থেকে খাওয়া শুরু করবে, ওরা রেগে আগুন হয়ে গেল। এ তো পরিষ্কার বাঘেদের অপমান! না না, এই অপমান বাঘেরা সহ্য করবে না। এর একমাত্র বিহিত হল বদমাশ চিতাগুলোকে মার দিয়ে বুঝিয়ে দেওয়া জঙ্গলটা আসলে কার।

আর সবার মতো বাঘের ছানাও এখন জানে যে আদি-অনাদিকাল থেকে বাঘেরা ব্যাঘ্রশাস্ত্র মেনে সামনের ঠ্যাং থেকে খাওয়া শুরু করে। খুব ছোটোবেলায় খিদের মুখে ও একবার হরিণের পিছনের ঠ্যাং কামড়ে খাওয়া শুরু করতে গেছিল। মা একেবারে হা রে রে রে করে তেড়ে এসে ওকে ভাগিয়ে দেয়।

অনেকবার বাঘের ছানা বড়োদের জিজ্ঞাসা করেছে, পিছনের ঠ্যাং থেকে আগে মাংস খেলে কী হয়? বড়োরা গম্ভীরভাবে বলেছে, “বিপদ হয়, খুব বড়ো বিপদ!” কিন্তু সেই খুব বড়ো বিপদটা যে কী সেটা কেউ খুলে বলেনি। বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করে ও জেনেছে যে ওরা চিতারা সবসময় আগে পিছনের ঠ্যাং থেকে হরিণ খাওয়া শুরু করে। চিতা-পাঠে  নাকি পরিষ্কার লেখা আছে যে সব চিতা প্রথমে লেজটাকে উপরে তুলে মাটিতে দু’বার আছড়াবে, আর ঠিক একই সময় নিজের নাকটাকে ডান থাবা দিয়ে তিন বার চুলকোবে। তারপর খাওয়া শুরু করবে হরিণের পিছনের ঠ্যাং থেকে। বাঘের ছানা ভাবে, কই চিতাদের তো বিপদ হয় না? তবে কি বিপদ হয় শুধু বাঘেদের?

কে ঠিক? স্কুলে এই নিয়ে ভালুকস্যারকে প্রশ্ন করেছিল ওরা। ভালুকস্যার কেমন যেন গম্ভীর হয়ে গেলেন। তারপর এদিক ওদিক তাকিয়ে ফিসফিস করে ওদের বললেন, “বাজিয়ে দ্যাখ! সবকিছু বাজিয়ে দ্যাখ!” একথা বলতে বলতেই ভালুকস্যার হঠাৎ জ্বরে কোঁ কোঁ করে কাঁপতে লাগলেন আর ওদের বললেন, তাড়াতাড়ি করে ওষুধ খাবার জন্য এক গেলাস জল এনে দিতে। জল আনতে আনতে বাঘের ছানার আর চিতার ছানার কিন্তু মনে হল, ভালুকস্যারের এবারের জ্বরটা ঠিক স্বাভাবিক নয়। ভালুকস্যার সবকথা খুলে বলতে চাইছেন না।

যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল পুরোদমে।

রোজ রাত্রে বাঘের ছানার বাবা অন্য বাঘেদের সাথে বেরোয়। ভোরবেলা যখন ফেরে, সারা গায়ে আঁচড় আর কামড়ের দাগ। মা অনেকক্ষণ ধরে বাবার গা চেটে দিলেও রক্ত গড়ানো বন্ধ হয় না।

একদিন রাতে বাবা বাড়ি ফিরল খোঁড়াতে খোঁড়াতে। এ-অবস্থায় শিকারে বেরোনোর প্রশ্নই ওঠে না। ফলে মাকে বেরোতে হল শিকারে। বেশি দূর যাবার উপায় নেই, তাই এই প্রথম জীবনে ভরপেট খাওয়া জুটল না বাঘের ছানার।

পা খোঁড়া হলেও বাবার যুদ্ধের উৎসাহে ভাটা নেই। খাবার কম পড়ে পড়ুক, হতচ্ছাড়া গেছো বাঁদর চিতাগুলোকে যে একটু হলেও শিক্ষা দেওয়া গেছে এতেই বাবা খুশি।

স্কুল বন্ধ। বাড়িতে খাবার নেই। অসহ্য একটা পরিবেশ। বাবা চোট খাওয়া ঠ্যাংটাকে সাবধানে উপরে তুলে ঘুমোচ্ছে। মা বেরিয়েছে শিকারে। যাবার আগে পই পই করে বাঘের ছানাকে বলে গেছে একা ঘরের থেকে যেন না বেরোয়। দিনকাল ভালো নয়।

