গল্প নক আউট শিশির বিশ্বাস শরৎ ২০১৮

শিশির বিশ্বাস-এর সমস্ত গল্প   

অন্ধকার সাবওয়ের ওধারে

শিশির বিশ্বাস

দুর্যোগের দিনে বাড়ি থেকে বের হতে মানা করেছিল সবাই। গগনবাবু কান দেননি। কিন্তু তাইতে শেষ পর্যন্ত এমন বিপাকে পড়বেন, ভাবতেই পারেননি। আসলে অফিসে কাজ অন্ত প্রাণ গগনবাবু ওরফে গগনেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলি একেবারেই সৃষ্টিছাড়া মানুষ। টেলিফোন অফিসে ঢুকেছিলেন সেই আটত্রিশ বছর আগে। বাবা হঠাৎ মারা যেতে সংসারের পুরো দায় তখন কাঁধে। সামাল দিতে শুরু করেছিলেন ওভারটাইম। প্রথমে উইক ডে। তারপর সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও। অফিসে এসে সেই যে কাজ নিয়ে পড়তেন, টিফিনের আগে আর ওঠার সময় পেতেন না। অফিস থেকে বেরোতে সেই আটটা। ওই ওভারটাইমের টানেই তেমন ছুটিও নেননি। সংসারের দিকে তাকিয়ে তখন ব্যাপারটা মেনে নিয়েছিলেন হাসি মুখেই। তারপর কবে যে সেটা অভ্যাসে দাড়িয়ে গেছে, টেরও পাননি।

এক-এক করে বোনেদের বিয়ে দিয়েছেন। ছোট ভাই হিমাংশু কলেজ থেকে বের হয়ে এখন ব্যাঙ্কের চাকুরে। বিয়েও দিয়েছেন। কিন্তু নিজে আর ওসবে যাননি। মা বেঁচে থাকতে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু রাজি করাতে পারেননি। তারপর সময় পালটেছে। সংসারের ঝক্কি তেমন আর সামলাতে হয় না। হিমাংশুই এখন সেই দায়িত্বে। কিন্তু গগনবাবুর পরিবর্তন হয়নি। অফিসে ওভারটাইম বন্ধ হয়ে গেছে অনেক দিন আগে। কিন্তু ছুটির দিন ছাড়া তিনি অফিস কামাই করেছেন, এমন বিশেষ হয়নি। সেবার এক ব্যাপার হয়েছিল।

সেদিন শনিবার বিকেল। মাথা চুলকোতে-চুলকোতে হাতে একটা ছুটির দরখাস্ত নিয়ে গগনবাবু ইনচার্জ রায়সাহেবের ঘরে ঢুকলেনু। কাচুমাচু মুখে বললেন, “আর পারলাম না স্যার। দিন কয়েকের ছুটি নিতেই হবে এবার।

এস.ডি.ই রায়সাহেব বছর পাঁচেক আছেন এই অফিসে। বিলক্ষণ চেনেন মানুষটিকে। এমন কাজের মানুষ বড়ো একটা দেখেননি। সেই মানুষ হঠাৎ ছুটি নেবেন শুনে অবাক হয়েই বললেন, ‘তা দরকার থাকলে নেবেন বই কী।

‘কিছু দরকার নয় স্যার। রায়সাহেবের কথায় আরও কাচুমাচু হয়ে গেল গগনবাবুর মুখ । বাড়ির সবাই চাঁদিপুর বেড়াতে যাচ্ছে। দিন দুয়েক থাকবে। সেখান থেকে নাকি আরও কোথায়-কোথায় যাবে। ভাই সেজন্য গাড়িও ভাড়া করেছে। আমাকেও নিয়ে যাবে সঙ্গে। কী কাণ্ড বলুন দেখি! অনেক করে বললুম, শুনলে না কিছুতেই। ভাইপো দুটো আরও এক কাঠি। সাফ জানিয়ে দিয়েছে, জেঠু রাজি না হলে স্রেফ বেঁধে তুলে নেবে গাড়িতে। গগনবাবু করুণ গলায় বললেও প্রবীণ মানুষ রায়সাহেব কিন্তু খুশিই হলেন। বললেন, তা বাড়ির সবাই যখন বলছে, দিন কয়েক ঘুরেই আসুন না।