কিন্তু একা থাকলেই বাঘের ছানার খুব খিদে পায়। এত খিদে যে বলে বোঝানো যায় না। আচ্ছা, নিজে নিজে একটা হরিণ মেরে আনলে কেমন হয়? মা-বাবা ওর শিকার দেখে কেমন চমকে যাবে ভাব তো? হুঁ হুঁ বাবা, এরপরে তো মেনে নিতেই হবে যে ও বড়ো হয়ে গেছে।

বাড়ি থেকে বেরিয়ে বড়ো একটা নিঃশ্বাস নিল বাঘের ছানা। পুবদিকের থেকে আসা হাওয়াতে পরিষ্কার হরিণ-হরিণ গন্ধ। গুঁড়ি মেরে সাবধানে এগোতে এগোতে একটু পরেই দেখতে পেল হরিণের পুরো দলটাকে। মা বা বাবা যেরকম করে, ঠিক সেইরকম গর্জন করে লাফ দিল বাঘের ছানা একটা মোটামতন হরিণের দিকে। কিন্তু একদম ঠিক সময়ে লাফটা না হওয়ায় অল্পের জন্য তাক করা হরিণটা ফসকে গেল। ছুটতে শুরু করল পুরো দলটা। অনেকদূর ধাওয়া করেও দলটার কাউকে ছুঁতে পারল না বাঘের ছানা। এ-জঙ্গলের হরিণগুলো দৌড়োতে পারে খুব জোরে। ওদের ধরা এত সহজ নয়।

হরিণ তাড়া করতে করতে বাড়ির থেকে ঠিক কতটা দূরে চলে এসেছে এতক্ষণ সেই খেয়াল ছিল না বাঘের ছানার। হঠাৎ উপরদিক থেকে অন্যরকম একটা গন্ধ নাকে আসায় বাঘের ছানা দেখল একটু দূরে গাছের উপরে বসে দু-দুটো ষণ্ডা চিতা চারদিকে নজর রাখছে। স্কুল ছাড়িয়ে যে এলাকাতে ও ঢুকে পড়েছে সেটা চিতাদের এলাকা।

প্রায় একই সময়ে নাক দিয়ে বড়ো নিঃশ্বাস নিল দুই ষণ্ডা চিতা। তারপর দু’জনেই একই সাথে এ ওকে বলল, “বাঘ!”

প্রাণের ভয়ে ছুটতে শুরু করল বাঘের ছানা। এবারে আরও জোরে, কারণ ধরা পড়লে যে কী হবে সেটা বুঝতে ওর বাকি নেই। উপরে কাঁটার খোঁচায় কপাল আঁচড়ে গেল অনেকখানি। এসব পাত্তা দিয়ে কোনও লাভ নেই, ছুটে যেতে হবে। কিন্তু মুশকিল এই, যেদিকে ও বাধ্য হয়ে ছুটছে সেটা চিতাদের এলাকার আরও ভিতরে।

ভাগ্যিস চিতাদুটো অনেকটা দূরে ছিল, নইলে প্রাণ বেরিয়ে যেত এতক্ষণে। তবুও বাঘের ছানা জানে যে চিতার সাথে দৌড়ে ও পারবে না। হঠাৎ একটা মোড়ের মুখে বাঁক নিয়ে সামনে সোঁদা ফুলের একটা বড়ো ঝাড় দেখে তার মধ্যে ঢুকে পড়ল বাঘের ছানা।

ভাগ্য ভালো বলতে হবে। ঝাড়ের মাঝখানে ছোটো একটা গর্ত। বাইরে থেকে দেখে বোঝা যায় না। বোধহয় কোনও শেয়াল বা খরগোশের খোঁড়া। আলগা মাটি ছড়ানো চারপাশে। গর্তের মধ্যে বসে প্রাণপণে নিজেকে মাটি-চাপা দিতে লাগল বাঘের ছানা, নিজেকে যতটা পারে আড়াল করার জন্য।

প্রথমে মোড়ের মুখে এসে সোজা ছুটেছিল চিতাদুটো। বাঘের ছানাকে দেখতে না পেয়ে আবার মোড়ের মাথায় এসে দাঁড়াল। দুই ষণ্ডায় কথা হতে লাগলঃ

“যাহ্‌, পালিয়ে গেল।”

“সোজা তো যায়নি। তার মানে বাঁদিকে গেছে।”

“যাক, তাহলে আর দেখতে হবে না। সর্দার নিজে আছে ওখানে পাহারায়।”

“আর যদি লুকিয়ে থাকে?”