“আপনিও দেখছি স্যার ওই দলে!” একরাশ ক্ষোভ ঝরে পড়ল গগনবাবুর গলায়। বিরস মুখে ছুটির অ্যাপ্লিকেশনটা রেখে বের হয়ে গেলেন। পরের দিন রবিবার। সোমবার ফার্স্ট হাফে জি.এম অফিসে জরুরি মিটিং ছিল। সেটা সেরে বেলা দুটো নাগাদ রায়সাহেব নিজের অফিসে ফিরে কাজ করছেন, হঠাৎ হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকলেন গগনবাবু। একগাল হেসে বললেন, “আজ সকালেই ট্রেন ধরে পালিয়ে এসেছি স্যার! ওসব পোষায় আমাদের? বাপরে! এক বেলাতেই দম বন্ধ হবার জোগাড়!”

এহেন গগনবাবু ঘূর্ণিঝড় আয়লার খবরে অফিস কামাই করবেন, তাই হয়! গত রাত থেকেই টি.ভি আর রেডিওতে ঘন-ঘন হুঁশিয়ারি চলছে। বঙ্গোপসাগরে গভীর নিম্নচাপ প্রবল ঘূর্ণিঝড় হয়ে ধেয়ে আসছে দক্ষিণবঙ্গের দিকে। সুন্দরবন হয়ে আজ সকালের মধ্যে আছড়ে পড়বে কলকাতার উপর। শেষ রাত থেকে তার নমুনাও পাওয়া যাচ্ছে। ঝিরঝিরে বৃষ্টি। সেই সাথে দমকা হাওয়ার বেগ ক্রমশ বাড়ছে। কিন্তু তাতে পরোয়া করেননি। গত আটত্রিশ বছরে এমন দুর্যোগ মাথায় করে কত দিন অফিস করেছেন। বরং আজ একটু তাড়াতাড়িই বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন। বিরাটি থেকে বরাবর বাসেই যাওয়া আসা করেন। বাড়ির কাছেই স্ট্যান্ড, বসেই যেতে পারেন। কিন্তু আজ এই অবস্থায় সময়মতো বাস পাবেন না বুঝে সোজা চলে এসেছেন স্টেশনে। প্রায় ফাকা ট্রেনটা পেয়ে গিয়েছিলেন একটু পরেই। ঘন-ঘন হুঁশিয়ারির দরুন অফিস-যাত্রী তেমন কেউ যে আজ বাড়ি থেকে বের হয়নি, তা বেশ বোঝা যায়। আরামে বসেই একসময় পৌছে গিয়েছেন শিয়ালদহ। গোলমালটা হয়ে গেল তারপরেই। | প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে বাইরে বের হয়ে সামনে সাবওয়ে পড়তে গগনবাবু ঢুকে পড়েছিলেন সেই পথে। কিন্তু কপাল খারাপ। খানিক এগোতেই ঝুপ করে লোডশেডিং হয়ে গেল। এমারজেন্সি বাতিগুলো সাথে-সাথে জ্বলে উঠলেও তাতে অন্ধকার কাটল সামান্যই। সেই আধো অন্ধকারে গগনবাবু হঠাৎ আবিষ্কার করলেন দীর্ঘ সাবওয়ের ভিতর তিনি একেবারেই একা। আশপাশে কেউ কোথাও নেই। রীতিমতো শক্ত মনের মানুষ হলেও গগনবাবুর সারা শরীর হঠাৎ কেমন ছমছম করে উঠল। সেই আধো অন্ধকারে প্রায় হোঁচট খেতে-খেতে একসময় ওপ্রান্তে পৌঁছে দিনের আলোর দেখা পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে যাবেন, চারপাশে তাকিয়ে থতমত খেয়ে গেলেন। সামনে ফ্লাইওভার, এ.পি.সি রোড তেমনই আছে বটে, কিন্তু এ কী অবস্থা আজ শিয়ালদহের! মানুষের ভিড়ে সারাদিন গমগম করে যে জায়গা, আয়লার হুঁশিয়ারিতে আজ একেবারে শুনশান। ফুটপাতে অন্ধকার সাবওয়ের ওধারে হকার, অস্থায়ী দোকান, সব উধাও। পথে কোনও মানুষজনের দেখা নেই। খাঁ খাঁ করছে চারপাশ। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ফুটপাতে কোনও হকার বসতে ভরসা পায়নি হয়তো, কিন্তু পথে কোনও মানুষও কি থাকতে নেই! একটু হকচকিয়ে গেলেও সামলে নিতে সময় লাগল না। কিন্তু সমস্যা হল অন্য কারণে। ভেবেছিলেন সাবওয়ে থেকে বেরিয়ে বাস পেয়ে যাবেন। কিন্তু এই অবস্থায় বাসের ভরসায় পড়ে থেকে লাভ নেই। অফিস এমন কিছু দূরে নয়। সঙ্গে ছাতাও রয়েছে, কিন্তু ঝড়ের যা তেজ তাতে ছাতায় সুবিধা হবে না। কী করবেন ভাবছেন, বৃষ্টিটা বাড়ল আবার। ঠিক ওই সময় ক্যাঁচ-কোঁচ শব্দে একটা পুরোনো আমলের ঘোড়ার গাড়ি সামনে এসে দাঁড়াল। উপরে বসে হালকা লিকলিকে চেহারার এক কোচোয়ান। গালে খোচা দাড়ি লোকটা ঘাড় ফিরিয়ে ছোট এক সেলাম ঠুকে বলল, “আসেন কত্তা, আব্দুলের ছ্যাকরায় আসেন। কলকাতার রাস্তায় হঠাৎ ঘোড়ার গাড়ি দেখবেন, আশা করেননি গগনবাবু। মনে আছে, সবে তখন চাকরিতে ঢুকেছেন, এই শিয়ালদহ হয়েই যাওয়া-আসা করতেন। নতুন স্টেশন-বাড়ি তখনও তৈরি হয়নি। পুরোনো স্টেশনের সামনে ছিল বিশাল এক চত্বর। তারই একধারে ট্রাম গুমটি ঘেঁষে যাত্রীর অপেক্ষায় দাড়িয়ে থাকত গোটা কয়েক ঘোড়ার গাড়ি। রাস্তায় তখনও ঘোড়ার গাড়ি চলত। তারপর ধীরে-ধীরে সেসব উধাও হয়ে গেছে কলকাতার রাস্তা থেকে। কিন্তু এমন অদ্ভুত আকারের সেকেলে ছ্যাকরা কলকাতার রাস্তায় কখনও দেখেছেন বলে মনে করতে পারলেন না।