“কোথায় লুকোবে? এখানে নেই, থাকলে গন্ধে ঠিক টের পেতাম।”

“চল। একটা বাচ্চার পিছনে বেশি সময় নষ্ট করে লাভ নেই।”

“বাচ্চা তো কী হয়েছে? বাঘ তো! ধরতে পারলে ছিঁড়ে শেষ করে দেব!”

“আরে, তাড়াতাড়ি জায়গায় চল আগে। পাহারায় না দেখলে সর্দারই আমাদের ছিঁড়ে খাবে।”

মনে মনে নিজের বুদ্ধির তারিফ করল বাঘের ছানা। সোঁদা ফুলের গন্ধ ওকে বাঁচিয়ে দিয়েছে এবারের মতন। চিতাদের কথায় এটা বোঝা গেল যে বাঁদিকে যাওয়া চলবে না। তার মানে সোজা যেতে হবে। সোজাও কি পাহারা থাকবে? মনে হয় না। বাঘের ছানা জানে যে ওদিকে জঙ্গল শেষ হচ্ছে। মানুষের রাজত্ব ওদিকে। চিতারা খুব ভালো করে জানে যে বাঘেরা ওদিক দিয়ে আক্রমণ করবে না। সাবধানে গুঁড়ি মেরে মেরে সোজা পথ ধরে এগোতে লাগল বাঘের ছানা।

এটাই কি সেই পুকুরটা, যার কথা ওর বন্ধু ওকে বারবার বলেছে? কিন্তু পুকুরের পারে কে জল খেতে নেমেছে ওখানে? ওর বন্ধু চিতার ছানা না? তিন লাফে বন্ধুর দিকে এগোল বাঘের ছানা।

কিন্তু বাঘের ছানাকে দেখে ভয়ে কেমন যেন কুঁকড়ে গেল চিতার ছানা। অবাক হয়ে বাঘের ছানা বলল, “কী রে, কী হল?”

“মারবি না তো আমায়?”

আরও অবাক হয়ে গেল বাঘের ছানা।

“কেন? মারব কেন তোকে?”

তারপর মুহূর্তের মধ্যে সব পরিষ্কার হয়ে গেলো তার কাছে, কেন ভয় পাচ্ছে চিতার ছানা। ভয়ংকর রাগ হয়ে গেল বাঘের ছানার। চিৎকার করে উঠল, “ভেবেছিস কী তুই, তোকে শখ করে মারবার জন্য এতদূরে এখানে এসেছি?”

রাগের চোটে মাটিতে পা ঠুকল বাঘের ছানা। ছোটো গর্ত হয়ে গেল মাটিতে আঁচড় লেগে।

দুঃখে প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে পড়ল চিতার ছানা। “না না, জানি তুই আমায় মারবি না। তবুও হঠাৎ করে প্রায় তেড়ে আসার মতন ছুটে এলি, সারা গায়ে মাটি, কপালে রক্ত লেগে, তাই ভুল ভাবলাম।”

তারপর একটু থেমে আবার বলল, “কাল রাতে আমাদের পাড়ার চারজনকে একেবারে ছিঁড়ে টুকরো করে দিয়েছে বাঘেরা।”

“আর তোরা চিতারা? তোরা শুধু মার খেয়েছিস, করিসনি কিছু, তাই না?”

“না না, আমি কি তাই বলেছি? চিতারাও তো যাকে হাতের কাছে পাচ্ছে মারছে। সেজন্যই তো বোকার মতো ভাবলাম…”

কিছুক্ষণ চুপ হয়ে যায় দু’জনে। তারপর বাঘের ছানা বলে, “জানিস, আমার নিজের বেলা কী হয়েছে?”

কীভাবে এখানে এসে পৌঁছাল, বন্ধুকে সব খুলে বলে বাঘের ছানা। চিন্তার ভাঁজ পড়ে চিতার ছানার কপালে। “বাড়ি ফিরবি কেমন করে?”

“সেটাই তো ভাবছি!”

একটু ভেবে চিতার ছানা বলে, “হয়েছে। একটা উপায় আছে। আমাদের পাড়ার একেবারে ধার বরাবর চললে ঘুরপথে পৌঁছে যেতে পারবি। সব জায়গায় পাহারাও নেই, তবে কয়েকটা জায়গায় আছে। তুই তো জানিস না ঠিক কোথায়, আমি জানি। তাই তোর সাথে সাথে যেতে হবে আমাকেও।”

এইবারে বন্ধুর উপর কৃতজ্ঞতা আর ভালোবাসায় চোখ ছলছল করে ওঠে বাঘের ছানার। একটু অনুতাপও হয় বন্ধুকে ভুল বুঝেছিল বলে।

হাঁটা দেয় দু’জনে। জঙ্গল এদিকে বেশ হালকা। ধার বরাবর চলেছে ওরা। যেতে যেতে ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ে বাঘের ছানা। “জব্বর খিদে পেয়ে গেছে। কাল রাত থেকে খাইনি কিছু।”

“আমারও।”

কিছুক্ষণ বসে বিশ্রাম নিতে থাকে ওরা। তারপর হঠাৎ চিতার ছানা হাওয়ায় গন্ধ নেয়। ফিসফিস করে বন্ধুকে বলে, “হরিণ! বড়ো পাল একটা। জানিস, এদিক দিয়ে জল খেতে যায় ওরা।”

নিঃশব্দে গুঁড়ি মেরে হরিণের পালের দিকে এগিয়ে যায় ওরা দু’জন। তারপর কাছে এসে গর্জন করে লাফ দেয় হরিণদের দিকে।

আবার নিজের হরিণ ফসকে যায় বাঘের ছানার। কিন্তু চিতার ছানা অনেক বেশি ক্ষিপ্র। হরিণ তাক করতে ভুল হয় না তার। বাঘের ছানাও আবার লাফ দেয় সেই একই হরিণের ওপরে। চিতার ছানার ক্ষিপ্রতা আর বাঘের ছানার জোর, দু’জনে মিলে বিশাল চেহারার হরিণ-বাবাজিকে কুপোকাত করতে বেশি সময় লাগে না।

উত্তেজনায় ঘেমে হাঁপাতে থাকে দু’জনে। দু’জনেরই এই প্রথম হরিণ শিকার।

কিন্তু খাওয়া শুরু করতে গিয়েও হঠাৎ থমকে যায় ওরা। সামনের ঠ্যাং না পিছনের ঠ্যাং?

সমস্যার সমাধান করতেও দেরি হয় না। বাঘের ছানা বলে, “নে, আমি সামনের ঠ্যাং থেকে শুরু করছি। তুই পিছনের ঠ্যাং থেকে। একসাথে, কুইক!”

গোগ্রাসে মাংস খেতে ঝাঁপিয়ে পরে দু’জনে।

আবার চলা শুরু। ছোট্ট একটা পায়ে চলা পথ এঁকেবেঁকে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে গেছে। পথটা যদিও চিতাদের এলাকার মধ্যে, কিন্তু বাঘপাড়া ঠিক সামনেই। হঠাৎ খুব কাছ থেকে একটা বিকট সম্মিলিত গর্জনের আওয়াজ আসে বাঘেদের আর চিতাদের। ভীষণ ভয় পেয়ে পথ ছেড়ে পাশের জঙ্গল দিয়ে ছুটতে শুরু করে ওরা। আর ছুটতে ছুটতে দু’জনেই হঠাৎ লক্ষ করে, পায়ের নিচে জমি নেই। পুরনো পাতা আর ডালপালা দিয়ে ঢাকা ছিল, তাই বুঝতে পারেনি। কুয়োর মতো গভীর একটা গর্তের মধ্যে পড়ে গেছে ওরা।

গর্তের মধ্যে ভয়ে কেঁদে ফেলে ওরা দু’জনে। কী হবে এবার! চিতার ছানার চোখে জল। ফিসফিস করে বলে, “এটা ফাঁদ।”

“হুঁ।”

“কার ফাঁদ জানি না। যাদেরই হোক, হয় মাটি-চাপা দিয়ে মারবে নয়তো খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বা পাথর ফেলে ফেলে।”

“হুঁ!”

“কী বীভৎস! কী যে করব আমরা এখন!”

“তাড়াতাড়ি করতে হবে কিছু একটা। ফাঁদ যাদেরই হোক, একটু পরেই আসবে তারা।”

হঠাৎ বাঘের ছানার মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। বলে, “উপায় হয়েছে! ঐ লতাটা দেখছিস, কুয়োর দেয়াল বেয়ে ঝুলছে? তোর পিঠে চেপে লাফিয়ে ওটা ধরতে পারলে ওটা বেয়ে আমি উঠে যেতে পারব। উপরে উঠে লতাটা টেনে ধরে আরও একটু নামিয়ে দিলে তুইও উঠে আসতে পারবি!”