“কী ভাবচেন গো কত্তা? কেরাঞ্চি আজ আর পাবেন না। এই ঝড়-তুফানের দিনে সব ঘরে খিল দিয়েছে।”

হঠাৎ লোকটার কথায় চিন্তায় ছেদ পড়ল গগনবাবুর। কপালের ভাজগুলো কুঁচকে উঠল আরও। কিন্তু ওই সময় কোচোয়ান লোকটা যেন ব্যস্ত হয়ে উঠল হঠাৎ। হাতে ঘোড়ার দড়িতে সামান্য ঝাঁকুনি দিয়ে খরখরে গলায় বলল, “কত্তা তাহলে কেরাঞ্চির জন্যই থাকেন।”

কোচোয়ানের ইঙ্গিত পেয়ে ততক্ষণে নড়ে উঠেছে ঘোড়াটা। দেখে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন গগনবাবু। তাড়াতাড়ি উঠে বসলেন গাড়িতে। প্রায় মুহূর্তে ক্যাঁচ-কোঁচ আওয়াজে চলতে শুরু করল নড়বড়ে গাড়িটা ।

এই দুর্যোগের দিনে সুযোগ যখন মিলেছে তখন সেটা ছেড়ে দেওয়াটা ঠিক হবে না বুঝেই গাড়িতে উঠেছিলেন গগনবাবু। কিন্তু তারপর ভাবনাটা যেন আরও চেপে বসল মাথায়। স্কুলে ভাল ছাত্র ছিলেন। পড়ার বইয়ের বাইরেও প্রচুর বই পড়তেন। শুধু গল্পের বই নয়। অন্য বইও। সংসারের ঘূর্ণিপাকে পড়ে বই পড়ার সেই অভ্যাস প্রায় হারিয়ে গেলেও অনেক কিছুই ভোলেননি এখনও।

সত্তরের দশকের গোড়ায় যখন তিনি চাকরিতে ঢুকেছিলেন, তার আগেই কলকাতা থেকে ছ্যাকরা বিদায় নিয়েছে। তবু হয়তো মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু ওকেরাঞ্চি! সেই স্কুল জীবনেই একটা বইতে কেরাঞ্চি-গাড়ির কথা পড়েছিলেন। ওটা এক ধরণের ঘোড়ার গাড়ি। সেই আঠারো শতকের কথা। কলকাতা শহর তখন সবে গড়ে উঠতে শুরু করেছে। আজকের ডালহৌসি পাড়ায় একটা দুটো করে কোম্পানির অফিস, কোর্ট-কাছারি চালু হয়েছে। সেসব অফিসে সাহেব ‘রাইটার’ অর্থাৎ কেরানিদের সঙ্গে কিছু বাঙালি বাবুও ঢুকতে শুরু করেছেন। গোড়ায় তারা অফিসে আসতেন হেঁটেই। তারপর চালু হল ছ্যাকরা-গাড়ি। কিন্তু তাতে ভাড়া একটু বেশি বলে সামান্য মাইনের বাবুদের কাছে তেমন জনপ্রিয় হতে পারেনি। তাই অল্প দিনের মধ্যেই রাস্তায় এসে পড়ল দুই ঘোড়ায় টানা কেরাঞ্চি-গাড়ি। হাড়জিরজিরে ঘোড়া, কিম্ভত খাঁচার আদলে তৈরি সেই গাড়িতে পাঁচ থেকে ছ’জনের বসার ব্যবস্থা থাকত। জনপ্রতি ভাড়া তাই বেশ কম হত। বাঙালি বাবুদের অনেকেই তখন অফিসে যাওয়ার জন্য ব্যবহার করত ওই কেরাণ্ডি-গাড়ি। কিন্তু অনেকদিন হল সে-সব ইতিহাস হয়ে গেছে।

নড়বড়ে আসনে বসে সেই কথাই ভাবছিলেন গগনবাবু। হঠাৎ মনে পড়ল, কোচোয়ান লোকটাকে তো গন্তব্যস্থানের কথাই বলা হয়নি। জানতে চায়নি ও-পক্ষও। ধড়মড়িয়ে উঠে সেই কথাই বলতে যাবেন, বাইরের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ যেন বিষম খেলেন। এ কোথা দিয়ে চলেছে গাড়িটা! জলকাদায় ভরা কাঁচা পথ। দুধারে গাছপালার ফাঁকে নির্ভেজাল খড়-পাতা নয়তো টালির ঘর। তারই ফাঁকে এক আধটা একতলা কোঠাবাড়ি। পরিচিত কলকাতা শহরের ছিটেফোঁটা চিহ্নও নেই। এই সামান্য সময়ের মধ্যে লোকটা কোথায় নিয়ে এল তাকে! কোনও বদ মতলব নেই তো? ধড়মড়িয়ে উঠে বললেন, “দাড়াও। দাড়াও বাপু। এ কোথায় নিয়ে এলে?”

নড়বড়ে ছ্যাকরা গগনবাবুর নড়াচড়ায় ততক্ষণে টালমাটাল হয়ে উঠেছে। কোচোয়ান আব্দুল গাড়ি থামিয়ে ব্যাজার হয়ে বলল, “কেন, লালদিঘির দিকেই তো যাচ্চি কত্তা!”

লোকটা লালদিঘি বলতে যে ডালহৌসিপাড়া অর্থাৎ বি.বা.দি বাগ বোঝাচ্ছে সেটা বুঝতে ভুল হয়নি গগনবাবুর। তাড়াতাড়ি বললেন, “না-না লালদিঘি নয়। আমার অফিস ওয়েলিংটনের ওদিকে।”

“ও-ওয়েংটন! হঠাৎ যেন থতমত খেল আব্দুল। সেটা কোতা গো কত্তা?”

“ওয়েংটন নয়, ওয়েলিংটন। ধর্মতলার ওদিকে।” গগনবাবু বললেন।

“এই মাটি কল্লেন! সে তো সেই খালের ওধারে! আগে কইবেন তো!” গজগজ করে লোকটা বলল। আর সেই কথায় প্রায় আকাশ থেকে পড়লেন গগনবাবু। এতদিন কলকাতায় যাওয়া আসা করছেন, ধর্মতলার ওদিকে কোনও খাল নজরে পড়েনি। কিন্তু সে-কথা বলবেন কী, তার আগেই আব্দুল গাড়ি ঘুরিয়ে খরখরে গলায় বলল, “ওদিকের পথঘাট ভাল নয় কত্তা। ঝড়জলে আবার বান ডেকেছে গঙ্গায়। নড়াচড়া না করে সাবধানে বসেন দেখি।”

বলতে-বলতে লোকটা হুড়মুড়িয়ে পাশের সরু এক গলিতে গাড়ি ঢুকিয়ে দিল। এবড়ো-খেবড়ো গলির জলকাদায় পড়ে নড়বড়ে চাকায় আর্তনাদ তুলে গাড়ি টালমাটাল হয়ে উঠল আরও। দু’ধারের খোলা দরজা দিয়ে ছিটকে যেতে পারেন, সেই ভয়ে টাল সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন গগনবাবু। কাঁচা হলেও আগের রাস্তা তবু ভাল ছিল অনেক। দু’পাশে বাড়ি-ঘরও কিছু ছিল। এদিকে সরু গলির দুধারে শুধু ঝোপঝাড় আর জঙ্গল। তার উপর ঝড়ের বেগ হঠাৎ যেন বাড়তে শুরু করেছে। অঝোরে বৃষ্টির সঙ্গে শোঁ-শোঁ শব্দে যা দমকা বাতাস, গগনবাবুর ভয় হল, পলকা ছ্যাকরা উলটে না যায়। দু’ধারে গাছপালা ঝড়ে যেভাবে দুলছে, গাড়ির উপর ভেঙে পড়াও বিচিত্র নয়।।

ওই সময় পথের পাশে গোটা কয়েক ঝুপড়ি নজরে পড়ল। পাশে গোটা কয়েক মাঝ ধরার ঘুনি পড়ে থাকতে দেখে বুঝলেন, জেলেদের আস্তানা। ঝড়ে চাল উড়ে গেছে। ফাকা মাটির দেওয়ালগুলো হাঁ করে রয়েছে। জনমানুষ নেই। প্রাণ সঁচাতে পালিয়েছে সবাই। এই প্রথম গগনবাবুর মনে হল, বাড়ি থেকে আজ না বেরোলেই ভাল করতেন। ঠিক করে ফেললেন, অফিসে নয়, শিয়ালদহতেই ফিরে যাবেন আবার। গলা ঝেড়ে সেই কথাই বলতে যাবেন, গাড়িটা পথের বাঁকের কাছে এসে থামল। আব্দুল ঘাড় ফিরিয়ে বলল, “এবার নামেন গো কত্তা।”

নামবেন কী! সামনে নজর পড়তে পা থেকে মাথা পর্যন্ত শিউরে উঠল গগনবাবুর। সামনে অল্প দূরে মস্ত এক খাল। এই দুর্যোগের দিনে তাকে দুরন্ত এক নদী বললেও ভুল হয় না। বানের ঘোলা জলে থইথই। বড়-বড় ঢেউয়ের মাথায় জমাট ফেনার রাশি। খালের উপর নড়বড়ে এক কাঠের সাঁকো ঢেউয়ের দোলায় যেভাবে কঁপছে, ভেসে যাবে যে কোনও মুহূর্তে। দু’চোখ বিস্ফারিত করে সেদিকে খানিক তাকিয়ে গগনবাবু বললেন, “এ কোথায় এনে ফেললে ভাই! আ-আমি যে ধর্মতলার দিকে যাব!”