ভীষণ খুশি হয় চিতার ছানা। লতাটা ভালো করে দেখে নিয়ে বলে, “ঠিক বলেছিস। তবে একটা ব্যাপার। তোর ওজন আমার চেয়ে বেশি বলে তোর ভার নেওয়াটা আমার পক্ষে শক্ত। তবে লাফাতে আমি তোর চেয়ে বেশি পারি। তাই প্রথমে তুই নিচে থাক। তোর পিঠে আমি চড়ব।”

“ঠিক আছে।”

বাঘের ছানার পিঠে ওঠে চিতার ছানা। ঝাঁপ দিয়ে লতা আঁকড়ে ধরে। মুখ দিয়ে লতা কামড়ে চার পা কাজে লাগিয়ে তরতর করে উঠে আসে উপরে। উঠেই লতাটা ঝুঁকিয়ে নামিয়ে দেয় আরও একটু নিচে। হ্যাঁচোড়প্যাঁচোড় করতে করতে উঠে আসে বাঘের ছানাও।

উপরে উঠে হাসি ফোটে দু’জনের মুখে। কিন্তু ভালো করে হাসবার আগেই চিতার ছানা কান খাড়া করে বন্ধুকে ফিসফিস করে বলে, “লুকো, লুকিয়ে পড়, তাড়াতাড়ি!”

কেন তা বুঝিয়ে বলতে হয় না। দেখা যায় না, তবে স্পষ্ট শোনা যায়। শুকনো পাতার ওপরে কাদের যেন পা ফেলার শব্দ, খস খস খস। তাড়াতাড়ি কুয়োর গায়ে একটা ঘন ঝোপের মধ্যে ঢুকে পড়ে ওরা দু’জনে।

শব্দটা কিন্তু একটু কাছে এগিয়ে আসার পরে আবার থেমে যায়। তারপর ঘুরে যায় অন্যদিকে। ফাঁদ যাদেরই হোক, তারা বোধহয় টের পায়নি, ফাঁদে শিকার পড়েছিল কোনও।

অনেকদূর পর্যন্ত পায়ের আওয়াজ শোনা যায় শুকনো পাতার ওপর, খস খস খস। শব্দ পুরো মিলিয়ে যাওয়া অবধি নিঃশব্দে অপেক্ষা করে ওরা ঝোপের মধ্যে। শব্দ মিলিয়ে গেলেও কোনও ঝুঁকি নেয় না বাঘের ছানা আর চিতার ছানা। ভালো করে চারদিক দেখে আর গন্ধ শুঁকে তারপর ঝোপের থেকে বেরোয় ওরা।

ঝোপ থেকে বেরিয়ে এবার খিলখিল করে হেসে ওঠে দু’জনে।

চিতার ছানা বলে, “আমরা যা করলাম বড়ো বড়ো বাঘেরাও পারবে না।”

বাঘের ছানা কটমট করে বন্ধুর দিকে তাকায়। বলে, “হুম! বড়ো বড়ো চিতারাও পারবে না!”

আবার হাসে দু’জনে।

চিতার ছানা বলে, “এই পথ ধরে সোজা চলে গেলে তোদের পাড়ায় পৌঁছবি। আর কোনও পাহারা নেই সামনে। তুই রওনা দে তাহলে, আমিও ফিরি।”

রওনা দিতে গিয়েও থমকে দাঁড়ায় বাঘের ছানা। “আচ্ছা, একটা কথা মনে হল হঠাৎ। আমি মাংস খেলাম সামনের ঠ্যাং থেকে, তুই খেলি পিছনের ঠ্যাং থেকে – ঠিক বড়োরা যেমন বলে সেভাবে। কিন্তু তার ঠিক পরেই গর্তে পড়ে গেলাম আমরা। সব যদি ঠিকভাবেই করলাম তাহলে এত বড়ো বিপদ এল কেন?”

চিতার ছানা প্রতিবাদ করল। “কিন্তু শেষ অবধি তো আমরা কোনও বিপদে পড়িনি। হয়তো বড়োদের কথা শুনেছি বলেই আমাদের বিপদ হয়নি!”