“কত্তা নতুন নাকি কলকাতায়!” কোচোয়ান আব্দুল ভিজে নেয়ে উঠেছে ইতিমধ্যে। কিন্তু সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ না করে অবাক হয়ে তাকাল গগনবাবুর দিকে। তারপর বলল, “সাঁকো পার হয়ে খানিক গেলেই ধর্মতলা! ওদিকে ছ্যাকরা যায় না। নামেন এবার।” ফের তাগাদা লাগাল সে।

ততক্ষণে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে এসেছে গগনবাবুর। কোনওমতে একটা টোক গিলে বললেন, “ন-না বাপু। ধর্মতলায় কাজ নেই। তুমি আমায় শেয়ালদাতেই নিয়ে চলো আবার।”

“শ-শেয়ালদা!” প্রায় আকাশ থেকে পড়ল লোকটা, “সেটা আবার কোথা?”

“ক-কেন? সেই যেখান থেকে ছ্যাকরায় উঠেছিলাম!” থতমত খেয়ে গগনবাবু বললেন।

“ও বৈঠকখানা? তাই বলেন। কিন্তু ফিরতি পথের ভাড়া লাগবে কত্তা।”

ফিরতি পথের ভাড়া কেন, গগনবাবু তখন তার বেশি দিতেও প্রস্তুত। সেই কথাই বলতে যাবেন, তার আগেই এক ভয়ানক ব্যাপার ঘটে গেল। ঝড়ের বেগ ক্রমেই বাড়ছিল। গাঢ় মেঘ, ঘন গাছপালার মাঝে আলোও ক্ষীণ হয়ে আসছিল। হঠাৎ ঝুপ করে নেমে এল গাঢ় অন্ধকার। মড়মড় শব্দে আশপাশে অনবরত ভেঙে পড়ছিল গাছপালা। আচমকা সেসব ছাপিয়ে প্রবল দমকা ঝড়ে হুড়মুড় করে চারদিক কাপিয়ে কী যেন ধেয়ে এল ওদের দিকে। সেই সাথে অনেক মানুষের অন্তিম আর্তনাদ। দারুণ আতঙ্কে চোখের পলক তখন স্থির হয়ে গিয়েছে গগনবাবুর। কড়-কড়াৎ শব্দে চোখ-কান ধাধিয়ে কাছেই বাজ পড়ল কোথাও। আর সেই সুতীব্র আলোয় এক ভয়ানক দৃশ্য দেখতে পেলেন। গোড়ায় মনে হয়েছিল মড়মড় শব্দে গাছপালা ভেঙে বিশাল এক দৈত্য যেন হাঁ করে সেই খাল পথে ধেয়ে আসছে। কিন্তু তারপরেই বুঝলেন, দৈত্য-দানো নয়, লম্বা মাস্তুল, দড়িদড়াসহ বড় এক জাহাজ। চোখের পলকে সেটা মড়মড় শব্দে আছড়ে পড়ল ছ্যাকরার উপর।

কোচোয়ান আব্দুলের আর্ত চিৎকার, ঘোড়ার ত্রাহিরব তখনও কানে বাজছে, তারই ভিতর হঠাৎ যেন সংবিৎ ফিরে এল গগনবাবুর। গোড়ায় মনে হয়েছিল, তিনি আর বেঁচে নেই। কিন্তু ভুল ভাঙতে দেরি হল না। ছ্যাকরা থেকে ছিটকে পড়লেও বেঁচেই রয়েছেন। তাড়াতাড়ি উঠে বসতেই বুঝলেন, শুধু বেঁচেই নয়, শরীরে কুটোর আঁচড়টিও লাগেনি। কিন্তু এ কোথায় তিনি ! চারপাশে ভাল করে চোখ ফেরাতে ফের চমকে উঠলেন। সেই জলকাদায় ভরা কাঁচা পথ, বনবাদাড়, খাল, আব্দুলের ছ্যাকরা, কিছুর চিহ্নমাত্রও নেই। ভয়ানক ঝড়বৃষ্টির ভিতর প্রায় কাকভেজা হয়ে পড়ে রয়েছেন ওয়েলিংটনের পাশে ফুটপাতের উপর।

অ্যাডভান্স ইনটিমেশন ছাড়া এই প্রথম অফিস কামাই করলেন গগনবাবু। এরপর আর অফিসে যেতে ভরসা পাননি। কোনও গতিকে এক রিকশাওয়ালাকে রাজি করিয়ে সোজা শিয়ালদহ। তারপর ট্রেন ধরে বাড়িতে। বলা বাহুল্য, ওই কাকভেজা অবস্থায় বাড়ি ফিরতেই পড়তে হল এক ঝাক প্রশ্নের মুখে। কিন্তু কিছুই বলতে পারেননি কাউকে। বললে কেউ বিশ্বাসও করত না। তার নিজেরই তো মনে হচ্ছিল, পুরো ব্যাপারটা মনের ভুল বা স্বপ্ন ছাড়া কিছু নয়। শিয়ালদহে ওই অন্ধকার সাবওয়ে থেকে বেরিয়ে বাস না পেয়ে ঝড়বৃষ্টি মাথায় একরকম ঘোরের মধ্যে ওয়েলিংটন পর্যন্ত হেঁটে চলে গিয়েছিলেন। বাকিটা সেই ঘোরের মধ্যে দেখা নিছক এক আজগুবি স্বপ্ন। কিন্তু সেটাও যুক্তি দিয়ে মেলাতে পারেননি। বেশ মনে আছে, ট্রেন থেকে নেমে ঘড়িতে সময় দেখেছিলেন, আটটা কুড়ি। আর ওয়েলিংটনের ফুটপাতে যখন তাঁর সংবিৎ ফেরে তখন ঘড়িতে সময় সাড়ে আটটা। ওই ঝড়বৃষ্টির ভিতর মাত্র দশ মিনিটে অতটা পথ হেঁটে যাওয়া এই বয়সে তার পক্ষে কিছুতেই সম্ভব নয়। বরং বাড়ি ফিরে ঠাণ্ডা মাথায় পুরো ব্যাপারটা ভাবতে গিয়ে হঠাৎ যেন অন্য এক ব্যাপার খুঁজে পেলেন।

পরের দিনই অফিসে লম্বা এক ছুটির দরখাস্ত পাঠিয়ে দিলেন গগনবাবু। বরাবরই জেদি স্বভাবের মানুষ। সহজে কখনও হাল ছাড়েননি। এবারেও ব্যতিক্রম হল না। প্রথমে পাড়ার লাইব্রেরি, তারপর ন্যাশানাল লাইব্রেরি থেকে বইপত্র জোগাড় করে খোঁজখবর করতেই পুরোনো কলকাতার এক ঘটনার কথা জানতে পারলেন। সে ১৭৩৭ সালের কথা। কলকাতা শহর তখন সবে গড়ে উঠতে শুরু করেছে। ওই ১৭৩৭ সালের ১০ই সেপ্টেম্বর ভয়ানক এক ঘূর্ণিঝড় আছড়ে পড়েছিল কলকাতার বুকে। অবশ্য শহর বলতে যা বোঝায়, সবে গড়ে ওঠা সেদিনের কলকাতায় অর ছিটেফোঁটাও ছিল না। বনবাদাড়ে ভরা সেই কলকাতায় গঙ্গা থেকে বের হওয়া একটা খাল আজকের হেস্টিংস স্ট্রিট। খালটা ওয়েলিংটন স্কোয়ারের পাশ দিয়ে চলে গিয়েছিল সল্টলেকের বাদার জলার দিকে। বড়-বড় নৌকো চলত।