বাঘের ছানার চোখ উত্তেজনায় জ্বলজ্বল করে ওঠে। “একটা কাজ করবি? হরিণটা তো আমরা আধখানা খেয়েছি। এবারে উলটোভাবে খাব। আমি পিছনের ঠ্যাং আর তুই সামনের ঠ্যাং। তারপর ঐ লতা বেয়ে আবার গর্তে নামব। চল না, দেখি কী হয়!”

“পাগল হয়েছিস! আবার কেউ কুয়োয় নামে?”

“হ্যাঁ, নামে! আমার মনে হচ্ছে ওই সামনের ঠ্যাং-পিছনের ঠ্যাং ব্যাপারগুলো একেবারে ফালতু।”

“হ্যাঁ, আমারও তা মনে হয়নি তা নয়, তবে…”

“তবে আবার কী? কোনও তবে-টবে নয়! আয়, নামি!”

“যাদের ফাঁদ তারা যদি ফিরে আসে?”

“আসবে না। আর আমি দেখেছি, প্রচুর শুকনো পাতা জমে আছে কুয়োর নিচে। পাতা-চাপা দিয়ে লুকিয়ে থাকব দু’জনে।”

“একটু বেশি ঝুঁকি হয়ে যাচ্ছে না?”

“হ্যাঁ, ঝুঁকি একটু তো আছেই। তবে এর আগের বারও তো আমরা গর্ত থেকে বেরোলাম, আবার পারব না? ভেবে দ্যাখ, কত কী করলাম আমরা এই অল্প সময়ের মধ্যে! বড়োরাও কি সবসময় এসব পারে? আমার মনে হয় পারব, নিশ্চয়ই পারব!”

এবার উত্তেজনায় চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে চিতার ছানারও।

এবারে হরিণ খাওয়ার সময় কেন জানি না ভীষণ হাসি পায় ওদের। কী ভয় পায় বড়োরা, আর কী বোকা সব! দাঁড়াও না, আর একটু সময় দাও আমাদের, তোমাদের শাস্ত্র-টাস্ত্র সব ঘেঁটে ঘোল করে দেব আমরা। নতুন করে সব শাস্ত্র লিখব আবার। আমাদের লেখা শাস্ত্র পড়ে চলতে হবে তখন।

লতা বেয়ে আবার কুয়োয় নামে দু’জনে। আবার উপরে উঠতে কোনও সমস্যা তো হয়ই না, বরং আরও অনেক তাড়াতাড়ি উপরে উঠে পড়ে ওরা।

উপরে উঠে বাঘের ছানা বলে, “দেখলি? বলেছিলাম তোকে, পারব!”

হাসে চিতার ছানা। “বড়োরা কেউ বিশ্বাসই করবে না।”

হঠাৎ করেই যেন অনেক বড়ো হয়ে গেছে ওরা। বড়োদের চেয়েও বড়ো।

দু’জনে দু’জনের গাল চেটে দেয়। এবার দু’জনে দু’দিকে যাবে।

হঠাৎ দূর থেকে হাওয়ায় ভেসে আসে গর্জন। প্রথমে বাঘেদের। তারপরে চিতাদের। দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বাঘের ছানা বলে, “লড়াই শুরু হয়েছে আবার!”

তারপর দুঃখ চাপতে হাসে। চিতার ছানাও হাসে। দাঁতে দাঁত চেপে বন্ধুকে বলে, “দুটোই গোরু, দুটোই গাধা!”

অলঙ্করণঃ ইন্দ্রশেখর

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

Advertisements

4 Responses to গল্প দুটোই গোরু, দুটোই গাধা কৌশিক ভট্টাচার্য শরৎ ২০১৮

  1. Arindam gangopadhyay says:

    “দুটোই গোরু, দুটোই গাধা!” সে আর বলতে! খুব ভাল! শুধু ধেড়েগুলোকে পড়াতে পারলে হয়.

    Like

  2. Kalpataru Bandopadhyay says:

    অসাধারণ প্রয়াস… অভিনন্দন পোগ্রাম লেখনী

    Like

  3. Kalpataru Bandopadhyay says:

    অভিনন্দন যোগ্য লেখনী…

    Like

  4. পীযূষ কান্তি দাস says:

    সামান্য ব্যাপার নিয়ে গোলমাল করে বড়ো রা । আসলে সমগোত্রীয় ছাড়া অন্য গোত্রের সাথে মেলামেশায় আপত্তি । রূপক ধর্মী গল্পটা ভালোই লাগালো ।

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s