সেই ঘূর্ণিঝড়ের দাপটে সেদিন তছনছ হয়ে গিয়েছিল কলকাতা শহর। প্রবল বানে ফুলে উঠেছিল নদীর জল। গঙ্গায় নোঙর করা কোনও জাহাজ আর আস্ত থাকেনি। তাদেরই একটা দড়িদড়া ছিড়ে হঠাৎ ভেসে এসেছিল সেই খাল দিয়ে। তারপর ওয়েলিংটনের কাছে ডাঙায় আছড়ে পড়ে চুরমার হয়ে গিয়েছিল। কোনও লেখায় আবার অন্য রকমও আছে। প্রবল ঝড়ে গোটা জাহাজটাই নাকি গঙ্গা থেকে উড়ে এসে পড়েছিল ওই জায়গায়। ভয়ানক এক ভূমিকম্পও হয়েছিল ওই সময়। জায়গাটার নাম সেই থেকে হয়ে গিয়েছিল ‘ডিঙিভাঙা’। পরে সেই খাল বুজিয়ে যে রাস্তা তৈরি হয়, লোকমুখে তারও নাম হয়ে যায় ডিঙিভাঙা। সেই রাস্তার খানিক অংশই আজকের ক্রিক রো।

রহস্যের হদিস খানিকটা হলেও এরপর পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল গগনবাবুর কাছে। এই ২০০৯-এর আয়লা ঘূর্ণিঝড়ের সকালে তিনি বের হয়েছিলেন বাড়ি থেকে। সন্দেহ নেই, তারপর শিয়ালদহে অন্ধকার সাবওয়ে দিয়ে যেখানে হাজির হয়েছিলেন, তা দু’শো বাহাত্তর বছর আগের কলকাতায় আর এক ঘূর্ণিঝড়ের দিন। আব্দুলের ছ্যাকরা, কলকাতার কাঁচা রাস্তা, গলিপথ, ওয়েলিংটনের কাছে গঙ্গার খাল, নড়বড়ে সাঁকো, সবই সেই পুরোনো দিনের কলকাতা শহরের।

‘দি টাইম টানেল’ নামে আর একটি বই থেকেও মিলেছে কিছু তথ্য। সময়ের মধ্যেও নাকি কখনও ফাটল ধরে। তৈরি হয়। মস্ত এক সুড়ঙ্গের। উদ্ভট হলেও ব্যাপারটা অনেকেই আর উড়িয়ে দিচ্ছেন না। ওই নামে হলিউডে একটা জনপ্রীয় টিভি সিরিয়ালও তৈরি হয়েছে। মহাকাশে বিজ্ঞানীরা নানা ধরণের রহস্যজনক কণার সন্ধান পাচ্ছেন। এদের কোনোটার প্রভাবেই নাকি হঠাৎ সময়ের সেই ফাটলের মুখটা খুলে যায়। তখন সেই সুড়ঙ্গের ভিতরে গিয়ে পড়লে সময়ের বাধা অতিক্রম করে মুহুর্তে যেমন কয়েক লক্ষ বছর এগিয়ে যাওয়া যায়, তেমন পিছিয়েও যাওয়া যায়। শিয়ালদহে অন্ধকার সাবওয়ের ভিতর সেদিন এমন কিছুই ঘটেছিল কিনা, অনেক ভেবেও কিনারা করতে পারেননি।

তবে অন্য একটা ব্যাপার হয়েছে। লম্বা ছুটির পর অফিসে জয়েন করেই গগনবাবু জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি ভি আর নেবেন এবার। চাকরি অনেক দিন করেছেন। এবার বাকি জীবনটা একটু বইপত্র নিয়ে কাটাবেন।

অলঙ্করণঃ শিমুল

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

1 Response to গল্প নক আউট শিশির বিশ্বাস শরৎ ২০১৮

  1. Rumela says:

    বরাবরের মত দারুন একটা মেজাজ পেলাম গল্পে।

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s